প্রবাহ প্রহরী

রচনা  : সুপ্রিয় দাস

অলঙ্করণ : সুমন দাস

“ক্রিং… ক্রিং…।” কলকাতার উত্তর শহরতলির একদম শেষ প্রান্তে এক প্রাচীন অথচ আশ্চর্য রকম জনবিরল এলাকা। প্রায় পরিত্যক্ত একটা বাড়ির অন্ধকার কোণে এতক্ষণ আত্মগোপন করে থাকা ঘরটা হঠাৎ যেন কোন অদৃশ্য অনুসন্ধিৎসুর সামনে অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে পড়ার একরাশ বিরক্তিতে কর্কশ আস্ফালন করে উঠল। ঘরের একক বাসিন্দা প্রাণীটার অবশ্য কোন ভাবান্তর ঘটল না। অদ্ভুত দ্রুত অথচ শিথিল পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে কালো অন্ধকার মন্থন করে অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে প্রায় যান্ত্রিক ভঙ্গিতে তুলে আনল আদ্যিকালের টেলিফোনটার নিকষ কালো রিসিভারটা।

     “হ্যালো।”

     “হ্যালো। মিঃ দাস বলছেন?”

     “হ্যাঁ বলছি”

     “এই ভোর রাতে আপনাকে বাধ্য হয়ে ফোন করলাম। পালবাবুর জরুরী তলব। যত তাড়াতাড়ি পারেন অফিসে এসে স্যারের সঙ্গে দেখা করুন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আনতে গাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে। ধন্যবাদ।”

     এই টেলিফোন বার্তা পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন ধর্মায়ুধ দাস গাড়িতে উঠল তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দুঁদে পেশাদারি অভ্যাসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠা অবধি এতক্ষণ মনে কোন ভাবনা চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়নি ধর্মায়ুধ। কিন্তু এবার প্রতিবর্ত সাময়িক অবসর নেওয়ায় মন সক্রিয় হয়ে উঠল তার। ফোনটা করেছিল তার বসের বিশ্বস্ত সেক্রেটারি ও হিসাবরক্ষক মিস ছবি সেনগুপ্ত। আজ কতদিন সে তার সংস্থার হয়ে বকেয়া সংগ্রহ করবার কাজ করে চলেছে তা সে নিজেই প্রায় ভুলতে বসেছে। জটিল কেস এলে ইদানীং “স্যার” অর্থাৎ অনিমেশ পাল বাকি সবার চেয়ে তাকেই বেশি ভরসা করেন। কিন্তু আজ কি এমন কেস এলো যাতে এরকম প্রায় মাঝরাতে জরুরি তলব? ছোটোখাটো কেস তো আজকাল নতুন ছেলে ছোকরাগুলো ভালোই সামলাচ্ছে। প্রধানত যেখানে দেনাদার অনেক সেখানেই তাঁকে পাঠানো হয়। কিন্তু তার জন্য এত কিসের তাড়া যে ভোর না হতেই হাজির হওয়ার জরুরী ফরমান? এইসব চিন্তা করতে করতেই সে অফিসের বিশেষ একটি ঘরের সুইং ডোর পেরিয়ে ঢুকে এসে দাঁড়ালো অনিমেশ পালের সামনে।

     ঘরের ভিতরের বৈদ্যুতিক আলোগুলো কিরকম ঝাপসা। আসবাবপত্রে প্রাচীনতার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সেই বাকি সবকিছুর সাথে কিছুটা বেমানান রকমের স্পষ্ট একটা কাঁচের টেবিলের অপর প্রান্তে বসে আছেন অনিমেশ পাল। ধর্মায়ুধ জানে না কখন তার স্যার অফিসে এসেছে। হয়ত সারা রাত এখানেই আছেন। কিন্তু চেহারা বা ব্যবহার থেকে তা বোঝা খুব কঠিন। এরকম বলিষ্ঠ শরীর, নিকষ কালো গায়ের রঙ ও তার সাথে মানানসই গম্ভীর কণ্ঠস্বরের অন্য কোন লোক সে আজ পর্যন্ত দ্বিতীয়টি দেখে নি। এই প্রচণ্ড চেহারার আবরণ ভেদ করে মনের কোন ক্লান্তি বা সংশয়ের বাইরে আসা মনে হয় একান্তই নিষিদ্ধ।

     ধর্মায়ূধ যখন ঘরে ঢুকল তখন অনিমেশ অভ্যাস মত তার কালো শিঙে বাঁধানো মেহগনি কাঠের ভারী ছড়িটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে চলেছে। এই ছড়িটা ওনার একান্তই প্রিয়। কারো সাথে কথা বলার সময়ে এটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা তার একটা অবচেতন অভ্যাস। হয়ত ওটা হাতে থাকলে তার কথা বলার সময়ে মনঃসংযোগ করতে সুবিধা হয়।

     “এস দাস। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করে রয়েছি। বোসো।”

     স্বভাবগত গাম্ভীর্য ঝরে পড়ল অনিমেশের কণ্ঠস্বরে। ধর্মায়ূধ শান্তভাবে একটা চেয়ার টেনে বসে পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। অনাবশ্যক কথা বলা তার ধাতে নেই।

     “তোমাকে এত জরুরী তলব যখন করেছি তখন নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ যে একটা খুব জটিল সমস্যা সঙ্কুল কেস এসেছে। তোমার মত অভিজ্ঞ ও দক্ষ কালেক্টর ছাড়া এই কেস আর কেউ হ্যান্ডল করতে পারবে না। এই লোকটার মেয়াদ প্রায় ছমাস আগে শেষ হয়েছে। কিন্তু কোন অজানা টেকনিকাল সমস্যার জন্য আমরা এখনো আমাদের পাওনা আদায় করতে সক্ষম হইনি। আমরা ইতিমধ্যে তিনজন কালেক্টরকে নিয়োগ করেছি। তারা সবাই নিজেদের সাধ্য মত চেষ্টা করেছে। কিন্তু কেউ সমস্যার সমাধান তো দূর অস্ত, সমস্যাটা যে কি তাই ধরতে পারেনি। এ ধরনের কেস তুমি আগেও সমাধান করেছ। আর তোমার কেরিয়ারে আজ অবধি কোনদিন তুমি ব্যর্থ হওনি। তাই আমি চাই এবার তুমি চেষ্টা কর। আজ অবধি কোনোদিন কোন আদায়ে আমাদের এতবার ব্যর্থ হতে হয়নি। সমস্যাটা সমাধানের সাথে সাথে সমস্যাটা কি সেটাও বিস্তারে জানতে হবে তোমাকে। বুঝতেই পারছ আমাদের আদায়পত্রের কাজ অত্যন্ত জটিল। কোনোরকম ফাঁকফোকর থাকতে দেওয়া চলে না। সমস্যাটা না বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে এরকম সমস্যা এড়ানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না। তাতে এই সংস্থার কাজকর্মের পুরো ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। আমাদের এই কাজে তো ঝুঁকির অভাব নেই।”

     “বুঝলাম। আমিও এরকমই কিছু আশা করছিলাম।”

     “চমৎকার! তাহলে আর দেরি করো না। এখন থেকেই কাজে লেগে পড়ো। এই কেসটার দেনাদারের পরিচয়, ঠিকানা ও কেসের যাবতীয় ডিটেল নিয়ে একটা প্রিন্টেড ফাইল তৈরি করিয়ে রেখেছি তোমার জন্য; তুমি তো আবার ল্যাপটপ ব্যবহার করো না। ফাইলটা তুমি বাইরে মিস সেনগুপ্তের কাছ থেকে পেয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের এই কেসটা সামলাতে হবে। আমারও ওপরওয়ালা রয়েছে। তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়েছে ইতিমধ্যে। এরকম বেনিয়ম ছমাস ধরে ফেলে রাখা হয়েছে শুনে তারা মোটেই খুশী নন। কাজেই…. বেস্ট অফ লাক।”

(২)

সকালে ওঠা থেকেই আজ মনটা ভালো নেই চিরঞ্জীব রাহার। শেষ কয়েক মাস ধরে লেখালেখিতে মন বসাতে পারছে না সে। বেশ কয়েকজন প্রকাশককে ফিরিয়ে দিয়েছে সে শেষ ছ’মাসে। বড়দিনে তার লেখা শেষ প্রকাশিত হয়েছিল বাংলার নামীদামী সব পত্রিকাতেই। তারপর থেকেই এই অবস্থা। ডাক্তারের পরামর্শও নিয়েছিল যদি সমস্যাটা শারীরিক হয় সেই ভেবে। ডাক্তার দেখে বলেছিলেন শারীরিক সমস্যা কিছু নেই, মানসিক ক্লান্তি। কলকাতা ছেড়ে একটা কোন শান্ত নিরিবিলি জায়গায় কিছুদিন থেকে আসতে। সেই কারণেই কলকাতা ছেড়ে ঘাটশিলার কাছেই তাদের পারিবারিক বাংলোতে এসে উঠেছে সে। সে একা নয়, সঙ্গে সঞ্জীবও আছে।

     চিরঞ্জীব ও সঞ্জীব যমজ দুই ভাই। তাদের ঠাকুরদা ছিলেন সিংভূমের নেটিভ স্টেটের রাজাদের ডাক্তার। এই বাড়িটাও তাঁরই তৈরি। তবে পরিবার বলতে সঞ্জীব ছাড়া চিরঞ্জীবের আর কেউ নেই। তাদের জন্মের কিছুদিন বাদেই এক দুর্ঘটনায় তাদের মা বাবা দুজনেই মারা যান। নিকটাত্মীয় কেউ ছিল না সেরকম। তাই তার বাবার বন্ধু নরেশ সরকার তাদের দুই ভাইয়ের ব্যবস্থা করে দেন এই ঘাটশিলায়ই এক মিশনারি স্কুলের বোর্ডিং স্কুল সংলগ্ন অনাথ আশ্রমে। তাদের বাবা রীতিমত অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী ছিলেন তাই আর্থিক সংগতির অভাব ছিল না। কিন্তু তাদেরকে কলকাতার সুদূরে ঘাটশিলায় স্কুলে ভর্তি করার ক্ষেত্রে দুটি কারণ ছিল। এক ঘাটশিলার সেই মিশনারি স্কুলের অধ্যক্ষ ফাদার ম্যাকগ্রেগর ছিলেন তার দাদুর অন্তরঙ্গ বন্ধু আর দুই সঞ্জীব জন্ম থেকেই মূক ও বধির। সেই কারণেই তার সঠিক দেখাশুনোর জন্য নরেশবাবু অচেনা কোনো লোককে ভরসা করতে পারেননি। চিরঞ্জীব ও সঞ্জীব দুই ভাইই স্বাভাবিক কারণেই ছিল মিশনারি স্কুলের অন্য ছাত্রদের থেকে অনেকটা আলাদা। প্রতিবন্ধকতা বা অন্য কোন কারণে সঞ্জীব ছোট থেকেই ছিল অস্বাভাবিক রকমের অন্তর্মুখী। সাধারণ ছাত্রদের সাথে ক্লাস করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না আর সেই মফঃস্বল শহরে তাকে লেখাপড়া শেখানোর উপযুক্ত সাধনের অভাবও ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে লেখাপড়ায় ভালই অগ্রসর হল। অন্যদিকে চিরঞ্জীব স্কুল জীবনে ছাত্র হিসেবে বেশ সাধারণের পর্যায়ই রইল। কিন্তু মূক ও বধির ভাইয়ের ব্যাপারে সে ছিল অতিরিক্ত মাত্রায় সংবেদনশীল। হয়ত এই কারণেই স্কুল জীবনে তার সেরকম অন্তরঙ্গ বন্ধু বলতে কেউ ছিল না। তারা দুই ভাইই ছিল একে অপরের সব সময়ের সাথী। এই ভাবে দুই ভাইয়ের বাল্যকাল নেহাতই নিস্তরঙ্গভাবে কেটে গেলো।

     স্কুল শেষ হওয়ার পড়ে সঞ্জীব উচ্চশিক্ষা লাভের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখালো না। গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য রোজগারের তাগিদ না থাকায় চিরঞ্জীবও তার ওপর খুব একটা জোর খাটালো না। সে নিজে কিন্তু টাটানগরের মিশনারি কলেজে ভর্তি হল। এই কলেজে থাকতেই তার মেধার একটা ক্রমবিকাশ ঘটল। এই সময়েই তার সাহিত্যচর্চা শুরু ও সাহিত্যচর্চাতেই জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত। কলেজের ডিগ্রী শেষ করে তারা দুই ভাই কলকাতায় এসে বসবাস করবার সিদ্ধান্ত নিলো। সংসারী হওয়া বা কোন নারীকে স্থায়ীভাবে নিজের জীবনের অংশ করে তোলার প্রতি তার কোন তাগিদ জন্মাল না। তার একটা কারণ যদি ভাইয়ের প্রতি অবহেলার আশঙ্কা হয় তাহলে অন্য কারণ অবশ্যই তার অবাধ গতিতে সাহিত্য সৃষ্টির খাতে বয়ে চলা জীবনের গতিকে কোন বাঁধে অবরুদ্ধ না করবার যুক্তি। চিরঞ্জীবের জীবন বেশ ভালোই চলছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই তার লেখা পাঠক মহলে বেশ পরিচিতি লাভ করতে শুরু করল। আর আজ তো সে বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ও সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক বলে পরিচিত। সাহিত্য সমালোচকরা একবাক্যে স্বীকার করে যে সাহিত্যের কিছু বিশেষ ধারায় সে সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখতে পারে।

     অন্যদিকে সঞ্জীবের জীবনও বদলালো। চিরঞ্জীব বহির্মুখী হয়ে ওঠার সাথে সাথে তার জীবনে নেমে এলো একাকীত্ব। কিন্তু সর্বক্ষণের সাথী চিরঞ্জীবের অভাব সে কোনভাবে পূরণ করতে চেষ্টা করল না। কলেজে না ভর্তি হলেও তাদের বাড়িতে পুরনো লাইব্রেরীতে বইয়ের অভাব ছিল না। ফাদার ম্যাকগ্রেগর অনেক চেষ্টা করেছিলেন যাতে সে অন্তত বাড়িতে বসেই প্রথাগত না হলেও অপ্রথাগতভাবেও লেখাপড়া চালিয়ে যায়। কিন্তু সঞ্জীব অদ্ভুতভাবে তার জীবনকে পারিপার্শ্বিক জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকীত্বকে অবলম্বন করেই বেঁচে রইল। আর এখন তো চিরঞ্জীবের সাথেও সারাদিনে খাবার সময়ের বাইরে সে দেখা সাক্ষাৎ করে না। চিরঞ্জীব তার এই একাকীত্বের রাজ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টা বহুবার করেছে ও বিতাড়িত হয়ে শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে। সঞ্জীবের এই বৈরাগ্যের কারণ তার বোধগম্য হয়নি। এই পৃথিবীতে সঞ্জীবের অস্তিত্ব এখন এক অস্পষ্ট ছায়ার মতই। সারাদিন ঘরে বন্দি হয়ে সে যে ঠিক কি করে তার হদিশ কেউ রাখে না।

     এভাবেই মোটামুটি গতে বাঁধা ছকে চিরঞ্জীব ও সঞ্জীবের জীবনটা কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু আজ থেকে ঠিক ছমাস আগে সব কেমন গোলমাল হওয়া শুরু হল। প্রথম উপসর্গটা শুরু হয়েছিল একদম অপ্রত্যাশিতভাবে যেভাবে সচরাচর মানুষের জীবনে দুর্বিপাকের সূচনা হয়ে থাকে। কিন্তু না কোন দুর্বিপাক নয়, একটা স্বপ্ন। স্বপ্নটা শুরু হয় ঘাটশিলার পুরনো বাড়িটায়। দেখা যায় বাড়ির সামনে তার ছেলেবেলার চেনা বা অচেনা সব মানুষগুলোকে। মা, বাবা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, নরেশ কাকা, ফাদার ম্যাকগ্রেগর এমনকি স্কুলের হস্টেলের ওয়ার্ডেন জেকব স্যার ও মালী চিত্তদাকেও। সবাই মুখে একটা প্রশান্ত হাসি নিয়ে তাকে ও সঞ্জীবকে ঘিরে চার পাশে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কারোর মুখে কোন কথা নেই। শরীরে নেই কোন স্পন্দন। তারপরে হঠাৎ একটা নিঃশব্দ দুরন্ত ঝড়ের মত ধেয়ে আসে গাঢ় অন্ধকার। মিলিয়ে যায় সব কিছু। সেই অন্ধকার কিন্তু শূন্য নয়। সেই অন্ধকার গলিত আলকাতরার মত তরল ও বরফের মত ঠাণ্ডা। ভাসিয়ে নিয়ে চলে তাকে। দম আটকে আসে। বুকের মধ্যে শুরু হয় শেল বেঁধার অসহ্য যন্ত্রণা। হঠাৎ এই আলোর মধ্যে সে দেখতে পায় দূরে অন্ধকার ভেদ করে ফুটে উঠছে এক উজ্জ্বল আলোর রেখা। এমন সময় সে অনুভব করে তার হাতে ধরা রয়েছে আর একজনের হাত। চমকে পিছনে ফিরে তাকায় সে। চোখে পড়ে সঞ্জীবের করুণ আর্তি ভরা মুখ। চমকে ওঠে চিরঞ্জীব। এই ভাব-বিহ্বল অভিব্যক্তি সঞ্জীবের মুখমণ্ডলে কোনদিন দেখেনি সে। এবং সেই মুহূর্তে ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠে চিরঞ্জীব। জেগে উঠে সে অনুভব করেছিল তার সমস্ত শরীর অসাড়। বুকে পিন ফোটার মত চিনচিনে যন্ত্রণা।

     বেশ কয়েক মিনিট লেগেছিল তার শরীরে সাড় ফিরতে। ধাতস্থ হয়ে উঠে যখন বুঝতে পেরেছিল যে গোটা ব্যাপারটাই একটা স্বপ্ন, তখন অনেকটা স্বাভাবিক লেগেছিল। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় ও এরকম স্বপ্নের পরে সহজে ঘুম না আসার সম্ভাবনায় চিরঞ্জীব ঠিক করল লেখালেখি করেই বাকি রাতটা কাটিয়ে দেবে। অন্তত এই অদ্ভুত স্বপ্নের থেকে মনটা সরিয়ে নিতে পারলে ঘুম আসার কিছুটা অন্তত সম্ভাবনা থাকবে। এই মনে করে চিরঞ্জীব শোবার ঘর ছেড়ে নিচের তলায় স্টাডি রুমের দিকে এগোল। কিন্তু পথে বসবার ঘরের থেকে একটা মৃদু শব্দ তার কানে এলো। সন্দিগ্ধ মনে বসবার ঘরের পর্দা সরিয়ে সে হতবাক হয়ে গেল। সেই ঘরে একটা হাল্কা আলো জ্বলছে। তার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে সঞ্জীব। সে পেছন থেকে সঞ্জীবের কাঁধে হাত রাখতেই সঞ্জীব ফিরে তাকালো। সঞ্জীবের মুখের দিকে চোখ পড়তেই সে তড়িতাহতের মত দু’পা পিছিয়ে এলো! এ যে সেই মুখ! সঞ্জীবের মুখে চোখে অবিকল সেই অভিব্যক্তি যা সে একটু আগে স্বপ্নে দেখেছে! সভয়ে সঞ্জীবকে তার শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো সে। সঞ্জীবকে ইশারায় কিছু জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সঞ্জীব আবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে তার একাকীত্বের অভেদ্য খোলসে। কাজেই সেই জিজ্ঞাসার কোন উত্তর সে পায়নি।

     সেই সূত্রপাত। তারপরে দিনকয়েক স্বাভাবিকভাবে কাটল। চিরঞ্জীবের মনে সেই রাত্রের দুঃস্বপ্নের দাগ অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। এমন সময়ে ঘটল দ্বিতীয় ঘটনাটা। সেই দুঃস্বপ্নের রাতের পরে কয়েকদিন চিরঞ্জীবের লেখালেখি মাথায় উঠেছিল। মনের অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কোন ভাবেই সে লেখায় মন দিতে পারছিল না। সেদিন বিকেলটা বেশ ভালো মনে হওয়ায় মনের ওপর অনেক জোর খাটিয়েই চিরঞ্জীব নিজেকে টেনে নিয়ে লিখতে বসেছিল। তবে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত রেখে সে বুঝল মাথা এখনো পরিষ্কার হয়নি। সে তার উপন্যাসের প্লট ভাবছে বটে কিন্তু বার বার সেদিনের স্বপ্নের দৃশ্যগুলোই শুধু ফিরে ফিরে হানা দিচ্ছে তার মনে। তাই খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি তার উপন্যাস। নিজের মনের মধ্যে এই দুরূহ সংগ্রামে কখন যে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে আর বাড়ির চাকররা রাতের খাবার দাবার গুছিয়ে রেখে বিদায় নিয়েছে তা সে টেরও পায়নি। হঠাৎ হুঁশ হওয়ায় সে টের পেল যে সঞ্জীব তার স্টাডির বাইরে বসবার ঘরে এসে বসেছে। এটা মাঝে মাঝে সঞ্জীব করে বটে। সে লেখায় ব্যস্ত থাকলে সঞ্জীব চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। রাতের খাবারটা একসাথে খাওয়াটা তার একান্ত-বাসের একটা দৈনিক অবসরযাপন। তাই চিরঞ্জীব তার উপস্থিতিতে সেরকম বিচলিত হল না। খাবার টেবিলে যাবার জন্য উঠতে যাবে এমন সময়ে হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো। কে যেন খুব তাড়াতাড়ি দৌড়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেল। কৌতূহলী হয়ে সে তাড়াতাড়ি বসার ঘরে গিয়ে দেখল ঘরে কেউ নেই। ঘরের পাশে ব্যালকনিতে যাবার দরজাটা খোলা। সে ব্যালকনিতে পৌঁছে দেখল সঞ্জীব প্রশস্ত ব্যালকনির অন্য প্রান্তে গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে ও দু’হাতে গ্রিল আঁকড়ে ধরে বাড়ির সামনের লনে কিছু একটা দেখবার চেষ্টা করছে। তার দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ সে ব্যালকনির অন্যদিকে দাঁড়িয়েও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে সঞ্জীবের পিঠে হাত রাখতেই সে টের পেল যে তার সারা গা বেয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে। পিঠে স্পর্শ পেয়ে সঞ্জীব তার দিকে ফিরে তাকাতে সে স্পষ্ট দেখতে পেল তার চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে চরম আতঙ্ক। সঞ্জীব জ্ঞান হারায়।

     সেদিন অনেক সাধ্য সাধনা করে সঞ্জীবকে সুস্থ করেছিল চিরঞ্জীব। ডাক্তারকে খবর দিয়েছিল। ডাক্তার এসে অবশ্য সেরকম কোন শারীরিক অস্বাভাবিকতা পায়নি। সঞ্জীবের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে নিজে বাইরে অস্বাভাবিক কিছুই দেখতে পায়নি। বাড়ির গেটে দারোয়ান আছে। তাকে হাঁক পেড়ে জিজ্ঞেস করতে সে জোর দিয়ে বলল যে সে সারাক্ষণ গেটেই ছিল ও গেট দিয়ে বা অন্য ভাবে বাড়ির কম্পাউন্ডের ভেতরে কেউ প্রবেশ করেনি। তাও সে পরদিন স্থানীয় থানায় একটা রিপোর্ট করে এসেছিল।

     কিন্তু এই ঘটনাগুলো তো ছিল সূত্রপাত মাত্র। তারপর থেকে চিরঞ্জীবের সেই দুঃস্বপ্ন বার বার ফিরে ফিরে হানা দিতে থাকল। আর প্রত্যেকবার স্বপ্নের পরে সাময়িক পক্ষাঘাতের লক্ষণ ও সঞ্জীবের আচরণে অস্বাভাবিকতাটাও উত্তরোত্তর বেড়ে চলল। অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। তারা দুজনেই ক্রমশ শীর্ণ হয়ে পড়ছে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল যে এই সমস্ত ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকে চিরঞ্জীব আর একটা লেখাও লিখে শেষ করতে পারেনি। সব প্রকাশকদের অসুস্থতার কারণে লেখা দিতে না পারার কথা জানাতে বাধ্য হয়েছে। ডাক্তার বদ্যি কম করেনি সে এই ক’মাসে। কিন্তু তারা তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে শারীরিক বা মানসিক কোন অস্বাভাবিকতাই খুঁজে পায়নি। অবশেষে আর কোন উপায় না দেখে ডাক্তারদের এই হাওয়া বদলের পরামর্শ।

(৩)

গাড়ি থেকে নেমে সন্তর্পণে লঘু পদচারনায় এগিয়ে চলে ধর্মায়ুধ। আসার পথেই কেস ফাইলটা খুঁটিয়ে পড়ে দেখেছে সে। তার গন্তব্য সামনের অনুচ্চ টিলার কোলে মিশে থাকা পুরনো বাড়িটা। টিলা বেয়ে প্রায় শখানেক ফুট উঠে গিয়ে একটা ঢালু পাহাড়ি রাস্তা বাড়িটার ফাটকে গিয়ে শেষ হয়েছে। সেই রাস্তার মাঝামাঝি পৌঁছে স্থির হয়ে দাঁড়ায় সে। বেলা পড়ে এসেছে। তবে এখনো বেশ আলো রয়েছে। সেই আলোতে বাড়িটাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করে সে। তার কেস ফাইল বলছে যার কাছ থেকে তাঁকে বকেয়া আদায় করতে হবে তার বাস ওই বাড়িটাতেই। নাম চিরঞ্জীব রাহা। বাকি সব ডিটেল ও রয়েছে। তবে যা নেই তা হল এই যে লোকটা অত্যন্ত কঠিন ঠাঁই। অবশ্য তার অভিজ্ঞতা আর তার পূর্ববর্তী আদায়কারীদের ব্যর্থতা থেকে একথা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়। তাই অত্যন্ত মেপে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে। বাড়িটা বেশ পুরনো ও একদম নির্জন। মনে মনে খুশী হয় ধর্মায়ূধ। নিরিবিলি হলেই কাজে সুবিধে। সোজা পথে কাজ হবে না তা সে বেশ বুঝতে পেরেছে, আর বাঁকা পথ ধরতে হলে আশে পাশে যত লোকজন কম থাকে ততই ভালো। তার পূর্ববর্তী আদায়কারীরা যা যা প্রচলিত পন্থা আছে সে সবই বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করেছে। নতুন কোন উপায় বার করতে হবে। সেই ভাবনায় ডুবে যায় সে। এই সব ভাবনায় কেটে যায় অনেকটা সময়। সন্ধে হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। বাড়ির ভেতরে আলোগুলো দু-একটা করে জ্বলে উঠছে। আর তার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাড়ির অন্দরমহল। সে এবার সন্তর্পণে এগিয়ে যায় বাড়ির আরো কাছে। ফাটকের কাছে, রাস্তার ধার ঘেঁষে একটা মস্ত শিরীষ গাছের পেছনে অন্ধকার ছায়ায় তার অবয়ব গুটিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে সে। এমন সময়ে তার কানে এলো একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ। বাড়ির পেছনের দিকে গ্যারাজে রাখা একটা ফরচুনার গাড়ি আগেই চোখে পড়েছিল। চাপা গম্ভীর গুঞ্জন তুলে সেটা এগিয়ে আসছে। ফাটকের দিকে। চালকের আসনে চিরঞ্জীব রাহা। তার টার্গেট! বিদ্যুৎ খেলে গেল ধর্মায়ূধের শরীর ও মনে। এই সুযোগ। এই লোকটার তিন কূলে কেউ নেই বলেই লেখা আছে ফাইলে। কাজেই এখুনি এর গড়ির এক্সিডেন্ট ঘটলে আর কারো খুব একটা ক্ষতি হবে না। মুহূর্তের মধ্যে কর্তব্য স্থির করে ফেলে সে। জ্যা মুক্ত তিরের গতিতে ছুটে চলে টিলার নিচে রাখা তার গাড়ির দিকে। চিরঞ্জীবের গাড়িটা টিলার নিচে নামার আগেই ওটাকে পথচ্যুত করে নিচে গড়িয়ে ফেলতে পারলেই কাজ হাসিল!

     আজ সারাদিন যথারীতি চিরঞ্জীব লাইব্রেরীতে বসে কাটিয়েছে। ডেস্কে ল্যাপটপ খুলে নানারকম ভাবে লেখা শুরু করবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটা লাইন ও বেরোয়নি তার হাত দিয়ে। যতবার মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করেছে ততবার মাথায় একটা তীব্র যন্ত্রণা এসে বাসা বেঁধেছে। শেষে আর থাকতে না পেরে বাইরে একটু খোলা হাওয়ার সন্ধানে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সে। তার বাড়ি থেকে কয়েক মাইলের মধ্যেই সুবর্ণরেখা নদীর ধারে একটা বেশ নির্জন পাড় সে একদিনের মধ্যে আবিষ্কার করেছে। জায়গাটা তার বেশ পছন্দ। সেই উদ্দেশ্যেই গাড়ি বার করে সে সবে ফাটক পেরিয়ে রাস্তায় পড়েছে। নিচে নামার পথে একটা ছোট বাঁক আছে। সেটা ঘুরে সবে এক্সিলারেটরে চাপ দিয়েছে এমন সময়ে হঠাৎ যেন সামনের অন্ধকার ফুঁড়ে ভীম বেগে ছুটে এলো একটা অদ্ভুত কালো গাড়ি। গাড়িটার সব হেডলাইট নেভানো তাই তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সজাগ হতে হতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। গাড়িটার সামনের কাঁচটাও কেমন যেন মিশকালো। যেন সম্পূর্ণ নিরেট একটা বস্তু। সে গাড়িটা দেখতে পেল সেকেন্ডেরও কয়েক ভগ্নাংশের জন্য। সে ব্রেক মারলেও গাড়িটা একদম ঘাড়ের ওপরে চলে এসেছে। মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেল তার বাঁ পাশে রাস্তার প্রান্তে খাদের কথা। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় তার হাত সংঘর্ষ এড়াতে স্টিয়ারিংটা ঘুরিয়ে দিল বাঁ দিকে। হঠাৎ নিজেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হাল্কা মনে হল তার। এই অবস্থায় হঠাৎ তার কানে যেন ভেসে এলো একটা ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। তার পরমুহূর্তেই পায়ের নিচে প্রচণ্ড শব্দ ও সংঘাতের সাথে সাথে চারদিকে নেমে এলো অন্ধকার ও নৈঃশব্দ্য।

     চিরঞ্জীবের গাড়িটা খাদে গড়িয়ে পড়তে দেখার সাথে সাথে ধর্মায়ূধ নিজের গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। এখানে থাকা আর তার পক্ষে উচিৎ নয়। চিরঞ্জীবের গাড়িটা উল্টে পড়ে আছে রাস্তা থেকে প্রায় সত্তর আশি ফুট নিচে। অন্ধকার হলেও সে স্পষ্ট দেখতে পেল যে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে ঝুলছে চিরঞ্জীবের নিঃস্পন্দ দেহ। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সে প্রবল গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। হেড অফিসে ফোন করে অনিমেশ পাল-কে খবরটা দিতে হবে।

(৪)

ঘাটশিলা শহরের প্রান্তে একটা পেট্রোল পাম্পের একটু দূরে গাড়ি রেখে ধর্মায়ুধ পাম্প সংলগ্ন একটা জনহীন পাবলিক টেলিফোন বুথের দিকে এগিয়ে যায় ধর্মায়ুধ। ভোর হতে আর কিছুক্ষণ মাত্র বাকি। রাতেই সে ফোনে অনিমেশ পাল-কে এক্সিডেন্টের খবর জানিয়েছে। অনিমেশ পাল সাবধানী লোক। তবে ধর্মায়ুধের ওপর তার অগাধ ভরসা। ধর্মায়ূধ যে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে কাজ সারবে সে ভরসা তার আছে। কিন্তু তাও এই কেসটা এতই স্পর্শকাতর যে সে ঐ এলাকার হাসপাতালগুলোতে খবর নেবার জন্য লোক লাগিয়েছে। ফোনে চিরঞ্জীবের মৃত্যু সংবাদ পেলেই তিনি ধর্মায়ুধকে ছুটি দেবেন। সেটা যাচাই করতেই ধর্মায়ুধকে তিনি ভোরবেলা ফোন করতে বলেছেন।

     ফোন রিং হওয়ার সাথে সাথে ওপার থেকে অনিমেশের গম্ভীর গলা ভেসে এলো।

     “স্যরি টু ডিসয়াপয়েন্ট ইউ দাস। খবর ভালো নয়। সাবজেক্ট সারভাইভস।”

     স্বভাবসিদ্ধ ভণিতাবিহীন বাচ্যে তিনি ঘোষণা করলেন।

   “হুম। আনফরচুনেট স্যার। ভেবেছিলাম কাজ হয়ে গেছে। অনেকটা রোল করেছিল গাড়িটা। ইমপ্যাক্টটাও বেশ স্ট্রং ছিল।“

     “তুমি কবে থেকে ফরচুনে বিশ্বাসী হলে দাস? ইমপ্যাক্ট যাই হোক, সাবজেক্ট প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কাজেই তোমার নেক্সট মুভ প্ল্যান করে ফেল। এন্ড মেক ইট ফেল সেফ দিস টাইম। আর বেশি সুযোগ তোমাকে দেওয়া আমার সাধ্যের বাইরে দাস। ওপরওয়ালারা ইমেডিয়েট রেজাল্ট এক্সপেক্ট করছে। তোমার পরবর্তী মুভগুলো আরো ডাইরেক্ট করতে হলে করো। আমি সব সামলে নেবো। কিন্তু আমরা ডেস্পারেটলি রেজাল্ট চাইছি। তোমাকে এই মেসেজটা দেওয়ার জন্য কতক্ষণ ধরে বসে আছি জানো! লাস্ট খবর হল চিরঞ্জীবকে জামশেদপুরে টাটা মেইন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিছু প্রিকশনারি টেস্ট এর জন্য। বেস্ট অফ লাক।“

     ফোন রেখে দিলেন অনিমেষ পাল। কিছুটা থমকে গেল ধর্মায়ুধ। অনিমেশের রাশ হাল্কা হতে সে জীবনে এই প্রথম দেখছে। আর আরো ডাইরেক্ট মুভ! কিন্তু সবচেয়ে সে যেটাতে অবাক হল তা হল ওনার তিনটে কথা। “প্রায় অক্ষত অবস্থা!” গাড়ি সমেত প্রায় একশ ফুট গড়িয়ে পড়ে কেউ অক্ষত! এরকম হওয়ার সম্ভাবনা কতটা? না, এই কেসটা সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে হবে তাকে। গাড়িতে বসে গাড়ি ছুটিয়ে দেয় ধর্মায়ুধ। আপাতত গন্তব্য জামশেদপুর।

     গাড়ি চালাতে চালাতেই মনঃস্থির করে ফেলে সে। অনিমেশ পালের কথা ঠিক। এভাবে আড়াল থেকে আঘাত হানার পন্থা অবলম্বন করে আজ অবধি সে ব্যর্থ হয়নি বটে, কিন্তু অসফল হবার একটা সামান্য সমস্যা তো থেকেই যায়। তা ছাড়া এতটাও তাড়াহুড়ো করে কিছু করা হয়ত তার উচিৎ হয়নি। আগে চিরঞ্জীব সম্পর্কে ভালো ভাবে খোঁজ নিতে হবে। কিছু একটা গভীর রহস্য রয়েছে এই কেসটায় এটা সে বেশ বুঝতে পারছে এখন। তাদের ফাইলের তথ্যে নিঃসন্দেহে কিছু একটা ফাঁক আছে। তাই তার আগে যারা চেষ্টা করেছিল তারা সফল হয়নি। সেটা আগে জানতে হবে। আর তার জন্য এখন আর কোন হঠকারিতা নয়। প্রয়োজন হলে সশরীরে দেখা করবে সে চিরঞ্জীবের সাথে।

     হাসপাতালে পৌঁছে রিসেপশনে খবর নিয়ে চিরঞ্জীবের ঘরের নম্বর পেতে খুব একটা বেগ পেতে হল না। খুব সন্তর্পণে সে চিরঞ্জীবের ঘরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলে। সকলের সমক্ষে থেকেও সকলের নজর এড়িয়ে চলাফেরা করবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তার আছে। তার কাজের জন্য এই ক্ষমতা অত্যন্ত কার্যকর। ঘরের দরজার সামনে এসে সে থমকে দাঁড়ায়। ভেতরে লোক আছে। আবছা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে ভেতর থেকে।

     “আপনার সব টেস্টের রেজাল্ট নরমাল। কাজেই আজ বিকেলেই আপনার ছুটি। তবে খুব জোর বেঁচে গেছেন। আপনার সব কটা হাড় যে আস্ত আছে এটা আমাদের কাছে এক পরম বিস্ময়।“

     “আমি আমার জন্য চিন্তা করছি না ডক্টর। আপনি বলার আগেই আমি বেশ বুঝতে পারছি যে আমার কিচ্ছু হয় নি। কিন্তু আমার ভাই সঞ্জীব? ওর কি হয়েছে? আমাকে আর অন্ধকারে রাখবেন না। সব খুলে বলুন।“

     “ওয়েল ওনার কেসটা স্ট্রেঞ্জ। আপনার বাড়ির চাকরের বয়ান অনু্যায়ী যে সময়ে আপনার এক্সিডেন্টটা ঘটে প্রায় সেই সময়েই সঞ্জীব প্রচণ্ড আর্তনাদ করে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। তার সিস্টেমে কোন অস্বাভাবিকতা আমরা দেখতে পাইনি। ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু কিছু একটা ওর সব ইন্দ্রিয়গুলোকে নির্জীব করে রেখেছে। আমার ধারনা ও কোন ভাবে আপনার এক্সিডেন্টটা হতে দেখেছিল। এক্সিডেন্ট স্পটটা তো একদম আপনার বাড়ির গেটের বাইরেই। তাই সেটা খুবই সম্ভব। আর তার ফলে প্রচণ্ড শক পেয়েই ওর এই অবস্থা। তবে আমার ধারনা ওর রেস্ট দরকার। ওকেও আপনি বাড়ি নিয়ে যান। আমি ভালো নার্সের ব্যবস্থা করে দেব। আশা করি বিশ্রাম নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই ও আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।“

     “তাই ভালো। হাসপাতালের পরিবেশটা ওর মত স্বেচ্ছায় ঘর বন্দী থাকা মানুষের ভালো লাগার কথা নয়।“

     “আর একটা ব্যাপার। এক্সিডেন্টের ব্যাপার বুঝতেই পারছেন, আপনার লোকাল জুরিসডিকশন থানা থেকে ইন্সপেক্টর ভার্মা আপনার জবানবন্দি নিতে চান।“

     “কিন্তু আমার যে কিছুই মনে পড়ছে না। গাড়ি নিয়ে বাইরে বেরিয়েছিলাম ওইটুকু মনে আছে। তার পড়ে নেক্সট মেমরি হল জ্ঞান ফেরার পড়ে। মাঝে কি ঘটেছিল তা কিচ্ছু মনে করতে পারছি না।“

     “সেটা অনেক সময়ে হয়ে থাকে। একটা প্রচণ্ড শক তো।…

     আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না ধর্মায়ুধ। চিরঞ্জীবের এক্সিডেন্ট এর স্মৃতি চলে যাওয়াটা তার পক্ষে সুখবর বটে। কিন্তু সে তা নিয়ে সে ভাবিত নয় আর। সব কিছু ছাপিয়ে তার মনে একটাই চিন্তা ঝড়ের আকার নিয়েছে। সঞ্জীব! সঞ্জীব রাহা! চিরঞ্জীবের ভাই! এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা তার ফাইল থেকে বাদ পড়ল কি করে? তার ফাইলে যে স্পষ্ট লেখা আছে যে চিরঞ্জীব রাহার রক্তের সম্পর্কের জীবিত কোন আত্মীয় নেই। আর সে যতক্ষণ চিরঞ্জীবের বাড়ির ওপরে কাল নজর রেখেছে একবারের জন্যেও সঞ্জীবের অস্তিত্ব টের পায়নি! এত বড় ভুল! এখুনি অনিমেশকে ফোনে সব জানাতে হবে! দ্রুত পায়ে বাইরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ধর্মায়ুধ। কিন্তু খানিক দূর গিয়েই সে থমকে দাঁড়ায়। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। তার সামনের ঘরটার ওপরে লেখা ‘ইনফর্মেশন রুম’। যন্ত্রচালিতর মত এগিয়ে চলে সে সেই দরজার ভেতরে। ঘরে একজন লোক তার দিকে পিছন ফিরে কম্পিঊটারে এক মনে ডেটা ভরে চলেছে। খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে সে। তাই পেছনে যে নিঃশব্দে কেউ ঘরে ঢুকে পেশেন্ট ফাইলের দেরাজ খুলে ফেলেছে সেটা সে টের পায়নি বা পেলেও মনে করেছে যে হাসপাতালেরই কোন স্টাফ পেশেন্ট ফাইল খুঁজতে এসেছে। দ্রুত হাতে দেরাজে বর্ণক্রমে সাজানো ফাইলগুলোর থেকে সঞ্জীব রাহা নামের ফাইলটা খুঁজে বার করতে বেশি সময় লাগল না ধর্মায়ূধের। ফাইলের প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বোলাতেই কপালে ভাঁজ পড়ল ধর্মায়ুধের। সঞ্জীবের জন্ম তারিখ ৬ই জুন, ১৯৬৬! সঞ্জীব ও চিরঞ্জীবের জন্ম তারিখ এক! তারা দুজনে যমজ! না, এতটা ভুল হওয়া তাদের সংস্থার তথ্য দফতরের পক্ষে খুবই অস্বাভাবিক। এর রহস্য ভেদ করা প্রয়োজন। ফাইলটা যথাস্থানে রেখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে সে। পাশের টেলিফোন বুথ থেকে অনিমেশের নম্বর ডায়াল করে সে।

     দুবার রিং হবার পরেই অপর পার থেকে অনিমেশের গলা ভেসে এলো। ধর্মায়ূধ এক নিঃশ্বাসে চিরঞ্জীবের সাথে ডাক্তারের কথোপকথনের বিবরণ সংক্ষেপে বর্ণনা করে থামল। কয়েক মুহূর্ত কোন কথা বলল না অনিমেশ। তারপরে বলে উঠল।

     “দাস, চিরঞ্জীবের ভাই সঞ্জীব! সঞ্জীব রাহা! জন্ম ৬ই জুন ১৯৬৬। দ্রোণ শেখর রাহা আর মৃণালিনী রাহার কনিষ্ঠ সন্তান! আমাদের ডাটাবেসে এন্ট্রি আছে দাস!”

     “সে কি! তাহলে আমার ফাইলে এর উল্লেখ নেই কেন?”

     “তার ও কারণ আছে। আমাদের ফাইলে ভুল নেই। ফাইলে লেখা আছে চিরঞ্জীব রাহার কোন জীবিত নিকটাত্মীয় নেই। সেটা সম্পূর্ণ ঠিক।“

     “ আপনি বলতে কি চাইছেন?”

     “আমি এটাই বলতে চাইছি যে আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী সঞ্জীব রাহা মৃত! তার মৃত্যু হয় ৬ই জুন ১৯৬৬ এর সন্ধ্যে ৮ টা ৩৬ মিনিটে। আর সঞ্জীবের জন্ম হয়েছিল…… অসম্ভব! সঞ্জীবের জন্ম হয়েছিল ৮টা ৪৫ মিনিটে! অর্থাৎ জন্মের আগের মুহূর্তে তার মায়ের গর্ভেই তার মৃত্যু হয়!”

(৫)

আজ পাঁচ দিন হল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছে চিরঞ্জীব। শরীরের সামান্য কিছু কেটে ছড়ে যাওয়া বা কালশিটে পড়ার যন্ত্রণা যেটুকু ছিল তা প্রায় বিদায় নিয়েছে। এক দিনেই দুর্ঘটনার রেশ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। তবে তার অবশ্য অন্য কারণও রয়েছে। একটা কারণ হল গত কয়েক মাসের প্রায় প্রতি রাতে হানা দেওয়া বিদঘুটে স্বপ্নগুলো একদিনে আর ফিরে আসেনি। আর দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই সঞ্জীব। সে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এবং তাই নয়, তার মধ্যে একটা পরিবর্তনও চিরঞ্জীব লক্ষ করছে। সে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে তার ভাইয়ের সঙ্গে। সঞ্জীবের অসুস্থতার কারণে চিরঞ্জীব তার শোবার ঘরের লাগোয়া একটা ঘরে সঞ্জীবের শোবার ব্যবস্থা করেছে। অন্য সময়ে হয়ত সঞ্জীব তাতে আপত্তি প্রকাশ করত। কিন্তু এবার সে সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও সে তার পুরনো শোবার ঘরে ফিরে যাবার কোন ইচ্ছে প্রকাশ করেনি। চিরঞ্জীব ডাক্তারের পরামর্শে রোজ দু’বেলা বাগানে হাঁটতে বেরোলে সেও তার সঙ্গ নিচ্ছে নিজে থেকেই। তার এই পরিবর্তনে চিরঞ্জীব বিস্মিত হলেও খুশী। এই বাড়িতে দুই ভাইয়ের শৈশব ও কৈশোরের অনেক স্মৃতি রয়েছে। আজ সঞ্জীবের সাথে বাগানে ঘুরতে ঘুরতে সেই স্মৃতিগুলোকেই রোমন্থন করছিল চিরঞ্জীব। অনর্গল সঞ্জীবকে সেই সব পুরনো দিনের কথা বলে যাচ্ছিল। সঞ্জীব নিজেকে গুটিয়ে নেবার পর থেকে চিরঞ্জীবের কোন কথা বললে শুনে যায় বটে কিন্তু তার মুখের ভাবে কোন পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আজ চিরঞ্জীবের মনে হল চিরঞ্জীবের কথা শুনে সঞ্জীবের মুখে সামান্য একটা প্রশান্তির ছায়া পড়ল। যেন সেও আজ অনেকদিন পরে চিরঞ্জীবের অনুভবের অংশীদার হতে পারল।

     বেলা গড়িয়ে এসেছে। এবার চিরঞ্জীবের অতিথিদের আসবার সময় হয়ে এলো। গত পরশু তারা ফোন করেছিল। তার এক্সিডেন্টের খবর ও আশ্চর্যজনক ভাবে অক্ষত থাকার খবর কলকাতায় তার প্রকাশকদের অনেকেই জানতে পেরেছেন। তাদেরই কেউ মনে হয় সংবাদপত্রের লোকজনকে খবরটা দিয়েছিল। কলকাতার এক সংবাদপত্র থেকে এক সাংবাদিক তার এই অলৌকিক ভাবে বেঁচে ফেরার খবর ছাপতে চায়। তার জন্য একেবারে বাড়ি বয়ে ঘাটশিলায় এসে তাকে ইন্টারভিউ করতে চায়। আরো বেশ কিছু সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর সে ফোনেই দিয়েছে। কিন্তু এরা নাছোড়বান্দা সামনা সামনি সাক্ষাৎকারের জন্য। লেখালেখির কাজ বন্ধ থাকায় চিরঞ্জীবের আর যাই হোক, এখন হাতে সময়ের অভাব নেই। তাই সে রাজী হয়ে গেছে সাক্ষাৎকারের প্রস্তাবে।

     স্নান খাওয়া সেরে তারা দুই ভাই বাইরের ঘরে এসে বসেছে। এমন সময়ে বাড়ির গেটের বাইরে একটা গাড়ি এসে থামার শব্দ পাওয়া গেল। তার ঠিক দু মিনিট বাদে দরজায় কলিংবেল বাজতে কেয়ারটেকার এসে দরজা খুলে দিল। দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল দুই ব্যক্তি। প্রথম জন বেশ বলিষ্ঠ ও কৃষ্ণকায়। দ্বিতীয় জন রোগা ঢ্যাঙ্গা ও ফ্যাকাসে। প্রাথমিক আলাপ পরিচয় সারা হল। প্রথম জন অনিমেশ পাল। বয়স চিরঞ্জীব আন্দাজ করল পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। পরনে ধুসর রঙের স্যুট। হাতে একটা ভারী ও বাহারি ছড়ি। সাজ পোশাকে বেশ সাহেবি কায়দার মানুষ মনে হয়। দ্বিতীয় জন ধর্মায়ুধ দাস। তার চেহারা থেকে বয়স আন্দাজ করা শক্ত। তিরিশ থেকে পঞ্চাশ যা কিছু হতে পারে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিটা কেন জানি চিরঞ্জীবের খুব একটা পছন্দ হল না। এর পরনে কালো চামড়ার লম্বা জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট। হাতে একটা মাঝারি কালো ব্যাগ।

     চিরঞ্জীব এদের বসতে বলে কেয়ারটেকারকে চায়ের কথা বলতে এরা দুজনেই আপত্তি জানিয়ে বলল যে এই সময়ে এরা কিছু খান না। সাক্ষাৎকার শেষ করে আজ রাতের ট্রেনে এরা কলকাতা ফিরে যাবেন। তাই চিরঞ্জীবও তাদের পাশে সোফায় এসে বসল। সঞ্জীব সাধারণত ঘরে কেউ তার সাথে দেখা করতে এলে নিজের ঘরে চলে যায়। আজ কিন্তু এর ব্যতিক্রম ঘটল। এরা দুজন ঘরে ঢোকা অবধি সে এক মুহূর্তের জন্যও এদের ওপর থেকে দৃষ্টি সরায়নি। সেটা এই দুজনেরও দৃষ্টি এড়ায়নি। সে ঠায় বসে রয়েছে ঘরের কোনের দিকে একটা ইজি চেয়ারে।

     চিরঞ্জীব একটু অপ্রস্তুত বোধ করল। তার সে গলা খাঁকরানি দিয়ে কথা শুরু করল।

     “বলুন মিঃ দাস ও মিঃ পাল আমার কাছ থেকে আপনাদের কি জানবার আছে।“

     ধর্মায়ুধ তার ব্যাগ থেকে একটা মাঝারি আকারের ফাইল বের করে বলে উঠল

     “আমরা এখানে আসবার আগে আপনার সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছি। আপনারা দুই ভাই শৈশবে এই বাড়ীতে ও এখান থেকে অনতিদূরে মিশনারি বোর্ডিং এ মানুষ হয়েছেন। আপনার ভাই সঞ্জীবের জন্মাবধি একটা প্রতিবন্ধকতা আছে তাই সে স্কুলের পরে উচ্চশিক্ষার প্রতি আর কোন আগ্রহ দেখায়নি। আপনি কলেজ শেষ করে এখানকার পাট চুকিয়ে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। সেখানেই আপনার সাহিত্যচর্চার শুরু ও সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ এও আমরা জানি…”

     এরপরে চিরঞ্জীবকে আশ্চর্য করে দিয়ে ধর্মায়ুধ তার শৈশব ও কৈশোরে জীবনের অনেক বিশদ বিবরণ একনাগাড়ে বলে গেল। বলা শেষ ধর্মায়ুধ একটা সামান্য বিরতি নিল। যেন চিরঞ্জীবের প্রতিক্রিয়া খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করছে সে। অন্য দিকে অনিমেশ এখনো অবধি একটাও কথা বলেননি। শুধু শুনে যাচ্ছেন ও মাঝে মাঝে সটান সঞ্জীবের দিকে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে কিছু একটা দেখছেন। এটা কিছু নতুন নয় যদিও, সঞ্জীবের সাথে চিরঞ্জীবের চেহারার এতই মিল যে যারা প্রথম দুজনকে একসাথে দেখেন তাদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া চিরঞ্জীব আগেও লক্ষ করেছে। কিন্তু এই লোকগুলোর হাব ভাব নিয়ে চিরঞ্জীবের একটা খটকা লাগছে। প্রথমত এদের বেশভূষা কথাবার্তা একেবারেই সাংবাদিকের মত নয়। দ্বিতীয়ত তার সম্পর্কে বিশেষ করে তার ছেলেবেলার এত কথা লোকগুলো জানল কি করে? লোকগুলোর কোন বদ মতলব নেই তো? যদিও দিনের বেলা ও বাড়িতে কেয়ারটেকার ও মালী রয়েছে। তারা সবাই অনেকদিনের পুরনো লোক। কাজেই এই পরিস্থিতিতে চুরি ডাকাতি করতে মাত্র দুজন বাড়িতে সাংবাদিক সেজে ঢুকবে না। কিন্তু যদি লোকগুলোর আরো দলবল বাড়ির বাইরে থেকে থাকে? আর বদ মতলব নিয়ে এলে তো এদের সঙ্গে মারাত্মক অস্ত্র থাকাও সম্ভব। এই সমস্ত কথা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এমন সময়ে একটা গুরুগম্ভীর স্বরে তার চিন্তা স্রোত ছিন্ন হল।

     “আপনি ঠিক ধরেছেন মিঃ রাহা। সাংবাদিক আমরা নই। তবে চোর ডাকাত ও নই।“

     চমকে উঠল চিরঞ্জীব! তার মনের চিন্তার তরঙ্গ কি কোন ভাবে তার অজান্তে তার মুখে কথা হয়ে উচ্চারিত হয়েছে? নয়ত এই লোকটা জানল কি করে?

     “আপনি শান্ত হয়ে বসুন। আর অভিনয়ের দরকার নেই দাস। সোজা সাপটা সত্যি কথাটা এনাকে জানিয়ে দেওয়া যাক।”

     “সেই ভালো স্যার।”

     হতবাক চিরঞ্জীবের মুখে এবার কথা ফুটল।

     “সাংবাদিক না হলে কে আপনারা? আমি কি চিন্তা করছি তা আপনি বুঝলেন কি করে? আপনাদের উদ্দেশ্য কি?”

     “আমাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই। তবে তা আপনাদের পক্ষে সুখের হবে না দুঃখের তা এখনো জানি না।”

     পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা এদের দৃষ্টি এড়িয়ে হাতে তুলে নেবার চেষ্টা করল চিরঞ্জীব। কিছুটা অভ্যাসের বশেই। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। যদিও তার মোবাইলে স্থানীয় থানার নম্বর সেভ করা আছে কিনা সে মনে করতে পারছে না। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে হতাশ হল। মোবাইলে নেটওয়ার্ক সিগনাল নেই। তার হাতে মোবাইল ইতিমধ্যে লোক দুটো দেখতে পেয়েছে নিশ্চিত, কিন্তু তাতে তাদের কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। শান্ত স্বরে ধর্মায়ুধ বলে উঠল

     “মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না চিরঞ্জীববাবু। আমরা যতক্ষণ এই বাড়িতে রয়েছি, এর ত্রিসীমানায় কেউ মোবাইলে সিগনাল পাবে না। এমন কি আমরা নিজেরাও না।”

     মনে মনে প্রমাদ গুনল চিরঞ্জীব এবং প্রায় প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় সটান উঠে দাঁড়ালো। মুহূর্তে তার মনে হল এই লোকগুলোর থেকে পালানো দরকার। কিন্তু পরমুহুর্তেই চোখ গেল সঞ্জীবের দিকে। তাকে এই বিপজ্জনক লোকগুলোর হাতে ফেলে যাওয়া যায় না। না, চিৎকার করে মালী বা কেয়ারটেকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে মুখ খুলতেই সে অনুভব করল তার মুখের ওপর প্রবল শক্তিতে চেপে বসেছে একটা ফ্যাকাসে ঠাণ্ডা হাতের শীর্ণ আঙ্গুলগুলো। আর সাথে সাথে তার জিভ, যেন অসাড় হয়ে পড়ল। সেই অসাড়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তার সমস্ত শরীরে। সেই অসাড়তা তার সারা শরীর অতিক্রম করে তার পা অবধি প্রসারিত হতেই সে ঢলে পড়ল মেঝের পুরু কার্পেটের ওপর। তার চেতনা অক্ষুণ্ণ কিন্তু দেহ অসাড়। সেই অবস্থাতেও সে অব্যক্ত আতঙ্কের সঙ্গে দেখল যে সঞ্জীব অবসন্ন দেহে অনিমেশের পায়ের কাছে পড়ে আছে আর অনিমেশের বলিষ্ঠ মুষ্টিতে বিকেলের পড়ন্ত রৌদ্রে ঝক ঝক করছে তার বাহারের ভারী ছড়ি খানা।

     ধর্মায়ুধের ইস্পাতের সাঁড়াশির মত হাত দুটো ততক্ষণে তার দু কাঁধ ধরে তার শরীরটাকে সোজা দাঁড় করিয়ে প্রায় শূন্যে তুলে ধরেছে। তার দৃষ্টির সামনে ধর্মায়ুধের ফ্যাকাসে মুখ ও ঠাণ্ডা চোখ। কিন্তু সেই চোখ আর পার্থিব মানুষের চোখ নেই! সেই চোখ খোলা নয়, বোজা। চিরঞ্জীবের সজাগ চেতনা স্পষ্ট তাকে দেখালো যে ধর্মায়ুধের বোজা দুচোখের পাতার মাঝের জোড়গুলো একটা আর একটার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে। যেন তার দুচোখের সমস্তটাই একটা অবিচ্ছিন্ন চামড়ার আবরণে ঢাকা পড়ল। এই দৃশ্যও মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। চারদিকে কেমন একটা ধূসর পর্দা। সে স্পষ্ট অনুভব করল সে তার গাড়ির স্টিয়ারিং এর সামনে বসে আছে। সামনে একটা বাঁক। গাড়িটা বাঁক নিলো কিন্তু এ কি! সামনে ভীম বেগে ছুটে আসছে আর একটা ধূসর রঙের গাড়ি। এই গাড়িটা তার চেনা! এটা সে দুবার দেখেছে। একবার তার এক্সিডেন্টের ঠিক আগের মুহূর্তে আর আর একবার একটু আগেই এই গাড়িটাই গেটের সামনে রেখে তার থেকে নেমে এসেছে এই দুজন অমানুষ। আর সহ্য করতে পারল না চিরঞ্জীবের চেতনা। সেও এবার যোগ দিল তার অসাড় দোসর, চিরঞ্জীবের শরীরের সাথে।

(৬)

জ্ঞান হতে খুব সন্তর্পণে চোখ খুলল চিরঞ্জীব। চারপাশের পরিবেশটা ঠিক ঠাহর করতে পারল না। এটা তার বাড়ি নয়। একটা খোলা জায়গা। কিন্তু চারপাশে কিরকম একটা ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিবেশ। আকাশে এক ফালি মুমূর্ষু চাঁদ রয়েছে বটে। কিন্তু তার আলো চারপাশের ধোঁয়াশার প্রাচীর ভেদ করে কিছু দেখাতে পারছে না। নিচের জমিটা বেশ শক্ত ও মসৃণ। তার মনে হল একটা পাথুরে খোলা জায়গায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। কোনোক্রমে নড়েচড়ে উঠে বসবার চেষ্টা করল সে।

     “জ্ঞান ফিরেছে দেখছি আপনার।”

     কে যেন বলে উঠল। ধর্মায়ুধের গলাটা চিনতে পারল চিরঞ্জীব। এতক্ষণ অজ্ঞান অবস্থায় থাকায় শিথিল হয়ে পড়া স্নায়ুগুলো হঠাৎ যেন লাফিয়ে উঠল তার। মুহূর্তে অজ্ঞান হবার আগে যা যা ঘটেছিল সে সবের রোমন্থন ঘটল তার মানস-পটে।

     “শান্ত হোন। উত্তেজিত হবেন না চিরঞ্জীব বাবু। অবশ্য উত্তেজিত হয়ে লাভও নেই। আপনার বাড়ি থেকে এখন অনেক দূরে রয়েছেন আপনি। চারপাশে মাইল খনেকের মধ্যে কোন জনপ্রাণী নেই। আপনার কাছ থেকে আমরা এরকমই একটা রি-একশন আশা করেছিলাম। তাই তার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। আপনাকে অজ্ঞান করবার অনেক আগেই আপনার কেয়ারটেকার ও মালীকে বেশ লম্বা সময়ের জন্য ঘুম পাড়ানো হয়ে গেছিল। আমাদের কাজে গোপনীয়তাই শেষ কথা। কাজেই কোন রকম ঝুঁকি আর আমরা নিতে চাই না।”

     “আপনাদের উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করে বলবেন কি? কে আপনারা? কি চান? সঞ্জীব কোথায়?” এক নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করে গেল চিরঞ্জীব। এতক্ষণে প্রাথমিক হতবাক ভাবটা অনেকটাই কেটে গেছে তার। সে বেশ বুঝতে পারছে যে এই লোকগুলো সাধারণ মানুষ নয়। কিন্তু ব্যাপারটা কিছুটা যেন গা সওয়া হয়ে গেছে এতক্ষণে।

     “সব বলছি বলবার জন্যই তো আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি।” উত্তর আসে ধুর্মায়ুধ এর কাছ থেকে। “সঞ্জীব ভালো আছে। ওনার জ্ঞান ফিরে এসেছে।”

     “আপনারা কি ধরনের মানুষ? একজন নিরীহ অসহায় মুক ও বধির মানুষের ওপর হাত তুলে বীরত্ব দেখাতে আপনাদের লজ্জা করে না?” আবার প্রায় গর্জে উঠল চিরঞ্জীব।

     “আপনি আবার উত্তেজিত হচ্ছেন।” শান্ত স্বরে বলে ওঠে ধর্মায়ুধ। “আর আমরা যা করছি সে সব আমাদের কর্তব্য। ভালো করে মন দিয়ে শুনুন তাহলে আমরা কে। হয়ত কিছুটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হতে পারে আপনার।”

     “আমার নাম ধর্মায়ুধ দাস। আমি এমন একটা সংস্থার হয়ে কাজ করি যাদের কাজ হল মানুষের এই পৃথিবীতে অবস্থান করবার মেয়াদের হিসেব নিকেশ রাখা। মেয়াদ ফুরলে এই পৃথিবী থেকে সবাইকেই বিদায় নিতে হয়। আজ অবধি এর অন্যথা হয়নি। আমাদের সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থিতি এই নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। আর আমরা এই নিয়মের রক্ষাকারী। কেউ এই নিয়ম ভাঙ্গলে আমার ডাক পড়ে। নিয়ম ভাঙ্গার ক্ষমতা কয়েকশ বছরে এক আধ জনের হয়ে থাকে। কিন্তু আজ অবধি আমার হাত থেকে নিস্তার কেউ পায়নি।”

     এতটা শুনে সশব্দে হেসে ওঠে চিরঞ্জীব। তারপরে বলে “আপনি মশাই বুজরুক তা ধরতে পেরেছি। তবে আপনারা উন্মাদ না ডাকাত তা এখনো স্পষ্ট নয়। কি চান খোলসা করে বলুন। আপনি আমাকে অজ্ঞান করবার আগে যে ভেল্কিটা দেখালেন সেটা কি সম্মোহন করেছিলেন আমাকে না আমার অজান্তে কোন হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ আমার শরীরে প্রবেশ করিয়েছিলেন?”

     “আমি আন্দাজ করেছিলাম যে আপনার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন হবে। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও হয়ত এই রকমই প্রতিক্রিয়া হত আমার। তবে শুনুন আগে আমার সমস্ত কথা। তবে তার আগে আপনাকে দেখাতে চাই একটা প্রমাণ আমার কথার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে।”

     এতক্ষণে চিরঞ্জীব দেখতে পেল ধর্মায়ুধকে। চারপাশের কুয়াশার খানিকটা যেন হঠাৎ জমাট বেঁধে অবয়ব ধারণ করল। ধর্মায়ুধের হাত প্রসারিত ও হাতের আঙুল প্রসারিত হয়ে চিরঞ্জীবের পেছনের দিকে নির্দেশ করছে। চিরঞ্জীব পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখল সেই সর্বব্যাপী কুয়াশার মধ্যে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে একটা ঝাপসা আলোর বৃত্ত। সেই বৃত্তটা সম্ভবত গাড়ির হেডলাইটের সৃষ্টি। সেই বৃত্তের মধ্যে থেকে যন্ত্রচালিতের মত এগিয়ে আসছে একটা মনুষ্য মূর্তি। সঞ্জীব! সে এসে চিরঞ্জীবকে পেরিয়ে ঘুরে সেই আলোর দিকে মুখ করে দাঁড়াতেই চমকে উঠল চিরঞ্জীব। সঞ্জীবের চোখ দুটো অপার্থিব রকমের মণিহীন কালো কাঁচের টুকরোর মত। সে ছুটে গিয়ে সঞ্জীবের দু হাতে কাঁধ ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে ডেকে উঠল “সঞ্জীব! সঞ্জীব!” কিন্তু সঞ্জীবের মধ্যে কোন ভাবান্তর নেই।

     “আপনি বৃথা চেষ্টা করছেন। আপনার ভাইকে সময় হলেই জাগানো হবে। তার চেতনা এখন স্থান-কালের গণ্ডী অতিক্রম করে এই মহাবিশ্বের স্বরূপ অন্তর্চক্ষে প্রত্যক্ষ করছে। এটা আপনাকে দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঞ্জীব আলাদা।”

     “আলাদা! কেন? সে কথা বলতে বা শুনতে পারে না বলে?”

     “না কারণ সে আপনার মত জীবিত মানুষ নয় বলে।”

     “কি বলছেন কি?” আর্তনাদ করে ওঠে চিরঞ্জীব।

     প্রচণ্ড সংশয়ের ঝড়ের মধ্য দিয়ে সে তার বোধ ও বুদ্ধির প্রবাহকে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু পেরে ওঠে না। সঞ্জীবের এই অপার্থিব মূর্তি, তার অজ্ঞান হবার আগের মুহূর্তে দেখা ধর্মায়ুধের সেই অলৌকিক মূর্তি, ও তার এক্সিডেন্টের জেগে ওঠা স্মৃতি তার সব যুক্তি বুদ্ধির বাঁধ ভেঙ্গে তার অনুভবের জমিতে নিয়ে আসছে ভয় ও সংশয়ের মহাপ্লাবন।

     “শান্ত হোন চিরঞ্জীব আগে আমাদের কথা মন দিয়ে শুনুন।” অনিমেশের জলদ গম্ভীর স্বর ভেসে আসে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার অবয়ব সেই ম্লান আলোর বৃত্তের প্রেক্ষাপটে। অনিমেশ বলে চলেন।

     “আমি আপনার মনের প্রতিটি সংশয়ের কথা অনুভব করতে পারছি। তাই গোড়া থেকেই বলি। আমি, যাকে আপনি অনিমেশ পাল নামে চেনেন, প্রকৃতপক্ষে এই মহাবিশ্বের অতি-মাত্রিক জগতের এক পর্যবেক্ষক। আমরা আমাদের নিম্নতর মাত্রার জগত নিয়ে বহু বহু যুগ ধরে নানা ধরনের গবেষণা করে চলেছি। আপনাদের এই চার মাত্রার জগতে প্রাণের সৃষ্টিও আমরাই করেছি। আপনাদের প্রাণের মূল উপাদান হল আপনাদের শরীর ও তাকে চালনা করবার মত শক্তি। আপনাদের জগতে প্রচলিত পরিভাষার প্রাণ নিয়ে এই সব তথ্য আপনি অবশ্যই জানবেন। কিন্তু যা আপনার জানা নেই তা হল আপনাদের বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে আমাদের একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফসল।

     চতুর্মাত্রিক জগতে পদার্থের ওপর উচ্চ মাত্রার বা ডাইমেনশনের এক প্রকার অত্যন্ত দুর্লভ মহাজাগতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে এই পরীক্ষা। আপনাদের প্রাণী জগতের প্রত্যেক সদস্য, এককোষী ব্যাক্টিরিয়া থেকে অতিকায় মহা-জীব, আমাদের গবেষণার এক একটা ট্রায়াল মাত্র।

     কিন্তু এই প্রাণ সৃষ্টিকারী মহাজাগতিক শক্তিটি অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক। এর প্রতিটি ভাগ নিজস্ব চেতনা সমৃদ্ধ।

     আপনাদের চার মাত্রার জগতে জীবন্ত শরীরের বাইরে এর কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু যা আছে ও যা অত্যন্ত বিপজ্জনক তা হল জীবের দেহে এই শক্তির ও তার চেতনার বিবর্তন। এই বিবর্তনের ফলে সে তার ধারক ও বাহক জীবের শরীরে ক্রমাগত ক্ষয় ঘটায়। ফলে আপনাদের জগতে সৃষ্টি হয় রোগ, জরা ও মৃত্যুর। মৃত্যুর পর এই শক্তি শরীর ছেড়ে মুক্তি লাভ করে এবং এখানেই আমাদের কাজের শুরু। আমাদের কাজ হল এই শক্তি সঠিকভাবে উচ্চতর মাত্রায় ফিরে যাচ্ছে কি না তা দেখাশোনা করা। আমরা এই কাজ আপনাদের হিসেবে বিগত কোটি কোটি বছর ধরে করে চলেছি।”

     অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে থামল অনিমেশ। প্রথমে চিরঞ্জীবের এই সব কথাগুলো প্রলাপ মনে হচ্ছিল। কিন্তু তার বিগত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা ও এই লোক দুটোর কথা তার মনের অন্য সব অনুভূতিকে ছাপিয়ে ইতিমধ্যে সৃষ্টি করেছে মানুষের প্রবলতম বোধ, অনুসন্ধিৎসা। সে কৌতূহল ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে অনিমেশের দিকে। সে মুখে কিছু বলতে না পারলেও তার মনের প্রশ্নের ঝড় অনিমেশের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। সে আবার বলে চলে।

     “আমি অনুভব করছি যে আপনি ভাবছেন আমরা যদি উচ্চমাত্রার জীব হই তাহলে আমাদের আকার অবয়ব একদম মানুষের মত কি করে হল। এর উত্তর সহজ। আমাদের অবয়ব চার মাত্রায় সীমিত করা যাবে না। আপনার ও আপনার মত অন্যান্যদের সাথে প্রয়োজনে কোন রকম সন্দেহ না জাগিয়ে এই চতুর্মাত্রিক জগতে যোগাযোগ রক্ষা করবার জন্য আমাদের এই রূপ; আসলে এটা একটা চতুর্মাত্রিক প্রতিচ্ছবি মাত্র।

     আমরা আমাদের অস্তিত্বের কথা আমাদের বিশ্বের আইনানুসারে এই জগতে প্রকাশ করতে পারি না। অতীতে এক সময়ে প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু এই জগতে তার অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আজ বহু যুগ হল আমাদের স্বরূপ প্রকাশ সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ।”

     অনিমেশের এই শেষ কথাটায় চিরঞ্জীবের মনে একটা নতুন ভাবনার সৃষ্টি করল। তাকে এরা এদের সব গুহ্য তত্ত্ব শোনাচ্ছে কেন? তবে কি…!

     “ঠিক। আপনি ঠিকই ভাবছেন চিরঞ্জীব বাবু। আপনার শরীরের মধ্যে আবদ্ধ সেই একাধারে প্রাণদায়ী ও প্রাণঘাতী মহাজাগতিক শক্তিটিকে তার প্রকৃত উৎস মাত্রায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। আসলে আপনার প্রাণশক্তির চতুর্মাত্রিক জগতের মেয়াদ শেষ হয়েছে আপনাদের হিসেবে প্রায় সাত মাস আগে। আমরা আজ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেছি তাকে ফিরিয়ে নেবার কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হতে পারিনি। তার কিছু লক্ষন মনে হয় আপনিও টের পেয়েছেন।“

     চিরঞ্জীব সচকিতে বলে ওঠে

     “সাত মাস! মানে আমার সেই বার বার ফিরে আসা দুঃস্বপ্নগুলোও তো আজ থেকে প্রায় সাত মাস আগেই শুরু! আর আমার লেখার ক্ষমতা লোপ পাওয়া? সেটাও কি এই কারণেই?”

     “আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। আপনার প্রত্যেক দুঃস্বপ্ন ও তার পরবর্তী সাময়িক পক্ষাঘাত আসলে আমাদের এক একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া। আপনার লেখার ক্ষমতা লোপ পাওয়াও তাই। আপনার পারিপার্শ্বিক জগতের অনুভূতির সাথে আপনার যোগসূত্র আমাদের প্রতিটি প্রচেষ্টার সাথে কিছুটা দুর্বল হয়ে পরত। আর এই যোগসূত্র না থাকলে কারো পক্ষেই কোন সৃষ্টিশীল কাজ করা সম্ভব নয়। “

     “আর সঞ্জীবের উন্মাদের মত আচরণ? তার কি ব্যাখ্যা? আর আপনাদের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে আমার ক্ষেত্রে আপনাদের এত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল কেন?”

     চিরঞ্জীবের মনে হল অনিমেশের এতক্ষণ ধরে প্রায় ভাবলেশহীন পাথুরে মুখমণ্ডলে যেন কিছুটা বিষাদের ছায়া পড়ল। সে ধীর গলায় বলে চলল।

     “সঞ্জীবের আচরণ ও আমাদের ব্যর্থতা। এর পেছনে একটা আশ্চর্য রহস্য রয়েছে। আমরাও সেটা এই শেষ কয়েকদিনে অনেক অনুসন্ধান করে উপলব্ধি করতে পেরেছি।

     আপনার ভেতরে যে প্রাণশক্তি আমরা স্থাপন করেছিলাম সেটি যে একটি অভূতপূর্ব ও সম্পূর্ণ নতুন ধরনের মহাজাগতিক শক্তি তা আমরা এতদিন বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলাম আপনার ভাই সঞ্জীবের কথা জানতে পেরে। আপনার ভাই সঞ্জীবের প্রকৃতপক্ষে আপনার মায়ের গর্ভেই মৃত্যু হয়। তার অতি-মাত্রিক প্রাণশক্তিটি ফিরে আসে তার নির্ধারিত গন্তব্যে। তার এই মৃত্যু আমাদের একটা ব্যর্থ পরীক্ষা। কিন্তু এরকম হয়ে থাকে।

     কিন্তু আপনার প্রাণশক্তিটি এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটায়। সে তার প্রচণ্ড শক্তি বলে একসাথে প্রাণ সঞ্চার করে আপনাদের দুজনের দেহেই। কিন্তু এই দুই শরীরে প্রাণ সঞ্চার করতে গিয়ে নিজে বিভক্ত হয়ে যায় দুটি ভাগে। আর তার থেকেই যত বিপত্তি। আমরা আগাগোড়া আপনার অর্থাৎ সেই শক্তির একটি খণ্ডিত অংশকে আপনার শরীর থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার অপর খণ্ডটি অর্থাৎ সঞ্জীবের দেহে অবস্থিত প্রাণশক্তি তার প্রবল আকর্ষিক শক্তিতে বার বার তার দোসরকে ফিরিয়ে এনেছে আপনার দেহে।

     আমরা আমাদের শেষ চেষ্টা করেছিলাম আমরা আপনার দুর্ঘটনা ঘটিয়ে। কিন্তু সেটা ছিল আমাদের সব চেয়ে বড় ভুল। আপনাকে বাঁচাতে গিয়ে সঞ্জীব অজান্তেই তার মনে সৃষ্ট প্রচণ্ড আবেগের মাধ্যমে আপনাদের প্রাণশক্তির এক অজানা তরঙ্গ-সূত্রকে জাগ্রত করে তুলেছে। সেই শক্তি মহাবিশ্বের বেঁধে দেওয়া অজানা কোন নিয়মের সীমা উল্লঙ্ঘন করেছে। আর তার থেকে শুরু হয়েছে এক সর্বগ্রাসী ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া। এর ফলে ইতিমধ্যে আপনাদের এই চতুর্মাত্রিক জগত অস্তিত্ব থেকে মুছে যাওয়া শুরু হয়েছে। তা এখনো ঘটছে আপনাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাইরে। তাই আপনারা এখনো সেটা অনুভব করছেন না।”

     “কিন্তু আপনাদের যদি আমাদের প্রাণের এতই প্রয়োজন তাহলে আপনারা আমাদের অজ্ঞান করেও এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন কেন?” রুদ্ধকন্ঠে বলে ওঠে চিরঞ্জীব। তার সত্ত্বা আজ চিরন্তন মানবিক প্রথা অনুসারে প্রবল অনুসন্ধিৎসায় মৃত্যুভয়কেও গ্রাহ্য করতে ভুলে গেছে।

     “কারণ আমাদের উপায় নেই। আপনার মধ্যে অবস্থিত প্রাণশক্তি আমাদেরও জ্ঞান ও বুদ্ধির অতীত হয়ে উঠেছে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করা বা আপনাদের শরীর থেকে জোর করে আলাদা করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে এই অচলাবস্থা কাটানোর একটাই সম্ভাব্য উপায় আমরা ভেবে বার করতে পেরেছি। সেটা হল আপনাদের এই প্রাণশক্তিকে মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ মাত্রাগুলোতে অবস্থিত মহাজাগতিক সূত্র রক্ষাকারী তরঙ্গগুলির কাছে নিয়ে যাওয়া। আপনাদের প্রাণশক্তি হবে মহাপ্রলয়ের বার্তাবাহী দূত। আমাদের বিশ্বাস আমরা ঠিক বার্তা প্রেরণ করতে পারলে তারা মহাজাগতিক এই সর্ববিনাশকারী প্রতিক্রিয়া থামিয়ে আবার তার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সামর্থ্য হবে।“

     “কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?” নিজের মনেই বলে ওঠে চিরঞ্জীব। বলেই সে উপলব্ধি করে যে তার মনের সাধারণ মানব সুলভ ভয় ভীতি আশঙ্কাগুলো যেন ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছে। হঠাৎ যেন সামান্য উত্তেজনার ছাপ পড়ে অনিমেশের মুখে। সে বলে ওঠে

     “দাস! কিছু বুঝতে পারছ?”

     ধর্মায়ুধ ও এবার যেন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। “হ্যাঁ। মনে হচ্ছে সংকেত পাওয়া গেছে।”

     চিরঞ্জীবের দিকে ফিরে ধর্মায়ুধ বলে ওঠে।

     “চিরঞ্জীব আপনারা দুজনই এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রক্ষা করবার শেষ আশা। এতক্ষণ সঞ্জীবের মধ্যে অবস্থিত আপনার জীবনশক্তির অন্য অংশটা আমাদের মহাকর্ষ তরঙ্গবার্তা বাহকের মাধ্যমে উচ্চতর মাত্রাগুলিতে সূত্র রক্ষাকারী তরঙ্গগুলোর অনুসন্ধান করছিল এবং এই আসন্ন বিপদের বার্তা প্রচার করছিল। মনে হচ্ছে সেই অনুসন্ধান সফল হয়েছে। সেই মহান তরঙ্গ এই সম্ভাব্য ধ্বংসের বার্তা পেয়ে নিজেরাই আপনাদের খুঁজে নিয়েছে। তারা আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছে। তাই আপনার মনের ভয়, দ্বিধা, শঙ্কা সব মুছে যাচ্ছে।”

     হ্যাঁ। সত্যিই মুছে যাচ্ছে। চিরঞ্জীবও সেই আহ্বান অনুভব করতে পারছে। তার দৃষ্টি এখন প্রসারিত। চারদিকের কুয়াশার আবরণ সরে গেছে। চারিদিকে চেয়ে সে দেখছে শুধু আলো আর আলো। পায়ের তলার পাথর যেন পাথর নয়। তার অণু পরমাণু ভেদ করে সে তার ভেতরের একদম শেষ পর্যায়ের তরঙ্গের মাঝে সৃষ্ট স্থিতি বিনাশের সমবেত নৃত্য স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সেই নৃত্যের মুদ্রায় রয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য আহ্বান। তাকে যেন তারা উদ্বাহু হয়ে বয়ে নিয়ে চলেছে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আলোর দিকে। সেই আলোর শেষ প্রান্তে তার অপেক্ষায় রয়েছে সঞ্জীব। তার সারা মুখে অপার্থিব প্রশান্তি। সে তার হাত প্রসারিত করে রেখেছে চিরঞ্জীবের স্পর্শের অপেক্ষায়। চিরঞ্জীবের হাত এসে স্পর্শ করে তার হাত। তাদের দুজনের হাত একত্র হতে তাদের সমস্ত শরীর ক্রমশ গলিত সোনার বরনের আলো হয়ে মিশে যেতে থাকে একে অপরের সাথে। সেই স্বর্ণাভ আলো প্রবাহিত হয় আকাশে বাতাসে ও মাটিতে ভেসে থাকা পদার্থের অণু পরমাণুর অতীত তরঙ্গ সূত্রে। পুবের আকাশেও তখন সূর্যের রক্তিম আভা; সেই স্বর্ণাভ মহাজাগতিক স্রোতকে অভিবাদন জানিয়ে সে জীবনের আশ্বাস ধ্বনি ছড়িয়ে দেয় ভোরের সুবর্ণরেখার মন্ত্রমুগ্ধ জলস্রোতে।

(উপসংহার)

সন ৩০১৭, ইওরোপার কক্ষপথে অবস্থিত ডাইমেনশনাল ওয়েভ অবজারভেটরির যন্ত্র-বৈজ্ঞানিকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বছর কয়েক আগে আবিষ্কৃত, এক হাজার আলোকবর্ষ দূরে মহাবিশ্বের যে অংশটি অবজারভেটরির মনিটর থেকে প্রায় তিনশ পার্থিব ঘণ্টা আগে থেকে আচমকাই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিল, সেটা আজ হঠাৎ আবার ফিরে এসেছে। এরকম অদ্ভুত ব্যাপার আগে কখনো ঘটে নি। ব্যাপারটা যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। সাইবর্গ বেসস্টেশন ভালকানের  মনিটরেও এই একই ব্যাপার ধরা পড়েছে। সারা সৌরজগতের মানব, যন্ত্র, সাইবর্গ প্রভৃতি সব জাতির বৈজ্ঞানিকরা এই ঘটনাটার ব্যাখ্যা নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্কে মেতে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!