যখন নামবে আঁধার

প্রচন্ড রেগে গিয়েছিলেন অতীশ ৭৭, শরণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। আগুনচোখে চেয়ে রইলেন সামনের সাংবাদিক যুবকের দিকে। এত রেগে গিয়েছিলেন যে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর, মনে হচ্ছিল এই বুঝি তিনি তেড়ে গিয়ে সাংবাদিককে দু’ঘা লাগিয়ে দেন। ভুবন ৭৬২, সাংবাদিক, তেমন বিচলিত হয় নি। তার চাকরিটাই এমন। এইসব রাগারাগির মধ্যে পড়তে হয় প্রায়ই। চাকরির প্রথমদিকে যখন তার কলামটি তেমন জনপ্রিয় হয় নি, তখন থেকেই সে নানা বিপজ্জনক সাক্ষাৎকার নিয়ে আসছে। কয়েকবার মারধর পর্যন্ত খেতে হয়েছে তাকে। তবে আস্তে আস্তে সয়ে গিয়েছে সব। ঐসব অভিজ্ঞতাগুলো তাকে আত্মবিশ্বাস আর ধৈর্য দিয়েছে অনেক। ভুবন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল, জ্যোতির্বিদ মহাশয় একটু ঠান্ডা হলেই হয়তো কথা বলবেন। গত দু’মাস ধরে যা চলছে! তবে কিনা জ্যোতির্বিদেরা একটু অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ হন, সে তো সবাই জানেই। আস্তে আস্তে নিজেকে সামলালেন অতীশ, তারপরে শান্ত গলায় বললেন, “দেখুন ভুবন, আপনি যে প্রস্তাব করছেন, তা মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।”

     তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভীন ২৫, কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সে বেশ নার্ভাস গলায় বললো, “স্যর, আপনি যদি—শত হলেও এঁরা মিডিয়ার লোক— আপনি যদি একটু—”

     ওর কথা শেষ হলো না, অতীশ ভীনের দিকে ফিরে ভুরু তুললেন, কঠিন গলায় বললেন, “ভীন, আমাদের কথার মধ্যে কথা বোলো না। এঁকে এখানে এনেছ বেশ করেছ, কিন্তু এখন ঝামেলা কোরো না। যাও, নিজের কাজে যাও।” ভীন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, মাথা হেলিয়ে মেনে নিয়ে চলে গেল।

     ভুবন সুযোগ পেয়ে বললো, “স্যর অতীশ, আমাকে প্লীজ বলতে দিন পুরোটা। আমি—”

     “এখন যাই বলুন না কেন, গত দু’মাস ধরে আপনার দৈনিক কলামে যা লিখে গিয়েছেন, তার চেয়ে বেশী ক্ষতি আর কেউ করে নি আমাদের। এখন কোনোকিছুতেই সেই ক্ষতিপূরণ হওয়ার নয়। আপনি মিডিয়াতে রীতিমতন প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টার আর উদ্যোগের বিরুদ্ধে। গোটা অবজার্ভেটরির সমস্ত কর্মীদের সমস্ত কাজকে হাস্যকর প্রতিপন্ন করেছেন।”

     শহরের বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা “শরণ্য সংবাদ” এর একটা কপি টেবিল থেকে তুলে নিয়ে ভুবনের মুখের সামনে নাড়িয়ে অতীশ আগুন গলায় বললেন, “আপনার মতন ঘোর বেহায়া সাংবাদিকেরও লজ্জা হওয়া উচিত এর পরেও এখানে এসেছেন বলে। শুধু এসেছেন না, আবার এই অনুরোধও করছেন যে আজকের সমস্ত ঘটনার প্রতিবেদন লিখবেন। কী আর বলবো, নির্লজ্জতার একটা সীমা থাকা উচিত।”

     কথা শেষ করে অতীশ কাগজখানা আছড়ে ফেললেন মেঝেতে, দুম দুম করে হেঁটে গেলেন জানালার ধারে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। তারপরে সেখান থেকেই বললেন, “আপনি এবারে চলে যেতে পারেন সাংবাদিক মশাই।”

     অতীশ জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন গামা, এই গ্রহের আকাশের ছয়টি সূর্যের সবচেয়ে উজ্জ্বলটি, অস্ত যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই স্নিগ্ধ বাসন্তী রঙের হয়ে এসেছে, দিগন্তের কুহেলীতে মিলিয়ে যাবে এখনই। অতীশ জানতেন, এই গামাকে আর তিনি দেখবেন না সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে।

     হঠাৎ তিনি ঘুরে তাকালেন, বললেন, “না ভুবন, যাবেন না। আসুন এখানে। আপনার প্রতিবেদনে কী লিখবেন আমি এখনই বলে দিচ্ছি। আসুন এখানে।”

     ভুবন যাবার কোনো চেষ্টাই করেনি, এত সহজে চলে যাবার ছেলে সে নয়। সাংবাদিকতা করে খেতে হয় তাকে। এখন আস্তে আস্তে সে অতীশের দিকে এগোয়। সাবধানে।

     অতীশের কাছে যেতে তিনি জানালাপথে বাইরের দিকে নির্দেশ করে বললেন, “শুধু বিটা এখন আকাশে। বাকী পাঁচ সূর্য অস্ত গিয়েছে। দেখতে পাচ্ছেন?”

     ভুবন দেখতে পাচ্ছিল, সে নীরবে মাথা হেলালো। বিটা এখন প্রায় মধ্যাকাশে। লাল নক্ষত্র। হাল্কা কমলারঙের রোদ্দুরে ভরে ছিল আদিগন্ত প্রান্তর, দূরের পাহাড়ের রেখা, চিকচিকে নদী।

     বিটা এখন গ্রহ থেকে সবচেয়ে দূরে, অপসূর অবস্থানে। তাই স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে খানিকটা ছোটো দেখাচ্ছে। কিন্তু অন্য পাঁচটি সূর্যের অনুপস্থিতিতে বিটাই এখন এই আকাশে একচ্ছত্র সম্রাট।

     গ্রহটির নাম নগমা। সে যে সূর্যকে ঘিরে ঘোরে, তার নাম আলফা। আলফা এখন একেবারে উল্টোদিকে, অস্তে গিয়েছে অনেক আগেই। গামা অস্ত গেল এইমাত্র। অন্য তিনটি সূর্যও দিগন্তের নিচে। এখন আকাশে কেবল বিটা, বিটা রেড-ডোয়ার্ফ ।

     অতীশের মুখ লালসূর্যের একলা আলোতে কেমন অদ্ভুত বিষন্ন দেখায়। তিনি বলেন, “আর চার ঘন্টা। ব্যস, তারপরেই আমাদের সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। কেন জানেন? কারণ বিটা আকাশে একা। লিখে নিন। কিন্তু পড়ার আর কেউ থাকবে না।” ম্লান হাসি হেসে অতীশ বলেন।

     ভুবন আস্তে করে বলে, “কিন্তু ধরুন চার ঘন্টা গেল, আট ঘন্টা গেল, কিছুই হল না। তখন?”

     অতীশ বলেন, “অনেক কিছুই হবে হে সাংবাদিক, অনেক কিছু হবে। এই চার ঘন্টায় অনেক কান্ডই ঘটে যাবে।”

     “ঠিক আছে, নাহয় ঘটলো অনেক কিছু। কিন্তু ধরুন-”

     এইসময়ে ভীন ২৫ আবার এগিয়ে আসে। বলে, “স্যর, একটিমাত্র অনুরোধ। আমাকে যা খুশি করবেন না হয় পরে, এখন সাংবাদিকের কথাটা একটু শুনুন।”

     ভুবন বলে, “দেখুন, দু’জন বলছে শুনতে, আপনি একা বলছেন শুনবেন না। এটা তো গণতন্ত্র হচ্ছে না। একটু শুনুন, ক্ষতি তো নেই।”

     অবজার্ভেটরিতে আর যে পাঁচজন ছিলেন, তারা এতক্ষণ কিছুই বলেন নি, চুপচাপ দেখছিলেন আর শুনছিলেন।

     অতীশ ঘড়ি বার করলেন, বললেন, “ঠিক আছে। পাঁচমিনিট সময় দিচ্ছি। এরমধ্যে যা বলার বলুন।”

     ভুবন বললো, “আমাকে যদি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে থাকতে দেন, আর যদি সত্যি প্রলয় ঘটে সব ধ্বংস হয়, তাহলে তো আর আমার কলাম বেরোবে না। আপনাদের কোনো ক্ষতি হবে না। আর যদি সত্যি সত্যি কোনো প্রলয় না ঘটে, সব ঠিকঠাক থাকে, তাহলে জাস্ট একটা ব্যঙ্গাত্বক লেখা বেরোবে। চেনাজানা বন্ধুমানুষের ব্যঙ্গ। তেমন কিছু খারাপ হবে না।”

     অতীশ আবার তেতে ওঠেন, “চেনাজানা বন্ধুমানুষ বলতে কি নিজের কথা বলছেন?”

     ভুবন হাসে, বলে, “একদম তাই।  আমার কলামে মাঝে মাঝে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে লিখেছি, কিন্তু আমি সবসময় আপনাদের বেনিফিট অব ডাউট দিয়েছি। বোঝেন তো এখন আর সেই পুরোনোদিন নেই যে “মহাপ্রলয় আসন্ন” টাইপের লেখা লোকে বিশ্বাস করবে। তার উপরে যদি তারা শোনে বিজ্ঞানীরা হঠাৎ বিজ্ঞান ছেড়ে এক গুপ্তসমিতির বানানো রটনাকে সত্যি বলে মানছে, তাহলে আরো রেগে যাবে।”

     অতীশ বললেন, “না, গুপ্তসমিতির রটনাকে সত্যি বলে আমরা মানছি না। ওদের থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি বটে, কিন্তু আমাদের গণনা শক্ত ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত। আর গুপ্তসমিতির থেকে যে তথ্যগুলো পেয়েছি, সেগুলো ওদের কিংবদন্তীর ভিতর থেকে বাছাই করে তুলে নেওয়া সত্যিকার অংশটুকু। ঐ গুপ্তসমিতির মিস্টিসিজম আমরা গ্রহণ করিনি। ওরা এখন আমাদের উপরে আপনাদের থেকেও বেশি রেগে গিয়েছে।”

     ভুবন তাড়াতাড়ি বলে, “আমরা আপনাদের উপরে রাগ করিনি কখনো। কিন্তু সাধারণ লোকেরা অনেকে ক্ষেপে গিয়েছে।”

     অতীশ ঠোঁট উল্টালেন, বললেন, “ক্ষেপেছে বেশ করেছে। আরো ক্ষেপুক।”

     ভুবন বলে, “কিন্তু — যদি কিছু না ঘটে, তাহলে আগামীকাল কী হবে? লোকেদের কী জবাব দেবেন? মিথ্যে ভয় দেখানোর জন্য ওরা তো আপনাদের উপরে হামলা করতে পারে।”

     অতীশ বললেন, “কোনো আগামীকাল আসবে না। আজই সভ্যতার শেষ। সভ্যতা বলে যা জানি আমরা, তার সব শেষ হবে আর ঘন্টা চারেক পরেই।”

     ভুবন বলে, “তর্কের খাতিরে ধরুন কিছু ঘটলো না, সব ঠিক রইল। দেখুন গত দু’মাসে কী হয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যে কীরকম মন্দা পড়েছে! বিনিয়োগকারীরা সত্যি করে যদিও বিশ্বাস করে না দুনিয়া শেষ হবে, কিন্তু তাও বিনিয়োগ করছে না যতদিন না দিনটা পার হয়। সাধারণ লোকও অনেকেই এসব বিশ্বাস করে না, কিন্তু তাও দামী জিনিসপত্র কিনতে দ্বিধা করছে, দিনটা পার হবার অপেক্ষা করছে। এখন দেখুন তাহলে ব্যাপার! লোকে বলছে এইসব আধপাগলা বৈজ্ঞানিকরা-ক্ষমা করবেন শব্দটা ব্যবহারের জন্য, কিন্তু লোকে এরকমই বলে- তো ওরা বলছে এরাই যদি দেশের ব্যবসাবাণিজ্যকে এইভাবে মন্দায় ফেলতে পরে, তাহলে তো মুশকিল। এদের আটকানো হোক।”

     অতীশ বললেন, “বুঝলাম। তা আপনি আমাদের জনরোষ থেকে বাঁচাবেন? কীভাবে?”

     ভুবন হাসে, বলে, “আমি প্রচারের ভার নিতে পারি। আমি শুধু ব্যঙ্গবিদ্রূপের দিকটাই হাইলাইট করে এমন অবস্থা করে দিতে পারি তাতে জনতার রোষ প্রশমিত হবে। তারা আক্রমণের মতন বিপজ্জনক ব্যাপারে আর যাবে না। তার বদলে জাস্ট এখানে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে থাকতে চাইছি মাত্র।”

     ভীন বললো, “ওঁর কথা শুনুন স্যর। এখানের বাকীরাও একমত। গত দু’মাসে আমরা যথাসাধ্য সবকিছু হিসেব করেছি বটে, কিন্তু একটা অতি ক্ষুদ্র চান্স-ওয়ান ইন এ মিলিয়ন- থেকেই যাচ্ছে স্যর ভুল হবার। হয় আমাদের তত্ত্বে , নাহয় আমাদের গণনায়। সেই ক্ষেত্রে স্যর, এঁর সাহায্য আমাদের উপকার করতে পরে।”

     অবজার্ভেটরির বাকী পাঁচজনও টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন এসে, তাঁদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ভীনের সঙ্গে তাঁরা একমত।

     অতীশের মুখ দেখে মনে হল নিমপাতার সরবৎ খাচ্ছেন, কিন্তু নিরুপায় হয়েই মেনে নিলেন তিনি। বললেন “ঠিক আছে, তোমরা সবাই যখন বলছ, তখন আর কী করা।”

     তারপরে তিনি ভুবনের দিকে ফিরে খুব ফর্মাল গলায় বললেন, “আপনি থাকতে পারেন পুরো ঘটনা দেখার জন্য। তবে আমাদের কাজে কোনো বিঘ্ন ঘটাবেন না দয়া করে। এখানের পুরো কাজের চার্জে আমি থাকছি, আপনার কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা চাইছি। কোনোরকম ঝামেলা আমি বরদাস্ত করবো না।”

     বয়সের রেখাচিহ্নিত অতীশের প্রৌঢ়মুখ ভাবসংঘাতে বদলে যাচ্ছিল, তিনি হয়তো আরো অনেকক্ষণ অনেক কথাই বলতেন, কিন্তু এমন সময় কোথা থেকে অন্য একটা গলা শোনা গেল।

     “হ্যালো হ্যালো হ্যাল্লো” বলতে বলতে এক চমৎকার লালচে গালের দীর্ঘদেহ লোক এসে হাজির হলেন। বললেন, “উফ, কীরকম গোরস্থানের মতন আবহাওয়া করে রেখেছেন আপনারা। একটু হাসুন, কথা বলুন, আনন্দ করুন, তবে তো মানসিক চাপ কমবে!”

     অতীশ উত্তেজিত গলায় বললেন, “এ কী? শ্রীনিবাস তুমি এখানে কেন? তোমার তো সুরক্ষাশিবিরে থাকার কথা এখন।”

     শ্রীনিবাস হাসতে হাসতে চেয়ারে গিয়ে বসলেন, বললেন, “উফ্ফ, সুরক্ষাশিবির! কী বোরিং জায়্গা রে বাবা। আমি ওখানে টিঁকতে পারলাম না আর। তাই এখানে এলাম। যা ঘটবার সব তো এখানেই ঘটবে। আমার বুঝি কৌতূহল থাকতে নেই? ঐ গুপ্তসমিতির  রহস্যবাদীরা যে নক্ষত্র না কীসের কথা বলেছে, আমি সেইগুলো দেখতে চাই। আহ, জীবনে একবার এই চান্স-” তারপরে অতীশের থমথমে মুখ দেখে থেমে গিয়ে হাতে হাত ঘষে বললেন, “বাইরে ঠান্ডা খুব। বরফঠান্ডা হাওয়া। বিটা থেকে তো কোনো তাপই আসছে না মনে হয়।”

     অতীশ রেগে দাঁতে দাঁত পিষে বললেন, “ওঃ, আমার কপালেই কেন জোটে এইসব মানুষ? শ্রীনিবাস, কেন তুমি সবসময় উল্টোপাল্টা কাজ করো? এখানে কী কাজে লাগবে তুমি?”

     শ্রীনিবাস হেসে বললেন, “আরে এখানেই তো লাগবো কাজে। আমি সাইকোলজিস্ট, সুরক্ষাশিবিরে আমার দাম কানাকড়িও না। ওখানে চাই শক্তসমর্থ যুবক যুবতী, কাজকর্ম, সন্তানজন্ম ও পালন, এইসব যারা করতে পারবে। আমি এই বুড়োবয়সে ওখানে থেকে লাভ কী? শুধু শুধু অন্নধ্বংস! তারচেয়ে এখানেই অনেক ভালো।”

     ভুবন আস্তে আস্তে বলে, “স্যর, সুরক্ষাশিবিরটা কী?”

     শ্রীনিবাস এতক্ষণে লক্ষ্য করেছেন ভুবনকে, বললেন, “আরে, আপনি কে?”

     অতীশ বলেন, “উনি ভুবন, ৭৬২, সাংবাদিক। শুনেছ না এঁর কথা?”

     ভুবন হেসে হাত বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ডশেকের জন্য, “আপনি নির্ঘাত শ্রীনিবাস, ৫০১, শরণ্য বিশ্বাবিদ্যালয়ের মনোবিদ। আমিও আপনার কথা শুনেছি। কিন্তু স্যর, সুরক্ষাশিবির কী?”

     শ্রীনিবাস বললেন, “হ্যাঁ, ঐ সুরক্ষাশিবির। আসলে হয়েছে কী আমরা কিছু লোককে এই আসন্ন প্রলয়ের ব্যাপারটা বোঝাতে পেরেছিলাম। ওরা সিরিয়াসলি নিয়েছে ব্যাপারটা। সুরক্ষিত আশ্রয় বানিয়ে সেখানে খাদ্য জল বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব নিয়ে তারা সেখানে আছে। এই অবজার্ভেটরির কর্মীদের আত্মীয়স্বজন, শরণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মী আর জনাকয় বাইরের লোক। এই। সংখ্যায় বেশী না, সব মিলে শ তিনেক। এদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ মহিলা ও শিশু।”

     ভুবন বলে, “ও তাই। তাহলে ঐ নিরাপদ আশ্রয়ে ওরা তাহলে বেঁচে যাবে, ওরা অন্ধকার নামা দেখতে পাবে না, আর কী যেন বলে, নক্ষত্র না কী দেখা দেবে, সেসবও দেখতে পাবে না। গোটা নগমা গ্রহ যখন পাগল হয়ে যাবে, তখন ওরা থাকবে স্বাভাবিক।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “কিন্তু সহজ হবে না। গোটা গ্রহ উন্মাদ, সমস্ত শহর জ্বলছে আগুনে, সেই অবস্থায় সুস্থ স্বাভাবিক বাঁচা সহজ না। তবে ওদের খাদ্য জল অস্ত্র এসব আছে ওদের, এই যা ভরসা।”

     অতীশ বললেন, “আরো জিনিস আছে ওদের। আমাদের সমস্ত রেকর্ডেড ডেটা আর ডকুমেন্ট সব ওদের কাছে। এই আজকে যা ডেটা কালেক্ট করা হবে, সে আর দেওয়া যাবে না বটে কিন্তু বাকী সব আছে ওদের কাছে। পরবর্তী সভ্যতার জন্য ওসব কিছু খুব জরুরী।”

     ভুবন এত অবাক হয়ে গিয়েছিল যে আর কিছু বলতে পারলো না। অবস্থাটা ভাবতে লাগলো এক মনে।

     সামনের টেবিলে তখন দাবা খেলা শুরু হয়েছে। সময় তো কাটাতে হবে! নীরবে দাবার চাল দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

     অতীশ একটু দূরে শ্রীনিবাসের সঙ্গে ফিসফিস করে কী যেন বলছিলেন। সেদিকে গিয়ে ভুবন বললো, “আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে, এখানে কথা বললে অন্যদের ডিস্টার্ব করা হবে, চলুন অন্য জায়্গায় গিয়ে কথা বলি।”

     অতীশ রাগতমুখে চেয়ে রইলেন, কিন্তু শ্রীনিবাস উৎসাহী হয়ে বললেন, “অবশ্যই অবশ্যই। কথা বলতে পারলে আমার খুব ভালো হয়। এই তো অতীশকে বলছিলাম লোকেরা এইসব মহাপ্রলয় ট্রলয় এর ব্যাপারে কেন বিশ্বাস টিশ্বাস করে না। আসলে মানুষ নিজের মনের সুরক্ষাবলয় থেকে বেরোতে চায় না। ভাবে, বিশ্বাস না করলেই বুঝি বিপদ ঘটবে না।”

     অতীশ বললেন, “শ্রীনিবাস, এখানে কথা না। চলো পাশের ঘরে যাই সাংবাদিককে নিয়ে।”

     শ্রীনিবাস উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “চলুন সাংবাদিক মশাই, পাশের ঘরে যাওয়া যাক। ওখানে চেয়ারের গদীগুলো বেশ নরম।”

      পাশের ঘরটার চেয়ারগুলো সত্যি নরম গদীওয়ালা। ঘরের সবকটা জানালায় লাল পর্দা, ঘরের মেঝেতে মেরুণ কার্পেট, বিটা থেকে আসা লাল রোদ্দুরে সবকিছু লালে লালে একাকার।

     শ্রীনিবাস বললেন, “ওহ, একটুখানি সাদা রোদ্দুরের জন্য মনটা আনচান করছে। ঈশ যদি গামা কি ডেল্টা থাকতো আকাশে!”

     অতীশ বললেন, “ভুবন, আপনি যেন কী জানতে চাইছিলেন? মনে রাখবেন সময় কিন্তু সংক্ষিপ্ত, আর সোয়া ঘন্টা পরেই উপরে যেতে হবে। তখন আর কথা বলার কোনো ফুরসৎ থাকবে না। তাই, যা জানতে চান, দ্রুত এখনই বলে ফেলুন।”

     ভুবন বুকের উপরে হাত রেখে একটু পিছনে হেলে সিরিয়াস গলায় বলে, “আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে ব্যাপার গুরুতর। এইবারে বলুন ঘটনাটা আসলে কী?”

     অতীশ আবার রেগে যান, “এই দু’মাস ধরে আমাদের নিয়ে কলাম লিখে টিখে শেষে এখন বলছেন ঘটনাটা আসলে কী? আপনি কি এই ক্রান্তিকালে মজা করতে এসেছেন?”

     “না না, না স্যর, মজা না। আমি জানি আপনারা বলেছেন একটা মহা অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে গোটা গ্রহে, আর গোটা মানবসভ্যতা ধ্বংস হবে। কিন্তু এই ঘটনার নেপথ্যের বিজ্ঞানটা কী, সেটাই জানতে চাই।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “ওঁর কাছে জানতে চাইবেন না। উনি যদি বলেনও, তাড়া তাড়া কাগজে ইয়া ইয়া সব চার্ট গ্রাফ সংখ্যা আর মস্ত মস্ত সব ইকোয়েশন টিকোয়েশন দিয়ে এমনভাবে আপনার মাথা গুলিয়ে দেবেন, যে যাও বা একটু একটু বুঝেছিলেন, তাও ভুলে যাবেন।”

     ভুবন শ্রীনিবাসের দিকে চেয়ে হাসে, বলে, “ঠিক আছে তাহলে আপনি বলুন।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “সাংবাদিক মশাই, আপনি নিশ্চয় জানেন যে আমাদের নগমা গ্রহের সভ্যতার গতি চক্রাকার। সভ্যতা শুরু হয়, একটা সময় উন্নতির চরমে ওঠে, তারপরেই পতন হয়, আবার নতুন করে সভ্যতা শুরু হয়।”

     ভুবন বলে, “হুঁ, জানি। এটা তো প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটা তত্ত্ব। ফ্যাক্ট বলে গৃহীত হয়েছে কী?”

     শ্রীনিবাস বলে, “প্রায় গৃহীত বলা যায়। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়ও। গোটা ইতিহাসে সন্ধান পাওয়া গিয়েছে পর পর মোট ন’টা সভ্যতার, সব কটাই শুরু থেকে বেশ মসৃণভাবে উন্নতি করেছে, কিন্তু উন্নতির চরমে পৌঁছে হঠাৎ আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে সব ক’টাই, একেবারে কোনো ব্যতিক্রম নেই। কেন এরকম হল তার কোনো যথাযোগ্য কারণ পাওয়া যায় না, আগুনে সব এমনভাবে পুড়ে গিয়েছে, কোনো ক্লু পাওয়া যায় না যে কেন হঠাৎ সব ওভাবে শেষ হলো।”

     ভুবন বলে, “এই সভ্যতাগুলোর আগে একটা প্রস্তরযুগ ছিল না?”

     শ্রীনিবাস বলে, “ছিল, তবে সেই সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তখন মানুষ ছিল প্রায় বনমানুষ।”

     ভুবন বলে, “তারপরে?”

     শ্রীনিবাস বললেন, “সভ্যতা বলতে আমরা যা বুঝি, তা ঐ ন’টা সভ্যতা। শুরু হয়, এগিয়ে চলে, তারপরে আগুনে ভস্মীভূত। নানারকম তত্ত্ব আছে এর কারণ হিসেবে, কোনো তত্ত্ব বলে আকাশ থেকে আগুনবৃষ্টি হয়, কোনো তত্ত্ব বলে নগমা কোনো একটা সূর্যের মধ্য দিয়ে যায়—আরো নানা থিওরি আছে এরকম। তবে গত কয়েক

     শতক ধরে একটা তত্ত্ব একটা গুপ্তসমিতির মধ্যে সযত্নে রক্ষিত হচ্ছে—”

     ভুবন বলে, “ঐ নক্ষত্রতত্ত্ব তো? গুপ্তসমিতির পবিত্র গ্রন্থে যা আছে?”

     শ্রীনিবাস বলে, “হ্যাঁ। ওদের বইতে আছে, প্রতি ২০৫০ বছর অন্তর অন্তর নগমা ঢোকে এক বিশাল গুহায়, ছ’টা সূর্যই পড়ে যায় আড়ালে, তখন ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় গ্রহ। আর সেই অন্ধকারে নাকি বের হয়ে আসে নক্ষত্র বলে একরকমের জিনিস, ওরা নাকি মানুষদের মনের সমস্ত শুভবুদ্ধি চুরি করে নেয়। তখন মানুষ পাগল হয়ে যায়, নিজেদের তৈরী সভ্যতা নিজেরাই পুড়িয়ে দেয় আগুনে। মূল বক্তব্য এই। যদিও ওদের বইয়ে অনেক রহস্যময় কবিতা টবিতা দিয়ে বিশদ করে বলা আছে, কিন্তু আসল কথা এইটাই।”

     একটু থামলেন শ্রীনিবাস, তারপরে গভীর করে শ্বাস নিয়ে বললেন, “এদিকে আমরা সম্প্রতি পেয়েছি বিজ্ঞানের নতুন একটি সূত্র, মহাকর্ষ সূত্র।”

     অতীশ এইখানে কেমন যেন রেগে গেলেন আবার, শ্রীনিবাসের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেলেন ঘর থেকে।

     ভুবন ফিসফিস করে বলে, “কী হয়েছে? কোনো ঝামেলা?”

     শ্রীনিবাস বলে, “তেমন কিছু না। অতীশ তখন আমায় বলছিলেন দু’জন লোক, এই অব্জার্ভেটরির কর্মীই, এসে পড়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, তারা আসছে না। এদিকে ওদেরকে দরকার আজকের পর্যবেক্ষণ কাজে। তাই হয়তো দেখতে গেলেন ওরা এলো কিনা।”

     ভুবন বলে, “কারা ওরা?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “প্রমিত আর ইমন। এসে পড়বে নির্ঘাৎ। ঘন্টাখানেকের মধ্যে না এলে ব্যাপারটা একটু ঝামেলারই হবে। তবে আশা করছি এসে পড়বে ওরা।”

     ভুবন আগের আলোচনায় ফিরতে চায়, বলে, “আপনি মহাকর্ষ বিষয়ে যেন কী বলছিলেন?”

     শ্রীনিবাস বলে, “হ্যাঁ, মহাকর্ষ। আপনি কিছু জানেন এই ব্যাপারে?”

     ভুবন বলে, “তেমন কিছু জানি না। শুধু নাম শুনেছি। আর, শুনেছি এ একদম নতুন তত্ত্ব আর এর জন্য যে অঙ্ক টঙ্ক লাগে তা খুব জটিল। গোটা নগমা গ্রহের মাত্র ১২ জন নাকি গোটাগুটি ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। খুব কঠিন নাকি এই তত্ত্ব।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “যাহ, এত কঠিন কিছু না। এর গণিত জটিল, কিন্তু মূল ব্যাপার জটিল না। মহাকর্ষ তত্ত্ব বলে সমস্ত বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করে আর এই আকর্ষণ বল বস্তুদের ভরে গুণফলের সমানুপাতিক আর দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। ব্যস, এই।”

     ভুবন অবিশ্বাসের গলায় বলে, “মাত্র এই?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “হুঁ, মূল কথা এই। কিন্তু চারশো বছর লাগলো এই জানতে।”

     ভুবন বলে, “কেন? শুনে তো মনে হল জলবৎ তরলম ব্যাপার।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “শুনতে ওরকম লাগে। কিন্তু আসল ব্যাপার এত সোজা না। দীর্ঘমেয়াদী কার্যধারা আছে এর পেছনে। প্রচুর পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক হিসেব টিসেব আছে। সেই যে চার শতাব্দী আগে জ্ঞানভী ৪১ আবিষ্কার করেছিলেন যে নগমা ঘুরছে আলফা নামক সূর্যটিকে ঘিরে, সেই থেকে কাজের শুরু। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কাজ করে চলেছেন পর্যবেক্ষণের আর সেই অনুসারে গাণিতিক বিশ্লেষণের। ছয়টি সূর্যের কক্ষপথের বিশ্লেষণ করা হয়েছে আতিপাতি করে, তত্ত্বের পর তত্ত্ব এসেছে, পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে না মিললে হয় বাতিল করা হয়েছে তত্ত্ব নয়তো পরিবর্তন করা হয়েছে। এইভাবে চলেছে শতকের পর শতক, ভাবতে পারেন?”

     ভুবন বলে, “হ্যাঁ, খুবই পরিশ্রমসাধ্য কাজ।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “তারপরে একসময়ে মহাকর্ষ সূত্রটি পাওয়া গেল অনেক ঝাড়াইবাছাই ইত্যাদি করে। আজ থেকে প্রায় দু’দশক আগে প্রথম দেখানো সম্ভব হয় যে এই ছয়টি সূর্যের কক্ষপথ মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে যা হবার কথা, ঠিক তাই। তখন লোকে মেনে নন। স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল সেটা, বহুবিতর্কিত মহাকর্ষ তত্ত্বের জয়।”

     শ্রীনিবাস চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গেলেন, বাইরে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের এই গ্রহ নগমা, আলফা ঘিরে ঘুরছে। নগমার কক্ষপথের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, অসঙ্গতি থাকছে। মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে ওর কক্ষপথ যা হবার কথা, তা নয়। ঘোর রহস্য। হয় সূত্রটি ভুল নয়তো অজানা কোনো ফ্যাকটর হিসেবের মধ্যে নেওয়া হয় নি।”

     ভুবন এসে শ্রীনিবাসের পাশে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে দূরে শরণ্য শহরের উঁচু মিনারগুলো দেখা যাচ্ছে, লাল সূর্য বিটা থেকে আসা আলোয় লাল হয়ে জ্বলছে।

     ভুবন বলে, “স্যর, তারপরে কী হল? নগমার কক্ষপথের হিসেব মেলানো গেল?”

     শ্রীনিবাস বললেন, “জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নানারকম তত্ত্ব দিতে লাগলেন, খাটলো না কোনোটাই। তারপরে অতীশ একসময় একটু অপ্রচলিত পথে গেলেন। তিনি গুপ্তসমিতির প্রধান, শায়ক ৫ এর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। শায়কের কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল যে ঐ কক্ষপথের রহস্যটি অনেকটা সহজ হয়ে গেল। অতীশ নতুন করে হিসেব করলেন সব।”

     ভুবন উত্তেজনা সংহ্ত গলায় বলে, “ কী হিসেব?”

     “অতীশ ভেবে দেখলেন, নগমার মতই যদি আরেকটা বস্তু থাকে যার নিজস্ব কোনো আলো নেই, কেবল সূর্যগুলো থেকে পাওয়া আলো প্রতিফলিত করতে পারে সে, তাহলে আমাদের এই আকাশে যেখানে সবসময় একাধিক সূর্য থাকে, সেই আলোর ছটায় ঐ আলোহীন বস্তুটাকে দেখা যাবে না।”

     ভুবন বলে, “কী অদ্ভুত ধারণা!”

     শ্রীনিবাস বলেন, “অদ্ভুতের তো সবে শুরু। ঐ বস্তুটি নগমা উপগ্রহ, নগমা ঘিরে ঘোরে সে। ওর মহাকর্ষটি হিসেবের মধ্যে নিলেই নগমার কক্ষপথের অসঙ্গতি একেবারে দূর হয়ে যায়, খাপে খাপে মিলে যায় গণিত আর পর্যবেক্ষণ।”

     ভুবন কিছু বলতে পারে না, অবাক হয়ে চেয়ে থাকে শুধু।

     শ্রীনিবাস বলে, “ঐ উপগ্রহটিই আসছে বিটা আর নগমার মাঝখানে। বিটা আর ঐ উপগ্রহের কক্ষতল এক। ঐ উপগ্রহ মঝখানে এলে বিটার আলো আটকে যাবে, উপগ্রহের ছায়া পড়বে নগমার উপরে। ঘটবে গ্রহণ। এখন বিটা সবচেয়ে দূরে আর উপগ্রহটি সবচেয়ে কাছে, তাই বিটার আপাত আকার ঐ উপগ্রহের আপাত আকারের চেয়ে অনেক ছোটো, সাতভাগের একভাগ। ঐ গ্রহণ চলবে বহু ঘন্টা ধরে। নগমা নিজের অক্ষের উপরে ঘুরছে, এতক্ষণ গ্রহণ চলবে বলে গোটা গ্রহের সমস্ত অংশই পড়বে ছায়ার ভিতরে। আমরা দেখতে পাবো প্রথম রাত্রি, অন্ধকারের প্রথম অভিজ্ঞতা হবে আমাদের। গুপ্তসম্প্রদায়ের পবিত্র পুঁথির কাহিনি অনুযায়ী, নক্ষত্র বলে একরকম জিনিস নাকি দেখা যাবে ঐ অন্ধকারে। অন্ধকারে সবাই পাগল হয়ে যাবে, আমাদের সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে। দু’হাজার ঊনপঞ্চাশ বছর পর পর এমন কালরাত্রি নামে নগমার বুকে। “

     ভুবন কেমন যেন একটা হতভম্বের মতন হয়ে যায়, বলে, “এই তাহলে পুরো বৃত্তান্ত?”

     মনোবিদ মহাশয় বলেন, “পুরো ব্যাপারের প্রথমটা হল অন্ধকার, তারপরে নাকি বেরিয়ে আসবে নক্ষত্র বলে একরকম জিনিস, লোকে পাগল হয়ে যাবে আর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে শহরকে শহর। সভ্যতা ধ্বংস হবে। তারপরে আবার নতুন করে শুরু হবে সভ্যতার পরবর্তী চক্র, দশম সভ্যতা।”

     ভুবন বলে, “কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে এমন কী আছে যে মানুষ পাগল হবে?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “অন্ধকার দেখেছেন কখনো? জানেন কীরকম হয় অন্ধকার?”

     ভুবন বলে, “অন্ধকার?” তারপরে মনে মনে হাতড়ে হাতড়ে হঠাৎ যেন উত্তর খুঁজে পেয়ে বলে,” গুহার ভিতরে যেমন থাকে।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “গুহার ভিতরে গিয়েছিলেন কোনোদিন?”

     ভুবন বলে, “না না, গুহায় যাই নি। শুনেছি।”

     শ্রীনিবাস বলেন , “আমিও তাই অনুমান করছি যে আপনি যান নি গুহার ভিতরে। আমি গত সপ্তাহে একবার একটা চেষ্টা করেছিলাম, জাস্ট অভিজ্ঞতাটুকু পাওয়ার জন্য। কিন্তু বেশীদূর যেতে পারিনি, ঊর্ধশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে এসেছিলাম। উফ্ফ, সাংঘাতিক।”

     ভুবন বলে, “আমি গেলে ঐভাবে পালিয়ে আসতাম না নিশ্চয়। অন্ধকারে এত ভয়ের কী আছে?”

     শ্রীনিবাস রেগে যান একটু, বলেন, “নিজে তো টের পান নি, তাই বলছেন। জানালার ঐ পর্দাটা টেনে বাইরের আলো ঢেকে দিন তো দেখি কেমন পারেন। পর্দা টেনে দিয়ে তারপরে এইখানে আমার পাশে এই চেয়ারে এসে বসবেন। “

     ভুবন জানালার কাছে গিয়ে কাঁপা হাতে পর্দা টেনে বাইরের আলো আটকে দেয়। ঘর অন্ধকার। ভুবনের নিজের পায়ের শব্দই কেমন অদ্ভুত ভৌতিক লাগে সে যখন হেঁটে হেঁটে চেয়ারের দিকে আসার চেষ্টা করে। ফিসফিস করে সে বলে, “স্যর, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না। কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “অন্ধকারে দেখা যায় না। আপনি হাতড়ে হাতড়ে বুঝে বুঝে আসুন।”

     কীসের সঙ্গে যেন ধাক্কা খায় ভুবন, আর্ত গলায় বলে, “দেয়ালগুলো যেন চেপে আসছে সবদিক থেকে। আমার –আহ–আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। স্যর, পর্দা সরিয়ে দিন প্লীজ, আলো আলো আলো একটু আলো–স্যর, আমি মরে যাচ্ছি অন্ধকারে।”

     শ্রীনিবাস উঠে গিয়ে হ্যাঁচকা টানে পর্দা সরিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছতে থাকেন, বলেন, “উফফ, কীরকম যে লাগছিল! শুধু একটা অন্ধকার ঘর! তাতেই এই অবস্থা। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেলে — পাগল হতে ইচ্ছে করে না, তার আগেই যেন মরণ হয়।”

     বাইরে থেকে লাল আলো এসে ঘর ভরে দিয়েছে আবার, ভুবন আনন্দে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে জানালায় গিয়ে চেয়ে থাকে আকাশের লালসূর্যের দিকে।

     ভুবন সুস্থ বোধ করছিল আলো পেয়ে, বললো, “অন্ধকার—বেশ বিদঘুটে ব্যাপার- কষ্ট হবে, অস্বস্তি হবে, কিন্তু মনে হয় সহ্য করে নিতে পারবে মানুষ।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “হুঁ, একটা অন্ধকার ঘর সহ্য করতে পারবে কোনোক্রমে। কিন্তু গোটা দুনিয়া যদি—আচ্ছা, দু’বছর আগে আপনি জঙ্গম শহরের শতবর্ষপূর্তি উৎসবে গিয়েছিলেন কি? “

     ভুবন বলে, “না, জঙ্গম শহরে যাই নি। ওখানে কোনো অ্যাসাইনমেন্ট পড়ে নি আমার। এমনি এমনি ছ হাজার মাইল দূরে যাওয়া পোষায় নি, অত দূরে জাস্ট উৎসব দেখতে যাবার মতন অত টাকাও নেই আমার।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “আমি গিয়েছিলাম। আপনার কি মনে আছে ঐ উৎসবে একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল, “রহস্যময় সুড়ঙ্গ”, তখন কাগজে অনেক লেখালিখি হচ্ছিল এই নিয়ে।”

     ভুবন বলে, “হুঁ, মনে আছে। কী একটা ঝামেলাও যেন হয়েছিল তখন এই নিয়ে।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “তেমন কিছু না, একটু যা হয়েছিল তাড়াতাড়ি চাপা দেওয়া হয়েছিল। আসলে ব্যাপারটা তেমন কিছু না, একটা মাইলখানেক লম্বা সুড়ঙ্গ, ভিতরে কোনো আলো নেই। দর্শকরা একটা খোলা গাড়ীতে ওর মধ্যে ঢোকে, মিনিট পনেরো ধরে ঐ অন্ধকারের মধ্যে গড়গড় করে চলতে চলতে সুড়ঙ্গের অন্য মুখ দিয়ে গাড়ী ওদের নিয়ে বাইরে আসে। এই খেলাটা খুব জনপ্রিয় ছিল যতদিন না আইন করে বন্ধ করা হল।”

     ভুবন অবাক হয়ে বলে, “জনপ্রিয়?”

     মনস্তত্ত্ববিদ হাসেন, বলেন, “নিশ্চয়। মানুষ ভয়ের উত্তেজনা নিতে চায় যতক্ষণ ব্যাপারটা খেলার মতন থাকে। মানুষ জন্মায় তিনটে সহজাত ভয় নিয়ে, এক হলো প্রচন্ড শব্দের ভয়, দুই হল পড়ে যাবার ভয় আর তিন হল অন্ধকারের ভয়। সেইজন্যেই তো আড়াল থেকে এসে কারুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কানে কূ দেওয়া শিশুদের কাছে প্রিয় খেলা। সেইজন্যেই নাগরদোলায় চড়া অনেকের কাছে প্রিয়। সেইজন্যেই ঐ অন্ধকার সুড়ঙ্গের খেলাও দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। মানুষ টিকিট কেটে কেটে ঐ ভয় পেতে চেয়েছে, বেরিয়ে এসেছে ভয়ে আধমরা হয়ে, তবু আবারও এসেছে পরে আবার টিকিট কেটে ঢুকবে বলে।”

     ভুবন বলে, “এক মিনিট। কয়েকজন মারা গিয়েছিল না? ঐ সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দেবার পর এই নিয়ে কিছু শোনা গিয়েছিল যেন!”

     শ্রীনিবাস বললেন, “দু’তিনজন দুর্বল হার্টের লোক মারা গিয়েছিল। কিন্তু ওদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল উৎসব কর্তৃপক্ষ থেকে, আর জঙ্গম শহরের শাসন পরিষদও ব্যাপারটা বুঝে মিটমাট করে ফেলেছিলেন। শত হলেও লোকেরা তো জেনেশুনে নিজেরা ঝুঁকি নিয়েই ঢুকেছিল। ওদের তো জোর করে ঢোকানো হয় নি। ঐ ঘটনার পরে একজন ডাক্তারকে নিয়োগ করা হয়, সুড়ঙ্গে ঢোকার আগে তিনি দর্শকদের পরীক্ষা করে দেখতেন হার্ট যথেষ্ট সবল কিন। ডাক্তার সম্মতি দিলে তবে দর্শক যেতে পারত। ভালোই চলছিল ঐ খেলা।”

     ভুবন বলে, “তারপর?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে থাকে। কিছু কিছু লোক, প্রতি দশজনে একজন, সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসে একদম সুস্থ স্বাভাবিক কিন্তু কিছুতেই তারা কোনো বাড়ীঘরে ঢুকতে চায় না। প্রাসাদ, দুর্গ, কুটির, তাঁবু-যেখানেই চারপাশটা আর মাথার উপরটা ঢাকা, সেখানে ঢুকতেই ওরা অস্বীকার করে।”

     ভুবন অবাক, “সে কি? রাতে ঘুমাতো কোথায় ওরা?”

     শ্রীনিবাস গম্ভীর গলায় বলেন, “খোলা আকাশের নিচে।”

     ভুবন বলে, “অন্যেরা ওদের জোরজার করে ঘরে নিয়ে গেলে পারতো।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “সেই চেষ্টা কি আর করেনি অন্যেরা? করেছে। তাতে ঐ ঘরে যেতে ভয় পাওয়া লোকগুলো উন্মত্তের মতন আচরণ করেছে, আঁচড়ে কামড়ে দিয়ে হাত ছাড়িয়ে পালিয়েছে। দুই তিনজনে মিলে যাদের ধরে ঘরে নিয়েছে, সেইসব ক্ষেত্রে ওরা কাছে কোনো দেয়াল দেখামাত্র সেখানে মাথা ঠুকতে আরম্ভ করেছে যতক্ষণ না রক্তাক্ত হয়ে যায়। কেবল কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ছাড়া ওদের ঘরে রাখা যায় নি।”

     ভুবন ফিসফিস করে বলে, “লোকগুলো পাগল হয়ে গিয়েছিল।”

     শ্রীনিবাস বলে, “একদম তাই। সুড়ঙ্গে ঢোকা মানুষদের মধ্যে প্রতি দশজনে একজন ওরকম পাগল হয়ে যায়। তখন উৎসব কর্ত্তৃপক্ষ মনস্তত্ত্ববিদদের ডেকে পাঠান। আমরা ওখানে গিয়ে সবকিছু দেখেশুনে ঐ সুড়ঙ্গে ঢোকার খেলা বন্ধ করে দেবার ব্যবস্থা করি। আর কীই বা করার ছিল?”

     ভুবন বলে, “ঐ লোকগুলোর আসলে কী হয়েছিল? কেন ওরা ঘরে যেতে ভয় পেত?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “এই একটু আগে ঘর অন্ধকার হবার পর আপনার যেমন হয়েছিল, ওদেরও তাই। মনে হতো দেওয়ালগুলো চারদিক থেকে চেপে আসছে ওদের উপর। একে মনস্তত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় বলে ক্লসট্রোফোবিয়া বা বদ্ধস্থানাতঙ্ক। অন্ধকার আর বদ্ধস্থানাতঙ্কের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। মানুষের সহজাত অন্ধকারে ভয় ব্যাপারটা বদ্ধ জায়্গায় প্রকট হয়ে ওঠে, তাই ঐ বদ্ধস্থানাতঙ্ক আর অন্ধকারে ভয় একটা আরেকটার পরিপূরক।”

     ভুবন বলে, “সুড়ঙ্গে ঢুকে ঐ লোকগুলোর ক্লসট্রোফোবিয়া হয়েছিল? অন্যদের তো হয় নি!”

     শ্রীনিবাস বলেন, “ঐ মানুষগুলোর আসলে ক্লসট্রোফোবিয়াকে মোকাবিলা করার মতন মানসিক সবলতা ছিল না। তাই অন্ধকারে ওরা ঐ বদ্ধস্থানাতঙ্কে আক্রান্ত হয় আর ঐ আতঙ্ক থেকে পরেও বেরোতে পারে না। ওরা হয়তো আগে থেকেই কিছুটা আতঙ্কপ্রবণ ছিল, অন্ধকারে সেটাই কাল হল। পনেরো মিনিট দীর্ঘ সময়, ঐ সুচীভেদ্য অন্ধকারের ভিতর দিয়ে পনেরো মিনিট— আপনি তো মাত্র দেড় দু’মিনিট অন্ধকার ঘরে ছিলেন, তাতেই যথেষ্ট আপসেট দেখাচ্ছিল আপনাকে।”

     দীর্ঘ নীরবতা এর পর। চুপ করে থাকেন দুটি মানুষ, প্রৌঢ় মনস্তত্ত্ববিদ আর যুবক সাংবাদিক।

     একসময়ে ভুবন মরীয়া গলায় বলে, “নাহ, এত খারাপ হবে না ব্যাপারটা। বিশ্বাস হয় না আমার।”

     শ্রীনিবাস বলেন,” সে আপনি বিশ্বাস করতে চান না, তাই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকান দেখি।”

     ভুবন বাইরে তাকায়, শ্রীনিবাস কেমন এক অদ্ভুত মন্ত্রের মতন সুরে বলে যান, “ভাবুন অন্ধকার। আপনার ডাইনে বাঁয়ে উপরে নিচে সামনে পিছনে সূচীভেদ্য অন্ধকার। যতদূর চোখ যায় কোনো আলো নেই। আকাশ জমি বাড়িঘর গাছপালা সব ঘন কালো অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে। তারপরে, বেরিয়ে এলো নক্ষত্র না কী বলে, সেইগুলো। কল্পনা করতে পারেন?”

     ভুবন কেমন বিদ্রোহীর মতন গলায় বলে, “পারি, পারি কল্পনা করতে। অন্ধকার, কালো, নক্ষত্র- ওহ্হ”, শেষদিকে ভেঙে যায় ওর গলা।

     শ্রীনিবাস বলেন, “না, পারেন না। আমাদের মস্তিষ্ক ঐ জিনিস ধারণ করতে পারে না, সেভাবে তৈরী হয় নি আমাদের মগজ। অসীম বা অনন্ত কে যেমন আমরা অনুভব করতে পারি না, এও সেইরকম। শুধু আমাদের বানানো নানা শব্দ দিয়ে ও নিয়ে কথা বলতে পারি মাত্র। সত্যি সত্যি জিনিসটা কী তা আমরা কেউ অনুভব করতে পারি না। বাস্তবতার একটা সামান্য অংশমাত্র দেখে শিউরে উঠেছি আমরা, যখন সত্যি সত্যি সেই সর্বব্যাপী অন্ধকার আসবে, তখন আমাদের মন কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না, সবাই উন্মাদ হয়ে যাবো।”

     একটু থেমে বিষন্ন নিস্তেজ গলায় তিনি বলেন, “আরো দুই সহস্রাব্দীর সমস্ত মেধা সমস্ত পরিশ্রম সমস্ত প্রচেষ্টা আবার জলে যাবে। কালকে গোটা নগমা গ্রহে একটি শহরও আস্ত থাকবে না।”

     ভুবন বলে, “অন্ধকারে নাহয় পাগল হয়েই গেলাম সবাই। কিন্তু শহর কী করে ধ্বংস করবো?”

     শ্রীনিবাস কেমন রেগে রেগে বলেন,”অন্ধকারে কোন্‌ জিনিসটা সবচেয়ে বেশি করে চাইবে সবাই? আলো। আলো কী করে পাবে? আগুন থেকে। উনুন তো দেখেছেন। আগুন শুধু তাপ দেয় না, আলো ও দেয়। অন্ধকারে উন্মত্ত মানুষেরা হাতের কাছে যা পাবে তাতেই আগুন দেবে। হ্যাঁ, আলো তারা পাবে। তাদের সভ্যতা জ্বলে যাবে আগুনে।”

     ভুবন স্থির চোখে চেয়ে রইল শ্রীনিবাসের চোখের দিকে, যেন একটা মানসিক লড়াই হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পরে প্রথমে ভুবনের চোখের পাতা পড়ল, সে সরে গেল একটু, ও হাঁপিয়ে শ্বাস নিচ্ছিল, ওর মনটা এতটাই দুর্বল, ভেঙে পড়া অবস্থায় চলে গিয়েছিল ঐ কাল্পনিক সর্বব্যাপী অন্ধকার আর অজানা নক্ষত্র না কী বলে সেইসব, উন্মত্ত মানুষের দল আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে তাদের নিজেদের সমস্ত জিনিসপত্র—এইসব ঘোর গন্ডগোলের কথা ভেবে যে পাশের ঘরের গন্ডগোলের শব্দটা খেয়লাই করেনি প্রথমে।

     শ্রীনিবাস বললেন, “ইমনের গলা শুনলাম যেন! মনে হয় ইমন আর প্রমিত ফিরেছে। চলুন তো দেখি।”

     ভুবন বলে, “চলুন।” সে নিজেকে নাড়া দিয়ে সম্বিৎ ফিরিয়ে আনে, ভাবে, “যা হবার হবে ভেবে লাভ নেই, এত টেনশন আর নিতে পারি না।”

     পাশের ঘরে তখন হুলুস্থুলু অবস্থা। অবজার্ভেটরির বিজ্ঞানী আর কর্মীরা সবাই দুই তরুণকে ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছে।

     এই দুই তরুণ, প্রমিত আর ইমন, তখন নিজেদের ওভারকোটগুলো খুলে ঝুলিয়ে রাখছে আর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা করছে।

     অতীশ বেশ রাগত আর উদ্বিঘ্ন গলায় ইমন আর প্রমিতকে বলছিলেন, “আরে, তোমাদের আক্কেল কবে হবে? আর আধঘন্টাও বাকী নেই গ্রহণ শুরু হতে। এতক্ষণ ছিলে কোথায় তোমরা?”

     প্রমিত ২৪ হাতে হাত ঘষে গরম করতে চেষ্টা করছিল, বাইরে ঠান্ডা খুব, ওদের দু’জনের নাকের ডগা, গাল লালচে দেখাচ্ছিল বাইরে থেকে এলো বলে।

     চেয়ারে বসে নিয়ে তারপরে প্রমিত বললো, “আমি আর ইমন আমাদের একটা ছোট্টো এক্সপেরিমেন্ট করে এলাম এখন। আমাদের এক্সপেরিমেন্টটা ছিল কৃত্রিমভাবে অন্ধকার আর নক্ষত্রের মতন কিছু সিমুলেট করে দেখা। মানে একটা আন্দাজ পাওয়া আরকি কীরকম দেখাবে।”

     সবাই শুনে ফিসফাস করে নানা কথা বলতে লাগলো, অতীশ সাগ্রহে এগিয়ে এসে বললেন, “এক্সপেরিমেন্ট কীরকম হলো? কী দেখলে?”

     প্রমিত বললো, “সত্যি বলতে কি অনেকদিন আগেই এই আইডিয়া আমাদের মনে এসেছিল। তারপর ইমন খবর আনলো শহরে একটা একতলা বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে যার ছাদটা গম্বুজাকার। আগে বাড়ীটা ছিল মিউজিয়াম। ব্যস, আমরা ও বাড়ী কিনে নিলাম আমাদের এক্সপেরিমেন্টের জন্য।”

     অতীশ তো অবাক, “বাড়ী কিনে নিলে? টাকা কোথায় পেলে?”

     ইমন হেসে বলে, “আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যা ছিল সব তুলে নিলাম। দুজনের টাকা মিলিয়ে হয়ে গেল কেনা। এ টাকা জমা থেকেই বা কী হতো? আগামীকাল থেকে তো সব খোলামকুচি। যাই হোক গম্বুজ ছাদওয়ালা বাড়ীটা কিনে আমরা নানা টুকটাক পরিবর্তন ঘটালাম মিস্ত্রী লাগিয়ে।  তারপরে করলাম আমাদের এক্সপেরিমেন্ট।”

     প্রমিত বলে, “আমরা বাড়ীটা কিনে নিয়ে ঐ গোল গন্বুজের মতন ছাদওয়ালা ঘরটায় মেঝে থেকে ছাদ অবধি সব কালো ভেলভেট দিয়ে মুড়ে ফেলি, যাতে দরজা বন্ধ করে দিলে ঘর একদম ঘন অন্ধকার হয়ে যায়। গোল ছাদে কিছু গর্ত করি, গর্তগুলো বাইরে থেকে ধাতব ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করি, তারপরে এমন ব্যব্স্থা করি  যাতে এগুলো সব একসাথে সরে যায় একটা সুইচ টিপলে। এইসবের জন্য অবশ্য ইলেক্ট্রিশিয়িআন আর কাঠমিস্ত্রীদের লাগানো হয়েছিল। টাকাটা তেমন সমস্যা ছিল না, আমরা তো জানিই যে আমাদের সঞ্চয় করা টাকা আর পরে কাজে লাগবে না, তাই যতটা পারা যায় লাগিয়ে ফেললাম। যাই হোক, এসবের পর এমন ব্যব্স্থা হলো যে ঘরের মধ্যে অন্ধকার আর ঐ সুইচ টিপে ধাতব ঢাকনি সরিয়ে গর্তগুলোর মধ্য দিয়ে আলো আনা–যাতে কিনা ঐ যে নক্ষত্র না কী বলে, সেইগুলোর মতন কিছু দেখা যায়।”

     প্রমিত এইখানে একটু থামে, যারা শুনছিল তারা সব রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল, কেউ কোনো শব্দ করে না। শুধু অতীশ কেমন একটা অদ্ভুত আড়ষ্ট গলায় বলেন, “তোমরা এরকম একটা কান্ড পুরো প্রাইভেটে করলে—এরকম করার তো কোনো অধিকার নেই তোমাদের!”

     প্রমিত একটু লাজুক গলায় বলে, “জানি স্যর, জানি। কিন্তু আমরা আসলে আর কারুকে জানাতে চাইনি, কারণ আমরা ভেবেছিলাম বেশ ভয়ানক কিছু ওখানে ঘটবে। মনস্তত্ত্ববিদরা  যেমন বলেছেন, আমরাও প্রায় তাই ভেবেছিলাম যে আমরা উন্মাদ হয়ে যাবো হয়তো। তাই নিজেরাই ঝুঁকি নিয়ে করতে চেয়েছি, আর কারুকে জড়াতে চাই নি। আশা করি আপনি আমাদের ভুল বুঝবেন না স্যর। আমরা এও ভেবেছিলাম যে যদি আমরা শারীরিক মানসিকভাবে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসি, তাহলে ঐ অন্ধকার আর নক্ষত্রের মুখোমুখি হবার ব্যাপারে আমাদের ইমিউনিটি তৈরী হবে, সেই উপায় প্রয়োগ করে তাহলে বাকীদেরও—কিন্তু কিছুই হলো না। আমাদের এক্সপেরিমেন্ট একেবারে ব্যর্থ, কোনো কাজের কাজই হল না।”

     অতীশ বললেন, “কেন, কী হলো সেখানে?”

     এইবারে ইমন উত্তর দিল, “আমরা ঐ ঘরে ঢুকে তো দিলাম দরজা বন্ধ করে। অন্ধকারে চোখ সইয়ে নেবার মতন সময় নিলাম। কিন্তু অদ্ভুত সেই অনুভূতি, দেয়ালগুলো যেন চারপাশ থেকে এগিয়ে এসে পিষে ফেলতে চায়, সেরকম অনুভূতি হচ্ছিল দু’জনেরই। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে মনকে বুঝ দিতে থাকলাম, এরকম কিছু আসলে হচ্ছে না, এটা মনের ভয় মাত্র। তারপরে সুইচ টিপলাম, গর্তগুলোর উপর থেকে সরে গেল ঢাকনা, বিন্দু বিন্দু আলো দেখা দিল।” ইমন এইটুকু বলে থামে।

     অতীশ বললেন, “তারপর?”

     ইমন ক্লান্ত গলায় বলে, “তারপরে আর কিছু না। কিচ্ছু হলো না। একটা ছাদ আর তাতে কতগুলো গর্ত, গর্ত দিয়ে আলো আসছে। এইমাত্র। আর কোনো অন্য অনুভূতি হলো না আমাদের। বারে বারে পুরো ব্যাপারটা রিপিট করলাম, কিচ্ছু না। এত দেরি হলো তাই। সব ব্যর্থ। একটা গোল ছাদ, তাতে কতগুলো গর্ত, ব্যস। ছি ছি, এইজন্য এতগুলো দিন ধরে আমরা—”

     ইমন থামে, চারিপাশে অদ্ভুত নীরবতা, সবাই এত অবাক যে নড়াচড়াও ভুলে গিয়েছে।

     সবচেয়ে বেশী অবাক শ্রীনিবাস, চোখ গোল গোল করে তিনি চেয়ে আছেন ইমনের দিকে। প্রথম কথা বলে ভুবন, বলে, “শ্রীনিবাস, আপনাদের ঐ তত্ত্ব, মানুষের মনের উপরে অভূতপূর্ব অন্ধকার ও নক্ষত্রের প্রভাব নিয়ে যে তত্ত্বটা, সেটা কিন্তু এবারে ফর্দাফাঁই স্যর।” ভুবন হাসছিল, একটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচার মতন হাসি।

     শ্রীনিবাস একটা হাত তুলে বললেন, “একটা কথা আছে আমার। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে ভালো করে ভেবে দেখতে চাই, একটু সময় লাগবে। এই ব্যাপারটা —এই ইমন আর প্রমিতের এক্সপেরিমেন্টটা—”

     কথাটা শ্রীনিবাস শেষ করার আগেই ধুপধাপ করে কী যেন পড়ে গেল কোথায়। ভীন বিদ্যুতের মতন ছিটকে উঠে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল।

     তারপরেই তার চিৎকার শোনা গেল, “আরে!!! এই লোকটা এখানে কেন? শয়তান! আমাদের যন্ত্রপাতিতে যদি কিছু ঝামেলা করে থাকিস তুই–তাহলে আমি তোকে–হুঁ, আমার নাম ভীন, আমি সহজে কারুকে ছেড়ে দিই না।”

     ভীনকে অনুসরণ করে বাকীরাও উপরে দৌড় দিল। উপরে তখন ভয়াবহ কান্ড।

     ফোটোগ্রাফিক প্লেটগুলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে, আর ভীন এক অপরিচিত ব্যক্তির গলা টিপে ধরে চিৎকার করছে, “কেন এসেছিস এখানে? কে পাঠিয়েছে তোকে?”

     লোকটির মুখ লাল, চোখ ঠিকরে আসছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে, দুর্বল হাতে সে ভীনের বজ্রমুষ্ঠি আলগা করতে চাইছে—এই অবস্থায় এসে গেলেন অতীশ। বললেন, “ভীন, ভীন, ওকে ছেড়ে দাও।”

     ভীন ছেড়ে দিলে লোকটা জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়, চোখমুখ লাল থেকে স্বাভাবিক রঙে আসে। লোকটি ছোটোখাটো চেহারার মানুষ, চুল দাড়ি এমনভাবে বাঁধা যে দেখেই বোঝা যায় এ সেই বিশেষ গুপ্তসমিতির লোক।

     গুপ্তসমিতির লোকটির কলার ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে ভীন রাগী গলায় বলে, “কী করতে এসেছিস? এই ফটোপ্লেটগুলো চুরি করতে?”

     লোকটি সামলে উঠেছিল, এখন কেমন একটা জেদী গলায় বললো, “ওগুলো নিতে আসিনি। ওগুলো অসাবধানে পড়ে গেল।”

     ভীন বলে, “তাহলে? ক্যামেরাগুলো চুরি করতে এসেছিলি? আমাদের ক্যামেরার যদি কোনো ক্ষতি করে থাকিস,তবে –তবে তোকে আমি —তোকে আমি শেষ করবো। এমনি না, একটু একটু করে কুচিয়ে কুচিয়ে কাটবো তোকে, কষ্ট দিয়ে দিয়ে মারবো। কী সাংঘাতিক! আমাদের ক্যামেরা–” আবার লোকটির গলায় ভীনের হাত শক্ত হয়ে বসে।

     অতীশ এসে ভীনকে আবার ঠান্দা করে, বলে, “এসব কী হচ্ছে, ভীন? ছেড়ে দাও ওকে। ও এসেছিল বটে, কিন্তু কিছু তো ক্ষতি করতে পারে নি আমাদের।”

     ভীন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছেড়ে দেয় লোকটাকে, লোকটা গলায় হাত বোলাতে বোলাতে কী যেন একটা বলে।

     অতীশ ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “তোমাকে তো মনে হয় আগে দেখেছি। তুমি লোহিত ২৫ না? তোমাদের নেতা শায়ক ৫ এর বিশ্বস্ত অনুচর? গত সপ্তাহে তোমাদের নেতা যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন, ওঁর সঙ্গে তুমিই তো এসেছিলে ?”

     লোহিত সম্মতি জানায় মাথা কাত করে।

     অতীশ বলেন, “এখন কী চাও আমাদের কাছে?”

     লোহিত বলে, “আমি যা চাই আপনারা সেটা নিজের ইচ্ছায় দেবেন না। তাই এইভাবে–” কথা শেষ করে না সে, থেমে যায়।

     অতীশ বলেন, “শায়ক পাঠিয়েছেন নাকি নিজেই এসেছ?”

     লোহিত বলে, “এর উত্তর আমি দেবো না।”

     অতীশ বলেন, “একাই এসেছ নাকি আরো সাঙ্গোপাঙ্গো আছে?”

     লোহিত জেদী গলায় বলে, “এই প্রশ্নের উত্তরও দেবো না।”

     অতীশ কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখলেন, তারপরে বললেন, “লোহিত, তোমার নেতা আমার কাছে ঠিক কী চাইছেন? তাঁর যা যা শর্ত ছিল, আমি তো সেই সব শর্তপূরণ করেছি।”

     উত্তরে লোহিত ম্লান হাসে, কথা বলে না।

     অতীশ উত্তপ্ত গলায় বলেন, “তোমার কাছে এমনকিছু তথ্য ছিল, যা শুধু গুপ্তসমিতির লোকেরাই পেতে পারে। তিনি সেই তথ্য আমায় দেন এই শর্তে যে আমি ঐ তোমাদের গুপ্তসমিতির বলা কিংবদন্তী বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করবো।”

     লোহিত বলে, “প্রমাণের প্রয়োজন নেই। গুপ্তসমিতির পবিত্র গ্রন্থের “সত্যের প্রকাশ” অধ্যায়ে সবই বলা আছে। আমাদের কাছে ঐ কথাগুলোই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট।”

     অতীশ বলেন, “হ্যাঁ, তোমাদের মানে গুপ্তসমিতির সদস্যদের কাছে যথেষ্ট। সে আমি জানি। আমি বলছিলাম বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের কথা, যেটা সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সেই প্রমাণ আমি করেছি।”

     লোহিতের তিক্ত গল শোনা যায়, “হ্যাঁ তা করেছেন বটে। প্রমাণ করেছেন সব। খাঁটি ধূর্তের মতন। আমাদের বিশ্বাসগুলোরই আর প্রয়োজন যাতে না থাকে, সেইভাবে। ঐ অন্ধকার আর নক্ষত্র —সব প্রমাণ করেছেন প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে, ওগুলোর আসল আধ্যাত্মিক গুরুত্বই মুছে দিয়েছেন। এ আমাদের দৃষ্টিতে একেবারে চরম অন্যায়।”

     অতীশ শান্ত গলায় বলেন, “সে তো আমাদের ত্রুটি নয়। ওগুলো ফ্যাক্ট, অস্বীকার করার তো উপায় নেই। সত্য যা, তাকে পরিষ্কার করে বলা ছাড়া আমাদের কী করার আছে?”

     এইবারে জ্বলন্ত রাগ ছিটকে ওঠে গুপ্তসমিতির মানুষটির কথায়, সে বলে “সত্য? আপনারা অন্ধ, মোহগ্রস্ত। সত্য কী আপনারা জানেন না।”

     অতীশও চড়া গলায় বলেন, “এমন কথা বলার মানেটা কী? আমরা কিছু জানি না এটা এত জোর দিয়ে বলছো কী করে?”

     গভীর বিশ্বাসীর মতন উত্তর আসে লোহিতের কাছ থেকে, “আমি জানি, আমরা জানি। আমাদের বিশ্বাস আমাদের বলে দেয় সত্য কী। আপনারা অবিশ্বাসী, তাই বুঝতে পারেন না।”

     অতীশের মুখ লালচে হয়ে যায়। পাশ থেকে ভীন কী যেন বলে তাঁকে। কিন্তু অতীশ হাত নেড়ে তাঁকে থামতে ইঙ্গিত করেন।  তারপরে ঠান্ডা গলায় বলেন, “তাহলে তোমার নেতা,  কী চান আমাদের থেকে? হ্যাঁ, আমরা মানুষকে আসন্ন অন্ধকার, নক্ষত্র ও সম্ভাব্য উন্মত্ততার ব্যাপারে সতর্ক করছি। কিন্তু সফল হচ্ছি না, কেউ মানছে না। এতে হয়তো তোমাদের নেতা খুশি হবেন। তিনি তো চান মানুষেরা —”

     লোহিত অতীশকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বলে, “আপনাদের ঐ চেষ্টাই অনেক ক্ষতি করে দিয়েছে। আর, তার উপরে এইসব শয়তানি যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়ে তথ্য সংগ্রহ—এ আরো খারাপ। আমি এইটাই বন্ধ করতে চেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে ধরা পড়ে গেলাম। আমরা চাই মানুষ অপেক্ষা করে থাকুক পবিত্র নক্ষত্রদের আশায়, নক্ষত্রদের ইচ্ছাই জয়যুক্ত হোক। বন্দী জীবাত্মা ঠাঁই পাক পরমের শ্রীচরণে। আপনারা—অহংকারী মূর্খের দল, দুটো যন্ত্রপাতি নাড়তে চাড়তে শিখে আর দুটো আঁক কষতে শিখে নিজেদের কী মনে করেছেন? নক্ষত্রদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করবেন ভেবেছেন?”

     অতীশ বলেন, “এই যন্ত্রপাতি নষ্ট করেও লাভ হত না হে লোহিত, আমাদের সমস্ত সংগৃহীত তথ্যভান্ডার চলে গেছে সুরক্ষাশিবিরে। এই এখনকারগুলো শুধু নষ্ট হতো। কিন্তু ধরা পড়ে যাবার পর এখন তো তুমি একজন চোর মাত্র। এখনই এখান থেকে পুলিশ ডাকার ব্যবস্থা হবে, তোমাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।”

     শ্রীনিবাস এগিয়ে এসে বলেন, “অতীশ, এখন কি এসবের সময়? গ্রহণ শুরু হতে আর দেরি নেই। এই লোহিতের ব্যাপারটা আমি সামলাচ্ছি।”

     অতীশ রেগে আগুন, “শ্রীনিবাস, এখানে তুমি পুরো বাইরের লোক, এর মধ্যে জড়িয়ে যেও না। আমাদের ব্যাপার আমাদের বুঝে নিতে দাও।”

     শ্রীনিবাস এইবারে আর না পেরে হতাশ হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, “অতীশ, কয়েক মিনিটের মধ্যে বিটার গ্রহণ শুরু হবে। আর তোমরা এখন এইসব পুলিশ ডাকাডাকি করতে গিয়ে সেই অভূতপূর্ব মুহূর্তটি মিস করে যাবে। এ তো স্রেফ বোকামি। আর এই লোহিত, এ তো বলছেই যে কোনো ঝামেলা করবে না। হাজার হোক এ এক সম্মানিত যুবক, খুব বিশ্বস্তও।”

     লোহিত বলে, “না, আমি কখনোই বলছি না এরকম। আপনারা যা খুশি করতে পারেন আমার উপরে। কিন্তু শুনে রাখুন, যেই মুহূর্তে আমি সুযোগ পাবো, সেই মুহূর্তেই যা করতে এসেছিলাম তাই করবো। আপনারা বরং পুলিশই ডাকুন।”

     শ্রীনিবাস এইবারে বেশ একটা স্নেহশীল হাসি হেসে বলেন, “লোহিত, বাপু তুমি খুবই জেদী লোক যা হোক। আচ্ছা, এইবারে শোনো–ঐ যে জানালার কাছে দেখছো লোকটাকে, ও খুবই ভালো কুস্তির প্যাঁচ ট্যাচ জানে। ও তোমাকে নজরে রাখছে বাজপাখির মতন। যেই না কোনো বেচাল দেখবে তোমার, অমনি এসে পড়বে তোমার উপরে। কেন বাপু এইসব ঝামেলার মধ্যে পড়তে চাও সাধ করে? তারচেয়ে আমি যা বলি, শোনো।”

     লোহিত শক্ত গলায় বলে, “কী?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “গ্রহণ শুরু হলেই আমি আর ঐ কুস্তিগীর তোমাকে ধরে ভালো করে বেঁধে একটা দেয়াল আলমারির ভিতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেবো। পুরো গ্রহণের সময়টা তুমি ওখানে থাকবে।”

     লোহিত তপ্ত গলায় বলে, “তারপরে আর আমাকে খুলে দেবার কেউ থাকবে না। গ্রহণ ট্রহণ হয়ে যাবার পরে তো সবাই উন্মাদ, কে আর খুলে দেবে? শ্বাস বন্ধ হয়ে বা খিদেয় আস্তে আস্তে আমায় মরতে হবে ওখানে। আপনাদের কাছে আর কী বা আশা করতে পারি? বড়ো বড়ো নীতিকথা বলেন, বিজ্ঞানের কথা বলেন, এদিকে খুন করতে চান আমায়।”

     অতীশ কেমন বিচলিত হয়ে বলেন, “শ্রীনিবাস, কেন এইসব বলছো? আমরা এরকম করবো কেন? একটা লোককে বেঁধে দেয়াল আলমারিতে পুরে দরজা বন্ধ করে —ছি ছি—”

     শ্রীনিবাস অতীশকে থামিয়ে বলেন, “আরে আমাকে পুরোটা বলতে দাও না আগে। আমি মোটেই তোমাকে ওরকম শ্বাস বন্ধ করে মারতে চাই না। কিন্তু গ্রহণের সময় যদি তুমি ঐরকম বন্ধ থাকো, তাহলে তো সেই অন্ধকারের পারের নক্ষত্রদের দেখতে পাবে না তুমি, তোমাদের গুপ্তসমিতির বিশ্বাস অনুযায়ী তার অর্থ কী, সে তো তুমি জানো। জানো না? তার অর্থ হলো তোমার আত্মার মুক্তি হবে না। এই ভয়ানক পরিণতি কি তুমি চাও? এখানে যদি ঝামেলা না করো, তাহলে আর ওভাবে বন্ধ করা হবে না তোমায়। কিন্তু কথা দিতে হবে যে কোনো ঝামেলা তুমি করবে না। নাহলেই–বুঝতেই পারছো—”

     লোহিতের গলার কাছটা ওঠানামা করে কয়েকবার, তারপরে শুকনো গলায় সে বলে, “ঠিক আছে, কথা দিলাম। আপনাদের কাজ আপনারা করুন, কিন্তু আপনাদের পরকাল ঝরঝরে, সেটাই আমার সান্ত্বনা।” এই বলে সে গিয়ে দরজার কাছের উঁচু তেপায়া টুলের উপরে বসে পড়ে।

     শ্রীনিবাস ভুবনকে ডাকেন, “ভুবন, আপনি এই লোহিতের পাশে বসে থাকুন। জাস্ট সতর্ক থাকা আরকি।”

     ভুবন কিন্তু নড়ে না তার জায়গা থেকে, কোনো কথা বলে না। তার মুখ পাংশু, সে তর্জনী তুলে দেখায় আকাশের দিকে।

     সবাই তার তর্জনী অনুসরণ করে তাকায় আকাশে, একসঙ্গে সবার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অদ্ভুত এক আওয়াজ। ভয় বিস্ময় আর আরো কত অনুভূতি যে এক হয়ে মিশে ছিল সেই আওয়াজে!

     গ্রহণ শুরু হয়ে গিয়েছে। বিটার একটা কোণ কালো হয়ে গিয়েছে।

     এক মুহূর্তের থমকে থাকা। তার পরেই পেশাগত ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে। এই ক্রান্তিমুহূর্তে আবেগের বশবর্তী হয়ে সময় নষ্ট করেছেন বলে তাঁরা লজ্জিত।

     শ্রীনিবাস বলেন, “গ্রহণের একদম শুরুটা, যখন উপগ্রহের প্রান্তটা প্রথম এলো আমাদের আর বিটার মাঝে, সেই কন্ট্যাক্ট এর মুহূর্ততা মিস করে গিয়েছি আমরা। মিনিট পনেরো আগেই সম্ভবতঃ সেটা ঘটেছে। গণনা অনুযায়ী যা পাওয়া গিয়েছে তার সামান্য আগেই, তবে সে কিছু না। ক্যালকুলেশনের ব্যাপার, কিছু অনিশ্চয়তা তো থাকবেই।”

     অতীশ কী কাজে ঘরের অন্যদিকে যেতে যেতে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে গেলেন শ্রীনিবাসের দিকে।

     ভুবন তখনও অবাক অবস্থায় তার নিজের জায়্গাতেই দাঁড়িয়ে। ভুবনের পাশে এসে শ্রীনিবাস ফিসফিস করে বলেন, “অতীশ রেগে বোম। এই লোহিতের ঝামেলায় ফার্স্ট কন্ট্যাক্ট মিস করে গিয়ে রেগে এখন চতুর্ভুজ সে।”

     ভুবন টলতে টলতে এসে লোহিতের পাশের একটা খালি টুলের উপরে বসে পড়ে। ও কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে বালি-বালি লাগছিল ওর।

     ভালো করে নজর করে দেখে শ্রীনিবাস বলেন, “ভুবন, কী হলো আপনার? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

     শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে ভুবন আস্তে আস্তে বলে, “শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। তবে সামলে নেবো।”

     শ্রীনিবাস কোমল গলায় বলেন, “ভয় পাবেন না ভুবন, ভয়ের কিছু নেই।”

     ভুবন বলে, “ঠিক ভয় না, হঠাৎ অভাবিতের মুখোমুখি পড়ে গেলে যা হয়, তাই হয়েছে। এতদিন আমি এসব কিছুই বিশ্বাস করিনি, ভেবেছি সব আপনাদের বানানো, বিখ্যাত হবার জন্য এইসব করছেন আপনারা। কিন্তু এখন—এখন— এখন দেখছি সব সত্যি সত্যি ঘটছে!”

     আপনজনের মতন স্নেহার্দ্র গলায় শ্রীনিবাস বলেন, “ভুবন, আপনার কি পরিবার আছে? কোনো আত্মীয়স্বজন আছে? স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা?”

     ভুবন মাথা নাড়ে, বলে, “স্ত্রী, সন্তান কেউ নেই। বাবা-মাও বহুকাল পরলোকগত। এক দিদি আছে, বহু হাজার মাইল দূরে থাকে, ওর ঠিকানাটাও ঠিক জানা নেই আমার।”

     শ্রীনিবাস বলেন, “আপনি নিজে তো আছেন। সুরক্ষাশিবিরে চলে যান। ওঁরা খুশী হবেন আপনার মতন সুস্থসবল যুবককে পেয়ে। এখান থেকে বেশি দূরও না।”

     ভুবন দৃঢ় গলায় বলে, “না। যাবো না। আমি সাংবাদিক, আমার কাজ আমায় করতে হবে। পালিয়ে যাবো না।”

     শ্রীনিবাস হাসেন, বলেন, “নিজের কাজের প্রতি বিশ্বস্ততা। বাহ, এই তো চাই।”

     হঠাৎ পাশ থেকে অদ্ভুত মন্ত্রের মতন কিছু শুনে ভুবন সেদিকে তাকালো। শ্রীনিবাসও। লোহিত। তার চোখ আকাশের বিটার দিকে, সে আবিষ্টের মতন অদ্ভুত সুরেলা মন্ত্রের মতন কিছু বলছে।

     ফিসফিস করে ভুবন শ্রীনিবাসের কাছে জানতে চাইলো, “আপনি জানেন কী বলছে ও?”

     শ্রীনিবাস বললেন, “ওদের গুপ্তসমিতির পবিত্র গ্রন্থের ‘সত্যের প্রকাশ, পঞ্চম অধ্যায়’ অংশ থেকে মন্ত্র বলছে। চুপ করে শুনুন।”

     কান পেতে ভুবন শুনলো লোহিত বলছে, “অবশেষে সেই পুণ্য দিবসের আগমণ ঘটিল। বিটা আকাশে একমাত্র সূর্য হইয়া প্রহরা দিতে লাগিল। পূর্ণ আবর্তণের অর্ধকালব্যাপী আকাশে বিটা রহিল একা, সঙ্কুচিত ও শীতল। মানুষেরা একত্রিত হইতে লাগিল মহাসড়কে ও নগরচত্বরে, আশ্চর্য সেই দৃশ্য দর্শনের নিমিত্ত। এক অদ্ভুত মানসিক অবসাদ তাহাদের অন্তরে আসিল, তাহারা নিজ নিজ ভাষা বিস্মৃত হইল কারণ তাহাদের আত্মা অপেক্ষা করিতেছিল নক্ষত্র আবির্ভাবের।”

     মধ্যাহ্নকালে, ত্রিগুণা নগরীর মধ্যস্থলে আসিয়া মহান ভৃন্দন বলিতে লাগিলেন, “হে মনুষ্যগণ, শ্রবণ কর। তোমরা সর্বদা ন্যায়পথে থাকো নাই, তথাপি পরম করুণাময় তোমাদিগের জন্য মুক্তির পথ প্রস্তুত করিয়াছেন। এই মুহূর্তে অন্ধকার গুহা অগ্রসর হইয়া আসিতেছে বিটার  দিকে, বিটাকে সে গিলিয়া ফেলিবে।”

     ভৃন্দনের কথার মধ্যস্থলেই অন্ধকার গুহার ওষ্ঠদেশ আসিয়া বিটার এক পার্শ্বে সংললগ্ন হইল। দেখিতে দেখিতে সে গ্রাস করিয়া ফেলিল বিটাকে। ঘন অন্ধকারে মনুষ্যগণের আর্ত চিৎকার অভ্রভেদী হইয়া উঠিল। কোনো আলো রহিল না, মনুষ্যগণ চক্ষু থাকিতেও অন্ধত্বপ্রাপ্ত হইল। কেহ কাহারও পার্শ্বের মনুষ্যকেও দেখিতে পাইল না, যদিও শ্বাসপ্রশ্বাসের স্পর্শ পাইতেছিল।

     সেই সর্বব্যাপী ঘোর কৃষ্ণবর্ণা নিশিথিনীর বক্ষে ফুটিয়া উঠিতে লাগিল নক্ষত্রেরা, অগণিত নক্ষত্র। সেই অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের মুখোমুখি হইয়া বৃক্ষের পত্রপল্লবেরাও বিস্ময়ে আর্তনাদ করিয়া উঠিল।

     সেই মুহূর্তে মনুষ্যগণের দেহ হইতে আত্মা প্রস্থান করিল, নক্ষত্রেরা তাহাদের আত্মা কাড়িয়া লইল। আত্মাহীন দেহসমূহ পশুদেহতুল্য হইল, বন্য পশুর ন্যায় তাহারা চিৎকার করতে লাগিল।

     অগণিত নক্ষত্র হইতে ছুটিয়া আসিল অগ্নিবাণ, নগরীর পর নগরী জ্বলিয়া উঠিল লেলিহ অগ্নিশিখায়। মনুষ্যনির্মিত সমস্ত কীর্তি ধূলায় মিশিয়া গেল।

     তৎসত্ত্বেও কিছু কিছু চিহ্ন —

     এরপর থেকেই লোহিতের মন্ত্র আর বোধগম্য হল না ভুবনের বা শ্রীনিবাসের। লোহিত এক প্রাচীন ও গোপণ ভাষা ব্যবহার শুরু করেছিল, সেই ভাষা কেবল গুপ্তসমিতির সদস্যেরাই জানে।

     ভুবন অবাক হয়ে চেয়ে রইল, আওয়াজগুলো চেনা চেনা মনে হয় শুনলে অথচ বোধের সম্পূর্ণ অগম্য। ভাষা জিনিসটা কী আশ্চর্য!

     শ্রীনিবাস মৃদুস্বরে বললেন, “গুপ্তসমিতির প্রাচীন গোপণ ভাষা। ওদের পবিত্র গ্রন্থ আদতে এই ভাষাতেই লেখা। এ বাইরের লোক একেবারেই বুঝতে পারে না।”

     ভুবনের ভয় কেটে গেছিল, মনের বোঝা নামিয়ে রেখে খুশির গলায় সে বলে, “যতটুকু শুনেছি তাই যথেষ্ট। ওহ, এখন অনেক ভালো লাগছে।”

     “এখন ভালো লাগছে? এইসব ত্রিগুণা নগরী টগরীর ভয়ংকর কাহিনী শোনার পর? বলেন কী!”

     ভুবন একটা হাঁফ ছাড়া হাসি হেসে বলে, “এখন সত্যি ভালো লাগছে। অথচ একটু আগে অদ্ভুত একটা অবস্থা হয়েছিল, কেমন অবশ অবশ লাগছিল। একে আপনাদের ঐ মহাকর্ষ তত্ত্ব তার উপরে গ্রহণ শুরু-এসব দেখে প্রায় হয়েই গিয়েছিল আরকি আমার! আর এখন এই লোহিতের মন্ত্র শুনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। এসব আমার চেনা জিনিস, ছোট্টোবেলার রূপকথার মত। এইধরণের কত কাহিনী শুনেছি তো ছোটোবেলায় ঠাকুমার কাছে। আহ, এসব নিয়ে আর ভয় টয় পাচ্ছি না, হুঁ।”

     “তবু সাবধানের মার নেই, ঘুরে বসি” এই বলে ভুবন জানালার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভিতর দিকে মুখ করে বসল।

     শ্রীনিবাস অল্প হাসলেন, বললেন, “তা বসুন, তবে একটু আস্তে কথা বলুন। এইমাত্র দেখলাম অতীশ ঐ কোণে কাজ করতে করতে আপনার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি হানলো।”

     ভুবন হাসে, বলে, “ওহ, স্যর অতীশ! গন্ডগোলে ওঁর কথা ভুলতে বসেছিলাম প্রায়। কিন্তু শ্রীনিবাস, এই নক্ষত্র না কী, এদের দ্বারা উন্মাদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচার ক্ষমতা কি কারুর থাকে না? কিছু লোকের তো স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা থাকা উচিত।”

     শ্রীনিবাস সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারেন না। বিটা এখন ঠিক মধ্যগগণে, ওর লাল রোদ্দুরের টুকরোটা মেঝেতে ছিল, এখন উঠে এসেছে শ্রীনিবাসের কোলের উপরে। সেদিকে চেয়ে কেমন আবিষ্টের মতন বসে রইলেন শ্রীনিবাস।

     বিটার এক তৃতীয়াংশ এখন ছায়াচ্ছন্ন। পূর্ণগ্রহণের দিকে এগিয়ে চলেছে সেই ছায়া।

     শ্রীনিবাস কেমন অদ্ভুত একটা দুঃখের হাসি হেসে বললেন, “শরণ্য শহরের বিশ লাখ মানুষ গুপ্তসমিতিতে যোগ দিতে চেয়েছে শেষ মুহূর্তে। অবশ্য এই সময়ে আর—” এই পর্যন্ত বলে থেমে গিয়ে শ্রীনিবাস বলেন, “হ্যাঁ, সাংবাদিক মশাই, কী যেন বলছিলেন আপনি?”

     ভুবন বলে, “বলছিলাম যে ঐ গুপ্তসমিতির পবিত্র গ্রন্থ, সত্যের প্রকাশ —এইসব রক্ষা পেল কেমন করে? কেমন করে গেল এক সভ্যতার এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে? দুই পর্বের মাঝে তো মহামন্বন্তর ধরণের অবস্থা, সেই অবস্থায় তো ঐ বই টই সব ধ্বংস হয়ে যাবার কথা। এ জিনিস লেখাই বা হল কী করে? নির্ঘাত কিছু লোক সুস্থ অবস্থায় থাকতো, নইলে সবাই উন্মাদ হয়ে গেলে এসব লিখেছিলো কারা, রক্ষাই বা করতো কারা?”

     “দেখুন, আসলে কীভাবে কী হয়েছিল, তার তো কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। ঐ অত হাজার বছর আগে কী হয়েছিল না হয়েছিল সে আমরা শুধু এখন অনুমান করি মাত্র। তবে আমার কিছু নিজস্ব ধারণা আছে। তিন ধরণের মানুষ আছে যাদের উপরে এই ঘটনার প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম পড়বে। একদল হল, যারা নক্ষত্র টক্ষত্র কিছু দেখবেও না গ্রাহ্যও করবে না, মাতাল হয়ে পড়ে থাকবে কোথাও। বা যারা আগে থেকেই মানসিক রোগী, চারপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তাতে যাদের তেমন কিছু যায় আসে না। তবে এদের প্রতক্ষদর্শী হিসাবেও ধরা যাবে না।”

     একটু থেমে শ্রীনিবাস আবার বলেন, “তারপরে আছে দ্বিতীয়দল।  ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরা। এদের কাছে দুনিয়া এত নতুন এত বিস্ময়কর এমনিতেই যে এই গ্রহণ-ট্রহণ অন্ধকার-টন্ধকার নক্ষত্র-টত্র জাস্ট আরেকটা বিস্ময় মাত্র।”

     ভুবন বলে, “হুঁ, আপনার কথায় যুক্তি আছে। তো তৃতীয় দল কারা?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “এই তৃতীয়দল হল উদাসীন ধরণের লোক, যাদের কিছুতেই তেমন বিস্ময় নেই, খানিকটা যেন পাথুরে টাইপ। এই ধরণের লোকও প্রভাবিত তেমন হবে না। বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ মানুষেরা। তো, এই তিনদলের মধ্যে শিশুরা কিছুটা ছায়া ছায়া স্মৃতি ধরে রাখতে পারবে, বড় হতে হতে আবছা হয়ে যাবে সেসব আরো। আর বাকী দুইদল আরো ভাঙা ভাঙা কিছু ঘটনার স্মৃতির টুকরো মনে রাখতে পারবে। সম্ভবত এইসব থেকেই গড়ে উঠেছে ঐ সত্যের প্রকাশ অধ্যায়।”

     শ্রীনিবাস বলে চলেন, “অর্থাৎ কিনা “সত্যের প্রকাশ” এ সত্য কিছু আছে বটে, কিন্তু যাদের স্মৃতির ভিত্তিতে ঐ রচনা তারা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তেমন জোরদার নয়। শিশুরা আর নীরেটমাথা গোঁয়াররা কি আর তেমন নির্ভর করার মতন সাক্ষী হতে পারে? পারে না। তার উপরে সভ্যতার এক চক্র থেকে আরেক চক্রে ক্রমাগত ঐ রচনা সম্পাদিত আর পুনর্সম্পাদিত হয়েছে। এইভাবে অনেক বদলে গিয়েছে আসল ব্যাপার।”

     ভুবন এইখানে এসে শ্রীনিবাসকে থামিয়ে বলে, “তাহলে আপনি বলতে চান ওদের ঐ পবিত্র গ্রন্থ সভ্যতার চক্র থেকে চক্রে বহন করা হয়েছে? যেমন কিনা আপনারা মহাকর্ষের তত্ত্ব সম্পর্কিত সব লেখাপত্র রক্ষা করে সভ্যতার পরবর্তী চক্রে নেবার ব্যবস্থা করছেন?”

     শ্রীনিবাস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “সম্ভবত তাই। ওরা কীভাবে করেছে তা আমরা জানি না, তবে করেছে বলেই তো মনে হচ্ছে ব্যাপার দেখেশুনে। আমার পয়েন্টটা হল গ্রন্থ যদি থেকেও থাকে, সেটা তেমন সহায় হয় না সত্যিটা বোঝাতে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসল ঘটনার উপরে নানারকম রঙ চড়ানো বর্ণনা হয়ে হয়ে আসল ব্যাপার একেবারেই ঢেকে যায়। এই যে দেখুন না ইমন আর প্রমিতের ঐ এক্সপেরিমেন্ট, কাজ হল না বললো তো ওরা? মনে আছে?”

     ভুবন বলে, “হ্যাঁ, ওরা তো বললো বারে বারে করে দেখেও কোনো এফেক্ট বুঝলো না।”

     শ্রীনিবাস বললেন, “কেন কাজ করেনি জানেন? কারণ—অ্যাঁ? কী হলো?”

     শেষ কথাটা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন উনি, হন্তদন্ত হয়ে অতীশ এগিয়ে আসছেন দেখে।

     শ্রীনিবাসের কনুই ধরে অতীশ একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “এইমাত্র গোপণ সূত্রে সুরক্ষাশিবিরের খবর পেলাম।”

     “সুরক্ষাশিবিরে আবার কী হল? কোনো ঝামেলা?”

     “না, ওখানের ওরা তো বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে ভিতরে সীলড হয়ে গিয়েছে। আগামীকালের আগে ওরা বেরোবে না। ওরা নিরাপদ।”

     “তাহলে? গন্ডগোলটা কোথায়?” শ্রীনিবাসের প্রশ্নে উদ্বেগ গোপণ থাকে না। অতীশ কেমন হাঁপ ধরা গলায় বলেন, “শহরে গন্ডগোল। শরণ্য শহর থেকে এই অব্জার্ভেটরির দিকে আসছে গুপ্তসমিতির লোকেরা। অবজারভেটরি আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। ওরা বহু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আসছে। কী করবো শ্রীনিবাস?”

     শ্রীনিবাস একটুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর বললেন, “পূর্ণগ্রহণ হতে আর কত দেরি?”

     “এক ঘন্টারও কম।”

     “তবে আর তত চিন্তা নেই। লোকজন জড়ো করে আক্রমণ শানানো চটপট হবার ব্যাপার না, সময় লাগে। ততক্ষণে যা হবার হয়ে যাবে। এই অব্জার্ভেটরি থেকে মূল শহর প্রয় পাঁচ মাইল, এতটা দূরত্বও আমাদের সহায়। চিন্তা করো না অতীশ, ঝামেলা ওরা কিছু করতে পারবে না।”

     বিটা ততক্ষণে অর্ধেক ছায়াচ্ছন্ন, সেই অদ্ভুত মরা লাল আলোয় দূরের শরণ্য শহরের দিকে চেয়ে রইলেন শ্রীনিবাস, দূর দিগন্তে নগরীর মিনারগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে।

     সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ঘরের সব শব্দ মৃদু হয়ে মিলিয়ে গেল শ্রীনিবাসের কানে, শুধু মনে হল চারিদিক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। মনে হল পাখিরা ডাকছে না, কীটপতংগেরাও একদম চুপ। কী এক ভীষণ প্রতীক্ষায় যেন জল-স্থল-অন্তরীক্ষ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।  এই অবস্থায় কানের কাছে ভুবনের প্রশ্নটা বজ্রপাতের মতন লাগলো শ্রীনিবাসের, ভুবন জিজ্ঞেস করছিল, “কী হয়েছে শ্রীনিবাস, কোনো গন্ডগোল?”

     চমকে উঠলেন শ্রীনিবাস, পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিলেন। বললেন, “নাহ, সব ঠিক আছে। চলুন, আমাদের জায়্গায় গিয়ে বসি।”

     তারা জানালার কাছে নিজেদের টুলে বসে পড়লেন। শ্রীনিবাস অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না, নিজের টাই আলগা করে ঘাড় এদিক ওদিক করে নিলেন, ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছিল তাঁর।

     তারপর হঠাৎ বললেন, “আচ্ছা ভুবন, নিঃশ্বাসে কোনো কষ্ট হচ্ছে কি আপনার?”

     ভুবন বড়ো করে দু’বার শ্বাস নেয়, শ্বাস ফেলে। তারপরে বলে, “নাতো। ঠিকই তো আছে।”

     শ্রীনিবাস নিবন্ত গলায় বলেন, “আমার হচ্ছে শ্বাসকষ্ট। জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়েছিলাম, তখন মনে হয় ঐ মরা আলো দেখে মনে ভয় ঢুকেছে। হয়তো ক্লসট্রোফোবিয়ার অ্যাটাকের পূর্বলক্ষণ এই শ্বাসকষ্ট।”

     ভুবন বলে, “আমার এখনো শুরু হয় নি। এই দেখুন, ভীন আসছেন।”

     ভীন কাছে এসে বলে, “আপনাদের এখানে একটু বসি? আমার ক্যামেরা ট্যামেরা সব সেট করা হয়ে গিয়েছে। পূর্ণগ্রহণের আগে পর্যন্ত এখন আর কিছু করার নেই।”

     “হ্যাঁ হ্যাঁ বসুন বসুন।” সাগ্রহে বলে ভুবন।

     ভীন একটা চেয়ার টেনে এনে বসে। চোখের কোণা দিয়ে দেখে নেয় লোহিতকে, লোহিত তখন পকেট থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো ছোট্টো বই বের করে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। আর কোনোদিকে খেয়াল নেই তার।

     চাপা গলায় ভীন বলে, “এই লোহিত কোনো ঝামেলা করে নি তো আর?”

     ভুবন নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানায় যে লোহিত কোনো ঝামেলা করেনি। তারপরেই তার ভুরু কুঁচকে যায়, জোরে শ্বাস নেয়। বলে, “ভীন, দেখুন তো শ্বাস নিতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিন আপনার।”

     ভীন জোরে শ্বাস নেয়, শ্বাস ছাড়ে কয়েকবার। তারপর বলে, “না তো! এখনও কোনো অসুবিধা নেই।”

     ভুবন বলে, “আমার হঠাৎ শুরু হল এখনই। একটু একটু শ্বাসকষ্ট। ক্লস্ট্রোফোবিয়ার আক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ মনে হয়।”

     “ওহ, ক্লস্ট্রোফোবিয়া!!! আমার আবার অন্য অসুবিধে হচ্ছে। মনে হচ্ছে নিজের চোখ যেন ভিতরে ঢুকে আসছে, বাইরের কিছু আর ঠিকমতন দেখছে না। চারিদিক ঝাপসা, অস্পষ্ট। ঠান্ডা, আহ, কী ঠান্ডা!” ভীন কেমন যেন বিমূঢ় গলায় বলে।

     ভুবন বলে, “ঠান্ডাটা সত্যি, ওটায় কোনো ভুল নেই। আমারও খুব ঠান্ডা লাগছে, পায়ের আঙুলগুলো যেন জমে বরফ। ওহ।”

     শ্রীনিবাস পাশ থেকে বলেন, “আমাদের আসলে কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা জরুরী এইসময়। তাহলে এইসব প্যানিক ট্যানিক আর কাবু করতে পারবে না সহজে। আচ্ছা, এই যে কিছুক্ষণ আগে বলতে গিয়েছিলাম প্রমিত আর ইমনের ঐ এক্সপেরিমেন্ট কেন কাজ করেনি, তখন তো ঝামেলা হয়ে আর বলা হল না, এখন শুনতে চান?”

     ভুবন সাগ্রহে বলে, “হ্যাঁ, বলুন, বলুন।”

     “হুঁ, বলি তাহলে। আসলে ইমন আর প্রমিত ঐ ‘সত্যের প্রকাশ’ বইয়ের ঘটনাগুলোকে আক্ষরিক অর্থে নিয়েছিল, সেটাই ভুল হয়েছিল। হয়তো নক্ষত্র ব্যাপারটা বাস্তব কিছু নয়, হয়তো ওগুলো ইল্যুশন। কল্পনা। অভূতপূর্ব অন্ধকারের মধ্যে পড়ে মানুষের মন হয়তো কল্পনায় ওগুলোকে সৃষ্টি করে, অসংখ্য আলোর বিন্দু, অন্ধকারের কালো গায়ে।”

     ভুবন বলে, “তাহলে আপনি বলতে চান উন্মত্ত মনের কল্পনাই নক্ষত্র? আসলে ওরকম কিছু নেই? উন্মাদনার ফলেই ওগুলো দেখেছে মানুষ? সত্যের প্রকাশে যেমন বলেছে, নক্ষত্রেরা এসে মানুষের আত্মা কেড়ে নিয়ে মানুষকে পাগল বানিয়ে দিল, সেট ঠিক না? নক্ষত্র বলে কিছু নেই, উন্মাদ হয়েই মানুষ ভুল দ্যাখে? তাহলে ভীন যে ফটো তুলবেন সেগুলো তো স্রেফ ব্ল্যাংক আসবে!”

     “হুঁ, তাহলেই একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ হয়ে যাবে। মানুষে ভুল দেখতে পারে, ক্যামেরা তো আর ভুল দেখবে না!”

     ভীন এইবারে সাগ্রহে অথচ অল্প সঙ্কোচের সঙ্গে বলে, “আমারও ঐ নক্ষত্রদের ব্যাপারে একটা ধারণা আছে, জানেন? একটু অদ্ভুত ধরণের ধারণা, সিরিয়াসলি নেবার দরকার নেই। জাস্ট একটা ব্যক্তিগত ধারণা আরকি। শুনবেন?”

     “বলুন, শুনছি।” শ্রীনিবাস বেশ উৎসাহের সঙ্গেই বলেন।

     ভীন বলে, “ধরুন, আমাদের এই ছ’টি সূর্য ছাড়াও আরও অনেক সূর্য আছে মহাবিশ্বে, অনেক দূরে বলে যাদের দেখা যায় না।” এইটুকু বলেই ভীন থামে, তারপরে বলে, “আপনাদের যদি লাগমাছাড়া কল্পনা মনে হয়, তাহলে এখানেই ইতি করি।”

     ভুবন হাসি লুকোচ্ছিল কিন্তু শ্রীনিবাস বেশ সিরিয়াস মুখে বলেন, “না না, থামবেন না। খুব ইন্টারেস্টিং কথা বলছে আপনি। যে মহাকর্ষের সূত্র আমরা পেয়েছি, সেই অনুসারে তো ঐসব সূর্যেরা আকর্ষণ করবে আমাদের এই ছয় সূর্যওয়ালা জগৎকে। কী, করবে না?”

     ভীন বলে, “অন্য সূর্যেরা অনেক অনেক দূরে, ধরুন চার পাঁচ আলোকবর্ষ (আলোকবর্ষ=আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে) বা তারও বেশী দূরে হলে ওদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ আমাদের উপরে খুব খুব খুব কম হবে। এত অল্প যে আমরা ওদের প্রভাব বুঝতেই পারবো না। ধরুন, এরকম দূরের সূর্য অনেক আছে, গোটা দশ বারো কি ধরুন গোটা কুড়িমতন।”

     ভুবন হাসতে হাসতে বলে, “কী দারুণ আইডিয়া! খুব ভালো কল্পবিজ্ঞানের গল্প হতে পারে। রবিবারের কাগজে বেরোলে পড়তে পাবে না, লোকে গরম কচুরির মতন লুফে নেবে।”

     ভীন হেসে বলে, “জাস্ট একটা আইডিয়া। কিন্তু নিশ্চয় বুঝতে পারছেন এরকম যদি সত্যিই অন্য সূর্যেরা থাকে, তাহলে পূর্ণগ্রহণের সময় অন্ধকারে ঐ দূরের সূর্যদের দেখা যাবে আলোর বিন্দুর মতন, কারণ তখন তো আমাদের এই ছয়টি সূর্যের একটির আলোও বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে ঐ গুপ্তসমিতির লোকেরা যেমন বলে যে লাখ লাখ নক্ষত্র দেখা যাবে, সেটা সম্ভবতঃ বাড়িয়ে বলা। মহাবিশ্ব এত বড়ো না যে লাখ লাখ সূর্য আঁটবে।”

     শ্রীনিবাসের আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছিল, তিনি বললেন, “দারুণ! ভীন, চমত্কার একটা পয়েন্ট তুলেছেন আপনি। বাড়িয়ে বলা ব্যাপারটা হবেই, ওটাকে এড়ানোর উপায় নেই। জানেন তো যে আমাদের মন খুব বেশী বড় সংখ্যা সরাসরি ট্যাকল করতে পারে না। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ পর্যন্ত পারে, তার বেশী সংখ্যক জিনিস হলে বলে, “অনেক”। নেহাৎ আমাদের একটা সিস্টেম্যাটিক উপায় আছে সংখ্যা গণনার, সেইজন্য আমরা ঐ উপায় অনুসরণ করে বড়ো বড়ো সংখ্যা হিসেব করতে পারি। খুব বেশি জিনিসের সামনে সামনে সরাসরি পড়ে গেলে —- নির্ঘাৎ এইটাই হয়, হয়তও গোটা দশ বারো নক্ষত্র দেখে মানুষ বলে লাখ লাখ দেখেছে।”

     ভীন বলে, “আমার আরো একটা এইরকম আইডিয়া আছে। ভাবুন একটা ছোটো মহাবিশ্ব, তাতে একটিমাত্র সূর্য আর তাকে ঘিরে একটিমাত্র গ্রহ ঘুরছে। গ্রহটা একেবারে নিঁখুত একটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে। ভাবুন তো সেই জগতে এই মহাকর্ষের তত্ত্ব পাওয়া কত সহজ হবে? ওখানকার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ওদের দূরবীণ আবিষ্কারের আগেই খালি চোখে দেখেই মহাকর্ষ তত্ত্ব বুঝে ফেলবেন।”

     শ্রীনিবাস হেসে বলেন, “কিউট আইডিয়া। কিন্তু ঐরকম একটা সিস্টেম কি ডাইনামিকালি স্টেবল হবে? “

     ভীন বলে, “অবশ্যই স্টেবল হবে। অঙ্ক কষে দেখানো যায়। আমি নিজেই কয়েকবার কষেছি। কিন্তু অঙ্কের চেয়ে এই ব্যাপারটার দার্শনিক দিকটা আমাকে বেশি টানে। এক সূর্য আর এক গ্রহের জগৎ! কেমন হবে সেই গ্রহের অবস্থা?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “ভাবনাটা আকর্ষণীয় সত্যিই, অনেকটা যেন আদর্শ গ্যাস বা পরমশূন্যের ধারণার মতন।”

     ভীন বলে, “একটা অবশ্য মনখারাপ করা ব্যাপার আছে ওখানে। ঐ গ্রহে প্রাণের বিকাশ সম্ভব হবে না। যথেষ্ট আলো আর তাপ ও গ্রহ পাবে না, জীবনের বিকাশের জন্য যা জরুরী। আর ঐ গ্রহ যদি নিজের অক্ষের উপরে ঘোরে, তাহলে ঘূর্ণনের অর্ধেকটা সময় জুড়ে গ্রহের একদিকে থাকবে পুরো অন্ধকার। ঐ অবস্থায় প্রাণের বিকাশ–”

     ভীনের কথা শেষ হবার আগেই শ্রীনিবাস লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কেমন শিশুর মতন উচ্ছ্বাসে বলে উঠলেন, “অতীশ আলো এনেছেন!”

     “অ্যাঁ, তাই নাকি?” বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ভীন। অতীশকে দেখে আর অতীশের বগলে একবোঝা বাতি দেখে স্বস্তির হাসিতে মুখ ভরে যায় তার।

     আধডজন ফুটখানেক লম্বা আর ইঞ্চিখানেক করে চওড়া জিনিস অতীশের কাছে, খুব যত্ন করে আনছেন তিনি। চারপাশের সমস্ত লোকজন সাগ্রহে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।

     অতীশ বললেন, “সবাই নিজের নিজের কাজে যান প্লীজ। শ্রীনিবাস, এদিকে এসো, আমাকে একটু সাহায্য করো।”

     শ্রীনিবাস লম্বা লম্বা পা ফেলে অতীশের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তারপরে দু’জনে মিলে দেয়ালের থেকে বেরিয়ে আসা ধাতব হোল্ডারের মধ্যে  যত্ন করে জিনিসগুলোর গোড়া গুঁজে দেন।  তারপরে রীতিমতন ভক্তিনিষ্ঠা সহকারে দেশলাই জ্বেলে ঐ লম্বা জিনিসগুলোর ডগায় ধরেন। আগুন ধরে ওঠে, শিখা জ্বলতে থাকে।

     ছয়টি বাতি জ্বলে, ঘরটি ভরে ওঠে হাল্কা সোনালি আলোয়। হাওয়ায় শিখাগুলো যখন কাঁপে, তখন ঘরভর্তি ছায়া দুলতে থাকে মাতালের মতন। শুধু আলো না, বিস্তর ধোঁয়াও বের হতে থাকে অদ্ভুত বাতিগুলো থেকে।

     চারঘন্টা পরে সোনালী আলো আবার। এতক্ষণ বিটা থেকে পাওয়া ঐ ম্লান লাল আলোর পরে ঐটুকু সোনালী আলো কী যে আনন্দ নিয়ে এসেছে!

     সবাই অল্পবিস্তর উচ্ছ্বসিত। এমনকি লোহিত পর্যন্ত তার পবিত্র গ্রন্থ থেকে মুখ তুলে তাকায়, চোখে মুগ্ধতা।

     শ্রীনিবাস নিজের হাতের পাতা আলোর শিখার কাছে নিয়ে গরম করতে করতে বলেন, “কী সুন্দর! কী সুন্দর! সোনালি রঙ যে এত সুন্দর আগে কে জানতো!”

     ভুবন এতটা বেসামাল উচ্ছ্বাসে পড়ে নি, সে মনোযোগ দিয়ে বাতি নিরীক্ষণ করে, তারপরে জানতে চায়, “এগুলো কীসের তৈরী?”

     শ্রীনিবাস বলেন, “কাঠ।”

     ভুবন বলে, “কিন্তু পুড়ে তো যাচ্ছে না! শুধু উপরটা থেকে আলোর শিখা জ্বলছে।”

     শ্রীনিবাস বলে, “সেইটাই তো এর কারিগরী কৌশল। কৃত্রিম আলো তৈরীর সবচেয়ে এফিশিয়েন্ট কায়্দা নেওয়া হয়েছে এতে। কয়েকশো এমন বাতি তৈরী হয়েছে, প্রয় সবই গিয়েছে সুরক্ষাশিবিরে।”

     তারপরে শিখার কাছ থেকে হাত সরিয়ে এনে ভুবনের দিকে ফিরে বলেন, “পাটখড়ি থেকে বানানো এগুলো। কড়া করে শুকিয়ে নেওয়া পাঠখড়ি তেলে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে দিনকয়েক। তারপরে বাতি তৈরী। একপ্রান্তে আগুন দিলে আস্তে আস্তে ঐ তেল পুড়ে আলো দেয়। এক একটা আধঘন্টা মতন একটানা আলো দিতে পারে অপূর্ব আবিষ্কার, তাই না? শরণ্য বিশ্বাবিদ্যালয়ের এক তরুণ গবেষকের আবিষ্কার এটা।”

     বাতি জ্বালানোর সময়ের ঐ একটুখানি বিহ্বলতার পরেই অবজার্ভেটরির কর্মীরা সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত আবার।

     লোহিত নিজের বসবার টুলটা টেনে নিয়ে গিয়েছে একটা বাতির ঠিক নিচে, মন দিয়ে পড়ছে পবিত্র গ্রন্থ, নিঃশব্দে না, ওর ঠোঁট নড়ছে পড়ার সময়। প্রার্থনার মতন পড়া, নক্ষত্রদের আবাহন মন্ত্র পড়ছে কিনা!

     ভীন চলে গিয়েছে নিজের ক্যামেরার সেটিং এর দিকে আবার। ভুবন এই সুযোগে নিজের নোটবই বের করে লিখতে থাকে নোটস, আগামীকাল এই লেখা বেরোবে খবরের কাগজে। এই কাজে ব্যস্ত থাকায় সে টের পায় না আকাশ এখন অদ্ভুত লাল, খোসা ছাড়ানো বীটের মতন লাল।

     বাতাস কেমন ভারী হয়ে এসেছে। অন্ধকার যেন স্পন্দনশীল এক সত্তার মতন ঘরে ঢুকে আসছে। বাতিগুলোর শিখা ঘিরে যে সোনালী আলোর গোলক, তার চারপাশে ক্রমশ ঘনতর হয়ে আসছে অন্ধকার। হ্যাঁ, সেই অচেনা অন্ধকার, সেই ভয়, যাকে চেনেনা কেউ।

     ধোঁয়ার গন্ধ, কম্পিত শিখা থেকে উড়ে উড়ে যাওয়া সোনালি ফুলকি, কাজের মধ্যে জোর করে নিজেদের ব্যস্ত রাখা মানুষের দল—এইসব ঘিরে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার, ধীর কিন্তু নিশ্চিত গতিতে।

     বাইরের দিক থেকে আসা আওয়াজ প্রথমে ভুবন টের পেল। অস্পষ্ট দূরাগত আওয়াজ যাকে এমনতে শোনাই যেত না যদি না অব্জার্ভেটরিতে পরিপূর্ণ নৈঃশব্দ থাকতো। সে লেখা থামিয়ে নোটবুক আর পেন পকেটে পুরে উঠে দাঁড়াল। তারপরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও চলে গেল জানালার সামনে। বাইরের দৃশ্য দেখে অস্ফুটে সে একটা চিৎকার করে উঠলো, ডাক দিল, “শ্রীনিবাস!!!”

     মুহূর্তের মধ্যে সবাই কাজ থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিমেষের মধ্যে শ্রীনিবাস এসে দাঁড়ালেন ভুবনের পাশে, তারপর তাঁর পাশে অতীশ। ইমন কাজ করছিল বিশাল সোলারস্কোপ নিয়ে, কাজ থামিয়ে সেখান থেকেই সে তাকালো ভুবনের দিকে।

     আকাশে বিটা তখন এক চিলতে মাত্র ঢাকতে বাকী। লাল বাঁকা একটা সরু ফালি শুধু দেখা যাচ্ছে। যেন নগমা গ্রহের দিকে শেষবারের মতন চেয়ে আছে বিটা, অন্ধকারে নিমজ্জিত হবার আগে।

     পুবের দিগন্তে অন্ধকার, শরণ্য নগরীর কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না, লেপেপুঁছে একাকার সব। শহর থেকে অব্জার্ভেটরি আসার রাস্তাটা ম্লান লাল একটা রেখার মতন লাগছে, দু’পাশের গাছগুলো ঝুপসি অন্ধকারে মিলেমিশে কেমন অবিচ্ছিন্ন ছায়ার মতন লাগছে।

     ঐ রাস্তা ধরেই ছুটে আসছে গুপ্তসমিতির উন্মত্ত জনতা, অবজার্ভেটরি ভেঙে ফেলে এখানকার পাপীদের ত্রাণ করতে। দূর থেকে আসা এদেরই চিৎকার প্রথম শুনতে পেয়েছিল ভুবন।

     অতীশ ভাঙা গলায় বলে উঠলেন, “ওরা এসে পড়েছে।”

     শ্রীনিবাস জিজ্ঞাসা করলেন, “পূর্ণগ্রহণ হতে আর কতটা সময় বাকী?”

     অতীশ বললেন, “আর মিনিট পনেরো বাকী। কিন্তু ওরা—ঐ উন্মত্ত জনতা এখানে এসে পড়বে পাঁচ মিনিটের মধ্যে।”

     শ্রীনিবাস অভয় দিলেন, বললেন, “এই অব্জার্ভেটরি দুর্গের মতন, আমরা ওদের আটকে রাখতে পারবো। অতীশ, তুমি তোমার লোকেদের কাজে ব্যস্ত রাখো, আর লোহিতের দিকে দৃষ্টি রেখো। আমি আর ভুবন গিয়ে সামনের দরজায় চেয়ার টেবিল আলমারি ঠেসান দিচ্ছি। ভুবন, চলো।”

     ভুবন রেডি ছিল। সে শ্রীনিবাসের সঙ্গে যোগ দিল। সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে তারা অনেকটা নেমে গেল, কিন্তু চারপাশ অন্ধকার, কিছু ঠাহর হয় না। অবজারেভ্টরির ডোমের আলোকিত দরজা পিছনে হারিয়ে গেল, সামনে পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার।

     শ্রীনিবাস দিশাহারা হয়ে পড়ে গেলেন, ডানহাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আহ আমি —আমি শ্বাস নিতে পারছি না। ভুবন, আপনি আমার জন্য থামবেন না, গিয়ে সামনের দরজায় ঠেকা দিন।”

     ভুবন কয়েক ধাপ নেমেছিল, কিন্তু ফিরে এল। বললো, “শ্রীনিবাস, কয়েক মিনিট থাকতে পারবেন? আমি আলো নিয়ে আসি একটা।”

     ভুবনের হৃৎপিন্ড ধকধক করছিল, অন্ধকারে সেও তো ভয় পায়! কিন্তু তা সত্ত্বেও সাহস সঞ্চয় করে দুড়দাড়িয়ে এক এক বারে দুই ধাপ করে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলো।

     কাছের বাতিটাকে হোল্ডার থেকে নামিয়ে হাতের মুঠোয় গোড়াটা শক্ত করে চেপে ধরে ছুটলো আবার নিচে। বাতিটা থেকে ধোঁয়া আসছিল আলোর সঙ্গে, তবু খুব ভালো লাগছিল ওর, সোনালি শিখাটুকু যেন প্রাণদায়িনী।

     নিচে সিঁড়িচাতালে শ্রীনিবাস চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিলেন, ভুবন তাঁর কাঁধে ধাক্কা দিল, উনি কাতরে উঠে চোখ মেললেন। ভুবন বললো, “সব ঠিক আছে, এই দেখুন আলো এনেছি।”

     দু’জনে মিলে তারপরে নিচের প্রশস্ত অফিসঘরে। ঘরে বাতি জ্বলছিল, দেখে ভুবন আশ্বস্ত হল।

     শ্রীনিবাসের হাতে নিজের বাতিটা দিয়ে ভুবন বললো, “শুনতে পাচ্ছেন বাইরে চিৎকার? ওরা এসে পড়ল বলে।”

     বাইরে কর্কশ চিৎকারধ্বনি শোনা যাচ্ছিল, কথা বোঝা যাচ্ছিল না, শুধু সম্মিলিত জনতার ক্রুদ্ধ গর্জনশব্দ।

     এই অবজার্ভেটরি শক্তপোক্ত দুর্গের মতন সত্যিই, গত শতকে স্থাপত্যের নব-দেবদত্তীয় ধারা যখন সবচেয়ে জনপ্রিয়, তখন এটা তৈরী। ঐ স্থাপত্যবৈশিষ্টের মূলে আছে স্থায়িত্ব ও মজবুত গঠন, সৌন্দর্য্যের দিকে ততটা জোর নেই।

     জানালাগুলো ইঞ্চিখানেক পুরু লোহার গ্রিল দিয়ে সুরক্ষিত, দেওয়াল চওড়া মজবুত গাঁথনির, ভূমিকম্পও টলাতে পারবে না। প্রধান দরজা বিশাল, ওক কাঠের, তাকে ঘিরে লোহার ফ্রেম।

     শ্রীনিবাস প্রধান দরজার ছিটকিনি আটকে হুড়কো লাগালেন। তারপরে তাঁর চোখে পড়লো পিছনদিকে একটা ছোটো দরজা, ছিটকিনি ভাঙা, হুড়কো নেই। শ্রীনিবাস বললেন,”ঐখান দিয়েই তবে লোহিত ঢুকেছিল!”

     কিন্তু এইবারে? কী করা যায়?

     ভুবন ঐ ছোটো দরজার পাল্লা দুটো ঠেসে বন্ধ করে একটা টেবিল টেনে এনে ঠেকা দিল, তারপরে ভারী একটা চেয়ার টেবিলটার উপরে তুলে দিল। যাক, এখনকার মতন ব্যারিকেড নিশ্ছিদ্র।

     বাইরে জনতার গর্জন শোনা যাচ্ছে, ওরা সামনের দরজার করাঘাত করছে, কিন্তু তাতে ঐ বজ্রসম কঠিন দরজার কিছু হবে না।

     শরণ্য শহর থেকে রওনা দেবর সময় গুপ্তসমিতির লোকেরা অস্ত্র, গাড়ী, নেতৃত্ব কোনোকিছুর কথাই ভাবে নি, পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছিল খালি হাতেই। ভেবেছিল খালি হাতেই বুঝি অব্জার্ভেটরির দরজা ভেঙে ফেলতে পারবে।

     লাল সূর্য বিটার শেষ চিলতেটুকু তখন ছায়ায় ঢাকছে।

     ভুবন বলে, “শ্রীনিবাস, উপরে চলুন।”

     উপরে অবজার্ভেটরির ডোমে, ইমন দাঁড়িয়ে তার সোলারস্কোপের সামনে। ঘরের মাঝে নিজের ক্যামেরার সামনে ভীন, বাকীরা সবাই যার যার ওয়ার্কস্টেশনে, সবার সামনেই ক্যামেরা সেট করা।

     ভীন বলছে, “সবাই মন দিয়ে শুনুন প্লীজ। পূর্ণগ্রহণের পূর্ব-মুহূর্তে আমি ছবি তুলেই সেই ফটোপ্লেট সরিয়ে নতুন ফটোপ্লেট দেবো। আপনাদের ফটোপ্লেটগুলো সব তখন রেডি থাকবে নক্ষত্রদের জন্য। সবাই এক্সপোজার টাইম তো জানেন, তাই না?”

     সবাই একসঙ্গে সম্মতি জানায়।

     ভীন নিজের চোখের উপরে হাত ঘষে, বলে, “বাতিগুলো? জ্বলছে না নিভে গ্যাছে? ওহ, না না, নেভেনি। ঐ তো, দেখতে পাচ্ছি।”

     তারপরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভীন বলে,”শুনুন, ঐ সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরার পাল্লার মধ্যে একটা নক্ষত্র পেলেও তুলে ফেলবেন। দুটো নক্ষত্র এক ছবিতে আনতে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। আর–আর যদি মনে করেন মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে, পাগল হয়ে যাচ্ছেন, তাহলে ক্যামেরার দিকে যাবেন না, উল্টোদিকে সরে যাবেন। ঠিক আছে?”

     ভুবন আর শ্রীনিবাস তখন ডোমের দরজায়, ফিসফিসিয়ে শ্রীনিবাস বলেন, “অতীশ কোথায়? আমাকে অতীশের কাছে যেতে হবে।”

     ভুবন উত্তর দিতে পারে না, ঘরের সবাইকে ছায়ার মতন লাগে তার। বাতিগুলো এখনও জ্বলছে, কিন্তু অন্ধকারের সমুদ্রের মধ্যে যেন তারা ছোটো ছোটো গোল গোল আলোর ছোপ মাত্র।

     স্যাঁতানো গলায় সে বলে, “কারুকে চিনতে পারছি না, অন্ধকার।”

     শ্রীনিবাস সামনে হাত বাড়িয়ে এক পা এগোন, তারপরে ভাঙা গলায় ডাকেন, “অ তী ঈ ঈ শ”

     ভুবন শ্রীনিবাসের বাহু ধরে বলে, “আমি আপনাকে নিয়ে যাই, চলুন।”

     কেমন করে যেন ঐ অন্ধকারের ভিতর দিয়েই সে শ্রীনিবাসকে নিয়ে ঘরের অন্যপ্রান্তে যায়। ঘরের অন্য লোকেরা সবাই যার যার নিজস্ব কাজ, নিজস্ব ভয় সামলাতে ব্যস্ত, কেউ তাদের নজর করে না।

     কীসে যেন হোঁচট খান শ্রীনিবাস, দাঁড়িয়ে পড়েন। তারপরে ডাকেন, “অতীশ”।

     কার যেন কাঁপা হাত তাঁকে স্পর্শ করে, তারপরেই সরে যায়, তারপরে তাঁর গলা শোনেন শ্রীনিবাস, অতীশ এসেছেন।

     অতীশ বলেন, “শ্রীনিবাস?”

     শ্রীনিবাসের আবার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু ভয় সরিয়ে রেখে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে চেষ্টা করেন তিনি। বলেম, “অতীশ, দরজা সব বন্ধ করে এসেছি আমরা। বাইরের উন্মত্ত জনতা ঢুকতে পারবে না। আমরা নিরাপদ।”

     এদিকে দূরে নিজের জায়গা থেকে লাফিয়ে ওঠে লোহিত, তার মুখ বেঁকেচুরে গ্যাছে, সে যেন কী বলতে চায়, অথচ বলতে পারে না। বলতে গেলেই যদি কথা আটকে যায়, তাহলে তার আত্মার মুক্তি হবে না। এদিকে নক্ষত্রদের পুণ্য আবির্ভাবক্ষণ সমাগত।

     দূরে সে দেখতে পায় ভীনের মুখ, লাল সূর্য বিটার শেষ চিলতেটুকুর ছবি তুলছে। মুহূর্তে নিজের ইতিকর্তব্য স্থির করে নিয়ে সেইদিকে গুঁড়ি মেরে অগ্রসর হয় লোহিত।

     কিন্তু পৌঁছতে পারে না, তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে ভুবন, বলে, “ছি ছি ছি, বদমাশ, বেইমান!”

     লোহিত একটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিতে চায় ভুবনের মুঠো, কিন্তু পারে না। ভুবন বাঘের মতন ধরে রাখে তাকে।

     হঠাৎ ভুবন শোনে ভীন বলছে, “সবাই নিজের ক্যামেরায় দেখুন, নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে কিনা, এইমাত্র পূর্ণগ্রহণ হয়েছে।” এইটুকু বলেই আঁক বলে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় ভীনের।

     দূর থেকে শ্রীনিবাসের অদ্ভুত একটা চিৎকার, কে যেন পাগলের মতন হা হা হা করে উঠে দুম করে চুপ করে গেল—তারপরে একটা নৈঃশব্দ, অদ্ভুত নীরব সব, বাইরের জনতার গর্জন হঠাৎ থেমে গিয়েছে।

     ভুবন টের পায় তার হাতের মুঠোর মধ্যে লোহিতের দেহ শিথিল হয়ে গিয়েছে, তার বোবা চোখে দূরের বাতির সোনালি আলোর প্রতিফলন, তার মুখে গ্যাঁজলা, গলা দিয়ে জান্তব ঘর্ঘরানি বেরিয়ে আসছে। লোহিতের অচেতনপ্রায় দেহ নিজের এক হাতের বেড়ের উপরে নিয়ে ভুবন ফিরে তাকায় জানালার দিকে।

     নক্ষত্র!!!! জানালা দিয়ে সে দেখতে পায় নক্ষত্রদের। সত্যি, সব সত্যি।

     রাশি রাশি নক্ষত্র। নগমা এক স্টার ক্লাস্টারের মধ্যস্থলে, তাই এত নক্ষত্র। ত্রিশ হাজার নক্ষত্রের তীব্র দ্যুতি নেমে আসছে রক্তজমানো ঠান্ডা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে।

     হতবিহ্বল ভুবন লোহিতকে মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার গলার পেশীগুলো চারদিক থেকে চেপে এসে তার শ্বাস বন্ধ করে দিতে চায়, শরীরের সমস্ত পেশী শক্ত হয়ে যায়, ভয় একটা পরিপূর্ণ কালো সমুদ্রের মতন তাকে ডুবিয়ে দিতে চায়।

     সে স্পষ্ট বুঝতে পারে সে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে। তার ভিতরে একটা ছোট্টো শিশুর মতন ছটফট করে তার স্বাভাবিক চেতনা, ছোটো ছোটো দুই হাত দিয়ে কালো ভয়কে ঠেকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু পারে না।

     কী ভয়ংকর! সম্পূর্ণ জেনেবুঝে পাগল হতে থাকা! এক মুহূর্তে সে আছে, তার দুনিয়া আছে, তার পরমুহূর্তেই সে থাকবে কিন্তু তার দুনিয়া চলে যাবে অন্ধ উন্মাদনার গর্ভে! ওহ্হ্হ।

     অন্ধকার, ঠান্ডা, প্রলয়। এই সেই কালরাত্রি। মহাজগতের আলোকিত দেওয়ালগুলো ভেঙেচুরে পড়ে গিয়েছে, এখন অন্ধকারের কালো কালো টুকরো নেমে আসছে তাকে পিষে মারতে।

     কে যেন হামাগুঁড়ি দিয়ে এগোচ্ছিল, তার উপর দিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যায় ভুবন। তার সমস্ত উন্মত্ত চেতনায় এখন আলোর জন্য হাহাকার। দেওয়ালের বাতির দিকে ছুটে যায় সে।

     “আলো চাই” সে চিৎকার করে ওঠে ঘরঘরে গলায়।

     কোথায় যেন অতীশ কাঁদছেন, ভয়ার্ত শিশুর মতন। বলছেন, “ঐ নক্ষত্র, অত অত নক্ষত্র, আমরা কিছু জানতাম না। কিছু না। ছ’টি সূর্য—আহ— এই ছিল আমাদের জগৎ। এর বাইরে এত এত এত নক্ষত্র, এত এত এত সূর্য—-এখন এই এত অন্ধকার, অন্ধকার, দেওয়াল ভেঙে অন্ধকারের সমুদ্র—আহ, আহ, কিছু জানা হল না, আহ, আহ, আর পারি না, এবারে সব শেষ।”

     কে যেন শেষ বাতিটা মেঝেতে আছড়ে ফেললো, নিভে গেল সেটা। সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রদের আলোকচ্ছটা যেন লাফিয়ে এলো ভেতরে। কী উদাসীন, অথচ কী তীব্র সুন্দর!

     দূরে শরণ্য নগরীতে লাল আগুনের ছটা দেখা দিয়েছে, মানুষ আগুনে পুড়িয়ে ফেলছে তার সভ্যতা। আবার শুরু হয়ে গেল দীর্ঘ রাত্রি।

**********

( লেখক পরিচিতিঃ আইস্যাক আসিমভের জন্ম ১৯২০ সালে রাশিয়ায়। পরবর্তী কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহন করেন আসিমভ। পেশায় বায়োকেমিস্ট আসিমভকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের একজন বলে ধরা হয়। সারাজীবন তিনি প্রায় ৫০০ বই লিখেছেন বা সম্পাদনা করেছেন। আসিমভকে মনে করা হয় কল্পবিজ্ঞানের সেরা তিন লেখকের একজন বলে, রবার্ট হেইনলেইন আর আর্থার সি ক্লার্কের সাথে। কল্পবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আসিমভের ফাউন্ডেসন, রোবট আর গ্যালাকটিক এম্পেরর সিরিজ বিশ্বখ্যাত। ‘নাইটফল’ গল্পটি ১৯৬৪ সালে সায়েন্স ফিকশন রাইটার্স অফ আমেরিকা সংগঠনটি ‘বেস্ট সায়েন্স ফিকশন স্টোরি অফ অল টাইম’ সম্মান দেয়। এছাড়াও আসিমভ প্রচুর রহস্য, ফ্যান্টাসি, পপুলার সায়েন্স ও নন ফিকশন লিখে গেছেন। ১৯৯২ সালে তার মৃত্যু হয়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!