শিল্পী মাকড়সা

নেডি ওকোরোফর, বাংলা অনুবাদ: অনুষ্টুপ শেঠ

জোম্বি যায় না, যায় না, যদি না তুমি যেতে বলো,

জোম্বি!

জোম্বি!

জোম্বি থামে না, থামে না, যদি না তুমি থামতে বলো,

জোম্বি ঘোরে না, ঘোরে না, যদি না তুমি ঘুরতে বলো,

জোম্বি!

জোম্বি ভাবে না, নিজে ভাবে না, যদি না তুমি ভাবতে বলো

–       [‘জোম্বি’ গানের অংশবিশেষ, লেখক ফেলাকুটি, নাইজিরিয়ার মিউজিশিয়ান ও স্বঘোষিত নিপীড়িত শ্রেণির মুখপাত্র।]

আমার বর আমায় নিয়ম করে পেটাত। যেদিনের কথা, সেই সন্ধ্যায় তেমনই এক মারধরের পর, আমি বাড়ির পিছন দিকে ঝোপঝাড়গুলো পার হয়ে উঁচু ঘাসের জমিটায়, পাইপলাইনের ঠিক সামনে বসেছিলাম। আমাদের বাড়িটা গাঁয়ের একদম শেষপ্রান্তে তো, প্রায় জঙ্গলের দোরগোড়ায়ই বলা যায়। ফলে কেউ কখনও ওকে আমার গায়ে হাত তোলার সময়ে দেখতে বা শুনতে পেত না।

     লোকটাকে আরও রাগিয়ে না দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর এই একটাই রাস্তা ছিল আমার, এই বাড়ির পিছনের পোড়ো জমিটায় পালিয়ে আসা। ও জানত, আমি কোথায় আছি। ও জানত, আমি একাই বসে আছি এখানে। কিন্তু বেজায় আত্মসর্বস্ব লোক তো, তাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকত। কখনও বোঝেনি, বোঝেনি কেন ভাবেওনি যে, আমি আত্মহত্যার কথা ভাবি এইসব সময়ে।

     লোকটা পাঁড় মাতাল ছিল। নাইজার ডেলটা গণজাগরণ মঞ্চের বেশির ভাগ লোকই তাই ছিল। ওরা ওভাবেই নিজেদের রাগ, হতাশা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। খাঁড়ির মাছ, চিংড়ি— সব মারা যাচ্ছিল ক্রমশ।ওই জল খেয়ে খেয়ে দ্বীপের মেয়েদের মা হবার ক্ষমতা চলে যাচ্ছিল। বহুকাল ধরে খেলে ছেলেদের প্রস্রাবে রক্ত বেরনো শুরু হত।

     কাছাকাছি একটা নদী থেকে আমি খাবার জল আনতাম। তারপর তার পাশেই একটা তেলের ফ্লো-স্টেশন বানানো হল।এখন নদীটা পুরো নোংরা, দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। ঘোলাটে জলের ওপর ভাসা তেলের আস্তরণে রামধনু রং চমকায়। ওলকচু এসব কন্দের ক্ষেতে প্রতিবছর আগের বছরের থেকে কম ফলন হচ্ছে। বাতাস গায়ে লাগলে গা নোংরা হয়ে যায়, সারাক্ষণ এমন গন্ধ ছাড়ে যে মনে হয় মর্গের সামনে বসে আছি। কিছু জায়গায় তো সর্বক্ষণ এত আলো, এত শব্দ আসে এই সব ফ্লো স্টেশন থেকে যে, মনে হয় রাত্রি বলে কিছু নেই-ই।

     গ্রাম তো নয়, ভাগাড় মাইরি!

     এর ওপর, গণজাগরণ মঞ্চের মেম্বাররা পটাপট ধরা পড়ছিল। পুরো ‘ধরো আর মারো’ চলছিল। সদস্যদের দেখলেই ওরা রাস্তার মধ্যে গুলি করছিল, গাড়ি চাপা দিচ্ছিল, ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে জলায় ফেলে দিচ্ছিল। জলায় ফেলে দিলে তাদের বডিটাও এমনকী পাওয়া যেত না আর।

     আমি আমার বরকে সুখ দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতাম। কিন্তু তিন বছর ধরে লাগাতার চেষ্টা করেও আমার শরীর গর্ভধারণ করতে পারল না। ওর হতাশা বা দুঃখর কারণ হয়তো বোঝা কঠিন ছিল না… কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে বোঝাপড়া চলে না। যন্ত্রণা, যেটা ও আমায় নিয়মিত দিত।

     আমার সবচেয়ে প্রিয় (আমার একমাত্র প্রিয়ই বলা চলে) সম্পত্তি ছিল আমার বাবার গিটারটা। পালিশ করা আবুরা কাঠের তৈরি, কচ্ছপের খোলা দেওয়া ওপরে। দারুণ দেখতে। বাবা বলত, এই ব-দ্বীপের শেষতম আবুরা গাছগুলোর একটার কাঠ দিয়ে গিটারটা তৈরি। গিটারটার খুব কাছে নাক নিয়ে গেলে মনে হয় বাবা ঠিকই বলত। কত পুরোনো, কিন্তু এখনো সদ্য কাটা গাছের মতো গন্ধ, যেন ফেলে আসা জঙ্গলের গল্প বলছে, যে গল্প শুধু ও-ই জানে এখন।

     বাবার গিটারটা না থাকলে আমিও থাকতাম না। কম বয়সে বাবা সন্ধেবেলা বাড়ির সামনে গিটার বাজাত, আশপাশের সবাই কাজ ফেলে এসে শুনত। এমনকী তালে তালে নাচত, হাততালি দিত, চোখ বন্ধ করে বুঁদ হয়ে থাকত, পকেটে সেলফোন বাজলেও ধরত না। আমার মা যিনি হয়েছিলেন তিনি ওই গিটারের আওয়াজ শুনেই এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রথম।

     বাবা যখন গিটার বাজাত, আমি বাবার লম্বা আঙুলগুলোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম।কী সুরের খেলা! বাবা সুর দিয়ে সবকিছু এঁকে ফেলতে পারত— রামধনু, সূর্যোদয়, মাকড়সার সূক্ষ্ম জালে চমকে ওঠা শিশিরকণা। আমার দাদাদের আগ্রহ ছিল না, কিন্তু আমি শিখতে চাইতাম। তাই বাবা আমাকে সব শিখিয়েছিল। যা যা জানত সব। আমার আঙুলও বাবার মতোই লম্বা, আমারও সুর শোনার কান ছিল, গিটারের তারে আমার হাত চলত বাবার চেয়ে তাড়াতাড়ি, নিপুণভাবে। ভালো বাজাতাম, রীতিমতো ভালো।

     কিন্তু আমি এই আপদকে বিয়ে করলাম। অ্যান্ড্রু। তাই এখন আমি কেবলমাত্র বাড়ির পিছনে গিয়ে গিটার বাজাতে পারি। ওর থেকে আড়ালে। গিটারটাই আমার একমাত্র মুক্তি।

     সেই ঘটনার দিন সন্ধ্যায়, তেলের পাইপের ঠিক সামনে আমি বসে ছিলাম। সব বাড়ির পিছন দিয়ে তেলের পাইপ গেছে। এই গ্রামটা তেল সাপ্লাই দেওয়া গ্রাম, আমার বেড়ে ওঠার গ্রামটাও যেমন ছিল। আমার মা-ও এরকম তৈলসমৃদ্ধ, পাইপলাইনে ভরা গ্রামে বড় হয়েছিল, তাঁর মাও সেরকম আর একটা গ্রামে। আমরা হচ্ছি জন্ম জন্ম পাইপলাইনের ধারে জীবন কাটানো মানুষ।

     আমার মায়ের ঠাকুমা নাকি পাইপলাইনের ওপর শুয়ে থাকতে ভালোবাসত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে শুয়ে, দু’দিকে যত দূর চোখ যায় তত দূর চলে যাওয়া স্টিলের পাইপগুলোর মধ্যে দিয়ে কুলকুল করে অনন্ত বয়ে যাওয়া তরলের আওয়াজ শুনত। এসব ওই জোম্বিগুলো আসার আগের কথা অবশ্য। ভাবলেও হাসি পায়। এখন এসব করার চেষ্টা করলে জোম্বিরা মায়াদয়া না করে স্রেফ মেরে ফেলত।

     যাই হোক, যা বলছিলাম। আমার যখন খুবই মনমেজাজ খারাপ হত, গিটার নিয়ে এইখানে এসে পাইপলাইনের সামনেই বসে থাকতাম। প্রাণের ঝুঁকি যে নিচ্ছি সেটা জানতাম, পাইপলাইনের এত কাছে আসা মানেই বিপদ, কিন্তু ওই রকম মনের অবস্থাতে, সত্যি বলতে কী, মরে গেলেও আমার কিছু যেত আসত না। হয়তো মরে যেতেই চাইতাম। মাতালটা যে এসব রাগারাগি মারপিটের সময়ে কোনওদিন গিটারটা আছড়ে ভেঙে দেয়নি এই আমার ভাগ্য। দিলে, আমি সেইদিনই পাইপলাইনের উপর চড়ে বসতাম, তারপর যা হওয়ার হত। হয়তো মনে মনে সেটা জানত বলেই লোকটা মেরে আমার গিটার ভাঙার বদলে নাকমুখ ভেঙে দেওয়াটা পছন্দ করত।

     আজ ও আমায় ঠাসিয়ে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। কেন, জানি না। স্রেফ দরজা ঠেলে বাড়িতে ঢুকল। আমি রান্নাঘরে কাজ করছিলাম। সেখানে ঢুকল, ঢুকেই থাপ্পড়। হয়তো কাজে কোনও ঝঞ্ঝাট হয়েছিল, হয়তো ওর শুয়ে বেড়ানোর সঙ্গিনীদের মধ্যে কেউ ওকে ঝেড়েছিল বা হয়তো আমিই কোনও অন্যায় করেছিলাম। জানি না, জানতে চাইও না। নাক থেকে রক্ত পড়াটা সবে বন্ধ হতে শুরু হয়েছিল, মাথাটাও আর অত ঘুরছিল না।

     আজ আমি একটু বেশিই আপসেট হয়ে আছি। এত কাছে বসেছি পাইপলাইনের, পায়ের আঙুলের দু’ইঞ্চি এগোলেই ছুঁয়ে যাবে। গরম আর ভ্যাপসা ভাবটাও বেশি যেন আজ। বা হয়তো ওটা আমার নাকের যন্ত্রণার জন্য মনে হচ্ছে। মশার কামড়গুলোও গায়ে লাগছে না তত। দূরে নেঙ্কাকে দেখতে পাচ্ছি, এ আমার সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলে না। নেঙ্কা ছোট ছেলেদের একটা বড় বাথটাবে চান করাচ্ছে। আরও কয়েকটা বাড়ির পরে একটা টেবিল ঘিরে কয়েকজন লোক তাস খেলছে। অন্ধকার হয়ে গেছে। চারদিকে ছোট ঝোপঝাড়ে ভর্তি। আর বললাম তো, সবচেয়ে কাছের বাড়িটাও বেশ খানিকটা দূরে। তাই আমাকে কেউই দেখতে পাচ্ছিল না।

     নিঃশ্বাস ফেলে গিটারটা তুলে নিলাম। যে সুরটা ধরলাম, সেটা বাবা খুব বাজাত। বাজাতে বাজাতে চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল আমার। বাবাকে খুব মিস করি, করব চিরকাল। আঙুলের নীচে তারের কম্পন যেন বুকের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছিল।

     সুরের মায়ায় পুরো ডুবে গেছিলাম। জালের মতো বাজনা ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারদিকে, পড়ন্ত সূর্যের আলোয় নারকেল গাছগুলোর চূড়া রাঙিয়ে দেবার মতো মোহময় সেই সুর…

     ক্লিক!

     নিমেষে কাঠ হয়ে গেলাম, আঙুল যেখানে ছিল সেখানেই থমকে গেল, শেষ বাজনার রেশ আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। একটুও নড়তে ভয় করছিল। চোখ খুলতেও। মাথার পাশটা আবার দপদপ করতে শুরু করেছিল।

     ক্লিক! তুলনায় কাছে এবার। ক্লিক! আরও কাছে। ক্লিক! আরও! আমার বুক ধড়ফড় করছিল। গা গুলোচ্ছিল ভয়ে। যতই ঝুঁকি নিই না কেন, এইভাবে মরে যেতে তো আমি চাইনি! কে চাইবে, জোম্বিরা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, তেমন মৃত্যু? গ্রামের সব্বাই দিনে চোদ্দো বার যা করে, আমিও তেমন নাইজেরিয়ার সরকারকে গালি দিচ্ছিলাম।

     টিং!!!

     মাঝের আঙুলের নীচে চেপে ধরা তারটার কাঁপুনি থেমে যাবার পরও আমি চোখ খুলতে পারছিলাম না। আমার হাত কাঁপতে শুরু করে দিয়েছিল। একটা শীতল, খোঁচামতো কিছু আমার হাতটা ধরে তুলে সরিয়ে দিল। চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল, সামলালাম। গিটারের তার আবার বেজে উঠল।

     টুং!

     আমার হাতে চাপা না থাকায়, তারটা এবার সুন্দর বেজেছে। খুব আস্তে আস্তে চোখ খুললাম। খুলতেই বুক ধড়াস করে উঠল। সামনে যে জিনিসটা দাঁড়িয়ে ছিল সেটা হয়তো তিন ফুট মতো লম্বা হবে। আমার সঙ্গে তার সরাসরি চোখাচোখি হল। এর আগে কখনও এত কাছ থেকে দেখিনি। খুব অল্প লোকেই দেখেছে। এগুলো সারাক্ষণ ভয়ানক গতিতে পাইপের উপর নীচে দৌড়ে বেড়ায়, সারাক্ষণই কিছু না কিছু করছে, করতে যাচ্ছে।

     আর একটু ভালো করে চেয়ে দেখলাম। এদের সত্যি সত্যি আটটা পা! অত অন্ধকারের মধ্যেও পাগুলো চকচক করছে। সামান্য যেটুকু আলো আসছে তাতেই সব প্রতিফলিত হচ্ছে। আর একটু আলো হলে আমি তো আয়নার মতো নিজের মুখ দেখতে পেতাম। শুনেছিলাম এগুলো নিজেরাই নিজেদের পালিশ করে ঝকঝকে রাখে। তাই-ই হবে, নইলে কে বসে বসে এতগুলো জোম্বিকে সাফ করবে!

     জোম্বিদের বানানোটা সরকারের আইডিয়া। তবে শেল, শেভ্রন আর অন্যান্য তেল কোম্পানিগুলোও (যাদের আগ্রহ বেশি বই কম ছিল না) টাকা ঢেলেছিল বানানোর সময়ে। পাইপলাইন ভেঙে তেল চুরি আর দস্যুবৃত্তি ঠেকাতে জোম্বিগুলোকে বানানো হয়েছিল। ভাবলে হাসি পায় না? সরকার আর এই কোম্পানিগুলো আমাদের জমি-জায়গার বারোটা বাজিয়ে দিল, খুঁড়ে খুঁড়ে সব তেল তুলে নিল, তারপর আমাদেরই সেই তেলের ভাণ্ডার থেকে তাড়ানোর জন্য রোবট বানাচ্ছে!

     এগুলোর নাম রাখা হয়েছিল আনান্সি ড্রয়েড ৪১৯, কিন্তু আমরা বলতাম “উয়োবো যন্ত্র‘ বা আরও ছোট করে ‘জোম্বি’— ‘দ্যাখ-মার’ বিভাগের সৈন্যগুলো, যারা মাথায় পোকা নড়লেই আমাদের ডেরায় এসে উৎপাত করত, তাদেরকেও তাই-ই বলা হত বলে।

     শুনেছি এই ‘জোম্বি’ রোবটগুলো স্বাধীন চিন্তাভাবনা করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আমি স্কুলে পড়েছিলাম, ইউনিভার্সিটিতেও এক-দেড় বছর গেছিলাম, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে পড়িনি। আর বিয়ে করে এই মড়ার দশা গ্রামে চলে আসার পর তো এখানকার বাকিদের মতোই হয়ে গেছি। জোম্বিদের পাহারা দেওয়া পাইপ বিছোনো ব-দ্বীপের এক গেঁয়ো মেয়ে, যাকে তার বর ইচ্ছে হলেই বেহুদ্দা ঠ্যাঙায়। আমি আর রোবটের বুদ্ধির কী বুঝব!

     ওটাকে একটা বিরাট ধাতব মাকড়সার মতো দেখতে লাগছিল। চলাফেরাও করছিল মাকড়সার মতোই, মসৃণ ভাবে নড়াচড়া করছিল পায়ের গাঁটগুলো। কাছে ঝুঁকে পড়ে গিটারের তারগুলো আরও কাছ থেকে দেখছিল ওটা, হঠাৎ পিছনের দুটো পা দিয়ে পাইপের গায়ে আঘাত করল। ক্লিং! ক্লিং! ক্লিং!

     আমার হাতটা ধরে আবার তারের উপর রাখল জোম্বিটা, আমার আঙুল দিয়ে তারটা বাজানোর চেষ্টা করল দুবার— একটা আধাখ্যাঁচড়া আওয়াজ হল তাতে। ওটার নীল পুঞ্জাক্ষির চোখগুলো আমার দিকে চেয়ে ছিল, এত কাছে বলে দেখলাম সেগুলো মোটেই বাল্ব নয়। বরং বলের মতো কিছুতে ভরা নীল, স্থির তরল কিছু – পারদের মতো। আমি মুগ্ধ হয়ে না তাকিয়ে পারছিলাম না। গ্রামের আর কেউ এটা জানে না, কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এত কাছ থেকে কেউ দেখেনি। উজ্জ্বল, তরল ধাতুর চোখ! আইব্বাস!!

     ওটা আমার হাতে আরও জোরে চাপ দিল। নীল চোখের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আঁতকে উঠেছিলাম প্রথমে, তারপর বুঝলাম।

     “তুমি…আমায় গিটার বাজাতে বলছ?”

     ওটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, একটা পা দিয়ে গিটার গায়ে আলতো টোকা দিল এই কথায়। বহুকাল বাদে কেউ আবার আমার বাজনা শুনতে চাইল। আমার প্রিয় গানটা বাজাচ্ছিলাম, অলিভার ডি’কক-এর ‘লাভ দ্য সি রোড’। প্রাণ ঢেলে বাজাচ্ছিলাম, প্রাণপণ করে বাজাচ্ছিলাম।

     জোম্বিটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, একটা পা আমার গিটারে ঠেকিয়ে। শুনছিল? আমার তো তাই মনে হয়। মিনিট কুড়ি বাদে, শেষ অবধি যখন কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়া অবস্থায় বাজানো থামালাম, ওটা এক পা বাড়িয়ে আমার টনটন করতে থাকা আঙুলগুলো ছুঁল। খুব আলতো করে।

***

এই পাইপলাইনগুলোর কোনওটা দিয়ে ডিজেল যায়, কোনওটা দিয়ে ক্রুড অয়েল। দিনে মিলিয়ন মিলিয়ন লিটার। আমেরিকার পঁচিশ শতাংশ তেল নাইজিরিয়া থেকে চালান যায়। আর আমরা, কিছুই পাই না তার বিনিময়ে।জোম্বিদের আক্রমণে মরে যাওয়া ছাড়া কিছুই পাই না। বলার মতো অনেক কথা আছে আমাদের।

     জোম্বিদের প্রথম যখন ছাড়া হল, আমরা কেউ কিছুই জানতাম না। খালি গুজব শোনা যেত, অমুকের টুকরো করে ছেঁড়া মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তমুক রাত্রে তার বাড়ির পিছনে দানব-মাকড়সাদের দৌড়ে চলে যেতে দেখেছে। অথবা পাইপলাইনে কোথায় ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হয়েছে, চারদিকে শুধু পুড়ে আংরা বডি পাওয়া গেছে লোকজনের। কিন্তু বডিগুলো যেখানে পাওয়া যেত, তার ধারেকাছের সব পাইপই একদম অক্ষত থাকত।

     লোকেরা তবুও তেল চুরি করা চালিয়ে যাচ্ছিল। আমার বর-ও। আমার ধারণা ও ডিজেল আর তেল সব ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি করত। কিছু তেল বাড়িতেও আনত অবশ্য। দু’দিন একটা বালতিতে রেখে দিলে সেটা থিতিয়ে গিয়ে কেরোসিনের মতো কিছু একটা হয়ে দাঁড়াত। আমি তা দিয়ে রান্না করতাম। কাজেই, আমারও ওকে কিছু বলা সাজে না। তবু, কাজটা খুব খুব খুব বিপজ্জনক ছিল।

     জোম্বিদের টের পেতে না দিয়েও পাইপ ভাঙার কিছু উপায় ছিল। আমার বর আর তার দলের লোকেরা একরকমের শক্তিশালী লেজার কাটার ব্যবহার করত। সেগুলো একটা হাসপাতাল থেকে চুরি করে আনা। কিন্তু ভীষণ সাবধানে, একদম নিঃশব্দে কাজটা করতে হত। একটু আওয়াজ, পাইপের গায়ে একটা কম্পন, ব্যস! এক মিনিটের মধ্যে জোম্বিগুলো হু হু করে দৌড়ে আসত। আমার বরের অনেক পরিচিত স্রেফ অসাবধানে পাইপ বা কাটারের গায়ে তাদের আঙুলের বিয়ের আংটির ঘষা লাগার আওয়াজের জন্য মারা গেছে।

     কয়েক বছর আগে কিছু বাচ্চা ছেলে পাইপের কাছাকাছি খেলছিল। কুস্তি লড়তে লড়তে তাদের মধ্যে দু’জন পাইপের গায়ে গিয়ে পড়েছিল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে জোম্বিগুলো পৌঁছে গেছিল সেখানে। একটা ছেলে কোনওরকমে পালিয়ে যেতে পেরেছিল, অন্যজনকে হাত ধরে ঝুলিয়ে দূরে ঝোপের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ছেলেটার হাতটা আর দুটো পা-ই ভেঙে গেছিল। গভর্নেমেন্টের লোকেরা দাবি করেছিল যে জোম্বিদের এমনভাবে প্রোগ্রাম করা আছে যাতে তারা যথাসম্ভব কম ক্ষতি করে মানুষের, কিন্তু… আমি ওদের কথা বিশ্বাস করি না। নাহ্‌!

     ওগুলো সাংঘাতিক জিনিস। পাইপলাইনের কাছে যাওয়া মানেই নৃশংস মৃত্যু ডেকে আনা। অথচ, আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির পিছন দিয়েই গেছে ওই কালান্তক পাইপলাইনগুলো।

     তবে আমি ক্রমশই বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছিলাম। এই কয়েক মাস ধরে, আমার বর আমায় মেরে মেরে আধমরা করে দিচ্ছিল প্রায়ই। কেন, সেটাও ভেবে পেতাম না। ওর চাকরি চলে যায়নি। আমি জেনে গেছিলাম লোকটা অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক চালাচ্ছিল, তা সেসবেও কিছু বিগড়োয়নি। আমাদের টাকাপয়সার টানাটানি ছিল ঠিকই, কিন্তু না খেয়ে থাকার মতো খারাপ দশাও ছিল না। হয়তো আমি ওকে সন্তান দিতে পারছিলাম না বলে। সেটা আমারই দোষ জানি, কিন্তু আমারই বা কী করার ছিল?

     আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন পিছনের ঘাসজমিতে গিয়ে বসে থাকছিলাম। আর, প্রতিবার, এই বিশেষ জোম্বিটা এসে হাজির হত। আমার ওকে গিটার বাজিয়ে শোনাতে ভালো লাগত। ও শুনত। ওর সুন্দর চোখগুলো আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠত। আচ্ছা, রোবটদের কি আনন্দ বলে কিছু হয়? আমার ধারণা, এত উন্নত বুদ্ধিমান রোবটদের হয়। সারাদিনে বহুবার দূর থেকে দেখতাম জোম্বিরা দল বেঁধে পাইপ বরাবর দৌড়াদৌড়ি করছে। সারাইয়ের কাজে, নয়তো ঘষামাজা, পালিশ করা— যা কিছু করে ওরা। আমার জোম্বি সেই দলের মধ্যে আছে কিনা বুঝে উঠতে পারতাম না।

     বার আট-দশ এরকম আসার পর, ওটা খুব অদ্ভুত একটা কাজ করল। খুবই আশ্চর্যের। সেদিন আমার বর অসম্ভব মেজাজ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল, গা থেকে নানা অ্যালকোহলের গন্ধ ছাড়ছিল— বিয়ার, পাম ওয়াইন, পারফিউম। তার আগে সেদিন আমি সারাদিন ধরে অনেক ভেবেছিলাম। নিজেকে নিয়ে। কেমন আটকা পড়ে গেছি। নিজের একটা বাচ্চা চাইছিলাম। এই বাড়ির মধ্যে সারাদিন আর ভালো লাগছিল না। নিজের একটা কাজ চাইছিলাম। বন্ধু চাইছিলাম। সাহস চাইছিলাম। কিন্তু সাহস আছে, তাও তো জানি। এতবার একটা জোম্বির সঙ্গে মুখোমুখি হচ্ছি, সাহস না থাকলে পারতাম?

     প্রাইমারি স্কুলের টিচারের চাকরি আছে শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম আমার বরকে বলব যে আমি সেই কাজটা করতে চাই। সে বাড়ি ফিরে আমায় জড়িয়ে ধরে খানিক আদর করে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। বসে, টিভি চালিয়ে দিল। অনেক রাত হয়েছিল তবু আমি ডিনার সাজিয়ে এনে দিলাম। মরিচগুঁড়ো ছিটোনো, খাসির মাংস, মুরগি আর চিংড়ি দেওয়া পেটভরানো স্যুপ। লোকটা বেশ মাতাল হয়ে ফিরেছিল, মানে খুশমেজাজেই ছিল। কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার খাওয়া দেখতে দেখতে আমার সব সাহস কেমন উড়ে গেল। নিজের জীবন পাল্টানোর সব সদিচ্ছা কেমন ভয়ে কুঁকড়ে মনে একদম পিছনে চলে গেল। 

     “আর কিছু লাগবে?”

     লোকটা সত্যি সত্যি মুখ তুলে চেয়ে হাসল, “স্যুপটা খুব ভালো হয়েছে আজ।’’

     আমিও হাসলাম, কিন্তু আমার মনের মধ্যের সবকিছু যেন আরও গুটিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। “শুনে ভালো লাগল,’’ বলে, নিজের গিটার কাঁধে তুলে নিলাম, “আমি একটু পিছনের জমিতে গিয়ে বসছি, বাইরে বেশ হাওয়া দিচ্ছে।’’

     “পাইপের খুব কাছে চলে যেও না।’’ বলল বটে, কিন্তু তার চোখ ততক্ষণে টিভির দিকে চলে গেছে, মন মাংসের হাড্ডি চিবোনোয়।

     অন্ধকারে, ঘাসজমির ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে পা টিপে টিপে চলে এলাম পাইপলাইনের কাছে। আমার অভ্যস্ত জায়গাটায় গিয়ে পা ছড়িয়ে বসলাম। পাইপলাইন থেকে ঠিক এক ফুট দূরে। বসে, তারগুলোয় অল্প অল্প করে ঝংকার তুলতে শুরু করলাম। আমার বুকে জমে থাকা বিষাদের স্বর। এখান থেকে কোথায় বা যাওয়ার জায়গা আছে আমার? এই কি জীবন? দীর্ঘশ্বাস পড়ল একটা। এক মাসের ওপর চার্চে যাওয়া হয়নি।

     পাইপের উপর দিয়ে এগিয়ে আসা ক্লিক ক্লিক আওয়াজটায় আমার মন হালকা হল কিছুটা। ওর তরল তীব্র নীল চোখগুলোয় আজ জোরালো আলো ঝলকাচ্ছিল। একবার এক গাঁটরি নীল কাপড় কিনেছিলাম এক মহিলার থেকে। সেটা এত ঝকঝকে নীল, মনে হত রোদে ধোয়া পরিষ্কার জলের দিকে তাকিয়ে আছি। মহিলাটি বলেছিল, ওটা হল আকাশি রঙ। আমার জোম্বির চোখের রং আজ গাঢ় আকাশি ছিল।

     আমার সামনে এসে থামল। আমি জানতাম ওটাই আমার জোম্বি, কারণ মাসখানেক আগে ও আমাকে সামনের একটা পায়ে একটা নীল প্রজাপতির স্টিকার লাগাতে দিয়েছিল।

     “গুড ইভনিং!” বললাম।

     ও একটুও নড়ল না।

     “আমার আজ মন খারাপ।’’ বললাম।

     ও পাইপ থেকে নেমে, গুটি গুটি পায়ে ঘাস পেরিয়ে এসে ওর শরীরটা মাটিতে নামিয়ে বসল। তারপর বসে অপেক্ষা করতেই লাগল।

     আমি একটু হাত সেট করে নিয়ে ওর প্রিয় গানটা ধরলাম। বব মার্লের “নো উওম্যান, নো ক্রাই”। বাজাতে বাজাতেই দেখলাম ওর ধাতব শরীরটা ধীরে ধীরে পাক খাচ্ছে, এদ্দিনে বুঝে গেছি ওটাই ওর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। দেখে ভাল লাগল। বাজনা থামলে, ও আবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি তারে শেষ কিছু টুং টাং করে, পিছনে হাত দিয়ে এলিয়ে বসলাম। নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, “এ এক জঘন্য জীবন, বুঝলে।’’

     আচমকা, মৃদু ঘড়ঘড় শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ও সবক’টা পা সোজা করে উঠে দাঁড়াল। এতটাই পা টানটান করল যে সাধারণত যা থাকে তার চেয়ে প্রায় এক ফুট লম্বা লাগছিল ওকে। ওর শরীরের নিচে, মাঝখান থেকে, সাদা ধাতব কিছু একটা নেমে আসছিল। আমার বুক ধ্বক করে উঠল, গিটারটা আঁকড়ে ধরে আমি পালাব কিনা ভাবছিলাম। এক্ষুণি ছুটে পালানো দরকার নয়? আমি এই রোবটকে বন্ধু করেছি, চিনেছি, বলা ভালো ভাবছি ওকে চিনেছি, কিন্তু সত্যি করে কি চিনি নাকি কৃত্রিম যন্ত্রটাকে? জানি নাকি, এ কেন এমনভাবে আমার কাছে আসে?

     ধাতব বস্তুটা আরো দ্রুত বেরোচ্ছিল, ওটার পেটের নিচে জড়ো হচ্ছিল। চোখ কুঁচকে দেখলাম, জিনিসটা সরু তারের মতো। তারপর আমার চোখের সামনেই, জোম্বিটা তিন পায়ের ভর দিয়ে উঠে, বাকি পাঁচ পা দিয়ে সেই তারের রাশি নিয়ে কী যেন বানাতে শুরু করল। পাগুলো ঝড়ের গতিতে সেই কারিকুরি করছিল, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কী তৈরি হচ্ছে। ঘাসের কুচো ছিটকে পড়ছিল এদিক ওদিক, ঘড়ঘড় আওয়াজটা আরো একটু জোর হচ্ছিল।

     অবশেষে পাগুলো থামল।ঝিঁঝি আর ব্যাঙের ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম, নারকেল আর লাল গরান গাছগুলোর পাতায় বাতাস চলার ঝিরিঝিরি শব্দ, আশপাশের কোনো বাড়িতে কাঁচকলা বা কচুভাজার তেলের গন্ধ ভেসে আসছিল।

     আমি একদৃষ্টে জোম্বির বানানো জিনিসটার দিকে চেয়ে ছিলাম। হাসছিলাম। মুখ ভরে, নিজে থেকেই হাসি ফুটে উঠেছিল দেখতে দেখতে। “এটা কী?” ফিসফিস করে বললাম।

     ও সামনের দু’হাতে জিনিসটা ধরে উঁচু করে তুলে ধরল, তারপর পিছনের একটা পা দু’বার মাটিতে ঠুকল। ওইভাবেই ও কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে, যদিও বেশির ভাগ সময়েই আমি বুঝতে পারি না কী বলছে।

     তারপর ও তিনহাতে তারগুলোয় ঝংকার দিতে শুরু করল। প্রথমে আমার সব প্রিয় গানের টুকরো টুকরো বাজতে শুনলাম, বব মার্লে থেকে সানি আডে থেকে কার্লোস সান্তানা… তারপর সুরটা এমন জটিল আর গভীর হয়ে গেল যে আনন্দে, বিস্ময়ে, উল্লাসে আমি কেঁদে ফেলতে বাধ্য হলাম। গ্রামের অন্য লোকেরাও নিশ্চয় সে সুর শুনতে পেয়েছিল, হয়তো দরজা বা জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতেও চেষ্টা করেছিল কে বাজায়। কিন্তু অন্ধকার, ঝোপ, গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে ছিলাম আমরা। আমি কান্না থামাতেই পারছিলাম না। কে জানে কেন। হু হু করে কেঁদেই যাচ্ছিলাম খালি।ওর কেমন লাগছিল আমার কান্না দেখে জানি না। বোধহয় খুশিই হয়েছিল।

     পরের এক ঘণ্টা ধরে আমি ওর কাছে এই সুরটা বাজাতে শিখলাম।

***

দশ দিন পরে, বদ্বীপের অনেক ভিতরের একটা পাইপলাইনে কিছু কর্মী আর সৈন্য একদম জোম্বির হাতে আক্রান্ত হল। দশজন লোককে তারা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেছিল, জলাভূমিটা জুড়ে সেইসব খণ্ড খণ্ড হাত পা ধড় মুণ্ডু পড়েছিল। যারা পালিয়ে বেঁচেছিল, তারা সাংবাদিকদের বলল ওই জোম্বিদের কেউ থামাতে পারবে না। একজন সৈন্য এমনকী একটা গ্রেনেড ছুড়েছিল একটার দিকে, জোম্বিরা পাইপলাইন এক্সপ্লোশনের সময়ে যে ফোর্স ফিল্ড তৈরি করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে তাই দিয়ে সেটা অনায়াসে গ্রেনেড বিস্ফোরণ এড়িয়ে গেছিল। সেই সৈন্যর ভাষায় একটা বজ্রগর্ভ বলয় ঘিরে নিয়েছিল সেটাকে।

     “ভয়ংকর! ওহ কী ভয়ংকর বিপজ্জনক!” সেই আতঙ্কিত সৈন্য বার বার বলছিল টিভিতে। মুখ কালিঝুলি মাখা, চোখের পাশে শিরা দপদপ করছে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। “শয়তান যন্ত্র ওগুলো! আমি জানতাম, শুরু থেকেই জানতাম। দেখো আমায়, গ্রেনেড দিয়েও কিস্যু করতে পারলাম না!”

     সে পাইপলাইনে লোকগুলো কাজ সবে শুরু করেছিল, পরে দেখা গেছিল সেটা পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে। জোম্বিদের শুধুমাত্র মেরামতি করার কৌশল প্রোগ্রাম করা হয়েছিল, নতুন পাইপলাইন জুড়ে তৈরি করার টেকনিক প্রোগ্রামে ছিল না। পুরো ব্যাপারটাই অবিশ্বাস্য। কাগজে লিখেছিল, জোম্বিরা নিজে নিজেই অনেক কিছু শিখে যাচ্ছে যা একদমই ভালো কথা নয়। কিছু কাগজ জোম্বিরা বিদ্রোহ করছে এরকম কথাও তুলছিল। সব মিলিয়ে, কিছু একটা গণ্ডগোল চলছিল।

     “দ্যাখো গে আর কিছুকাল পরে ওই বজ্জাত যন্ত্রগুলো আমাদের সবাইকেই মেরে ফেলবে।“ আমার বর বিয়ার হাতে কাগজ পড়তে পড়তে বলেছিল।

     আমি ঠিক করলাম আমার জোম্বির সঙ্গে আর দেখা করব না। এগুলোর কিছু ঠিক নেই, হয়তো বা লট কে লট পুরোই বিগড়ে যাচ্ছে।

***

মাঝরাত। আমি আবার পিছনের জমিতে বসে ছিলাম।

     আমার বর গত কয়েক সপ্তাহে আমার গায়ে আর হাত তোলেনি। মনে হয় আমার পরিবর্তনটা টের পেয়েছে। আমি পালটে গেছি। সে এখন আমায় গিটার বাজাতে শোনে, কিছু বলে না। এমনকী বাড়ির মধ্যেও বাজাই। ভোরবেলা। বা সন্ধ্যায় তার বন্ধুরা এলে, রান্নাবান্না সেরে শোয়ার ঘরে বসে। আর সে যে গানগুলো শুনছে আমি জানি সেগুলি তাকে আনন্দের অনুভূতি দিচ্ছে। এ এমন সব সুর, যার প্রতিটি স্বর যেন বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে, সবচেয়ে আনন্দ দেওয়ার মতো করে বাছাই করে বানানো হয়েছে।

     আমার জোম্বির জন্য আমার বিয়ের সমস্যাগুলো মিটতে বসেছে। অন্তত সবচেয়ে খারাপগুলো তো বটেই। যখন সুন্দর সুর মাথার মধ্যে ভালো লাগার অনুভূতি জাগিয়ে তুলছে, তখন লোকটার পক্ষে আমায় মারধর করা সম্ভব নয়। আমি আবার আশা করতে শুরু করেছিলাম— নিজের একটা বাচ্চা। এই বিরক্তিকর গৃহিণীর কর্তব্য ছেড়ে বাইরে বেরোতে পারার, প্রাইমারি স্কুলে মিউজিক টিচার হিসেবে যোগ দিতে পারার। আশা করছিলাম আমার গ্রামের লোকজনও যেন এই তৈলভাণ্ডারের বিশাল লাভের পর্যাপ্ত ভাগ পায়। আর রাত্রে আমার স্বপ্নে আসত গাঢ় নীল ধাতব আলিঙ্গন, তার দিয়ে বোনা সুরের জাল সেসব।

     সেই রাত্রে আমি এরকমই কিছু স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছিলাম। চোখের পাতা খুলেছিল মুখে হাসি নিয়ে। ভালো কিছু হতে চলেছে এবার। আমার বর পাশে অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। মৃদু চাঁদের আলোয় তাকে বেশ শান্তশিষ্ট দেখাচ্ছিল। মদের গন্ধ পাচ্ছিলাম না আর। সামনে ঝুঁকে তার ঠোঁটে একটা আলতো চুমু দিলাম। ঘুম না ভাঙিয়ে। বিছানা থেকে উঠে ফুলহাতা জামা-প্যান্ট গলিয়ে নিলাম। বাইরে মশা আছে। গিটার নিলাম।

     আমি আমার জোম্বির নাম দিয়েছিলাম ‘উদিদে ওকোয়াঙ্কা’। আমার ভাষায় তার মানে হল ‘শিল্পী মাকড়সা’। গল্প অনুযায়ী, উদিদে ওকোয়াঙ্কা হল সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী। সে মাটির নীচে থাকে, যে কোনও ছেঁড়াখোঁড়া টুকরো থেকে সে নতুন কিছু বানিয়ে দিতে পারে। এমনকী চাইলে একটা খড়ের কুচি থেকে বানিয়ে দিতে পারে নতুন কোনও আত্মা। আমার জোম্বির জন্য নামটা মানানসই ছিল। উদিদে আমার কি কিছু নাম রাখেনি? মনে হয় নিশ্চয়ই কিছু একটা রেখেছে। যদিও আর কাউকে আমার কথা বলেছে বলে মনে হয় না। বললে সম্ভবত ওকে আর এভাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে দেওয়া হত না।

     সে রাত্রে উদিদে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন জানত আমি বেরিয়ে আসব। মুখে মুচকি হাসলেও, ওকে দেখে আমার মন খুশি হয়ে উঠেছিল। ওর বাজনাটা ও মাথায় করে নিয়ে এসেছিল, তার দিয়ে বানানো জটিল নানা কোনার তারা একটা। এই ক’হপ্তায় ও আরও তার লাগিয়েছে বাজনাটায়। কিছু খুব সরু, কিছু অত সরু নয়। আমার প্রায়ই ভাবতাম, অন্য সময়ে এটাকে ও কোথায় লুকিয়ে রাখে, কারণ অত বড় জিনিসটা শরীরে লুকোনো সম্ভব ছিল না।

     উদিদে বাজনাটা সামনে ধরে বাজাতে শুরু করল। প্রথম কয়েকটা স্বরেই আমার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। আমার বাবা-মাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। কম বয়সের বাবা-মা। যখন তারা হতাশ, নিরুদ্যম হয়ে পড়েনি, যখন আমরাও ছোট ছিলাম, আমার বিয়ে হয়নি, বড়দা এই ‘দ্যাখ মার’ শুরু হবার পর তাদের হাতে মারা পড়েনি, ছোড়দা উত্তরের অজানা জায়গায় চলে যায়নি বাড়ি ছেড়ে… যখন সব কিছু আশাব্যঞ্জক মনে হতো।

     হেসে উঠে, চোখের জল মুছে নিয়ে আমিও সুর ধরলাম। শুরুতে ওর বাজনার সঙ্গে মিলিয়েই বাজাচ্ছিলাম। তারপর ক্রমশ সুর দুটো মিলেমিশে, সঙ্গত করতে করতে, পাল্লা দিতে দিতে এমন জায়গায় পৌঁছে গেল… উফ! মনে হচ্ছিল ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছি। ওই রোবটটা আর আমি, আহ্‌, বলে বোঝাতে পারব না।

     “এমি!”

     আমাদের সুরের ঘোর তক্ষুণি ভেঙে গেল।

     “এমি!” আমার বর আবার ডাকল।

     আমি কাঠ হয়ে গেছিলাম। উদিদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করতে পারলাম শুধু, “প্লিজ, ওকে মেরো না…”

     “স্যামুয়েল মেসেজ করল জানো”, উঁচু ঘাসের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে আমার বর বলছিল, তখনও তার চোখ ফোনের দিকেই আটকে।“স্কুলের কাছের পাইপলাইনে লিক হয়েছে, শয়তান জোম্বিগুলোর একটাও এখনো টের পায়নি মনে হচ্ছে। গিটার-ফিটার রেখে চলো আমার সঙ্গে, বালতি নিয়ে গিয়ে…” এইখানে মুখ তুলে তাকাতেই সে আতঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল।

     তিনজনেই, অনেকক্ষণ ধরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্থির হয়ে ছিলাম। আমার বর ঘাসজমি শুরু হবার একটু পরেই, উদিদে পাইপলাইনের সামনে, তার বাজনা দুহাতে ট্রফির মতো হাতে ধরে, আর আমি দু’জনের মাঝখানে। একটু নড়তেও ভয় করছিল। আমার বরের দিকে ফিরলাম শেষ পর্যন্ত, খুব সতর্কভাবে কথা বলতে শুরু করলাম, “অ্যান্ড্রু, আমাকে বলতে দাও…”

     আমার বর আমার দিকে চোখ ফেরাতে সময় নিল। এমন করে তাকিয়ে ছিল যেন জীবনে প্রথমবার আমাকে দেখছে। “আমার নিজের স্ত্রী!” শব্দগুলো হিসহিসিয়ে বেরোল।

     “আমি…”

     উদিদে ওর সামনের পা দুটো তুলল। একবারের জন্য মনে হল ও আমাকে কিছু অনুরোধ করছে, বা হয়তো জড়িয়ে ধরতে চাইছে। তারপরই ও জোরসে হাত দুটো তালি দিল, এত জোরে যে একটা লাল ঝলক বেরিয়ে এল ধাতব ঠোক্করে আর কানফাটানো একটা আওয়াজ উঠল “ঠং!”

     আমরা দু’হাতে কান চেপে ধরেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে দেশলাইপোড়া গন্ধে ভরে উঠেছিল চারদিকের বাতাস। কানে হাত চাপা দিয়েও, দূর থেকে ভেসে আসা অন্যান্য জোম্বিদের সাড়া শুনতে পাচ্ছিলাম। ঠং ঠং করে এত আওয়াজ হচ্ছিল যেন মুঠো মুঠো নুড়িপাথরের বৃষ্টি হচ্ছে পাইপের উপর। দেখলাম উদিদে একবার কেঁপে উঠল, তারপর হড়বড় করে পাইপের উপর উঠে দাঁড়াল, অপেক্ষায়। বেশিক্ষণ না, একদল এসে হাজির হল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। প্রায় কুড়িটা। প্রথম যেটা খেয়াল করলাম, তা হল এদের প্রত্যেকের চোখ লাল, টকটক রাগী লাল।

     এরা উদিদের চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল, জটিল ছন্দে পা ঠুকে কথা হচ্ছিল। আমি আর উদিদের চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। তারপর সবকটা ঝড়ের গতিতে ছুটে চলে গেল পুবদিকে।

     মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, আমার বরও কখন চলে গেছে।

     সবার কাছে সেলফোন থাকায় কথাটা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। জলদিই এরকম সব মেসেজ ছড়িয়ে পড়তে লাগল— “পাইপ ফেটেছে, স্কুলের কাছে! জোম্বিগুলোর পাত্তা নেই’’, “এক্ষুনি বালতি নিয়ে স্কুলের কাছে এসো” ইত্যাদি। আমার বর আমায় কখনওই সেলফোন রাখতে দেয়নি। খরচ হত বেশি। তাছাড়া সে মনে করত সেলফোনের কোনও প্রয়োজন নেই আমার। কিন্তু প্রাইমারি স্কুল কোথায় আমি চিনতাম।

     লোকে ধরেই নিচ্ছিল এবার যে জোম্বিরা পুরোপুরি বিগড়ে গেছে, গিয়ে তাদের ডিউটি সব ছেড়ে বদ্বীপের ভিতরে কোথাও জঙ্গলে চলে গেছে, তাদের যা ইচ্ছে ফুর্তিফার্তা করছে সেখানে। এমনিতে, লোকেরা চুরি করার জন্য পাইপে ফাটল ধরালে, সে যতই নিঃশব্দে সাবধানে হোক না কেন, এক ঘণ্টার মধ্যে জোম্বিরা ঠিক টের পেয়ে যেত। আর তার আরও এক ঘণ্টার মধ্যে মেরামতি শেষ হয়ে যেত। কিন্তু এই পাইপটা ভাঙার দু’ঘন্টা পরেও তাদের কোনও সাড়াশব্দ নেই দেখে লোকে অন্যদের ডাকাডাকি শুরু করেছিল।

     আমি কিন্তু অন্যরকম ভাবছিলাম। আমি জানতাম জোম্বিরা শুধু রোবট নয়, ওরা নিজেদের মতো ভাবনাচিন্তা করতে পারে। ওরা স্মার্ট। ওদের দুর্বোধ্য কাজের পিছনেও কিছু প্ল্যান থাকে। এবং ওদের বেশির ভাগই মানুষদের পছন্দ করে না।

     অগোছালো ভিড়টা পাশে এলোমেলো দাঁড় করানো গাড়ি-ট্রাকের আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম। পাইপলাইন এখানে খানিকটা উঁচু হয়ে দক্ষিণে যাচ্ছে। কেউ এই অংশের একটা গাঁট পুরোই খুলে দিয়েছে, ফলে দুদিকের খোলা মুখ দিয়ে বিরাট ঝর্ণার মতো লালচে ডিজেল বেরিয়ে আসছে।

     লোকে সেখানে হাতির দলের মতো গুঁতোগুঁতি করছে! জেরিক্যান, বোতল, বাটি, বালতি যে যা পারে এনেছে সঙ্গে। একজন তো একটা কালো জঞ্জালের ব্যাগ দিয়েই তেল ভরার চেষ্টা করছিল, সেটা ফুটো হয়ে গিয়ে সব তেল লোকটার বুকে পেটে পায়ে পড়ে গেল।

     উপচে পড়া তেল মাটিতে একটা ধারা তৈরি করেছিল, স্কুলের খেলার মাঠের মাঝে গিয়ে সেটা জড়ো হচ্ছিল। স্কুলের কাছাকাছি আসারও আগে আমার ধোঁয়াটে গন্ধ এসে নাক জ্বালা করছিল। নাক চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল এত ঝাঁঝালো গন্ধ। শার্ট তুলে নাকমুখ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করে দেখলাম, বিশেষ লাভ হল না।

     তখনো গাড়িতে, বাইকে, বাসে বা পায়ে হেঁটে আরো লোক আসছিল। তারা আবার তাদের ফোনে মেসেজ করে তাদের বন্ধুদের ডাকছিল। যারা সরাসরি তেল চুরির দলে নেই, তারা বহুকাল বাদে ফ্রি তেল পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

     বাচ্চারাও ছিল। দৌড়ে বেড়াচ্ছিল, বাবা মায়েরা পাঠিয়ে দিয়েছে তেল আনতে, বা এমনিই সঙ্গে এনেছে। এরা সম্ভবত জীবনে প্রথম এরকম মানুষদের পাইপের এত কাছে যেতে দেখল, মানে জোম্বিদের হাতে মারা না গিয়ে। হিপ-হপ বা হাইলাইফ গানের কলি ভেসে আসছিল গাড়িগুলোর সাউন্ড সিস্টেম থেকে। সেগুলোর গিটারের আওয়াজ এই তেলের ধোঁয়ার মতোই ঘন হয়ে উঠেছিল জায়গাটায়। জোম্বিরা যে এর সবই টের পাচ্ছে, এ নিয়ে আমার একটুও সন্দেহ ছিল না।

     আমার বরকে খুঁজে পেলাম। লাল বড় বালতিটা নিয়ে তেলের ঝর্ণার দিকে এগোচ্ছে। পাঁচটা লোক নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। তার মধ্যে দুজন মারামারি শুরু করল। ধাক্কাধাক্কি করে একজনকে তেলের মধ্যেই ঠেলে ফেলে দিচ্ছিল।

     “অ্যান্ড্রু!” অত আওয়াজের মধ্যেও গলা তুলে চেঁচালাম।

     ও ঘুরল। আমায় দেখে ওর ভুরু কুঁচকে গেল।

     “প্লিজ!” আমি তোতলাচ্ছিলাম, “আমি সরি!”

     ও মাটিতে থুতু ফেলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে থাকল।

     “এখান থেকে বেরিয়ে চলো!” আমি মরিয়া হয়ে বলে উঠলাম, “ওরা এসে পড়বে!”

     ও বোঁ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আচ্ছা? কেন, তুমি ওদের খবর দিয়ে ডেকে এনেছ নাকি?”

     অমনি, আচমকা, কথার জবাবের মতোই যেন, লোকজন চেঁচাতে চেঁচাতে হুড়মুড় করে ছুটোছুটি শুরু করল।ওহ্ না! জোম্বিরা এসে গেছে, তারা রাস্তার দিক থেকে এমন ভাবে তাড়া করে আসছে যে, লোকেরা মাঠে জমে থাকা তেলের পুকুরের দিকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ওহ! শয়তানের দল! আমার বর আগুন ঝরা চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে। আমার দিকে আঙুল তুলে কিছু বলল, আওয়াজের চোটে শুনতে পেলাম না। তারপর ঘুরে সেও দৌড়ে ভিড়ে মিশে গেল।

     আমি উদিদেকে খুঁজছিলাম ওদের দলে। সবক’টার চোখ এখনও টকটকে লাল। ও কি আদৌ আছে এদের মধ্যে? পাগুলো দেখার চেষ্টা করছিলাম যদি প্রজাপতি স্টিকারটা দেখতে পাই। এই তো, পেয়েছি! বাঁদিকে, আমার খুব কাছেই। হাসিমুখে ডাকি, “উদিদে!”

     নামটা আমার মুখ থেকে বেরোনো মাত্রই, দেখলাম সামনের দিকে মাঝামাঝি দু’জন জোম্বি তাদের সামনের দু’পা শূন্যে তুলে ধরল। আমার মুখের হাসি আতঙ্কে মুছে গেল, সটান মাটিতে শুয়ে পড়ে দুহাতে মাথা আড়াল করলাম। লোকে তখনও মাঠের তেলের মধ্যে দিয়ে স্কুলে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে। তাদের গাড়িগুলো থেকে এখনো হিপ-হপ আর হাইলাইফ মিউজিক ভেসে আসছে, হেডলাইটের আলো এসে পড়ছে এই ডামাডোলের উপর।

     জোম্বি দুটো জোরসে তালি দিল, দুটো বীভৎস জোরালো স্পার্ক খেলে গেল তাতে।

     টিং!

     হুশশশশশ্‌!

***

চোখ ধাঁধানো আলো, ঝলসানো তাপ, মানুষের চামড়া-চুল-মাংস পোড়ার গন্ধ, উদভ্রান্ত চীৎকার আস্তে আস্তে কমে এসে গা গুলোনো ঘড়ঘড়ানি— এগুলো মনে আছে আমার। আওয়াজ কমছিল, বিকট গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছিল। কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে, বহু বহুক্ষণ ওই নরকে আমি শুয়ে ছিলাম।

***

আমি আর কখনওই প্রাইমারি স্কুলে মিউজিক টিচার হতে পারব না। স্কুলটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, স্কুলের বাচ্চারাও সেই সঙ্গে। আমার বর-ও মারা গেছে। সে আমাকে স্পাই, ঘরশত্রু বিভীষণ এরকম কিছু একটা ভেবে নিয়েই মারা গেছে। সবাই-ই মারা গেছে। আমি বাদে। তেলের বিস্ফোরণটা হবার ঠিক আগে, উদিদে দৌড়ে এসে তার ফোর্স ফিল্ড দিয়ে আমাকে ঘিরে নিয়েছিল।

     তাই আমি বেঁচে আছি।

     আর, আমার পেটেরটাও বেঁচে আছে। উদিদের অলৌকিক মিউজিকের কল্যাণে, আমি শেষ অবধি গর্ভধারণ করতে পেরেছিলাম। উদিদে বলে নাকি মেয়ে হবে। রোবট কী করে জানে এসব কে জানে! আমরা দু’জন রোজ ওর জন্য বাজনা বাজাই, আমি টের পাই ছোট্টটা কী আরামে ঘুমিয়ে পড়ে সে গান শুনে। কিন্তু কেমন জগতে চোখ মেলবে সে, আমি জানি না। জোম্বি আর জোম্বিদের সৃষ্টিকর্তা মানুষদের মধ্যে একট সরাসরি যুদ্ধ বাঁধার বিপক্ষে সে তো শুধু পাবে তার মা আর উদিদেকে।

     আমাদের জন্য প্রার্থনা করো। যেন আমরা মানুষ আর রোবটদের একটা সন্ধিচুক্তিতে যেতে রাজি করাতে পারি। না হলে এই বদ্বীপ শুধু রক্ত, ধাতুর টুকরো আর ধোঁয়াতেই ভরে যাবে। আর হ্যাঁ, এটাও প্রার্থনা করো যে জোম্বিরা কোনওভাবে পাখা গজিয়ে, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তোমার দেশে এসে হাজির না হয়!

4 thoughts on “শিল্পী মাকড়সা

  • April 10, 2019 at 10:54 pm
    Permalink

    এই গল্পটার অনুবাদ করা যায়, এমনটাই জানতাম না। যদি যায়ও, তাহলেও সেটা এত স্বচ্ছন্দ, প্রাণবন্ত হবে, এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য ছিল।
    কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। শুধু ধন্যবাদ, আর আরও এমন কাজের দাবি জানিয়ে রাখলাম।

    Reply
  • April 11, 2019 at 8:03 am
    Permalink

    অপূর্ব।

    Reply
  • April 12, 2019 at 9:45 am
    Permalink

    অসামান্য অনুবাদ। এক নিঃশ্বাসে পড়া হয়ে যায়। অপূর্ব।

    Reply
  • April 12, 2019 at 11:57 am
    Permalink

    দারুণ লাগল। অনুবাদ বলে বিশ্বাস হয় না। গল্পটাও অসামান্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!