বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞান সম্মেলন – একটি রিপোর্ট

সোহম গুহ

অলংকরণ:সুপ্রিয় দাস

প্রথম দিন

বিগত ২০১৮ সালের ২২শে নভেম্বর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ এবং কল্পবিশ্ব ওয়েবজিনের যৌথ প্রচেষ্টায় ইউ. জি. আর্টসের অনিতা ব্যানার্জি মেমোরিয়াল হলে উদ্বোধন হয়েছিল Workshops of Horrible Creation: 200 Years of Imagined Humans – International Conference and Workshop on Science Fiction নামক তিনদিন ব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞের।  অংশগ্রহণকারী  সমস্ত কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল টারডিসের মোড়কে প্রোগ্রামের সময়সূচী (চিত্র ১)। উদ্বোধনী বক্তৃতায় দীপ ঘোষ (কল্পবিশ্ব) যেমন বাংলা কল্পবিজ্ঞান চর্চার এক সংক্ষিপ্ত ধারণা পেশ করেন, তেমনই ডক্টর অভিজিৎ গুপ্ত (বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি) বলেন এদেশের প্রেক্ষিতে সাহিত্যের এই অবহেলিত ধারাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন নিয়ে তাঁর ও তাঁর বিভাগের নিরন্তর প্রচেষ্টার কথা।

 

এরপর প্রথম প্যানেলে চেয়ার গ্রহণ করেন The ক্লার্কসওয়র্ল্ড, অ্যাসিমভ’স সাইন্স ফিকশন, অ্যাপেক্স ইত্যাদি আন্তর্জাতিক পত্রিকার নিয়মিত লেখক এবং ‘দ্য ডিভাউরার’ – খ্যাত ইন্দ্রপ্রমিত দাস এবং গেমওয়ার্ল্ড ট্রিলজি, টার্বুলেন্স, রেজিস্ট্যান্স গ্রন্থের প্রখ্যাত লেখক সুমিত বসু। সঞ্চালনার জন্য অধ্যাপিকা রিমি বি. চ্যাটার্জি উদগ্রীব থাকলেও তাঁর কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা অন্তরায় হয়ে পড়ে। তাঁর অভাব পূরণ করেন অভিজিৎ গুপ্ত মহাশয়। এই প্যানেলে আলোচনা হয় ইংরেজিতে প্রকাশিত সাই-ফাই ও ফ্যান্টাসির, যার একক নাম এস. এফ. বা স্পেকুলেটিভ ফিকশন। উঠে আসে বন্দনা সিং, অনিল মেনন প্রমুখ লেখকের নাম। অমিতাভ ঘোষের কলকাতা ক্রোমোজোম, সুমিত বসুর ‘দ্য সিমোকিন প্রফেসিজ’ ইত্যাদি এই আলোচনায় উঠে আসা উল্লেখযোগ্য নাম।

মাইকের সামনে প্রফেসর অভিজিৎ গুপ্ত, লেখক সমিত বসু ও ইন্দ্রপ্রমিত দাস

 

উৎসাহী ছাত্র, গবেষক, লেখক ও পাঠকেরা

পরবর্তী প্যানেলে এ. বি. এইচ. হলে দিল্লীর শ্যামলাল কলেজের সুমিতা শর্মা বলেন ‘হোয়েন এস. এফ . মিটস পোয়েট্রিঃ রিডিং সুজান স্লাভিয়েরো’স সাইবর্গিয়া’ এই বিষয় সম্পর্কে তাঁর গবেষণার কথা, যেখানে লেখিকা সুজান স্লাভিয়েরো এই বিখ্যাত  কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি লাইন, প্রত্যেক শব্দের ব্যাখ্যা আমরা নতুন বা অন্য দৃষ্টিতে জেনেছি। উল্লিখিত কবিতাটা তারই এক ক্ষুদ্র উদাহরণঃ 

A Windigo Moves to the Suburbs

Hear the rags settling in my spare room?
No bones remain. I wear sandals
now, mow the lawn on Sundays.
We hum, collide. I like your neck.

This smile takes practice, my lips
too small for teeth. I am greening
with these stews of swamp moss
& mushrooms. It’s been years

since I’ve bitten. See these frostbite
scars? I am still punctuated, Arctic.
I miss some things crisp & larded,
try hard not to see the neighbors

as joints & lobes. My clavicles push
against my skin like sharp wings,
something lycan. This is the opposite
of what’s in your stomach. A fork

standing at attention. Something icy
thumps beneath my shirt, stuttering.
I think you are lemony & attractive
but this is only on the inside.

কে. আই. আই. টি. ভুবনেশ্বর এর সুদেষ্ণা দত্ত চৌধুরীর উপস্থাপনার শিরোনাম ছিল ‘দ্য মিরর আপ টু নেচারঃ রোবট রাইটস অ্যান্ড রংস’, যেখানে ব্লেড রানার থেকে রবি, রোবটস অফ ডন, ২০০১ এর হ্যাল প্রমুখ মানবচরিত্র (দোষ-ত্রুটি) সমন্বিত রোবট যে আসলে আমাদেরই দর্পণ, তাই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।  বিশ্বভারতীর অধ্যাপক সুদেব প্রতিম বসু বলেন ‘ইনটু দ্য ভয়েডঃ সাইন্স ফিকশন অ্যান্ড হেভি মেটাল মিউজিক’ এর কথা, তাঁর শব্দকল্পের গবেষণাকে উপস্থাপনার সময় স্ক্রিনে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সিলভারহক, পিঙ্ক ফ্লয়েড প্রমুখের সাইফাই বিষয়ক অ্যালবাম কভার এবং এই সঙ্গে স্পিকারে অপূর্ব হেভি মেটাল সুর এবং গানের কথার মূর্ছনা।

এরই সঙ্গে এ. বি. এইচ. রুমে বক্তব্য রেখেছিলেন সি. এস. এস. টি. আই. পি. গান্ধীনগরের অভিষেক লাক্কাড়। তাঁর বিষয়বস্তু ছিল ‘জিনস অন স্ক্রিনঃ দ্য জেনেটিক ইম্যাজিনারি ইন ইন্ডিয়ান পপুলার সিনেমা’ । হাল আমলের ২.০ থেকে কৃষ ট্রিলজি, সবই ফুটে উঠেছিল তাঁর বক্তব্যে। এর পরে তাঁর কথা পেশ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের  অভিষেক সরকার। তিনি বলেন ‘সেন্টিমেন্টাল হিউম্যানিজম ভার্সেস বায়োটেকনোলজিক্যাল ডিহিউমানাইজেশন অফ থার্ড ওয়র্ল্ড বডিসঃ সিলেক্ট সাইন্স ফিকশন অফ মুহম্মদ জাফর ইকবাল’ এর ওপর। মহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের কল্পবিজ্ঞান জগতের এক বহু আলোচিত নাম। তাঁর প্রায় যুগব্যাপী কলমে নামানুষের কথাই ছিল অভিষেক বাবুর বক্তব্যের বিষয়।

পরবর্তী বক্তা ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক নাম কৃষ্ণা ডান্ডে। তিনি বলেন ‘হিউম্যানস ইন হার্ড এস. এফ . : ফ্রম বায়োপাওয়ার টু জিওপাওয়ার’ – এর উপর, যেখানে কল্পবিজ্ঞানের বিজ্ঞানভিত্তিক শক্তির ব্যবহার আজকের বাস্তব।

মধ্যাহ্নভোজনের পর আই আই টি রোপার এর জ্যাসমিন শর্মা বলেন জিনয়েডস রেবেলিয়ানঃ আ টেকনো – ফিলোজফিক্যাল অ্যানালিসিস অফ অ্যালেক্স গারল্যান্ড’স এক্স মেচিনা’। যেখানে তিনি ফুটিয়ে তোলেন এই বিখ্যাত চলচ্চিত্রটির যান্ত্রিক চরিত্রগুলির কৃত্রিম মননের মানবিক বিশ্লেষণ।

এরপর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ তামিলনাড়ুর পি বি শ্যারন বলেন ‘দ্য ইউনিক, দ্য নর্মাল অ্যান্ড দ্য গ্রোটেস্ক ইন ক্যাথারিন ডান’স গিক লাভ’ এর ওপর। এই বইয়ের গল্প এক কৃত্রিক বুদ্ধিমত্তা বিশিষ্ট যন্ত্র বিনেওস্কিকে নিয়ে, গল্পে দেখা যায় যে রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে নতুন মানুষের ব্রিড তৈরি হয় খামারের মুরগির মত। বইটি যে আসলে মানবিক  সত্ত্বার পাশবিক বিকলনের গল্প এবং কেন তা অপার্থিব হলেও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ, তা তিনি তাঁর বক্তব্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

বেথুন কলেজের মন্দিরা চক্রবর্তীর বক্তব্যের শিরোনাম ছিল ‘নন অমনিস মরিয়ারঃ পলিটিক্স অফ আইসোলেশন অ্যান্ড ডিগ্রিস অফ লোনলিনেস ইন কাজুও ইসিগুরো’স নেভার লেট মি গো’ । একাকীত্ব এবং বোহেমিয়ান উদাসীনতা কাজুওর লেখার বৈশিষ্ট্য, এটাও তার ব্যতিক্রম নয়। মানুষের এই ডিজিটাল যুগের একলা ঘরের কথাই ফুটে উঠেছিল তাঁর বক্তব্যে।

একই সঙ্গে এ. ভি . আর. রুমে বক্তৃতা রাখেন যাদবপুরের প্রত্যুষা বসু। তার পেপার ছিল ‘ডু হিউম্যানস ওয়রশিপ অ্যান্ড্রয়েড গডস?: অ্যানালাইজিং দ্য অ্যান্ড্রয়েড অ্যাজ আ ডিভাইন ফিগার ইন পপুলার সাইন্স ফিকশন’। দানিকেন থেকে বর্তমানের এ আই, সবই ফুটে উঠেছিল তাঁর বক্তৃতায়। এরপরে যৌথভাবে পেপার পড়েন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির মেঘমালা ঘোষ, হিরণ্য মুখার্জী, শ্রীরূপা দত্ত, কলকাতা। ‘অগমেন্টেড রিয়্যালিটিঃ এক্সপেরিয়েন্সিং দ্য ফিউচারিস্টিক সাবলাইমঃ অ্যা কেস স্টাডি অফ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন অ্যান্ড পারফেক্ট পিপল’ শিরোনামে তারা গুগলের হলোলেন্স থেকে ট্রনের বিশ্ব এবং কিভাবে তা  ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, পোস্টহিউমানিজম, ট্র্যান্সহিউমানিজমের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তা ফুটিয়ে তোলেন।

৪.৩০এর চা-বিরতির পর শুভ উদ্বোধন ঘটে যে তিনটে বইয়ের তারা হল  ‘এফ টি এল’ নামে একটি অনুবাদ কল্পবিজ্ঞান সঙ্কলন, ‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন ২০০’ নামক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সম্বন্ধীয় ফিকশন ও নন ফিকশন সঙ্কলন এবং ‘চিরকালের হকিং’ নামে একটি আলোচনামূলক গ্রন্থ। প্রথম এবং তৃতীয় বইটি জয়ঢাক প্রকাশনার, দ্বিতীয়টি কল্পবিশ্ব প্রকাশনার। সেই সঙ্গে কল্পবিশ্বের তরফে ছিল ‘বিস্ময়’, ‘আশ্চর্য’ এবং ‘ফ্যান্টাস্টিক’ পত্রিকার দুর্লভ প্রচ্ছদগুলির এক প্রদর্শনী। হলের বাইরে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছিল প্রতিশ্রুতি ও অরণ্যমন প্রকাশনীর তরফ থেকে বাংলা কল্পবিজ্ঞান বইয়ের দোকান।

কল্পবিশ্ব প্রকাশিত ফ্র্যানকেনস্টাইন ২০০ বইটির কভার

প্রথম দিনের শেষ অনুষ্ঠানটি ছিল লেখক এবং মনোজ্ঞ পাঠক শ্রী ঋজু গাঙ্গুলীর সঞ্চালনায় দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য সেনগুপ্ত, সুমিত বর্ধন, ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চ্যাটার্জি এবং সোহম গুহের মধ্যে এক আলোচনাসভা যার বিষয় বাংলা কল্পবিজ্ঞানের বর্তমান, ভবিষ্যৎ, গতিপ্রকৃতি এবং চিন্তন।

 

দ্বিতীয় দিন

২৩শে নভেম্বর সকাল ১০.৩০-এ কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন শুরু হলো অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্পবিজ্ঞান গবেষক শ্রী বোধিসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে, যার বিষয়বস্তু ছিল সৃষ্টির দ্বিশত বছর পরে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের উত্তরাধিকার সম্পর্কে। তাঁর কথাতেও পোস্ট-হিউমানিজম, ট্র্যান্স-হিউমানিজম বারেবারে উঠে এসেছিল। 

১১.১৫ এর কফি ব্রেকের পরে ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের চর্চার উপর আলোকপাত করেন সামি আহমেদ খান, সুকন্যা দত্ত এবং সালিখ সাহ। প্রসঙ্গত ইংরেজি কল্পবিজ্ঞান লেখার জগতে প্রথম দুজন পরিচিত নাম, এবং সালিখ সাহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক এসএফ পত্রিকা মিথিলা রিভিউয়ের সম্পাদক। এঁদের স্বপ্নের সাথে হাত মিলিয়ে এ. বি. এইচ. হলের শ্রোতারাও অনুধাবন করলেন সাইফাইয়ের গুরুত্ব এবং মর্যাদা।

১২.৩০-এর লাঞ্চের পরে কল্পবিজ্ঞান অনুরাগীরা সাক্ষাত করলেন সুমিত বসু এবং ইন্দ্রপ্রমিত দাসের সঙ্গে। একই সাথে এভিআর রুমে অনুরাগীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন সামি আহমেদ খান এবং সালিখ শাহ।

পঞ্চম সেশনে হেরিটেজ কলেজের আসিজিৎ দত্ত-এর পেপার ছিল (Dis)Abling Body and Consciousness: Technological Afterness and After-Humans in Realive and Upgrade, যেখানে তিনি মৃত্যুপরবর্তী পুনর্জীবনের কথা বলেছেন। প্রসঙ্গত উঠে এসেছে রিএনিমেশন, এবং রিইনকারনেশনের কথাও।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুলগনা চট্টোপাধ্যায় বলেন Medical Posthumanism, Bioethics, and Octavia Butler’s Xenogenesis Trilogy-এর উপর। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌমাভ মাইতির গবেষণাপত্র ছিল Disability and Alternative Human Imagination in Samuel R. Delany’s The Einstein Intersection।

একই সঙ্গে এভিআর রুমে বিশ্বভারতীর শাওনা বারিক বলেন British Fantasy about Constructing Clockwork Coolie in Colonial India -এর উপর, এবং প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীগন্ত ভটাচার্য্য পেশ করেন The Individual vis-à-vis the Collective: Mind Is Where the Frontier Is-এর উপরে তাঁর মূল্যবান বিশ্লেষণ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বালগোপাল মেননের- Of Gods, Monsters, and Other Casualties: On the Origin Stories of Indian Superheroes-এর বিষয়ধারা ছিল পুরাণ এবং সাইফাইয়ের মেলবন্ধন, যার উপরে কিছুটা হলেও দানিকেনীয় ছায়া সুস্পষ্ট।

৩.৩০-এর চা বিরতির পর আফ্রাহ সাফিক দেখান তাঁর ডিজিটাল আর্ট, যে বিমূর্ততার বিষয় ছিল সুলতানা’স ড্রিম নামক লেখাটি। একই সঙ্গে পাশের ঘরে চলছিল দেবকুমার মিত্র ও অর্ঘ্য মান্নার তত্ত্বাবধানে কল্পবিজ্ঞান কমিকসের ওয়ার্কশপ।

সর্বশেষে দেবকুমার মিত্রের মধ্যস্থতায় কমিক্সে এসএফএর প্রভাব এবং অবদান সম্পর্কে বলেন অর্ঘ্য মান্না এবং দেবজ্যোতি গুহ। এঁরা প্রত্যেকেই কমিকস প্রেমী এবং বাংলা ও বিদেশী কমিকসের বিশেষজ্ঞ।

 

তৃতীয় দিন

২৪শে নভেম্বরে কনফারেন্সের শেষ দিনের শুভারম্ভ ঘটে কল্পবিশ্ব তথা বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কে দীপ ঘোষ এবং  বিশ্বদীপ দে’র নাতিদীর্ঘ বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে। সঙ্গে ছিলেন সন্তু বাগ এবং সন্দীপন গাঙ্গুলী। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ক্ষণজন্মা স্রষ্টারা এবং তাঁদের সৃষ্টির কথা। উঠে আসে কালের গর্ভে হারানো তিন পত্রিকা – আশ্চর্য, বিস্ময় এবং ফ্যান্টাস্টিকের কথাও। (https://www.facebook.com/kalpabiswa/videos/347695802714947/?t=1)

অতঃপর একটি কফি বিরতির পর এবিএইচ হলে তাঁদের গবেষণাপত্র পেশ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্চিতা মিত্র এবং মধুব্রতা ভট্টাচার্য্য তাঁদের Patriarchy and His (Un)natural Creations: A Study of Monstrosity And Masculinity in Jessica Jones পেপারটিতে। এই পেপারে তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন কমিক্সে নারী সুপারহিরোর সেক্সিজম, পরবর্তী ধাপে ফেমিনিজম, এবং সব শেষ ধাপে সমতার কথা। এরপরে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির চিরকালীন বিরোধের কথা বলেন সোহম গুহ এবং দীপ ঘোষ (কল্পবিশ্ব) -Shelley And Lovecraft: The Interpretation of Their Tales of Reanimation in The Lights of Modern Scientific Age পেপারে।

একই সঙ্গে এভিআর রুমে পাঠ হচ্ছিল আরও কিছু গবেষণার কথা। সর্বপ্রথমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রুচিরা মন্ডল পাঠ করেন -The Distorted Human Body in Mervyn Peake’s Boy in Darkness and Titus Alone, যেখানে মধ্যযুগীয় রিএলিজম এবং ফ্যান্টাসি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। এই লেখাটির মাধ্যমে বক্তা বিশ্লেষণ করেছেন মানবমনের চালচিত্রের কথা।

এরই মাঝে ফ্লয়ারে কফি ব্রেকের সময় হয়ে গেল ছোট্ট একটি কসপ্লেয়িং ইভেন্ট। যোগ দিয়েছিলেন দীপ ঘোষ (ডার্থ ভাডের), সন্তু বাগ (হান সোলো) এবং অঙ্কিতা মাইতি (প্রিন্সেস লিয়া)। রইল তারই একটি ছবি।

 

সন্তু বাগ, দীপ ঘোষ ও অঙ্কিতা মাইতি

সিদ্ধার্থ সিনহা পড়েছেন তাঁর Do Transgenics Dream of Electric Elephants: A Trans-Human Study of Richard Starking’s Elephantmen পেপারটি, যার রেফারেন্স কমিক্সটি উবারের মত জনরের দিকনির্দেশক একটি মাইলস্টোন। পোস্ট-হিউমানিজম, ট্র্যান্স-হিউমানিজম এই বক্তব্যেরও প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজান উজির ও মধুরিমা মজুমদার ব্যাখ্যা করেন তাঁদের পেপার Posthuman Birth and the Shame of the Modern Prometheus, যেখানে ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের দৈত্যের সঙ্গে আজকের বিজ্ঞানের অপবিকাশ কিভাবে জড়িত তা তাঁরা ফুটিয়ে তোলেন। 

১২.৪৫-এর লাঞ্চের পর এবিএইচ হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজর্ষি রায় পড়েন তাঁর The still point of the turning world: Anxieties of the ‘timeless’, and postponed teleology in Bangla science fiction works of Satyajit Ray and Taradas Bandopadhyay নামক পেপারটি। অতঃপর যাদবপুরেরই আরেক ছাত্র অরুনাভ ব্যানার্জি পাঠ করেন তাঁর These wonderful narrations inspired me with strange feelings : Visions of a limiting human consciousness পেপারটি।

একই সঙ্গে এভিআর রুমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি ঝা পড়েন The Human in the machine, the machine in the human: the Ethics of Human-Robot Interpersonal Dynamics in Jonathan Barkley and Sam Vincent’s Humans নামক পেপারটি। এই পেপারে আসিমভের ল অফ রোবটিক্স কেন আসলে যন্ত্র মানুষের কাছে দাসখত, তাঁর কথা তিনি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন।

২.৪৫-এ প্রকাশিত হল সিদ্ধার্থ ঘোষ রচনা সমগ্র ১, একটি দুষ্প্রাপ্য লেখার সংকলন, কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনের তরফ থেকে। এই ক্ষণজন্মা লেখকের সুহৃদ প্রসাদরঞ্জন রায়, অভিজিৎ গুপ্ত এবং গবেষক দেবজ্যোতি গুহর স্মৃতিচারণায় শ্রোতাদের সামনে ফুটে ওঠে এই বিস্মৃতপ্রায় লেখকের জীবন, তাঁর লেখার পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষটির কথা এবং টেরি প্র্যাচেটের ডিস্কওয়ার্ল্ড সিরিজের পেছনে তাঁর হিন্দু পুরাণ সম্পর্কিত অনুপ্রেরণার কথাও।

 

সিদ্ধার্থ ঘোষ রচনা সংগ্রহ প্রথম পর্ব (কল্পবিজ্ঞান) কভার

অতঃপর, একটি ক্ষুদ্র চা বিরতির পর এবিএইচ হলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের স্মৃতিচারণা করেন তাঁর স্নেহধন্যা কল্পবিজ্ঞান লেখিকা এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, উঠে আসে পিঁপড়ে পুরাণের একটি দুষ্প্রাপ্য ইংরেজি অনুবাদের খবর, এ ছাড়া এই কল্পবিজ্ঞান লেখক মানুষটির জীবনের কথা।

 

বাঁ দিক থেকে সিদ্ধার্থ ঘোষের সুহৃদ প্রসাদরঞ্জন রায়, সিদ্ধার্থ-বিশেষজ্ঞ দেবজ্যোতি গুহ, কল্পবিশ্বের সম্পাদক সন্তু বাগ ও এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়

তিন দিন ব্যাপি এই বিশাল অনুষ্ঠানের সঠিক সমাপাতন ঘটে যখন বিস্ময় পত্রিকার চালনাশক্তি রণেন ঘোষ, অমিতানন্দ দাস, এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায় এবং রাজকুমার রায়চৌধুরিকে পুস্পস্তবক দিয়ে ভূষিত করেন কল্পবিশ্বে পেছনের মানুষগুলি। দিনের শেষে এবিএইচ হল সাক্ষী থাকে নতুন এবং পুরাতন প্রজন্মের এই মেলবন্ধনের। “হেথা হতে যাও পুরাতন হেথা নতুনের খেলা আরম্ভ হইয়াছে” নয়, পুরাতনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে নতুনের পথ চলাই প্রতিভাত এই সম্মেলনের শেষবেলায়।

 

বাঁ দিক থেকে সঞ্চালক বিশ্বদীপ দে, বিস্ময় পত্রিকার সম্পাদক রণেন ঘোষ, কল্পবিজ্ঞান লেখক অমিতানন্দ দাস, রাজকুমার রায়চৌধুরী ও এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়।

 

বাঁ দিক থেকেঃ সোহম গুহ, শামি আহমেদ খান, সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়, বোধিসত্ব চট্টোপাধ্যায়, দীপ ঘোষ, ইন্দ্রপ্রমিত দাস, শালিখ শাহ, সমিত বসু ও সন্তু বাগ

 

**কিছু জায়গায় বক্তার নাম, এবং তাঁদের পেপারের নাম ইংরেজিতে লিখিত বানানদোষ এড়াতে।
**কনফারেন্স সম্পর্কে আরো জানতে নিচের লিংক গুলি দেখতে পারেন।
১) https://kalpabiswa.com/workshops-of-horrible-creation-200-years-of-imagined-humans/

২) https://kalpabiswa.com/conference/

One thought on “বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞান সম্মেলন – একটি রিপোর্ট

  • November 26, 2019 at 9:39 am
    Permalink

    দারুণ আয়োজন ছিল! খুব ভালো লাগলো। অনেক দূর থেকে একরাশ শুভেচ্ছা। এগিয়ে যাক বাংলা কল্পকাহিনীরা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!