প্রহর শেষের আলো

It is a subject also of additional interest to the author that this story was begun in the majestic region where the scene is principally laid, and in society which cannot cease to be regretted. I passed the summer of 1816 in the environs of Geneva. The season was cold and rainy, and in the evenings we crowded around a blazing wood fire, and occasionally amused ourselves with some German stories of ghosts, which happened to fall into our hands. These tales excited in us a playful desire of imitation. Two other friends (a tale from the pen of one of whom would be far more acceptable to the public than anything I can ever hope to produce) and myself agreed to write each a story founded on some supernatural occurrence.

The weather, however, suddenly became serene; and my two friends left me on a journey among the Alps, and lost, in the magnificent scenes which they present, all memory of their ghostly visions. The following tale is the only one which has been completed.

                                – – – Mary Shelly (The Preface from Frankenstein Or The Modern Prometheus)

‘মেরী(), এভাবে একলা কেন বসে আছো বাইরে? এদিকে বাড়ির মধ্যে সবাই হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে তোমাকে। আড্ডার ফাঁকে আমিও খেয়াল করিনি কখন তুমি বেরিয়ে এসেছো ঘর থেকে। ভেতরে চলো, ঠান্ডা লেগে যাবে। এই কয়েক মুহূর্তেই আমার মনে হচ্ছে যেন জমে গেছি।’

     লেক জেনিভার দিক থেকে বয়ে আসা ঝোড়ো বাতাসের শব্দ আকাশ জুড়ে একটা অপস্রিয়মাণ হাহাকারের মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। ভারী হয়ে আসছে বাতাস। কি এক অজানা পাখি ডাক দিয়ে চলে গেল পথহারার মতো। সে ডাক গম্ভীর, তার স্বরে কন্ট্রাল্টো গায়িকার চাপা অনুনাদ লুকিয়ে আছে। কোরিন্থিয়ান কলামের গায়ে কালচে সবুজ গুল্মরাজি মেডুসার কালনাগিনী চুলের মতো পেঁচিয়ে রয়েছে। আর তার নীচে একা বসে মেরী। ওঁর দৃষ্টি উদাস, বিমনা। দূর দিগন্তরেখায় অস্তরাগের শেষ চালচিত্রকে তখন ঘিরে ধরেছে প্রায় জান্তব আকৃতির মেঘের দল। আলতামিরার ক্ষ্যাপা বাইসনের মতো তারা ফুঁসছে, তাদের সম্মিলিত বিন্যাস ছড়িয়ে পড়তে চাইছে ক্রন্দসীর ছায়াঘেরা পথে। মেরীর অধীর দৃষ্টি সেই দিকে নিবদ্ধ। সাঁঝবেলায় প্রায় রহস্যের অভিসারে যেন আচ্ছন্ন পরিবেশ।

     ‘আকাশের কোণে ওই মেঘটাকে দেখেছো পার্সি?’() মেরীর মুখর নীরবতা ভেঙে গেল আচম্বিতে। পার্সি মুখ তুলে তাকায় অভীষ্ট দিকে।

     ‘বাতাসের গহনে লুকিয়ে থাকা সেই আত্মাদের কথা মনে পড়ছে আমার। তাদের হাহাকার ঝড়ের শব্দের মতো। মাঝে মাঝে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যাবার সময় আমার মনে হয় যেন কতো চাপা কান্না, কতো নিস্ফল আক্রোশ লড়াই করে যাচ্ছে ওই হাওয়ার ভেতরে। এখনও মনে হচ্ছে। আজ সাঁঝবেলায় সোঁদা বাতাসের এই ছোঁয়াগুলো যেন অতীতের সেই জিনদের মতো ঘিরে ধরছে আমাকে। তোমার কবিতায় যেমন অক্ষরমালার মধ্যে দিয়ে তাদের এঁকেছো তুমি। এই অন্ধকারে তোমার কবিতাই কেবল মনে পড়ছে আমার।’()

     ‘বাড়ির ভেতরে চলো মেরী। এমন সন্ধ্যায় কল্পনা স্বাভাবিকভাবেই আসে। সবসময় তাকে বেশী প্রশ্রয় না দেয়াই ভালো। আর জর্জি() অনেকক্ষণ ধরে ওয়াইনের বোতলটা নিয়ে অপেক্ষা করছে। ভিন্টেজ কালেকশন!! বলল প্রায় ৬০ বছর আগেকার। এই লটের প্রথমটা নাকি অভিনেতা গ্যারিক(৫) কিনেছিলেন। ভাবো হয়তো হ্যামলেটের স্বগতোক্তিগুলো বলার সময় এই ওয়াইনে চুমুক দিয়েই মঞ্চে ঢুকতেন গ্যারিক।’ পার্সি সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে দেয় মেরীর দিকে।

     ‘সেই ওয়াইনের রঙ বোধকরি তীব্র লাল হবে। প্রায় অনর্থক রক্তপাতের মতো!! মনে আছে আমার মরা মেয়েকে তোমরা সাদা স্যাটিনে মুড়ে নিয়ে চলে গেছিলে একদিন। আমিও তখন শুয়ে ছিলাম অমন তীব্র লাল একদলা রক্তের মধ্যে। গলার কাছে যেন ভারী হয়ে আছে সেই ছবিটা, আমাকে দমবন্ধ করে দেয় মাঝে মাঝে। সে অবশ্য বছরখানেক আগেকারই কথা। জর্জির ওয়াইনের মতো ভিন্টেজ নয়। আমার সেই মেয়ে এখনও আসে আমার কাছে। মাঝে মাঝে গভীর রাতে, কখনও আবার ভোরের দিকে। আবার এখন ওই কালো মেঘের মধ্যে যেন ছোট ছোট আঙুলগুলো নেড়ে ডেকে যাচ্ছে আমাকে। আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি …’

     পার্সি এসে মেরীর দুই ঠোঁটের ওপর আড়াআড়িভাবে ওঁর তর্জনীটা রেখে উদ্যত শব্দগুলোকে আটকে দেয়।

     ‘চলো ভেতরে। লেকের দিক থেকে কনকনে হাওয়া আসছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে এখুনি। আর … (একটু থেমে) ওই কষ্টটা তোমার মতো আমিও বয়ে বেড়াচ্ছি মেরী।’ দুজনে দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে, ব্যাথার নিস্তরঙ্গ সাগরে আনতপ্রায় ঢেউ ওঠার অপেক্ষা যেন করে আছে পৃথিবী।

     ভিলা দিওদাতির দোতলায় লেকের দিক বরাবর বড়ো ঘরটায় তখন ফায়ারপ্লেসের আগুনের লেলিহান শিখাগুলো সাড়া পেয়েছে কোন এক ধূসর অতীতের। এক অদ্ভুত বিচ্ছুরণ তাদের মধ্যে, কিসের যেন চাঞ্চল্য!! সেই গনগনে আগুন ঘিরে পাত্রপাত্রীরা বসে আছে। ঠিক সেই মূহূর্তে জর্জির ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বন্ধু জন(৬) একটা নতুন গল্পের খসড়া পড়ে শোনাচ্ছিল। তাঁর একপাশে ক্লারা(৭) আর উল্টোদিকে জর্জ। শুনতে শুনতে জর্জের দৃষ্টি মাঝে মাঝেই ক্লারার দেহের সুডৌল বর্ণিকাভঙ্গ মেপে নিচ্ছে উদ্ধত দৃষ্টিতে। আর সেই ফাঁকে দৃষ্টিবিনিময় হলেই একটা লালচে আভা এসে মিলিয়ে যাচ্ছে ক্লারার দু’গালে।

     ‘অব্রে জানে না এই প্রহেলিকার রহস্য। তার স্বাভাবিক বোধগুলো এখন কাজ করছে না আর। রোমের গলিঘুঁজির মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই রহস্যময় ছায়া। সে কি মানুষ না বিদেহী এক ভ্যাম্পায়ার!! লর্ড উটভেন (রুথভেন) কোন্‌ সেই ভয়ঙ্কর কথাটা লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন ওর কাছ থেকে!!’

     ‘আরে মেরী, এসো এসো। তোমার জন্যই সবাই মিলে বসে আছি।’ জর্জি উঠে দাঁড়াল এক আদর্শ হোস্টের মতো। মেরী আর পার্সি তখন উল্টোদিকের আরাম কেদারায় এসে বসে পড়ে। মেরীর কাঁধের চাদর টেনে দেয় পার্সি।  

     ‘আমাদের ডাক্তার জন এক দারুন ভূতের গল্প লেখা শুরু করেছে। আমি তো বলছি এটা গুছিয়ে বড়ো করে লিখে ফ্যালো ডাক্তার।’

     ‘আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন ডাক্তার পলিডোরি?’ মেরী কিছুটা উদ্যতভাবেই বলে ওঠে।

     ‘দেখুন, চিকিৎসক হিসেবে আমার দায় বিজ্ঞানের কাছে। তাই আষাঢ়ে, প্রমান অযোগ্য কোনকিছু বিশ্বাস করতে পারি না আমি। কিন্তু, তা বলে তো গথিক সাহিত্যের রস গ্রহণ করতে কোন বাধা নেই আমার। আর আজকের পরিবেশটাই যখন আদর্শ এই ধরণের গল্পের জন্য …।’

     ‘আরে রাখো তোমার আষাঢ়ে!!’ জর্জের ঠোঁটের কোণে ব্যাঙ্গের হাসি দেখা দিল।

     ‘এই গ্রীষ্মকালে আমরা পাঁচজনে মিলে ফায়ারপ্লেসের পাশে বসেও প্রবল ঠাণ্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছি। এও কি কম আষাঢ়ে। এদিকে মনে হচ্ছে বৃষ্টিও আসতে চলেছে প্রবলভাবে। আমি তো ভাবছি পার্সির মতো করে গ্রীষ্মের একটা গীতিকাব্য (Ode) লিখব। যেখানে গ্রীষ্ম হবে মায়াবী, কুহকিনী একটা মেয়ে। বলো ডাক্তার, অসময়ে এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডার কি ব্যাখ্যা!!’

     ‘ব্যাখ্যা নিশ্চই আছে। বিজ্ঞানীরা ঠিকই ধরতে পারবেন ভবিষ্যতে। অনেক সময় সমকালে বোঝা না গেলেও বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে আগামী দিনে বেরিয়ে আসে সত্যিটা। যেমন ধরুন এখন আর বোধকরি কোন বাচ্চাকেই ভোলাতে পারবেন না পৃথিবীর আকৃতি চৌকো বলে। কিন্তু এক সময় ভাবুন তো এটাই ছিল সাধারণ বিশ্বাস। বোলোনার সেই ডাক্তার গ্যালভানির(৮) কথা নিশ্চই মনে আছে সবার। প্রানী বিদ্যুৎ নিয়ে কতো পরীক্ষা করেছিলেন। ওর পরীক্ষায় সেই মরা ব্যাঙের পা’টা যখন কেঁপে উঠছিল তখন সেখানে উপস্থিত জনেরা কেঁপে উঠতেন ভয়ে। গ্যালভানি প্রাণী বিদ্যুৎ নিয়ে তার ব্যাখ্যায় প্রাথমিকভাবে হতবাক করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীদের। প্রফেসর ভোল্টা(৯) যদিও অন্য মত দিয়েছিলেন ওই ব্যাপারে। সত্যি বলতে কি আমরা এখনও সঠিকভাবে জানি না রহস্যটা। সত্যিই কি ওই ব্যাঙের পাগুলো নড়ে উঠছিল ওর শরীরের নিজস্ব বিদ্যুতের প্রভাবে, নাকি অন্য কিছু? আজ না জানলেও আগামীদিনে বিজ্ঞানীরা নিশ্চই জানতে পারবেন ওই রহস্য।’ পলিডোরির গলায় প্রত্যয়ের সুর।

     ‘থাক!! আমাদের আড্ডায় তোমাদের জটিল বিজ্ঞান থাক এখন। সময়টা যখন ভূতের গল্পের জন্য আদর্শ তখন আমার প্রস্তাব যে সবাই মিলে একটা মজার খেলা খেলা যাক। জন যেমন তার লেখা শুরু করে দিয়েছে তেমনি আমরা সবাই মিলে এমন গথিক গল্প লিখি না কেন। গল্পগুলো হতে হবে মৌলিক!!’ ফায়ারপ্লেসের আগুনে আরো কাঠ গুঁজে দিতে দিতে বলে উঠল জর্জ।

     ‘পার্সি, তোমার মনে আছে ওডেনভাল্ডের সেই দূর্গের কথা? সেই জনৈক অ্যালকেমিস্ট য়োহান ডিপেল(১০) যেখানে মৃতদেহগুলোকে কবর থেকে খুঁড়ে বার করে তাঁর সেই ভয়ঙ্কর পরীক্ষাগুলো করতেন!!’ মেরীর গলায় মন্দ্রসপ্তকের একটা লুকোনো কিন্তু অস্থির আন্দোলন। যেন কুয়াশার ভেতর থেকে সেই শব্দগুলো ভেসে আসছে। ওই ঘরের সবাই টের পেল ওঁর গলার স্বরে কুহকের সেই অনুরণন।

     ‘ও বুঝেছি!! যেবার তুমি, ক্লারা আর আমি মিলে বেড়াতে বেড়াতে ডার্মস্ট্যাট এর দিকে চলে গেছিলাম। সেই দূর্গটা সত্যি যেন অতীত থেকে আসা একটা প্রেতের মতো পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে ছিল।’ পার্সি সেই ভ্রমণের স্মৃতি রোমান্থন করে সহজেই।

     ‘প্রেতই বটে!! আমরা কিন্তু চারজন ছিলাম সেবার!! আর একজন ঘুমের মধ্যে অস্ফূট হয়ে ছিল আমার ভেতরে। জন্মদাত্রী মায়ের কোন স্মৃতি নেই আমার কাছে। ওই একজনকে নিজের শরীরে, নিজের সত্ত্বায় বয়ে বেড়ানোর প্রতিটা দিনের স্মৃতি এখনও স্পষ্ট আমার কাছে।’  কিছুটা মৃদু স্বরে বলে ওঠে মেরী, প্রায় ঘোরের মধ্যে। তারপর ওই ঘরের মধ্যে বাকী সবার উপস্থিতি অনুভব করে, সম্বিৎ পেয়ে ডাক্তার পলিডোরির দিকে ফিরে চায় সে।   

     ‘আচ্ছা সেই মরা ব্যাঙটাকে পুরো বাঁচিয়ে তোলা যেত না ডাক্তার!! যদি আরো বেশী বিদ্যুতের যোগান দেয়া যেত বাইরে থেকে।’ মেরীর দৃষ্টিতে সজাগ প্রশ্ন।

     ‘ডক্টর গ্যালভানি তো পরীক্ষাটা করেছিলেন শুধু ব্যাঙের দুটো কাটা পা নিয়ে। সে দুটো বাকী দেহ ছাড়া বেঁচে উঠলেও বোধকরি কোন সুরাহা হত না। মানে ধড় ছাড়া শুধু পা …’

     ‘তোমরা দুজনে সেই ব্যাঙের পা নিয়ে পড়লে আবার। ওসব ছাড়ো এখন। তার চেয়ে এই প্রবল ঠান্ডায় আমরা চলো লালচে মদিরায় গলা ভিজিয়ে নিই। এই সন্ধ্যায় প্রেমের দেবী অ্যাফ্রোদেতিকে আহ্বান জানাতে পারি আমরা, কথা বলতে পারি মধ্যপ্রাচ্যের কাব্যসঙ্গীত নিয়ে কিম্বা আমার কাব্যে জোলেখা সেলিমের(১১) প্রেমের গভীর আখ্যান পড়ে শোনাতে পারি তোমাদের। আবার চাইলে হ্যান্ডেলের(১২) অমর সুরধুনী ভেসে আসতে পারে ওই পিয়ানোর মধ্যে দিয়ে। মেরী, ক্লারা, জন তোমরা যে কেউ গিয়ে ওই পিয়ানোটার সদ্ব্যবহার করতে পারো। সেসব না করে ব্যাঙের কাটা পা!!  ক্লারা তোমার এই বোনকে নিয়ে আর পারা গেল না!!’ ওয়াইন গ্লাসে রক্তিম সুরা ঢালতে ঢালতে বলে উঠল জর্জি বায়রন।

     ‘মাননীয় বায়রণ, ওই ওয়াইন গ্লাসের মধ্যে দিয়ে এদিকে তাকালে আমার মুখটাকে কি অদ্ভুত লাগছে না!! যেন মানুষেরই নয় তাই না, অথচ এটা আপনার চেনা মুখ। ঠিক তেমনিভাবে আমিও আমার বাবার(১৩) কাছে সত্যির ভাষ্যকে পারিপার্শ্বিকের আলোয় মেপে নিতে শিখেছি। কাব্যের মধ্যে জীবনের নানারঙের বর্ণালী আমাকেও স্পর্শ করে। আপনার কাব্যের আমি এক গুনমুগ্ধ পাঠক। কিন্তু ওইসব নানা রঙের বানিয়ে তোলা শব্দ যেন একটা গভীর সত্যের ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারে সেটাও কি কবির কাম্য নয়? যে সত্যির অনেকগুলো মুখ থাকে। যাইহোক, এই সন্ধ্যেবেলায় সেসব কথা আর বাড়াব না।’

     ঘরের উত্তাপ যেন আরো কমে গেছে হঠাৎ এই কথার প্রতিধ্বণিতে।

     ‘আচ্ছা, এতো কথার মধ্যে আমার কিন্তু প্রবল খিদে পেয়ে গেছে। ডিনারে আমাদের জন্য আজ কি বরাদ্দ জর্জ? এই শীতে যেটা চাই সেটা হল স্যুইস চিকেন বেকড্‌ ব্রেস্ট, আর তার সাথে কনিয়াক।’ পরিবেশটাকে হাল্কা করার জন্য পার্সি এগিয়ে আসে।

     ‘কবিতা না লিখে নাটক লেখা উচিৎ ছিল তোমার পার্সি!! কি দ্রুত নতুন দৃশ্যে চলে যেতে পারো!! হ্যারিয়েটের(১৪) সাথে ঝগড়ার সময়েও তুমি কি এমনভাবেই সামাল দাও। নাকি আমাকেই তোমার ভয় বেশী!!’

     মেরীর দৃষ্টি যেন ওই ফায়ারপ্লেসের শিখাগুলোর মতোই গনগনে লাল হয়ে গেছে। তার সামনে কিছুটা অসহায় পার্সি।

     ‘আমি রাজী মাননীয় বায়রণ। আপনার আগের প্রস্তাবটা আমার ভালো লেগেছে। গথিক ভয়ের গল্পই লিখতে চেষ্টা করব আমি।’ মেরীর মুখমণ্ডলের গনগনে আঁচের দীপ্তি তাঁর গলার স্বরেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

     ‘দারুন হবে মেরী। আমরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের ধারণামত সেই প্রেতের কাহিনী লিখছি তাহলে। এই রাতে তোমরাও আর মেজঁ সাপ্যুইতে ফেরার কথা ভেবো না। ডিনার এলো বলে আর আমার প্যান্ট্রিতে অঢেল জোগান রয়েছে সবার জন্য।’

     জর্জ বায়রনের গলায় প্রবল উৎসাহ। এর আগের মুহুর্তের হঠাৎ জেগে ওঠা শৈত্য যেন মিলিয়ে যাচ্ছে ওই ঘর থেকে। গনগনে আগুনের হোমশিখা গরম করে দিচ্ছে ওই গোধূলির হিম ধূসরতাকে। মেরীর মনের গভীরেও যেন অতীতের কোন ছায়াশরীর আহ্বান জানিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার অসীম রহস্যের এপারে যে পর্দা আছে, যার নিঃসীম ধোঁয়াটে কিনারাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠলে দুর্লঙ্ঘ্যেয় সেই জগতের খবর আসে আলোর মারফৎ, মেরী সেই আলোর ছোঁয়া দেখতে পেল আকাশে। সেই বড়ো ঘরের বিরাট জানলা পেরিয়ে তখন অতীতের অজস্র প্রেতের কান্না ভেসে আসছে ছায়াপথে। সেই কান্না শুনছে শুধু মেরী। সেই আলোছায়া, বাতাসের সেই গভীর নিঃশ্বাসের ভেতরে পুনর্জন্ম নিচ্ছে অতীতের এক ছায়াশরীর। যার স্বগতোক্তি শোনা যাবে আগামীদিনে আমাদের সবার অযুত নিযুত দুঃস্বপ্নের রঙ্গমঞ্চে। যে স্বপ্নের কিনারে লেগে থাকা রঙ ওই ভিন্টেজ ওয়াইনের মতো গাঢ় লাল।  

পরিচিতিঃ

(১) মেরী উলস্টোনক্রাফট শেলী।

(২) পার্সি বিস্‌ শেলী (ব্রিটিশ রোম্যান্টিক কাব্য অধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি)।

(৩) Oh! there are spirits of the air,
And genii of the evening breeze,
And gentle ghosts, with eyes as fair
As star-beams among twilight trees …
 P.B. Shelly, Alastor or The Spirit of Solitude (1816)

(৪) লর্ড জর্জ গর্ডন বায়রন (ষষ্ঠ ব্যারন বায়রন, এফ. আর. এস, বিখ্যাত রোম্যান্টিক কবি এবং রাজনীতিবিদ্‌) ।

(৫) ডেভিড গ্যারিক (বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা)।

(৬) জন পলিডোরি (চিকিৎসক এবং প্রখ্যাত লেখক, ওঁর বিখ্যাত রচনা ‘ভ্যাম্পায়ার’)।

(৭) ক্লারা মেরী জেন ক্লেরমঁ (সম্পর্কে মেরীর বৈমাত্রেয় বোন, একসময়ে লর্ড বায়রণের প্রেমিকা। ওঁদের মেয়ের নাম অ্যালেগ্রা)।

(৮) লুইজি অ্যালোসিয়ো গ্যালভানি (ইটালির চিকিৎসক এবং পদার্থবিদ)।

(৯) আলেসান্দ্রো ভোল্টা (ইটালির প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, তড়িৎ বিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা। ওঁর আবিষ্কৃত ‘ভোল্টেইক পাইল’-ই ব্যাটারির আদি রূপ)।

(১০) য়োহান কনরাড ডিপেল (বিতর্কিত থিয়োলজিয়ান এবং অ্যালকেমিস্ট যার আবাস ছিল ক্যাসল ‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’)।

(১১) দ্য ব্রাইড অফ্‌ অ্যাবিডস্‌।

(১২) জর্জ ফ্রিডরিক হ্যান্ডেল (বারোক যুগের প্রখ্যাত জার্মান সুরস্রষ্টা, যদিও জীবনের বেশিরভাগটাই কাটে ইংল্যান্ডে)

(১৩) উইলিয়াম গডউইন (প্রখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)।

(১৪) হ্যারিয়েট শেলী ওয়েস্টব্রুক (পার্সি বিস্‌ শেলীর প্রথম স্ত্রী। এই গল্পে উল্লিখিত সময়ের কয়েকদিনের মধ্যেই হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে পার্সি ও মেরী সামাজিকভাবে বিয়ে করেন)।

One thought on “প্রহর শেষের আলো

  • April 2, 2018 at 7:45 am
    Permalink

    অসামান্য লেখা! ইতিহাস আর কল্পনাকে মিলিয়ে এমন লেখা মেরী শেলীর প্রতি যোগ্য শ্রদ্ধার্ঘ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!