ভিত্তি

ব্যাঙের ছাতার মত মেঘগুলো পর পর আকাশে উঠছিল।

     রাষ্ট্রনায়কদের আঙুলগুলো কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ছিল কিনা কেউ জানে না। পর পর পিয়ানোর রীড টেপার মত ছন্দে সুইচগুলোয় চাপ পড়েছিল।

     মস্কো,দুবাই, টোকিও, নিউ ইয়র্ক, লণ্ডন, সিডনি, দিল্লি, বেজিং…

     অশান্তি ঘনিয়ে এসেছিল বহুকাল আগে থেকেই। যুগের পর যুগ কোন দেশের রাষ্ট্রনায়কই জনসংখ্যা প্রতিরোধের কথা সিরিয়াসলি ভাবেনি। বরং কোথাও অজ্ঞতা থেকে, কোথাও ধর্মের দোহাই দিয়ে, কোথাও স্রেফ টাকার অহংকারে দ্বিগুণের চেয়েও অনেক বেশী হারে লোক বেড়েই চলেছিল সর্বত্র।

     খাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়েছিল সেও অনেক দিনের কথা। এর পরের ধাপ হিসেবে শক্তিশালীদের দুর্বলের থেকে কেড়ে খাওয়াটা ছিল অবশ্যম্ভাবী। সমস্ত কমজোরী লোক এভাবে না খেয়ে মারা পড়ার পর, যখন আর কোন উপায় নেই, তখন শুরু হয় খাওয়া কমানোর নিয়ম। আর, আধপেটা খেয়ে বেড়ে ওঠা জেনারেশনের কাছে, বা তাদেরএকই রকম বুভুক্ষু নেতাদের কাছে দূরদর্শিতা আশা করা যায় না।

     শেষ লড়াইটা ছিল জল নিয়ে। পানীয় জলের দখলের। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে প্রত্যেক রাষ্ট্রনেতাই ভেবেছিলেন, আর কারোই তাঁর মত সাহস হবে না।

     মুহূর্তের ব্যবধানে এতদিন অপেক্ষায় থাকা পারমাণবিক বোমাগুলো একের পর এক সক্রিয় হয়েছিল।

     সারা পৃথিবী জুড়ে একই দিনে, একইসঙ্গে সর্বগ্রাসী অনন্ত মৃত্যুর নিঃস্তব্ধতা নেমে এসেছিল।

*****

     গ্যালাক্সি উনোর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সূরিয়াকোটী। সেটার চারদিকে যে তেরোখানা ছোট বড় গ্রহ ঘুরপাক খাচ্ছে, তার সাত নম্বরটার নাম বুমি মিরাহা। এটার তিন নম্বর সেকশনে তেয়াটুয়ার ল্যাব ওভো-ওয়ান। প্রাচীন সাহিত্য ও মিথোলজি নিয়ে মূলত এই ল্যাবের কারবার। আপাতত তিন বছর ধরে তেয়াটুয়া এই ল্যাবের সুপ্রীমো। ল্যাবটা ভারি প্রিয় তেয়াটুয়ার। সাবজেক্টটাও। দিনের বেশীর ভাগ সময় সে এখানেই কাটায়, মাল্টিপ্রোজেক্টরের সামনে বসে। কত যে কিছু এখনো জানা বাকি!

     এই বড় মডেলটা ল্যাবে ঢোকার মুখেই বাঁদিকে রাখা ছিল। বহুবছর আগে এই ল্যাব যখন শুরু হয়েছিল, তখন বুমি মিরাহার প্রথম এক্সপেরিমেন্টাল প্রোজেক্টের মডেলটা প্রাচীন বস্তুর সংগ্রহশালা থেকে নিয়ে এসে এখানে বসানো হয়। মিথোলজির একটা বড় অংশে এটার কথা আছে তো!

     এতকাল ধরে এই মডেলটা আপন খেয়ালে দিব্যি চলছিল। দমটম দিতে হতনা, খালি মাঝে মাঝে স্লো হচ্ছে মনে হলে একটু ধুলো ঝাড়লেই চলে যেত। সেট করে দেয়া ফর্মুলা অনুযায়ী ঘটতে থাকা অভ্যন্তরীণ ছোটখাট কম্পন, টার্বুলেন্স, সংঘর্ষ- এগুলো মডেলটা আপনা আপনিই সামলে নিতে পারত। মোটের ওপর তদারকি কম, সিম্পল ডিজাইনের বেশ টেঁকসই জিনিস ছিল একটা।

     যে জন্য তেয়াটুয়ার এই পুরনো মডেলটা খুব পছন্দ ছিলো। এটার সামনেই কিছু কিউবিকো চেয়ার বসিয়ে, সুন্দর একটা বসার জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। জটিল ব্যাপারে অনেকক্ষণ কাজ করার পর মাথা ছাড়াতে এখানে বসাটা খুব কাজ দিত। পিছনে খুব আস্তে টিক টিক করে মডেলটা নিজের মত চলত, উনি সামনে বসে রিল্যাক্স করতেন।

     গত সন্ধ্যায় ল্যাব বন্ধ করে বেরিয়ে যাওয়ার আগেও তাই করছিলেন। সারাদিন বেশ চাপ গেছে, তাই এমনিই কিছু ফোর্থডাইমেনশনাল জিওমেট্রির এক্সট্রা সলভ করছিলেন তিনি চেয়ারে বসে। টাইমপাস আর কী। হঠাৎধুম ধুম করে সেকী ভয়ংকর সব আওয়াজ পিছন থেকে। সেইসঙ্গে সারা ঘরে মুহুর্মুহু চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি।

     ঘুরে দেখেছিলেন, গোটা মডেলটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কেমন। প্রথমে তো ভেবেছিলেন ভেঙেই পড়ল হয়তো সবশুদ্ধু। শেষ অবধি সব থামতে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলেন, পুরোটা কেমন কালচে ধোঁয়ায় ভরে আছে।

     তখন দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাঁর গরম জল ও ফুডো-ক্যাপসুল খাবার সময় হয়ে গেছিল, তাই চলে গেছিলেন তখনকার মত। আজ অন্যান্য কাজ শেষ হতেই ছুটে এসেছেন দেখতে, কী হ’ল কাল ব্যাপারটা।

     চাবি খুলে ঢুকে প্রথমে কিছুতত টের পাননি। কালচে ধোঁয়াটা এখন আর নেই, অবশ্য মডেলটা আর চলছে না। স্থির হয়ে আছে বাতিল যন্ত্রপাতির মত।

     চালু করার সুইচগুলো তেয়াটুয়া জানেন। কিন্তু কী হবে চালু করে?

     বহুকাল আগের এক্সপেরিমেন্ট ছিল। সে তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তো কতকাল মুজি-ইয়মে রাখা ছিল। এখন এটা একটা খেলনা বই কিছু নয়! খামোকা এনার্জি ইনপুট করে চালু করার দরকারটা কী!

     ভাবতে ভাবতে মডেলটার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন তিনি। মাঝামাঝি এসেছেন, এমন সময়ে খুব হালকা পচা গন্ধটা নাকে এল।

     তখন কথাটা মনে পড়ল তেয়াটুয়ার। এক্সপেরিমেন্টের পার্ট হিসেবে এই মডেলটার তিন নম্বর এলিমেন্টটায় কিছু জীবকোষ স্প্রে করা হয়েছিল – এরকম যেন পড়েছিলেন ক্লাসিক্সো ডকু সেকশনে। সম্ভবত মডেলটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঐ জীবকোষগুলো মরে পচে এই গন্ধটা ছাড়ছে!

     একটা হ্যাণ্ডি রোবোকে দিয়ে সাবধানে ঐ এলিমেন্টটা বের করে আনালেন তিনি।

     এহ, এটা একেবারে চটা উঠে খাবলে খুবলে কী মলিন দশা! আর বার করে আনার পর গন্ধটা আরো তীব্র লাগতে লাগল।

     উঃ, গা গুলিয়ে ওঠার মত গন্ধ।

     এটা একেবারে বাতিল করে ফেলে দেবার হুকুম হ্যান্ডিরোবোকে বুঝিয়ে দিয়ে ভিতরে গিয়ে নিজের কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি।

     হ্যান্ডিরোবো এলিমেন্টটা নিয়ে গিয়ে ডিজপোজার নং ৫ এ ফেলে এল। আননোন মেটিরিয়াল ক্যাটাগরির জন্য ওটাই বরাদ্দ।

*****

     গার্বেজ ডাম্পটার কাছেই মিহুদের বাড়ি। মিহু, নাথান, তোমোকোওরা সবাই রোজ খেলা করে ডাম্পটার পাশের বেগুনী ঘাসেভরা মাঠটায়।

     আজও খেলছিল, টেলিপ্যাথি গেম। নাথান বড্ড জোচ্চুরি করে এটায়। জোচ্চুরি না করে এতবার এত নিখুঁত মিলিয়ে দেওয়া কেমন করে সম্ভব! ঠিক আছে, নাহয় ওর আউকিউ ওদের ক্লাসের অ্যাভারেজের থেকে অনেকটাই বেশি। ওদের প্রোফেসার বেনেফেত্তোরা বলেন নাথান চাইলে, ব্রো-মাহনী না হয়েও, স্পেশাল স্কীমে প্রোফেসর হবার জন্য আবেদন করতে পারে। তাহলে বড় হয়ে ওই ডাম্পের স্ক্যাভেঞ্জারের কাজ করতে হবেনা ওর বাবামায়ের মত। সবকিছু সেরকম ভালভাবে চললে, চাই কি, ব্রো-মাহনী এক্সটেন্ডেড হিসেবেও ওকে কনভার্ট করে দেওয়া যেতে পারে।

     নাথান অবশ্য খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি তাতে। ব্রো-মাহনীদের সম্বন্ধে ওর ধারণা খুব নীচু।

      “ভেবে দ্যাখ না, সব কাজ তো ‘বিয়াশ-ও’রা আর আমরা ‘সু-ড্রো’রা করি। ব্রো-মাহনী গুলো স্রেফ বসে বসে আয়েস করে। আমার বয়ে গেছে অমন বদমায়েশ হতে।”

     একবারই নাথান মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল ওদের কাছে। অমনি ক্লাসের স্ল্যাংপিকার যন্ত্র বিপবিপ করে উঠে লাল হয়ে গেছিল। ‘বদমায়েশ’ শব্দটা খুব খারাপ,ওদের মুখে অ্যালাউড নয়। নাথানের বাবা মাকে পরদিন স্কুলে এসে দেখা করতে হয়েছিল।

     তারপর থেকে নাথান কথা বলা আরো কমিয়ে দিয়েছে। তারফলেই কিনা কে জানে, টেলিপ্যাথি গেমেও আজকাল অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।

     সেটা অবশ্য নাথান জানে না। ও শুধু এটুকুই জানে যে, কথা না বলে নিজের মনে বসে ভাবলে ওর মাথা আরো পরিষ্কার হয়, অনেক কিছু ও আপনাআপনি বুঝতে পেরে যায় কেমন যেন। এই যেমন এখন চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল তোমোকো কোনকোন ডিজিট ভাবছে মাথায়। কিন্তু সিকোয়েন্সটা পুরোটা বলার আগেই পায়ে দুম করে একটা ধাক্কা লাগায় মনঃসংযোগ ব্যাহত হল।

     একটা বল। ফুটবলের সাইজের। কে জানে কিসের তৈরি। বেশ শক্ত, নাথানের পায়ে ব্যথা লেগেছে রীতিমত। গার্বেজ ডাম্প রিফিল হবার সময়ে এরকম একআধটা জিনিস মাঝে মাঝেই ছিটকে মাঠে চলে আসে বটে।

     দু পা সরে দাঁড়িয়ে আবার চোখ বন্ধ করেছিল নাথান। বাজখাঁই গলার ডাকে চমকে উঠে চোখ খুলল আবার।

      “ওহে বালক, দাঁড়িয়ে আছিস যে বড়? যা ফেরত দিয়ে আয়! নিয়ম জানিস না নাকি?”

     সান ডায়াবোল। গারবেজ ডাম্পটার মালিক শুধু না, ব্রো-মাহনী সন্তানসমিতির ভাইস। গারবেজ ডাম্পের আশেপাশের অঞ্চলটাও ওর আন্ডারে। ওর অলিখিত নিয়ম, এরকমসব ফুট-ফরমায়েশ এই অঞ্চলের ছোট ছেলেমেয়েদের করতে হবে।

      “কী রে? মতলবটা কী? চুরি করার কথা ভাবছিস না তো?”

     বিচ্ছিরি আওয়াজ করে হাসে ডায়াবোল। নাথান অগত্যা নীচু হয়ে বলটা কুড়িয়ে নেয়। এটা ফেরত দিতে যেতে হবে গার্বেজ  ডাম্পটার অন্য প্রান্তের গেটারটন সেন্টারে। জ্বালাতন!

     মিহু ওর সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, নাথান বারণ করেছে। অতটা হেঁটে গিয়ে জমা দিয়ে ফিরে আসতে আসতে বিকেল ফুরিয়ে যাবে, ওরও খেলা হবে না তাহলে আজ আর। হাঁটা শুরু করার পর দেখল, ডায়াবোল ওর অ্যাম্ফো গাড়িটা নিয়ে ওই দিকেই গেল! ওর গাড়িতে নাথানকে চড়াবে না সে ঠিক আছে, কিন্তু ইচ্ছে করলে বলটা তো নিজেই গাড়ি করে নিয়ে চলে যেতে পারত! এই লোকগুলোর জন্যই ব্রো-মাহনীদের ওপর এত রাগ ওর।

     লোঞ্জোনের পাশ দিয়ে রাস্তাটা এমনিতেই খুব নিরিবিলি, এদিকে দরকার ছাড়া কেউ আসে না। ওবলটা টুকটুক করে পায়ে লাথি মেরে গড়াতে গড়াতে নিয়ে যাচ্ছিল। অ্যাদ্দিন ধরে চেপে রাখা রাগটা খালি খালি বেরিয়ে আসতে চাইছিল ডায়াবোলের হাসিটা মনে পড়লেই।

     যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল নাথান। এই আজন্ম নিয়ম মেনে চলা ওদের, ব্রো-মাহনীরা যা বলবে সু-ড্রোদের চুপ করে হুকুম তামিল করতেই হবে, এসব ওর আর সহ্য হচ্ছিল না – মাথা ফেটে যেতে চাইছিল রাগে। আর কিছু হাতের কাছে ছিল না, তাই রাগটা গিয়ে পড়ল বলটার ওপরেই। তোদের জিনিস, তাও কিনা গার্বেজ ডাম্পের জিনিস, আমায় বয়ে নিয়ে গিয়ে ফেরত দিতে হবে কেন! দেব না, যা।

     গায়ের সব শক্তি জড়ো করে নাথান ছুঁড়ে ফেলে দিল বলটা লোঞ্জোনের মধ্যে। কেউ জিগ্যেস করলে বলবে পড়ে গেছিল পা লেগে। লোঞ্জোনে কারো প্রবেশ নিষেধ বিশেষ পাস ছাড়া, তাই ও কেন খুঁজতে যায়নি এ প্রশ্নটা কেউ করবে না।

     জোরটা আশাতিরিক্ত বেশিই হয়েছিল। গড়াতে গড়াতে ল্যাক্স-মান-লাইন পেরিয়ে গেল বলটা। লম্বা লম্বা মেরুন কালো গাছের জঙ্গলে লোঞ্জোন ঢাকা হওয়ায়, এটা অবশ্য নাথান টের পেল না – সে ততক্ষণে হালকা মনে শিস দিতে দিতে ফেরার পথ ধরেছে।

*****

      ‘খাবার’ জিনিসটা খুব বেশি লাগে না সলিটারিওদের। এমনিতেও সারাক্ষণের এই এত ছায়া ছায়া অন্ধকারে আর একইসঙ্গে এত গরম জায়গায় তাদের বাস, যে জীবনের বেশির ভাগ সময়টা ঘুমিয়েই কাটে। যেটুকু সময় জেগে থাকে, তাতেও স্থির হয়ে এক জায়গায় দূরের দিকে চেয়ে বসে বসে ভাবাটাই তাদের একমাত্র কাজ। তাদের নাতিদীর্ঘ শরীরের সবচেয়ে কর্মিষ্ঠ অঙ্গ ব্রেন, তাই শরীরের বেশিটাই মাথা। ছোট্ট বুক পেট আর সরু সরু চার হাতে লম্বা লম্বা তিনটে করে আঙুল। একবার খেলে, আবার খিদে পেতে পেতে চার বা পাঁচবার ঘুমিয়ে ওঠা হয়ে যায়।

     কিন্তু একদমই লাগে না যে খাবার তাও তো নয়!আর খাবারের স্টকও কিছু অনন্তকাল থাকে না। জীবনকালে নাহোক আট দশবার ফুরোয়।

     তখন খাবার জোগাড় করতে বেরোতে হয়। আর সলিটারিওদের এই খাবার আবার শুধুই ডিগ-বলয় নামের সীমান্ত প্রদেশে পাওয়া যায়।

     বলতেই পারো, তাহলে ওরা সেখান থেকে এত দূরে থাকে কেন। এটার উত্তর পিপ জানে না। সে শুধু এটুকুই জানে যে ডিগ-বলয়ে অনেকক্ষণ থাকতে নেই। থাকা বারণ।

     তাছাড়া, গরমও খুব বেশি ওখানে। ছায়াটা কম লাগে যেন।

     একে তো ধু উষর সমতল জমি ছাড়া কিছুই নেই এই চত্বরে। একদম ডিগ-বলয়ের কাছাকাছি এলে তবেই এই সরস এফেনীগুলো পাওয়া যায়। মাটি ফুঁড়ে সোজা ওঠে এগুলো, সবুজ রঙের মোটা চ্যাপ্টা সারি সারি দণ্ড। এরকম কয়েকটা তুলে নিয়ে যেতে পারলেই আবার বহুদিন খিদে নিয়ে চিন্তা নেই। পিপকে ওর মা, কুরিওসা শিখিয়েছিল কী করে আলতো করে লম্বা আঙুলেমাটি খুঁড়ে খুঁড়ে শিকড় সমেত তুলে এগুলো নিয়ে যেতে হয়। বার তিন মায়ের সঙ্গে এসেছিল পিপ। তারপর, ও লায়েক হয়ে যেতে মা আলাদা হয়ে গেল, যেমন হয়।

     এফেনী খুঁজতে খুঁজতেই ডিগ-বলয়ের একদম পাশে এসে পড়েছিল সে। সেই ফুটোটার কাছাকাছি। আজব ফুটো একটা, সোজা নেমে গেছে নীচে। ওর দু আঙুলের বেশি একসাথে ঢোকে না, এত ছোট। ছোটবেলায় একবার অনেকক্ষণ ধরে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেছিল মনে আছে, কোথায় যেফুটোটার শেষ কে জানে, কিছুতেই পায়নি!

     ফুটোটা দেখতে ব্যস্ত ছিল বলেই হয়তো এই জিনিসটা পায়ে না ঠেকা অবধি চোখেই পড়েনি। নইলে এমন ফাঁকা জমিতে চোখে না পড়াটাই আশ্চর্য। দুই আঙুলে তুলে ধরে দেখল, চমৎকার গোল একটা ব্যাপার। সম্ভবত, মা যে জিনিসটাকে ‘মার্বেল’ বলে উল্লেখ করত সেরকমই কিছু – বা সেই জিনিসই।

     এইটা মনে পড়তেই, ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো ফিরে এল। মনের মধ্যে ছেলেমানুষি চাড়া দিয়ে উঠল আবার।

     পিপকে প্রথমবার যখন নিয়ে এসেছিল এফেনী খুঁজতে, তখন মা শিখিয়েছিল খেলাটা। মায়ের ছোটবেলার খেলা। তবে মা খেলত মার্বেল বলে একটা জিনিস দিয়ে, অনেকদিন ছিল নাকি সে মার্বেলটা মায়ের কাছে। তারপর তো হারিয়েই গেল। ওরকম আরেকটা আর কোথায় পাবে, এফেনীর একটা টুকরো ভেঙে যথাসম্ভব গোল করে তাই দিয়ে ওকে শিখিয়েছিল মা। 

     খেলাটা জটিল কিছু নয় – দূর থেকে টিপ করে ছুঁড়ে ফুটোটার মধ্যে মার্বেলটা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। সহজ শুনতে, কিন্তু কী শক্ত করা, আর কী ইন্টারেস্টিং!

     তখন, যতবার আসত, ততবার খেলত। বারবার চেষ্টা করেও পারেনি কোনদিন। আজ কিন্তু টিপ করে গড়িয়ে দিতে এক চান্সেই মার্বেলটা সটাং ফুটোটার ভিতর ঢুকে গেল।

     বেকুবের মত চেয়ে রইল পিপ।এই যাঃ! আরেকটুক্ষণ খেলবে ভেবেছিল যে!

     যাকগে। মা-ও তো জীবনে একবারই পেরেছিল, তাতেই তো হারিয়ে গেছিল মার্বেলটা!

     আর বেশিক্ষণ এখানে থাকা ঠিক হবে না, গরমও লাগছে খুব। পিপ আবার এফেনীর খোঁজে হামাগুড়ি দিয়ে অন্যদিকে চলল।

*****

     নাহ্‌, এই ঝুরঝুরে গুহাটায় আর পোষাবে না। সারাক্ষণ কিছু না কিছু লেগে আছে! এই কালকেই ঘুমোনোর জায়গাটায় নতুন ফাটল গজিয়েছে একটা, মাঝরাতে পাশ ফিরতে গিয়ে চিমটি খেল পেটে। আজ আবার এই।

     গুহার ঠিক পিছন দিকটায় পাথরের চাটানে বসে মন দিয়ে বসে সোমলতার পাতা ছাড়াচ্ছিল বহুবিজ্ঞব্যতিক্রমী। নিজেরই বাগানের সংগ্রহ, কারো পাকা লতায় আঁকশি দেয়নি কিছু না।বাইরের সাদা তুষারে ঢাকা পাহাড়শৃঙ্গগুলোয় তখনো নীল গোলাপী রঙ ধরেনি।

     টকাস করে নাকের ডগায় জিনিসটা এসে পড়ল। মাথা আর শরীরের বাকি অংশের মত নাকে তো আর বিশাল ঝাঁকড়া সাদা লোম দিয়ে ঢাকা নেই! লাগল একটু।

     তুলে নিয়ে ফেলে দিতে গিয়েও মন পালটাল। বেশ বড়সড় নিটোল দেখতে পুঁতিটা। নাতি ভাবাবেশচূর্ণকেশ একগাদা খেলার জিনিস জড়ো করে রেখে গেছে ওদিকের তাকটায়,আবার ছুটিতে এসে খেলবে বলে। ভাল কিছু পেলে, ওখানেই তুলে রাখেন বহুবিজ্ঞব্যতিক্রমী।

     পুঁতিটা সেখানেই রাখতে গিয়ে মন পালটালেন তিনি। বড্ড কুচো জিনিস, পড়ে টড়েযাবে।

     নাতির সবচেয়ে প্রিয় খেলনার বাক্সটা খুলে, তার বিভিন্ন উদ্ভট উঁচুনীচু গড়নের খেলাটায় হাত বোলাতে বোলাতে একটা জুতমত খাঁজে ব্যালান্স করে পুঁতিটা রেখে দিলেন তিনি। কিছু জিনিস কেমন কখনোই পুরোনো হয়না। এই খেলাটা তাঁদের ছোটবেলাতেও জনপ্রিয় ছিল খুব।

     আলতো করে বাক্সটার উপরের ‘গ্যালাক্সিউনো’ লেখাটায় হাত বোলালেন তিনি, বাক্সটা তাকে তুলে রাখার আগে।

*****

     তেয়াটুয়ার আণ্ডারে নতুন ট্রেনী হিসেবে এই কিছুকাল হল জয়েন করেছে ভিশি। এদ্দিন শুধুই মাইন্ড-ট্রান্সফার আর ডকু পড়া চলছিল। এই প্রথম তাকে কিছু হাতে-কলমে করার মত কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন তেয়াটুয়া।

     অবশ্য, এই বিশেষ ব্যাপারটাই ওর গবেষণার বিষয়, কাজেই দায়িত্বটা যে ওর ওপরেই আসবে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। বলতে কি, ওর আগ্রহেই কাজটা হাতে নিয়েছেন তেয়াটুয়া।

     প্রাথমিক জ্ঞান তো ছিলই ভিশির, এই কদিনে আরো অনেক অনেক পড়াশুনো করে ফেলেছে ক্লাসিক্সো ডকু সেকশন ঘেঁটে। পেরিগ্রাফে সমস্তটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এঁকে নিয়েছেও, কোথায় উঁচু হবে, কোথায় নীচু, কোথায় কোন ত্রোল দিয়ে ওজনটা ব্যালেন্স করতে হবে সব। চোখের সামনে পুরোটা আগাপাশতলা দেখতে পাচ্ছে ও। আর একদম আধুনিক করে প্যাকেজ করবে ওটাকে, ভেবেই রেখেছে। কিছুটা মিবাডাস্ট ছড়িয়ে দেবে সব শেষ হলে, এই জৈব সুরক্ষা কোষগুলো সবচেয়ে ভাল সংরক্ষণের উপায়। তবে শুধু সেই ভরসাতেই রাখবে না ভিশি, চারটে আলাদা আলাদা গ্রেডের আয়নোলেয়ার দিয়ে মুড়েও দেবে ভেবে রেখেছে। বহুকাল টাটকা থাকবে সব, নতুনের মত ঝকঝক করবে।

     ঠেকে আছে শুধু একটা জায়গায়।

     মুশকিল হচ্ছে, ভিশি এত পড়েও ব্যাপারটার ভিতরের খবরটা পায়নি। জিনিসটার মূলে যে কি ভিত্তি ছিল, সেটা না জানায় খুব ঠেকায় পড়েছে সে। বানাবে তো এত কিছু, কিন্তু কোন পদার্থের ওপর? এত এত ডকু ঘেঁটে ফেলল, কিন্তু কিছুতেই একেবারে ভিত্তি, মানে ‘কোর’ ব্যাপারটার কোন ব্যাখ্যা নেই।

     ল্যাবের সামনে, তেয়াটুয়ার ঘরের বাইরের বাগানে হাঁটতে হাঁটতে  ভিশি এসবই ভাবছিল। তেয়াটুয়ার হাঞ্চিক্স হয়েছে, এখন টানা তিনদিন অপরান-হো আসবেন না। তেমনই নিয়ম, যাতে আর কারো রোগটা না হয়। তাই ল্যাব এখন ভিশির একার দখলে বলা যায়।

     এখন তো সব কিছুই প্লাস্টিকাই দিয়ে বানানো হয়। আর কিছু ভেবে না পেলে সেটা দিয়েই রেপ্লিকা করার কথা ভাবতে হবে ভিশিকে। কিন্তু আইডিয়াটা কেমন যেন খেলো খেলো লাগছিল ওর, মন উঠছিল না। তেয়াটুয়া অবশ্য বলেছিলেন পাঁচনম্বর গ্রহ টেরামিরাহা থেকে আনা রকোপীস জুড়ে জুড়ে তৈরি করা যায় কিনা দেখতে, কিন্তু আজই হিসেব শেষ হল ওর, ওটা ব্যবহার করলে ডেন্সিটি এতটাই পালটে যাচ্ছে ইকুয়েশনের থেকে যে ব্যালেন্স থাকবে না। সব ওলটপালট হয়ে যাবে, হয়তো দম দিলেও চলবে না আর।

     তাই বেশ দুশ্চিন্তা নিয়ে পায়চারি করছিল ভিশি। বাগানের ছ নম্বর কোনাটা ঘুরেই থ হয়ে গেল। এটা আবার কোথথেকে এল?

     ইয়াব্বড় একটা গোলক। এবড়ো খেবড়ো গা। সারা গা ভর্তি বেজায় নোংরা। বাগানটা এদিকে এমন তছনছই বা হয়ে গেল কি করে!

     চেনা কিছু নয় সেটা নিশ্চিত। তবু,  ভিশির কেমন চেনা চেনা লাগে সাইজটা…

     হ্যাণ্ডিরোবোকে দিয়ে ল্যাবে তুলিয়ে আনালো ভিশি জিনিসটাকে। ও যে ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় ফুটছে তা ওর ঘন ঘন নাক চুলকোনো দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তখন।

     প্রোটোকল অনুযায়ী, ল্যাবে এনে প্রথমেই জিনিসটা কোরস্ক্যান দিয়ে চেক করল হ্যাণ্ডিরোবো। প্রতিটি ইঞ্চি।

     রেজাল্টটা দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না ভিশি, আনন্দে দুবার হাত দিয়ে নিজের মাথায় টকাং করে মেরে নিল। “আননোন মেটিরিয়াল”।

     গোলকটাকে জায়গা মত মাউন্ট করিয়ে দিতে বলে, ও তাড়াতাড়ি এতদিন ধরে জোগাড় করে রাখা, এম টি গুঁড়ো, রকোর টুকরো, ত্রোল এইচ টু ও ইত্যাদি অন্য সব মেটিরিয়াল জড়ো করতে থাকে টেক-সারফেসে।

     তেয়াটুয়া ফিরে আসার আগেই বিশ্বকর্মার সেই পুরোনো মডেলটার তিননম্বর এলিমেন্টটাও নতুন করে বানিয়ে ফেলতে পারবে মনে হচ্ছে।

One thought on “ভিত্তি

  • August 11, 2018 at 3:51 am
    Permalink

    বারবার পড়ার মত একটা গল্প, সত্যি আসাধারণ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!