যদি

শর্মিলা মৈত্র

অলংকরণ:অঙ্কিতা

এক…

আলো ভালো করে ফুটতে না ফুটতেই হালুম-গোলুমকে তাড়া লাগায় দিদুন, “চটপট রেডি হয়ে নে। একজায়গায় নিয়ে যাব।” দাদাভাই অবিশ্যি ওদের পক্ষ নিয়ে বলতে যায়, “আহা, ওদের যে এখনও উড়োজাহাজের খোঁয়ারি কাটে নি। কাল গেলে হত না? মর্ণিং ওয়াক তো পালিয়ে যাচ্ছে না।” হালুম-গোলুম মজা পায়, “দাদাভাই ইজ সো ফানি! হোয়াটস আ খোঁয়ারি? ইউ নো গোলুম?” “নোপ।” গোলুম চাঁচাছোলা, “সাম ল্যাঙ্গোয়েজ ফ্রম দি আউটার স্পেস আই বিলিভ।” ওদের বাবা এ ঘরে কথার আওয়াজ পেয়েই বোধহয় চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে আসে, “শাট আপ গোলুম! ইটস ইওর মাদার টাং! ডোণ্ট মেক ফান অফ ইট!” “তুই আবার উঠে এলি কেন? আসলে ওর দিদুন আর আমার দুজনের ইচ্ছে আমাদের সকালবেলাকার জমায়েতে জোড়া নাতিদের একবার দেখাব। গেলবার যখন এসছিল তখন তো জ্ঞান হয় নি। তুই শুয়ে পড়গে যা। তোরা চিন্তা করিস নি বাবান, খানিক বাদেই ফিরে আসব, বৌমাকে বলে দিস।” বাবান তার ঘরের আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে মেম বৌমাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে নেয় আর তারপর নীচু গলায় বলে, “ভালো করে গরম জামাটামা পরিয়ে নিও, মেম হোক আর যাই হোক, আফটার অল মা তো, ওর আর দেশ- বিদেশ হয় না। ঠান্ডা-ফান্ডা লেগে গেলে চেল্লাতে শুরু করে দেবে।” হালুম-গোলুমকে রণসাজে সজ্জিত করে সকালের আড্ডায় এসে হাজির হতেই বুড়োবুড়ির দল হুড়োহুড়ি শুরু করে দেয়, “ও মা! কোনটা হালুম কোনটা গোলুম রে অপালা?” গালগুনো দেখ, টুকটুকে আপেলের মতো যেন! মা’র মতো সোনালী চুল পেয়েছে, কি বল?” “ও ভটচায দা, বাংলা জানে? না কেবল গ্যাট ম্যাট ফ্যাট?” “পুরো সায়েব বাচ্ছা দুখানা!” “শেক হ্যান্ড… আই অ্যাম অ্যানাদার দাদু… দাদু অফ দ্য পার্ক!” নানান কথায় পার্কের ভোরবেলা সরগরম হয়ে ওঠে। হালুম-গোলুম খানিকক্ষণ হাসিটাসি দিয়ে ম্যানেজ করে, তারপর সবাই নিজেদের প্রাত্যহিক কচালীতে ফিরে গেছে দেখে একটু নিশ্চিন্ত হয়। হালুম দিদুনকে কানে কানে বলে, “মে উই…” বাকীটা হাত ঘুরিয়ে মূকাভিনয় করে দেখায়। দিদুনের বুঝতে দেরী হয় না এবারে, “কেমন বুদ্ধি হয়েছে দেখো! অ্যাক্টিং করে কেমন বুঝিয়ে দিলে! ইংরিজি জানি না ভেবো না বাপু তা বলে। সেকালের লন্ডন মিশনারিতে পড়া মেয়ে আমি। তবে তোমাদের হাঁউ মাউ ইংরিজি বাপু কিচ্ছু বুঝতে পারি না। কি বলছিস? পার্কে একটা চক্কর মেরে আসবি? বেশ তো, যা না, কিন্তু পার্কের বাইরে যেও না বাপু… …” শেষ কথাগুলো উনিও মূকাভিনয়ের মাধ্যমে দেখান। হালুম-গোলুম দুচারটে ওখে, ডোণ্ট ওরি ডিডুন জাতীয় আশ্বাসবাক্য ছেড়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটা লাগায়। পার্কের যে কোণাটায় ছোট্ট লোহার গেট আছে, আর সেটা দিয়ে বেরোলেই কাণাগলিটা যেখানে রাজ্যের বাতিল মালপত্তর ডাঁই করে রাখা থাকে, কেউ কখনও নিয়েও যায় না, সেখানে আবর্জনার স্তুপে ওরা প্রথম দেখতে পেল স্পেসশিপটাকে। কোথা দিয়ে যেন নীলচে ধোঁয়া গলগলিয়ে বেরোচ্ছে আর সে ধোঁয়ার গন্ধটাও ওদের চেনা নয় – কেমন যেন ভিজে ভিজে, সোঁদা সোঁদা। হালুম শক্ত করে গোলুমের হাত চেপে ধরে, “শ্যাল উই?” “লেটস… বাট বি কেয়ারফুল। এলিয়েনস মে অ্যাটাক।” গা ছমছম করলেও ওরা হাল ছাড়ে না, লোহার মরচে ধরা বেঁটে গেটটা ক্যাঁচোত করে খুলে গলিতে পা দেয়। কোত্থাও কেউ নেই, কেবল নীলচে ধোঁয়ার রাশ সোঁদা গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে পাক খেয়ে আধো অন্ধকার আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। হালুমের কাঁপা গলা বাজে, “এনিবডি দেয়ার?” গোলুম ওর মুখে হাত চাপা দেয়, “নো… শ শ শ… ইউ আর বিয়িং টু অ্যাডভেঞ্চারাস হালুম।” “আই ওয়ান্ট টু সী ওয়ান… আই হ্যাভ নেভার সীন অ্যান এলিয়েন বিফোর।” “নিদার আই, বাট…” ওদের কথোপকথন শুনতে পেয়েই বোধহয় ভেতর থেকে অদ্ভুত মূর্তিটা বেরিয়ে আসে, পেছন পেছন আরও একটা। হালুম-গোলুমের বয়সীই হবে, কারণ চেহারা দেখে বয়েস বোঝা দুষ্কর। ঢাকের মতো পেটের চারপাশে কাঠি কাঠি হাত পায়ের মতো চারখানা কি যেন, আর ওপরদিকে গোল হাঁড়ির মতো মাথা – লজ্জাস্থানে একফালি কানি মতো কাপড় দিয়ে ঢাকা, কিন্তু ঊর্ধাঙ্গে ঢোলা ডবল সাইজের হুড দেওয়া জামা। ল্যাগব্যাগ করতে করতে খানিকটা হেঁটে এসে কিম্ভুত মূর্তিদুটো বলে ওঠে, “অ মাই…মা…ইন্দি আয়্যা দেহ একবার, দুই আন ইকুলিয়ার পোলা আইস্যে…” ( মা, মা, দুটো অদ্ভুত দেখতে বাচ্ছা, দেখবে এস) হালুম-গোলুম ওদের কিচিরমিচির কিচ্ছু বোঝে না। ভেতর থেকে আওয়াজ আসে, “আয় অন যাইত ন পারস্যুম। চুলা ধরাইত তো! “(কাজ করছি, এখন যেতে পারব না, উনুন ধরাচ্ছি দেখতে পাচ্চিস না) কিম্ভুতেরা অনুনয়ের সুরে বলে, “একবার…তরাতরি আইসত করত। মনে হর যাইব গা – কন্ডেতুন আইস দু আন পোলা? পিত্থিবীর বাইরের তুন? মা, হে দুই আন পোলা ভূত হইব ফানলার! “(একবার… চলে যায় যদি? কোত্থেকে এল বলতো এ দুটো? পৃথিবীর বাইরে থেকে বোধহয়। ভূত নয়তো?) আরেকটা একটু বড় সাইজের কিম্ভূত স্পেসশিপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, “দূর, ভূত কিয়রলায় অইব? সায়েবের পোলা অইব ফানলার। এডে কুইথ্যে আইস্যে? ও বাপ, এডে বইয়ো। ইক্কিনি চা খাইবা না?” (দূর, ভূত হবে কেন? সায়েব বাচ্ছা মনে হচ্ছে। এল কোত্থেকে এখেনে? বসো না বাবারা, চা খাবে?) গোলুম আরও শক্ত করে হালুমের হাত আঁকড়ে ধরে, “দে আর অফারিং আস সাম্থিং… …লেটস রান হালুম।” হালুম খোঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নড়ে না, “আই ওয়ান্ট টু টেক দেম টূ ম্যারিকা ইউ নো। শো দেম টু মাই সায়েন্স টিচার। ইটস আ লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স ইউ নো বাডি।” হালুম পায়ে পায়ে স্পেসশিপটার ভেতরে ঢুকে যায় আর ওর পেছন পেছন কিম্ভূতেদের দলটাও। যাবার সময় গোলুমের দিকে ইশারা করে ওকেও আসতে বলে যায়। গোলুমের পা দুটো মাটির সঙ্গে পেরেক-মারা হয়ে থাকে, সারা গা এই শীতের সকালেও বিনবিনে ঘামে ভিজে যায়। আর ঠিক তক্ষুণি শুনতে পায় পার্কের দরোয়ান রামজীর গলা, “ওই – ওই তো আপনের সায়েব নাতি… দুষ্টু আছে স্যার। গেট খুলে বাইরে চলে এসেছে… এ্যাই! এ্যাই! কাঁহা লে যা রহে হো উস্কো? ছোড়ো… ছোড়ো…” হালুমকে উদ্ধার করে দাদাভাইয়ের হাতে তুলে দেয় রামজী। দাদাভাইও ঘেমে উঠেছেন, কপালের ঘাম রুমালে মুছতে মুছতে বলেন, “মিত্তির তুমি ওদের দিদাকে খবরটা দিয়ে দাও তো যে ওদের পাওয়া গেছে। আমি ব্যাপারটা দেখি এক্টু… রাম, এরা কে? ছেলেধরা টরা নয়তো?” “আরে না না বাবু। এই রকেটটা গেল পুজোতে পান্ডালের জন্য বানানো হল। প্রাইজ ভী পেল আমাদের পুজো। তারপর যা হোয়, রাস্তায় পড়েই আছে। এই ফেমিলিটা ভিখমাঙ্গাদের ফেমিলি বোধহয়… কোথা থেকে এসেছে কে জানে, রাস্তায় পড়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে এর ভেতরে সেঁধিয়েছে। ওখানেই থাকে। ভয় পাবার কিছু নেই, খোকাবাবুরা পান্ডালের ভেতরটা দেখতে চাচ্ছিল বোধহয়, বিলায়েতে ওরকম কিছু তো দেখেনি কভি, কি তাই তো খোকাবাবুরা?” হালুম-গোলুম শক্ত হয়ে ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের দাদু তাড়া লাগান, “চল, চল, মা উঠে পড়লে চিন্তা করবে…” দাদুর পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে হালুম গোলুমের কানে কানে বলে, “দাদাভাই নোজ নাথিং… হ্যাভ ইউ সীন দেম? দেয়ার ড্রেস? ল্যাঙ্গোয়েজ?” গোলুম সায় দেয়, “ঈয়া, আই বিলিভ দে আর… এনিওয়ে, ওয়ান মাস্ট নট এক্সপেক্ট এলিয়েন্স ইন ইন্ডিয়া, দে ল্যাক ইমাজিনেশান আই বিলীভ!”

 

দুই…

বিল্টু এমন আচমকা ‘বৌদি’ বলে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল লিপির হাতের বেলনাটা কেঁপে গিয়ে নিটোল গোল রুটিটার একটা ধার কেমন তেকোনা মতো হয়ে গেল। বিরক্তমুখে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল লিপি যাতে রুটিটার আগের আকার ফিরে আসে। কিন্তু হল না। আরও তেতো মুখে লিপি বলতে থাকে, কি কর বল তো ঠাকুরপো? এমন আকাচমকা ঘাড়ে এসে পড় না! গেল রুটিখানা তেকোণা হয়ে, তোমার বাবার মুখ শুনতে হবে এক্ষুণি। বয়েস বাড়ছে না কমছে দিনকে দিন?” বিলটুর গোঁফের রেখার মধ্যে দিয়ে দুষ্টুমি আর কাম মাখানো হাসি ফুটে উঠল, “ঠেলে সরিয়ে দিলে তো? দাঁড়াও, বলছি বাবাকে। তারপর মা মরা ছেলেকে দূরছাই করার দায়ে আরেক দফা কোর্ট মার্শাল খাবে।” “বল গে যাও। কমই বা কি শুনছি সারাদিনে। এবার মুখের ওপর বলে দোব পারব না।” “কি পারবে না গো বৌদি? আমার চাপ সামলাতে না সংসার ধর্ম করতে? না কি দাদার সঙ্গে থাকতে? শেষেরটা যদি হয়, তাহলে লাইনে আমি আছি।” আবার সবলে পেছন থেকে লিপিকে জড়িয়ে ধরে বিল্টু। নিজের পেছনে সদ্য যুবক দেওরের পুরুষালি কাঠিন্য অনুভব করে কি লিপি? এবার ঝটকা মেরে ছাড়াতে গিয়ে গ্যাসে বসানো সসপ্যানের হাতলে ধাক্কা লাগে। ছ্যাঁক শব্দ করে খানিকটা জল চলকে পড়ে আগুন নিভে যায়। “বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু…” লিপি কঠিন হয়, অসম্ভব বিরক্ত লাগতে থাকে তার। “কি করবে? বাবাকে বলে দেবে? যাও, বল না গিয়ে…” বিল্টু ছাড়ে না ওকে। আর ঠিক তক্ষুণি শ্বশুরের গলা বেজে উঠে লিপিকে মুক্তি দেয়, “কি হল কি বৌমা? দুটো রুটি দিতে বেলা কাবার করে ফেললে যে মা। তোমার বৌদির আমলে এসব হবার জো টি ছিল না, দেখছ তো হীরেন দা, সবকিছু একেবারে পারফেক্ট, মেশিনের মতো স্মুদ চলত।” “সে আর বলতে? দেখিনি আবার। কি আর করবে ভায়া, একটু মানিয়ে গুছিয়ে নাও যে ক’দিন আছ।” লিপি রান্নাঘর থেকে বুঝে যায় হীরেন জেঠুও এসে হাজির হয়েছে, তিন কাপ চা করতে হবে। দেওরকে একরকম ঠেলে ঘর থেকে বের করে দেয়, “পড়তে বোস গে, চা দিয়ে আসছি ঘরে।” বাবাকে খাবার দিতে গিয়ে আবারও পারফেকশানের চক্করে পড়ে যায় লিপি। উনি তিনখানা রুটির মাঝ থেকে ঠিক তেকোনাটা বেছে বের করেন, “দেখেছ, দেখেছ হিরেন, তোমার বৌদির হাত দিয়ে এ জিনিস কোনদিন বেরুত? এখনকার মেয়েদের সবতাতেই তাড়াহুড়ো। বৌমা, এ রুটিখানা মনে হচ্ছে ফোলেও নি, এখানা নিয়ে যাও, আজ দুখানাই খাই।” আলুভাজাগুলো আঙুলে নাড়াচাড়া করতে থাকেন ভদ্রলোক। লিপি ভাবে, আলুর সাইজ মিলিয়ে দেখছে নাকি সবক’টা এক মাপের কিনা? ডেঞ্জারাস বুড়ো! হীরেন জেঠু ওর অবস্থাটা বোধহয় বুঝতে পারেন, বিপদতাড়ন হয়ে বলে ওঠেন, “তোমার আবার বড্ড খুঁতখুঁতুনি বাপু। বেচারির মুখখানা কেমন শুকিয়ে গেছে দেখছ না? এদিকে এস মা…” লিপি প্রমাদ গোণে, এখুনি বলবে বসতে আর তারপর যেখানে সেখানে হাত বুলিয়ে…  “গ্যাস জ্বলছে জেঠু, চা খাবেন তো?” উত্তরের আগেই রান্নাঘরে সেঁধোয় সে। চা বানানোয় সমস্ত মন ঢেলে দেবার চেষ্টা করতে থাকে, নইলে আবার পারফেকশানের ফাঁদে পড়তে হতে পারে। চায়ের পাতা জল ফোটার ঠিক কোন মূহুর্তে দিতে হয়, ক’মিনিট চাপা দিয়ে রাখতে হয়, চিনি দুধ সবকিছু মিলিয়ে যা দাঁড়ায় সে বিষয়ে একচ্ছত্র অস্কার অধিকারিনী লিপির প্রয়াত শাশুড়ীমা। সশব্দে চিনি গুলতে গুলতেই কানে আসে হীরেন জেঠু বলছেন, “আর চিন্তার কিছু নেই ভায়া, এই দ্যাখো কাগজে কি লিখেছে… মেয়েমানুষের রোবট তৈরি হচ্ছে নাকি ওদেশে। পুরুষের যাবতীয় কাজ নিমেষে করে দেবে উইথ পারফেকশান। কারণ মেশিন-মেয়ে তো! এমনকি বিছানাতেও নাকি…” “থামো তো হীরেন দা, কি যে বল তার ঠিক নেই। ঘরে বৌমা রয়েছে, বিল্টু রয়েছে, শুনতে পাবে না।” হীরেন জেঠুর গলা নামলেও উৎসাহে ভাঁটা পড়ে না। শুধু লিপির কানে পৌঁছয় না কথাগুলো আর তাতে ভারী অস্বস্তি হতে থাকে ওর। এমন একটা মজাদার খবর! শেষমেশ বিল্টুকে ডাকে ও। বিল্টু ব্যাপারটা শুনে তো অবাক। “এতে আশ্চর্যের কি আছে? সবকিছু কম্পিউটারে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে, মেয়েমানুষও হবে। রোবট কম্পানিয়ন বিদেশে চালু হয়ে গেছে অলরেডি।” “আমায় এর ওপর কিছু বইটই এনে দিতে পারবে ঠাকুরপো? একটু পড়ে দেখতুম।” বিল্টু মুখখানা হাঁ করে ফেলে, “কিসে অনার্স ছিল যেন তোমার? বাংলা না? তুমি সায়েন্স ফিকশান পড়বে? মানে এটাও একধরণের কল্পবিজ্ঞান হল না?” “না, মানে বুঝতে না পারলে তুমি তো আছই।” দাদার জায়গায় ওকে গুরুত্ব দেওয়াতে বিল্টু খুশীই হয়, “আচ্ছা, দেখব’খন।” তারপরেই আবিষ্কারের ভঙ্গীতে হাতে তালি দিয়ে ওঠে, “বুঝেছি! তুমি ঐ ব্যাপারটা জানতে চাও, তাই তো?” “কোন ব্যাপার? না, না, আমি ঐ পারফেকশান… মানে কাজকম্মগুলো কি করে… তুমি বুঝবে না, দাও না এনে ঠাকুরপো?” লিপির অনুনয়ে শিহরিত হয় বিল্টু, “আরে বললাম তো দোব। লজ্জা পাচ্ছ কেন? হীরেন জেঠু নীচু গলায় যা বলছিল আমি শুনেছি… ওসবও করা যায় রোবটের সঙ্গে। আমি তোমায় পানু দেখিয়ে দেব’খন।” “পানু?” লিপির মাথায় ঢোকে না কিছু, তারপর কিছু একটা আন্দাজ করে আবার বিল্টুকে ঘর থেকে বের করে দেয়, “আগে বইটা এনে দাও তারপর।” “প্রমিস?” লিপি আনমনে কি একটা উত্তর দেয় নিজেও শুনতে পায় না। রাতে রন্টু নিয়মমাফিক লিপির অনিচ্ছুক শরীরটা ধ্বস্তাতে শুরু করলে ওকে থামিয়ে দিয়ে লিপি বলে রোবট মেয়ের কথা। রন্টু আধবোজা চোখে বলে, “কে ঢোকাল মাথায়? বিল্টু নিশ্চয়ই? যত্তসব আজেবাজে গপ্প মারা কথা। নাও, ঠিক করে শোও দেখি এবার। পারফেক্টলি কিছু করতে শেখোনি লিপি। ধেত্তেরি!” আইন মেনে ধর্ষিত হতে হতে লিপি ভাবতে থাকে, “এটা কারো বাড়ীতে শেখায় বলে তো শুনি নি। আর তুমিও যে এ’তে পারফেক্ট নও সেটাও বুঝতে পারছি, কিন্তু বলার উপায় নেই। আসুক একবার রোবট মেয়েমানুষ… পারফেকশানের ঠেলাটা বুঝবে তখন।” বেশ কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তির পর রন্টু লিপির অভ্যন্তরে গিয়ে দম নেয়, আর হাঁপাতে হাঁপাতে লিপি ভাবতে থাকে – মেশিনের মেয়ে যখন, তখন সবকিছুই মেশিনেরই হবে। ওখানটাও… মেশিন বিগড়ে যদি যায় একবার, ইঁদুরকলের জাঁতির মতো কট করে…”। রন্টু শুধু বলতে পারে, “আঃ লাগছে তো! কি করছ কি?”

তিন…

“কি হে, তিন ছয় তিন নয়, ভ্যাকুয়াম বক্স হাতে সাত সকালে এখানে লাইন দিয়েছ যে?”

“আর বোলো না, সাত পাঁচ নয় ছয়, পুরোনো মেশিন বিগড়োলে এতদিন ফেলে দিয়েই এসেছি জাঙ্ক ইয়ার্ডে, মানে যখন আর সারানো যায় না আর কি…..কাল বাড়ীর সবচেয়ে আদ্যিকালের মেশিনটা জবাব দিয়েছে। পাঁচ পাঁচ দুই বলল ওটাকে ফেলে দেবার সময় নাকি তিন কোয়ার্টার ‘কান্না’ লাগবে।”

“সেটা আবার কি জিনিস?”

“জানি না, বলল আর্কাইভে রাখা আছে কিছুটা। দেবে কিনা কে জানে… চীফের যা মেজাজ… তা তোমার হাতেও তো একটা ভ্যাকুয়াম বক্স দেখছি…”

“কাল বাড়িতে একটা নতুন মেশিন এ্যাসেম্বল করা হল, ছোট্ট সুন্দর একখানা মেশিন। চার চার আট হুকুম করল খানিকটা হাসি নিয়ে আসতে হবে, সবাইকে নাকি হাসতে হবে। এতদিন কত মেশিন ফেলা হল আর গড়া হল, এমন অদ্ভুত আবদার কোনদিন শুনেছ?”

“সব চীফের জন্যে বুঝলে, এসব কিছুর জন্যে উনিই দায়ী।”

“চীফ? এই সবকিছুর জন্যে শাসন ব্যবস্থাকে দায়ী করাটা কিন্তু প্রাগৈতিহসিক অভ্যাস। সবকিছু পালটে ফেলেছ, ওটা পাল্টাওনি?”

“পালটে তো ফেলাই হয়েছিল, কে বলেছিল ওনাকে আর্কাইভ থেকে এই ভাষাটা বের করে আমাদের মধ্যে প্রোগ্রামিং করে দিতে? শূন্য এক দিয়ে কথা বলা নাকি ওনার কাছে একঘেয়ে ঠেকছিল। এখন বুঝুক ঠেলা। এই ভাষাটা মাথার চিপ-এ কাজ করতে শুরু করার পর থেকেই এইসব গন্ড গোল শুরু হয়েছে। হাসি, কান্না, প্রেম, ভালোবাসা, যৌন আনন্দ যা যা উঠে গেছে, অবসোলিট হয়ে গেছে সেই সবকিছু চাইতে শুরু করেছে সবাই, যোগান দিতে মাথার ঘাম পায়ে পড়ে যাবে দেখে নিও।”

“ভালোই তো, আন্দোলন, প্রতিবাদ এগুলোও তো উঠে গিয়েছিল, এই ভাষাটা থেকে জানতে পারলুম ওগুলো ছিল। কেউ কিছু না দিতে পারলে তখন ওগুলো হত। চীফ ফেল করলে আন্দোলন হবে, প্রতিবাদ হবে, চীফ গদিচ্যূত হবেন, নতুন চীফ আসবে। আমাদের একঘেঁয়েমিও কাটা দরকার। যাক গে, দেখ দেখি, আর্কাইভের দরজা খুলল কিনা…”।

3 thoughts on “যদি

  • April 11, 2019 at 1:43 am
    Permalink

    তিনটে গল্প যেন ত্রিবর্ণ,অন্য রকম।

    Reply
  • April 11, 2019 at 9:47 am
    Permalink

    Darun …

    tin ti golpo tin ti swader….khub sunder

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!