মহাকাশের দূত

রচনা  : বিশ্বদীপ দে

অলঙ্করণ : সুপ্রিয় দাস

কুচকুচে কালো আকাশে ফুটে আছে কুচি কুচি তারা।

     ওলটানো বাটির মতো আকাশ। তার নীচে এই দিগন্তবিস্তৃত তেপান্তরের মাঠ। এখানে দাঁড়িয়ে চোখ রাখলে তারাদের উজ্জ্বল সমুদ্রে হারিয়ে যেতে থাকে মন। কোটি কোটি আলোকবর্ষের দূরত্ব মুছে যায় ক্রমশ। নক্ষত্রের পবিত্র অগ্নি আমাদের মনের ভেতর স্থির হয়ে জ্বলে থাকে।

    হঠাৎ মনে হয়, এর ভেতরে একটা তারা যেন আগের থেকে আকারে বেড়ে গেছে খানিকটা! নিশ্চয়ই চোখের ভুল, এই ভেবে উপেক্ষা করতে গিয়েও খটকা লেগে থাকে মনে। তারাটা কি আরও বড় হচ্ছে?

     ক্রমে তারাটা বড়, আরও বড় হয়ে যখন তার বিপুল আলো নিয়ে নেমে আসছে মাটির কাছাকাছি, তখন সমস্ত শরীর জুড়ে উথালপাথাল ঝড়। প্রবল শব্দ আর আলোয় ধাঁধিয়ে যেতে থাকে চোখ। পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসে মহাকাশের দূত।

     এটা স্বপ্ন। একটা উদ্দাম কল্পনা মাত্র। ওরকম কোনও বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে কোনওদিন সত্যি সত্যি একটা ইউফো বা অজানা উড়ন্ত বস্তু বা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী চালিত মহাকাশযান নেমে আসতে দেখিনি আমরা। তবু স্বপ্নের ভেতরে, চেতনার গভীরে সশব্দে নেমে আসা সেই স্পেসশিপের সাক্ষাৎ কি আমরা পাইনি?

     শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘মানুষ নক্ষত্র নয়, নক্ষত্রের মতো দূরে নয়/মানুষের মধ্যে তবু নক্ষত্রপুঞ্জেরা খেলা করে’। আলোর বেগেও যেখানে যেতে লেগে যাবে হাজার হাজার বছর, সেই সব সুদূর নক্ষত্রের কাছে আমাদের যাওয়া হবে না কোনওদিন। তাই আমরা স্বপ্ন দেখি সেই নক্ষত্রের দেশ থেকে আমাদের কাছে একদিন এসে পৌঁছোবে অজানা গ্রহের দূত। আমাদের ভিতর অবিরল খেলা করে চলা নক্ষত্রপুঞ্জের ঢেউয়ের মধ্যে তাদের বার্তা মিশে যাবে। আমরা জানব, আমরা একা নই। নিঃসঙ্গ নই। ‘ইটি’ ছবির সেই বিখ্যাত পোস্টার মনে করুন। দুটি আঙুল। একটি মানুষের। একটি ভিনগ্রহের বাসিন্দার। দুটি আঙুলের স্পর্শবিন্দুতে জেগে আছে এক উজ্জ্বল দ্যুতি। সেই দ্যুতির দেখা পেতে আমাদের আপ্রাণ প্রতীক্ষা।

    লেখক-শিল্পীদের কল্পনায় তাই বারেবারে ফিরে এসেছে ‘এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল জীব’। কিন্তু মানুষ থেকে মানুষে তাদের চেহারা, চরিত্র পালটে পালটে গেছে স্বাভাবিকভাবেই। তাছাড়া যতদিন যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হচ্ছে। আর ততই পুরো ব্যাপারটা একটা নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

(২)

     একসময় পৃথিবী থেকে দূরবিনের সাহায্যে মঙ্গলগ্রহের মাটিতে লক্ষ করা গেছিল লম্বা লম্বা দাগ। বিজ্ঞানীরা মনে করলেন ওগুলো আসলে কৃত্রিম উপায়ে কাটা চওড়া খাল! যা কিনা বুদ্ধিমান জীবদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত নিশ্চিতভাবে। ১৮৭৭ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওভান্নি সিওপ্যারেলি প্রথম এই রকম খাল ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন। কোনও সন্দেহ নেই, তৎকালীন অনুন্নত দূরবিনে অত দূরের গ্রহের খুঁটিনাটি বোঝা দুষ্কর ছিল। ওই সব খাল যে নিছকই ভ্রান্ত ধারণা, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেই সময়ে এরকম একটা আবিষ্কারে যে রীতিমতো সাড়া পড়ে যাবে সেটা সহজেই অনুমেয়।   

     সিওপ্যারেলির সেই আবিষ্কারের কুড়ি বছর বাদে লেখা হয়েছিল ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’। যেখানে মঙ্গলগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা এসে হাজির হয়েছিল পৃথিবীতে। এইচ জি ওয়েলসের দুনিয়া কাঁপানো এই উপন্যাস, প্রকাশের সময় থেকেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত এই বই পরবর্তী সময়ে অসংখ্য সিনেমা, রেডিয়ো নাটক, কমিক্সের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন লেখকেরা এর নানা রকম সিকুয়েল লিখেছেন। তৈরি হয়েছে টেলিভিশন সিরিজ… আরও কত কী! এমনকী বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ডের ‘লিকুইড ফুয়েলড রকেট’ এবং ‘মালটি-স্টেজ রকেট’ আবিষ্কারেরও মূল অনুপ্রেরণা ছিল ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’!   

     এর মধ্যে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল ১৯৩৮ সালে। সেদিন রেডিয়ো খুলেই শ্রোতারা চমকে গেছিলেন। রেডিয়োর ঘোষক উত্তেজিত স্বরে যে খবর শোনাচ্ছিলেন তা পিলে চমকে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। মঙ্গলগ্রহের ভয়ংকর প্রাণীরা আক্রমণ করেছে পৃথিবী! হইহই পড়ে গেল সবার মধ্যে। কী হবে এবার? ওই শক্তিশালী প্রাণীদের সঙ্গে যুদ্ধে কি ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের নীল গ্রহ?  

     প্রায় চল্লিশ মিনিট চলার পর অবশ্য বোঝা গেল ওটা আসলে একটা রেডিয়ো নাটক! এইচ জি ওয়েলসের কয়েক দশক পুরোনো উপন্যাস থেকে যেটাকে ষাট মিনিটের রেডিয়ো নাটকে রূপান্তর ঘটানো হয়েছে মাত্র। নাটকটির পরিচালক ছিলেন আরেক বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব অরসন ওয়েলস। তাঁর রেডিয়ো-কণ্ঠের শ্বাসরোধী উচ্চারণে লেখকের কল্পনা একদম জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল।

    এইচ জি ওয়েলসের অমর এই সৃষ্টিই কি অনুপ্রাণিত করেছিল বঙ্গদেশের এক বিখ্যাত লেখককে? তাই তিনিও বাংলার সুজলা সুফলা প্রকৃতির মধ্যে উড়িয়ে এনেছিলেন মঙ্গলগ্রহেরই স্পেসশিপ? হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সেই ‘মেঘদূতের মর্তে আগমন’ উপন্যাসে অবশ্য মঙ্গলগ্রহের প্রাণীরা কেবল পৃথিবীতে এসেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ‘স্পেসিমেন’ হিসেবে তুলে নিয়ে গিয়েছিল বিমল-কুমার-রামহরি-বিনয়বাবুদেরও! ফলে তাদের সঙ্গে পাঠকও পৌঁছে গেছিল মঙ্গলে।

     কাহিনির মধ্যেই ফুটনোট হিসেবে হেমেন্দ্রকুমার রায় উল্লেখ করেছিলেন ‘সিয়াপ্যারেলি, লাওয়েল, গান, স্ট্যানলি উইলিয়মস ও শ্লামেরিয়ন প্রভৃতি বিখ্যাত পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের’ নাম। মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ওই সব বই পড়েই। আর সেখানে উল্লেখ ছিল সেই সুদীর্ঘ ‘কৃত্রিম’ খালেরও। বিনয়বাবু বলেছিলেন, ‘… এমন মরুভূমির মতন দেশে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শত শত ক্রোশব্যাপী কৃত্রিম খাল কেটে চাষ-আবাদ করে যে জীব বেঁচে আছে, তারা যে খুব চালাক ও সভ্য, তাতেও আর কোনওই সন্দেহ নেই’।                   

     সেই সময়ের বাংলাদেশে বসে ভিনগ্রহীদের কল্পনা করে হেমেন্দ্রকুমার সত্যিই চমকে দিয়েছিলেন সকলকে। কিন্তু তাঁর সেই কাহিনিকে ঠিক সাই-ফাই বলা যায় না হয়তো। বরং অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিই বলা ভালো।


 (৩)

বাংলা সাহিত্যে ইটি-র আবির্ভাব হেমেন্দ্রকুমারের হাত ধরে হলেও ভিনগ্রহীদের নিয়ে প্রথম ক্লাসিক রচনা নিঃসন্দেহে ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। নিরীহ গোবেচারা বঙ্কুবাবু, যাকে এই দুনিয়ার কেউ আজ পর্যন্ত ‘মানুষ’ বলেই গণ্য করে না, তিনিই দেখা পেলেন ভিনগ্রহ থেকে আসা ‘অ্যাং’-এর। অচেনা গ্রহের প্রাণী এসে বঙ্কুবাবুর মধ্যে জ্বেলে দিয়ে গেল আত্মবিশ্বাসের রংমশাল। নিজের ‘অস্তিত্বের’ খোঁজ তিনি পেলেন বহু দূর থেকে আসা ‘বন্ধু’-র সৌজন্যে।    

 

    কেবল ছোটগল্প লিখেই সন্তুষ্ট থাকতে চাননি সত্যজিৎ রায়। পরবর্তী সময়ে তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াছবির। যার নাম ঠিক হয়েছিল ‘দ্য এলিয়েন’। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০—নানা সময়ে শুটিং শুরুর কথা হয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেই ছবি হয়নি। এ এক চরম দুর্ভাগ্য। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছবি হয়তো হতে পারত তাঁর অন্যতম সেরা ছবি।

    ছবির গল্পের পটভূমি ছিল খরাক্লিষ্ট গ্রাম মঙ্গলপুর। মাটি ও পাথরের স্তর ভেদ করে চাষের জলের সন্ধানে সেখানে ড্রিলিং-এর কাজ শুরু হয়। আচমকাই খবর পাওয়া গেল গ্রামের বাঁশবনের পাশের পুকুরে দেখা গেছে এক ঝলমলে সোনালি চুড়ো। সবাই ভাবল, নিশ্চয়ই এটা কোনও প্রাচীন মন্দিরের চুড়ো। কিন্তু তা আসলে ছিল একটা স্পেসশিপ। যে স্পেসশিপে করে এসেছে ‘এলিয়েন’। ফুট তিনেক উঁচু, বড়ো মাথা আর কোটরাগত চোখের সেই প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে গ্রামের বালক হাবার। দরিদ্র অনাথ সেই বালককে সঙ্গে করে নিয়ে যায় সে। আর নিয়ে যায় জোনাকি পোকা, পদ্মফুল, সাপ, কাঠবেড়ালি, ব্যাং আর বুলবুল পাখি। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেয় ‘এলিয়েন’। সে এই পৃথিবীকে দখল করতে আসেনি। এসেছিল এই নীল রঙের গ্রহটাকে বুঝতে। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ গল্পের ছায়া এই ছবির চিত্রনাট্যে থাকলেও তা যেন আরও বিস্তৃত, আরও অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে পড়েছে এখানে। ‘এলিয়েন’ এখানে ভাবিত হয়েছে মানবসভ্যতাকে নিয়ে। বুঝতে চেয়েছে মানব সভ্যতার প্রকৃত স্বরূপ।

     প্রফেসর শঙ্কুর ‘মহাকাশের দূত’ গল্পে যারা এসেছিল দূরের পথ পেরিয়ে, তারা দিয়ে গিয়েছিল মানুষের চারটি প্রধান সংকটের সমাধান আর পৃথিবীর পঁয়ষট্টি হাজার বছরের ইতিহাস। যা ধরা ছিল একটা মটরদানার অর্ধেক আয়তনের প্রস্তরখণ্ডে।  অর্থাৎ সত্যজিতের কল্পনায় বারবার এই বাইরের দুনিয়া থেকে আগত আগন্তুকেরা মানুষের হিতৈষী হিসেবেই এসেছে। তারা মানুষকে দিতে চেয়েছে উত্তরণের পথের সন্ধান।

     আর এখানেই সত্যজিৎ রায় আলাদা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর আর সব সাই-ফাই রচয়িতাদের থেকে। তার আগে যত ‘ইটি’-র দেখা মিলেছে সাহিত্যে ও সিনেমায়, তারা সবাই যুদ্ধ করতে চেয়েছে। ধ্বংস করতে চেয়েছে মানব সভ্যতাকে। অর্থাৎ ‘দ্য ওয়ার অফ ওয়ার্ল্ডস’-এরই সম্প্রসারিত ও ভিন্ন রূপেরই দেখা মিলেছে বারংবার। সেখানে ‘এলিয়েন’ আসলে একটা মনস্টারেরই মতো। ‘কিং কং’ বা ‘গর্জিলা’ জাতীয় ছবিতে যেমন ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ উপাদান দেখা যায়, ব্যাপারটা অনেকটা সেরকমই। এবং শেষপর্যন্ত তাদের হারিয়ে দিয়ে মানুষের জয় পাওয়াই এই ধরনের কাহিনির উপজীব্য। সত্যজিৎ এই ‘ছক’-টিকে একেবারে উলটে দিলেন। মানব সভ্যতার জয়গানের একমাত্রিক আত্মতৃপ্তি নয়, বরং মানুষের আত্ম-উন্নতি সাধন ও সভ্যতার এগিয়ে চলার ক্ষেত্রকে আরও মসৃণ করতেই যেন তাঁর কল্পনার ‘এলিয়েন’-রা তৎপর। আমাদের দুর্ভাগ্য ‘এলিয়েন’ (বা ‘অবতার’) ছবিটা তৈরি হয়নি। হলে বিশ্বচলচ্চিত্রে আরও একটি অসামান্য মাত্রা যোগ হত, তা বলাই বাহুল্য।                  

(৪)

     ১৯৮২ সালে মুক্তি পেল ‘ইটি দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’। পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ। এ ছবির সঙ্গে আশ্চর্য মিল সত্যজিতের ‘দ্য এলিয়েনে’র! সে দুই বহিরাগত আগন্তুকের চেহারায় হোক, বা গল্পের আখ্যানভাগে। হাবা আর এলিয়েনের বন্ধুত্বেরই প্রতিফলন যেন আমরা খুঁজে পাই দশ বছরের এলিয়েট আর ইটির বন্ধুত্বে।

    ক্যালিফোর্নিয়ার এক জঙ্গলে নেমে এসেছিল ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান। সেই যানে ছিল সেই গ্রহের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। শেষ পর্যন্ত তড়িঘড়ি পালাতে গিয়ে তারা ফেলে যায় তাদের এক সঙ্গীকে। অসহায় সেই ইটি আশ্রয় পায় এলিয়েটের কাছে। এলিয়েট আর তার মধ্যে গড়ে ওঠে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। ক্রমে এলিয়েটের দাদা মাইকেল আর বোন গার্টিও সাক্ষাৎ পায় তার। শেষপর্যন্ত ইটি ফিরে যায় তার গ্রহে। কিন্তু জানিয়ে যায়, যতদূরেই সে যাক না কেন, আসলে সে থেকে যাবে এই সরলমনা বালকটির মনের মধ্যে। গল্পটি দর্শককে আপ্লুত করে দেয়। এক বিরাট ব্লকবাস্টার হয়ে ওঠে ছবিটি। দূরের গ্রহ থেকে যে আসবে, সে শত্রু নয়, বরং বন্ধুত্বের বার্তা নিয়েই আসবে—সত্যজিতের এই ভাবনাই যেন প্রতিফলিত হয় ‘ইটি দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ ছবিতে।

     প্রসঙ্গত মনে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক মহম্মদ জাফর ইকবালের একটি সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসের কথা—টুকুনজিল। সেখানেও গ্রামের এক সাধারণ কিশোর বিলু দেখা পেয়েছিল ভিনগ্রহের বাসিন্দার। স্বাভাবিকভাবেই বড়রা তার কথা বিশ্বাস করেনি। তাকে এমনকী সাইকিয়াট্রিস্ট অবধি দেখানো হয়েছিল! বিলু ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিল সেই ভিনগ্রহের আগন্তুককে। আদর করে নাম দিয়েছিল টুকুনজিল। টুকুনজিল বিলুর কাছ থেকে শিখে নিয়েছিল এই গ্রহের আদবকায়দা। কেন মানুষ ঘুমোয়, কেনই বা হেসে ওঠে উচ্চস্বরে। আর শিখেছিল এক অমোঘ অনুভূতি—ভালোবাসা। এ কাহিনিও ‘ইটি’ ছবির সেই পোস্টারের দু আঙুল ও আঙুলের মাঝে ঝিলিক দিয়ে দিয়ে ওঠা দ্যুতির কথাই বলে যেন। কোনও ভয়ঙ্কর শত্রু নয়, ক্ষুদ্র চেহারার টুকুনজিল এসেছিল বন্ধুত্বের রঙিন বার্তা নিয়ে।

(৫)

     অসংখ্য অজস্র সিনেমা ও সাহিত্য। বিষয় একটাই। ভিনগ্রহ থেকে আসা প্রাণী। তারই মাত্র দু-এক আঁজলা নমুনা এই লেখায় উঠে এল। কিন্তু তাতেও এই ধরনের কল্পনার মূল সুরটাকে ধরতে অসুবিধা হয় না। সেই কোন সুদূর সময়ে বসে লেখা ‘দ্য ওয়ার অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস’ হোক বা হালের অত্যাধুনিক ঝাঁ চকচকে কোনও চলচ্চিত্র বা কম্পিউটার গেম, সবেরই আসল অনুপ্রেরণা মানুষের চিরকালীন জিজ্ঞাসা। আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? এই ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে’ ‘একাকী’ মানুষ ‘বিস্ময়ে’ প্রত্যক্ষ করেছে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রহস্যমালাকে। আর নিজের মতো করে বুঝে নিতে চেয়েছে।


মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছে সে একলা নয়। তার এই জাগতিক জীবনের সীমাবদ্ধতার বাইরেও সে আসলে সংযুক্ত এক বৃহত্তর জীবনস্রোতের সঙ্গে। যে জীবন মহাকাশের এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেই বিরাট, বিপুল অনন্ত জীবনের সন্ধানেই হাজার হাজার বছর ধরে তার কল্পনা ধাবমান। আর সেখানেই বারে বারে কল্পনার ‘ইউফো’ ভেসে এসেছে। মানুষই এই গ্রহের একমাত্র প্রাণী যে খিদে-যৌনতা-অস্তিত্ব সংগ্রামের বাইরেও ভাবতে চেয়েছে। অন্ধকার গুহার মধ্যে বসে অবসর-যাপনের বাধ্যতায় সে হাতে তুলে নিয়েছে প্রস্তর খণ্ড। তারপর গুহার দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলেছে বাইসন। কিন্তু কেবল এটুকুতেই তার কাজ শেষ হয়নি। মাটির পৃথিবী থেকে চোখ তুলে মাথার ওপরে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে তার রহস্যময়তায় মুগ্ধ হয়েছে সে। শিল্পসৃষ্টির নিত্যনতুন তাড়নায় কল্পনায় ভেসে যেতে চেয়েছে ছায়াপথের তারার ধুলোয়। নিজের অস্তিত্ব, নিজের জীবনেরই বিস্তৃত এক যাপন সে খুঁজে পেয়েছে সুদূর মহাকাশের ঠিকানায়। কখনও তারাদের জুড়ে জুড়ে কালপুরুষ বানিয়েছে সে। কখনও সুদূর নক্ষত্রের আবছায়ায় খুঁজে পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের মুখ। আবার কখনও ওই তারার দেশ থেকেই ভেসে আসতে দেখেছে কাল্পনিক মহাকাশযান।

(৬)

     এবং দানিকেন। তাঁকে ছাড়া এ আলোচনা শেষ করা যায় কি?

    পুরো নাম এরিক আন্তন পল ফন দানিকেন। সুইজারল্যান্ডের বাসিন্দা দানিকেন দাবি করে বসলেন, এই মানবসভ্যতা আসলে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের দান। আমরা কে পড়িনি তাঁ বই? অ্যানসিয়েন্ট অ্যাস্ট্রোনট থিয়োরির সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা তো তিনিই। তাঁর ‘চ্যারিয়েটস ওফ দ্য গডস?’, ‘গডস ফ্রম আউটার স্পেস’, ‘দ্য গড অ্যান্ড দেয়ার গ্র্যান্ড ডিজাইন’, ‘ইন সার্চ অফ অ্যানসিয়েন্ট গডস’ এই সব বই লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি আড্ডার টেবিলে ঝড় উঠেছে তাঁর তুলে দেওয়া অমোঘ প্রশ্নে—দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ?


এই কল্পনাই মানুষকে পার্থিব আর সব কিছুর থেকে এগিয়ে রেখেছে। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং নিজের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘অলদো আই ক্যান নট মুভ… ইন মাই মাইন্ড আই অ্যাম ফ্রি। ফ্রি টু এক্সপ্লোর দ্য ইউনিভার্স।’     কার্ল সেগান বলেছেন, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি ক্লেম নিডস এক্সট্রা অর্ডিনারি এভিডেন্স।’ কাজেই দানিকেনের ‘অ-স্বাভাবিক’ তত্ত্ব ও তার বিরোধ নিয়ে আলোচনা এক বিরাট পরিসর দাবি করে। তাছাড়া এ লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়ও সেটা নয়। সে আলোচনা তোলা থাক অন্য সময়ের জন্য। এখানে এই কথাটাই কেবল বলা যেতে পারে যে, সত্যজিতের কল্পনায় এলিয়েনরা আমাদের দেখাতে চায় উত্তরণের পথ, আমাদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন জল-হাওয়া-বাতাস দিয়ে তাকে তরতাজা করে তোলে। আর দানিকেন আমাদের বলেন, দেবতা বলে আমরা যাঁদের নিত্যদিন উপাসনা করি, তাঁরাও আসলে এলিয়েনই। তাঁরা আমাদের উত্তরণের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন এরই মধ্যে। তাঁদেরই সাহায্যে মানবসভ্যতা এই বিস্তীর্ণ ও সমৃদ্ধ রূপ পেয়েছে। তাঁর তত্ত্বকে নিয়ে ওঠা ঝড় এখন অনেকটাই স্তিমিত। তবু মানুষ কত গভীরে গিয়ে ভিনগ্রহের প্রাণকে কল্পনা করেছে তা বুঝতে দানিকেনের কথা আমাদের ভাবতেই হবে।

     এটাই বোধহয় আসল কথা। খালি চোখে যে ছায়াপথকে দেখা যায় তা সম্পূর্ণ ছায়াপথের সামান্য একটু অংশ মাত্র। দশ হাজার কোটি তারা নিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ ছায়াপথ আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার অনেক বাইরে। ছায়াপথ একটা চাকতির মতো। তার কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা অজস্র সর্পিল বাহুর মাত্র চারটির সন্ধানই এ যাবৎ পাওয়া গেছে। আমরা যেটা দেখতে পাই সেটা সেরকমই একটা বাহুর খণ্ডাংশ! সেই বাহুরই বাইরের দিকে অবস্থিত কালপুরুষ বাহুর এক প্রশাখার মধ্যে আমাদের এই সৌরমণ্ডল! অর্থাৎ মহাবিশ্বের একটা কোণে পড়ে আছে আমাদের এই নীল রঙের গ্রহ। সেখানে বসে বসেই মানুষ তার চেতনা দিয়ে স্পর্শ করতে চাইছে এক বিশাল অনন্তকে। যে অনন্তকে পুরোপুরি কল্পনা করার ক্ষমতাও এখনও সে আয়ত্ত করতে পারেনি।

     কল্পনামগ্নতায় সে খুঁজে বেড়ায় তার ‘দোসর’। হয়তো সে তার চরম শত্রু। হয়তো বন্ধু। বা ঈশ্বরপ্রতিম। সে যেই হোক, যারাই হোক তার খোঁজ পাওয়ার আপ্রাণ ইচ্ছেই যেন এক ‘অজানা উড়ন্ত গোলোক’ হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের মনের আনাচে কানাচে। আমাদের সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!