রেড

রচনা  : ঋজু গাঙ্গুলী

অলঙ্করণ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য (চিত্রচোর)

নুই আর বুকে ভর দিয়ে হ্যাচের দিকে এগোয় রয়।

ঠাণ্ডা কংক্রিটের এই শ্যাফটের ভেতরের হাওয়া কত শতাব্দীর, তা কে জানে। কিন্তু ওসব ভাবার সময় ও’র কাছে ছিল না।

“সিস্টেম অনলাইন”, রিনরিনে গলাটা ও’র কানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, “ওভারলোড হলে কিন্তু বিপদ আছে”।

বিপদ!

শব্দটা এর আগেও ও’র মাথায় এসেছে, তাই না?

গত জন্মে?

না, কয়েক ঘন্টা আগে?

কম্যান্ড সেন্টারে বসে, মিশনের ব্যাপারে শুনতে গিয়ে এই কথাটাই ও’র মাথায় এসেছিল।

কী যেন ছিল মিশনটা?

সিসমিক ম্যাপিং করতে গিয়ে, চাঁদের তথাকথিত ডার্ক সাইডে একটা শূন্যগর্ভ টিলা খুঁজে পাওয়া যায়। জায়গাটায় অভিযান চালিয়ে যা দেখা যায়, তাতে প্রশাসনে প্রায় প্যানিক তৈরি হয়।

রাতারাতি যে স্পেশাল টিমকে উড়িয়ে আনা হয় চাঁদে, তারই ব্রিফিং চলছিল।

স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ওঠা ছবিটা দেখিয়ে কম্যান্ড সেন্টারের প্রধান ডক্টর গ্রেগরি বলেছিলেন, “আপনাদের সামনে ছাব্বিশ ফুট লম্বা আর সাত ফুট ব্যাসের, প্রায় সাতাশ টন ওজনের যে চোঙাটা আছে, সেটাই হল ত্রুতনেভ-বাবায়েভ ডিজাইনে বানানো, মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী থার্মোনিউক্লিয়ার বম্ব।

৩০শে অক্টোবর ১৯৬১, আর্কটিক ওশনের নোভায়া-জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জের সেভের্ন দ্বীপের ওপর, মস্কো টাইম বেলা ১১-৩২-এ, মাটি থেকে মোটামুটি চার কিলোমিটার উচ্চতায় এর জাতভাইকে বিস্ফোরিত করা হয়েছিল।

সেটাকে কেউ বলে ‘কুজকিনা মাত’, কেউ বলে ‘ভানিয়া’, কেউ বা বলে আর. ডি. এস ২২০।

আমাদের হিসেব বলছে, পর্দায় আপনারা যেটা দেখছেন সেটাও সেই মানের, অর্থাৎ ৫০ মেগাটনের!”

“জার বোম্বা!”, রয়-এর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল কথাটা।

“কারেক্ট রয়”, কয়েকশো বছরের রিপাবলিকান নাগরিকত্ব সত্ত্বেও গ্রেগরি তোভারিচ যে নিজের শেকড়টা ভোলেননি সেটা তাঁর গর্বিত কথাগুলো শুনে বোঝা যায়, “ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সেই চরম সময়ে, অনেক বেশি সম্পদ কাজে লাগিয়েও, মার্কিনরা এত বড়ো কোনো পরমাণু বোমা কখনও বানাতে পারেনি”!

“কিন্তু এটা এখানে এল কীভাবে?” প্রশ্নটা তোলেন ধৃতিমান। গ্রেগরির বদলে এবার উত্তরটা আসে জেনারেল পোলানস্কির মুখ থেকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে ঠাণ্ডা লড়াই চলেছিল চল্লিশ বছর ধরে, তাতে পরমাণু ও মহাকাশ বিজ্ঞান ছিল আসল এরিনা।

দুই দেশই জানত, ওখানে কে কতটা এগিয়ে যেতে পারে, তার ওপরেই নির্ভর করছে অন্যান্য দেশের ওপর দাদাগিরির ক্ষমতা।

চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম পদক্ষেপ যেহেতু ঘটে অ্যাপোলো ১১-র মাধ্যমে, তাই অনেকেই ভাবেন, মহাকাশ গবেষণার প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের হার হয়েছিল।

বাস্তব কিন্তু একদম আলাদা।

মহাকাশে শুধু কৃত্রিম উপগ্রহ নয়, মানুষকেও প্রথম নিয়ে গেছিল যে দেশ, তাদের পক্ষে গোপনে এমন একটা বেস তৈরি করা কি একান্তই অসম্ভব?”

“তবু”, থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল রয়, “লোকের নজরের আড়ালে, চাঁদের বুকে এমন একটা বেস তৈরি করা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?”

মুচকি হেসে বলেছিলেন পোলানস্কি, “সেটা বুঝতে গেলে আপনাকে সোভিয়েত মহাকাশ গবেষণার কিছু অন্ধকার দিক সম্বন্ধে জানতে হবে রয়।

“এন-১ নামক সুপারহেভি রকেটের মাধ্যমে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা কাগজে-কলমে বাস্তবায়িত না হলেও, এই বেস-এর রেকর্ড বলছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন একাধিক মিশনের মাধ্যমে, চাঁদের বুকে ‘আলমাজ’ নামের এই মিলিটারি বেসটি তৈরি করতে পেরেছিল।

এও জেনেছি যে, বইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষিপ্ত একাধিক ‘লুনা’ রকেট, যারা রেকর্ড অনুযায়ী হারিয়ে গেছিল বা চাঁদে ক্র্যাশ করেছিল, আসলে মার্কিন নজরদারির আড়ালে এই বেসটা তৈরি করায় নিয়োজিত হয়েছিল।

বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন মহাকাশ অভিযানে শামিল হয়ে বহু মহাকাশচারী নিখোঁজ হয়েছেন।

এখন আমরা সন্দেহাতীত ভাবে জানতে পেরেছি, বহু মহাকাশচারী, যাঁরা নাকি নানা পরীক্ষামূলক যাত্রায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, আসলে এই শিবির বানানোয়, এবং এই বোমাটা অ্যাসেম্বল করায় ভূমিকা নিয়েছিলেন”।

“তবে”, কথার খেই ধরেন গ্রেগরি, “এমন একটা বোমাকে, ইন্টার-কন্টিনেটাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটে ছুড়তে আরো একটা জিনিস দরকার ছিল।

একটি উচ্চ ক্ষমতার কম্পিউটার।

মার্কিন, জাপানিজ, বা চাইনিজ প্রযুক্তির প্যারালাল কম্পিউটিং ভিত্তিক সুপারকম্পিউটারের বদলে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা এখানে এক সম্পূর্ণ অন্য রকমের, কোয়ান্টাম-ভিত্তিক কম্পিউটার ব্যবহার করেছিলেন, যা সেই যুগের বিচারে প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

“মনে হয়”, মুচকি হাসেন গ্রেগরি, “সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু একটি দেশের সেরা মেধারা এই ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন”।

ধৃতিমান ও রয়-কে গম্ভীর থাকতে দেখে আবার কথা শুরু করেন পোলানস্কি।

“বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে এই ঘাঁটি পরিত্যক্ত হয়। গোপনীয়তা এবং অন্য নানা কারণে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই ঘাঁটির অবশিষ্ট বাসিন্দারা খাদ্য ও অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু সেই কম্পিউটারটি থেকে যায়।

কম্পিউটারটা ঠিক কী লজিকে কাজ করে তা বোঝার মতো সময় না পেলেও এটুকু বোঝা গেছে যে সেটা এখনও কাজ করে”।

“আপনারা এই বোমা, আর কম্পিউটার নিয়ে আরো বেশি জানতে যে ভীষণ ভাবে উৎসাহী তা তো বুঝলাম”, গম্ভীর গলায় বলেছিলেন ধৃতিমান, “কিন্তু আমাকে এর মধ্যে কেন জড়াচ্ছেন?”

“এই সাঙ্ঘাতিক বোমাটা”, থেমে-থেমে বলেন গ্রেগরি, “যা ফাটলে শুধু চাঁদের বুকে অবস্থিত সবক’টা বেস ও সমস্ত মানুষ-ই নয়, স্বয়ং চাঁদ-ই বিপন্ন হবে, সেটা এখান থেকে সরাতেই হবে।

কিন্তু ক্রেন বা অন্য জিনিসের সাহায্যে জিনিসটাকে সরাতে আমরা একটু…”

“ভয় পাচ্ছেন?”, ধৃতিমানের ব্যঙ্গাত্মক গলাটা শুনে পোলানস্কি’র মুখটা লাল হয়ে ওঠে। তিনি প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই অবশ্য হাত তুলে তাঁকে, এবং সেনাবাহিনীর অন্যান্য অফিসারকে আশ্বস্ত করেন ধৃতিমান, “না পেলেই আমি বেশি চিন্তিত হতাম, কারণ তাহলে বুঝতাম, আপনারা একেবারে দায়িত্বজ্ঞানহীন।

আজ অবধি অনেক রকম কাজই করেছি, তবে বম্ব-ডিসপোজাল কখনও করিনি”।

কিছুক্ষণ চুপ করে আবার বলেছিলেন ধৃতিমান, “বেশ, আমি একটা স্পেস-টাইম লুপ তৈরি করব, যাতে বোমাটাকে পাঠিয়ে দেওয়া যায় একটা নিরাপদ আস্তাকুঁড়ে।

কিন্তু সেটা এখানে বসে হবে না। আমাদের যেতে হবে ওই ‘আলমাজ’-এ”।

“তোমার পক্ষে কি কিছুই করা সম্ভব নয়?”, মাউথপিসে যতটা সম্ভব ফিসফিসিয়েও কাতর অনুনয় করে রয়, “আমি কারো কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছি না, তুমিও যদি…!”

কথাটা শেষ করে না রয়।

ও বুঝতে পারছিল যে আত্মঘাতী কিছু করা ছাড়া কোনো বিকল্পই ও’র হাতে নেই।

“কোথায় পাঠানো হচ্ছে বোমাটা?” রিনরিনে গলাটা জানতে চায়।

বেলায়েভের বলা তারিখটা খেয়াল ছিল রয়-এর। ওই দিনটা রিপাবলিকের কোনো মানুষের পক্ষেই ভোলা সম্ভব নয়। সেটাই বলে ও।

“যদি তারিখ ও স্থান নির্ধারণের কাজটা বেস-এর মূল কম্পিউটারকে দেওয়া যায়, তাহলে এর একটা সমাধান সম্ভব”, বলে সরু গলাটা।

এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও রয়-এর মাথায় প্রশ্নটা আবার ঢুঁ মারে।

কে এই মেয়েটা? বেস-এর মূল কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যদি যোগাযোগ নাই থাকে, তাহলে এ কীভাবে এই নেটওয়ার্কে এল?

পরমুহূর্তেই ও মনস্থির করে ফেলে, এবং উত্তর দেয়, “আমি চেষ্টা করছি।

শুধু আমাকে নিচের ঘরে কে কোথায় আছে সেটা দেখতে একটু সাহায্য করো”।

উত্তর আসে না, তবে সামনের ছোট্ট স্ক্রিনটায় একের পর এক দৃশ্য বদলে যেতে থাকে। দানাদার, ঝিরিঝিরি ছবির মধ্য দিয়েও রয় বুঝতে পারে, নিচের অবস্থাটা।

ও’র মনে পড়ে, ঠিক কী ঘটেছিল এই ঘরে মাত্র মিনিট পাঁচেক আগেই।

‘আলমাজ’-এ পৌঁছে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল জিনিসপত্র সাজাতে, যাতে ওই বিশাল বোমাটার চারধারে একটা ফোর্স-ফিল্ড তৈরি করা যায়।

যেহেতু প্রক্রিয়াটার সঙ্গে রয় পরিচিত, তাই ও’ও হাত লাগিয়েছিল সৈন্যদের সঙ্গে।

তখনই ও’র আলাপ হয়েছিল বেলায়েভের সঙ্গে।

পোলানস্কি’র সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড, হাসিখুশি বেলায়েভ-কে বেশ ভালো লেগেছিল রয়-এর। আর পাঁচজন মিলিটারি অফিসারের মতো গোমড়ামুখো নয়, বরং বেশ সহজ ভাবেই সবার সঙ্গে কথা বলেছিল লোকটা।

একটা ব্যাপার অবশ্য রয় বুঝতে পেরেছিল।

এই বেস-এর নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব রিপাবলিকান নেভি’র হাতে থাকলেও, যে ঘরে কাজটা হচ্ছে তার সবক’টা স্ট্র্যাটেজিক পজিশনে মোতায়েন ছিল বেলায়েভ-এর নিজস্ব টিম-এর কম্যান্ডোরা।

চোখ টিপে, রসিকতার ভঙ্গিতে ও’কে বলেছিল বেলায়েভ, “কিছু-কিছু কাজ অন্যদের ওপর ছাড়া যায় না”।

অত্যন্ত ক্লান্তিকর এই প্রক্রিয়াটা শেষ হওয়ার পর এক কাপ কফির সন্ধানে ঘর ছেড়ে বাইরের করিডরে বেরিয়েছিল রয়।

তখনই ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভারি, ধাতব আওয়াজটা পেয়েছিল ও। চমকে উঠে চারদিকে তাকিয়েই রয় বুঝতে পেরেছিল, বোমা, এবং ধৃতিমান ও অন্যান্যরা যে ঘরে আছেন, সেটার দরজাটা এয়ার-লক হয়ে বাকি বেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

অন্য কয়েকজন সৈন্য, যারা ওরই মতো ঘরের বাইরে করিডরে আটকা পড়েছিল, ছুটে গিয়ে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছিল। একজন বুদ্ধি করে দরজার লাগোয়া ছোট্ট স্ক্রিনটা কয়েকটা বোতাম টিপে চালুও করেছিল।

স্ক্রিনে ফুটে ওঠা দৃশ্যটা ওদের চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

“বুঝতেই পারছেন প্রফেসর”, বেলায়েভের আপাতভাবে ভদ্র আর শান্ত গলাটা শুনতে পায় রয়, “এটা একটা পেশাদারি অপারেশন মাত্র। আপনি যদি আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন তাহলে সবকিছু চুকেবুকে তো যাবেই, আগামী দিনে আপনার গবেষণার জন্যেও আপনি অনেক বেশি ফান্ড ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কনফেডারেশন তার বন্ধুদের মনে রাখে”।

ধৃতিমানের গলাটা নির্বিকার শোনালেও তার পেছনে যে কী পরিমাণ রাগ আছে, সেটা আন্দাজ করতে পারে রয়, “একটা বেইমানের কথার কোনো দাম আমার কাছে নেই বেলায়েভ”।

“সাবধান প্রফেসর”, বেলায়েভের গলাতেও বিষ মিশে যায় এবার, “আপনি আমাদের কাছে মূল্যবান, কিন্তু জেনারেল পোলানস্কি বা ডক্টর গ্রেগরি’র জন্য একটা করে বুলেট খরচ করতে আমার টিমের একটুও কষ্ট হবে না। নতুন ব্যবস্থায় সেজন্য আমরা এক-আধটা মেডেলও পেতে পারি”।

“নতুন ব্যবস্থা!”, ধৃতিমানের গলাটা এবার কাঁপতে থাকে, “মূর্খের দল! তোমাদের কোনো ধারণা আছে এই নিয়ে?

যা করতে চাইছ, সেটা হলে শুধু যে কয়েক লক্ষ নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যাবে তাই নয়, মানবজাতি তথা এই ছায়াপথের শুধু ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান-ও বদলে যাবে তার ফলে!”

“কেন নাটক করছেন প্রফেসর?”, বোর হওয়া গলায় বলে বেলায়েভ, “৩০শে জুন ৩০০৮, গ্যালেনা কোয়াড্রান্টের রাজধানীতে আপনি এই বোমাটা, আমরা সেটাকে টাইমার দিয়ে চালু করার পর, পাঠিয়ে দেবেন। একঝাঁক অপদার্থ, চোর, এবং মেরুদণ্ডহীন নেতা, আর একদল আমোদলোভী জনতার পাশাপাশি, রিপাবলিকের কাছে কনফেডারেশনের নেতাদের আত্মসমর্পণ, এবং শান্তি-চুক্তি সইয়ের ওই কলঙ্কের দিনটাই মুছে যাবে ইতিহাস থেকে। নতুন করে শুরু হবে মানুষের ইতিহাস, শুধু এবার তার নেতৃত্ব দেবে কনফেডারেশনের উদ্যমী মানুষেরা”।

নিচে তাকায় রয়। শ্যাফটের এই জায়গায় ঝাঁঝরির মতো একটা হ্যাচ রয়েছে, যেটা ভেতর থেকে খোলা যায়।

ঠিক নিচেই সেই দৃশ্যটা দেখা যাচ্ছে যেটা, একটু অন্য কোণ থেকে, দেখতে পেয়েছিল ওরা ঘরের বাইরের সেই স্ক্রিনেই।

কিছুটা দূরে, ফোর্স-ফিল্ডের দ্যূতির মধ্যে ঝুলে রয়েছে জার বোম্বা।

সেই ফিল্ডটা তৈরি করেছে যেসব জেনারেটর, তাদের সঙ্গে যুক্ত তারগুলো গিয়ে মিশেছে একঝাঁক কম্পিউটারে।

তার সামনে, ড্যাশবোর্ডের রঙিন আলোয় লাল হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে, দাঁড়িয়ে আছেন ধৃতিমান।

মাটিতে, নিল-ডাউন হওয়ার ভঙ্গিতে, মাথার পেছনে হাত জোড়া লক করে বসে আছেন গ্রেগরি ও পোলানস্কি। তাঁদের দু’জনের মুখেই যন্ত্রণার চিহ্ন বুঝিয়ে দিচ্ছে, ব্লাস্টার না হলেও অন্য অস্ত্র, এবং গায়ের জোর ব্যবহার করা হয়েছে তাঁদের বাগে আনতে।

কয়েকজন সৈন্য, যারা স্পষ্টতই বেলায়েভ ও তার টিমকে চ্যালেঞ্জ করতে চেষ্টা করেছিল, আহত বা নিহত হয়ে পড়ে আছে।

স্ক্রিনে এই দৃশ্যটা দেখেই রয় বুঝতে পেরেছিল, ঘরের ভেতরে ঘটেছে এক ভয়ঙ্কর অন্তর্ঘাত। সৈন্যদের মতো ও’ও কমিউনিকেটর চালু করে চেষ্টা করেছিল বাইরে খবরটা পাঠিয়ে সাহায্য চাইতে।

সবক’টা চ্যানেল, এমনকি মিলিটারির নিজস্ব শর্ট-ওয়েভেও কোনো সাড়া না পেয়ে বাকি সৈন্যরা যখন হতাশ হয়ে পড়ছে, রয় কিন্তু তখনও হাল ছাড়েনি।

সবক’টা ফ্রিকোয়েন্সিতে ডিসট্রেস সিগনাল পাঠাতে গিয়েই ও হঠাৎ একটা রিনরিনে, মিষ্টি গলায় দুর্বোধ্য কিছু শুনতে পেয়েছিল।

“আর সময় নষ্ট করবেন না প্রফেসর”, বেলায়েভের গলাটা হিংস্র হয়ে ওঠে এবার, “আপনি লুপ চালু না করলে আমরা বোমাটা আর্ম করতে পারছি না।

বলা তো যায় না, আপনি হয়তো আত্মহত্যা করেও বোমাটা চাঁদের বুকেই ফাটানোর ব্যবস্থা করে ফেললেন!”

বিষণ্ণ মুখে মহাবিশ্বের বুকে একটি নির্দিষ্ট স্থান ও কালের বিন্দু খুঁজে নেন ধৃতিমান, তারপর সেগুলো এন্ট্রি করতে থাকেন সেই কম্পিউটারে, যেটা এই কাজের জন্য ক্রনোমিটার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রয়ের মনে পড়ে মেয়েটার সঙ্গে হওয়া কথাগুলো।

“তুমি যেই হও না কেন”, আকুল হয়ে বলেছিল রয়, “আমাদের সাহায্য করো”।

দুর্বোধ্য ভাষায়, একঘেয়ে ভঙ্গিতে বেশ কিছু কথা বলেছিল মেয়েটা। রয় সেসবের উত্তরে ইউনিভার্সাল ডিসট্রেস সিগনাল-টার পুনরাবৃত্তি করে গেছিল স্পিকারে।

তারপরেই হঠাৎ মেয়েটা স্পষ্ট ইংরেজিতে কথা বলে উঠেছিল।

“আপনি কে? এই ফ্রিকোয়েন্সিতে কথা বলছেন কেন?”

রয় যথাসম্ভব সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিয়েছিল।

বেসের নিরাপত্তা বিপন্ন একথা বলে সাহায্য চাইলেও বেসের বাইরে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ কিছুতেই শুনতে চায়নি মেয়েটা, বরং বারবার বলেছিল, “এটা ক্লোজড সার্কিট। বাইরে কথা বলা সম্ভব নয়”।

বাধ্য হয়ে রয় জিজ্ঞেস করেছিল, “ঘরের ভেতরে, কম্পিউটারের কাছে যাওয়ার কি কোনো পথ আছে?”

কেন রয় কম্পিউটারের কাছে যেতে চায়, এই প্রশ্নের উত্তরে, মনের ভেতর থেকে ফুঁসে ওঠা গালাগালিগুলোকে অতি কষ্টে চেপে রেখে, রয় বুঝিয়ে বলেছিল যে কিছু লোক কম্পিউটারের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, তাই ওকে সেখানে যেতে হবে।

তারপরেই এই মেইনটেন্যান্স শ্যাফট-টায় পৌঁছনোর রাস্তা ও’কে বলে দেয় মেয়েটা।

এই পথেই হামাগুড়ি দিয়ে টেকনিশিয়ানরা কম্পিউটারের মেমরি ব্যাংক ও অন্যান্য জিনিসের দেখাশোনা করত, এটা বোঝে রয়।

সৈন্যদের ডেকে আনার সময় ছিল না ও’র কাছে। তাছাড়া ওই মুহূর্তে ও কাউকেই ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না।

তাই নিজেই, কানে হেডফোন আর মুখের সামনে মাউথপিস লাগিয়ে, শ্যাফটে ঢুকে পড়েছিল ও।

নিজের পরিকল্পনাটা ছকে নেয় রয়।

হিসেবের সামান্য ভুলেই ব্লাস্টারের নিষ্করুণ আদর ওকে কাজ, অ্যাডভেঞ্চার, ধৃতিমান, আর রুচিরা’র থেকে বরাবরের মতো আলাদা করে দিতে পারে।

কিন্তু আর তো কিছুই করার নেই!

ধৃতিমান যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে কিছুটা পেছনের যে কম্পিউটারটা স্থান-কাল নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ঠিক ওপরের হ্যাচটা সন্তর্পণে খুলে ফেলে ও।

বেঁচে থাকলে এই বাচ্চা মেয়ের মতো গলার অধিকারী টেকনিশিয়ানটিকে সাহসিকতার জন্য পদক দেওয়াতেই হবে, ভাবে রয়।

হ্যাচ দিয়ে নিচে লাফানোর আগেও জানতে চায় ও, “তোমার নাম কী?”

“মোয়ে ইময়া ক্রাসনোয়ে”, বলে মেয়েটা। তারপর, সম্ভবত রয়-এর অজ্ঞতার প্রতি করুণাবশতই সেটা ও’র বোধগম্য ভাষায় অনূদিত হয়ে আসে: “মাই নেম ইজ রেড”।

নিচে লাফিয়ে পড়ে রয়।

ও যেমনটা ভেবেছিল, সেটাই হয়। বেলায়েভের যে সৈন্যটি সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, রিফ্লেক্সের বশে সে তৎক্ষণাৎ ব্লাস্টার ফায়ার করে।

নিচে পড়েই গড়িয়ে গেছিল রয়। তাই ব্লাস্টারের নীলচে-সাদা শিখা ওকে স্পর্শ করেনি।

কম্পিউটারটার সেই সুযোগ ছিল না।

মুহূর্তের মধ্যে গলে যায় তার প্যানেলটা।

দু’হাত দিয়ে মাথা ঢেকে মাটিতে পড়ে “গুলি কোরো না! গুলি কোরো না!” বলতে থাকে রয়।

বেলায়েভের উত্তেজিত গলা শোনে রয়। পাঁজর আর কোমরে কয়েকটা লাথি মুখ বুজে সহ্য করতে ও’র অসুবিধে হয় না, কারণ ও জানে, কাজ হয়ে গেছে।

“প্রফেসর ধৃতিমান!”, বেলায়েভের পক্ষে যে আর শান্ত থাকার অভিনয় করাও সম্ভব হচ্ছে না সেটা ও’র চিৎকার শুনে বুঝতে পারে রয়, “আপনার এই সঙ্গীটি হিরো হতে গিয়ে আমাদের সবার পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে!”

ঠোঁটের কোণটা ফুলে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, বোঝে রয়। অবশ্য, এমন একটা অপারেশন এই পর্যায়ে এসে বিঘ্নিত হলে রাগ হওয়া, এবং তার বশে নিরস্ত্র মানুষকেও মারধোর করাটা স্বাভাবিক ব্যাপার।

তবে, ওপর থেকে নিচে লাফিয়েই বেস-এর আদি কম্পিউটারটার দিকে গড়িয়ে যাওয়া, এবং ধৃতিমান যতবার ও’র দিকে তাকাচ্ছেন ততবার মুখটা ঘুরিয়ে সেদিকেই করা, এই দুটো সঙ্কেত যদি ধৃতিমানের ধারালো মগজে ঠিকমতো প্রসেসড হয়, তাহলে এই সংকট থেকে মুক্তির একটা রাস্তা বেরিয়ে আসবে।

যদি ওই মেয়েটি, যে ‘রেড’ বলে পরিচয় দিল, সত্যি বলে থাকে।

“উত্তেজিত হোয়ো না”, ধৃতিমানের গলাটা এমনই অধ্যাপকসুলভ ছিল যে বেলায়েভ তো বটেই, পোলানস্কি ও গ্রেগরি-ও অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকান, “একটা রাস্তা এখনও আছে”।

“দোহাই আপনার প্রফেসর!”, এবার উত্তেজিত হয়ে, ব্লাস্টারের বাঁটের ঘায়ে কুঁকড়ে গিয়েও বলেন পোলানস্কি, “এই ভাড়াটে লোকটার কথার ভিত্তিতে আপনি যাই করুন না কেন, সেটার পরিণতি কোনোমতেই ভালো হবে না”।

“তোমরা লুপটার কনট্রোল এই বেস-এর মূল কম্পিউটারে যুক্ত করো,” কোনো দিকে কর্ণপাত না করে বলেন ধৃতিমান, “গ্রেগরি বলেছেন যে কম্পিউটারটা এখনও কাজ করছে, তাই সেটা দিয়েই বাকিটা করা সম্ভব হবে”।

নিশ্চিন্ত হয় রয়। ও’র শ্বাসটা দীর্ঘশ্বাস ভেবে বেলায়েভ আশ্বস্ত হলেও ধৃতিমান তীক্ষ্ণ চোখে ও’কে একবার দেখে নেন, তারপর বলেন, “আমি লুপ খুলছি”।

দ্রুত হাতে ড্যাশবোর্ডে কিছু এন্ট্রি করতে গিয়ে থমকে যান ধৃতিমান।

বেলায়েভ খিঁচিয়ে ওঠে, “কী হল? থামছেন কেন এখন?”

“তারিখের জন্য তো মাত্র ছ’টা ঘর আছে”, থেমে-থেমে বলেন ধৃতিমান, “তাতে কীভাবে…”।

“তাহলে ৩০০৬০৮ এন্টার করুন” আদেশের সুরে বলে বেলায়েভ, “কনফেডারেশনের কম্পিউটারেও ওভাবেই এন্টার করা হয়”।

রয়-এর দিকে তাকান ধৃতিমান। তারপর, কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থেকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তারিখটা, এবং গ্যালাকটিক কো-অর্ডিনেটগুলো সিস্টেমে এন্টার করেন তিনি।

শান্তিচুক্তি সইয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট গ্যালারিতে উপস্থিত ছিল রয়। তাই ও মনে করতে পারে, গ্যালেনা কোয়াড্র্যান্ট-এর মোটামুটি মাঝামাঝি জায়গার অবস্থান হল ১০.১৫ উত্তর, ৭.০০ মধ্য, ৬.৫৫ ভেক্টরে।

ও’র খেয়াল হয়, ধৃতিমান এই সংখ্যাগুলোই এন্টার করলেন।

কিন্তু কেমন যেন অন্য রকম ভাবে!

“অবশেষে!”, বেলায়েভের মুখে একটা হিংস্র হাসি ফুটে ওঠে, “আমরা মানবজাতির ইতিহাস বদলে দিতে চলেছি প্রফেসর। আর আপনি কি না গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন?”

গ্রেগরি এবং পোলানস্কি, দু’জনেই মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন ধৃতিমান-কে আটকাতে। গ্রেগরি’র মাথা ফেটেছে। আর পোলানস্কি’র হাতের একটা অংশ ঝলসে দিয়েছে ব্লাস্টার। তবু, তাঁদের আটকে রাখতে হিমসিম খাচ্ছিল বেলায়েভের লোকেরা।

রয়-কে এক ঝলক দেখে নেন ধৃতিমান, তারপর বেলায়েভের উদ্দেশে বলেন, “যে পরিমাণ লোড পড়ছে এই সিস্টেমের ওপর, তাতে এই ভিন্টেজ কম্পিউটারটা কিন্তু নষ্ট হয়ে যাবে”।

“গুলি মারুন আপনি কম্পিউটারকে!”, বলে আর্ম করা ডিভাইসটাকে বুকের মধ্যে ধরে রাখা স্পেস-টাইম লুপের ডেলিভারি মেকানিজম চালু করে বেলায়েভ।

থ্রমমমম করে একটা আওয়াজ ওঠে ঘর জুড়ে।

রয় বুঝতে পারে, লুপ খুলছে এদিক থেকে।

পরমুহূর্তেই একটা বিকট আওয়াজ তুলে পুরোনো কম্পিউটারটায় আগুন ধরে যায়। ঘরের বেশ কয়েকটা আলো-ও নিভে যায় তখনই।

বন্ধ হয়ে থাকা ভারি দরজাটা খুলে যেতে থাকে।

এক ঝটকায় গ্রেগরিকে টেনে নামিয়ে, নিজেও মাটিতে শুয়ে পড়ে রয়। ধৃতিমান-ও পোলানস্কি-কে চেপে ধরে একই পন্থা নেন।

দরজা থেকে, এবং ঘরের মধ্য থেকেও ব্লাস্টারের শিখারা অন্ধকারে নীলচে-সাদা আলোর এক অদ্ভুত তাণ্ডব নৃত্য পেশ করে।

কিছুক্ষণ পরে, ভারি বুটের আওয়াজ তুলে একঝাঁক সৈন্য ঘরে ঢোকে।

তাদের স্যালুটের তোয়াক্কা না করে, বেলায়েভ ও তার সঙ্গীদের মৃতদেহের দিকে না তাকিয়েই পোলানস্কি চেঁচিয়ে ওঠেন, “গ্যালেনা কোয়াড্রান্টের সঙ্গে যোগাযোগ করো। ওদের ভীষণ বিপদ!”

“দরকার নেই”, গ্রেগরি’র মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধার ফাঁকে বলেন ধৃতিমান, “বোমাটা অন্য জায়গায় গেছে”।

“কিন্তু যেখানে গেছে তাদেরকেও তো সতর্ক করা দরকার!”, আর্তনাদ করে ওঠেন গ্রেগরি।

“বললাম তো”, নিরাসক্ত গলায় বলেন ধৃতিমান, “ওটা নিয়ে আর ভাবতে হবে না”।

কম্যান্ড সেন্টারে বসেও সেনাবাহিনী ও সিভিলিয়ান কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না, তাই বাধ্য হয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করছিলেন ধৃতিমান।

“রয় আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, বেস-এর আদি কম্পিউটারটা যদি স্পেস-টাইম কো-অর্ডিনেটস ঠিক করার জন্য ব্যবহার করি, তাহলে এই সমস্যার একটা সমাধান হতে পারে।

ইনপুট করতে গিয়েই আমি দেখি, কম্পিউটারটায় আট ডিজিটে তারিখ এবং ছ’ডিজিটে মহাকাশে কোনো বিন্দুর অবস্থান বোঝানোর সুযোগ নেই।

তার বদলে ব্যবস্থা আছে ছ’ডিজিটে তারিখ, এবং ছ’ডিজিটে পৃথিবীর বুকে কোনো জায়গার অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ফিড করার।

তাই আমি, আমার জ্ঞাতসারে, পৃথিবীর সবচেয়ে জনবিরল একটা বিন্দুর ল্যাটিট্যুড-লংগিট্যুড এন্টার করি, যার সংখ্যাগুলো, কাকতালীয় ভাবে হলেও, গ্যালেনা কোয়াড্র্যান্টের মাঝামাঝি জায়গার সঙ্গে মেলে।

আমি ডেলিভারি মেকানিজমের লুপটা খোলার ব্যবস্থা করি ৬০.৫৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ১০১.৫৭ ডিগ্রি পূর্ব অবস্থানে।

তারিখের ব্যাপারে একটা ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না, কিন্তু নানা জায়গা থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, সেই ফাটকাটাও খেটে গেছে”।

“মানে?”, সবার প্রশ্নটা গ্রেগরি’র মুখ দিয়ে বোমার মতো ফেটে বেরোয়।

“আপনারা জানেন কি না জানি না, তবে বিংশ শতাব্দীর শেষে ওয়াইটুকে, অর্থাৎ ইয়ার টু থাউজেন্ড বলে একটা বিরাট ক্রাইসিস দেখা দেয়।

তার আগে অবধি অনেক কম্পিউটারেই ছ’ডিজিটে তারিখ, অর্থাৎ দুই ডিজিটে সাল বোঝানো হত। কিন্তু সেই সময় লোকের আশঙ্কা হয়, সরলমনা, অথচ মহাশক্তিধর কম্পিউটারের দল ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৯৯ রাত বারোটা বাজলে যেই জিরো আওয়ার আসবে, তখনই তারিখটা বদলে ১লা জানুয়ারি ২০০০-এর বদলে ১লা জানুয়ারি ১৯০০ করে ফেলতে পারে!

যেহেতু এই সোভিয়েত কম্পিউটারটা বিংশ শতাব্দীর প্রোডাক্ট, তাই আমি একটা ঝুঁকি নিয়েছিলাম এই ভেবে যে হয়তো কম্পিউটারটা দু’ডিজিটের সংখ্যা দিলে সেটাকে ৩০০৮-এর বদলে ১৯০৮ ভাববে”।

“তার মানে”, গ্রেগরি’র চোখগুলো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়, “৩০শে জুন ১৯০৮ সালে সাইবেরিয়ায় তুঙ্গুস্কা নদীর ওপর কোনো অ্যাস্টেরয়েড নয়, কমেট নয়, ব্ল্যাক হোল নয়,…

জার বোম্বা ফেটেছিল!”

“হ্যাঁ”, নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেন ধৃতিমান, “দু’হাজার বছরের একটা রহস্যের সমাধান এতদিনে হল”।

“তাহলে রেড এটাই আন্দাজ করেছিল!”, থাকতে না পেরে বলে রয়।

সবার সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে রয় রেড-এর সঙ্গে ও’র কথাবার্তার বিবরণ দেয়।

“ওই নামে কোনো মেয়ে এই বেস-এ নেই”, স্পষ্ট করে বলেন পোলানস্কি, “তবে…”।

“ইয়ং ম্যান”, গম্ভীর গলায় বলেন গ্রেগরি, “সোভিয়েত টেকনোলজির এক আশ্চর্য নিদর্শন ছিল এই বেস-এর কম্পিউটার, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মাধ্যমে, মানব মস্তিষ্কের মতো করেই, স্বশিক্ষিত হতে জানত।

আমাদের সবার দুর্ভাগ্য, সেটা একদম জ্বলে নষ্ট হয়ে গেল এই ঘটনায়।

সেটার কাগুজে নাম ছিল ই.এস এস.ভি.এম ১০০০।

তবে, কম্পিউটারটার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য যেসব টেকনিশিয়ান ও’র সঙ্গে নিয়মিত কথা বলত, তারা ওকে ক্রাসনি, অর্থাৎ ‘রেড’ বলেই ডাকত”।

2 thoughts on “রেড

  • January 1, 2018 at 6:13 am
    Permalink

    বিশ্ব সমাজ – রাজনীতির আঙিনায় ওই নতুন পরীক্ষাগারের আবহটা এক দুর্দান্ত বিন্যাসে ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞানের বাহ্য মোড়কে যখন জীবনকে দেখার একটা নতুন বোধ গড়ে উঠছে সেই সময়টাকে ভবিষ্যতের বয়ানে কি অক্ষরে লেখা হবে তার সার্থক নির্মিতি।

    Reply
  • January 1, 2018 at 12:44 pm
    Permalink

    দারুন, অসাধারণ একটা গল্প।

    Reply

Leave a Reply to শেখর রণেন্দু Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!