মীরজাফর

রচনা  : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

অলঙ্করণ : সুপ্রিয় দাস

“ড্যাম! হাউ দিস ক্যুড হ্যাপেন?”

     “সর‍ি স্যার- ইট ওয়স মাই ফল্ট, বাট-বাট আই ডিড রেক্টিফাই ইট উইদিন সেকেন্ডস।”

     “দ্যাট ডাসন’ট চেঞ্জ এনিথিং!! ইউ অয়্যার অ্যাবাউট টু জিওপারডাইস মাই এন্টায়ার লাইফ’স ওয়ার্ক – ইউ!! লাল, ইউ দেয়ার??”

     “ইয়েস স্যার।”

     “শ্যুট দিস বাস্টার্ড রাইট নাউ! আই ওয়ান্ট টু হিয়ার হিস স্ক্রিম!”

     একটা তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা গেল – যুগপত বন্দুকের এবং মৃতপ্রায় মানুষের গলার।

     “গুড রিডেন্স। নাউ আই নিড টু হ্যান্ডেল দিস।”

 

     মেয়েটির মুখটা নিম্নাঙ্গে চেপে ধরে সবে একটা সুখের আওয়াজ বের করেছে অশোক, মাথা আর কানের মাঝে চেপে থাকা ট্রান্সমিটার জানিয়ে দিল বসের ফোন আসছে!

     জ্বালাতন – আর ফোন করার সময় পায় না। দিল সব কেঁচিয়ে। মেয়েটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে প্যান্টটা পরতে পরতে ফোনটা রিসিভ করল অশোক। সে খুব সচেতনভাবেই ফোনের ডিভাইসটা বাড়িতে ফেলে এসেছে আজ। ফোন কাছে না থাকলেও ওই প্রচন্ড শক্তিশালী ট্রান্সমিটার এবং ট্রান্সরিসিভার জানান দেয় যে ফোন আসছে। এতে কেবল ভয়েস কলই হয় – ডিভাইসটা থাকলেই বস ভিডিও কল করতে বলত! আর তা হলেই চিত্তির!

     -হ্যাঁ বস!

     -কি হ্যাঁ বস? আছটা কোথায় শুনি? সক্কাল সক্কাল ডিভাইস ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?

     -ইয়ে মানে, ভুলে গেছি তাড়াহুড়োতে। অফিসের দিকেই যাচ্ছিলাম যদিও। রীনার খুব তাড়া ছিল তো – তাই ওকে একটু রেডি করতে গিয়ে একদম ভুলে মেরেছি।

     – যাইহোক, শোন। কাজ আছে, আর্জেন্ট। এখুনি অফিসে এসে আমার সঙ্গে দেখা কর। জলদি এস, বুঝলে!! আর দয়া করে ট্র্যাকিংটা অন কর। কোথায় যে মারাচ্ছ সক্কাল সক্কাল কে জানে!

     ফোনটা রেখে হাঁফ ছাড়ল অশোক। যাক বাবা- ভাগ্যিস ট্র্যাকিং অপশনটা অফ করে রেখেছিল। নাহলে বস যে আর কী কী মধুর বচন শোনাত কে জানে!

     সোনাগাছির এদিকে খুব একটা যাতায়াত নেই অশোকের। বিশাল এই জায়গাটার ভেতর যে কত গলিঘুঁজি রয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই – পুরো গোলকধাঁধা। সে আসলে সোনাগাছির সামনের অংশটারই খদ্দের। কাল রাতে তার চেনা দালাল ফোনে তাকে বলেছিল, এখানে নাকি একটা খাসা “মাল” এসেছে। সেই জন্যই সক্কাল সক্কাল রীনাকে রেডি করে বের করেই সোজা এখানে চলে এসেছিল অশোক – বেশ কয়েকদিনের উপোসী শরীরের জ্বালা জুড়োতে। এই জায়গাটাতে আগে আসেনি সে – মূল সোনাগাছির থেকে অনেকটা ভেতরে। দালাল পথ দেখিয়ে না আনলে সে জীবনেও চিনে ঢুকতে পারত না। কিন্তু হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। মেয়েটা সত্যি একটা “মাল”। এতদিন ধরে সোনাগাছির নারীমাংসের স্বাদ নিচ্ছে অশোক, কিন্তু এরকম বড় একটা দেখেনি সে। পুরো আওয়ারগ্লাস ফিগার। আজ আর উত্তেজনার জন্য দুপাত্তর চড়াতে হয়নি অশোককে। পেটের শাড়ীটা কিছুটা সরানোর পর সিংহীনির মতো পাতলা কোমর দেখেই অশোক ব্যোমকে গেছিল। ভেবেছিল আজ কিছু একটা অজুহাত দেখিয়ে ছুটি মেরে দেবে, মেয়েটার সঙ্গে সারাদিন কাটাবে! কিন্তু শালা সে গুড়েও বালি। চল এখন বসের ধ্যাতানি খেতে!! এই না হলে কপাল!

     দোতলা থেকে নিচে নামার মুখেই দালালের সঙ্গে দেখা। সে বেশ অবাক হয়েই বলল, “স্যার হয়ে গেল? এত তাড়াতাড়ি?”

     একটা কাঁচা খিস্তি ঝেড়ে অশোক বলল, “দ্যাখ, মেজাজ গরম আছে। মুখ খারাপ করাস না। এখন তাড়াতাড়ি পার্কিং এ নিয়ে চল। অফিস যেতে হবে।”

     সদ্য কেনা ভলভো কনভার্টিবলটা স্টার্ট করল অশোক। যদিও এসব গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে না – ভয়েস কম্যান্ডেই চলে – তবু অশোক একটা সনাতনী ফিল আনার জন্য স্টিয়ারিংটাও রেখেছে। আর তার থেকেও বড়, তার কাজের সুবাদে তাকে অনেক দুর্গম জায়গায় যেতে হয়। সেসব জায়গায় মাঝে মাঝে কানেকশন কেটে যাওয়ার সম্ভবনা প্রবল, তাই ম্যানুয়াল অপশন না থাকলে বিপদের কথা। গাড়িটা ব্যাট্যারি আর সোলার মোড দুটোতেই অপারেট করতে পারে। ব্যাটারি মোডটা অফ করে সোলারটা চালিয়ে অশোক জি পি এসটা অন করে দিল।

     -বাবা, তুমি কোথায়?

     রীনার গলা শোনা গেল তার কানের ওপরে আটকানো রিসিভারে। মুহুর্তের জন্য অশোকের ভেতরকার জন্তুটা খোলস ছেড়ে কেমন যেন মানুষের মতো হয়ে গেল। এই ডাকটা তাকে মাঝে মাঝে সমে ফিরতে দেয় না! মেয়েটার ওপর এই টানটাই অশোককে হয়তো পুরোপুরি পশু করে ফেলেনি। ওর মা ওকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু সে ওকে ফেলতে পারেনি। যদিও এখনও ওকে খোরপোষ ঠিক দিয়ে যেতে হয়…

     “কী রে, কী হয়েছে।”

     “মিস তোমাকে ডেকেছে। বলছে কী দরকার আছে।”

     “কেন রে? তুই আবার কী করলি?”

     “আমি কিছু করিনি বাবা।” আদুরে গলায় বলল রীনা, “অনন্যা মিস বলল তোমার বাবাকে দেখা করতে বলো। দরকার আছে।”

     একটা ব্যাঁকা হাসি ফুটে উঠল অশোকের মুখে। অনন্যা- আচ্ছা! তাহলে এই ব্যাপার। নিশ্চয়ই টাকার দরকার হয়েছে! অনন্যা মেয়েকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেয় না যে সেই তার মা। আবার সারাক্ষণ ওকে না দেখলেও চলে না। স্কুলে সব্বাই জানে অনন্যা মিস রীনাকে একটু বেশিই ভালোবাসে – কিন্তু আসল ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেছে।

     “আচ্ছা সোনা, আমি যাব। মিস-কে বলে দিয়ো। বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে মিসের সঙ্গে দেখা করে আসব, কেমন?”

     “আচ্ছা বাবা – আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো প্লিজ। একা একা খুব বোর লাগে।”

     “ওক্কে। এখন রাখি সোনা। অফিসে দরকারী কাজ আছে।”

     ততক্ষণে তার গাড়ি অফিসের অনেকটা কাছে চলে এসেছে। স্টিয়ারিংটা হাতে ধরা থাকলেও, কথা বলতে বলতে অটো মোডটা অন করে দিয়েছিল অশোক। যদিও সে ভালো ড্রাইভার, তবু আজকাল কলকাতা শহরে গাড়ির যা গতি, তাতে বলা যায় না। রোজই তো কিছু না কিছু দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।

 

     অফিসে ঢুকে অশোক প্রথমে গেল মিঃ অনিমেষ সেনের কেবিনে। তার আগে অবশ্য উঁকি মেরে দেখে নিয়েছে বস ভিডিও কলিং এ মিটিং করছেন। এখন বসকে বিরক্ত করা যাবে না। তবে মিঃ সেনের কাছে অনেক খবরাখবর থাকে। লোকটা সকাল সাতটায় অফিস আসে, আর বাড়ি যায় রাত নটায়। শনি রবিবারেও অফিসে এসে খবর পড়ে আর কম্পিউটারে গেম খেলে। অশোক কানাঘুষোয় শুনেছে, মিসেস সেনের নাইট ডিউটি থাকে। উনি বাড়ি থেকে বেরোনর পরেই মিঃ সেন বাড়ি ঢোকেন। কর্তা গিন্নীতে মুখ দেখাদেখি নেই। অশোক সোজা ঘরে ঢুকে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

     সেনবাবু মন দিয়ে কিছু একটা করছিলেন তাঁর ট্যাবে। অশোককে দেখে একটু আশ্চর্য হলেন।

     “কী ব্যাপার হে? কী মনে করে?”

     “ব্যাপার তো তুমি বলবে সেনদা। বস শনিবারের সকালে ডাকাডাকি করছে কেন? মিটিং ও করছে দেখছি। কোনও ডেভেলপমেন্ট হল নাকি?”

     সেনদা চশমাটা নাকের নীচে টেনে নিলেন, “সেরকম তো কিছু শুনিনি। তবে কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে।”

     অশোক সোজা হয়ে বসল, “নতুন রিসোর্স বেরিয়েছে?”

     সেনদা ঝুঁকে এলেন –“সেরকমই মনে হচ্ছে। কিন্তু এবার ব্যাপারটা একটু ঘোরাল লাগছে হে। সকাল থেকেই বস দাপাদাপি করছে। আজ দেখি একদম সাতসকালে এসে হাজির। মনে হচ্ছে এবারও তোমাকেই সামলাতে হবে।”

     অশোকের চোয়াল ঝুলে পড়ল। আবার!! কতদিক তাকে সামলাতে হবে আর? ওয়াটারহাউসের আই-টি হেড অশোক সামন্ত কদিন ধরে অফিস জব ছেড়ে ফিল্ড ওয়ার্কে নেমেছে। আই-টিতে বিশেষ কাজ না থাকায় তার প্রমোশন আটকে আছে দু-বছর ধরে। তাই সে ঠিক করেছিল যে সে আবার ফিল্ড ওয়ার্কে নামবে। বসকে বলতে বস রাজিও হয়ে যায়। অনন্যার ব্যাপারটার পর অফিসে বসে থাকতে ভালো লাগত না অশোকের। এর থেকে ফিল্ডে ঘোরা অনেক আরামের।

     কদিন আগে একটা ওয়াটার রিসোর্স আইডেন্টিফাই করে এসেছে সে। সেই নিয়ে দুনিয়ার মামলা, মোকদ্দমা, রিসোর্স রাইটস নিয়ে ঝামেলা – সব মেটাতে মেটাতে তার জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে গেছে। সে এখন দক্ষ ফিল্ড স্টাফ – বাকিদের মতোই তারও কাজ ওয়াটার রিসোর্স খুঁজে বের করা। তবে সেই রিসোর্সকে কোম্পানীর কুক্ষিগত করানোর কাজে সে খুব একটা দড় নয়। তাদের লীগাল টিমের দুটো স্টাফ রিসাইন দেওয়ার পরেই তার ঘাড়ে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব চেপেছে। জ্বালাতনের শেষ নেই! একটা মিটতে না মিটতে আর একটা। এদিকে মাইনে বাড়ানোর বেলায় বস হঠাৎ করে কালা হয়ে যান। নাঃ – ওয়াটারহাউস-এ অনেকদিন হয়ে গেল। এবার তাকে একটা অন্য কিছু খুঁজতে হবে।

     সেনদার ঘর থেকে বেরোনোর মুখেই বস তাকে দেখতে পেয়ে গেলেন।

     “ওখানে কী করছ? তোমাকে বললাম না সিধে আমার কেবিনে আসতে?”

     “আপনি মিটিং করছিলেন, তাই বিরক্ত করিনি।”

     বস কিছক্ষণ চুপ করে রইলেন, “এবার ঘরে এস। জরুরি কথা আছে। আসার সময়ে কেবিনের সাউন্ডপ্রুফ মোডটা অন করে দিও।”

     অশোক বুঝল, ব্যাপার গুরুতর। বস তার সঙ্গে সাউন্ডপ্রুফ মোডে কোনওদিন কথা বলেননি আজ অবধি। চুপচাপ বসের কেবিনে গিয়ে বসল সে।

     “অশোক – ধানাইপানাই না করে সোজা কথায় আসি। ধুমড়ির কাজটা কতদূর?”

     “স্যার, ওটার মামলা প্রায় শেষের পথে। সিন-সিটি-কে পুরো ধুয়ে দিয়েছি। ওরা ক্লেম করেছিল যে রিসোর্সটা ওরাই আগে আইডেন্টিফাই করেছে, কিন্তু ওদের ডব্লু আর টিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছি। অ্যাক্সিডেন্ট দেখাতে হয়েছিল – তাতে অবশ্য কিছু খরচা হয়েছে। তবে কাজ হয়েছে। আদালতে ওরা উইটনেস প্রোডিউস করতে না পারায় আপাতত বল আমাদের কোর্টে।”

     “বেশ – আজ অবধি তুমি ক-টা রিসোর্স আইডেন্টিফাই করেছ।”

     “স্যার – প্রায় দশটার মতো। তবে যদি বাকি কোম্পানীদের আইডেন্টিফাই করা রিসোর্স পোচিং করা বলেন, তাহলে হয়ত আরও অনেক বেশি। প্রায় খান পঁচিশেক।”

     “হুম – তোমার জন্য একটা ভালো কাজ আছে। ঝক্কি কম – হয়তো একদিনেই উঠে যাবে। মন দিয়ে শোন। আই-টি রিলেটেড ঝামেলা, তোমাকে ছাড়া হবে না।”

     “বলুন স্যার – তবে স্যার একটা কথা। আমার এবারের প্রমোশনটা –”

     “হয়ে যাবে। আমাকে শুধু একটা মেল করতে হবে। তাহলেই তুমি আমাদের নেক্সট ভাইস প্রেসিডেন্ট। কেবল এই কাজটা উদ্ধার করে দাও। এবার এই স্ক্রিনের দিকে তাকাও – “

     ঘরের আলো নিভে এল – আর উজ্জ্বল হয়ে উঠল বসের বিরাট লম্বা ফ্লুরোসেন্ট টেবিলের উপরিভাগ। সেখানে ফুটে উঠল এক স্যাটেলাইট নকশা। তারই এক বিশেষ দিক জুম করে বস বলে চললেন, “এই যে জায়গাটা দেখছ, এটা কলকাতা থেকে প্রায় ছ-শ কিলোমিটার দূরের একটা প্রত্যন্ত গ্রাম। আজকালকার দিনে গ্রাম খুব একটা নেই, কিন্তু এটা যেন একেবারেই ছন্নছাড়া জায়গা। তাছাড়া গ্রামের মানুষ নাকি বহুদিন আগে গ্রামটিকে ছেড়ে পালিয়েছে – বলতে পার এটা একটা পরিত্যক্ত গ্রাম। জায়গাটার নাম কারুতীর্থ। আমাদের স্যাটেলাইট ড্রোনে এই জায়গাটায় কিছু অ্যানোমালি ধরা পড়েছে।”

     অশোক প্রশ্ন করে, “কী ধরনের অ্যানোমালি?”

     “জায়গাটার রিডিং কয়েক সেকেন্ডের জন্য টাইপ ফাইভ পয়েন্ট সিক্স হয়ে আবার টাইপ থ্রি হয়ে যায়।”

     নড়ে চড়ে বসে অশোক, “টাইপ ফাইভ পয়েন্ট সিক্স আর টাইপ থ্রি এর মধ্যে তো আসমান জমিন ফারাক!! কিন্তু টাইপ থ্রি তে তো জল থাকে না…তাছাড়া তো……”

     “দূর বাল! মন দিয়ে শোন না কী বলছি।” বস খেঁকিয়ে ওঠেন। ভদ্রলোক উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু রেগে গেলে এমন সব কথা বলেন, লোকজনের কান গরম হয়ে ওঠে।

     “জায়গাটা প্রথম থেকেই টাইপ থ্রি-ই ছিল।” বস বলে চলেন, “কয়েকটা টাইপ থ্রি ঘেঁটেও আমরা কিছু পাইনি, তাই এটাও ঘাঁটাঘাঁটি করিনি। তবে তিন চারদিন আগে আমাদের হেডকোয়াটার্স থেকে রাত তিনটের সময় আমাকে জাগিয়ে অ্যানোম্যালিটা জানানো হয়। মাটির মধ্যেকার সোঁদা ভাবের পরিমান স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি থাকলে সেটার গ্রেড কিছুটা ইম্প্রুভ করতে পারে। আবহাওয়ার রিপোর্ট বলছে ওদিকে কদিন আগে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছে – আর সেটাই আমার সন্দেহ আরও জোরদার করছে।”

     অশোক গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “স্যার, তাহলে তো মিটেই গেল। ওরকম হাল্কাপানা বৃষ্টি তো এদিক সেদিক হয়েই থাকে। সেটাই হয়তো জায়গাটাকে টাইপ থ্রি থেকে ফাইভ পয়েন্টার বানিয়ে ছেড়েছে। তবে আগের রেকর্ড চেক করেছেন?”

     বস একটু চুপ করে থেকে বললেন, “করেছি। জায়গাটা বহুদিন আগে, মানে প্রায় তিনশ বছর আগে টাইপ ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ গ্রেডের ছিল। সেখান থেকে আজ এই দশা। তাই সম্ভাবনাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছি না।”

     অশোক বুঝল বসের যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। “বস, তবুও একটা কিন্তু থেকে যায়। ওরকম হাল্কা বৃষ্টিতে থ্রি থেকে ফাইভে আপগ্রেড হলো কি করে? তাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য!! কিছু টেকনিক্যাল গ্লিচ নেই তো?”

     “সেজন্যই তো তোমাকে ডাকা। আরও একটা জটিল সমস্যা হয়েছে। যে ড্রোনটা এটা আইডেন্টিফাই করেছে, সেটা আর সিগন্যাল পাঠাচ্ছে না – পুরো ডেড। ওই অ্যানোম্যালি সিগ্ন্যালিং এর কিছু পর থেকেই সেটা যে কোথায় হাপিস হয়ে গেছে তার কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তোমাকে ওখানে একবার যেতে হবে।”

     অশোকের বুক ধ্বক করে উঠল। এক একটা ড্রোনের দাম কম করেও কয়েকশো কোটি ডলার। “স্যার হেড অফিস থেকে কিছু বলেছে?”

     “হুম – আর সেজন্যই জরুরি তলব। এটা কাল রাতেই হয়েছে। তোমাকে আজই বেরিয়ে পড়তে হবে। গিয়ে দেখ যদি কিছু পাও। আসলে আমিই যেতাম, কিন্তু সক্কাল সক্কাল খবর পেলাম আমাদের চেয়ারম্যান মিঃ ওয়াটস আসছেন মিটিং করতে এই ব্যাপারে। আমাকে ঘাঁটি ছাড়লে চলবে না। বরং তুমি এখনই বেরিয়ে পড়।”

     “স্যার- অ্যানোম্যালিটা আর কারওর চোখে ধরা পড়েনি তো? আপনি তো জানেনই সিন-সিটি বা ওয়াটার-নিয়ারদের ড্রোনও এদিক সেদিক করে বেড়াচ্ছে আজকাল।” অশোক বলে ওঠে।

     “দ্যাখ, বলা যায় না – অ্যানোম্যালিটা হয়তো আরও কারও চোখে পড়ে গেছে। আজ না হয় কাল ওখানে অ্যাটাক হতেই পারে। পারলে তুমি আগে গিয়ে জায়গাটা রেকি করে কোনও পোটেনশিয়াল রিসোর্সকে ট্যাপ কর। কিছু পেলে জানিও। তবে সবার আগে ড্রোনটা ট্র্যাক কর। ওটা পেলে ডিসম্যান্টেল করে নিয়ে চলে এস এখানে। কোম্পানির গাড়ি বিজি আছে – তোমার গাড়িতে হবে?”

     “হ্যাঁ স্যার – আমার গাড়িতেই হয়ে যাবে। ড্রোনটা তো বেশি বড় নয় – ডিসম্যান্টল করলে বেশি স্পেস নেবে না। তবে যদি ওটা না পাই?”

     “পেলে আমাকে সিকিওর লাইনে যোগাযোগ করবে, আর না পেলে সেটাও জানাবে। – আর কথাটা যেন কোনওমতেই পাঁচকান না হয়। আশা করি এতটুকু বিশ্বাস তোমাকে করাই যায়।”

     “নিশ্চই স্যার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” অশোক ভরসা দেবার চেষ্টা করল।

     “কতটা এরিয়া জুড়ে এই টাইপ থ্রি গ্রেড আছে?” অশোক জিজ্ঞেস করল।

     বস কিছুক্ষণ অশোকের দিকে তাকিয়ে রইলেন, “স্যাটেলাইট ভিশন বলছে শখানেক বর্গ কিলোমিটার জুড়ে।”

     “আর ফাইভ পয়েন্টার দেখা গিয়েছে?”

     “মাত্র কয়েক কাঠার ওপর।” বস বললেন।

     “মাত্র” হতাশ হল অশোক – “যদি কিছু থাকেই, তাহলে তো মাত্র কয়েক কোটি ডলার জুটবে।”

     “তাতে কী?” বস খেঁকিয়ে উঠলেন। “ব্যাবসাটা আমি সামলাচ্ছি না তুমি? সেসব ডিসিশন আমাকে নিতে দাও। তোমাকে জরিপ টরিপ কিচ্ছু করতে হবে না। কেবল ড্রোনটা দেখে এস। আর পরশু সন্ধ্যের মধ্যে রিপোর্ট সমেত অফিসে চলে আসবে। নো ভিডিও কলিং – আই নিড ইয়োর ফিজিক্যাল প্রেজেন্স হিয়ার, ইন দিস ভেরি রুম। অ্যান্ড কিপ ইয়োর ড্যাম সেলুলার ডিভাইস হ্যান্ডি।”

     “ওক্কে স্যার।”

     অশোক কাজটায় বেশ একটা রোমাঞ্চের গন্ধ পেল। বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল সে তেমন ফিল্ডওয়ার্ক করেনি। অফিস আর আদালতে ছুটতে হয়েছে কেবল। ধুমড়ির কাজটা তার পোচিং-ই বলা চলে। নিজে থেকে রিসোর্স আইডেন্টিফাই করেছিল তাও গত বছর। কাজটা পেয়ে অশোক বুঝল, তার খিদেটা এখনও মরেনি।

     তবু কিছু কিছু জায়গায় তার খটকা লাগছে। সে সেনদার ঘরে আবার হানা দিল, “সেনদা – একটু চা-সিগারেট চলবে নাকি? আপনার ফেভারিট ব্র্যাণ্ড আছে কিন্তু।”

 

     “সেনদা – ব্যাপারটার মধ্যে আমি একটা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছি। যেটা খুব সুবিধের নয়।” সিগারেটে একটা টান দিয়ে অশোক বলল।

     সেনদা চায়ের কাপে একটা সশব্দ চুমুক দিয়ে বলল, “কীরকম?”

     “ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল গোছের কেস! ছিল টাইপ থ্রি, হয়ে গেল টাইপ ফাইভ – আবার পলক ফেলতেই সেটা হয়ে দাঁড়াল টাইপ থ্রি! এটা কি মগের মুলুক নাকি? ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে?”

     সেনদা অশোকের পাশে একটু সরে এসে বললেন, “ভিডিওটা দেখেছ?”

     “নাঃ দেখিনি। তবে এসে দেখে নেব। সার্ভারেই তো তোলা আছে।”

     “একটু দেখে যেও।”

     “আপনি দেখেছেন?” অশোক জিজ্ঞেস করল।

     “দেখেছি। বস সকালে এসে কাউকে না পেয়ে আমাকেই ডেকেছিল কী বুঝছি জানতে। অদ্ভুত ব্যাপারটা কী জানো অশোক, টাইপ ওয়ান গ্রেড দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় টাইপ থ্রি গ্রেডের ওই জায়গাটা লুকানো ছিল কেমনভাবে সেটাই আশ্চর্যের। তার ওপর ড্রোন হিট সিগন্যালিং এ জায়গাটা হঠাৎ করে সবুজ হয়ে গিয়ে আবার কমলা হয়ে গেল। যেন কেউ কিছু একটা অন করেছিল, আবার অফ করে দিল।”

     অশোক চমকে উঠল, “টেকনিক্যাল গ্লিচ নয় বলছ?”

     “সেরকম মনে হল না আমার। যাইহোক, তুমি এসব ভালো বুঝবে। তবে জায়গাটা নাকি খুব একটা ভালো নয়। তৈরি হয়ে যেও।”

     “কিন্তু ড্রোনটা গেল কোথায়?” অশোক অবাক হয়।

     “হয়ত কিছু বিগড়েছিল। দেখ ওখানেই পড়ে আছে হয়ত।” সেনদা বলে ওঠেন।

     অশোক বুঝল, তাকে তৈরী হয়েই যেতে হবে। সার্ভের যন্ত্রপাতি তার কাছে থাকেই –তবু কিছু দরকারি জিনিসপত্র কী মনে করে সে গাড়িতে তুলে নিল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ভেতরের একটা গোপন কুলুঙ্গিতে তার আল্ট্রাসোনিক গ্লক গানটা রাখা আছে। সেটা হাতে নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল সে। জি পি এস এ দেখাচ্ছে – শোভাবাজারের ওপর দিয়েই তাকে যেতে হবে। সকালের অতৃপ্ত কামনাটা হঠাৎ প্যান্টের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল অশোকের। হাতে অনেকটা সময় আছে। সন্ধ্যে করে বেরোলেই হবে। ছ-শ কিলোমটার যেতে ঘন্টা পাঁচেকের বেশি লাগার কথা নয়। রাস্তা বেশ ভালো – প্রায় সবই সিক্স লেন। গ্রেটার কলকাতা পেরোলেই রাস্তা একটু খারাপ – তবে সেটা পেরোতেও বেশি লাগবে না। ভলভোর এই গাড়িটা অফ –রোডেও ভালো সার্ভিস দেয়।

     দালালটাকে ধরে সকালের মেয়েটার কাছে যেতে বেশি সময় লাগল না অশোকের। মেয়েটা তাকে দেখে মুচকি হাসল – যেন তার আশাতেই পথ চেয়ে বসেছিল। অশোকের কামনা তখন উদগ্র হয়ে উঠেছে – সে প্রায় বন্য পশুর মতোই মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

 

     রমণতৃপ্ত অশোক একটা সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে রইল বিছানায়। মাথায় এখন হাজার চিন্তা ঘুরছে। স্যাটেলাইট ড্রোন গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা খুবই আশ্চর্যের।

     “এত কী ভাবছ বলত?” মিষ্টি গলার কথাটা শুনে অশোকের চটকা ভেঙে গেল। মেয়েটা তার পাশে শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অশোক ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকাল। বড় বড় চোখের নিকষকালো তারায় হাল্কা দুষ্টুমি খেলা করে বেড়াচ্ছে। মুখটা ভীষণ সুন্দর। গায়ের রঙ কিছুটা চাপা –কিন্তু সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছে তার সারা অঙ্গ থেকে। দেখে চট করে ধান্দাওয়ালি মনে হয় না। চোখে মুখে একটা বুদ্ধির ছাপ রয়েছে।

     অশোক কী বলবে চট করে বুঝে উঠতে পারল না। উঠে জামাকাপড় পরতে পরতে বলল, “তোমার নাম কী?”

     মেয়েটা হাল্কা হেসে বলল, “রমা।”

     “আমার নাম অশোক।” জামাটা গুঁজতে গুঁজতে জিজ্ঞেস করল সে, “তোমার বাড়ি কোথায় রমা?”

     “ধুপগুড়ি”।

     অশোকের হাত মুহুর্তের জন্য থেমে গেল। নামটা কোথায় শুনেছে – বা দেখেছে! মনে করতে পারল না সে। তবে যাবার সময় নোটের তাড়াটা বিছানার পাশে রেখে যেতে ভুলল না। গাড়িতে বসে জি পি এস টা অন করতেই তার হৃৎপিন্ড যেন মুহুর্তের জন্য থেমে গেল। কী আশ্চর্য সমাপতন। এক ছুটে আবার দোতলায় উঠে মেয়েটার ঘরে সজোরে নক করল অশোক। 

**************************************************************************

     অনন্যার বাড়িতে অশোক যখন পৌঁছাল, তখন সন্ধ্যে হয় হয়। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, আর অনন্যা যথারীতি রীনাকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। বাবাকে দেখতে পেয়ে রীনা এক ছুটে অশোকের কোলে উঠে পড়ল। বাবাকে ছাড়া তার এক মুহুর্তও চলে না। অন্যদিন হলে অশোক রীনাকে একটু আদর করেই নামিয়ে দিত, কিন্তু আজ কেন জানি তার মনে হল সে এমন কোথাও যেতে চলেছে, যেখান থেকে তার ফিরে আসা কঠিন হবে। এমনিতে সে যথেষ্ট ডাকাবুকো – কিন্তু রীনাকে বুকে নিয়ে আজ তার মনটা এক অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল। তার কিছু হলে এই মেয়েটার কী হবে!! অনন্যা তো তার দু-নম্বর ফ্যামিলি নিয়ে দিব্যি আছে। সে কি কোনওদিন তার মেয়েকে আপন করে নিতে পারবে?

     “কী হল, মুখটা শুকনো কেন?” অনন্যার গলার আওয়াজে চটকা ভেঙে গেল অশোকের।

     “না না তেমন কিছু না।” রীনাকে কোল থেকে নামিয়ে অনন্যাকে টেনে পাশের ঘরে নিয়ে গেল অশোক। অনন্যার বর্তমান স্বামী পুলিশ অফিসার। কর্তব্যের খাতিরে তাকে অধিকাংশ সময় বাইরেই থাকতে হয়। আর অশোকের সঙ্গে দেখা করার জন্য অনন্যা সেইসব সময়গুলোই বেছে নেয় নির্দ্বিধায়।

     “আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্টে একটু বাইরে যেতে হবে। ব্যাপারটা একটু সিরিয়াস – ক-দিন বাইরে থাকতে হতে পারে। রীনাকে সে ক-টা দিন তোমার কাছে রাখো।”

     “অশোক – কী হয়েছে?” অনন্যার গলায় যেন হালকা উদ্বেগ। এ কী হল অশোকের। অনন্যার সঙ্গে তার সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে অনেকদিন হল। তাও আজ সামান্য কথা শুনে তার মনটা দুর্বল হয়ে পড়ছে কেন!

     “কিছু না” অশোক স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে, “তুমি রীনাকে রাখলে সমস্যা হবে না তো? তিমির যদি কিছু বলে?”

     “আরে কিচ্ছু বলবে না। ও কখন আসে কখন যায় তার কোনও ঠিক নেই। তাছাড়া এই ফ্ল্যাটে নতুন এসেছি – বিশেষ কাউকে চিনি না। তাদেরই কারুর বাচ্চা বলে চালিয়ে দেব। সে নিয়ে চিন্তা করো না। ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরো।”

     অনন্যাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অশোক চটজলদি কিছু খাবার প্যাক করে নেয়। কয়েক বোতল ফ্রুটজুস আর বিয়ারের ক্যানও তুলে নেয় গাড়িতে। ওয়াটারহাউসের কার্ড দেখিয়ে ডিসকাউন্টে কিনে নেয় কিছু জলের বোতল। তারপর গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সোনাগাছির উদ্দেশ্যে।

 

     সোনাগাছি থেকে রমাকে তুলে নিয়ে অশোক যখন যাত্রা শুরু করল, তখন প্রায় রাত আটটা। অটোমোড সরিয়ে রেখে অশোক নিজেই ড্রাইভ করছে। তার মাথায় এখন গুনগুন করছে চিন্তার সারি। জিপিএস এ কারুতীর্থ যাওয়ার পথে যে যে জায়গাগুলো দেখাচ্ছিল, তাদের মধ্যে সবথেকে শেষ গ্রাম হল ধুপগুড়ি। হ্যাঁ – রমা যেখানে থাকে বলেছিল। সেটা দেখার পরই ও ঠিক করে ফেলেছিল রমাকে সঙ্গে নেবে। নতুন জায়গা, সঙ্গে একজন লোকাল কেউ থাকলে সুবিধে হয়। তাছাড়া এরকম একটা সুন্দরীকে ছেড়ে থাকতে বেশিক্ষণ ইচ্ছে করছিল না অশোকের। যদি ওখানে ক-দিন থাকতে হয় – তাহলে রমা কাজে আসতে পারে। তার জন্য অবশ্য রমা এবং দালালকে মোটা টাকা দিতে হয়েছে তাকে। অশোকের সবই ঠিক আছে, কিন্তু নারী শরীর আর সুরা দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়। এই জন্যই তো অনন্যা……

     সন্ধ্যের অন্ধকারে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে কলকাতা। চারিদিকে বিরাট বিরাট ইমারতের সারি। বড় বড় মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীর হেডকোয়াটার্স ফ্লুরোসেন্ট আলোয় সেজে উঠেছে। কলকাতা এখন এক কৃত্রিম শহর। জায়গাগুলোর আদিম নাম কিছু আছে বটে, কিন্তু কলকাতা এখন – কী যেন বলত এককালে, “কল্লোলিনী তিলোত্তমা”। সমস্ত শহরটাকে মুড়ে দেওয়া হয়েছে এক কৃত্রিম পরিবেশের চাদরে। কলকাতায় এখন আর গরম নেই – পুরোটাই যাকে বলে, সেন্ট্রালাইজড এয়ার কন্ডিশনিং। এককালে এখানে নাকি ভীষণ পচা গরম পড়ত। গত কয়েকশো বছরে গরম আরও বেড়েছে, আর পাল্লা দিয়ে বেড়েছে একটা জিনিসের আকাল – সেটা হল জল।

     অশোক বইতে পড়েছে, প্রায় তিনশো বছর আগে থেকে, পৃথিবীতে জলের অভাব ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। যদিও পৃথিবীর তিনভাগ জল দিয়েই ঘেরা, তবু পানযোগ্য জলের পরিমাণ মাত্র দেড় শতাংশের কিছু বেশি – যা ছড়িয়ে আছে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে, যাকে বলে অ্যাকুইফার। নদী, হিমবাহের জল হয়তো আছে, কিন্তু হিমবাহের জল তো আর পান করা যায় না। নদীর জল বলতেও বরফগলা জলের পুষ্ট নদীই ভরসা। এই পানযোগ্য জলের বন্টন আবার সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও কম, তো কোথাও প্রকৃতি যেন উজাড় করে জলের ধারায় ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছেন চারদিক।

     পৃথিবীর বহু জায়গার মতো ভারতের বেশ কিছু স্থানে জলের আকাল প্রচন্ড বেশি। বিশেষতঃ দক্ষিণ ভারতে বর্ষার জলে পুষ্ট নদীগুলি বহুদিন আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ঘোর অনাবৃষ্টির কারণে। কাবেরী, গোদাবরী, নর্মদা – এদের নাম ইতিহাসেই থেকে গেছে। ওসব জায়গা দিয়ে আজকাল পন্যবাহী ট্রাক চলাচল করে- সিক্স টু এইট লেন হয়ে গেছে ওইসব নদীর খাত। দক্ষিণের মানুষজন উঠে এসেছে উত্তরে এবং পুবে। কিন্তু সেখানেও তারা থেকে গেছে অন্তেবাসীর মতো।

     টেকনোলজির ওপর মানুষের দখল যত বেড়েছে, ততই ক্রমশ কমেছে তার পরিবেশ সচেতনতা। বহু শত বছর আগে, যখন প্রাগৈতিহাসিক কলকারখানার ধোঁয়া বা খনিজ তেল চালিত গাড়ির ইঞ্জিনের ধোঁয়া আকাশকে কালো করে দিত, বাতাসে ছড়াত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড, সালফারের কণা – তখন ব্যাপারটা অনুধাবন করা অনেক সহজ ছিল। কারণ তা সরাসরি এফেক্ট করত মানুষের চারপাশের পরিবেশকে। কিন্ত তার পরবর্তীকালে পরিবেশ দূষণ ঘটেছে, হয়ত অনেক বেশি পরিমানে ঘটেছে – কিন্তু মানুষ তা সেভাবে টের পায়নি, বা হয়ত টের পেতে দেওয়া হয়নি। ডিজিটাল বর্জ্য, সস্তার এয়ার কন্ডিশনিং এ ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, ভারী শিল্পের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা, কৃষিতে ভুগর্ভস্থ জল তুলে সেচের কাজে ব্যবহার, বৃষ্টির জলকে সেভাবে সঞ্চয় করার ব্যাপারে সিরিয়াস না হওয়া এবং সর্বোপরি জল নিয়ে যথেচ্ছাচার – পানযোগ্য জলকে দিন দিন দুর্মূল্য করে তুলেছে।

     খনিজ তেল শেষ হয়ে যাবার পর, সোলার বা স্পেশাল সেল ব্যাটারি ব্যাবহার করে গাড়ি, ট্রেন, বাস, প্লেন চালানো গেছে বটে, কিন্তু জল ছাড়া যে মানুষ অচল! তাই প্রথমে জলে র‍্যাশনিং করা হয়েছে, তারপর প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয়ে জল দখলের ঠান্ডা যুদ্ধ। এখন আর কেউ কাউকে অস্ত্র দেখিয়ে চোখ রাঙায় না। মানুষ পরমাণু অস্ত্রের পরিবেশনাশক ক্ষমতা বুঝে নিয়েছে। আজকাল এরা অর্থনীতির ময়দানে নেমে শান্তভাবে একে অপরের ঘাড় মটকে দেয়।

     ভারতের পূর্বভাগ এবং উত্তরভাগের জলসম্পদ প্রচুর। তা কেবল গঙ্গার উপস্থিতির জন্য নয়, পাহাড়ী ঝর্ণা, এবং পূর্বভারতের লোভনীয় ভূগর্ভস্থ জলস্তর ভারতের জনসংখ্যার এক বিপুল অংশের জলের চিন্তা মেটাতে সক্ষম। হতে পারে, আমেরিকার ভূতপূর্ব অ্যাকুইফার ওগাল্লালার মতো এদের বিস্তার এত বেশি নয়, তবে পরিমাণের প্রাচুর্যে এইসব জলের গুরুত্ব ক্রমশই বেড়ে চলেছে।

     চিনের অবস্থা ভারতের থেকে আরও খারাপ। কুখ্যাত পীত নদী হোয়াং হো এখন নালা বললেই চলে। চিনের এক বিরাট অংশের, প্রধানত উত্তর চীনের জলের সমস্যা মেটাতে গিয়ে সে নিজের জীবন উতসর্গ করেছে। ইয়াং সি এর এক হাল। চীন এখন পাগলের মতো জল সম্পদ খুঁজে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে, যাতে তার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে ন্যুনতম জলটুকুর জোগান দেওয়া যায়।

     ভারতের এই মূল্যবান জলসম্পদ রক্ষা করতেই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী হয়েছে কন্ট্রোলড অ্যাকুইফার ইউজ ফর সাসটেনেবেল এনভায়রনমেন্ট (CAUSE), আর তারই ফলশ্রুতি হিসাবে মাথা তুলেছে ওয়াটারহাউস – ভারতের সবচেয়ে পুরানো অ্যাকুইফার আইডেন্টিফায়ার এণ্ড ওয়াটার রাইটস প্রোটেকশন কোম্পানী। এদের ফিল্ড এজেন্টদেরকে বলা হয়, “ওয়াটার রিসোর্স ট্র্যাকার” বা ডব্লিউ আর টি। অশোক যখন ওয়াটারহাউস জয়েন করে তখন সে নিজেও ছিল ফিল্ড এজেন্ট। ওয়াটারহাউসে সবাইকেই ফিল্ড ঘুরতে হয় প্রথম কয়েক বছর। তারপর বিভিন্ন পজিশনে পদোন্নতি ঘটে। অশোকের ব্যাগগ্রাউন্ড কম্পিউটার সায়েন্স থাকায় তাকে আই-টি সামলানোর দ্বায়িত্ব দেওয়ায় হয়। তবু বেশ কয়েক বছর সে গভীরভাবে ওয়াটার রিসোর্স খোঁজার কাজ চালিয়েছে, মাটি পরীক্ষা করা, মাটিতে বালির পরিমান, চুনাপাথরের পরিমাণ, নুড়ি বা পাথরের উপস্থিতি এসব দেখে তার চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মাটির উপরিভাগ দেখে সে বলে দিতে পারে সেই মাটির নীচে জল আছে না নেই।

     ওয়াটারহাউসের একাধিপত্যে গত ছ-সাত বছর ধরে থাবা বসিয়েছে কিছু মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানী। সরকারী আনুকূল্যে যাদের হাত ক্রমশই লম্বা হচ্ছে। যেমন সিন-সিটি, আক্যুই-নিয়ার ইত্যাদি কোম্পানী। এদের মধ্যে দু-একটি চীনা কোম্পানীও আছে। লোকজন বলাবলি করছে, এরা সব আমেরিকা দস্যু তস্করের দল। ভারতের জলসম্পদের ওপর এদের অনেকদিনের নজর। ছলে বলে কৌশলে সেগুলো দখল নিতেই নাকি এদের আবির্ভাব। যাগগে যাক – অশোক এত রাজনীতি বোঝে না।

     তবে সে এটা বেশ বুঝেছে, জল দখলের লড়াইতে ভারতের চারপাশ থেকে ছেঁকে আসছে বড় বড় রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো। এরা অনেকেই ভারত সরকারের সঙ্গে গায়ে পড়ে শিল্প চুক্তি করেছে। তাদের দেশ থেকে ভারী শিল্প তুলে এনেছে এদেশে – বিশেষতঃ বঙ্গদেশের এদিকেই যেন এদের নজর বেশি। কলকাতার পরিবেশকে কৃত্রিম পরিবেশের চাদরে মুড়ে দিয়েছে এদেরই তৈরী অ্যাটমোসফিরারিক কন্ট্রোলার। প্রচুর খরচ হয়েছে এটা করতে – সরকারকে প্রভুত অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে এরা। সরকারও এখন এদের বদান্যতায় বিগলিত।

     অশোকের চারপাশের শীতাতনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম কলকাতা এখন উধাও – ভলভোর ভারী চাকা দ্রুতগতিতে গড়িয়ে চলেছে সিক্স লেন রাস্তার ওপর দিয়ে। এখন এই রাস্তার দুপাশে বিরাট শিল্পাঞ্চল। অধিকাংশরই হেড অফিস কলকাতাতেই। অশোক চট করে জলের বোতল থেকে কিছুটা খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল। জিনিসটা বেশি ব্যবহার করা যাবে না। রাস্তায় জল আর পাওয়া নাও যেতে পারে। বাকিটা বিয়ার আর ফ্রুট জুসেই গলা ভেজাতে হবে।

     ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনে এসে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে গাড়ির স্টেপনি ব্যাটারীতেও চার্জ ভরে নিল অশোক। রমাকে ডেকে তুলে খাবার খেতে দিল এবং নিজেও কিছু খেয়ে নিল। সারারাত আর কোথাও গাড়ি দাঁড় করানো যাবে না। চারপাশে প্রচুর ঘন বসতি আর এসব জায়গায় ডাকাতি, ছিনতাইও হয় প্রচুর। কলকাতা থেকে বেরোলেই আইনি ব্যবস্থার এই অবনতি প্রায় চোখে পড়ার মতো। এইসব লোকগুলোই ওই শিল্পনগরীতে শ্রমিকের কাজ করে। অশোক জানে এদের চাহিদা প্রচুর, জোগান সীমিত। জলের জন্য লোকগুলো হাহাকার করে মরে। প্রতিদিন মাথাপিছু পাঁচ লিটার জল বরাদ্দ এদের জন্য। এতেই ওদের সব কিছু সারতে হয়।

 

     রমার দিকে চোখ যেতেই অশোক দেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। ড্রাইভারের পাশের সিটটা পুরো ফেলে দিয়ে একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে। অশোক আলতো স্বরে ডাকল, “রমা”

     “উঁ”

     “কয়েকটা কথা ছিল।”

     “বলো”

     অশোক তৈরী হয়ে নিল। “তোমার ব্যাপারে তো কিছুই জানি না। তোমাকে দেখে ঠিক সোনাগাছির বেশ্যা বলে মনে হয় না। ধূপগুড়ি থেকে এতদূর উজিয়ে এখানে এলে কিভাবে?”

     “কেন গো? তোমাদের শরীরের খিদে থাকতে আছে- আর আমাদের থাকতে নেই?” খিলখিল করে হেসে উঠল রমা।

     অশোক একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেল। এতটা সোজাসাপ্টা জবাব সে আশা করেনি।

     “না গো অশোকবাবু – সেসব নয়”, রমার গলা সিরিয়াস, “ধূপগুড়ি আর বাসযোগ্য নেই গো। মাটির তলার জল শেষ। এখন বেশি খুঁড়লে আর্সেনিক ওঠে। ওই জল খেয়ে আমাদের গাঁয়ে কতলোক মারা গেছে, কতলোকের ক্যান্সার ধরা পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। গঙ্গার শুদ্ধ জল অতদূরে পৌঁছায় না। আর পৌঁছালেও তা বড় কম। বাড়িতে আমার এক বাবা আর এক ভাই। তাদের জন্য কিছু করব বলে এতদূর পাড়ি দিয়েছিলাম মাসখানেক আগে। এখানে এসে দেখি, কলকাতার ব্যাপার স্যাপারই আলাদা। চাকরি না করলে এখানে এক সপ্তাহের বেশি থাকা যায় না – পুলিশ এসে আই ডি চেক করে, নিজেদের রেকর্ডের সঙ্গে মেলায়। তাই একরকম বাধ্য হয়েই……”

     অশোক জানে গণিকালয় পুরোপুরি আইনসম্মত এবং স্যালারাইড একটা জীবিকা। মেয়েটার রূপের জন্যই চাকরিটা তার লেগে গেছে যদিও – না হলে কলকাতা থেকে ঘাড়ধাক্কা খেতে তার এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগত না। কলকাতায় ঢোকার সময় সীমান্তরক্ষীরা রীতিমতো চেক করে একটা ক্যাপসুল খাইয়ে দেয় কোনও নতুন আগন্তুককে। এক সপ্তাহ তা কোনও সমস্যা করে না। আসলে সেটা একটা বায়ো জিপিএস ট্র্যাকার। এক সপ্তাহের মধ্যে আগন্তুকের এমপ্লয়ার তাকে একটি বিপরীত ক্যাপসুল খেতে দেয় – তা খেলেই আগেরটা ডিঅ্যাক্টভেট হয়ে গিয়ে পুলিশের কাছে সংকেত চলে যায়। আর এক সপ্তাহে চাকরি না জুটলে, পুরানো ক্যাপসুলের ট্র্যাকার ধরে পুলিশবাহিনী সেই বেকার আগন্তুককে পাকড়ে তাকে কলকাতার বাইরে খেদিয়ে দিয়ে আসে।

     আজকাল বেকার উদ্বাস্তুদের কলকাতায় কোনও ঠাঁই নেই – যদি না সে পলিটিক্যালি খুব পাওয়ারফুল হয়!

     বিরাট একটা পাঁচিলের ধার ঘেঁষে চলেছে অশোকদের গাড়ি। অশোক জানে পাঁচিলের ওপাশেই বয়ে চলেছে গঙ্গা। তাকে আজকাল আর দেখাই যায় না। সে জল কেবল শিল্পের কাজে লাগে, আর লাগে এতগুলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে। বিরাট বড় বড় জল সংশোধনাগার দিনরাত কাজ করে চলেছে গঙ্গার জল পরিশুদ্ধ করার। কিন্তু কতদিন? অশোক জানে এই আশঙ্কা তার মতো আরও অনেকের। আর তাই এই অ্যাকুইফার খোঁজার ও তার দখল নেওয়ার এত আকাঙ্খা, এত উদ্যোগ।

     মানুষ যে ভাবেই হোক–নিজে আগে বাঁচতে চায়।

     রমা আবার চোখ বুজে ফেলেছে। মেয়েটা কথা বলে কম। অশোকের নিজেরও ঘুম পাচ্ছে বেশ। তবে ঘুমানোর আগে সে জিপিএস টা সেট করে নিল ধূপগুড়িতে – তারপর অটোমোড অ্যাক্টিভ করে শুয়ে পড়ল। গাড়ির ছাদটা ক্রমে স্বচ্ছ হয়ে উঠল রিমোটের চাপে। সেখান দিয়ে অশোক দেখতে চেষ্টা করল রাতের তারাভরা আকাশ – কতদিন সে দেখেনি। কলকাতায় এখন আকাশ দেখতে চাওয়া বাতুলতা। অ্যাটমোসফিয়ারিক কন্ট্রোলার আকাশকে ঢেকে রাখে – তাছাড়া পাশের শিল্পাঞ্চল থেকে যে ধোঁয়া বা ধূলো ওঠে, নির্মেঘ আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে তুলতে তা যথেষ্ট।

     অশোকের চোখে ঘুম নেমে এল। কাল অনেক কাজ আছে।

 

     ভোরবেলার প্রথম আলো স্বচ্ছ কাঁচের চাদরের মধ্যে দিয়ে অশোকের চোখে পড়ে তাকে জাগিয়ে তুলল। গাড়ির ব্যাটারী যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও, সারারাত এসি চালানোর ফলে তার চার্জও কিছুটা কমে এসেছে। অশোক এসিটা বন্ধ করে দিল হাত বাড়িয়ে। তাকিয়ে দেখল রমা এখনও শুয়ে রয়েছে। বাপরে – মেয়েটা কিছু ঘুমোতে পারে। কন্ট্রোলড এয়ার প্রেসার ডিভাইসটা নিয়ে সে গাড়ির বাইরে বেরোল। মুখ হাত পা পরিষ্কার করতে আজকাল এই ডিভাইসই ভরসা। জল দিয়ে মুখ ধোওয়া লোকে ভাবতে পারে না খুব একটা। অতি ধনীরা হয়ত বাড়িতে ট্যাঙ্ক করে জলের সাপ্লাই রেখে দিয়েছে, কিন্তু মধ্যবিত্ত বা গরীবরা আজকাল এটাই ব্যবহার করে।

     বাইরে বেরোতেই রোদের উত্তাপ অশোককে যেন পুড়িয়ে দিতে লাগল। উফফ –কি গরম। কলকাতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াতে থাকতে থাকতে এমন অভ্যেস হয়ে গেছে, বাইরের উত্তাপকে মানিয়ে নিতে শরীরের বেশ কষ্ট হয় এখন। দূর-দূরান্ত অবধি ধূ ধূ প্রান্তর। মাঝে মাঝে কয়েকঘর বাড়ি। গাছপালা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াও জলসঙ্কট মায় পরিবেশের এই বিপুল অবনতির কারণ। শহুরে অশোকের ভাবতেও কষ্ট হয় যে এসব জায়গায় মানুষজন থাকে।

     তবু অনেকদিন পর বাইরের পরিবেশে বুকভরে নিশ্বাস নিতে পেরে ভালোই লাগছে। এখানে কারখানা নেই, তাই বাতাস রুক্ষ হলেও নির্মল। অশোক জানে, সে এমনিতেই বিহাইন্ড শিডিউল চলছে। কারুতীর্থের দিকে বেরিয়ে পড়াটা দরকার এখুনি। তার আগে একটু দুধ চা খেলে ভালো হয়। গাড়িতে ফিরে গিয়ে অশোক দেখল রমা উঠে পড়েছে।

     “গুড মর্নিং”

     “হুম – গুড মর্নিং”

     “যাও মুখে একটু হাওয়া দিয়ে এস। আমি চা বানাচ্ছি – দুধ চা খাও তো?”

     “খাই।”

     “রমা, আমরা এখন ধুপগুড়িতে। এখানে তোমার বাড়িটা কোথায়?”

     রমা কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল –তারপর বলল, “অনেকটা ভেতর দিকে। বাদামতলা বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে।”

     “তোমার বাড়িতে ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে না?” কাজের সময় অশোক চায়না তার কোনও সঙ্গী থাক।

     “তা তো করছেই।” রমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “ওই সোজা রাস্তাটা ধরে কিছুটা গেলেই আমার বাড়ি। আমাকে নামিয়ে তুমি চলে যেও। বাই দ্য ওয়ে, যাচ্ছটা কোথায় শুনি?”

     অশোক মুচকি হাসল, “আমি যাচ্ছি দ্বারভাঙা। আমার কাকার বাড়ি। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। ভাবলাম একটা উইকএন্ড ড্রাইভও হবে। তবে রেডি থেকো। আমি রাতেই এসে তোমাকে তুলে নেব।”

     “বেশ”।

     ধূপগুড়ি থেকে গাড়ি এগিয়ে চলল দুলকি চালে। চারপাশের পরিবেশ আরও রুক্ষ হয়ে উঠছে। দুপাশে কেবল ন্যাড়া পাহাড়ের সারি। মাঝে মাঝে কিছু ঝোপঝাড়। একটা বাজার মতন অঞ্চলও পেরিয়ে এল অশোকরা। কয়েকটা মুদীখানার দোকান আর একটা বিশাল বড় জলের ট্যাঙ্ক। সরকার থেকে পাইপ লাইনে করে জল এই ট্যাঙ্কেই ভরে দেয়। সেই পাইপ মাটির বেশ নীচে দিয়ে গেছে। অশোক শুনেছে পাইপের ওপর কয়েক লেয়ার ধাতব কোটিং এর উপর নাকি একটা হাল্কা বিদ্যুত প্রবাহ চলে – যাতে কোনও উঞ্ছ মানুষ লোভের আতিশয্যে পাইপ কেটে জল না বের করে নিতে পারে।

     বাজার পেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তা আরও খারাপ হতে শুরু করল। ফেটে যাওয়া মাটি আর পাথরের সঙ্গে মুহুর্মুহু টক্করে ভলভো কেঁপে উঠতে লাগল প্রতি মুহুর্তে। ধুপগুড়ি থেকেই অশোক গাড়ির অটোমোড অফ করে অশোক স্টিয়ারিং ধরে নিয়েছে। আরও কিছুটা রোলার কোস্টার রাইড চালানোর পর সামনের একটা বাঁক নজরে আসতেই রমা চেঁচিয়ে বলল, “ওই তো বাবা দাঁড়িয়ে আছে।”

     বাস্তবিকই এক মধ্যবয়স্ক মানুষ গাড়িটাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। “বাবাকে ফোনে বলে দিয়েছিলাম যে আমি আসছি।” রমার গলায় উচ্ছ্বাস। অশোকের মুখের ভেরতটায় কেমন তেতো স্বাদ অনুভব করল। সে আশা করেছিল অভিযানটা গোপন রাখবে, কিন্তু এ তো ভালো ঝামেলায় পড়া গেল। এই বুড়ো আবার কজনকে বলবে কে জানে!!

     “রমা – তুমি আমার কথা কিছু বলেছ?” অশোক জিজ্ঞেস করল।

     “না না – শুধু বলেছি আমার অফিসের বস আমাকে ছেড়ে দিতে আসছে।” রমা হাসিমুখে বলল।

     অশোক মুখ টিপে হাসল – মেয়েটার বুদ্ধি আছে। 

     লোকটির কাছে এসে গাড়ি থামাল অশোক। লোকটির বয়স মোটামুটি পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছিই হবে। কর্মঠ চেহারা। ময়লা কাপড় পরে থাকলেও একটা প্রচ্ছন্ন আভিজাত্য যেন ফণা তুলতে চাইছে। মুখে হাল্কা দাড়ি – রোদের তামাটে হয়ে যাওয়া রঙ। কিন্তু চোখগুলো জ্বলজ্বলে। রমার মতো লোকটিকেও যেন ঠিক গ্রাম্য বলে মনে হল না অশোকের।

     “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে” – গমগমে গলায় বলল লোকটি।

     “না না- ঠিক আছে। এদিকেই আসছিলাম তাই ভাবলাম রমাকে ছেড়ে দিয়ে যাই।” অশোক কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

     “এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?” লোকটির গলায় কৌতূহল।

     অশোক সতর্ক হল, “আমি যাব দ্বারভাঙা। ড্রাইভিং করার শখ তো। উইক এন্ডগুলোতে বেরিয়ে পড়ি। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করছি আপনাকে। এখানে কারুতীর্থ বলে জায়গাটা কোথায় বলতে পারেন? নেটে দেখছিলাম এটা নাকি একটা পরিত্যক্ত গ্রাম – কেউ থাকে না, কেউ আসে না। আমার ইচ্ছে ছিল জায়গাটা একবার ঘুরে যাই।”

     লোকটির গলার স্বর নীচে করে বলল, “ওদিকে যাবেন না। ও গাঁয়ে মানুষ থাকে না। প্রায় শখানেক বছর আগে এক মহামারীতে পুরো গ্রাম সাফ হয়ে যায়। তারপর ওদিকে আর কেউ পা দেয় না। এমনিতেই এদিক ছেড়ে সব মানুষজন সরে পড়ছে! শুনেছি ওখানে রাতের বেলায় ওই সব মৃত মানুষদের আত্মা এখনও ঘোরফেরা করে। রাতের বেলায় মাটির নীচে থেকে আওয়াজ ওঠে নানারকম। বলা তো যায় না – তবে আপনার যখন ইচ্ছে। এই সোজা রাস্তাটা দিয়ে কিলোমিটার দশেক যাওয়ার পর একটা ন্যাড়া পাহাড় পাবেন। তার ডানদিকে ঘুরলেই কারুতীর্থ গ্রামের সীমানা।”

     “বটে” – অশোকের সন্দেহ আর কৌতুহল দুটোই আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু সে মুখে একটা কৌতুকের ভাব ফুটিয়ে বলে, “বেশ, আমি জায়গাটা দেখেই বেরিয়ে যাব। আমাকে আজই ফিরতে হবে কিনা। আসার সময় রমাকে তুলে নিয়ে যাব। কাল জরুরী মিটিং আছে অফিসে। চলি – “ অশোকে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল।

     রেয়ার মিররে দেখতে পেল, বাপ আর মেয়ে তার এগিয়ে চলা গাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলে মিলিয়ে গেল রাস্তার ধারে।

 

     ন্যাড়া পাহাড়টা ঘুরে যখন কারুতীর্থের সীমান্তে পৌঁছাল অশোক তখন প্রায় বেলা ১০টা পেরিয়েছে। সূর্য প্রায় মধ্যগগনে। ন্যাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে একটা সরু পায়ে চলার পথ চলে গেছে এঁকে বেঁকে। তার পাশের জমি রোদের তাপে ফুটিফাটা। অশোক বুঝল, তাকে গ্রামে ঢুকতে হবে। তার অভিজ্ঞ চোখ বলে দিচ্ছিল – হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনওখানে।

     ভলভোর সোলার মোড অন করে অশোকের গাড়ি দুলকিচালে এগিয়ে চলল ন্যাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে। প্রায় আধঘন্টা চলার পর অশোক গাড়ি থেকে নেমে এল। এখানকার মাটি ফাটা নয় – বরং ঠিকঠাক। কিন্তু জায়গাটা কেমন যেন অসম্ভব নিস্তব্ধ। একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। যদিও অদূরেই একটা শুকিয়ে যাওয়া গাছের ডালে দুটো তিনটে শকুন বসে রয়েছে। মাটিটাই কেমন অদ্ভুত। সাধারণ এঁটেল মাটি বা লালমাটির যে বৈশিষ্ট্য, তা এখানে অনুপস্থিত। মাটিটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল অশোক। বালিমাটি হলে যেরকম একটা খসখসে ভাব থাকে সেটাও নেই। মাটির চরিত্রটা বুঝতে পারল না সে।

     ম্যাগনেটোমিটারের দিকে তাকাতেই অশোক মারাত্মক চমকে গেল। সাধারণতঃ যেখানে অ্যাকুইফার থাকে সেখানে সামান্য ম্যাগনেটিক এবং ইলেকট্রিক্যাল প্রেজেন্স থাকেই, সেটা সে জানে। ড্রোনগুলো জেনারেলি এগুলোই চেক করে। কিন্তু ম্যাগনেটোমিটারের কাঁটা এরকম ব্যবহার করছে কেন? এত মারাত্মক ম্যাগনেটিক ফিল্ডের উপস্থিতির একটাই কারণ হতে পারে, যে কাছাকাছি কোথাও প্রচুর পরিমানে বিদ্যুত প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব!! এইসব জায়গায় অধিকাংশ বিদ্যুত আসে অত্যাধুনিক সোলার প্যানেল থেকে। বৈদ্যুতিক তার এখানে কোথাও নেই। মাটির বহু নীচে যে জলের পাইপলাইন আছে, তার থেকে বেরোনো বিদ্যুত এত স্ট্রং ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে পারে না। তবে নিশ্চই আশেপাশে কোথাও উচ্চমানের বিদ্যুতপ্রবাহ চলছে। অশোক প্রচন্ড অবাক হল – এত বেশি ম্যাগনেটিক ফিল্ড ড্রোনগুলোতে ধরা পড়ছে না কেন?

     হাতের ঝুরঝুরে মাটির দিকে তাকিয়ে অশোক নিজের ব্যাগ থেকে সয়েল অ্যানালাইজারটা বের করল। স্লাইডে সামান্য মাটি রেখে সকেটে ঢোকানোর পর অ্যানালাইজার পাক্কা তিনমিনিট পর জানাল, সে এই সয়েল আইডেন্টিফাই করতে পারছে না!! অশোকের বুক ধুকপুক করছে – একি হচ্ছে আজ! সেকি অন্য কোনও গ্রহে এসে পড়েছে? মাটির চরিত্র বোঝা যাচ্ছে না – ম্যাগনেটোমিটারের কাঁটা পাগলের মতো ব্যবহার করছে – কিছু তো গন্ডগোল আছে এখানে। মারাত্মক গন্ডগোল। অশোক বুঝতে পারল ব্যাপারটা বসকে জানানো দরকার।

     কানের পাশে লাগানো মাইক্রোচিপকে ভয়েস কম্যান্ড দিতে গিয়ে অশোকের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝতে পারল চিপ ডেড হয়ে আছে। জ্যামার – অশোকের ঘাড়ের রোঁয়া খাড়া হয়ে গেল উত্তেজনায়! নিশ্চিত জ্যামার লাগানো আছে – কোনও সিগন্যাল আসতেও পারবে না যেতেও পারবে না। সেইজন্যই ড্রোনগুলো কম্যিউনিকেট করতে পারে না এই জায়গার সঙ্গে। কিন্তু তাহলে তো ড্রোনে রেগুলার ব্ল্যাঙ্ক সিগন্যাল আসা উচিত ছিল – গ্রেড থ্রি দেখাত না!

     রহস্য – রহস্য এবং আরও রহস্য। অশোকের মনে হল সে একেবারে রহস্যের খাসমহলে এসে পড়েছে। তার বাঁদিকে কয়েকশো ফুট উঁচু নেড়া পাহাড়, চারপাশে ধূ ধূ প্রান্তর, দূরে পাতাঝরা গাছের ডালে তিনটে শকুন… এই ঠা ঠা দুপুর রোদের দাঁড়িয়েও অশোকের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। সে দুর্বল নয়। টান টান ব্রাউনবেল্ট পাওয়া চেহারা তার। রোদচশমার আড়ালে তার তীক্ষ্ণ চোখদুটো অসহায়ভাবে জরিপ করে চলেছে চারপাশ! কিন্তু এমন কিছু চোখে পড়ছে না, যা এই রহস্যের কিনারা করতে পারে।

     অশোক ঠিক করল সে আগে চৌম্বকক্ষেত্রের ব্যপ্তিটা মেপে বের করবে। সে গাড়িতে উঠে অটোমোড অন করল – আর করেই ঠোঁট কামড়াল। তীব্র ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রভাবে অটোমোড জিপিএস সব এদিক ওদিক হয়ে গেছে। ম্যাগনেটোমিটারটাকে সে গাড়ির দরজার বাইরের সকেটে ঝুলিয়ে দিল। ম্যানুয়াল মোডে গাড়ি চলতে থাকল এদিক সেদিক। প্রায় ঘন্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করে অশোক বুঝল এই ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ব্যপ্তি বিশাল এলাকা জুড়ে। কমপক্ষে কয়েকশো বর্গ কিলোমিটারের কম হবে না। কারুতীর্থ গ্রামটা ক্রমে উত্তরে বিস্তার লাভ করেছে অনেকটা। ঠিক কতটা জানে না অশোক।

     দুপুর গড়িয়ে গেল। অশোকের ঘড়িতে এখন বিকেল তিনটে। রোদের প্রচন্ড তেজে মাথা যন্ত্রণা করছে অশোকের। কিন্তু সে রহস্যের শেষ দেখে যাবে – অর্ধেক কাজ করে সে কোনওদিন ফেরেনি। ড্রোনটা আশেপাশে দেখতে পাচ্ছে না সে। তবে সে একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে চায়। ধুকপুকে বুকে স্টীলের হ্যান্ডড্রিলটা বের করল অশোক। কয়েকফুট খুঁড়ে তাতে ওয়াটার সেন্সরটা বসাতে হবে। মাটির ওপর হাঁটুমুড়ে বসল অশোক। ড্রিলটা বের করে খুঁড়তে যাওয়ার আগে, একমুঠি মাটি তুলে ভালো করে পরীক্ষা করল। মাটির গুঁড়োর মধ্যে ওগুলো কী? অশোক খুব ভালো করে দেখতে থাকল – কাঠের গুঁড়ো মনে হচ্ছে যেন!! হাড়ের গুঁড়োও রয়েছে বেশ খানিকটা। বিদ্যুত চমকের মতো অশোকের একটা সম্ভাবনা মনে পড়ে গেল। ব্যাগ থেকে একটানে সয়েল আইডেন্টিফায়ারটা বের করে রিডিং চেক করল। সেলুলোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি।

     প্রায় চিৎকার করে উঠল অশোক – “মাই গড! আর্টিফিসিয়াল সয়েল!!” কিন্তু এখানে কীভাবে? এই বন্ধ্যা জমিতে কে এত কষ্ট করে সিন্থেটিক সয়েল ফেলে রাখবে! অশোক মহা উৎসাহে মাটি খুঁড়ে তাতে সেন্সরটা ফিট করল। যা দেখল, তাতে তার ধুকপুকানি থেমে গেল – সেন্সর নিশ্চিতভাবেই ফাইভ পয়েন্ট সিক্স এর রিডিং দিচ্ছে। অশোক পাগল হয়ে গেল – বার বার করে সেন্সর লাগাল আর ওঠাল। সারা মাঠে অন্তত কুড়িটা জায়গায় সে সেন্সর লাগাল – প্রায় সব জায়গাতেই এক রিডিং!! অশোক উত্তেজনায় মাটিতে বসে রইল। এ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার করেছে সে। তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। কান থেকে কম্যুনিকেটর চিপটা খুলে ফেলল সে। তাকে এখন ভাবতে হবে, অনেক কিছু ভাবতে হবে।

     ড্রোনের কথা এখন বেমালুম ভুলে গেছে অশোক। মাটি থেকে উঠে সে দ্রুতপায়ে এগোল গাড়ির দিকে। আকাশ থেকে তখন সূর্যদেব বিদায় নিয়েছে। ঘনিয়ে আসছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।

     হ্যান্ড সেন্সর দিয়ে গাড়ির লকটা খোলার সময় তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় টের পেল পেছনে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। সেকেন্ডের রিফ্লেক্সে কোমর থেকে গ্লক গানটা বের করে ঘুরতে যেতেই মাথায় একটা জোর আঘাত লাগল শক্ত কিছুর – চোখের সামনে থেকে দুনিয়াটা কালো হয়ে গেল অশোকের।

 

১০

     মাথায় একটা চিনচিনে যন্ত্রণা নিয়ে অশোক চোখ খুলল। তার চোখ খুলেই বুঝল সে একটা গদি আঁটা চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা হয়ে আছে। সামনে দুটো উৎকন্ঠিত মুখ।

     “যাক-বাবা, জ্ঞান ফিরেছে। দেখলি তো আমি বলেই ছিলাম – মারটা এমন কিছু বেশি জোরে হয়নি।”

     “ঠিক আছে ঠিক আছে। বেশী কায়দা মারতে হবে না। এবার দয়া করে বসকে খবর দে।”

     অশোক ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিকে দেখল। রীতিমতো সুসজ্জিত একটা কেবিন। দুপাশে প্রচুর পুরানো বইপত্র সাজানো। সামনে প্রমাণ সাইজের একটা টেবিলে দুটো অত্যাধুনিক ল্যাপটপ এবং রাইটিং ট্যাব। টেবিলের একপ্রান্তে একটা বড় বোতলে জল রাখা।

     “হ্যালো অশোক। জ্ঞান ফিরল তাহলে।”

     মাথার চিনচিনে যন্ত্রনাটা এবার সারা মাথায় ছড়িয়ে পড়েছে। অশোক বুঝতে পারল একটা চটচটে কিছু মাথা থেকে গড়িয়ে নেমে তার চোখের কোণের কাছে শুকিয়ে আছে। রক্ত – অশোক বুঝতে পারল তার বেশ দুর্বল লাগছে। সকাল থেকে সেই চা ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি। উত্তেজনায় খাওয়া ভুলে গিয়েছিল সে। তবুও তার মনে হল, গলাটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।

     একটা চশমাপরা মুখ ঝুঁকে এল অশোকের মুখের কাছে, “কি-হে শরীর খারাপ লাগছে? ড্যারেল, ব্রিং সাম স্ট্রং মকটেল টু দিস জেন্টেলম্যান।”

     “বস!!!!!!” অশোকের গলা থেকে বিস্ময় ছিটকে এল। “আপনি এখানে?”

     “এই তো সোনার চাঁদ চিনতে পেরেছে আমাকে।” বস বলে উঠলেন। “তার আগে জুসটা খেয়ে নাও। শরীরে শক্তি পাবে। অনেক কাজ করতে হবে যে। সময় বড়ই কম।”

     একটা বলশালী মহিলা ঘরে ঢুকল হাতে একটা স্ট্র লাগানো বোতল নিয়ে। অশোকের মুখের কাছে সেটা ধরতেই অশোক চোঁ চোঁ করে পুরো জুসটাই খেয়ে নিল। তেষ্টা পেয়েছিল প্রচন্ড। আর জুসটাতে এমন একটা কিছু ছিল যেটা খেয়ে অশোকের বেশ চাঙ্গা লাগতে শুরু করল।

     “তোমাকে এভাবে অভ্যর্থনা করাতে আমার খুব খারাপ লাগছে অশোক, কিন্তু আমার কিছু করার নেই। তোমাকে এখন আমি কিছু কথা বলব। তারপর তোমাকে কিছু দরকারী কাজ করতে হবে। সেসব হয়ে যাওয়ার পরই আমি তোমাকে মুক্তি দিতে পারি, তার আগে নয়।”

     অশোক চুপ করে রইল। সে জানে ভদ্রলোক তার সামনে সমস্ত রহস্য সমাধান করবেন। কিন্তু সে বুঝল না, সে-ই কেন? ইনি তার থেকে কী চান?

     “অশোক, এই ফিল্ডে তোমার হয়ে গেল প্রায় পনের বছর। কম তো নয়। জল নিয়ে কাজ করতে করতে জলের ইতিহাস এবং পরিবেশ সংক্রান্ত অ্যাডভারসিটি তোমারও জানা। তাই বেসিক জিনিস নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। এটুকু তুমি নিশ্চই জানো, জলের সমস্যা আজ থেকে নয়। এর উৎস বহুযুগ আগে থেকে – বলা ভালো শত শত বছর আগে থেকে। যখন মানুষের হাতে পর্যাপ্ত জল ছিল, আর সে তা যথেচ্ছ ব্যবহার করত। জল নিয়ে প্রচুর সভা, অধিবেশন হয়েছে সে সময়। একটা গালভরা ইভেন্ট হত পৃথিবীতে – যার নাম ছিল ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরাম। বিভিন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সেখানে যেতেন, ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট, রেনওয়াটার হারভেস্টিং, ওয়াটার রাইটস, কন্ট্রোলড ওয়াটার ইউজ, এসবের ব্যাপারে গালভরা লেকচার দিয়ে যে যার ঘরে ফিরে যেতেন। কাজের কাজ এতই সামান্য হত যে সে আর কহতব্য নয়।

     যাইহোক, চীন ঠিক করেছিল, উত্তর চীনে বিরাট পাইপলাইন বসিয়ে দক্ষিণ চীনের হোয়াং হো থেকে জল তুলে নিয়ে যাবে। ওখানকার মারাত্মক জলকষ্ট মেটাবে। কিন্তু মাত্র পঁয়তাল্লিশ শতাংশ হিমবাহের জলে পুষ্ট নদী বেচারী এত চাপ নিতে পারল না। শুকিয়ে গেল। পরিবেশে উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহ গলতে থাকল – আর তার অধিকাংশ জল সমুদ্রে মিশে তাকে পানের অযোগ্য করে তুলল। আমেরিকার বড় বড় অ্যাকুইফার শুকিয়ে কাঠ। ইউনাইটেড নেশনস এ ওয়াটার রাইটস নিয়ে জোর মামলা না হলে এতদিনে বড় বড় দেশগুলো নিজেদের ওয়াটার রিসোর্স নিজেদের হাতেই রেখে দিত। ছোট দেশগুলোর মানুষজন জলের জন্য হাহাকার করে কবেই মারা যেত।”

     অশোক জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু ডি-স্যালিনেশন করেও তো পানযোগ্য জল তৈরী হচ্ছে।”

     “হচ্ছে, সবই ওই ওয়াটার রাইটসের কৃপায়। কারণ ডি-স্যালিনেশনের খরচ কম নয়। তার খরচ যোগান দিতে কোটি কোটি ডলার অনুদান হিসাবে দিতে হচ্ছে বড় বড় দেশগুলোকেই। মামলার হাল হকিকত এখন খুব সুবিধের নয়, যে কোনও দিন এরা অনুদান তুলে নিতে পারে। আর তাই সবাই মিলে অন্য দেশের মাটির নীচের জলসম্পদ কুক্ষিগত করার প্রতিযোগীতায় নেমেছে। যে যতটা পারে নিজেদের নামে লিখিয়ে রাখছে আর কী!”

     অশোকের মাথা ঝিম ঝিম করছে। “সেসব তো বুঝলাম, কিন্তু আমাকে এভাবে ধরে রাখার মানে কী? এসব কথা তো বাঁধন খুলেও করা যায়।”

     “দেখেছ কান্ড!! তালেগোলে ভুলেই গেছি। – মোহনলাল, একে খুলে দাও। আর তুমি ঘরে এসে দাঁড়াও।”

     কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একজন হাট্টা কাট্টা যুবক এসে তার বাঁধন কেটে দিল, আর প্রায় যন্ত্রমানবের মতোই দরজার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রইল। অশোক আড়চোখে দেখে বুঝল, তার হাতেই রয়েছে অশোকের গ্লক গানটা।

     বাঁধন খুলে যেতে অশোক কিছুক্ষণ মাথাটা এপাশ ওপাশ করে খেলিয়ে নিল। পকেট থেকে রুমাল বের করে শুকনো রক্ত কিছুটা মুছে নিল। তারপর বসের দিকে তাকাল।

     “এই জায়গাটা বহু বছর আগেই মহামারীর কবলে পড়ে খালি হয়ে যায়। আমার বাবা ছিলেন দূরদর্শী পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী। তিনি যখন ওয়াটারশেড, অ্যাকুইফার এবং রেনওয়াটার হার্ভেস্টিং নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন লোকে ততটা খেয়াল করেনি। তিনি কাজটা গোপনে করতে থাকেন। এই জায়গার মাটির নীচে প্রচুর খনিজ জলের সন্ধান পান তিনি। সেখানেই অত্যন্ত গোপনে মাটির নিচে একটা বিরাট কনফাইন্ড আর্টিফিসিয়াল অ্যাকুইফার বানাতে থাকেন। পুরোটা প্ল্যান করার পর, কাজটা তিনি শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি। ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী জায়গাটা লো-ল্যান্ড। তাই জল দাঁড়ানোর পক্ষে আদর্শ। তিনি বৃষ্টির জল বা অন্যান্য যে কোনও ওয়াটার সোর্স থেকে প্রাপ্ত জল এখানে জমাতেন। এখানকার অ্যাকুইফারগুলোকে সঞ্জীবিত করতেন। আমি তখন কেমব্রিজে পড়াশোনা শেষ করে বাবার কাজে যোগ দিই। কিন্তু বাবার সবথেকে বড় সমস্যা ছিল, এতবড় একটা প্রজেক্টের জন্য অর্থ।

     বাবার আমলেই “কজ” তৈরী হয় সরকারী বদান্যতায়। বাবা ছিলেন তার প্রেসিডেন্ট। বাবার সঙ্গে সরকারের বড় বড় আমলাদের ভালোই যোগসাজস ছিল। বাবা তাঁদের অনুরোধ করেন তাঁর নিজের রিসার্চের কাজের জন্য “কজ” এর ফান্ড থেকে কিছু টাকা অনুমোদন করতে। ওঁরা করেও দেন – কিন্তু বাবা সেই রিসার্চের টাকা ছাড়াও সরকারী অর্থ তছরূপ শুরু করেন। ওয়াটারহাউসের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে।

     এমতাবস্থায়, ওয়াটারহাউসকে টেক-ওভার করে আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াটার ফার্ম “দ্য অ্যাকোয়াটিক”। এরা আসার পর, আমরা সমস্যায় পড়ি, কারণ অর্থের জন্য যত সহজে দেশীয় কোম্পানীকে লুটে নেওয়া সম্ভব, বিদেশি কোম্পানীর ওপর সে জোর আমাদের খাটে না। তবে বাবা থাকাকালীনই আমি ওয়াটারহাউসে যোগ দিই। বিদেশি টেক ওভারের পর আমার উচ্চশিক্ষা এবং যোগ্যতার জন্য ওরা আমাকে এশিয়া প্যাসিফিক এর হেড নির্বাচিত করে। এবং আমিও নিজের মতো দিব্যি ফান্ড তছরূপ করতে থাকি আমাদের প্রজেক্টের জন্য। তবে তার জন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

     যাক সে কথা। এতদিনে আমার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এই জায়গাটা এখন একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ ফেসিলিটি। আমেরিকার ওগালাল্লা অ্যাকুইফারের মতো বড় না হলেও, প্রায় ছয়শ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এই বিশাল কৃত্রিম অ্যাকুইফার আমি তৈরী করতে সক্ষম হয়েছি – যাতে কোটি কোটি কিউসেক শুদ্ধ, খনিজ পানীয় জল রয়েছে। বলতে গেলে আমি এখন অর্বুদ নির্বুদ ডলারের মালিক।” বস মুচকি হাসলেন।

     অশোক বলল, “আমার কিছু প্রশ্ন রয়েছে।”

     বস ঘড়ি দেখে বললেন, “করো প্রশ্ন – তবে সময় বেশি নেই। আর আধঘন্টা দিতে পারি। তার মধ্যে তোমাকে তৈরী হয়ে নিতে হবে পরবর্তী কাজের জন্য।”

     অশোক এখনো জানে না কী কাজের কথা বলে চলেছেন বস, তবু সে প্রশ্ন করল- “এই অ্যাকুইফারটা তৈরী করে আপনার লাভ? আপনি কি এটা বেচতে চান?”

     “পাগল? এখন কেন বেচব? আগে জলের ক্রাইসিস তৈরী হোক, তবে না।”

     “তাহলে তো আপনাকে জলের ক্রাইসিসের জন্য আরও একশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ উত্তর ভারতের জলের সোর্স এবং গঙ্গার জল এখনও বহাল তবিয়তে বর্তমান। আমি মানছি এই বিশাল অ্যাকুইফারের দাম প্রচুর, কিন্তু এটা তো বেয়াইনি। জানতে পারলে সরকার আপনাকে শাস্তিও দিতে পারে।”

     বস হেসে ফেললেন – “অশোক তুমি এখনও অনেক কিছু জানো না। এই অ্যাকুইফার আয়তনে এবং গভীরতায় দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের তৈরী মেশিন মাটি খুঁড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। তুমি এখন যেখানে বসে আছ, সেটা কারুতীর্থের প্রায় পঞ্চাশফুট তলায় অবস্থিত জলের মধ্যে একটা ভাসমান কেবিন। বাইরে যাওয়ার একটাই রাস্তা – সেটা হল একটি গোপন টিউবের মধ্যে অবস্থিত একটা লিফট। তবে মাটির ওপর আমাদের গোপন সার্ভেলিয়েন্স ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। অবাঞ্ছিত লোকের উপস্থিতি আমরা ঠিকই টের পেয়ে যাই।

     আর রইল গঙ্গার কথা – প্রায় শখানেক পিউরিফায়ার প্রতিনিয়ত জল টেনে নিচ্ছে গঙ্গা থেকে। তারপর রয়েছে কিছু ভারী শিল্পের কাজ। কাগজের ব্যবহার অনেক কমে গেলেও এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তার কাজেও লাগছে জল – আর সে সবই আসছে ওই গঙ্গা থেকেই। তুমি জানো গঙ্গার কী অবস্থা? জায়গায় জায়গার বিরাট বিরাট চরা পড়ে গেছে। গঙ্গার জলের ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে দেশের দুশো কোটি জনতা। আমি হিসেব করে দেখেছি, আর বড়জোর দশ বছর, তারপরই হোয়াং হোর দশা হবে আমাদের নদীর।”

     “কিন্তু তারপরও তো আছে আমাদের অন্যান্য অ্যাকুইফার। প্রায় একশ পঁচিশের মতো।” অশোক না বলে পারল না।

     “ভুল – একশ সত্তর। আমার থেকে খবর নাও হে। আর সেগুলো অনেকগুলোই কনফাইন্ড নয় – ওপেন। আর সেগুলোর জলও আর কদিন পর পানের যোগ্য থাকবে না।” বসের মুখ থেকে হাসিটা এখনও মিলিয়ে যায়নি।

     “কেন, থাকবে না কেন?” অশোক ঝুঁকে আসে।

     “কারণ – কারণটা তোমাকে বলেই দি। ওই সব অ্যাকুইফারে আমরা বিষ ঢেলেছি। জানো কী বিষ? আর্সেনিকের একটা যৌগ। বেশ উচ্চ পরিমাণে। দুম করে রিভার্স অসমোসিসে তাকে আলাদা করা যাবে না। কারুতীর্থ কেন পরিত্যক্ত জানো? এটা আর্সেনিক অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল। এখানকার অধিকাংশ অ্যাকুইফারের জলে ছিল আর্সেনিস, ক্লোরাইডের মতো বিষ। পেটে গেলেই ক্যান্সার। কিন্তু জল থেকে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতিতে কীভাবে এই বিশেষ আর্সেনিক যৌগকে আলাদা করতে হয় সেটা কেবল জানি আমি। ওইসব অ্যাকুইফারের জল যখন পানের জন্য ব্যবহার করার সময় আসবে, তখন দেখা যাবে তাতে ভর্তি বিষ। তাকে ছেঁকে সেই জল পানযোগ্য করতে তুলতে খরচ হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ। আমি সেই অর্থে ভাগ তো বসাবই – তাছাড়া তখন আমার এই অ্যাকুইফার থেকে জল সরবরাহ করে কামাব কোটি কোটি ডলার।”

     “কিন্তু আপনার অ্যাকুইফারে জলের জোগান আসছে কোথা থেকে? বৃষ্টি তো এসব জায়গায় বড় একটা হয়না।” অশোক জিজ্ঞেস করল।

     “গঙ্গার জলের একটা বিরাট অংশ আমার অ্যাকুইফারের জলের যোগান দেয়। আমাদের সব থেকে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে গঙ্গার জলের উৎস ধরে তাকে আমাদের অ্যাকুইফার অবধি কানেক্ট করতে। অত্যন্ত গোপনে করতে হয়েছে এই কাজ। এই বিশেষ শিরাটা কেউ জানে না – মাটির তলায় জায়গায় জায়গায় বিশেষভাবে খনন করে ওই জলের ধারা আমাকে আনতে হয়েছে। ডলার লেগেছে প্রচুর, আর লেগেছে ইঞ্জিনিয়ার। সবাইকে আলাদা আলাদা জায়গায় কাজ করিয়েছি নানা ছল ছুতোয়। তারপর কানেক্ট করেছি আমি একা। অবশ্য আমার সহকারীরা সারাক্ষণই ছিল আমার পাশে।”

     “তার মানে আপনাকে এখনও দশ বছর বসে থাকতে হবে এইসব হওয়ার জন্য।” অশোক জিজ্ঞাসা করল।

     “তা কেন? আমার নিজের আবিষ্কার করা দু তিনটে ছোট ছোট অ্যাকুইফার বেচে দেব। তা থেকে আমার আপাতত চলে যাবে। তাছাড়া অফিসের ইনকাম তো আছেই।”

     “কিন্তু সিন্থেটিক সয়েল দিয়ে কী করতে চান বুঝলাম না।”

     “শুধু জলের যোগান দিলে হবে? খাদ্যের ব্যবস্থাও তো করতে হবে হে! মাটির যা অবস্থা, তাতে এই মাটিতে ফসল ফলবে না। তাই পুষ্টিকর মাটি বানিয়ে রেখেছি। ঠিক সময়মতো ফসল উৎপাদন শুরু করে দেব।”

     “তাহলে ড্রোনের ব্যাপারটা?”

     বসের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল “ওটাই আমার দিক থেকে একমাত্র ভুল। জায়গাটাকে আমি বিশেষভাবে প্রোটেক্ট করে রেখেছিলাম। চারপাশের জায়গাগুলো যাতে গ্রেড ওয়ান আর মাঝেরটা গ্রেড থ্রি দেখায় সেরকম ভাবে সিস্টেমে ফিড করানো ছিল। এটা একটা স্ট্র্যাটেজিক ভাবনা। কারণ এই জায়গায় গ্রেড আগে ছিল ফাইভ পয়েন্ট সামথিং –সেটা দুম করে গ্রেড ওয়ান দেখালে সন্দেহ হতে পারে। তাই গ্রেড থ্রি এর ব্যবস্থা। ড্রোন টেকনোলজি আমিও কিছুটা বুঝি। কীভাবে ড্রোনের সোনার-কে ম্যানিপুলেট করে ডিসায়ার্ড গ্রেড আনতে হয় সেটা আমি জানি। সেদিন আমার এক কর্মীর ভুলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা একটু বেশি হয়ে যায়। ওয়াটারহাউসের ড্রোনটা তখন আশেপাশেই ছিল – সমাপতনই বলা যায়। ওই উচ্চ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের কারণে ড্রোনটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনেকটা নিচে নেমে আসে, এবং তখনই অ্যাকচুয়াল গ্রেডটা ধরা পড়ে যায়। যদিও পড়ে যাওয়া ড্রোনটা আমরা নষ্ট করে দিয়েছি –কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। তোমাকে এর মধ্যে জড়াতে চাইনি, কিন্তু কী আর করা যাবে।”

     “তাহলে আমাকে এখানে পাঠানোর মানে টা কী?”

     “তোমাকে এগুলো জানানোর দরকার ছিল অশোক” বসের গলা সিরিয়াস। “কারণ ওয়াটারহাউসের আই-টি ম্যানেজার তুমি। মিঃ ওয়াটস এর নির্দেশ ছিল তোমাকে পাঠানোর জন্য। তবে জানতাম না যে তুমি পোঁদপাকামি করে মাটি মাপতে বসবে! যাইহোক, সব যখন জেনেই গেলে – তোমাকে আমার একটা কাজ করতে হবে। যে ফুটেজটা ওয়াটারহাউসের সার্ভারে আছে, সেটা তুমি ডিলিট করবে আমার জন্য।”

     “কীভাবে? এখানে বসে তো সার্ভারের অ্যাক্সেস পাওয়া যাবে না।” অশোক বলল।

     “ঠিক সেই কারনেই তোমাকে এখানে ডাকা। এবার তুমি যাবে আমাদের অফিসে। সেখানে সার্ভারে বসে ফায়ারওয়ালটা সরাবে কিছুক্ষণের জন্য আর আমাকে সার্ভারের ব্যাক-এন্ড লিঙ্কটা পাঠাবে। আমি এখান থেকে সার্ভারে ঢুকে ফাইলটা ডিলিট করব এবং আবার তুমি ফায়ারওয়াল অন করবে, ব্যস এইটুকুই।”

     “মোটেই এটুকু নয় বস। আপনি ভালোমতই জানেন অফিসের প্রতিটা কোনায় সিসিটিভি আছে। আমি সার্ভারে ঢুকে ফায়ারওয়াল অফ করলে নিমেষে খবর চলে যাবে হেড অফিসে। ওরা দুনিয়ার কৈফিয়ত চাইবে – নাম্বার অফ ফাইলস স্ক্যান করবে! আমি ধরা পড়ে যাব।”

     “হবে না- আমি তোমাকে বাঁচিয়ে নেব। বড়জোর চাকরিটা যাবে তোমার। তারপর তোমার ভরণ পোষণের দ্বায়িত্ব আমার। তুমি চিন্তা করো না।”

     “না বস – এ হয় না। আমি পারব না। তাছাড়া কি-ই বা এসে গেল ওইটুকু একটা ফুটেজে। চেয়ারম্যান তো দেখেছেন ওটা – কী আর বলেছেন!!” অশোকের গলায় স্পষ্ট বিদ্রোহ।

     “দেখেননি অশোক – কিছুই দেখেননি। দেখলে আর রক্ষে থাকবে না। পুরো ফৌজ নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতে চলে আসবে লালমুখোটা। ওরা ফুটেজগুলো নিয়ে একটা উইকলি রিভিউ করে। আজ রবিবার – কাল বিকেল করে সেই রিভিউ বসবে। সো, ইউ বেটার স্টার্ট নাউ।”

     “আমি পারব না বস।” অশোক চেয়ারে বসে থাকে।

     “তোমার ন্যাকামি শোনার জন্য আমি তোমাকে ডাকিনি অশোক। মনে রেখ, তোমার একটা সম্পত্তি আমাদের কাছে আছে।” বস দেওয়ালের দিকে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করলেন আর সেখানে একটা স্ক্রিন ফুটে উঠল। বস ভয়েস কম্যান্ড দিতে একটা ভিডিও কলিং হতে লাগল কলকাতাতে – একজন লোককে দেখা গেল – ঘরের মধ্যে বসে রয়েছে, কোলে রীনা।

     “তিমির” উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল অশোক।

     “রীনা, কেমন আছ সোনা? এই দেখ কে আছে আমার সঙ্গে। তোমার বাবা” বস বলে চললেন।

     রীনা তিমিরের কোলের ওপর চুপটি করে বসেছিল। বাবাকে স্ক্রিনে দেখে সে একলাফে উঠে চলে এল স্ক্রিনের কাছে। “বাবা তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি এস – মিসকে খুব মারছে এই লোকটা। আমাকেও মারছে। আমি বাবার কাছে যাব” – ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল রীনা।

     “মিস কিরে পাগলী – মা বল।” তিমিরের মুখে খিলখিলে হাসি।

     অশোকের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এটা একটা মারাত্মক র‍্যাকেট। সে ভালোই ফেঁসেছে। চাকরি তার যাবে নিশ্চিত – জেলও হতে পারে। আর এই কাজটা হয়ে গেলে তাকে কতদূর বাঁচিয়ে রাখবে এই বস তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু আপাতত উপায় নেই – তাকে যেতেই হবে।

     অশোক প্রস্তুত হয়ে নিল। মাথায় একটা কাপড়ের টুপি পরিয়ে মোহনলাল নামের ছেলেটা তাকে ধাক্কা মেরে নিয়ে চলল গাড়ির কাছে ছেড়ে আসতে। অশোক বুঝতে পারল তাকে একটা লিফটে ওঠানো হল, মিনিট দুয়েক পর একটা ধাতব শব্দে বুঝল মাটির নীচের কোনও একটা কুটুরীর ঢাকনা খুলে গেল। হু হু করে বাতাস ঢুকতে লাগল কুটুরীর মধ্যে। দুজনে কুটুরীর বাইরে বেরিয়ে এল। একটা ভোঁতা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল কুটুরির দরজা।

     গাড়ির কাছে পৌঁছে অশোক দেখল একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল। রমা!! অবাক হতে হতে অশোক তখন ভাবনা চিন্তা করার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছে। গাড়ির দরজা খুলে অশোক জলের একটা বোতল বের করে ঢক ঢক করে খানিকটা জল ঢেলে নিল গলায়। তারপর মুখে একটু জল দিয়ে রক্তটা মুছে নিল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করল।

     “সোজা চালাবেন। কোথাও যেন না দাঁড়ান।” রমার কাছ থেকে নির্দেশ এল।

     কানের কাছে মাইক্রোচিপ অ্যাক্টিভ হয়ে উঠেছে – “অবাক হচ্ছ অশোক? হওয়ারই কথা। শহুরে বেবুশ্যে কবে থেকেই বা হুকুম করতে শিখেছে। আরে ও বেশ্যা নয় – ও আমার অন্যতম অ্যাসিস্টেন্ট। ওর নাম – ছাড়ো নাম দিয়ে কি-ই বা হবে। রমা দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও।” বসের গলা ভেসে এল কানের মধ্যে। “ও যেমন বলবে তেমনটা শুনে চলবে, নাহলেই – যাও এবার বেরিয়ে পড় – দুগগা দুগগা।”

     সারা রাস্তায় অশোক বা রমা কেউই কোনও কথা বলল না। আজ বোধহয় পূর্নিমা –আকাশে পূর্নচন্দ্র। ঝকঝকে রাতের আকাশে চাঁদের আলোয় সব কেমন যেন সাদা হয়ে উঠেছে। দুপাশের ফাঁকা মাঠগুলোকে মনে হচ্ছে তেপান্তরের মাঠের মতো। সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে স্বপ্ন বলেই মনে হচ্ছিল অশোকের। কাল সে কী ছিল – আজ সে কী হয়েছে। মানুষের জীবন বোধহয় এরকমই – আজ একরকম, কিন্তু পুরো একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে যেতে মুহুর্তমাত্র সময় লাগে না।

     “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?” অশোক রমার দিকে তাকায়।

     রমার চোখ সামনের দিকে – ঠোঁট চাপা। ব্যাক্তিত্ব পুরো পালটে গেছে তার।

     “কি কথা?”

     “সোনাগাছিতে কী করতেন আপনি?”

     রমা চাপা হাসল, “স্যারের সব কাজ তো এখানে বসে হয় না। কলকাতায় থাকতে হত আমাকে। লুকানোর সবচেয়ে সেফ জায়গা ওই সোনাগাছি। তাই বসই বলেছিলেন ওখানে থাকতে। আপনাকে শরীরের খিদের ব্যাপারটা খুব বাড়িয়ে বলিনি। একা একা কাজ করা মাঝে মাঝে খুব চাপের হয়ে যায়। দালাল যখন আপনার ছবি দেখিয়েছিল তখন মন্দ লাগেনি। কিন্তু আপনাকেই যে আমাদের কাজে লাগবে সেটা তখনও জানতাম না। “

     “আপনি কী জানতেন আপনাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব?”

     “নাঃ সেটা জানতাম না। আপনি নিজেই এসে ধরা দিয়েছেন যদিও। সেটা না হলে আপনাকে ফলো করার ব্যবস্থাও ছিল আমার কাছে। কিন্তু আপনি নিজেই যখন নিয়ে গেলেন – তখন সেটার আর দরকার পড়েনি।”

     আর কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল না অশোকের। সে শুধু নিজেকে দোষ দিতে পারল না। এটা না জানলে নারী আসক্তির ফলস্বরূপ এই চরম ভুলের জন্য সে হয়ত আজীবন মরমে মরে থাকত।

 

১১

     অশোক যখন কলকাতায় ঢুকল তখন রাত তিনটে। এত রাতে অফিস যাওয়ার কোনও মানে হয় না। সে সোজা চলে গেল তার অ্যাপার্টমেন্টে। রমাও চলল তার সঙ্গে। অশোককে একা না ছাড়ার নির্দেশ আছে তার কাছে। অশোক ঘরে ঢুকে ফ্রেস হয়ে নিল – বদলে নিল জামাকাপড়। রমার অলক্ষ্যে তার শোবার ঘর থেকে তুলে নিল একটা গোপন সেলফোন। পুরানো আমলের – ট্র্যাকিং করা যায় না। আসলে এটা সে নিয়েছিল অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তার নিজের ফোনটা অত্যাধুনিক, তাই সেটাতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা প্রচুর। অনন্যার সঙ্গে সেই নিয়ে রোজ ঝামেলা হত। তাই এই গোপন ব্যবস্থা। অশোকের মনে হচ্ছিল ফোনটা কাজে আসতে পারে।

     সকাল হতে না হতেই অশোক বেরিয়ে পড়ল। পাশে রমা। রমাকে গাড়িতে বসিয়ে অশোক অফিসে ঢুকে এল। রমা অফিসে ঢুকতে পারবে না। বাইরের লোক অফিসে অ্যালাউড নয়। অশোক লগ-ইন করে সোজা চলে গেল সার্ভার রুমে। এই রুমের অ্যাক্সেস কেবল তারই আছে – কারণ বায়োমেট্রিক সেন্সরের ছাড়পত্র ছাড়া এ ঘরে ঢোকা অসম্ভব। মেন কম্পিউটারের সামনে বসে অশোক প্রোগ্রামিং লিখে সার্ভারে ঢুকে গেল – তারপর অ্যাক্সেস নিল ফায়ার-ওয়ালের।

     বসের মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে উঠল “সামওয়ান ইজ ট্রাইং টু অ্যাক্সেস সার্ভার ফায়ারওয়াল, – অথরাইজ?”

     “ফাক!! অশোক – হোয়াট দ্য হেল ইউ আর ডুয়িং? হোয়াই দিস ব্লাডি থিং নিডস মাই অথরাইজেশন?”

     “সার্ভারের অ্যাক্সেস তো আপনাকে ছাড়া হবে না বস।” অশোকের গলা ভেসে আসে।

     “ব্লাডি হেল! স্কিপ কর। ইউ নো হাউ টু ডু ইট। বেশি চালাকি মারিও না আমার সঙ্গে অশোক – মাইন্ড ইট।” বসের গলায় স্পষ্ট বিরক্তি।

     অশোক মুচকি হাসে। ও যা করার করে দিয়েছে। অন্তত এস এম এস টাও থাকুক। পরে ঠেলা বুঝবে।

     অশোকে প্রোগ্রামিং অন্যভাবে লেখে – ফায়ারওয়ালের আনঅথরাইজড অ্যাক্সেস নিয়ে নেয় বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টার পর। সার্ভার এখন পুরো ফ্রি – যা খুশি করা যায়। অশোক চুপচাপ বসে থাকে। সে জানে তার সামনে সোনার খনি উন্মুক্ত – সে চাইলে অনেককিছু করতে পারে।

     “হোয়্যার ইস দ্য সার্ভার লিংক ইউ ব্লাডি ইডিয়ট।” বসের রাগী গলায় অশোকের চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায়।

     অশোক চট করে ফুটেজের একটা কপি করে নেয় নিজের পুরানো মোবাইলে। তারপর অ্যাক্সেস লিঙ্ক পাঠিয়ে দেয় বসকে।

     কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ডিলিট হয়ে যায় ফুটেজ – আর সার্ভারে ফিরে আসে ফায়ারওয়াল।

     “বস – কাজ তো হয়ে গেল। এবার রীনাকে ছেড়ে দিন।” অশোকের গলা ভেসে আসে বসের কাছে।

     “হবে হবে সব হবে। তুমি এবার চট করে কারুতীর্থতে চলে এস দেখি। রীনাকে তোমার বাড়ি পৌঁছে দিতে বলছি।”

     “ওক্কে স্যার। স্যার আমার ফোনের ব্যাটারি ডেড হয়ে যাচ্ছে। কাল থেকে চার্জ নেই। আমি দুমিনিটে একটু চার্জ দিয়েই অফিস থেকে বেরোচ্ছি।” অশোক বলে।

     বস সার্ভার চেক করে – অ্যাক্সেস ডিনায়েড। ফায়ারওয়াল কাজ করছে নিজের মতো।

     “ঠিক আছে। রমা তোমার অ্যাপার্টমেন্টেই থাকবে। তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যেও। রীনাকে নিয়ে আমাদের এখানে চলে এস। আরও কিছু কাজ বাকি আছে।”

     “ওকে স্যার। ছাড়ছি স্যার।” অশোক চিপটা খুলে ফেলে ফোন বন্ধ করে দেয়।

     সকাল সাতটা বেজে গেছে। সুবিমলের ঘরে নক করে অশোক।

     “আরে কী ব্যাপার। তোমাকে তো ভুতের মতো লাগছে। সব ঠিকঠাক তো?”

     “দাদা একটা উপকার করুন। প্লিজ। মিঃ ওয়াটসের নাম্বার আছে?”

     “আছে -কিন্তু ওয়াটস কী করবে?”

     “দরকার আছে দাদা -প্লিজ। আর্জেন্ট।”

     নাম্বার নিয়ে সোজা কনফারেন্স রুমে ঢুকে যায় অশোক।

     “মিঃ ওয়াটস।”

     “সর‍ি ডুড– ওয়াটস ইজ আউট। আয় অ্যাম রবার্ট। দ্য নিউ সিইও অফ দ্য কোম্পানী। হু ইজ ইট?”

     “স্যার দিস ইজ অশোক – আই-টি হেড – কলকাতা হেড অফিস।”

     “ওহ – ইয়া আসোক – টেল মি।”

     “স্যার আই হ্যাভ সাম ভ্যালুয়েবেল নিউজ ফর ইউ স্যার। দিস ক্যান শ্যেক দ্য হিস্ট্রি অফ ম্যানকাইন্ড।”

     “হোয়াট! ইজ ইওর লাইন সিকিওরড? ইউ ওয়ান্ট মি টু কল ইউ ব্যাক?”

     “নো স্যার – নট রিকোয়ার্ড। প্লিজ হিয়ার মি আউট। বাট আই হ্যাভ সাম কন্ডিশনস টু… অ্যান্ড ফর সেফটি পারপাস, প্লিজ কল মি বাই মাই অ্যানাদার নেম”

১২

     “ফাক –দ্যাট বাস্টার্ড। ওয়াটসের নাম্বার নিয়ে কী করেছে। আর তুমিও দিয়ে দিলে।”

     “আরে বস আমি কী করে জানব? আমাকে আপনি কিছু বলেছেন আগে? তবে নাম্বারটা নিয়েই তো ঢুকে গেল কনফারেন্স রুমে।”

     “ফোন তো অফ ছিল! অন্য কোনও কম্যুনিকেশন ইউজ করেছে?”

     “দেখিনি তো – ফোনটা তো আমার সামনেই পড়ে ছিল। যাবার সময় নিয়ে গেল।”

     “শিট!! এখন সে কোথায়?”

     “বেরিয়ে গেল তো বেশ খানিকক্ষণ।”

     “দ্য হেল অন ইউ! একটু আগে জানাতে পারলে না – এনিওয়েজ অ্যাকাউন্টগুলো যেভাবেই হোক ডিলিট করো। স্টার্ট নাউ।”

     “রমা রমা”

     “কী হয়েছে স্যার।”

     “গেট দ্য ফাক আউট অফ দেয়ার- নাউ।”

     “রাইট অ্যাওয়ে স্যার।”

     “অ্যান্ড টেক দ্যাট বিচ উইথ ইউ – গেট হিয়ার এস্যাপ।”

     “স্যার –স্যার।”

     “নাউ হোয়াট।”

     “স্যার – সামনের মোড়ে পুলিশ গাড়ি চেক করছে স্যার। সবার মোবাইলে আমার ছবি পাঠিয়ে দিয়েছে।”

     “ফাক!! মেয়েটাকে কোথাও নামিয়ে রেখে বেরিয়ে যাও।”

     “স্যার কলকাতার বেড়া টপকাতে পারব না স্যার। ধরে ফেলবে।”

     “তাহলে মরো! ডোন্ট কল মি এগেইন।”

     “স্যার এটা কী বলছেন স্যার – এতদিন ধরে এত কিছু করলাম আপনার জন্য, আপনি এভাবে……স্যার স্যার। কেটে দিল?? ফাক ফাক!!”

 

১৩

     অশোকের গাড়ি তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে কলকাতা অতিক্রম করে। সে এখন ভীষণ নিশ্চিন্ত। রমা এখন পুলিশের হাতে আর রীনা পুলিশ কাস্টডিতে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। বাবাকে দেখে সে একছুট্টে তার কোলে চড়ে বসেছিল। কিন্তু অশোক জানে, তার শেষ বোঝাপড়াটা বাকি আছে। তাকে আর একবার যেতেই হবে কারুতীর্থে। তাই রীনার মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে সে বেরিয়ে এসেছে। অনন্যা ফোন করেছিল, তিমির নাকি কাল থেকে ফেরার। ওদের বাড়িতে নাকি পুলিশ এসেছিল। ইনিয়ে বিনিয়ে কান্নার মাঝেই অশোক তার ফোন কেটে দিয়েছে। ভালো লাগছে না কিছুই – জীবনটাকে অন্যভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করতে তার।

     তবে পুরো খবরটা শুনে রবার্টের উচ্ছাসটা মারাত্মক ছিল। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল সে, কিন্তু অশোক বুঝেছে লোকটার মাথা অসম্ভব ঠান্ডা। সে আশ্বাস দিয়েছে – দ্রুত অশোককে সে ডিপোর্ট করে দেবে লন্ডনে। কোম্পানীর সিইও এরকম রাতারাতি চেঞ্জ হয়ে যায় এই প্রথম শুনল সে। গলা শুনে মনে হয়েছে কম বয়েসী ছেলে – উদ্যোগী। লন্ডনে থাকে – অফিসটা নাকি ওখানে বসেই সামলাচ্ছে।

     শেষ অঙ্কের যবনিকাপাত বাকি আছে অশোকের। তার কাছে কোনও অস্ত্র নেই – গ্লক গানটা মোহনলাল নামের সেই ছেলেটার হাতেই থেকে গেছে। যাক গে – এখন সেই রাজা। বস এখন আর বস নেই – সে ইঁদুর। গাড়িটা অটোমোডে রেখে জি পি এসটা অন করে দিল অশোক।

     বিকেল বেলা যখন সে কারুতীর্থে পৌঁছাল, তখন অবস্থা সামান্য বদলেছে। হঠাৎ স্নাইপারের একটা গুলি এসে তার গাড়ির সামনের একটা টায়ার ফাঁসিয়ে দিল। অশোক লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল। হঠাৎ দূরে একটা চিৎকার শোনা গেল, “ডোন্ট শ্যুট – আই ওয়ান্ট দ্যাট বাস্টার্ড ইন মাই অফিস।”

     মাটির নিচের সেই অফিস ঘরে তাকে একরকম আছড়ে ফেলল মোহনলাল। হিঁচড়ে নিয়ে আসার জন্য অশোকের কব্জি দুটো এখনও ব্যাথা করছে বেশ।

     বস এগিয়ে এসে ওকে একটা ঠাটিয়ে চড় মারল। “হাউ ডেয়ার ইউ টু স্পয়েল মাই লাইফ’স অ্যাচিভমেন্ট।” অশোক দেখল বসের মুখ লাল হয়ে উঠেছে, কথা বলার সময় ফেনা ঝরছে অবিরত – রাগে কাঁপছে তার সর্ব শরীর।

     শব্দ করে থুতু ফেলল অশোক, “অ্যাচিভমেন্ট মাই ফুট! লোকের খাবার জলে বিষ মিশিয়ে অ্যাচিভমেন্ট মারানো হচ্ছে মিঃ সিরাজ?”

     “হ্যাঁ হচ্ছে!! কারণ এই বিদেশি শয়তানগুলো জলের ভান্ডার লুটে নিলে আমাদের কাছে আর কিছু থাকবে না। আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব -পরাধীন হয়ে পড়ব। এরা বিজনেস করতে আসেনি গাধা, এরা লুট করতে এসেছে তাও কী বুঝিয়ে দিতে হবে?” সিরাজ চিৎকার করে উঠলেন।

     “আর আপনি কী করছেন? আপনার উচিত ছিল আপনার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে দেশের লোকগুলোর জন্য কিছু করা – আপনার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে মানুষগুলোকে বাঁচানো। তা না করে আপনি জলের ওপর বসে ব্যাবসা করছেন? আপনি ওদের থেকে কিসে কম শুনি?” অশোকের মুখের পেশি ফুলে উঠেছে।

     “মুখ সামলে কথা বলো অশোক। তুমি জানো না তুমি কী করেছ। এখন ওরা এসে সব লুটে নেবে। সারা দেশের সব থেকে বড় অ্যাকুইফার ওদের হাতে চলে গেলে ওরা তো আমাদের অর্থনীতিতেই কব্জা করে নেবে। আমরা শেষ হয়ে গেলাম অশোক।” সিরাজ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।

     মোহনলাল হয়ত বসের কথাবার্তায় একটু অন্যমনষ্ক হয়েছিল – অশোকের একটা চকিত আপারকাটে চিত হয়ে পড়ে যেতেই গ্লক গানটা হাতে চলে এল অশোকের। আর দেরী করল না অশোক – মোহনলাল সামলে নিয়ে উঠতে যেতেই তীব্র আল্ট্রাসোনিক বীম তার মাথায় লেগে একরাশ রক্ত ও মগজ ছিটকে দিল মাটিতে।

     সিরাজ এবার মুখ তুললেন – রাগে হতাশায় দুমড়ে আছে সেই মুখ। চোখ থেকে অনবরত জল বেরিয়ে আসছে। “তুমি এটা করতে পারলে অশোক – দেশের জন্য একবারও ভাবলে না?”

     সিরাজের মুখের পুরানো হাসিটা এখন অশোকের মুখে সঞ্চারিত হয়ে পড়েছে – “পারলাম, কারণ আমি এখানে থাকতে চাই না। আমার জীবন আমি নিজের মতো গড়ে নিতে চাই মিঃ সিরাজ। এই জায়গা আর কিছুদিন পর এমনিতেই ওদের হাতে চলে যেত – সেটা আপনিও জানতেন। আমি কেবল সেটা দুদিন আগে করে দিলাম। আর হ্যাঁ, আমার একটা পিতৃদত্ত নাম আছে – যেটা আমি কোথাও ব্যবহার করি না। পছন্দ না হওয়ায় চেঞ্জ করেছি অনেকদিন আগেই। আমি আর অশোক নই, আজ থেকে আমি মীরজাফর।”

     বিস্ফারিত সিরাজের মুখের ওপর গ্লক গানটার শেষ হয়ে আসা ব্যাটারি আর একবার মাত্র ফায়ার করতে পারল।

     মীরজাফর দেখল, তার মোবাইলে একটা এস এম এস ঢুকেছে,

     “থ্যাংকস ফর ইয়োর ইমেন্স হেল্প, মিঃ জাফর। আই অ্যাম অন দ্য ওয়ে। উই উইল কনসিডার ইয়োর কন্ডিশনস সুন। বাট – ফর দ্য টাইম বিয়িং – ইউ আর ইন চার্জ অফ দ্য এন্টায়ার কালকুটা সিটি অপারেশন ডুড। হাউ ডাস দ্যাট সাউন্ড? সি ইউ স্যুন।

     ইয়োরস ট্রুলি– রবার্ট ক্লাইভ।”

13 thoughts on “মীরজাফর

  • July 15, 2018 at 1:03 pm
    Permalink

    অনবদ্য! অনবদ্য! এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম

    Reply
  • July 16, 2018 at 4:09 am
    Permalink

    অদ্ভূত ভাল উপন্যাস! কোথাও কোন অসংলগ্ন কল্পনা নেই। আমরা সাবধান না হলে ঠিক যেমনটি আর একশো বছর পরে হবার কথা তাইই যেন লেখা হয়েছে। যেমন প্লটের বাঁধুনি তেমনি ভাষা। এ গল্প বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে, ভাবতেই আশ্চর্য লাগছে।

    Reply
  • July 16, 2018 at 8:19 am
    Permalink

    দারুন উপন্যাস।শেষটা বেশ ভালো।আর নামের চমকটাও।

    Reply
  • July 16, 2018 at 10:37 am
    Permalink

    Mind blowing…awesome…read it in one go. You never lost the grip…congrats bro.

    Reply
  • July 16, 2018 at 11:46 pm
    Permalink

    অসাধারণ। অসামান্য।

    Reply
  • July 17, 2018 at 8:13 am
    Permalink

    আগামীর ছায়া শব্দের ওডিসির মধ্যে দিয়ে ধরা পড়েছে। যতোই বালিতে মুখ গুঁজে থাকি না এই সাধের সভ্যতার ব্যাটন ধরে যে পথে এগোচ্ছি সবাই তাতে যেন এই ভবিষ্যৎ ধেয়ে আসছে দ্রুত। সন্দীপনকে ধন্যবাদ এমন একটা ভাবনা এই জল মাটির প্রেক্ষিতে গেঁথে ফেলার জন্য। অনন্য!!

    Reply
  • July 17, 2018 at 11:41 pm
    Permalink

    Besh onnorokom..

    Reply
  • July 18, 2018 at 10:02 am
    Permalink

    এটা কি ছিল? একনিশ্বাসে শেষ করেছি বলতে গেলে। দারুন দাদা।

    Reply
  • July 28, 2018 at 4:36 am
    Permalink

    Bujhte parchina ki likhbo.. Proud fill hoche je choto belay kichu bochor tor sathe keteche r obak lagche je tui eto sundor ki kore likhli… Dom bondho kore ek nissas a porlam eta.. Osadhoron

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!