ফুলস্টপ

রচনা  : সৌমলেন্দু ঘোষ

অলঙ্করণ :

আজকের দিনটা শুভর কাছে বেশ অন্যরকম। শুভ মানে শুভব্রত সিনহা, টরন্টোর মাউন্ট সিনাই হসপিটালের সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের আপাতত হেড। আপাতত বলার কারণ হয়ত ডক্টর পল কেলির আচমকা পদত্যাগও হতে পারে। যাই হোক, আজ রুটিন-মাফিক ভিজিট সারতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গিয়েছিল শুভর, তাই ডক্টরস কোয়ার্টারে না গিয়ে তার চেম্বার থেকেই কলকাতার বাড়িতে ফোনটা করে স্কাইপিটা অন করতে বলল সে বাবানকে। বাবান ওর একমাত্র ছেলে, শুরুতেই একগাল ফুলিয়ে যথারীতি দাদু আর মায়ের প্রতি সারা সপ্তাহের রাগটা উগরে ফেলতে নিল বেশ কয়েক মিনিট; তারপরই স্মিতার সঙ্গে একটু নিভৃত আলাপ, শেষে বাবার সঙ্গে একটু মনখারাপের দর কষাকষি করে যখন স্কাইপিটা বন্ধ করল তখন ঘড়িতে রাত ৯ টার কাঁটা ছুঁই ছুঁই করছে। আজ কলকাতার বাড়িতে বেশ একটা উৎসবের মেজাজ পাওয়া গেল, শুভ ভুলেই গিয়েছিল যে আজ বাংলা নববর্ষ। এটা ভেবেই তার ছোটবেলার বেশ কিছু কথা মনে পড়ে গেল; ছোটবেলা মানেই উত্তর কলকাতার সেই গলি, দলবেঁধে স্কুল পালানো, রকের আড্ডা আর বেপাড়ার মেয়েদের দিকে আড়চোখে তাকানো। উফফ! কি দিন গেছে; ভাবলেই হাসি পায় এখন শুভর। কানাডাতে সে এসেছে প্রায় আট বছর, এর মধ্যে মাত্র দুইবারই সে দেশে যেতে পেরেছে। এমনিতে একা থাকতে ভালবাসে শুভ, অবশ্য এর পিছনে একটা মারাত্মক কারণও আছে অবিশ্যি; যাক সে কথা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শুভ দেখল প্রায় ৯.০৫, আচ্ছা আজকেই সব শেষ করে দিলে কেমন হয়? হ্যাঁ হ্যাঁ, আজকেই; দেরি করে কি লাভ….

     বিপ…বিপপ….

     হঠাৎই তীব্র হর্নের শব্দে ঝিম-ভাবটা একদম কেটে গেল শুভর, তারপরই উল্টোদিক থেকে আসা হেডলাইটের আলোয় চোখটা ধাঁধিয়ে গেল তার। উফফ! আর একটু হলেই হয়েছিল আর কি? সরাসরি ধাক্কা লাগত গাড়িটার সাথে, ঠিক সময়ে বাঁদিকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে সে গাড়িটা। এইরকমভাবে মরে যাওয়াটা মোটেই পছন্দ না শুভর, তার মতে মৃত্যু আসবে তার নিজের ইচ্ছামত, এই চেষ্টাই সে কি করছে না? ওই তো সামনে একটা ওয়াগন ভ্যান ওর সাথে গাড়িটা ,অ্যাকসিডেন্ট করালে কেমন হয়? দারুণ একটা থ্রিল হবে মনে হচ্ছে; ঠিক এইসময়ই শুভর প্রিয় এইচ.এস.ভি গ্রান্জ-টার স্পিডোমিটারের কাঁটা ১২০ কিমির ঘর পার হল। তারপর, আর কি….

     চোখ দুটো আবার একবার রগড়ে নিল শুভ, অবশ্য বারো-তলা এই অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে এমনিও নিচটা অন্ধকারই দেখায়, যতই সেখানে নিয়ন বোর্ডে ডক্টরস কোয়ার্টারস লেখাটা জ্বলজ্বল করুক না কেন? রেডিয়াম হাতঘড়িতে তখন ঠিক রাত বারোটা পাঁচ; শুভ এখন ছাদের আলসেটার উপর বসে খুব ঠাণ্ডা ভাবে একটা মার্লবোরো ধরাল, তারপরেই ভাবল আচ্ছা ছাদ থেকে একটা ছোট্ট ঝাঁপ দিলেও তো হয়। বেশ একটা ইন্টারেস্টিং প্রসেস, খুব একটা যন্ত্রণা হবে কি? বারো-তলার যা হাইট; নাহ! আর ভেবে লাভ নেই, ছাদ থেকে ঝাঁপই দেবে শুভ। এইদিকটা এমনিতেও অ্যাপার্টমেন্টের পিছনদিক, কাল সকালের আগে কেউ মনে হয় না তাকে থুড়ি তার বডিকে খুঁজে পাবে; আচ্ছা দেখতে কেমন হবে তাকে? খুব ভয়ানক কি, মাথা-হাত-পা থ্যাঁতলানো, চারিদিকে রক্তের মধ্যে তার দেহটা মণ্ড পাকিয়ে পড়ে আছে; আচ্ছা এই ছবিটা তার বাড়িতেও তো পাঠাবে, বাবান আর স্মিতা সহ্য করতে পারবে তো? হে হে, ভাবতেই মনটা খুশি হয়ে গেল শুভর। এইভাবেই তাহলে মরবে সে; এরপরই শুভ আলসের উপর উঠে ঝাঁপটা দিল….

     নাআআহ…!!!

     একটা চিৎকার করে উঠেই শুভ দেখল চটচটে ঘামে গেঞ্জিটা কখন যেন ভিজে গেছে; ওহহ! স্বপ্ন দেখছিল সে তাহলে। আশ্চর্য ঘামে ভিজে যাওয়া সত্ত্বেও তার কেমন যেন ঠাণ্ডা লাগছে, এটা তো হবার কথা নয়। শেষ পর্যন্ত ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই; আরে, ওকি? স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে, হ্যাঁ, কোনও ভুল নেই। এত রাতে তারই হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে অ্যাপার্টমেন্টের তলায়, কোনও এমার্জেন্সী কেস নাকি? তাছাড়া, একটা পুলিশের গাড়ি, কেন? তার মনে পড়ল ফিফথ ফ্লোরের মিঃ অ্যাডামস বেশ কিছুদিন যাবত হার্টের প্রবলেমে ভুগছিলেন, হতেও পারে তার কিছু হয়েছে। কিন্তু, পুলিশ কি করছে? একবার দেখে আসবে কি সে? এই ভেবে ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই চমকে উঠল শুভ; আরে ঘর থেকে ব্যালকনি আসার দরজাটা বন্ধ, তাহলে সে কি করে এল? দরজাটা ঠেলতেই কি যেন হল শুভর, মনে হল থাক থাক অন্ধকারের বদলে তার চোখে কেউ যেন হাজার ওয়াটের আলো ফেলল। তারপর ঘরে ঢুকতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল শুভর কাছে; তাহলে এতদিনে সে পেরেছে। মুক্তির আনন্দে নিজের কাঁধ ধরে নিজেই ঝাঁকিয়ে দিল সে….

     সেই মুহূর্তেই পুলিশের লোকটি সিলিং এর দিকে চেয়ে দেখল মিঃ সিনহার নিথর বডিটা ফাঁস দেওয়া অবস্থাতেই দুলছে, ঠিক যেন একটা সরল দোলগতির পেন্ডুলাম….

     রাত তখন ঠিক তিনটে দশ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *