বঙ্গনারীর কল্পবিজ্ঞান: একটি পর্যবেক্ষণ

দেবিকা দে

অলংকরণ:চিত্রা মিত্র

মেয়েদের লেখা কল্পবিজ্ঞান। কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটা তাচ্ছিল্য রয়েছে, না? ঠিক যেমন মাধ্যমিক বা অন্যান্য পরীক্ষায় ‘মেয়েদের মধ্যে প্রথম’ শুনলে মনে হয়। বলা যেতে পারে, লেখা শেষ পর্যন্ত লেখা। তাকে মেয়ের লেখা, ছেলের লেখা, বয়স্ক মানুষের লেখা, কমবয়সির লেখা এভাবে ভাগ করে কী লাভ? কথাটা একদিক দিয়ে হয়তো ঠিক। কিন্তু আরও একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায় এর পিছনে লিঙ্গ বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শোষণ ইত্যাদি খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। আসলে ‘মেয়েদের মধ্যে প্রথম’ কথাটায় যে তাচ্ছিল্য আছে, এখানে সেটা নেই। বরং ‘মেয়েদের লেখা কল্পবিজ্ঞান’ বলে আলাদা করে চিহ্নিত করে তার মধ্যেকার বৈশিষ্ট্যকে খুঁজতে যাওয়ার ইচ্ছেটুকুই প্রধান। যেভাবে অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে উঠে আসা লেখক আর সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো লেখকের দেখার চোখ আলাদা হতে বাধ্য, ঠিক তেমনই এক্ষেত্রেও অনেক কিছু খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। হাজার হোক, পুরুষের চোখ আর নারীর চোখ তো এক নয়।

     কল্পবিজ্ঞানের জন্মদাতা হিসেবে যেখানে মেরি শেলি মান্যতা পেয়েছেন। এক স্বপ্নতাড়িত অষ্টাদশীর ঘুমের অবচেতন বেয়ে উঠে এসেছিল প্রথম সাই ফাই রচনার বীজ। ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’। একথা আমরা সবাই জানি। পাশাপাশি এও জানি, পরবর্তী সময়ে কল্পবিজ্ঞান বা ফ্যান্টাসি রচনায় পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে বহু লেখিকা বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

     কিন্তু আমাদের বঙ্গদেশে ছবিটা একেবারে উল্টো। জগদীশচন্দ্র বসুর লেখা ‘পলাতক তুফান’, যার প্রথম নাম ছিল ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ (কারও মতে তার আগেও বিভিন্ন লেখার সন্ধান মিলেছে যাকে কল্পবিজ্ঞান বলা যায়), সেটি থেকে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জন্ম হলেও প্রকৃত অর্থে প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘পিঁপড়ে পুরাণ’ থেকেই বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু। ছয়ের দশকে অদ্রীশ বর্ধন তৈরি করলেন ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দবন্ধটি। সত্যজিৎ, অদ্রীশ এবং আরও কত লেখকের কলমের ছোঁয়ায় বাংলা কল্পবিজ্ঞান ক্রমে আরও উঁচুতে পৌঁছে গেল। কিন্তু তার এহেন শৃঙ্গারোহনের রেখাচিত্রে মেয়েরা কোথায়?

     এত হতাশার মধ্যেও উজ্জ্বল সোনালি রেখা যে একেবারেই নেই তা নয়। সেই সব সোনালি রেখা বিভিন্ন সময় ফুটে উঠেছে যে সব বঙ্গনারীর স্পর্শে, আসুন তাঁদের কথা এবার আলোচনা করা যাক।

     প্রথমেই যাঁর নাম করব তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর ‘সুলতানা’স ড্রিম’ই প্রথম কোনও বাঙালি লেখিকার লেখা কল্পবিজ্ঞান। গল্পটি ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের পত্রিকা ‘দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন’-এ। বেগম রোকেয়ার এই কাহিনি আসলে একটি স্বপ্নের বর্ণনা। এক অপরিচিত মেয়ের হাত ধরে গল্পের কথক সুলতানা পৌঁছে যায় এমন এক পৃথিবীতে, যেখানকার সমাজের চালিকাশক্তি নারীরা! সেই ইউটোপিয়ান জগতের কথাই উঠে এসেছে সুলতানার স্বপ্ন বেয়ে। সমাজ সংস্কার ও নারীমুক্তি আন্দোলনের স্বপ্ন দু’চোখে ছিল রোকেয়ার। পঁচিশ বছর বয়সে এই কাহিনি রচনার মধ্যে দিয়ে তিনি বাংলা কল্পবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সৃষ্টি করেন। 

     এবার বলি লীলা মজুমদারের কথা। ছোটবেলা থেকে যে ক’জন লেখক আমাদের পেড়ে ফেলেন, লীলা মজুমদার নামটা সেই তালিকার গোড়ার দিকেই থাকবে। সরস কলমে মজলিশি ঢঙে গল্প শোনাতে শোনাতে তিনি গড়ে তোলেন এক অলীক ভুবন। ভূতের গল্পের পাশাপাশি জমিয়ে ফ্যান্টাসি ও কল্পবিজ্ঞানও লিখে গিয়েছেন কিংবদন্তি লেখিকা।

     তাঁর ‘কল্পবিজ্ঞানের গল্প’ বইয়ের উৎসর্গের পাতায় তিনি লিখে দিয়েছিলেন— ‘এসব ঘটনা আজ পর্যন্ত কোথাও ঘটেছে বলে শুনিনি। তাই বলে না ঘটবার কারণও দেখি না। সেই আসল সত্য, যে আজকের দোড়গোড়ায় থেমে থাকে না। যে দিগন্তের পরপারে আরও শতশত সম্ভাব্য দিগন্তের সন্ধান করে। যে সব সত্যকামীরা এ-কথা বিশ্বাস করে আমার বই তাদের দিলাম।’

     লীলা মজুমদারের কল্পবিজ্ঞান রচনার মধ্যে ‘বাতাসবাড়ি’ কিংবা ‘ব্যাঘ্রপুরাণ’-এর কথা আমরা সবাই জানি। তাই অপেক্ষাকৃত কম চেনা দু’টি লেখার কথাই বরং বলি। তাঁর দু’টি অসামান্য গল্প ‘আকাশ-ঘাঁটি’ ও ‘সিঁড়ি’। আকারে অবশ্য প্রথমটি দ্বিতীয়টির থেকে অনেকটাই বড়। কিন্তু আকারে বা গল্পের কাঠামোয় তফাত থাকলেও একটা বড়সড় মিল রয়েছে। দু’টি গল্পেই দেখা মেলে ইউটোপিয়ার। ‘আকাশ-ঘাঁটি’ গল্পে প্রধান চরিত্র বড়কাকা। তিনি কালীঘাট এলাকার দুই মস্তান হুলো ও ঘোতনকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দিলেন স্পেস স্টেশনে। যেখানে মানুষ বলতে ওই তিনজনই। বাকিরা রোবট। এক আশ্চর্য সুন্দর জায়গা সেটা। হিংসা, রক্তারক্তিতে দীর্ণ ধূলিমলিন পৃথিবীর একেবারে উল্টো। সাজানো গোছানো তকতকে। হুলোর খুব ইচ্ছে তার শীর্ণকায় বোন ফুলিকেও সেখানে নিয়ে আসে। গল্পে ভিনগ্রহীদের দেখা মিললেও আসল কথাটা গল্পের শেষে বলে দেন লেখিকা। হুলো, ঘোতন বা ফুলিই কেবল নয়, আরও অনেকে এসে বসবাস শুরু করে দেয় সেই আকাশ-ঘাঁটিতে। লীলা মজুমদার লিখছেন— ‘এ গল্পের শেষটা ভালো। এই রকম আরো হাজার হাজার পৃথিবী তৈরি করা হবে।’  বোঝা যায় সেই স্বপ্নকে ফুটিয়ে তুলতেই গল্পটি লেখা।

     ‘সিঁড়ি’ গল্পে দেখা মেলে ভুলো, খাদা, নেপু, ন্যাকা, বকু, শিবুদের। দিনের পর দিন খেতে পায় না তারা। হতদরিদ্র এই সব ছেলেমেয়েরা কচু, শামুক, গুগলি, নুন-লঙ্কা দিয়ে তৈরি খাবার খেলে মনে করে পরমান্ন খাচ্ছে। একদিন তাদের জন্য নেমে এল সিঁড়ি। আসলে বকুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল ভিনগ্রহীদের। ‘কী সুন্দর দেখতে তারা, কী ভালো কাপড় চোপড় পরা।’ তারা থাকে কোথায়? ‘ওরা দেখিয়ে দিল রাতের কালো আকাশে অনেক দূরে একটা নীল তারা মিটমিট করছে তার দিকে, ওই আকাশের সূর্য। ওরই চারিদিকে আমাদের পৃথিবী ঘোরে।’ আগেই বলেছি, এও এক ইউটোপিয়ার গল্প। গল্পের শেষে সেই হতদরিদ্র ছেলেমেয়েরা তো বটেই, অন্য গরিব মানুষগুলোও চড়ে বসে সিঁড়িতে। লেখিকা লিখছেন—‘ক্যাওটপাড়ার পাশের ঘরছাড়ারা সবাই নিঃশব্দে এসে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি, আধাবয়সি, কারো পেটে ভাত পড়েনি দুদিন।’

     দু’টি গল্পেই লীলা মজুমদারের চিরচেনা সিগনেচার। সরস গল্প। পড়তে দিব্যি মজা। অথচ তারই আড়ালে রয়ে যায় এক অব্যক্ত যন্ত্রণার ছোঁয়া। এই দুনিয়াটা মোটেই ভালো নয়। গরিবগুর্বো, না খেতে পাওয়া মানুষগুলোর বড্ড কষ্ট। সেই কষ্ট থেকে পরিত্রাণের কথা অন্য ধারার লেখার মতো তাঁর কল্পবিজ্ঞানেও জায়গা করে নিয়েছে।

     এবার এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়। স্বামী শান্তিপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ ভাবে ‘পরমাণু জিজ্ঞাসা’র মতো বিজ্ঞানের বই লিখে মিলেছিল রবীন্দ্র পুরস্কার। কিন্তু এণাক্ষীর আসল ভালোবাসা কল্পবিজ্ঞান। তাঁর কল্পবিজ্ঞানের গল্প সংকলন ‘মানুষ যেদিন হাসবে না’ বইটির জন্য তাঁকে মনে রাখতেই হবে পাঠককে। পাশাপাশি প্রেমেন্দ্র মিত্রের দুই অবিস্মরণীয় কীর্তি—‘পিঁপড়ে পুরাণ’ ও ‘মনুদ্বাদশ’-এর ইংরেজি অনুবাদও করেছেন তিনি। কিন্তু এণাক্ষী খুব বেশি লেখেননি। লিখলে হয়তো আরও বহু মণিমাণিক্য জমা পড়ত পাঠকের সংগ্রহে।

     বাণী বসুকে আমরা ‘গান্ধর্বী’, ‘মৈত্রেয়ী জাতক’ ইত্যাদি উপন্যাসের জন্যই চিনি। কিন্তু বঙ্গনারীর কল্পবিজ্ঞান রচনার কথা বলতে বসলে তাঁর নাম আমাদের বলতেই হবে। বহু বছর আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর ‘কাঁটাচুয়া’ পড়ে চমকে উঠেছিলাম। শুরু থেকেই গল্প এগিয়েছে থ্রিলারের মেজাজে। একের পর এক রহস্যময় হত্যা ও তাকে ঘিরে দানা বাঁধতে থাকা আতঙ্ক পাঠককে মগ্ন করে তোলে। কিন্তু একেবারে শেষে এসে যখন রহস্যের উন্মোচন ঘটে তখন দেখা যায় এ গল্প কল্পবিজ্ঞানের। দেশ তথা বিশ্ব জুড়ে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির সামনে নারীর রুখে দাঁড়ানোর সংকল্পকে মিউটেশনের মোড়কে মুড়ে লেখিকা আমাদের স্তম্ভিত করে দেন।

     তাঁর ‘দ্বিতীয় পৃথিবী’ কাহিনিটিও মুগ্ধ করে। এ এক ইউটোপিয়ার আখ্যান। এমন এক গ্রহের ছবি এঁকেছেন বাণী, যেখানে দূষণের চিহ্নমাত্র নেই। সেই গ্রহের উন্নত বুদ্ধিমান প্রাণীরা পৃথিবী থেকে নিয়ে যেতে চান কিছু মানুষকে। সমাজের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে এই মানুষদের কেউ সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত, কারও বা বুদ্ধি কম, কেউ বা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা। কিন্তু লীলা মজুমদারের ‘সিঁড়ি’র মতো এখানে শামু, নীতা, পিঙ্কিরা কিন্তু পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায়নি। পৃথিবী তাদের ‘মায়ের মতো’ জানিয়ে শামু জানিয়ে দেয়, তারা এখানেই থাকবে। অন্যান্য লেখালেখির পাশাপাশি বাণী বসুর এই সব রচনা বা ‘অপারেশন অরিন্দম’ তাঁর কল্পবিজ্ঞান লেখার দক্ষতাকে ফুটিয়ে তোলে। কেন যে তিনি আরও লিখছেন না!

     এবং সুচিত্রা ভট্টাচার্য। অকালপ্রয়াত জনপ্রিয় এই সাহিত্যিকের একমাত্র কল্পবিজ্ঞান রচনা ‘দাবানলের দেশে’। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে রহস্যময় দাবানলকে কেন্দ্র করে কাহিনি বুনেছেন লেখিকা। জীবনের প্রথম কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসে সুচিত্রা চমকে দেন। কিন্তু তার আগে বা পরে আর কোনও কল্পবিজ্ঞান তিনি লিখলেন না, এই নিয়ে আমার মতো কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকের আফশোষ থেকেই যাবে।

     ছয় বা সাতের দশকে তুমু‌ল আলোড়ন ফেলে দেওয়ার পরে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ধারা কিঞ্চিৎ ক্ষীণ হয়ে আসে। হয়তো ‘আশ্চর্য’, ‘বিস্ময়’-এর মতো কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা না থাকাটাই (‘ফ্যান্টাস্টিক’ থাকলেও তার জনপ্রিয়তা কমে আসছিল) এর পিছনে একটা কারণ হয়ে ওঠে। তবুও সুচিত্রা ভট্টাচার্য বা বাণী বসুর মতো জনপ্রিয় লেখিকা কল্পবিজ্ঞানকে একেবারে ব্রাত্য করে দেননি। লাভবান হয়েছে পাঠক।

     এই সময়ের লেখিকাদের মধ্যে যশোধরা রায়চৌধুরীর কল্পবিজ্ঞানের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহ রয়েছে। বাবা দিলীপ রায়চৌধুরী অকালপ্রয়াত একজন কল্পবিজ্ঞান ল‌েখক। মেয়ে যশোধরাও রক্তের চোরাটানে অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন এই ধরনের লেখার প্রতি। জনপ্রিয় কবি যশোধরার লেখাতে নারীমুক্তির যে স্বপ্ন বিচ্ছুরিত হয়, তাঁর লেখা কল্পবিজ্ঞানেও সেই ছাপ স্পষ্ট। তাঁরই মতো এই সময়ের আর এক সাহিত্যিক তৃষ্ণা বসাকও কল্পবিজ্ঞান লিখছেন। তাঁর লেখাও চমকে দেয়। এখানেও মেয়েদের জন্য পৃথিবীটাকে আরও একটু সুন্দর করে তোলার স্বপ্নই প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

     বাংলা কল্পবিজ্ঞান এমনিতেই কম লেখা হয়। তার মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা তো আরওই কম। এরই মাঝে যশোধরা-তৃষ্ণারা সেই ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেছেন। এটাই পাঠকের কাছে আশার কথা। আমাদের বিশ্বাস, তাঁদের দেখে নতুনরাও এগিয়ে আসবে। সুলতানার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রংমশাল হাতে পাড়ি দেবে ভবিষ্যতের পথে। যে ভবিষ্যতের ছবি একমাত্র কল্পবিজ্ঞানই আঁকতে পারে।

2 thoughts on “বঙ্গনারীর কল্পবিজ্ঞান: একটি পর্যবেক্ষণ

  • May 7, 2019 at 7:49 am
    Permalink

    Khub sundar discussion. kintu amar eakta request chilo. Ei lekhikader lekha gulo niye apnara ki eakta anthology publish korte paren na ?

    Reply
    • May 12, 2019 at 2:32 am
      Permalink

      হ্যাঁ, প্রকাশিত হবে এটা আলাদা বই আকারে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!