মঙ্গলদেউড়ি

সুমিত বর্ধন

অলংকরণ:জটায়ু

—মঙ্গলদেউড়ি—

দৌলতনগরের বুক চিরে চলে টানা চলে গেছে প্ল্যাঙ্ক সরণী। তার এক প্রান্তে গভর্নর প্যালেস আর মহাকাল মন্দির। আর অন্য প্রান্তে এই মঙ্গলদেউড়ি। দেউড়ির অপর পারে রাস্তা খানিকটা দূর এগিয়ে দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তার একটা সোজা চলে গেছে হকিন্সাবাদ অবধি, আর অন্যটা নদী আর জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে বেঁকেচুরে এগিয়েছে রুসোগঞ্জের দিকে।

     মঙ্গলদেউড়ি কোনও সাধারণ তোরণ নয়। এককালে কাইজারী মহামৃগের শোভাযাত্রা তাদের পিঠের হাওদা আর মাথার ডালপালা ছড়ানো বিশাল শিং নিয়ে অনায়াসে দুলকি চালে হেঁটে যেত এই দেউড়ির তলা দিয়ে। নীলকান্ত মহিষে টানা শকটে চাপিয়ে যোধবণিকদের কাফিলা বয়ে আনত আয়সরেশম, সুগন্ধি আর ভিন্নর পুরাবস্তু, ধুলো উড়িয়ে গ্রীবিনের ক্ষুরের আওয়াজ তুলে দর্পভরে ছুটে যেত গভর্নরের রিসালা। নগরোৎসবের দিন এই দেউড়ির চার কোণের মিনার থেকে বাতাসে পতপত করে উড়ত নিশান, দোতলার বারন্দায় দাঁড়িয়ে সিপাহীদের কুচকাওয়াজ আর বাজীকরদের কেরামতিতে উৎসাহ দিতেন সপার্ষদ গভর্নর। উৎসবের শেষে বারন্দার পেছনের লম্বা দরবার হলে খেতাব-খেলাতে সম্মানিত করা হত বিশিষ্ট নাগরিকদের।

     সে-সব অনেককাল আগেকার কথা। গভর্নরের পিলখানায় আজ আর কোন মহামৃগ অবশিষ্ট নেই, দেউড়ির ওপরের কার্ণিশে বসানো মহামৃগের মাথার কাঠের প্রতিকৃতিটাও জলে কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে দেউড়ির অদূরে। তার মাথার শিঙগুলোও উধাও, হয়তো কেউ জ্বালানী কাঠের জন্যে ভেঙে নিয়ে গেছে।

     একের পর এক দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ভূমিকম্প আর সাইক্লোনের প্রকোপে পর্য্যদুস্ত দৌলতনগরের মতনই মঙ্গলদেউড়ি আজ কেবল তার অতীত গৌরবের স্মৃতি মাত্র। ভগ্নদশা দেউড়ির দেওয়ালে বসানো কারুচিত্রের কাঠের প্যানেলগুলো তাদের লাক্ষার আবরণ হারিয়ে বিবর্ণ হতশ্রী হয়ে পড়েছে, দোতলার বারন্দাটাও অর্ধেক ধ্বসে পড়েছে। ওপরের দরবার হল এখন কেবল ব্যবহার হয় বেওয়ারিস লাশ রাখার কাজে। চোরডাকাতের ভয়ে অন্ধকার কেন, দিনের বেলাতেও এদিকে কেউ বড় একটা ঘেঁষে না।

     আজ এই বিকেলে আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে, দুহাত দূরে কিছু দেখা যায় না। আকাশে মাঝে মধ্যে লালচে বেগুনী আলো ঝলসে গর্জন করে উঠছে বিদ্যুৎগর্ভ মেঘ। আধা অন্ধকার দেউড়ির নিচে বেদিতে বসে বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ধারার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে মহাকাল মন্দিরের এক মুণ্ডিত মস্তক তরুণ ভিক্ষু। তার শরীরে জড়ানো জীর্ণ শ্বেতবস্ত্র, কপালে ভস্মলেপ। মাটিতে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে আরও একজন, তার পাশে পড়ে থাকা গাঁইতি, শাবল আর আরও দুএকটা যন্ত্রপাতি থেকে বোঝা যায় যে সে একজন পুরাখনক। বনে জঙ্গলে ভিন্নর পুরাবস্তু খুঁজে বেড়ানোই তার পেশা।

     বৃষ্টির দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে ভিক্ষু, কিন্তু আপনমনে বিড়বিড় করে চলে পুরাখনক— “কী আশ্চর্য! কিচ্ছু বুঝলাম না! কিচ্ছু বুঝলাম না!”

     তার মুখের দিকে একবার তাকায় ভিক্ষু, কোনও কথা বলে না।

     জলের ওপর দিয়ে দৌড়নোর ছপছপ আওয়াজ ওঠে। বৃষ্টির ধূসর পর্দার মধ্যে দিয়ে ছুটে এসে দেউড়ির মধ্যে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে একজন পথিক। পায়ে বুটজুতো, পিঠে বাঁধা ঝোলা। ভিজে জামাকাপড় শরীরের সঙ্গে লেপটে গেছে।

     পিঠের ঝোলা নামিয়ে রেখে হাত জড় করে ভিক্ষুকে একটা দায়সারা প্রণাম করে পথিক— “প্রণাম, সুতপ!”

     নীরবে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে একবার হাত তুলে ফের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে ভিক্ষু। গায়ের ভিজে জামা খুলে নিঙড়োতে থাকে পথিক।

     ফের বিড়বিড় করে পুরাখনক— “কিচ্ছু বুঝলাম না! মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝলাম না!”

     ভিজে জামা নিঙড়োনো বন্ধ করে তার পাশে এসে বসে পথিক।

     “কী হয়েছে? কী বুঝতে পারোনি?”

     চোখ তুলে পথিকের মুখের দিকে তাকায় পুরাখনক।

     “এমন অদ্ভুত গল্প আমি জীবনে কোনওদিন শুনিনি।”

     নাক দিয়ে একটা ব্যাঙ্গের শব্দ করে পথিক— “তা বলে ফেল! আমাদের এখানে ভিক্ষু আছেন। জ্ঞানী মানুষ, মানে বুঝিয়ে দেবেন।”

     দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ধারাপাত একদিক থেকে আর একদিক উড়ে যায় বিশাল ধোঁয়াটে পর্দা হয়ে। দেউড়ির মাথায় শব্দ হয় ড্রাম বাজানোর মতন।

     মৃদু মাথা নাড়ে ভিক্ষু, দৃষ্টি তার তখনও বাইরের বৃষ্টির দিকে— “আমি কেন, গ্রন্থমঠের প্রধান আচার্য্যও এমন অদ্ভুত কাহিনি কখনও শুনেছেন কিনা সন্দেহ।”

     খানিকটা বিস্ময় নিয়ে ভিক্ষুর দিকে তাকায় পথিক— “গল্পটা আপনিও জানেন তাহলে!”

     একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ভিক্ষু— “এই খনক আর আমি দুজনে একসঙ্গে আজ এই কাহিনি শুনেছি।”

     “কোথায় শুনেছেন?”

     “কোতোয়ালীর উঠোনে।”

     “কোতোয়ালী?”

     “হ্যাঁ একটা লোক খুন হয়েছিল তাই—”

     ভিক্ষুর মুখের কথা শেষ হয় না। নাকে শব্দ তুলে ব্যঙ্গের হাসি হাসে পথিক।

     “একটা লোক! মাত্র একটা লোক খুন হয়েছে? তা কী এসে যায় তাতে? এই দেউড়ির ওপরের ঘরেই যান না। দেখবেন কম করে গোটা পাঁচেক বেওয়ারিস লাশ পড়ে আছে।”

     মাথা ঝোঁকায় ভিক্ষু— “ভুল বলোনি। যুদ্ধ, বন্যা, সাইক্লোন, দুর্ভিক্ষ, বছরের পর বছর ধরে একের পর এক বিপর্যয়। তার ওপর প্রায় প্রতি রাতেই চোর ডাকাতের আক্রমণ। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। কিন্তু তবু বলব, এমন অদ্ভুত ঘটনার কথা আগে শুনিনি।”

     মেঘের কোন গোপন কন্দরে গর্জন করে বাজের আওয়াজ। ক্ষণিকের জন্যে বিদ্যুতের লালচে নীল আলো পড়ে ভিক্ষুর ওপরে।

     মাটির দিকে চোখ রেখে ভিক্ষু বলে— “এই কয়েক বছরে পোকামাকড়ের মতন মানুষকে মরতে দেখেছি। তবু নিজের মনকে বুঝিয়েছি। কিন্তু এই ঘটনার পর মানুষের ওপর বিশ্বাস চলে গেছে আমার।”

     মুখে বিরক্তির আওয়াজ তোলে পথিক— “রাখুন দিকি আপনার জ্ঞানের কথা! ভাবলাম বৃষ্টিতে আটকে পড়েছি, একটা গল্প শুনলে সময় কেটে যাবে। জ্ঞান শোনার চাইতে বরঞ্চ বৃষ্টির আওয়াজ শোনা ভাল।”

     দেউড়ির অন্য দিকে সরে যায় পথিক। দেউড়ির দেওয়ালে বসানো কারুকাজ করা কাঠের প্যানেল খুলতে থাকে চাড় দিয়ে। চোখ তুলে সেদিকে একবার তাকায় ভিক্ষু, কিন্তু কিছু বলতে গিয়েও বলে না।

     কাঠগুলো মাটিতে পাঁজা করে আগুন জ্বালিয়ে দেয় পথিক। আগুনের লালচে আলো পড়ে দেউড়ির আনাচে কানাচে। আগুনের উষ্ণতায় কিছুটা কমে আসে বাতাসের হিমেল আর্দ্রতা।

     লম্বা পায়ে পথিকের কাছে একরকম দৌড়ে আসে পুরাখনক— “শোন তাহলে। আমার থেকেই শোন। গল্পটার জট হয়তো তুমিই ছাড়াতে পারবে।”

     আলতো করে মাটি চাপড়ায় পথিক— “বসো। আরাম করে বসো। বসে ধীরেসুস্থে বলো।”

     দেউড়ির ঢালু ছাদ থেকে জলপ্রপাতের মত নিচে পড়ে বৃষ্টির জল। সেদিকে চুপ করে খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকে পুরাখনক— “দিন তিনেক আগের কথা। ঘাড়ে গাঁইতি শাবল ফেলে রুসোগঞ্জের রাস্তার পাশে যে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড় আছে তার ওপর উঠেছিলাম।”

     “কেন?”

     “কানাঘুষো শুনেছিলাম জঙ্গলের ভেতর একটা ভিন্নর বাঙ্কার আছে। সেটাই খুঁজতে যাচ্ছিলাম।”

     আগুনের আঁচে লালচে দেখায় পুরাখনকের মুখ। সেদিকে একবার তাকায় ভিক্ষু। মানুষ অম্বালিকায় পা দেওয়ার বহু আগেই ভিন্নররা উধাও হয়ে গেছে এই গ্রহ থেকে। হয় কালের প্রভাবে নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে, অথবা বসত উঠিয়ে চলে গেছে অন্য কোন জগতে। অম্বালিকায় রয়ে গেছে তাদের ফেলে যাওয়া প্রযুক্তি। সে সব খুঁজে বেড়ানোই পুরাখনকদের মতন মানুষদের পেশা।

     একটা নিঃশ্বাস ফেলে ভিক্ষু। প্রকৃত মালিকদের অনুপস্থিতিতে তাদের মালপত্র লুঠ করা তার নিজের দর্শন অনুমোদন করে না, কিন্তু বহুকালের এই রেওয়াজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও তার নেই।

     আগুনে হাত সেঁকে পুরাখনক— “পাহাড়ে খানিকটা ওঠার পর দেখলাম ঝোপের ওপর একটা টুপি পড়ে রয়েছে।”

     “টুপি! কীরকম টুপি?” ধুনির নিচের দিকের কাঠ নেড়ে দিয়ে আঁচ উস্কে দেয় পথিক। কয়েকশো বছরের শিল্প আর ইতিহাস মিশে যায় আগুনে।

     “মেয়েদের টুপি। চওড়া কানাতের। কানাতের নিচে নেটিং দেওয়া।”

     ঘাড় নাড়ে পথিক। “হ্যাঁ বনেদী ঘরের মেয়েরা ব্যবহার করে। পোকামাকড়ের কামড় থেকে মুখ বাঁচাতে। তারপর?”

     “টুপিটা একবার তুলে দেখে আবার রেখে দিলাম। তারপর জোর কদমে হেঁটে গেলাম জঙ্গলের আরও খানিকটা ভেতরে। চোখে পড়ল একটা শামুক বাঁশের ঝাড়। তাদের খোলস আলোয় চকচক করেছে।”

     একটা দমকা হাওয়ায় সনসন আওয়াজে কেঁপে যায় আগুনের শিখা। দেউড়ির দেওয়ালের পড়া খনক আর পথিকের ছায়া নেচে ওঠে প্রেতমূর্তির মতন। আগুনের শিখাটা হাত দিয়ে আড়াল করে খনক— “শুনেছিলাম বাঙ্কার ওই বাঁশঝাড়ের পেছনে। বাঁশের ঠাসাঠাসি কাণ্ডগুলো ঠেলে তাই ভেতরে ঢুকতে লাগলাম। কিছুটা যাবার পর দেখালাম দুটো বাঁশের ফাঁকে আটকে রয়েছে আর একটা টুপি।”

     “আর একটা টুপি!” বিস্ময়ের ছোঁয়া লাগে পথিকের কণ্ঠস্বরে। “কীরকম টুপি?”

     “ফৌজী টুপি। কাপড়ের। মিলিশিয়ার লোকেরা যেমন পরে।”

     “ফৌজী টুপি!”

     “হ্যাঁ। টুপিটা তুলে নিয়ে আর একটু এগোতেই শেষ হয়ে গেল বাঁশঝাড়ের সীমানা। দেখলাম একটা ফাঁকা মাঠের মতন জায়গা, তাকে ঘিরে রেখেছে উঁচু গাছের সারি। মনে পড়ল এই জায়গাটার কথাই শুনেছিলাম।”

     “বাঙ্কার পেলে?” আগুনের লালচে আলোয় চকচক করে পথিকের চোখ।

     “না। ফাঁকা জায়গাটার একপাশে একটা কাঁসরপাতা গাছ, হাওয়ায় তার পাতায় পাতায় ঠোকাঠুকি লেগে টুংটাং আওয়াজ উঠছে। আমায় যে খবর দিয়েছিল সে বলেছিল বাঙ্কারে ঢোকার রাস্তাটা ওই গাছের নিচেই আছে। কিন্তু গাছটার দিকে দুপা এগোতেই পায়ে কী একটা জড়িয়ে গেল। নিচু হয়ে দেখলাম একটা দড়ি।”

     “দড়ি!”

     “হ্যাঁ মোটা দড়ি। যেমন জানোয়ার বাঁধার কাজে লাগে। অবাক হয়ে ভাবছি এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দড়ি কোথা থেকে এলো, উল্টোদিকের একটা গাছের ওপর থেকে একটা চিলবেড়াল তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। চমকে উঠে সে দিকে তাকাতে দেখতে পেলাম গাছের নিচে ঝোপের ধারে একটা ক্লিপ পড়ে আছে।”

     আগুনের আরও খানিকটা ধারে ঘেঁসে বসে পথিক— “ক্লিপ! কী রকম ক্লিপ?”

     “মেয়েদের মাথার ক্লিপ। আলোর ফুল বসানো। প্রায় দৌড়ে গেলাম ক্লিপটার দিকে। গিয়ে দেখলাম—”

     শিউরে ওঠে পুরাখনক, থেমে যায় তার কথা।

     “কী দেখলে? বলো, বলো!” উৎসুক কণ্ঠে তাড়া দেয় পথিক।

     “দেখলাম ঝোপের মধ্যে একটা লাশ পড়ে আছে। চোখ দুটো খোলা, জামা রক্তে ভিজে গেছে।”

     “তারপর কী করলে?”

     “তারপর? তারপর আর কিছু করিনি। উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে পুলিসকে খবর দিলাম।”

     নাক দিয়ে ফের ব্যাঙ্গের আওয়াজ করে পথিক— “ব্যস। এইটুকু গল্প! এর মধ্যে আর আছে কী? আজকাল রোজ চারপাঁচটা এইরকম লাশ এদিকে ওদিকে পড়ে থাকে!”

     মাথাটা দুপাশে নাড়ায় খনক— “দু-তিনদিন বাদে, মানে আজ সকালে, কোতায়ালী থেকে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল আমার জবানবন্দী নিতে।”

     বেদীর ওপর থেকে ভেসে আসে ভিক্ষুর কণ্ঠস্বর— “আমাকেও ডেকেছিল জবানবন্দী দিতে। আরও কয়েকজনকেও।”

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া পুরাখনকের জবানবন্দী

“হ্যাঁ হুজুর! বিলকুল হুজুর! লাশটা আমিই প্রথম দেখি হুজুর। কোথায়? দিন তিনেক আগে সকাল সকাল জঙ্গলে গিয়েছিলাম? কেন গিয়েছিলাম? ভিন্নর বাঙ্কার খুঁজতে হুজুর। না হুজুর মিথ্যে কথা বলছি না, মহাকালের দিব্যি হুজুর। ঠিক কোনখানে? রুসোগড়ের রাস্তার পাশের পাহাড়ের ওপর উঠে জঙ্গলের মধ্যে একটা শামুক বাঁশের ঝাড়ের পেছনে।”

     “লাশটা? লাশটা কাঁসরপাতা গাছের নিচে ঝোপের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়েছিল, গায়ে নীল রঙের জামা। বুকে তলোয়ারের কোপ, জামাটা রক্তে ভেজা।”

     “হ্যাঁ হুজুর, চারপাশটা রক্তে ভিজে ছিল। মাটিতে পড়ে থাকা শামুক বাঁশের পাতাগুলো সব রক্তে ভেজা ছিল। না হুজুর, রক্ত গড়াচ্ছিল না, শুকিয়ে কালো হয়েছিল। হ্যাঁ হুজুর, দেখে তো মনে হল চোট অনেক আগে লেগেছিল। ক্ষতের আশেপাশে রক্তের মধ্যে অনেক জুঁইবোলতা আটকে ছিল।”

     “না হুজুর কোন তরোয়াল দেখিনি। খালি বাঁশঝাড়ের পেছনে একটা দড়ি পড়ে ছিল। আর, আর, একটা মেয়েদের ক্লিপ। না হুজুর আর কিছু না। হ্যাঁ হুজুর, দেখে তো মনে হল বেশ লড়াই হয়েছে। মাটিতে পড়ে থাকা পাতাগুলো সব পায়ে মাড়ানো, একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছিল।”

     “তলোয়ার? না হুজুর কোন তলোয়ার দেখতে পাইনি। গ্রীবিন? না হুজুর কোন গ্রীবিন ছিলনা। ওই শামুক বাঁশের ঝাড় ঠেলে মানুষের পক্ষেই ঢোকা কষ্টের, ওর ভেতরে গ্রীবিন যাবে কীকরে?”

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া মহাকাল মন্দিরের ভিক্ষুর জবানবন্দী

“হ্যাঁ হুজুর, অবশ্যই। ভাল করে ভেবেচিন্তেই উত্তর দেব। কখন দেখেছিলাম লোকটাকে? দিন চারেক আগে সকালের দিকে হবে। মহাকাল মন্দিরের রাস্তা ধরে যাচ্ছিল। সঙ্গে গ্রীবিনের পিঠে একজন মেয়েমানুষ ছিল। না তখন জানতাম না। মেয়েটা যে লোকটার বউ সে কথা পরে জেনেছি। না মুখ দেখিনি। টুপির নেটিঙের আড়ালে মুখ ঢাকা ছিল। পোষাক? হাল্কা লাল রঙের জোব্বা ছিল গায়ে, রঙীন সুতোর নক্সা তোলা। না, লাগাম ধরে ছিল না। লাগাম পুরুষমানুষটার হাতে ছিল। মেয়েটা গ্রীবিনের লম্বা গলাটা ধরে বসেছিল। হলদে রঙের গ্রীবিন, মাথায় সবুজ ঝুঁটি। লম্বা? তা আন্দাজ সাড়ে-পাঁচ ফুট মত হবে লম্বায় মেয়েটা। না হুজুর এর বেশি কিছু দেখিনি। আমি মহাকাল মন্দিরের ভিক্ষু, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েমানুষ দেখা আমার উচিৎ নয়। নিরস্ত্র? না, লোকটা নিরস্ত্র ছিল না। কোমরে তলোয়ার ছিল, পিঠেও লঞ্চার বাঁধা ছিল। আর একটা জিনিস মনে পড়েছে। লোকটার পিঠের তূণীরে অন্ততঃ গোটা বিশেক মিসাইল কাঠি ছিল।”

     “না হুজুর আর কিছু বলার নেই। লোকটার কপালে যে এমন অপঘাত মৃত্যু লেখা আছে তখন স্বপ্নেও ভাবিনি। শাস্ত্রে যে বলে ‘নলিনী দলগত জলমতি তরলং তদ্বজ্জীবনমতিশয় চপলং’ সে কথা যে এমন করে ফলবে তা কি আর তখন জানি? মানুষটার কাছের লোকজনকে সমবেদনা জানানোর মতন আমার ভাষা আমার নেই। মহাকাল তাকে অনন্তে আশ্রয় দিন।”

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া জনৈক পুলিস কন্সটেবেলের জবানবন্দী

“অর্ডার হুকুম? জী হুকুম, কোন কিছু বাদ না দিয়ে বেফিকর্‌ উত্তর দেব। যে লোকটাকে অ্যারেস্ট করেছি? ওর নাম তেজপ্রতাপ হুকুম, কুখ্যাত ডাকাত। কী করে ধরলাম? পুরনো সাঁকোর কাছে মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছিল। দেখে মনে হল গ্রীবিনের পিঠ থেকে পড়ে গেছে। কখন ধরলাম? কাল সন্ধে নাগাদ। আর একটা কথা বলে রাখি হুকুম। এর আগেও একে দুচারবার ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রতিবার হাত ফস্কে পালিয়েছে। এবারে আর পালাতে দিইনি, ঘাড় ধরে তুলে এনেছি। পোষাক? গায়ে একটা বুশ জ্যাকেট ছিল। অস্ত্র? হ্যাঁ তা ছিল। একটা ইস্পাত কাঁচের তলোয়ার বাঁধা ছিল কোমরে। আশেপাশে একটা লঞ্চার আর মিসাইল কাঠির তূণীরও পড়েছিল। বলছেন খুন হওয়া লোকটার কাছেও লঞ্চার আর মিসাইল কাঠির তূণীর ছিল? তাহলে এই তেজপ্রতাপই নিশ্চয়ই হাতিয়েছে ওগুলো। জী হুকুম, নোট করে রেখেছি হুকুম। পাতলা লঞ্চার, হাতলে চামড়ার পট্টি জড়ানো। তূণীরে লাক্ষার নক্সা তোলা, ভেতরে সবশুদ্ধ সতেরোটা মিসাইল কাঠি। এগুলো সব ওর কাছ থেকে পাওয়া গেছে। জী হুকুম, সাঁকো থেকে একটু দূরে একটা গ্রীবিন চরে বেড়াচ্ছিল। হ্যাঁ, হলদে রঙের গ্রীবিন। মাথায় সবুজ ঝুঁটি। না, সঙ্গে কেউ ছিল না, লম্বা লাগামটা মাটিতে লুটোচ্ছিল। কথায় বলে না ধর্মের কল বাতাসে নড়ে? গ্রীবিনের পিঠ থেকে না পড়লে তেজপ্রতাপ এবারেও আমাদের হাতে ধরা পড়ত না।”

     “হুকুম, এই দৌলতনগরের আশেপাশে যত চোরডাকাত আছে, তাদের মধ্যে এই তেজপ্রতাপ বেছে বেছে মেয়েদেরই টার্গেট করে। গত মাসে রুসোগঞ্জ থেকে আসা এক গেরস্ত বাড়ির বউ আর তার মেয়ে মহাকাল মন্দির দেখে ফেরার পথে খুন হয়। আমার সন্দেহ এটা তেজপ্রতাপেরই কাজ। এই তেজপ্রতাপ যদি লোকটাকে খুন করে থাকে, তাহলে তার বউয়ের কী পরিণতি হয়েছে ভাবতেই শিউরে উঠছি। হুকুমের কাছে বান্দার দরখাস্ত্‌ রইল, এ ব্যাপারেও তদন্ত করে দেখার।”

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া জনৈক বৃদ্ধার জবানবন্দী

“হ্যাঁ হুজুর, দেহটা আমার জামাইয়েরই। না হুজুর, ওর বাড়ি দৌলতনগরে না। ও হকিন্সাবাদের আজাদ মিলিশিয়ার একজন রিসলদার। নাম? ওর নাম সুশান্ত। বয়স? বয়স বছর সাতাশ আটাশ হবে। না হুজুর, ফৌজী হলেও খুব নরম স্বভাবের ছেলে। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়ে কাউকে রাগিয়ে দেওয়ার মানুষ নয়।”

     “আমার মেয়ে? আমার মেয়ের নাম মণীষা। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। একটু একরোখা আর জেদী বটে, কিন্তু খুব আমুদে আর হাসিখুশি। না হুজুর, সুশান্ত ছাড়া আর কোন পুরুষমানুষের সঙ্গে ওর কোন সম্পর্ক ছিল না। কেমন দেখতে? মুখটা একটু লম্বাটে ধরণের, বাঁ চোখের কোনে একটা তিল আছে।”

     “মেয়েকে নিয়ে জামাই আমার কাছে এসেছিল হুজুর। দিন চারেক আগে মহাকাল মন্দিরে পুজো দিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। আমার পোড়া কপাল, ওদের অদৃষ্টে কিনা শেষে এই ছিল? ওগো, আমার মেয়েটার কী হল গো? জামাইয়ের যা হওয়ার হয়ে গেছে, আমার মেয়েটাকে যাতে ফিরে পাই তার কিছু একটা উপায় করুন হুজুর। যদ্দিন বাঁচব আপনার কেনা বাঁদী হয়ে থাকব। মর, মর, তেজপ্রতাপ না কী নাম তোর, মর তুই! আমার জামাইটাকেই শুধু নয়, আমার মেয়েটাকেও—”

     (বৃদ্ধার বাকি কথাগুলো কান্নায় চাপা পড়ে গেছে)

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া তেজপ্রতাপ নামক কুখ্যাত দস্যুর স্বীকারোক্তি

“হ্যাঁ বলব না কেন সত্যি কথা? বুক ফুলিয়ে বলব। একবার ধরা পড়লে যে আমার কাটা মুণ্ডুটা কোতোয়ালীর দেওয়ালের আঙটা থেকে ঝুলবে সে তো আগে থেকেই জানি। আসল কথা লুকিয়ে লাভ কী? হ্যাঁ লোকটাকে আমিই মেরেছি। না মাগীটা কোথায় জানি না। হ্যাঁ, হ্যাঁ মারুন মারুন, কিন্তু কিস্যু হবে না। যা জানি না তা বলতে যাব কেন?

     দিন-চারেক আগে মহাকাল মন্দির যাবার রাস্তায় একটা ভাঙা বাড়ির আড়ালে বসে মাল খাচ্ছিলাম। দেখলাম মেয়েটা গ্রীবিনের পিঠে চেপে মন্দিরের দিক থেকে আসছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া দিল। ওই হাওয়াটা না দিলে এইসব ঝামেলা পাকাতোই না, বুইলেন না, আমি তো নিজের মনে মালই টানছিলাম। কিন্তু হাওয়াতে মেয়েটার মুখে ঢাকা নেটিং সরে গেল, আর আমিও তার মুখখানা দেখতে পেলাম। ওঃ, মাইরি বলছি, মনে হল মহাকাল মন্দিরের দেওয়ালে আঁকা অপ্সরাদের একটা মন্দির থেকে নেমে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে কেমন ঝাঁ করে মনে হল, এ মালটাকে যেমন করে হোক ভোগ করতেই হবে। দরকার হলে ওর মরদটাকে খুন করতে হল করব।”

     “কেন? খুন করা এমন কী কাজ যে অত ভাবতে হবে? কোন মেয়েকে ভোগ করার আগে তার পুরুষটাকে মারতে হবে না? কোমরে তলোয়ারটা খামোখাই লটকে রাখতাম নাকি?”

     “আর দূর! এত হ্যাজাচ্ছেন কেন বলুন তো? আপনারা মানুষ মারেন না? হ্যাঁ, বুঝলাম তলোয়ারের কোপ মারেন না। কিন্তু তাও মারেন ঠিকই। টাকার জোরে মারেন, ক্ষমতার জোরে মারেন, যেন তাদেরই উপকার করছেন এমন সব ভুজুংভাজুং দিয়ে মারেন। রক্ত ঝরে না ঠিকই, তবু মানুষ মারা যায়। আমাদের মধ্যে কে বেশি বড় ক্রিমিন্যাল বলা শক্ত। খ্যা খ্যা খ্যা খ্যা।

     যাকগে। তারপর ভাবলুম চেষ্টা করে দেখি না, যদি মরদটাকে না মেরেই মেয়েটাকে তোলা যায়। তাহলে পুলিসের ঝামেলা কম হবে। কিন্তু শহরের মধ্যে হবে না, দুটোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কোন ভাবে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে যেতে।”

     “না। জঙ্গলে নিয়ে যেতে বেশি ঝামেলা হয়নি। জামাকাপড় ঝেড়েঝুড়ে সাফসুতরো হয়ে নিয়ে ভিড়ে গেলাম ওদের সঙ্গে রাস্তায়। হাঁটতে হাঁটতে নানা কথার মাঝে কায়দা করে শুনিয়ে দিলাম আমি একটা ভিন্নর বাঙ্কারের খোঁজ জানি। এতদিন জঙ্গলের মধ্যে এক যেতে সাহস হয়নি, নাহলে একজন সঙ্গী পেলে সব তুলে আনতাম। আট আনার বখরা পেলেই জায়গাটা দেখিয়ে দিতে পারি। লোভ, বুঝলেন না? খ্যা খ্যা খ্যা খ্যা লোভ! আধঘন্টা গেল না, শালা রিসলদার বাড়ির পথ ছেড়ে আমার সঙ্গে রুসোগঞ্জের রাস্তা ধরল।

     জঙ্গলের ভেতরে একটা শামুক বাঁশের ঝাড় আছে। বাঁশগুলো এত ঘন তার মধ্যে দিয়ে কষ্ট করে যেতে হয়। গ্রীবিন তার ভেতরে ঢুকবে না। মেয়েটাকে জঙ্গলের মধ্যে গ্রীবিনের পিঠে বসিয়ে রেখে আমি রিসলদারকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বাঁশঝাড়টা ঘন হলেও বেশি গভীর নয়, খানিকটা গেলেই তার পর একটা ফাঁকা জায়গা পড়ে। রিসলদার হাবাগোবা শহুরে গেরস্ত নয়, ফৌজি ট্রেনিং আছে। তাকে কব্জা করাটা সোজা নয়। তাই তাকে বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে একটা উঁচু কাঁসরপাতা গাছে দেখিয়ে বললাম বাঙ্কারের মুখটা তার তলায় আছে।

     শালা রিসলদারের তর সইল না। তাড়াহুড়ো করে বাঁশঝাড় ঠেলে এগোতে গিয়ে বাঁশের মাঝখানে গেলে ফেঁসে। সেই সুযোগে তাকে পেছন থেকে দড়িতে জড়িয়ে ফেললাম, তারপর টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে বেঁধে ফেললাম কাঁসরপাতা গাছটা্র সঙ্গে। না চেঁচাতে পারেনি। বেঁধে ফেলার পর মুখে বাঁশপাতা ঠুসে দিয়েছিলাম।

     বেঁধে ফেলার পর শামুক বাঁশের ঝাড় টপকে ফেরৎ গিয়ে রিসলদারের বউকে বললাম তার মরদকে শিঙেল সাপে কেটেছে। শুনে সে মাথার টুপি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গ্রীবিনের পিঠ থেকে নেমে কেঁদে ককিয়ে আমার সঙ্গে ছুটল। আমি তার হাত ধরে নিয়ে এলাম বাঁশঝাড়ের পেছনের জায়গাটায়।

     রিসলদার গাছের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে দেখতে পেয়েই মেয়েটা জামার ভেতর থেকে একটা ছোরা বের করে আমার গলার দিকে চালিয়ে দিল। উফ্‌ কী তেজ শালা মেয়েটার! আর একটু হলে আমার গলা দুফাঁক হয়ে যেত। লাফিয়ে সরে এসেও নিস্তার নেই, মাগীটা তেড়ে এসে আমাকে ছোরা দিয়ে কোপানোর চেষ্টা করতে লাগল।

     কিন্তু আমিও তেজপ্রতাপ। মারদাঙ্গা কম করিনি। একটা মেয়েছেলে আমার কী করবে? দু-একবার এদিক সেদিক করে ছোরার কোপ এড়িয়ে হাতটা ধরে ফেলে হাত মুচড়ে ছোরাটা কেড়ে নিলাম।

     ছোরা হারিয়ে মেয়েটা একেবারে নেতিয়ে পড়ল। সব লড়াই করার ইচ্ছেটাই মনে হল ফুরিয়ে গেল তার। তারপর তাকে ঝোপের আড়ালে টেনে নিয়ে গিয়ে—। ওঃ এমন সুখ বহুদিন পাইনি! মনে হচ্ছিল মহাকালের কোন অপ্সরাকে লাগাচ্ছি। খ্যা খ্যা খ্যা খ্যা!”

     “আরে মারছেন কেন? মারছেন কেন? আরে মস্তি কি আমি একা নিয়েছি নাকি? মেয়েটা নেয়নি? প্রথমদিকে তো খুব সতীপনা দেখিয়ে হাতপা ছুঁড়ল। তারপর একটু বাদে দেখি দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। পা দুটো কোমরের ওপরে তুলে দিয়েছে। আরও বলব নাকি রসিয়ে রসিয়ে? খ্যা খ্যা খ্যা খ্যা।”

     “দূর শালা! আবার মারে! আরে বানিয়ে বলব কেন? বানিয়ে বললে আমাকে ছেড়ে দেবেন নাকি?”

     “হ্যাঁ, ভেবেছিলাম লোকটাকে মারব না। মারতামও না। কিন্তু মেয়েটাই তো আমাকে উস্কে দিল। কাজ হয়ে যাবার পর উঠে চলে আসছি, মেয়েটা লাফিয়ে উঠে আমাকে টেনে ধরল। বলল আমি যদি তার মরদটাকে মেরে ফেলি তাহলে ও আমার সঙ্গে চলে আসবে। তার চোখ দুটো তখন জ্বলছে। আমাকে গালাগালি দিয়ে বলল দু-দুটো মরদ নিয়ে ও লোককে মুখ দেখাতে চায় না। আমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে ও তার সঙ্গে ঘর করবে।

     মেয়েটার কথা শুনে আমার মাথার মধ্যেও কেমন একটা আগুন জ্বলে উঠল। কেমন মনে হল পুরো দুনিয়াও যদি আমার উলটো দিকে দাঁড়িয়ে যায় তাতেও পরোয়া নেই। কিন্তু একে যেমন করে হোক আমার ঘরে তুলতে হবে। না, ওর শরীরটা ভোগ করার জন্যে নয়। টান যদি কেবল ওর শরীরের ওপর হত, তাহলে এক লাথ মেরে চলে যেতাম, ওর মরদের রক্তে হাত ভেজাতাম না। এ অন্য কিছু। এইরকম মনের অবস্থা আগে কোনদিন হয়নি। ঠিক করলাম রিসলদারকে মরতে হবে।”

     “না, রিসলদারকে বাঁধা অবস্থায় খুন করিনি। ওইরকম কাপুরুষ তেজপ্রতাপ নয়। রিসলদরের বাঁধন খুলে দিয়ে তাকে বললাম তরোয়াল হাতে আমার মোকাবিলা করতে।

     কোমর থেকে ইস্পাত কাঁচের তলোয়ারখানা টেনে নিয়ে রিসলদার আমায় আক্রমণ করল। তলোয়ার তুলে আমি ঠেকালাম তাকে। তারপর নাচের মতন মাপা ছন্দে পরস্পরকে আক্রমণ করতে লাগলাম আমরা। তলোয়ারের ঠোকাঠুকিতে ছিটকোতে লাগলো আগুনের ফুলকি। এর আগে কোনওদিন কেউ বিশবারের বেশি তেজপ্রতাপের তলোয়ারের মার আটকাতে পারেনি। আর এই রিসলদার তেইশবার রুখে দিল আমার আক্রমণ। কিন্তু চব্বিশবারের বার আমার তলোয়ারের ফলা গেঁথে গেলে রিসলদারের বুকে, তার রক্তাত্ত দেহটা গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।

     তারপর কোথায় একটা চিলবেড়াল চিৎকার করে উঠল। হাতে রক্তমাখা তলোয়ার নিয়ে চারপাশে তাকালাম। কিন্তু মেয়েটাকে কোথাও দেখতে পেলাম না।

     রিসলদারের তলোয়ার, লঞ্চার আর মিসাইল কাঠির তূণীরটা নিয়ে শামুক বাঁশের ঝাড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। জঙ্গলের মধ্যে গ্রীবিনটা একাই চরে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু তার কাছেও মেয়েটাকে দেখতে পেলাম না।”

     “ছোরাটা? ছোরাটার কথা এইসব ঝামেলায় ভুলেই গিয়েছিলাম। মনে থাকলে ওটাও নিয়ে নিতাম। বেচলে দু-পয়সা হত।”

     “তারপর? তারপর আর কী! শহরে এসে রিসালদারের তলোয়ারটা বেচে দিয়ে যা টাকা পেলাম সেই দিয়ে ভরপেট মাল খেলাম। প্লেটোগড়ের কাছে যুদ্ধ লেগেছে। ভাবলাম গ্রীবিনটা সেখানে গিয়ে বেচলে ভাল দাম পাব। সেদিকেই যাছিলাম। কিন্তু শুঁড়ির বাচ্ছা মদে কী মিশিয়েছিল কে জানে, শরীর খারাপ হয়ে সাঁকোর কাছে পড়ে গেলাম।

     নিন গল্প শেষ, এবার কী করবেন করে ফেলুন।”

 

—মঙ্গলদেউড়ি—

দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির জল এসে পড়ে দেউড়ির ভেতর, ভিজে যায় ভিক্ষুর বসন। কিন্তু তবু আপনমনে বাইরের দুর্য্যোগের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে সে।

     আগুনের দিকে তাকায় পথিক— “চোরডাকাতের কথা কি আর বিশ্বাস করা চলে? রিসলদারের বউকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো আসল কথাটা জানা যেত। কিন্তু তাকে কি আর পাওয়া যাবে? তেজপ্রতাপ হয়তো তাকে খুন করে কোথাও পুঁতে দিয়েছে।”

     মৃদু ঘাড় নাড়ে পুরাখনক— “না। খুন হয়নি। পাওয়া গেছে।”

     অবাক চোখে তাকায় পথিক— “পাওয়া গেছে? কোথায় পাওয়া গেল?”

     “মহাকাল মন্দিরের পেছনে কাঠগোলায় লুকিয়ে ছিল।” জবাব আসে ভিক্ষুর কাছ থেকে “তেজপ্রতাপ যখন জবানবন্দী দিচ্ছে, তখন কন্সটেবেলরা কোতোয়ালীতে ধরে নিয়ে আসে।”

     “সব ঝুট!” কেমন রাগতস্বরে গর্জে ওঠে খনক “সব মিথ্যে কথা। তেজপ্রতাপ আর ওই রিসলদারের বউ, দুজনেই মিথ্যে কথা বলছে।”

     “হুঁহ্‌!” ব্যাঙ্গের শব্দ করে পথিক “মানুষ মাত্রেই মিথ্যে কথা বলে। অন্যের কথা ছাড়ো, আর্ধেক সময় মানুষ নিজেই নিজেকে মিথ্যে কথা বলে।”

     বৃষ্টির দিক থেকে নজর ফেরায় ভিক্ষু— “মানুষ দুর্বল। তাই মিথ্যে কথা বলে। অন্যকে। নিজেকেও।”

     “দুত্তোর!” বিরক্ত হয় পথিক, “জ্ঞান দেবেন না তো সুতপ। যা শুনেছেন সেইটা খুলে বলুন তো! মেয়েটা কী বলল?”

     “মেয়েটা? মেয়েটা যা বলল তার সঙ্গে তেজপ্রতাপ যা বলেছিল তার কোন মিল নেই।”

     দমকা হাওয়ায় উড়ে এসে জলের ঝাপটা আর একবার ভিজিয়ে দেয় ভিক্ষুর পোষাক।

 

দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া মণীষা নামক মহিলার জবানবন্দী

“হ্যাঁ হুজুর! ওই নীল জামা পরা লোকটাই জোর করে আমাকে—। কত কাকুতি মিনতি করলাম, পায়ে পড়লাম তাও শুনল না। টেনে হিঁচড়ে আমাকে মাটিতে ফেলে—!”

     (কান্নার শব্দে এর পরের কথা চাপা পড়ে গেছে )

     “আমার ওপর জবরদস্তি করার পর লোকটা বুক চাপড়ে বলল ওর নাম তেজপ্রতাপ। আমার নাকি অনেক সৌভাগ্য যে আমাকে ও ভোগ করেছে।”

     “উত্তরে কিছু বলিনি। কারণ একটু দূরে দেখলাম একটু দূরে গাছের সঙ্গে বাঁধা আমার স্বামী ছটফট করছে। দড়ি দিয়ে এমন কষে বাঁধা যে একটু নড়ার উপায় নেই।”

     “না হুজুর আমি ছাড়াইনি। ছাড়াব বলে ছুটে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এই লোকটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর আমার স্বামীর কোমর থেকে তলোয়ারটা খুলে নিয়ে হাসতে হাসতে জঙ্গলে ঢুকে গেল।”

     “হ্যাঁ হুজুর, আমি উঠে স্বামীর বাঁধন ছাড়াতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকাতে থমকে গেলাম। দেখলাম এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টিতে রাগ নেই, দুঃখ নেই, খালি অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা ঘৃণা ঝরে পড়ছে। তার সেই ভয়ানক দৃষ্টির কথা মনে পড়লে এখনও আমার রক্ত জমে যায় হুজুর।”

     “চিৎকার করে বললাম তুমি আমায় মারো, মেরে ফেলো। কিন্তু দোহাই তোমার ওইভাবে আমার দিকে তাকিয়ো না। কোন উত্তর দিল না হুজুর।”

     “একটু দূরে দেখলাম আমার ছোরাটা পড়ে আছে। না হুজুর, কেনা নয়, পারিবারিক সম্পত্তি। হ্যাঁ হুজুর দামী। পৃথিবী থেকে আনা। হাতলে মুক্তোর কাজ করা।”

     “বাঁধন খুলে দিয়ে ছোরাটা ওর দিকে বাড়িয়ে বললাম, এতই যদি তুমি আমাকে ঘেন্না কর, তাহলে নাও, এইটা দিয়ে শেষ করে দাও আমায়। কোন উত্তর দিল না হুজুর, সেই একভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বসে রইল।”

     “তার পর আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি হুজুর। মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরল দেখলাম আমার স্বামীর শরীরটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। জামা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, বুকে ছোরাটা গাঁথা।”

     “জঙ্গলেই আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলাম হুজুর, মরতে পারিনি। কাঠগোলায় লুকিয়ে ছিলাম কেন? ভেবেছিলাম রাত হলে কাঠ জড় করে নিজের গায়ে আগুন দেব, তাই ওখানে লুকিয়েছিলাম। এ জীবন নিয়ে আমি আর কী করব হুজুর?”

     (কান্নার শব্দে বাকি কথা চাপা পড়ে গেছে )

 

—মঙ্গলদেউড়ি—

অঝোরে ঝরে পড়ে বৃষ্টি। ভিজে হাওয়ার ঝাপটায় উষ্ণতা কমে এসেছে অনেকটাই। আগুনের আঁচের পাশে এসে বসে ভিক্ষু।

     ভিক্ষুর মুখের দিকে তাকায় পথিক— “যাব্বাবা! যত শুনছি তত সব গুলিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য মেয়েদের কথাও সবসময়ে বিশ্বাস করা যায় না। কেঁদেকেটে একসা করে। অন্যকেও ভুল বোঝায়, নিজেদেরও ভুল বোঝায়।”

     কড়কড় শব্দে বাজ পড়ে কোথাও। উঠে গিয়ে দেওয়ালের কাঠের প্যানেল ভেঙে এনে পড়ন্ত আঁচে গুঁজে দেয় পথিক।

     “রিসলদারের মুখ থেকে যদি ঘটনাটা শোনা যেত, তাহলে হয়তো সত্যিটা বোঝা যেত।”

     আগুনের লালচে আলো পড়ে ভিক্ষুর মুখে— “তাও শোনা গেছে!”

     বিষ্ফারিত চোখে পথিক তাকায় ভিক্ষুর দিকে— “কী করে? সে তো মরে গেছে! তার মুখ থেকে কিছু শোনা গেল কী করে?”

     “ভিন্নর টেকনোলজি। অন্তিম সময়ের চিন্তাগুলো মস্তিষ্কের টিস্যুতে যে ছাপ ফেলে যায়, তাকে রূপ দেয়।”

     “মিথ্যে কথা! সব মিথ্যে কথা!” চিৎকার করে ওঠে পুরাখনক।

     দুদিকে মাথা নাড়ায় ভিক্ষু— “না, মৃত মানুষ মিথ্যে বলতে যাবে কেন? মানুষের মধ্যে কি এতটুকু সততা থাকবে না?”

     “ফুঃ!” মুখে আওয়াজ তোলে পথিক, “একটা কথা বলুন তো সুতপ, মানুষের মধ্যে সততা বলে সত্যি কি কিছু থাকে? নাকি মানুষের খারাপটা চাপা দেওয়ার জন্যে আপনারা এসব গল্প বানান। তাতে জীবনটা আর একটু সরল হয়ে যায়, তাই না?”

     চোখ নিচু করে মাথা নাড়ে ভিক্ষু— “ভুল! ভুল!”

     ব্যাঙ্গের হাসি হাসে পথিক— “আপনার যেমন অভিরুচি! যাকগে, বাদ দিন! মরা লোকটার বলা গল্পটা শোনা যাক বরং।”

     বিদ্যুতের আভায় আবার ঝলসে ওঠে আকাশ।

(** গোপনীয়তার স্বার্থে অপসারিত **) নামক ভিন্নর প্রযুক্তির ব্যবহার দ্বারা প্রাপ্ত দৌলতনগরের পুলিস কমিশনারকে দেওয়া মৃত রিসলদার সুশান্তের জবানবন্দী

     নোট ১: মৃতদেহের মাথায় বসানো ধাতব পটিতে দ্রূত আলোক সঞ্চারণ। মৃত শরীরে স্পন্দন ও কম্পন।

     নোট ২: স্পীকারের কড়কড় আওয়াজ ক্রমে মানুষের কণ্ঠস্বরে রূপান্তরিত। প্রথমে হাহাকার, তার পর দুর্বোধ্য ভাষা, এবং সবশেষে কথোপকথন।

     “এত অন্ধকার কেন? আমার শরীর কোথায়? ওঃ কী যন্ত্রণা!”

     (আবার হাহাকার )

     “দেখলাম আমার বউকে ধর্ষণ করার পর ডাকাতটা তাকে মিষ্টি কথায় কী বোঝাচ্ছে। আমি গাছে বাঁধা। কী করতে পারি? তবু মাথা ঝাঁকালাম, চোখ টিপলাম। যাতে আমার বউ ওর কথায় না ভোলে। কিন্তু কিচ্ছু হল না। দেখলাম সে মন দিয়ে জানোয়ারাটার কথা শুনছে। ভেতরটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল।”

     (আবার হাহাকার )

     “শুনতে পেলাম ডাকাতটা আমার বউকে বলছে ‘এর পর তোকে আর তোর মরদ ঘরে নেবে না। তার চাইতে তুই আমার সঙ্গে চল।’ না, কোন প্রতিবাদ করল না আমার বউ। সুন্দর মুখটা তুলে তাকাল কেবল একবার। যেন কোন ঘোরের মধ্যে আছে। আমার বুকটা ভালবাসায় মুচড়ে উঠল।”

     “কিন্তু কী বলল আমার বউ? কী বলল ডাকাতটাকে?”

     “বলল ‘চলো তাহলে, যাই।’ শুনে আমার বুকে ভেঙে গেল! বুক ভেঙে গেল!”

     “তারপর? তারপর ডাকাতটার হাত ধরে আমার বউ আমাকে ফেলে চলে যেতে লাগল! ওঃ! আমার বুকে ভেঙে গেল! বুক ভেঙে গেল!”

     (আবার হাহাকার )

     “না! না! এখানেই শেষ নয়! এখানে শেষ হলে এত যন্ত্রণা পেতাম না। চলে যেতে যেতে আমার বউ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর আমার দিকে আঙুল তুলে বলল ‘ওকে মের ফেল, না হলে তোমার সঙ্গে যেতে পারব না।’ তারপর পাগলের মতো চিৎকার করতেই থাকল, ‘মের ফেল! মের ফেল! ওকে মেরে ফেল!’ ওঃ! কথাগুলো ভাবলেই মনে হচ্ছে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি! ওঃ!”

     (আবার হাহাকার )

     “এরকম নিষ্ঠুর কথা কোনদিন কোন মানুষ কানে শুনেছে? ডাকাতটা পর্যন্ত কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। দুহাতে তাকে আঁকড়ে আমার বউ আমাকে মারার কথা বলে চিৎকার করতে লাগল।”

     “না ডাকাতটা তাকে কোন উত্তর দিল না। উলটে এক ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর আমার কাছে এগিয়ে এসে বুকের ওপর দুহাত রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘বলো কী চাও? একে বাঁচিয়ে রাখতে চাও? না মেরে ফেলতে চাও? যদি মারতে বলো, তো এখুনি এটাকে খুন করে ফেলব!’ ওঃ! শুধু এইটুকু বলার জন্যে আমি ডাকাতটাকে ক্ষমা করে দিতে পারি। ওঃ!”

     “আমি কিছু বলার আগেই আমার বউ একবার চিৎকার করে উঠল। তারপর ছুটে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে গেল। ডাকুটা তাকে হাত বাড়িয়েও ধরতে পারল না।”

     “ডাকাত আমার কাছে এসে আমার কোমর থেকে তলোয়ারটা খুলে নিল। আমার লঞ্চার আর মিসাইল কাঠির তূণীরটাও উঠিয়ে নিল। তারপর এক কোপে আমার বাঁধনটা কেটে দিয়ে মিলিয়ে গেল জঙ্গলে।”

     “কোথায় একটা চিলবেড়াল ডেকে উঠল। তারপর থেমে গেল সব শব্দ। সব? না, না। সব শব্দ নয়। কানে ভেসে আসছিল একটা কান্নার আওয়াজ।”

     “দড়ির বাঁধন খুলে ফেললাম। বুঝতে চেষ্টা করলাম কে কাঁদছে।”

     “কে কাঁদছে?”

     “কে কাঁদছে?”

     “ওঃ! কে কাঁদছে?”

     “বুঝতে পারলাম আর কেউ নয়। আমি! আমি নিজেই কাঁদছি!”

     (আবার হাহাকার )

     “গাছের গোড়া থেকে শরীরটাকে হিঁচড়ে সামনে দিকে নিয়ে গেলাম। মাটির ওপর চকচকে কী পড়ে ওটা?”

     “হাতে তুলে নিলাম। আমার বউয়ের ছোরাটা। কেনা নয়। পারিবারিক সম্পত্তি। দামী। পৃথিবী থেকে আনা। হাতলে মুক্তোর কাজ।”

     “ছোরাটা তুলে বিঁধিয়ে দিলাম নিজের বুকে। গলায় একদলা রক্ত উঠে এল, কিন্তু আর কোন ব্যাথা অনুভব করলাম না।”

     “তারপর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সব নিথর, নীরব। চোখে পড়ে কেবল মাথার ওপর গাছের পাতার পেছনে একটা পান্ডুর আলোর প্রলেপ।”

     “ধীরে ধীরে নিভে এল সে আলোটুকুও। এক গভীর, নিবিড় নীরব অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমি।”

     “তারপর কে একজন এল। কে? কে? দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম না। আমার চারপাশে তখন কেবলই অন্ধকার। আগন্তুক অদৃশ্য হাতে যত্ন করে আমার বুক থেকে টেনে নিল ছোরাটা। ওঃ! ওঃ! আর একবার রক্তের স্বাদ পেলাম গলায়। তারপর ডুবে গেলাম আরও গাড় এক নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে।”

     (আবার হাহাকার )

 

—মঙ্গলদেউড়ি—

আগুনের পাশ থেকে ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতন ছিটকে যায় পুরাখনক— “মিথ্যে কথা! সব মিথ্যে কথা! ছোরাটোরা কিচ্ছু ছিল না। তলোয়ারের আঘাতে মারা গিয়েছিল লোকটা।”

     ধীরে ধীরে খনিকের দিকে মাথা ঘোরায় পথিক। ভ্রূদুটো কপালে উঠে যায় তার, তির্যক হাসিতে বেঁকে যায় ঠোঁট— “হুঁ! গল্পে নতুন প্যাঁচ দেখছি! মনে হচ্ছে তুমি সমস্ত ঘটনাটা দেখেছ? কী সত্যি কি না?”

     নীরবে ওপর নিচে মাথা দোলায় পুরাখনিক। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় ভিক্ষু।

     উঠে গিয়ে পুরাখনিকের কাঁধে হাত রাখে পথিক— “তাহলে কোতোয়ালীতে বলোনি কেন?”

     দুহাতে মুখ ঢেকে ঝুঁকে পড়ে খনিক— “আমি—আমি এর মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চাইনি!”

     “বেশ তো! ভাল কথা! তা আমাদের বলতে তো বাধা নেই? বলো না!”

     উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে পুরাখনক।

     তার কাঁধে আলতো করে ঝাঁকুনি দেয় পথিক— “আরে বলো না! বলেই ফেলো। গল্পটা এবারে বেশ জমে উঠেছে।”

     “আমি শুনতে চাই না!” প্রায় চিৎকার করে ওঠে ভিক্ষু, “এই সব ভয়ানক গল্প আমি আর শুনতে চাই না!”

     “ভয়ানক কোথায়, সুতপ?” বাঁকা হাসি হাসে পথিক, “এ সব তো আজকাল জলভাত! শোনেননি? প্লেটোগড়ের যুদ্ধে মানুষের কাণ্ডকারখানা দেখে আজকাল জলশকুনগুলো পর্যন্ত নিরামশাষী হয়ে গেছে।”

     পুরাখনকের কাঁধ ধরে আবার ঝাঁকায় পথিক— “বলো না, সেদিন আর কী দেখেছিলে?”

     দেউড়ির বাইরে অঝোরে ঝরতে থাকা জলের ধারার দিকে তাকায় পুরাখনক। কোথায় দূরে একটা গ্রীবিন ডেকে ওঠে।

     “সেদিন জঙ্গলের ভেতর প্রথমে মেয়েটার টুপিটা দেখতে পাই। তারপর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা শামুকবাঁশের ঝাড় চোখে পড়ল। আলো পড়ে বাঁশের সাদা খোলসগুলো চকচক করছে।”

     “তারপর?”

     “বাঁশ ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। শুনেছিলাম বাঁশ ঝাড়ের পেছন একটা ফাঁকা জায়গায় ভিন্নর বাঙ্কার আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগে মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। বাঁশের ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম, মনে হলে কোন নাটকের মহড়া চলছে।”

     “কী দেখলে?”

     “দেখলাম মাটির ওপর একটা মেয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে। আর তার একটু দূরে একটা কাঁসরপাতা গাছের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে একটা লোক।”

     পুরাখনকের জামাটা টেনে ধরে পথিক— “ওরেঃ শালা! তবে যে বললে তুমি লোকটার লাশ দেখেছ?”

     এক ঝটকায় পথিকের হাতটা টেনে সরিয়ে দেয় পুরাখনক। তার গলার স্বর চড়ে যায় কয়েক পর্দা— “বললাম না, আমি এর মধ্যে জড়াতে চাইনি!”

     “আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে!” তাকে আশ্বস্ত করে পথিক, “তারপর কী হল বলো। তেজপ্রতাপ কী করছিল?”

     “তেজপ্রতাপ? তেজপ্রতাপ মাটিতে বসে মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইছিল।”

 

—বেণুবন—

বাঁশে ঝাড়ের আড়াল থেকে সবই চোখে পড়ে খনকের।

     মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদে মণীষা। আর তার পাশে বসে অনুনয় বিনয় করে তেজপ্রতাপ।

     “মাইরী বলছি, তোকে একবার পেয়ে টান কমেনি। উলটে বারবার পাওয়ার ইচ্ছেটা বেড়ে উঠেছে। চল, আমার সঙ্গে চল! আমার আউরত হবি!”

     উত্তর দেয় না মণীষা। ফোঁপাতে থাকে মাটিতে শুয়ে।

     হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে তেজপ্রতাপ— “এই দেখ, ডাকু তেজপ্রতাপ, যার ভয়ে লোকে কাঁপে, তোর কাছে হাঁটু গেড়ে ভিক্ষে চাইছে। তুই যদি চাস, আমি ডাকাতি করা ছেড়ে দেবে। এতদিন যা জমিয়েছি তাই দিয়েই তোকে রাণীর হালে রাখব।”

     উত্তর দেয় না মণীষা। তার পিঠের ওপর আলতো করে হাত রাখে তেজপ্রতাপ— “আমার ডাকাতির পয়সা নিবি না? পরোয়া নেহি! রাস্তায় রাস্তায় মাল ফিরি করে তোকে খাওয়াব। তুই যা বলবি, তাই করতে আমি রাজী আছি। তুই শুধু বল তুই আমার সঙ্গে যাবি!”

     তাও উত্তর দেয় না মণীষা, মাটিতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে আগের মতোই।

অনুনয় ছেড়ে ভয় দেখায় তেজপ্রতাপ— “দেখ, তুই যদি আমার সঙ্গে না আসিস, তাহলে কিন্তু আমার তোকে খুন করা ছাড়া কোন রাস্তা থাকবে না। হ্যাঁ বল। বল, হ্যাঁ!”

     কান্না ছাড়া কোন উত্তর আসেনা মণীষার থেকে।

     দুহাতে ধাক্কা দেয় তেজপ্রতাপ মণীষাকে। তার কন্ঠস্বরে উষ্মার ছোঁয়া লাগে— “এই, কান্না থামা! চুপ কর! চুপ কর! বল আমার সঙ্গে যাবি! বল হ্যাঁ!”

     মাটি থেকে ছিটকে উঠে বসে মণীষা— “আমি কী বলব? আমি মেয়েছেলে হয়ে কিছু বলতে পারি? কিচ্ছু বলব না আমি!”

     লাফিয়ে উঠে ছুটে যায় মণীষা। মাটিতে পড়ে থাকা একটা ছোরা কুড়িয়ে নিয়ে, তার এক টানে কেটে ফেলে সুশান্তর বাঁধন। তারপর আবার দৌড়ে সরে গিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।

     একটা বাঁকা হাসি খেলে যায় তেজপ্রতাপের মুখে— “ও, বুঝেছি! তুই চাস ফয়সালাটা পুরুষমানুষ পুরুষমানুষেই হোক!”

     কোমরে বাঁধা তলোয়ারের হাতলে হাত রাখে তেজপ্রতাপ। ধীর পায়ে সুশান্তর দিকে এগিয়ে যায় শিকারী বেড়ালের মতন।

     উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বাধা দেয় সুশান্ত— “দাঁড়া! এসবের কোন দরকার নেই। এই মাগীটার জন্যে আমার প্রাণ খোয়ানোর কোন ইচ্ছে নেই।”

     ভুরু কুঁচকে সুশান্তর দিকে তাকায় তেজপ্রতাপ। দৃষ্টিতে তার খেলা করে বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা দুইই।

     ধীরে ধীরে উঠে বসে মণীষা তাকায় সুশান্তর দিকে। বিস্ময় লেগে তার চোখেও।

     মণীষার দিকে কয়েক পা এগিয়ে আসে সুশান্ত— “কী মনে করেছিস, ঝোপের আড়ালে কী হয়েছিল দেখতে পাইনি বলে কানেও শুনতে পাইনি?। খানকি মাগী, কটা পুরুষমানুষের সঙ্গে শুবি তুই? মর তুই, মর!”

     তেজপ্রতাপের দিকে ফেরে সুশান্ত— “এই বেহায়া বেশ্যাটাকে আমার আর কোন দরকার নেই। চাইলে তুই নিয়ে যা সঙ্গে করে। এর চাইতে আমার কাছে আমার গ্রীবিনটা বেশি দরকারি।”

     সুশান্ত আর তেজপ্রতাপের মাঝখানে মাটিতে বসে থাকে মণীষা, হতভম্বের মতন তাকাতে থাকে দুজনের মুখের দিকে।

     সুশান্তর মুখে দিকে তাকিয়ে থাকে তেজপ্রতাপ। মণীষার মুখের দিকে তাকিয়েও ভাবে কিছুক্ষণ। তারপর পেছন ফিরে হাঁটা দেয় জঙ্গলের দিকে।

     মাটি থেকে লাফিয়ে উঠে তাকে পেছন থেকে টেনে ধরে মণীষা— “যাস না!”

     তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় তেজপ্রতাপ— “ছাড়! ছাড়! আমার পেছন পেছন আসিস না।”

     মাটিতে মুখ গুঁজে আবার ফোঁপাতে শুরু করে মণীষা।

     তার দিকে এগিয়ে আসে সুশান্ত— “চুপ কর! বন্ধ কর তোর নাকি কান্না! ওসবে আর কোন কাজ হবে না!”

     সুশান্তকে বাধা দেয় তেজপ্রতাপ— “এই! ওর ওপর অত মেজাজ দেখাস না। মেয়েরা এমনিতেই কমজোরী।”

     হঠাৎ একটা বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে মণীষার গলা থেকে। সে চিৎকার করে বলে ওঠে— “কমজোরী? কমজোরী তো তোরা রে!”

     উঠে দাঁড়িয়ে সুশান্তর মুখের কাছে মুখ নিয়ে আসে মণীষা— “তুই যদি আমার মরদ হোস, তাহলে যে আমার ইজ্জত নিল তাকে মারছিস না কেন? তাকে মেরে তারপরে না হয় আমায় বলতিস মরে যেতে? তাহলে অন্ততঃ বুঝতাম তুই পুরুষমানুষ, হিজড়ে নোস!”

     জ্বলন্ত চোখে তেজপ্রতাপের দিকে তাকায় মণীষা— “আর তুই? তুই কোন পুরুষমানুষ রে? তুই যে তেজপ্রতাপ জানতে পারার পর আর কাঁদিনি। ভেবেছিলাম যাক, আমার এই মেকি জীবন থেকে তেজপ্রতাপ হয়তো আমায় নিষ্কৃতি দেবে। এই বন্দীদশা থেকে আমায় মুক্তি দিলে ও যা চাইবে তাতেই আমি রাজী।”

     তেজপ্রতাপের মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয় মণীষা— “কিন্তু তুই! তুই তো দেখছি আমার এই মরদটার মতনই দুপয়সার মাল। শালা হিজড়ে।”

     মাথা নিচু করে আড়চোখে মণীষার দিকে তাকিয়ে থাকে তেজপ্রতাপ। মণীষার বাক্যবাণ যে তার কোন দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে, তার মুখের ভঙ্গী দেখে সে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না।

     ছিটকে সরে যায় মণীষা। একটা ভয়ানক অট্টহাসি বেরিয়ে আসে তার গলা দিয়ে— “মনে রাখিস, মেয়েরা সেই পুরুষকেই ভালবাসে যে তাকে জান বাজী রেখে ভালবাসতে পারে। মরদকে মেয়েছেলেকে নিজের করতে হয় তলোয়ারের জোরে।”

     পাণ্ডুর মুখে পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে তেজপ্রতাপ আর সুশান্ত। তারপর তলোয়ার টেনে বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে বাড়িয়ে ধরে দুজনেই।

     সুশান্তর দিকে তলোয়ার চালায় তেজপ্রতাপ। ছিটকে সরে গিয়ে দৌড়ে পালায় সুশান্ত। তাকে তাড়া করে তেজপ্রতাপ। ছুটে পালাতে গিয়ে পড়ে যায় সুশান্ত। মাটিতে বসে তলোয়ার চালায় এলোপাথাড়ি।

     সুশান্তর দিকে ছুটে আসতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তেজপ্রতাপ। মাটি থেকে উঠে তার দিকে তেড়ে যায় সুশান্ত। কোনওমতে উঠে এবার দৌড়ে পালায় তেজপ্রতাপ।

     তার বেশি কাছে আসার চেষ্টা করে না সুশান্ত, নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে তলোয়ারের ঘোরায়। দূরে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় তলোয়ারের কোপ মারে তেজপ্রতাপও।

     হঠাৎ আবার তেড়ে যায় তেজপ্রতাপ। খানিকদুর দৌড়ে পালায় সুশান্ত, তারপর সেও আবার উলটে তেড়ে যায়। দূরে সরে গিয়ে এলোপাথাড়ি তলোয়ার চালাতে থাকে তেজপ্রতাপ।

     এই অদ্ভুত অনিচ্ছার অসিযুদ্ধ চলতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। কারোর চোট লাগে না, রক্তে ঝরে না, তলোয়ারে তলোয়ারে ঠোকাঠুকি হয় না। অস্ত্রের কোপ পড়ে কেবল হাওয়ায়, ঝোপের ওপর, গাছের গায়ে।

     কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন হয়। এলোপাথাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে সুশান্তর তলোয়ার আটকে যায় একটা গাছের গুঁড়িতে। টানাটানি করেও সেটা খুলে উঠতে পারে না সুশান্ত।

     সুযোগ দেখে তার দিকে তেড়ে আসে তেজপ্রতাপ। তলোয়ার ফেলে রেখে দৌড়য় সুশান্ত, কিন্তু বেশি দূর যেতে পারে না, পা আটকে পড়ে যায় একটা ঝোপের ভেতর।

     তার কাছে ছুটে এসে হাঁপাতে থাকে তেজপ্রতাপ, তাকে লক্ষ্য করে উঁচিয়ে ধরে তলোয়ার।

     আর্তস্বরে চিৎকার করে ওঠে সুশান্ত— “আমি মরতে চাই না।”

     তেজপ্রতাপের কানে যায় না সে আকুতি। হাঁপাতে হাঁপাতেই সে সুশান্তর বুকে বসিয়ে দেয় তলোয়ারের ফলাটা।

     সুশান্তর জামা ভিজে যায় রক্তে, গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে একটা ঘড়ঘড় শব্দ। চোখ দুটো খোলা রেঝেই তার মাথাটা হেলে যায় পেছনের দিকে।

     কোথায় তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে একটা চিলবেড়াল।

     পেছন দিকে ছিটকে যায় তেজপ্রতাপ। ভয়ার্ত চোখে খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকে সুশান্তের প্রাণহীণ দেহটার দিকে। তারপর পড়িমড়ি করে ছুটে যায় মণীষার দিকে।

একটা আতঙ্কের চিৎকার করে কয়েক পা পিছিয়ে যায় মণীষা। দুহাত বাড়িয়ে তাকে ধরার চেষ্টা করে তেজপ্রতাপ, আবার চিৎকার করে তার হাত ঠেলে সরিয়ে মণীষা।

     আবার তার দিকে হাত বাড়ায় তেজপ্রতাপ, আবার চিৎকার করে হাত ঠেলে দিয়ে সরে যায় মণীষা।

     এবার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে তেজপ্রতাপের। গাছের গুঁড়িতে গেঁথে থাকা সুশান্তের তলোয়ারটা নিয়ে তেড়ে যায় তার দিকে।

     একটা আর্তনাদ করে ছুটে পালায় মণীষা। মিলিয়ে যায় জঙ্গলের গভীরে।

     ঝুঁকে পড়ে খানিক্ষণ হাঁপায় তেজপ্রতাপ। তারপর একে একে কুড়িয়ে নেয় সুশান্তর লঞ্চার আর মিসাইল কাঠির তূণীর, সুশান্তের লাশের বুক থেকে খুলে নেয় তলোয়ার।

     নিজের তলোয়ারটা খাপে ঢুকিয়ে নিয়ে শামুক বাঁশের ঝাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় তেজপ্রতাপ।

 

—মঙ্গলদেউড়ি—

উচ্চকণ্ঠে হাসতে শুরু করে পথিক। তার হাসির শব্দে গমগম করে আধাঅন্ধকার দেউড়ি।

     “আচ্ছা, এটাই নাকি আসল ঘটনা! এ তো দেখছি গল্পের আর একটা নতুন অবতার।”

     “আমি মিথ্যে কথা বলি না!” রাগতস্বরে প্রতিবাদ করে পুরাখনক, “নিজের চোখে যা দেখেছি, তাই বললাম।”

     হাসি থামে না পথিকের, “হা হা হা, বললেই হল?”

     “যা সত্যি তাই বলেছি! আমি মিথ্যে কথা বলি না।” গলার স্বর এক পর্দা চড়ে খনকের।

     পথিকের কন্ঠস্বরে ব্যাঙ্গের ছোঁয়া লাগে, “হ্যাঁ, তুমি ছাড়া দুনিয়াশুদ্ধু লোক মিথ্যে কথা বলছি বলে তারপর মিথ্যে কথা বলে ।”

     “জঘন্য!” হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে ভিক্ষু।” কেউ যদি কাউকে বিশ্বাসই না করে, তাহলে এই দুনিয়া আর নরকে তফাৎ কী রইল?”

     “কোন তফাৎ নেই!” উত্তর আসে পথিকের কাছে থেকে “এটাই নরক। আমরা নরকেই বাস করছি।”

     “আমি মানি না। আমি মানুষেকে বিশ্বাস করতে চাই!” চেপে রাখা কান্নায় কেঁপে যায় ভিক্ষুর কণ্ঠস্বর, “এই দুনিয়াটা নরকের মতো হোক আমি চাই না।”

পথিকের অট্টহাস্য আবার ছড়িয়ে যায় দেউড়ির মধ্যে।

     “ওই সব কান্নাকাটিতে কোন লাভ নেই সুতপ! নিজেই ভেবে দেখুন না, যে কটা গল্প শুনলেন তার কোনটা বিশ্বাস করবেন আপনি?”

     ফের উচ্চকণ্ঠে হাসে পথিক, “মানুষ যে কেন কিছু করে তা আদৌ বোঝা সম্ভব নয় সুতপ। বুঝলেন?”

চুপ করে যায় ভিক্ষু, হাঁটুর ওপরে মাথা রেখে তাকিয়ে থাকে বাইরের বৃষ্টির দিকে।

     দেউড়ির দেওয়ালে হেলান দিয়ে নীরবে বসে থাকে পুরাখনকও। তার দৃষ্টি হারিয়ে গেছে কোথাও।

     দূরে আবার কোথাও একটা গ্রীবিন ডেকে ওঠে। আগুনের কাঠগুলো নেড়েচেড়ে উস্কে দিতে থাকে পথিক।

     অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মধ্যে ভগ্নপ্রায় দেউড়ির মধ্যে নিজেদের চিন্তায় ডুবে বসে থাকে তিনটে মানুষ। বাইরে ঝলসে উঠতে থাকে আকাশ, অঝোরে ঝরতে থাকে জলের ধারা।

     নীরবে কেটে যায় অনেকটা সময়।

     হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ ঘণ্টাধ্বনিতে ডুবে যায় বৃষ্টির শব্দ। বোঝা যায় কাছেই কোথাও একটা অ্যালার্ম বাজছে।

     চমকে লাফিয়ে ওঠে তিনটে মানুষ, বুঝতে চেষ্টা করে শব্দের উৎস।

     খুঁজে পেতে দেরি হয় না। আওয়াজ আসছে দেউড়ির দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নিচ থেকে।

     ছুটে যায় তিনজনেই। সবার আগে পথিক।

     সিঁড়ির নিচে রাখা একটা ছোট লম্বাটে বাক্সের গায়ে দপদপ করে লাল হলুদ জ্বলে। আর তার থেকে বেরিয়ে আসে অ্যালার্মের ঘণ্টার মতো আওয়াজ।

     বাক্সটাকে টেনে বের করে আনে পথিক। তার হাতের স্পর্শে নিভে যায় আলো, থেমে যায় অ্যালার্মের আওয়াজ।

     বিস্মিত কন্ঠে পথিক বলে, “এম্ব্রিও প্যাক!”

     নিচু হয়ে ঝুঁকে দেখে ভিক্ষু। কাঁচের ঘেরাটোপ দেওয়া কালো রঙের বাক্স, তার গায়ে বসানো আলো, সুইচ আর মিটারের সারি। মানব শরীর থেকে ভ্রূণ স্থানান্তররিত করতে ব্যাবহার করা হয় এই যন্ত্রের।

     একটা মিটার ভাল করে দেখে ভিক্ষু, চার্জ শেষ হয়ে আসছে। দশ বারো ঘণ্টার মধ্যে এটাকে ইনকিউবেটরে না ঢোকালে ভেতরের ভ্রূণটা মরে যাবে।

     এক ধাক্কায় ভিক্ষুকে ঠেলে সরিয়ে দেয় পথিক। হাত বাড়িয়ে চাপ দেয় একটা সুইচে। খুট্‌ শব্দ করে বাক্সের গা থেকে বেরিয়ে আসে একটা সরু ড্রয়ার। তার ভেতরে শোয়ানো একসারি কাঁচের অ্যাম্পুল। ভ্রূণকে বড় করার জন্যে প্রয়োজনীয় গ্রোথ হরমোন।

     বিনাবাক্যব্যায়ে অ্যাম্পুলগুলোকে পকেটে পুরতে আরম্ভ করে পথিক!

     “এই! এই শালা! কী করছিস?” লাফিয়ে এসে তাকে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরে পুরাখনক। বাক্সটা দুহাতে ধরে একদিকে সরে যায় ভিক্ষু।

     এক ঝটকায় খনকের হাত ঠেলে সরিয়ে দেয় পথিক।

     “তাতে তোর কী?”

     “এটা অন্যায়!” গর্জে ওঠে খনক।

     “হুঃ! অন্যায়! কিসের অন্যায়? আমি না নিলে অ্যাম্পুলগুলো অন্য কেউ নেবে। এত অন্যায়ের কী আছে?”

     “এটা পাপ!”

     “পাপ! হুঃ!” ব্যঙ্গের ছোঁয়া লাগে পথিকের কণ্ঠস্বরে “আর যারা এটাকে এখানে ফেলে গেছে তারা পাপ করেনি? এটার বাপ-মা পাপ করেনি?”

     “ভুল! ভুল বলছিস। ভ্রূণকে যাতে বড় করা যায় তাই সঙ্গে গ্রোথ হরমোন দিয়ে রেখেছে। এমনি ফেলে দিয়ে যায়নি।”

     “তোর সঙ্গে বাজে বকতে চাই না। যা ফোট!”

     “তুই ছোটলোক! স্বার্থপর!” চিৎকার করে ওঠে খনক।

     “কী বললি? স্বার্থপর? একে স্বার্থপরতা বলে না, এটা বেঁচে থাকার লড়াই। এখানে জঙ্গলের জানোয়ারগুলো পর্যন্ত মানুষের চাইতে ভাল আছে। স্বার্থপর না হলে এই দুনিয়ায় টিকে থাকা যাবে?”

     পেছনে ফিরে হাঁটা দেয় পথিক।

     “সব শালা মিথ্যেবাদী! সব জোচ্চোর!” চিৎকার করে ওঠে খনক, “ওই ডাকাতাটা, ওই রিসলদার, ওই মেয়েটা, তুই, তোরা সব স্বার্থপর!”

     একটা ব্যঙ্গের হাসি ছড়িয়ে পড়ে পথিকের মুখে, “আর তুই নোস? শালা! পুলিসের চোখে ধুলো দিলে কী হবে, তুই কি মনে করেছিস তোর চালাকি আমি বুঝতে পারিনি?”

     হঠাৎ কেমন চুপ করে যায় পুরাখনক। চোখ নামিয়ে নেয় নিচের দিকে।

     তাকে দেউড়ির দেয়ালের গায়ে ঠেসে ধরে পথিক, “ছোরাটা কী করলি? ওই মুক্তো বসানো দামী ছোরাটা? বল, বল! কী হল সেটার? জঙ্গলের ঘাসের মধ্যে হারিয়ে গেল?”

     খনকের মাথায় একটা থাবড়া বসিয়ে দেয় পথিক, “তুই না নিলে কোথায় গেল সেটা? জবাব দে?”

     উত্তর দেয় না খনক। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে মাথা নিচু করে।

     পথিকের হাসিটা আবার ছড়িয়ে যায় দেউড়ির মধ্যে, “হা হা, ঠিক ধরেছি! চোর শালা!”

     আবার সজোরে একটা থাপ্পড় মারে পথিক খনকের গালে, “নিজে চোর, আবার পরকে চোর বলে অপবাদ দিচ্ছে! স্বার্থপরতা যদি একে না বলে তো আর কাকে বলে!”

     উত্তর না দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে পুরাখনক।

     দেউড়ির বাইরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ায় পথিক, “আর কিছু বলার আছে? নেই? তাহলে চলি।”

     হাসতে হাসতে বৃষ্টির মধ্যে ছুটে চলে যায় পথিক, জলের পর্দার আড়ালে ডেকে যায় তার শরীরটা, বর্ষণের শব্দে মিলিয়ে জলের মধ্য দিয়ে দৌড়নোর ছপছপ আওয়াজ।

     দেওয়ালে পিঠ মাথা নিচু দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পুরাখনক। এম্ব্রিও প্যাকের বাক্স হাতে উদাস নয়নে দঁড়িয়ে থাকে ভিক্ষু।

     দেউড়ির বাইরে নিরবচ্ছিন্ন ধারায় পড়তে থাকে জল। কেটে যায় অনেকটা সময়, দিন ফুরিয়ে আরও ঘোলাটে হয়ে আসে আলো।

     হঠাৎ আবার এম্ব্রিও প্যাকের গায়ে জ্বলে ওঠে আলো, বেজে ওঠে অ্যালার্ম।

     একটা সুইচে আঙুল রেখে আল্যার্ম বন্ধ করে দেয় ভিক্ষুক, নিজের মনেই বলে, “চার্জ কমে আসছে। ইনকিউবেটরে না দিলে একে বাঁচানো যাবে না।”

     নীরবে এম্ব্রিও প্যাকের দিকে দুহাত বাড়ায় খনক।

     এক ঝটকায় এম্ব্রিও প্যাক সরিয়ে নেয় ভিক্ষু। গলার স্বর কয়েক পর্দা ইঠে যায় তার। “কী? কী চাই? যেটুকু পড়ে আছে তারও ভাগ চাই?”

     দুপাশে মাথা নাড়ে পুরাখনক, “না! একে বাঁচাতে চাই। দৌলতনগরের হাসপাতাল আগুনে পুড়ে গেছে। কাগজপত্র ছাড়া হকিন্সাবাদের হাসপাতালেও এটা দেওয়া যাবে না। একমাত্র সুশ্রূত মঠে নিয়ে গেলে হয়তো একে বাঁচানো যেতে পারে।”

     “সুশ্রূত মঠ!” বিস্ময়ের ছোঁয়া লাগে ভিক্ষুর কন্ঠস্বরে “সুশ্রূত মঠের রাস্তা তো প্লেটোগড়ের ওপর দিয়ে গেছে। সেখানে তো লড়াই চলছে, অরাজক অবস্থা, খুন জখম লেগে আছে। যাবে কী করে?”

     ম্লান হাসি হাসে খনক, “যাহোক করে চলে যাব। আমি মাঠে ঘাটে চরে বেড়াই, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চোর ডাকাতের নজর এড়িয়ে যেতে পারব।”

     “ওই পথে প্রাণের ঝুঁকি অনেক! তার ওপর এমন দুর্যোগ!”

     “জানি, কিন্তু তবু এই প্রাণটাকে বাঁচানোর চেষ্টা তো করতে হবে।”

     ক্ষণিকের জন্যে চোখ বন্ধ করে ভিক্ষু, “মাপ চাইছি তোমার কাছে। আমার ভুল হয়েছিল তোমাকে বুঝতে।”

     বাইরে ঝলসে ওঠে আকাশ। লালচে নীল আলো পড়ে খনকের মুখে।

     “না সুতপ। আজকের মতন দিনে মানুষকে ভরসা না করাটাই স্বাভাবিক।”

     দেউড়ির বাইরের দিকে তাকায় ভিক্ষু, “কিন্তু সুশ্রূত মঠে অনেক দূরে। এম্ব্রিও প্যাকের চার্জ শেষ হওয়ার আগে তুমি পৌঁছতে পারবে?”

     হঠাৎ খুব কাছে থেকে ভেসে আসে গ্রীবিনের তীক্ষ্ণ চিৎকার আর জলের ওপর ক্ষুরের ছপছপ শব্দ। আর কয়েক মূহুর্ত বাদেই মাথার সবুজ ঝুঁটি থেকে চারপাশে জলকণা ছিটিয়ে দেউড়ির মধ্যে ছুটে আসে একটা হলুদ রঙের গ্রীবিন।

     দৌড়ে গিয়ে গ্রীবিনের লাগামটা চেপে ধরে পথিক, “আপনার প্রশ্নের উত্তর সুতপ।”

     মাথা নাড়ে ভিক্ষু। “এটা রিসলদারের গ্রীবিন মনে হচ্ছে। ঝড় বৃষ্টিতে বাঁধন ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে। মহাকাল সহায়!”

     “মহাকাল সহায়!” গ্রীবিনের পিঠে লাফিয়ে চড়ে খনক, হাত বাড়িয়ে দেয় ভিক্ষুর দিকে।

     এম্ব্রিও প্যাকটা খনকের হাতে তুলে দেয় ভিক্ষু। লাগামের টানে গ্রীবিনের মুখ দেউড়ির বাইরে দিকে ঘুরিয়ে দেয় পুরাখনক।

     “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সুতপ।”

     মাথা নাড়ে ভিক্ষু, “না। ধন্যবাদ তোমার প্রাপ্য। তোমার জন্যে আজ আবার নতুন করে মানুষের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেলাম।”

     শক্ত হাতে লাগাম চেপে ধরে পুরাখনক, গোড়ালী দিকে হাল্কা আঘাত করে গ্রীবিনের পেটে।

     মাথা তুলে একবার চিৎকার করে গ্রীবিন, তারপর ক্ষুরের আওয়াজ তুলে ছুটে বেরিয়ে যায় দেউড়ির বাইরে

 

==============================================================

সংযোজন: এই কাহিনিটি মূলত একটি পরিবর্তিত পটভূমিকায় ১৯৫০ সালে আকিরো কুরোসাওয়া পরিচালিত ‘রাশোমন’ চলচ্চিত্রের পুনর্কথন। ইতিহাসের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ ছায়াছবির মধ্যে এই ফিল্মটিকে অন্যতম বলে গণ্য করা হয়, এবং এযাবৎ এটি বহুবার নানা ভাষায় ও নানা দেশে ফিল্ম ও সিরিয়াল হিসেবে পুনর্নিমিত হয়েছে। আকিরো কুরোসাওয়া এই চলচ্চিত্রটি নির্মান করেন রাইয়ুসোনোকো আকুতাগাওয়া রচিত দুটি ছোট গল্পকে ভিত্তি করে— ‘রাশোমন’ ও ‘ইয়াবু নো নাকা’ (বেণুবন)। রাইয়ুসোনোকো আকুতাগাওয়াকে জাপানী ছোট গল্পের জনক বলা হয়, এবং তাঁর এই দুটি কাহিনি সামন্ততান্ত্রিক জাপানের হেইয়ান যুগের (৭৯৪-১১৮৫) শেষের দিকের অবক্ষয়ের পটভুমিকায় লেখা। বর্তমান গল্পটি কুরোসাওয়ার ‘রাশোমন’ ছায়াছবি এবং আকুতাগাওয়ার ‘ইয়াবু নো নাকা’ কাহিনি— দুটিই আশ্রয় করেই রচিত।

6 thoughts on “মঙ্গলদেউড়ি

  • August 17, 2019 at 8:37 am
    Permalink

    কী পড়লাম! এপিক, সুমিতদা। এপিক লেখা। রশোমন আর স্টিমপাংক এভাবে মেশানো যায় – এ কখনও কল্পনাও করিনি। আভূমি সেলাম।

    Reply
  • August 17, 2019 at 11:52 am
    Permalink

    একটি ক্লাসিকের ক্লাসিক বিনির্মাণ। চির অক্ষয় হয়ে থাকবে এ লেখা বাংলা সাহিত্যে। সেলাম সুমিতদা।

    Reply
  • August 18, 2019 at 11:14 pm
    Permalink

    এ এক অসামান্য বিনির্মাণ। সুমিত বাবু বাংলা কল্পবিজ্ঞানে এক নতুন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিচ্ছেন।

    Reply
  • August 19, 2019 at 2:07 am
    Permalink

    সুমিত বর্ধন ভক্ত হয়ে গেলাম আপনার স্যর, অর্থতৃষ্ঞা, কৌস্তূভ, মারকত নন্দিনী, তোরন আর মঙ্গলদেউরি,phenomenal!

    Reply
  • August 22, 2019 at 5:08 am
    Permalink

    Amazing তৃষ্ণা বেড়ে গেল।

    Reply
  • September 8, 2019 at 6:30 am
    Permalink

    এতদিনে পড়ে উঠতে পারলাম। খুব ভালো লাগল- বিশেষত আপনার করা সংযোজনটি বেশ। তবে এবার আবার একবার রসোমন দেখব…

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!