রণেন ঘোষ (১৯৩৬-২০১৯) – বাংলা কল্পবিজ্ঞানের এক অন্যতম শেষ মোহিকান

বাংলা কল্পবিজ্ঞানের পাঠকেরা

রণেন ঘোষ (১৯৩৬-২০১৯)

রণেন ঘোষ আর নেই। রবিবারের সকালে মৃত্যু হয়েছে এই অশীতিপর তরুণের। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে অসুখের সঙ্গে লড়তে লড়তে অবশেষে হার মানতে হল আমাদের অত্যন্ত প্রিয়, কাছের মানুষটিকে। তবে রণেনবাবুর মতো সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর কর্মকাণ্ডের ভিতর দিয়ে জীবনের কাছে চিরবিজয়ী হয়ে থাকবেন। মৃত্যুর সাধ্য নেই সেখানে নাক গলায়।

     বাংলা কল্পবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ অদ্রীশ বর্ধনের ‘আশ্চর্য’র সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল যে তরুণদের জীবন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন রণেনবাবু। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই কলম ধরা। বলতেন, ‘‘অদ্রীশদাই আমাকে লিখিয়ে নিয়েছেন বলতে পারো। আমি তখন নানা কাজে ব্যস্ত। অফিস আছে, সোশ্যাল ওয়ার্ক আছে। এমনও হয়েছে, উনি আমার বাড়িতে চলে এসেছেন, আমার গিন্নিকে বললেন, কৃষ্ণা তুমি আমাকে চা করে খাওয়াও। ওকে ওই ঘরে লিখতে বসিয়েছি, ও লিখুক। ধরে না লেখালে তো লিখবে না!’’

     ‘আশ্চর্য’র দুরন্ত সফর আচমকাই থমকে গিয়েছিল সম্পাদকের জীবনে চরম দুঃসময় এসে পড়ায়। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের নয়া যুগের মশাল এসে পড়ে তরুণ রণেনদের হাতে। অনীশ দেব, অমিতানন্দ দাশ, সুজিত ধরদের সঙ্গে রণেনবাবু শুরু করলেন ‘বিস্ময় সায়েন্স ফিকশন’। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বেরিয়েছিল প্রথম সংখ্যা। ‘পাগলামি’ এমন পর্যায়ে ছিল, ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন তাঁরা। ট্রেনেও উঠে পড়তেন পত্রিকার গোছা নিয়ে। স্বল্পায়ু ওই পত্রিকা বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বলা যায় ‘আশ্চর্য’ ও ‘ফ্যান্টাস্টিক’-এর মাঝের এক অনিবার্য মিসিং লিঙ্ক।

     সারা জীবনে মৌলিক লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করেছেন। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ সবেতেই সিদ্ধহস্ত। বলতেন, সারা জীবন অনেক লিখেছি, অনেক জায়গায় লেখার প্রস্তাব পেয়েছি, কিন্তু আশ্চর্য!, বিস্ময় আর ফ্যান্টাসটিক ছাড়া কোথাও লিখিনি। পরে শুরু করেন প্রকাশনাও। ‘প্রতিশ্রুতি’ প্রকাশন।

     আমাদের ‘কল্পবিশ্ব’-র প্রতি অসম্ভব স্নেহ ছিল তাঁর। সব সময় খেয়াল রাখতেন নতুন কারা লিখছে। কোন ধরনের লেখা ছাপানো হচ্ছে। কল্পবিশ্বের প্রথম বার্ষিক সংকলন প্রকাশের সিদ্ধান্তও তাঁরই। প্রথম দুই বারের সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রতিশ্রুতি’ থেকেই। সব সময় চাইতেন, কেবল পত্রিকা নয়। প্রকাশনার কাজও শুরু করি আমরা। বলা যায়, তিনি না থাকলে হয়তো প্রকাশনা শুরু করার সাহসই হত না আমাদের।

     রণেন ঘোষের মৃত্যু তাই আমাদের কাছে এক পরম স্বজনবিয়োগ। ব্যক্তির মৃত্যু হলেও তাঁর কীর্তি থেকে যায়। বাংলা কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি আন্দোলনের ইতিহাস তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। আর রইল তাঁর আশীর্বাদ। যাকে সঙ্গে নিয়ে আগামীর পথে এগিয়ে যেতে চায় ‘কল্পবিশ্ব’।

 

কিছু স্মৃতিচারণা কিছু অনুভূতি

অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়

।। শ্রী রণেন্দ্রনারায়ণ ঘোষ ।।
(১৯৩৬ – ২০১৯)

“একটা খাটিয়া, স্যাঁকা পাঁপড়, আর পাগলামিতে ভর্তি কতগুলো মাথা…”

     এইটা উনি উত্তর দিয়েছিলেন। প্রশ্নটা ছিল ‘বিস্ময়’ শুরু করার পিছনে মূল কারণগুলি কী ছিল? একটি তথ্যচিত্রের সুবাদে একদিনই ওঁর বাড়ি যাওয়া একটি সাক্ষাৎকার নিতে। ঐ প্রথম, ওইই শেষ আলাপ। অথচ আজ পর্যন্ত যত জায়গায়, যত জনের বাড়িতে যাওয়া হয়েছে শুটিং এর জন্য, সবথেকে বেশী সময় কাটানো হয়েছে ওঁরই বাড়িতে; সাড়ে তিন ঘণ্টা। শুটিং টুকু বাদে, সেই সাড়ে তিনঘন্টার আলাপের বিষয় কল্পবিজ্ঞান থেকে খাওয়াদাওয়া হয়ে ব্যাক্তিগত কথা থেকে ক্যামেরার লেন্স পর্যন্ত গড়িয়েছিল। চলে আসার আগে বললেন “তোমাদের একটা জিনিস দেখাই”। বলে আমাদেরই বললেন “আলমারি থেকে কাগজে মোড়া লেন্স গুলো বের করো”। সব পুরোনো আমলের ফিল্ম ক্যামেরার লেন্স! চোখেই দেখা যায়না। আর আমরা হাতে ধরে সেগুলো দেখছি! তার মধ্যে একটা লেন্স হাতে নিয়ে বললেন “তোমরা একটা ছবি দেখেছো, ইন্দিরা গান্ধী রিফিউজি ক্যাম্পে খিচুড়ি পরিবেশন করছেন? ওটা আমার তোলা, এই লেন্সটা দিয়ে”।

     ভালো থাকবেন রণেন বাবু।

     প্রণাম নেবেন।

দীপ ঘোষ

বছর কয়েক আগে হোয়াটস অ্যাপ ব্যাবহার করা শিখেছিলেন, আর তারপর থেকে প্রত্যেকদিন সকালে ফোন খুললেই অন্তত রণেন ঘোষের থেকে একটা ‘সুপ্রভাত’ পাবোই। আমি যে কবার ওনাকে উত্তর দিয়েছি তা দুই হাতের আঙ্গুল গুনেই হিসেব করা যাবে। দু তিন দিন পরপরই ফোন করতেন বিকেলের দিকে। অনেক সময় কাজের মাঝে ধরতে পারতাম না। ফোন ব্যাকও সেদিন হয়ত করা হতনা। কিন্তু এগুলো কোনো রকম অবজ্ঞা নয়, নিজের বাবা মা ভাই বোনের সাথে যেভাবে ফর্মালিটি করিনা, সেরকমই রণেনবাবুর সাথেও আমার সম্পর্ক ছিল। সেই ২০১৬ সালের মাঝে কল্পবিশ্বের ইন্টারভিউ নেবার জন্যে হাজির হয়েছিলাম ওনার পার্ক সার্কাসের বাড়িতে। তারপর থেকে ওটাই হয়ে উঠেছে কল্পবিশ্বের অ্যান অফিশিয়াল আড্ডাঘর। কখনো সশরীরে আবার কখনো ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। ছিলেন কল্পবিজ্ঞানের সাক্ষাৎ সিধু জ্যাঠা – কত তথ্য আর বই দিয়েই না সাহায্য করেছেন আমাদের। যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন কত নতুন লেখক আর গবেষকদের সাথে। অভিজিৎ দা, বোধি, কার্লস থেকে শুরু করে আরো কতজনই না। ২০১৭ সালে জোর করে বললেন বই বের কর! আমি আছি তো, প্রকাশনা আর খরচের চিন্তা কোর না। অনভিজ্ঞ হাতে পরপর দুবছর বের হল দুটি কল্পবিশ্ব। এক সময় রাগ হত, আমাদের দ্বারা এসব বই বের করা হয় নাকি? পরে শুনেছি উনি বলেছেন – শিখুক হাত পুড়িয়ে, তবেই তো কাজটা বুঝবে। আমি সেই সুযোগটা দিচ্ছি ওদের। হ্যা, সেই সুযোগটা পেয়েছিলাম বলেই ২০১৮ সালে এসেছে কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন। তারপরে আরো কত প্ল্যান চলেছে দিনের পর দিন। কতবার নানা অসুবিধায় পড়ে মন খারাপ করে ফোন করেছি। অভয় দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন, স্নেহভরে বলেছেন সব ঠিক হয়ে যাবে, তোমরা আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। আগের বছর কল্পবিজ্ঞানের কনফারেন্সে ওনার উৎসাহ ছিল দেখার মত – অনেক অসুস্থতার মধ্যেও এসেছিলেন উনি। ফেরার সময় নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসে উনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমায় আর সন্তুকে ওনার কল্পবিজ্ঞানের লেখা গুলি একত্রিত করার। এত অল্প সময়ে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কথা দিচ্ছি এই বই বের হবেই প্রতিশ্রুতি থেকেই। এই চিঠিটি আমার আর
সন্তুর কল্পবিজ্ঞানের সম্পাদক জীবনের সেরা প্রাপ্তি হয়েই থাকবে।

বিশ্বদীপ দে

‘তুমিও লেখো না কেন?’ ২০০১ সালের এক শীতকালে এই প্রশ্ন আমাকে করেছিলেন রণেন ঘোষ। মুখে নয়, কলমে। আসলে গিয়েছিলাম তাঁর অটোগ্রাফ নিতে। বইমেলায়। ‘প্রতিশ্রুতি’র স্টলে। কলমের আঁচড়ে লিখে দিয়েছিলেন কথা ক’টি। আর মনের ভেতরে জ্বেলে দিয়েছিলেন লেখা-ইচ্ছের অনর্গল ফুলঝুরি।
     রণেন ঘোষ প্রয়াত। লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক রণেন ঘোষ বাংলা কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অনিবার্য নাম । রবিবারের সকালে তাঁর স্পেসশিপ উড়ে গিয়েছে অনন্তের দিকে। মাথার মধ্যে ভেসে আসছে অনেক কথা। অনেক স্মৃতি। আমার সঙ্গে, আমাদের ‘কল্পবিশ্ব’-র সঙ্গে তাঁর ছিল এক অমোঘ হৃদ্যতা। বছর কয়েক আগে তাঁকে ফোন করেছিলাম। বাংলা কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আমাদের মাতামাতি ও কল্পবিশ্বের কথা শুনে শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন মানুষটা। আমাদের সকলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বাড়িতে। সেই শুরু। তারপর জড়িয়ে যাওয়া যেন একটা যুগের সঙ্গে। সাতের দশকে তরুণ রণেন ও তাঁর বন্ধুরা বের করেছিলেন ‘বিস্ময় সায়েন্স ফিকশন’ পত্রিকা। আর এখন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে আমরা ক’জন শুরু করেছি ‘কল্পবিশ্ব’। বলতেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে নিজেদের সময়টা খুঁজে পাই।’’
     অগাধ পাণ্ডিত্য। বাড়ি ভর্তি বই। তাঁর বইয়ের সংগ্রহ সম্পর্কে একটা তথ্যই যথেষ্ট। অদ্রীশ বর্ধনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে বই চেয়ে পড়তেন সত্যজিৎ রায়। বিলিতি সাই-ফাই-এর এমন সংগ্রহ গোটা কলকাতা শহরে কারও কাছেই বোধহয় নেই। কেবল সাই-ফাই নয়, বিজ্ঞান ও গবেষণামূলক বইয়েরও বিপুল সংগ্রহ। লিখতেন। পড়তেন। সেই সঙ্গে লিখতে উৎসাহ দিতেন তরুণদের। ‘প্রতিশ্রুতি’ প্রকাশনী তৈরিই করেছিলেন চুটিয়ে সাই-ফাই, ফ্যান্টাসি ও বিজ্ঞান বিষয়ক নন ফিকশন ছাপবেন বলে।
     ব্যক্তিগত সাক্ষাতে বরাবরই উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন। আমায়। আমাদের। গত নভেম্বরে যাদবপুরের সেমিনারে এসেছিলেন। তিনি ও তাঁরই সমবয়সি, যাঁরা জড়িয়েছিলেন ‘বিস্ময় সায়েন্স ফিকশন’র সঙ্গে, তাঁদের সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করার দৌলতে কাছ থেকে শুনেছিলাম তাঁদের লড়াই। বাংলা ভাষায় অবহেলিত এক জঁরকে এগিয়ে নিয়ে চলার সংকল্পের কথা। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ অদ্রীশ বর্ধনকে ‘গুরু’ মানতেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘আশ্চর্য’ পত্রিকাতেই লেখা শুরু তরুণ রণেনের। পরে অদ্রীশ সম্পাদিত ‘ফ্যান্টাস্টিক’-এর সহ সম্পাদনাও করেছেন দীর্ঘ সময়।
     কাজপাগল মানুষ। সারাক্ষণই থাকতেন নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে। শরীরটা একেবারে ভেঙে পড়ার আগে পর্যন্ত নিয়ম করে লেখার টেবিলে বসেছেন। লিখেছেন। এবার নতুন দুনিয়ায় পাড়ি।
     কত কথা হয়েছে। কিন্তু আপনাকে কখনও বলে ওঠা হয়নি, বহু বছর আগে এক কলেজ পড়ুয়াকে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে আপনি কী লিখেছিলেন। সে লেখা রয়ে গেল আমার কাছে। এক পুরনো হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতা জুড়ে, আমার সেদিনের স্বপ্নবিলাসের ইচ্ছেতে আপনার দেওয়া সিলমোহর।
     খুব খুব ভাল থাকবেন রণেনবাবু। নতুন কোনও ফ্রিকোয়েন্সি, কোনও নয়া দুনিয়ায় নিশ্চয়ই দেখা হয়ে যাবে।

 

বোধিসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায়, (ওসলো ইউনিভার্সিটি)        

রণেন বাবুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ২০১০-এ, যখন আমি বাংলা কল্পবিজ্ঞান নিয়ে পিএইচডি শুরু করছি। ওঁর প্রতিশ্রুতি প্রকাশনীর ছোট্ট অফিসে। তারপরে বাড়িতে ডাকেন, আর সেখান থেকেই কল্পবিজ্ঞান নিয়ে ওঁর সঙ্গে আড্ডা শুরু। বাড়িতে ডেকে নিয়ে দেখালেন ওঁর সায়েন্স ফিকশন কালেকশন, যাতে আমার সব থেকে বেশি মনে আছে ‘রাইভ্যালস অব এইচ জি ওয়েলস’ নামে একটি বই। বললেন যে অনেক সময় আমরা এক দুজনকে ফোকাস দিয়ে বাকিদেরকে দেখি না, কিন্তু বাংলা কল্পবিজ্ঞানে সেটা হয়নি। কারণ আমরা একসঙ্গে সব কাজের পরিকল্পনা করি। অফিসে ঝেড়েঝুড়ে পুরানো দুর্লভ আশ্চর্য!, বিস্ময়-এর কপি দেখালেন, আরও কত চিঠি ইত্যাদি দেখালেন। আমাদের ডিজিটাইজেশন পরিকল্পনা হল, আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোফেসর অভিজিৎ গুপ্ত বললেন যে কাজটি যাদবপুর করতে পারবে। যদিও ওঁর সেই ম্যাগাজিন স্ক্যান এর কাজ পরে অনেকটাই আমার বাবা করলেন। আমরা একটা প্লান বানাই, একটা নতুন কল্পবিজ্ঞান ম্যাগাজিন শুরু করার, কিন্তু তারপর বিদেশে চলে গিয়ে আর সেটা করা হয়ে ওঠেনি। যদিও লাকিলি কল্পবিশ্ব তার কিছু বছর পরে সেটা খুব সাফল্যের সঙ্গে অনেক বড় স্কেলে করেছে। শেষ কিছু বছর ওঁর সঙ্গে ফোনে মাঝে মাঝেই কথা হত। ওঁর লেখা নিয়ে, আশ্চর্য! বিস্ময় , ফ্যানট্যাসটিক নিয়ে, বাংলা কল্পবিজ্ঞানে নতুন কি কি হচ্ছে সেই নিয়ে, রণেন বাবুর যে কাজটি সবথেকে বেশি আমরা দেখতে পাবো সেটা অবশ্যই সম্পাদকের, তবে ওঁর অবদান তার থেকে অনেক বেশি – আমাদের সবাইকে এই বিষয়ে সাহায্য করা, পরামর্শ আর উৎসাহ দেওয়া, আর কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের উপরে বিশ্বাস রেখে এত বছর প্রতিশ্রুতি চালানো আর বছরের পর বছর এত বই লিখে কল্পবিজ্ঞানের ধারাটাকে বাঁচিয়ে রাখা, এ-তো অমূল্য অবদান। এই বছর আমরা সবাই মিলে কল্পবিজ্ঞানের উপর ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি, যাতে ওঁর কাজটিকে আরও ভালো করে তুলে ধরা হবে, ওঁর একটা লেখারও প্রথম অনুবাদ বেরবে – এ সব উনি দেখতে পেলে খুব ভালো লাগত। খুব মিস করব ওঁকে, প্রণাম রণেনবাবু।

 

ঋজু গাঙ্গুলী

একদা বাংলা কল্পবিজ্ঞান নামক ঘরানাটি নিজস্ব পরিচিতি, ব্যাপ্তি ও গভীরতা পেয়েছিল যে মানুষদের জন্য, তাঁদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব, শ্রী রণেন ঘোষ প্রয়াত হলেন। তাঁর উদ্দেশে আলাদাভাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করার যোগ্যতা আমার নেই। বরং, এই গ্রুপ এবং কল্পবিশ্ব যেহেতু তাঁর স্নেহাশিস পেয়েছে বরাবর, তাই এই গ্রুপের কাছে একটি আবেদন আছে।

     যদি সম্ভব হয় তাহলে রণেনবাবু এবং তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনার একটি ব্যবস্থা করা হোক। সেই সঙ্গেই হোক তাঁর লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা। আমাদের স্মৃতি বড়ো দুর্বল। কিছুদিন পর যাতে “কে রণেন ঘোষ?” জাতীয় অপ্রীতিকর কিন্তু অমোঘ প্রশ্নের উত্তর বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যায় যথাযথভাবে, সেজন্যই এই প্রক্রিয়াটা জরুরি।

     মৃত্যুর পর কী হয় সেই নিয়ে আমার পড়া সবচেয়ে ভয়ংকর গল্পটি রণেনবাবু’র লেখা। আজ সেই গল্পটাই ছায়াপাত ঘটাচ্ছে মনে। তাই শেষে শুধু এটুকু লিখি, উনি যেখানেই থাকুন, আনন্দে থাকুন। কোনো অন্ধকার যেন তাঁকে স্পর্শ না করে।

অঙ্কিতা

বিদায় রণেন দাদু। বিগত কয়েকবছরে কল্পবিশ্বের সঙ্গে বিভিন্ন কাজ করার সূত্রে এই অত্যন্ত বিদগ্ধ মানুষটির সঙ্গে আমারও আলাপ হয়েছিল। বছর দুয়েক আগে আমি যখন ভাবিওনি সিরিয়াসলি লেখালিখি শুরু করার কথা, তখন এই মানুষটিই আমায় বলেছিলেন, ‘তোমার ছোট গল্পটা ভীষণ ভালো লেগেছে। ভালো করে একটা কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস লেখ। আমিই ছাপব।’
     সেই উপন্যাস আর লেখা হয়নি। আমাকে প্রথম উৎসাহ দেওয়া লোকটিও আজ চলে গেলেন।
     উনি শুধু রণেন ঘোষ এক অন্য ব্যক্তিত্ব্ নন, উনি আমার খুব কাছের একজন মানুষ। যিনি জীবনে শেষ দিনটুকু পর্যন্ত শুধু বাংলা কল্পবিজ্ঞানের কিভাবে উন্নতি হবে বা হতে পারে এই কথাই ভেবেছেন। নতুন লেখকদের উৎসাহিত করেছেন। কল্পবিশ্বের এই ক্ষুদ্র ওয়েব-ম্যাগাজিন তাঁর হাত ধরেই প্রথম ভারচুয়াল থেকে প্রিন্টেড জগতে পা রেখেছিল।
     আজ বাংলা কল্পবিজ্ঞানের এক স্তম্ভ চলে গেল। আমার মাথার উপর থেকে আশীর্বাদের একটা হাতও সরে গেল।

     নিচের ছবিটি আমার প্রথম বই কালসন্দর্ভার উদ্বোধনে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স ফিকশন কনফারেন্স চলাকালীন।

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

কল্পবিশ্বের সাথে ওঁর দ্বিতীয় সাক্ষাতকার। সেবার নানা গল্প আড্ডার মধ্যে অনেকক্ষণ ছিলাম আমরা। এর ফাঁকে আমাদের দেখিয়েছিলেন ওঁর কল্পবিজ্ঞান বইয়ের বিরাট সংগ্রহ যা হয়তো এই কলকাতা শহরে বেশ দুর্লভ। পুরোনো ধ্রুপদী বা যাকে বলা যায় গোল্ডেন এজ সাইন্স ফিকশন থেকে শুরু করে হাল আমলের চিসিন লিউ পর্যন্ত। শুধু কল্পবিজ্ঞানই নয়, বিজ্ঞানের নানা শাখায় বেশ কিছু আকর গ্রন্থ নিয়মিত পাঠ করতেন এবং সেইসব বই থেকে রীতিমতো নানা তথ্যের উল্লেখ করতে পারতেন। আমাদের কল্পবিশ্ব পরিবারের কাছে সেদিন ওঁকে পেয়েছিলাম এক তারুণ্যে ভরা শেষ মোহিকানের মতো যিনি উৎসাহে টগবগ করে ফুটছেন নতুন কিছু জানার জন্য। বিশেষ করে আমাদের মাতৃভাষায় কল্পবিজ্ঞানকে সার্বিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ওঁর উৎসাহ আর প্রেরণা আমাদের কাছে এক বাতিঘরের মতো যার আলোয় আগামীর পথ খুঁজে নেয়া যায়। রণেন ঘোষ আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সুমিত বর্ধন

“নিন্দন্তি নীতিনিপুণা যদি বা স্তুবন্তু, লক্ষ্মী সমাবিশতু গচ্ছতু বা যথেষ্টম । ” – নীতিশতকম / ভর্তৃহরি

     বুদ্ধিমানে নিন্দাই করুন কিম্বা প্রশংসাই ক্রুন, লক্ষ্মী লাভ হোক আর নাই হোক , আমি যখন ভালবেসে ফেলেছি, তখন এ পথ থেকে আমি একচুল নড়ব না – কল্পবিজ্ঞানের অন্যান্য পথিকৃৎদের মতন এই নাছোড়বান্দা মনোভাব রণেন বাবুরও ছিল । বহু বাধা বিপত্তি আশাভঙ্গের মধ্যেও দিয়েও নানান ভাবে তিনি কল্পবিজ্ঞানের ক্ষীণ শিখাটিকে বহুকাল ধরে তাই সযত্নে আগলে রেখেছিলেন ।

     তাঁর চিরবিদায়ে আমরা তাঁকে অবশ্যই স্মরণ করব, তাঁর অবদানের প্রতি ব্যক্ত করবো নিজেদের কৃতজ্ঞতা । কিন্তু আমাদের দায়িত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায় না । তাঁর আগলে রাখা শিখা থেকে কল্পবিজ্ঞানের মশালটি জ্বালিয়ে আরো ওপরে তুলে ধরাই হবে এই মার্গদর্শকের প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ ।

     দূরস্থোঽপি ন দূরস্থো যো যস্য মনসি স্থিত: |

     যিনি সর্বদা আমাদের মনেই থাকেন তিনি দূরে গিয়েও দুরে সরে যান না ।

প্রমিত নন্দী

রণেনবাবুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল একবারই। পরবাসিয়া পাঁচালীর জানুয়ারী সংখ্যা ছিল বিশেষ কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি সংখ্যা। আমাদের ইচ্ছা ছিল, বাংলায় এই ধারার তিন পথপ্রদর্শক পত্রিকা ‘আশ্চর্য!’, ‘বিস্ময়’ আর ‘ফ্যানটাস্টিক’-এর তিনটি লেখা ওসিআর করে আবার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেব। কল্পবিশ্বের অন্যতম সম্পাদক সন্তু বাগের শরণাপন্ন হলাম। আমাদের অনুরোধ ছিল, এরকম তিনটি লেখা পেলে ভালো হয় যা এমনকি ধুলোখেলার সাইটেও নেই। সন্তুবাবু এরকম বেয়াড়া আবদারে শুধু রাজিই হলেন না, অত্যন্ত ব্যস্ততার ফাঁকেও সময় বের করে তিনটি লেখা তাড়াতাড়ি পাঠিয়েও দিলেন। এবার এল অনুমতি সংগ্রহের পালা। ‘আশ্চর্য!’ ও ‘ফ্যানটাস্টিক’-এর ক্ষেত্রে কল্পবিশ্ব অনুমতি দিল। ‘বিস্ময়’-এর লেখাটির জন্য দীপবাবু আমায় বিশেষ করে বললেন রণেনবাবুকে অন্তত ফোন করে জানিয়ে রাখতে। সুদূর গুয়াহাটি থেকে পত্রিকা প্রকাশ করায় সেসময় সামনাসামনি সাক্ষাতের উপায় ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত পত্রিকা প্রকাশের আগে সেটা সম্ভব হয়নি। মনে আছে, দিনদুয়েক বাদে মোবাইল নম্বরটা পেয়ে দুরু দুরু বুকে ওনাকে ফোন করেছিলাম। ফোনে প্রথমে ব্যাপারটা শুনে মৃদু ভর্ত্সনা করেছিলেন। ব্যস ওইটুকুই, তারপর বাকি সময়টা একের পর এক উৎসাহব্যঞ্জক কথাই বলে গেলেন সেই অশীতিপর তরুণ। এমনকি, পত্রিকার জন্য কিছু নতুন পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। আমার মত হাঁটুর বয়সীকে আপনি বলায় বলেছিলেন ভবিষ্যতে তুমিতে যেতে বেশি দেরি হবে না। কিন্তু সেদিনের পর তাঁর সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ হয়নি। ওনাকে কথা দিয়েছিলাম, জানুয়ারী সংখ্যাটা প্রিন্ট করে দেখাব। এবারে ছুটিতে বাড়ি গেলে ইচ্ছে ছিল, ওনার হাতে সেটা তুলে দেব। কিন্তু তার আগেই…

     উনি যেখানেই থাকুন, নিঃসন্দেহে আমাদের দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করে যাবেন। ওনার জীবন ও কাজ থেকে যদি ন্যূনতম কিছুও শিখতে পারি, তাহলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।

সুমন দাস

খবরটা পেয়েই মন খারাপ হয়ে গেল। এই মানুষটি বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য জগতে যে অবদান রেখে গেলেন, তা আমাদের মত পাঠকের কাছে বিড়াট বড় পাওনা। কল্পবিজ্ঞান একটা এমন সাহিত্য যার সাথে মিশে আছে বিজ্ঞান চেতনা। এই চেতনা পাঠককে এমন একটা কল্পনার জগতে নিয়ে যায়, যাতে মনে হয় — এমনটা তো হতেই পারে। আর তারপর পাঠক উদ্বুদ্ধ হবে, সেই বিষয়ের ওপর আরোও গভীরভাবে পড়াশোনা করার জন্য। বিজ্ঞানমনস্কতা সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ হয়ে উঠবে।

     রণেন ঘোষ মহাশয় শুধু তো লেখেননি, লেখকবৃন্দ তৈরী করেছেন, পাঠক তৈরীকরেছেন একাধিক ম্যাগাজিন, বই আর আলোচনার মধ্য দিয়ে — শেষ বয়স পর্যন্ত। আজ যতটুকু বিজ্ঞানমনস্ক পাঠক ও কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী বাংলায় আছে, রণেনবাবুদের মতন কিছু মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমেরই ফসল তা।

     কল্পবিশ্ব’র শুরু থেকে তাদের সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। দেখেছি, কয়েকজন উৎসাহী মানুষ কল্পবিজ্ঞান নিয়ে কিছু করার কথা ভাবছে। এবং অন্ধকারে পথ হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের সহযোগী পাওয়ার অভাব ছিল না। অভাব ছিল একজন অভিজ্ঞ মানুষের, যিনি সঠিক পরামর্শ দেবেন। রণেনবাবু সেই অভাব মিটিয়েছেন। শুধু অভাবই মেটান নি, পথনির্দেশ করেছেন, সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে পরিশ্রমও করেছেন — ফলস্বরূপ কল্পবিশ্ব’র জয়যাত্রার গতি ক্রমবর্ধমান।

     ওনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি কোনদিন। কিন্তু সন্তুদা’র কাছে শুনেছিলাম, আমার লেখার অকুন্ঠ প্রশংসা করেছেন। নিজের লেখার গুণগত মান জানি বলেই অবাক হয়েছিলাম। এমনই মানুষ ছিলেন তিনি। একজন এলেবেলে লেখকের চেষ্টাকেও উৎসাহ দিতেন এমনভাবে, যাতে সে এগিয়ে চলার প্রেরণা পায়। আজকের সময়ে প্রেরণাদাতার বড় অভাব। এই অভাব বাড়ল বই কমল না।

     উনি চিরকাল বাংলা কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে একজন আদর্শ হয়ে থাকবেন। আমার অন্তরের শ্রদ্ধা এবং প্রণাম রইল…

সোহম গুহ

ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় দীপদার সূত্রে। ওনার ছোট স্টাডিরুমে আমার পরিচয় পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমার লেখা পড়েছি। বয়স কত?”
     উত্তর পেয়ে বলেছিলেন, “লেখো। তোমার হবে। তোমাদের মাধ্যমেই বাংলার স্বর্ণযুগ আবার ফিরবে।”
     যখন শুনলেন আমার পারিবারিক অবস্থার কথা, যে আমার কলম থমকে গেছে, বললেন, “আমার বয়স কত? দুই বছরের মধ্যে অন্তত 7টা বই বের করতেই হবে। কলমের জরা ধরেনা। মনকে জরাজীর্ণ হতে দিয়ো না।”

     কথা রাখলেন না আপনি।
     ওই সময়, আমার আত্মবিশ্বাসের ভীত গড়ে দিয়েছিল কথাগুলো।
     কিছু মানুষ পথিকের পাশাপাশি পথপ্রদর্শকও হন, তাঁদের দেখা দেখানো পথে কল্পবিশ্ব চলতে শুরু করেছিল। আমি কল্পবিশ্বর প্রথম প্রিন্টেড কপির ভূমিকা তুলেই বলছি, উনি না উৎসাহ দিলে সেটা অসম্ভব হত।
     আশ্চর্যর প্রথম বর্ষের সংখ্যা পড়ার সময় বাংলার এই মুষ্টিমেয় মানুষগুলি, যাদের জন্য ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দটি আজ প্রচলিত, তাদের উপর এক অপরিসীম শ্রদ্ধা জন্মায় আমার মধ্যে। যাদবপুরের সেমিনার তাঁদের কাজের মর্যাদা দিয়েছিল এক ছাদের তলায়।

     A part of every journey is the end..
     ওনাকে ঐভাবে ভেন্টিলেশনে দেখে তাই আমার পা টলে গেছিল, ব্যাগ ভুল করে ফেলে এসেছিলাম বেলভিউতে।
     বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই পিঠে হাত দিয়ে উৎসাহ জোগানোর মানুষটা আর নেই।
     যেখানেই থাকবেন, ভালো থাকবেন স্যার।

অভিজিৎ সেনগুপ্ত

হারিয়ে যায়।
     একে একে বড়রা সব হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের দেশে।খোকনকাকু,যাকে কখনও নিজের কাকু নয় বলে বোধ হয়নি,গতকাল দুপুরে চলে গেছে আকাশে।
     রণেন ঘোষ। লেখক, বিশেষ করে সায়েন্স ফিকশনকে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছনোর দায়িত্ব স্বইচ্ছায় যারা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তাঁদের অগ্রগণ্য।
     শুধু লেখক নয়। সম্পাদক, প্রকাশক, সংগ্রাহক, সংগঠক। অনেক কিছুই ছিল কাকু। জনসংযোগটা খুব ভালো বুঝতো পার্সোনাল ম‍্যানেজমেন্ট এর লোক ছিল যে। ব‍্যবসাটাও কৃতিত্বের সঙ্গে করেছে বহু বছর। আবার পার্সোনাল ম‍্যানেজার হিসাবেও যথেষ্ট সুনাম পেয়েছিল যখন চাকরী করতো।
     খুব কাছের কাউকে হারিয়ে মনটা মোটেও ভালো নেই আজ।
     মনে পড়ছে কলকাতার সেইসব দিনগুলো। ১৫ নম্বর লিন্টন স্ট্রীট। পুরোনো বাড়ি গুলো। পুরোনো লোকজন। পুরোনো দোকান, বাজার। সবকিছুই নিয়ে মনটা ভারভার।
     কাকীমা, রাণা,বাদশা।
     শারীরিকভাবে সাথে না থাকলেও মানসিকভাবে তোমাদের পাশেই।

সুদীপ দেব

আমি ওঁর সঙ্গে কোনওদিন কথা বলিনি, দূর থেকে দেখেছি কয়েকবার। এই সেদিনই তো, কল্পবিশ্বের সেমিনারের শেষ দিনে অসুস্থতার মধ্যেও উনি এলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞানে ব্রতী কচিকাঁচাদের উৎসাহ দিতে – এমন সময়, যখন কিনা নিজেকে অসুস্থতার কারণে প্রায় ঘর বন্দী করে রেখেছিলেন। সব কিছু তুচ্ছ করেও ছুটে এলেন। ভাবছিলাম, যে কোন জায়গায় মানুষ পৌঁছতে পারলে এমনটা হতে পারে। বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের ধারাকে মূলস্রোতে মিলিয়ে দেবার জন্য যাঁরা একসময় উদ্যোগী হয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম পুরোধা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন আবার ফিরে পেয়েছেন নবযৌবনের সামর্থ। নিজের অভিজ্ঞতা, সঞ্চয় ভাগ করে নিচ্ছেন নবীনদের সঙ্গে। তাদের এগিয়ে চলার জন্য শুধু মৌখিক নির্দেশ নয়, হাত ধরে নিয়ে চলেছেন। সেই হাত আজ তিনি ছাড়িয়ে নিলেন। হয়তো তিনি বুঝেছেন, এবার তাঁর মানস পুত্র-কন্যারা কোন অবলম্বন ছাড়া এগিয়ে যেতে পারবে। অভিভাবকদের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে একসময় সন্তানকে একা পথ অতিক্রম করতেই হয়। পাথেয় রয়ে যায় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, মূল্যবোধ, জীবন চেতনা। তাই আমার মনে হয়, রণেন ঘোষের নশ্বর দেহ না থাকলেও তিনি রয়ে যাবেন কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী প্রতিটি পাঠক, লেখক, প্রকাশক – সকলের মধ্যে। আত্মা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তা কোন অজ্ঞাত, অদৃশ্য কল্পশক্তি নয় – তাঁর দেখিয়ে যাওয়া পথকেই কুসুমাস্তীর্ণ করে রাখলে সেই আত্মা চিরশান্তি লাভ করবে।

প্রতিম দাস

বছর দুয়েক আগের কথা। লাভক্র্যাফটের একটা ছোট গল্প পোলারিস অনুবাদ করে পোস্ট করেছিলাম। রণেন ঘোষ নামের একটি মানুষ ফোন নম্বর দিয়ে বলেন সম্ভব হলে একবার ফোন করতে। না তখন ফেসবুক সুত্রে চিনতাম না মানুষটাকে। তবে লেখক রূপে ওই নামের একজনকে চিনতাম। ইনি কি তিনিই? এই প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ফোন করি। অনুমান সত্যি উনিই সেই রণেন ঘোষ। প্রথমেই বলেন লেখাটি বেশ ভালো হয়েছে। আরও অনুবাদ করো। শুধু লাভক্র্যাফট নয় ওই সময়ে অন্য লেখকরাও এই ভয়কে বিষয় করে অনেক কিছু লিখেছিলেন সেগুলো করো। আর পারলে থুলু মিথোজগুলো অনুবাদ করো। প্রায় ৩৫ মিনিট অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। বলেছিলেন উনার বাড়িতে যেতে। আমার দুর্ভাগ্য পারিবারিক নানান ঝামেলায় যেতে পারিনি। আর কোনোদিন যাওয়াই হবে না। মানুষটাই যে আর নেই সে বাড়িতে…
এরপর উনি যেদিন থেকে হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার শুরু করেছিলেন সেদিন থেকে রোজ সকালে গুড মর্নিং মেসেজ পাঠাতে ভোলেননি।
শেষের একটা মাস অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর মেসেজ আসবেও না কোনোদিন। মানুষটাই যে নেই আর ওটা ব্যবহার করার জন্য।
কল্পবিজ্ঞান ঘরানার এক বলিষ্ঠ লেখকের অসাধারণ লেখাগুলোই রয়ে গেল। না সব পড়া হয়নি। ইচ্ছে রইলো সেগুলো পড়ার। ভালো থাকবেন স্যার। আমার প্রণাম রইলো। আশীর্বাদ করবেন একটু আধটু যেন আপনার মতো লিখতে পারি।
আগামীদিনে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতেই অনুবাদ করবো থুলু মিথোজের কাহিনি। কথা দিলাম স্যার।
Digital sktetch through PenTab…2019

নির্জন সেন

রণেন ঘোষ বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু আজ এই মধ্যবয়সে এসে আমার মনে হয় বৃদ্ধ বয়সের সবচেয়ে বড় অভিশাপ বোধহয় ক্রমাগত সহচর ও বন্ধুদের মৃত্যুসংবাদ শোনা। একটি করে বন্ধুর চলে যাওয়ার খবর আসে আর বুকের ভেতরে একটা করে ইমারত ধ্বসে পড়ে যায়। সেইজন্য বাবা-মাকে আজকাল আর পরিচিতজনের মৃত্যুসংবাদ দিই না।
     যিনি গেছেন তিনি তো আর ফিরবেন না, যাঁরা বেঁচে থাকবে যন্ত্রণা পায় তারাই। আমি অদ্রীশবাবুর কথা বলছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কেউ যেন ওঁকে এই সংবাদ না দেয়।

প্রসেঞ্জিত চক্রবর্তী

বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ভাবতেই পারছি না। মনে পড়ছে সল্টলেকের যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে কলকাতা বইমেলা সময়। নিজ হাতে “সাবধান! ইউ এফ ও” বইটি তুলে দিয়ে, বলেছিলেন দেখো “। তারপর ঐ বিষয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক জগত উন্মোচন হয়েছিল আমার সামনে । তারপর নিজেই জোগাড়, করে নি পরবর্তী বইগুলো। এক অনুপ্রেরণা রণেন ঘোষ। ওনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি, পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। কল্পবিজ্ঞানের যে জগৎ তিনি বাংলা সাহিত্যে, উন্মোচন করেছিলেন পাশাপাশি, বিতর্কিত বিষয় গবেষণামূলক সাহিত্য তা এককথায় অনবদ্য। “আপনার ” অনুপ্রেরণা আমার পাথেয় হয়ে থাকবে ।

সৌরভ ঘোষ 

আমার মত অধম পাঠকের প্রথমদিকে ওনার মত নক্ষত্রের সঙ্গে পরিচয় না থাকলেও কল্পবিশ্ব-এর হাত ধরে ওনাকে চেনা। জানেন মৃত্যু সংবাদ বড় সাংঘাতিক জিনিস।শুনতে বড়ই অদ্ভুত লাগে। অবিশ্বাস্য মনে হয়। বিশেষতঃ আপনি যখন দেশের বাইরে থাকেন। আমি কল্পবিশ্ব এর ২০১৮ এ হওয়া প্রথম conference এ থাকতে পারিনি। Santu দা আমার জন্য এই বইটিতে ওনার একটি অটোগ্রাফ নেয় আমার হয়েই।অদ্রীশ বাবুর অসুস্থতায় একটু চিন্তিত ছিলাম। ভেবেছিলাম দেশে ফিরে ওনার সঙ্গে দেখা করব তাই। কারণ উনি আমার বাড়ির প্রায় কাছেই থাকেন। সেইসঙ্গে রণেন বাবুর সঙ্গেও দেখা করব। Dip দার শেষ পাওয়া খবরে ভেবেছিলাম উনিও অদ্রীশ বাবুর মতই সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং খুব শিগগিরই অদ্রীশ বাবুর মত বই হাতে কল্পবিশ্ব এর সঙ্গে ছবি দেখতে পাব। কিন্তু ঈশ্বরের যে সে পরিকল্পনা ছিলোনা তা আজ প্রমাণিত। যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন। কোনও ছবিও নেই আমার কাছে ওনার তাই ভালোবাসার স্মৃতি হিসেবে পরে থাকল এই বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠাটাই। ওনার lovecraftian লেখা “আমি নিশার আতঙ্ক” মনে এক বিষম দাগ কেটে আছে এখনও যখন বইয়ের পাতা ওল্টাই!!

কল্পবিশ্ব এবং রণেন ঘোষ

কল্পবিশ্বের তরফে নেওয়া সাক্ষাৎকার —

রণেন ঘোষের সঙ্গে একটি দুপুর 

কল্পবিশ্বে প্রকাশিত তাঁর গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধগুলি পড়তে পারবেন নিচের লিঙ্কে

রণেন ঘোষের লেখা কল্পবিজ্ঞান পড়তে ক্লিক করুন

কল্পবিশ্বের অদ্রীশ বর্ধনকে নিয়ে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় স্মৃতিচারণ করেছিলেন সেই স্বর্ণযুগের লেখালিখির কথা। পড়তে পারবেন নিচের লিংকে

অদ্রীশ বর্ধনকে নিয়ে রণেন ঘোষের লেখা অ-আ-ভ 

অদ্রীশ বর্ধন এবং রণেন ঘোষের মধ্যে লেখা একগুচ্ছ অপ্রকাশিত চিঠি পড়তে পারবেন নিচের লিংকে

চিঠিপত্র 

যাদবপুরে প্রথম কল্পবিজ্ঞান কনফারেন্সে শত অসুস্থতা সত্ত্বেও যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। সেই আলোচনার এক ঝলক দেখতে পাবেন নিচের লিংকে

কল্পবিজ্ঞান কনফারেন্সের আলোচনাসভায়  

কার্লোস সুচলওস্কি কন-এর সঙ্গে কল্পবিশ্বের আলাপ করিয়ে দেওয়ার মূলে ছিলেন রণেন ঘোষ। পড়তে পারবেন ২০১৭ সালের সেই দিনের ঘটনা। কীভাবে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম স্প্যানিশ কল্পবিজ্ঞান লেখকের সঙ্গে। নিচে রইল সেই লিঙ্ক

কার্লোসের ইন্টারভিউ 

One thought on “রণেন ঘোষ (১৯৩৬-২০১৯) – বাংলা কল্পবিজ্ঞানের এক অন্যতম শেষ মোহিকান

  • April 11, 2019 at 2:18 am
    Permalink

    আমাদের মাথার ওপর মহীরুহ হয়ে থাকা মানুষগুলো একে-একে সরে যাচ্ছেন। এ বড়ো কঠিন সময়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!