মায়াবতী

অমিতাভ রক্ষিত

অলংকরণ:দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য (চিত্রচোর)

চরিত্র

(ষ্টেজে আবির্ভাবের ক্রমানুযায়ী)

নেপথ্য                           পুরুষ অথবা নারী কন্ঠ

বিবেক মিত্র                   মধ্যবয়সী পুরুষ। পেশায় উকিল

বিকাশ                          মধ্যবয়সী পুরুষ। বিবেকের সহকারী ও ভৃত্য কানে কম শোনেন

মায়াবতী                       যুবতী নারী। ভাল গান গাইতে পারেন

বিবেকের বিবেক           মধ্যবয়সী পুরুষ। বিবেক মিত্রর ছায়ার মতন

পরেশ ঘটক                   অল্পবয়সী পুরুষ। বিল্ডিং ইন্সপেক্টার, ঘুষখোর

শুভব্রত                         টেলিফোন রিপেয়ারম্যান। নারী চরিত্রও করা যায়

বৃদ্ধা                                ডবল রোল

হিতেশ                           বিল্ডিং সুপারভাইজার। নারী চরিত্রও করা যায়

পুলিশ ১ নম্বর  পুরুষ     একটু শক্তিশালী হলে ভাল হয়

পুলিশ ২ নম্বর পুরুষ     একটু শক্তিশালী হলে ভাল হয় ডায়ালগ নেই

 

পুনর্মূষিক

[প্রথম দৃশ্য]

(বিবেক মিত্র চেয়ারে বসে আছেন তিনি মধ্যবয়সী, ফিটফাট বিকাশচন্দ্র-র বয়স হয়েছে, কানে একটু কম শোনেন, তার ওপরে তত চটপটে নন একটু খুঁড়িয়ে চলেন।)

 

নেপথ্য “অ্যাডভোকেট বিবেক মিত্র। তাঁর ফাই ফরমাস খাটেন বিকাশ। বিকাশ আজ বহুদিন ধরেই বিবেকবাবুর পরিবারে নিযুক্ত, তাই দুজনের সম্পর্কটা ঠিক প্রভু-ভৃত্যের মত নয়, বরঞ্চ কিছুটা পারিবারিক সদস্যদের মতন। বিবেকবাবু খুবই উঁচুদরের উকিল, কিন্তু অত্যন্ত সৎ লোক বলে মামলা তেমন জিততে পারেন না। তাই পসার খুব কম”
বিবেক হ্যাঁ রে বিকাশ, বেলা তিনটে তো বেজে গেল, আজ একটাও মক্কেল এল না এখনও?
বিকাশ অ্যাঁ?
বিবেক (রেগে) অ্যাঁ মানে? কোনও কথা যদি কানে যায়! বলি একটা মক্কেলও তো এল না আজকে!
বিকাশ তা আমি কী করব বাবু!
বিবেক তুই কী করবি? যা, বাইরে গিয়ে দেখে আয়, আবার সাইন বোর্ডটা খুলে পড়ে গেছে কিনা। লোকে সাইন বোর্ড না দেখলে কী করে বুঝবে এটা উকিলের চেম্বার? দুটো পেরেক দিয়ে ভাল করে ঠুকে দিয়েছিলি তো?
বিকাশ সেদিনও তো দুটো পেরেক দিছিনু – তাও তো তুমি খুলে দিলে!
বিবেক খুলে দেব না? তুমি ব্যাটা উল্টো করে নেমপ্লেট লাগাবে, আর আমি তোমায় পূজো করব? আজকেও গিয়ে দেখে এস উল্টো হয়েছে কিনা। 
বিকাশ যাচ্ছি দাঁড়াও। তা বাপু, ভাবছিলাম বেলা তো হল, পেটে তো কিছু দাওনি এখনও। দুটো পরোটাও কিনে নিয়ে আসি গিয়ে তাহলে?
বিবেক না, না, এত বেলায় আর পরোটা খাব না! বদহজম হবে না?
বিকাশ (মাথা নেড়ে) উপোস দিয়ে দিয়ে আর কটা টাকা বাঁচাবে? না খেয়ে খেয়ে শরীরটা ভেঙ্গে যাবে না?
বিবেক তুই থাম্‌!
বিকাশ (বিবেকের কথায় পাত্তা না দিয়ে) আজ যদি আমাদের মা ঠাকরুন বেঁচে থাকতেন তবে মজা বুঝতে!
বিবেক (বউয়ের কথা মনে পড়ায় একটু শোকাতুর হয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন) কিন্তু সে তো আর নেই বিকাশ । কাজেই ওকথা তুলে আর কী লাভ? (তিনি টেবিলে কনুই রেখে কিছুক্ষণ দুহাতে মাথা ঢেকে চুপ করে বসে থাকলেন)।
বিকাশ (খুব বিব্রত হয়ে) আহা হা, এই দেখো তো! আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, মাথায় গোবর পোরা – খালি খালি তোমায় কষ্ট দেই! আমার কথায় মন খারাপ কোরোনি… ওঠো ওঠো।  
বিবেক (উঠে দাঁড়িয়ে) না না, তোর আর দোষ কী? দোষ তো সবই আমার। এই দেখ্ না! ইস্কুল কলেজে কোনদিন সেকেণ্ড পর্যন্তও হইনি। ল-কলেজও পাশ করলাম একেবারে “টপ অফ দা ক্লাশ”। তাই দেখে আমার শ্বশুর মশাই ভাবলেন, এর থেকে বুঝি ভাল পাত্র আর হয় না! নিজের অমন সুন্দর মেয়েটাকে আমার হাতে দিয়ে সঁপে দিয়ে সুখে স্বর্গবাস করতে চলে গেলেন। আর আমি কী করলাম? কিছুই উপার্জন করতে পারলাম না। কত দুঃখ কষ্টে জীবনটা কাটালো বউটা! তারপরে ক্যান্সার হল, অথচ টাকার অভাবে ভাল করে চিকিৎসাও করাতে পারলাম না! ধ্যাৎ, কী পুরুষ মানুষ আমি? উকিল হয়ে কী লাভ হল!
বিকাশ উকিলরা তো ভালই উপার্জন করতে পারে – দেখ না, ওই তো নীহার উকিলের অপিস – তার কত মক্কেল! ঘরে জায়গা না হলে, রাস্তাতেই লাইন দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে থাকে সারাদিন – যেন তাকে কেস ধরিয়ে দিতে পারলেই জিতে যাবে সবাই! সেই করেই তো কত বড় বাড়ি, আর দু দুটো গাড়িও করে ফেলল, নীহার উকিল! 
বিবেক (ম্লান হেসে) নীহার চন্দ? ব্যাটা তো উকিল ভণ্ড! আমাদের সকলের নাম ডোবায়! শুধু ঘুষ দিয়ে আর মিথ্যে সাক্ষী খাড়া করে কেস জেতে! তা, বাঃ রে, বিকাশ, তুই তো দেখছি বেশ বুকে ছুরি ঢোকাতে পারিস!
বিকাশ (বিকাশ একটু দূরে চলে গিয়েছিল। তাই প্রথমে কানে হাত দিয়ে একটু ভাল করে শোনবার চেষ্টা করল। তারপরে একটু ইতস্ততঃ করে বলল) অ্যাঁ… না না তুমি যে চুরি করতে পার না সে তো আমি জানি। তাই তো সবাই এত ছোদ্দা করে তোমায়!
বিবেক আরে দূর, “ছোদ্দা” ধুয়ে কি ভাত খাব?
বিকাশ (বিবেকের কথায় কান না দিয়ে) আর মনটাও তো কত নরম তোমার – কারুর দুঃখের কথা শুনলে আর তাকে ফেরাতে পার না!
বিবেক হ্যাঁ, সেই জন্যই তো আমার মক্কেল হয় যত হাভাতে, বাউণ্ডুলে আর গরীব বিধবারা! এই দেখ্‌ না, কত লড়াই করে গত সপ্তাহে একটা কেরাণীর পৈতৃক সম্পত্তিটা বাঁচিয়ে দিলাম। কিন্তু তার তো ফি দেবারই পয়সা নেই। তখন কী করল সে – (টেবিলের ওপরে এক ঝুড়ি ফল দেখিয়ে) – সে এসে কিছু মুসম্বী আর আপেল – আর কী একটা কারুকার্য করা পুরনো, খালি, গয়নার বাক্স উপহার দিয়ে গেল। বলল, পরিবারে আছে বহুদিন, ভেতরে কিছুই নেই, ব্যবহার করতে পারেন, তবে চাবিটা হারিয়ে গেছে! (ঝুড়ি হাঁটকে বাক্সটা বার করে হাতে নিয়ে প্রথমে একটু নাড়াচাড়া করলেন। তারপরে সেটাকে আবার টেবিলে নামিয়ে রেখে) আরে! এ দিয়ে আমি কী করব? 
বিকাশ বাবু, আমি কী আজ আসি তাহলে? বাড়ি গিয়ে রান্না করতি হবে যে। (দরজার দিকে এগিয়ে গেল)
বিবেক আরে শোন্‌ শোন্‌ – 
বিকাশ (বেরিয়ে যেতে যেতে মাথা নেড়ে) হ্যাঁ হ্যাঁ, ফোন করবনি, তুমিও ফোন কোরো দরকার হলে।
বিবেক (চেঁচিয়ে) আরে ধ্যাৎ, দাঁড়া দাঁড়া। (কাছে গিয়ে বিকাশের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিতে দিতে) – এ মাসে তো এখনও মাইনে দিতে পারিনি তোকে, এই কটা টাকা নে। একটু মাছ কিনে নিস।
(নমস্কার করতে করতে বিকাশ বেরিয়ে গেল)
বিবেক (পায়চারি করতে করতে স্বগতোক্তি) ফি দিতে পারে না, দেয় শুধু গয়নার বাক্স – তাও আবার খালি! আর তার চাবিও নেই! উফ, ঘেন্না ধরে গেল! (গয়নার বাক্সটা হাতে তুলে সেটাকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ঢাকনাটা খোলার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ খট্‌ করে একটা জোরে শব্দ করে ঢাকনাটা খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে ষ্টেজের আলো সব নিভে গেল) আরে আরে, কী হল! লোডশেডিং হল নাকি আবার?
(এরপরে খুব জোরে একটা কামান দাগার মতন আওয়াজ হয়ে আবার স্টেজের আলো জ্বলে উঠল আর দেখা গেল সেখানে একজন সুন্দরী যুবতী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে)
বিবেক (চমকে উঠে) আরে, তুমি কে?
(মেয়েটা দৌড়ে গয়নার বাক্সটা কেড়ে নিতে গেল বিবেকের কাছ থেকে)
বিবেক (বাক্স সরিয়ে নিয়ে) এই, খবরদার। কে তুমি?
মেয়ে আমি পেত্নী। মায়াবতী পেত্নী। (আবার বাক্সটা কেড়ে নিতে যায়)
বিবেক পেত্নী! হাঃ! (বাক্সটা বাঁচাতে বাঁচাতে) এই বাক্সের ওপরে তোমার এত লোভ কেন?
মায়াবতী লোভ কী? এটাকেই তো তুমি আমার জেলখানা করেছো! সেই কবে গয়না দেবে বলে কায়দা করে আমাকে বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে, আর তারপর পঞ্চাশ বছর ধরে ঢাকনা বন্ধ করে রাখলে। এটাকে তোমার হাত থেকে সরাতে না পারলে আমার স্বস্তি নেই – আবার কখন বন্দী করে ফেলবে! (বাক্সটা আবার ধরতে গেল)
বিবেক (বাক্স বাঁচিয়ে) দেখ, আমি তোমাকে বন্দী করিওনি, করবার কোনও ইচ্ছেও নেই। আমি আজ সকালেই মাত্র এই বাক্সটা হাতে পেয়েছি!
মায়াবতী ও, তবে তো ভাল কথা। তা আমাকে বাক্সটা দিয়ে দাও, আমি চলে যাই।
বিবেক আরে! দিয়ে দাও বললেই হল? জান, এটা আসলে আমার উকিলের ফি?
মায়াবতী তাই নাকি? কিন্তু আমার কাছে তো কোনও পয়সা নেই। কী করে তোমাকে বাক্সের দাম দেব?
বিবেক নেই বললেই হল? তুমি তো পেত্নী, ঠিক?
মায়াবতী হ্যাঁ
বিবেক তার মানে ভূতের স্ত্রী লিঙ্গ, তাই তো?
মায়াবতী (আমতা আমতা করে) হ্যাঁ, মানে…
বিবেক (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) মানে ভূত তো! তা ভূতেরা তো খুব ভাল নাচতে জানে, তুমি একটু নাচো তো দেখি!
মায়াবতী কিন্তু আমি যে নাচতে জানিনা!
বিবেক নাচতে জাননা? তবে কিসের ভূত? সত্যজিৎ রায়ের ভূতগুলো কেমন সুন্দর নাচ গান করলো গুপী গায়েনে! গাইতে পার?
মায়াবতী তা একটু আধটু পারি বোধহয়।
বিবেক বেশ তো, তবে একটা গানই কর না হয়। ভাল গান শুনিয়ে খুশী করতে পারলে হয়ত বা বাক্সটা দিয়ে দেব তোমায়।
মায়াবতী সত্যি? দিয়ে দেবে। তবে শোন। (তারপরে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে। [পুরো গানটা হয়ত গাইবার প্রয়োজন হবে না – পরিচালকের বিবেচনা]) 
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
তুল তুল রাঙা পায়েতে 
ফুল ফুল বনছায়েতে 
পলাশের রঙ রাঙালো কখন 
চোখে সে স্বপন আঁকে 
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
গুন্ গুন্ গুন্ গুন্       (এই প্যারাগ্রাফ দুবার হবে)
ফিরে এলো ওই ফাল্গুন
পথিক মেয়ে হয় চঞ্চল 
কাঁকন বাজে ঠুন ঠুন ঠুন
পলাশের রঙ রাঙালো কখন 
চোখে সে স্বপন আঁকে
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
তুল তুল রাঙা পায়েতে 
ফুল ফুল বনছায়েতে 
পলাশের রঙ রাঙালো কখন 
চোখে সে স্বপন আঁকে 
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
ছুন্ ছুন্ ছুন্ ছুন্        (এই প্যারাগ্রাফ দুবার হবে)
ঝুমুর বাজে কার রুমঝুম্ 
মহুল বনে মৌ দোল দোল 
দু নয়নে নেই নেই ঘুম
পলাশের রঙ রাঙালো কখন 
চোখে সে স্বপন আঁকে 
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
তুল তুল রাঙা পায়েতে 
ফুল ফুল বনছায়েতে 
পলাশের রঙ রাঙালো কখন 
চোখে সে স্বপন আঁকে 
মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা 
বিবেক (হাততালি দিতে দিতে) বাঃ বাঃ, বেশ গাইলে তো! এবারে যদি আমাকে তিনটে “বর” দাও, তাহলেই বাক্সটা তোমাকে দিয়ে দেব, প্রমিস!
মায়াবতী আবার বরও দিতে হবে?
বিবেক বর দিতে হবে না? সত্যজিৎ-এর ভূতেরা তো আগে নাচল! তারপরে তিন তিনটে বর দিয়ে গুপী-বাঘাদের জীবন সেট্‌ করে দিল! তবে তো গেল! তা তুমি যখন নাচতে জানো না, তখন গান গেয়েই বর দাও…
মায়াবতী কিন্তু আমি যে বর দিতে জানি না! জান, এক একটা বর দেওয়া শিখতে অন্ততঃ ৭০-৭৫ বছর বন্ধ থাকা লাগে! আমি তো মাত্র ৫০ বছর বন্ধ ছিলাম, তাই ভাল করে শিখে উঠতে পারিনি…
বিবেক (কপট রাগ দেখিয়ে) ও, এই কথা! (বাক্সের ডালা খুলে মায়াবতীর দিকে এগিয়ে গিয়ে) ঢোকো, ঢোকো বলছি – শিগিগির এর মধ্যে ঢোকো। আরও বছর পঁচিশ বন্ধ করে রাখি, তারপরে না হয় বর দেওয়া শেখা হয়ে গেলে ডালাটায় ‘নক্‌’ কোরো তুমি। তখন আবার খুলে দেব।
মায়াবতী (ভয়ে দৌড়ে পালাতে পালাতে) না না না, আমাকে আবার বন্দী করো না, বন্দী করো না। আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, বন্দী করো না, একটা বর দিচ্ছি! একটা বর-ই জানি কিন্তু আমি।
বিবেক (বাক্সটা নামিয়ে রেখে) একটাই বর জান? আচ্ছা ঠিক আছে। একটা বর-ই হোক তাহলে। কী বর দেবে?
মায়াবতী কী আর বর দেব! আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে তুমি ভীষণ সৎ লোক, তাই এত গরীব হয়ে আছ। তোমাকে বর দিচ্ছি, যে তুমি যদি একটু দুনম্বরী কাজ করতে শেখো, তবে নিঃসন্দেহে অনেক পয়সা কড়ি কামাতে পারবে। কিন্তু মনে রেখ, দুনম্বরী করা একবার শুরু করলে কিন্তু আর সেটাকে ছাড়তে পারবে না। ছাড়লেই পুনর্মূষিক – সব শেষ!
বিবেক এটা আবার কী রকম বর? ভাল একটু বাড়ি ঘরদোর হবে তো? এই তো এঁদো একটা বাড়িতে পড়ে আছি…
মায়াবতী (হাসতে হাসতে) আচ্ছা, হবে হবে, বাড়ির “ক্লজ”-টাও ঢুকিয়ে দিচ্ছি তাহলে। শোনো –
(একটু গলা খাঁকারি দিয়ে)
পেত্নী আমি, রূপের রাণী
বর দিয়ে যাই যেমন জানি!
সৎ পথেতে চলতে গেলে
হেরেই যাবে বারে বারে।
জীবনটা যে ভাঁওতা বাজি,
লোক ঠকানোয় সবাই রাজী।
এবার থেকে সবকিছুতে
অসৎ পথে চলবে হেঁটে।
তবেই তোমার অর্থ হবে
বাড়িও তোমার উচ্চে যাবে।
কিন্তু যদি একটুকুও
দয়ার বশে কাজ করেছ,
সৎ পথেতে পা ফেলেছ,
তখন কিন্তু এক পলকে
পুনর্মূষিক হবেই হবে, 
হবেই হবে!
(বর দেওয়া শেষ হতেই আবার কামান দাগার মতো আওয়াজ হয়ে স্টেজের আলো নিবে গেল। একটু পরে আলো ফিরে আসতে দেখা গেল, মায়াবতী আর বাক্স, দুটোই অদৃশ্য)
বিবেক কী বলল রে বাবা! ‘বাড়িও তোমার উচ্চে যাবে’ – তার মানে? এটা আবার কী বর পেলাম আমি? কী বর? এই পেত্নী, শিগিগির ফিরে আয়, মায়াবতী – মায়াবতী-ই-ই-ই… ফিরে আয় বলছি!
(“মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা” গান হতে হতে পর্দা বন্ধ হয়ে গেল। প্রথম দৃশ্য সমাপ্ত)
— ০ —
[দ্বিতীয় দৃশ্য]
(পর্দা খুলতে দেখা গেল বিবেক মিত্র টেবিলে বসে ফাইল দেখছেন আর চা খাচ্ছেন)
নেপথ্য  “বিবেক বাবুর অফিসে মায়াবতী-র আবির্ভাবের পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। বিবেক বাবু অনেক চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছেন যে এবার থেকে মামলা জেতা্র জন্য প্রয়োজন হলে, তিনি দু-পাঁচটা মিথ্যে সাক্ষী ব্যবহার করতে দ্বিধা বোধ করবেন না। সম্প্রতি আদালতের মুহুরীকে একটু চা-সিঙ্গাড়া খাইয়ে তিনি অ্যাডভোকেট নীহার চন্দ-র পুরোনো কিছু কেস ফাইল, কপি করিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিছুদিন ধরে সেগুলোকেই তিনি নানা ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন”
বিবেক মিত্র (ফাইলের স্তূপ থেকে কিছু ফাইল টেবিলের এক ধারে রেখে, চেঁচিয়ে) বিকাশ, ও বিকাশ… (একটু অপেক্ষা করে) উঃ, একটা কথাও যদি কানে যায় কালাটার… (আরও জোরে) বিকাশ!
বিকাশ (তাড়াতাড়ি এসে) আমারে ডাকতেছিলে বাবু?
বিবেক মিত্র (বিরক্তি চেপে) হ্যাঁ হ্যাঁ, শোন্‌। দেখ্‌, আমি তোকে কতগুলো ঠিকানা লিখে দিয়েছি (বিকাশের হাতে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে)। তুই সাইকেলটা নিয়ে একটু বেরো। এরা সবাই নীহার উকিলের কাছে কেসে হেরে গিয়ে, অনেক সম্পত্তি খুইয়েছে। তুই এক্‌ এক্‌ করে ওদের সবার কাছে গিয়ে বল্‌বি যে আমি ওদের কেসগুলো খুব ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেছি। আমার মনে হয় অ্যাপিলে আমি ওদের সম্পত্তিগুলো ফিরিয়ে আনতে পারব কোর্টে গিয়ে। তবে পয়সা একটু বেশী লাগবে।
বিকাশ বেশী পয়সা লাগলে কি আর কেউ তোমার মক্কেল হবে?
বিবেক মিত্র (হেসে) আরে, কেন হবে না? হেঁ হেঁ, এই বিবেক মিত্র আর সেই বিবেক মিত্র নেই! এবারে আমি কেস ‘জিতবার’ জন্য লড়ব, ভাল মানুষ হবার জন্য নয়! আমি যাদের নাম তোকে দিয়েছি, তারা সবাই খুব শাঁসালো, বুঝলি তো! শাঁসালো! দেখবি, তারা সম্পত্তিগুলো ফিরে পাবার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারবে না! ওদের বলবি আমার অফিসে আসতে কাল-পরশু নাগাদ।
(বিকাশ লিস্ট হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল)
বিবেক মিত্র (পায়চারি করতে করতে) এই বিবেক মিত্র আর সেই বিবেক মিত্র নেই। এবারে ঠ্যালার নাম বাবুজি বলবে সকলে…
(হঠাৎ সার্কাসের জোকারের মতন চলন-বলন নিয়ে একটা লোক স্টেজে ঢুকে পড়ল আর চুপিচুপি পেছন থেকে বিবেক-এর পায়চারিকে “স্যাডো” করতে লাগল। [পরিচালক চাইলে সে কিছুক্ষণ ধরে নানান অঙ্গভঙ্গিও করতে পারে] তারপরে হঠাৎ সে এগিয়ে এসে পেছন থেকে বিবেকের কাঁধে একটা কামড় লাগাল)  
বিবেক মিত্র (খুব চমকে লাফিয়ে উঠে) আবে কে রে শালা! (ঘুরে আগন্তুককে দেখে) এই, কে রে তুই? কোত্থেকে এলি?
আগন্তুক  (আগন্তুক খুব হেসে ফেলল) আমি বিবেক!
বিবেক মিত্র (রেগে, কাঁধে হাত বোলাতে বোলাতে) ফাজলামি করছিস? কোত্থেকে ঢুকলি ঘরে? বেরো – বেরিয়ে যা বলছি – বেরিয়ে যা শিগিগির! চোর, না কী!
(আগন্তুক কিন্তু বেরোবার জন্য বিন্দুমাত্রও চেষ্টা করল না। বরঞ্চ হেসে, লাফিয়ে, দিব্যি স্টেজের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে থাকল) 
বিবেক মিত্র দাঁড়া, পুলিশ ডাকছি – বিকাশটাকেও আবার ঠিক এই সময়েই বাইরে পাঠালাম! রান্নার লোকটাও বোধহয় এখনও আসে নি। আজকাল চোর ছ্যাঁচোড়ের বড় উপদ্রব হয়েছে দেখছি… (মোবাইল ফোন বার করে তাড়াতাড়ি ফোন করবার চেষ্টা করলেন) আরে, ফোনও তো দেখছি… (দু তিন বার নানা ভাবে ফোন করবার চেষ্টা করলেন) ব্যাপারটা কী!
আগন্তুক  (হেসে, হাত পা নেড়ে) কোনও লাভ হবে না! ফোন এখন কাজই করবে না!
বিবেক মিত্র কী যে সব হচ্ছে আজকাল! (ফোন টেবিলে রেখে) কে তুই, শিগগিরই বল্‌, নয়ত ঘুঁষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেব বলছি! বয়সকালে বক্সিং করতাম রীতিমতন…
আগন্তুক (হেসে) জানি গো মশায়! বললাম তো, আমি বিবেক!
বিবেক মিত্র (রেগে) আরে হতভাগা, বিবেক তো আমি – আমার নাম নিয়ে ভ্যাঙানো হচ্ছে? তোর পদবী কী?
আগন্তুক  (হেসে) আরে, ভ্যাঙ্গাতে যাব কেন? আমার কোন পদবী টদবি নেই, আমি শুধু বিবেক! মাইরি বলছি! – (এগিয়ে এসে বিবেক মিত্র-র বুকে তর্জনী ঠেকিয়ে) আমি তো-ও-ও-ও-র বিবেক!
বিবেক মিত্র আমার বিবেক! সে আবার কী? (কথাটা বলেই একটু চিন্তিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটু পায়চারী করে নিলেন তিনি। তারপরে বললেন) আমার বিবেক? তা এসেই কামড়ে দিলি কেন? এটার কী মানে হল?
বিবেকের বিবেক (অবাক হয়ে) ওমা! “বিবেকের দংশন” কথাটা শুনিসনি বুঝি? কথাটা কী আর এমনি এমনি প্রবাদ বাক্য হয়েছে!
বিবেক মিত্র (কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে পায়চারী করবার পর, দুঃখ করে মাথা নাড়তে নাড়তে) নাঃ আমার কোনও বিবেক নেই। গরীব লোকেদের, মানে আমার মত অকৃতকার্য্য লোকেদের, এদের কোনও বিবেক থাকতে নেই। তাছাড়া, নীহার চন্দ-রই কি আর বিবেক আছে?
বিবেকের বিবেক (এই প্রথম গম্ভীর হয়ে) তোর তো এতদিন বিবেক ছিল বলেই সবাই জানত! কিন্তু যা শুরু করতে চলেছিস, তাতে তো মনে হচ্ছে তোর আর বিবেক বলে কিছু থাকবে না। 
বিবেক মিত্র (সমান গম্ভীর ভাবে) না, আমার মতন লোকের বিবেক না থাকাই ভাল! তুই যা, আমার আর বিবেকের দরকার নেই। আর আসবি না আমার কাছে।
বিবেকের বিবেক (দুঃখ করে) আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছিস? 
বিবেক মিত্র (বিবেকের পিঠে হাত দিয়ে তাকে দরজার দিকে ঠেলতে ঠেলতে) হ্যাঁ দিচ্ছি। আর আসবি না। আমার বিবেক না থাকলেই ভাল।
(বিবেককে বাইরে বার করে দিয়ে বিবেক মিত্র আবার টেবিলে এসে কিছুক্ষণ দুহাতের মধ্যে মুখ ঢেকে বসে থাকলেন। এমন সময় দরজায় জোরে জোরে “নক্‌” হল)
আগন্তুক মিত্র মশায় বাড়ী আছেন নাকি? বিবেক বাবু?
বিবেক মিত্র (স্বগতোক্তি) আরে, মক্কেল নাকি! (উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে) কে? আপনি কে? 
আগন্তুক (বাইরে থেকে) আজ্ঞে আমি পরেশ ঘটক। আমি “সিটি বিল্ডিং” ইন্সপেক্টর। একটু জরুরী কথা আছে…
বিবেক মিত্র (তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে) ও, আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন। কী ব্যাপার? আমার তো বিল্ডিং ইন্সপেক্সন কবে হয়ে গেছে – অকুপেশন সার্টিফিকেটও তো হাতে পেয়ে গেছি বহু দিন!
পরেশ ঘটক (ভেতরে ঢুকে) ওটা তো টেম্পোরারি “ড্যাশ ওয়ান ডট থ্রি” সার্টিফিকেট। ওটাকে কে তো পার্মানেন্ট করাতে হবে! কতদিন হল বাড়ি কমপ্লিট হয়েছে?
বিবেক মিত্র তা, এক বছর হল প্রায়।
পরেশ ঘটক ও, তবেই তো! সেইজন্যই তো আমাকে পাঠালো। আর ছ মাস পরেই টেম্পোরারি সার্টিফিকেটটা এক্সপায়ার করে যাবে। এখনই পার্মানেন্ট সার্টিফিকেটের অ্যাপ্লাই করে দিন।
বিবেক মিত্র কে পাঠালো আপনাকে?
পরেশ ঘটক কেন, আমার ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার, শিবু লাহিড়ী!
বিবেক মিত্র তিনি আবার কোন ডিপার্টমেন্টের?
পরেশ ঘটক ও সি ডি – অকুপেশন সার্টিফিকেশন ডিপার্টমেন্ট।
বিবেক মিত্র সেটা আবার কী? আমি তো খোদ বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট থেকেই সোজা সার্টিফিকেশন পেয়েছি।
পরেশ ঘটক পেয়েছেনই তো। তাই তো আমরা জানতে পেরেছি। ওদের সার্টিফিকেট তো টেম্পোরারী – দেড় বছরের মধ্যে আমাদের কাছ থেকে ওটাকে পার্মানেন্ট করে নিতে হয়। তা না হলে তো দেড় বছর পরে আপনি ইল্‌লিগাল অকুপেন্ট হয়ে যাবেন!
বিবেক মিত্র বলেন কী! নিজের বাড়িতে ইললিগাল? তারপরে?
পরেশ ঘটক তারপরে আর কী – বকেয়া সার্টিফিকেট গেজেটে আপনার নাম উঠে যাবে। তারপর সার্টিফিকেটটা নীলামে যাবে! আর তারপরে সেটা যে কিনে নেবে, সে সঙ্গে সঙ্গে এসে আপনাকে উচ্ছেদ করে বাড়ি দখল করে নেবে!
বিবেক মিত্র বাবা, এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! এই হল আমাদের কর্পোরেশনের ব্যুরোক্রেসি – আমাকে তো কেউ এটা বলে নি আগে… 
পরেশ ঘটক বলবে না কেন, বলতেই তো এসেছি স্যার। আপনি বোধহয় এর আগে কখনও বাড়ি কেনেন নি, তাই না?
বিবেক মিত্র না, তা তো কিনিনি। সেইজন্যেই তো এত আনাড়ি… আমাকে একটু কোর্টে গিয়ে খবর নিতে হবে এ ব্যাপারে… এ তো ভারী অন্যায়… মিউনিসিপাল কর্পোরেশন নিয়ে তো কাজ করিনি কখনও, তাই এসব জানতামই না…
(চিন্তা করে ঘুরতে ঘুরতে স্টেজের সামনে এগিয়ে এসে স্বগতোক্তি)
নতুন করে আবার সার্টিফিকেট করাতে হবে! কী জানি! পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে! বেটা গুল মারছে না তো? একবার সার্টিফিকেট পাবার পরেও সেটাকে আবার পার্মানেন্ট করতে হবে – এ কী হয় নাকি! আর আমি উকিল হয়েও সেটা কোনদিন জানবো না?
(পরেশের দিকে ফিরে গিয়ে)
তা, আপনার ডিপার্টমেন্টের নাম যেন কী বললেন – সার্টিফিকেট সাব-ইন্সপেকশন ডিপার্টমেন্ট?
পরেশ ঘটক না না, এফ সি ডি – ফাইনাল সার্টিফিকেশন ডিপার্টমেন্ট স্যার।
বিবেক মিত্র ও, হ্যাঁ, মনে পড়েছে – এক্ষুণি তো বললেন – ও সি ডি – অকুপেশন সার্টিফিকেশন ডিপার্টমেন্ট। (একটু সুর চড়া করে) সেটা আবার “ফাইনাল” হয়ে গেল কি করে?
পরেশ ঘটক (ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে) না, মানে ওই নামটা আমরা নিজেদের মধ্যে বলি স্যার – আমরাই ফাইনাল ডিপার্টমেন্ট কিনা, তাই। মুখ ফস্কে আপনাকে এফ সি ডি বলে ফেলেছি। আসল নামটা হল ও সি ডি – অকুপেশন সার্টিফিকেশন ডিপার্টমেন্ট – আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার।
বিবেক মিত্র (কড়া করে) বটে! তা ঠিক আছে, কোন বিল্ডিং-এ যেতে হবে বলুন, কাল আপনাদের অফিস খুললেই আমি পৌঁছে যাব।
পরেশ ঘটক (চমকে উঠে) আরে না না, সে কী কথা স্যার। আপনি আবার কষ্ট করে অতদূর যাবেন কেন! আমিই আবার ফর্মগুলো নিয়ে সকালে পৌঁছে যাব।
বিবেক মিত্র (পাইচারী করছিলেন এতক্ষণ। এবারে হেসে স্টেজের সামনের দিকে এসে স্বগতোক্তি) এতক্ষণে ঝেড়ে কেশেছে ব্যাটা! ঘুষ খেতে এসেছিস্‌, তা আগে বললেই পারতিস্‌ – অত ধানাই পানাই-এর কি দরকার? (এবারে পরেশের দিকে ঘুরে) তা বেশ তো, পুরো কত খরচ হবে মনে হয় পার্মানেন্ট সার্টিফিকেট করতে?
পরেশ ঘটক তা-আ-আ-, এরকম বাড়িতে লাখ দেড়েক তো লেগে যাবেই!
বিবেক মিত্র বলেন কী? পুরো বাড়িটা বানাতেই তো দু লাখ টাকা মতন লেগেছে মাত্র – ছোট্ট একতলা বাড়ি, এত টাকা লাগবে কেন?
পরেশ ঘটক তা লাগবে না? ইনফ্লেশন্‌ মশাই, ইনফ্লেশন্‌! সরকার তো টিভির সামনে গিয়ে চেপে চুপে বলে সবকিছু – আসলে কিন্তু ইনফ্লেশন হয়েছে ৪৭%। সব মিলিয়ে আপনার বাড়ির দাম তো এখন ছয় লাখ টাকারও বেশী হবে।
বিবেক মিত্র (হেসে) হে হে, আপনার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক মশায়! আমি জানতামই না যে আসল ইনফ্লেশন হয়েছে ৪৭%! তবে আরও আশ্চর্য লাগল শুনে যে ৪৭% ইনফ্লেশনেই বাড়ির দাম একবছরে তিন গুণ হয়ে গেছে!
পরেশ ঘটক (একটু অবাক হয়ে গিয়ে) আজ্ঞে, আপনি কি বললেন তা তো ঠিক বুঝলাম না…
বিবেক মিত্র আরে তেমন কিছু বলিনি! চিন্তা করবেন না। কালকে সকালে আসুন সব কাগজ পত্র নিয়ে, তারপরে কথা হবে। এখন আপনি আসুন!
পরেশ ঘটক হেঁ হেঁ, ঠিকই বলেছেন – আমি এখন তাহলে আসি – আমি আসি? কাল সকালে আবার দেখা হবে। এখন আসি তবে?… (মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে গেল)
(পরেশ বেরোতে বেরোতে বিকাশ ঢুকলো।)
বিকাশ (পেছন দিকে তাকাতে তাকাতে) ওইডা আবার কেডা গেল? যেন কালবোসেকির ঝড় বয়ে গেল!
বিবেক মিত্র কালবৈশাখীর ঝড়ই বটে! ব্যাটা একজন ঘুষখোর, চিনে রাখ্‌ ভাল করে। আবার কালকে আসবে! তা তোর কাজ কেমন হল? কারুর সঙ্গে দেখা হল?
বিকাশ (এক গাল হেসে) দেখা হয়নি মানে? আপনে চেয়ারে বসো, নয়ত পড়ি যাবে নিঘ্‌ঘাত! (বিবেক মিত্রকে ঠেলতে ঠেলতে চেয়ারে বসিয়ে দিল)
বিবেক মিত্র বাবা, তোর তো ফূর্তি আর ধরে না দেখছি। কী হয়েছে?
বিকাশ আপনি যে পাঁচটি ঠিকানা দেছিলেন, তাদের সবাইকেই ঘরে পেয়েছি। সবাই বলেছে তোমার সঙ্গে কথা বলবে, কাল-পড়শুনি এয়ে যাবে। কেবল একজন তোমাকে এখুনি টাকা দিয়ে দেছে। (খাম থেকে ১০১ টাকা বার করে বিবেক মিত্রের হাতে দিয়ে) এই নাও। আর সঙ্গে এই রসিদটাতেও বলেছে তোমাকে সই করতে। তাহলেই নাকি তুমি তার উকিল হয়ে যাবে। আমি আবার বাড়ি ফেরার পথে রসিদটা তাঁকে দিয়ে যাব।
বিবেক মিত্র আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, এই ১০১ টাকাটাকে বলে রিটেইনার – রসিদে সই করা মাত্র আমি তার উকিল হয়ে যাব। রসিদটা দে (বিকাশ রসিদটা এগিয়ে দিল) – আমি সই করে দিচ্ছি। ওঃ এটা তো দেখছি সরিৎ মল্লিক!
বিকাশ (কানে হাত দিয়ে) চললি? না না, যাই নাই। রসিদ নিয়ে তবে যাবনে।
বিবেক মিত্র আরে ধ্যুৎ, বলছি যে মক্কেলটা টাকা পাঠিয়েছে তার নাম সরিৎ মল্লিক। আমি ঠিক জানতাম যে ওই প্রথম টোপ গিলবে – অনেক টাকার সম্পত্তি খুইয়েছে… (রসিদটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে) হ্যাঁ, তুই বাড়ি যাবার পথে এটা সরিৎকে দিয়ে যাবি। হ্যাঁ হ্যাঁ, বাবা – নতুন বিবেকের প্রথম মক্কেল! (আরও কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তারপরে রসিদে সই করে দিল)
(রসিদে সই করা হতেই একটা অভাবনীয় কাণ্ড হল। হঠাৎ খুব জোরে ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচোর করে আওয়াজ হওয়া শুরু হল আর স্টেজের সব আলো নিবে গেল। ঘরের জিনিষ-পত্র, টেবিলের কাগজ পত্র সবকিছু উলটে পালটে পড়ে যাবার শব্দ শোনা গেল –আর অন্ধকারের মধ্যে থেকে আর্তনাদ শোনা গেল দুজনের)
বিবেক মিত্র এ তো বিরাট বড় ভূমিকম্প হচ্ছে বিকাশ – পায়ের নীচে মাটি ধড়ফড় করছে – পুরো বাড়িটাই না ভেঙ্গে পড়ে…
বিকাশ (কাঁদো কাঁদো হয়ে, বিবেক মিত্র-র গলাটাকে ছাপিয়ে) ও বাবাগো, ভূমিকম্পে যে আমার বড় ভয়…পা টলছে, গা গুলুচ্ছে, হাঁটু ভেঙ্গে যাচ্ছে… বাবাগো, মা-রে, আমাকে বাঁচাও, বাবু তুমি কোথায়, আমার যে ভূমিকম্পে ভীষণ ভয়… মা শীতলা, বাঁচাও আমাকে…
বিবেক মিত্র আরে ধুত্যারী, শীতলা পুজো তো বসন্ত হলে দেয়, তোর কী বসন্ত হয়েছে?
বিকাশ না না, আমার তো ভূমিকম্প হয়েছে! কাকে ডাকব? 
বিবেক মিত্র কাউকে ডাকতে হবে না, ভূমিকম্প আর কতক্ষণ থাকে? এক্ষুণি থেমে যাবে, চুপ করে বসে থাক্‌! 
বিকাশ আমি তো এখন আর বসে নেই বাবু, উলটে পড়ে গেলুম যে। (প্রায় কাঁদতে কাঁদতে) এখন কি আবার উঠি বস্‌তি হবে?
বিবেক মিত্র কিচ্ছু করতে হবে না, শুয়েই থাক্‌, আর প্যানপ্যান করিস না।
(সৌভাগ্যবশতঃ, আরও দু চারটে জিনিষ উলটে পরার আওয়াজ হয়ে, সবকিছু চুপচাপ হয়ে গেল, আর স্টেজের আলোও সব জ্বলে উঠল। দেখা গেল যে বিকাশ একটা চেয়ারের সামনে মাটিতে উলটে পড়ে আছে। তার একটা পা টেবিলের হাতলে আটকে ওপর দিকে উঠে আছে। ঘরে জিনিষপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বিবেক রায় মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আছেন। আলো আসতেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বিকাশ-ও)
বিবেক মিত্র (সন্দিগ্ধভাবে) আচ্ছা এতবড় একটা ভূমিকম্প হল, কই শাঁখ টাঁখ তো বাজলো না পাড়ায়? ব্যাপারটা কী – বিকাশ যা তো একটু, বেরিয়ে দেখ কী ব্যাপার। পাড়ার লোকজন কেউ নিশ্চয়ই বেরিয়েছে…
বিকাশ আমি? আমি বা-বা-বা-ইরে যাব? আবার যদি ভূ-ভূ-ভূ-মিকম্প হয়?
বিবেক মিত্র (ধমক দিয়ে) ন্যাকামি করতে হবে না, যা দেখে আয়!
বিকাশ (স্টেজ থেকে বেরিয়ে, একটু পরে চিৎকার করে) বাবু, বাবু শিগগির এস, আমাদের বাড়িতে একটা সিঁড়ি হয়ে গেছে…
বিবেক মিত্র (অবাক হয়ে) বলিস কিরে? একতলা বাড়িতে সিঁড়ি? এতদিন সিঁড়ি দেখলি না, আজ হঠাৎ ভূমিকম্পের পরে সিঁড়ি দেখছিস?(স্বগতোক্তি) ভয়ের চোটে লোকটার মাথাই খারাপ হয়ে গেছে, কল্পনা শক্তি খুব বেড়ে গেছে (আবার বিকাশকে উদ্দেশ্য করে) – সিঁড়ি দেখছিস ঠিক?
বিকাশ হ্যাঁ বাবু! 
বিবেক মিত্র (স্বগতোক্তি – হাসতে হাসতে) একতলা বাড়িতে সিঁড়ি – ওটা ওর নরকের সিঁড়ি বোধহয় (বিকাশর দিকে ফিরে) তা বেশ তো, সিঁড়ি ধরে নীচে নেবে যা না, দেখ্‌ কোথায় গেছে!
বিকাশ যাব?
বিবেক মিত্র হ্যাঁ হ্যাঁ, নেমে দেখ্‌ কোথায় গেছে ওটা!
বিকাশ (কিছুক্ষণ চুপচাপের পর উত্তেজিত হয়ে খুব চিৎকার করে) বাবু বাবু শিগগিরই নীচে এস, তোমার বাড়ি দোতলা হয়ে গেছেন!
বিবেক মিত্র বলিস কী রে? বাড়ি আবার নিজে নিজে দোতলা হয়ে যায় নাকি? আবোল তাবোল বকছিস্‌ কেন?
বিকাশ তুমি শিগগির নীচে এস – নিজে দেখ!
বিবেক মিত্র আসছি।
(বিবেক মিত্র হন্তদন্ত হয়ে স্টেজ থেকে বেরিয়ে গেলেন।)
বিবেক মিত্র (কিছুক্ষণ পরে দূর থেকে) তাই তো, বাড়িটা তো দেখছি দোতলা হয়ে গেছে!
(বিবেক মিত্র একটু পরে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে স্টেজে ঢুকে অডিয়েন্স-কে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে)
বিবেক মিত্র আমার বাড়িটা হঠাৎ দোতলা হয়ে গেছে!
(পর্দা বন্ধ হয়ে গেল। দ্বিতীয় দৃশ্য সমাপ্ত)
— ০ —
[তৃতীয় দৃশ্য]
(পরের দিন সকাল বেলা। পর্দা খুলতে দেখা গেল বিবেক মিত্র চা খেতে খেতে টেবিলে বসে ফাইল দেখছেন আর বিকাশ ফার্নিচারের ধুলো ঝাড়ছে। এমন সময় দরজায় জোরে জোরে “নক্‌” হল)
আগন্তুক (দূর থেকে) মিত্র মশায় বাড়ী আছেন নাকি? মিত্র বাবু?
বিবেক মিত্র (বিকাশ-কে) এই, কালকের সেই ঘুষখোরটা এসেছে দেখ্‌। বেশী বাক্যব্যয় করবি না ওর সাথে। শুধু দরজাটা খুলে এখানে নিয়ে আয় ওকে।
পরেশ ঘটক (চারিদিকে মাথা ঘুরিয়ে স্টেজে ঢুকতে ঢুকতে) আমি সিওর যে কালকে এটা একটা একতলা বাড়ি ছিল! আশ্চর্য্, এখন দেখছি এটা দোতলা বাড়ি!
বিবেক মিত্র (টেবিলে বসে ফাইল দেখতে দেখতে) কী হয়েছে, পরেশবাবু? কী বলছেন?
পরেশ ঘটক (খুবই ঘাবড়ে গিয়ে, চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে) স্যার, কালকে যখন আপনার সঙ্গে দেখা করলাম, তখন তো এটা একটা একতলা বাড়ি ছিল, তাই না? সিঁড়ি বলে তো কিছু দেখিনি – সিঁড়ি বেয়ে তো উঠিনি! আর একরাতের মধ্যে আজকে এটা দিব্যি দোতলা হয়ে গেছে!
বিবেক মিত্র (হেসে) আপনি কী ধুমপান করেন?
পরেশ ঘটক (অবাক হয়ে) অ্যাঁ?
বিবেক মিত্র মানে, গঞ্জিকা সেবন করেন?
পরেশ ঘটক তার মানে?
বিবেক মিত্র তা না হলে এত আজগুবি কথা বলছেন কেন? এক রাত্তিরের মধ্যে কি কোনও বাড়ি হঠাৎ দোতলা হয়ে যেতে পারে?
পরেশ ঘটক না না, সে তো হতেই পারে না স্যার! এরকম কী কখনও হয়! (তবুও সে চারিপাশ সন্দিগ্ধভাবে দেখতে থাকে) তবু…
বিবেক মিত্র (ধমক দিয়ে) তবু কী? কাগজপত্র এনেছেন?
পরেশ ঘটক এনেছি স্যার, কিন্তু ভুল হয়েছে তো! (বলে আবার সন্দিগ্ধ ভাবে চারিপাশ দেখতে দেখতে) আমি তো একতলা বাড়ির ফর্ম ফিল আপ করে নিয়ে এসেছি। ওতে তো কাজ হবে না স্যার – (তারপরে একটু আত্মবিশ্বাস নিয়ে) কিন্তু দোতলা বাড়ির জন্য টাকা আরও বেশী লাগবে স্যার!
বিবেক মিত্র (হেসে) তাই নাকি? (ব্যঙ্গ করে) তো কত লাগবে এখন?
পরেশ ঘটক (কানের ওপরে রাখা পেন্সিলটা নিয়ে নোটপ্যাডে কিছুক্ষণ হিসেব করে) তা আপনার আড়াই লাখ মতন দিতে লাগবে। এ বাড়ির দোতলা করবার প্ল্যান অ্যাপ্রুভাল আছে তো?
বিবেক মিত্র (মাথা নেড়ে) নিশ্চয়ই আছে, নিশ্চয়ই আছে! (তারপরে হেসে) আর না থাকলেই বা কী – আপনি ব্যাকডেট করে একটা প্ল্যান ‘পাস’ করিয়ে দিতে পারবেন না? কত এক্সট্রা লাগবে?
পরেশ ঘটক (খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে) কী যে বলেন স্যার! পরেশ ঘটক পারে না এমন কিছু কাজ আছে নাকি? অন্ততঃ বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টে তো নেই! আরও লাখ খানেক টাকা বেশী লাগবে শুধু।
বিবেক মিত্র বেশ তো, আপনি একটা দোতলার অ্যাপ্রুভড প্ল্যান নিয়ে আসুন তবে।
পরেশ ঘটক নো প্রবলেম, তাতে আর কী সমস্যা! নিয়ে আসব, কোনো ব্যাপারই নয়। তবে একটু, (ইতস্ততঃ করে) পঞ্চাশ হাজার টাকা মতন অ্যাডভান্স লাগবে স্যার আজকে।
বিবেক মিত্র (ধমক দিয়ে) অ্যাডভান্স? অ্যাডভান্স আবার কী? ফেল কড়ি, মাখ তেল! প্ল্যান নিয়ে আসুন, তখন টাকা দেব। আর নয়ত বলুন, আমার বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টের আরও অন্য লোকের সঙ্গে জানাশুনা আছে…
পরেশ ঘটক (চমকে উঠে) না না স্যার, তা নয়, আর কারুর দরকার নেই, আমিই কাজটা করে দেব। তবে একটু অ্যাডভান্স হলে ভাল হত, একটু এদিক ওদিক টাকা খাওয়াতে হবে তো…
বিবেক মিত্র ওসব আমি কিছু জানি না। খাওয়াতে হবে কী আঁচাতে হবে, এসব আপনার ব্যাপার। আমার হচ্ছে ডেলিভারী। মাল নিয়ে আসবেন, পেমেন্ট নিয়ে যাবেন।
পরেশ ঘটক টাকাটা সেদিনই পাব তো? ক্যাশ চাই কিন্তু স্যার…
বিবেক মিত্র ক্যাশই নিয়ে যাবেন, তাতে আর সমস্যা কী?
পরেশ ঘটক বেশ তো! তা এই কাজটা করতে একটু সময় লাগবে – তিন মাস তো বটেই। তা মাস তিনেক বাদেই আসব তাহলে। কিন্তু আর কাউকে ডাকবেন না এর মধ্যে। আমি একেবারে বাড়ি এসে হোম ডেলিভারী দিয়ে যাব। তা… একটু বাড়িটা দেখে নক্সা করে নিয়ে যাই, ব্লু প্রিন্ট করাতে হবে তো ! কেউ কি বাড়িটা আমাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে?
বিবেক মিত্র নিশ্চয়ই। (জোরে, বিকাশের দিকে তাকিয়ে) বিকাশ, পরেশবাবুকে একটু বাড়িটা দেখিয়ে দে – বি-কা-শ…
বিকাশ (চমকে উঠে) গাড়ি! হ্যাঁ হ্যাঁ, গাড়ি ডেকে দিচ্ছি – কী গাড়ি ডাকব, ট্যাক্সী, না ওলা?
বিবেক মিত্র আরে দূর হতভাগা, গাড়ি নয়, এনাকে বাড়িটা একটু ঘুরে দেখিয়ে দে!
বিকাশ ও, তাই বলেন বাবু! (পরেশের দিকে তাকিয়ে) আসেন বাবু, আপনারে বাড়ি দেখাই (পরেশ আর বিকাশ বেরিয়ে যায়)
(পর্দা বন্ধ হয়ে গেল। তৃতীয় দৃশ্য সমাপ্ত)
[চতুর্থ দৃশ্য]
(পর্দা খুলতে দেখা গেল বিবেক মিত্র টেবিলে বসে ফাইল দেখছেন আর চা খাচ্ছেন। সকাল বেলা বলে তখনও পাজামা-কুর্তা পরে আছেন।)
নেপথ্য  “সেদিনের পরে বেশ মাস কয়েক কেটে গিয়েছে। বিবেকবাবুর পসার হঠাৎ খুব বেড়ে গিয়েছে – অনেকগুলো কেসও জিতে গিয়েছেন পরপর। তার ফলে তিনি এখন বেশ ধনী মানুষ। সবথেকে মজার কথা হল, যে কোর্টে শুনানী পেতে তাঁর কোনও অসুবিধে হয়নি। আপনারা সবাই জানেন, যে আমাদের দেশের কোর্টে জজ সাহেবের সামনে পৌঁছতেই মাস-বছর কাবার হয়ে যায়; সময়মত বিচার পাওয়ার আশা করা তো বাতুলতা! অথচ বিবেক বাবু যেদিনই কেস দাখিল করেছেন সেদিনই শুনানী পেয়ে গেছেন। মায়াবতীর বর না পেলে নিশ্চয়ই এটা কখনও সম্ভব হতোনা। বলা বাহুল্য, তিনি এখন আর ভাল মানুষ উকিল নেই। যখন যেখানে যেভাবে দরকার হয়েছে, তখন সেখানে, সেভাবেই কেস জেতবার ব্যবস্থা করেছেন। ফলে তাঁর বাড়ি, মায়াবতীর কল্যাণে, এখন দশতলা উঁচু হয়ে গিয়েছে।”
(বিবেকের বিবেক পেছন দিয়ে স্টেজে ঢুকে এসে চুপিচুপি বিবেক মিত্র-র কাঁধে আবার একটা কামড় দিল)
বিবেক মিত্র (চমকে উঠে দাঁড়িয়ে) আবার এসে কামড় দিচ্ছিস? তোকে বলেছি না…
বিবেকের বিবেক (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) কামড়াব না? লাখ লাখ টাকা তো দিব্বি কামিয়ে ফেলেছিস এই ক’মাসে, কিন্তু তাতে কী সত্যিই খুশী আছিস তুই? সারা জীবন যে একটা প্রিন্সিপ্‌ল মেনে চলতিস তা তো…
বিবেক মিত্র থাম্‌ তুই!
বিবেকের বিবেক  থামব কেন? রাতের পর রাত তোর ঘুম হচ্ছে না, আর এদিকে ব্যাঙ্ক ব্যালান্সে যত সব ‘শুন্য’, যেগুলো আগে সংখ্যার বাঁদিকে থাকত, সেগুলো গিয়ে এখন ডানদিকে জমছে! কটা “শূন্য” জমেছে শুনি তোর, সংখ্যার ডানদিকে? 
বিবেক মিত্র অনেক, অনেক; তাতে তোর কী?
বিবেকের বিবেক আমার ‘কী’ মানে? ঘুম নেই, চোখের কোলে কালি পড়ছে, মনে আনন্দ নেই, জীবনে নীতি, আদর্শ বলে কিছু নেই, কেবল টাকা টাকা টাকা! টাকা বানাবার একটা যন্ত্র হয়ে গিয়েছিস শুধু! দাঁড়া, মায়াবতীকে গিয়ে বলছি আমি, মাথায় একটু ন্যায়-অন্যায় জ্ঞানটা আবার ঢুকিয়ে দিতে…
বিবেক মিত্র (রেগে তেড়ে গিয়ে) এই, খবরদার! ওই পেত্নী আমার ভাল বই মন্দ করেনি! ওকে একদম ঘাঁটাবি না বলে দিচ্ছি!
বিবেকের বিবেক ঘাঁটাবো না মানে? পেটি খুলে লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করতে দিয়ে সে তোর পুরো মনুষ্যত্বটাই কেড়ে নিয়েছে! এক্ষুণি গিয়ে তাকে তুলোধনা করছি, দাঁড়া না – আজকেই একটা এসপার ওসপার করে ছাড়ব…
বিবেক মিত্র চোপ্‌! ও তোর কী ক্ষতি করেছে শুনি?
বিবেকের বিবেক ক্ষতি মানে? তুই পুরোপুরি অমানুষ হয়ে গেলে কী আর আমার কোনও অস্তিত্ব থাকবে, না থাকতে পারে! এভাবে আমার অস্তিত্ব বিপন্ন করবার কোনও অধিকার তার নেই নেই নেই!
বিবেক মিত্র তোর অস্তিত্ব নিয়ে আমার কী মাথাব্যাথা?
বিবেকের বিবেক তোর মাথাই আর বাকি নেই তো মাথাব্যাথা! তবে ওপরওয়ালার কাছে গিয়ে সকলকেই জবাবদিহি করতে হয় একদিন না একদিন! সে মাকড়সাই হোক আর পেত্নীই হোক! 
বিবেক মিত্র এই পেত্নীই আমাকে জীবনের নতুন মানে খুঁজে দিয়েছে – নাকি সেটা তুই বুঝতে পারছিস না?
বিবেকের বিবেক বুঝছি বলেই তো তোর ভালর জন্য এত কথা বলছি! আমি শুধু গিয়ে তাকে বলব তোর মনুষ্যত্ব ফিরিয়ে দিতে। জগতের সমীকরণ  সে নষ্ট করতে পারে না, পারে না, পারে না! তোর ভালর জন্যই এটা করছি…দেখ্‌ না…
বিবেক মিত্র (প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বিবেকের বিবেক-কে ধাক্কা দিয়ে স্টেজ থেকে বার করে দিতে দিতে) বেরো তুই! আমার আর ভাল করতে হবে না তোকে, অনেক করেছিস… বেরো… বেরো… আর খবরদার এদিকে পা-ও মাড়াবি না বলে দিচ্ছি… যত সব স্বার্থপর, “ডু গুডার”-এর দল (গজগজ করতে করতে দিয়ে ডেস্কে গিয়ে আবার বসে পড়লেন তিনি)
(একটু পরে একটা দামী কলিং বেল-এর শব্দ শোনা গেল)
বিবেক মিত্র (জোরে) – বিকাশ, ও বিকাশ, দেখ্‌ তো কে বেল বাজালো, (হাত ঘড়িটা দেখে) চেম্বার খোলার তো সময় হয়নি এখনও, আমি তো তৈরীও হইনি!
বিকাশ (দরজার দকে তাকিয়ে, চেঁচিয়ে) আসতেছি, আসতেছি দাঁড়ান… 
(স্টেজের এক উইং দিয়ে ঢুকে আবার অন্য উয়িং-এ গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজা খুলতেই পরেশ ঘটক গলায় আর বুকে হাত দিয়ে কাশতে কাশতে স্টেজে ঢুকে কোনওরকমে একটা চেয়ারে বস পড়ল)
পরেশ ঘটক (ভীষন কাশতে কাশতে আর হাঁপ নিতে নিতে) – আ-আ-আ-আটতলা বানিয়েছেন – আ-আ-আ-র লিফট্‌ লাগাননি স্যার! সিঁড়ি বেয়ে-এ-এ-এ উঠ-উঠ-উঠতে গিয়ে তো মরে – মরে -মরেই যাচ্ছিলাম স্যার। খুব বেঁচে গেছেন আপনি – খুব বেঁচে গেছেন স্যার – (বলতে বলতে কাঁধের ঝোলা থেকে জলের বোতল বার করে জল খেতে খেতে হাঁপাতে থাকল)
বিবেক মিত্র (পরেশের অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে) কী থেকে বেঁচে গেছি ঘটক মশাই?
পরেশ ঘটক (এখনও হাঁপাতে হাঁপাতে) ব্র-ব্র-ব্র-ব্রহ্মহত্যা থেকে স্যার। আমি তো, আমি তো, ম-ম-মরেই যাচ্ছিলাম স্যার!
বিবেক মিত্র (হাসতে হাসতেই) ওই সব সস্তার বিড়ি টিড়ি আর খাবেন না – একেবারে লাংস-এ চড়া পড়ে যাচ্ছে যে! ইয়াং ম্যান, আর দশ তলা সিঁড়ি উঠতেই মরে যাচ্ছিলেন? ‘নেপোয় মারে দই’ করে তো লক্ষ লক্ষ টাকা কামাচ্ছেন মশায় – একটু ভাল চুরুট টুরুট খান। (টেবিলের ওপরে রাখা একটা দামী সিগারের বাক্স খুলে পরেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে) এই নিন, একটা হাভানা চুরুট খান…
পরেশ ঘটক (এতক্ষণে হাঁপানোটা একটু গেছে) বলেন কি স্যার, হাভানা চুরুট! (একটা চুরুট তুলে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আর শুঁকতে শুঁকতে) বাঃ, এ তো স্যার এক একটার কয়েক হাজার টাকা করে দাম হবে! (তারপর ঠোঁটে দিয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়ে দেশলাই/ লাইটার খুঁজতে খুঁজতে) খাই স্যার? খাই?
বিবেক মিত্র আরে খান না! কেন খাবেন না? খাবার জন্যই তো দিলাম!
পরেশ ঘটক (লাইটার দিয়ে চুরুট জ্বালাতে গিয়ে তাড়াতাড়ি চুরুট-টা মুখ থেকে বার করে) না না স্যার, এটা বাড়ি নিয়ে গিয়ে সন্ধেবেলা একটু আরাম করে খাই, কি বলেন? (বিবেক মিত্র চুরুটের বাক্সটা নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। তখন তাড়াতাড়ি করে) স্যার স্যার, দাঁড়ান একটু…
বিবেক মিত্র (পেছন ঘুরে) কী, বলুন!
পরেশ ঘটক (আমতা আমতা করে) স্যার, আর একটা নিয়ে যাই, কাল আমার জন্মদিন, তাই কাল আর একটা খাব… মানে আপনার তো অনেকগুলো আছে দেখলাম কিনা, তাই…
বিবেক মিত্র (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ, হ্যাঁ নিন না, লোককে দেবার জন্যই তো কেনা … (পরেশ আরও দু চারটে চুরুট তুলে পাঞ্জাবীর পকেটে ঢুকিয়ে রাখল)… তা বলুন পরেশ বাবু। আজ কী পূণ্য করেছি যে সাত সকালেই আপনার পদধূলি পেলাম!
পরেশ ঘটক কী যে বলেন স্যার! হেঁ হেঁ, আপনাদের দয়াতেই তো যা হোক তবু একটু আধটু খেয়ে পরে বাঁচতে পারি আমরা। (কাঁধের ব্যাগটা হাতড়ে হাতড়ে একটা কাগজ বার করতে করতে) তা আমি তো গেল দিনে যেমন আপনাকে কথা দিয়েছিলাম, সেই মতনই একটা নক্সা বানিয়ে নিয়ে এসেছি। (তারপরে বিবেক মিত্রের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে তাঁকে সেটা এগিয়ে দিয়ে) কিন্তু তো এটা আবার ভুল প্ল্যান হয়ে গেছে, বুঝতেই পারছেন – এটা একটা দোতলার বাড়ির প্ল্যান!
বিবেক মিত্র (খুব অবাক হবার ভান করে) সে কী কথা মশায়, দশতলা বাড়ির জন্য দোতলার প্ল্যান এনেছেন কেন? এটা নিয়ে কী করব আমি?
পরেশ ঘটক কী আর করবেন! আমাকে আগে বকেয়া তিন লাখ টাকা নগদ দেবেন। তারপরে এই কাগজটা দিয়ে উনুনে আগুন ধরিয়ে আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দেবেন। ইতিমধ্যে আমি হিসেব করে দেখছি আপনার আর কত টাকা বেশী লাগবে এই ইল্‌লিগাল দশতলা বাড়ি বানানোর জন্যে। 
বিবেক মিত্র (পরেশের লম্ফঝম্ফ দেখে বেশ কৌতুক বোধ করে) আচ্ছা আচ্ছা, তা আগে বলুন যে আমাকে হঠাৎ বেমক্কা একটা দোতলা বাড়ির প্ল্যান কেন হাতে ধরিয়ে দিলেন? আমি কি কখনও এটা চেয়েছি যে আপনাকে এখন তিন লাখ টাকা নগদ দেব?
পরেশ ঘটক (রেগে গিয়ে) টাকা দেবেন না মানে? সেদিনই কথা দিলেন – আপনার মত ভদ্রলোকের মুখের কথা – সেদিনই বললেন যে আপনার দোতলা বাড়ির নক্সা নেই, আমি যাহোক করে ঘুষ টুষ দিয়ে একটা প্ল্যান পাস করিয়ে দিলেই আপনি নগদ টাকা দিয়ে দেবেন! এখন দিন সেই টাকা আগে!
বিবেক মিত্র (হাসতে হাসতে) আপনার কী এখনও সিঁড়ি ভেঙ্গে মাথা ঘুরছে? আমার দশতলা বাড়ি, আমি দোতলার প্ল্যান কেন চাইব?
পরেশ ঘটক তখন যে আপনার বাড়ি দোতলা ছিল!
বিবেক মিত্র দোতলা ছিল? কতদিন আগে হবে সেটা বলুন তো? 
পরেশ ঘটক কেন, সে তো এখনও তিনমাসও হয়নি পুরো!
বিবেক মিত্র হা হা, কতদিন বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করছেন মশাই?
পরেশ ঘটক সে তো বছর পনেরো হতে চলল (তারপর রেগে) কেন, তাতে আপনার কী স্যার?
বিবেক মিত্র আমার কিছুই নয় মশায়। তবে দোতলা বাড়িকে দশতলা করতে কতদিন সময় লাগে বলুন তো?
পরেশ ঘটক এমনিতে তো অন্ততঃ একবছর লাগে, কিন্তু আপনি যে কিছু ভাল রকম দুনম্বরী করছেন, সেটা আমি বুঝে গেছি স্যার। হেঁ হেঁ, পরেশ ঘটককে অত বোকা ভাববেন না। দুনম্বরীটা যে ঠিক কী তা এখনও বুঝতে পারিনি বটে, কিন্তু সাংঘাতিক কিছু না থাকলে একরাতের মধ্যে একতলা থেকে দোতলা, আর তিনমাসের মধ্যে দোতলা থেকে দশতলা কেউ বানাতে পারেনা। (বিবেক মিত্র-র দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে) বুঝেছি আপনি খুব চালাক লোক, উকিল সাহেব, কিন্তু একটা সামান্য ভুলের জন্য ধরা পড়ে গেলেন আমার কাছে…পরেশ ঘটকের চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়, বুঝলেন…
বিবেক মিত্র (অবাক হয়ে) তাই নাকি, কী ভুল?
পরেশ ঘটক ভুল মানে? আপনি যদি আইন মাফিক প্ল্যান করে বাড়িটা বানাতেন তবে যে কন্ট্রাক্টারই হোক না কেন, আজকালকার দিনে কেউ পাঁচতলার বেশী হলে, লিফ্‌ট না লাগিয়ে আর কাজ শেষ করতে পারত না। তা না হলেই তো ঘচাৎ – তার লাইসেন্সটা একেবার কাটা যেত!
বিবেক মিত্র (একটু আশ্বস্ত হয়ে মুচকি হেসে) আমার মায়াবতী পেত্নী বোধহয় লিফ্‌ট বানাতে জানে না!
পরেশ ঘটক কী কী? কার নাম বললেন? সে কে?
বিবেক মিত্র আরে সেই তো এই বাড়িটা বানিয়েছে!
পরেশ ঘটক তার মানে সে আপনার আর্কিটেক্ট? কী নাম? মায়াবতী পেত্নী? সে আবার কিরকম নাম? পেত্নী কি রকম পদবি হল? বাঙ্গালী নয় বোধহয়!
বিবেক মিত্র বাঙ্গালী, বাঙ্গালী – পেত্নী নয়, মায়াবতী গেট্‌নী – আমেরিকান বিয়ে করেছে সম্ভবতঃ।
পরেশ ঘটক গেট্‌নী? মায়াবতী গেট্‌নী – আমাদের খাতায় কী তাঁর নাম অ্যাপ্রুভড বলে রেজিস্টার করা আছে? তা না হলে কিন্তু আপনি আরও বিপদে পড়বেন – দাঁড়ান দেখছি (স্মার্ট ফোন নিয়ে অনেকক্ষণ বোতাম টোতাম টিপে)– নাঃ, আর্কিটেক্ট লিষ্টে নাম নেই। মায়াবতীও নেই, গেট্‌নীও নেই…
বিবেক মিত্র তা হলে কী হবে?
পরেশ ঘটক কিছুই হতে হবে না স্যার, আমি সব ম্যানেজ দিয়ে দিতে পারব। লিফ্‌ট না থাকলেও, আটতলার প্ল্যান ঠিক ম্যানেজ করে দেব। কিন্তু টাকা লাগবে স্যার, অনেক টাকা – এবারে আর ঘরের টাকা অ্যাডভান্স করে আপনার কাজ করাতে পারব না!
বিবেক মিত্র কত লাগবে?
পরেশ ঘটক আগে তো বকেয়া তিন লাখ টাকাটা দেবেন। তারপরে আরও লাখ দশেক টাকা অ্যাডভান্স করতে হবে। এত কাজ পঞ্চাশ লাখের কমে কিছুতেই হবেনা মনে হয়। আপনার আর্কিটেক্ট-ও লাইসেন্সড নয়!
বিবেক মিত্র অসম্ভব!
পরেশ ঘটক অসম্ভব মানে? টাকা না পেলে আজকেই লক আউট করে দেব আপনার বাড়ি!
বিবেক মিত্র (ভীষন রেগে) বাড়ি লক আউট করবে মানে?
পরেশ ঘটক (বুক ফুলিয়ে আঙ্গুল উঁচু করে) লক আউট মানে একেবারে কোর্টের অর্ডার আনব, আর পুলিশ এনে দরজায় চেন লাগিয়ে দেব, আর চেনে বড় তালা লাগিয়ে, বাড়ী সিল করে দেব। এবারে টাকা ছাড় চাঁদু – নয়ত মজা বুঝবে আজকেই!
বিবেক মিত্র শালা ঘুষখোর!
(এবারে বিবেক মিত্র আর পরেশের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বেধে যায়। তবে কোনও আওয়াজ শোনা যায় না। শুধু দুজনে দুজনের দিকে আঙ্গুল নেড়ে নেড়ে আর মুখের কাছে মুখ নিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ঝগড়া করে যায়। [পরিচালক চাইলে এই সময়ে কিছু ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক চালাতে পারেন] অবশেষে বিবেক মিত্র পরেশ-কে ধাক্কা দিতে দিতে দরজার কাছে নিয়ে যান)
বিবেক মিত্র (ঠেলা দিয়ে) বেরো শালা। আর যদি কোনওদিন এ বাড়িতে ঢুকেছিস তো ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব!
পরেশ ঘটক ঘুষখোর – দাঁড়া না, এক্ষুনি যদি পুলিশ এনে তোর বাড়ি সিল না করে দিই তো আমার বাপের নাম গণেশ!
(পরেশ কে ঠেলে বাড়ি থেকে বার করে দিলেন বিবেক বাবু। তারপরে তিনি সবে চেয়ারে গিয়ে বসে একটু হাঁপ ছেড়েছেন, তখনই আবার কলিং বেল-এর শব্দ শোনা গেল)
বিবেক মিত্র (বিকাশর দিকে ফিরে) দ্যাখ তো গিয়ে আবার কে এল!
(বিকাশ একজন টেলিফোন রিপেয়ারম্যানকে স্টেজে নিয়ে এল। রিপেয়ারম্যান-এর হাতে জলের খোলা বোতল)
আগন্তুক (হাঁপাতে হাঁপাতে) ন- ন- নমস্কার, স্যার। (মুখে চোখে জল দিতে দিতে হাঁপাতে থাকল)
বিবেক মিত্র নমস্কার, আমার বেডরুমের টেলিফোনটা সারাতে এসেছেন?
আগন্তুক (জল খেতে খেতে, থেমে থেমে, হাঁপ নিতে নিতে, আর রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে) আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। বস্‌ আমাকে বলল, শু-শু-শুভ – মা-মা-মা-নে আমার নাম শুভব্রত তো… (নারী চরিত্র হলে বিকল্পে “শুভা”) উকিলবাবুর ফোনটা আজকে সারিয়ে দিয়ে আয় – আঃ (হাঁপাতে থাকে)
বিবেক মিত্র গুড্‌! ফোনটা তো আগে ঠিকই চলছিল, কিন্তু কিছুদিন হল আর কাজ করছে না। বোধহয় লাইনটা ইঁদুরে কেটে দিয়েছে…
শুভ/শুভা (এদিক ওদিক দেখে একটু বিশ্রাম নিয়ে) তা স্যার, আপনার লিফটটা কোন দিকে? আমি তো খুঁজেই পেলাম না, তাই মিছিমিছি এতগুলো সিঁড়ি ভাঙ্গতে হল – যা কষ্ট হচ্ছিল!
বিবেক মিত্র (হেসে) আরে একটু কষ্ট না করলে ক আর কেষ্ট পাওয়া যায়? আমার লিফট লাগানো হয়নি এখনও… (বিকাশকে উদ্দেশ্য করে) বিকাশ, যা শুভবাবুকে বেডরুমে নিয়ে যা।
(শুভব্রতকে নিয়ে বিকাশ স্টেজের উল্টো দিকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। বিবেকবাবু টেবিলে বসে ফাইল পত্র নাড়াচাড়া করতে থাকলেন। পর্দা একটা মিউজিকের সঙ্গে একবার বন্ধ হয়ে গিয়ে তারপরেই আবার খুলে গেল। শেষ পর্যন্ত শুভ বেডরুমের দিক থেকে আবার স্টেজে ঢুকল)
বিবেক মিত্র সারানো হল? কাজ করছে?
শুভ (গর্ব দেখিয়ে) হ্যাঁ স্যার, কাজ করবে না মানে! শুভ দাসের কাছে চালাকি নাকি? কানেক্‌টারের একটা পিন একটু বেশী বেঁকে গেছিল – সোজা করে দিতেই এক্‌কেবারে ডায়াল টোন্‌!
বিবেক মিত্র বাঃ, খুব ভাল। আবার যদি কিছু গণ্ডগোল হয় তবে তাহলে আপনাকেই ডাকব – নাম শুভব্রত দাস বললেন তো…
শুভ (সভয়ে) না না না, আমাকে আর ডাকাবেন না স্যার, অন্য কাউকে পাঠাতে বলবেন প্লীজ – আমার নাম আসলে শুভ নয়, শুভ বললে কেউ চিনতেই পারবে না!
বিবেক মিত্র (হেসে) কেন, এত ভয় কেন?
শুভ ভয় কেন বলছেন স্যার? তবে আপনার তো লিফ্‌ট নেই, এই দশতলা বাড়ি, আমার আবার হাঁটুতে বাত আছে তো, তাই বলছিলাম স্যার!
বিবেক মিত্র (হেসে) বাঃ, তা হলে আবার ফোন খারাপ হলে কী করব?
শুভ খারাপ কেন হবে আবার? খারাপ হবে না! (নিজের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) আর এই বান্দা সারিয়ে দিয়ে গেল আজকে – সে কী আর খারাপ হবে এখন? খারাপ হবে না। (বিবেক মিত্রর দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে) এই চালানটা সই করে দেবেন স্যার? কাজটা কম্লিট হয়েছে বলে দেবেন…
(বিবেক মিত্র সই করে কাগজটা আবার ফেরৎ দিয়ে দিলেন।)
শুভ (দরজার দিকে যেতে যেতে ফিরে বিবেক মিত্রর দিকে ফিরে) তবে স্যার, আমি বলি কি, আজকাল তো মোবাইল ফোনের যুগ, কে আর তারের ফোন রাখে! আবার যদি লাইনটা খারাপ হয় তখন আর সারাবেন কেন, বেডরুমটার জন্যও নতুন আর একটা মোবাইল ফোন কিনে নেবেন। 
বিবেক মিত্র (অবাক হয়ে) অ্যাঁ? দশতলা বাড়ি বলে আরেকটা নতুন মোবাইল কিনতে হবে? শুধু বেডরুমের জন্যে?
শুভ না না, তা নয়, তা নয়, তবে কী জানেন, এতগুলো সিঁড়ি তো, আপনি না হয় একটা লিফটই লাগিয়ে নিন তাহলে! আচ্ছা নমস্কার স্যার আমি চলি। (বেরিয়ে গেল)
বিবেক মিত্র (সেদিকে তাকিয়ে) বলে কিরে বিকাশ! দেখলি? টেলিফোনের মিস্তিরিটা কিনা বলে, হয় মোবাইল নয় লিফট! দিনকাল কী হল রে! (এবারে ঘড়ি দেখে বিকাশর দিকে তাকিয়ে) উফ্‌! আচ্ছা শোন্‌, আমি যাই, চানটা চট্‌ করে সেরে আসি। এগারোটায় তো আবার চেম্বার খুলতে হবে। তুই একটু খেয়াল রাখিস। কেউ হঠাৎ আগে এসে পড়লে একটু বসতে বলবি। (বেডরুমের দিকে বেরিয়ে গেলেন।)
(বিকাশ ঘর ঝাড়া-পোঁছা করতে লাগল। এমন সময় দরজায় কারুর ধাক্কা দেবার আওয়াজ শোনা যাবে। বিকাশ প্রথমে শুনতে পাবে না। তারপরে আরও দুবার ধাক্কা দেবার পরে কানটা খাড়া করে তবে শুনতে পাবে)
বিকাশ (চেঁচিয়ে) আসতেছি, আসতেছি, দাঁড়ান।
(বিকাশ দরজা খুলতেই দেখা গেল একজন বৃদ্ধা। হাতে লাঠি আর কিছু পোঁটলা-পুঁটলি। তিনি ঘরে ঢুকেই খুব জোরে জোরে দম নিতে থাকলেন। যদিও বিকাশ তাঁকে আগে দেখেনি বলে চিনতে পারেনি, কিন্তু দর্শকেরা তাঁকে চিনতে পারবেন – তিনি সেই মায়াবতী পেত্নী – কেবল এখন বৃদ্ধা বেশে)
বিকাশ (খুব উদ্বিগ্ন হয়ে) মা ঠাকরুন – ঠিক আছেন তো, বসুন, বসুন! এখানে বসুন। তা কে আপনি মা? এখানে!
বৃদ্ধা (দম নিতে নিতে) তুমি কে বাবা?
বিকাশ ভূমি তে? হ্যাঁ হ্যাঁ, ভূমিতেই বসুন। চেয়ারেও বসতে পারেন – কোন অসুবিধে নেই… (বৃদ্ধা লাঠি আর পোঁটলা-পুঁটলি নামিয়ে মাটিতেই বসে পড়লেন স্টেজের সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে)
বৃদ্ধা (হেসে) তা তোমার নাম কি বাবা?
বিকাশ আইজ্ঞা, আমি বিকাশ। মা ঠাকরুনের নামটা তো জানা হল না…
বৃদ্ধা (হেসে) আরে এককাল গিয়ে তিনকালে ঠেকেছে, আমার আবার নাম! বাপে আদর করে নাম দিয়েছিল মায়াবতী। এখন সবাই ডাকে বুড়ি মা বলে…
বিকাশ তা বুড়ি মা, এতগুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলেন কী করে এই বয়সে?
মায়াবতী একদিনে তো পারিনি উঠতে বাবা! অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম। রোজ সকালবেলা থেকে উঠতে শুরু করতাম। একটা দুটো করে সিঁড়ি ভেঙ্গে, একটু করে জিরিয়ে নিতাম। তাতে তিনতলা পর্যন্ত উঠতে উঠতেই সন্ধ্যে হয়ে যেত! তখন আর কি করি, আবার বাড়ি ফিরে যেতাম। একবার তো অনেক কষ্ট করে চারতলা পর্যন্ত উঠেছিলাম, কিন্তু এমন হাঁপানী হল যে আর পারলাম না!
বিকাশ বলেন কী বুড়ি মা! তা আজকে এত সকাল সকাল কী করে পৌঁছে গেলেন?
মায়াবতী (হেসে) আজকে তো আর বেরোইনি বাবা! কাল খুব ভোরে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গে এই দেখনা – (পুঁটলি-পোঁটলার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) – একেবারে পুঁটলি ভরে চিঁড়ে ভাজা, মুড়ি, কাঁচানঙ্কা সব নিয়ে। সাড়ে সাত তলা আসতে আসতেই গভীর রাত হয়ে গেল। তখন আর কী করি, সিঁড়ির এক কোণাতে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আজ আবার কাকভোর থেকে উঠতে শুরু করে, তবেই না এতক্ষণে পৌঁছোলাম!
বিকাশ (থতমত খেয়ে) কী সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার বুড়ি মা! এত কষ্ট করে এলেন কেন আপনি?
মায়াবতী উকিলবাবুর সঙ্গে যে বড় দরকার আমার! তিনি বড়মানুষ লোক, তাঁর দেখা কী আর সহজে পাওয়া যায়? একটু কষ্ট করতে হবে না? শুনেছি তিনি ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবে না আমাকে!
(এমন সময়ে স্নান শেষ করে তৈরী হয়ে বিবেকবাবু অফিসে ঢুকলেন। এখন আর তিনি আগের মতন ধুতি পাঞ্জাবী পরে অফিস করেন না, রীতিমতন দামী কোট-প্যান্ট-স্যুট-টাই পরে কাজ করেন)
বিবেক মিত্র (ঢুকতে ঢুকতে) কেউ এল নাকি রে বিকাশ? কেউ দরজা ধাক্কালো বলে মনে হল যেন! (বলতে বলতে মাটিতে বসা মায়াবতীর ওপরে চোখ পড়েই তিনি থমকে গেলেন। তারপরে চিৎকার করে) আরে, আরে, এই তো দেখি সেই পেত্নীটা – আজকে আবার বুড়ি সেজে এসেছে – কী চাই তোমার পেত্নী?
মায়াবতী (খুব অপমানিত বোধ করে) অ্যাঁ, আমাকে পেত্নী বললেন উকিল বাবু! আমি পেত্নী? (তারপরে কাঁদতে কাঁদতে) হে ভগবান, এর চেয়ে আমাকে মেরেই ফেল না কেন! যার কাছে এলাম প্রাণ বাঁচাতে, সেই কিনা আমাকে বিনা কারন গালাগাল দেয় পেত্নী বলে (বিবেক বাবুর দিকে মাথা ঘুরিয়ে একটু উদ্ধত হয়ে) কেন? কেন? কী ক্ষতি করেছি আপনার, যে আপনি আমাকে এভাবে অপমান করছেন? (আবার কাঁদতে কাঁদতে) এখন না হয় বুড়ি হয়েছি আর দুবেলা পেট ভরে খেতে পাই না, কিন্তু একসময়ে তো রূপ ছিল – লোকে রীতিমতন সুন্দরী বলত আমাকে। হা হা হা! হে ভগবান, এ সংসারে আর কী বাকি আছে আমার – এবারে ফিরিয়ে নাও ঠাকুর… (বলতে বলতে হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি)
বিবেক মিত্র (ঘটনার এরকম আকষ্মিকতায় চমকে গিয়ে কি করবেন ভেবে না পেয়ে) আরে আরে আরে – কী হল, কী হল, মরে গেল নাকি? এমন কী বললাম আমি?
বিকাশ (নার্ভাস হয়ে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে, কিছুটা অভিযোগ করতে করতে) ভালমানুষেরে শুধু শুধু পেত্নী বললে কেনে? যদি মরে গিয়ে থাকেন… না না না… পেত্নী বলার কি দরকার ছিল?
বিবেক মিত্র (হাঁটু গেড়ে মায়াবতীর পাশে বসতে বসতে) এইতো… মানে এইতো, ইনিই তো… না না, সে তুই বুঝবি না, কী করে বোঝাই তোকে…আজকে বুড়ি দেখাচ্ছে কিন্তু ইনিই তো… (বলতে বলতে মায়াবতীর নাকের কাছে আঙ্গুল দিতে দিতে)… আরে আরে, মরেনি এখনও, এইতো নিঃশ্বাস নিচ্ছে, শুধু অজ্ঞান হয়ে গেছে!
বিকাশ (ঘাবড়ে গিয়ে) অ্যাঁ?
বিবেক মিত্র (উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে) দেখি একটু বাতাস দিই, তুই যা এক গেলাস জল নিয়ে আয় শিগগির (টেবিল থেকে একটা ফাইল হাতে নিয়ে আবার হাঁটু গেড়ে মায়াবতীর পাশে বসে হাওয়া করতে লাগলেন; একটু পরে আবার ওপরে তাকিয়ে দেখেন যে বিকাশ তখনও একই ভাবে, কী করবে ভেবে না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন; তখন নলীনিকে ধমকে) আরে, ভ্যোম হয়ে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? যা জল নিয়ে আয় শিগগির!!
বিকাশ (তখনও বিভ্রান্তিতে। মাথা চুলকোতে চুলকোতে, মাথা নেড়ে) ও, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, আনতাছি আনতাছি (স্টেজ থেকে বেরিয়ে গেল)
(একটু পরে বিকাশ স্টেজে ঢুকল। হাতে একটা বড় বীচ্‌ বল)
বিবেক মিত্র (রেগে) আরে দূর হতভাগা, বল নয়, জল, জল! জল নিয়ে আয় একটু।
(বিকাশ তাড়াতাড়ি বলটা ফেলে বেরিয়ে গেল। একটু পরে এক গেলাস জল হাতে নিয়ে ফিরল)
বিবেক মিত্র দে, দে, এদিকে দে শিগগির।
(বিবেক মিত্র মুখে চোখে একটু জল ছেটাতেই নড়ে চড়ে উঠে বসলেন মায়াবতী)
বিবেক মিত্র (খুব কোমল করে) এখন কেমন বোধ করছেন ম্যাডাম? একটু চা খাবেন নাকি?
বিকাশ (এগিয়ে এসে) বুড়ি মা, চা করে দেই?
মায়াবতী না না চা লাগবে না, আমি ঠিক আছি, ঠিক আছি। হঠাৎ মাথাটা একটু ঘুরে গেছিল… (আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন)
বিকাশ (পাশে এসে দাঁড়িয়ে) বাবুর কথায় রাগ করবেন না যেন। ওনার মনটা আসলে খুব দরদী। আপনার মতন অনেক গরীব দুঃখীদের সাহায্য করেন উনি… আপনি নিব্‌ভাবোনায় বাবুকে বলুন আপনি কী চান।
মায়াবতী (বিকাশকে) বলব, ঠিক বললে রেগে যাবেন না তো উনি?
(এমন সময় বিবেকের বিবেক স্টেজে ঢুকে বিবেক বাবুর পেছনে এসে দাঁড়াল)
বিবেক মিত্র (এবারেও কোমল করে) বলুন না, কী চাই, নির্ভয়ে বলুন।
(বিবেকের বিবেক খুব খুশী হয়ে বিবেক বাবুর পেছনে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল)
মায়াবতী আমার যে খুব বিপদ উকিল মশাই। কী করে বোঝাই – স্বামীর সঙ্গে অনেক বেশী বয়সে বিয়ে হয়েছিল! তাই আমাদের কোন ছেলেপুলে হয়নি। একদিন দেখি আঁস্তাকুড়ে পড়ে, মাস তিনেকের একটা বাচ্চা ছেলে, হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খিদেয় ককাচ্ছে। তখন স্বামীকে অনেক বলে কয়ে রাজী করিয়ে ছেলেটাকে বাড়ি নিয়ে এলাম, আর নিজেদের ছেলের মতন করে বড় করে তুললাম। সে আজ এককুড়ি পাঁচ বছর হয়ে গেল! রতন এখন জোয়ান ছোকরা। তা গেল বছরে, মা কালীর নাম করতে করতে শেষ পর্য্যন্ত আমার স্বামী চোখ বোজালেন। যাবার আগে সমস্ত সম্পত্তি আধা আধি ভাগ করে দিলেন আমার আর রতনের নামে। ভাগে যা পেলাম তা থেকে বাড়িভাড়া আর ভাগচাষীদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা নিয়ে, বেশ স্বচ্ছন্দেই বাকি জীবনটা কেটে যেত আমার। (ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি)
বিকাশ (মায়াবতীর পিঠে হাত বুলিয়ে সান্তনা) আঃ, না না, কাঁদবেন না, বুড়ি মা। কী হয়েছে বাবুকে ঠিক করে বলেন না!
মায়াবতী কী আর হবে, একদিন দুধ দিয়ে যাকে প্রাণ বাঁচালাম, সে এখন কালসাপ হয়ে গিয়ে আমাকেই ফোঁস করছে! তার সম্পত্তির এত লো্ভ যে সে আর আমার চোখ বুজোনো পর্য্যন্তও অপেক্ষা করতে চায় না। মিথ্যে সাক্ষীসাবুদ খাড়া করে সে কোর্টে গিয়ে প্রমাণ করে ফেলল যে পুরো উইলটাই নাকি জাল! আমি জাল করেছি, কারন আসলে তার বাবা তাকেই পুরো সম্পত্তি দিয়ে গেছে। এসব শুনে কোর্ট যে শুধু আমার সম্পত্তিটা কেড়েই নিল তা নয়, তার পরিবর্তে আমার হাতে একটা কড়ি পয়সাও দিল না! (কাঁদতে কাঁদতে) কী আর বলব এখন, পেটে ভাত দেবারও আর সামর্থ নেই আমার! এখন আপনি আমাকে বাঁচান, উকিলবাবু। শুনেছি আপনি অনেক বিধবার সম্পত্তি উদ্ধার করে দিয়েছেন – তাই বড় কষ্ট করে, অনেক আশা নিয়ে, আপনার কাছে এসেছি আজ…(মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে থাকলেন তিনি)
(বিবেক মিত্র অনেক্ষণ মাথা নীচু করে পায়চারী করতে লাগলেন। তাঁর বিবেকও সমানে তাঁকে অনুসরণ করে চলল প্রতি পদে)
বিবেক মিত্র বুড়ি মা, ঠিক কত টাকা ফীস দিতে পারবেন আপনি? (এই কথাটা শুনে তাঁর বিবেক হঠাৎ থেমে গিয়ে ভুরু কুঁচকে কোমরে দুহাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল)
মায়াবতী (করুণ করে) এক্ষুণি তো কোনও টাকাই দিতে পারব না উকিল বাবু। তবে সম্পত্তিটা উদ্ধার করে দিলে তো ভাড়া থেকে সব টাকা মিটিয়ে দিতে পারব। (আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন)
বিবেক মিত্র কোনও ফীস দিতে না পারলে তো মুস্কিল… আজকাল আমি আর ফিস না নিয়ে কোনও কাজ করি না!
(এই কথা শুনে তাঁর বিবেক দু-পা এগিয়ে এসে ঠক করে মাটিতে পা ঠুকে আবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তাঁকে মুখ বিকৃতি করে ভ্যাংচাতে লাগল। বিবেক মিত্র মাথা নীচু করে পায়চারী করতে লাগলেন। মায়াবতী কেবল আস্তে আস্তে কেঁদেই চললেন)
বিবেক মিত্র (প্রায় স্বগতক্তিতে) না, এখন আর ফীস দিতে না পারলে কোনও কেস নিতে পারব না – নাঃ, একেবারই নয়!
(হঠাৎ বিবেক মিত্রর বিবেক দৌড়ে এসে তাঁর কাঁধে একটা জোরে কামড় লাগালো)
বিবেক মিত্র (ব্যাথায় লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে) আঃ, অনেক বার বলেছি কামড় দিবি না আমায়। তোকে আর আমার দরকার নেই, একদম দরকার নেই। এক্ষুণি বেরিয়ে যা এখান থেকে! (বিবেকের বিবেক সে ধমকানিতে ভ্রূক্ষেপ না করে বিবেক মিত্রকে অনুসরন করতে থাকল। কিন্তু ভুল বুঝল বিকাশ)
বিকাশ (সভয়ে) অ্যাঁ? আমায় তুমি বরখাস্ত করতেছ বাবু? আমি কি দোষ করলাম?
বিবেক মিত্র (একটু অপ্রস্তুত হয়ে) আরে না না, তোকে কিছু বলিনি বিকাশ, তোকে কেন বলব?
বিকাশ (অভিমান করে) হ্যাঁঃ, আমাকে বললে না তো কী হাওয়াকে বললে? আমি আর বুড়ি মা ছাড়া আর কি কেউ আছে এখানে, যে তাকে বরখাস্ত করবে?
(বিবেক মিত্র তাড়াতাড়ি বিকাশর কাছে গিয়ে তাকে সান্তনা দিতে শুরু করলেন)
বিবেক মিত্র আহা, না না! তোকে কেন বরখাস্ত করব বিকাশ? তোকে ছাড়া আমার চলবেই না! আমি আসলে নিজের সঙ্গেই কথা বলছিলাম। কথাগুলো একটু জোরে জোরেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, বুঝলিনা!
(বিকাশ মাথা গোঁজ করে নীচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, আর কিছু বলল না। বিবেক মিত্র আস্তে আস্তে মায়াবতীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।)
বিবেক মিত্র (কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে) পয়সা তো নেই বুঝলাম, কিন্তু পুঁটলিগুলোর ভেতরে কী আছে আপনার?
মায়াবিনী শুধু একটু চিঁড়ে মুড়ি আছে এখন, সিঁড়ি উঠতে উঠতে খেতে লাগবে বলে নিয়ে এসেছিলাম, বেশীটাই খেয়ে ফেলেছি।
বিবেক মিত্র তা বেশ তো। তাহলে নাহয় একটু মুড়িই দিন আমার হাতে। ওটাই রিটেনার বলে ধরে নেব এখন (মায়াবতীর কাছে হাত পেতে দাঁড়ালেন)
(বিবেকের বিবেক খুব খুশী হয়ে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করল স্টেজের মধ্যে। মায়াবতী পুঁটলি খুলে একটু মুড়ি বিবেক মিত্র-র হাতে দিলেন)
বিবেক মিত্র (মুড়ি মুখে দিতে দিতে) বেশ, তাহলে আপনার কেসটা হাতে নিলাম আমি…
(বিবেক মিত্রর কথা শেষ হতে না হতে হঠাৎ খুব জোরে ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচোর করে আওয়াজ হওয়া শুরু হল আর স্টেজের সব আলো নিবে গেল। ঘরের জিনিষপত্র, টেবিলের কাগজ, সবকিছু উলটে পালটে পড়ে যাবার শব্দ শোনা গেল – আর অন্ধকারের মধ্যে থেকে আর্তনাদ শোনা গেল)
বিকাশ (কাঁদো কাঁদো হয়ে) ও বাবাগো, আবার ভূমিকম্প করেচে – ভূমিকম্পে যে আমার বড় ভয়…পা টলছে, গা গুলুচ্ছে, হাঁটু ভেঙ্গে যাচ্ছে…বাবাগো, মারে, আমাকে বাঁচাও, বাবু তুমি কোথায়, বাঁচাও আমাকে…
বিবেক মিত্র (শান্ত ভাবে) কিচ্ছু হচ্ছে না বিকাশ, চুপ করে বসে থাক তুই, এক্ষুণি সব ঠিক হয়ে।
(এভাবে স্টেজের মধ্যে কিছুক্ষণ অন্ধকার চলল। বিকাশ একট আধটু গুঁই-গাঁই করল বটে, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। বিবেকবাবু টুঁ শব্দটিও করলেন না। কিছুক্ষণ পরে স্টেজের আলো আবার সব জ্বলে উঠল। দেখা গেল যে স্টেজে উপস্থিত আছেন শুধু বিকাশ আর বিবেক মিত্র। মায়াবতী আর বিবেকের বিবেকের পাত্তা দেখা গেল না। বিকাশ একটা চেয়ারের সামনে মাটিতে শুয়ে পড়ে আছেন আর বিবেক মিত্র মাটিতে পা ছড়িয়ে চুপচাপ বসে আছেন। আলো আসতেই তিনি ও বিকাশ দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। টেবিলের ওপরের জিনিষপত্র সব চারিদিকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে আছে। কেবল টেবিলের ওপরে রাখা আছে একটা নতুন বই)
বিবেক মিত্র (টেবিলের কাছে গিয়ে বইটা হাতে তুলে নিতে নিতে স্বগতোক্তি) সে এবারে অন্ততঃ একটা বই রেখে গেছে আমার জন্য (বইটাকে হাতে তুলে পর্যবেক্ষণ করতে করতে) বাব্বাঃ! টাইটেল-টা আবার কী জমকালো তার – “আপনার সততা না হারিয়েও কীভাবে মকদ্দমা জিতবেন” – (তারপর ধীরে ধীরে বইটাকে টেবিলে ফেরৎ রাখতে রাখতে) মনে হচ্ছে মায়াবতী আমাকে সৎপথে না ফিরিয়ে ছাড়বে না…
বিকাশ (হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে) বাবু বাবু, আমাদের বাড়ি বোধহয় আবার এখন একতলা হয়ে গেছেন, সেই আগের মতনই রাস্তা থেকে গোবরের গন্ধ আসছে এখন!
(বিকাশের মুখের কথা ঠিকমতন শেষ হতে না হতেই বাইরে থেকে খুব উচ্চৈস্বরে হৈচৈ আর ঝগড়া করতে পরেশ, দুজন পুলিশ, আর বিল্ডিং ডিপার্টমেন্টের একজন সুপারভাইজার হুড়মুড় করে স্টেজে ঢুকে পড়লেন)
আগন্তুক ঘটক্‌, এটাই এবারে হয়েছে তোমার চরম! লাহিড়ী সাহেব নিজে না অনুরোধ না করলে কী আর আমি আজ আসতাম তোমার পাগলামি দেখতে? এইটা তোমার দশতলা বাড়ি হল? 
পরেশ এই বাড়িটা তো একটু আগেই দশতলা ছিল! 
হিতেশ একটু আগেই দশতলা ছিল আর এখন একতলা? পাগল না পেটখারাপ? নেহাৎ স্যার বললেন, “হিতেশ (বিকল্পে হীরা – নারী চরিত্র করলে) দুটো পুলিশ নিয়ে পরেশের সঙ্গে যাও তো দেখি, কী ব্যাপার! কে নাকি একটা বেআইনি দশতলা বাড়ি হাঁকিয়ে বসেছে….”
পরেশ স্যার তো ঠিকই বলছিলেন… (বিবেক মিত্র-র দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) ওই ব্যাটা মাসখানেক আগে নিজে থেকেই আমাকে ডেকে বলেছিলঃ ‘পরেশ, বাড়িটার তো কোন রকম লাইসেন্স নেই, আপনি যা হোক করে একটা প্ল্যান অ্যাপ্রুভ করিয়ে দিন। যা পয়সা লাগে আমি দিয়ে দেবো!’ আর এখন কিনা বলে, ‘পয়সা দেব না!’ পুরো একটা দোতলা বাড়ির প্ল্যান করিয়ে নিয়ে এলাম কত কাঠ-খড় পুড়িয়ে!
হিতেশ একতলা বাড়ির জন্য দোতলার প্ল্যান কেন করালেন?
পরেশ তখন যে এটা দোতলা বাড়ি ছিল হিতেশ দা (বিকল্পে হীরা দি)!
হিতেশ (রেগে) হ্যাঃ , আর তারপরে সেটা দশতলা হয়ে গেল ক-দিনের মধ্যে!
পরেশ হয়েছেই তো! কতো লাখ টাকার মামলা ভেবে দেখুন তো! 
হিতেশ বটেই তো! লাহিড়ী সাহেবকেও তো তুমি একই পাগলের প্রলাপ দিয়ে এসেছ! কিন্তু আমার তো প্রথম থেকেই ঠিকানা দেখে মনে হচ্ছিল – এই পাড়ায় দশতলা বাড়ি কী করে হতে পারে? 
পরেশ পারে নাই তো, সেজন্যই তো এতটা ইল্‌লিগাল!
হিতেশ দেখ পরেশ, তুমি এ ব্যাপার নিয়ে অনেক দিন ধরে অনেক রকম কথা বলে চলেছো। এতদিন একতলা বাড়িটাকে সাজাচ্ছিলে দোতলা বলে। আজ আবার বললে, সেটা নাকি দশতলা! ব্যাপারটা কী?  
পরেশ (সজোরে প্রতিবাদ জানিয়ে) আরে, আমি একটু আগেই নিজের চোখে দেখেছি বাড়িটা দশতলা… আর এখন কি করে জানি না… দাঁড়ান, ব্যাটাকে মজা দেখাচ্ছি… আমাকে বুদ্ধু বানানো হচ্ছে!  (বলতে বলতে বিবেক মিত্রের দিকে এগিয়ে গিয়ে দিকে আঙ্গুল নেড়ে নেড়ে) কী যে শুরু করেছ ঘুঘু, তা আমি জানিনা। দুঘন্টা আগেই কত হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দশতলা সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠলাম – (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) শুধুমাত্র জনসাধারণের হয়ে কাজ করি বলে! (তারপরে বিবেক মিত্রর দিকে ফিরে তাকিয়ে) আর এই দু ঘন্টার মধ্যেই সেটাকে আবার একতলা করে ফেলেছ? কী করে যে করলে চাঁদু সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আজ আর আমি ছাড়ছি না তোমায়… (বলতে বলতে সে চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকল)
হিতেশ (বিবেক মিত্রর কাছে এগিয়ে গিয়ে একটু ক্ষমা চাইতে চাইতে) কিছু মনে করবেন না স্যার। ওর একটা মেন্টাল ব্রেক ডাউন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমি ওকে সরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাবস্থা করছি। আর কোনদিন বিরক্ত করবে না আপনাকে। (এবারে পুলিশদের দিকে তাকিয়ে পরেশকে দেখিয়ে) যাও, পাকড় লো উসকো!
(পুলিশ দুজন দুপাশ থেকে গিয়ে পরেশকে ধরল)
পরেশ (চমকে গিয়ে রেগে) অ্যাই, কী হচ্ছে কী হচ্ছে, কেয়া হোতা হ্যায়? ধরো মৎ! এই এই এই…
(পুলিশ দুজন পরেশকে উঁচু করে মাটি থেকে উঠিয়ে ফেলল)পুলিশ ১ নম্বর (হিতেশের দিকে তাকিয়ে) ইনকো কাঁহা লে যাঁউ স্যার?
হিতেশ/হীরা  ওকে সোজা রাঁচী এক্সপ্রেসে তুলে দাও গিয়ে, আমি আসছি!
(পুলিশ দুজন পরেশকে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে টেনে নিয়ে গেল)
পরেশ (পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিস্ফল প্রতিবাদ করতে করতে) মুঝে ছোড় দো, ছোড় দো, (হিতেশের দিকে তাকিয়ে) আমি পাগল নই, সত্যি বলছি কিন্তু, এরমধ্যে কোথাও কিছু বড়সড় গড়বড় আছে… (বিবেক মিত্রের দিকে তাকিয়ে) আপনিই বলুন, আপনি তো জানেনই স্যার, আমি পাগলের মতন কিছু বলছি না – এই বাড়িটা দুঘন্টা আগেও দশতলা ছিল, আপনিই বলুন স্যার, প্লীজ স্যার, আপনার হাতে পায়ে পড়ি স্যার (কাঁদতে কাঁদতে) আমি রাঁচী যাব না, ওরা বড় কড়া কড়া ওষুধ দেয়, আমি রাঁচী যাব না, অ্যাঁ-এ-এ-এ
(পুলিশ দুজন পরেশকে নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর)
হিতেশ (বিবেক মিত্রর দিকে তাকিয়ে) খুবই দুঃখিত স্যার, কী আর বলব! তবে পরেশ মনে হয় আপনাকে আর কোনদিন বিরক্ত করতে আসবে না। নমস্কার।
(হিতেশ বেরিয়ে গেলেন। “মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা” গানটা বাজতে বাজতে পর্দা বন্ধ হয়ে গেল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!