প্রোফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার – ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা

লেখক – সত্যজিৎ রায় ও সুদীপ দেব

অলংকরণ – কল্যাণী রায়

 

৬ই অক্টোবর

     

     আজ আমার পঁচাত্তর বছর পূর্ণ হল। সকালে অবিনাশবাবু এসেছিলেন, আমার হাত দুটোধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, ‘মেনি হ্যাপি ডেজ অফ দ্য রিটার্ন।’ ভদ্রলোকের হাবভাবএতই আন্তরিকতাপূর্ণ ছিল যে আমি আর ইংরেজিটা সংশোধন করলাম না।

     দেশবিদেশ থেকে বহু বিজ্ঞানী বন্ধুরা আমায় অভিনন্দন জানিয়েছে। আমার সামনেই টেবিলে রাখা রয়েছে অন্তত খান পঞ্চাশেক চিঠি, টেলিগ্রাম আর গ্রিটিংস কার্ড। এখনও কাজ করতে পারছি—সেটাই বড় কথা। তার একটা কারণ অবশ্য মিরাকিউরল, আর আরেকটা আমার চাকর প্রহ্লাদের একনিষ্ঠ পরিচর্যা। সেও অবিশ্যি আমার মিরাকিউরলের সুফল ভোগ করেছে, যেমন করেছে আমার বেড়াল নিউটন। গত পঞ্চাশ বছরে মিরাকিউরল থেকে শুরু করে কত কী যে আবিষ্কার করেছি, সেই কথাই ভাবছিলাম। অ্যানাইহিলিন পিস্তল, ঘুমের বড়ি সমনোলিন, লুপ্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য রিমেমব্রেন, ল্যাম্পের জোরালো আলো লুমিনিম্যাক্স, শ্যাঙ্কোপ্লাস্ট, শ্যাঙ্কোপ্লেন, কানে শোনা যায় না এমন শব্দ শোনার জন্য মাইক্রোসোনোগ্রাফ—আরও কত কী!

     এইসব ভাবছি এমন সময় প্রহ্লাদ এসে খবর দিল, একজন সাহেব দেখা করতে এসেছেন।

     আমি আসতে বলতে যিনি প্ৰবেশ করলেন তার বয়স পঁচিশের বেশি নয়। আমার সঙ্গে করমর্দন করে ছেলেটি বলল, ‘আমার নাম চার্লস ড্রেক্সেল। আমার বাবার নাম হয়তো তুমি—’

     ‘জন ড্রেক্সেল কি? বায়োকেমিস্ট?’

     ‘হ্যাঁ। আমি বাবার ব্যাপারেই তোমার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছি।’

     ‘তোমার বাবা এখন কোথায়?’

     ‘প্ৰশান্ত মহাসাগরের একটা দ্বীপে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন। তিন দিন হল তাঁর মৃত্যু হয়।’

     ‘সে কী! এ যে ভয়ংকর সংবাদ। ব্যাপারটা শুনি।’

     ‘বলছি। পুরো ব্যাপারটাই বলছি, একটু ধৈর্য লাগবে।’

     ‘ধৈর্যের কোনও অভাব নেই আমার।’

     ‘বাবা শুধু বিজ্ঞানীই ছিলেন না—তিনি পর্যটকও ছিলেন। দু বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ভ্ৰমণ করতে গিয়ে তিনি ত্ৰয়োদশ শতাব্দীর একটি আরবি পুঁথির সন্ধান পান। বাবা আরবি জানতেন। অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য পুঁথি। সেটা পড়ে তিনি প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত হয়ে পড়েন। বলেন, এই পুঁথিতে পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিস আবিষ্কারের পদ্ধতির বর্ণনা আছে।’

     ‘সেটা কী জিনিস? আমি জিজ্ঞেস করলাম।’

     ‘তাও বাবা বলেননি। বললেন, এক্সপেরিমেন্ট সফল হলে লোকে এমনিই জানতে পারবে।’

     ‘তারপর?’

     ‘তারপর বাবা এক্সপেরিমেন্টের তোড়জোড় শুরু করেন। ব্যয়সাপেক্ষ এক্সপেরিমেন্ট—শহরে করা চলবে না—প্রাকৃতিক পরিবেশ চাই। বাবা ব্যাপারটাকে গোপন রাখার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ বেছে নেন। কোনও সংস্থা বাবাকে টাকা দিতে রাজি হয়নি। অবশেষে জোসেফ গ্রিমাল্ডি নামে বাবার এক পরিচিত ধনী বায়োকেমিস্ট, বাবাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে এবং এক্সপেরিমেন্টে অংশগ্রহণ করতে রাজি হন। গ্রিমাল্ডির শর্ত ছিল, পরীক্ষা সফল হলে তার জন্য অর্ধেক কৃতিত্ব সে দাবি করবে। বাবা তখন এমনই মেতে উঠেছেন যে, এই শর্তে তিনি রাজি হয়ে যান। তিন মাস আগে এই এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়। চিঠিতে জানতে পারতাম। বাবা দ্রুত সফলতার দিকে এগিয়ে চলেছেন। এমন সময় বিনা মেঘে বজ্ৰাঘাত। গ্রিমাল্ডির চিঠি এল যে, মাত্র চার দিনের অসুখে কোনও অজ্ঞাত ট্রপিক্যাল ব্যারামে বাবার মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীর দল যে যার দেশে ফিরে গেছে। অথচ বাবার শেষ চিঠিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, এক্সপেরিমেন্ট সফল হতে চলেছে।’

     ‘তোমার বাবার মৃত্যু সম্বন্ধে তোমার নিজের কোনও ধারণা আছে?’

     ‘আছে।’

     ‘কী?’

     ‘গ্রিমাল্ডি এক্সপেরিমেন্টের পুরো ক্রেডিট নেবার জন্য বাবাকে খুন করেছে।’

     ‘বুঝলাম। কিন্তু তুমি আমার কাছে এসেছ কেন?’

     ‘আমি চাই, তুমি ওই দ্বীপে গিয়ে ব্যাপারটা অনুসন্ধান করো। এই ধরনের অভিযান তো তোমার কাছে নতুন কিছু নয়। তোমার দল নিয়ে তুমি চলে যাও। বাবার কাজটা অসম্পূর্ণ থাকলে বিজ্ঞানের পরম ক্ষতি হবে। দ্বীপের অবস্থান আমার জানা আছে, আমি তোমাকে জানিয়ে দেব।’

     ‘কিন্তু আমি যেতে চাইলেই গ্রিমাল্ডি সেটা মেনে নেবে কেন?’

     ‘তারও উপায় আমি ভেবে রেখেছি। গ্রিমাল্ডি চিঠিতে জানিয়েছিল বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হয়তো তার একার দ্বারা সম্ভব হবে না। কিন্তু অন্য সবাই ফিরে এলেও সে নিজে ওই দ্বীপে কিছুদিনের জন্য রয়ে যাবে এবং একটা শেষ চেষ্টা করে দেখবে। আমি জানি, শেষ পর্যন্ত গ্রিমাল্ডি সফল হলেও এখন বেমালুম সেটা চেপে যাবে আর ভবিষ্যতে সুযোগ বুঝে সেই আবিষ্কারের পূর্ণ কৃতিত্ব দাবি করবে। আমি বাবার জায়গায় তোমাকে পাঠানোর প্রস্তাব রাখব। তোমার যা খ্যাতি আর এলেম তাতে গ্রিমাল্ডি অসম্মত হতে পারবে না।’

     ‘তোমার অনুমান কতটা সত্যি তা তো এখনই বলতে পারছি না। তবে পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিস বলতে তোমার বাবা কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটা জানার একটা আগ্রহ হচ্ছে। আমি যদি এই এক্সপেরিমেন্টে যোগ দিই তাহলে চাইব তুমিও আমার সঙ্গে চলো।’

     ‘বেশ তো। আমার কোন আপত্তি নেই।’

 

২৩শে অক্টোবর

 

     সান ফ্রান্সিসকোর ওকল্যান্ড পোর্ট থেকে একটি প্রাইভেট লঞ্চ নিয়ে ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের উদ্দেশে আজই আমরা রওয়ানা হয়েছি। দ্বীপের অবস্থান হল ল্যাটিচিউড থার্টিসিক্স নর্থ—লঙ্গিচিউডওয়ান টুয়েন্টি এইট ওয়েস্ট। আমরা মানে আমি, চার্লস, সন্ডার্স, অবিনাশবাবু আর মাইকেল। সন্ডার্সকে একটা টেলিগ্রাম করে এই অভিযানের ব্যাপারে জানাতেই সে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে যায়। আর প্রশান্ত মহাসাগরের এক অজানা দ্বীপে যাচ্ছি শুনে অবিনাশবাবু বলেন যে, অনেকদিন ঘরে বসে থেকে উনিও হাঁপিয়ে উঠেছেন। গঙ্গাসাগরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। ওঁর মতে ব্যাপারটা একই, তবে আমার সঙ্গে গেলে একটু কথা বলার মতো মানুষ পাবেন।

     ভদ্রলোকের সঙ্গ আমার খারাপ লাগে না। এবারের অভিযানে যদি সত্যিই পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিসটি আবিষ্কার করতে পারি তাহলে অন্তত সেটা চাক্ষুষ করে উনি অবাক হয়ে যান কি না সেটাও একটা দেখার মতো ব্যাপার হবে।

     আমাদের দলের পঞ্চম ব্যক্তিটি সম্পর্কে একটু বলা দরকার। বছর পঁয়ত্রিশেকের সদাহাস্যময় এই বায়োকেমিস্টের নাম মাইকেল স্মিথ। সে জন ড্রেক্সেলের এক্সপেরিমেন্টে একজন সহকারী হিসেবে কাজ করছিল। ড্রেক্সেলের আকস্মিক মৃত্যুতে অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ অসম্পূর্ণ রেখে সেও ফিরে আসে নিজের দেশে, লস এঞ্জেলস-এ। আর সঙ্গে নিয়ে আসে ড্রেক্সেলের নিত্য ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র। সেগুলি চার্লসের কাছে ফেরত দিতে এসে জানতে পারে যে আমরা আবার সেই দ্বীপে চলেছি ড্রেক্সেলের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য। তখন মাইকেল আমাদের অভিযানে সামিল হওয়ার প্রস্তাব করে। একদিক থেকে দেখতে গেলে মাইকেল আমাদের সঙ্গ নেওয়ায় ভালই হয়েছে। গ্রিমাল্ডির কাছে কী রকম ব্যবহার পাব তা জানি না। এক্সপেরিমেন্টের কাজে তিনি আদৌ আমাদের সহযোগিতা করবেন কি না জানা নেই। বরং মাইকেলের কাছে জেনে নেওয়া যাবে কী নিয়ে তাদের গবেষণা চলছিল এবং কতদূর তার অগ্রগতি হয়েছিল। এই লঞ্চটা মাইকেলই চালিয়ে নিয়ে চলেছে আইল্যান্ডের উদ্দেশে।

     আমি লঞ্চের ডেকে বসে ডায়রি লিখছিলাম, এমন সময় পেনট্যাক্স ক্যামেরা হাতে মাইকেল এসে দাঁড়াল।

     ডায়রি থেকে মুখ তুলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইঞ্জিনঘরে কাকে বসিয়ে এলে?’

     ‘এখন তো কিছুক্ষণ একভাবে সোজা লঞ্চ চলবে, তাই করার কিছু নেই তেমন। চার্লসকে বললাম আমি একটু হাওয়া খেয়ে আসি।’

     ‘তোমার কি ফটোগ্রাফির নেশা আছে?’

     ‘আলবাত। ঠিক তোমার যেমন ডায়রি লেখার নেশা।’

     ‘হুম। একটা কথা ভাবছিলাম,তুমি যে জন ড্রেক্সেলের জিনিসপত্রগুলি নিয়ে এসেছিলে তার মধ্যে কি কোন পুঁথি বা ডায়রি ছিল?’

     ‘পুঁথি? ইউ মিন ম্যানাস্ক্রিপ্ট?’

     ‘হ্যাঁ, অনেক পুরনো আরবি পুঁথি।’

     ‘না। সেরকম কোন জিনিস ছিল না।’

     ‘আর তার গবেষণার কাগজপত্র?’

     ‘আমি তো সেরকম কিছু দেখিনি। তবে সে সব জিনিস যদি থেকে থাকে তবে গ্রিমাল্ডি তা আমায় দেয়নি। আমাকে শুধু তার দৈনন্দিন ব্যবহারের মামুলি কিছু জিনিস ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’

     ‘আচ্ছা। গবেষণাটা কী নিয়ে হচ্ছিল সে ব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলবে?’

     একটু চুপ করে থেকে মাথার সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে মাইকেল বলল, ‘এ ব্যাপারে আমরা কেউই খুব স্পষ্টভাবে কিছু জানতাম না। আমাদের প্রত্যেকের কাজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল। যদিও দলের সবাই শিক্ষানবিশ বিজ্ঞানী, তবু বলতে একটু দ্বিধা করছে; আমাদের কাজগুলো খুব একটা বৈজ্ঞানিক সুলভ ছিল না।’

     ‘তুমি নিঃসংকোচে বলতে পারো।’

     ‘যেমন আমার কাজ ছিল মধু সংগ্রহ করা। মৌমাছির চাষ করা হয়েছিল। এক্সপেরিমেন্টের জন্য দরকার ছিল সদ্য চাকভাঙা মধু। আমাদের দলের ডেভিড ছোকরা প্রতিদিন সকালে গরুর দুধ দুইয়ে নিয়ে যেত ল্যাবরেটরিতে। এছাড়া আরও অনেক প্রাকৃতিক উপাদান প্রয়োজন পড়ত। যার অধিকাংশই ছিল টাটকা। যেমন টিউলিপ ফুলের বৃন্তের রস, ব্রাউন পেলিক্যানের সদ্য পাড়া ডিম এইসব।’

     ‘তার মানে ওই দ্বীপে বেশ গাছপালা পশুপাখি আছে।’

     ‘পশু সেরকম কিছু চোখে পড়েনি, তবে প্রচুর পাখি আর গাছ আছে। আর বেশ কয়েকটা প্রাকৃতিক গুহা আছে। এরকম একটা বড় গুহাকেই ল্যাবরেটরি বানানো হয়েছিল। আমাদের থাকার ব্যাবস্থাও হয়েছিল ছোট ছোট কয়েকটা গুহায়। আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্সের জিনিস ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। এমনকী ছবি তুলতেও পারিনি গতবার। ’মাইকেল তার গলায় ঝোলানো ক্যামেরাটা দেখিয়ে হেসে বলল, ‘আবার ওই দ্বীপে যেতে চাওয়ার সেটাও একটা কারণ।’

     বোঝাই যাচ্ছে ড্রেক্সেল যে আবিষ্কারটা করতে চলেছিলেন তার জন্য প্রয়োজন ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রাচীন পরিবেশ। অর্থাৎ যে সময়ে সেই পুঁথিটা লেখা হয়েছিল সেই সময়কার পরিবেশ। তাই আমি চিন্তান্বিতভাবে মাথা নেড়ে বললাম, ‘তোমার সেই শখ এবারেও পূরণ হবে কি না তার গ্যারান্টি দিতে পারছি না। কারণ এক্সপেরিমেন্ট যতদিন না শেষ হচ্ছে ড্রেক্সেলের জারি করা নিয়মগুলো দ্বীপে পৌঁছে আমাদের সবাইকে মানতে হবে।’

     ‘তাহলে এখনই বরং আমাদের সবার একটা গ্রুপ ছবি তুলে নাও।’ সন্ডার্সের গলা পেয়ে বুঝলাম সে কখন ডেকে এসে দাঁড়িয়েছে, আর আমাদের কথোপকথন তার কানে গেছে।

     এরপর মাইকেল হাঁকডাক করে বাকিদের লঞ্চে ডেকে নিয়ে এল। ছোকরার প্রাণচঞ্চলতায় আমার নিজের যৌবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বোধহয় একটু স্থবির হয়ে পড়ে।

 

২৩শে অক্টোবর, রাত আটটা

 

     ড্রেক্সেল আইল্যাণ্ডের সৈকতে শ্যাঙ্কোপ্লাস্টের তাঁবু খাটিয়ে তার ভিতর লুমিনিম্যাক্সের আলোয় ডায়রি লিখছি। অবিনাশবাবু পাশে বসে মশকিউলিন মাখছেন। আমার সাম্প্রতিক আবিষ্কার এই তেল একবার মাখলে জল দিয়ে না ধুয়ে ফেলা পর্যন্ত মশা বা অন্য কোন কীট-পতঙ্গ কামড়াবে না। আমি মশকিউলিন মেখে চারদিন পর্যন্ত স্নান না করে পরীক্ষা করে দেখেছি মশা, পিঁপড়ে ইত্যাদি ধারেপাশে আসে না। সবথেকে মজার ব্যাপার হল, এই তেল তৈরি করার প্রধান উপাদান মশারই লার্ভা। এবারের অভিযানে আমার মনে হয়েছিল যে অচেনা সামুদ্রিক দ্বীপে মশা বা অন্য ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য মশকিউলিনের দরকার হতে পারে। আমার অনুমান যে অভ্রান্ত তা এখানে আসার পরই বুঝতে পারছি। গাছপালা অধ্যুষিত সবুজ এই দ্বীপে বিকেলবেলা এসে পৌঁছোনোর পরই যে জিনিসটি সবার প্রথমে আমাদের নাজেহাল করে তুলেছিল তা হল ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণ। মাইকেলের কাছে শুনেছি যেহেতু মশা নিবারণের যাবতীয় রাসায়নিক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল তাই তারা সন্ধের পরই মশারির ভিতর সেঁধিয়ে যেত। অবিনাশবাবু অবিশ্যি প্রথমে মশকিউলিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হয়ে ব্যবহার করতে চাননি। কিন্তু যখন দেখলেন আমরা এই তেল মেখে দিব্যি বহাল তবিয়তে মশার কামড় ঠেকিয়ে রেখেছি তখন বললেন, ‘দিন তো মশাই আপনার ওই ওডোমস তেল একটু মেখে নিই। আমার আবার এসবে একটু অ্যালার্জি আছে কিনা। কিন্তু এখন দেখছি না মাখলে ম্যালেরিয়ায় প্রাণ দিতে হবে।’

     আমি তাঁকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, এই তেল মাখলে অ্যালার্জি বা অন্য কোনরকম সাইড এফেক্টের সম্ভাবনা নেই। আর মশকিউলিন একদম প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি, তাই এ জিনিস ড্রেক্সেল আইল্যান্ডে ব্যবহার করতেও কোন বাধা নেই।

     দ্বীপের পশ্চিম দিকটায় আমরা এসে লঞ্চ ভিড়িয়েছি,এদিকে প্রায় দু’শো মিটার বালিয়াড়ির পর শুরু হচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। কাল সকালে ওই জঙ্গলের প্রান্ত ধরে অর্ধবৃত্তাকারে প্রায় সাত মাইল হেঁটে পৌঁছাতে হবে ড্রেক্সেলের কর্মকাণ্ডের জায়গায়। মাইকেল জানিয়েছে দ্বীপের ওই দিকটায় সমুদ্র থেকে খাড়াই পাহাড় উঠে গেছে, তাই সেখানে নামা যাবে না। আজ রাতটুকু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বালিয়াড়িতে পরপর তিনটি তাঁবু খাটানো হয়েছে। আমাদের পাশের তাঁবুটিতে রয়েছে সন্ডার্স আর চার্লস। আর তিন নম্বর তাঁবুতে মাইকেল একা আছে।

     একটা জিনিস আমি ভাবছিলাম যে এই দুর্গম এলাকা থেকে কীভাবে শহরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত ড্রেক্সেল আর তাঁর দলবল! কারণ, চার্লসের কাছে তার বাবার সঙ্গে নিয়মিত চিঠিপত্র লেনদেনের কথা শুনেছি। কাল এ ব্যাপারে মাইকেলকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

 

২৪শে অক্টোবর, সকাল সাড়ে সাতটা

 

     প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে জঙ্গল আর পাথুরে টিলা অতিক্রম করে এসে একটু সমতল জায়গা পেয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য দাঁড়ানো হয়েছে। সমুদ্রতটের দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রচুর নারকেল গাছ ছিল। বেশির ভাগ গাছের নীচে পড়ে আছে ঝুনো নারকেল। অবিনাশবাবু তারই গোটা তিনেক কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। এখন সেগুলো ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

     আজ সকালে সন্ডার্সের হাঁক ডাকে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। মাটি থেকে প্রায় দেড়শো ফুট ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা সি-প্লেন।

     ‘কী ব্যাপার বলো তো শঙ্কু, আমরা আসছি জানতে পেরে গ্রিমাল্ডি কি উড়ে গেল?’

     ‘আমার তা মনে হয় না। কারণ আমাদের আসার দিনক্ষণ গ্রিমাল্ডিকে জানানো হয়নি। তবে ওই প্লেনটি কে চালাচ্ছে তা আমরা বুঝতে না পারলেও, পাইলট নিশ্চয়ই আমাদের দেখতে পেয়েছে।’

     ‘লেমরিক বোধহয় সপ্তাহের বাজার আনতে গেল।’ পিছন থেকে মাইকেলের কথা শুনে বুঝতে পারলাম প্লেনটা তারও চোখে পড়েছে।

     আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘লেমরিক কে?’

     ‘গ্রিমাল্ডির সর্বক্ষণের লোক। বয়স বেশি নয়, চব্বিশ-পঁচিশ হবে। জাতে মুলাটো, কথা খুব কম বললেও সব কাজে চৌখস।’

     ‘সি-প্লেনটা কি গ্রিমাল্ডির নিজের?’

     ‘অবশ্যই। এর সাহায্যেই তো সপ্তাহে একবার করে আমাদের রসদ আনা হত। এই দ্বীপে খাবার জিনিস বলতে শুধু নারকেল আর কলা ছাড়া কিছু দেখি নি।’

     আইল্যান্ড থেকে লোকালয়ের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের মাধ্যমটা পরিষ্কার হল। সেইসঙ্গে এটাও বুঝলাম, অন্য সবকিছু নিষিদ্ধ হলেও অন্তত একটা আধুনিক যন্ত্র এই দ্বীপে ড্রেক্সেল মেনে নিয়েছিলেন। তবে আমাদের জন্য আলাদা করে রসদের প্রয়োজন হবে না। আমি সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষুধা-তৃষ্ণানাশক পিল বটিকা ইন্ডিকা নিয়ে এসেছি। এতে আমাদের পাঁচজনের হেসেখেলে কুড়িদিন চলে যাবে। অবিশ্যি আমার বিশ্বাস, আরবি পুঁথির ফর্মুলাটা পেলে দিনসাতেকের মধ্যেই পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিসটা আমি আবিষ্কার করে ফেলতে পারব। ধরে নিচ্ছি প্রয়োজনীয় সব উপাদানই গ্রিমাল্ডি সংগ্রহ করে রেখেছে। এখন সে আমাদের এ ব্যাপারে কতটা সাহায্য করতে চায় সেটাই দেখার।

     আপাতত অবিনাশবাবু যুদ্ধজয়ের ভঙ্গিতে দুটো ছাড়ানো নারকেল নিয়ে এগিয়ে আসছেন।

 

২৪শে অক্টোবর, বিকেল পাঁচটা

 

     আজ সকালের পর থেকে সারাদিন যা হল এইবেলা লিখে রাখি। এখন আমি বসে আছি ড্রেক্সেলের প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরির সামনে একটি গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো আসনে। আমার ঠিক পিছনেই অন্তত আড়াইশো-তিনশো বছরের প্রাচীন এক বিশাল বটগাছ। চারিদিকে এত মোটা মোটা ঝুরি নেমেছে যে আসল কাণ্ড কোনটা তা বুঝে ওঠাই মুশকিল। এই অঞ্চলে বটগাছের উপস্থিতি খুব বেশি দিনের নয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে মোটামুটি দেড়শো বছর আগে ভারতীয় বটগাছ এনে রোপণ করা হয়। এখন অবিশ্যি সেখানে প্রচুর বটবৃক্ষের রমরমা। কিন্তু এই গাছ যে তার বহু আগে থেকেই এই জনহীন দ্বীপে ছিল সেটা ড্রেক্সেল বা গ্রিমাল্ডি এখানে ঘাঁটি না গাড়লে জানা যেত না।

     সমুদ্র তীরবর্তী ম্যানগ্রোভের বসতি পার করে— তারপর প্রায় সত্তর মিটারের মত লম্বা লম্বা ইউক্যালিপটাসের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসার পথেই দেখেছি এই দ্বীপে প্রচুর পাখি আছে। বটগাছের মতোই বড় ঝাঁকড়া আরেক ধরনের গাছ দেখলাম, মাইকেল বলল তার নাম কোও ট্রি। একটা কথা মানতেই হবে— পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্য মিলে এমন একটি মনোরম প্রাকৃতিক অঞ্চল ড্রেক্সেল তার এক্সপেরিমেন্টের জন্য বেছে নিয়েছে যে মনে হয়, সত্যিই পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিস এমন জায়গাতেই তৈরি হওয়া মানায়।

     এখানে আমরা এসে পৌঁছেছি বেলা এগারোটার কিছু আগে। পাহাড়ের কোলে প্রায় পাঁচশো মিটার জায়গা জুড়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রিমাল্ডি আর ড্রেক্সেলের কর্মযজ্ঞ চলছে। অল্প দূরত্বে আছে ছোট বড় মিলিয়ে সাতটি গুহা। আর সর্বত্রই এমন একটা আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়াচ বাঁচানোর চেষ্টা রয়েছে যে বিভ্রম হয় বুঝি কোন আদিম প্রেক্ষাপটে বানানো সিনেমার সেটে এসে ঢুকে পড়েছি।

     এই জায়গায় আসার পরেই আমার মন বলল, এখানে আমরা ছাড়া এখন আর কোনও মানুষের অস্তিস্ব নেই। আমার অনুমান যে অভ্রান্ত তা অনতিবিলম্বেই প্রমাণিত হল। মাইকেল আমাদের প্রথমে নিয়ে গেল গ্রিমাল্ডি যেখানে থাকত সেই গুহাটিতে। সেখানে গ্রিমাল্ডির বসবাসের সবরকম চিহ্ন উপস্থিত থাকলেও মানুষটিকে পাওয়া গেল না। এরপর বাকি গুহাগুলো এবং আশপাশে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে আর গ্রিমাল্ডির নাম ধরে ডেকেও কোন সাড়া পেলাম না। তা হলে কি সন্ডার্সের অনুমানই সত্যি? আমাদের আসার খবর পেয়ে গ্রিমাল্ডি কি এখান থেকে পাততাড়ি গোটাল?

     যাই হোক, আমার প্রবল আগ্রহ ছিল ড্রেক্সেলের ল্যাবরেটরি নিয়ে। মাইকেলকে সেটা জানাতে সে আমাদের নিয়ে এল এই গুহাটার সামনে। একটা বড় পাথর দিয়ে গুহামুখটা বন্ধ করা ছিল। চার্লস আর মাইকেল দুজনে মিলে সেটা ঠেলে সরিয়ে দিলে আমরা গুহাটায় প্রবেশ করলাম।

     মাইকেল বলল, ‘প্রকৃতির কী আশ্চর্য সৃষ্টি দেখ। বাকি কোনও গুহামুখে কিন্তু আগল নেই; এই যে বড় পাথরটা বাইরে থেকে আমরা মাত্র দুজন ঠেলে সরিয়ে দিলাম, ভিতর থেকে দশজন মিলে ঠেললেও খোলা যাবে না—এমনভাবে খাপে খাপে আটকানো।’

     সামনেই দুটো বড় মশাল রাখা ছিল। একটা খাঁজে রাখা চকমকি পাথর ঠুকে মাইকেল সে দুটো জ্বালিয়ে নিল। একটা মশাল সে নিজে নিল, অবিনাশবাবু তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় মশালটা ধরে নিলেন। বললেন, ‘অলিম্পিকে মশাল নিয়ে ছুটতে দেখিচি। সে জিনিস যে এমন ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুরে পেয়ে যাব ভাবতে পারিনি।’

     আমি বললাম, ‘আপনি যেন এখন আবার ছুটতে যাবেন না। সাবধানে এগিয়ে আসুন।’

     সবার প্রথমে মাইকেল, তারপর চার্লস, আমি, অবিনাশবাবু আর সন্ডার্স এগিয়ে চললাম অপ্রশস্ত পথ দিয়ে। ছাদ মাঝে মাঝে এতটাই নীচে নেমে আসছে যে হেঁট হয়ে চলতে হচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকে গিয়ে একটা বেশ বড় ঘরের মতো জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম। ঘরটার আট ফুটের মতো উচ্চতা। আয়তনে প্রায় একটা টেনিস কোর্ট এঁটে যাবে এখানে। মোটামুটি মাঝখানে একটা বড় পাথর ছাদটাকে ধরে রেখেছে। ছোট বড় আরও কিছু পাথর দেওয়ালের দিকে সরিয়ে রাখা আছে। এত বড় প্রাকৃতিক গুহা বেশ দুর্লভ ব্যাপার।

     এই দ্বীপে নিউট্রিয়ার উপস্থিতি আগেই চোখে পড়েছে। মেঠো ইঁদুরের মতো দেখতে এই প্রাণীকে অনেকে কয়পু নামেও ডাকে। ইঁদুরের সঙ্গে এদের পার্থক্য হল কয়পুদের সামনের ও ওপরের দুটো দাঁত বেশ বড় আর বাঁকানো, সেইজন্য মুখটা অনেকটা সিন্ধুঘোটকের মতো দেখতে লাগে। এছাড়াও ওজনে একেকটা কয়পু অনেক সময় দশ কেজির মতও হয়। সে জিনিস যে এই গুহার ভিতরেও পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে তার নিদর্শন চারিদিকে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। ড্রেক্সেল এই গুহাটাকেই সাজিয়েছে ল্যাবরেটরি হিসেবে। মশালের আলোয় দেখলাম, যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম যা আছে তাতে একে পাঁচ-ছ’শো বছরের পুরনো গবেষণাগার হিসেবে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায়।

     যদিও খুব একটা পাবার আশা করিনি, তবু আমি অবিনাশবাবুর হাত থেকে মশালটা নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম যদি সেই আরবি পুঁথি এখানেই কোথাও রাখা থাকে। সেটা যে পাইনি তা বলাই বাহুল্য।

     চার্লস তার বাবার অন্তিম কর্মস্থলে এসে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে বুঝতে পারছি। আরবি পুঁথিটা শেষ পর্যন্ত না পাওয়া গেলে বা গ্রিমাল্ডির দেখা না পেলে আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে সেটা বুঝেও সে একবার আমার হাতটা ধরে বলল, ‘তা হলে কি বাবার শেষ কাজটা অসমাপ্তই থেকে যাবে?’

     ‘সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। আর গ্রিমাল্ডি ইতিমধ্যেই সেটা করে ফেলেছে কি না তাও আমাদের জানা নেই।’

     ‘সেটা যে আরও মারাত্মক।’

     গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পর চার্লস মাইকেলকে বলল, ‘বাবার সমাধির কাছে আমাকে একবার নিয়ে চলো।’

     ‘তোমার বাবার দেহ দেশে নিয়ে যাওয়া হয়নি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

     ‘না। বাবার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী এই দ্বীপেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।’

     মাইকেলকে অনুসরণ করে আমরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেলাম। একটা জলের ধারার ক্ষীণ শব্দ কানে আসছিল অনেকক্ষণ ধরে। বুঝতে পারছিলাম কাছে কোথাও পাহাড়ি ঝরনা আছে। ক্রমশ সেই শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠল। শেষে দেখলাম সেই ঝরনারই পাশে এক জায়গায় পাথর দিয়ে বেদি মতো করা হয়েছে। ওপরে একটা পাথরের ওপর জন ড্রেক্সেলের নাম আর জন্ম-মৃত্যুর তারিখ খোদাই করে লিখে রাখা হয়েছে।

     চার্লস এখানে এসে নতজানু হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। আমি, সন্ডার্স আর অবিনাশবাবু ঝরনার পাশে এসে দাঁড়ালাম।

 

     সন্ডার্স বলল, ‘কী ঠিক করলে শঙ্কু? এখন আমাদের কী করণীয়?’

     ‘গ্রিমাল্ডির এভাবে উধাও হয়ে যাওয়াটাই আমাকে ভাবাচ্ছে। যদি সে গবেষণায় সফল হয়ে যায় তা হলে আর এই দ্বীপে ফিরে আসবে কি না সন্দেহ আছে। আর যদি সাময়িকভাবে কোনও কাজে গিয়ে থাকে তা হলে ওর আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। গ্রিমাল্ডির গুহাতে তার পোশাক আশাক রয়েছে দেখলাম। কাজেই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই প্রবল।’

     ‘আর যদি সে আমাদের ফাঁকি দিতে চায়?’

     ‘তাতে আখেরে তার লাভ হবে বলে মনে হয় না। আমি গ্রিমাল্ডির জায়গায় থাকলে তো এতদূর এগিয়ে কাজ অসমাপ্ত রেখে এভাবে পালাতাম না।’

     ‘তা হলে একবার গ্রিমাল্ডির ঘরটা খুঁজে দেখলেই তো হয়। যদি ওখানেই সে পুঁথিটা কোথাও রেখে থাকে।’

     ‘কারও অনুপস্থিতিতে তার জিনিসপত্র ঘাঁটায় আমার ঠিক মন চায় না। বরং দু’দিন দেখা যাক। তার পরেও গ্রিমাল্ডি না ফিরলে সেটাই করতে হবে।’

     সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে অনেকক্ষণ। সন্ধে হয়ে এসেছে। মাইকেল যে গুহাটায় আগেরবার ছিল সেখানে ওর সঙ্গে চার্লস থাকবে। আমি, সন্ডার্স আর অবিনাশবাবু আরেকটা গুহায় কাটাব। এখানে তাঁবু খাটিয়েও থাকা যেত। কিন্তু গুহাবাসের মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা কেউ হারাতে চায় না।

 

২৫ শে অক্টোবর

 

     আজ সারাদিন চুপচাপ বসে থেকেই কাটল। মাইকেলকে সঙ্গে নিয়ে আমি ঘুরে ঘুরে ড্রেক্সেলের কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করলাম। ড্রেক্সেল এই জায়গাটাকে রীতিমতো ফার্ম হাউস বানিয়ে ফেলেছিল। মৌমাছি থেকে শুরু করে, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের চাষ তো রয়েছেই। একটা বাছুর সমেত গরুও আছে টাটকা দুধের জোগান দেওয়ার জন্য। এসবই এক্সপেরিমেন্টের কাজে লাগত। আমার সব দেখে মনে হচ্ছে কোন শক্তিশালী ভিটামিন বা এই জাতীয় কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল তারা। সন্ডার্সকে সে কথা জানাতে সে বলল, ‘দেখো হয়তো সর্বরোগনাশক বড়ি আবিষ্কারের কথাই লেখা আছে সে পুঁথিতে। এর থেকে সুন্দর জিনিস তো কিছু হতে পারে না।’

     ‘সেটা তো স্বর্ণপর্ণী গাছড়া ছাড়া সম্ভব নয়। তুমি তো জানোই সে গাছে এমন একটা উপাদান আছে যা সনাক্ত করা যায়নি। সেইজন্যেই পরীক্ষাগারে মিরাকিউরল তৈরি অসম্ভব।’

     ‘অন্য কোনভাবে সম্ভব হতে পারে না? প্রাচীনকালের চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক রহস্যময় ঔষধিতে রোগ নিরাময় করা হত। সেসব অনেক কিছুর এখন আর হদিশ পাওয়া যায় না।’

     ‘আবিষ্কার যাই হোক না কেন তার যে একটা মার্কেট ভ্যালু আছে সে ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত। নইলে গ্রিমাল্ডির মতো ধনকুবের টাকা ঢালতে রাজি হত না।’

     অবিনাশবাবু একটা গাছের তেকোনা ডাল কেটে গুলতির মতো বানিয়েছেন। সেটা দিয়ে পাখি মারার উদ্যোগ নিচ্ছেন দেখে মাইকেল বলল, ‘পাখি না মেরে একটা জ্যান্ত পাখির সুন্দর ছবি তুলতে পারলে মন কত ভাল হয়ে যায় দেখবেন। সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকে সে জিনিস।’

     ‘ইট ইস নট ফর কিল আ বার্ড। জাস্ট আ নস্টালজিয়া। ইন গিরিডি, হোয়েন আই ওয়াজ চাইল্ড, আই কিলড বার্ড বাই—কী যেন বলে গুলতিকে ইংরেজিতে— বাই দিস। বাট নাউ আই লাভ লিভিং বার্ডস।’

     অবিনাশবাবু অবিস্মরণীয় ইংরেজিতে তাঁর পক্ষীপ্রীতির কথা বোঝাতে চেষ্টা করছেন মাইকেলকে।

     আমি আর একবার ড্রেক্সেলের গবেষণাগারে গিয়ে সব জিনিস পরীক্ষা করে দেখলাম। রাসায়নিক বা অন্যান্য উপাদান যা কিছু আছে সবই অত্যন্ত চেনা জিনিস। আমার অনেক আশ্চর্য আবিষ্কারও এমন সহজলভ্য উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছে। আসল হল ফর্মুলা, অর্থাৎ পরিমাণ আর পদ্ধতি। কিন্তু সবার আগে জানা দরকার লক্ষ্য; অর্থাৎ কী বানাতে চাইছি।

     কাল সকালে গ্রিমাল্ডির ঘর তল্লাশি করে দেখতে হবে। যদি সেই ফর্মুলা না পাওয়া যায় তা হলে এই দ্বীপ ত্যাগ করা ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।

 

২৬ শে অক্টোবর, দুপুর আড়াইটে

 

     গ্রিমাল্ডি ফেরেনি। তার জিনিসপত্র ঘেঁটে সেই আরবি পুঁথিরও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। কাজেই ধরে নেওয়া যায় আবিষ্কারের ব্যাপারটা আমাদের থেকে গোপন করার উদ্দেশ্যেই সে ফর্মুলা সমেত পাততাড়ি গুটিয়েছে।

     চার্লস খুবই ভেঙে পড়েছে তার বাবার শেষ কাজটি এভাবে গ্রিমাল্ডির আত্মসাৎ করে নেওয়ার ঘটনায়। কিন্তু আমরা নিরুপায়। আমাদের হাতে এই চুরির কোনও প্রমাণ নেই।

     কাল ফিরে যাওয়া ঠিক করেছি।

 

২৬ শে অক্টোবর, সন্ধ্যা সাতটা

 

     অভাবনীয় ঘটনা। বিকেল চারটে নাগাদ গ্রিমাল্ডি আর লেমরিক ফিরে এসেছে। আমরা যে পথ দিয়ে এখানে এসেছি ওরা এল তার বিপরীত দিক দিয়ে। ওরা সি-প্লেনে আসায় সুবিধে হয়েছে, দ্বীপের পূর্ব দিকে জলে ল্যান্ডিং করে চড়াই ভেঙে আসতে হলেও সময় অনেক কম লেগেছে। গ্রিমাল্ডি এসেই সোজা আমার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘সরি শঙ্কু, তোমরা যে ড্রেক্সেল আইল্যান্ডে পৌঁছে গেছ সেটা জানার পরেও আমার ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল। আশা করি, এই দু’দিন তোমাদের কোন অসুবিধে হয়নি।’

     ফরসা রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেলেও গ্রিমাল্ডির চেহারায় একটা আলাদা আভিজাত্য রয়েছে। ব্যাকব্রাশ করা একমাথা সাদা চুল ও সুগঠিত শরীর দেখে তার সঠিক বয়স অনুমান করা মুশকিল।

     আমি গ্রিমাল্ডির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললাম, ‘কিন্তু তোমায় দেখে মনে হচ্ছে খুব অস্থির হয়ে আছ। এর মধ্যে বিশেষ কিছু ঘটেছে কি?’

     ‘বিশেষ কিছু কী বলছ— বিশ্বে সাড়া পড়ে যাবে এই আবিষ্কারের কথা প্রচার পেলে।’

     ‘তার মানে তুমি ড্রেক্সেলের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে পেরেছ?’

     ‘অসমাপ্ত কাজ কি না জানি না, তবে জনের পাওয়া সেই আরবি পুঁথিতে যে জিনিসের কথা বলা ছিল সেটা অবশ্যই আমি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।’ এই পর্যন্ত বলে গ্রিমাল্ডি চার্লসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি টু সে, তোমার বাবা সম্পূর্ণ ভুল পথে এগোচ্ছিল। ফলে যে জিনিস সে তৈরি করেছিল, সম্ভবত নিজের ওপর তার প্রয়োগেই জনের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর আমি সেই পুঁথিতে বর্ণনা করা ফর্মুলা নিয়ে প্রথম থেকে ভাবতে বসি। জিনিসটা আবিষ্কারের উপাদানগুলো স্পষ্টভাবে বলা থাকলেও পদ্ধতি লেখা আছে অনেকটা হেঁয়ালির মতো করে। জন সেই হেঁয়ালির ভুল বিশ্লেষণ করেছিল।’

     চার্লসের দিকে তাকিয়ে দেখলাম গ্রিমাল্ডির ওপর রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে তার অনুমান সঠিক প্রমাণ করে গ্রিমাল্ডি আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজেই নিতে চাইছে। আর ড্রেক্সেলকে খুন করে সেই দায়ভার তার গবেষণার ব্যর্থতার ওপরেই চাপাতে চাইছে। কিন্তু সেটা প্রমাণ করার কোনও উপায় নেই; আর এখন বিতর্কের সময়ও নয়। তাই আমি ইশারায় চার্লসকে উত্তেজিত হতে বারণ করলাম।

     ‘কিন্তু আবিষ্কারটা আসলে কী সেটা জানতে পারি? জন ড্রেক্সেল বলেছিলেন তিনি পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিস আবিষ্কার করতে চলেছেন।’ সন্ডার্স জিজ্ঞেস করল।

     ‘নিঃসন্দেহে সে জিনিস পৃথিবীর সবার কাছে সুন্দর। এমন জিনিস যাকে সুন্দরতম বলাতে কেউ দ্বিমত হবে না শঙ্কু।’ গ্রিমাল্ডি আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

     অবিনাশবাবু এমন সময় হাতে একটা কাগজের কার্ড নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছেন দেখলাম।

     ‘এই দেখুন মশাই, আপনার ওই মাইকেল— ব্যাটা ছবি তুলতে পারে না, আবার ফটোগ্রাফার হয়েছে! জাহাজে আমাদের ছবি তুলেছিল, সেটায় দেখুন আমি কীরকম বেঁকে দাঁড়িয়ে আছি আর চোখটাও বন্ধ। কী বিচ্ছিরি লাগছে—’

     হঠাৎ অবিনাশবাবুর খেয়াল হল, আমাদের দলে একজন নতুন ব্যক্তির আগমন হয়েছে। তিনি হকচকিয়ে চুপ করে গেলেন। ওঁর পিছন পিছন মাইকেলও হাসতে হাসতে ক্যামেরা হাতে আসছিল, সেও গ্রিমাল্ডিকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। গ্রিমাল্ডির সঙ্গে আমি এই ফাঁকে সন্ডার্স আর অবিনাশবাবুর পরিচয়পর্বটা সেরে ফেললাম। গ্রিমাল্ডি আমার হাতের গ্রুপ ছবিটা দেখিয়ে জানতে চাইল যে— কী নিয়ে অবিনাশবাবুর অভিযোগ।

     আমি হেসে ব্যাপারটা বলায় গ্রিমাল্ডি বলল, ‘একটা জিনিস খেয়াল কর, তুমি নিজে উপস্থিত আছ এমন কোনও গ্রুপ ছবি প্রথমবার দেখার সময় তোমার চোখ কিন্তু নিজেকেই দেখবে। অন্যদের ছবি যত সুন্দরই হোক না কেন, যদি নিজেরটা ভাল না আসে তবে সেই ছবি তোমার মনের মতো হবে না। অর্থাৎ’— সন্ডার্সের দিকে তাকিয়ে গ্রিমাল্ডি বলল—‘পৃথিবীতে মানুষ নিজেকেই সবথেকে সুন্দর দেখতে ভালবাসে। আর জনেরপুঁথিতে আছে মানুষের হৃতসৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার ও তাকে চিরস্থায়ী করে রাখার বন্দোবস্ত।’

     ‘তার মানে?’

     ‘তোমার এখন কত বয়স শঙ্কু? পঁয়ষট্টি, সত্তর?’

     ‘পঁচাত্তর।’

     ‘তুমি যদি এই মাইকেলের বয়সে ফিরে যেতে পার?’

     ‘অর্থাৎ ওই পুঁথিতে মানুষের যৌবন ফিরে পাওয়ার উপায় বলা আছে?’

     ‘শুধু ফিরে পাওয়াই নয়; অনন্ত যৌবন শঙ্কু! অনন্ত যৌবন!’—গ্রিমাল্ডি দৃশ্যতই বেশ উত্তেজিত।

     ‘ইটারনাল ইউথ—ইটারনাল ইউথ—’পাশ থেকে অবিনাশবাবুর ফিসফিসানি কানে আসছে।

     ‘কিন্তু তুমি এই দু’দিন কোথায় ছিলে?’ চার্লস কঠিনভাবে জিজ্ঞেস করল।

     ‘যৌবন ফিরে পাওয়ার উপাদান প্রস্তুত। বাকি আছে শুধু প্রয়োগ। জন এই জায়গাতেও ভুল করেছিল। শুনে অবাক হবে, সে জিনিস প্রয়োগের জন্য ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও ব্লাড ট্রান্সফিউশনের উল্লেখ আছে। কিন্তু সে ব্যাপারে যা পদ্ধতি বলা হয়েছে তার থেকে বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। প্রাচীন পদ্ধতিতে বরং সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। আমি জনের মতো ভুল করতে চাই না। তাই আমাকে শহরে যেতে হয়েছিল ব্লাড ট্রান্সফিউশনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনার জন্য।’

     ‘তবে রক্তও নিশ্চয়ই আনতে হয়েছে?’

     ‘উঁহু। ওই একটি ব্যাপারে পুঁথিকে অনুসরণ করতে হবে। এর জন্য চাই তাজা রক্ত। অর্থাৎ ব্লাড এক্সচেঞ্জ। যে নিজের যৌবন ফিরে পেতে চায় তার শরীরে প্রবেশ করবে কমবয়সি দাতার রক্ত। তবে সে রক্ত গ্রহীতার শরীরে প্রবেশ করার আগে তার সঙ্গে মিশে যাবে গবেষণালব্ধ উপাদান। আবার অন্যদিকে বয়স্ক ব্যক্তির রক্ত সেই উপাদানের সঙ্গে মিশে প্রবেশ করবে অল্পবয়সি মানুষটির শরীরে।’

     ‘দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ নিশ্চয়ই এক হতে হবে। সেটাও কি বলা আছে ওই প্রাচীন পুঁথিতে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

     ‘অবশ্যই। কিন্তু তখন তো এবিও কথাটার প্রচলন হয়নি। রক্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি উপাদানের মিল থাকতেই হবে এমন নির্দেশ আছে। আমি নিশ্চিত অ্যান্টিজেন আর অ্যান্টিবডির কথাই বলা হচ্ছে।’

     ‘তোমার এক্সপেরিমেন্টের জন্য তা হলে তো দুজন একই ব্লাড গ্রুপের মানুষও লাগবে।’

     ‘তাও প্রস্তুত আছে—আমার বয়স ছেষট্টি, আর লেমরিকের তেইশ। আমাদের রক্তের গ্রুপ একই, বি নেগেটিভ। মোটা টাকার বিনিময়ে লেমরিক এ ব্যাপারে রাজি হয়েছে। যদি এই এক্সপেরিমেন্টে আমার বা লেমরিকের ভালমন্দ কিছু হয়ে যায় তা হলেওর প্রাপ্য পারিশ্রমিক আর ক্ষতিপূরণ ওর পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে। এই দু’দিনে সেই ব্যবস্থাও করে এলাম। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমার গবেষণার শেষ ধাপ আমি কালই অতিক্রম করতে চাই। যেহেতু আমি নিজে এই পরীক্ষার অংশ, তাই আশা করি, ব্লাড ট্রান্সফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য তোমাদের কাছ থেকে পাব।’

     সন্ডার্স বলল, এই বিষয়ে ওর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। তাই কোনও অসুবিধে হবে না। লেমরিক আর গ্রিমাল্ডির সঙ্গে নিয়ে আসা যাবতীয় জিনিসপত্র ল্যাবরেটরি গুহাতে রাখা হয়েছে। চার্লস একদম চুপ করে আছে। গ্রিমাল্ডির ওপর প্রতিহিংসা মেটাতে সে না কোন বাগড়া দিয়ে বসে। আজ রাত্তিরে এমনিতেও আমার ঘুম আসবে না। তাই চার্লসের গুহার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বেশ বুঝতে পারছি কালকের দিনটা খুব উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে কাটবে।

 

২৮ শে অক্টোবর

 

     গ্রিমাল্ডির গবেষণা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। গতকাল ড্রেক্সেলের ল্যাবরেটরিতে পুঁথির বিবরণ অনুযায়ী গ্রিমাল্ডি আর লেমরিকের রক্ত বিনিময়ের পরে আজ অবধি গ্রিমাল্ডির দেহে কোনওরকম পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। এমনিতে দু’জনেই শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। কিন্তু গ্রিমাল্ডি মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েছে। এক্সপেরিমেন্ট ফলপ্রসূ না হওয়ায় লেমরিকও হতাশ। মাইকেলের কাছে সে নাকি আক্ষেপ করে বলেছে, পারিশ্রমিকের টাকাটা হয়তো আর পাওয়া যাবে না। শুধু চার্লসের মধ্যে একটা চাপা উৎফুল্ল ভাব দেখতে পাচ্ছি। সেটা বোধহয় গ্রিমাল্ডির ব্যর্থতার কারণেই। গ্রিমাল্ডি সফল হলে চার্লস যে খুব খুশি হত না সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

     আমি গ্রিমাল্ডির কাছ থেকে আরবি পুঁথিটা চেয়ে এনেছি। আদ্যোপান্ত একবার চোখ বোলানোর পরে মনে হচ্ছে, গ্রিমাল্ডি আর ড্রেক্সেল দুজনেই কোথাও একটা বড় ভুল করেছে। সেটা যে কী— তা এখনও বুঝতে পারিনি। তবে ফর্মুলাটা হেঁয়ালিতে পূর্ণ। এর সঠিক মর্মোদ্ধার করার জন্য একটু ভাবতে হবে। আমার মনে হয় তা একদিনের মধ্যেই আমি করে ফেলতে পারব। দেখা যাক কী হয়।

 

২৯ শে অক্টোবর

 

     অন্তত বুদ্ধির ধার বাড়ানোর জন্য যে যৌবনে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই সেটা প্রমাণিত হল। আমার এই পঁচাত্তর বছরের জীবনে অভিজ্ঞতা, অধ্যয়ন আর মেধার বলে তেরশোসালের প্রাচীন পুঁথির প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারাটাই আমার এই বক্তব্যের অকাট্য প্রমাণ বলে মনে করি।

     গতকাল দ্বিতীয়বার সেই ফর্মুলার ওপর চোখ বোলাতে শুরু করামাত্র আমি বুঝতে পারছিলাম, এই পুঁথির রচয়িতা যে প্রাচীন বৈজ্ঞানিক, তিনি সাহিত্যেও কম পারদর্শী ছিলেন না। আমাদের মঙ্গলকাব্যেও এমন দ্ব্যর্থক ভাষার প্রয়োগ আছে। অর্থাৎ একই ফর্মুলার মধ্যে দুটি আলাদা জিনিস প্রস্তুতের কথা লুকিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। ড্রেক্সেল আর গ্রিমাল্ডি দুজনেই সঠিক পথে তাদের গবেষণা চালিয়ে গেছেন। পার্থক্য একটাই, একই ফর্মুলা থেকে দুজন দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে দুই ভিন্ন জিনিস আবিষ্কার করেছেন। ব্যাপারটা আরেকটু সবিস্তারে বলা দরকার।

     ড্রেক্সেলের উদ্ধার করা এই পুঁথিতে মানুষের পুনর্যৌবন প্রাপ্তি আর যৌবন বা বয়সকে থামিয়ে রাখার দুটি আলাদা উপায় বলা আছে। গ্রিমাল্ডি প্রথম পথে এগিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সে কেন সফল হল না সেই ব্যাপারটা আমার কাছে এখনও ধোঁয়াশায় রয়েছে।

     কিন্তু যে মুহূর্তে বুঝতে পারলাম ড্রেক্সেলের আবিষ্কার ছিল দ্বিতীয় পথে, এবং সেই আবিষ্কার সে নিজের ওপর প্রয়োগ করেছিল, তক্ষুনি আমি প্রবল উৎকণ্ঠায় মাইকেলের গুহার দিকে ছুটলাম।

     মাইকেলকে দেখামাত্র আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ড্রেক্সেলকে কীভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল? কফিন বানানো হয়েছিল কি?’

     ‘কেন বলো তো?’

     ‘এখন প্রশ্ন করার সময় নয়, যা বলছি তার জবাব দাও।’

     ‘হ্যাঁ, কোও গাছের কাঁচা তক্তা দিয়ে কফিন তৈরি করা হয়েছিল।’

     ‘ড্রেক্সেলের মৃত্যু হয়েছিল তেরোই অক্টোবর। অর্থাৎ দু’সপ্তাহ আগে। যে হারে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে তাতে আশা করি সেই কফিনের অক্সিজেনেই এতদিন সে বেঁচে আছে। চার্লসকে নিয়ে শিগগির চলো। মাটি খুঁড়ে ড্রেক্সেলকে উদ্ধার করতে হবে।’

     ‘তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাবা এখনও বেঁচে আছে? বলো কী!’—চার্লস আমাদের কথোপকথন শুনতে পেয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

     ‘সব বলব, এখন আগে আমাদের ওই সমাধির কাছে যাওয়া প্রয়োজন। মাইকেল, তুমি লেমরিককে ডেকে নাও।’

     চারিদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। অরণ্যের রাত এমনিতেও বেশি কালো হয়। তার ওপর মেঘ করে এসেছে, টুপটাপ শুরু হয়েছে বৃষ্টি। এই অবস্থায় মশাল জ্বলবে না। আমার লুমিনিম্যাক্সের আলোই একমাত্র ভরসা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় একবার একটা তীক্ষ্ণ শব্দ শুনে অবিনাশবাবু আমার কোটটা কনুইয়ের কাছটায় খামচে ধরলেন।

     ‘ওটা পাখির ডাক অবিনাশবাবু। পাখির বাসায় হয়তো সাপ বা ধেড়ে ইঁদুর হানা দিয়েছে। আপনাকে তো আসতে বারণ করেছিলাম। গুহাতেই থাকতে পারতেন।’

     আইল্যান্ডে পৌঁছোনোর পরেই অবিনাশবাবু গাছের ডাল কেটে একটা বড় লাঠি বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেটা বাগিয়ে ধরে বললেন, ‘কী যে বলেন মশাই—এমন একটা সময় আপনার সঙ্গে না এসে বসে থাকব? এই জঙ্গলে তো বাঘ-ভাল্লুক নেই শুনলাম। আর থাকলেও আপনার ওই হনলুলু পিস্তলের সামনে সব ভ্যানিশ হয়ে যাবে। কাজেই ভয় কীসের?’

     অবিনাশবাবু বরাবর আমার অ্যানাইহিলিনকে হনলুলু বলেন কেন তা এখনও বুঝি না। যাই হোক, ড্রেক্সেলের সমাধির পাশে পৌঁছে লেমরিক, চার্লস আর মাইকেলের তৎপরতায় পাথর সরানো শুরু হল। আমি, সন্ডার্স আর অবিনাশবাবুও হাত লাগালাম। অবশেষে মাটি খুঁড়ে কফিন বার করে ওপরে তোলা হল। ভাগ্যিস এই ক’দিনের মধ্যে আগে বৃষ্টি হয়নি। কফিনের ডালা খুলে যা দেখা গেল তাতে সবাই বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেও আমার কাছে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কফিনের মধ্যে অবিকৃত শুয়ে আছেন জন ড্রেক্সেল।

     ওই অবস্থাতেই পালা করে চারজন চারজন ধরাধরি করে কফিনশুদ্ধু ড্রেক্সেলকে নিয়ে আসা হল বড় গুহাটার মধ্যে। এবার শুরু হল আমার কাজ। যে ওষুধ প্রয়োগে ড্রেক্সেলের এই অবস্থা তার প্রভাব দূর করার ওষুধের ফর্মুলাও ছিল সেই পুঁথিতে। অবশ্যই দ্ব্যর্থকভাবে। সব উপাদানই হাতের কাছে মজুত ছিল। সারা রাতের চেষ্টার পরে ভোরের দিকে ড্রেক্সেলের খুব ক্ষীণ পালস রেট পাওয়া গেল। আরও ঘণ্টা দুয়েক পরে ক্রমে সেই ছন্দ অনেকটাই বাড়ল। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। ঠিক সকাল সাতটা চোদ্দো মিনিটে ড্রেক্সেল চোখ মেলে তাকালেন। আটটার সময় উঠে বসলেন। তারপর আমার নির্দেশে তাঁকে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ানো হল।

     ‘এবার বলো, তুমি কীভাবে বুঝলে যে বাবার মৃত্যু হয়নি?’

     গুহার বাইরে উজ্জ্বল আলোয় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা চার্লস আমায় করল বটে, কিন্তু আমি জানি সবার মনেই এখন ওই প্রশ্নটাই ঘুরছে। তাদের কৌতূহল নিরসন করা দরকার। আমি ওই আরবি পুঁথিতে দু’রকম অর্থে লেখা দু’রকম জিনিস তৈরির ব্যাপারটা ভেঙে বললাম।

     ‘জন ড্রেক্সেল আসলে কোন ট্রপিকাল ব্যারামে আক্রান্ত হননি, তিনি হাইবারনেশনে চলে গিয়েছিলেন।’

     ‘হাইপার—না কী যেন বললেন? এর মানে কী?’ অবিনাশবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

     ‘সাপের শীতঘুম হয় জানেন তো? এই অবস্থায় প্রাণীর হৃদস্পন্দন কমে যায়, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতি ধীর হয়ে আসে। বিপাকক্রিয়া চলে অতি মন্থর গতিতে—অর্থাৎ শরীর থেকে খুব অল্পই শক্তি নির্গত হয়। কাজেই ক্ষয় হয় সামান্য পরিমাণে। ড্রেক্সেলের তৈরি করা এই ওষুধের ফলে মানুষ খুব গভীর হাইবারনেশনে চলে যায়। অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না যে সেই ব্যক্তি জীবিত আছে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে পরীক্ষা করলে হয়তো বোঝা যেত, কিন্তু এ দ্বীপে সে সুযোগ কোথায়। হিউম্যান হাইবারনেশন নিয়ে বর্তমানেও অনেক গবেষণা হয়েছে কিন্তু সেভাবে সফলতা আসেনি। অথচ কোন প্রাচীনকালের পুঁথিতে বর্ণিত এই উপায়ে মানুষকে অনেক বছর পর্যন্ত ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়। যেহেতু বিপাক ক্রিয়ার হার প্রায় বন্ধ হয়ে যায় তাই মানুষের বয়সও বাড়ে না। আমি যদি অ্যান্টিডোট প্রয়োগে ড্রেক্সেলের ঘুম না ভাঙাতাম তবে তিনি একশো-দেড়শো বছর পরে আজকের বয়সেই জেগে উঠতেন। কিন্তু কফিনের মধ্যে আবদ্ধ জায়গায় বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারতেন না। খুব ধীরে হলেও তো তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল।’

     ‘তা হলে আমার গবেষণায় ভুল কোথায় হল? আমি কেন সফল হলাম না?’ অস্থিরভাবে বলে উঠল গ্রিমাল্ডি।

     ‘সেটা নিয়ে আমি চিন্তা করার অবকাশ পাইনি। হেঁয়ালির ব্যাপারটা বোঝার পরেই আমার প্রথম কর্তব্য ছিল ড্রেক্সেলকে কফিন থেকে উদ্ধার করা। ফর্মুলার প্রথম অর্থটা আমায় আবার বিশ্লেষণ করতে হবে। আরেকটু ধৈর্য রাখো গ্রিমাল্ডি।’

     গ্রিমাল্ডিকে এ কথা বললেও তার ভুলটা যে কোন জায়গায় সেটা আমি মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছি। দাতা ও গ্রহীতার রক্তের যে অচেনা দুটি উপাদান বা বৈশিষ্ট্য ফর্মুলায় মেলানোর কথা বলা হয়েছে তা অ্যান্টিজেন আর অ্যান্টিবডি নয়। একটা বৈশিষ্ট্য অবশ্যই রক্তের গ্রুপ। কারণ গ্রুপ না মিললে ব্লাড ট্রান্সফিউশনে মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু অন্য উপাদানটাই আমাকে ভাবাচ্ছে।

 

৩০ শে অক্টোবর

 

     হেঁয়ালির সম্পূর্ণ অংশই এখন জলের মতো পরিষ্কার। আমার চোখের সামনে তার ফল দেখতে পাচ্ছি। একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধ ফিরে যাচ্ছেন তার পঁচিশ বছরের যৌবনে। সমগ্র প্রক্রিয়াটি শেষ হতে আরও ঘণ্টাখানেক লাগবে। এই সময়টায় কিছুই করার নেই। তাই ডায়রি খুলে বসেছি।

     আরবি পুঁথির রহস্য উদ্ঘাটনে অবিনাশবাবুরও যে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়ে গেল তা না বললেই নয়।

     কাল রাতে যখন সেই পুঁথির হেঁয়ালি সমাধানে হিমশিম খাচ্ছিলাম, সেই সময় অবিনাশবাবু বললেন, ‘আগেকার দিনের মানুষরা এমনিতেও অনেক বেশিদিন বাঁচত। এখন ভেজাল খেয়ে খেয়ে আমাদের আয়ু কমে গেছে, বুঝলেন মশাই।’

     মনঃসংযোগের ব্যাঘাত ঘটায় আমি একটু বিরক্তভাবেই বললাম, ‘এই তথ্য আপনি কোথায় পেলেন?’

     ‘আমাদের রামায়ণ মহাভারতেই তো কত উদাহরণ রয়েছে। হনুমান তো শুনি এখনও বেঁচে আছে।’

     ‘রামায়ণ মহাভারত হল কাব্য, কল্পনা। এদের কোন হিস্টোরিকাল এভিডেন্স নেই।’

     ‘বলেন কী! সব তা হলে মিথ্যে? এই যে আপনি যৌবন ফিরে পাওয়ার ফর্মুলা আবিষ্কার করার চেষ্টায় মাথার অবশিষ্ট ক’গাছা চুল ছিঁড়ছেন, ও জিনিসও তো আমাদের পুরাণে সেই কবে থেকে লেখা আছে।’

     ‘বটে!’

     ‘কেন, আপনি যযাতির গল্প পড়েন নি—যে কিনা দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের অভিশাপে বুড়ো হয়ে গেছিল। পরে আবার তার নিজেরই ছেলে পুরুর যৌবন ধার নিয়ে ইয়ং হয়ে যায়।’

     আমি পুঁথি থেকে চোখ তুলে অবিনাশবাবুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। এত সহজ একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছিলাম না! রক্তের দ্বিতীয় যে উপাদান মেলানোর কথা বলা হয়েছে সেটা অবিনাশবাবুর এই কথাতে বিদ্যুৎঝলকের মতো আমার মাথায় খেলে গেল।

     আমি সোল্লাসে বলে উঠলাম, ‘জিন, অবিনাশবাবু জিন।’

     ‘না, না। জিন-টিন হুরি-পরির গল্প আমিও বিশ্বাস করি না, কিন্তু—’

     ‘এ জিন সে জিন নয়। এ হল বংশগতির ধারক ও বাহক। আরও ভেঙে বলতে গেলে,যে দু’জন মানুষের মধ্যে রক্ত বিনিময় করতে হবে তাদের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ডিএনএ-র মিল থাকাও আবশ্যিক।’

     অবিনাশবাবু কতটা বুঝলেন জানি না। আমি অবিলম্বে ড্রেক্সেল আর গ্রিমাল্ডিকে ডেকে আমার মতামত জানালাম।

     গ্রিমাল্ডি শুনে বলল, ‘তাহলে বলতে হয় আমার আবিষ্কারে কোনও ত্রুটি নেই, মানুষ নির্বাচনে ভুল হয়েছিল।’

     ‘এই মুহূর্তে সেটা প্রমাণ করার কোন উপায় দেখছি না।’

     ‘উপায় অবশ্যই আছে।’ চার্লসের কথায় সবার নজর ঘুরে গেল তার দিকে—‘আমার আর বাবার দু’জনেরই রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। আর ডিএনএ-র মিল যে থাকবে সেটা বলাই বাহুল্য।’

     ড্রেক্সেল উদ্বিগ্নভাবে বলে উঠল, ‘কিন্তু গবেষণায় কোনও ভুল থেকে গেলে যদি তোমার কোন ক্ষতি হয়ে যায় সেটা আমি মেনে নিতে পারব না।’

     ‘সে সম্ভাবনা অবশ্য নেই বললেই চলে।’ আমি বললাম—‘কারণ ইতিমধ্যে সে ওষুধ মিশ্রিত রক্ত বিনিময় করা হয়েছে গ্রিমাল্ডি আর লেমরিকের শরীরে। ফর্মুলার নির্দেশ অমান্য করে ব্লাড এক্সচেঞ্জ করার কোন কুফল আছে কি না জানি না, কিন্তু দুজনেই এখনও পর্যন্ত দিব্যি বহাল তবিয়তে আছে।’

     ঠিক হল পরের দিন সকালে বাবা আর ছেলের রক্ত বদল করা হবে। এখন সেই প্রক্রিয়াই চলছে। দু’জনকে অল্প পরিমাণে আমার তৈরি ঘুমের বড়ি সমনোলিন দিয়েছিলাম, যাতে এই সময়টা নিরুদ্বিগ্ন থাকে। তাই তারা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। চার্লসের শয্যার পাশ থেকে সন্ডার্স আমাকে ডাকছে। মনে হয় কোনও অস্বাভাবিকতা দেখতে পেয়েছে।

 

     অবাক কাণ্ড! এ যেন সত্যিই যযাতির গল্পের পুনরাবৃত্তি হল। আড়াই ঘণ্টা আগে সন্ডার্সের ডাকে লেখা বন্ধ করে উঠে গিয়ে চার্লসের পাশে গিয়ে দেখলাম তার মধ্যে এক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। মাথার চুল অনেক ঝরে গেছে, চামড়া বেশ খসখসে হয়ে গেছে, ঠোঁট আর কানের লতি অনেকটা ঝুলে পড়েছে। যেন তার বয়স আরও পঁচিশ বছর বেড়ে গেছে। ওদিকে ড্রেক্সেলের চেহারায় যে যৌবনের জেল্লা ফিরছে সে তো আগেই বলেছি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে যা দাঁড়াল তা হল এই—পরীক্ষার শেষে দু’জনের শুধু রক্ত বদলই নয়; বরং তাদের বয়সেরও বিনিময় হয়ে গেল।

     জন ড্রেক্সেলকে এখন অনেকটাই আমাদের পরিচিত চার্লস ড্রেক্সেলের মতো দেখতে লাগছে। অন্যদিকে চার্লসকে দেখে মনে হচ্ছে সে সত্তর বছরের বিখ্যাত বায়োকেমিস্ট জন ড্রেক্সেল।

     পরীক্ষা সফল হওয়ায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি ঠিক কথা, কিন্তু সেইসঙ্গে একটা অবসন্নতাও গ্রাস করেছে। তা হলে একজন মানুষের যৌবন ফিরে পেতে গেলে আরেকজনের যৌবন বলিদান দিতে হবে! এ জিনিস তো মানুষের হাতে এলে অপব্যবহার অনিবার্য।

     ড্রেক্সেল অনেকক্ষণ চুপ করে কিছু ভাবছিল। একসময় আমার কাছে এসে বলল, ‘শঙ্কু, নিজের ছেলের যৌবনের বিনিময়ে আমি জোয়ান হতে চাই না। তুমি অ্যান্টিডোট ব্যবহার করে আমাদের আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাও।’

     চার্লস তার বাবার কথা শুনতে পেয়ে বলল, ‘কিন্তু বাবা, এক্সপেরিমেন্ট যে সফল তার প্রমাণ তো রাখতে হবে। তোমার এতদিনের অধ্যাবসায়, সবার এত পরিশ্রম, এত কর্মকাণ্ড—’

     ‘লোকচক্ষুর আড়ালে এই এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে। কাজেই আমাদের কোন ব্যর্থতার খবর প্রকাশ পাবে না। ওই পুঁথিকে এই দ্বীপেই আমরা নষ্ট করে দিয়ে যাব।’

     ‘কী বলছেন! এমন আবিষ্কার বরবাদ করে ফেলবেন?’ মাইকেল বিস্ময়ে বলে উঠল।

     ‘হ্যাঁ। পৃথিবীর সুন্দরতম নয়, বরং কুৎসিত এই আবিষ্কার। নিজের সন্তানের অমঙ্গল কোন বাবা-মা কামনা করতে পারে না। আর করলেও সেটা মানবজাতির পক্ষে দুর্ভাগ্য। আশা করি আমার সঙ্গে গ্রিমাল্ডি, সন্ডার্স আর শঙ্কুও একমত হবে।’

     গ্রিমাল্ডি ও সন্ডার্স সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। আমি বললাম, ‘একই দিনে দু’বার ব্লাড এক্সচেঞ্জ ঠিক হবে না। আজকের দিনটা বাদ দিয়ে কাল আমি বিপরীত প্রক্রিয়ায় তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব।’

     মনে মনে ভাবলাম হাজার বছর যৌবন যাপনের পর যযাতিও যে তার ছেলের যৌবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন; কারণ তিনি বুঝেছিলেন মানুষের কামনা-বাসনার কোন শেষ নেই।

 

৩১ শে অক্টোবর, বিকেল

 

     আমাদের মনের অবস্থা বর্ণনা করার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। প্রথমেই জানিয়ে রাখি বাবা আর ছেলে তাদের আগের বয়স ফিরে পেয়েছে। কিন্তু বিপদ এসেছে অন্য দিক দিয়ে।

     আজ সকালে ড্রেক্সেল আর চার্লসের দ্বিতীয়বার বয়স বদল করতে ল্যাবরেটরিতে আমরা সবাই জমায়েত হই। তারপর সব আয়োজন সম্পূর্ণ করে শুরু হয় ব্লাড ট্রান্সফিউশন। উভয়ের রক্ত অ্যান্টিডোটের সঙ্গে মিশে প্রবেশ করছে অপরজনের দেহে। আমি, সন্ডার্স আর গ্রিমাল্ডি উদ্বিগ্ন চোখে পর্যবেক্ষণ করছি সে ঘটনা।

     এমন সময় অবিনাশবাবু বলে উঠলেন, ‘ও মশাই, গুহার দরজাটা কে বন্ধ করে দিল বলুন তো? আমার একটু বাইরে যাওয়ার দরকার।’

     সত্যিই দেখা গেল গুহামুখের পাথরটা কেউ বাইরে থেকে ঠেলে বেরনোর রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। ভিতরে শুধু মাইকেলের অনুপস্থিতি দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এই কীর্তি তারই। সন্ডার্স আর অবিনাশবাবু মিলে চেষ্টা করছিল পাথরটা ঠেলে সরানোর। কিন্তু সেটা এক চুলও নাড়ানো গেল না।

     আমি বললাম, ‘বৃথা চেষ্টা সন্ডার্স, এই পাথর শুধু বাইরে থেকেই পাশ দিয়ে ঠেলে সরানো সম্ভব। ভিতর থেকে সোজাসুজি ঠেলে সরানো যাবে না।’

     সন্ডার্স রাগে গজরাতে গজরাতে বলল, ‘বাইরে কিন্তু লেমরিকও আছে। একমাত্র সে আমাদের উদ্ধার করতে পারে।’

     ‘লেমরিকও যে মাইকেলের সঙ্গে যোগ দেয়নি তার নিশ্চয়তা কী।’ গ্রিমাল্ডি বলল, ‘আমাকে এই গুহায় আটকে রেখে মেরে ফেলতে পারলে চুক্তিমতো ক্ষতিপূরণের সব টাকাই যে সে পেয়ে যাবে।’

     ‘কিন্তু মাইকেল ব্যাটা এ কাজ করল কেন?’ অবিনাশবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

     ‘সেটা বোঝা আর এমন কী কঠিন!’ আমি বললাম, ‘আমাদের এই আবিষ্কার যে নষ্ট হয়ে যাক তা মাইকেল চায়নি। আরবি পুঁথিটা আমার গুহাতেই রাখা আছে আর এই আবিষ্কারের পদ্ধতি এবং উপকরণ সব তার জানা। এবার নিজে সেটা তৈরি করে আবিষ্কারের কৃতিত্ব দাবি করবে।’

     ‘কী শয়তান! কী শয়তান!’

     ‘এখন আমাদের এই গুহা থেকে অন্য কোনও উপায়ে বেরনোর রাস্তা খুঁজতে হবে। অনেক সময় এমন প্রাকৃতিক গুহার দুটো মুখ থাকে। এখানেও তেমন কিছু আছে কি না দেখতে হবে।’

     বদ্ধ গুহার মধ্যে মশাল জ্বেলে রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে সকলে মারা পড়ব। কী ভাগ্যে লুমিনিম্যাক্সটা এনেছিলাম এক্সপেরিমেন্টের কাজে উজ্জ্বল আলোর প্রয়োজন হবে বলে। আপাতত সেই আলোতেই কাজ চলছে। কিন্তু তার মেয়াদও তো অনন্তকাল নয়। গত দু-তিন ঘণ্টায় আঁতিপাঁতি করে খোঁজা হয়েছে। দেওয়ালের দিকের আলগা পাথর ঠেলে দেখা হয়েছে। কিন্তু অন্য কোন রাস্তা পাওয়া যায়নি। ড্রেক্সেল আর চার্লস আগের অবস্থায় ফিরে আসার পর এখন শারীরিকভাবে সুস্থ। কিন্তু খাদ্য আর পানীয় ছাড়া কীভাবে সবার সুস্থ থাকা সম্ভব হবে সেটা চিন্তার বিষয়।

***

     আজ কত তারিখ বা এখন বাইরে দিন না রাত কিছুই জানি না। অবিনাশবাবু আর ড্রেক্সেল প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন। এক্সপেরিমেন্টের কাজে কিছু মধু আর দুধ রাখা ছিল। সেটা ভাগাভাগি করে এতদিন চলেছে; আর অবশিষ্ট নেই। লুমিনিম্যাক্সের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। তাই খুব দরকার ছাড়া জ্বালানো হচ্ছে না। এরপর অনন্ত অন্ধকার নেমে আসবে।

     গ্রিমাল্ডি খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। মনে হয় প্রচণ্ড ভয় আর দুশ্চিন্তা ওকে গ্রাস করেছে।

     এর মধ্যে একদিন সন্ডার্সের চোখে পড়ল একটা কয়পু একটা বড় পাথরের পিছনে দেওয়ালের আড়ালে চলে গেল। সবাই মিলে হাত লাগিয়ে পাথরটা সরানোর পর একটা ফাটল চোখে পড়ল। কিন্তু সেটা এতটাই অপ্রশস্ত যে কোন মানুষ তার মধ্যে দিয়ে গলে যেতে পারবে না। হয়তো এটাই আমার শেষ ডায়রি লেখা। মনে হয় এই গুহার অন্ধকারেই আমাদের সবার মৃত্যু হবে। ভবিতব্যকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।

১২ ই নভেম্বর, সান ফ্রান্সিসকো

     আমি যে বেঁচে আছি আর ডায়রি লিখতে পারছি সেটা আমার বরাতের জোর। আগামীকাল দেশে ফেরার বিমান ধরব। ভাগ্য সহায় না হলে ড্রেক্সেল আইল্যান্ডেই সবার মৃত্যু অনিবার্য ছিল। বাঁচার আশা যে প্রায় ত্যাগ করে ফেলেছিলাম সেটা বলাই বাহুল্য।

     গুহার মধ্যে দিনরাতের হিসেব ছিল না। অবসন্ন অবস্থায় গুহার মেঝেতেই সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে ছিলাম। একসময় পায়ের ওপর দিয়ে কিছু একটা চলে যাওয়ার অনুভূতি হল। একটু পরে সন্ডার্সের নড়াচড়াও টের পেলাম। ক্ষীণ কন্ঠস্বরে সে বলে উঠল, ‘এরা কি ভেবেছে আমরা মরে গেছি? তাই ভোজন সারতে এসেছে?’

     কয়পু যে নিরামিষাশী প্রাণী তা আমি জানি। কিন্তু অনতিবিলম্বেই গুহার মধ্যে অন্তত খান পনেরো কয়পুর ছোটাছুটি টের পেলাম। এরা হঠাৎ এত চঞ্চল হয়ে উঠল কেন। লুমিনিম্যাক্সের আলো ফুরিয়ে গেছে। তাই এরা কোথায় যাচ্ছে দেখার উপায় নেই।

     সন্ডার্স আবার জিজ্ঞেস করল, ‘শুনতে পাচ্ছ শঙ্কু?’

     কিছুক্ষণ ধরে আমিও একটা মৃদু কুলকুল শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন জল বয়ে চলেছে কোথাও। কিন্তু শব্দের উৎস যে ঠিক কোথায় সেটা বুঝতে পারছিলাম না।

     আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। মাথাটা অল্প টলে গেল। আবার একটা কয়পু পায়ের ওপর দিয়ে ছুটে গেল। সেই জলের শব্দ এখন বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কান খাড়া করে শব্দের উৎস বুঝতে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গুহার দেওয়ালের দিকে এগোতে লাগলাম। একবার কারও গায়ে হোঁচট খেলাম।

     চার্লস জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’

     আমি নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে পা ঘষে ঘষে যেদিক থেকে শব্দটা আসছে গুহার সেদিকের দেওয়ালে গিয়ে কান পাতলাম। পাথরে কান পাততে শব্দটা আরও জোরাল হল। এবারে আমি ওই অবস্থাতেই দেওয়ালে কান ঠেকিয়ে এগিয়ে চললাম শব্দের সঠিক উৎসের সন্ধানে। এক জায়গায় এসে মনে হল ঠিক সেখানে দেওয়ালের উলটো পিঠ দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে। আমি নিচু হয়ে হাতড়ে হাতড়ে একটা মাঝারি মাপের পাথর নিয়ে গুহার দেওয়ালে সেই জায়গায় আঘাত করলাম। ঢপ ঢপ করে শব্দ হল।

     আমি গলা তুলে বললাম, ‘সন্ডার্স এদিকে এসো একবার।’

     আর ঠিকতখনই জলের শব্দটা ছাপিয়ে একটা গুড়গুড় আওয়াজ ভেসে এল। দেখতে দেখতে সেই আওয়াজ বেড়ে গিয়ে কানে তালা ধরার উপক্রম হল। যেন গুহার দেওয়ালের বাইরে প্রলয় কাণ্ড চলছে।

     সন্ডার্স আর চার্লস আওয়াজ লক্ষ করে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সন্ডার্স আমার কাঁধটা ধরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রলয়ঙ্কর সেই আওয়াজ ছাপিয়ে সন্ডার্সের কথার একটা বর্ণও আমি বুঝতে পারলাম না। নিঃসীম অন্ধকারে তিনজন মানুষ একে অপরকে ধরে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগলাম।

     কতক্ষণ ওইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। এক সময় যেমন হঠাৎ আওয়াজটা শুরু হয়েছিল তেমনি হঠাৎ করেই সেটা থেমে গেল। আরও কিছুক্ষণ আমরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে নড়তে পারলাম না। কানে তালা ধরে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর মানসিকভাবে আমি একটু ধাতস্থ হলাম। আবার সেই মৃদু কুলকুল ধ্বনিটা শুনতে পাচ্ছি। এত বড় ঘটনার পরেও গ্রিমাল্ডি, ড্রেক্সেল আর অবিনাশবাবুর কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। ওরা বেঁচে আছে তো?

     ‘সন্ডার্স, দেখো তো মশালটা পাও কি না।’

     ‘কী হবে?’

     ‘একটু আলো দরকার।’

     ‘দাঁড়াও। আমি জানি চকমকি পাথর আর মশাল দুটো নিভিয়ে কোথায় রাখা হয়েছিল।’

     ‘একটা মশাল জ্বাললেই চলবে।’

     সন্ডার্স আন্দাজে গুহার অন্যদিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে গুহামুখের দিক থেকে চকমকি ঠোকার শব্দ পেলাম। তারপরে একটা মশাল হাতে সন্ডার্সকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। অনেকক্ষণ নিকষ অন্ধকারে থাকার পর মশালের আলোতেও তাকাতে প্রথমে অসুবিধে হচ্ছিল। সেই আলোতে আমি আর চার্লস দেখলাম আমাদের দলের বাকি তিনজন নিঃসাড়ে পড়ে আছে। আমি এগিয়ে গিয়ে একে একে সবাইকে পরীক্ষা করে দেখলাম তিনজনেই বেঁচে আছে। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে পারবে জানি না।

     এবারে আমি আবার ফিরে এলাম সেই জায়গায় যেখান থেকে জলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

     আমি সেখানে গুহার দেওয়ালে হাত বুলিয়ে বললাম, ‘এখানে পাথর কিন্তু নিরেট নয়। দেওয়ালের ওপারে কোন সুড়ঙ্গ থাকলেও থাকতে পারে। আর জল বইছে মানেই সেই জল সুড়ঙ্গপথে বাইরে যাবে। এই দেওয়ালটা যদি ফাটানো যায় কোনভাবে—তা হলে দেখা যেত সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে মানুষও যেতে পারবে কি না।’

     সন্ডার্স উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘যদি নয়, শঙ্কু। ফাটাতেই হবে। বাঁচার এটাই শেষ উপায়।’

     তারপরই সে আর চার্লস দুটো বড় পাথর নিয়ে দেওয়ালে এলোপাথারি মারতে লাগল। দেওয়ালের পাথর কতটা ভাঙল বোঝা গেল না, কিন্তু একটু পরেই তাদের হাতের পাথর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। দুজনে এই অল্প পরিশ্রমেই হাঁপাতে লাগল।

     আমি বললাম, ‘এভাবে হবে না। লোহার তৈরি হাতুড়ির মতো কোন জিনিস দরকার।’

     ‘আছে, আছে।’ এই বলে চার্লস ছুটে গিয়ে গবেষণার সরঞ্জামের মধ্যে রাখা একটা বেশ বড় হামানদিস্তার নোড়াটা নিয়ে এল।

     আমি দেওয়ালের মধ্যে একটা জায়গায় নির্দেশ করে বললাম, ‘সবাই একসঙ্গে নয়। একজন একজন করে ঠিক এই জায়গাটাতেই আঘাত করতে হবে।’

     পাথরে লোহা ঠোকার শব্দ বদ্ধ গুহার মধ্যে বহুগুণ হয়ে গুমগুম করতে লাগল। থেকে থেকে আগুনের ফুলকি ঠিকরে উঠছে। বাঁচার অন্তিম লড়াই হিসেবে ক্লান্ত অবসন্ন দেহেও আমরা পালা করে দেওয়াল ফাটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। একসময় সত্যিই একটা বড় পাথরের অংশ আলগা হয়ে বাইরের দিকে ছিটকে পড়ল। সেই জায়গায় একটা ছয় ইঞ্চির মতো ব্যাসের গোলাকার গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দ্বিগুণ উৎসাহে আঘাতের পর আঘাত করে চললাম। এবারে আর বেশি বেগ পেতে হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মানুষ গলে যাওয়ার মত বড় হয়ে গেল সেই গর্ত। সন্ডার্স মাথা ঢুকিয়ে একবার দেখে নিয়ে গুঁড়ি মেরে দেওয়ালের ওপাশে চলে গেল। তারপর সে আমার নাম ধরে ডাকল, ‘শঙ্কু, চলে এস।’

     আমি আর চার্লস সেই পথে বেরিয়ে এসে দেখলাম কোন সুড়ঙ্গ নয়, আমরা একদম রাতের অন্ধকারে খোলা আকাশের নীচে চলে এসেছি। পাহাড়ের গায়ে একটা চাতালের মতো খাঁজ, সেই খাঁজে আমরা দাঁড়িয়ে।

     অঝোরে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। ডানদিকে হাতখানেক দূরত্বে ঝরছে পাহাড়ি ঝরনা। বৃষ্টিতে তার রূপ প্রবল। এ আমাদের পরিচিত জায়গা। এখানেই ড্রেক্সেলকে মৃত মনে করে সমাধি দেওয়া হয়েছিল।

     কিন্তু সে জায়গার এ কী অবস্থা! চার্লস আর সন্ডার্সের দিকে তাকিয়ে দেখি তারাও আমার মত বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেছে। আমাদের সামনে পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় তিরিশ চল্লিশ ফুট চওড়া এক রাস্তার সৃষ্টি হয়েছে। যেন একশো পাল উন্মত্ত হাতি প্রবল আক্রোশে সেই রাস্তার মধ্যে দিয়ে যাবতীয় গাছপালা পাথর পাহাড় লণ্ডভণ্ড করে নিয়ে চলে গেছে।

     ‘কী মনে হচ্ছে শঙ্কু?’ সন্ডার্স জিজ্ঞেস করল।

     ‘এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। গত দু-তিন দিন এক নাগাড়ে এরকম প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের ওপরে কোথাও জল জমে ছিল। সেই জমা জলের চাপে একসময় পাথুরে বাঁধ ভেঙে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা হড়পা বান বয়ে গেছে এখান দিয়ে। গুহার মধ্যে আমরা যে ভীষণ শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম তা সেই প্রবল জলস্রোতের আওয়াজ। এরকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে পশুপাখিরা ঠিক বুঝতে পারে, সেইজন্যই গুহায় কয়পুর ছোটাছুটি হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল।’

     প্রচণ্ড জলতেষ্টায় আমরা উবু হয়ে বসে ঝরনার জলই খেয়ে নিলাম অনেকটা। বৃষ্টিতে ঝরনার জলের ধারা বেড়ে যাওয়ার কারণেই আজ গুহার পাতলা দেওয়াল ভেদ করে এর শব্দ ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছিল। এতদিন গুহার মধ্যে থেকে এর কোনও অস্তিত্ব বোঝা যায়নি।

     এবার আমরা পাথর আঁকড়ে হাঁচড়-পাঁচড় করে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে এই বুঝি আলগা পাথর খসে নীচে পড়ে যাব। শেষ পর্যন্ত তিনজনেই সমতলে এসে নামলাম। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ে গিয়ে জ্বালা করছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কোনমতে হেঁটে এলাম ল্যাবরেটরি গুহার সামনের দিকে বটগাছটার তলায়। তিনজনে মিলে ঠেলে গুহামুখ চাপা দেওয়া পাথরটা সরিয়ে ভিতরে যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিলাম।

     অবিলম্বে বাকি তিনজনের শুশ্রূষা প্রয়োজন। আমার গুহায় ঢুকে মিরাকিউরলের শিশি এনে সবাইকে দুটো করে খাইয়ে দিলাম। আমি নিজেও খেলাম। সন্ডার্স ব্রান্ডি নিয়ে এসেছে। জন, গ্রিমাল্ডি আর অবিনাশবাবুর মুখ ফাঁক করে অল্প অল্প ঢেলে দেওয়া হল। তারপর আমরাও খেলাম। মিরাকিউরলের গুণে ভোর হওয়ার আগেই তিনজনের জ্ঞান ফিরে এল। অবিনাশবাবু আর ড্রেক্সেল ঠিকঠাক থাকলেও গ্রিমাল্ডির মধ্যে একটা অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। গুহার মেঝেতে একদম চুপ করে বসে আছে আর এদিক ওদিক ভীত সন্ত্রস্তভাবে তাকাচ্ছে। আমি আর সন্ডার্স কয়েকবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোনও অসুবিধে হচ্ছে কি না। প্রত্যেকবারই সে চুপ করে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। কয়েকদিন অতিরিক্ত চিন্তা আর ভয়ে কোনও মানসিক গণ্ডগোল দেখা গেল কি না কে জানে।

     ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিও অনেকটা ধরে এল। একে একে সবাই গুহার বাইরে বেরিয়ে এলাম। গ্রিমাল্ডি আসতে চাইছিল না। সন্ডার্স একরকম জোর করেই তাকে বাইরে নিয়ে এল। যদি দিনের আলোতে সে কিছুটা ধাতস্থ হয়। বাইরে এসে গ্রিমাল্ডি এদিক ওদিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘পুঁথিটা কোথায় রেখেছিলে?’

     তার এই প্রশ্নে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। অন্তত আগের কথা সে কিছু ভুলে যায় নি। এবার তবে ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।আমি বললাম, ‘সেটা আমার গুহাতেই ছিল, মাইকেলের পক্ষে খুঁজে পাওয়া এমন কিছু কঠিন হবে না।’

     ‘তবু একবার দেখা দরকার।’ এই বলে সে আমাদের গুহায় গিয়ে ঢুকল।

     সন্ডার্স বলল, ‘তোমার মিরাকিউরল ওকে আর একটা খাইয়ে দেবে নাকি? মনে হচ্ছে তো এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।’

     আমি বললাম, ‘কাজ হলে ওই দুটোতেই হবে। আর মিরাকিউরলে মানসিক ব্যাধি সারে কি না আমার জানা নেই।’

     ‘কীসের একটা বাজে গন্ধ আসছে বলো তো?’

     খুব হাল্কা বৃষ্টির সঙ্গে পুবের সমুদ্রের দিক থেকে হাওয়া বইছিল। সেই হাওয়ায় মাঝে মাঝেই একটা পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম। সন্ডার্সের কথায় বুঝলাম সেটা সেও পেয়েছে।

     সন্ডার্স গন্ধ লক্ষ করে এগিয়ে গেল। দু’মিনিট পরেই জঙ্গলের দিক থেকে সন্ডার্সের আর্তনাদ ভেসে এল, ‘সর্বনাশ! শঙ্কু, তাড়াতাড়ি এসে দেখে যাও।’

     আমার পিছনে পিছনে বাকিরাও ছুটল সে দিকে। সন্ডার্সের পাশে গিয়ে ওর নির্দেশ করা একটা পাথরের দিকে তাকাতেই দেখলাম পাথরের আড়াল থেকে জুতো পরা একজোড়া পা বেরিয়ে আছে। ক্যামেরাটা কিছু দূরেই পড়ে রয়েছে।

     ‘লেমরিক কোন সাক্ষী রাখতে চায় নি।’ চার্লস বলল।

     কাছে গিয়ে দেখলাম মাইকেলের মৃতদেহ বিকৃত হয়ে গেলেও পেটের মধ্যে আমূল গেঁথে দেওয়া ছুরির হাতলটা দেখা যাচ্ছে, তার ডান হাতে এখনও ধরা আছে সেই আরবি পুঁথি।

     এই সময় গ্রিমাল্ডি হঠাৎ পিছন থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাইকেলের মৃতদেহের ওপর। মাইকেলের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল সেই পুঁথি।

     ড্রেক্সেল চিৎকার করে উঠল, ‘গ্রিমাল্ডি! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ!’

     গ্রিমাল্ডি মাইকেলের মৃতদেহতে ঝুঁকে পড়া অবস্থা থেকে আমাদের দিকে ঘুরে গেল। শিহরিত হয়ে দেখলাম তার বাঁ হাতে বুকের কাছে ধরা রয়েছে সেই পুঁথি, আর উদ্যত ডান হাতে আমাদের দিকে তাক করে রেখেছে আমারই নিশ্চিহ্নাস্ত্র, অ্যানাইহিলিন পিস্তল।

     বুঝলাম, সে যখন পুঁথির খোঁজে আমাদের গুহায় ঢুকেছিল তখনই জিনিসটা পেয়ে হস্তগত করেছে।

     আমি দু’হাত ওপরে তুলে চেঁচিয়ে বললাম, ‘কেউ ওকে বাধা দিও না। সবাই সরে এস।’

     আমার চোখ গ্রিমাল্ডির ওপর নিবদ্ধ। ‘হিঁক্‌ হিঁক্‌’ করে পাশ থেকে যে আওয়াজটা এল সেটা অবিনাশবাবুর হেঁচকি ছাড়া আর কিছুর হতেই পারে না।

     আমরা হাত ওপরে তোলা অবস্থায় এক পা এক পা করে পিছতে লাগলাম। গ্রিমাল্ডিও উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে অ্যানাইহিলিন তাক করে পিছু হটছে। আমাদের সঙ্গে তার দূরত্ব যখন মোটামুটি একশো গজের মতো হয়ে গেল, অনেকটাই গাছের আড়াল পড়ে গেল মাঝখানে। তখন সে ঘুরে ছুটতে লাগল।

 

     ড্রেক্সেল বারবার একটাই কথা বলছে, ‘আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না গ্রিমাল্ডি এমন করতে পারে। ওকে আমি বহুদিন ধরে চিনি। নির্ঘাত ওর মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে।’

     সন্ডার্স বলল, ‘এই অবস্থায় গ্রিমাল্ডি কোথায় গেল সেটা তো দেখতে হবে।’

     ‘কিন্তু ওর হাতে অ্যানাইহিলিন রয়েছে।’ আমি বললাম, ‘এ যে কী সাংঘাতিক অস্ত্র তা তো তুমি জানোই।’

     ‘সেই জন্যই তো সেটা উদ্ধার করার উপায় ভাবতে হবে।’

     সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করলাম আমি,সন্ডার্স আর চার্লস—এই তিনজন মিলে গ্রিমাল্ডি যেদিকে গেছে সেদিকে খুঁজে দেখা হবে। আমার মন বলছে দ্বীপের পুবদিকে সমুদ্রে ওর সি-প্লেন রাখা আছে ভেবে সেদিকেই গ্রিমাল্ডি যাবে। সেইমতো আমরা রওয়ানা দিলাম। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে উৎরাই ভেঙে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু গ্রিমাল্ডির কোন চিহ্ন নেই। গুহার কাছে ফিরে যাব ভাবছি, ঠিক তখনই সমুদ্রের দিক থেকে আওয়াজ পেয়ে দেখলাম গ্রিমাল্ডির সি-প্লেনটা দ্বীপের দিকেই আসছে। তারপর সেটা এসে দ্বীপের পাশে জলের ওপর নামল। বিস্ময়ের পর বিস্ময়! সি-প্লেন থেকে নামল আর কেউ নয়; বিশ্বাসঘাতক লেমরিক।

     ভাবছি এই দ্বীপে আবার লেমরিকের ফিরে আসার কারণ কী হতে পারে; এইসময় সে আমাদের দেখতে পেয়ে এদিকেই এগিয়ে এল। কাছে এসে বলল, ‘থ্যাঙ্ক গড! তোমরা সবাই বেঁচে আছ। তোমাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। নিজের বিবেকের জ্বালা সহ্য না করতে পেরে ফিরে এলাম তোমাদের উদ্ধার করার জন্য। মাইকেলকে আমি খুন করেছি। তার জন্য যে শাস্তি প্রাপ্য আমি তা মেনে নেব।’

     ‘এ যে দেখি উলটপুরাণ! ভালমানুষ গ্রিমাল্ডি হঠাৎ শয়তানের রূপ ধারণ করল, আর শয়তান লেমরিক ফিরে এসেছে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে!’

     সন্ডার্সের এই কথায় আমি চমকিত হয়ে গেলাম। কিন্তু কিছু বলে ওঠার আগেই চার্লসের চিৎকারে আমার চমক ভাঙল।

     ‘ওই যে গ্রিমাল্ডি! সি-প্লেন নিয়ে পালাতে চাইছে। ওকে আটকাও।’

     জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে গ্রিমাল্ডিকে সি-প্লেনের দিকে ছুটতে দেখে আর চার্লসের চিৎকারে হতচকিত হয়ে লেমরিক ছুটে গ্রিমাল্ডিকে বাধা দিতে গেল, আর গ্রিমাল্ডি সেটা দেখতে পেয়ে লেমরিকের দিকে অ্যানাইহিলিন তাক করে ট্রিগার টিপে দিল।

     একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ—লেমরিকের আর কোন চিহ্নই রইল না।

     ‘মাই গড!’ চার্লস আর্তনাদ করে উঠল।

     গ্রিমাল্ডিও এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ঘাবড়ে গিয়ে অ্যানাইহিলিন ছুড়ে ফেলে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়েছে। লেমরিককে আহত বা হত্যা করার জন্য সে পিস্তল চালিয়েছিল ঠিক কথা, কিন্তু অ্যানাইহিলিনের এই রকম সর্বগ্রাসী রূপ সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল না। এরপর আমরা তিনজন মিলে তাকে ধরে নিয়ে গুহার কাছে ফিরে আসতে তেমন বেগ পেতে হল না।

     আরও একটা দিন ড্রেক্সেল আইল্যান্ডে কাটিয়ে আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম। দ্বীপের পশ্চিম দিকেই আমাদের যেতে হবে। সেখানে আমাদের লঞ্চ রাখা আছে। গ্রিমাল্ডির সি-প্লেনে সবাই একসঙ্গে ফিরতে পারব না।

     শহরে পৌঁছোনোর পর অবিলম্বে গ্রিমাল্ডির মানসিক চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তার মনোজগতে হঠাৎ এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা আমি আইল্যান্ডেই সন্ডার্সের একটা উক্তিতে পেয়ে গিয়েছিলাম। আরবি পুঁথির নির্দেশ অনুযায়ী, ডিএনএ না মিলিয়ে সেই ওষুধ মিশ্রিত রক্ত লেমরিক আর গ্রিমাল্ডির মধ্যে বিনিময় করার ফলে তাদের বাহ্যিক চেহারা বা বয়সের পরিবর্তন না হলেও, মানসিক গঠন, স্বভাব-চরিত্র বা আচারআচরণের বিনিময় হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা হয়েছে অনেক ধীর গতিতে। সেইজন্যই লেমরিক কৃতকর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে দ্বীপে ফিরে গিয়েছিল আমাদের উদ্ধার করতে। আর গ্রিমাল্ডি আরবি পুঁথি আত্মসাৎ করে পালাতে চেয়েছিল। লেমরিক বেঁচে থাকলে অ্যান্টিডোট প্রয়োগ করে তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার একটা সহজ উপায় থাকত। কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই।

     ড্রেক্সেল আইল্যান্ড ছেড়ে আসার আগে মাইকেলের মৃতদেহ সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছে। গ্রিমাল্ডির কাছ থেকে আরবি পুঁথিটা আমি নিয়ে নিয়েছিলাম। বৃষ্টির জলে এমনিতেই সেটার অবস্থা সঙ্গিন হয়ে পড়েছিল। লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে সেটা ভাসিয়ে দিয়েছি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে।

 

———-

লেখকের কথাঃ প্রোফেসর শঙ্কুর শেষ কাহিনি “স্বর্ণপর্ণী” প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালের পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায়, আর ১৯৯১–এর জুন মাসে সত্যজিৎ রায় লিখতে শুরু করেন “ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা”। এই দুই শঙ্কু কাহিনিই শুরু হচ্ছে প্রোফেসর শঙ্কুর জন্মদিনে লেখা ডায়রির পাতা থেকে। যদিও “স্বর্ণপর্ণী”তে সে তারিখ ১৬ জুন, আর এখানে ১৬ই অক্টোবর। উভয় কাহিনির প্রথম দিকের কয়েকটি প্যারাগ্রাফের মধ্যেও আশ্চর্য মিল লক্ষ করা যায়। জন্মদিনে শঙ্কু তার সারা জীবনের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলির স্মৃতিচারণ করছে। কাজেই মনে হতে পারে, “ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা” কিছুটা লেখার পরে লেখকের হয়তো এই সাদৃশ্যের কথা মনে পড়ে যায়। তাই তিনি এই কাহিনি আর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাননি। কিন্তু আবার সন্দীপ রায়ের লেখা ফুটনোট থেকে জানা যায় “বাবা গল্পটি পর পর মোট তিনবার লেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতিবারই তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।” কাজেই পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিস বলতে তিনি সর্বরোগনাশক বড়ি মিরাকিউরল নাকি অন্য কিছুর কথা বলতে চেয়েছিলেন তা জানার আর কোনও উপায় নেই। অসম্পূর্ণ লেখাটি প্রথমে ১৯৯২ সালের পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় প্রকাশিত হয়। পরে “সেলাম প্রোফেসর শঙ্কু” আর “শঙ্কু সমগ্র”-তে গ্রন্থিত হয়। 

55 thoughts on “প্রোফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার – ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা

  • October 15, 2018 at 1:06 am
    Permalink

    কোথায় সত্যজিৎ শেষ হয়ে সুদীপ শুরু হয়েছে, বোঝাই গেল না! সার্থক প্যাস্টিশ। রোমাঞ্চ আর বিস্ময়ের আদর্শ মিশ্রণ।

    Reply
    • October 15, 2018 at 2:07 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ ঋজুদা। গতবারে তোমার দেওয়া রিভিউ মাথায় ছিল লেখার সময়।

      Reply
    • October 15, 2018 at 5:42 am
      Permalink

      আমিও এটাই লিখতে যাচ্ছিলাম| ভাব আর ভাষা – দুদিক থেকেই সুদীপ-বাবু অসম্ভব মুন্সিয়ানার নিদর্শন রেখেছেন| চমত্কার|

      Reply
      • October 15, 2018 at 5:54 am
        Permalink

        ধন্যবাদ সুমিতদা।

        Reply
  • October 15, 2018 at 5:46 am
    Permalink

    দারুণ। শেষ টা নাটকীয় হলেও , বেশ টানটান ।

    Reply
    • October 15, 2018 at 5:54 am
      Permalink

      প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

      Reply
  • October 15, 2018 at 9:35 am
    Permalink

    সুদীপ বাবু, অভিনন্দন। বেশ ভালো লাগলো ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের কাহিনী। আরো ভালো লাগলো এই কারনে, আমি নিজেও এক সময় এটা শেষ করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুতেই ভেবে বের করতে পারিনি কি পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিশ ! কাজেই কিছুটা লেখার পর সেই প্রোজেক্ট পরিত্যক্ত হয়। আপনি সেটা পেরেছেন। লেখার বাঁধুনি ইন্টেলেক্ট্রনের চেয়ে অনেক অনেক ভালো। কল্যাণী রায়কেও সাধুবাদ দিই সুন্দর অলংকরনের জন্য। শুধু দুটো জিনিশ – ক্রোলের অনুপস্থিতি আর আরবী পুঁথির হেঁয়ালি আর তার রহস্যভেদ আরেকটু বিশদ হলে ভালো হত। আবারো ধন্যবাদ দিই সুন্দর প্যাস্টিসটি উপহার দেবার জন্য। এরপর আপনার কাছ থেকে মৌলিক শঙ্কু কাহিনীর প্রত্যাশা রইল। ভালো থাকবেন। শুভ পূজা।

    Reply
    • October 15, 2018 at 10:05 am
      Permalink

      ধন্যবাদ শুভাগতদা আপনার সুন্দর পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য।

      Reply
  • October 15, 2018 at 10:14 am
    Permalink

    অসম্পূর্ণ গল্পটা তো পড়েছিলাম৷ কিন্তু আশ্চর্য পুরোটা পড়ার পর আদৌ বুঝতে পারলাম না কোন জায়গায় সত্যজিৎ ছেড়ে গিয়েছিলেন৷ মনে হচ্ছে প্রোফেসর শঙ্কু নিজের ওপরেই ডেক্সেলের ওষুধ প্রয়োগ করে হাইবারনেশনে চলে গিয়েছিলেন৷ আর এই ২০১৮ সালে জেগে উঠে নিজের অসম্পূর্ণ ডায়েরি শেষ করলেন৷

    Reply
    • October 15, 2018 at 12:05 pm
      Permalink

      খুব আনন্দ পেলাম আপনার এই সরস প্রশংসায়। শারদ শুভেচ্ছা নেবেন।

      Reply
  • October 15, 2018 at 11:26 am
    Permalink

    অসাধারণ লাগলো পড়ে… শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান,নির্মেদ এবং পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম।ভীষণ ভালো লাগলো এই অনবদ্য লেখাটি পড়ে।

    Reply
    • October 15, 2018 at 12:07 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ ও শারদোৎসবের শুভেচ্ছা জানাই আপনাকেও।

      Reply
  • October 15, 2018 at 12:50 pm
    Permalink

    দুর্দান্ত। পড়ে আলাদা করা যাচ্ছে না দুই লেখককে। আপনার লেখার সর্বাঙ্গীন শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

    Reply
    • October 15, 2018 at 11:06 pm
      Permalink

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।

      Reply
  • October 15, 2018 at 1:15 pm
    Permalink

    আমি অভিভূত। আগের ‘ইন্টেলেকট্রন’টা আমার কাছে তেমন না জমলেও এটা খুব ভাল লেগেছে।

    সুদীপ যেভাবে এই গল্পটি ভেবেছে ও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ। অর্থাৎ প্লট তেরিতে তার মুন্সিয়ানা দেখার মতো। শঙ্কুকাহিনির স্টাইল ধরে রাখার ধরনটিও চমৎকার। উৎকণ্ঠা তৈরি আর তার বিকাশ বেশ সুন্দর।

    সুন্দর জিনিসেই খুঁত ধরা মানায় ও পরবর্তীতে তা আরও সুন্দর হবার জায়গা তৈরি করে রাখে। তাই বলি, সুদীপ যে লিখতে শুরু করেছে তা যে আমি দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেই (সংলাপে) বুঝে গেলাম তার কারণ হল আনন্দ ও সত্যজিতের বানানরীতি অনুসরণ না করা। এমনকী কয়েকটি জায়গায় একই শব্দের ভিন্ন বানানও দেখা গিয়েছে।

    গল্পের প্রয়োজনে স্বাভাবিকভাবেই সুদীপ নতুন চরিত্রের অবতারণা করেছে, কিন্তু সবকটি চরিত্রকে ভালভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। যেমন সন্ডার্সের প্রায় কোনও ভূমিকাই নেই। আবার, এই শেষ গল্পে ক্রোলের উপস্থিতি কাম্য ছিল। চরিত্রগুলির বাহ্যিক বর্ণনাও অপ্রতুল।

    প্রতিটি দিনের ডায়রিতে বর্ণনা এড়িয়ে সরাসরি মূল ঘটনায় চলে যাওয়া গল্পটির আরও সুন্দর হওয়া আটকে দিয়েছে।

    যাইহোক, সর্বোপরি, এটি সুযোগ্য হাতে লেখা খুব উপভোগ্য ও প্রায় সার্থক একটি প্যাস্টিশ। এবার কিন্তু সম্পূর্ণ মৌলিক শঙ্কুকাহিনি চাই।

    Reply
    • October 15, 2018 at 1:36 pm
      Permalink

      বানানরীতি নিয়ে একটা কথা বলি, ‘ওনার’ শব্দের ব্যবহার সত্যজিৎ দেখতে পেলে বোধহয় লোক পাঠিয়ে বাড়ি থেকে তুলে আনাতেন, তারপর জানি না।

      আর একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। গুহার ভিতরে আটকে যাবার ঘটনাটা কোন গল্পে যেন পড়েছিলাম। শঙ্কুকাহিনিই কিনা তাও মনে নেই। কিন্তু পড়েছিলাম অবশ্যই।

      Reply
    • October 15, 2018 at 9:58 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ প্রসেনজিৎ তোমার সুচিন্তিত মতামত দেওয়ার জন্য। তোমার এই রিভিউ সত্যি আমার খুব উপকারে আসবে। শুধু একটা ব্যাপারে দ্বিমত আছে, শেষ গল্প বলেই ক্রোলকে আনতে হবে এটা সঠিক যুক্তি হল কি? আমার কিন্তু এই গল্পে ক্রোলকে অপরিহার্য মনে হয় নি। বানান প্রসঙ্গে বলি, আমি আনন্দ বা সত্যজিতের বানানরীতি অনুসরণ করতে চেয়েছি, যেটুকু অমিল পেয়েছ সেটা অজ্ঞানতাবশতই হয়েছে।

      Reply
      • October 15, 2018 at 10:10 pm
        Permalink

        না, শেষ গল্প বলে ক্রোলকে আনতে হবেই তা নয়। শুধু, পাঠকের একটা চাহিদা থাকেই। তাই সেটা পূরণ করা যায় কিনা ভেবে বের করা যেত। অন্তত না আনার একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খাড়া করলে বেশ ভাল হত।

        Reply
    • October 15, 2018 at 10:25 pm
      Permalink

      আর হ্যাঁ, শঙ্কু ও কোচাবাম্বার গুহাতে গুহার ভিতরে আটকে পড়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সহায়তায় (সেক্ষেত্রে ভূমিকম্প) বেরিয়ে আসার ঘটনা আছে। কিন্তু তার প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ আলাদা।

      Reply
  • October 15, 2018 at 1:25 pm
    Permalink

    Sudip Babu Khub sundor likhechhen. Satti kothay Satyajit ses holo ar Sudip Suru holo bujhte parini. Infact lekhata onek besi modern hoyechhe. Ekhonkar onek sobdo jurechhe…jegulo Satyajit Babu er pokhhe lekha possible chhilo na….last 2 decades advances in science and technology ke kaje lagiye sanku ke apni Amar banchiye Tulun. Onek subhokamona roilo.

    Reply
    • October 15, 2018 at 10:15 pm
      Permalink

      আপনাকেও অনেক শুভেচ্ছা জানাই শারদীয়ার।

      Reply
  • October 15, 2018 at 10:41 pm
    Permalink

    আমি অভিভূত। পুজোয় শঙ্কু পাওয়া আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। থ‍্যাঙ্ক ইউ সুদীপ, এবং কল্পবিশ্ব

    Reply
    • October 15, 2018 at 11:04 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ ও শারদ শুভেচ্ছা জানাই।

      Reply
  • October 15, 2018 at 10:50 pm
    Permalink

    Khub, khub bhalo laglo. Sotyi-i Satyajiter sange tofat dhora mushkil. Villain-er haate Pentax camera dekhe ektu dukkho pelam, kintu ota temon kichhu na. Apni ebar “Intelectron” tao likhe felun.

    Reply
    • October 15, 2018 at 11:03 pm
      Permalink

      ইন্টেলেকট্রন তো গতবারেই লেখা হয়ে গিয়েছে। আপনি এই ওয়েবজিনের ওপরে দেখুন “পুরোনো সংখ্যা” ট্যাব আছে। ওখানে ক্লিক করে 2017 সালের শারদীয়া সংখ্যায় গেলেই সেটা পেয়ে যাবেন।

      Reply
  • October 16, 2018 at 4:00 am
    Permalink

    la jobab Sudip da……….asadharan lekha…..satyi kothay satyajit themechhen r Sudip suru korechhen bojha muskil…….lekhar kotha vabini kintu sdundar jinis ki hote pare seta onek vebechhi…..satyi lekha ta pore mugdha holam……….

    Reply
    • October 16, 2018 at 12:50 pm
      Permalink

      পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

      Reply
  • October 16, 2018 at 11:55 am
    Permalink

    আগের লেখার চেয়ে এটা অনেক ভালো হয়েছে, একদম সঠিক ভাব আর ভাষার দখলে জমে উঠেছে..এরকম লিখতে থাকুন সুদীপ দা

    Reply
    • October 16, 2018 at 12:51 pm
      Permalink

      থ্যাঙ্কু, সঙ্গে থাকার জন্য।

      Reply
  • October 16, 2018 at 1:33 pm
    Permalink

    মন্ত্রমু। শুধু পড়ে গেলাম।মুগ্ধতার ভাষা হয় না।

    Reply
    • October 16, 2018 at 10:27 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  • October 16, 2018 at 9:58 pm
    Permalink

    একেই বলে সার্থক প্যাস্টিশে! কোথায় যে সত্যজিতের শেষ, সুদীপের শুরু, জানা না থাকলে কেউ বলতে পারবে না। গল্প নিয়ে কিছু বলার নেই। শঙ্কু কাহিনীগুলির মধ্যে এটা বেশ উঁচুতেই থাকবে। চমক, টুইস্ট, সব মিলিয়ে সার্থক রসসৃষ্টি।

    Reply
    • October 16, 2018 at 10:29 pm
      Permalink

      থ্যাঙ্কু ত্রিদিবেন্দ্রদা, ভাল আমিও আপনার লেখার খুব ভক্ত। আরও ঘনাদা চাই কিন্তু।

      Reply
  • October 19, 2018 at 4:59 am
    Permalink

    খুব ভাল লেগেছে । শুধু কয়েকটি জায়গা সত্যজিত রায়ের মত হয় নি বলে আমার মনে হয়েছে । যেমন ব্রান্ডি খাওয়ার জায়গায় “তারপর আমরাও খেলাম” । তবে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত লেখা ।

    Reply
    • October 19, 2018 at 10:47 am
      Permalink

      ভাল লাগল আপনার পাঠ প্রতিক্রিয়া পেয়ে। শুভ বিজয়া।

      Reply
  • October 19, 2018 at 7:26 am
    Permalink

    অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। শেষ তা একটু ঝুলে গেল মনে হচ্ছে। কিন্তু সেটা সত্যজিৎ রায়ের গল্প বলেই। এটা শঙ্কু না হলে অন্য কিছু হলে অনবদ্য হতো। গল্প তো অসাধারণ। লেখনী ও অসাধারণ। কোন জায়গা থেকে আপনি শুরু করলেন সেটাই ধরতে পারলাম না। কয়েকটা জায়গা একটু ভালো করলে আপনি সত্যজিৎ রায়ের যোগ্য উত্তরসূরি হতেই পারেন।

    খুব ই সুন্দর। অনেক লেখক ই এরকম পুরোনো লেখা continue করেন কিন্তু সেগুলো খুব ই বাজে হয়। আপনার মত লেখা আমি সত্যি এর আগে পড়িনি। এর আগে একটা লেখা পড়েছিলাম, ওই শংকর এর উপর ভিত্তি করে সেটা পরে শেষ করতে পারিনি কিন্তু এটা টাই সুন্দর কি বলি।
    অপূর্ব

    Reply
    • October 19, 2018 at 10:46 am
      Permalink

      ধন্যবাদ জানাই আপনার সুচিন্তিত মতামত জানানোর জন্য।

      Reply
  • October 20, 2018 at 10:14 am
    Permalink

    osadharan, jeno Satyajit Babu abar likhlen.
    Jyoti Prakash Mukhopadhyay.

    Reply
  • October 20, 2018 at 11:02 am
    Permalink

    অসাধারণ সুদীপ।পরিপূর্ন একটা শঙ্কু এডভেঞ্চার অনেকদিন পরে সেই আনন্দমেলার ফিলিং এনে দিল।আগের ইন্টালেক্ট্রন এর থেকে অনেক বেশী টান টান গল্প।আপনি সত্যিই সার্থক।

    Reply
  • October 20, 2018 at 11:06 am
    Permalink

    অসাধারণ সুদীপ।পরিপূর্ন একটা শঙ্কু এডভেঞ্চার অনেকদিন পরে সেই আনন্দমেলার ফিলিং এনে দিল।আগের ইন্টালেক্ট্রন এর থেকে অনেক বেশী টান টান গল্প।আপনি সত্যিই সার্থক।
    যে কনসেপ্ট এ লিখেছেন,তার প্রশংসা করি।কিন্তু আরবী পুঁথির ব্যাপারটা একটু ডিটেল হলে ব্যাপারটা আরো রোমাঞ্চকর হত।

    Reply
    • October 20, 2018 at 12:44 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ আপনাকে। এই পুরোনো পুঁথি বা ফর্মুলার খুব ডিটেলিং স্রষ্টা স্বয়ং পরিহার করে চলতেন। আপনি সুবর্ন সুযোগ, হিপনোজেন এসব গল্পের কথা ভেবে দেখুন।

      Reply
  • October 22, 2018 at 2:57 am
    Permalink

    কোথায় সত্যজিৎ রায় শেষ করেছেন আর কোথায় সুদীপ বাবু শুরু করেছেন, বুঝতেই পারলাম না। এর আগে শরদ্বিন্দু বাবুর অর্ধেক লেখা ব্যোমকেশ কাহিনী (বিশুপাল বধ), নারায়ণ সান্যাল লিখে সমাপ্ত করেছিলেন। সেটা পড়েছি, তাতে পার্থক্যটা স্পষ্ট বোঝা যায়,কারন শেষ অর্ধেকটাতে (চির পরিচিত) ব্যোমকেশ-সুলভ মেজাজ(FLAVOUR) পাওয়া যায় না। কিন্তু ধন্যি আপনার লেখার স্টাইল, একবারের জন্য মনে হয়নি এটি পুরোটা, সত্যজিত রায়ের লেখা নয়। খুব ভালো লেগেছে।

    Reply
    • October 22, 2018 at 6:07 am
      Permalink

      আমার মনে হয়, কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক, যিনি নিজস্ব স্টাইলে লিখে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন, তাঁর পক্ষে প্যাস্টিশ লেখা আরও কঠিন। আপনি নারায়ণ সান্যালেরই প্রথম দিককার উপন্যাস মহাকালের মন্দিরের কথা ভাবুন, পড়লে মনে হবে যেন শরদিন্দুর লেখা কোন ঐতিহাসিক উপন্যাসই পড়ছেন। উনি নিজেও সে কথা স্বীকার করেছেন যে ওই উপন্যাস শরদিন্দুকে নকল করেই লেখা। কিন্তু নারায়ণ সান্যালের পরবর্তী ঐতিহাসিক কাহিনীগুলিতে সম্পূর্ন স্বতন্ত্র ঘরানা।

      Reply
    • October 22, 2018 at 6:57 am
      Permalink

      যাই হোক, সুদীপ বাবু, আপনার এই শঙ্কু কাহিনী (ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা) পড়ে খুব ভালো লেগেছে । তাছাড়া পুজোর সময় নতুন শঙ্কু-কাহিনী পেয়ে খুব ভালো লাগলো। আপনাকে এবং “কল্পবিশ্ব” কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
      • October 22, 2018 at 7:08 am
        Permalink

        আপনাকেও পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানাই। শুভ বিজয়া।

        Reply
  • October 22, 2018 at 4:32 am
    Permalink

    শঙ্কু কাহিনীর একজন অবিমিশ্র সমর্থকই পারবেন এমন সীমলেস বুনন। খুব ভাল। হ্যাঁ, সন্ডার্সের উপস্থিতিটা আরোপিত লেগেছে।

    Reply
    • October 22, 2018 at 6:09 am
      Permalink

      ভাল লাগল আপনার পাঠ প্রতিক্রিয়া।

      Reply
  • October 22, 2018 at 8:29 am
    Permalink

    Ek niswase.pore fellam galpo ta, sotyi ei ami ageo tomar lekha pore Prochur anondo peyechi aj o abar pelam,

    opvutopurbo bolle kom bola hobe, No doubt Satyajit Ray er ei galpo sesh korar khamota ek matro bangla jagote bartoman tomar e ache..

    Galpo ta porte porte vabchilam ki maratyok chinta dhara ki kalpona shokti proyojon na hole, ei galpo lekha samvob hotona..
    r osesh dhonyobad eto sundor ei galptao amader upohar dewar jonyo r
    Shonkur diary er sesh galpo ti somapto korar jonyo..

    Reply
    • October 23, 2018 at 5:33 am
      Permalink

      Thank you Debjoy 🙂

      Reply
  • October 22, 2018 at 9:26 am
    Permalink

    শুভ বিজয়া, আপনাকেও, ভালো থাকবেন। নমস্কার।

    Reply
  • October 22, 2018 at 9:57 am
    Permalink

    sobai sob kichu bole diyechen … ta se valo laga ba truti khoja … o pothe na giye shudhu bolte pari pore tripti pelam

    Reply
    • October 23, 2018 at 5:33 am
      Permalink

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। 🙂

      Reply
  • October 25, 2018 at 10:08 am
    Permalink

    apnar lekhata pore bes bhalo laglo….sudhu ektai proshn theke gelo… Grimaldi to nijeo boigyanik…tini hibernation ar death er parthokko bujhlen na….!! Oi jaygata arektu bisod korle bhalo hoto. Ar tachhara thik bojha gelo na keno Grimaldi ar Drexel dujonei bhul korlo…
    Overall bes enjoyable…. bhalo lekha!

    Reply
    • October 25, 2018 at 10:52 am
      Permalink

      গ্রীমল্ডি তো ডাক্তার নয়, বুঝবে কি করে? ড্রেক্সেল আর গ্রীমল্ডি পুঁথির dual meaning উদ্ধার করতে পারে নি, কিন্তু শঙ্কু পেরেছে, এখানেই তো শঙ্কুর শ্রেষ্ঠত্ব।
      যাই হোক, ভাল লাগল আপনার প্রতিক্রিয়া। 🙂

      Reply
  • October 27, 2018 at 8:56 pm
    Permalink

    চমৎকার। আপনার লেখাটা ঠিক কোনখানে শুরু হয়েছে বুঝলাম না, অদ্ভুত মিলিয়েছেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!