বৃত্ত

বৃত্ত

লেখক – দেবলীনা পন্ডা 

অলংকরণ – তৃষা আঢ্য

স্টিয়ারিং-এর ওপর হাত রেখে ঘড়িটা দেখল মেহুল। সাতটা দশ। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টিটা হয়েই চলেছে, ধরার কোনও নাম নেই। আর হবে নাই বা কেন, আজ তেরই অগাস্ট হয়ে গেল। কলকাতাটা এইসময় ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি, রাস্তায় উপচে আসা নর্দমার জল আর প্যাচপেচে কাদায় ভরে থাকারই কথা! তাদের কপালটাই খারাপ। কোথায় ভেবেছিল ডিসেম্বরে জমাটি ঠান্ডায় বিয়েটা করবে, তা নয় এই বিরক্তিকর বৃষ্টি-কাদার মধ্যেই বিয়ে করতে হল! শ্রীনন্দার আদরের দাদাভাই মানে, ওর বড়শালা অনসাইটে তিন বছরের জন্য প্যারিস চলে যাবে সেপ্টেম্বরে, তাই ডিসেম্বর অব্দি বিয়েটা টানা সম্ভব নয়। অগত্যা! আগের বছর ঠিক এই দিনটাতে সেই মুষলধারে বৃষ্টিতে ট্র্যাফিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিভাবে বিয়ে করতে গিয়েছিল ভেবে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেহুল।

     সাতটা কুড়ি। পাঁচতলার বেডরুমের জানালার দিকে তাকিয়ে হর্নটায় আলতো করে দুবার চাপ দিল মেহুল। কি যে এত সাজছে শ্রী! আজ অ্যানিভার্সারির দিনটার জন্য আগে থেকে কত্ত প্ল্যান করে রেখেছিল বউটা, ওর আব্দারে আজ ছুটি নিল মেহুল। তার জন্য পাওনা অবশ্য বড় মন্দ হয়নি! সকালবেলা ওর প্রিয় লুচি, সাদা আলুর চচ্চড়ি, জিলিপি; তারপর আবার লাঞ্চে শ্রীর হাতের বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ! ওফ্, বিরিয়ানিটা যা বানায় না শ্রী! এরপর একটা মিষ্টি মিষ্টি আদরমাখা দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যে হতেই বাড়ির বাইরে বের করে দিল বউ। ম্যারিয়টে আজ ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের বুকিং আছে ওদের, তো শ্রী যখন সাজবে তখন নাকি ও ঘরে থাকতে পারবে না! আদর করে বউয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বলেছিল মেহুল, “অত সাজার কি আছে? তোমাকে তো এমনিতেই…”, তবে সে সোহাগ ধোপে টেকেনি। সেজেগুজে সন্ধ্যেবেলা বেরোতেই হল তাকে। অ্যানিভার্সারির গিফটটা আগেই দুজনের দুজনকে দেওয়া হয়ে গেছে। বড় গোলাপের বোকেটা ফ্লাওয়ার শপ থেকে তুলে নিয়ে, গাড়িতে পেট্রোল ভরে দুটো সিগারেট খেয়ে আবার চলে এসেছে মেহুল।

     সামনের লুকিং গ্লাসটায় নিজেকে একবার দেখে নিল মেহুল। চুলটা সেটই আছে। আজ শেভ করে শ্রীর ফেভারিট আফটারশেভটাই লাগিয়েছে সে। টাইটা একবার ঠিক করে নিয়ে আবার হর্ন দিতে যাবে, তার আগেই… খট্ খট্ খট্… উঁচু হিলের তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে আসছে। বামদিকে তাকিয়েই নিজের অজান্তে মুখটা খানিক হাঁ হয়ে গেল গেল মেহুলের। একটা টুকটুকে লাল অফ শোল্ডার গাউন পরে হিলে শব্দ তুলে হেঁটে আসছে শ্রীনন্দা, গলায় তার দেওয়া পার্লসেটটা! একটু উঁচু করে খোঁপার মতো বাঁধা চুল, স্মোকি আইজ, আর ওর হাতে থাকা গোলাপগুলোর চেয়েও লাল রঙের একজোড়া ঠোঁট নিয়ে হিলহিলে শরীরটায় জড়িয়ে থাকা ওর পাশের সীটটাতে এসে বসল শ্রীনন্দা। হঠাৎ করে যেন খেই হারিয়ে গেছে মেহুলের, হার্টবিট এক-দুটো মিস হল বোধহয়! দু-চোখ ভরে দেখতে থাকল, এই কি তার শ্রী? এতো কোনও রূপকথার পাতা মায়াবী রাজকন্যে! নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ মনে হল মেহুলের। সত্যি, আজকের দিনটা কোনওদিন ভুলতে পারবে না ও!

     দরজা লক করে মেহুলের মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল শ্রীনন্দা, “কি হল? চলো! তখন থেকে তো প্যাঁক প্যাঁক করছিলে!” শ্রীর ঘাড়ের কাছে মুখটা নিয়ে পারফিউমের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ফিসফিস করলো মেহুল, “আজ না গেলেই নয়? চলো না ঘরে ফিরে…”, দুম করে ওর পিঠে একটা কিল মেরে হেসে ফেলল শ্রীনন্দা।

     বাইরের মাতাল হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। জানালার কাচটা নামিয়ে মুখটা বাড়িয়ে দিল শ্রী। বৃষ্টিকণা তার গলার নেকলেসটাকে লজ্জা দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট হীরের কুচির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ওর গালে ঠোঁটে গলায়। সামনের রাস্তা থেকে বারবার মেহুলের চোখটা সরে চলে যাচ্ছিল ওর দিক। অনেক রাত হয়ে গেছে, ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁতে আর বেশী বাকি নেই। আজকের ওই অসাধারণ ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের পর ফেরার পথে মহারাণীর ইচ্ছে হল এই রোমান্টিক ওয়েদারে একটু লং ড্রাইভ করে আসা যাক। মেহুলেরও ভীষণ ভালো লাগছিল। নির্জন রাস্তা, বাইরে হাল্কা হাল্কা বৃষ্টি, জলের চাদরে ঢাকা আবছা আলোর ল্যাম্পপোস্টগুলো, আর গাড়িতে ওরা দুজন!

     ওয়াইনটা বোধহয় কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। ঘোর লাগা চোখে শ্রীকে দেখতে দেখতে কাছে টেনে নিল মেহুল, ঠোঁট দিয়ে ছুঁল শ্রীর ঠোঁটে লেগে থাকা জলকণাগুলোকে। নিজেকে সমর্পন করেছে শ্রীও, চোখ বন্ধ করে জড়িয়ে ধরেছে মেহুলকে, আঙুল ডুবিয়ে দিয়েছে ওর চুলে…“আআআহহহহ্!!” একটা প্রচন্ড আর্তনাদ… গাড়ির কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ল ভারি কিছু একটা… কাঁচে ছিটকে এল একঝলক রক্ত! মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল সব কিছু! শ্রীনন্দার মর্মান্তিক চিৎকারের মধ্যেও স্পষ্ট শুনতে পেল মেহুল চাকার নীচে মট্ করে শব্দটা, পাগলের মতো স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে ব্রেক এর বদলে চাপ দিয়ে ফেলল অ্যাক্সিলেটরে…বিস্ফারিত চোখে দেখল ভেজা রাস্তায় পিছলে যাচ্ছে চাকা, বাম দিকে হেলে গিয়ে গাড়িটা ভীষণ জোরে এগিয়ে যেতে লাগল বিশাল গাছটার দিকে!

 

(২)

     হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো মেহুল। রাস্তার ওপারে বাঁশ-কাপড় লাগিয়ে প্যান্ডেল তৈরীর কাজ চলছে। পুজোর আর বেশি বাকি নেই। এই চত্বরে বেশ কয়েকটা বড় পুজো হয়। প্রতিবার শ্রীকে নিয়ে বেরোত মেহুল, সেই তাদের প্রেমের শুরু থেকেই। এবছর বেরোতে পারবে কিনা কে জানে! শ্রীর  সুস্থ হয়ে ওঠাটাই… মেহুলের চারপাশ থেকে আশ্বিনের নীল আকাশ আর চ্যাটচেটে ঘামে ভেজা লোকজনের ভীড় সরে গিয়ে হঠাৎ যেন ভেসে উঠল মাসখানেক আগের সেই অঝোর বর্ষার অভিশপ্ত রাতটা! সিগারেট ধরা হাতটা কেঁপে উঠল একটু। সেই ঘটনার পর বহু রাত ঘুমোতে পারেনি, বারবার সামনে চলে এসেছে সেই ভয়ংকর  দৃশ্যগুলো! গাছে গিয়ে গাড়ীটা যখন ধাক্কা মারল, সামনের দিকে ছিটকে এসেছিল ও, এয়ার ব্যাগগুলো অবশ্য বড় কোনও ক্ষতি হওয়ার আগেই বাঁচিয়ে দিয়েছিল ওকে! সারা গায়ে গাড়ির সামনের ভাঙা কাচ গাঁথা, নাক মুখ ফেটে রক্ত পড়ছে, এই অবস্থায় পাশের দিকে তাকিয়ে মাথাটা জাস্ট ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিল তার! সীটের একদিকে অচেতন ভাবে এলিয়ে পড়ে আছে শ্রী, মাথায় গভীর ক্ষত থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর জামাকাপড়, সীট! আর খোলা জানালাটা দিয়ে ঢুকে এসেছে পাতাসহ একটা মোটা ডাল! কোনও সাড়া নেই ওর শরীরে, পাগলের মতো চিৎকার করে ডেকে ডেকে গলা চিরে গিয়েছিল মেহুলের! মাথার মধ্যে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছিল সবকিছু, সেই সময় এক অমানুষিক ইচ্ছেশক্তিতে স্টিয়ারিং হাতে দুমড়ে যাওয়া গাড়িটা ছুটিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সে সবচেয়ে কাছের হসপিটালটায়। মাথায় মারাত্মক চোট,প্রায় তিনদিন আইসিইউতে কোমায় ছিল শ্রী। তখন প্রায় পাগলের মতো অবস্থা তার! ডক্টরের নির্দেশে ওকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে গিয়েছিল নার্সরা, ওর শরীর থেকে একে একে কাচ বের করে ওষুধ দিয়েছিল। নাকে তুলো গুঁজে হসপিটালের রিসেপশানে এসে বসেছিল মেহুল, এমন সময় দেওয়ালজোড়া টিভিতে দেখেছিল খবরটা! বড় বড় সব ব্রেকিং নিউজের মাঝে ছোট্ট একটা এক মিনিটের খবর ওদের অ্যাক্সিডেন্টটার। একটা ছেলে চাপা পড়েছে তার গাড়ির তলায়! ওই অবস্থায় শ্রী-এর জন্য এমন ভয়ঙ্কর টেনশনের মধ্যেও মেহুলের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গিয়েছিল নতুন আশঙ্কায়! তারপরের ক’টা দিন যেন মানসিক দুশ্চিন্তা ওকে একেবারে নিংড়ে নিয়েছিল! সারাক্ষণ পুলিশের ভয়, হসপিটালে আসার সময় মনে হয় মুখটা ঢেকে বেরোবে কিনা… শুধু আড়ে আড়ে নজর রাখতো নিউজ চ্যানেলগুলোর খবরে! কদিন খবরে দেখিয়ে ছিল.. ছেলেটা পাতি একটা উলোঝুলো টাইপের ছেলে, বাড়িতে স্ত্রী ছাড়া বোধহয় আর কেউ নেই, সেও আবার তারপরেই কোনও হসপিটালে থেকে মারা যায়। পুলিশ স্বাভাবিকভাবেই তাকে আইডেন্টিফাই করতেই পারেনি। চ্যানেলগুলোও যথারীতি আরও নানারকম খবরে মেতে উঠেছিল। এরকম একটা পাতি অ্যাক্সিডেন্টের খবরে কি আর তাদের টি আর পি উঠবে! খুব বাঁচান বেঁচে গিয়েছিল মেহুল! ভাগ্যিস সেদিন রাস্তাটা ফাঁকা ছিল… আর একা ছিল লোকটা…! যাক, ভগবান যা করেন ভালোর জন্যই… নাহলে ওই একটা রাতের জন্য ওদের জীবনটা একদম তছনছ হয়ে যেত… ওদের স্বপ্নগুলো…

     “স্যার, প্লিজ কাম ইন অ্যান্ড সাইন দ্য পেপার্স।” রিসেপশনিস্ট মেয়েটার ডাকে সিগারেটটা পায়ের তলায় নিভিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকল মেহুল। আজ শ্রীকে বাড়ি নিয়ে যাবে ও। মাথায় চোটের ফলে একটা ছোট ব্লাড ক্লট হয়েছিল বটে, তবে অপারেশনটা আর করাতে হয়নি শেষ পর্যন্ত। মেডিসিনেই আস্তে আস্তে সুস্থ হল শ্রী। ওদের কাজের মেয়ে কাজল তো আছেই, এ ছাড়া আগে থেকে একজন সারাক্ষণের আয়া ঠিক করে রেখেছে মেহুল। ডক্টর ভালো ভাবে রেস্ট নিতে বলেছেন। সাদা কুর্তা পাজামা পরা শ্রী-কে ধরে ধরে এনে গাড়িতে বসালো মেহুল।

     এই কদিন হসপিটালে থেকে ভীষণ শুকনো ফ্যাকাসে লাগছে শ্রীকে, ক্লান্ত দুটো চোখ আর তার নীচে ঘন কালো ছোপ। পরম যত্নে ওর মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলল মেহুল।

 

(৩)

     ব্যালকনিতে বসেছিল শ্রীনন্দা। একটু আগে আয়া মেয়েটা একবাটি ওটস আর জ্যুস রেখে গেছে টেবিলে। দু চামচ খেয়েছে, আর ইচ্ছে করছে না। এই রুগীর পথ্য যে কবে শেষ হবে! দিন পনেরো হয়ে গেল হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছে, কিন্তু মেহুল আর ডক্টরের সাঁড়াশি আক্রমণে সে বেচারি গৃহবন্দী। শপিং-পার্লার-মুভি, তার নাচের ক্লাস সব বন্ধ! এদিকে পুজো শুরু হয়ে গেল, গোটা কলকাতা মেতে উঠেছে। আর সে কিনা ঘরে বসে বসে বোর হচ্ছে! এরকম আরও কতদিন চলবে কে জানে!

     ঘরের ভেতরে এসে রাইটিং টেবিলটার সামনে বসল শ্রীনন্দা। অনেক দিন কিছু লেখালেখি করা হয় না। না, সিরিয়াস ভাবে লেখালিখি কোনওদিনই করেনি সে… ওই টুকটাক নিজের খেয়ালে লেখা। সেগুলোই কখনো ফেসবুকে নিজের ওয়ালে স্ট্যাটাস দিয়েছে হয়তো, কিংবা বড়জোর কোনও ফেসবুক গল্পের গ্রুপে… ব্যাস, এইটুকুই! ডায়েরিটা টেনে নিল শ্রীনন্দা, খসখস করে লিখতে শুরু করল।

     প্রায় আধঘন্টা মতো পরে যখন সে মাথা তুলল ডায়েরি থেকে, তখন কাজল এসে খাওয়ার জন্য ডেকে ডেকে শেষে ওটসটা তুলে নিয়ে গেছে। সেদিকে হুঁশ নেই তার, লেখাটায় চোখ বুলিয়ে নিজেই চমকে গেল! আরে বেশ দারুণ একটা থ্রিলার হয়েছে তো! এত ভালো গল্প, এত ভালো লেখা এর আগে তো কোনওদিন লেখেনি সে! আজ মেহুল আসলে দেখাতে হবে! মনের খুশিতে রিভলভিং চেয়ারটায় পাক খেয়ে ডাক দিল শ্রীনন্দা, “কাজল! কাজল! কিছু খেতে দে। খিদে পেয়েছে!”

     সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। চুলে একটা লম্বা বিনুনি করে সোফায় এসে বসল শ্রীনন্দা। মনটা খারাপ হয়ে আছে। আজ ষষ্ঠী। রাস্তায় রাস্তায় নিশ্চয়ই জনজোয়ার নেমেছে! এখন তো মানুষ পারলে মহালয়া থেকেই সেলিব্রেট করা শুরু করে! পুজো কমিটিগুলোও তেমন, মানুষের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্বোধনও তাড়াতাড়ি করে দিচ্ছে… দ্বিতীয়া বা তৃতীয়াতেই! অথচ তার এবছর আর পুজো দেখাই হবে না! মাথার কাটা জায়গাটায় এখনও ওষুধ লাগাতে হচ্ছে, ইনফেকশন হতে পারে বলে এমনিতেই তো বাইরে বেরোনো বারণ…তার ওপর এই ভিড়ভাট্টায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যেতে বললে ওকে বোধহয় এবার হাত-পা বেঁধেই বসিয়ে রাখবে মেহুল! একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমোটটা হাতে নিল শ্রীনন্দা। এবারের মতো টিভিতেই নাহয় দেখা যাক পুজোটা! টিভিটা চালিয়ে বাংলা নিউজ চ্যানেলে গেল, ওগুলোতেই পুজো পরিক্রমা দেখায়। কিন্তু একি! চোখের সামনে ভেসে উঠেছে একটা বিখ্যাত নিউজ চ্যানেল… উত্তেজিত স্বরে নিউজ রিডার কি বলছে! কানের মধ্যে যেন গরম সীসে ঢুকে গেল শ্রীনন্দার… মুখ  চেপে ধরেও আর্ত চিৎকারটা সামলাতে পারল না সে! তাড়াতাড়ি চ্যানেল চেঞ্জ করে দেখল, সব জায়গায় একই খবর! বড় বড় লাল লেখায় ব্রেকিং নিউজ… রিপোর্টারদের চিৎকার… ছুটে চলা ক্যামেরা…. রিমোটটা খসে পড়ল ওর হাত থেকে! ওর চিৎকারে দৌড়ে এসেছে কাজল, টিভির দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত গলায় চিৎকার করে উঠল সেও! পাগলের মতো ছুটে গিয়ে মোবাইলটায় নাম্বার ডায়াল করল শ্রীনন্দা, তারপর হাউ হাউ করে ভেঙে পড়ল, “কোথায় তুমি?”

     বিধ্বস্ত অবস্থায় সোফায় এলিয়ে পড়েছিল মেহুল। আতঙ্ক এখনও গ্রাস করে রেখেছে তাকে, তবুও তার মাঝেই নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে অক্ষত ফিরে আসার প্রশান্তি আস্তে আস্তে একটা ঠান্ডা প্রলেপ ছড়াচ্ছে তার ভেতরে। আজ এক ভয়ানক বিভীষিকা বয়ে গেছে কলকাতার বুকে। কেড়ে নিয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ… উৎসবের আনন্দ-জৌলুস মুছে গিয়ে চারদিকে এখন শুধুই স্বজনহারার হাহাকার!

     “কপাল খুব ভালো ছিল। আমি আগেভাগে বেরিয়ে গেছিলাম বসকে বলে… আজ ষষ্ঠীতে তোমার মন খারাপ করবে বাড়িতে বসে… উফ্! নাহলে… কি যে হত! ভাবতেও পারছি না… কলকাতায় এরকম…”, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কথাগুলো আর শেষ করতে পারল না মেহুল, সেন্টার টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা জলের গ্লাসটা তুলে নিল। ওর পাশে পাথরের মূর্তির মতো বসেছিল শ্রীনন্দা, দুশ্চিন্তায় আতঙ্কে যেন কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল এতক্ষণ; হঠাৎ যেন হুঁশ ফিরে পেয়ে মেহুলকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল! নিজের আলিঙ্গনের মধ্যে ওকে বুকে টেনে নিল মেহুল, কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল, “এই তো আমি! ঠিক আছি তো… আর ভয় নেই! আর কেঁদো না সোনা। শরীর খারাপ করবে তোমার!”

     মুখ তুলে ওর দিকে ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে তাকালো শ্রীনন্দা। ওর সেই অস্বাভাবিক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আরও একবার বুকটা কেঁপে গেল মেহুলের! ভীষণ ভয় পেয়েছে মেয়েটা! আতঙ্ক যেন ওর চোখে মুখে নির্মম গভীর আঁচড় কেটে দিয়ে গেছে! ও কিছু বলার আগেই হঠাৎ একটা ঘড়ঘড়ে স্বরে বলে উঠল শ্রীনন্দা, “একটা জিনিস দেখবে?” তারপরেই উঠে চলে গেল ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে একটা খোলা ডায়েরি এগিয়ে দিল মেহুলের দিকে।

     -“কি এটা?”

     -“একটা…গল্প…আমি…আজ দুপুরে…লিখেছি…”, থেমে থেমে বলল শ্রী।

     ভুরু কুঁচকে গেল মেহুলের। এসব কি বলছে শ্রী! একটু আগে ভয়ে আতঙ্কে কাঁপছিল আর এখন গল্প পড়াতে খাতা খুলে বসেছে! পুরো ব্যাপারটাই মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল তার, সামান্য অধৈর্য্য স্বরে বলল,“এখন আবার কি গল্প পড়ব? কি যে করো না তুমি! এখন এসব রাখো… ভাল্লাগছে না… পরে দেখা যাবে…!”

     -“প্লিজ জান!”, ব্যাকুল আর্তি ঝরে পড়ল শ্রী এর গলায়। মেহুলের পাশে বসে চেপে ধরল হাত দুটো, “তুমি প্লিজ একটিবার পড়ো… বুঝতে পারবে কেন বলছি!”

     ওর আকুলতা দেখে অবাক হয়ে গেল মেহুল! কী এমন আছে ওই গল্পে! শ্রী-এর করুণ মায়া ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে টেনে নিল ডায়েরিটা। ওর নিজের মনেও অবশ্য ততক্ষণে কৌতূহলের একটা ভারী বাষ্প তৈরী হচ্ছে! চোখ রাখল ডায়েরির পাতায়।

     একটা ছেলের কাহিনি দিয়ে শুরু হয়েছে গল্পটা। একটু এগোতেই চমৎকৃত হল মেহুল! বাহ্! শ্রী-এর লেখা তো আগের চেয়ে অনেক ইম্প্রুভ করেছে! যেমন ঝরঝরে সাবলীল ভাষা, তেমনি টানটান প্লট! পড়তে পড়তে ডুবে গেল গল্পে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্টুডেন্ট ছেলেটি। কলেজে থাকতে থাকতে ড্রাগের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে জীবন। বুঁদ হয়ে পড়তে থাকে মেহুল। এরপর ইন্টারনেটের মাধ্যমে মিলিট্যান্ট গ্রুপে যোগদান।  নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া এবং বহুবছর পর ফের কলকাতায় আগমন। হঠাৎ আটকে গেল মেহুল! একি! নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না… আবার পড়ল সে! এরপর যা যা ঘটনা লেখা তা নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে শুধু ভারতবর্ষ নয়, গোটা বিশ্ব! শ্রী-এর গল্পের পাতায় যেন ফুটে উঠেছে আজকেরই দিনটা! আজ, অর্থাৎ মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যেবেলায় কলকাতার ছটা বড় বড় পুজো প্যান্ডেলে বম্ব ব্লাস্ট হয়েছে… মারা গেছে হাজার হাজার মানুষ! স্তম্ভিত হয়ে শ্রীর দিকে তাকাল মেহুল! এ তো মারাত্মক কোইন্সিডেন্স! শ্রীও তখন ভীষণ ভয় পাওয়া মুখে সোফার কভারটা খামচে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো! প্রবল কৌতূহলে আবার পাতায় চোখ রাখল মেহুল… বর্ণনায় ফুটিয়ে তোলা সেই সমস্ত ধ্বংসদৃশ্যগুলো, ঠিক যে বর্ণনা এখন টিভিতে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে উঠে আসছে! এমনকি… ক্লাবগুলোর নাম অব্দি এক!

     -“বাপরে!”, ডায়েরিটা রেখে কপালটা চেপে ধরল মেহুল, চোখ বড় বড় করে বলল,“এ কি ভয়ংকর কোইন্সিডেন্স! তুমি দুপুরে লিখলে… আর সন্ধ্যেবেলা ব্লাস্ট হল!”

     -“এটা…এটা কি করে হল!”, একটা ভয়াবহ আর্তনাদ যেন ঠিকরে এল শ্রীর গলা দিয়ে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে থাকল, “আজই কেন হঠাৎ লিখতে ইচ্ছে করল…? এর আগে তো কোনওদিন এমন গল্প লিখিওনি! আমি লিখলাম বলেই কি…?”

     -“উফ্, আমার বউটা একদম পাগলি! তুমি লিখলে বলে হল, এমনটা আবার হয় নাকি!”, শ্রীর কথার পিঠে হা হা করে একটা প্রাণখোলা হাসি ছড়িয়ে পড়ল মেহুলের মুখে! কাছে টেনে নিল ওকে। চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিতে নরম গলায় বলতে থাকল, “তুমি এইসব ভুলভাল ভাবা বন্ধ করো তো! আরে বাবা, এসব টেররিস্ট অ্যাটাকের প্ল্যানিং বহু আগে থেকে হয়, তুমি আজ গল্প না লিখলেও ব্লাস্টটা হতই! নিজেকে এভাবে দোষী ভাবছ কেন! কলকাতার পুজোয় বম্ব ব্লাস্ট নিয়ে আগেও তো অনেক স্টোরি লেখা হয়েছে। এমন একটা পপুলেটেড মেট্রো সিটিতে এরকম অ্যাটাকের সম্ভাবনাও তো সবসময়ই থাকে! তোমারটা জাস্ট টাইম ম্যাচ করে গেছে, আর কিছু না!”

     মেহুলের বুকে মাথা রেখে একটু যেন ভরসা খুঁজছিল শ্রী…ওর মাথায় গাল ঠেকিয়ে আশ্বাস দিলো মেহুল, “কিচ্ছু হয়নি সোনা! তুমি প্লিজ অত স্ট্রেস নিও না, কেমন! ডক্টরও কিন্তু বারণ করেছে!”

 

(৪)

     পোর্সেলিনের ফ্লাওয়ার ভাসগুলোতে সাদা কারনেশান আর লাল গোলাপগুলো পরপর সাজাচ্ছিল শ্রীনন্দা। আজ ফ্ল্যাটটাকে খুব সুন্দর করে নিজের হাতে সাজাবে ও, মেহুলের জন্মদিন বলে কথা! এবছর ঘরেই সেলিব্রেট করবে তারা। অ্যাক্সিডেন্টে আগের গাড়িটা একেবারে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল, ভাগ্যিস ইন্সিওরেন্স করা ছিল! তারপর আবার নতুন গাড়ি নিয়েছে মেহুল, কিন্তু এখনও একটা হাল্কা ট্রমা আছে ওর মধ্যে… অফিসের বাইরে খুব একটা ড্রাইভ করতে চায় না।

     ওর আর মেহুলের বিয়ের একটা ছবি সুন্দর করে ফ্রেম করা আছে ক্যাবিনেটের ওপর। কাপড় দিয়ে মুছে আলতো করে হাত বোলালো শ্রীনন্দা। কোথায় যেন একটা কাঁটা ফুটছে। একটা সরু চুলের মতো ফাঁক যেন তৈরী হয়েছে ওদের মধ্যে। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছিটকে এল শ্রীনন্দার বুক চিরে! আগের মতো আর তাকে বোঝে না মেহুল, অনুভব করে না ভেতর থেকে। সেদিনের পর থেকে প্রায় পনের-কুড়ি দিন অন্তর অন্তর একই ঘটনা ঘটে চলেছে… আর প্রতিবারেই এক দমবন্ধ করা অপরাধবোধ যেন গলা চেপে ধরছে তার! বেশ কয়েকবার মেহুলকে জানিয়েছিল তার এই অসহ্য যন্ত্রণার কথা… কিভাবে হঠাৎ করে ওকে টানতে থাকে ডায়েরি আর পেনটা… পাগলের মতো ছুটে যায় ও আর কলমের আঁচড়ে ফুটে ওঠে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনার কথা! তারপরই সেই দুর্ঘটনাগুলো নির্মম সত্যি হয়ে নেমে আসে পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তে! কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটাকে বরাবর হাসিঠাট্টার ছলে কোইন্সিডেন্স বলে উড়িয়ে দিয়েছে মেহুল! একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে কি আর তাকে কোইন্সিডেন্স বলা যায়? প্রতিবার ওর সঙ্গেই কেন হয় এমন!

     পুজোমন্ডপে ব্লাস্টের পরের দিন যখন নিউজে দেখিয়েছিল যে এই পুরো প্ল্যানটার মাস্টারমাইন্ড ছেলেটাকে ধরা গেছে এবং সে কলকাতারই ছেলে… ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করার পর কোথায় যেন চলে যায়… আবার অনেক বছর উধাও থাকার পর হঠাৎই কলকাতায় ফিরে এসেছে! ঠিক যেন হুবহু শ্রীর সেই গল্পটা! তখনও ব্যাপারটা নিয়ে মজা করেছে মেহুল! “এই রে! এবার আমার বউকে তো পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে!” বলে বলে সারাদিন খেপাল ওকে! শুধু তো ওই দিনই নয়… তারপরেও তো কতবার.. .একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর মেহুলের সেই একই প্রতিক্রিয়া… চমকে উঠল শ্রীনন্দা! এ কোথায় ও! ড্রইংরুম থেকে মুছতে মুছতে কাপড়টা হাতে নিয়েই কখন এসে স্টাডিতে রাইটিং টেবিলে বসেছে ও! এখনও অনেক কাজ পড়ে আছে, উঠতে গিয়েও উঠতে পারলো না শ্রী… বা বলা ভালো উঠল না! কারণ ততক্ষণে যেন ধীরে ধীরে অন্য একটা মানুষ দখল নিচ্ছে ওর ভেতরটা…কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, “লেখ! সব ভুলে লেখ! তোকে তো লিখতেই হবে!” মাথার ভেতর রক্তকণা গুলো পাগলের মতো ছুটোছুটি শুরু করেছে… দ্রুত নিঃশ্বাসের গতি পরিবর্তনে হাপরের মতো ওঠা নামা করছে বুক! হাতের কাপড়টা ছুঁড়ে ফেলে বিকারগ্রস্তের মতো ডায়েরিটার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্রীনন্দা!

     সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরে হতভম্ব হয়ে গেল মেহুল! ড্রয়িং রুম জুড়ে ফুল-মোমবাতি ছড়ানো ছেটানো হয়ে পড়ে আছে কার্পেটের ওপর! যেন সাজাতে গিয়েও সাজানো হয়নি সেসব! আর তার মধ্যে এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে শ্রী। ওর আওয়াজে মুখ তুলে তাকালো, চোখে জল! কি ব্যাপার! ও কিছু বোঝার আগেই দৌড়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল, ফুঁপিয়ে উঠল বুকে মুখ গুঁজে।

     -“আরে কি হয়েছে?”, দু হাতে শ্রীনন্দাকে সামলালো মেহুল। ততক্ষণে পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাতে শুরু করে দিয়েছে শ্রী, হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে অস্থির ভাবে বলে উঠল, “কত্ত প্ল্যান করেছিলাম… কিচ্ছু সাজাতে পারলামই না! আজকের দিনটা এত এত স্পেশাল, তাও আমি…”

     -“থামো থামো! কি হয়েছে ঠিক করে না বললে বুঝবো কি করে? সাজাতে পারলে না কেন?”, মনে মনে একটু অধৈর্য্য হলেও গলায় সেটা প্রকাশ পেতে দিলো না মেহুল। হঠাৎ কেমন যেন সিঁটিয়ে গেল শ্রীনন্দা!

     “আমি লিখছিলাম আবার! জানো… আমার মধ্যে না অন্য একটা মানুষ ঢুকে যায়… সেই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছিল ওই ভয়ংকর কথাগুলো! আমি লিখতে চাইনি! দেখো দেখো…”, বলতে বলতে মেহুলের মুখটা দুহাতে নিজের মুখের দিকে আনল, “দেখতে পাচ্ছো না! আমার মধ্যে অন্য একজন আছে… দেখো ভালো করে!” তার দু চোখে তখন উন্মাদের দৃষ্টি!

     গলার কাছে কি যেন দলা পাকাচ্ছিল। দু হাতে শক্ত করে ধরে শ্রীর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও সামলানোর চেষ্টা করছিল মেহুল। বাষ্প জমছে দুই চোখে। এ কোন শ্রী! এসব কি বলছে ও! তবে কি মাথার চোটের এফেক্টটা এতদিনে ব্রেনে পড়তে আরম্ভ করল? ডক্টর বলেছিলেন এরকম হতে পারে, অনেক দিন পরেও মেমরি লস বা ম্যাডনেস ফিরে আসতে পারে… ধাক্কাটা মাথায় লেগিয়েছিল তো! কিছুই বলা যায় না! ওর বুকের মধ্যে তখনো ছটফট করছে শ্রী, নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না মেহুলও। দু চোখ ছাপিয়ে জল নামছে… আশ্রয় দরকার… একটা নিবিড় আশ্রয়! ওকে কোলে তুলে নিল মেহুল, গভীর আশ্লেষে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরেছে ওর দুটো ঠোঁট… এই যেন তার শেষ আশ্রয়। ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছিল শ্রীও… মেহুলকে টেনে নিল নিজের দিকে। যেন উন্মত্ত ঝড়ের তান্ডবের পর নামছিল এক কামনার বৃষ্টি… দূরের সাঁঝতারাকে সাক্ষী রেখে ভালোবাসায় মিশতে মিশতে একে অপরকে ধারণ করছিল দুই নারী ও পুরুষ।

 

(৫)

     শ্রীনন্দাকে সঙ্গে করে চেম্বারের বাইরে এলেন ডক্টর মিত্র। “আরে ইয়াংম্যান! কনগ্র্যাচুলেশনস!”, বলে জড়িয়ে ধরলেন মেহুলকে! “দেয়ার ইজ আ গ্রেট নিউজ! ইউ আর গোয়িং টু বিকাম আ ড্যাড!”,বলে মিটিমিটি হাসলেন শ্রীর দিকে তাকিয়ে! একটা রক্তিম আভা ছড়িয়ে গেল শ্রীর মুখে, নতচোখে একটু পাশে সরে গিয়ে অ্যাকোরিয়ামের মাছগুলো দেখতে থাকল সে।

     একটুখানি হকচকিয়ে গেল মেহুল! এরকম একটা খবরের জন্য একদমই তৈরী ছিল না! সেদিন শ্রীর ওরকম পাগলামি দেখার পর একটা অসম্ভব আতঙ্ক কাঁটার মতো খচখচ করছিল ওর মধ্যে। যদিও পরের দিন সকাল থেকে একদম নর্মাল হয়ে গিয়েছিল শ্রী… হাসছে, কথা বলছে, খুনসুটি করছে… তাও ওর জন্মদিনের সন্ধ্যেটা কিছুতেই ভুলতে পারছিলো না মেহুল! শ্রীকে কি সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত? এই প্রশ্নটা শেষ কদিনে যে নিজেকে কতবার করেছে ও, তার কোনও হিসেব নেই! এই ভাবে ক’টা দিন যাওয়ার পর সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে শেষ অব্দি ডক্টর মিত্র, যিনি শ্রীর ট্রিটমেন্ট করছিলেন, তাঁর কাছে যাওয়াই মনস্থ করে। তারপর ওনার ওপিনিয়ন নিয়েই না হয় এগোনো যাবে! এখানে এসে শ্রীর সঙ্গে খানিক কথাবার্তা বলে স্ক্যান করার জন্য পাঠালেন, সঙ্গে একটা টেস্টও। আর তারপর ঘন্টাখানেক পর এই খবর! একটা অনাবিল সুখ যেন তিরতির করে ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর মধ্যে… চারপাশের আলোটা যেন হঠাৎই বেড়ে গেল! “কি বলছেন ডক্টর! থ্যাঙ্কয়ু! থ্যাঙ্কস ফর দ্য নিউজ!”, বিহ্বল স্বরে ডক্টর মিত্রের হাতটা দুহাতে জড়িয়ে ঝাঁকাতে থাকল মেহুল!

     -“আরে মেনশান নট! আর হ্যাঁ”, গলাটা সামান্য নীচু করলেন ডঃ মিত্র, “আমি শ্রীনন্দার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম। স্ক্যান ও করালাম। কোনও অ্যাবনর্মালিটি নেই… অ্যাটলিস্ট তুমি যা ভাবছো তেমন কিছুই নয়! এরকম একটা ফেটাল অ্যাক্সিডেন্ট, স্বাভাবিক ভাবেই তার ট্রমাটা এখনও কাটেনি… সারাদিন বাড়িতে প্রায় একা থাকে, তার ওপর এই লেখার সঙ্গে ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার কোইন্সিডেন্সটা ঠিক মানতে পারছে না… ভয় পাচ্ছে। আমি বুঝিয়েছি ভালো করে, এখনই তোমার কাউন্সেলিং-এর ব্যাপারে কিছু ভাবার দরকার নেই! তবে আমার মনে হয় এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। মাতৃত্ব একজন মেয়েকে পূর্ণতা দেয়, ভেতরকার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়, জানো তো! তুমি বরং ওকে যতটা বেশী সম্ভব টাইম দাও, খুব ভালো করে যত্ন নাও। যে আসছে তার জন্য প্রস্তুতি শুরু করো… দেখবে ও সব ভুলে যাবে। অল দ্য বেস্ট ডিয়ার!”

     বাড়িতে পৌঁছেই ওকে কোলে তুলে নিয়ে বাচ্চাদের মতো নাচতে শুরু করে দিলো মেহুল! কাজল তো দেখে হেসেই কুটিপাটি। একটা স্নিগ্ধ ভালোবাসা ছড়িয়ে যাচ্ছিল শ্রীনন্দার সারা শরীর জুড়ে। একটা অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছে শরীরে, তার মধ্যেই বেড়ে উঠছে একটা প্রাণ! পরম মমতায় নিজের পেটের ওপর হাত বোলালো সে। জীবন দিয়ে আগলে রাখবে তার এই ছোট্ট সোনাকে… খুব যত্ন নেবে! এখন থেকে তার প্রতিটা মুহূর্ত শুধু ওর। ওর যাতে কোনও কষ্ট না হয়, তার জন্য নিজের খুব ভালো করে খেয়াল রাখবে সে! কিন্তু… উজ্জ্বল রঙের খেলার মধ্যে যেন এক ফোঁটা কালো রঙ পড়ে যাওয়ার মতো করে একটা বিষন্নতা ফোঁটা ফোঁটা মিশে যাচ্ছিল তার চেতনায়! মেহুল কি ওকে পাগল ভাবছে? নাহলে কোনও প্রবলেম না হওয়া সত্ত্বেও কেন ডক্টরের কাছে নিয়ে গেল ওকে? ডক্টরই বা কেন সব বাদ দিয়ে বেশীরভাগ সময়টা ওকে লেখালিখি নিয়েই জিজ্ঞাসা করে গেলেন? উনি ওর লেখার ব্যাপারটা জানলেনই বা কি করে? চোখ থেকে উপচে পড়া জলটাকে অনেক কষ্টে ঠোঁট কামড়ে আটকালো শ্রীনন্দা। এখনও পাগলের মতো লাফাচ্ছে মেহুল! ওই আনন্দে উদ্ভাসিত মুখটা দেখতে দেখতে যেন ওর ভেতর থেকে কেউ বলে উঠল… নাহ্,আর কখনো বলবে না ওকে। মেহুলের এই উচ্ছল মুখটাকে আর নিভতে দেখতে চায় না ও! লিখবে না… আর লিখবেনা ও! কোনওদিনও না!

 

(৬)

     টবের গাছগুলোয় জল দিচ্ছিল শ্রীনন্দা। সকালবেলা মেহুল বেরিয়ে যাওয়ার পর সারাটা দিন পড়ে থাকে। দেখতে দেখতে আটটা মাস কেটে গেল। আজকাল আর কিছুই ভালো লাগেনা। শরীরটা বেঢপ হয়ে ফুলে উঠেছে, আয়নায় নিজের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করেনা। সারাক্ষণ মাথা ঝিমঝিম আর গা গোলানো… না খেতে ভালো লাগে, না শুতে। মেহুল অবশ্য সকালবেলা খুব যত্ন করে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে দিয়ে গেছে, ওষুধও। আপনমনে পেটে হাত বোলালো শ্রী। আজকাল তার ভেতরের খুদেটা মাঝে মাঝে জানান দেয় তার উপস্থিতি! ওইটুকু… ওই অনুভূতিটাই তো তার বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ.. .নাহলে তো কবেই… বুক মুচড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল শ্রীর।

     দরজার আড়াল থেকে লুকিয়ে তাকে দেখছিল কাজল, চোখে একটা চাপা আতঙ্ক! কালকের সন্ধ্যেটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে! ভেতরে ভেতরে আরও একবার কেঁপে উঠল কাজল… চোখের সামনে ভেসে উঠল বৌদির সেই ভয়ংকর মূর্তি! প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যেবেলা গরম দুধ নিয়ে বারান্দায় গেছিলো ও, দেখে বৌদি নেই! এরপর এদিক ওদিক দেখতে দেখতে শেষপর্যন্ত বইয়ের ঘরটায় গিয়ে দেখল টেবিল চেয়ারে বসে কী যেন লিখছে বৌদি। এর আগেও কাজের ফাঁকে দেখেছে বৌদি আজকাল যেন কিসব লেখালিখি করে, কিন্তু কাল বৌদির সামনে গিয়ে দৃশ্য দেখে যেন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল তার! পাগলের মতো কী যেন লিখে চলেছে বৌদি। মুখ দিয়ে একটা চাপা গোঁ গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে! এ যেন বৌদি নয়, অন্য কোনও মানুষ… লাল চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, মাথার চুল এলোমেলো, ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে! সেই পাগলপারা দৃষ্টি খাতার পাতায় আটকে, যেন গিলে খাবে খাতাটা! একই সঙ্গে ঝড়ের গতিতে হাত চলছে, লেখায় ভরে উঠছে পাতাগুলো! বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পড়ছিল কাজলের… বৌদিকে ভূতে পেয়েছে নাকি? ভর করেছে কিছু? তাদের গ্রামে এ সমস্ত হলে ওঝা আছে। ঝেড়ে বিষ নামিয়ে দেয় একেবারে… কিন্তু শহরের পড়াশুনো করা মানুষরা এসব মানবে নাকি! উল্টে তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়েই দেবে! অনেক সাহস সঞ্চয় করে ভয়ে ভয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কাজল, আলতো করে ছুঁয়েছিল, “বৌদি! দুধটা!”, আর সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠেছিল! বৌদির গা ভীষণ গরম! ঠিক যেন গনগনে কড়াই… হাত দিলে ছ্যাঁকা লেগে যায়! মুহূর্তের মধ্যে জ্বলন্ত চোখ তুলে তাকিয়েছিল বৌদি, হিসহিসে গলায় চিৎকার করে ঠেলে দিয়েছিল তাকে, “যাঃ! চলে যাঃ!” আরও একবার শিউরে উঠল কাজল! কি হয়েছিল বৌদির? কিন্তু তারপর তো আবার খানিকবাদে ঠিক হয়ে গেল… আজ সকাল থেকেও সব স্বাভাবিক… খাওয়া-দাওয়া করেছে, এই যে এখন গাছে জল দিচ্ছে…

     -“কি রে! ফলের বাটিটা নিয়ে ওরকম হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন! দে আমাকে!”, শ্রীর আওয়াজে ঘোর কেটে গেল কাজলের! স্প্রে বটলটা রেখে হাসিমুখে হাত বাড়িয়েছে শ্রী। “অ্যাঁ! হ্যাঁ…এই যে…”, ফলের বাটিটা রেখে একরকম পালিয়ে গেল ও!

     বেতের চেয়ারটাতে বসে একটা আপেলের টুকরো দাঁতে কেটেও রেখে দিল শ্রী। কিচ্ছু ভালো লাগছে না, মাথার ভেতরটা দপদপ করছে। কাজল অমন পালিয়ে গেল কেন, জানে ও। কিন্তু কি করবে… ওই সময়গুলোতে যে নিজের দখলে থাকে না ও! কি করে, কখন করে সবই বুঝতে পারে… কিন্তু কিছুতেই থামাতে পারেনা নিজেকে! যেন এক অদৃশ্য শক্তি সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো চালনা করতে থাকে ওকে! আর এই অপরাধবোধের ভার বইতে পারছে না ও… কতবার ভেবেছে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা। শুধু মাত্র একটা অদ্ভুত মায়ার আবেশ যেন তাকে টেনে ধরেছে পেছনে, মনে করিয়ে দিয়েছে তার আগত সন্তানের কথা! কাউকে বোঝাতে পারে না ও নিজের অবস্থাটা… যার বোঝার কথা ছিল সেইই তো…

     দু ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে এসে পড়ল কোলের বাটিতে রাখা আপেলের ওপর। ওর এই বিষন্নতা, এই মাঝে মাঝে চুপ করে বসে থাকা… এগুলোকে মেহুল ভাবে প্রেগনেন্সির জন্য মুড সুইং! ওর ভুলটা আর ভাঙাতে চায় না শ্রী। ওর এই মনের অবস্থাটা আর কাউকেই জানাতে দিতে চায় না। কি লাভ! সবাই তো পাগলই ভাববে! সেদিন যতই প্রতিজ্ঞা করুক আর লিখবে না, কিন্তু মাঝেমধ্যেই যে ওর মধ্যে সেই অন্য মানুষটা এসে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় ডায়েরি-পেনটার দিকে… একথা কেউ বিশ্বাস করবে না! প্রথম প্রথম নিজেও বিশ্বাস করতে পারত না… এই ইন্টারনেটের যুগে কলকাতার মতো মেট্রো সিটিতে বসে ও নাকি পোসেসড হয়ে যাচ্ছে! সোজা বাংলায় “ভূতে পেয়েছে”! কিন্তু একটু একটু করে অনুভব করে… কিছু কিছু জিনিসের বোধহয় সত্যি ব্যাখ্যা হয় না! শুধু শ্রী নিজে জানে কোন অসীম যন্ত্রণার সমুদ্রে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে ও!

     গালটা মুছে মোবাইলটা হাতে নিল ও। একটু অন্য দিকে মনটা ফেরানো যাক। এইরকম ভীষণ একলা মনখারাপের মুহূর্তগুলোয় ফেসবুকটা খুলে খুলে দেখে। বিভিন্ন বন্ধুদের ছবি, ওকে পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তা, নানরকম মুহূর্ত, স্ট্যাটাস… সময়টা বেশ কেটে যায়, মনের ভেতরের জ্বালাটা ভুলে থাকে। স্ক্রল করছিল শ্রী, কয়েকটা পোস্টে লাইকও করল… তারপর দেখতে দেখতে হঠাৎ এক জায়গায় এসে থমকে গেল। একটি বিখ্যাত সর্বভারতীয় চ্যানেলের অফিসিয়াল পেজ থেকে দেওয়া একটা রিপোর্ট, যাতে বর্ণনা দেওয়া এক হাড় হিম করা ঘটনার! এক স্কিজোফ্রেনিক মহিলার কীর্তি! গতকাল গভীর রাতে তিনি নিজের হাতে শাবল দিয়ে বাড়ি মেরে নিজের মেয়েকে মেরে ফেলেছেন, তারপর নিজেই নিজের গলার নলি কেটে আত্মহত্যা করেছেন! এছাড়া মহিলার মৃতদেহের গায়ে ছিল অসংখ্য কাটাকুটির চিহ্ন! পুলিশসূত্রে জানা গেছে ওই মহিলা সম্ভবত এর আগে নিজের স্বামীকেও হত্যা করেছেন, তাঁর দেহ পাওয়া গেছে বাড়ির পিছনের বাগানে! মোবাইলটা সামনের ছোটো টেবিলটায় ছুঁড়ে ফেলল শ্রী! সে জানে এর কারণ! এই মহিলা তো তারই সৃষ্টি করা চরিত্র… কাল সন্ধ্যেই তো লিখেছে সে এই গল্পটা! পাশে রাখা কুশনটা মুখে চেপে মর্মান্তিক হাহাকারের মতো কান্নায় ভেঙে পড়ল শ্রী! এর শেষ কোথায়! তার কি মুক্তি নেই এই অভিশপ্ত জীবন থেকে!

 

(৭)

     পার্কিং স্পেস থেকে গাড়িটা বের করল মেহুল। আজ একটা ভীষণ স্পেশাল দিন! ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু হল না… ক্লায়েন্ট মিটিং ছিল। মিটিংটা শেষ করেই জলদি জলদি বেরিয়ে পড়েছে। শিস দিতে দিতে রাস্তায় নামাল ওর নতুন কালো ডিজায়ারটা। আজ দারুণ ভাবে সেলিব্রেট করবে ওদের সেকেন্ড অ্যানিভার্সারিটা! ঘরে শ্যাম্পেন এনে রাখা আছে, যাওয়ার পথে গোলাপের বোকে আর খাবারটা তুলে নেবে। মনের মধ্যে হালকা একটা দখিনা বাতাস বইছে যেন! আর কয়েকদিন পরেই ওদের জীবনে আসবে নতুন অতিথি! ওর আসার অপেক্ষায় একটা একটা করে দিন গুনে চলেছে ওরা… ঘর সাজানো, বেবিকট-খেলনা-পুঁচকে পুঁচকে জামাগুলো কেনা, সবই একটু একটু করে হচ্ছে! শ্রীর অবশ্য মাঝেমধ্যেই মুড সুইং করে… তবে ডক্টর বলেছে এরকম অ্যাডভান্স স্টেজে এটা খুবই নর্মাল। পকেটে হাত দিল মেহুল, নাহ্,সলিটেয়ারের বক্সটা ঠিকঠাকই আছে! সারপ্রাইজটা পেয়ে শ্রীর মুখটা কেমন হবে… ভাবতেই একটা ভালোলাগার আবেশ ছুঁয়ে গেল ওকে!

     উফ্, আবার ট্র্যাফিক! অফিস ফেরত ভীড়ে ঠাসা রাস্তায় গাড়ির মধ্যে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছিল মেহুল। এর মধ্যে আবার আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে! যেদিনই একটু তাড়াহুড়ো করতে চায়, সেদিনই যত দেরি! সিগনালের লাল আলোর দিকে তাকিয়ে কমতে থাকা সময়টা দেখছিল মেহুল… আচমকা পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল! কাজল! এখন শ্রীর এরকম অবস্থায় কখন কি এমার্জেন্সি হয়, তাই কাজলকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছে মেহুল, যদিও আজ অব্দি তার দরকার হয়নি… বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল! কাজল কেন ফোন করছে! শ্রীর কী কিছু হল? শ্রী কি কথা বলার অবস্থায় নেই? নিজের বুকের ধুকপুকুনিটা শুনতে শুনতেই কানে ফোন লাগালো মেহুল… ওপাশ থেকে হাউমাউ করে উঠল কাজল, “দাদা! তুমি কোথায়? শিগ্গির এসো…বৌদি কেমন করছে!”

     হাঁফাতে হাঁফাতে ফ্ল্যাটে ঢুকল মেহুল! এইটুকু রাস্তা যে কিভাবে গাড়ি চালিয়ে এসেছে নিজেই জানে না! সারাটা রাস্তা কতরকমের যে আশঙ্কায় দুলেছে সে… শ্রীর কি লেবার পেন শুরু হয়ে গেল? কিন্তু ডক্টর ডেট তো আরও একমাস পরের দিয়েছে…! তাহলে কি পড়ে-টড়ে গেল! “শ্রী! শ্রী কোথায়!” কাজলের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে করে উঠল মেহুল… মুখে আঁচল চেপে কোনওমতে তাকে স্টাডির দরজাটা দেখিয়ে দিলো কাজল! দৌড়ে গিয়ে স্টাডিতে ঢুকেই পাথর হয়ে গেল মেহুল! শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ভীষণ ঠান্ডা স্রোত যেন নেমে যাচ্ছে! এ কী ভয়ংকর দৃশ্য দেখছে সে! চেয়ারে বসে রাইটিং টেবিলটার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে শ্রী, মুখের নীচে একটা খোলা ডায়েরি! ডান হাতটা শিথিল হয়ে পড়ে আছে একপাশে, আঙুলের ফাঁকে একটা পেন! আর তার নাক এবং ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে দুটো সরু টাটকা রক্তের ধারা!

     ফ্ল্যাটে ঢুকে কোনওমতে সোফার ওপর নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ল মেহুল। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত বারোটা। বাইরে বৃষ্টির বেগটা বেড়েছে… ঝমঝম শব্দে কান পাতা দায়। কিন্তু মাথার ভেতরে শিরা-উপশিরায় রক্তের স্রোত যেন সে শব্দকেও ছাপিয়ে যায়! কি ভেবেছিল… আর কি হয়ে গেল! হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার সময় শ্রীর সেই অস্বাভাবিক আতঙ্কিত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল মেহুলের! তার বিস্ফারিত চোখে যেন কোনও এক ভয়ংকর বিভীষিকার ছায়া… কিছু একটা যেন বলতে চাইছিল ও… বলে উঠতে পারছিল না… শুধু একটা অনন্ত বোবা দৃষ্টি মেহুলের জন্য রেখে দিয়ে গেল! সারাটা সন্ধ্যে অস্থির ভাবে হোটেলের লাউঞ্জে বসেছিল মেহুল, এক মুহূর্ত নড়েনি! ওদিকে ভেতরে তখন ইঞ্জেকশান আর একের পর এক টেস্ট চলছিল শ্রীর। অবশেষে ডক্টর সব চেক আপ করে বললেন কোনও কারণে ভয়ে বা দুশ্চিন্তায় বিপি প্রচন্ড হাই হয়ে গিয়ে ব্লিডিং হয়েছে। এখন ইঞ্জেকশান দেওয়ার পর অনেকটা স্টেবল, ঘুমোচ্ছে ও, চিন্তার কোনও কারণ নেই। আর তারপর একরকম জোর করেই মেহুলকে ঠেলে পাঠালেন বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিতে। ওয়াল ক্লকটার দিকে তাকালো মেহুল। ওটার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার মধ্যে টিকটিক করছে হাজারটা প্রশ্ন! কী জন্য ভয় পেল শ্রী? দুশ্চিন্তাই বা কিসের? সবই তো ঠিকঠাক চলছে… তাহলে কী এমন হল যে এত হাই হয়ে গেল বিপি? সন্ধ্যেবেলা হসপিটালে যাওয়ার সময় কাজলের কথাগুলো যেন এখনও কানে বাজছে ওর, “কী যেন মাঝেমাঝে লিখত বৌদি! তখন আর মানুষ থাকতনি, কী যেন ভর করত! তোমরা তো আবার বললে এসব বিশ্বাস করবেনি দাদা!” কী লিখত শ্রী? ওকে বলেনি কেন?… আবার একঝাঁক প্রশ্নের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে হঠাৎ চমকে উঠল মেহুল! বুকের মধ্যে হাতুড়ি পড়ছে তার…! শ্রী তো একবার সেই পুজোর সময়… তারপর ওর বার্থডের দিন… এখনও লেখে ও? আর… ওই ভাবে মিলে যায় সব?

     কান-মাথা যেন মুহূর্তে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল মেহুলের! নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো পায়ে পায়ে স্টাডিতে গিয়ে হাতে তুলে নিল সেই ডায়েরিটা, যার ওপর মুখ থুবড়ে পড়েছিল শ্রীনন্দা। পাতা ওল্টালো মেহুল। ডায়েরিতে ডেট লিখে রেখেছে শ্রী… সবগুলোই মোটামুটি পনেরো-কুড়ি দিনের গ্যাপে। গল্পগুলো পড়া শুরু করল… আস্তে আস্তে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তার, মাথার ভেতরটা কেমন খালি খালি, গলাটা শুকিয়ে কাঠ! এসব কি লিখেছে শ্রী!

     প্রত্যেকটা গল্পই কোনও না ভয়াবহ মৃত্যু বা দুর্ঘটনা নিয়ে! এবং সেইসব বিবরণ এতটাই নৃশংস ও মর্মান্তিক, পড়তে পড়তে যেন গা গুলিয়ে ওঠে! শ্রীর মতো ওরকম একটা ফুলের মতো নরম শান্ত স্বভাবের মেয়ে যে এত বীভৎস বর্ণনা লিখতে পারে, এ তো স্বপ্নেও কোনওদিন কল্পনা করতে পারেনি মেহুল! আর প্রতিটি ঘটনার বিবরণই এমন ভাবে লেখা যেন সামনে থেকে দাঁড়িয়ে নিজে দেখেছে শ্রী, এতটাই বিশদে বর্ণনা করা!

     কয়েকটা গল্প পড়ে মনে পড়ল মেহুলের এই সব ভয়ংকর ঘটনা গুলো সবই সে কোনও না কোনও সময় পেপারে পড়েছে… এতটা নৃশংস হওয়ার কারণে এতদিনেও মনে আছে তার! তবে কি শ্রীর ওই লেখাগুলোর মতো এগুলোও ওর লেখার পরে ঘটেছে? কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব? হঠাৎ করে যেন মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল মেহুলের, চেয়ার ধরে কোনওমতে সামলালো! ফাঁকা অন্ধকার ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে গাটা কেমন শিরশির করছে! তাহলে কি শ্রীর কথাই ঠিক? সত্যিই কি অশুভ শক্তি বাসা বেঁধেছে শ্রীর শরীরে? ক্ষতি করতে চাইছে শ্রী আর তাদের বাচ্চার? কিন্তু কিভাবে ওদের বাঁচাবে ও? কাকে বলবে? দরদর করে ঘামতে লাগল মেহুল…

     এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে এসব কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? কৌতূহল আর উৎকণ্ঠা মেশানো প্রবল এক টানে তাড়াতাড়ি পাতা উলটে পেছনের দিকে চলে গেল মেহুল, সম্ভবত যেখানে আজ গল্প লিখছিল শ্রী। কালো কালির আঁচড়ে শ্রীর সুন্দর হাতের লেখার ওপর ফোঁটায় ফোঁটায় ছড়িয়ে আছে শুকনো কালচে রক্ত, কিছু বুঝি আবার চুঁইয়ে চলে গেছে পরের পাতাতেও। সেসমস্ত অগ্রাহ্য করে টেবিলল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোর নীচে ডায়েরিটা ধরে গভীর মনোযোগে পড়তে থাকল মেহুল। শ্রীর বাকি গল্পগুলোর মতো এটাও একটানা লেখা, কোনও কাটাকুটি নেই… সেই একই অদ্ভুত সুন্দর ডিটেইলিং! একটি ছেলের গল্প, লেখক হতে চায় সে। অনবদ্য লেখনী তার, গল্পগুলির প্লটও দুর্ধর্ষ, সাবলীল ঝরঝরে ভাষা যেন তার সহজাত। কিন্তু দু-একটা ম্যাগাজিনে লেখা বেরোনো ছাড়া কোনওভাবেই নিজেকে বিখ্যাত সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না সে। বই ছাপানোর আশায় একের পর এক প্রকাশকের দরজায় কড়া নেড়ে চলেছে সে, আর বারে বারেই বিফল হয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাকে। লেখকমহল একবাক্যে স্বীকার করে তার প্রতিভা, এমনকি “উদীয়মান” ছাপও পড়েছে তার নামের পাশে, কিন্তু বেশীরভাগ লোকেরই একটাই আপত্তি! ওর লেখা নাকি বড্ড নৃশংস… গোটা গল্প জুড়েই থাকে কোনও না কোনও ভয়ংকর ঘটনার পুঙ্খানু্খ বিবরণ, যা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সবসময় হজম করা কঠিন! প্রকাশকদের ভাষায় “র’ ডার্ক রাইটিং”!

     এদিকে অনটন বেড়েই চলেছে… সে আর তার স্ত্রীকে নিয়ে ছোটো সংসার। তার মাঝেই একদিন খবর আসল বাবা হতে চলেছে সে! স্ত্রী হসপিটালে ভর্তি হল… হঠাৎ করে অনেক রাতে ফোন এল খুব অসুস্থ, রক্তের প্রয়োজন। এক্ষুনি যেতে হবে তাকে! সেই প্রবল বৃষ্টির রাতে বেরোল ছেলেটা… স্ত্রীর কাছে যেতে হবে হসপিটালে… এদিকে মাথায় টাকাপয়সা জোগাড়ের চিন্তা… এরপর আবার একটা ভয়ংকর পরিণতি, সেই সমস্ত মাথায় ধাক্কা মারার মতো বিবরণ! পুরোটা একনিশ্বাসে পড়ে থামল মেহুল। শেষের দিকটা কেমন চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে বা শুনেছে… কোনও নিউজ চ্যানেলে কি? এবার কি তবে উলটপুরাণ হল! কোনও ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে লিখছিল শ্রী? একটু একটু করে যেন মনে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছিল মেহুলের… ভুল ভাবছে সে। শুধুশুধু টেনশান করছে… সব ঘটনাই ওরকম নয়, এক-দুটো হয়তো মিলে…

     হঠাৎ তাকে ভীষণ চমকে দিয়ে নিস্তব্ধ ঘর কাঁপিয়ে ঝনঝন করে বেজে উঠল মোবাইলটা! ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কোনওমতে সেটা রেখে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল মেহুল! হসপিটালের রিসেপশন থেকে ফোন… ইন্টারণাল ব্লিডিং হচ্ছে শ্রীর… ও যেন এক্ষুণি আসে! একটু আগে আসা একঝলক স্বস্তির আবেশটা মুছে গিয়ে আবার তার জায়গা নিচ্ছে চরম উৎকণ্ঠা আর ভয়! দিগবিদিগ জ্ঞানশূণ্য হয়ে কোনওমতে গাড়ির চাবিটা তুলে দৌড়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরোল মেহুল! বাইরে অঝোর বৃষ্টি পড়েই চলেছে! পার্কিং-এ এসে গাড়ির ভেতর বসে বসে প্রচন্ড অসহায় লাগছিল… গাড়ি কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না! একটু আগেও তো ড্রাইভ করে ফিরল… ঠিকই তো ছিল… কি হল হঠাৎ! ওদিকে একটা একটা করে মুহূর্ত পেরিয়ে যাচ্ছে… শ্রীর যদি কিছু হয়ে যায়… আর ভাবতে পারল না মেহুল। গাড়ি থেকে নেমে দৌড়তে শুরু করল… রাস্তায় একটা ট্যাক্সি ধরে নেবে নাহয়!

     রাত প্রায় একটা বাজতে যায়। একটা ট্যাক্সির দেখা নেই! এত রাত। তার ওপর আবার বৃষ্টি… রাস্তায় কোনওরকম গাড়িঘোড়া প্রায় নেই বললেই চলে। তাও বৃষ্টিটা কমে গিয়ে এখন টিপটিপ করে পড়ছে। দৌড়তে দৌড়তে হাঁফিয়ে পড়েছিল মেহুল, বুকটা হাত দিয়ে চেপে দাঁড়িয়ে পড়ল। না না, এক মুহূর্ত দাঁড়ানো যাবে না! বড় করে শ্বাস নিয়ে আবার জোরে জোরে হাঁটা শুরু করল। আজ এই ভয়ংকর দুর্যোগের রাতটা যে কখন কাটবে! অথচ কত সুন্দর হতে পারত আজকের সন্ধ্যেটা! বৃষ্টির জল একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে তার চোখের কোল দিয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা জলের সঙ্গে। মুখটা মুছল মেহুল। সারাদিনের ক্লান্তি-উৎকণ্ঠা-ক্লেদ যেন গ্রাস করছে তাকে, পা দুটো আর চলতে চায় না… তবুও তার থামার উপায় নেই! আজ কত কি প্ল্যান করে রেখেছিল! তাদের ঝুলবারান্দাটায় সে আর শ্রী বসবে তাদের বাচ্চাটাকে নিয়ে… শ্রীর পেটে কান পেতে কত কথা বলবে সে তার ছোট্ট সোনাটার সঙ্গে… আগের বছরের অ্যানিভার্সারির দিনটা মনে পড়ল মেহুলের। ওদের প্রথম অ্যানিভার্সারি… এরকমই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যে ছিল… কি অসাধারণ সেজেছিল শ্রী! সেই রোমান্টিক ক্যান্ডেল লাইট ডিনার… বৃষ্টির রাতে একটু গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া… তারপর সেই ভয়ংকর অ্যাক্সিডেন্টটা! উফ্, খুব জোর বেঁচে গিয়েছিল!

     হাঁটতে হাঁটতে ডানদিকে মসজিদটার দিকে চোখ গেল মেহুলের… কেমন চেনা চেনা লাগছে… আরে, এটাই তো সেই রাস্তাটা! এটা দিয়ে হসপিটালটা শর্টকাট হবে বলেই তো এল! এ তো একদম কোইন্সিডেন্সের বাবা! একবছর পর সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটছে মেহুল! হয়তো এরকম কোইন্সিডেন্সই কাজ করেছে শ্রীর লেখাগুলোয়, আর ও সেটাকে এত সিরিয়াসলি নিয়ে… আবার দৌড়তে শুরু করল মেহুল। শ্রীর কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছতেই হবে! যেতে যেতেও একটা অদম্য কৌতূহল মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল, আচ্ছা সেই গাছটা কোথায় যেটায় তাদের গাড়িটা ধাক্কা মেরেছিল? ওটার এখন কি অবস্থা কে জানে! গায়ে কি এখনও ওই ধাক্কা লাগার চিহ্নগুলো আছে? এদিক ওদিক গাছটা খুঁজতে খুঁজতে আর শ্রীর কথা ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিল মেহুল।

     হঠাৎ করে এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু! অন্ধকারের বুক চিরে সাক্ষাৎ উন্মত্ত দানবের মতো কোথা থেকে যেন ছুটে এল একটা গাড়ি! ঝাপসা বৃষ্টির চাদরের মধ্যে হেডলাইটের প্রচন্ড আলোর ঝলকানিতে অন্ধ হয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় পেল না মেহুল!

     “আআহহহ্!!”, প্রচন্ড এক মরণ আর্তনাদ ছিটকে এল চাকার তলায় ঢুকে যাওয়া মানুষটার গলা থেকে! গাড়িটা কিছুটা ঘষটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে… যন্ত্রণায় ফালা ফালা হতে হতে আশ্চর্য ভাবে শ্রীর ডায়েরির কথাগুলোই মনে পড়তে লাগল মেহুলের… সেই বর্ণনা… “কোমরের নীচ থেকে মাংসগুলো কেটে থেঁতলে যাচ্ছে… হাড়গুলো এবার গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যাবে রাস্তার কাদায়… মাথার ঘিলুগুলো হয়ত তালু ফেটে বেরিয়ে ছেতরে পড়ে থাকবে পচা পূঁজের মতো… মরে যাচ্ছি আমি, শেষ হয়ে যাচ্ছি… আর দেখা হবে না মায়ার সঙ্গে…ও কি জানতে পারবে…? ওরা বলেছিল বইটা ছাপবে…হল না…কিছুই দেখা হল না… আহ্, পেটে যেন কি গেঁথে গেল… নাড়িভুঁড়িগুলো কৃমির মতো বেরিয়ে আসবে এবার…”

     এ কি তার ভবিষ্যৎই লিখেছিল শ্রী? গল্পের ছেলেটা আর ও তো মিশে এক হয়ে যাচ্ছে! একটু দূরে নিজের ডান হাতটা ছিটকে পড়ে অল্প অল্প ছটফট করছে… মুখের মধ্যে নোনতা রক্তের স্বাদ… সময় শেষ হয়ে আসছে… শ্রী… ওদের বাচ্চা… হঠাৎ তার প্রায় অচেতন বিকল মস্তিষ্কের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ভেসে উঠল কিছু টুকরো টুকরো ছবি! মনে পড়েছে… এই গল্পটা সে আগে কোথায় দেখেছে! কেন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল! কারণ সে তো নিজে ছিল সেইখানে! একবছর আগে এইভাবেই গাড়ি চাপা দিয়ে মেরেছিল লোকটাকে! রক্তে ভেসে যেতে যেতে আবছা অবয়বের মতো ভেসে উঠল সেই নিউজরিডার মেয়েটার মুখ… অ্যাক্সিডেন্টের খবর পড়ছে… আচ্ছা ওই লোকটাও একজন লেখক ছিল না?

     সব অন্ধকার হয়ে আসার আগে একটা বিকট মাটিকাঁপানো শব্দে মাথাটা অল্প ঘোরাতে পারলো মেহুল…নিভে আসা আবছা চোখে শেষবারের মতো দেখল গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মারলো ঠিক সেই গাছটায়! তখনও সেই দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর বাজতে থাকা রেডিও থেকে বেজে আসছে একটা গান…“জিন্দগি অউর কুছ ভি নেহি…তেরি মেরি কাহানি হ্যায়!!”

পুনশ্চ : ১৪ই আগস্ট। কলকাতার বেশ কিছু নামকরা খবরের কাগজের মাঝের দিকের পাতার এক কোণে ছোট্ট একটা খবর নজর এড়ালো না অনেকেরই। স্টাফ রিপোর্টার লিখছেন, “শহরে আবার এক পথ দুর্ঘটনা, গতির বলি হলেন একজন। গতকাল রাত প্রায় একটা নাগাদ ১৩ নং মির্জা মসজিদ স্ট্রীটে একটি গাড়ি ধাক্কা মারে এক পথচারীকে, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা গিয়েছে; মেহুল চৌধুরী, আই টি সেক্টরে কর্মরত ছিলেন। গাড়িটিতে ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক অনিমেষ মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী। তাঁর বয়ান অনুযায়ী,গতকাল রাতে বিবাহ বার্ষিকী পালন করে নৈশাহারের পর গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এমন সময় হঠাৎই ওই ব্যক্তি চলন্ত গাড়ির সামনে এসে পড়েন এবং বৃষ্টিভেজা পিছল পথে তিনি গাড়ির কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেন। তবে শ্রী মজুমদারের শারীরিক পরীক্ষায় রক্তে অ্যালকোহল পাওয়া গিয়েছে, আপাতত তিনি পুলিশ হেফাজতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গতবছর একই দিনে ওই রাস্তায় আরও একটি গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। মারা যান উদীয়মান লেখক প্রবুদ্ধ সরকার। তিনি তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন এবং পথে একটি গাড়ি চাপা দেয় তাঁকে। পরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তাঁর স্ত্রীরও। তবে সেই ক্ষেত্রে ঘাতক গাড়িটির চালকের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। একই জায়গায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটায় চিন্তিত প্রশাসন। জায়গাটিকে দুর্ঘটনা প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!