ভালোবাসা ডট কম

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়

অলংকরণ:অনুষ্টুপ শেঠ

অনসূয়া দাঁড়িয়েছে এসে আয়নার সামনে। আধো অন্ধকার ঘর। পিছনের জানালায় এক টুকরো আকাশের ছায়া দেখা যাচ্ছে। আয়নাটা দেখতে দেখতে একটা কুয়ো হয়ে যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে তার তল নেই। অনসূয়া জানে ওই কুয়োটায় ঘোলা জল, অনেক গভীরে থকথকে কাদা। ওর মধ্যে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে অনসূয়া। নিজের ভাঙাচোরা প্রতিচ্ছবি দেখছে। এখানে বাতাস কম। দম বন্ধ হয়ে আসছে অনসূয়া…!

     ঘুমটা ভেঙে গেল। আবার সেই স্বপ্ন। স্বপ্নটা বারবার ফিরে আসে। জানলা দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে সকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঘুম ভাঙলেও উঠতে ইচ্ছে করছিল না। আজ মহালয়া। দেবীপক্ষের সূচনা। চতুর্দিকে উৎসবের আমেজ। বড় একা, বড় ফাঁকা লাগছে তার এই শরৎ সকালে।

      শুভময় গত রাতে পুরী গেছে তার স্যাটারডে ক্লাবের বন্ধুদের নিয়ে। অল মেন্স ক্লাব। অনসূয়ার যাওয়ার কোন প্রশ্নই নেই। আগ্রহও ছিল না। রেবতীর ফোন এল সাতসকালে। অনসূয়ার কলেজের বন্ধু রেবতী। শান্তিনিকেতন যাচ্ছে ওরা, তিন বন্ধু মিলে । শুভময় পুরীতে শুনে বলল,

     –চল আমাদের সঙ্গে শান্তিনিকেতন। তিনদিনের মধ্যে ঘুরে চলে আসবি।

     ওখানে রেবতীর দিদির একটা ছোট ফ্ল্যাট আছে। বিন্দাস আছে রেবতী। বিয়ে করেনি, মাঝখানে বছর দুয়েক একটা লিভ-ইন সম্পর্কে ছিল। একটা চাকরি করে মাঝারি মানের। টুকটাক ফোটোগ্রাফি করে আর প্রচুর ঘুরে বেড়ায়। শুভময়ের সঙ্গে প্রেম পর্বে কলেজের বন্ধুদের প্রায় সকলেই চলে গিয়েছিল পিছনের সারিতে। কীভাবে যেন রয়ে গেছিল এই রেবতী। এর পিছনে অনসূয়ার যত না ভূমিকা, রেবতীর ভূমিকা অনেক বেশি। সেই আগ্রহ ভরে যোগাযোগ রেখে সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

     শান্তিনিকেতন যেতে উৎসাহ পেল না অনসূয়া। রেবতীর বাকি দুই বান্ধবীকে চেনেই না সে। পরিচিত নয় রেবতীর সাম্প্রতিক লাইফস্টাইলের সঙ্গে। এরকম প্রায় অপরিচিত একটা গ্রুপে ঢুকে পস্তানোর চেয়ে নিজের মতো ক’টা দিন কাটিয়ে দেওয়া ভালো। রেবতী বলল,

     –একেবারে একা থাকবি? কি করবি?

     –দেখি। ঘুমোব যত খুশি। বইটই পড়ব। কেটে যাবে।

     –একটা দারুন অ্যাপ আছে। ডাউনলোড করে নে। হু হু করে কেটে যাবে সময়। তোকে লিঙ্ক পাঠিয়ে দিচ্ছি।

     –আরে না না! আমি ওসব অ্যাপ-ট্যাপে তেমন সড়গড় নই। ভালোও লাগে না।।

     –আরে, এটা একেবারে অন্যরকম। একবার ট্রাই করে দ্যাখ।

     হোয়াটসঅ্যাপে লিঙ্ক চলে এল দু মিনিটের মধ্যে। নামটা দেখেই প্রথম আকৃষ্ট হল অনসূয়া। ভালোবাসা ডট কম।  

     অ্যাপটা ডাউনলোড হতে সময় নিল মিনিট খানেক। তারপর স্টার্ট বাটন ছুঁয়ে দিতেই একটা মিষ্টি মেয়ের ছবি ফুটে উঠল স্ক্রিনে।

     –হাই, আমি রেবতী। তোমার ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে আমার সঙ্গে কথা বল অনসূয়া!

     খুব অবাক হল অনসূয়া। বিশেষত ‘রেবতী’ আর ‘অনসূয়া’ নামদুটো শুনে।

     –হাই অনসূয়া। প্লিজ টক টু মি। দু মিনিটের মধ্যে রেস্পন্স না এলে এই সেশন টারমিনেট করে যাবে। আবার নতুন করে লগ ইন করতে হবে। পাসওয়ার্ড মনে রেখো – ‘রেবতী’।

     –কিন্তু …

     –এই অ্যাপ তোমাকে যে পাঠিয়েছে, ট্রু-কলার অনুযায়ী তার নামটাই অটোমেটিক্যালি আমার নাম। আর তোমার নাম তো অনসূয়া। অ্যাম আই রাইট? তবে তুমি চাইলে এই নামগুলো বদলে নিতে পারবে। স্ক্রিনের ডান দিকে একটা ছোট অ্যারো-কি আছে ওখানে টাচ করলেই অপশন পাবে। ‘চেঞ্জ কলারনেম’ অপশনে গিয়ে টাইপ করে নিজের পছন্দমতো নাম দিতে পার আমার, ডার্লিং, সুইটহার্ট, শুভময় – যা খুশি।

     –শুভময়?

     –ইয়েস, তোমার হাসব্যান্ডের নাম। এত অবাক হওয়ার কি আছে? তোমার ফোনে যেটুকু অ্যাক্সেস পেয়েছি তাতে এটুকু ডেটা রিট্রিভ করা তো ছেলেখেলা। নিজের নামও বদলে নিতে পার। সেই নামেই তোমাকে ডাকবো, ভালোবাসব, আদর করব অনসূয়া!

     –ভালোবাসা! আদর!

     –এটা তো ভালোবাসার অ্যাপ। যখনি তোমার ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে হবে, জাস্ট লগ ইন। প্রথম দিন, দিস ইজ ফ্রি ফর ওয়ান আওয়ার। দেখে নাও। যদি ভালো লাগে, পার সেশন অনলি ফাইভ ডলারস। আপটু থ্রি আওয়ারস। তারপর টারমিনেট করে যাবে অটোমেটিক্যালি। যদি আরও চাও, কনটিনিউ অপশন ক্লিক করলেই আরও তিন ডলার তোমার আকাউন্ট থেকে ডেবিটেড হবে, দেন আই আম ইওরস ফর দ্য নেক্সট টু আওয়ারস। ভেবে দেখ অনসূয়া মাত্র পাঁচ ডলারে তুমি তিন ঘণ্টা ভালোবাসা পাবে। ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করলেই তুমি ভার্চুয়ালি ভালোবাসার জগতে চলে যাবে। … শ্যাল উই স্টার্ট? অর ইউ হ্যাভ মোর টু আস্ক?

     অনসূয়া একটু ইতস্তত করে বলল,

     –ডলারে পেমেন্ট কেন?

     –কারন অ্যাপটা এদেশী নয়। ডেভলপার একটা আমেরিকান সফটয়ার কোম্পানি। আশিটা ভাষায় এটা রমরম করে চলছে সারা পৃথিবী জুড়ে। রিজিওনাল ভ্যারিয়েশনও আছে। তোমার সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছি এটা কলকাত্তাইয়া বাংলা। কথার মাঝে মাঝে ইংলিশ ওয়ার্ডস অ্যান্ড ফ্রেজেস আসবে, কখনো কখনো একটু হিন্দিও। ঢাকার বাংলা আবার অন্যরকম। পশ্চিমবঙ্গের মফস্বলি বাংলা আর একটু অন্যরকম। বাংলায় আপাতত এই তিনরকম অপশন আমরা দিচ্ছি। পরে তেমন ডিম্যান্ড থাকলে আমরা আপডেটেড ভার্সানে আরও দু একটা রিজিওনাল বাংলা অ্যাড করে দেব। ভেবে দেখ, নিজের ভাষায় কথা না বললে কি ভালোবাসা যায়? তোমার এই ল্যাঙ্গোয়েজ ভার্সানটা রেবতী ইউজ করে। চাইলে তুমি চেঞ্জ করে নিতে পার।

     –না, না। এটাই ঠিক আছে।

     অনসূয়া রেবতী নাম বদলে করে নিল শু। অনেক আগে শুভময়কে এই নামে ডাকত অনসূয়া, সে ডাকাডাকির পাট উঠেই গেছে কবে! এখন এক ছাদের তলায় থাকলেও তার আর শুভময়ের আলাদা জগত। সেই দুই জগতের মধ্যে দূরত্বও অনেক।

     অনসূয়া নিজের নামটাও বদলে করে নিল সোনু। ওটা ওর ডাকনাম। মা ডাকতেন, ছেলেবেলার বন্ধুরা ডাকত, আর হ্যাঁ, শুভময়ও, অনেকদিন আগে।

     –কেমন আছ সোনু?

     শু কথা শুরু করল। অনসূয়া কি বলবে ভেবে পেল না। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বোকার মতো হাসল। শু আবার বলল,

     –সোনু, হাউ আর ইউ সোনা?

     কথাটা পুরুষকণ্ঠে শুনতে পেলে বোধহয় ভালো হত। ভালোবাসার কথাই বলবে যখন!

     –রেবতী, তুমি পুরুষ হতে পার না?

     –রেবতী? হু ইজ রেবতী? আই আম শু।

     –সরি! শু, তুমি পুরুষ হতে পার না?

     মিষ্টি করে হাসল শু।

     –পুরুষের কাছে কি চাও বল? সব আমিই দেব। অনেক বেশি দেব। পুরুষ তত ভালোবাসতে পারে না যতটা পারে একটা মেয়ে। তাই আমি মেয়ে। বল, কেমন আছ সোনু?

     –এই তো বেশ আছি, ভালোই তো আছি!

     –আয়না আজ কি বলল তোমায়?

     –আয়না?

     –তোমার সেই স্বপ্নের আয়না! না কি কুয়ো?

     কেমন ভয় পেয়ে গেল অনসূয়া। থট রিডিং জানে নাকি মেয়েটা? আর কি কি জানে?

     –ভয় পাচ্ছ সোনু? চল আমরা গল্প করি। একদম ছোটবেলার গল্প। কে বেশি ভালোবাসত তোমায়? মা? নাকি বাবা?! তুমিই বা কাকে ভালোবাসতে বেশি?

     –মা? মা আমাকে চায়নি। আমি জন্মাবার পর মা নাকি হাউহাউ করে কেঁদেছিল। ছেলে চেয়েছিল মা। মা নেই আজ পাঁচবছর!

     –আর বাবা!

     –বাবাও চলে গেছেন অনেকদিন।… আমি ছোটবেলায় খুব সাজতে ভালোবাসতাম। বাবা বলত, অমন বুলডগের মতো গোদা মুখে আর সাজতে হবে না!

     –আচ্ছা, ওসব ছাড়। সোনু, তুমি আজ কি খাবে বলত?

     –শেফালিকে বলেছি একটু খিচুড়ি করে দেবে। আর ওমলেট।

     –মা’র কাছে যাবে, সোনু! চল বেড়িয়ে আসি তোমার ছোটবেলায়।

     সেই পুরানো বাড়িটার দোতলার ঘরে জানলার পাশে বিছানায় শুয়ে রইল অনসূয়া। জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। কি মিষ্টি গন্ধ মায়ের গায়ে! আর কি নরম আদর!

          সোনু আমার চাঁদের কণা,

          সবাই বলে দে না দে না!

          এমন মেয়ের নেই তুলনা,

          দিলে যে আমার দিন চলে না!

     ঝিমধরা ভাবটা কেটে গেল হঠাৎ। তাকিয়ে দেখল, শু তখনো জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনের অপর।

     –এক ঘণ্টা হয়েছে। এবার টারমিনেট করতে হবে। যদি কনটিনিউ করতে চাও তবে আবার লগ ইন করো। কিছু ফর্মালিটি আছে। ব্যাঙ্ক ডিটেলস দিতে হবে।  পাঁচ ডলার তোমার আকাউন্ট থেকে ডেবিট হওয়ার পর সেশন চালু হবে। পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে পড়ো। বাই বাই।

     ঝপ করে আলো নিভে স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল। অনসূয়া চুপ করে বসে ভাবল খানিকক্ষণ। ওই গানটা গেয়ে মা ভাইকে ঘুম পাড়াত। তাকে কখনো এমন করে ঘুম পাড়িয়েছিল কি? তার স্মৃতিতে নেই। ছোটবেলায় মায়ের আদর তেমন পায়নি অনসূয়া। বরং মায়ের উগ্রচণ্ডা মূর্তি অনেক দেখেছে। এতদিন পর ঘুমঘুম ঝিমুনির মধ্যে মায়ের আদর, যা কখনো পায়নি, কেমন প্রত্যক্ষ ভাবে ধরা দিল! কি একখানা অ্যাপ বানিয়েছে এরা!

     অনসূয়া একটু ভেবে নিতে চাইল। অ্যাপটা খরচসাপেক্ষ। ডলারে পেমেন্ট। তবে রেবতী তো রেকমেন্ড করল। রাতে ভালো করে ঘুম হল না। স্বপ্নে ফিরে ফিরে এল মা, শুভময়, রেবতী। সকালে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠল। শেফালি কাজকর্ম সেরে চলে যেতেই নিজের জন্য এককাপ চা বানিয়ে মোবাইল খুলে বসল অনসূয়া। আজ আর অত সহজে লগ ইন করতে পারল না। ব্যাঙ্ক ডিটেল দেওয়ার হাজারো হাঙ্গামা। এই কোড, সেই কোড। ক্রেডিট কার্ড নম্বর! অনসূয়া নিজে হাতে এসব করেনি কখনো আগে। রেবতীকে ফোন করল। ফোন বেজে বেজে থেমে গেল। শুভময়ের ফোন সুইচড অফ। এমনিতেই লেট রাইজার শুভময়। তারপর নিশ্চয়ই রাত অবধি হইহুল্লোড় হয়েছে। বারবার চেষ্টা করতে করতে একসময় হয়ে গেল। সাকসেসফুলি লগড ইন।

     –গুড মর্নিং সোনু। রাতে ঘুম হয়েছে ভালো?

     –না, হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছি। দেরিতে ভেঙেছে ঘুম।

     –তার মানে তুমি এক্সাইটেড। সোনু, আজ কি করবে সারাদিন? কি ইচ্ছে করছে, বলত?

     –কি যে করি, ভেবেই পাচ্ছি না। তুমিই বল না শু!

     –একটু বেড়িয়ে এলে কেমন হয়? ধর, সমুদ্রের ধারে হেঁটে বেড়াচ্ছ, বা পাহাড়ি ঝোরার ধারে বসে পাখির গান শুনছ, বা, গভীর জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করছ!

     –এসবও হয় বুঝি!

     –সব কিছু হয়। ভার্চুয়াল। অবিকল আসলের মতো!

     –বল কি? তবে যে বললে এটা ভালোবাসার অ্যাপ?

     –ভালোবাসা নয়? যে বেড়াতে ভালোবাসে তার কাছে এর মতো সুদিং আর কিছু হয় না। তুমি শেষ কবে বেড়াতে গিয়েছ বলত!

     সত্যিই, বহুদিন শুধু বেড়াতে কোথাও যাওয়া হয়নি।। শুভময় কাজে গেছে দেশ-বিদেশ, অনসূয়া সঙ্গে গেছে। শুভময় কাজ করেছে আর অনসূয়া একটা গাইড নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে একা একা। বলল,

     –সমুদ্র! সমুদ্র দেখিনি কতদিন! বালিতে পা ছড়িয়ে বসে থাকব, ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে যাবে।

     –ভার্চুয়াল জগতে বেড়াতে যাবার জন্য সামান্য কিছু এক্সট্রা চার্জেস। সতেরো ডলার। আপত্তি নেই তো?

     অনসূয়া দেখে নিয়েছে, তার অ্যাকাউন্টে যথেষ্ট টাকা আছে। কিছুদিন একটা ছোট চাকরি করেছিল অনসূয়া। পরে ছেলেকে দেখাশোনার জন্য ছেড়ে দেয়। নিজের কিছু জমানো টাকা আছে। মা মারা যাবার পর উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু টাকা পেয়েছে। প্রতিমাসে একটা হ্যান্ডসাম অ্যামাউন্ট শুভময় ট্রান্সফার করে দেয় তার অ্যাকাউন্টে। সংসারখরচ এবং হাতখরচ বাবদ। অনসূয়া খরচের অভ্যাস বিশেষ নেই। তাই জমেছেও অনেক।

     এবারে খুব সহজেই মিটিয়ে দেওয়া গেল ভার্চুয়াল ট্রাভেলের চার্জ। শু এর সঙ্গে অনসূয়া চলে গেল সোনালি বালির বিচে, সেখানে পান্না রঙের জল। শান্ত সমুদ্র। ঝিনুক আর লাল কাঁকড়া। যেন মিনাকারি করা সোনালি বেনারসি ছড়ানো রয়েছে তটরেখা ধরে। সমুদ্রের ঢেউ ভিজিয়ে দিচ্ছে শরীর।

     সমুদ্রে নামলেই তার কেমন শরীরী অনুভুতি হয়। আগ্রাসী ঢেউ তার শারীরিক সত্তাকে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দেয়। অমন আছারিপিছাড়ি কেটে-ছড়ে যাওয়া জ্বালা ধরানো শরীরি সংসর্গে মরে যেতে ইচ্ছে হয়। অনসূয়া অনুভব করল, তার শরীর উন্মুখ হয়ে উঠেছে। সে কামনা করছে, ভীষনভাবে কামনা করছে … এমন একজনকে, যার নামটুকুও সে জানে না। তার ছেলের কলেজের সেই তরুণ শিক্ষকটিকে, গত শীতে সায়েন্স এক্সিবিশনে গিয়ে দেখেছিল যাকে। অনসূয়া প্রশ্নের উত্তরে যে খুব মন দিয়ে বুঝিয়েছিল ছেলেদের তৈরি মডেলের কৃৎকৌশল। তার সুঠাম চিবুক, পাতলা ঠোঁট, হাল্কা বাদামি আর ধূসর মেশানো চোখের তারা, গভীর কণ্ঠস্বর। এক্সিবিশন থেকে ফিরেও সে অনেকক্ষণ ভেবেছিল ওই ছেলেটির কথা, কল্পনায় দেখতে চেষ্টা করছিল, ঠিক কেমন করে সে আদর করে তার প্রেমিকাকে।

     আজ এই মুহূর্তে তার ইচ্ছে করল সে স্নান করবে ওই ছেলেটির সঙ্গে। খোলা আকাশের নীচে, নোনাজল আর বালি মাখামাখি হয়ে। ছেলেটি তাকে তুলে ধরবে, ছুঁড়ে ফেলবে, ইচ্ছে মতোন ঢেউ এ চেপে পাড়ি দেবে প্রবল জলপথ, যতক্ষণ প্রাণ চায়। আজ চল্লিশ পার করা পাঁড় রমণী সে, হাতে গুনে বলে দিতে পারে ঠিক কতবার সঠিক অরগ্যাজম হয়েছে তার। ধ্বস্ত, যান্ত্রিক এক একটা যৌন অভিজ্ঞতা বিমর্ষ, ক্লান্ত করেছে বারবার।

     হঠাৎ মনে হল গোলমাল হচ্ছে কথাও। সেই শিরশিরানি আর নেই। চোখ খুলে দেখল, কোথায় হারিয়ে গেছে সেই সমুদ্রতট, স্ক্রিন জুড়ে শু এর মুখ।

     –সরি সোনু, এই সেশনটা টারমিনেট করতেই হল।

     –কেন? কেন?

     অস্থির হয়ে হয়ে বলে উঠল অনসূয়া।

     –তুমি যা চাইছ, আমাদের এই ভার্সানটা সেটা সাপোর্ট করে না।

     –তার মানে? … বাট আই হ্যাভ পেইড… দিস ইস চিটিং!

     –বোঝার চেষ্টা কর সোনু! এই অ্যাপটার কিছু লিমিটেশন আছে। ভার্চুয়াল সেক্সের জন্য অন্য আপডেটেড ভার্সান আছে! সেটা তোমাকে আলাদা করে ডাউনলোড করতে হবে। সেখানে দারুন সব এক্সাইটিং ফিচার্স। কোন জেন্ডার চাও, কিরকম লোকেশন, কন্ডিশন প্রেফার করো, সব বেছে নিতে পারবে। সেটিং চেঞ্জও করা যায়। মোনটনির কোন জায়গাই নেই। আনলিমিটেড ফান। তবে তোমার মোবাইল সেটের যে সফটওয়্যার তার সঙ্গে কম্প্যাটিবল হতে হবে। না হলে বেস্ট এফেক্ট পাবে না।  তোমাকে লিঙ্ক পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপডেট করে নাও। তারপর আবার লগ ইন করো। পাসওয়ার্ড সেম থাকবে।

     ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গিয়েই আবার জ্বলে উঠল আলো। কয়েক সেকেন্ড পরেই স্ক্রিন এর ওপর ভেসে উঠল ভালোবাসা ডট কম ***। এই তাহলে অ্যাপটার আপডেটেড ভার্সন। ইয়ারফোনটা কানে লাগিয়ে আইকনটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিল অনসূয়া। সঙ্গে সঙ্গে পেমেন্ট অপশন। অনলাইন পেমেন্টে এখন সড়গড় অনসূয়া। বারোশো তেত্রিশ ডলার! বেশ এক্সপেন্সিভ তো! ওহ, বাট আই হ্যাভ লাখস! মনে মনে বলল অনসূয়া। পেমেন্ট করে দেওয়ার পর সারা স্ক্রিন জুড়ে হাল্কা গোলাপি আলো ফুটে উঠল, তার ওপর ঘুরতে লাগল একটা নীল রং এর চাকা। অনসূয়া অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল স্ক্রিন এর দিকে। খুল যা সিম সিম! ওহ! আর কতক্ষণ!

     ব্যাং!

     এরর মেসেজঃ অ্যাপ্লিকেশন নট রেকগনাইজড।

     মানে? আবার চেষ্টা করল অনসূয়া। আবার! আবার! প্রত্যেকবার একই রেজাল্ট। কি করবে এখন! মরিয়া হয়ে রেবতীকে ফোন করল,

     –অ্যাপটার আপডেটেড ভার্সন খুলছে না!

     –আপডেটেড ভার্সন? তুই আপডেট করতে গেলি কেন?

     –ওরাই তো বলল, দারুণ সব এক্সাইটিং ফিচারস!

     –দেখছি।

     কিছুক্ষণের অসহনীয় অপেক্ষার পর আবার ফোন এল রেবতীর।

     –শোন, অ্যাপটাকে ট্রেস করতে পারছি না। মনে হচ্ছে ইন্টারনেট কনেকশনের কিছু প্রব্লেম রয়েছে। কাল সকালে আর একবার বরং…

     বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিল অনসূয়া। কি করবে সে এখন? খানিকক্ষণ বারান্দায় পাইচারি করার পর মনে হল খিদে পাচ্ছে তার। অনেকক্ষণ কিছু খায়নি সে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, শেফালির সকালের রেঁধে যাওয়া ভাত-তরকারি এখনো তেমনি পড়ে রয়েছে ডাইনিং টেবিলে। মনে পড়ল, আজ ছেলেটার পরীক্ষা ছিল। খোঁজ নেওয়া হয়নি একবারও। অনেক দূরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে ছেলেটা। অভিমানী ছেলে। খুব রাগ করে আছে নিশ্চয়ই।

     মোবাইলটা কেমন মড়ার মতো পড়ে রয়েছে বিছানার একপাশে। ফ্রাসটেশনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল মনে পড়ল। তুলে নিয়ে দেখল সাতটা মিসড কল আর চারটে মেসেজ। মিসড কল চারটে ছেলের, দুটো শুভময়ের আর একটা রেবতীর। মেসেজগুলো পড়তে গিয়ে দেখল চারটেই ব্যাঙ্ক এর। চারবারই অনলাইন পেমেন্ট হয়েছে। একবার পাঁচ ডলার, একবার সতেরো ডলার আর একবার বারশো তেত্রিশ ডলার । এগুলো সে পেমেন্ট করেছিল নিজের হাতেই। কিন্তু আর একটা কি? বিরাট বড় অ্যামাউনটের একটা উইথড্রয়াল হয়েছে। হিসেব করে দেখল, যে টাকাটা তার অ্যাকাউন্টে থাকার কথা, তার পুরোটাই বেরিয়ে গেছে। কি হল? মাথা কাজ করছিলনা তার। ফোন করল শুভময়কে,

     –হাউ ইজ ইট পসিবল? অনলাইন পেমেন্ট করেছিলে?

     –করেছিলাম কিন্তু পিন তো দিইনি, শুধু কার্ড নাম্বার।

     –ওটিপি এসেছিল?

     –না!

     –তা হলে তো এমন হবার কথা নয়! পিন ছাড়া, ওটিপি ছাড়া তোমার অজান্তে কীভাবে… এখনি কাস্টমার সার্ভিসে ফোন কর!

     তার আকাউন্ট থেকে সাত লক্ষ বত্রিশ হাজার টাকা বেরিয়ে গেছে। ডলারে। অনলাইন পেমেন্ট ডলারে হলে পিন লাগে না। ওটিপি-ও আসে না। শুধু কার্ড নম্বর হলেই চলে। শুভময়কে জানিয়ে দিয়েছে। শুভময় মুখে কিছু বলেনি, ফিরে আসছে কলকাতায় কাল সকালেই। ওকে সব খুলে বলতে হবে। ছেলের ফোন এল, তাকে শুধু বলল, শরীর খারাপ, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। রেবতীর ফোন বেজে বেজে থেমে গেছে দু’বার, ধরতে ইচ্ছে করেনি।

     ফোনটা সুইচড অফ করে বারান্দায় বসে রইল অনসূয়া। সে ভাববে না তার শূন্য ব্যাঙ্ক আকাউন্টের কথা, ভাববে না ছেলের কথা, শুভময়ের কথা। সে ভাববে মায়ের আদর, ভাববে সেই সমুদ্রস্নান, সেই ছোকরা শিক্ষকটির কানের লতি আর হ্যাজেল চোখের কথা।

     হঠাৎ একটা বিপ বিপ আওয়াজ। তার ঘুমিয়ে থাকা ফোনটায় আলো জ্বলে উঠেছে। কিন্তু ফোন তো সুইচড অফ ছিল! ফোনের স্ক্রিন এর ওপর শুধু একটা নীল আলো। অনসূয়ার বুকের মধ্যে সেই শিরশিরানিটা ফিরে এল আবার।

     –কাকে তুমি সবচেয়ে ভালোবাস সোনু?

     গলাটা খুব চেনা, কিন্তু সেই অ্যাপ এর মেয়েটির গলা এটা নয়। নীল স্ক্রিন এর মধ্যে ভেসে উঠল একটা বুদবুদ। বুদবুদটা ক্রমশ বড় হতে লাগল। অনসূয়ার বুকের শিরশিরানিটা বাড়ছে ক্রমশ।

     –কে তোমায় সবথেকে বেশি ভালোবাসে?

     অনসূয়া চিনতে পারল, এ তার নিজের গলার আওয়াজ। বাড়তে বাড়তে বুদবুদটা একটা আয়নার চেহারা নিল, যেখানে অনসূয়া দেখতে পাচ্ছে তার ঝাপসা মুখের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু…

     আয়না তো নয়! এ তো তার সেই স্বপ্নের কুয়োটা! যার তল নেই বলে মনে হয়, ঘোলা জল, অনেক নীচে থকথকে কাদা! কুয়োটা যেন আকাশ জোড়া বিশাল হাঁ করে গিলতে আসছে তাকে। চারপাশে বাতাস কমে আসছে যেন। দম আটকে আসছে অনসূয়ার। পিছনে দেওয়াল। পিছিয়ে যাবার আর কোন রাস্তা নেই।

     আগুপিছু কিছু না ভেবেই কুয়োটায় ঝাঁপ দিল অনসূয়া।                                                                                                                                                                                                                

2 thoughts on “ভালোবাসা ডট কম

  • April 12, 2019 at 5:11 am
    Permalink

    বাহ চমৎকার গল্প।

    Reply
  • April 18, 2019 at 12:51 am
    Permalink

    durdanto………
    sudhu ektai jiggasa…..’online payment dollar e hole OTP ba pin laage na sudhu card number holei chole’ ei info ta ki sathik?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!