ফস্কা গেরো – আর্থার সি. ক্লার্ক

বাংলা অনুবাদ - রাকেশকুমার দাস

অলংকরণ:মূল প্রচ্ছদ

মাননীয় সম্পাদক মহাশয়,

সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক পর্ষদ

     আপনার পাঠানো সংবাদ থেকে জানতে পারলাম যে পৃথিবীর বাসিন্দারা পারমাণবিক শক্তি নিষ্কাশনে সমর্থ হয়েছে এবং তারা রকেট-উৎক্ষেপণ নিয়েও গবেষণা শুরু করেছে। আমার অনুরোধ এটিকে অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা হিসেবে গণ্য করুন। অবিলম্বে এই বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠান। তবে দয়া করে বেশি বড় করবেন না ।

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৪র্থ

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয়,

     বিগত কয়েকদিনে আমরা যা জানতে পেরেছি তা নীচে লিপিবদ্ধ করছি।

     কয়েকমাস আগে পৃথিবীর একটি অঞ্চল থেকে যথেষ্ট পরিমাণে নিউট্রন নির্গমনের ঘটনা ধরা পড়ে আমাদের যন্ত্রে। কিন্তু তাদের বেতার সম্প্রচার তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে এই ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। তিনদিন আগে আমরা দ্বিতীয়বার নিউট্রন নির্গমনের সংকেত পাই। এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত বেতার তরঙ্গগুলোতে ঘোষণা শুনতে পাই যে  তাদের ওখানে যে যুদ্ধ চলছে তাতে পরমাণু বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের রেডিও অনুবাদকরা এখনও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যেটুকু জানা গেছে তাতে মনে হচ্ছে বোমাগুলো খুব একটা দুর্বল ছিল না। এখনও পর্যন্ত দুটি মাত্র বোমা ফেলার খবর পাওয়া গেছে। বোমার উপকরণের ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বটে, তবে আমরা এখনও তাতে ব্যবহৃত মৌলগুলি চিহ্নিত করতে পারিনি। এ ব্যাপারে বিশদ যথা শীঘ্র আপনাকে জানানো হবে। তবে পৃথিবীবাসীরা পারমাণবিক শক্তিকে মুক্ত করতে পেরেছে এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত, যদিও এখনও অবধি সেটা বিস্ফোরক নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  

     রকেট গবেষণা নিয়ে বিশদ কিছু জানা যায়নি। বেতারতরঙ্গের খোঁজ পাওয়ার পর থেকে তাদের ওপর আমাদের বৈজ্ঞানিকরা অত্যন্ত কড়া নজর রেখে চলেছে। তাও সেটা প্রায় এক পুরুষ আগে। পৃথিবীতে যে দীর্ঘযাত্রার রকেট তৈরি হয়েছে এ ব্যাপারে এখন আর আমাদের কোন সন্দেহ নেই। যুদ্ধের সময় মিলিটারিদের বেতারবার্তায় তার উল্লেখ পাওয়া গেছে একাধিকবার। কিন্তু তারা সেই রকেট নিয়ে মহাকাশ বা অন্যান্য গ্রহে অভিযানের তেমন কোনও প্রচেষ্টা করেনি। হয়তো যুদ্ধ মিটে গেলে তারা এদিকটাতেও নজর দেবে। আমরা তাদের বেতার সম্প্রচার এবং মহাকাশ-গবেষণার ওপর কঠোরভাবে নজরদারি জারি রেখেছি।

     এই গ্রহের প্রযুক্তিবিদ্যা যে ভাবে অগ্রসর হচ্ছে তা থেকে আমরা অনুমান করছি যে মহাকাশযাত্রার উপযোগী পারমাণবিক রকেট তৈরি করতে এদের কমপক্ষে আরও কুড়ি বছর লাগবে। তাই আমরা এখনই চাঁদে আমাদের ঘাঁটি তৈরি করার কাজ শুরু করতে পারি। এতে তারা যখনই এই সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করবে আমরা খুব কাছ থেকে নজর রাখতে পারব। 

ইতি,

ট্রেসকন

সম্পাদক,

সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক পর্ষদ

 

সংযোজন:

     নতুন পাওয়া তথ্য অনুসারে পৃথিবীতে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল বলে অনুমান করা হচ্ছে। পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের ফলেই হয়তো যুদ্ধ হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। এতে ধারণা করা যেতে পারে যে,  আমরা যা আঁচ করেছিলাম তার আগেই তারা গবেষণায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে। কিছু বেতার সম্প্রচারে এও শোনা গেছে যে তারা রকেট চালানোতেও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করার কথা ভাবছে।

 

 

মাননীয়

বিভাগীয় প্রধান,

আন্তর্গ্রহ সুরক্ষা দপ্তর ( আসুদ )

     আপনারা বৈজ্ঞানিক পর্ষদের সম্পাদক ট্রেসকনের পাঠানো বিবরণী পড়েছেন আশা করি। অবিলম্বে পৃথিবীর উপগ্রহটিতে অভিযান সংঘটিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হবে সেখানে একটি ঘাঁটি নির্মাণ করে পৃথিবীর উপর নজর রাখা যাতে তারা রকেট গবেষণায় কোনওরকম অগ্রসর হলেই আমরা তৎক্ষণাৎ জানতে পারি।

     আর একটা কথা, চাঁদে আমাদের অভিযান ও উপস্থিতি কঠোরভাবে গোপন রাখার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে আপনি ব্যক্তিগতভাবে ভারপ্রাপ্ত থাকবেন। এই প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট পাঠাবেন আমার দফতরে। দরকার পড়লে বেশি ঘনঘন রিপোর্ট পাঠাতেও দ্বিধা করবেন না।

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৪র্থ

 

 

মাননীয় অধিকর্তা,

আন্তর্গ্রহ সুরক্ষা দপ্তর ( আসুদ )

     পৃথিবীর রিপোর্টের কী হল?

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৪র্থ

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয়,

     অনভিপ্রেত বিলম্বের জন্য দুঃখিত। যে যানটি চাঁদের ঘাঁটি থেকে রিপোর্ট নিয়ে আসছিল সেটি মাঝপথে ভেঙে পড়ে বলে আপনার কাছে যথাসময়ে রিপোর্ট পাঠাতে পারিনি।

     বিগত এক বছরে রকেট সংক্রান্ত কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বেতার সম্প্রচারগুলিতেও এর কোনও উল্লেখ আমরা পাইনি।

বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয়,

     আপনি হয়তো আপনার বাবাকে পাঠানো পৃথিবী সংক্রান্ত আমাদের বাৎসরিক রিপোর্টগুলি পড়ে থাকবেন। গত পনেরো বছরে  আশাব্যঞ্জক কোনও অগ্রগতির নিদর্শন আমরা পাইনি। কিন্ত এই মুহূর্তে চাঁদের ঘাঁটি থেকে যে বার্তাটি এসেছে সেটি অবিলম্বে আপনাকে জানানো দরকার বলে মনে করছি।

 

“আজ একটি রকেটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের ভূখণ্ড থেকে। সেটি বায়ুমণ্ডল পার করে গ্রহের পরিধির প্রায় এক-চতুর্থাংশ পথ মহাকাশে যাত্রা করে আবার ফিরে আসে তাদের নিয়ন্ত্রণে। “

 বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

 

মাননীয় রাজ্যপ্রধান,

     আপনি কী করণীয় বলে মনে করেন?

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৫ম

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় সমীপেষু ,

     এই বার্তার অর্থ আমাদের চিরাচরিত নীতি পালন করে চলার দিন শেষ হয়েছে।

     আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একমাত্র পন্থা হল পৃথিবীবাসীদের প্রযুক্তির এই নির্দিষ্ট অভিমুখে অগ্রসর হওয়াকে প্রতিরোধ করা। এর জন্য হয়ত আমাদের মাত্রাধিক ভীতিপ্রদর্শন করতে হতে পারে।

     পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল অতিরিক্ত হওয়ার দরুন আমরা সেখানে পদার্পণ করতে অপারগ, ফলত আমাদের কর্মক্ষমতাও সীমিত। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তোমার বাবা আনভারের সঙ্গে প্রায় এক শতক পূর্বে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তাতে ওঁর যা সিদ্ধান্ত ছিল তার সঙ্গে আমি সহমত। অনতিবিলম্বে সেই পরিকল্পনা অনুসারে আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।

বিনীত,

রাজ্যপ্রধান
ফে. ক. সু.

 

 

মাননীয় রাজ্য সম্পাদক ,

     পর্ষদকে জানান আগামী কাল দুপুরে একটি জরুরি সভার আহ্বান করা হয়েছে। 

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৫ম

 

 

মাননীয় আসুদ অধিকর্তা ,

     আনভারের পরিকল্পনা অনুসারে চলতে গেলে আশা করছি কুড়িটি যুদ্ধজাহাজ  প্রস্তুত করতে হবে। শুধু যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত করলেই হবে, এই মুহুর্তে অস্ত্রশস্ত্রের কোনও প্রয়োজন নেই। নির্মাণ কাজের অগ্রগতির রিপোর্ট পাঠিয়ে যাবেন প্রতি সপ্তাহে।

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৫ম

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় ,

     উনিশটি যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত হয়ে গেছে। কুড়িতম জাহাজটির কাঠামো একদম অকেজো হয়ে পড়েছে, অন্তত একমাসের মধ্যে সেটি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না।

বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

 

মাননীয় আসুদ অধিকর্তা ,

     উনিশটিই যথেষ্ট। আমাদের কার্য পরিকল্পনা নিয়ে কাল আপনার সঙ্গে আলোচনা করব। পৃথিবীতে যে ভাষ্যটি সম্প্রচার করা হবে সেটার খসড়া তৈরি হয়ে গেছে?

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৫ম

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় ,

     ভাষ্যটি নিম্নরূপ:

     পৃথিবীর জনগণ!

     আমরা, অর্থাৎ আপনারা যাকে মঙ্গলগ্রহ বলে অভিহিত করেন সেই গ্রহের বাসিন্দা, আপনাদের আন্তর্গ্রহ পরিভ্রমণের বিষয়ে সমস্ত গবেষণার ওপর নজর রেখেছি বহু বছর ধরে। এই গবেষণা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে আপনাদের। আপনাদের জাতির ওপর আমরা গভীর চর্চা করে এই সিদ্ধান্তে অবনীত হয়েছি যে আপনারা সভ্যতার যে স্তরে রয়েছেন সেখান থেকে নিজেদের গ্রহ ত্যাগ করে অন্য গ্রহে যাত্রা করার পক্ষে এখনও যোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। আপনারা আকাশে যে যুদ্ধজাহাজগুলিকে ভাসতে দেখছেন, সেগুলি এক নিমেষে আপনাদের শহরগুলিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। আপনারা মহাকাশযাত্রার প্রচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ না করলে আমরা হয়তো সেই অবাঞ্ছিত কাজটি করতে বাধ্য হব।

     আমরা আপনাদের উপগ্রহ চাঁদে একটি পর্যবেক্ষণাগার গড়ে তুলেছি যাতে আপনারা আদেশ অমান্য করলেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারি। আপনারা যদি আদেশ মেনে চলেন তাহলে আমরা আর আপনাদের কোনও ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করব না। অন্যথায়, একটি রকেটও যদি ভূমণ্ডল ত্যাগ করে মহাকাশে যায় আমরা আপনাদের একটি করে শহর ধ্বংস করতে থাকব।

     মঙ্গলগ্রহের রাষ্ট্রপতি ও পর্ষদের আদেশানুসারে।

বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

 

মাননীয় আসুদ অধিকর্তা ,

     বয়ান অনুমোদিত। দ্রুত ভাষান্তর শুরু করে দিন।

     আমি নিজে কিন্তু এই জাহাজবাহিনীর সঙ্গে যাব না পৃথিবীতে। আপনার কী বক্তব্য দ্রুত জানান।  

রাষ্ট্রপতি
কে. ক. ৫ম

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় ,

     অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমাদের অভিযান সফল হয়েছে। আমাদের মহাকাশযাত্রায় সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা ঘটেনি। পৃথিবীর বাসিন্দারা অনেক আগে থেকেই আমাদের আগমন টের পেয়ে যায়, এটা আমরা তাদের বেতার সম্প্রচার থেকেই জানতে পারি। ওখানকার জনমানসে আমাদের আগমন নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে যায়। পরিকল্পনা মতোই জাহাজগুলি আগে সেখানে চলে যায়, এবং আমি সেই চরমপত্রের বক্তব্য বেতারতরঙ্গে সম্প্রচার করি। এর পরেই আমরা ওই গ্রহ ছেড়ে চলে আসি, কোনও ভয়ঙ্কর অস্ত্র আমাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়নি।

     দু’দিনের মধ্যে বিশদ রিপোর্ট পাঠাচ্ছি।

বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয়,

     মনস্তাত্ত্বিকগণ তাঁদের বিশ্লেষণ শেষ করেছেন। তাঁদের রিপোর্টটি সঙ্গে পাঠানো হল।

     আমাদের দাবি শুনে তারা যথারীতি রেগে উঠেছিল। নিশ্চয়ই তাদের আত্মগরিমায় আঘাত করেছিল। বিশেষ করে যে জাতি মনে করে তারাই একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী এই মহাবিশ্বে।

     যাই হোক, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওদের সুর বদল হতে লাগল ধীরে ধীরে। ওরা বুঝতে পারল আমরা ওদের সমস্ত বেতার যোগাযোগ ও সম্প্রচারে আড়ি পেতে রয়েছি। কোনও কোনও দিন এমনও হয়েছে তারা আমাদের উদ্দেশেই বেতারে বার্তা পাঠিয়েছিল। তারা শেষ পর্যন্ত জানায় যে রকেট গবেষণা থামাতে তারা রাজি হয়েছে।

     যদিও এতটা সহজে তারা মেনে নেবে ভাবিনি, তাও সব ভালো যার শেষ ভালো। যদি তাদের আমাদের বোকা বানানোর উদ্দেশ্য থাকে সেটাও সফল হবে না, আমরা আর একটি স্টেশন বানিয়ে ফেলেছি ইতিমধ্যে। এবং সেটা একদম তাদের বায়ুমণ্ডলের ঠিক ওপরে। আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, বা বিকিরণ-সনাক্তকারী যন্ত্রকে ফাঁকি দিয়ে তারা আর কোনও মহাকাশযান বানাতে পারবে না। আমরা পৃথিবীর থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

     তবে পৃথিবীর উপর কড়া নজরদারি বলবৎ থাকবে।    

ইতি,

ট্রেসকন

সম্পাদক,

সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক পর্ষদ

 

 

মাননীয় রাষ্ট্রপতি মহাশয় ,

     হ্যাঁ, এটা সত্য ঘটনা যে গত দশ বছরে পৃথিবীতে আর মহাকাশযান নিয়ে কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। আমরা ভাবতেই পারিনি পৃথিবীর বাসিন্দারা এত সহজে আত্মসমর্পণ করবে।

     তবে এটাও স্বীকার করতে হবে এদের অস্তিত্ব আমাদের সভ্যতার জন্য একটি চিরন্তন বিভীষিকা হয়ে থেকে গেছে। এই ব্যাপারে আপনি যেমনটি বলেছিলেন সেই মতো গবেষণা চলছে। তবে তার কিছু কঠিন সমস্যাও রয়েছে। এত বড় গ্রহকে শুধু বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং তেজস্ক্রিয় বিষ প্রয়োগ করে বেশি সাফল্য আসতে পারে বলে আমার ধারণা। 

     তবে আনন্দের কথা আমাদের কাছে অনির্দিষ্টকাল সময় আছে এই গবেষণা শেষ করার।

বিনীত,

রান্তে

আসুদ অধিকর্তা

 

(চিঠির ঝাঁপি এখানেই শেষ)

 

প্রফেসর এস. ম্যাক্সটন

ভাষাতত্ত্ব বিভাগ,

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

     ওপরের কাগজপত্রগুলো মঙ্গলের প্রধান শহর মার্সগ্রিড KL302895-এর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া গেছে। আপনারা মঙ্গলে ব্যবহৃত চিত্রলিপির যে ধারণা দিয়েছিলেন তা থেকে মনে হচ্ছে এই কাগজপত্রের মধ্যে একাধিক বার ‘পৃথিবী’ শব্দের উল্লেখ আছে।  মনে হচ্ছে এগুলোর অনুবাদ করতে পারলে ওদের পৃথিবী সম্বন্ধে ধ্যানধারণার কথা জানা যাবে। আরও কিছু কাগজপত্র পরে পাঠানো হচ্ছে।

এইচ. ফোর্বস

লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার

গোয়েন্দা বিভাগ

বিশেষ মহাকাশ বাহিনী

 

ব্যক্তিগত সংযোজন:

প্রিয় ম্যাক্স,

     কেমন আছ? এর মধ্যে যোগাযোগ করতে পারিনি বলে কিছু মনে কোরো না। পৃথিবীতে ফিরেই আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব।

     এখানকার অবস্থা আর কহতব্য নয়। মঙ্গলে পুরোপুরি অমঙ্গল আনতে সমর্থ হয়েছি আমরা। মাউন্ট উইলসন অফিসের ছেলেগুলো ঠিক যে স্থানাঙ্কগুলি গণনা করেছিল তা এক্কেবারে নিখুঁত মিলে গেছে। এই শহরটাই বোধহয় এদের রাজধানী ছিল। আমরা টেলিপোর্ট করে যে বিশাল বোমা পাঠিয়েছিলাম সেটা ঠিক শহরের উপরেই পুনর্গঠিত হয়, তারপর যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে।

     আমাদের দুটো ছোট ট্র‍্যান্সম্যাটার যন্ত্র আছে, এই দুটো দিয়েই মঙ্গলের যাবতীয় জিনিসপত্র আমরা পৃথিবীতে পাঠাচ্ছি। যেমন এই কাগজপত্র ট্রান্সসেন্ডার ২ দিয়ে পাঠাব। বড় সাইজের ট্র‍্যান্সম্যাটার প্রস্তুত করে তাড়াতাড়ি না পাঠালে আমাদের ফেরার দিনটা কিন্তু অনিশ্চিত হয়ে থাকছে। তাই আমাদের দিকটা একটু দেখো কেমন?

     এটা ভেবেই এখন ভালো লাগছে যে এখন আমরা আবার রকেট গবেষণা শুরু করতে পারব। কারোর চোখরাঙানির ভয়ে আমরা থেমে থাকব না। আমার কথাগুলো সেকেলে লাগতে পারে, কণাপরিচলন বা টেলিপোর্টেশন আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর এখন আবার রকেটের কী দরকার! কিন্তু এই যন্ত্রের ভিতর ঢুকে নিজের মাথা-মুন্ডু সমেত ঘেঁটেঘুঁটে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গিয়ে তারপর আলোর গতিতে দুদ্দাড় ছুটে হঠাৎ একজায়গায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়া…  যাই বলো বাপু এ আমার পোষায় না, মহাকাশযাত্রার আনন্দ নেই এতে।  

     ফোর্বস

 

 

মূল গল্প : লুপহোল

 ১৯৪৬ সালে জন ডবলিউ ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত ‘অ্যাসটাউন্ডিং’ পত্রিকায় এই গল্পটি প্রকাশ হয়। কল্পবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান লেখক স্যার আর্থার সি ক্লার্কের লেখা ‘অ্যাস্টাউন্ডিং’ পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়া প্রথম গল্প এটিই ।

8 thoughts on “ফস্কা গেরো – আর্থার সি. ক্লার্ক

  • May 2, 2020 at 5:36 am
    Permalink

    অনেকদিন পর এমন একটা অনুবাদ গল্প পড়লাম যেটা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ভুলেই যাচ্ছিলাম যে কোনো অনুবাদ গল্প পড়ছি। রা.কু.দা আপনার আরো লেখা পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

    Reply
    • May 2, 2020 at 8:46 am
      Permalink

      ধন্যবাদ সৌ. চ. 😂 উৎসাহ দেওয়ার জন্য। আরও ভাল করার চেষ্টা করব।
      রা.কু.দা.

      Reply
  • May 3, 2020 at 2:59 pm
    Permalink

    অনবদ্য! ভাবতেই অবাক হচ্ছি সেই চল্লিশের দশকে এমন হার্ডসাইফাই লিখে গেছেন! আর অনুবাদের ব্যাপারে কী বলব! অসাধারণ।

    Reply
    • May 13, 2020 at 2:58 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ সাইফুল ইসলাম মহাশয়। অনুবাদ ভাল লেখেছে জেনে খুবই আনন্দিত হলাম।

      Reply
  • May 7, 2020 at 10:39 am
    Permalink

    যেমন তাকলাগানো গল্প, তেমনই স্বচ্ছন্দ, নির্ভার আর গতিময় অনুবাদ। দারুণ লাগল!

    Reply
    • May 12, 2020 at 3:08 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ ঋজু বাবু, আপনার ভাল লেগেছে জেনে দারুন আনন্দিত ও বেশ উৎসাহিত বোধ করছি।

      Reply
  • May 12, 2020 at 3:01 am
    Permalink

    অনেক ধন্যবাদ, আপনার গল্প ও অনুবাদ ভাল লেগেছে জেনে খুব ভাল লাগল। অনেক উৎসাহ পেলাম।

    Reply
  • June 29, 2020 at 1:27 pm
    Permalink

    দারুন উপভোগ করলাম । খুব ভাল অনুবাদ ।

    Reply

Leave a Reply to সৌরভ Cancel reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!