ম্যাজিক বাক্স

ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ: সৌরভ দে

(এই কাহিনি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোনও ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে কোনওরকম মিল একেবারেই আকস্মিক বলে ধরতে হবে।)

 

(১)

“এই ছেলের জন্য একদিন আমাদের গুষ্টি-সুদ্ধ জেলে যেতে হবে। একে নিয়ে যে আমি কী করি!”

     “এখন আক্ষেপ করে লাভ কি বল? ওর ছোটবেলা থেকে তোমাকে আমি বার বার বলেছি, যে ছেলেকে সময় দাও। কিন্তু তুমি তোমার কোর্ট আর …”

     “ছেলেকে সময় দিলে যে পেটের ভাত জুটত না সে কথা খেয়াল আছে?”

     “তোমার এই যে সবসময় টাকা টাকা করা এই হল সব ঝামেলার মূল। তুমি কোর্টের ক্লার্ক, আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়াই, আমাদের কি এমন টাকার অভাব?”

     “ওঃ, যখন জয়েন্ট ফ্যামিলিতে ছিলাম, তখন বাড়ি করো বাড়ি করো বলে কে আমার মাথা খেত? সেই বাড়ির একটা পয়সা কি তোমার স্কুলের মাইনে থেকে হয়েছিল? না আমার ক্লার্কের মাইনেয় এই দোতলা বাড়ি করা সম্ভব ছিল?”

     “দেখ, আমি টাকা বাজে খরচ করি না, যতটা সম্ভব পি-এফে জমাই। বিপদ আপদের জন্যই তো…”

     “আর তোমার বছর বছর গড়ানো ভারী ভারী সোনার গয়নাগুলি? ওগুলো কোথা থেকে আসে?”

     “এক কথা থেকে কথা কোথায় গড়াল দেখ। দেবুর বখে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব তুমি অস্বীকার করতে পারো? যে বাবা দিনান্তে ছেলেদের একবার খোঁজও নেয় না, সেই বাবার ছেলেরা যে উচ্ছন্নে যাবে তার আর কথা কি?”

     “ঠিক! যেমন বাবু গেছে!”

     “আহা বাবুর কথা আলাদা।”

     “খুব একটা আলাদা কিছু বলে কিন্তু আমার মনে হয় না। ফিজিক্সে এম-এস-সি পাস করেছে আজ বছর দুই হয়ে গেল। কি ছাতার এক রিসার্চ করছে বুঝি না। একটা পয়সা তো ঘরে আসেই না, বরং খবর পাই এখনও তোমার কাছে থেকে হাতখরচ আদায় করে। দেবু অন্তত সেদিকে ভালো। গাঁজা-মদ যাই খাক নিজের পয়সায় খায়।”

     “তোমাদের পরিবারে শিক্ষা জিনিসটার চিরকালই অভাব। বাবু রিসার্চ…”

     “ফ্যামিলি তুলে একদম কথা বলবে না। তোমাদের ফ্যামিলি যেন কত…”

     রোজকার মতোই শুরু হয়ে গেছে। শুভজিৎ ওরফে বাবু স্নান করতে করতে ভাবল রোজ সকালের এই গজ-কচ্ছপের যুদ্ধ শুরু হতে যে কোনও একটা কারণ হলেই চলে। আজকের কারণটা অবশ্য একটু সিরিয়াস। কাল রাতে দাদা দেবজিৎ মারামারি করে এসেছে। কার নাকি মাথা ফাটিয়েছে, নিজের নাক থেকেও রক্ত পড়ছিল। বাবার কোর্টের প্রতিপত্তির কারণে বাড়িতে পুলিশ আসেনি। কিন্তু পাড়ার মাস্তান মহলে বেশ হইচই পড়ে গেছে।

     দাদা অবশ্য খুব অন্যায় কিছু করেছে বলে মনে হয় না। বাস স্ট্যান্ডের কাছে কতকগুলো বদমাশ রেগুলার নেশা করে ঝামেলা করে। পয়সাওয়ালা ঘরের বাইকবাজ ছেলে সব। কাল এখানকার বড় প্রমোটার লক্ষ্মীদার মেয়েকে আওয়াজ দিয়েছে। দাদাকে লক্ষ্মীদার চামচে বললে ভুল বলা হয় না। দাদা দেবজিৎ সোজা একখানা লোহার রড নিয়ে গিয়ে ওদের উপরে চড়াও হয়েছিল। তারপরে থানা-পুলিশ ইত্যাদি যা হয়। অবশ্য লক্ষ্মীদা সবটাই সামলে নেবে, কিন্তু কাল অ্যাকশনের সময়ে দাদা একা ছিল। আরও কয়েকটা ছেলে নিয়ে গেলেই হত। ভালোমন্দ কিছু হলে মুশকিল হত না? দাদাটা বড্ড গোঁয়ার।

     ইতিমধ্যে ঝগড়া শেষ করে বাবা কোর্টের দিকে রওনা হয়েছে। শুভজিৎও খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য সায়েন্স কলেজ।

     এস-সি স্যার মানে প্রফেসার সব্যসাচী চক্রবর্তী এখনও এসে পৌঁছাননি। রিসার্চ স্কলারদের মধ্যে প্রলয়দা আর মৈত্রেয়ী এসেছে। বিমানদা নিশ্চয়ই স্যারের বাড়ি গেছে। স্যারের সঙ্গে আসবে। শুভজিৎ তার ডেস্কটপটায় লগ-ইন করল। নিয়ম হল এখানকার কম্পিউটার থেকে কিছু বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না, বা বাড়ি থেকে কোনওকিছু এখানে ঢোকানো যাবে না।

     শুভজিৎ ম্যাট-ল্যাব দিয়ে একটা বড় প্রোগ্রাম বানাচ্ছে। কথা ছিল এই প্রোগ্রামটা বিমানদা, ও আর মৈত্রেয়ী–এই তিনজনে মিলে বানাবে। কিন্তু বিমানদা সারা দিন স্যারের পিছনে তেলের বাটি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মৈত্রেয়ী কিছু চালাক চালাক কথা বলেই দায় সারছে। অতএব যা করার শুভজিতকেই করতে হবে। তাতে অবশ্য শুভজিতের কিছু যায় আসে না। প্রোগ্রাম বানাতে ওর ভালোই লাগে। কিন্তু সমস্যা হল স্যারের কাছে এই কাজগুলির কোনও দাম পাচ্ছে না শুভজিৎ। তিনজনের কাজ একা করার পর পুরো কৃতিত্বটুকু যদি বিমানদা মেরে দেয়, তখন বড় খারাপ লাগে। স্যার খালি বলেন টিম-ওয়ার্ক হল আসল। কিন্তু কাজের বেলা একজন আর বাহবার বেলায় আর-একজন এই ধরনের কাজ ভাগাভাগি শুভজিতের আর খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না।

     তন্ময় ঘরে ঢুকল। এই ছেলেটাকে শুভজিৎ বেশ খানিকটা পছন্দ করে। প্রফেসর দত্তাত্রেয় মজুমদার সংক্ষেপে ডি-এম স্যারের কাছে মাসছয়েক হল ঢুকেছে। সি-এস-আই-আর ফেলো। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। ছেলেটা এক্সপেরিমেন্টের কাজ খুব ভালো জানে। আবার তুমুল আড্ডাবাজও। ডি-এমের কাছে যারা আছে তারা ওকে সবাই ভীষণ পছন্দ করে।

     আসলে ডি–এম স্যার সবার থেকে আলাদা। কলকাতায় ন্যানো টেকনোলজির উপর খুব ভালো এক্সপেরিমেন্ট একমাত্র ওঁর ল্যাবেই হয়। স্যার যেমন ভালো কাজ জানেন আবার তেমন ভালো তাঁর কন্টাক্ট। সারা ভারতের বিভিন্ন ফান্ডিং এজেন্সি থেকে কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে আসেন। সেরকম বেছে রিসার্চ ফেলোও নিয়ে থাকেন। শুভজিৎও তো প্রথমে ওঁর কাছেই কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু নেট ছিল না বলে উনি পাত্তাও দেননি। ডিপার্টমেন্টের সব স্যার ওঁকে যেমন হিংসা করেন তেমন সমঝে চলেন। সব্যসাচী স্যার তো সারাদিন ডি-এমের সম্বন্ধে পি-এন-পি-সি করতে থাকেন।

     এস-সি আসলে ন্যানো টেকনোলজির থিয়োরির কিছু কাজ করার চেষ্টা করছেন, মানে শুভজিতকে দিয়ে করাচ্ছেন। কিন্তু শুভজিতের সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছে যে স্যার ন্যানো-টেকের ব্যাপারে বিশেষ কিছুই জানেন না। কিন্তু নানা রকম বোলচাল দিয়ে উনি একটা ভুল ধারণা সবার মনে তৈরি করে রেখেছেন।

     তন্ময় সোজা শুভজিতের কাছে চলে এল। বলল “শুভজিৎদা, এস-সি কখন আসবেন জানো? স্যার খবর নিতে বললেন।”

     “না রে, জানি না। মনে হচ্ছে এইবারে এসে পড়বেন।”

     “আসলে মার্চের বাইশ তারিখে ডি-এস-টির কৃষ্ণমূর্তি আসছে, তো এস-সি নাকি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তা এবারে কৃষ্ণমূর্তি বাইশ তারিখ বিকালেই চলে যাবেন। সময় খুব কম। স্যারও ডি-৪০ ন্যানো স্যাম্পলটা নিয়ে খুব ব্যস্ত। এয়ারপোর্টে যেতে পারবেন না। তাই এস-সি যদি কৃষ্ণমূর্তিকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে আনেন, তাহলে দেখায়ও ভালো আর ওঁর সঙ্গে এস-সির কথা বলাটাও হয়ে যাবে।”

     “ঠিক আছে বলে দেব। ডি-৪০ এর কেসটা কি রে?”

     “ওটা আমাদের একটা লেটেস্ট ডেভেলপমেন্ট। ওই স্যাম্পলটার ক্যাপাসিটেন্স মেপে দেখা যাচ্ছে পার স্কয়ার মিলিমিটারে প্রায় হাজার মাইক্রোর কাছাকাছি হচ্ছে।”

     ওদিক থেকে প্রলয়দার গলা পাওয়া গেল, “গুল মারছিস তন্ময়?”

     “না প্রলয়দা, বিশ্বাস করো! এটা একটা আশ্চর্য কাণ্ড হচ্ছে। চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কৃষ্ণমূর্তি শুধু স্যারের কথায় কলকাতায় আসছে। কালও ফোনে স্যারকে বলেছে ‘আই ডোন্ট বিলিভ।”

     “তা মার্চ বাইশ তো এখনও দেড়মাস বাকি?”

     “কৃষ্ণমূর্তি এখন তো ইউএসে। দেশে ফিরে সোজা কলকাতায় আসবে।”

     এমন সময় দরজা খুলে এস-সি স্যার ঢুকলেন। সঙ্গে ব্যাগ হাতে বিমানদা। স্কলারদের পাশ দিয়ে গিয়ে পার্টিশন করা নিজের খাস চেম্বারে ঢুকলেন, সঙ্গে বিমানদাও। তন্ময় একটু যেন দোনোমনা করল। তারপর শুভজিতকে বলল –“তুমি তাহলে কথাটা জিজ্ঞাসা করে রেখ শুভজিৎদা। আমি পরে খবর নেব”। তারপর বেরিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় এস-সি চেম্বার থেকে বেরিয়ে বললেন, “কী খবর তন্ময়বাবু। তোমাদের গবেষণার কাজ কেমন চলছে?” গবেষণা শব্দটা লম্বা করে উচ্চারণ করলেন এস-সি। স্পষ্ট বিদ্রূপের চিহ্ন। তন্ময় একটা একপেশে হাসি দিয়ে বলল “ভালো স্যার”।

     “তোমার স্যারের মুর্গীটা কাল রাতে ক-টা পেপার পাড়ল?”

     এটা একটা টিপিক্যাল এস-সির রসিকতা। ডি-এম স্যারের ল্যাবে প্রচুর পেপার লেখা হয়, তাই এস-সি বলেন ‘ওদের একটা পেপার পাড়া মুরগী আছে’। কিন্তু এই কথাটা স্যার সরাসরি তন্ময়কে কথাটা না বললেও পারতেন। তন্ময় শক্ত মুখে জবাব দিল –“সবাই ডিমটাই দেখে। আসলে মুর্গিটার খাবার জোগাড় করাটাই বড় শক্ত স্যার। সবাই মিলে হন্যে হয়ে সেই চেষ্টাই করছি”। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

     শুভজিৎ দেখল সব্যসাচীর মুখে আষাঢ় ঘনিয়ে এসেছে। কোনও কথা বললেন না তিনি। বিমানদা কয়েক সেকেন্ড পরে ফ্যাঁচ করে উঠল। -“তন্ময়টার মতন বেয়াদপ কম দেখেছি স্যার। এই দত্তাত্রেয়বাবুই ওকে মাথায় তুলেছেন। নিজের সম্বন্ধে এত ইনফ্লেটেড ধারণা ওর!”

     সব্যসাচী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এম্পটি ভেসেল সাউন্ডস মাচ। আসলে এই জেনারেশানের ছেলেদের এটাই সমস্যা”।

     শুভজিৎ ভাবল, এই শুরু হল স্যারের ফেভারিট বিষয়ের আলোচনা। বর্তমান প্রজন্মের অবক্ষয়। যথাসাধ্য কান বন্ধ করে প্রোগ্রামে মন দিল ও।

(২)

“আইনস্টাইন মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে ফটো-ইলেকট্রিসিটির থিয়োরি দিয়েছিলেন। যার জন্য উনি নোবেল প্রাইজ পান”। শুভজিৎ বলল।

     এমএসসি ফার্স্ট ইয়ারের এই তিনটে ছেলেমেয়ে তথাগত, নেত্রবতী, আর দেবলীনা। এরা সিলেবাসের বাইরেও ফিজিক্সের আর পাঁচটা ব্যাপারে আগ্রহী। এই ব্যাপারে এরা শুভজিতের সমধর্মী বলা যায়। শুভজিৎ সারাজীবন পড়া মুখস্থ না করে, বুঝতে গিয়ে ভুগেছে। পরীক্ষার সময় তুমি কী বুঝেছ তার কোনও দাম নেই। বরং তুমি না বুঝে কতটা মুখস্ত করতে পারো তারই কম্পিটিশন হয়। আর আমাদের দেশে, পরীক্ষায় পাওয়া নম্বরই হল শেষ কথা। শুভজিতের ফিজিক্স সংক্রান্ত সিলেবাসের বাইরের পড়াশোনা পরীক্ষার সময় কোনই কাজে আসেনি।

     “কিন্তু রিলেটিভিটি?” দেবলীনা বলে।

     “রিলেটিভিটি তখনও লোকে বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। ১৯১৭ সালে সূর্যগ্রহণের সময় দেখা গেল তারার আলো সূর্যের পাশ দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যাচ্ছে। সেই প্রথম বিজ্ঞানীরা জেনারেল রিলেটিভিটি মানতে বাধ্য হলেন। কিন্তু ১৯২১ সালে নোবেল পুরষ্কার দেবার সময়ও স্পষ্ট করে বলা হল যে ওঁকে ফটো-ইলেকট্রিক এফেক্ট আবিষ্কারের জন্যই নোবেল দেয়া হল”।

     তথাগত প্রশ্ন করল, “কিন্তু তাহলে আইনস্টাইনের সব কাজই তো ওঁর আটত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। বাকি জীবনটা উনি কী করেছিলেন?”

     নেত্রবতী বলল, “আমি শুনেছি উনি নাকি শেষ জীবনে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স নিয়ে কাজ করছিলেন”।

     শুভজিৎ বলল, “ঠিকই শুনেছিস। আসলে পৃথিবীতে চার রকম ইন্টার-অ্যাকশন হয়। গ্র্যাভিটেশন, ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক, স্ট্রং আর উইক। আইনস্টাইন আসলে চেয়েছিলেন এই চারটে ফোর্সকে এক করতে। উনি রিলেটিভিটি থিয়োরিতে দেখিয়েছিলেন যে মহাকর্ষ বা গ্রাভিটি হল আসলে ভরের আশেপাশে স্পেস-টাইম বেঁকে যাবার ফল আর…”

     তথাগত বাধা দিয়ে বলল, “এগুলো আমার শুনতে আজগুবি লাগে। স্পেস কী করে বেঁকে যায়?”

     শুভজিৎ হাসল। বলল, “আজগুবি লাগাই উচিত। কারণ আমরা যে পৃথিবী আমাদের চারদিকে দেখি সেখানে এরকম কিছু দেখার কথা নয়। কিন্তু রিলেটিভিটি বলছে অন্য কথা। ভেবে দেখ আমাদের চারপাশের জগৎ হল তিনটে মাত্রার জগৎ। তিন মাত্রা হল দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, আর উচ্চতা, এই তো? এখন ধর একটা প্রাণী আছে যে উচ্চতা চেনে না। শুধু দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ চেনে। টেবিলের উপর ঘুরে বেড়ায়। তাকে হঠাৎ টেবিল থেকে একটু তুলে নিলে কী হবে? সে যখন আবার টেবিলের বন্ধুদের কাছে ফিরে যাবে, সে কি তখন ওদের তার নতুন অবস্থাটা বোঝাতে পারবে? আমাদেরও সেই অবস্থা হবে যদি পৃথিবীটা চার মাত্রার হয়। রিলেটিভিটি বলছে সময় হল সেই চতুর্থ মাত্রা। এখন বিরাট বড় ভরের কাছে যে জায়গাটা আছে সেইখান দিয়ে যেতে গেলে সবাইকেই ভরের দিকে বেঁকে যেতে হয়, এমনকি আলোকেও। এরই নাম স্পেস-টাইম একসঙ্গে বেঁকে যাওয়া। আমাদের ধারণা হয় যে বড় ভর অন্য ভরকে তার গ্র্যাভিটি দিয়ে টানছে। কিন্তু আসলে রাস্তাটাই বাঁকা। বাকিটা ভয়ানক কঠিন অঙ্ক, আমি ভালো জানি না।”।

     তথাগত বলে, “কিন্তু এর সঙ্গে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক থিয়োরির কি সম্পর্ক?”

     শুভজিৎ বলল, “গ্র্যাভিটি যেমন স্পেস-টাইম বেঁকে যাবার ফল, সেইরকম ইলেকট্রিক বা ম্যাগনেটিক আকর্ষণও স্পেস টাইমের কোনও নতুন জ্যামিতি–এটাই শেষ জীবনে আইনস্টাইন প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তবে সম্ভবত সফল হননি”।

     তথাগত আর দেবলীনা বিদায় নিয়ে ক্লাসের দিকে রওনা হয়। নেত্রবতী শুভজিতকে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা তুমি এত কিছু পড়ার সময় পাও কখন?”

     শুভজিৎ একটু তিতকুটে রকমের হাসি হাসে, বলে, “এইসব পড়তে গিয়েই তো আমার এমএসসি পরীক্ষার পড়া মুখস্ত করা হল না”।

     “তুমি কসমোলজি নিয়ে রিসার্চ করলে তো পারতে!”

     “দেখ, কসমোলজির কাজ হাতে গোনা কয়েকটা নাম-করা জায়গায় হয়। আমার এই জঘন্য রেজাল্ট নিয়ে আমি তো আর সেই সব জায়গায় যেতে পারতাম না”।

     “তুমি না, আসলে খুব সহজে হাল ছেড়ে দাও। তোমার মতো ভালো ফিজিক্স, আমাদের স্যারদের মধ্যে ক’জন বোঝেন আমার সন্দেহ আছে। তুমি কেন যে সব জায়গায় অ্যাপ্লাই কর না–কে জানে!”

     “ঠিক আছে, তুই পাশ-টাশ করে তারপর টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ডিরেক্টর হয়ে যা, তারপর আমাকে ওখানে কসমোলজি নিয়ে রিসার্চ করার ব্যবস্থা করে দিস”।

     নেত্রবতী একটা মুখভঙ্গি করে বলে, “তুমি একটা যা তা।” তারপরেই বলল, “অ্যাই শুভজিৎদা, তুমি আমাকে ইএম থিয়োরিটা একটু বুঝিয়ে দাও না। এ-কে-জি’র ক্লাস কিচ্ছু বুঝতে পারছি না”।

     “আমি তোকে কতবার বলেছি, এ-কে-জি ক্লাসে যা লিখিয়ে দেবেন ওগুলোই পরীক্ষায় আসবে আর ওগুলো লিখলেই এইটটি পারসেন্ট পাবি। বুঝতে তোকে কে বলেছে?”

     “আমার না বুঝে কিছু লিখতে ভালো লাগে না। বুঝিয়ে দাও না বাবা! সবচেয়ে ভালো হয় আমাদের বাড়ি এলে। দুপুরে কেউ থাকে না, নিরিবিলি, আসবে?”

     অতি স্পষ্ট আহ্বান। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই নেত্রবতী শুভজিতকে অন্য চোখে দেখেছে। শুভজিতের মনে আছে এই ক্যান্টিনের সামনেই বছরখানেক আগে ওদের কলেজের জুনিয়ার ছেলে শমিক এই তন্বী উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা সুন্দরীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে নাম বলেছিল নেত্রবতী।

     শুভজিৎ প্রশংসার স্বরে বলেছিল, “বা! ভারী সুন্দর নাম তো, নেত্রবতী কর্ণাটকের একটা নদীর নাম না?” নেত্রবতী ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল, “জীবনে এই প্রথমবার কেউ আমার নামের মানেটা ঠিকঠাক বলল”। এরপর শুভজিৎ লক্ষ করেছে নেত্রবতী সুযোগ পেলেই ওর ধারে কাছে চলে এসেছে। কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শুভজিতের মনের গভীরে শিকড় গেড়ে যে হীনমন্যতা আছে তা তাকে স্বাভাবিক কথাগুলো ভাবতে দেয়নি। তা ছাড়া নেত্রবতীরা বেশ বড়লোক। নিজের বাড়িতে নেত্রবতীকে নিজের বাবা-মা-দাদার সঙ্গে? ভাবাই যায় না।

     এই মুহূর্তে নেত্রবতী অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। শুভজিৎ একটু গড়িমসি করে। বলে –“ঠিক আছে দেখছি, কবে বসা যায়। এখন স্যারের কাছে কাজ নিয়ে একটু চাপ চলছে”।

     নেত্রবতীর চোখ হতাশায় ভরে যায়, কিন্তু সে দমে না। বলে, “তোমাদের স্যার লোকটা যেন কেমন। প্র্যাকটিকালের সময় এত বাঁকা বাঁকা কথা বলেন না, বিচ্ছিরি লাগে। ওদিকে ক্লাসে তো থাকেন মিনিট দশেক। এত ওঁর কি কাজ থাকে?”

     “স্যার ন্যানো-টেকনোলজির একটা থিয়োরেটিকাল প্রোজেক্ট ডিএসটি’কে দিতে চলেছেন। সেই সংক্রান্ত কাজ চলছে।”

     “ন্যানোর কাজ তো শুনি ডি-এমের ল্যাবে হয়। সেদিন তথাগত তন্ময়দার সঙ্গে গিয়ে দেখে এসেছে। বিরাট কাণ্ড!”

     বুকে একটা তীব্র ঈর্ষা অনুভব করে শুভজিৎ। মুখে বলে, “ডি-এমের ল্যাবে এক্সপেরিমেন্ট হয়, এস-সি থিয়োরিটিকাল মডেলের চেষ্টা দিচ্ছেন। যদি ডিএসটি স্যারের প্রোজেক্টটা স্যাংশন করে তাহলে প্রায় এক কোটি টাকার প্রোজেক্ট হবে”।

     নেত্রবতীর মুখটা কি একটু উজ্জ্বল হল? বলে, “এই প্রোজেক্টটা এলে তুমি তো সেই প্রোজেক্টেই জেআরএফ হয়ে জয়েন করবে, তাই না?”

     শুভজিৎ মনে মনে ভাবে সেই আশাতেই তো সে প্রায় দেড় বছর ঘরের খেয়ে ল্যাবের প্রোগ্রাম লিখছে। জেআরএফ হলে বছর দুয়েকের জন্য মাসে হাজার তিরিশ মাইনে হবে। পরের তিন বছর আরও বেশি। কিন্তু স্যার কি প্রোজেক্টটা পাবেন? মুখে বলে –“গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল! প্রোজেক্ট আগে স্যাংশন তো হোক।”

     নেত্রবতীর চোখ এখনও উজ্জ্বল। বলে, “তুমি একটা হোপলেস পেসিমিস্ট। ঠিক হয়ে যাবে দেখো।”

     শুভজিতের মনের ভিতরে একটা ভীষণ ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। মনে হয় বলে ‘তুইই একমাত্র আমার উপর ভরসা রাখিস, তুই ভীষণ ভালো রে’। কিন্তু মনের কথা মুখে আসে না তার। বরং মুখটা একটু বেঁকিয়ে বলে, “চলি রে অনেক কাজ আছে।”

     ক্যান্টিন থেকে দরজার দিকে যেতে যেতে পিছন ফিরে তাকায় না শুভজিৎ। তাকালে দেখতে পেত নেত্রবতী এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। 

(৩)

“এই বাবু, তোর কী হয়েছে রে? কলেজ থেকে ফিরে টান টান হয়ে শুয়ে আছিস? মন খারাপ?”

     হ্যাঁ, শুভজিতের মন খুবই খারাপ। নাগপুরের কনফারেন্সের যে পেপারটার কাজ শতকরা নব্বই ভাগই শুভজিৎ করেছে, আজ স্যার ঠিক করেছেন ওটাতে স্যার, মৈত্রেয়ী আর বিমানদার নাম থাকবে। নাগপুর কনফারেন্সে গিয়ে মৈত্রেয়ী ওটা প্রেজেন্ট করবে। পেপারটায় শুভজিতের নাম থাকবে না। কাজেই শুভজিতের নাগপুর কনফারেন্সে যাবার কোনও প্রশ্ন নেই। অথচ কাজটা শুভজিৎকে দিয়ে করাবার আগে বিমানদার কত ভালো ভালো কথা!

     কিন্তু এসব কথা দাদা দেবজিৎকে কীভাবে বোঝাবে শুভজিৎ? কাজেই বলে, “বিরক্ত করিস না তো। নিজের কাজে কর।”

     কিন্তু দেবজিৎ ভাই অন্ত প্রাণ। ভাইয়ের জন্য তার জান কবুল। উচ্চ শিক্ষিত ভাইয়ের জন্য সে যেমন গর্ব অনুভব করে, তেমনই আবার ভাইকে সমীহ করেও চলে। সেই ভাই মন খারাপ করে সন্ধ্যাবেলা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে এ দেবজিতের প্রাণে সহ্য হয় না। সে সোজা ঘর ঢুকে পড়ে।

     “ভাই এরকমভাবে মন খারাপ করে থাকিস না। চল না, আজ কলতলার মাঠে প্রোগ্রাম হচ্ছে, দেখে আসবি”।

     শুভজিৎ রেগে যায়, খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে, কিন্তু দাদা কিছুতেই হার মানে না। অবশেষে নিরুপায় হয়েই দাদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে সে।

     বিচিত্রানুষ্ঠান। টিভির এক নামকরা গানের অনুষ্ঠানখ্যাত রূপন আর রিচিকা আসবে। তবে তারা আসার আগে, প্রথমে পাড়ার ছোট ছোট প্রতিভাদের নাচ গান হচ্ছে। তারপর যাদুরানী মিস ভানুমতীর ম্যাজিক শুরু হবে।

     মিস ভানুমতী স্টেজে এলেন। সাধারণত মহিলা ম্যাজিশিয়ান কম দেখা যায়। এই মিস ভানুমতী কিন্তু খুব একটা সুন্দরী নন। প্রথমত চেহারার মধ্যে একটা গোবদা গোছের ব্যাপার আছে। মুখে অজস্র গর্ত গর্ত ব্রণের দাগ। প্রবল চড়া মেকআপেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। গায়ের রং বিচ্ছিরি রকমের ফরসা। সাদা বললেই যেন ঠিক বলা হয়। তবে আওয়াজটি বেশ সুরেলা।

 

     প্রথমে ফুল, পাতা, টুপি ইত্যাদির ম্যাজিক। দেখানোর কায়দা এবং ম্যাজিশিয়ানের বকবকানি বা প্যাটর দুইই বেশ হৃদয়গ্রাহী। শুভজিৎ অনুভব করল তার মনের বিরক্তি বেশ খানিকটা কমে গেছে। একটা আস্ত ছেলেকে স্টেজের উপর থেকে ভ্যানিশ করে দেওয়ার খেলাটা দেখে শুভজিৎ বেশ আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ে। অবশেষে মিস ভানুমতী তাঁর শেষ খেলার ঘোষণা করলেন। এই খেলার নাম ম্যাজিক বাক্স। কেউ কৌশলটা ধরে দিতে পারলে হাজার টাকা পুরস্কার। কোনও বয়স্ক লোককে স্টেজে আসতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

     আশপাশের লোকের জড়তা কাটার আগেই দেবজিৎ হাত তুলে ফেলে। “এই যে আমার ভাই স্টেজে যাবে”। শুভজিৎ “আহ দাদা কি হচ্ছে”, বলে কাটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গর্বিত দাদা দেবজিতের ভাইয়ের উপর অগাধ বিশ্বাস। “আরে দেখ না। তুই ঠিক ধরে ফেলতে পারবি”। বাধ্য হয়ে চারপাশের কৌতূহলী জনতার চোখের সামনে দিয়ে স্টেজে ওঠে শুভজিৎ। এটা ঠিক নিজের পাড়া না হলেও এখানেও অনেকে ওকে ভালো ছাত্র বলে চেনে।

     স্টেজে শুভজিতের সামনে একটা বাক্স এনে রাখা হয়। পুরোটাই ধাতব। দেড় ফুট বাই দেড় ফুট আর উচ্চতায় দেড় ফুটের সামান্য বেশি। বাক্সটার মাথায় কব্জা দেওয়া ঢাকনা। ঢাকনা খুলে শুভজিতকে বলা হল ভালো করে ভিতরটা দেখে নিতে। শুভজিৎ লক্ষ করল বাক্সটার দেয়ালটা বেশ পুরু। ভিতরটা একফুট বাই একফুটের বেশি নয়। কিন্তু বাক্সর ভিতরের দেয়ালটা নিরেট। কোনও জায়গায় কোনও জোড়ার চিহ্ন নেই। খুব সম্ভব অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় কোনও ধাতু দিয়ে তৈরি।

     বাক্সর ভিতরটা হাত দিয়ে দেখে শুভজিৎ নিশ্চিত হল এই বাক্স থেকে বাক্সর দেয়ালের মধ্যে দিয়ে কিছু বার করা সম্ভব নয়। এবারে মিস ভানুমতী একটা বিশাল লুডোর ছক্কার মতো জিনিস এনে ওর হাতে দিলেন। জিনিসটা হালকা, প্লাস্টিকের তৈরি। এক একটা ধার ইঞ্চিদশেক হবে। মানে ছক্কাটাকে দিব্বি বাক্সটার মধ্যে ঢোকানো যাবে। শুভজিতকে তাই-ই করতে বলা হল। তারপর বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করে সরে আসতে হল।

     মিস ভানুমতীর কথার কামাই নেই। তিনি বলে যাচ্ছেন ‘এই বাক্সের মালিক ছিলেন ফারাও প্রথম র‍্যামসেসের জাদুগর আজক্স। এই বাক্স দিয়ে তিনি সব কিছু ভ্যানিশ করে দিতে পারতেন। একবার নাকি র‍্যামসেস রেগে গিয়ে অ্যাজক্সের কাছ থেকে নিজের দেওয়া মণিরত্ন সব ফিরিয়ে নিয়ে নিতে চান। অ্যাজক্স সব মণি এই ম্যাজিক বাক্সে ঢুকিয়ে দিলেন’ বলতে বলতে ভানুমতী বাক্সটাকে একটা কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে ভিতরে হাতটা নিয়ে গিয়ে আবার বার করে ফেললেন। তারপর নিজের খোলা হাতটা দেখিয়ে বললেন, “রাজা বাক্স খুলে কী দেখলেন?” বলে শুভজিতকে ইশারা করলেন বাক্সটা খোলার জন্য।

     বাক্স খুলে শুভজিৎ বিরাট চমক খেল। ছক্কাটা বাক্সে নেই! কোথায় গেল? ভানুমতী শুভজিতকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী দেখছেন সবাইকে বলুন”। বিমূঢ় শুভজিৎ অডিয়েন্সের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাক্সে কিছু নেই”।

     এরপর আবার ভানুমতী কিছুক্ষণ বকবক করার পর শুভজিতকে বললেন “বাক্সটা খুলে দেখুন তো”। শুভজিৎ বাক্সটা খুলে দেখল তার মধ্যে ছক্কাটা আবার এসে গেছে। ভানুমতী শুভজিতকে ছক্কাটা হাতে তুলে সবাইকে দেখাতে বললেন। হাতে নিয়ে সবাইকে দেখানোর সময় শুভজিতের মনে হল প্লাস্টিকের ছক্কাটা যেন বেশ একটু গরম হয়ে আছে।

     ভানুমতী শুভজিতকে বললেন, “আমি আরও একবার এই খেলাটা দেখাব। আপনার যদি কোনও সন্দেহ থাকে তাহলে বাক্সটা নেড়েচেড়ে দেখে নিতে পারেন। শুভজিৎ টেবিল থেকে একবার বাক্সটা তুলল। না টেবিলের দিকে কোনও ফাঁক নেই। বাক্সটা রাখার সময় শুভজিৎ বাক্সর গায়ে একটা ডায়াল আর কাঁটা আছে দেখতে পেল।

     এরপর মিস ভানুমতী আবার বাক্সটার উপর একটা কালো কাপড় ঢেকে হাত ভিতরে নিয়ে কিছু ম্যাজিক্যাল মন্ত্র পড়লেন। কালো কাপড় সরাবার সময় কিন্তু শুভজিৎ দেখতে পেল ভানুমতী একটা নয় ভোল্টের ব্যাটারি হাতে করে সরিয়ে ফেললেন।

     এরপর সমস্ত পদ্ধতিটাই পুনরাবৃত্ত হল। নিখুঁতভাবে ছক্কাটি উধাও হল এবং ফিরে এল। সবার হাততালির মধ্যে খেলা শেষ ঘোষণা হতে যাচ্ছিল। এমন সময় শুভজিৎ বলল, “আচ্ছা ওই প্লাস্টিকের ছক্কাটা ছাড়া অন্য কিছু ভ্যানিশ করা যাবে?”

     ভানুমতীর মুখে একটা জটিল হাসি ফুটে উঠল। বললেন, “যাবে। কিন্তু এটা আমি মাত্র আর একবারই করব। ঠিক আছে? বলুন কী ভ্যানিশ করতে হবে?” শুভজিৎ নিজের পকেটের ডট পেনটা বার করে দিয়ে বলল, “এটা ভ্যানিশ করা যাবে?”

     “যাবে, তবে পেনটা কিন্তু নষ্ট হয়ে যেতে পারে”।

     “যাক গে। এটাই ভ্যানিশ করুন”।

     এর পরের দশ মিনিটে শুভজিতের পেন ভ্যানিশ হয়ে আবার ফিরে এল। কিন্তু এরই মধ্যে শুভজিৎ তিনটি আবিষ্কার করে ফেলল। এক–এই ম্যাজিকটা দেখাতে প্রত্যেক বার একটা নতুন নয় ভোল্টের ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। দুই–যেটাকে ভ্যানিশ করা হচ্ছে সেই বস্তুটি ম্যাজিক বাক্সটির বাইরে যায় না। তিন–ফিরে আসার পর বস্তুটা বেশ একটু গরম থাকে।

     ম্যাজিক শো শেষ হয়ে গেল। শুভজিতের মাথায় কিন্তু ঘূর্ণি লেগেই রইল। কী ভাবে? কী ভাবে ওই মিস ভানুমতী জিনিসপত্র ভ্যানিশ করছে? বাক্সটার যা সাইজ, তাতে ওর মধ্যে অন্য কোনও খোপ থাকা সম্ভব নয় যার ভিতরে ছক্কাটা লুকিয়ে ফেলা যাবে। টেবিলের তলায় কোনও লুকানো জায়গা নেই। তাহলে ছক্কাটা যাচ্ছে কোথায়? আবার নিজে নিজে ফিরেই বা আসছে কি করে? শুভজিৎ এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে যা হবার বাক্সটার মধ্যেই হচ্ছে, কারণ ছক্কাটাকে বাইরে লুকিয়ে রাখার কোনও জায়গাই নেই। কিন্তু কী করে হচ্ছে? কৌশলটার মধ্যে অন্য কারিকুরি আছে। কারণ বাক্সের গায়ে একটা ডায়াল আছে। কেন আছে? ওটা থাকার কী প্রয়োজন? প্রত্যেকবার খেলা দেখাতে একটা করে নতুন ৯ ভোল্টের ব্যাটারি লাগছে। কেন? আর ফেরত আসার পর বস্তুটি গরম হয়ে থাকছে। এটাও তো অস্বাভাবিক।

     শুভজিৎ ঠিক করে ফেলল এই ব্যাপারটা ও কোনওভাবেই ছেড়ে দেবে না। ওই বাক্সের রহস্যটা জানতেই হবে। তার জন্য প্রথম দরকার ওই মিস ভানুমতীর সঙ্গে ভাব জমানো। অতএব সে দাদার দিকে ফিরে বলল, “কলতলা মাঠের এরা ম্যাজিশিয়ানটাকে কোথা থেকে জুটিয়েছে রে দাদা? একটু খবর নে তো। সায়েন্স কলেজে এর একটা শো করতে পারলে বেশ হয়”।

(৪)

বসে বসে অধৈর্য হয়ে গেছে শুভজিৎ। দেবযানী এখনও এসে পৌঁছায়নি। এদিকে রেস্টুরেন্টের লোকজন বারদুয়েক তাগাদা দিয়ে গেছে। আর বেশিক্ষণ বসতে দেবে বলে মনে হচ্ছে না।

     সেই দিনের সেই ম্যাজিক শো এর পর থেকেই মিস ভানুমতীর পিছনে লেগে আছে শুভজিৎ। যেখানেই মিস ভানুমতী প্রোগ্রাম করতে যায় সেখানেই শুভজিৎ গিয়ে উপস্থিত হত। আর সুযোগ পেলেই স্টেজে উঠত। প্রোগ্রাম শেষ হলে ব্যাক-স্টেজে গিয়ে মিস ভানুমতীকে বলত ‘আপনার প্রোগ্রাম দারুণ হয়েছে’। এই করেই আলাপ পরিচয় বাড়তে থাকে। পুরো সময়টাই শুভজিৎ এমন ভাব করছিল যেন সে গলা পর্যন্ত মিস ভানুমতীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। অবশেষে এই সুদর্শন, ভদ্র, সুশিক্ষিত ছেলেটিকে অবজ্ঞা করা আর মিস ভানুমতীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আজ প্রথম বার দুজনে ডেটিং এ বেরচ্ছে। শুভজিৎ আজকাল মিস ভানুমতীকে তার পিতৃদত্ত নাম দেবযানী বলে সম্বোধন করে।

     অবশেষে দেবযানী এসে পৌঁছেছে। মেক আপের পরিমাণটা অনেক কম। শাড়ি পরে আসার দরুন অনেক কম মোটা দেখাচ্ছে। হাঁসফাঁস করতে করতে বসে বড় করে এক গ্লাস জল খেয়ে বলল, “এক মক্কেল বাড়িতে এসেছিলো শো-এর ব্যাপারে। কিছুতেই আর ওঠে না। কিছু বলতেও পারি না, খরিদ্দার লক্ষ্মী!”

     খেতে খেতে নানা ধরনের গল্প চলতে লাগল। আস্তে আস্তে শুভজিৎ কথার ধারাকে ম্যাজিকের দিকে নিয়ে গেল। একসময় বলল, “যাই-ই বল তোমার বাক্সের ম্যাজিকটা কিন্তু অন্য সব ম্যাজিকের থেকে আলাদা।”

     দেবযানী হাসল, কিন্তু কিছু বলল না। শুভজিৎ বলল, “আমার ধারণা তুমি নিজেই জান না ম্যাজিকটা কি করে হয়।”

     দেবযানী সামান্য হলেও চমকাল। বলল, “এ কথাটা কেন মনে হল তোমার?”

     “আমি ফিজিক্সের ছাত্র। এই ম্যাজিকটা দেখাতে হলে একটা ব্যাটারি লাগে, তাই তো? অথচ আলো জ্বলে না, কোনও কিছু ঘোরে না, তাহলে কেন লাগবে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে ব্যাপারটা।”

     দেবযানী আরও কিছুক্ষণ তা না-না করল বটে, কিন্তু তারপরে ওর প্রতিরোধ ভেঙে গেল। বলল, “তুমিই ঠিক বলেছ, এই ম্যাজিকটা কী করে দেখাতে হয় আমি জানি কিন্তু কীভাবে হয় আমি জানি না।”

     “সবটাই কি বাক্সটার খেল?”

     “সবটাই।”

     “বাক্সটা কোথা থেকে পেলে?”

     “যদি কাউকে না বল তো বলতে পারি।”

     “না। একদম, কাউকে বলব না।”

     দেবযানী এর পর এই গল্পটি বলল।

     বছর চারেক আগে “উন্ডার ভন কোহার্জ” নামের এক ম্যাজিশিয়ান বাংলাদেশে ম্যাজিক দেখাতে আসেন। বাংলাদেশ যাবার আগে তিনি কলকাতায় কয়েকদিন ছিলেন। কলকাতায় থাকাকালীন তিনি কাগজে বিজ্ঞাপন দেন যাদুকরের অ্যাসিস্ট্যান্ট চাই। সাধারণত লোকাল ছোটখাটো ম্যাজিশিয়ানদের কাছে, বড় ম্যাজিশিয়ানের অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করাটা খুবই বড় সুযোগ বলে ধরা হয়। আধুনিক ম্যাজিকের কলাকৌশল সম্বন্ধে জানার এর থেকে ভালো উপায় নেই। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দেবযানীও দরখাস্ত করে। মূলত দেবযানীর সুরেলা গলা আর চমৎকার কথা বলার দক্ষতার জন্য ওকেই সিলেক্ট করা হয়। কারণ বাংলাদেশে ম্যাজিক দেখাতে হলে বাংলায় কথা বলতে হবে। আর সেটা একমাত্র বাঙালির পক্ষেই সম্ভব।

     ম্যাজিকের একটা বড় অংশ হল অবিশ্রাম ইন্টারেস্টিং কথাবার্তা বলে দর্শকের মনোযোগ অন্যত্র নিয়ে যাওয়া। ম্যাজিকের ভাষার একে বলে ‘প্যাটর’। দেবযানী আসলে স্টেজের উপর ম্যাজিশিয়ানের কথা বলার কাজটুকু করে দেবে এটাই ছিল পরিকল্পনা।

     সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু গোটা পাঁচেক শো এর পর “উন্ডার ভন কোহার্জ” কোনও অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। খুবই খারাপ অবস্থায় তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। টেস্ট করে জানা গেল তাঁর সারা দেহে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ কোনও স্পেসিফিক জায়গা থেকে ছড়িয়েছে তা নয়। ইতিমধ্যে তাঁর দলের অন্যান্যরা সব বেগতিক দেখে কেটে পড়ল। অগত্যা দেবযানীকেই তাঁকে হসপিটালে ভর্তি করা থেকে সেবা শুশ্রূষা করা সবই করতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি বাঁচলেন না। ওঁর ম্যাজিকের সাজ-সরঞ্জাম সবই ঢাকা থেকে জার্মানিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেবলমাত্র এই বাক্সটা উনি সবসময় নিজের কাছে রাখতেন। মারা যাবার সময় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাক্সটা তিনি দেবযানীকে দিয়ে যান। দেবযানীকে তিনি বলে গিয়েছিলেন এই বাক্সটাকে নিয়ে কোনওরকম কায়দা না করতে। এটি নাকি কেবলমাত্র ম্যাজিক দেখাবার সরঞ্জামই নয়। এই বাক্সটা একটা আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। আর এটার উপরে নাকি অভিশাপ আছে।

     কথায় কথায় বেশ রাত হয়ে গেছিল, ওরা যখন মলের ফুডকোর্ট থেকে বেরিয়ে আসছে তখন হঠাৎ পিছন থেকে ডাক, “ও শুভজিৎ দা, এখানে কোথায়?” শুভজিৎ পিছনে তাকিয়ে দেখে নেত্রবতী। ছিপছিপে সুঠাম চেহারার উপর শাড়ি পরে, পরিপাটি করে সাজসজ্জা করে, এমন গ্ল্যামারাস দৃশ্য হয়েছে যে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। ঝপ করে নেত্রবতীর প্রেমে পড়ে গেল সে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে পাশ থেকে দেবযানীর অসন্তুষ্ট আওয়াজ পেল শুভজিৎ, “এ কে?”

     শুভজিৎ বুঝল সমূহ বিপদ! নেত্রবতীর রূপ দেখেই দেবযানী বিগড়ে গেছে। এখন যদি দেবযানী, নেত্রবতীর সঙ্গে শুভজিতের ঘনিষ্ঠতার কোনওরকম আন্দাজ পায়, তাহলে বাক্স রহস্য চিরকাল রহস্যই থেকে যাবে। প্রবল চেষ্টায় মুখে একগাদা তাচ্ছিল্য এনে দেবযানীর দিকে তাকিয়ে বলে, “কলেজের জুনিয়ার।” তারপর নেত্রবতীর দিকে না তাকিয়েই বলে, “আসি রে, টা টা।” বলে গেটের দিকে এগিয়ে যায়। নেত্রবতী কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে নিজের কাজে ফিরে যায়। অনেক কষ্টে চোখের জল আটকেছে সে। না, শুভজিতের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখবে না সে। গার্ল-ফ্রেন্ড সঙ্গে থাকলেও শুভজিতের কাছে এতটা অবজ্ঞা তার প্রাপ্য ছিল না।

     শুভজিৎ নেত্রবতীকে একেবারে পাত্তা না দিলেও দেবযানী কিন্তু যথেষ্টই সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি প্রশ্নের অফ স্পিন, লেগ স্পিন সামলে আবার বাক্সের কথায় ফিরে যেতে সক্ষম হয় সে।

     “আচ্ছা প্রত্যেকবার একটা করে নতুন নয় ভোল্টের ব্যাটারি লাগে? পুরানো ব্যাটারি আবার ব্যবহার করে দেখেছ?”

     “না, স্যার বলেছিলেন কোনওরকম বুদ্ধি না খাটাতে। এই বাক্সটা নিয়ে বেশি খেলা দেখানোতেও তাঁর আপত্তি ছিল। খুব বড় শো না হলে উনি বাক্সর খেলা দেখাতেন না।”

     “উনি কি বাক্সটা বানিয়েছিলেন?”

     “না, স্যার বলেছিলেন ওটা ওর দাদু বানাতে শুরু করেন, কিন্তু শেষ করেন ওঁর বাবা। ওঁরা দুজনেই নাকি ফিজিসিস্ট ছিলেন।”

     “তা তোমার স্যারের বাবা পেটেন্ট নিলেন না কেন?”

     “তিনি খুব অল্প বয়সে মারা যান। বাক্সটা বানানোর পর বেশিদিন বাঁচেননি। মারা যাবার আগে স্যারকে বলেছিলেন বাক্সটা ব্যবহার না করতে। কিন্তু স্যার ততদিনে প্রফেশনাল ম্যাজিশিয়ান হয়ে গিয়েছিলেন। এমন একটা আশ্চর্য ম্যাজিক না দেখিয়ে পারা যায়? কিন্তু তিনিও বেশিদিন বাঁচেননি। এখন আমি বাক্সটার মালিক। ক’দিন বাঁচি দেখ!”

     শুভজিৎ বলে ওঠে, “বালাই ষাট! তোমার কিছু হবে কেন? আচ্ছা আমরা যদি বাক্সটা…” হঠাৎই দেবযানী রেগে উঠে বলে, “আচ্ছা তুমি আমার সম্বন্ধে ইন্টারেস্টেড না বাক্সটা সম্বন্ধে? সারা সন্ধ্যাটা তো বাক্স বাক্স করে কাটল।”

     শুভজিৎ মনে মনে জিব কাটে। সত্যি কথাই বলেছে দেবযানী। সাবধানে বাক্সের কথা এড়িয়ে মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসার কথা বলতে শুরু করে সে। ট্যাক্সি চড়ে দেবযানীর বাড়ি যেতে যেতে হাত ধরে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। দেবযানীও গলে যায়। ওর বুভুক্ষাটা বুঝতে পারে শুভজিৎ। মনে মনে সতর্কও হয়ে ওঠে।

     ট্যাক্সি থেকে নেমে দেবযানীর বাড়ির সামনে আসে শুভজিৎ। ছোট টালির বাড়ি। অথচ এর মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! দেবযানীর ভিতরে আসার আমন্ত্রণ খুব কায়দা করে এড়িয়ে যায় সে। বিদায় নেবার সময় একটা কথা হঠাৎ মনে পড়ে তার।

     “আচ্ছা তুমি তোমার স্যারের বাবা বা দাদুর নাম জানো? মনে আছে?”

     শুভজিতকে অবাক করে দিয়ে দেবযানী বলে, “তিনজনের নামই মনে আছে। স্যারের নাম ডেভিড লাভেনবার্গ, স্যারের বাবা অস্কার লাভেনবার্গ আর দাদুর নাম রুডলফ লাভেনবার্গ। স্যার মারা যাবার আগে বিকারের ঘোরে বাবা আর দাদুর নাম খুব বলতেন। আচ্ছা গুডনাইট।”

     ফেরার রাস্তায় শুভজিতের মনের মধ্যে বার বার দপদপ করছিল নামগুলি। কোথায় শুনেছে সে? বিশেষ করে রুডলফ লাভেনবার্গ নামটা। কিছুতেই মনে পড়ছিল না। খালি গলায় কাঁটা বিঁধে থাকার মতো একটা খচখচে অনুভূতি হচ্ছিল। মাথাটাও আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠছিল। বাড়ি ফিরে শোয়ার আগে ভালো করে ঘাড়ে মাথায় জল দিয়ে পা ধুয়ে শুতে গেল শুভজিৎ। ঘুম হবার জন্য একটা ঘুমের ওষুধও খেল। ঠিক ঘুম আসার মুহূর্তে একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বইয়ের তাক থেকে একটা বই পেড়ে আনে শুভজিৎ। হ্যাঁ ঠিক, রুডলফ লাভেনবার্গই বটে। কিন্তু তা যদি হয় তাহলে… কী সর্বনাশ!

     বইটার নাম “ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট”।

(৫)

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট বা ফিলাডেলফিয়া মিস্ট্রি ব্যাপারটাকে আসলে একটা কন্সপিরেসি থিয়োরি বলা যায়। বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ন্যাভাল ইয়ার্ডে, এলবিজ-ডি-ই-১৭৩ নামের একটি ডেস্ট্রয়ারের উপর কিছু অতি-গোপনীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হয়। উদ্দেশ্য যাই থাক ফলাফল অত্যন্ত অবিশ্বাস্য এবং মারাত্মক হয়। জাহাজটি নাকি সাত মিনিটের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। তার থেকেও ভয়ানক কথা হল সেই সাত মিনিট সময় জাহাজটিকে সুদূর নরফোক বন্দরে দেখা যায়। জাহাজের নাবিকরা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেশ কয়েকজনের স্মৃতিভ্রংশ হয়, কয়েকজন পাগল হয়ে যায়। সমস্ত রিপোর্ট চেপে দেওয়া হয়। ফলে আরও কী কী গোলমাল হয়েছিল জানা যায় না। কিন্তু সমস্ত ঘটনাটার ফলাফল এতই মারাত্মক ছিল যে ইউএস নেভি এই সংক্রান্ত কোনও পরীক্ষা আর ভবিষ্যতে করেনি।

     এই এক্সপেরিমেন্টের কথা ইউএস আর্মি কখনই স্বীকার করেনি। কিন্তু মরিস কেচাম জেসুপ বলে এক বিত্তশালী গবেষক এই ব্যাপারে বিরাট ব্যক্তিগত তদন্ত চালান। তা থেকে কতকগুলি কথা আর নাম উঠে আসে। এই লাভেনবার্গ নামটি সেখানেই ছিল। বস্তুত এই ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের প্রাণপুরুষ নাকি তিনিই ছিলেন।

     জেসুপ যা বলেন তা হল আইনস্টাইন যখন ইউনিভার্সাল ফিল্ড থিয়োরি নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন দেখেছিলেন যে তাঁর থিয়োরি অনুযায়ী ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ডেরও নাকি আলোকে বাঁকিয়ে দেবার ক্ষমতা আছে। তবে সেই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ক্ষমতা প্রচণ্ড হতে হবে। সাধারণ প্রক্রিয়ায় সেরকম ফিল্ড তৈরি করা অসম্ভব।

     রুডলফ লাভেনবার্গ ঠিক কোথা থেকে এসেছিলেন তা জানা যায় না। জাতে অভিজাত রাশিয়ান, এই পদার্থবিদ ভদ্রলোক, জার্মানদের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র সম্বন্ধে অসাধারণ জ্ঞান রাখতেন। এ ছাড়া নৌযুদ্ধের নানারকম অস্ত্রশস্ত্র সম্বন্ধেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। প্রিন্সটনে নিউক্লিয়ার ফিসন নিয়ে কাজ করার সময় আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। ম্যাগনেটিক ফিল্ডের সাহায্যে আলোকে বাঁকিয়ে দেবার কথা শুনে তাঁর মাথায় একটা নতুন আইডিয়া খেলে।

     ধরা যাক কেউ দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এখন লোকটিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি কেন? কারণ দেয়ালের একটা অংশের আলো লোকটি আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। লোকটির জায়গায় যদি একখণ্ড বিশাল বড় পাতলা কাচ রাখা হত তাহলে আমরা যেহেতু পিছনের দেয়ালটি দেখতে পেতাম ফলে কাচখণ্ডটি আমাদের কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকত।

     ঠিক এইভাবে যদি একটি জাহাজের পিছনের আলোগুলিকে বাঁকিয়ে সামনে এনে ফেলা যায় তাহলে জাহাজটি সামনে থাকা দর্শকের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাবে। একটা জাহাজ যুদ্ধের সময় অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারলে যে কত সুবিধা তা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না। এই প্রোজেক্টটা লাভেনবার্গ যত্ন করে তৈরি করে ইউএস নেভির সামনে ধরলেন।

     ততদিনে অ্যাটম বোমা তৈরি হয়ে গেছে। মার্কিন যুদ্ধবিভাগের মনে আধুনিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে তখন দারুণ মুগ্ধতা। হুকুম হল যত টাকা লাগে লাগুক, এই প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হওয়া চাই।

     ব্যাপারটা নিয়ে আইনস্টাইন কিন্তু খুঁতখুঁত করছিলেন। কারণ প্রবল ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড দিয়ে স্পেস-টাইমকে বাঁকানোর চেষ্টা করলে আলোর পথ বেঁকে যাবে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে আরও কী কী হবে তার স্পষ্ট কোনও ধারণা তখনও তাঁর মাথায় আসেনি। ব্যাপারটা খুব সুবিধার না-ও হতে পারে–এটা তাঁর মনে হচ্ছিল। কিন্তু উৎসাহী লাভেনবার্গ তাঁর সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব উড়িয়ে দিলেন।

     আইনস্টাইনকে সঙ্গে নিয়েই লাভেনবার্গ এই জাহাজ অদৃশ্য করার এক্সপেরিমেন্টে সামিল হলেন। কিন্তু বাধ সাধল আইনস্টাইনের থিয়োরির অঙ্কের জটিলতা। দশটি চলরাশি নিয়ে তৈরি দশটি ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশনের উত্তর কষে অ্যানালিটিকাল সলিউশান বার করা আজও অসাধ্য কাজ। একমাত্র সম্ভব হল নিউম্যারিকাল সলিউশন বার করা। কিন্তু তখনকার দিনের প্রাগৈতিহাসিক ক্যালকুলেটিং মেশিন দিয়ে নিউম্যারিকাল সলিউশন বানানো কতটা অসম্ভব বোঝাই যায়। বাধ্য হয়ে লাভেনবার্গ, আইনস্টাইনের আপত্তি স্বত্বেও অনেকগুলি শর্টকাট মেথড ব্যবহার করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে উত্তরগুলি সঠিক সলিউশানের ধারেকাছেও পৌঁছায়নি। তাই ফল ভালো হল না।

     ১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে ফিলাডেলফিয়া ন্যাভাল-ইয়ার্ডে এলবিজ-ডি-ই-১৭৩ ডেস্ট্রয়ারটিকে বিরাট মোটা মোটা তারের কয়েল জড়িয়ে দিয়ে অনেকগুলি দানবাকৃতি জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ পাঠিয়ে লাভেনবার্গের সলিউশান মোতাবেক প্রবল ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু ফলাফল যা হয়েছিল তা তো আগেই বলা হয়েছে।

     অপদস্থ লাভেনবার্গ কানাডায় অটোয়া ইউনিভার্সিটিতে চলে গেলেন। তাঁর কথা আর বিশেষ জানা যায় না।

     এই ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের কথা কিন্তু ইউএস নেভি কখনও স্বীকার করেনি। এ নিয়ে আইনস্টাইন সাহেবও কিছু বলেননি। এটা মোটামুটি আর পাঁচটা কন্সপিরেসি থিয়োরির একটা হয়ে রয়ে গেছে।

     এক লাভেনবার্গের কথা মনে পড়তে টপ করে আর এক লাভেনবার্গের নামও মনে পড়ে গেল শুভজিতের। ইনি হলেন অস্কার লাভেনবার্গ। এঁকে নিয়ে কী যেন একটা ঝামেলা হয়েছিল। গুগল খুলে অস্কার লাভেনবার্গ টাইপ করাতে প্রথমে অনেক হাবিজাবি আসতে থাকল। অবশেষে পাওয়া গেল, ১৯৯৬ সালে এই অস্কার লাভেনবার্গ দাবি করেন যে তিনি সাধারণ তাপমাত্রায় সুপার-কন্ডাক্টর আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু সে দাবি তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। প্রসঙ্গত বলা যায় ও জিনিস আজও আবিষ্কার হয়নি। এই লাভেনবার্গ যে রুডলাফ লাভেনবার্গের ছেলে সে কথার কোথাও উল্লেখ নেই। কিন্তু দেবযানী তো স্পষ্টই তিনজনের নাম বলল। ওর পক্ষে তো আর এসব বানিয়ে বলা সম্ভব নয়!

     শুভজিতের মাথা ক্রমশ গরম হয়ে উঠতে লাগল। সুপার-কন্ডাকটর মানে এমন একটা জিনিস যেটা বিদ্যুৎ পরিবহনে আদৌ বাধা দেয় না। ফলে সুপার কন্ডাক্টরের ভিতরে অল্প ভোল্টেজেই প্রায় অসীম কারেন্ট পাঠানো সম্ভব।

     ধরে নেয়া যাক অস্কার সাহেব সাধারণ তাপমাত্রায় সুপার কন্ডাক্টর আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তারপর তাঁর বাবার অসমাপ্ত এক্সপেরিমেন্টের কথা তাঁর মনে হয়। এই সুপার কন্ডাক্টরের সাহায্যে সেই আলো বাঁকানোর এক্সপেরিমেন্টটা অনেক সহজে করা যাবে। যে ম্যাগনেটিক ফিল্ড ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের সময় তৈরি করতে দানবিক মোটা কয়েল আর জেনারেটর লেগেছিল, তা এখন কয়েক গাছা সরু সুপার কন্ডাক্টরের তার আর একটা নয় ভোল্টের ব্যাটারিতেই তৈরি করা সম্ভব। ওই সরু সুপার কন্ডাক্টরের কয়েল বাক্সের মোটা দেয়ালের মধ্যেই নিশ্চয় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

     বাকি রইল আইনস্টাইনের দশটা ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন। সেগুলি যদি কারও জানা থেকে থাকে, আজকের এই সুপার কম্পিউটার, প্যারালাল কম্পিউটারের যুগে তার সলিউশন করাও হয়তো অসম্ভব নয়। তাহলে কি অস্কার সাহেব ওই বাক্সের মধ্যে একটা মিনি, কিন্তু সফল ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট করার ব্যবস্থা করেছিলেন? যাতে ওই বাক্সের মধ্যে যা থাকবে সেটাই কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাবে?

     কি কাণ্ড! আর সেই বাক্স রয়েছে কিনা এক থার্ডক্লাস ম্যাজিশিয়ান মিস ভানুমতীর কাছে? ওহে শুভজিৎ! এই বাক্স যদি তুমি পাও তাহলে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে পুরো তত্ত্ব বার করে নিতে কতক্ষণ? একাধারে সাধারণ তাপমাত্রার সুপার কন্ডাক্টর আর আইনস্টাইনের ইউনিফায়েড ফিল্ড থিয়োরির প্রমাণ! এ যদি সম্ভব হয় তারপর নোবেল প্রাইজই তো তোমার পিছনে ছুটবে হে!

     শুভজিতের গরম মাথা আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে এল। যেভাবেই হোক দেবযানীর কাছ থেকে বাক্সটা হাতাতেই হবে। কিন্তু দেবযানী যেন সন্দেহ করতে না পারে। কালকে? না কালকে নয়, দিনদুয়েক পরে দেবযানীর সঙ্গে ওর বাড়িতে গিয়ে বাক্সটা নেড়ে ঘেঁটে দেখা দরকার।

(৬)

কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকার পর আজ শুভজিৎ সায়েন্স কলেজে এসেছে। প্রথমেই বিমানদা না আসার জন্য কথা শোনাল। তারপর বলল স্যারের নাকি শুভজিতের সঙ্গে কী সব জরুরি কথা আছে। শুভজিৎ একটু অবাকই হল। কারণ স্যার কিছু বলতে হলে সাধারণত বিমানদাকে দিয়েই বলান।

     কম্পিউটারে বসে প্রোগ্রাম লিখতে লিখতে শুভজিৎ বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে খালি ওই বাক্সটার চেহারা ভেসে আসছিল। মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে দেবযানীর কাছে গিয়ে বাক্সটা নাড়াচাড়া করে দেখি। কিন্তু দেবযানীর মনে একেবারেই সন্দেহ জাগানো চলবে না যে শুভজিতের আসল আগ্রহের বিষয় দেবযানী নয়, তার বাক্স। তাই একদিন অপেক্ষা করে দেখা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

     ইতিমধ্যে স্যার এসে পড়লেন। শুভজিৎ এস-সি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে স্যারের ঘরে ঢুকল। স্যার বেশ আগ্রহ নিয়ে শুভজিতকে অভ্যর্থনা করলেন। শুভজিতের কাজের প্রশংসা করলেন। শুভজিতকে নাগপুর কনফারেন্সে কেন পাঠালেন না সেটাও বললেন। ওটা নাকি নেহাতই সাধারণ কনফারেন্স। ওখানে গেলে শুভজিতের সময় নষ্ট হত। বরং সামনের বছর উদয়পুরে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স হবে, সেইখানে শুভজিতকে ফার্স্ট অথর করে একটা পেপার দেবার কথা স্যার ভাবছেন ইত্যাদি নানা ভালো ভালো কথা। স্যারের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে হাসি হাসি মুখে শুভজিৎ হুঁ হুঁ করতে লাগল।

     কিছুক্ষণ পর থলি থেকে বেড়াল বার হল। এস-সি স্যার আর বিমানদা মিলে ন্যানো সাইন্সের একটি পেপার জার্নাল অব থিয়োরেটিকাল ন্যানো সাইন্সে জমা দিয়েছিলেন। সেটি রেফারি নানা রকম আপত্তি করে বাতিল করে দিয়েছে। এখন শুভজিতের কাজ হবে এই রেফারির মন্তব্যগুলো পড়ে পেপারে কী কী পরিবর্তন করতে হবে অবিলম্বে সেটার ব্যবস্থা করা। ওর প্রোগ্রামিং এর কাজ কদিন বন্ধ রাখলেই হবে।

     শুভজিৎ একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলল। স্যার শুভজিতকে শোষণ করার একদম শেষ সীমায় চলে গেছেন। শুভজিৎ এর প্রোগ্রামগুলি একটা থিয়োরেটিকাল প্রোজেক্ট প্রপোজালের অংশ। এই প্রজেক্ট প্রপোজালটা মে মাসের মধ্যে ডিএসটিকে পাঠাতেই হবে। না হলে প্রোজেক্ট আশার কোনও সম্ভাবনাই নেই। অথচ এই প্রোজেক্ট আসার ভরসায় গত দেড় বছর ধরে একটি পয়সা না-পেয়েও শুভজিৎ কাজ করে চলেছে, কারণ প্রোজেক্ট এলে ও তাতে জেআরএফ হয়ে ঢুকবে। আর এখন স্যার বলছেন সেই প্রজেক্ট আনার কাজ ছেড়ে বিমানদার পেপার কারেকশন করে দিতে, কেন না আসলে স্যার বা বিমানদার সেই ক্ষমতা বা যোগ্যতাই নেই। অথচ এই পেপারেও শুভজিতের নাম থাকবে না! স্যার ওকে পেয়েছেন কী? ভারবাহী গাধা? গাধাটাকেও তো দিনের শেষে খেতে দিতে হয়? এখানে শুভজিৎ তো একেবারেই বেগার খাটছে। অবশ্য গাধার থেকে শুভজিৎ যদি ভালো কিছু হত তাহলে কী আর এস-সি র কাছে কাজ করত?

     স্যারের কথা শুনে যতটা সম্ভব হ্যাঁ হ্যাঁ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শুভজিৎ। এখানে থেকে আর কোনও লাভ নেই। সমস্ত অন্তঃকরণ তেতো হয়ে গেছে তার। পড়াশোনা করাটা একেবারেই মূল্যহীন মনে হচ্ছে। ধুত্তেরি! এ সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে যাবে শুভজিৎ। সহসা আবার বাক্সটার কথা মনে পড়ে ওর। হ্যাঁ এসব ছেড়ে ওই বাক্সটা নিয়েই পড়ে থাকবে ও। বাক্সটা যে কোনও মূল্যে দখল করতেই হবে।

     হাঁটতে হাঁটতে অন্যমনে ক্যান্টিনের পাশে চলে এসেছিল শুভজিৎ হঠাৎ দেখল নেত্রবতী তার কোনও বান্ধবীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। শুভজিৎ ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু নেত্রবতী যেন ওকে দেখেও দেখল না।

     শুভজিৎ বলল, “কী রে একদম দেখতেই পাচ্ছিস না মনে হচ্ছে?”

     অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় নেত্রবতী বলল, “দেখতে পাব না কেন? কোনও দরকার আছে?”

     শুভজিৎ বুঝতেই পারল কী ঘটেছে। এটা সেই দিনের অবহেলার এফেক্ট। কিন্তু বলার তো কিছু নেই। নেত্রবতীর আচরণ একেবারেই যথাযথ।

     শুভজিৎ বলল, “তোর ইএম থিয়োরি বোঝার কথা ছিল না? একদিন চল বসি কোথাও!”

     নীরস গলায় নেত্রবতী বলল, “আমি নিজেই পড়ছি। বেশ বোঝা যাচ্ছে”।

     শুভজিৎ গলাটা সিরিয়াস করে বলল, “তোর সঙ্গে একটা খুব দরকারি কথা ছিল।”

     “বল।”

     “এখানে বলা যাবে না, একটু অন্য জায়গায় চল।”

     নিরুত্তাপ গলায় নেত্রবতী বলল, “আমার এখন সময় হবে না। আমি ক্লাসে যাচ্ছি। এখানে, এখনই, যদি বলতে পারো বল। না হলে আমার কোনও প্রয়োজন নেই”।

     শুভজিৎ মরিয়া হয়ে বলে ফেলল “তুই সেদিনের ব্যাপারটায় রাগ করেছিস, বুঝতে পেরেছি। কিন্তু দেখ…”

     বাধা দিয়ে নেত্রবতী বলল, “রাগ করার কোনও কারণ তো নেই। তুমি কী করো না করো সেটা সম্পূর্ণই তোমার ব্যাপার। আমি কেন রাগ করতে যাবো?”

     শুভজিৎ কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু নেত্রবতী আবার বাধা দিয়ে বলল “এই নিয়ে অকারণ কথাবার্তা বলার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আমি আসি, কেমন? টা টা”। নেত্রবতী কোনওদিকে না তাকিয়েই সোজা চলে গেল।

     চোখ জ্বালা করে উঠল শুভজিতের। মাটিতে একটা জোরদার লাথি মারার ইচ্ছা প্রবল ভাবে দমন করে সে। নেত্রবতী বুঝিয়ে বলার একটা সুযোগও দিল না। কিন্তু নেত্রবতী যা করেছে তাতে তাকে একেবারেই দোষ দেওয়া যায় না।

     শুভজিৎ নিজের কপালের কথা ভাবে। কপালটা একেবারে সোনা দিয়ে বাঁধান। দেবযানী এবং নেত্রবতী কারুর অস্তিত্বই অন্য কারও জানার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু কি অদ্ভুতভাবে দুটো জড়িয়ে গেল।

     এককাপ চা নিয়ে ক্যান্টিনের সামনে সিমেন্ট বাঁধান সিটে বসে ভাবতে থাকে শুভজিৎ। জন্ম থেকেই এই কপাল তার সঙ্গে শত্রুতা করে আসছে। সবার বাবা-মা কত সহানুভূতিশীল, বন্ধুরা তাদের বাবা-মায়ের কত ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছে। অথচ শুভজিৎ? বাবাকে তো ছুটির দিন ছাড়া দেখাই যেত না। ছুটির দিন বাড়ি থাকলেও, হয় কোনও পার্টি এসে ঘুষের পরিমাণ নিয়ে দরাদরি করত, না হলে তুমুল চিৎকার করে বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলা হত। বাবার কাছে অকারণে বকাবকি ছাড়া শুভজিৎ বিশেষ কিছু কোনওদিন শোনেনি।

     আর মা? উফ! কি ঘ্যানঘ্যান করতে পারেন ওই মহিলা! বকাবকি বিশেষ করত না ঠিকই, কিন্তু খালি উপদেশ আর উপদেশ! এই করা উচিত, ওই করা উচিত নয়। অমুকের ছেলে এই করে, তোরও করা উচিত! তমুকের ছেলে তাই করে না- দেখ কেমন লক্ষ্মী ছেলে, আর তুই? ব্যাগর ব্যাগর, সারা দিন! মায়ের এই উচিতের ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়ে মায়ের স্কুলের সহকর্মী মানসী মাসি মায়ের নাম দিয়েছিলেন ‘ঔচিত্যার্থে বিধিলিং’। একদিনও যে মা একটু আদর করে কোনও কথা বলেছে, শুভজিতের মনে পড়ে না।

     পড়াশোনার ব্যাপারটাও অদ্ভুত। শুভজিতের থেকে ফিজিক্স ভালো বোঝে এরকম ক-টা ছেলে কলকাতায় আছে? সম্ভবত একটাও না। অথচ কোথাও একটা রিসার্চ ফেলোশিপ জুটল কী? বরং এস-সির মতো একটা অপদার্থ স্বার্থপর বদমায়েশ গাইড কপালে জুটল। এই মুহূর্তে শুভজিতের ভবিষ্যৎ যে ঘন অন্ধকারে ঘিরে আছে তার দায় কার?

     ক্রমে ক্রমে শুভজিতের মন অন্ধকারে ভরে উঠতে থাকে। আমার সঙ্গে যদি অন্যায় হয় তাহলে পৃথিবীর সঙ্গে ন্যায্য ব্যবহার করার কোনও দরকার আছে কী? আমার করা পেপার নিয়ে যদি বিমানদা আর স্যার নাগপুর কনফারেন্সে যেতে পারেন, তাহলে আমি লাভেনবার্গের গবেষণা আত্মসাৎ করলেই বা দোষ হবে কেন?

     শুভজিৎ চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়াল। আগামী কাল দেবযানীর সঙ্গে দেখা করতে হবে। যে করেই হোক ওর কাছ থেকে ওই বাক্সটা নিয়ে দেখতে হবে ওটা ঠিক কী কাজ করে।

(৭)

শুভজিৎ সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে বসে আছে। তার যুক্তিবুদ্ধি প্রায় সবই গুলিয়ে গেছে। এ কী করে সম্ভব? বাক্সটাকে ও যা ভেবেছিল বাক্সটা তার থেকে অনেক জটিল একটা ব্যাপার।

     আজ বিকালে ও দেবযানীর বাসায় এসে উপস্থিত হয়েছে। কিছুটা আশ-কথা, পাশ-কথার পর দেবযানীকে ও বাক্সটা দেখাতে অনুরোধ করায় কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেবযানী ওটা নিয়ে এসেছে। শুভজিৎ দেবযানীকে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা তোমার ছক্কাটা ভ্যানিশ করে যাবার পর বাক্সটা খুলে যখন তুমি দেখাও তখন কি ওটা অদৃশ্য হয়ে থাকে না সত্যিই ভ্যানিশ করে যায়?”

     “এটা আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু তাতে কি যায় আসে?”

     “সেটাই তো আসল। আচ্ছা আমি অনেকগুলো নয় ভোল্টের ব্যাটারি এনেছি। একবার ম্যাজিকটা দেখাও”।

     দেবযানী যথারীতি বাক্স খুলে ছক্কাটা ভিতরে রেখে বাক্স বন্ধ করল। তারপর ডায়ালটার কেন্দ্রে একটা খুব ছোট্ট পুশ-বাটন আছে, সেটা টিপে দিল। কয়েক সেকেন্ড পরে বাক্স খুলে দেখাল ছক্কাটা সেখানে নেই। দেবযানী কিছু বলার আগেই শুভজিৎ বাক্সের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল। নিশ্চয়ই ছক্কাটা ওখানেই আছে, কিন্তু অদৃশ্য হয়ে আছে।

     শুভজিৎ একটা বিরাট চমক খেল। না, ছক্কাটা বাক্সের মধ্যে নেই। কিন্তু ইতিমধ্যেই দেবযানী চিল চিৎকার করে উঠেছে। এক ঝটকায় শুভজিতের হাত বাক্স থেকে বার করে নিয়ে দেবযানী দ্রুত বাক্স বন্ধ করে দিল। বলল, “তুমি ভয়ানক জ্বালাতন শুরু করে দিয়েছ তো! তোমায় বার বার বলছি বাক্সটা অত্যন্ত বিপদজনক। স্যার এর মধ্যে হা্ত ঢোকাতে কঠিনভাবে বারণ করে দিয়েছিলেন”। শুভজিৎ মুখে সরি বলল ঠিকই, কিন্তু মনে মনে সে দেবযানীর মোড়লিতে বেশ অসন্তুষ্ট বোধ করছিল। মিনিট তিনেক পর বাক্স খুলে দেখল ছক্কাটা আবার ফিরে এসেছে।

     শুভজিৎ বলল, “আমরা আর একটা জিনিস কি দেখতে পারি? বাক্সটা যদি বন্ধ না করা হয় তাহলে তো ছক্কাটা কীভাবে ফিরে আসে সেটা দেখা যায়?”

     দেবযানী খুব দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেল। এ ব্যাপারে স্যারের কোনও নিষেধ ছিল না। কিন্তু ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল যে ব্যাপারটা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু শুভজিতের আগ্রহের বাড়াবাড়ি দেখে ও না করল না।

     পুরো পদ্ধতিটা আবার রিপিট করা হল। কিন্তু এবারে বাক্স খোলার পর আর বন্ধ করা হল না। দু-জোড়া চোখ খুবই অবিশ্বাসের সঙ্গে দেখল আড়াই মিনিটের মাথায় হঠাৎ শূন্য থেকে ফাঁকা বাক্সের মধ্যে ছক্কাটি আবির্ভূত হল।

     দেবযানী খানিকটা ভয় পাওয়া গলায় বলল, “এটা আবার কী রকম ভুতুড়ে বাক্স রে বাবা!” ছক্কাটা বার করে বাক্সটা বন্ধ করে দেবযানী বলল, “আমি এবারে বাক্স রেখে দিচ্ছি”।

     শুভজিৎ হামলে পড়ল। “প্লিজ, প্লিজ, জাস্ট আর একটা এক্সপেরিমেন্ট। একবার মাত্র”।

     দেবযানী বাক্স ছাড়ল না। বলল, “তুমি ঠিক কী করতে চাও বলত? আমি তোমার হাতে বাক্স দেব না। যা করতে চাও বল। ঠিক মনে করলে সেটা আমিই করব। কিন্তু জাস্ট আর একবারই”।

     মনে মনে দেবযানীর মুণ্ডপাত করতে করতে শুভজিৎ বলল, “ঠিক আছে। এবারে ছক্কাটাকে বাক্সে পুরে, বাক্স বন্ধ করে, বাটনটা টিপে তারপর বাক্সটাকে সরিয়ে খাটের উপর রাখো”।

     দেবযানী বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, “এতে করে কি হবে?”

     “আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। সেটা মিটিয়ে নেব”।

     দেবযানী আবার সমস্ত পদ্ধতিটা নতুন করে সেরে বাক্সটা তুলে খাটের উপর নিয়ে এলো। ঠিক আড়াই মিনিটের মাথায় শুভজিৎ চিৎকার করে উঠল –“কী সর্বনাশ!!” দেবযানী বাক্সর দিকে তাকিয়ে ছিল। শুভজিতের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল ছক্কাটা টেবিলের উপর আবির্ভূত হয়েছে। বাক্সটা সরানোর আগে ছক্কাটা যেখানে ছিল, সেটা এখন ঠিক সেখানেই এসে উপস্থিত হয়েছে। অর্থাৎ ছক্কাটা নিজে নিজেই বাক্সর বাইরে বেরিয়ে এসেছে!!

     শুভজিৎ গুম হয়ে বসে রইল। সে নিজের চোখে যা দেখেছে সেটাকে বিশ্বাস করতে তার খুবই অসুবিধা হচ্ছে। দেবযানীই আগে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলল, “দারুণ ব্যাপার তো! এ তো একটা নতুন ম্যাজিক তৈরি হয়ে গেল দেখছি। এটা দেখালে আমার শো জমে দই হয়ে যাবে তো?”

     শুভজিৎ তার বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যেও মনে মনে হাসল, “ওরে অশিক্ষিত মেয়ে। নতুন ম্যাজিকের তালে আছিস? আমি ওদিকে দুনিয়া পালটে দেবার কথা ভাবছি। কি জিনিস যে তোর হাতে আছে তা তো জানিস না!”

     শুভজিৎ কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর বলল, “আচ্ছা ওই ডায়ালটা ঘোরালে কী হয়?”

     দেবযানী বাক্সটাকে সরিয়ে নিয়ে আবার টেবিলের উপর রেখে বলল, “জানি না। স্যার ডায়ালটা ঘোরাতেও বারণ করেছিলেন”।

     “আরে ধুত্তেরি তোমার স্যারের বারণ। একটা ডায়াল যখন আছে তখন সেটা নিশ্চয়ই ব্যবহার করা যায়। একটু ভালো করে ওটা দেখি”।

     দেখা গেল ডায়ালটা ২, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০, ১০০০, ২০০০ এই দশটা ভাগে ভাগ করা আছে। এই মুহূর্তে ডায়ালের কাঁটাটা দুই থেকে পাঁচের মধ্যে কোথাও আছে। কিন্তু ডায়ালের কাঁটা নাড়ানোর আগেই দেবযানী বাক্সটা ছিনিয়ে নিল।

     শুভজিৎ ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে! বাচ্চাদের মতো করছ কেন? আমি কি তোমার বাক্সটা খেয়ে ফেলব?”

     “বাক্সটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, পারে না?”

     “আমি কি এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে কিছু জানি না ভেবেছ? এই বাক্সটার মধ্যে কত বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা আছে ভাবতে পার? ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে গেলে এটার সব ক-টা ফিচার খতিয়ে দেখতে হবে না?”

     দেবযানী বাক্সটাকে সরিয়ে নিতে নিতে বলল, “একদম হবে না”।

     “মানে?”

     “মানে বাক্সটাকে নিয়ে তুমি আর কোনও রকম কেরামতি করবে না, ভবিষ্যতে এটা আমি আর তোমার ত্রিসীমানায় আনব না”।

     “সে কি কথা! আরে এই বাক্সটার বৈজ্ঞানিক তথ্য সারা পৃথিবীতে কীরকম সাড়া ফেলবে বল তো?”

     “আমি এখন তোমার মতলবটা বুঝতে পারছি। তুমি এই বাক্সটার মূল্যে নাম করতে চাও। কিন্তু আমি সেটা হতে দেব না। এই বাক্সটার রহস্য যাই থাক না কেন সেটা গোপন থাকবে। এই বাক্সটা আমার। এটা দিয়ে আমি যেমন ম্যাজিক দেখাই তেমনই দেখাব”।

     শুভজিৎ ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে বলল, “তুমি চাও না আমি বৈজ্ঞানিক হয়ে নাম করি?”

     “তুমি নাম করলে আমার কী?”

     “তুমি আমায় ভালোবাসো না?”

     দেবযানী হাসল। বলল, “ওসব কথা আর না-ই বা বললে। তুমি যে এই বাক্সটার জন্য ভালোবাসার নাটক করছ, সে আমি বুঝে গেছি”।

     শুভজিতের মাথা গরম হয়ে উঠতে লাগল। বলল, “তুমি আমার সম্বন্ধে বাজে কথা বলছ। আমি ওরকম ছেলে…”

     বাধা দিয়ে দেবযানী বলে, “তুমি যেরকম ছেলেই হও না কেন, এই বাক্সটা আমি তোমাকে আর দেব না। বাক্স ছাড়া শুধু দেবযানীর সঙ্গে প্রেম করতে চাইলে ভেবে দেখব”।

     এতক্ষণে শুভজিতের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। এত বড় একটা বৈজ্ঞানিক ঘটনা স্রেফ এই অশিক্ষিত মেয়েটার জন্য চাপা থাকবে? আর এত বড় একটা সুযোগ শুধু এই মেয়েটার খামখেয়ালিপনার জন্য নষ্ট হয়ে যাবে? দুনিয়ায় কেউ শুভজিতের জন্য এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়েনই, যে পারে সুবিধা নিয়েছে। আজ শুভজিৎ এত বড় একটা চান্স ছেড়ে দেবে? নেভার।

     শুভজিৎ বলল, “তুমি বোকার মতন গোঁয়ার্তুমি করছ। ভেবে দেখ বাক্সটা তোমার হলেও এটা তো তুমি আবিষ্কার করনি? কাজেই এই আবিষ্কারটা চেপে রাখার কোনও রাইট তোমার নেই। এটা তুমি করতে পারো না।”

     “পারি কি না, আমিই বুঝবো। তুমি বাক্স থেকে দূরে থাকো।”

     “গোটা সমাজকে তুমি এমন একটা আবিষ্কার থেকে বঞ্চিত করবে?”

     দেবযানীর মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে উঠল। বলল, “শুভজিৎ, মাইরি বলছি তুমি পলিটিক্সে ঢুকে পড়, অনেক উন্নতি করবে।”

     কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেবযানীর মুখের হাসিটা মুছে গেল, ফুটে উঠল অপার তিক্ততা। বলল, “সমাজকে বঞ্চিত করা-টরা অনেক বড় কথা। ছোটবেলা থেকে আমার জন্য কে কী করেছে? অল্প বয়সে বাবা মারা যাবার জন্য আমার পড়াশোনা হয়নি, সমাজ আমায় দেখেছে? মা মারা যাবার পর যে দেড় বছর আমি নরকে কাটিয়েছি, সমাজ আমায় আরও গাড্ডায় ফেলা ছাড়া কী করেছে? এখন আমি এই বাক্সটা দিয়ে ম্যাজিক দেখিয়ে খাচ্ছি। এখন তুমি এসেছ বিজ্ঞান, সমাজ এইসব বড় বড় কথা বলে এটা কেড়ে নিতে! কেন দেব আমি? বিনিময়ে আমি কী পাব? কাজেই এসব বড় বড় কথা বল না। যদি কেড়ে নেবার হিম্মত থাকে চেষ্টা করে দেখতে পারো। আর অন্য ভাবে, মিডিয়া ইত্যাদির চাপ সৃষ্টি করে দখল করার চেষ্টা করলে আমি জাস্ট এটা গঙ্গায় ফেলে দেব। কেউই পাবে না।”

     দেবযানী কথা শেষ করে হাঁপাতে থাকল। শুভজিৎ কিছু বলার চেষ্টা করছিল কিন্তু দেবযানী দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “বেরিয়ে যাও। আমি চেঁচামেচি করে লোক ডাকার আগে, বিদায় হও। আর এদিকে যেন না দেখি। দেখলে কপালে দুঃখ আছে। যাও।”

     মার খাওয়া কুকুরের মতো দেবযানীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল শুভজিৎ। সে এখন প্রকৃত অর্থেই সর্বহারা।

(৮)

অভাবনীয়! অচিন্তনীয়!! অভূতপূর্ব!!!

     এই সমস্ত বিশেষণ দিয়েও শুভজিৎ তার কপালের পরিবর্তনকে প্রকাশ করতে পারছে না। বাক্সটা এখন শুভজিতের কবজায়!

     গত শুক্রবার, দেবযানীর বাড়ি থেকে ফিরে, রাত্রে কিছু না খেয়ে সোজা বিছানা আশ্রয় করে শুয়ে পড়েছিল শুভজিৎ। আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। স্যারের ওখানে রিসার্চ, ম্যাজিকের বাক্স, নেত্রবতী, সব হাতছাড়া হয়ে গেল। এইবার সুবিধা মতো আত্মহত্যাটা করে নিলেই সমস্ত জ্বালা জুড়োয়।

     কতক্ষণ শুয়ে ছিল শুভজিৎ তার মনে নেই। ঘুমের মতন এসে গিয়েছিল। এমন সময় ঘরের আলো জ্বলে ওঠে। শোনা যায় দাদার গলা। “বাবু, এই বাবু,! সন্ধের সময় শুয়ে আছিস কেন? মন খারাপ? কী হয়েছে রে?”

     প্রথমে উত্তর দেয় না শুভজিৎ। কিন্তু দাদা দেবজিৎ ছোড়নে ওয়ালা নয়। কিছুক্ষণ দাদাকে মুখঝামটা দেয় শুভজিৎ। কিন্তু দাদা ছিনেজোঁকের মতো নিজের পয়েন্টে লেগে আছে। “তোর কি হয়েছে বল। বল না। বলেই দেখ, আমি কিছু করতে পারি কি না। না পারলে পারব না, তাতে তোর আর কী লস। বল না, লক্ষ্মী ভাই আমার!”

     অবশেষে শুভজিৎ বলে, “তোকে সব বুঝিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু ওই ম্যাজিশিয়ান মেয়েটার বাক্সটা আমার চাই। ও কিছুতেই দিতে রাজি হল না। কিন্তু ওটা পেলে আমার সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এমন কি আমি একটা বিরাট বড় সায়েন্টিস্ট বলেও নাম করে ফেলতে পারি।”

     সব শুনে দেবজিৎ বলল, “তুই চিন্তা করিস না। আমি দেখছি।”

     আর আজ সকাল বেলায় শুভজিৎ ঘুম থেকে ওঠার আগে ওর ঘরের দরজা নক করে ওকে তুলে দাদা বাক্সটা ওকে দিয়ে গেছে!! ‘কি করে পেলি’ এই প্রশ্নের জবাবে বলেছে, “তোর কোনও চিন্তা নেই।”

     দাদাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত হবার সময় ছিল না শুভজিতের। ও বাক্সটা নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করল।

     প্রথম এক্সপেরিমেন্ট ডায়ালের কাঁটাটা ঘুরিয়ে পাঁচ করা। তারপর বাক্সর মধ্যে একটা বই রেখে ব্যাটারি লাগিয়ে পুশ বাটনটা টিপে দেয়া। তারপর বাক্সটা বেশ খানিকটা সরিয়ে রাখা।

     দেখা গেল, বইটা ঠিক যেখানে বাক্স ছিল সেখানেই আবির্ভূত হল। তবে পাঁচ মিনিট পর।

     শুভজিৎ আবার চিন্তা করতে শুরু করল। এই বাক্সটা আসলে কি? এটা একটা বস্তুকে ভ্যানিশ করে দিচ্ছে। কতক্ষণের জন্য? না ডায়ালের কাঁটা যত মিনিটে থাকবে তত মিনিটের জন্য। ভ্যানিশ করার পর এটা কোথায় ফিরে আসছে? না ঠিক যেখানে ছিল সেইখানে। বাক্সটা কোথায় সরানো হল তার উপরে কিছু নির্ভর করছে না। তাহলে এই যন্ত্রটা কী যন্ত্র। টাইম মেশিন নাকি? বাক্সটার ভিতরের বস্তুটাকে ডায়ালের হিসাব মতো ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে? 

     যতই অসম্ভব মনে হোক টাইম মেশিনের কিন্তু কিছু বৈজ্ঞানিক থিয়োরি আছে। শুভজিৎ একটা বইতে এর ডিটেল পড়ে ছিল। অতীতে যাওয়া ততটা সম্ভব নয়। কারণ তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে জগতের বিশৃঙ্খলা পরিমাণ সময়ের সঙ্গে বাড়ে। মানে ধরা যাক গরম জল আর ঠান্ডা জল আলাদা করা আছে। মিশিয়ে দেওয়া খুব সহজ। নিজে নিজেই মিশে যেতে পারে। একে বলা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়া। কিন্তু নিজে নিজে জলের মিশ্রণ থেকে গরম জল আর ঠান্ডা জল আলাদা হতে পারবে না। এখন সময়কে উল্টোদিকে ঘোরানো মানে এই বিশৃঙ্খলা কমিয়ে দেওয়া। তা সম্ভব নয়। অন্তত তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী সম্ভব নয়।

     এ ছাড়া অন্য যুক্তিও আছে। অতীতে গিয়ে কেউ যদি কোনও ঘটনাকে পালটে দেয়। তার ফলে হঠাৎ বর্তমান পালটে যাবে। ধরা যাক কেউ অতীতে গিয়ে শুভজিতের বাবা আর মায়ের বিয়েটা বন্ধ করে দেয়। তাহলে বর্তমানের অবস্থা কী দাঁড়াবে? হঠাৎ শুভজিৎ আর দেবজিৎ থাকবে না? আবার বাবা-মা-র অন্য বিয়ে হয়ে থাকলে সেই সব সন্তানরা কি হঠাৎ আকাশ থেকে আমদানি হবে? কোনটাই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। আজকাল যদিও লোকে প্যারালাল ইউনিভার্স ইত্যাদি থিয়োরির কথা বলছে, কিন্তু সেগুলো বিজ্ঞানের থেকে কল্পবিজ্ঞানের আওতাতেই বেশি পড়ে।

     কিন্তু ভবিষ্যৎ? ভবিষ্যতে যাবার ব্যাপারে কিন্তু বিজ্ঞানের ততটা আপত্তি নেই। ওয়ার্ম হোল তত্ত্ব অনুসারে স্পেস টাইমের জালে যদি দুই জায়গায় ফুটো থাকে আর সে দুটো কোনওভাবে জোড়া থাকে তাহলে এই ফুটো গলে মুহূর্তের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়। আবার একইভাবে এক সময় থেকে অন্য সময়ে যাওয়া যায়। কিন্তু যেহেতু স্বাভাবিকভাবে সময় একমুখী, তাই এভাবে খালি ভবিষ্যতেই যাওয়া চলে। অতীতে নয়।

     আসলে আমরা তো স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতের দিকেই চলছি। এই ওয়ার্ম হোল শুধু তার রেটটা বাড়িয়ে দেয়।

     এত কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত কেউ ওয়ার্ম হোল দেখেনি। সবটাই অঙ্কের খাতায় রয়েছে।

     এই লাভেনবার্গ সাহেব তাহলে বাক্সের মধ্যে স্পেস-টাইম বাঁকিয়ে একটি সোজা ওয়ার্ম-হোলের সৃষ্টি করেছেন যা স্পেস এক জায়গায় রেখে শুধু টাইম অ্যাক্সিসটা পালটে দিচ্ছে! কতটা পালটানো হবে তা-ও ডায়াল ঘুরিয়ে ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে। ম্যাক্সিমাম ২০০০ মিনিট মানে তেত্রিশ ঘণ্টা কুড়ি মিনিট ভবিষ্যতে যাওয়া চলবে।

     বাক্সে কোনও জিনিস রেখে ডায়াল ঘুরিয়ে পুশবাটন টিপে দিলে জিনিসটা ডায়ালের হিসাবমতো ভবিষ্যতে চলে যাবে। এবারে যখন সেই ভবিষ্যৎ সময় এসে পড়বে তৎক্ষণাৎ সেই জিনিসটি সেখানে দেখা যাবে।

     সমস্ত ব্যাপারটা বোঝার পর শুভজিৎ খানিকটা ব্যোম মেরে রইল। বাক্সটা হাতে পাওয়া গেছে। কিন্তু এবারে সে কী করবে? বাক্সটা খুলে ফেলবে? কিন্তু বাক্সটার গায়ে কোনও স্ক্রু নেই। বাইরেও না, ভিতরেও না। শুধু বাক্সর তলার দিকে ওয়েল্ডিং এর দাগ আছে। মানে পুরো বাক্সটাই ছাঁচে ঢালাই করে বানানো হয়েছে। শুধু তলার দিকটা খোলা ছিল। ওইখান দিয়ে কয়েল সার্কিট ইত্যাদি ঢুকিয়ে তারপর বাক্সটা একেবারে সিল করে দেওয়া হয়েছে। বাক্সর ভিতরে কী আছে জানতে গেলে তলার অংশটা গ্যাস-কাটার দিয়ে কেটে বার করতে হবে। কাটার পর ভিতরের সার্কিট দেখে কিছু বুঝতে পারবে শুভজিৎ? তা ছাড়া সুপার কন্ডাক্টরের তারগুলো খালি চোখে দেখে সেগুলো কী করে বানানো হয়েছে তাই বা কী করে জানবে সে? সবচেয়ে ভয়ানক কথা হল যদি খুলে আর জোড়া না দেয়া যায়, বা জোড়া দিলেও জিনিসটা খারাপ হয়ে যায়? না, এরকম কিছুই করা সম্ভব নয়।

     শুভজিৎ পরিষ্কার বুঝতে পারল বাক্সটা হাতে পাবার পর তার অবস্থাও দেবযানীর থেকে ভালো কিছু দাঁড়াল না। বরং দেবযানী এটা বলতে পারত সে বাক্সটা কোথা থেকে পেয়েছে। কিন্তু শুভজিৎ এটাও বলতে পারবে না যে সে বাক্সটা কোথা থেকে পেয়েছে। আচ্ছা দাদা বাক্সটা কোথা থেকে হাতাল? দেবযানী যদি পুলিশে খবর দিয়ে শুভজিতের নাম বলে দেয়? কি সর্বনাশ!

     দাদার খোঁজে ঘর থেকে বেরোয় শুভজিৎ। কিন্তু কোথায় দাদা! সে আর দিনের বেলায় কবে বাড়ি থাকে? দুশ্চিন্তায় মাথার চুল খাড়া হয়ে যায় শুভজিতের। স্নান খাওয়া সেরে পাড়ায় বেরিয়ে সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করে সে। কিন্তু দাদা যেন ভ্যানিশ করে গেছে।

     কিন্তু খুব বেশিক্ষণ দুশ্চিন্তা করতে হয় না শুভজিতকে। বড় রাস্তার টেলিভিশনের দোকানটার ভিতরে ডিসপ্লে করা টেলিভিশনগুলোর একটায় দেবযানীর ছবি দেখে পিলে চমকে ওঠে শুভজিতের। তাড়াতাড়ি ভিতরে গিয়ে দেখে নিউজ চ্যানেলে খবর হচ্ছে। ম্যাজিশিয়ানের রহস্যময় হত্যাকাণ্ড! গতকাল রাত্রে কে বা কারা এই ম্যাজিশিয়ান মিস ভানুমতীর ঘরে ঢুকে, তাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। সারা ঘরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছড়ানো। ঘরের জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড। হত্যার উদ্দেশ্য খুব সম্ভব ডাকাতি। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে।

     শুভজিৎ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইল। তাই দাদা বলছিল ‘তোর চিন্তার কিছু নেই’। কেউ অভিযোগ জানাতে আসবে না!

     কিন্তু দাদা শুভজিতের জন্য একটা খুন করে ফেলল? খুন?

(৯)

সারা রাত ধরে অনেক ভেবেছে শুভজিৎ। কোনওভাবেই কোনও কূলকিনারা করতে পারেনি সে। বাক্সটা ভেঙে ফেলে তার থেকে কোনও বৈজ্ঞানিক তথ্য বার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আবার বাক্সটা সবাইকে দেখানোও সম্ভব নয়। অন্তত দেবযানীর হত্যা তদন্ত যতদিন না চাপা পড়ছে। তাহলে এত কাণ্ড করে বাক্সটা হাতে এনে তার লাভ কী হল? এক যদি না বাক্সটা অন্য কোনও কাজে লাগানো যায়। হঠাৎ ওর মাথায় একটা মতলব এল।

     পরদিন গম্ভীর মুখে সায়েন্স কলেজে গেল শুভজিৎ। কম্পিউটারে বসে কিছুক্ষণ হাবিজাবি করল। স্যার এসে পৌঁছানোর পর একটু সাহসে ভর করেই স্যারের কাছে গেল সে। বলল, “আপনার সঙ্গে একটু কনফিডেনসিয়াল কথা আছে স্যার।”

     “কনফিডেনসিয়াল কথা আবার কী? যা বলার বলে ফেল।”

     “কথাগুলি আপনারই স্বার্থে বলা স্যার। অন্য কারও কানে গেলে আপনারই বেশি অসুবিধা হবে।”

     সব্যসাচী একবার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। এই শান্ত পোষমানা ছেলেটাকে আজ একেবারেই অন্যরকম লাগছে। আস্তে উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে বললেন, “বল।”

     “দেখুন স্যার, আমার পক্ষে দিনের পর দিন ফেলোশিপ ছাড়া কাজ করা সম্ভব নয়।”

     সব্যসাচী কিছু বলতে গিয়েছিলেন কিন্তু শুভজিৎ তাঁকে বাধা দিয়ে বলল, “আগে আমি কথা শেষ করি স্যার, তারপর আপনার মতামত শুনব। পুরো কথাটা আগে শুনে নিন।” সব্যসাচী অস্বস্তি-ভরে চুপ করে গেলেন। ছেলেটা গোটা পরিস্থিতিটাই নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। করুক।”

     “এখন আমার ফেলোশিপ আসতে গেলে, আপনার ডিএসটির প্রোজেক্টটা সময় মতো জমা দিতে হবে। কাজেই আমি এই মুহূর্তে আপনাদের ওই পেপারের কারেকশনের কাজটা করতে পারব না।”

     সব্যসাচী আবার কথা বলতে গেলেন। কিন্তু শুভজিৎ হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিল। বলল, “কিন্তু আপনিও জানেন, আমিও জানি, আমরা ন্যানো সাইন্সে বড় প্রোজেক্ট লিখলেও ডিএসটি তা সহজে স্যাংশন করবে না কারণ…” বলে একটা নাটকীয় পজ দিল শুভজিৎ।

     সব্যসাচীর আগ্রহ জাগছিল। তিনিও বললেন, “কারণ?”

     “কারণ হলেন দত্তাত্রেয় মজুমদার, কলকাতায় পাশাপাশি দুটো ল্যাবে কোটি টাকার প্রোজেক্ট ডিএসটি কিছুতেই দেবে না। আমাদের প্রজেক্টটা খুব ভালো হলেও বলবে ডি-এমের সঙ্গে কোলাবরেট করতে। কারণ ওঁর অলরেডি বড় ল্যাব, বহু কোটি টাকার যন্ত্র আছে। ডিএসটি বলবে ওরা ন্যানো মেটেরিয়ালের স্বভাব বার করুক, তোমরা তার থিয়োরি তৈরি কর। তাতে আমাদের বিশেষ লাভ হবে না।”

     সব্যসাচীর মুখ থম থম করছিল। অপ্রিয় সত্য কে-ই বা শুনতে চায়। এবারে বলেই ফেললেন, “তাহলে তোমার যুক্তিমতো তো প্রোজেক্ট লেখাই বেকার, তাই না?”

     “আমার কথা শেষ হয়নি স্যার। মার্চের বাইশ তারিখে ডিএসটি-র কৃষ্ণমূর্তি আসছে। ওদের ল্যাব দেখতে। আপনি ওঁকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে আনবেন। আসার সময় আপনি বলবেন আপনি একটা বিরাট থিয়োরিটিক্যাল প্রজেক্ট রেডি করেছেন। কৃষ্ণমূর্তি ডি-এমের কথা বললে বলবেন ‘ওটা একটা ভণ্ড। নানা রকম বড় বড় দাবি করে। কাজের বেলায় ঘণ্টা। এই তো কি একটা স্যাম্পল নিয়ে হইচই করছে কিন্তু দেখতে চাইলে কাটিয়ে দিচ্ছে।”

     সব্যসাচী গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি ধরে নিচ্ছ কেন, আমি দত্তাত্রেয়র নামে বাজে কথা বলব? আর এখানে এসে তো কৃষ্ণমূর্তি সবই দেখতে পাবে। তখন…”

     শুভজিতের মুখে একটা ঠাণ্ডা হাসি ফুটে উঠল। বলল, “না স্যার, কৃষ্ণমূর্তি কিচ্ছু দেখতে পাবেন না। ডি-এমের সবকটা স্যাম্পল হারিয়ে যাবে।”

     “মানে, তুমি কি স্যাম্পেল চুরি করবে নাকি?”

     “আমি কি করব জানতে চাইবেন না স্যার। আপনাকে আমি কোনও কিছুতে জড়াব না। যদি ধরা পড়ে যাই তাহলে আমাকে আপনিই পুলিসে দিয়ে দেবেন, ঠিক আছে?”

     সব্যসাচী এক বুক অস্বস্তি নিয়ে বসে রইলেন। স্কীমটা খুবই মনের মতো লাগছে তাঁর, কিন্তু এই ছোকরা সব সামলাতে পারবে তো? বললেন, “ওরা স্যাম্পলগুলো প্রচণ্ড সাবধানে রাখে। তুমি এসব চেষ্টা ছেড়ে দাও হে।”

     শুভজিৎ আবার হাসল। সে বুঝতে পেরেছে স্যার তার কথাগুলোকে মূল্য দিচ্ছেন। বলল, “আপনি কোনও চিন্তা করবেন না স্যার। আমার কাছে একেবারে ফুল প্রুফ প্ল্যান আছে। আপনি শুধু কৃষ্ণমূর্তিকে ম্যানেজ করবেন। সেটা পারবেন তো?”

     সব্যসাচী আমতা আমতা করে বললেন, “দত্তাত্রেয় যদি স্যাম্পলগুলো দেখাতে না পারে তাহলে কৃষ্ণমূর্তি ওর মুখও দেখবে না। তখন তাকে ম্যানেজ করা ততটা শক্ত হবে না। কিন্তু তোমার ব্যাপারে আমি ভরসা পাচ্ছি না।”

     শুভজিৎ আবার বলল, “আমার প্ল্যান ফুল প্রুফ।”

     বাড়ি ফিরে শুভজিৎ দেখল তার দাদা তার নিজের ঘরে বসে আছে, যেটা সন্ধ্যাবেলা একেবারেই অস্বাভাবিক। কিন্তু কিরকম অদ্ভুতভাবে চেয়ে আছে। কাছে যেতে বলল

     “আয় ভাই, ভালো আছিস? তোর কাজ হচ্ছে?”

     “হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ভালোই এগবে। কিন্তু একটা কথা বলি দাদা, তুই মেয়েটাকে মেরেই ফেললি?”

     “মারতে চাইনি রে। একটুও মারতে চাইনি। কিন্তু মেয়েটা একটা কাটারি নিয়ে একদম মা কালীর মতো তেড়ে এল। তখন আর… কিন্তু আমি মারতে চাইনি। গলাটা টিপে ধরলাম। কী রকম কাটা মুরগীর মতো ধড়ফড় করতে করতে হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। মানুষ এত সহজে মরে যায়? এত সহজে?”

     শুভজিতের বুকের ভিতরটা যেন কেমন কেমন করে উঠল। দাদা কীরকম অস্বাভাবিক আচরণ করছে না? সে “যাই রে দাদা” বলে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।

(১০)

আগামীকাল সেই বহু প্রতীক্ষিত বাইশে মার্চ। ডিএসটি-র কৃষ্ণমূর্তি ডি-এমের ল্যাব দেখতে আসবেন। ডি এমের ল্যাবে সাজ সাজ রব। ল্যাবের সমস্ত যন্ত্রপাতি কম্পিউটার ইত্যাদি ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করা হচ্ছে। সমস্ত ন্যানো স্যাম্পলগুলো নম্বর দিয়ে সাজিয়ে স্যাম্পল রাখার ড্রয়ারগুলোতে রাখা হচ্ছে।

     এই ড্রয়ারগুলো দেখতে বেশ। একটা চার ইঞ্চি চৌকো বাক্সর সামনে চারটে ছোট্ট ড্রয়ার উপর নিচ করে সাজানো। প্রত্যেকটা ড্রয়ার খুললে সেগুলো আবার ন-টা এক স্কোয়ার ইঞ্চি খোপে ভাগ করা। এই খোপগুলোর মধ্যে কাচের ফিল্মের উপর স্যাম্পলগুলো থাকে। একটা বাক্সে এরকম ছত্রিশটা স্যাম্পল ধরে। ড্রয়ারের উপর একটা সুন্দর কায়দার চিমটে আছে, সেইটা দিয়ে স্যাম্পলগুলো ঢোকাতে বা বের করতে হয়। বাক্সর উপরে একটা এলো-সি-ডি ডিসপ্লে। ওই ডিসপ্লেটা আসলে একটা কম্বিনেশন লক। টাচ স্ক্রীনে নির্দিষ্ট নম্বর টাইপ করলে তবে বাক্স খোলা সম্ভব।

     শুভজিৎ একটা চমৎকার শো পিস কিনেছে। অনেকটা ওই ছক্কাটার সাইজে, কিন্তু কাচের তৈরি। সব ক-টা দিকেই ভারী সুন্দর গ্লাস পেইন্টিং করা আছে। ম্যাজিক বাক্সর ভিতর ওটা খুব সুন্দর ঢুকে যাচ্ছে। একবার ওটাকে দশ ঘণ্টা ভবিষ্যতে পাঠিয়ে ট্রায়াল দিয়েও রেখেছে শুভজিৎ। এই মুহূর্তে ও ওই বাক্সটা নিয়ে ডি-এমের ল্যাবে ঢুকল। আপাতত বাক্সটা গিফট র‍্যাপার দিয়ে মোড়া। বাক্সটা ও খুব অবহেলার সঙ্গে চল্লিশ নম্বর স্যাম্পলের বাক্সটার পাশে রাখল।

     শেষ এক মাস, বলতে নেই, শুভজিতের বেশ ভালোই কেটেছে। অবশ্য একটা খারাপ খবর হল দাদা বাড়ি থেকে পালিয়েছে। এই ব্যাপারটা অবশ্য শুভজিৎ ভালো করে বুঝতে পারেনি। দাদা ভীষণ বিষণ্ণ হয়ে যাচ্ছিল। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থাকত। স্নান করতে খেতে পর্যন্ত ভুলে যেত। একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনদিন পরে ফিরল। কি রকম পাগলের মত চেহারা হয়ে গেছিল। কিন্তু যেহেতু বাড়ির কেউই দাদাকে তেমন পছন্দ করে না, তাই দাদাকে ডাক্তার দেখানোর বদলে একটু বকাবকি দিয়েই মা কাজ সেরেছিল। এর দিনদুয়েক বাদে দাদা আবার কোথায় চলে গেছে এবং আর ফেরেনি। দিনদশেক পরে বাবা একটা নাম কা ওয়াস্তে মিসিং ডায়রি করল। ব্যাস আর কিছুই হয়নি।

     অন্যদিকে যেদিন শুভজিৎ এস-সি স্যারের সঙ্গে সব কথাবার্তা বলল, সে দিনই বেরবার সময় নেত্রবতীর সঙ্গে ওর চোখাচোখি হয়। শুভজিৎ হাসলে নেত্রবতীও একটু হাসে। তারপর প্রশ্ন করে, “আচ্ছা, তোমার সঙ্গে সেদিন যে মেয়েটি ছিল, সে ম্যাজিশিয়ান? টিভিতে দেখাল, মার্ডার হয়েছে?”

     শুভজিতের পিলে চমকে গেল। কিন্তু ও বুদ্ধি হারালও না। অবাক হবার ভান করে বলেছিল, “মার্ডার হয়েছে? সে কি রে? কে বলল?”

     নেত্রবতী অবাক হয়ে বলল, “তুমি জানো না?”

     শুভজিৎ নির্লিপ্ত মুখ করে বলল “কি করে জানব? ওই মেয়েটা আমার এক বন্ধুকে ব্ল্যাকমেল করছিল। ওর সঙ্গে আমার বন্ধু ক-দিন মেলামেশা করেছিল। তা মেয়েটা হঠাৎ দাবি করল দু-লাখ টাকা দিতে হবে, না হলে ওকে ফলস রেপের কেসে ফাঁসিয়ে দেবে। আমার বন্ধু আমাকে পাঠিয়েছিল নেগোসিয়েট করতে। কিন্তু মেয়েটা রাজি হয়নি। পুরো টাকাই দিতে হয়েছিল। ওইদিন আমি ভয়ানক টেনশনে ছিলাম আর তোর সঙ্গে ওই বদমাশ মেয়েটার পরিচয় করিয়ে দিতেও চাইনি। তাই তোকে ওইভাবে অ্যাভয়েড করছিলাম”।

     নেত্রবতীর চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। বলল, “কী ডেঞ্জারাস মহিলা রে বাবা! কিন্তু ওকে খুন করল কে?”

     “কী করে জানব বল। তবে যারা সাপ নিয়ে খেলে তারা সাপের কামড়েই মরে তাই না?”

     “এসব লোকের ধারেকাছে যাও কেন? ফিজিক্স নিয়ে আছো, তাই থাকাই ভালো নয় কি?”

     শুভজিৎ একমত হয়। এরপর থেকে নেত্রবতীর সঙ্গে ওর আবার ভাব হয়ে গেছে। তবে প্রজেক্ট লেখা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকার দরুন ওর সঙ্গে নেত্রবতীর কথাবার্তা আর খুব বেশি হয়নি। কালকের দিনটা ভালোয় ভালোয় কেটে গেলে ও নেত্রবতীকে ওর মনের কথা জানিয়ে দেবে ঠিক করেছে।

     শুভজিৎ ডি-এমের ল্যাবে একটু ঘুর ঘুর করছিল। ইতিমধ্যে ও সবাইকে ওর শো পিসটা দেখিয়ে প্রশংসা আদায় করেছে। কিন্তু ও খেয়াল করছে ওদের ল্যাবের বিশাখা মেয়েটা সব সময় চোখের কোনা দিয়ে ওকে নজরে রাখছে। ওরা সব সময়েই অন্য ল্যাবের লোকজনকে সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু বিশাখা সুন্দরী! যতই নজর রাখো আজ শুভজিতকে কোনওভাবেই বাগে পাবে না।

     শুভজিৎ শো পিসটাকে ম্যাজিক বাক্সে ঢোকাল। তারপর গিফট র‍্যাপার দিয়ে মুড়ে দিল। ব্যাটারিটা লাগানোই আছে। এখন বাজে বেলা একটা। দশ ঘণ্টা পরে রাত এগারোটায় নিশ্চয়ই ল্যাবে কেউ থাকবে না। শুভজিৎ প্রথমে খুব অবহেলার সঙ্গে ওদের সেই ৪০ নম্বর স্যাম্পলের বাক্সটা সরিয়ে রাখে। তারপর ঠিক যেখানে স্যাম্পলের বাক্সটা ছিল সেইখানে ম্যাজিক বাক্সটা নিয়ে আসে। এইবার হাতসাফাই করে পুশ বাটনটা শুধু টিপে দেয়। ব্যাস এবার নিজের বাক্সটা সরিয়ে খুব যত্ন করে স্যাম্পলের বাক্সটা যেখানে বাক্সটা ছিল সেখানে রেখে দেয়। বাক্সটা হাতে নিয়ে ল্যাবের অন্যদিকে তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে যায় ও। আড়চোখে দেখল বিশাখা উঠে এসে স্যাম্পলের বাক্সটা ঠিক আছে কি না একবার দেখে নিল। ল্যাবের ভিতর বেশ খানিকক্ষণ এদিক ওদিক করল তন্ময়। তারপর বেরিয়ে গেল।

     আনন্দে নাচতে ইচ্ছা করছিল তন্ময়ের। স্যাম্পলের বাক্স ওরা ওখানেই রাখে। দশ ঘণ্টা পরে রাত এগারোটার সময়ে শুভজিতের শো পিসটা ঠিক সেখানেই এসে আবির্ভূত হবে যেখানে ওদের বিখ্যাত চল্লিশ নম্বর স্যাম্পলের বাক্সটা আছে। ফলে বাক্সটা চলে যাবে শো পিসটার মধ্যে। আর সেটা কারো বাবারও বোঝার সাধ্য থাকবে না। চারদিক বন্ধ একটা কাচের শো পিসের মধ্যে যে স্যাম্পলের বাক্সটা থাকবে তা কে বুঝবে? আর বিকেলে ল্যাব ছেড়ে যাবার আগেও ওরা স্যাম্পলের বাক্স জায়গা মতোই দেখতে পাবে। হুঁ, একে বলে ওস্তাদের মার।

     আনন্দে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বাড়ি গেল শুভজিৎ।

     পরদিন বাইশ তারিখের সূচনা শুভজিৎ যেমন ভেবেছিল এমন ভাবেই হল। সকাল এগারোটায় ল্যাবে এসে খবর পেল স্যার কৃষ্ণমূর্তিকে আনতে এয়ারপোর্ট চলে গেছেন। ওদিকে ডি-এমের ল্যাব থেকে সন্দেহজনক গোলমাল শোনা যাচ্ছে। বিমানদা খবর আনতে গেল। খবর যেমন ভাবা গিয়েছিল তেমনই। বিমানদা উত্তেজনার ফাটো ফাটো হয়ে খবর দিল, “জানিস? ওদের সেই যে ডি-৪০ স্যাম্পলটা নিয়ে ওর এত ফাটাচ্ছিল, যেটার নাকি পার স্কয়ার মিলিমিটারে হাজার মাইক্রো ক্যাপাসিটেন্স, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্ত ল্যাব ওরা তোলপাড় করে ফেলেছে। কিন্তু কোথাও নেই। ডি-এম খুব উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি করে এখন বুক ব্যথা করে শুয়ে আছেন। খালি বলছেন আমি কৃষ্ণমূর্তিকে মুখ দেখাব কী করে?”

     শুভজিতের কিন্তু আর ভালো লাগছিল না। ডি-এম অসুস্থ হয়ে পড়লেন নাকি? শুভজিৎ ছাত্রজীবনে এই ভদ্রলোককে খুব শ্রদ্ধা করত। যদিও এখন…

     কিছুক্ষণ পর আবার খবর এলো ডি-এমের খুব সম্ভব স্ট্রোক হয়েছে। ওঁকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

     ইতিমধ্যে কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়ে স্যার এসে উপস্থিত হলেন। খবর শুনে কৃষ্ণমূর্তিও সোজা হসপিটালে চলে গেলেন, সঙ্গে এস-সি স্যার।

     আরও ঘণ্টাদুয়েক পর খারাপ খবরটা সায়েন্স কলেজে এসে পৌঁছল। প্রফেসার দত্তাত্রেয় মজুমদার ইস নো মোর। সায়েন্স কলেজ ছুটি হয়ে গেল। আগামী কাল শোকসভা হবে। 

     বাক্সটা কাল রাতে শুভজিৎ সাইন্স কলেজেই রেখে গিয়েছিল। এখন আস্তে আস্তে ডি এমের ল্যাবে গিয়ে ঢুকল সে। কেউই কোথাও নেই, শুধু ল্যাবরেটরি অ্যাটেন্ডেন্ট মনোজ বসে আছে। শুভজিৎ দেখল তার শো পিসটা টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে। কেউ জানে না যে স্যাম্পলের বাক্সটা ওর মধ্যে আছে। মনোজকে শুভজিৎ বলল, “এই দেখেছ, এটা এই ল্যাবে ফেলে গেছি। কাল সারা বিকেল খুঁজে পাইনি। নিয়ে গেলাম”।

     মনোজ উদাসভাবে বলল, “লিয়ে যান সার, কিই বা থাকবে বলেন। স্যারই চলিয়ে গেলেন। উমন দেওতার মতো আদমী। হায় হায়! ক্যা বদ নসিবি!”

     বাক্সর মধ্যে শো পিস ভরে ডায়ালটাকে আবার দু-মিনিটে ফিরিয়ে আনে শুভজিৎ। গিফট র‍্যাপারে মুড়ে একটা বড় থলের মধ্যে ঢোকায়। গতকালের ব্যাটারিটা লাগানোই রইল। মনটা কি রকম খারাপ হয়ে রয়েছে। এমন সময় নেত্রবতী ঘরে ঢোকে।

     “খবর শুনেছ শুভজিতদা?”

     “হ্যাঁ রে। মনটা খারাপ হয়ে গেল”।

     “কি আর করবে? এত বড় একটা থলি নিয়ে এসেছ কেন?”

     “একটা গিফট আইটেম আছে”।

     “দেখি কী রকম? খোলা যাবে?”

     থলে থেকে বাক্স বার করে র‍্যাপার খোলে শুভজিৎ। বাক্স থেকে শো পিসটা বার করে সে। নেত্রবতী দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে পাশে রাখে শো পিসটা।

     “দারুণ তো। কে চয়েস করল?”

     “আমিই করেছি”। বলতে বলতে বাক্সটা নামিয়ে রাখতে গিয়ে সুইচটায় চাপ পড়ে যায়। যাক গে বাক্সে তো আর কিছু নেই। বাক্সে শো পিস ভরতে ভরতে নেত্রবতীকে বলে –“আমার চয়েস কিন্তু ভালোই। একটা দারুণ মেয়েকে চয়েস করেছি। এখন মেয়েটা রাজি হলে হয়!”

     নেত্রবতীর দু চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বলে, “এ ব্যাপারে আপত্তি করবে এমন মেয়ে আছে না কি?”

     শুভজিৎ নেত্রবতীর হাত ধরে কাছে টানতে টানতে বলে, “আপত্তি নেই?”

     শুভজিতের চোখের দিকে সটান চেয়ে নেত্রবতী বলে, “না”

     পরমূহূর্তেই একটা বিকট হেঁচকি তুলে আঁক করে একটা আওয়াজ করে ছিটকে পড়ে নেত্রবতী। ‘কী হল?’ বলে আর্তনাদ করে ওর উপর ঝুঁকে পড়ে শুভজিৎ। নেত্রবতীর অপরূপ মুখখানা কীরকম বীভৎস চেহারা নিয়েছে। গলাটা ফুলে প্রায় গোল হয়ে গেছে। শুভজিৎ সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ওঠে।

(১১)

দু-দিন পর এক সন্ধ্যায় শ্মশান থেকে বেরিয়ে আসে শুভজিৎ। একটু আগে নেত্রবতীর শেষ কাজ করা হল। ডাক্তার বলেছিলেন স্ট্রোকে মৃত্যু। কারণ হার্টের মধ্যে প্রচুর বাতাস ঢুকে গেছে। পোস্টমর্টেম হয়েছে। কিন্তু হার্টে বাতাস ঢোকার কোনও কারণ পাওয়া যায়নি। কাজেই পুলিশ কোনও কেস লঞ্চ করবে না বলেছে। নেত্রবতীর বাবাও এ নিয়ে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করেননি।

     নেত্রবতীর মৃত্যুর কারণ বুঝতে পেরেছে একমাত্র শুভজিৎ। দেখা যাচ্ছে একবার কোনও কিছুকে ভবিষ্যতে পাঠালেই ব্যাটারিটা পুরো শেষ হয় না। নিজের কোলে থাকা বাক্সটির উপর যেই সুইচে চাপ পড়েছে, ওই বাক্সের মধ্যে যেটুকু হাওয়া ছিল তারা দু-মিনিট ভবিষ্যতে চলে গেছে। ঠিক দু-মিনিটের মাথায় ও নেত্রবতীকে টেনে নিজের কোলের কাছে এনেছিল। সেই মুহূর্তে দু-মিনিট অতীতের বাতাস ঠিক সেইখানে এসে উপস্থিত হয় যেখানে তখন নেত্রবতীর হার্ট, ফুসফুস আর গলা ছিল। সেইগুলি বাতাসে ভরে গিয়ে নেত্রবতীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

     ম্যাজিশিয়ান ডেভিড লাভেনবার্গ বলেছিলেন বাক্সটা অভিশপ্ত। ঠিকই বলেছিলেন। শুভজিতের সঙ্গে বাক্সটার পরিচয় হওয়ার পর বাক্সটি তিনটি মৃত্যু এবং একটি মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়েছে। শয়তান বাক্স!

     শুভজিতের কানে কেউ ফিসফিস করে বলে “শয়তান কে? বাক্সটা না তুমি? এই সবকটা মৃত্যুর জন্যই তো তুমি দায়ী। তোমার আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভ দায়ী”।

     শুভজিৎ বলতে চায় “না না, আমি কি দেবযানীকে খুন করতে বলেছিলাম? আমি কি জানতাম স্যাম্পল বাক্সটা হারিয়ে গেলে ডি-এম স্যারের স্ট্রোক হবে? আর নেত্রবতীকে তো আমি ভালোবাসতাম। ওর মৃত্যুটা তো অ্যাকসিডেন্ট।”

     কানের মধ্যের শব্দটা খিক খিক করে হাসতে থাকে। “সবাইকে ভুল বোঝানো যায় শুভজিৎ, নিজেকে ভুল বোঝানো কঠিন।”

     ক্রমে উত্তেজনা বাড়তে থাকে শুভজিতের। এই বাক্সটা! এই অভিশপ্ত বাক্সটা! এটার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা। আমি এই বাক্সটার প্রভাবে কী ভয়ংকর সব অন্যায় করে বসলাম। আমাকে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, তবে বাক্সটাকেও শেষ করব। বাক্সটাকে আজকাল সে কখনই কাছ-ছাড়া করে না। এই মুহূর্তে হাতের থলেতেই বাক্সটা আছে।

     নিমতলার পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে শুভজিৎ। একটা ঘোরের মধ্যে হাঁটতেই থাকে সে। একসময় দেখে সামনে একটা লঞ্চ ঘাট। সিদ্ধান্তে এসে যায় শুভজিৎ। সে সাঁতার জানে না। লঞ্চে উঠে মাঝগঙ্গায় বাক্সসুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়লেই হবে।

     লঞ্চে বেশি লোক নেই। শুভজিৎ রেলিং এর ধারে দাঁড়ায়। রাতের গঙ্গা ভারী সুন্দর দেখায়। একটা মিষ্টি ফুরফুরে হাওয়াও দিচ্ছে। এই সময় যদি পাশে নেত্রবতী থাকত? মাঝ-গঙ্গা কি এসে গেল?। আস্তে করে বাক্সটা জলের মধ্যে ছেড়ে দেয় শুভজিৎ। কব করে একটা শব্দ করে তলিয়ে গেল বাক্সটা। এইবারে শুভজিৎ। রেলিঙের ধার থেকে একটু এগিয়ে যাবে এমন সময় হঠাৎ খপ করে কে যেন তার বাঁ হাতটা ধরে ফেলল।

     এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। বিরক্ত বিরক্ত মুখে বললেন, “আরে বাবা পড়ে যাবে যে। নেশা করেছ নাকি”। তারপর বিড়বিড় করে বকতে লাগলেন, “এই সব ছেলেপুলে! কেয়ারলেস! এদের জন্য এদের বাবা-মা-র যে কী হাল হয়! আমার টি কি একবারও ভেবেছিল তার সৎকার করতে আমার কীরকম লেগেছিল?”

     শুভজিৎ একটা চমক খায়। এই ভদ্রলোকের ছেলে মারা গিয়েছিল? কী ভাবে? ভদ্রলোককে প্রশ্নটা করেই ফেলে সে।

     “সে অনেক কথা বাবা। আমার ছেলের বয়স তখন সতেরো। সব পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করত। কিন্তু সেইবার…”

     গঙ্গার বুকে ফুরফুরে হাওয়া বইতে থাকে। লঞ্চের উপর বসে এক মহাপাপীর সামনে বুক হালকা করতে থাকেন এক পুত্রহারা পিতা। শুভজিৎ প্রশ্ন করে “তারপর?”

     এইভাবেই গল্প চলতে থাকে। গল্পের শেষ হয় না।

5 thoughts on “ম্যাজিক বাক্স

  • October 3, 2019 at 2:11 pm
    Permalink

    অসাধারণ লাগল। বৈজ্ঞানিক দিকটা নিয়ে তো কোনও কথা হবে না। প্রধান চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনও খুব খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। পড়তে খুব ভালো লাগছিল। মানে এক কথায় আমি মুগ্ধ।

    তবে শেষটা একটু তাড়াহুড়ো করে হল মনে হল।
    এত কিছু হারানোর পরে শুভজিতের ক্যাথারসিস যেন বড্ড সহজে হল। গল্পের স্রোতের সঙ্গে মানালো না।

    Reply
  • October 7, 2019 at 3:16 am
    Permalink

    তারামাছ পড়ার পরে লেখকের পরবর্তী কাজের উপরে আগ্রহ বেড়েছিল। লেখক নিরাশ করেননি। রিভিউ আমার সাজে না, কিন্তু কাহিনীটার আরো বিকাশের সুযোগ ছিল (অবশ্য এই একই রোগে আমিও দুষ্ট)।

    Reply
  • October 9, 2019 at 9:47 am
    Permalink

    গল্পটি খুব ভাল লাগল দাদা। বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা এবং মানসিক টানাপোড়েনের মিশেল।

    Reply
  • October 9, 2019 at 10:12 pm
    Permalink

    আমার পড়া এই বছরের অন্যতম সেরা বড় গল্প( যদিও উপন্যাস বলে উল্লেখ আছে, তবুও আংগিক বিচার করলে এটিকে বড় গল্প বলাই যুক্তিযুক্ত।) । তবে শেষ টা যদি হঠাৎ করে না হতো বা শেষ টা ছোট গল্প সুলভ না হতো বা শুভজিতের চরিত্রের বিবর্তন এত দ্রুত না হতো তাহলে এটি বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটি অন্যতম সেরা উপন্যাস হতে পারত। লেখকের প্রতি প্রত্যাশা অনেক টা বেড়ে গেল। ভবিষ্যতে এই রকম আরো রত্ন তার থেকে পাব বলে আশা রাখি।

    Reply
  • October 10, 2019 at 6:35 pm
    Permalink

    বড় ভালো। এর বেশি মন্তব্য করার মত সাহিত্য বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমার নেই।
    শেষের ওই ‘গল্প শেষ হয় না’ কথা কটির ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যিটা অনতিক্রম্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!