পেন্ডুলাম

রচনা  : রে ব্র্যাডবেরি এবং হেনরি হাসে, অনুবাদ: পুষ্পল সরকার

অলঙ্করণ : সূর্যোদয় দে

সে ছিল কালের কয়েদি। জীবন ও মৃত্যু থেকে বহিষ্কৃত, এক আশ্চর্য বিষণ্ন জীব। সে তার সামনে দেখেছে সময়ের অনবরত আসা যাওয়া, আর ভীত ভাবে অপেক্ষা করেছে শুধু…অনন্তের?

     “আমার মনে হয়”, এরহাস তীক্ষ্ণ স্বরে বলে “আমরা যতগুলো গ্রহে গিয়েছি তার মধ্যে এই আবিষ্কারটি সব থেকে কৌতূহলজনক।” তার চওড়া সবুজ চকচকে ডানা কাঁপে, পুঁতির মতো চোখে বিদ্যুতের ঝলকানি। তার অনেক সাথীই তাদের মাথা নেড়ে সহমত জানায়, তাদের সরু ঘাড়ের কাছের নরম সবজে-সোনালি পালক নড়ে ওঠে। তারা দাঁড়ের মতো যার ওপরে বসে আছে সেটা আসলে ছিল চলন্ত ফুটপাথ যেটা এখন কুঁচকে যাওয়া ফিতের মতো ঝুলে রয়েছে সামনের বিস্তৃত শহরের ধ্বংসস্তুপের উপর।

     “হ্যাঁ” এরহাস বলে চলে, “এটা উদ্ভট এবং বিভ্রান্তিকর! এটা… এটা থাকার কোনও কারণই নেই।” সে অকারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তুর দিকে আবার ইঙ্গিতে দেখায়, যা সামনের ওই পাথুরে চাতালের উপর দাঁড়িয়ে। “দ্যাখো, একটা বিরাট নলাকার পেন্ডুলাম সুউচ্চ ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত আর ওই যন্ত্রপাতিগুলো কোনও এক সময় ওটাকে দোলাত… আমি একটু আগে পরীক্ষা করার জন্য উড়ে গিয়েছিলাম ওটার কাছে, কিন্তু হতাশাজনক ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে সব।”

     “কিন্তু ওই পেন্ডুলামের মাথাটা!” আর একজন পক্ষীজীব ভীতভাবে বলে ওঠে “একটা ফাঁপা প্রকোষ্ঠ, স্বচ্ছ কাঁচের–আর ওর মধ্যেই তো ওই ভয়ঙ্কর জিনিসটা বাইরে তাকিয়ে…”

     পেন্ডুলাম প্রকোষ্ঠের কাচের দেওয়ালে চেপ্টে দাঁড়িয়ে এক মানব কঙ্কাল। তার সাদাটে করোটি দেখছে নীচের নির্জন, চূর্ণবিচূর্ণ শহর– আর সামনের বেঁকে, দুমড়ে যাওয়া স্টিলের গার্ডারগুলো যেটা দেখে মনে হচ্ছে বিরাট এক স্টিলের লম্ফোদ্যত মাকড়সা, যেন এখুনি লাফিয়ে পড়বে!

     “জিনিসটা যেভাবে দাঁত বের করে হাসছে তা যে কোনও লোকের ভয় পাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট” একজন বলে।

     “ওই হাসি দেখে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই” এরহাস বিরক্ত হয়। “ওটা শুধুমাত্রই এক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কঙ্কাল যারা একসময়, নিশ্চিতভাবে এই জগতে বসবাস করত।’’ সে একটু ঘাবড়ে গিয়ে তার সরু সরু পা একটার উপর আর একটা রেখে বলে ওঠে, ‘‘তবুও ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেন— প্রায়— বিজয়ী রাজা! এদের আর কেউ কোথাও নেই কেন? কেন এ একা এখানে আর কেনই বা এই অদ্ভুত কাচের পেন্ডুলাম প্রকোষ্ঠে বন্দি?”

     “খুব শীঘ্রই আমরা এই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব।” আর একজন পক্ষীজীব সামনের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের মহাকাশযানের দিকে চেয়ে কাঁপা গলায় বলে ওঠে, ‘‘অরফ্লিউ এর মধ্যেই যে খাতাটা ওই কুঠুরি থেকে নিয়ে এসেছে তার বিচিত্র লিপির পাঠোদ্ধারও শুরু করে দিয়েছে। ওকে এখন বিরক্ত করা উচিত হবে না।”

     “ও কীভাবে খাতাটা উদ্ধার করল? আমি তো ওখানে ঢোকার কোনও জায়গাই দেখতে পাচ্ছি না।”

     “পেন্ডুলামের পাশের ওই লম্বা বাহুটা আসলে ফাঁপা, ওই ঘরটাকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো সাফ করার জন্য। অরফ্লিউ ওটা দিয়েই ঢুকেছে মনেহয়। যাইহোক, খাতার পাতাগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল কিন্তু অরফ্লিউ প্রায় পুরোটাই উদ্ধার করতে পেরেছে।”

     “ওফ! অনুবাদটা একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়! ও যে কেন…”

     “আরে! ওকে একটু সময় দাও। অজানা ভাষার পাঠোদ্ধার করার বিষয়ে অরফ্লিউ-এর একটা সহজাত প্রতিভা আছে।”

     “ঠিকই বলেছ। আমার এখনও মনে আছে সেই নক্ষত্রপুঞ্জের ছোট্ট গ্রহটি থেকে পাওয়া অজানা ধাতুফলকটির কথা…”

     “ওই তো, ও আসছে!”

     “আশ্চর্য! এর মধ্যেই কাজটা শেষ করে ফেলেছে!”

     “ওহ! আবার আমরা এক বিচিত্র কাহিনি জানতে পারব।”

     মহাকাশযানের দরজায় অরফ্লিউকে দেখে পক্ষীজীবরা খানিক শিহরিত হয়। সে খুব যত্নসহকারে হলুদ হয়ে যাওয়া এক বান্ডিল কাগজ নিয়ে আসছে সঙ্গে। আস্তে করে উড়ে এসে সে ওই দাঁড়ের মতো জায়গাটিতে বসে তার সাথীদের মাঝে।

     “এদের ভাষা বেশ সহজ।” অরফ্লিউ বলল। “আর কাহিনি খুবই দুঃখময়, বিষণ্নতায় ভরা। আমার বলা শেষ হলেই আমরা এখান থেকে উড়ে যাব, কারণ এই জগতের জন্য আমাদের করার কিছুই অবশিষ্ট নেই।”

     উদগ্রীব শ্রোতারা অরফ্লিউ-এর আরও কাছ ঘেঁষে বসল। বাতাসহীন এই পৃথিবীতে পেন্ডুলামটা একদম খাড়া এবং সম্পূর্ণ গতিহীন, স্বচ্ছ প্রকোষ্ঠটি চাতালের কয়েক ফুট ওপরে। সেই হাস্যময় করোটি এখনও দেখছে, মনে হচ্ছে সে যেন খুব মজা পাচ্ছে অথবা সে যেন পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত। অরফ্লিউ চকিতে আর একবার তার দিকে তাকিয়ে খাতার পাতা খুলে পড়তে শুরু করল।

     আমার নাম জন লেভিল। আমি ‘কালের কয়েদি’ নামেই পরিচিত। কত লোক, কত ভ্রমণার্থী দেশবিদেশ থেকে এই দুলন্ত পেন্ডুলামের মধ্যে আমাকে দেখতে আসে। ওই চলন্ত ফুটপাথের ওপর দাঁড়িয়ে স্কুলের ছোটছোট বাচ্চারা ভয়মিশ্রিত বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা আমাকে নিয়ে গবেষণা চালান, তাঁরা আমার সামনে দাঁড়ান, আমার এই কাচের খুপরির ওপরে তারা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বসিয়ে নানা পরীক্ষা চালান। ওহ! চাইলেই তারা আমাকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিতে পারতেন– কিন্তু এখন আমি জানি তা কখনই হবার নয়। এ সবই শুরু হয়েছিল আমার এক শাস্তি পাওয়া থেকে, কিন্তু এখন আমি বিজ্ঞানের এক প্রহেলিকা। সম্ভবত, আমি অমর! আর এও ভাগ্যের এক পরিহাস।

     হ্যাঁ, অমরত্বও তো শাস্তিই! আমি কুয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতির সরণি বেয়ে সেই দিনটাকে দেখি যেদিন এসবের শুরু। মনে পড়ে, আমি দুটো বিচ্ছিন্ন সময়কে জুড়ে ভবিষ্যৎ ভ্রমণের একটা বিশেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার তৈরি করা সময়ভ্রমণের যন্ত্রটার কথাও মনে পড়ছে। না, না, তার সঙ্গে এই পেন্ডুলামের কোনও সাদৃশ্যই নেই– সেটা শুধুমাত্রই ছিল একটা বিরাট বড় বাক্সের মতো জিনিস, যেটা বিশেষভাবে প্রস্তুত কিছু ধাতু এবং কাচ দিয়ে তৈরি। আর ছিল আমার নিজের ডিজাইনে তৈরি করা কয়েক সারি বিদ্যুতিক রোটর যা কিছুটা সংঘর্ষশীল হলেও মোটামুটি সুনিয়ন্ত্রণ সময়ক্ষেত্র তৈরি করতে পারত। আমি আমার যন্ত্র তৈরি করার পর তিন-তিনবার চালিয়ে পরীক্ষা করেছি নিশ্চিত হবার জন্য, কিন্তু বিজ্ঞানী সংঘের কেউই আমার কথা বিশ্বাস করল না। তারা সবাই হেসেছিল। এবং লেস্কি-ও খুব হেসেছিল, কারণ সে চিরকাল আমাকে ঘৃণাই করে এসেছে।

     আমি প্রমাণ দাখিল করার জন্য নিজের খরচে একটা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলাম। বিজ্ঞানী সংঘকে নিমন্ত্রণ করলাম যাতে তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সেখানে নিয়ে আসে। নিখরচায় খানিকটা আমোদ হবে ভেবেই বোধহয় তারা রাজিও হয়ে গেল।

     আমি কোনওদিন সেই দিনের কথা ভুলব না। সংঘের পরীক্ষাগারে সেদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একশো জন বিজ্ঞানী। কিন্তু তাদের আসার মূল উদ্দেশ্য আমাকে বিদ্রুপ করা। তখন আমি মঞ্চে, আমার ভারিক্কি মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছি নিচু গলায় তাদের বিভিন্ন বিদ্রুপাত্মক কথা, আমি পরোয়া করিনি। বাইরে লক্ষ লক্ষ লোক যে টেলিভিশনে দেখছে লেস্কি-র সময়ভ্রমণের সম্ভবনার বিপক্ষে করা চূড়ান্ত ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য– তাও আমি পরোয়া করিনি। পরোয়া করিনি, কারণ আমি জানতাম কয়েক মিনিট পরেই লেস্কি-র ওই সমস্ত মন্তব্য আমার জয়ের-ই সূচনা করবে। আমি রোটরগুলো চালু করব, তারপর প্রধান সুইচটা অন করলেই আমার যন্ত্র পলকে সময়ের অন্য মাত্রায় চলে যাবে এবং ফিরেও আসবে, যা ইতিমধ্যেই তিনবার সফলভাবে পরীক্ষিত। পরে একজন মানুষকে আমরা সময়ভ্রমণে পাঠাব।

     সেই ক্ষণ উপস্থিত। কিন্তু সেদিন ভাগ্যের হাতে আসলে আমার শেষের শুরু। কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গিয়ে থাকবে, কিন্তু আজ পর্যন্ত জানি না তা কী এবং কেন। হয়তো অনেক টেলিভিশন ক্যামেরা থাকার ফলে কোনও বৈদ্যুতিক গোলযোগে আমার রোটরগুলোর মাধ্যমে সৃষ্ট সময়ক্ষেত্রে কোনও গোলমাল হয়ে গিয়ে থাকবে। আমি শেষ পর্যন্ত যা মনে করতে পারি তা হল আমার সামনে প্রথম সারিতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা বসে আর আমি প্রধান সুইচের সামনে। আমার হাত নেমে এলো সুইচের ওপর…

     এখনও সেই হৃৎপিন্ড স্তব্ধ করে দেওয়া ভয়ের কথা ভাবলে কেঁপে উঠি। এক সাংঘাতিক সবুজাভ, বিজাতীয় আলো পাক খেয়ে উঠল সারা ঘরে এবং দেওয়ালে থেকে দেওয়ালে আর তার চলার পথের সব কিছুকে ভস্মীভূত করে ফেললো।

     লক্ষ লক্ষ টেলিভিশন দর্শকের সামনে আমার অজান্তে আমার হাতেই তাঁরা সবাই মৃত্যুবরণ করলেন। না, ঠিক সবাই নয়, লেস্কি, আমি এবং আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী, যাঁরা মেশিনের পিছনে ছিলেন এইরকম ক’জন পালাতে সক্ষম হলাম। যদিও সারা শরীর তখন সাংঘাতিকভাবে ঝলসে গেছে। এদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কম জখম হওয়ার ফলে জনরোষ সহস্রগুণ হয়ে উঠল আমার বিপক্ষে। অতি দ্রুত আমাকে বিচারালয়ে নিয়ে যাওয়া হল, যেখানে সহস্র জনতা চিৎকার করে আমার মৃত্যুদণ্ড চাইছিল।

     “সময়ভ্রমণের যন্ত্রটা গুঁড়িয়ে দাও” তারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল, ‘‘আর এই খুনিকে খতম করে দাও।”

     খুনি! আমি তো শুধুমাত্রই মানুষের উপকার করতে চেয়েছিলাম।

     বৃথাই আমি দুর্ঘটনার ব্যাপারে আমার নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা চালালাম, কারণ জনক্ষোভ কোনও বুদ্ধি-বিবেচনা মেনে চলে না।

     কয়েক সপ্তাহ পরে একদিন আমার গুপ্ত বন্দিশালা থেকে তড়িঘড়ি করে একদল রক্ষী আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে এল এক হাসপাতালে, যেখানে লেস্কি শয্যাশায়ী। সে একহাতে ভর দিয়ে কোনওরকমে একটু উঠে বসে আমার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল। আমি শুধু তার চোখ দুটোই দেখতে পেলাম কারণ তার সারা গায়ে ব্যান্ডেজ। মাত্র একবার সে আমার দিকে তাকিয়েছিল, যদি কখনও আমি কোনও মানুষের চোখে ধূর্তামি মেশানো উন্মাদ দৃষ্টি দেখে থাকি তা হলে এটাই ছিল সেই মুহূর্ত। তারপর সে অত্যন্ত কষ্ট করে তার ফুলে ওঠা ব্যান্ডেজ বাঁধা আর একটি হাত তুলে আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, “না, ওকে মারলে হবে না।” সে বিড়বিড় করে সামনে দাঁড়ানো কারা-কর্তৃপক্ষের লোকদের বলে চলে, “ওর মেশিন ধ্বংস করে ফেলো, ঠিক আছে, কিন্তু যন্ত্রাংশগুলো যত্ন করে রেখো। এই খুনির জন্য আমার মাথায় আরও যুৎসই পরিকল্পনা আছে।” আমার আবার মনে পড়ে গেলো আমার প্রতি লেস্কির সীমাহীন ঘৃণার কথা।

     তার ঠিক পরের সপ্তাহের একদিন একজন রক্ষী এসে বলল যে, আমার মেশিনটা পুরো খুলে ফেলা হয়েছে এবং যন্ত্রাংশগুলো দিয়ে অন্য কিছু একটা তৈরি করা হচ্ছে, লেস্কি শুয়ে শুয়েই গোটা ব্যাপারটা পরিচালনা করছে– এসব কথা বলতে বলতে তার মুখে এক ধরনের শয়তানি আনন্দ ফুটে উঠছিল।

     অবশেষে এল সেই দিন যেদিন আমাকে প্রথম এই পেন্ডুলামের সামনে দাঁড় করানো হল। ওহ! কল্পনাতীত এবং ভয়ঙ্কর, আমি আগে বুঝিনি লেস্কির উন্মত্ত প্রতিশোধস্পৃহার সীমা! আর দেখলাম জনতাও একই রকম প্রতিশোধলিপ্সু, নিষ্ঠুর, ঠিক যেন সেই প্রাচীন আমলের রোমানদের মতো গ্ল্যাডিয়েটরদের আমৃত্যু লড়াই দেখার জন্য একটা ছুটির দিন উপভোগ করতে এসেছে। এক আকস্মিক ভয়ে আমি চিৎকার করে লাফিয়ে পালাতে গেলাম। কিন্তু তাতে সামনের চলন্ত ফুটপাথে দাঁড়ানো দর্শকদের আর একটু মজারই খোরাক হল মাত্র। তারা হেসে উঠে আমাকে ভেংচিয়ে চিৎকার করে উঠল।

     রক্ষীরা আমাকে ধাক্কা মেরে পেন্ডুলামের উপরের কাচের ঘরে ঢুকিয়ে দিলো আর আমি সেখানে দাঁড়িয়ে আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। এই পেন্ডুলামটা আমার মেশিনেরই মূল্যবান ধাতু ও কাচ দিয়ে তৈরি। আসলে এটা ওই দুর্ঘটনার স্মারক হিসাবে থাকবে আর আমি আমারই যন্ত্রের মধ্যে সারা জীবনের জন্য প্রদর্শনের বস্তু হয়ে রয়ে যাব। জনতা এই প্রহসনের সপক্ষে চিৎকার করে আমার মুন্ডুপাত করতে করতে তাদের সম্মতি জানাল।

     একটা ক্লিক করে আওয়াজ, ওপর দিকে একটা ঘড়ঘড়ে ধ্বনি, আমার কাচের বন্দিশালা নড়ে উঠলো। ক্রমশ গতি এবং দোলানি বেড়ে ওঠে। মনে পড়ছে, আমার ক্রমাগত কাচের গায়ে ধাক্কা খাওয়া, নিস্ফল আর্তনাদ আর রক্তে ভেজা আমার দুই হাত। মনে পড়ছে, চোখের সামনে সারি সারি জনতার মুখ ঝাপসা হয়ে তালগোল পাকিয়ে এল… প্রথমে মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তা নয়। আসলে প্রথম রাতটায় আমার কোনও অনুভূতিই কাজ করছিল না।

     আমি একটুও ঘুমোতে পারিনি। যদিও জায়গাটা যে খুব অস্বস্তিজনক ছিল তাও নয়। শহরের আলোগুলো ধুমকেতুর লেজের মতো লাগছিল, আমার ডানদিক থেকে বাঁদিকে সেগুলো জ্বলন্ত আতসবাজির মতো সরে সরে যাচ্ছিল। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে ওঠা এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় আমি সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। পরের দিনও একইভাবে কাটল। তারপরের দিনগুলোতেও তারা পেন্ডুলামটা থামায়নি, একবারের জন্যও নয়। পরে তারা পেন্ডুলামের বাহুর ভিতর দিয়ে ঘষটে একটা ছোট গোল খাবারের পার্সেল নিক্ষেপ করল, সেটা সশব্দে আমার পায়ের কাছে এসে পড়লো। এই প্রথমবার আমি খাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু মেঝেটা অনবরত দোলার ফলে কিছুই খেতে পারলাম না। মরিয়া হয়ে আমি ঠান্ডা কাচের দেওয়ালে ঘুষির পর ঘুষি মেরে চললাম যতক্ষণ না আমার হাত থেকে আবার রক্তক্ষরণ হয়। শেষে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় কেঁদে উঠলাম, কিন্তু নিজের বলা দুর্বোধ্য কিছু শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না।

     এক অন্তহীন দুর্দশার পর ধীরে ধীরে আমি দুলন্ত অবস্থাতেও একটু করে খেতে এবং ঘুমোতে সমর্থ হলাম… কর্তৃপক্ষের লোকেরা মেঝেতে একটা কাচের আংটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। রাতে ওটার সঙ্গে নিজেকে আটকে শব্দহীন তন্দ্রায় ডুবে যেতাম। এমনকী, বাইরের জগতের প্রতিও আমার কৌতূহল জাগতে শুরু করল। আমি বাইরের দুলন্ত জগতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অনবরত দোলার ফলে আমার মাথা ঝিমঝিম করত, তবুও আমি তাকিয়ে থাকতাম যতক্ষণ না আমার চোখ ব্যথা হয়ে যায়। পেন্ডুলামটা এতটাই বড় যে সামনের প্রায় একশো ফুট জায়গা জুড়ে তার বিশাল ছায়া পড়ত, আর আমি হিসেব করে দেখেছি এক দিক থেকে আর এক দিকে দুলে যেতে এটার প্রায় চার-পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগত।

     দিনের পর দিন এই একই রকমভাবে কাটে, কত দিন তা অনুমান করতে পারি না।

     ধীরে ধীরে আমি আরও বেশি করে মনোঃসংযোগ করতে শুরু করলাম, বাইরে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা কৌতূহলে ফেটে পড়া মুখগুলোর প্রতি। আমাকে ইঙ্গিত করে তাদের হাসি… কালের কয়েদি, সদা চলন্ত কিন্তু এক জায়গায় বন্দি। তারপর কিছুকাল পর, জানি না সেটা সপ্তাহ, না মাস, না বছর— শহরের লোকেদের আসা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল, শুধু ভ্রমণার্থীরাই আমাকে দেখতে আসত…

     পরে দিনে একবার একজন এসে একটা টিউবের মাধ্যমে আমাকে খাবার দিয়ে যেত এবং ঘরটা পরিষ্কার করে যেত। শুধু দিনরাতের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে সময় ব্যাপারটাই আমার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠলো…

     ক্রমশ নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলাম এখান থেকে আমার মুক্তি নেই আর ঠিক তখনই আমার মনে হল, আমি কি আমার এই সমস্ত ঘটনার একটা লিখিত বিবরণ রেখে যেতে পারি না? এই চিন্তা আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলল, যে আমি তখন আর অন্য কিছু ভাবতেই পারছিলাম না।

     আমি ওই যে টিউবের মাধ্যমে আমাকে খাবার পাঠানো হতো, সেটাতে টেলিগ্রাফিক কোডে ওপরের লোকটিকে একটা খাতা ও কিছু লেখার সরঞ্জাম পাঠাতে অনুরোধ জানালাম। দিনের পর দিন আমি সংকেত করে গেছি কিন্তু কোনও উত্তর আসেনি। যত প্রত্যাখ্যাত হয়েছি তত আমার জেদ বেড়েছে, আর আমি আরও বেশি করে শব্দ করে গেছি। শেষে অনেকদিন পর একদিন আমার খাবারের সঙ্গে আরও একটা প্যাকেট নেমে এল টিউব দিয়ে। তার মধ্যে ছিল একটা বড় খাতা আর লেখার সরঞ্জাম, সম্ভবত ওপরের লোকটি আমার খটখট আওয়াজ শুনে শুনে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে থাকবে। যাই হোক না কেন, এই সামান্য বিলাসিতার আয়োজনটুকুতে আমি এক অনাবিল আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে গেলাম!

     কিছুদিন যাবৎ আমি আমার এই জীবনকাহিনি অযথা বাগাড়ম্বর না করে আর একবার প্রথম থেকে মনে করার চেষ্টা করছি।  লিখতে লিখতে এখন আমি ক্লান্ত, কিন্তু সময়বিশেষে আবার কলম ধরব… আগে ভাষায় অতীতকাল ব্যবহার করেছি, এখন থেকে বর্তমানকালে লিখব।

     আমার পেন্ডুলাম একই রকমভাবে দুলে চলেছে। এখন আমি নিশ্চিত, মাস নয় বেশ কযেক বছর ঘুরে গেছে! আমি এটার সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। মনে হয় যদি একদিন অকস্মাৎ এটা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সেই গতিহীন অস্তিত্বে আমি উন্মাদ হয়ে যাব।

     (কিছুদিন পর): কয়েকদিন যাবৎ দেখছি আমার এই চাতাল ঘিরে যে চলন্ত ফুটপাথ রয়েছে তাতে এক নতুন ঘটনা ঘটছে। অনেকে আসছে। তারা সব বিজ্ঞানী। বিচিত্রদর্শন যন্ত্রপাতি বসিয়ে দূর থেকেই তারা আমার উপর গবেষণা চালাচ্ছে। কারণটা আমি কিছুদিন আগে অনুমান করতে পেরেছি। আমি বছরের হিসাব না রাখলেও আমার মনে হয় আমি লেস্কি ও অন্যান্য যারা ছিল তাদের পেরিয়ে এখনও বেঁচে আছি। আমার গালে একটু দাড়ি বেরিয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে, আমি ভিতরে ভিতরে এক অদ্ভুত টগবগে জীবনীশক্তি অনুভব করছি। আমার মনে হয় আমি এদের সবাইকে ছাপিয়ে বেঁচে থাকব। এর কারণ আমি বলতে পারবে না, এমনকী ওই সামনের বিজ্ঞানীরা, যারা সন্দিগ্ধভাবে আমাকে নিয়ে গবেষণা করে চলেছে, ওরাও বলতে পারবে না। আর ওরা আমাকে ও এই ছোট্ট জগৎ, এই পেন্ডুলামটা থামাবে না— কারণ ওদের ভয়, ওটা থামলে যদি তার কোনো প্রভাব আমার উপর পড়ে।

     (আরও কিছুদিন পর): ওফ! এই লোকগুলো, এই-এই পুঁচকে বিজ্ঞানীগুলো আমার খবর পাঠানোর টিউবের মধ্যে দিয়ে একটা মাইক্রোফোন নামিয়ে দিয়েছে! ওদের মনে আছে যে, আমি একসময় একজন বিরাট বিজ্ঞানী ছিলাম। কিন্তু এক সাংঘাতিক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে আজ এখানে বন্দি। এতদিন তারা আমার দীর্ঘ আয়ুর কারণ জানার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেছে, এখন তারা চাইছে যে, আমি আমার এই দীর্ঘায়ুর লক্ষণগুলো বা প্রতিক্রিয়া বা এই বিষয়ে আমার কোনও ধারণার কথা যেন তাদের জানাই। তারা হতবুদ্ধি কিন্তু আশাবাদী, তাদের ধারণা আমি আমার এই অন্তহীন জীবনের কিছু সূত্র হয়তো তাদের দিতে পারব। তারা আমাকে জানিয়েছে যে আমি ইতিমধ্যেই এখানে দু’শো বছর কাটিয়ে ফেলেছি এবং বংশানুক্রমে তারা হল পঞ্চম পুরুষ!

     প্রথম প্রথম আমি কোনও কথা বলিনি, সত্যি বলতে কি আমি মাইক্রোফোনটাকে আমলই দিচ্ছিলাম না। আমি শুধু তাদের বকবক আর আমার প্রতি মিনতিপূর্ণ কথা শুনে যাচ্ছিলাম যতক্ষণ না আমি ক্লান্ত এবং বিরক্ত হয়ে পড়ি। তারপর আমি মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম আমার কথা শোনার জন্য তাদের উত্তেজনামাখা আকুল মুখগুলো। “কোনও মানুষই এরকম একটা অবিচারকে এত সহজে ক্ষমা করতে পারে না।” আমি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, “তাই আমার মনে হয় আরও অন্তত পাঁচটা বংশ পার হলে তবেই কিছু বলতে পারব! হা! হা! হা! হা!” বহুদিন পর আমি প্রাণখুলে হাসলাম।

     “ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” ওদের মধ্যে একজন বলে উঠল, “মনে হয় অমরত্বের গুপ্ত রহস্য আমরা কোনওদিনই জানতে পারবনা। পেন্ডুলামটাও আমরা থামাতে পারব না, কেননা যে সময়ক্ষেত্র বা যাই হোক না কেন, যেটা ওর অমরত্বকে বন্দি করে রেখেছে, সেটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে…”

     (আরও অনেকদিন পর): আমার ওই শেষ লেখা যবে লিখেছি বলে মনে হচ্ছে আসলে তার থেকে আরও অনেক বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। বছর? কত আমি জানি না। আমি প্রায় ভুলে গেছি কীভাবে পেন্সিল ধরতে হয়।

     বাইরের ওই উন্মাদ জগতে বহু নতুন জিনিসের আবির্ভাব ঘটছে, বহু পরিবর্তন হচ্ছে।

     একবার দেখেছিলাম অসংখ্য প্লেনের ঝাঁক, সংখ্যায় এত যে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। সুদূর সমুদ্রের দিক থেকে সেগুলো শহরের দিকে উড়ে আসছিল। এদিক থেকেও অজস্র প্লেন উড়ে যাচ্ছিল অন্যগুলোর সম্মুখীন হতে। এবং এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর যুদ্ধে একের পর এক ধ্বংস হয়ে শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ছিল। আবার কিছু প্লেন বিজয়ী হয়ে ফিরেও আসছিল, জানি না কোন পক্ষের…

     কিন্তু এসব অনেককাল আগের কথা, আর এতে আমার কিছুই আসে যায় না। আমার প্রতিদিনের খাবার পেন্ডুলাম বাহুর ভিতরের টিউব দিয়ে পৌঁছে যায়। আমার ধারণা এটা এখন একধরনের ধর্মীয় আচারে পরিণত হয়েছে এবং এখন যারা এই শহরের বাসিন্দা, তারা বহুকাল আগে ভুলে গেছে আমার বন্দিত্বের উপকথা। আমার ছোট্ট জগৎ দুলে চলে আর আমি পর্যবেক্ষণ করে যাই বাইরের ক্ষুদ্র জীবগুলোর গুচ্ছ ভুলে ভরা সংক্ষিপ্ত জীবন। ইতিমধ্যেই আমি বহু বংশ পার করে এখনও বেঁচে আছি, এখন আমি চাই ওদের শেষজনকেও ছাপিয়ে বেঁচে থাকতে! আমি থাকবই!

     …ও হ্যাঁ, আর একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি। এখন আমার প্রতিদিনের খাবার যারা দিয়ে যায় এবং ঘর পরিষ্কার করে যায় তারা রোবট! চৌকো, জবরজং, ভারিক্কি এবং চার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যুক্ত— নিশ্চিতভাবে ধাতুর তৈরি, আকারে যেন খানিকটা মানুষের মতো।

     …ক্রমশ শহরে আরও বেশি রোবট দেখতে পাচ্ছি। হ্যাঁ, মানুষও দেখতে পাই কখনও কখনও, কিন্তু তারা শুধু ফুর্তি আর প্রমোদভ্রমণের জন্য আসে। তাদের অধিকাংশই ওই আকাশচুম্বী বাড়িগুলোয় চূড়ান্ত আমোদপ্রমোদ আর বিলাসব্যাসনের মধ্যে দিন কাটায়। শুধু রোবটরাই নিচুতলায় থাকে শহর চালানোর যাবতীয় যান্ত্রিক ও অন্যান্য কাজ করে চলে। এই বিলাসিতাকেই হয়তো ওই আত্মকেন্দ্রিক জীবগুলো অগ্রগতি বলে মনে করছে।

     …রোবটরা আরও জটিল হয়ে উঠছে, আকারে ও চলাফেরায় আরও মানুষের কাছাকাছি।

     …এবং সংখ্যায় আরও বেশি… অদ্ভুত… একটা সম্ভাবনা মনের মধ্যে বারবার উঁকি দিচ্ছে…

     (কিছুদিন পর) : শেষ পর্যন্ত তাই হল! আমি জানতাম ! বাইরে বিরাট আকারে এক সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটছে… কয়েক যুগ ধরে শুধু বিলাস আর অলসতায় ডুবে থাকা দুর্বল মানুষেরা পালাতেও পারেনি… যারা রকেটপ্লেনে পালাবার চেষ্টা করেছিলো, রোবটদের ফ্যাকাশে-লাল বৈদ্যুতিক রশ্মি তাদের নামিয়ে এনেছে… আর কিছু মানুষ যারা আরও মরিয়া ও বেপরোয়া তারা রোবটদের মূল ঘাঁটিতে প্লেন থেকে থারমাইট বোমা ফেলার চেষ্টা করেছিলো… কিন্তু রোবটদের বৈদ্যুতিক প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র সেই বোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের সমস্ত প্লেনই টুকরো টুকরো করে দিয়েছে…

     বিদ্রোহটা ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অবশ্যম্ভাবীভাবে সফল। আমার অনুমান, শুধু আমি ছাড়া, পৃথিবীর বুক থেকে মানব সভ্যতা মুছে গেছে। এখন আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি, কী সুচতুরভাবেই না রোবটরা এর পরিকল্পনা করেছিল!

     মানুষরা অন্ধের মতো সব কিছু অগ্রাহ্য করে তাদের কল্পনার জগৎ বানাতে উঠে পড়ে লেগেছিল, তারা তাদের রোবটগুলোকে দিনকে দিন আরও সূক্ষ্ম, আরও আরও জটিল করে বানিয়ে তুলেছিল সেই দিনের জন্য, যেদিন তারা শহরের সমস্ত কাজকর্ম তুলে দিয়েছিল মাত্র দু-একজন মানুষের অধীনে থাকা অসংখ্য রোবটদের হাতে। কিন্তু কোথাও, কোনওভাবে, কোনও একজন রোবটের মধ্যে বোধশক্তির এক স্ফূলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল; সে চিন্তা করতে শুরু করেছিল, ধীরে কিন্তু নিখুঁতভাবে; সে নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছিল, হয়তো গোপনভাবে; ততদিন পর্যন্ত, যতদিন না সে সাংঘাতিক দক্ষ এক বুদ্ধিমত্তায় পরিণত হয়, এক প্রধান যান্ত্রিক মস্তিষ্ক, যার সুচারু পরিকল্পনায় এই বিদ্রোহ। গোটা ঘটনার ছবিটা আমার কাছে অন্তত এইরকম।

     এখন এই পৃথিবীতে শুধুই রোবট, তবে অসম্ভব বুদ্ধিমান। তাদের একদল গতকাল আমার এই দুলন্ত পেন্ডুলামের সামনে এসে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করছিল। ওরা নিশ্চিত করেই আমাকে মানুষ হিসাবে বুঝতে পেরেছে, জীবিত শেষজন। ওরা কি আমাকে শেষ করে ফেলবে? না। আমি নিশ্চয়ই রোবটদের মধ্যেও জীবন্ত উপকথায় পরিণত হয়েছি। আমার পেন্ডুলাম এখনও দুলে চলেছে। ওরা পেন্ডুলামের মাথার যন্ত্রপাতির উপর একটা আঘাত রক্ষাকারী কাচের আবরণ লাগিয়ে দিয়েছে। ওরা পেন্ডুলামের পাশে একটা যন্ত্র তৈরি করেছে যেখান থেকে আমার প্রতিদিনের খাবার পার্সেলে আমার কাছে পৌঁছে যায়। রোবটরা আর আমার কাছে আসে না। মনে হয়, ওরা আমায় ভুলে গেছে। আর এটা আমায় রাগিয়ে দেয়! ঠিক আছে! আমি বেঁচে থাকায় ওদেরকেও ছাপিয়ে যাব! আরে, ওরা তো আসলে মানব মস্তিষ্কেরই অবদান… আমি সবাইকে ছাপিয়ে বেঁচে থাকব, এমনকী এই প্রায়-মানুষদের মতো রোবটদের থেকেও দীর্ঘায়ু হব আমি। প্রতিজ্ঞা করছি!

     (আরও পরে): তবে কি এই শেষ? আমি রোবট রাজত্বের শেষ দেখেছি। গতকাল, যখন সূর্য পশ্চিম দিকে ক্রমশ লাল হয়ে উঠছিল, তখন আমি প্রত্যক্ষ করলাম অদ্ভুত এক জিনিস ঝাঁকেঝাঁকে নেমে আসছে মহাকাশ থেকে… ভিনগ্রহী প্রাণী, কাঁপতে কাঁপতে নামছে, ঘন কালো জিলেটিনের মতো ভারী বস্তু, সমস্ত কিছুর উপর এসে পড়ছে…

     আমি দেখেছিলাম রোবট-যানগুলো এঁকেবেঁকে উড়তে উড়তে তাদের বৈদ্যুতিক রশ্মি ওই কালো প্রাণীগুলোর ওপর নিক্ষেপ করছে কিন্তু তাতে কোনও ফলই হচ্ছে না। ক্রমশ তারা মাটির আরও নিকটবর্তী হচ্ছিল, শেষে রোবটযানগুলো রণে ভঙ্গ দিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোনও আশ্রয় নেই। রুপোলি যানগুলো একের পর এক ভেঙে পড়ছিল মাটিতে, ঠিক যেন মাটির উপর রুপোর ফোঁটা।

     ওই কালো, ঘন জিলেটিনের মতো বস্তুরা মাটির উপর ছড়িয়ে পড়েছে, শহর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে, বাইরের যা কিছু ধাতব বস্তু সব ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

     শুধু আমার পেন্ডুলামটা ছাড়া। শহর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, রোবটরা নিশ্চিহ্ন, কিন্তু আমার পেন্ডুলাম এখনও দুলে চলেছে, এই পৃথিবীর একমাত্র চলন্ত বস্তু… এটা ওই ভিনগ্রহীদের ধন্দে ফেলে দিয়েছে এবং এটাকে না থামানো পর্যন্ত তারা পরিতৃপ্ত হবেনা…

     এই সবই গতকালের ঘটনা। এখন আমি শান্ত হয়ে শুয়ে শুয়ে ওদের পর্যবেক্ষণ করে চলেছি। ওদের মধ্যে বেশিরভাগই শহরের ধ্বংসস্তুপের উপর জড়ো হয়ে চলে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে— কিন্তু কালো কম্পমান জিনিসটা আটকে আছে পেন্ডুলামের গায়ে। তারা একই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে পেন্ডুলামের ওপর, যে পদ্ধতিতে তারা রোবটদেরও ক্ষইয়ে ফেলেছিলো। তারা এই পৃথিবীতে তাদের কাজ সম্পূর্ণ করে যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। আমি জানি, কাচের এই আবরণী বেশিক্ষণ ওদের আটকাতে পারবে না। আমি লিখে যাব যতক্ষণ না আমার পেন্ডুলামের দোলানি বন্ধ হয়… এবার সেটাও ঘটতে শুরু করেছে। আমি ওপরের খাঁজকাটা চাকাগুলোতে একটা অদ্ভুত খড়খড়ে আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। খুব শীঘ্রই আমার এই ছোট্ট কাচের জগতের অবিশ্রাম দোলানি থেমে যাবে।

     আমি এখন আমার মনে প্রচণ্ড এক উল্লাস অনুভব করছি, কারণ শেষ পর্যন্ত এ তো আমারই জয়। যারা আমাকে এই নিষ্ঠুর শাস্তি দিয়েছিলো তাঁরা, তাদের উত্তরপুরুষ এবং শেষে রোবটদেরও আমি ছাপিয়ে গিয়েছি! এখন মৃত্যু ছাড়া আমার কাঙ্ক্ষিত কিছুই নেই, আমি জানি তাও আসবে যখন আমার পেন্ডুলাম থেমে যাবে, আমাকে আছড়ে ফেলবে এক অসহনীয় গতিহীনতায়…

     সে আসছে। ওই কালো জিলেটিনের মতো প্রাণীগুলো ফিরে যাচ্ছে তাদের সঙ্গীদের কাছে। ওপরের সব যন্ত্রপাতি কর্কশ শব্দে ভেঙে পড়ছে। আমার দোলানি ক্রমশ কমে আসছে…

     …আরও কমছে… আরও… আরও…

     ….আমি… আমার

     …অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে…

কঃসঃ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় রে ব্র্যাড্রবেরি সম্পাদিত Futuria Fantasia ম্যাগাজিনে  ১৯৩৯।  উইকিসোর্স  অনুযায়ী লেখাটির এখন আর কপিরাইট নেই।  

 

3 thoughts on “পেন্ডুলাম

  • July 16, 2018 at 1:15 am
    Permalink

    এই অনুবাদ কি গুগল ট্র্যান্সলেট-এ ফেলে করা? “আমি জয়ী যেসমস্ত লোকেরা আমাকে শাস্তি দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে, তাছাড়া অসংখ্য বংশপরম্পরা এবং শেষে রোবটদেরকেও আমি ছাপিয়ে গেছি।” এটা কবে থেকে বাংলা হল?

    Reply
  • July 18, 2018 at 12:34 am
    Permalink

    এইখানে একটু ভুল হয়েছে ঋজুবাবু। আমি ভুলবশত এই লেখাটির ড্রাফট ভার্সনটা আপলোড করে ফেলেছিলাম। লেখক গতকাল জানানোর পরেই আমি প্রপার ভার্সনটা আপলোড করেছি। আপনার কাছে অনুরোধ রইলো লেখাটি আরেকবার পড়ে দেখার।

    অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটির জন্য লেখক মহাশয়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

    Reply
    • July 18, 2018 at 1:30 am
      Permalink

      এবার গল্পটা দারুণ লাগল! আগের তুলনায় এ তো প্রায় বৈপ্লবিক রূপান্তর। খুব ভালো লাগল এই অনুবাদ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!