ফল

ঋজু গাঙ্গুলী

অলংকরণ:সুমন দাস

মেগাকর্প কমপ্লেক্স, সন্ধ্যা ছটা

“আমি একটা ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার নাম নয়, বরং ‘রু…উ…উ…’ বলে কে যেন সুর করে ডাকছিল। গলাটা বড্ড চেনা। কোথায় যেন শুনেছি। শুনতে খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল, যেন অনেক আদর আর ভালোবাসা মিশে আছে ডাকটায়।”

     “তারপর?” বলিষ্ঠ নারীকণ্ঠ বলে উঠল।

     “আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। উঠতে গিয়েই মনে হল, শরীরটা কী ভীষণ হালকা লাগছে! যেন আমি অনেক রোগা আর… ছোটো হয়ে গেছি। নিজের হাত-পায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, ঠিক তাই-ই হয়েছে! আমি ছোটো হয়ে গেছি।”

     “ছোটো মানে?” খসখসে গলায় প্রশ্ন আসে, “ঘরটার অনুপাতে আপনার নিজেকে ছোটো লাগছিল? ওই অ্যালিসের গল্পের মতো?”

     “না-না। ছোটো মানে বয়সে ছোটো। ধরুন আট কি নয়!”

     গলাটা থেমে যায়। থেমে থাকে। কাচের ওপাশে বসে থাকা দু’জন মানুষ মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। তারপর নারীকণ্ঠ সরব হয়, “তারপর কী হল?”

     “আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরেটা এত সুন্দর লাগছিল… এত সুন্দর!”

     “কীরকম ছিল বাইরেটা?”

     “নীল আকাশ। দূরে একটা বিশাল, ঘন নীল জলে ভরা লেক। দু’পাশে পুরোনো-পুরোনো বিশাল সব গাছ। তাদের শরীর থেকে ঝরে পড়ছে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ পাতা।”

     “আর?”

     “বাতাসে একটা গন্ধ মিশে ছিল, জানেন। এখন ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল। সুন্দর গন্ধ। অনেকটা রজনের মতো। বাতাস আমার চুলের মধ্য দিয়ে বিলি কাটছিল। আমার পরনের পাতলা জামার মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়ছিল। আমার শরীরে আলতো করে যেন কেউ হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। আর ওই গন্ধটা…! আমার ভালো লাগছিল। খুব-খুব ভালো লাগছিল।”

     “এ-সবই তো সুখস্বপ্নের স্মৃতি মনে হচ্ছে।” খসখসে গলাটা ফিসফিস করে সঙ্গীকে শুধোয়, “এগুলো জেনে আমরা কী করব?”

     “এই অবস্থাটা,” নারীকণ্ঠ জানতে চায়, “মানে এই ভালো-লাগার অনুভূতিগুলো, কতক্ষণ ছিল?”

     “জানি না। আমার সময়ের খেয়াল ছিল না। তবে একটা সময়…”

     “একটা সময়?”

     “একটা লোককে এগিয়ে আসতে দেখলাম। লোকটার মুখে হাসি ছিল, কিন্তু আমার ওকে ভালো লাগছিল না।”

     “লোকটার পরনে কী ছিল, কিছু মনে আছে?”

     “পরনে… এক-একবার এক-একরকম পোশাক দেখেছি বোধহয়। সেভাবে মনে নেই। ওর মুখটাও মনে নেই।”

     “বেশ। এরপর আপনি কী করলেন?”

     “আমি… না! আমি তো কিছু করিনি! সত্যি বলছি, বরং ওই আমাকে…!”

     “অফিসার্স!” কাঁচের এপাশে অ্যাপ্রন পরা ভদ্রলোক বলে ওঠেন, “ওর স্ট্রেস-লেভেল স্পাইক করছে। এই জিজ্ঞাসাবাদ আমি আর চালাতে দেব না।”

     “আমাদের কাজে বাধা দিলে বিপদে পড়বেন ডক্টর।” খসখসে গলাটা বলে ওঠে, “তাছাড়া আমরা বেশি সময় নেব না।”

     “আমরা জানি আপনি কিচ্ছু করেননি।” এই চাপান-উতোর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখে নারীকণ্ঠ, “লোকটা কী করেছিল?”

     “লোকটা আমাকে… আমাকে…!”

     “অফিসার্স!” ডাক্তারের কথাটা এবার প্রায় আর্তনাদের চেহারা নেয়, “ওর কিছু হলে আমার চাকরি চলে যাবে।”

     “তারপর কী হল?” নারীকণ্ঠে উত্তেজনার ভাব প্রকট হয়।

     “জানি না।” কাচের এপাশে এতক্ষণ সরব গলাটা এবার ভেঙে পড়ে, “আমি কিচ্ছু জানি না।”

     “প্লিজ নিরুপমা!”

     নামটা শোনামাত্র কাচের ওপাশের মানুষটি শান্ত হয়ে যায়।

     “কতদিন পর আমাকে এই নামে কেউ ডাকল! জানেন, আমার বাবা ছাড়া আর কেউ… কিন্তু আপনি ঠিক ওইভাবে উচ্চারণ করলেন কীভাবে?”

     “আমিও…” নারীকণ্ঠ ঢোঁক গেলে, “আমি পারি। আমার নাম তনয়া দত্ত।”

     “তনয়া…।” এতক্ষণে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে ওঠে কাচের ওপাশের মানুষটির মুখে। সেই হাসির আড়ালে যেন অন্য অনেক কিছু বেরিয়ে আসতেও চায়, “আমার স্বপ্ন তো শেষ হয়ে গেছে। তারপর একটা বিরাট আলোর ঝলক…আর আমার জেগে ওঠা। আর আমার কিচ্ছু বলার নেই। আপনারা আসুন। তবে…আপনি মাঝে-মাঝে আসবেন তনয়া। প্লিজ।”

 

ট্যান, কিউব, সন্ধে সাতটা

“আমি নিশ্চিত চিফ।” আমি গলাটা শান্ত রাখার চেষ্টা করি, “নিরুপমা, মানে আমাদের রেকর্ড মাফিক ‘পম’ নামের মেয়েটির এই স্বপ্নগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। ওগুলো যে ক্রিস্ট্যালে স্টোরড হয়েছে, সেগুলো আমাদের সিজ করা দরকার।”

     “তুমি ভালো করেই জান ট্যান,” রডরিগেজ খসখসে গলায় বলে, “ওগুলোর মালিক মেগাকর্প। ওগুলো সিজ করতে গেলে স্রেফ তোমার ধারণা দিয়ে হবে না। আমাদের আরও নিরেট কিছু চাই। এই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি বের করতে গিয়েই আমার জান কয়লা হয়ে গেছে।”

     “আমি ওর সঙ্গে একমত ট্যান।” চিফের ঠান্ডা গলা শুনে হতাশ হই, “পম একজন ড্রিমার। লুসিড ড্রিমস-এ ওর মতো যত সোশিওপ্যাথ আছে, তাদের সবার মতো ওর স্বপ্নও মেগাকর্পের সম্পত্তি। স্রেফ তোমার ধারণার ভিত্তিতে ওগুলো সিজ করলে মেগাকর্পের ল’ইয়াররা আমাদের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে।”

     “কিন্তু তারিখগুলো ভেবে দেখুন!” আমি উত্তেজিত হই, “গত মাসের তেরো, সাতাশ, এ-মাসের এগারো – এই দিনগুলোর কি কোনও বিশেষত্ব নেই? পম একজন ইরটিক ড্রিমার। ক’দিন আগে…”

     রডরিগেজ একটা সাজানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

     “তুমি নিজের বন্ধ ঘরে, তোমার ওই আন্টির নজর এড়িয়ে কী ধরনের হলোভিড দেখো, সেটা তোমার ব্যাপার ট্যান।” চিফের মুখটা বিরক্ত হলেও চোখে হাসিটা স্পষ্ট হয়, “কিন্তু তার ভিত্তিতে মেগাকর্পের জিনিস সিজ করাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”

     আমার মুখটা আপনা থেকেই আরক্ত হয়। এই শহরে, আজকের দিনে, কেউ প্রায় কিছু নিয়েই মাথা ঘামায় না। কিন্তু কেন জানি না, আজন্মলালিত কিছু সংস্কারের বশে আমার ভেতরে একটা লজ্জার ভাব চলে আসে।

     “বাড়াবাড়ি কি?” আমি বলি, “এই তিনটে দিনেই কিন্তু আমরা শহরতলীতে ওই জ্বলে যাওয়া লাশগুলো পেয়েছিলাম। মনে আছে?”

     “ওটা তো…” হতভম্ব মুখে রডরিগেজ চিফের দিকে তাকায়। চিফের মুখটা গম্ভীর হয়ে ওঠে।

     “হ্যাঁ, ওটা আলী’র কেস। তবে পদাধিকার কাজে লাগিয়ে ট্যান ওই রেকর্ডগুলো দেখতেই পারে। কিন্তু ট্যান,” আমার দিকে ঘোরেন চিফ, “আলী কিন্তু এগুলো গ্যাং ওয়ারের ফলে হওয়া খুনোখুনি হিসেবেই দেখছে। এখন তুমি যদি অন্য একটা থিওরি দাও…”

     “আমাকে এই কেস থেকে সরিয়ে দিন চিফ।” রডরিগেজের খসখসে গলাটা কেঁপে ওঠে। আমি ওর ব্যাপারটা বুঝি। ডিপার্টমেন্টের মধ্যে ক্ষমতার সংঘাতে বেচারিকে ইতিমধ্যেই প্রচুর ভুগতে হয়েছে। আমার সঙ্গে ও কাজ করতে রাজি হয়েছিল স্রেফ আমি নতুন বলে।

     “পাগলামি কোরো না!” আমি ওকে কষে ধমক দিই। তারপর চিফের দিকে ঘুরে বলি, “নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আমি আর কোনও মিল পাইনি। তবে কয়েকটা… অসঙ্গতি পেয়েছি। আমি কি সেগুলো বলব?”

     বেশ বুঝতে পারছিলাম, ব্যাপারটা গোলমেলে হচ্ছে। প্রোমোশনের পর আমি আর হাভেন হোমিসাইডে নেই। বরং অন্য নানা কাজে আমাকে একরকম জোর করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মন বলছে, এগুলো সিরিয়াল কিলিং। কিন্তু সেটা কাগজে-কলমে বলতে গেলেই আমার বিরুদ্ধে অন্যের কাজে নাক-গলানোর নালিশ উঠবে।

     “বলো।” দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চিফ, “এই ঘরে আপাতত যা কথা হচ্ছে সবই অফ দ্য রেকর্ড।”

     “তিনজনই পুরুষ, মধ্যবয়স্ক। টিপিক্যাল হাই সোসাইটি না হলেও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। একজন বিপত্নীক, অন্য দু’জন স্ত্রী আর সন্তানের থেকে আলাদা থাকতেন। এর চেয়ে বেশি খোঁজখবর নেওয়ার কথা পরে উঠবে। কিন্তু মৃত্যুর সময় এদের পোশাকে এমন কিছু পাওয়া গেছিল, যেগুলোর কোনও ব্যাখ্যা সাইটে পৌঁছনো অফিসার পাননি। আলীও পায়নি, এখনও অবধি।”

     “হয়ে গেল।” রডরিগেজ দীর্ঘশ্বাস ফেলেও নিজের ট্যাবটা খোলে, “সেগুলো কী, শুনি।”

     “প্রথমজনের পকেটে ছিল রবারের তৈরি একটা ছোট্ট গোলাপি হাতি। দ্বিতীয়জনের আঙুলে লেগে ছিল চটচটে ক্যান্ডি ফ্লসের কিছু আঁশ। তৃতীয়জনের কাছে ছিল একটা জ্যাসমিন-সেন্টেড সফট টিস্যুর প্যাকেট।”

     চিফের ভ্রূ কুঁচকে যায়। নাকের পাটা ফুলে ওঠে। শ্বাস ভারী হয়। ভাগ্যিস আমার ইউনিটের চিফ একজন মহিলা! নইলে এত দ্রুত আমার ভাবনাটা উনি বুঝে ফেলতেন না।

     “তাতে কী হল?” রডরিগেজ বোকার মতো প্রশ্ন করে। বেচারি ড্রাগ আর আর্মস নিয়ে কাজ করে বলেই হয়তো ব্যাপারটা বোঝেনি।

     “পেডোফাইল!” দাঁতে দাঁত চেপে বলেন চিফ, “এগুলোর অন্য কোনও ব্যাখ্যা অন্তত ওইসময় ওই জায়গায় থাকা লোকেদের ক্ষেত্রে দেওয়া যাবে না। কিন্তু আলী এটা দেখেনি কেন?”

     “কারণটা সহজবোধ্য।” এতক্ষণে আমার গলাটা সহজ হয়, “লোকগুলোর শরীরের মাঝখানের অংশটা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছিল। বেম্যাক্স নামের মাফিয়াটি বিদ্রোহীদের এইরকম ব্লাস্টারই সাপ্লাই করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল কিছুদিন আগে। আলী’র ওপর এমনিতেই খুব চাপ যাচ্ছে এই অস্ত্রপাচারের ব্যাপারটা নিয়ে। ও এই তিনটে খুনকেও ওই অ্যাংগেলে দেখছে।”

     “ও-ও-ও!” রডরিগেজ ঘুম থেকে ওঠা লোকের মতো সোজা হয়ে বসে, “হ্যাঁ, বডিগুলোর ওই দশা দেখে আলী অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর অবস্থায় ছিল না। কিন্তু মেজর…”

     “প্লিজ ডাক্‌,” ডোনাল্ড রজরিগেজের নাম স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সবার মুখে ওই চেহারা নিয়েছে, “এখানে ও-সব ফর্মালিটি ছাড়ো।”

     “কিন্তু ট্যান, এই খুনগুলোর সঙ্গে পমের যোগসূত্রটা কী? তুমি বললে লুসিড ড্রিমস-এ ঢুকে পমের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি কোর্টের এক জজকে ধরে অনুমতি আদায় করলাম। কিন্তু তারপর কী হল, কিছুই তো বুঝলাম না।” রডরিগেজ হতাশ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকায়।

     “আপনারা কেউ কি লুসিড ড্রিমজ চ্যানেলটা দেখেন?” আমি প্রশ্ন করি, “চিফ? ডাক্‌?”

     দু’জনেই মাথা নাড়েন। আমি ব্যাখ্যা করতে শুরু করি।

     “মিলিশিয়া, সেনাবাহিনী, মেডিসিন, নন-লিনিয়ার প্রেডিকশন – এমন নানা পেশায় যাঁরা আছেন, তাঁদের পক্ষে কোনও রিক্রিয়েশনাল ড্রাগস বা ইমপ্ল্যান্ট নেওয়া সম্ভব নয়। এদের মধ্যে আমিও পড়ি। আমাকে আবার ঘুমোতেও হয় ওষুধ খেয়ে, কারণ… আমার কিছু সমস্যা আছে। আপনারা জানেন।”

     আমি দম নিই। চিফ শান্তভাবে বসে থাকেন। রডরিগেজ কফি মেশিনে মালমশলা দিয়ে টাইম সেট করার ফাঁকেও কান খাড়া রাখে।

     “আমার মতো মানুষদের জন্যই মেগাকর্পের এই লুসিড ড্রিমস চ্যানেল। এখানে বিভিন্ন ড্রিমারের স্বপ্ন ক্রিস্ট্যালে স্টোরড, ফিল্টার্ড বা এনহ্যান্সড না হয়ে, বরং সরাসরি আমাদের হলোভিডে এসে পৌঁছয়। জানি, স্বপ্ন একটা ভীষণ ব্যক্তিগত জিনিস। কিন্তু লুসিড ড্রিমস-এ যারা স্বপ্ন দেখে, তাদের কোনও অধিকার নেই। সেগুলো আমাদের কাছে আসার পর এফেক্টটা হয় ঠিক স্বপ্নেরই মতো। মানে দৃশ্যগুলো হঠাৎ বদলায়, একটা শেষ হয়ে অন্য গল্প শুরু হয়ে যায়, অথচ দেখার সময় মনে হয় যেন সবটাই খুব স্বাভাবিক… লজিক্যাল।”

     পিং! কফি মেশিনের আওয়াজ শুনে আমি চমকে উঠি। ট্রেতে তিনটে কাপ নিয়ে আসে রডরিগেজ। আমাদের এই সান্ধ্য ও ইনফর্মাল বৈঠকটা যে চিফের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে পারি। নইলে ওঁর নিজস্ব লকারে লুকিয়ে রাখা হোমমেড কুকির বাক্সটা আমাদের সামনে কিছুতেই বেরোত না।

     “এই চ্যানেলে অনেকের স্বপ্ন আসে, তবে আমার নিজের পছন্দের ড্রিমার হল পম।” আমি কাপ হাতে নিয়ে বলে চলি, “আগে জানতাম না, আজ ডাক্‌ অনুমতিপত্রটা বের করায় কারণটা বুঝলাম। ও আর আমি একই এথনিক লিনিয়েজের। তাই আমার মা’র আর পিসি’র মুখে শোনা গল্পগুলোর রেশ কোথায় একটা যেন মিশে যেত ওর কিছু-কিছু স্বপ্নে। কিন্তু ওই তিন রাতের স্বপ্নগুলো দেখতে গিয়ে তাতে খুব অদ্ভুত কিছু দেখে ফেলি, যাদের সঙ্গে পমের ইরটিক ড্রিমের কোনও সম্পর্ক ছিল না। স্বপ্নগুলো দুম্‌ করে থেমেও গেছিল। এই জিনিস হতেই পারে। নানা কারণে মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষ ড্রাগ বা স্টিমুলান্টের প্রভাব থাকার পরেও কোনও ড্রিমার র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট, মানে স্বপ্ন দেখার অবস্থা থেকে তলিয়ে যেতে পারে ঘুমের গভীরে। কিন্তু আমার… কেন যেন… ব্যাপারগুলো অস্বাভাবিক লেগেছিল।”

     “কেন?” কফিতে চুমুক দিয়ে জানতে চায় রডরিগেজ, “এই তো বললে, এমনটা হতেই পারে।”

     “কারণ…” আমি একটু ইতস্তত করি, কারণ এবার ব্যাপারটা আর শুধু পমের স্বপ্ন নয়, আমার দিকেও যাচ্ছে, “পমের ইরটিক ড্রিমে দু’ধরনের পুরুষ আসে। একজনের প্রশস্ত কপাল, গভীর আর কাজল-কালো চোখ, পুরু ঠোঁট, ঈষৎ পুরু নাক। অন্যজনের পাতলা ঠোঁট, ধারালো এবং অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, ঢেউ খেলানো চুল আর টিকালো নাক। আমি লক্ষ করেছি, এই দুটো ভার্সনের পুরুষই আসে ওর স্বপ্নে। কিন্তু সেই তিনটে রাতে আমি যাদের দেখেছিলাম তারা অন্যরকম। তাদের মধ্যে একটা ভোঁতা লালসার ভাব ছিল। তাছাড়া… আশেপাশে অত রঙ, হঠাৎ পিওভি – মানে দেখার অ্যাংগলটা বদলে যাওয়া, তারপর কিছু অদ্ভুত টানাহেঁচড়ার মতো নড়াচড়া, শেষে ওই বিরাট আলোর ঝলক হয়ে সব ধোঁয়াটে হয়ে যাওয়া – এগুলো থেকে আমার মনে হয়েছিল, কিছু গোলমাল আছে।”

     “পরদিন খোঁজ নিয়েছিলে?” চিফ জিজ্ঞেস করেন।

     “নিয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম ড্রাই ডকের কাছে গ্যাং ওয়ারের ফলে একজন খুন হয়েছে। ওটা আমার এক্তিয়ারের বাইরে, তাই আমি মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এই জিনিস আরও দু’বার হয় তারপর। ঠিক চোদ্দো দিনের ব্যবধানে। আমি ভেবেছিলাম, এটা পমের কিছু শারীরিক সমস্যার ফলে হচ্ছে, বা কোনও ওষুধপত্রের এফেক্ট। কিন্তু আজ একটা বিজ্ঞাপন দেখে আমার মাথাটা খুলে গেল।”

     “কী বিজ্ঞাপন?” দু’জনেই জিজ্ঞেস করায় একটু আত্মপ্রসাদই হল। দ্রুত ট্যাপ করে ট্যাবে তুলে ধরলাম বিজ্ঞাপনটা। পাশাপাশি কমেন্ট্রির মতো করে কথা চালিয়ে গেলাম।

     “অত রঙ এমনি-এমনি হাভেনের পরিবেশে হওয়া অসম্ভব। স্বপ্নেও ওই জিনিস দেখা কঠিন, কারণ যে জিনিস বাস্তবে একবারও কেউ দেখেনি সে ওটা কল্পনা করবেই বা কীভাবে? তাই আমার মনে হয়েছিল, পম একটা সিমুলেশনের মধ্যে চলে গেছিল। সেখানে যে তার সামনে এসেছিল, সে তাকেই স্বপ্নে দেখেছে ও দেখিয়েছে। আর এই সিমুলেশনের আদর্শ জায়গা…”

     দেওয়ালের স্ক্রিনের সঙ্গে ট্যাবের সংযোগ হয়ে যাওয়ামাত্র লাফিয়ে ওঠে বিজ্ঞাপনটা। লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল রঙের বন্যায় ভেসে যাই আমরা।

     “ফল!” চিফ ফিসফিস করেন, “ড্রাই ডক জেন্ট্রিফিকেশনের অঙ্গ হিসেবে যে রেস্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন সেন্টারটা বানানো হয়েছে।”

     “হেমন্ত যেখানে শুধুই আপনার।” জোরে-জোরে পড়ে রডরিগেজ, “রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ আর স্পর্শ দিয়ে খুঁজে নিন নিজের ‘ফল সিজন’-কে।”

     “খুনগুলো হয়েছে এই এলাকার ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে।” আমি স্পষ্ট করি।

     “কিন্তু…” বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলেন চিফ, “পম কি তাহলে সেই রাতগুলোতে লুসিড ড্রিমজ-এ ছিল না? ও কি তাহলে ফল-এ ছিল?”

     “না চিফ।” এবার রডরিগেজ স্পষ্ট গলায় বলে, “আমি অনুমতি বের করতে গিয়ে রেকর্ড দেখে নিশ্চিত হয়েছিলাম। মেগাকর্প নিজের সোনার ডিম পাড়া হাঁসেদের ওখান থেকে বেরোতে দেয় না। পম ওখানেই ছিল।”

     “তাহলে?”

     “উত্তরটা জানার জন্য আমাকে ফল্‌-এ যেতে হবে চিফ।” আমি রডরিগেজের হাতে অল্প করে চাপ দিই, “একা। আমি আর কাউকে ঝামেলায় ফেলতে চাই না।”

     “কবে যেতে চাও?” চিফের গম্ভীর গলা শুনে বুঝি, ক্যালেন্ডারের দিকে তাঁরও চোখ গেছে।

     “আজকেই।” আমি বলি, “আগের খুনটার পর চোদ্দো দিন পূর্ণ হবে আজ রাতেই। পমের সেশন শুরু হতে আর কয়েক ঘণ্টা। অর্থাৎ আমাদের হাতে একদম সময় নেই।”

 

জন, ড্রাই ডক, রাত আটটা

“এই বুড়ো! কথা কানে যাচ্ছে না? এখান থেকে বিদেয় না হলে দেব পেছনে…”

     কাঁচা খিস্তিগুলো আমার কানে ধাক্কা মেরে আবার মিশে যায় শুকনো বাতাসে। আমি নড়ি না। মন দিয়ে দেখি পরিবেশটা। কয়েকটা ফাঁকা গুদাম, আবর্জনার স্তূপ, মৃতপ্রায় গাছ আর আগাছায় ছাওয়া একটা পার্কের ধ্বংসাবশেষ, চাপ-চাপ অন্ধকারে শুধু দূর থেকে ভেসে আসা আলোর এক-আধটা ঝলক। হুঁ, জায়গাটা দু’নম্বরি কারবারের পক্ষে আদর্শ বটে। কিন্তু এই খুনগুলো কি সেভাবে হয়েছে?

     পেছনে পায়ের শব্দটা এগিয়ে আসে। গলার আওয়াজটাও জোরালো হয়।

     আমি পারি ওকে শান্ত করতে। ওর গলার নীচে থিরথির করে কাঁপতে থাকা ভয়ের নদীটা যাতে বরাবরের মতো শুকিয়ে যায়, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়াই যায়। কিন্তু কী লাভ হবে তাতে? ওর বদলে আরেকজন আসবে এখানেই ডিউটি করতে। তারপর আরেকজন…

     “রিকভারি ব্র্যাঞ্চ।” কিছুটা পাশ ফিরে আমি আইডি-টা তুলে ধরি। অল্প আলোতেও হলোগ্রামটা ঝলসে ওঠে। লোকটা থমকে যায়।

     “তুমি এখানে একা কেন?” আমি জিজ্ঞেস করি, “মিলিশিয়া জায়গাটা কর্ডন করে দেয়নি এখনও?”

     “ক… করেছে স্যার।” লোকটা আমার বয়স দেখে পদ আন্দাজ করার চেষ্টা করছে দেখছি, “আমার সঙ্গীরা ব্লকের অন্য দিকে আছে। সবে সন্ধে হল তো…”

     আমি কিছু বলি না। চুপচাপ লোকটার দিকে চেয়ে থাকি। ও আরও কুঁকড়ে যায়। আমি জানি, পাশের ব্লকে ‘ফল’ নামের ওই সেন্টারটা চালু হওয়ার পর এই এলাকায় লোকের আনাগোনা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে আদিমতম পেশার কারবারও। লোকটা নির্ঘাত এই এলাকায় যারা সার্ভিস দেয় তাদের থেকে নগদে বা অন্যভাবে তোলা আদায়ের জন্য এখন এদিকটায় একা ছিল।

     “কাউকে এদিকে আসতে দেখেছ?” আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করি, “লাস্ট রিপোর্ট দেখি।”

দিনের দুঃসহ তাপ কমে গিয়ে মরুভূমির দিকে থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে এখন এদিকে। তার মধ্যেও লোকটার মুখে বিনবিনে ঘাম জমতে দেখি।

     “কেউ আসেনি স্যার। তা…তাই রিপোর্ট পাঠাইনি। এখন পাঠাব?”

     “না।” আমি সংক্ষেপে বলি, “আমাকে কাজ করতে দাও।”

     লোকটা প্রায় হাঁফ ছেড়ে দূরে সরে যায়। আমি জানি, টর্চ বা ফ্ল্যাশলাইট বের করছি না দেখে ও অবাক হবে। তবে আমার এ-সব লাগে না।

     বেম্যাক্স জেলে থাকলেও ওর দলটা বাইরে আছে। তাদের কাজ করার পদ্ধতি খুব সরল। দুটো গাড়ি এমনভাবে কাছাকাছি আসবে যা দেখে সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরাও ভাববে, এই বুঝি অ্যাক্সিডেন্ট হল! ড্রাইভাররা নেমে এসে চোটপাট করবে। পেছনের যাত্রীরা নেমে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করবে। এই ফাঁকে ব্যাগ বদল হয়ে যাবে। এই জিনিস এখানে হয়েই থাকতে পারে। তিনটে শরীর এই ব্লকের তিন জায়গায় পাওয়া গেছিল ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকটা জায়গাই রাস্তার কাছাকাছি। হয়তো ডিল ঠিকমতো হয়নি বলে ক্যারিয়ারটিকে ওড়ানো হয়েছে। মিলিশিয়া ঠিক এই অ্যাংগেলেই ব্যাপারটা দেখছে। কিন্তু…

     আলী, মানে হাভেন মিলিশিয়া-র যে অফিসার এই খুনগুলো নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, তিনি একটা জিনিস জানেন না। এই ব্লাস্টারের মাত্র দু’টি পিস বানানো গেছিল। অন্যান্য অস্ত্রের সঙ্গে সেগুলো পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ে বেম্যাক্স। মিলিশিয়া কিন্তু ওর কাছে একটাই ব্লাস্টার পেয়েছিল। আমার মাথাব্যথা অন্য হারিয়ে যাওয়া ব্লাস্টারটা নিয়ে। ওটা দিয়ে খুনগুলো হতেই পারে, কিন্তু তাতে একটা সমস্যা আছে। এই অস্ত্রটি একটি প্রোটোটাইপ। রাইফেলের মতো লম্বা নয়, বরং ছোটো আকারের একটা হ্যান্ডগানের মতো জিনিস এটা। স্বচ্ছন্দে নাড়াচাড়া করা গেলেও এটা কাজে লাগানো এই মুহূর্তে অসম্ভব। শক্তির উৎস যে ক্রিস্ট্যাল, সেটা থেকে মারাত্মক তাপ তৈরি হয়ে অস্ত্রের পেছনদিকটাকেও প্রায় গলিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে যে এটা ফায়ার করছে, বিশেষভাবে সুরক্ষিত না থাকলে তার বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

     কিন্তু অন্য কারও শরীর তো এখানে পাওয়া যায়নি। তাহলে ঠিক কী হয়েছে এখানে?

     “প্রথম বডিটা ওই… ওইখানে পড়ে ছিল স্যার।” লোকটা চেঁচিয়ে বলে। নিজেকে ঠান্ডা রাখি আমি। আমাকে দেখে লোকটা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তাই ও চেষ্টা করছে একইসঙ্গে আমাকে তুষ্ট করার, আর ওর সঙ্গীদের ডাকার।

     মাথা ঝাঁকিয়ে আমি লোকটার চিহ্নিত করা জায়গার কাছে যাই। ঘটনার পর প্রায় দু’মাস কেটে গেছে ঠিকই। কিন্তু পুলিশি কর্ডনের মধ্যে থাকায় সাইটে কিছু জিনিস এখনও আমার… বিশেষ চোখে ধরা পড়ে। তার মধ্যে প্রথমটাই আসল। ওই ব্লাস্টার এখানে ফায়ার করা হলে আশেপাশের দেওয়ালে আমি কিছু ট্রেস পেতামই। ডাইলিথিয়াম ক্রিস্ট্যালের রেডিয়েশন সহজে যাওয়ার জিনিস নয়। সেরকম কিচ্ছু এখানে ছিল না। অর্থাৎ, খুনটা এখানে হয়নি।

     হনহনিয়ে আমি বাকি দুটো জায়গাও দেখি। হ্যাঁ, এখানেও একই ব্যাপার। ব্লাস্টার ফায়ার হওয়ার কোনও চিহ্ন নেই। মাটিতে ঘষটানোর দাগ ছিল না। তবু আমি নিশ্চিত হলাম, বডিগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু কোত্থেকে? কীভাবে?

     ততক্ষণে লোকটার দুই স্যাঙাত এসে গেছিল। দলে ভারী হয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল হাভেন মিলিশিয়ার তিন নওজোয়ান।

     “আপনার আইডি-টা দেখাবেন।” নিচু গলায় বলল ওদের একজন। বাকিদের হাতগুলো জ্যাকেটের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করছিল।

     আমি একবার ভাবলাম মিলিশিয়া-র উর্দির আড়ালে কাজা করা, আসলে তিনটে আপাদমস্তক বদমায়েশকে শহরের বুক থেকে পার্মানেন্টলি দূর করে দেব কি না। তারপর নিজেকে শান্ত রাখলাম। আইডি-টা বের করে, লোকটার খুব কাছে গিয়ে সেটা ওর চোখের সামনে তুলে ধরলাম। বললাম, “তোমাদের র‍্যাংক আর নামওয়ালা ট্যাগগুলো এবার দেখি। মিলিটারি-র জিনিস নিয়ে খুনোখুনি হয়েছে যেখানে, সেই জায়গার শান্তিরক্ষকদের নাম রিপোর্টে না থাকলে চলবে?”

     লোকগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর একজন জিজ্ঞেস করল, “মিলিটারি-র জিনিস? আমাদের তো তেমন কিছু…”

     আমি হাসলাম। একমাথা সাদা চুল, ঈষৎ কুঁজো দাঁড়ানোর ভঙ্গি, মামুলি ওভার-অল পরা চেহারাটা দেখে কেউ আন্দাজ করতে পারে না। তবে কাছ থেকে আমাকে দেখলে যে অনেকেই ভয় পায়, সেটা আমি জানি। সেই এফেক্ট কাজে লাগিয়েই, প্রায় ফিসফিস করে বললাম, “এখন তো জানলে। এবার ভেবে দেখো, রিপোর্টে কী লিখবে।”

     লোকগুলো হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আমি কিন্তু দাঁড়ালাম না। হাঁটা লাগালাম বড়ো রাস্তার দিকে। ততক্ষণে তিনটে জিনিস বুঝে গেছিলাম।

     প্রথমত, তিনটে জায়গার কাছেই আধমরা ঘাসে আমি একটা অদ্ভুত গন্ধ পেয়েছি। প্রথম দুটো সাইট থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তিন নম্বর স্পটে গন্ধটা ধরার মতো ছিল। অনেকটা… শুকনো রজন বা ধুনোর মতো মিষ্টি গন্ধ। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, কারণ প্রাকৃতিক কোনও গন্ধ এতদিন থাকতে পারে না। ওটা কোন ধরনের কেমিক্যাল থেকে আসতে পারে সেটা নিজের রেকর্ড ঘেঁটে বের করে ফেলেছিলাম। সেই অনুযায়ী অন্য দুটো সাইটে খুঁজতেই ওখানেও কেমিক্যালটা পেলাম। এর একটাই অর্থ। শরীরগুলো যে এখানে নিয়ে এসেছিল, তার গায়ে এই কেমিক্যাল লেগে ছিল।

     দ্বিতীয়ত, গাড়ি থেকে বডি নামানো হয়েছে, এমন কিছু কেউ দেখেনি। স্পটগুলো খুঁটিয়ে দেখে সেখানে মিলিশিয়ার ভারী জুতোর ছাপ ছাড়াও মাটিতে কয়েকটা অন্যরকম দাগ দেখেছি। মনে হয়, ট্রলি গোছের কিছু একটা জিনিস কেউ ঠেলেছিল। তাহলে কি ওতে করেই পুড়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে আসা হয়েছিল? কিন্তু সেরকম কিছু হলে রাস্তায় কেউ সেটা দেখবে না? হ্যাঁ, একটা সম্ভাবনা আছে অবশ্য। ট্রলি গোছের জিনিসটা যে ঠেলেছিল, সে যদি রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও গাড়ির পাশে-পাশে চালিয়ে স্পটের কাছে আসে, তারপর পার্কে ঢোকে… কিন্তু সেভাবে খুব বেশি দূরত্ব পেরোনো অসম্ভব। তার মানে খুনের জায়গাগুলো এখান থেকে খুব একটা দূরে হবে না।

     তৃতীয়ত, যে এখানে শরীরগুলো ফেলেছিল, সে তারপর প্রকাশ্যে থাকতে চাইবে না। খুব সহজ হিসেবেই সে তারপর যত দ্রুত সম্ভব নিজের জায়গায় ফিরে যেতে চাইবে। তিনটে জায়গা থেকেই আমি সরলরেখা বরাবর তাকিয়ে দেখেছিলাম চার পাশে। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু দেখিনি। তবে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, তিনটে স্পট থেকেই তাকালে একটা কমন জায়গা দেখা যায়।

     ফল!

 

ট্যান, ফল্‌-এর ভেতরে, রাত নটা

রঙের রোশনাই!

     কথাটা হলোভিডে চরিত্রদের মুখে মাঝেমধ্যে শুনেছি বটে, কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পেলাম এই প্রথম। আর শুধু কি রঙ? সঙ্গে ভেসে আসছিল গাছের মধ্য দিয়ে হাওয়া বয়ে যাওয়ার শব্দ, পাখিদের ডাকাডাকি, ঝরা পাতার এলোমেলো নড়াচড়া… এমন আরও কত শব্দ। সেই হাওয়া যেন আমাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তাতে মিশে ছিল শুকনো, মিষ্টি একটা গন্ধ – যেটার কথা পম বলেছিল!

     সত্যি বলছি, মনে হচ্ছিল সব ছেড়েছুড়ে এখানেই থেকে যাই। শুধু আমার একারই এমন মনে হচ্ছিল না। আমার আশেপাশে যে ক’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই বাক্সের মতো বাড়িটার দেওয়াল, মেঝে, ছাদের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটছিলেন, তাঁদের সবার মুখে লেখা ছিল এই পরিবেশে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা।

     ছোটোরা ছুটোছুটি করছিল এদিক-ওদিকে। তাদের পায়ের নীচে করিডর কখনও হয়ে যাচ্ছিল টলটলে জল। কখনও বা কমলা হয়ে ওঠা বাঁশবনের ডগা দিয়ে মুখ বের করা হাতির দল দেখে তারা তারস্বরে চিৎকার করে উঠছিল। তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবক, কাউন্সিলর, টিচাররা পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন সবার ওপর নজর রাখতে গিয়ে। তারই মধ্যে যতবার তাঁরা দেওয়াল আর ছাদের দিকে তাকাচ্ছিলে, তখনই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁদের চোখ সেদিকেই স্থির হয়ে যাচ্ছিল।

     আর আমি?

     নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, এগুলো সব কৃত্রিম। আমাদের আশেপাশের দেওয়ালে ছড়িয়ে থাকা নানা রাসায়নিক আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সঙ্গে কথা বলছে। তাতে তৈরি হচ্ছে রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দের এক সমুদ্র। সেই সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছি আমরা। কিন্তু জবরদস্ত সাইক-ট্রেইনিং সত্বেও আমি নিজেকে পাথুরে রাখতে পারছিলাম না। অসহ্য সুখে, পুরোনো দুঃখের স্মৃতিতে, এমন কোনও পরিবেশে কোনওদিন কারও হাত ধরে হেঁটে না যেতে পারার আক্ষেপে কাঁদছিলাম আমি। কখন যে এর মধ্যে শো শেষ হয়েছে, পায়ে-পায়ে আর সবার মতো আমিও পৌঁছে গেছি গাছ আর ঝিল, বন আর নদী দিয়ে ভরা, আসলে ঘর আর করিডরে ভরা ওই স্বপ্নপুরীর শেষে, খেয়ালই হয়নি। হঠাৎ কানের পাশে বসানো সাবস্পেস রিসিভারটা গুঞ্জন তুলল, “ট্যান! তুমি কি পজিশন নিয়েছ?”

     চিফ শেষ অবধি আমাকে একা ছাড়েননি। একা, নিরস্ত্র অবস্থায় আমি কোনও সিরিয়াল কিলারের সন্ধানে যাব – এটা ওঁর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই ফল্‌ থেকে কিছুটা দূরত্বে, একটা আবর্জনায় ভরা পার্কের পাশে বসে হ্যাং-ওভার কাটানোর অভিনয় করছে রডরিগেজ। সোব্রাইটি প্যাচের মতো দেখতে যে জিনিসটা ওর কপাল আর কান ঢেকে রেখেছে, সেটা আসলে সাবস্পেস কমিউনিকেটর। জিনিসগুলো খুব বেশি দূরত্বে কাজ করে না। তাও ওর কথা আমি এত স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি! তার মানে আমি নিশ্চয় বাইরে বেরোনোর প্রধান রাস্তার খুব কাছে এসে পড়েছি।

     ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলার মতো একটা জায়গা খুঁজতে গিয়ে মুশকিলে পড়লাম। ছোটোদের একটা বিরাট স্রোত চিৎকার করতে-করতে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল পাশের দিকে। ঢেউটা যেখানে গিয়ে থামল সেটা লোকের ভিড়ে তখন গমগম করছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম, ফল্‌-এর এই অংশটা মূলত ছোটোদের জন্যই সাজানো। একটা বিশাল আর্কেড এটা, কিন্তু আর পাঁচটা আর্কেডের মতো গেমস খেলার ব্যবস্থা নেই এখানে। তার বদলে এখানে রয়েছে ফোয়ারা, খাবারের স্টল, আর একটা বিশাল গোলাপি বেলুন।

     বেলুনটার আকার একটা হাতির মতো!

     এক ঝটকায় আমি নিজের মিশনে ফিরে এলাম।

     এদিক-ওদিক তাকিয়ে আর্কেডের দোকানগুলো খুঁটিয়ে দেখলাম। হ্যাঁ, ওই তো! আইসক্রিম আর ক্যান্ডি ফ্লসের স্টল রয়েছে ওই কোণে। আর… ওই প্রান্তে একটা দোকানের সামনেও বিরাট ভিড় দেখছি। বাব্বা! স্বয়ং গ্রিন ম্যান, মানে সবুজ পোশাক পরা, সর্বাঙ্গে সবুজ পাতা, হলুদ ফুল্ম বাদামি ডাল গুঁজে রাখা একটা লোক ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটোদের একটা দঙ্গল ওখানে ঘুরছে। বড়োরা ওখান থেকেই কচিকাঁচাদের কিনে দিচ্ছেন নানা খেলনা – যাদের মধ্যে ছোট্ট হাতিও আছে দেখছি।

     তার মানে শিকার ধরার জন্য এই জায়গাটা কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এর মধ্যে খুনগুলো হবে কীভাবে? ভাবতে-ভাবতেই শুনলাম, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা হচ্ছে, “মাননীয় অতিথিদের জানানো হচ্ছে, ‘ফল্‌’ আজকের মতো বন্ধ হচ্ছে। দয়া করে বেরিয়ে আসুন। আমরা এবার সব বন্ধ করব। রোবো ক্লিনিং সার্ভিসের সঙ্গে দয়া করে সহযোগিতা করুন…।”

     চারদিক দেখতে-দেখতে আর্কেডের একপ্রান্তে চলে এসেছিলাম। একদিকের নিচু রেলিঙে হোঁচট খেয়ে আরেকটু হলেই ওপাশের ঢালু জায়গাটায় পড়তাম! একজোড়া শক্ত হাত আমাকে শেষ মুহূর্তে ধরে না ফেললে আমার আজকের মিশন লেংচে-লেংচে এখান থেকে বেরোনো দিয়েই শেষ হয়ে যেত। নিজেকে সামলে নিয়ে আমার সাময়িক রক্ষাকর্তাকে দেখলাম।

     “আপনার চোট লাগেনি তো?” আরবি আর স্ট্যান্ডার্ড – দুটো ভাষা মিশিয়ে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, “এই জায়গাটার সামনে বড়ো-বড়ো করে লেখা আছে, এদিকে আসা বারণ। তাও দেখুন, আপনিই চলে এলেন। আমরা তাহলে ছোটোদের কী করে সামলাব?”

     পিসি ছাড়া আর কেউ এরকম রাগ আর স্নেহ মিশিয়ে আমাকে বকে না। কেন যেন, আমার হঠাৎ খুব কান্না পেয়ে গেল। নিজেকে একটা কড়া ধমক দিয়ে সামলাতে চেষ্টা করলাম।

     ভদ্রলোক মাঝবয়সী। অত্যন্ত সৌম্যদর্শন। হলোভিডে কলেজের ফিলোজফি বা অঙ্কের টিচাররা যেমন দেখতে হন, ওঁকে দেখেও তেমনই মনে হচ্ছিল। পরনের সাদা পোশাকে দুটো আড়াআড়ি কমলা আর সবুজ স্ট্রাইপ বুঝিয়ে দিচ্ছিল, উনি ‘ফল্‌’-এর স্টাফ। বুকের কাছে ঝলমল করছিল আইডি। এদিকে আলো তুলনামূলকভাবে কম হলেও আমি লেখাটা পড়তে পারলাম।

     “ডক্টর… জাকির?” আমি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করলাম, “আমি আসলে এই জায়গাটায় এসে অবধি… কেমন যেন একটা হয়ে গেছি।”

     জাকির মৃদু হাসলেন। তারপর খুব ভদ্রভাবে আমার কনুই ধরে আমাকে বাইরে যাওয়ার রাস্তার দিকে নিয়ে গেলেন। যেতে-যেতে ভদ্রলোক শুধু বললেন, “ফল্‌ একটা পুকুর, যেখানে আপনার ছোটোবেলা সবসময় ধরা থাকবে। জলটা স্থির থাকবে না। কিন্তু পুকুরটা কালও থাকবে। আপনি কাল আবার আসুন, তবে এখন আর থাকবেন না। এবার আমাদের সব গোছাতে হবে তো।”

     “গোছাতে?” আমি না ভেবেই প্রশ্ন করি, “এগুলো কি ওই রিপাবলিকান থিয়েটারের মতো প্রপস্‌ দিয়ে সাজানো?”

     “আরে না-না!” হেসে ফেলেন জাকির, “সিনিয়র টেকনিশিয়ান হিসেবে ফল্‌-এর সিক্রেটগুলো তো আমি আপনাকে বলে দিতে পারি না। কিন্তু মরুভূমির মধ্যে এই শহরে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর কয়েকটা টুকরো আপনাদের সামনে তুলে ধরার জন্য আমাদের প্রচুর খাটতে হয়। আজ রাতে আবার সেগুলো ঠিকমতো না করা হলে কাল যাঁরা আসবেন, তাঁদের ভালো লাগবে কি?”

     “আচ্ছা,” তাও আমি অবুঝের মতো প্রশ্ন করি, “ওই দিকটায় কী আছে?”

     “আমাদের এই কমপ্লেক্সের জন্য এনার্জি তৈরি হয় ওর ঠিক নীচেই।” কোনও বাচ্চাকে বোঝানোর মতো করেই বলেন জাকির, “আমার মতো টেকনিশিয়ানদের থাকার ব্যবস্থাও ওখানেই। আপনাকে পরে কখনও আপ্যায়ন করব। কিন্তু আজ আর থাকবেন না, প্লিজ।”

 

বাধ্য মেয়ের মতো আমি আর্কেড থেকে বেরিয়ে এলাম। ছোটো-বড়ো সবাই তখন ফল্‌ থেকে বেরোচ্ছে। আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা লুকোনোর জায়গা খুঁজছিলাম, যেখান থেকে রডরিগেজের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। মরিয়া হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। তারপর নিজের রিস্টপ্যাডে ট্যাপ করে রডরিগেজিকে একটা মেসেজ পাঠানোর চেষ্টা করলাম। কপাল ভালো বলতে হবে, কোনওভাবে ওটা গন্তব্যে পৌঁছল! একটু পরেই জবাবি মেসেজ ঢুকল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী ফল্‌-এর ফ্লোর প্ল্যান। ক্যামেরাগুলোর অবস্থান দেখানো ছিল, যাতে ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমি কোনওভাবে আর্কেডের দিকটায় যেতে পারি।

     এবার আর অন্ধভাবে নয়। আমি একটা আন্দাজ পেয়েছি, কীভাবে এখানে কোনও প্রিডেটর শিকার করতে পারে।

     ব্যাপারটা খুব সহজ। কোনও বাচ্চা যদি গিফট চেয়েও না পায়, তারপর মা-বাবা-টিচারের ওপর অভিমানে ওই নিচু রেলিঙের দিকটায় সে ঠোঁট ফুলিয়ে বসতেই পারে। ব্যাপারটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি, কারণ ছোটোদের থেকেই বেশি করে বড়োরা ফল্‌-এর প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল। সেই অবস্থায় কেউ ঘ্যানঘ্যান করলে বাচ্চাটি চড়-থাপ্পড়ও খেয়ে যেতে পারে। কোনও পেডোফাইল এই অবস্থার সুযোগ নিতেই পারে। যতক্ষণে বাচ্চাটির অনুপস্থিতি টের পাওয়া যাবে, ততক্ষণে হয়তো কোনও… ক্ষতি হয়ে গেছে। সেটা জানতে-বুঝতেই অনেক সময় লেগে যাবে।

     ওই জায়গাটাতেই যেতে হবে আমাকে। হতেই পারে যে আজ রাতে কিছু হবে না। তবে দশটার আগে জায়গাটা পুরো ফাঁকা হবে না। এই আধঘণ্টা আমাকে কড়া নজর রাখতে হবে আর্কেডের ওই অংশটার ওপর। কিন্তু কোথায় পজিশন নেওয়া যায়?

 

জন, রাত সাড়ে ন’টা, ফল্‌-এর বাইরে

“সব পাখি ঘরে আসে – সব নদী…” আমার মনের মধ্যে কথাটা কোত্থেকে যেন উঠে এল। হাভেনের আকাশে ড্রোন ছাড়া অন্য কিছুকে পাখি বলা যাবে না। আর নদী? সে তো তার চেয়েও কষ্টকল্পনা! তবু কথাটা আমার মাথায় এল, কারণ গত দেড় ঘণ্টা ধরে এই ব্লকের আশপাশ তন্নতন্ন করে দেখে আমি সেখানেই এসে পৌঁছেছি, যেখানে আমার আসার কথা ছিল।

     ফল্‌!

     ওই বিশেষ ব্লাস্টার ফায়ার করার কোনও চিহ্ন আমি এই এলাকায় পাইনি। ডাইলিথিয়াম রেডিয়েশনের চিহ্ন আমার নজর থেকে লুকোনো অসম্ভব। তাই দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি, এই এলাকার কোথাও বেম্যাক্স বা অন্য কারও দলবল ও জিনিস ব্যবহার করেনি।

     শুকনো গন্ধের জন্য দায়ী কেমিক্যালের ট্রেস পেয়েছিলাম পার্কের গা-ঘেঁষা একটা সরু রাস্তায়। ওটা আদতে একটা সার্ভিস রোড। ফল্‌-এ দর্শক ও অন্যদের নিয়ে আসা গাড়িগুলো থাকে পার্কিং লটে, আর তাদের চেয়ে বড়ো গাড়িগুলো থাকে ওই রাস্তার ধারে। বুঝতে পেরেছিলাম, বডিগুলো এই রাস্তা ধরেই নিয়ে আসা হয়েছিল। কেমিক্যালের পিছু নিয়ে পার্কিং লট অবধি এসেছিলাম। কিন্তু তারপর আটকে গেছি। আসলে মাথার মধ্যে একগাদা প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছে।

     প্রথমত, বডিগুলো যেখানে পড়েছিল সেখানে মাটিতে দাগ দেখে ট্রলির কথা মনে হয়েছিল। এই জায়গাতে এখনও লোকের আনাগোনা যথেষ্ট। এখান দিয়ে ট্রলিতে চাপিয়ে একটা লোকের আধপোড়া শরীর নিয়ে যাওয়া হলে কারও নজরে পড়ার কথা। কিন্তু কেউ তো তেমন কিছু দেখেনি। এটা কীভাবে সম্ভব?

     দ্বিতীয়ত, গাড়িগুলো যে জায়গা জুড়ে দাঁড় করানো রয়েছে, তার ওপাশেই কংক্রিটের দেওয়াল। দেখে নিয়েছি, ওতে কোনও ফাঁকফোকর কি দরজা নেই। অথচ খুনগুলো এখানেও হয়নি। তাহলে বডিগুলো কীভাবে ওপরে এল?

     বুঝতে পারলাম, আমার মতো স্ক্যানার বা ট্র্যাকার না থাকলেও আলী এই দিকগুলো খুঁজে, হাল ছেড়ে দিয়েই এখন বেম্যাক্সের দলের পেছনে ধাওয়া করেছে। আমিও কি তাই করব?

     “ও মশাই!” পেছন থেকে হেঁড়ে গলায় একটা গলা ভেসে এল, “আপনি কি এখানকার স্টাফ?”

     পেছন ঘুরে বুঝলাম, হাভেন মিলিশিয়ার আর এক বীরপুঙ্গব হাজির হয়েছে, তবে এ ট্র্যাফিকের।

     “মেইনটেন্যান্স।” মিষ্টি হেসে পকেট থেকে আইডি-র কোণটা স্রেফ বের করে দেখালাম, “কেন অফিসার?”

     “কিউব থেকে মেসেজ এসেছে, আরও দু’গাড়ি মিলিশিয়া আসছে এখানে।” বিরক্ত মুখে বলল লোকটা, “আমরা ওই জায়গাটাতেও গাড়ি রাখব। আপনি কর্ডন সরিয়ে নিন।”

     লোকটার দেখানো জায়গাটার কাছে গেলাম। ফল্‌-এর ট্রেডমার্ক কমলা আর সবুজ রঙের কোন দিয়ে ঘেরা ছিল জায়গাটা। কংক্রিটের মেঝেতে একেবারে ফ্লাশ হয়ে থাকা একটা চৌকো অংশ, তবে তার গায়ের চিহ্নটা বলছিল, এটা একটা মেইনটেন্যান্স শিফট। বাইরের দিকে কোনও হাতল নেই, মানে এটা ভেতর থেকে খোলে।

     হঠাৎ আমার মাথার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিসেব মিলে গেল।

     ব্লাস্টার বাইরে ফায়ার করা হয়নি। কিন্তু ফল্‌-এর ভেতরে যদি খুনগুলো হয়ে থাকে তাহলে ব্যাপারটা বোঝা যায়। ওই গন্ধের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়, কারণ ওটা ফল্‌-এর সিগনেচার। তাছাড়া জায়গাটার ভেতরে এতরকম কেমিক্যাল আর রেডিয়েশন কাজ করছে যে তার যাবতীয় চিহ্ন অন্য জিনিসে ঢাকা পড়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।

     ওই শ্যাফট দিয়ে বডি বের করে আনাও সহজ হবে। নিজের জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে জানি, শ্যাফটে থাকে দুটো নড়াচড়া করার মতো অংশ। তার একটা ভারী যন্ত্রপাতি তোলা-নামানোর জন্য, সেখানে ট্রলি রাখা যেতে পারে। অন্যটা তার পাশেই ওঠে-নামে, তাতে একজন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

     কিন্তু… ট্রলিতে চাপিয়ে কাউকে তুলে আনলে সেটা কেউ দেখবে না?

     “কী হল?” লোকটা খেঁকিয়ে ওঠে দূর থেকে, “আপনি নামলে নামুন। আমি ওর ওপর দিয়েই গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করব, এই বলে দিলাম! যতসব বুড়োদের নিয়ে কারবার…”

     লোকটা গজগজ করতে-করতে চলে যায়। আমার মাথায় হঠাৎ একটা অন্য দৃশ্য ভেসে ওঠে।

     ট্রলি বা রোলার নয়, অন্য একটা জিনিসে একটা লোক বসে থাকলে কারও অস্বাভাবিক ঠেকবে না। এমনিতে সে জিনিস ফল্‌-এ ঢোকা আর বেরোনোর রাস্তা অন্যদিকে। কিন্তু এখানকারই কোনও কর্মীর পোশাক পরে কেউ যদি সেই জিনিসটি নিয়ে এই শ্যাফট দিয়ে ওঠে, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকবে না।

     হুইলচেয়ার! সেই বস্তুটি এই শ্যাফট দিয়ে নীচ থেকে এখানে নিয়ে আসা, তারপর ভিড়ভাট্টার মধ্যে একটা বাসের দিকে সেটা ঠেলতে-ঠেলতে সার্ভিস রোড ধরে এগিয়ে যাওয়া – এই জিনিস কেউ দেখলেও তাই নিয়ে সে দু’বার ভাববে না।

     মন ঠিক করে ফেললাম। ওপর থেকে এই শ্যাফটের দরজাটা খোলা যাবে না। কিন্তু সেটা বললে ওই ট্র্যাফিকের লোকটি বা অন্যদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে যে আমি এখানকার কর্মচারী নই। আঙুল বুলিয়ে বুঝে নিলাম, ঠিক কোন জায়গা দিয়ে লকিং মেকানিজমের ছোট্ট ক্রিস্ট্যালগুলো চালু রাখার মতো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে। সপাটে সেখানে একটা ঘা দিলাম। অন্য কারও হাত ভাঙত। আমার… কিছু হল না। তবে ওই দরজার একটা কোণ ভেঙে গেল। আঙুল ঢুকিয়ে দিলাম জায়গাটায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজার যন্ত্রপাতি বুঝে গেল, আমি কী চাইছি।

     দরজাটা স্লাইড করে এক পাশে সরতে গিয়েও ওই কোণের অংশটায় আটকে গেল। তবে যতটুকু জায়গা হয়েছিল তা আমার নামার পক্ষে যথেষ্ট। পেছন ফিরে, ট্র্যাফিকের মিলিশিয়াটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নীচে নেমে পড়লাম। দুটো প্ল্যাটফর্মই তখন স্থির ছিল। আমি চাইলে ওদের যেকোনও একটাকে চালু করতে পারতাম। কিন্তু নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চাইছিলাম না। কেবলে হাত আর পায়ের ভর দিয়ে নীচে নামতে লাগলাম আমি। তবে সেই অবস্থাতেও প্রশ্নের পর প্রশ্ন আমার মাথায় হামলে পড়ছিল।

     ফল্-এ হুইলচেয়ার জোগাড় করা ওখানকার কোনও কর্মচারীর পক্ষে সহজ। কিন্তু ব্লাস্টার ফায়ার করে লোকগুলোকে খুন করার কারণ কী? তাছাড়া, খুনি ওই তাপ হজম করবে কীভাবে? ব্লাস্টারটাই তো একবার ফায়ার হওয়ার পর অকেজো হয়ে যাবে, তাহলে পরের দুটো খুন সে করল কীভাবে?

     নীচে নামার ঠিক আগে এক লাফে আমি অন্য একটা হাতল ধরে নিলাম। দেখতে পেয়েছিলাম, এনার্জি সেলগুলো আর ওপরের আর্কেডের মাঝে একটা মেজানাইন ফ্লোরের মতো জায়গা আছে, তবে আরও সরু। শরীরটা দুলিয়ে সেখানে ঢুকিয়েই…

     “আপনি?!”

 

ট্যান, রাত দশটা, ফল্‌-এর ভেতরে

রাগ বা বিরক্তি নয়, নিখাদ বিস্ময়! এই অনুভূতিটা হয়েছিল বলেই মেজানাইন ফ্লোরে আধশোয়া হয়ে আর্কেড আর নীচে নজর রাখা অবস্থাতেও আমার মুখ স্রেফ হাঁ হয়ে গেছিল তখন।

     এই বুড়োটা এখানেও? কোত্থেকে?? কেন???

     “মেজর।” খুব দ্রুত আমার পাশে শুয়ে, মাথা অল্প নড করে বলল লোকটা, “আপনাকে এখানে দেখব ভাবিনি। আপনি তো হোমিসাইডে নেই। তাহলে, এখানে…?”

     “সে কৈফিয়ত আপনাকে দেব কেন?” আমি হিসিয়ে উঠলাম, “তার চেয়েও বড়ো কথা, আপনি এখানে কী করছেন? আর হ্যাঁ, সেই রাতে স্টেশন থার্টিন থেকে আপনি বেরোলেন কীভাবে? তারপর কোথায়…”

     লোকটা হাত তুলে আমাকে থামাল। তারপর নরম গলায় বলল, “এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আপনি এখানে আছেন দেখে বুঝতে পারছি, যেকোনও মুহূর্তে আমাদের টার্গেটের সঙ্গে দেখা হতে পারে। তাই চুপচাপ অপেক্ষা করা যাক।”

     এতক্ষণে দারুণ রাগ হচ্ছিল লোকটার ওপর, কিন্তু কথাগুলো উড়িয়েও দিতে পারলাম না। তবু প্রশ্নগুলো চাপা দেওয়াও সহজ হচ্ছিল না। ফিসফিস করে বললাম, “আপনিও কি পেডো-কিলারের খোঁজে এসেছেন?”

     “কার?” বুড়ো যে সত্যিই অবাক হয়েছে বোঝা যাচ্ছিল।

     আমি একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে বললাম, “আমাদের… মানে আমার থিওরি অনুযায়ী, যারা খুন হয়েছে তারা সবাই পেডোফাইল ছিল। কেউ তাদের মারছে বেছে-বেছে। তাই খুনিকে ওই নামে ডাকছি।”

     “তার মানে আপনি হোমিসাইডে না থেকেও খুনিকে খুঁজছেন!” লোকটা থেমে-থেমে বলল, “আমি অত বড়ো কিছু করতে আসিনি মেজর। আমি ব্লাস্টারটা খুঁজছি।”

     “ব্লাস্টার!” আমার গলাটা উঁচুতে উঠেও নেমে এল, “অ। তার মানে ওটা আদতে…”

     “আমাদের জিনিস।” সবিনয়ে জানাল জন থ্যান্ড্রো।

     “ওটা এখানে আছেন জানলেন কী করে?” আমি হাল ছাড়ার পাত্রী নই, এ-কথা পিসি থেকে চিফ, সবাই জানেন। এই বুড়োও সেটা জানে, তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও আমাকে অতি-সংক্ষেপে বোঝাল, কেন ও অমনটা ভেবেছে।

     “স্টোরেজ ডিভিশনের তরফে আমিই এসেছি।” বলে কথাটা শেষ করল জন, “কিন্তু বাইরে তো আপনাদের বিরাট দল আসছে মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় আপনি কি লুকিয়েই থাকবেন?”

     আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই। জন যা বলেছে তার সঙ্গে আমার থিওরি মেলালে দুটো জিনিস পরিষ্কার হয়। সেগুলো আলীকে জানানো দরকার, নইলে এটা খুনের তদন্ত থাকবে না। বরং মিলিশিয়া বনাম অস্ত্রপাচারকারী – এই লড়াইয়ে মিশে ঘুলিয়ে যাবে পুরো ব্যাপারটা।

     প্রথমত, এই খুনগুলো ফল্‌-এর কোনও স্টাফ করেছে, নইলে হুইলচেয়ারে বডি চাপিয়ে এই শ্যাফট দিয়ে ওঠা যেত না।

     দ্বিতীয়ত, ফল্‌-এরই কোনও শিশু, বা এখানকার কারও ছেলে বা মেয়েকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই জন্য। রডরিগেজের কাছ থেকে প্ল্যান পাওয়ার পর আর্কেডে ফিরে, ক্যামেরাকে ফাঁকি দিয়ে, তারপর রেলিং ধরে ঝুলে নীচে নামতে আমার বড়োজোর মিনিট পনেরো লেগেছিল। তার মধ্যেই এখান থেকে বাইরের মানুষদের, এমনকি স্টলের দায়িত্বে থাকা সব্বাইকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। হ্যাঁ, পেডোফাইল গোছের কোনও প্রিডেটর স্বেচ্ছায় লুকিয়ে থাকতেই পারে। কিন্তু ওই অন্ধকার জায়গায় এখন বাইরের কারও পক্ষে…

     আরে! ওটা কে? কে যেন বসে আছে ওই নিচু রেলিঙের ধারেই। কোনও বাচ্চা মেয়ে বলেই তো মনে হচ্ছে! হ্যাঁ, একটা আট বা ন’ বছর বয়সী বাচ্চা মেয়ে। পরনে রাতের পোশাক। গভীর ঘুমের তলিয়ে থাকার মতো মেয়েটার থুতনি ঠেকে আছে তার বুকে।

     “রেডি হোন ট্যান।” ফিসফিস করে বলা কথাটা আমার কানের ভেতর দিয়ে মরমে পশিল, “টোপ এসে গেছে।”

     “কিন্তু কোত্থেকে এল?” আমিও যথাসাধ্য নিচু গলায় জানতে চাইলাম, “আর্কেড তো ফাঁকা ছিল একটু আগেও।”

     “রেলিঙের পাশে কৃত্রিম লনের মতো জায়গাটা দেখেছেন?” জন আঙুল তোলে, “সিঁড়ির মতো ছোট্ট-ছোট্ট ধাপ আছে ওখানে। আমরা এপাশে যেমন একটা ধাপের মতো অংশ পেয়েছি, তেমন অংশ নিশ্চয় ওদিকেও আছে। ওই জায়গাটা থেকেই মেয়েটা উঠে এসেছে।”

     “কিন্তু মেয়েটা তো ঘুমো…”

     আমার কথা শেষ হল না। তার আগেই হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠল আশপাশটা!

     আর্কেডের দোকান, ফাঁকা জায়গা, বেঞ্চ – সবকিছুর ওপর কখন যে মিহি কুয়াশার মতো একটা আস্তরণ নেমে এসেছিল, দেখিনি। কিন্তু এবার সেখানেই নতুন করে জেগে উঠল প্রাচীন মহীরুহের দল, টলটলে জল, নীল আকাশ, আর সবকিছুর ওপর খেলে বেড়ানো কমলা-বাদামি-সবুজ পাতার দল।

     আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম চারদিক। মেজানাইন ফ্লোরের সিলিং মাথার ঠিক ওপরেই ছিল বলে বেশ কষ্ট করে হলেও বুঝতে পারছিলাম, আমরা কোথায় আছি। কিন্তু এর বাইরে থাকা কেউ এটাই ভাববে যে সে চলে গেছে দূরে কোথাও, অনেক দূরের কোনও স্বপ্নলোকে।তখনই একটা ডাক শুনতে পেলাম, “রু…উ…উ…!”

     কোনও যন্ত্রের গড়া ডাক নয়। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, যেন কোনও বাবা যেন তার মেয়েকে অনেক আদর, অনেক ভালোবাসা নিয়ে ডাকছেন! আমার গায়ে কাঁটা দিল।

     মেয়েটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো করে চোখ মেলল। আমার বুকের ভেতরটা আপনা থেকেই লাফিয়ে উঠল। না, মেয়েটার নিষ্পাপ মুখ বা বড়ো-বড়ো দু’চোখে আশপাশ দেখার ওই ভঙ্গিমা দেখে আমি চমকাইনি। আমার অন্য একটা কথা মনে হয়েছিল।

     আমি কি মেয়েটাকে কোথাও দেখেছি?

     তখনই দেখলাম, কে যেন এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে।কালো ব্লেজার, মানানসই ট্রাউজার্স, সোনালি ফ্রেমের চশমা… সব মিলিয়ে যে লোকটা এগিয়ে আসছিল আর্কেডের ধারের পথটা ধরে, তাকে দেখে সৌম্যদর্শন বা অভিজাত – এমন বিশেষণই মাথায় আসে। কিন্তু আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে দিল, এ কী ধরনের মানুষ… বা অমানুষ।

     “তুমি এখানে একা কেন খুকি?” লোকটার গলাও মানানসই, মানে বেশ মার্জিত। কিন্তু ওর চোখ বলে দিচ্ছিল, লোকটা দেখে নিচ্ছেআর্কেডে ও আর বাচ্চা মেয়েটা ছাড়া আর কেউ আছে কি না।

     ঠিক তখনই আবার সেই “রু…উ…উ…!” ডাক ভেসে এল বাতাসে। মেয়েটা প্রথমে আকাশের দিকে, তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল।

     লোকটা ওকে কোলে নেওয়ার ভঙ্গিতে হাত সামনে নিয়ে এগিয়ে এল। তারপর নিচু হয়ে ওকে কোলে তোলার বদলে হাতটা ঢুকিয়ে দিল অন্য কোথাও। আমার গা ঘিনঘিনিয়ে উঠলেও দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে রেখেছিলাম, কারণ আমি খুনিকে দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু আর্কেডে, বা মেয়েটার পেছনের অন্ধকারে আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।

     “না!” একটা চিৎকার করে, ঠিক গুলির মতোই আমার পাশ থেকে ছিটকে সামনে এগিয়ে গেল জন। আমিও সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কোনওক্রমে বাইরে এলাম। কিন্তু আমরা কেউই কিছু করতে পারলাম না।

     মেয়েটার রাতপোশাক উঁচু করে, তার নীচ থেকে ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছিল একটা সরু মুখের মতো জিনিস। তারপরেই একটা সাংঘাতিক আলোর ঝলক আমাকে অন্ধ করে দিল। ব্লাস্টার ফায়ার আমার কাছে নতুন কিছু নয়। তাও, আপনা থেকেই আমার চোখ বন্ধ হয়েছিল তৎক্ষণাৎ। তারপরেও বেশ কিছুক্ষণ অজস্র ছোটো-বড়ো আলোর বল ছাড়া কিছু দেখতে পেলাম না। অন্ধের মতো করেই হয়তো আমি এগিয়ে যেতাম, কিন্তু দারুণ তাপের একটা দেওয়াল যেন সামনে গড়ে উঠেছিল। আমি সেটা ভেদ করে সামনে এগোতে পারছিলাম না।

     “কেন?” সেই উজ্জ্বল আর উত্তপ্ত অন্ধকারের মধ্য দিয়ে একটা নরম, সত্যিকারের ভদ্র আর দুঃখিত গলা ভেসে এল, “কেন এলেন আপনারা?”

     “ডক্টর জাকির,” জনের শান্ত গলাটা শুনতে পেলাম পাশ থেকেই, “ফল্‌-এর চারপাশে এখন মিলিশিয়ার ভিড়। আপনি পালাতে পারবেন না। আজ নিয়ে মোট চারটে খুনের দাগ মুছতেই আপনার বাকি জীবনটা কাটবে। পাপের বোঝা আর বাড়াবেন না, প্লিজ।”

     “চারটে?” জাকিরের হাসিটার মধ্যে একটা খিলখিলে ভাব ছিল। হাসি পাওয়ার বদলে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল ওটা শুনে। এই মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না।

     “চারটে না স্যার, আরও অনেক। তবে আপনাদের আমি মারব না। কিন্তু আমার মেয়ে যদি কিছু করে, তাহলে আমি কিছু করতে পারব না।”

     মেয়ে?! অতি কষ্টে চোখ মেলে মেয়েটার দিকে তাকাই। দৃশ্যটা দেখে শিউরে উঠি আমি।

     “আহ্‌!” জনের ঠান্ডা গলা শুনে আমার মনে হল ও যেন কোনও ল্যাবরেটরিতে এক্সপেরিমেন্ট দেখছে, “ট্যান্টালাম কার্বাইড আর হ্যাফমিয়াম কার্বাইডের অ্যালয় দিয়ে শরীরের মাঝখানটা বানানো। তাই এই ব্লাস্টারের তাপ সহ্য করতে পেরেছে ‘আপনার মেয়ে’। কিন্তু ওর বাইরের চেহারাটা যে ভীষণভাবে ড্যামেজড হল ডক্টর।”

     “সেজন্যই তো অপেক্ষা করতে হয় আমাকে।” সেই একইরকম হাসিমাখা গলায় বলেন জাকির, “কিন্তু ওর মাথাটা একদম ঠিকঠাক আছে। একটু পরেই ও আবার ঘুমিয়ে পড়বে, যতক্ষণ না আমি ওকে ডাকি।”

     হয়তো জনের ঠান্ডা গলা, বা আমার খুব কাছে ওর উপস্থিতির জন্যই আমিও দুয়ে-দুয়ে চার করতে পারছিলাম।

     জাকির একটা অ্যান্ড্রয়েড বানিয়েছেন। তার শরীরের ভেতরেই ফিট্‌ করা রয়েছে জনের বলা ওই বিশেষ রকমের ডাইলিথিয়াম ক্রিস্ট্যাল বসানো ব্লাস্টার। কিন্তু সেই শরীরের বাইরের অংশটা ক্লোনিং ভ্যাটে বানাতে সময় লাগে। তার জন্য যে পরিমাণ শক্তি লাগে, সেটাও একবারে জোগাড় করার চেষ্টা করলে নজরে পড়তে হবে। তাই সিনিয়র টেকনিশিয়ান হিসেবে লুকিয়ে-চুরিয়ে শরীরের বাইরেটা ঠিকমতো বানাতে চোদ্দো দিন লাগে। তাই এই মারাত্মক সাইকেল!

     “কিন্তু কেন?” আমি থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলাম, “কেন আপনি এদের মারছেন ডক্টর? মানছি, এরা নরকের কীটেরও অধম। কিন্তু আপনি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না!”

     “আইন!” জাকিরের হিংস্র গলায় ফুটে ওঠা রাগ আর যন্ত্রণার সামনে আমি টলে গেলাম, “আইন আমি আর মানি না ম্যাডাম। আমার মেয়েকে যারা… সেই ‘নরকের কীট’-দের আপনারা কিচ্ছু করেননি তো। এখন আপনাদের ভরসায় আমি এদের ছাড়ব না।”

     জন চোখের পাতা ফেলার আগেই নড়েছিল। কিন্তু জাকিরের মেয়ে… না, এই খুনি পুতুলটা দেখলাম তার আগেই ওর দিকে ঘুরল। আমরা দু’জনেই একদম স্থির হয়ে গেলাম।

     “বাহ্‌!” জাকিরের গলায় খুশিয়াল ভাবটা ফিরে এল, “লক্ষ্মী ছেলেমেয়ের মতো আপনারা এখানেই থাকুন। আমি আসি। ভয় নেই, ও খুব বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপনারা ছাড়া পাবেন। ততক্ষণে আমি অন্য কোথাও চলে যাব। আসি তাহলে?”

     আর্কেডের লাল-কমলা ভাবটা দ্রুত ফিকে হয়ে আসছিল। প্রায়ান্ধকারে আমি একজোড়া পায়ের শব্দ দূরে সরে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। আওয়াজটা কোন দিকে গেল?

     “আমি পুতুলটাকে আটকাচ্ছি।” জন নিচু গলায় বলে উঠল, “আপনি ওর পিছু নিন। জাকিরকে ধরতে না পারলে ও ঠিক অন্য কোথাও মাথাচাড়া দেবে, অন্য নামে, অন্য পরিচয়ে। তারপর আবার শুরু হবে অন্যভাবে এই খুনের খেলা।”

     “আপনি আটকাবেন? কীভাবে?”

     জন উত্তর দিল না। বরং পুতুলটার দিকে এক পা বাড়াল। পুতুলটা ওকে দেখল, কিন্তু ফায়ার করল না। আরেক পা এগোল জন, তারপর আরেক পা…। আমি বুঝতে পারছিলাম, দারুণ টেনশনে আমি প্রায় নড়তেই পারছি না। এদিকে জাকির এতক্ষণে কোথায় গেছে কে জানে?

     একটা শিসের আওয়াজ পেলাম আমি। চমকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, আওয়াজটা কি অন্ধকার থেকে এসেছে, না পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম থেকে, নাকি…

     জন থ্যান্ড্রো! শিসটা ও দিচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, শিস দিয়ে ও একটা সুর তুলছে ওর আর ওই পুতুলের মাঝের বাতাসে। সুরটা… চিনতে পেরেছি!

     “রু…উ…উ…!”

     চোখের সামনে দেখলাম, মেয়েটার মুখে ফুটে উঠল সেই ভুবনভোলানো হাসিটা, যা দেখার আশায় রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ঘরে ফেরে বাবা-মা! ওর শরীরের মাঝখান থেকে উঁচু হয়ে ওঠা কুৎসিত নলটা নেমে এল একটু-একটু করে।

     জন ওর কাছে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল।

     আমি জানি, জন থ্যান্ড্রো, স্টোরেজ ডিভিশন নিশ্চয় খুব ভালো অভিনেতা। কাজের অঙ্গ হিসেবেই হয়তো তাকে ওরকম হতে হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, যেন কোনও বাবা দীনহীন ভঙ্গিতে এক রাজকন্যার সামনে হাজির হয়েছে।

     পুতুল… নাকি জাকিরের মেয়ে… হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরল।

     অন্ধকারে জাকিরের পায়ের শব্দ যেদিকে মিলিয়ে গেছিল, সেদিকটা আন্দাজ করে নিয়ে আমি পাগলের মতো ছুটলাম।

 

রডরিগেজ, ফল্‌-এর বাইরে, রাত সোয়া দশটা

পার্টনার কোনও বিপজ্জনক জায়গায় নিরস্ত্র অবস্থায় গেছে, আর ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব চেপে চুপচাপ তার জন্য অপেক্ষা করছেন – এরকম অবস্থায় পড়েছেন কখনও? অ্যাসিডিটি বাঁধিয়ে ফেলবেন ওইরকম হলে, বলে দিলাম! আমি এই লাইনে ঘাগু লোক। তবু ওই পার্কের বাইরে বসে পোকার কামড় টের পাচ্ছিলাম না, কারণ আমার রীতিমতো টেনশন হচ্ছিল। আসলে ট্যান মেয়েটা বড়ো ভালো। না-না, আমাদের নিয়ে আবার হাবিজাবি ভাবতে বসবেন না। মেয়েটা এই অল্প বয়সেই এত ধাক্কা খেয়েছে, আবার তারপরেও উঠে দাঁড়িয়েছে বারবার – এই ব্যাপারটাই আমার দারুণ লাগে।

     কী যেন বলছিলাম? হ্যাঁ, ফল্‌-এর ভেতরে তখন ট্যান, আর বাইরে আমি। দেখতে পাচ্ছিলাম, পিলপিল করে লোক বেরিয়ে এল বাক্স প্যাটার্নের বাড়িটা থেকে। পার্কিং লট, পাশের রাস্তা, সার্ভিস রোড – সব খালি হয়ে গাড়ির পর গাড়ি বেরিয়ে গেল। কিন্তু সেই একবার, রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ ট্যান একবার পিং করেছিল আমায়, তারপর আমি ওর কোনও সাড়াশব্দ পাইনি। ওর কথামতো ক্যামেরাগুলোর অবস্থান আর ফল্‌-এর ফ্লোর প্ল্যান ঝটপট ম্যানেজ করে পাঠিয়েও দিয়েছিলাম। সেটাও পেয়েছে কি না, কে জানে। এই ছাতার সাবস্পেস কমিউনিকেটরগুলো এত কম দূরত্বে কাজ করে…!

     আমার দুশ্চিন্তা আরও বাড়ল, যখন দেখলাম দু’ ট্রাক মিলিশিয়া ফল্‌-এর কাছে এসে দাঁড়াল প্রায় নিঃশব্দে। আমি সাড়াশব্দ না করে ওদের সিগনাল ইন্টারসেপ্ট করলাম। কাজটা কি বে-আইনি ছিল? নিকুচি করেছে। তা সেই সিগনাল থেকে বুঝলাম, আলী ওই চোদ্দোদিনের হিসেব করে আন্দাজ করেছে, আজ রাতেও এখানে অস্ত্রের কোনও লেনদেন হতে পারে। তাই ও স্থানীয় ইউনিটকে কিছু না জানিয়ে দলবল জুটিয়ে তৈরি হচ্ছে। বেম্যাক্সের দলবল কী করবে জানি না। কিন্তু আলী’র এই টিমটি ‘ট্রিগার-হ্যাপি’ লোকে ঠাসা। এরা আগে ব্লাস্টার ফায়ার করবে, তারপর ভাববে। আশপাশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় ক্রস-ফায়ারে আমরাই না মারা পড়ি!

     টেনশন কমানোর জন্য আমি আরও দুটো বে-আইনি কাজ করলাম। ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স এগুলোর কথা জানতে পারলে আমার ছাল ছাড়াবে অবশ্য। তার মধ্যে দ্বিতীয় কাজটা ছিল কয়েকটা রিপোর্ট বের করা। খুন হওয়া লোকেদের বডির অবস্থা থেকে খুনের সময় ঠিকমতো বলা যায়নি। কিন্তু কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী’র বয়ান আর ক্যামেরার ইনপুট থেকে মনে হয়েছে, নিহত ব্যক্তিরা ওই সন্ধ্যায় ফল্‌-এ ছিল। আলী তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফল্‌-এ রেকি করে তারপর হয়তো অস্ত্র পাচারের জন্য ওরা আবার এখানে এসেছিল মাঝরাতে। কিন্তু…

     আমি হোমিসাইডে ছিলাম বহুবছর আগে। কিন্তু ওকাম’স র‍্যাজর নামক যে বস্তুটি আমার মতো লোকেদের মাথায় তখন গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, সেটা আবার মাথাচাড়া দিল রিপোর্টগুলো পড়ে।

     কোনও ঘটনার সহজতম ব্যাখ্যাটিই সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

     খুনগুলো ফল্‌-এর ভেতরে হয়নি তো? আর সেটাই যদি হয় তাহলে তো শুধু ওই পেডোফাইল নয়, তার শিকারিও ভেতরে আছে। আর আছে ট্যান! আমি একরকম মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে এগোচ্ছিলাম, হঠাৎ গেটটা খুলে গেল।

     এক সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। পরনে ফল্‌-এর স্ট্যান্ডার্ড পোশাক, তাতে আইডি-টাও ঝকঝক করছে। আলী’র লোকজন তাঁকে থামাল। ভদ্রলোক সহাস্যে নিজের স্যুটকেসটা ওদের দিকে বাড়িয়ে কিছু বললেন। শরীরের ভাষা পড়তে পারি বলে দূর থেকেই বুঝলাম, আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে মিলিশিয়া। ওদের কর্ডন পেরিয়ে, স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে দ্রুত রাস্তার দিকে এগোলেন ভদ্রলোক। ইতিমধ্যে একটা গাড়ি এসে গেছিল। ভদ্রলোক তাতে চড়ে বসলেন।

     আমার এত কিছু দেখার বা মনে রাখার কথা নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার কাছে দেখার মতো আর কিছু ছিল না। সেজন্যই আমি এত খুঁটিয়ে সবকিছু দেখেছিলাম, এমনকি গাড়ির নম্বরটাও। হুশ্‌ করে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে ছুটতে-ছুটতে বেরিয়ে এল ট্যান।

     “ওকে থামাও!” চিৎকার করে বলল ট্যান, “ও… ও…!”

     কয়েকজন কৌতূহলী হয়ে গাড়িটার দিকে দেখছিল। কিন্তু হয় ট্যানকে এই ইউনিটের লোকেরা চেনে না, নয়তো তারা আলী ছাড়া কারও কথা শুনতে রাজি হয়নি। আমি ট্যানের দিকে ছুটে গেলাম। তবে আমার আগেই আরেকজন ওর কাছে পৌঁছে গেল।

     আলী!

     “আপনি এখানে কী করছেন… মেজর?” কারও পদকে যে গালির মতো করে ব্যবহার করা যায়, সেটা আলী বুঝিয়ে দিল। আমার মাথা গরম হলেও বুঝতে পারছিলাম, ট্যান বিপদে পড়েছে। তবে পার্টনারকে বিপদ থেকে বাঁচাতে না পারলে আমারও কি মান-সম্মান থাকবে?

     “আমরা ডিউটিতে আছি ক্যাপ্টেন।” আমি নিজের আইডি-টা সামনে তুলে এগিয়ে গেলাম, “তবে আপনার তদন্তের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।”

     আমার সঙ্গে আলী’র সম্পর্ক মোটেই ভালো না। তাই আমাকে ওখানে দেখে ওর মাথা আরও গরম হল। তবু ও চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, “তাই? এখানে কী ধরনের ডিউটি ছিল আপনাদের?”

     মনে আছে, সেই যে বে-আইনি কাজের কথা বলছিলাম! তার মধ্যে প্রথমটা এবার কাজে দিল। ট্যাব খুলে দুটো জিনিস বের করে দিলাম। প্রথমটা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস সংক্রান্ত একটা অভিযোগ। সেখানে একজন নালিশ করেছেন, ‘লুসিড ড্রিমজ’ নাকি ফল্‌-এর পেটেন্টেড ইমেজারি নিজের ব্যবসায় ব্যবহার করছে। দ্বিতীয়টা আমার আর ট্যানের আজ সন্ধেবেলায় পম্‌ নামের ওই মেয়েটির সঙ্গে দেখা করার অনুমতিপত্র। ওটা কিন্তু একদম খাঁটি জিনিস।

     ট্যান অধৈর্য হয়ে মাটিতে পা ঠুকছিল, কিন্তু আমি নির্বিকার ছিলাম। আলী দুটো জিনিসই দেখা শেষ করে ভ্রূকুঞ্চিত করে আমাদের দেখল। আমি বললাম, “পম্‌ নামের মেয়েটি স্বপ্ন দেখে এইরকম সময়েই। তাই আমরা ফল্‌-এ এসে দেখছিলাম, কোনওভাবে কিছু পাচার হচ্ছে কি না। মেজর ট্যান ভেতরে ছিলেন, আমি শুধুমাত্র রেকি করছিলাম। বিশ্বাস না হলে দেখুন, আমরা কিন্তু নিরস্ত্র।”

     শেষের পয়েন্টেই কাজ হল। আমার হাতে ট্যাবটা প্রায় ফেলে দিয়ে আলী ট্যানের দিকে ঘুরে বলল, “কাকে যেন ধরার কথা বলছিলেন আপনি?”

     “ডক্টর জাকির!” প্রায় চেঁচিয়ে বলে ট্যান, “উনিই… উনিই…”

     “গোপন তথ্য পাচার করছিলেন।” আমি ম্যানেজ করি, “আপনার কর্ডনের মধ্য দিয়েই উনি বেরোলেন, তাই না? সঙ্গে স্যুটকেসটাও ছিল মনে হচ্ছে।”

     আলী’র মুখে আঁধার ঘনায়। ওর ইশারায় দু’জন মিলিশিয়া এগিয়ে এসে স্যালুট ঠুকে বলে, “স্যুটকেসের ভেতর আপত্তিকর কিছু ছিল না ক্যাপ্টেন। শুধু ট্যাব, বেশ কিছু কেমিক্যালের ভায়াল, আর মেমরি ড্রাইভ।”

     আমি আর ট্যান মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। ট্যান কেন ডক্টর জাকিরকে ধরতে চাইছে, বুঝতে পারছিলাম না। তবে যা নিয়ে উনি বেরিয়েছেন তা মেগাকর্পের হাতে পড়লে তারা ওঁকে মাথায় তুলে রাখবে। সেটা আলীও বোঝেন।

     “গাড়িটাকে এক্ষুনি ধরো।” খিঁচিয়ে ওঠে আলী, “নম্বরটাও যদি কেউ খেয়াল করত…!”

     আমি সবিনয়ে ট্যাবটা এগিয়ে দিই, যাতে ডক্টর জাকিরের বেরিয়ে আসার ছবিগুলো ধরা ছিল। সেটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে আলী কয়েকটা সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দেয়। তারপর আমাদের দিকে ফিরে কিছুটা স্বাভাবিক গলায় বলে, “ওই গাড়িটা চেজ করে ডক্টর জাকির-কে আমরাই ধরব। কিন্তু এখানে আপনাদের আর থাকার দরকার নেই। আপনারা যান।”

     আমরা কথা না বাড়িয়ে বেরোচ্ছিলাম, হঠাৎ ট্যানের কী যেন একটা খেয়াল হয়। ও আবার দৌড়ে ফল্‌-এ ঢোকে। তার আগে আমাকে চিৎকার করে বলে, “তুমি পার্কিং লটের দিকটা দেখো।”

     দেখব? কী দেখব?

     আলী রাগত ভঙ্গিতে ট্যানের পিছু নিয়ে ফল্‌-এ ঢোকে। আমি দৌড়ে পার্কিং লটের কাছে আসি। স্বাভাবিকভাবেই আমি সেখানে গোলমেলে কিছু দেখিনি। মিলিশিয়ার কয়েকজন পাহারা দিচ্ছিল। ওখানে আর কেউ ছিল না। শুধু এক বুড়ো একটা বাচ্চা মেয়েকে কোলে নিয়ে মুখে ঘুমপাড়ানি গানের মতো শিস্‌ দিতে-দিতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছিল। হতাশ হয়ে আমি মূল গেটের কাছে ফিরে আসি। ট্যান, আলী, আরও কয়েকজন মেইনটেন্যান্স কর্মী – এরাও বেরিয়ে আসে ফল্‌ থেকে। ওদের মুখচোখ থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, ভেতরে ওরা কাউকে পায়নি। তবে ট্যান ঠিক কার খোঁজে ওখানে গেছিল, সেটা পরে বুঝতে পেরে আমার অবস্থাটা কেমন হয়েছিল, বুঝতেই পারছেন।

 

জন, জিরো বেস, পরে কখনও

“এই পুতুলটা… থুড়ি মেয়েটাকে নিয়ে তুমি কী করবে জন?” হেনরি ক্লান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের জীবনে রক্তমাংসের মানুষেরই দেখাশোনা করার উপায় নেই। আর তুমি কিনা…!”

     আমি তর্ক করিনি, বরং অন্য কথা ভাবছিলাম। শরীরের সবচেয়ে দামি জায়গা হল মস্তিষ্ক। জাকির তাঁর ক্ষতবিক্ষত, প্রায় কোমাটোজ মেয়ের মুখ আর মাথা থেকে টিস্যু নিয়ে ক্লোন করেছিলেন। এই অ্যান্ড্রয়েডের শরীরের ওই দুটো অংশ সেই মেয়ের স্মৃতিই বহন করছে। এই অবস্থায় তাকে আমি জাকিরের মেয়ে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছি না।

     হ্যাঁ, ‘ডক্টর জাকির’ নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটির আসল পরিচয় আমি খুঁজে বের করেছিলাম এই অ্যান্ড্রয়েড, অর্থাৎ রু-কে কাজে লাগিয়েই। ওর শরীরে বসানো নানা ইমপ্ল্যান্টের সূত্র ধরে আমি পিছিয়ে যেতে-যেতে অবশেষে পেয়েছিলাম তাঁকে। মা-মরা মেয়েকে নিয়েই ছিল ব্রিলিয়ান্ট বিজ্ঞানীটির সব কিছু। একদল পেডোফাইলের হাতে সেই মেয়ে ধর্ষিত ও অত্যাচারিত হলে তিনি দিশেহারা হয়ে যান। মিলিশিয়া থেকে মিলিটারি, কাউন্সিল থেকে ইউনিফায়েড কম্যান্ড – সর্বত্র বিচার চেয়ে হতাশ হয়েছিলেন জাকির। অবশেষে, ব্রেইন ডেড অবস্থায় মেয়েকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যান তিনি। মেয়েটির কী হয়েছিল, জানি না। তবে যতটুকু জানা গেছে, তার সবটাই আমি মেজর তনয়া দত্তের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি এনক্রিপ্ট করে। দেখা যাক, এই দিয়ে ও আর কিছু করতে পারে কি না।

     আমার মিশন শেষ। ব্লাস্টারের ডাইলিথিয়াম ক্রিস্টাল আমাদের হাতে এসে গেছে। আর রু রয়েছে আমার কাছে।

     সেই রাতে আমি ওকে কোলে নিয়ে ওই মেইনটেন্যান্স শ্যাফট দিয়ে ওপরে উঠি। ততক্ষণে ট্যান বা অন্যরা নীচ থেকে লক-ডাউন ইনিশিয়েট করে দিয়েছিল। যান্ত্রিকভাবে ওই দরজাটা খোলা যেত না। তবে আমি দরজার ওই ভাঙা কোণ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওটা সরাতে পেরেছিলাম। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি ও-সব পারি। বেরিয়ে এসে চুপচাপ মিশে গেছিলাম রাতের অন্ধকারে। পরে, অনেক পরে একটা হইচই থেকে বুঝেছিলাম, মিলিশিয়া জাকিরের গাড়িটা চেজ করছে। তবে আমার সেই নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না।

     “জাকির তো সেই রাতেই…” হেনরি কিছুক্ষণ চুপ করে বলে, “তুমি কি সেজন্যই ওকে নিজের কাছে রাখবে?”

     “অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গাড়িটা জ্বলে গেছিল।” আমি থেমে-থেমে বলি, “মিলিশিয়া বলছে, জাকিরের স্যুটকেসে নাকি এমন কেমিক্যাল ছিল যা অ্যাক্সিলারেন্ট হিসেবে কাজ করেছিল। ফলে আগুন এত বেড়ে যায় যে মানুষ, জিনিসপত্র, গাড়ি – সব পিন্ডি পাকিয়ে গেছিল। তাই জাকির মারা গেছেন কি না, এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। হয়তো অন্য কোথাও, অন্য কোনওভাবে উনি আবার নতুন করে এই ভেনডেটা চালু করার প্ল্যান করছেন।”

     হেনরি কিছু বলে না। রু’র ঘুমন্ত শরীরটা কোলে নিয়ে আমি কথা বলতে থাকি।

     “জাকির একা, নিজের মতো অপারেট করলে আমার কিছু করার নেই। কিন্তু উনি আবার নিজের সেই মেয়ের ক্লোন বানিয়ে কাজ করতে গেলে আমি জানতে পারব। তখন তাঁকে খুঁজে বের করতে পারব রু’র সাহায্য নিয়েই।”

     “জানতে পারবে?” হেনরি চমকে ওঠে, “কীভাবে?”

     “এক নাজি বিজ্ঞানীর কথা পড়েছি রেকর্ডে।” আমি নিচু স্বরে বলি, যাতে রু’র ঘুম না ভাঙে,“জোসেফ মেংগেল। লোকটা অমানুষ ছিল, ইহুদি বন্দিদের ওপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অকথ্য অত্যাচার চালাত। কিন্তু যমজদের ওপর লোকটার কাজ একেবারে অন্য লেভেলের ছিল। ও দেখেছিল, কিছু-কিছু বিশেষ অবস্থায়, জিনের দিক দিয়ে সাদৃশ্য আছে এমন মানুষদের মনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়। যুদ্ধের সময় বহু পরীক্ষা, বিশেষত বে-আইনি ক্লোনিং করতে গিয়ে এই জিনিসটা প্রমাণিত হয়। রু আর সেই মেয়েটি যেহেতু একই জিনের আধার থেকে গড়ে উঠবে, তাই তারা একে অপরের অনেক কিছু অনুভব করতে পারবে। রু যা দেখবে, তা আমিও দেখব। সেই ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি এই ক’দিনে।”

     “সেজন্যই তুমি ওকে… মানে রু-কে নিজের কাছে রাখতে চাইছ।” হেনরি বোদ্ধার মতো মাথা নাড়ে, “এইবার বুঝলাম।”

     আমি ওর ভুলটা ভাঙাই না। জন থ্যান্ড্রো, ওরফে জন দ্য অ্যান্ড্রয়েড নিজেও যে এক মৃত সৈনিকের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে, এ-কথা ওর জানার দরকার নেই। সেই সৈনিকের হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে যতক্ষণ না খুঁজে পাচ্ছি, ততক্ষণ রু-ই থাকুক আমার সঙ্গে, আমার কোলে।

 

মেগাকর্প কমপ্লেক্স, পরে কখনও

“কেমন আছেন, নিরুপমা?” বলিষ্ঠ নারীকণ্ঠ বলে ওঠে।

     কাচের ওপাশে বড়ো-বড়ো চোখজোড়া হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

     “আপনি এসেছেন! এখন আমার খুব ভালো লাগছে। আপনি এর মধ্যে আসেননি কেন?”

     নারীকণ্ঠ কিছু বলে না, বা বলতে পারে না। মনে হয়, যেন তার শরীরটা কেঁপে উঠছে বারবার।

     খসখসে গলার মালিক পেছনে ঘোরে। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো ডাক্তার আর সলিসিটরদের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “কাগজপত্র সব দেখে নিন। কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির নামে মেগাকর্প একাধিক সাইকোপ্যাথের পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেছে ঠিকই। কিন্তু এই মেয়েটির খুনখারাপির প্রবণতার জন্য দায়ী এর শৈশবের একাধিক ঘটনা। আমরা সব রেকর্ড বের করে কোর্টে দিয়েছি। পম্‌ ওরফে নিরুপমা আজ থেকে দশ বছর আগে, মাত্র ন’ বছর বয়সে গণধর্ষণের শিকার হয়। তাকে হাসপাতালে ক্লিনিক্যালি ডেড বলে ঘোষণা করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ঘোষণায় ভুল ছিল। পরে, ওর মতো বহু মানুষ ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসে, আপাতভাবে সুস্থ কিন্তু স্মৃতিভ্রংশ হয়ে। তারপর তাদের মধ্যে দেখা দেয় নানা প্রবণতা। তারপরেই ও আপনাদের এই সোনার খাঁচায় বন্দি হয়ে যায়।”

     “কিন্তু আমরা…” একজন ডাক্তার কিছু বলার চেষ্টা করেন, “আমরা তো কিছু করিনি।”

     “আপনারা কিছু করেননি বলেই বেঁচে গেলেন।” ধারালো নারীকণ্ঠ কাচের এপাশে থাকা সবাইকে কাঁপিয়ে দেয়, “শুধু ওর স্বপ্ন বেচে আর কামানো যাবে না। কোর্ট বলে দিয়েছে, নিরুপমা সুপারভিশন আর কেয়ারে থাকবে, তবে নিজের মতো। ও রোজগার করবে, কিন্তু নিজের মতো করে। তাই ওকে ছাড়ার ব্যবস্থা করুন। আমরা অপেক্ষা করছি।”

     ঘরটা খালি হয়ে যায়। কাচের ওপাশ থেকে একটু ভীত গলায় প্রশ্ন আসে, “আপনি কি রাগ করলেন? কিছু বলছেন না কেন? আসলে… আপনার সঙ্গে সেদিন কথা বলার পর আমার খুব ভালো লেগেছিল তনয়া।”

     নারীকণ্ঠ আবার নীরব থাকে। খসখসে গলা খেই ধরার মতো করে বলে, “আসলে উনি ব্যস্ত ছিলেন। আপনারই জন্য অনেক দৌড়োদৌড়ি হল তো।”

     “আমার জন্য?” বড়ো-বড়ো চোখজোড়ায় বিস্ময় আর ভয় জমা হয়, “কিন্তু আমি তো কিছু করিনি।”

     “করেননি বলেই তো আমরা করলাম।” নারীকণ্ঠ বলে ওঠে। তার কথায় মিশে থাকে অনেক কষ্টের গুরুগুরু, অনেক সুখের রিমঝিম।

     “আপনি আর স্বপ্ন দেখেছেন এর মধ্যে?” খসখসে গলা বলে ওঠে।

     “হ্যাঁ, তবে সেগুলো ওই… আমি যেমন দেখি, তেমনই। সেই সুন্দর জায়গা, সেই সুন্দর গন্ধ, ওই বাতাস – এগুলো আমি আর পাইনি স্বপ্নে। মাঝেমধ্যে অন্য কিছু দেখেছি বটে, যেমন মরুভূমি, কংক্রিটের টানেল, আকাশ থেকে ড্রোনের ছড়ানো অগ্নিবর্ষা। এগুলো অবশ্য এই শহরে প্রায় সবাই দেখে, তাই না?”

     “তা দেখে, তবে আপনার দেখার একটা আলাদা মানে আছে।” খসখসে গলায় চিন্তা ফোটে, “সে যাকগে। আচ্ছা, ওই সুন্দর জায়গাটায় যাবেন আপনি?”

     “আমি? ওখানে?? এক্ষুনি যাব! কিন্তু আমি কীভাবে…”

     “পাতাঝরার মরসুম মানেই সব শেষ নয় নিরুপমা।” নারীকণ্ঠ বলে ওঠে, “আপনার মতো… তোমার মতো আরও অনেক মানুষ পড়ে যায়, হয়তো ঝরেও যায়। কিন্তু তবু আমরা থামতে পারি না। এখান থেকে এবার তোমার ছুটি। চলো, আজ আমরা সবাই তোমার স্বপ্নের রাজ্যে ঘুরে আসি।”

 

কান্না আর খুশির চিৎকার মিশে যায়। দুদ্দাড় করে কেউ চেয়ার ছেড়ে ছুটে যায় পেছনে। নিজের ছোট্ট কিউবিকল থেকে নিজের জিনিসগুলো আনতে ব্যস্ত হয় সে। বেজার মুখে সইসাবুদ আর অন্য ফর্মালিটি সামলায় অন্য লোকজন।

     “ভুরু এখনও কুঁচকে আছে কেন মেজর… থুড়ি পার্টনার?” খসখসে গলা জানতে চায়।

     “জন থ্যান্ড্রো যে আমার কল্পনা নয়, সেটা নিশ্চয় এখন তুমিও মানবে ডাক্‌।” নারীকণ্ঠ শক্ত হয়ে বলে,“রেকর্ডগুলো ওই লোকটা না পাঠালে আমরা পমের অতীত সম্বন্ধে কিচ্ছু জানতে পারতাম না। তাছাড়া তুমি তো তাকে দেখেওছ। এবার কি তাহলে ওকে খোঁজার চেষ্টা করা যায়?”

     “আমি একটা বুড়োকে দেখেছি ট্যান।” খসখসে গলাটা ক্লান্তভাবে বলে, “ওই পুঁজি নিয়ে হাভেনের কয়েক কোটি লোকের মধ্যে মিলিটারির একটি গোপন ইউনিটের গোপন লোককে খুঁজে বের করা…! রক্ষে করো। এর চেয়ে তো ঝরা পাতার স্তূপে হারিয়ে যাওয়া গাড়ির চাবিও খুঁজে বের করা সহজ। ভালো কথা, গাড়ির চাবিটা কি তোমার কাছে?”

-*-

6 thoughts on “ফল

  • August 17, 2019 at 5:17 am
    Permalink

    ঋজু গাঙ্গুলির কলমে একটি ভালো গল্প। গল্পের ভিত্তি প্রস্তরে তুলি বুলিয়ে আঁকা লুসিড ড্রিম, কিছুটা সাইবারপন্ক লাইফ ক্রাইসিস, এবং বর্তমান সমাজের সমস্যার কথা একটি নিপুণ প্রতিবিম্ব। কল্পবিজ্ঞান যেমনটি হওয়া উচিত।

    Reply
  • August 18, 2019 at 4:33 am
    Permalink

    ঋজুদার লেখায় একটা আন্তর্জাতিক ছাপ পাই। বাংলায় লেখা হলেও মনে হয় যেন এই সময়ের বাংলা জঁর ফিকশন থেকে অনেকটাই এগিয়ে। চিরাচরিত চর্বিতচর্বন নেই। একটা মুক্ত বাতাস। দারুণ লেগেছে এই গল্পটিও। কুদস।

    Reply
  • August 18, 2019 at 7:35 am
    Permalink

    ঋজু গাঙ্গুলীর সাইবার পাঙ্ক এক অনন্য সৃষ্টি – unaplogetically international – পাঠককে টেনে দাঁড় করিয়ে দেয় প্রাপ্তমনস্ক কল্পবিজ্ঞানের আঙিনায় । শেষ হয়ে যায় মেজর ট্যান আর থান্ডোর নতুন কাহিনী, তবুও চোখে আবেশের মতন লেগে থাকে কালো আকাশের বুকে নিয়নের তীক্ষ্ণ আলোর মতন এক ডিস্টপিক দুনিয়ার অবক্ষয়ের পঙ্কিল অন্ধকার আর প্রযুক্তির তীব্র ঝলকানির মিশেল ।

    Reply
  • August 19, 2019 at 4:47 am
    Permalink

    ভালোবাসা আর মানবিকতার এক অমূল্য দলিল।

    Reply
  • August 24, 2019 at 1:21 pm
    Permalink

    john thandro r galper janyo wait kore thaki,emon e nesha dharano choritro guli,futiye tulechen lekhak,antorjatik man er thriller

    Reply
  • September 1, 2019 at 4:45 pm
    Permalink

    অনবদ্য! মনে হলো একটা ডিটেকটিভ-থ্রীলার মুভি দেখলাম। এতো সাবলীল আর জীবন্ত বর্ননা, পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো চোখের সামনে ঘটে চলছে ঘটনাপ্রবাহ। ভালো মানের সায়েন্স ফিকশন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!