শূন্যকাননের ফুল

তৃষ্ণা বসাক

অলংকরণ:তৃষা আঢ্য

মারিওভা কফি জয়েন্ট

‘নতুন কফি জয়েন্টটায় গেছিলে কোনওদিন?’

     ‘কোনটা?’

     এরো-স্কুটিটাকে কায়দা করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখেছিল জারা। নোয়ার ঝুলবারান্দার ঠিক একতলে, একদম নোয়ার মুখোমুখি। কথা বলতে বলতে একটু ছুঁয়ে নিচ্ছে নোয়াকে। ওর চুল, গাল, ঠোঁট। এভাবে ছুঁতে ওর ভালো লাগছে। বিশেষ করে নোয়ার ঠোঁট ছুঁলে ওর শরীরের মধ্যে কী যেন একটা হচ্ছে। এরকম তো আগে কখনও হয়নি। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বেরনোর আগে মা পইপই করে বলে দেয়, ‘নিউট্রাল মোডটা অন করে নে জারা’।

     লক্ষ্মী মেয়ের মতো তা করেও জারা। কিন্তু ওর স্কুটি যখন বাড়ি ছাড়িয়ে অনেকখানি এগিয়ে যায়, তখন সে টুক করে গার্ল মোডে চলে যায়। মেয়ে, সে এখন একটা মেয়ে। অন্তত অফিস পৌঁছনোর আগের রাস্তাটুকু সে একটা মেয়ে হয়ে ফুরফুর করে উড়তে উড়তে চলে যায়। আবার অফিস পৌঁছে ব্যাক টু নিউট্রাল মোড। তখন যে যতই ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলুক বা অশোভন সংকেত পাঠাক, তার কিচ্ছু হবে না!

     আগে বেশ মজা লাগত তার। মনে হত, এটা তার স্বাধীনতা। কিন্তু আজকাল মনে হয় অফিস, কাছারি, স্কুলে কেন নিউট্রাল মোডে থাকার কথা বলা হয় তাদের? ছেলেদেরও বলা হয় অবশ্য। কিন্তু ছেলেরা শোনেই না ওসব। আর সত্যি বলতে কী, ছেলেদের এভাবে বলাও হয় না। না বাড়িতে, না বাইরে। আজকাল তো প্রতিটা ট্রাফিক সিগন্যালে, স্কাই-গ্রাফিতি বোর্ডগুলোয় পর্যন্ত লেখা ফুটে উঠছে –

     ‘গার্লস, প্লিজ সুইচ টু নিউট্রাল মোড

     গার্লস, প্লিজ সুইচ টু নিউট্রাল মোড’

     তারপর লম্বা পরিসংখ্যান আসতে শুরু করে। এই নিউট্রাল মোড, যাকে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে নিউট্রালাব্রিয়াম– আ স্টেপ টুওয়র্ডাস জেন্ডারলেস সোসাইটি, সেটা চালু হবার পর থেকে রেপ ভিক্টিম কত কমে গেছে, তার ডেটা। সব মিথ্যে কথা। জারা জানে। কমলে তার মা এত টেনশনে ভুগত না। শুধু তার মা নয়, আর্থেনিয়ার সব মায়েরা। আর্থেনিয়ার বয়স বেশি না, এখনও পাঁচশো হয়নি। একটা ছোট্ট গ্রহাণুকে সাজিয়ে নেওয়া হয়েছে বিকল্প বাসভূমি হিসেবে। কিন্তু পুরানো পৃথিবী, মানবসভ্যতা– সে তো হাজার হাজার বছরের পুরানো। সেখানে এখন ৩০৩০ সাল। আর্থেনিয়ায় সেই সময়ের হিসেবই রাখা হয়। কারণ প্রশাসনে তো সেই পুরানো পৃথিবীর স্থবির মানুষগুলোই। নতুন সময়ের হিসেব ওরা রাখতে পারে না।

     কিন্তু জারা, আর জারার মতন যারা আর্থেনিয়ায় জন্মেছে, তারা জানে এটা ৪৭৬ আর্থেনিয়ান ইয়ার। কিন্তু সে জানা কেবল কাগজে কলমে। তারাও পুরানোদের মতো অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই ৩০৩০-তে। তাই জারা এখন ভাবল, এই ৩০৩০ এও আর্থেনিয়ার মতো জায়গাতে রেপ হয়ে যাচ্ছে, ভাবা যায়! প্রশাসন, যাকে এখানে বলা হয় সেন্ট্রাল হাব, সংক্ষেপে সি.এইচ., শুধু বাণী দিয়ে ক্ষান্ত। নিউট্রালাব্রিয়াম! হুঁ অল বোগাস।

     জারার খেয়াল হল নোয়া তাকে অনেকক্ষণ আগে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিল।

     ও একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ও সরি, তুমি কিছু বলছিলে তাই না?’

     নোয়া ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক চোখে জারাকে দেখছিল। মেয়েটা খুব অদ্ভুত। আর্থেনিয়ায় এমন মেয়ে দেখা যাবে না একটাও। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই ও যেন কোথায় হারিয়ে যায়। আসলে মেয়েটা অনেককিছু নিয়ে ভাবে। সব বিষয়ে ওর একটা নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে। বছরখানেক হবে, নোয়া ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পড়েছে। এমন কোনও মানুষ চোখে পড়েনি, যে কোনও কিছু নিয়ে কিছু ভাবে বা নিজের মতামত এত জোরালোভাবে প্রকাশ করে। এই আর্থেনিয়ায় সবাই বাঁধা গতে চলে, বাঁধা পথে বাড়ি ফেরে। ওয়াল স্ক্রিনে মঙ্গল বনাম পৃথিবীর সুপার অ্যানিম বল দেখে। আর প্রতি রবিবার ভাবলেশহীনমুখে কমিউনিটি রিলিজিয়ন হলে গিয়ে বসে থাকে। তারা সেন্ট্রাল হাবের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানে, কোথাও অন্যায় হচ্ছে জেনে বুঝেও, চোখ বুজে সেখান থেকে সরে পড়ে, ভুলেও প্রতিবাদ করে না। আর এ মেয়েটা একেবারে আশ্চর্য! বাঁধা ছকের বাইরে যেতেই ওর যত উৎসাহ। আর সেভাবেই ও নোয়াকে আবিষ্কার করেছে একদিন। সেই দিনটা মনে পড়লে আজও শরীরটা শিরশির করে ওঠে। এই হ্যাঙ্গিং কমপ্লেক্স, লোকের মুখে মুখে যার নাম ঝুল কলোনি, তার পাশ দিয়ে অফিস যাওয়ার পথে একদিন জারা দেখল, ঝুল কলোনির একটা বাড়ির ঝুলবারান্দায় একটা ছেলে টবে ফুল ফোটাচ্ছে। ফুল ফোটা কীভাবে চোখের সামনে দেখা যায়? যায়। পৃথিবী এখন চাষবাসে নতুন করে উন্নতি করছে। বিশেষ করে ফুলচাষে। এক ঘণ্টায় ফোটা, দু-ঘণ্টায় ফোটা ফুল তো ছিলই, সম্প্রতি হইচই ফেলে দিয়েছে দু-মিনিটে ফোটা ফুল, যে ফুলের চারা মাটিতে পুঁতে জাস্ট টু মিনিটস্‌ বলার অপেক্ষা। এটা কানে এসেছিল, কিন্তু চোখে দেখেনি জারা। আজ সে চোখের সামনে দেখল একটা ছেলে বারান্দার টবে জাদুকরের মতো ফুল ফোটাচ্ছে। সে তার এরো স্কুটিটা স্ট্যাটিক মোডে নিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল কী অপূর্ব একটা ফুল, রংটা আগুন লাল, ফুটে উঠল আস্তে আস্তে। আগুন লাল বলল বটে, কিন্তু সত্যি সত্যি আগুন কখনও চোখে দেখেনি জারা। আর্থেনিয়ায় কোনও প্রাকৃতিক রং-ই নেই। থাকবে কী করে, কোনও প্রকৃতিই তো নেই সেখানে। সব তৈরি করা, বানানো। তার মানে কিন্তু নকল গাছপালা, পাহাড় বানিয়ে বসানো তা নয়, এসব ভার্চুয়ালি প্রজেক্ট করা, যাতে নদী, পাহাড়, বনজঙ্গলের একটা ইলিউশন তৈরি হয়। জারা যেমন ফেরার সময়, প্রায়ই একটু ঘুরে নদীর ধার হয়ে আসে। নদীর নাম বাঁশি। সেই নদীর সূর্যাস্ত দেখার জন্যে কত লোক আসে সেখানে। মেলার মতো ভিড় হয়। জারা জানে, নদীটা সত্যি নয়, ভার্চুয়াল। কিন্তু সূর্যটা সত্যি। পৃথিবী আর আর্থেনিয়া একই সোলার সিস্টেমের মধ্যে পড়ে। রোদ্দুরের রংটাই জারার দেখা একমাত্র প্রাকৃতিক রং। তবে রোদ্দুরের রং সবসময় একরকম থাকে না। এই ছেলেটা যে ফুল ফোটাল, তার রং সূর্যাস্তের রোদের রঙের মতো। জারা মুগ্ধ গলায় বলল, ‘আগুন লাল’।

     ছেলেটা চমকে তাকাল।

     ‘তুমি আগুন দেখেছ কখনও?’

     ‘না, ছবি দেখেছি। আর বাঁশি নদীতে সূর্যাস্তের সময় ঠিক এইরকম রং হয়।’

     ‘বাঁশি নদী? বাঃ! এইরকম নামের নদী আছে আর্থেনিয়ায়?’

     ‘তুমি এখানে নতুন এসেছ না? আচ্ছা, আমি তোমাকে সব ঘুরিয়ে দেখাব।’

     ‘এখানে আসার পর থেকে কেউ আমার সঙ্গে প্রথম যেচে কথা বলল। তুমি আমার নতুন দেশের প্রথম বন্ধু। এই ফুলটা তোমার।’

     জারা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তোমার হাতে ফোটা প্রথম ফুল আমাকে দিয়ে দিলে?’

     ‘একদিন এক বাগান ফুল ফুটিয়ে তোমাকে দেব। নেবে তুমি?’

     জারা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘কী ফুল এটা?’

     ‘গোলাপ। শুধু গোলাপ নয়, আজবনগরের গোলাপ।’

     ‘আজবনগর! তুমি বুঝি আজবনগর থেকে এসেছ?’

     উত্তর না দিয়ে একগাল হেসেছিল ছেলেটা, পরে জেনেছিল ওর নাম নোয়া।

     আজ নোয়ার ঝুলবারান্দার সামনে স্কুটিতে বসে সেই দিনটার কথা ভাবছিল জারা। নোয়ার কথায় সে বলল, ‘ও সরি, তোমাকে নিয়ে কফি জয়েন্টটায় যাব ভাবছিলাম। যাবে?’

     ‘শিওর। কবে? আমি তো বেকার মানুষ, তুমি সময় বার কর।’

     ‘দাঁড়াও’ জারা স্কুটির বাস্কেট থেকে তার কলভাষটা বার করতে গেল, আর অমনি টাল সামলাতে না পেরে পড়তে লাগল। পতনরোধক বেল্ট পরতে ভুলে গেছে যথারীতি, মা মনে না করিয়ে দিলে প্রায়ই পরা হয় না সেটা। তা ছাড়া তার তো ঝুল কলোনিতে আসার কথাই নয়। তাই সে পড়তেই থাকল, যার মানে সে আর্থেনিয়ার মাটিতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে যাবে মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু সেটা হল না। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যেই, ঝুল বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে তাকে ধরে নিল নোয়া, তার অন্য হাতে ছাতার মতো কী একটা। সেটার সাহায্যে তারা উঠে এল বারান্দায়। থরথর করে কাঁপতে থাকা জারাকে বুকে চেপে নোয়া বলল মৃদু বকুনি দিয়ে, ‘পাগলি মেয়ে! একটু খেয়াল করবে তো!’

     নোয়ার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে আস্তে আস্তে শরীর অবশ হয়ে আসছিল জারার। হঠাৎ বিপদ্ঘন্টির শব্দে সে চমকে উঠল, নোয়াও। কোনও বড় ধরনের বিপদ ঘটলে এইরকম ঘণ্টা বাজে। সঙ্গে সঙ্গে সামনের ট্রাফিক ওয়ালে ফুটে উঠল খবর।

     ‘আ গার্লস ডেডবডি ফাউন্ড বিসাইড মারিওভা কফি জয়েন্ট। শি ওয়াজ ব্রুটালি রেপড….’

     আর কিছু পড়তে পারল না জারা। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। তারপর শরীরে জেগে উঠল তীব্র ক্রোধ। নোয়া আস্তে আস্তে বলল, ‘ওই মারিওভাতেই যাওয়ার কথা হচ্ছিল না আমাদের?’

বাঁশি নদীর ধারে

মারিওভা কফি জয়েন্টের পাশে একটা ছোট্ট পার্ক মতো আছে। কয়েকটা রংবাহারি বেঞ্চ আর পলি-গন্ধা ফুলের ঝাড়। এই ফুলগুলো দিনের এক একটা সময় এক একরকম সুগন্ধ ছড়ায়। এগুলো ভার্চুয়াল নয়, ইন্সটলেশন। আর্থেনিয়ার সমস্ত পাবলিক প্লেসে পলি-গন্ধার ছড়াছড়ি। এ ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই। আসলে এই পার্কটা মারিওভারই একটা এক্সটেনশন। এখানে বাইরের উটকো লোক ঢুকতে পারে না। মারিওভার ভেতরে আসলে ফোন ধরতে দেওয়া হয় না। তাই কারও ফোন এলে বা ফোন করবার দরকার হলে এখানে বেরিয়ে আসে, একটা বেঞ্চিতে বসে কথা সেরে নেয়। শোনা যাচ্ছে, এই মেয়েটা, যার নাম ঠিকানা এখনও কিছুই জানা যায়নি, বা জানা গেলেও সেটা মিডিয়াকে বলা হয়নি, সে কাল অনেক রাতে মারিওভাতে এসেছিল। নিয়েছিল এক প্লেট অ্যাল্গিস্তা (অ্যালগি ছড়ানো পাস্তা, এটা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংঘাতিক জনপ্রিয়)। তারপর সে একটা কফির অর্ডার দেয়।

     ‘সাধারণ কফি, কফি শেক না ইনফিউশন?’

     ‘এমনি কফি।’

     পুলিশের ইন্টেরোগেশনের উত্তরে জানিয়েছে মেয়েটি, যে বছর তিনেক হল মারিওভায় ওয়েট্রেসের কাজ করছে। আর্থেনিয়ায় সেন্ট্রাল হাবের কয়েকটা লোক দেখানো ব্যাপার আছে। তারা প্রশাসনের স্বচ্ছতা প্রমাণ করবার জন্যে এই ধরনের ঘটনা ঘটলেই প্রাথমিক সব ইন্টেরোগেশন সরকারি চ্যানেলগুলোয় লাইভ সম্প্রচার করে থাকে। আর তা দেখানো হয় প্রতিটা সিগন্যালের পোস্টে। নিন্দুকেরা অবশ্য বলে ওরা কেবল অকিঞ্চিৎকর খবরটুকুই দেখায়। যেটা সত্যিকারের খবর, সেটা আড়ালেই থাকে।

     নোয়া আর জারা পার্কের রেলিং-এর ওপারে দাঁড়িয়ে সিগন্যাল পোস্টের খবরটাই দেখছিল। জারা জানে এই খবরটাই প্রতিদিন অজস্রবার দেখানো হবে, দেখতে দেখতে সবাই ক্লান্ত হয়ে যাবে, বিরক্ত হবে এবং একসময় ভুলেও যাবে। মেয়েটির মৃত্যুর কোনও কিনারা হবে না।

     পার্কের একেবারে দূরতম কোণে পড়ে আছে মেয়েটি। তার শরীর একটা সাদা-কালো কাপড়ে ঢাকা, কাপড়ের ওপর সি.এইচ.-র লোগো। এই লোগোটা দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে। তবু আজ গা রিরি করে উঠল জারার। সব কিছুতে নিজেদের জাহির করতে হবে? মৃতদেহ ঢাকার কাপড়েও?

     জারা নোয়ার হাত ধরে টানল, ‘চলো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব মিথ্যে খবর দেখে কী হবে? ’

     ‘ও হ্যাঁ, তুমি তো অফিসে যাবে আবার।’

     ‘না যাব না ভাবছি, ইচ্ছে করছে না, মনটা ভার হয়ে আছে। আজ কোনও কাজে মন দিতে পারব না।’

     নোয়া হেসে বলল, ‘তাহলে আমার কাজটা কত ভালো বল? মন ভালো থাকলেও ফুল ফোটাতে ভালো লাগে আর মন খারাপ হলে তো কথাই নেই।’

     জারার মুখ ঝলমল করে উঠল, ‘দারুণ বলেছ! ভাবছি আজই চাকরিতে রিজাইন করে তোমার সঙ্গে ফুল ফোটানোর কাজ করব। ভালো হবে না?’

     নোয়া খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল ‘সত্যি আসবে আমার সঙ্গে? এটা প্রফেশনালি করা গেলে কিন্তু দারুণ ভবিষ্যৎ। আমি খুব ভালো করে খোঁজ নিয়েছি আর্থেনিয়ায় আমার মতো কেউ ফুল ফোটায় না। ইতিমধ্যেই কিন্তু অনেকে আমার কাছে এ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে, কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি সাজানোর জন্যে কিনেও নিয়ে গেছে। মুশকিল হচ্ছে, আমি ফুল ফোটাতে পারি কিন্তু বেচতে জানি না। কী দাম ফেলব, টার্গেট মার্কেট কোনটা, প্রমোশন কীভাবে করব, এ ব্যাপারে কেউ সাহায্য করলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে যাবে। এখন তুমি ছাড়া এখানে কাউকে তো চিনিই না, তা ছাড়া তোমাকে প্রথম দিন দেখেই আমার খুব কাছের নিজের লোক বলে মনে হয়। আজবনগরে ঠিক তোমার মতো একজন…’

     এই পর্যন্ত বলে হঠাৎ যেভাবে থেমে গেল নোয়া, তাতে জারার মনে হল পেছনে ও এমন অনেক কিছু ফেলে এসেছে, যা ওকে এখনও কাঁদায়। সেই জীবনের কিছুই জানে না জারা। একেবারে না জেনে শুনে বাঁধা চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিতের দিকে ঝুঁকবে?

     নোয়া যেন ওর মনের কথা পড়তে পেরেছে, সেইভাবেই বলল ‘অবশ্য সেটা সম্পূর্ণ তোমার সিদ্ধান্ত। তুমি তো আমাকে চেনই না। কেনই বা আমার জন্য চাকরি ছাড়বে?’

     জারা হেসে ফেলল। ‘আরে অত ভারিভারি কথা ভাবার দরকার নেই। আপাতত আজ আমি ছুটি নিয়ে নিলাম। চলো নদীর ধারে গিয়ে বসি। মাথাটা ছাড়ানো দরকার। যাবে?’

     নোয়া উত্তর না দিয়ে জারার এরো-স্কুটিতে গিয়ে বসল। এই মেয়েটার সঙ্গে থাকলে এত ভালো লাগে কেন কে জানে! কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল বাঁশি নদীর ধারে। এখন অফিস টাইম বলেই বোধহয় বেশি ভিড় নেই। ওরা একটা গাছের ছায়াতে গিয়ে বসল। গাছ, নদী সবই নকল, তবু জায়গাটা বেশ লাগে জারার।

     নোয়া হেসে বলল ‘গাছটা সত্যি নয়, কিন্তু ছায়াটা সত্যি। মজার ব্যাপার তাই না?’

     জারা বলল ‘দুনিয়া বলে একটা শব্দ আছে জান তো? আগে দুনিয়া বলতে শুধু পৃথিবীটাই বোঝাত। এখন দুনিয়া অনেক বড়। গ্রহে গ্রহে নতুন বাসভূমি, তা ছাড়া আমাদের আর্থেনিয়ার মতো কত গ্রহাণু। সব জায়গাতেই কিন্তু এই ব্যাপারটা পাবে।’

     নোয়া ধরতে পারল না কথাটা। ‘এই ব্যাপারটা মানে?’

     ‘মানে, গাছ নেই, তবু ছায়া আছে। আসলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব শুধু আমাদের মনেই থাকে। মনে করলে আছে, না করলে নেই। যে যত মনে করতে পারবে, সে তত ধনী।’

     নোয়া অবাক হয়ে বলল, ‘এ রকম কথা তো আমাদের আজবনগরে চলে। তুমি জানলে কী করে?’

     জারা খুব নরম করে নোয়ার হাতে হাত রাখল, ‘কি করে জানলাম? সে এক লম্বা গল্প। মার কাছে এরকম গল্প অনেক শুনেছি। মার কাছে একটা জিনিস আছে। একটা পুরানো ডায়েরি। আমাকে দেখতে দেয় না কোনওদিন। কেন কে জানে! তবে আমিও জেদ ধরে আছি। দেখবই ওটা। তোমাকে দেখাব একদিন। আজ নয়। আজ শুধু বাঁশি নদীর ধারে নোয়া আর জারা। ব্যস আর কিচ্ছু না।’

     নোয়া হাত টেনে নিল না, ওরও ভালো লাগছিল খুব। নদীর বুকে আলোর নাচ দেখতে দেখতে ও বলল, ‘কিছু কিছু জিনিস আছে, যা না দেখাই ভালো। একটু কম জানলে জীবনটা সুন্দর হয়।’

     জারা অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কে ফুল ফোটাচ্ছে? কে?

ঘরটা খুব বড় নয়। কিন্তু বড় দেখায়। কারণ কোনও আসবাব নেই বললেই চলে। এটা সি.এইচ.-এর কমিটি রুম। কিন্তু কমিটি রুম বলতে যে ছবি ভেসে ওঠে, গোল বা ওভাল টেবিল, দেওয়াল জোড়া ক্যাবিনেটে সারি সারি ফাইল, একপাশে টেবিলে কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার নিয়ে সুন্দরী সেক্রেটারি– সেসব কিছুই এখানে নেই। বদলে দেওয়াল জোড়া স্ক্রিন, যেটা আসলে মেন সার্ভার। সেই সার্ভারের সামনে তিনটে নোডে তিনজন বসে আছে। চেহারায় স্পষ্ট টেনশন। কারণ সার্ভারে ভেসে উঠেছে চিফের আইকন। চিফ এই তিনজনের সঙ্গে গ্রুপ টেক্সটিং করবেন। এভাবেই আর্থেনিয়ার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। যে তিনজন বসে আছে, তারা আর্থেনিয়ার পাঁচটি সবচেয়ে হেভি ওয়েট দপ্তরের প্রধান।

     –রিও রাবাইতো, এঁরা চার প্রজন্ম আগে পৃথিবী থেকে এসেছেন, দেখেন বহিঃগ্রহপুঞ্জ ও প্রতিরক্ষা।

     –মধু ম্যানহাটান, সাইবর্গ, দেখেন দুটি দপ্তর– নেটওয়ার্কিং ও জেন্ডার।

     –পদ্মাসনা আয়েঙ্গার, হিউম্যানয়েড। ইনি মাত্র এক প্রজন্ম আগে পৃথিবী থেকে এসেছেন, দেখেন পুলিশ ও প্রশাসন।

     চিফের কাছে এবং সাধারণ মানুষের কাছেও এঁদের পরিচয়, নোড ওয়ান, নোড টু, নোড থ্রি। খুব কম লোকই এঁদের নাম জানে বা চেহারার সঙ্গে পরিচিত।

                                                        

     সেন্ট্রাল হাব বা সি.এইচ.-এর যাবতীয় জনসংযোগ করে থাকেন মিকি টকিহাউস নামে একজন মহিলা। ইনি একজন হিউম্যানয়েড। আর্থেনিয়ায় নয়, এঁকে পৃথিবীর একটি সংস্থা বানিয়ে অনেক টাকায় আর্থেনিয়ার কাছে বিক্রি করেছে। এঁর কেনাবেচায় নাকি ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে বিরোধীরা প্রায়ই হইচই করে থাকে। বিষয়টি মিকি কেলেংকারি বা মিকিংকারি নামে বিখ্যাত। তাতে অবশ্য মিকির কোনও হেলদোল নেই। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিনি অক্লান্তভাবে স্পেস মিট থেকে চ্যানেল ডিসকাশন, পথসভা থেকে হাই-ফাই সেমিনার– ঝোলে ঝালে অম্বলে অকাতরে কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে চলেন। তাঁর দায়িত্ব ইমেজ বিল্ডিংয়ের, কিন্তু নিন্দুকেরা বলে মিকি যতই কথা বলেন, সি.এইচ.র ইমেজ ততই ধ্বসে যায়। কেউ কেউ বলে মিকিকে দেখলেই নাকি তাদের গায়ে চাকা চাকা অ্যালার্জি বেরিয়ে যায়। মিকির কানে সেসব যায় বলে মনে হয় না। তিনি অনর্গল কথা বলে যান, তাই তাঁর ল্যাব-দত্ত নামের সঙ্গে এই টকিহাউস পদবী জুড়ে গেছে। এমনিতে এদের কোনও পদবী হয় না, একটা কোড নাম্বার থাকে শুধু।

     আর চিফের নাম ধাম কেউই জানে না। এমনকি নোড ওয়ান, নোড টু, নোড থ্রি কেউই না। সারাদিন চ্যানেলে চ্যানেলে মিকির গুণকীর্তন করে বেড়ানো মিকিও না। চিফের গলার আওয়াজও কেউ কখনও শোনেনি। সম্ভবত গলার স্বর কাউকে জানতে দিতে চায় না বলেই, সমস্ত মিটিং হয় নেট টেক্সটিং করে, যেখানে প্রত্যেককে লিখে লিখে নিজের মতামত পেশ করতে হয়। মতামত শব্দটা অবশ্য একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। কারণ কে না জানে, আর্থেনিয়ার সেন্ট্রাল হাবে কারও কোনও নিজস্ব মতামত দেবার স্বাধীনতা তো দূরের কথা, মতামত দেবার ক্ষমতা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ এও বলে যে চিফ টিফ বলে আসলে কেউ নেই। অন্ধকার জালটা সরালে দেখা যাবে সব ফাঁকা, কেউ কোথাও নেই, বহু বছর ধরে, হয়তো আর্থেনিয়ার জন্মলগ্ন থেকেই একটা প্রোগ্রাম সেট করা আছে, এবং কী কী সিচুয়েশন আসতে পারে সেসব ইনপুট ফিড করাই আছে, সেই ভাবেই প্রোগ্রাম কাজ করে যাচ্ছে। তার মানে কিছুই বদলায়নি, চিফ একই আছে, নতুন মুখ, নতুন রক্ত টক্ত সব বাজে কথা, একটা প্রোগ্রামই কাজ করে যাচ্ছে, কাজ করেও যাবে বছরের পর বছর ধরে, হয়তো আর্থেনিয়া ধ্বংস হওয়া অব্দি।

     বারবার আমি সমর্থন করলাম, আমি সমর্থন করলাম লিখতে লিখতে হাত ব্যথা করছিল রিও রামাইতোর। তিনি একবার আড়চোখে মধু ম্যানহাটান আর পদ্মাসনা আয়েঙ্গারের দিকে তাকালেন। পদ্মাসনা খাঁটি যন্ত্রমানব, কিন্তু মধু, ও তো মানুষই, শরীরে যতই একগাদা চিপস বসানো থাক, রক্ত তো মানুষেরই, চিফের এই নির্দেশগুলোয় ঘাড় গুঁজে ডিটো দিতে দিতে ওর সেই রক্ত গরম হয়ে উঠছে না? আর বিষয়টি তো এলেবেলে নয়। আর্থেনিয়ার রাজধানী, খাস ওলালা শহরের বুকে একটি মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড, যেখানে অষ্টপ্রহর নজরদারি ক্যামেরা থাকার কথা। ফুটেজ চাইলে বলা হয়েছে, ওইসময় নাকি ক্যামেরাটি মেরামতি চলছিল, কোনও ছবিই তোলা হয়নি।

     চিফের আইকন ফুটে উঠলে তিনজন নড়েচড়ে বসল। তিনজন মানে রিও রাবাইতো, মধু ম্যানহাটান আর পদ্মাসনা আয়েঙ্গার।

     পর্দায় ফুটে উঠল,

     –শুভ দিন

     ওমনি তিনজন মরি বাঁচি করে লিখল,

     –শুভ দিন চিফ

     –শুভ দিন চিফ

     –শুভ দিন চিফ

     তখন আবার চিফের ডায়লগ বক্সে লেখা ফুটল,

     –কীসের শুভ দিন? একটা মেয়ে শহরের খাস জায়গায় এভাবে ধর্ষিতা হল, আর আপনারা বলছেন শুভ দিন? অপদার্থের দল সব! খুব অশুভ দিন, আর্থেনিয়ার ইতিহাসে এটা একটা কালো দিন।

     বিমূঢভাবে তিনজনে লেখে, কিছুটা শ্লথ ভঙ্গি এবার,

     –অশুভ দিন চিফ। আর্থেনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কালো দিন।

     এটা লেখার সময় তিনজনের মনেই উঁকি মেরে গেল, শহরের কেন্দ্রে আগে না হলেও, রেপ অনেকদিন ধরেই আর্থেনিয়ায় জলভাত। তার জন্যেই ট্রাফিক মোড়ে মোড়ে এত প্রচার, স্কাই গ্রাফিতি বোর্ডে এত প্রোপাগান্ডা, তারপর ওই নিউট্রালাব্রিয়াম, সোনার পাথরবাটির মতো ব্যাপার। নিউট্রালাব্রিয়াম ঘিরে মানুষের মনে যে পরিমাণ ক্ষোভ জমা হয়েছে তা বিলক্ষণ জানেন এই তিনজন। কিন্তু চিফকে সেসব বলা যাবে না। বললে শুধু চাকরি চলে যাবে তাই নয়, আর্থেনিয়া থেকে ভিটেছাড়া হতে হবে।

     মধু আর রিও পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, পদ্মাসনা এদের তিনজনের মধ্যে অনেকটা সুস্থির, হয়তো আয়েঙ্গার পদবীর সঙ্গে সঙ্গে তামিল স্থৈর্জও বহন করছে শরীরে, সে দেখা গেল একমনে চিফের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করছে। তা ছাড়া পুলিশ প্রশাসন দেখে বলে এই ঘটনায় তার দায়িত্ব আর টেনশন দুটোই বাকি দুজনের থেকে বেশি।

     চিফ এবার যা লিখলেন তাতে সবারই পিলে চমকে গেল (যদিও পিলে নেই, তবু ওই আর কি!)।

     এ কী লিখেছেন চিফ? ধাঁধা না হেঁয়ালি?

     ‘যে জন শূন্যে ফোটায় ফুল,

     তাকে চিনতে কোর না ভুল

     দোষী সে-ই জন

     শীঘ্র করো অন্বেষণ।’

     ভালো করে পড়ার আগেই চুঁ চুঁ চুঁক করে শব্দ হল, পরদা অন্ধকার। বোঝা গেল চিফ বিদায় নিয়েছেন, আজকের মতো কনফারেন্সিং শেষ। ঢক ঢক করে জল খেলেন মধু। রিও বললেন ‘আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না আমাদের চিফ একজন কবি।’

     ‘আরে ইতিহাস পড়ে দেখ, সব দেশের সব কালের অটোক্র্যাটরাই কবি।’

     ওমনি তর্ক জমে উঠল মধু আর রিওর। শুধু পদ্মাসনা কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, ‘আর্থেনিয়ায় ফুল ফোটাচ্ছে! কে?’

ইচ্ছাময়ীর ডায়েরি

ডায়েরিটা অনেক কষ্টে পাওয়া গেছে। জারা মাকে লুকিয়ে বার করেছে আলমারি থেকে। মার জামা কাপড়ের নিচে লুকনো ছিল। আর পড়ছে। এত পুরানো ভাষা, তারপর কাগজে হাতের লেখা, ভালো বুঝতে পারছে না, তবু ছাড়তেও পারছে না। কী এক অমোঘ আকর্ষণে পড়ে চলেছে।

     এটা মায়ের কোনও এক ঊর্ধ্বতন মাতামহীর ডায়েরি। মানে মার মার মার মা… ডায়েরিতে সাল তারিখ কিছু নেই। আর মাকে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না, কারণ এটা মা ভীষণ লুকিয়ে রেখেছে। তবে জারা এটুকু আন্দাজ করতে পারে ডায়েরিটার বয়স পাঁচশ বছরের কম নয়। যিনি লিখছেন তাঁর নাম ইচ্ছাময়ী। সে সময় মানে ২৫৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে মেয়েদের এমন নাম হত না, সেটা জানে জারা। তাই মনে হয় এটা তাঁর ছদ্মনাম। ডায়েরির শুরুতেই ইচ্ছাময়ী জানাচ্ছেন ডায়েরি লেখা পৃথিবী থেকে প্রায় উঠেই গেছে। তার প্রধান কারণ কাগজের দারুণ অভাব, তা ছাড়া নিজের অনুভবগুলো এভাবে গোপন রাখার মানসিকতা এখনকার মানুষের প্রায় নেই। সবাই সব কিছু সকলকে জানাতে চায়। কিন্তু তাঁর এসব ভালো লাগে না। তা ছাড়া তাঁর জীবনে এমন কিছু কথা আছে, যা একমাত্র ডায়েরিকেই বলা যায়।

     ডায়েরি থেকে জারা জানতে পারছে ইচ্ছাময়ী ছিলেন একজন স্বনির্ভর নারী, নিজের ভরণপোষণ তো বটেই, এমনকী সন্তান ধারণের জন্যেও তিনি কোনও পুরুষের ওপর নির্ভর করেননি। তখন অবশ্য এমনটাই চল ছিল। প্রচুর সংখ্যক মেয়ে এবং ছেলেও বিয়ে না করে সিংগল পেরেন্ট হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদিও পরের শতকে এসে এই চিন্তাধারা আর অত আধুনিক ছিল না। কারণ আধুনিকের সংজ্ঞাটাই তো পালটে গিয়েছিল, আধুনিকতা মানে হুজুগে গা ভাসানো নয়, যেটা করে নিজে কমফর্টেবল থাকা যায় সেটাই আধুনিকতা। গবেষণা দেখিয়েছিল সিংগল পেরেন্টদের বাচ্চাদের মধ্যে ক্রাইসিস বেশি। তো যাই হোক, ইচ্ছাময়ী যে যুগের মানুষ সে সময় সিংগল পেরেন্টিংই ক্রেজ, সেই হাওয়ায় গা ভাসিয়ে ইচ্ছাময়ীও পুরুষসঙ্গীহীন পরিবারের দিকে ঝুঁকলেন, তিনি আর তাঁর মেয়ে– ছোট্ট সংসার। তিনি কাজে যান, মেয়েটি স্কুলে, বাকি সময়টা নানান চাইল্ড কেয়ার অ্যাপ মেয়ের দেখভাল করে।

     বেশ চলছিল। হঠাৎ ইচ্ছাময়ীর শখ জাগল বাড়িতে এক টুকরো ফুলের বাগান করবেন, তাঁর ছোট্ট মেয়ে ডাহুক, বাগানে খেলে বেড়াচ্ছে এই ছবিটা তাঁর চোখের সামনে ভাসতে লাগল। কিন্তু পৃথিবীতে মাটির বড় আকাল। মাটি ছাড়া, জল ছাড়া ফুল ফোটানোর নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছে বটে, কিন্তু তা এখনও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আসেনি। খুব বড়লোক ছাড়া বাড়িতে কেউ ফুল ফোটাতে পারে না। তবু শখ বলে কথা। ইচ্ছাময়ী টাকার মায়া না করে, শহরের সবচেয়ে নামকরা মালীর দোকানে যোগাযোগ করলেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যে সেখান থেকে এসে হাজির হল যে যুবকটি, তাকে দেখে জীবনে প্রথমবার বুক কাঁপল ইচ্ছাময়ীর। জেনেটিক্যালি নিখুঁত অপূর্ব সুন্দর নারী-পুরুষ বানাবার এখন একটা প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু তাদের বুকে একটা ব্যাজ লাগানো থাকে জি.এম. অর্থাৎ জেনেটিকালি ম্যানুফ্যাকচার্ড। একে দেখে বোঝা যাচ্ছে, এ তা নয়। কোনও স্বাভাবিক মানুষ এত সুন্দর হতে পারে? বিস্ময়ের ঘোর কাটে না ইচ্ছাময়ীর। ডায়েরির ছত্রে ছত্রে সেই বিস্ময়, মুগ্ধতা আর উচ্ছ্বাস। সঙ্গে বেদনার সুরও গোপন থাকে না। কারণ ইচ্ছাময়ী উচ্চশিক্ষিত, ভালো চাকরি করেন, আর এই ছেলেটা, যতই গবেষণা করে ফুল ফোটাক, লোকে তো মালীই বলবে শেষ অব্দি। তা ছাড়া ইচ্ছাময়ীর প্রতিজ্ঞার কী হবে? পুরুষ ছাড়াই একটা জীবন কাটিয়ে দেবার সঙ্কল্প? তবু দমকা হাওয়ায় যেমন শুখনো পাতা উড়ে যায়, তেমনি উড়ে গেল ইচ্ছাময়ীর সব সঙ্কল্প। ডায়েরিতে তিনি লিখলেন, পরের দিন রবিবার। জিয়ান (হ্যাঁ ছেলেটার নাম ওটাই) বাড়িতে আসবে। কাজ শেষ হয়ে গেছে, পাওনা নিতে। আর তখনি তিনি ওকে মনের কথা খুলে বলবেন। ওর ফোটানো ফুল দিয়েই ওকে প্রেম নিবেদন করবেন। পরদিন ভোরে উঠে সোজা বাগানে চলে যান। বাগান থেকে বেছে বেছে হলুদ আর লাল ফুল তুলে তোড়া বাঁধেন। তোড়াটিকে সযত্নে সরিয়ে রাখেন মেয়ের দৃষ্টির আড়ালে। মেয়ে ডাহুক, যদিও খুব ছোট, কিন্তু ইচ্ছাময়ী চান না ও এখনি কিছু জানুক। ব্রেকফাস্ট সেরে ডাহুককে রুট স্কুলে ছাড়তে যান। সভ্যতা যত এগিয়েছে, তত দেখা গেছে পৃথিবীটা একরকম হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীর লোক এক খাবার খায়, এক জামা পরে, একরকম গান শোনে, এক সিনেমা দেখে, প্রায় এক ভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চারা যেসব স্কুলে পড়ে। সেখানে এসব শেখানো হয় না। তাই সারা পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়েছে রুট স্কুল মুভমেন্ট, রবিবার রবিবার এই স্কুল বসে, যেখানে নাচ, গান, নাটকের মধ্যে দিয়ে সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে বাচ্চাদের পরিচয় ঘটানো হয়। ডাহুক রবিবার করে এমন একটা স্কুলে যায়। সেখানে পৌঁছে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসেন ইচ্ছাময়ী। অনেকক্ষণ ধরে স্নান করেন। আয়নায় দেখেন নিজেকে। সোনালি গম রঙা মসৃণ ত্বক, সুগোল স্তন, নাভির ঘূর্ণি, সোনালি বদ্বীপ-– কোনও পুরুষের স্পর্শ পায়নি আজও। জিয়ানের মতো কারও অপেক্ষা ছিল হয়তো।

     স্নান সেরে হলুদ আর পার্পল মেশা অফ শোল্ডার ফ্রক পরেন, সারা গায়ে ছড়িয়ে দেন সুগন্ধি। এই সুগন্ধিটা রুট স্কুল থেকে কেনা, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে ভেজা মাটি যে সুগন্ধ ছড়ায়, এটা অবিকল সেইরকম।

     গেট খোলাই ছিল। জিয়ান কখন ঢুকে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারেননি। হঠাৎ গায়ের কাছে ফুল আর পৌরুষের মাখামাখি সৌরভে চমকে উঠে ইচ্ছাময়ী দেখলেন জিয়ান এসেছে। তাঁর যে কী হল হঠাৎ!

     ডায়েরিতে লিখছেন–

     ‘কী যে হল আমার এত কাছে জিয়ানকে পেয়ে। আমি ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠোঁটে অবিশ্রান্ত চুমু খেতে লাগলাম, ওর হাতটা আমার বুকে টেনে চেপে ধরলাম আর বলে চললাম, ‘লাভ ইউ বেবি। টেক মি, টেক মি।’

     জিয়ান প্রথমে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল, মনে হচ্ছিল আমার আদরে গলে যাচ্ছে। কিন্তু দ্রুত সে নিজেকে সামলে নিল, আর আমাকে হতচকিত করে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল।

     ‘বলল, ছি ম্যাডাম। কী করছেন? এরকম করলে আপনার নামে রিপোর্ট করতে বাধ্য হব। আমি এখানে কাজ করতে এসেছি। তা ছাড়া আমি এনগেজড। আমার গার্লফ্রেন্ডের নাম শিরিশ। আমি আর ও দুজনে মিলে এই ফুলের বুটিকটা চালাই।

     সোফার হাতাটা চেপে আমি নিজেকে সামলাচ্ছিলাম। প্রথমে আমার নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল খুব, তারপর সেই রাগটা গিয়ে পড়ল জিয়ানের ওপর। কোথায় আমি, কোথায় শিরিশ। ফুলের দোকানের ওই পুঁচকে মেয়েটা আমাকে হারিয়ে দেবে! আমি সহ্য করতে পারছিলাম না আমার এই পরাজয়। আমি ওদের শেষ করে দেব। তখুনি আমার মাথায় চিড়িক করে উঠল একটা চিন্তা। জিয়ানকে বললাম ‘আই আম রিয়েলি সরি জিয়ান’ ওকে টাকা মিটিয়ে বিদায় করে আমি, লিখতে লজ্জা হচ্ছে, আমার ফ্রকটা টেনে টেনে ছিঁড়লাম, বুকের কাছে নিজের নখ দিয়ে আঁচড়ের গভীর দাগ তৈরি করলাম, তারপর, ওম্যান সেলে ফোন করে বললাম, আমাকে রেপের চেষ্টা করা হয়েছে, করেছে ‘সে ইট উইথ ফ্লাওয়ার’ বুটিকের জিয়ান।

     আমি যা চেয়েছিলাম তাই হল, জিয়ানের চার বছরের জেল হল। শিরিশ ওকে ছেড়ে চলে গেল, ফুলের বুটিকটা উঠে গেল। কিন্তু আমি সুখী হতে পারলাম কই? জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জিয়ান কোথায় গেছে জানার জন্য কী না করেছি। খুঁজে পাইনি। মেয়ে বড় হয়ে নিজের মতো থাকে। আমি একা। হঠাৎ এত বছর পর এক বন্ধুর কাছে খবর পেলাম, জিয়ান এখন আজবনগরে নতুন নতুন ফুল ফোটানোর চেষ্টা করছে। আজবনগর কোথায় আমি জানি না। শুধু জানি, সেখানে আমায় যেতে হবে, যত শিগগির সম্ভব।

     এর পর ডায়েরিতে আর কোনও এন্ট্রি নেই। জারা ডায়েরিটা কোলে নিয়ে চুপ করে বসে থাকে। নোয়া কী যেন বলেছিল ফুলটার নাম, আজবনগরের গোলাপ!

তারে ধরি ধরি মনে করি

প্রশংসায় ভাসছে সেন্ট্রাল হাব। এত সুখের দিন ইদানীং কালে আর এসেছে কিনা সন্দেহ। পদ্মাসনা আয়েঙ্গার যেহেতু পুলিশ প্রশাসন দেখেন, তাই তিনি স্বাভাবিকভাবেই পুরো কৃতিত্ব দাবী করেছিলেন, কিন্তু মিকি টকিহাউস তাঁকে প্রায় ফেড আউট করে দিয়ে সবটাই চিফের পাদপদ্মে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। চ্যানেলে চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে তেমনটাই তিনি বলে বেড়াচ্ছেন।

     ‘যে জন শূন্যে ফোটায় ফুল,

     তাকে চিনতে কোর না ভুল

     দোষী সে-ই জন

     শীঘ্র করো অন্বেষণ।’

     চিফের এই চার লাইনের ছড়া বা কবিতা বা কড়া বা ছবিতা বা যাচ্ছেতাই যাই বলা যাক– চ্যানেলে চ্যানেলে, সিগন্যাল পোস্টে, স্কাইবোর্ডে সর্বত্র ছড়িয়ে গিয়েছে, কে একজন সুরও দিয়ে ফেলেছে, আর রাস্তাঘাটে লোকজনকে গাইতেও শোনা যাচ্ছে সেটা গুনগুন করে। তাতে একটু মনক্ষুণ্ণ হলেও নিরাশ হবার কারণ নেই পদ্মাসনার। কারণ সেন্ট্রাল হাবে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে পদ্মাসনার প্রোমোশনের খবর। সামনের মাসেই পদ্মাসনা হয়ে উঠবেন নেক্সট টু চিফ। সেটা ভাবলেই ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠছেন পদ্মাসনা। খুশির তরঙ্গ তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে তাঁর শরীর, থুড়ি সিস্টেমে। পোস্টটা পেলেই মিকির চাকরি খাবেন তিনি। একেবারে খেতে পারবেন না, তবে ওঁর জন্যে পানিশমেন্ট পোস্টিং ভেবে রেখেছেন তিনি। মিকিকে তিনি পৃথিবীতে আর্থেনিয়ার দূত করে পাঠাবেন। দেখ, শহর ছেড়ে অজ পাড়া গাঁয়ে গিয়ে থাকতে কেমন লাগে!

     নিজের ঘরে সোফায় আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছিলেন পদ্মাসনা। ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। ঝুল কলোনি থেকে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওর নাম নোয়া। এসেছে পৃথিবীর কী একটা জায়গা, ও হ্যাঁ আজবনগর থেকে। শূন্যে ফুল ফোটাবেন উনি। যাও বাছা, এবার ফুল ভুলে হুলের জ্বালা টের পাও। আর্থেনিয়ার জেলখানা একটা অদ্ভুত জায়গা। এখানে ফাঁসি বা শূলে চড়ানো বা মারধোর– এসব কিছু করা হয় না। শুধু মাথার স্মৃতির অংশটুকু চেঁছে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। লোকে যেমন চুল বা নখ কেটে ফেলে সেইভাবে। চুল বা নখ আবার গজায়, কিন্তু পুরানো স্মৃতি আর গজায় না। স্মৃতিছাঁটা মানুষকে যখন জেল থেকে বার করে দেওয়া হয় তখন সে না নিজেকে চিনতে পারে, না চিনতে পারে তার ছেড়ে যাওয়া পাড়া, শহর, লোকজন, অফিস। সে একটা ‘কিচ্ছু না’ হয়ে যায়। সমাজে সংসারে তার কোনও অস্তিত্ব থাকে না। সে তখন তার পুরানো কাজেও ফিরতে পারে না, নতুন করে কিছু শুরুও করতে পারে না। যেভাবে বেঁচে থাকে তা মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।

     ভাবতেই আনন্দে আটখানা হয়ে উঠলেন পদ্মাসনা। আহ, ছেলেটা স্মৃতি হারিয়ে ফিরবে, ওর ফুল ফোটানোর কথা আর মনেই থাকবে না। কী আনন্দ! একটা মেয়েকে রেপ করার শাস্তি এটাই। ছেলেটার মুখ চোখে কিন্তু অপরাধবোধ নেই কোনও, বরং খানিকটা কৌতূক আর খানিকটা বিস্ময় খেলা করছে সেখানে। দেখে খুশি ভাবটা কেটে গেল পদ্মাসনার। যাকে শাস্তি দেওয়া হল, সে যদি একটুও না দমে, একটুও না ঘাবড়ায়, তবে আর শাস্তি দেবার মজাটা কোথায়? পদ্মাসনার মনটা কেমন খুঁতখুঁত করতে লাগল। শাস্তিটা যথেষ্ট কড়া হল না। আরও কঠিন, আরও ভয়ংকর কিছু ভাবতে হবে। যদিও তিনি পুলিশ প্রশাসন দেখেন, তবু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। সেটা ঠিক কার হাতে আছে, তাও জানেন না তিনি। চিফ যা বলেন তার অন্ধ অনুসরণ করা ছাড়া কোনও উপায় নেই তাঁর বা বাকিদের। এই প্রথম আর্থেনিয়ার সব কিছুর ওপর খেপে উঠলেন পদ্মাসনা। সব কিছুই লোক দেখানো মনে হল তাঁর। স্মৃতি মুছে দেওয়া, ছোঃ! এটা কোনও শাস্তি হল! ফাঁসি কিংবা কুকুর দিয়ে খাওয়ানো, কিংবা উলটো গাধার পিঠে চড়িয়ে দেশ থেকে বার করে দেওয়া– পৃথিবীতে কী চমৎকার সব শাস্তি ছিল। আর এখানে যত্ত সব ন্যাকামো। কিছু হলেই হইচই পড়ে যাবে আর্থেনিয়ান রাইটস লঙ্ঘিত হচ্ছে! ভাগ্যিস এই ছেলেটা আর্থেনিয়ান নয়, একজন উদ্বাস্তু। আর একেবারে একলা উদ্বাস্তু, যার জন্যে গলা ফাটাবার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

     পদ্মাসনা মনের আনন্দে পাশের টেবিলে রাখা বাটি থেকে একমুঠো কাঁঠালের চিপস তুলে কুড়মুড় করে চিবোতে লাগলেন। হিউম্যানয়েড যদিও, কিন্তু ইনি মাত্র এক প্রজন্ম আগে পৃথিবী থেকে এসেছেন, আর তার আগের প্রজন্ম তো মানুষ। অর্থাৎ মানুষের ঔরসে ও বীর্জে না হোক, মানুষের উদ্যোগেই ল্যাবে জন্ম তাঁর। আর তাঁর সেই পূর্ব মানুষেরা ছিলেন তামিল, তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি যেমন পদবী আয়েঙ্গার ব্যবহার করেন, তেমনি সুযোগ পেলেই তামিল খাবার খান। আর্থেনিয়ায় এসব খাবার জোগাড় করা খুব শক্ত, এগুলো আসে পৃথিবী থেকে। নিন্দুকেরা বলে পদ্মাসনাকে এক প্যাকেট কাঁঠালের চিপস দিলেই অনেক অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আর্থেনিয়ায় নাগরিকত্ব পেয়ে যায়। কথাটা খুব মিথ্যে না। এই চিপসের প্যাকেটটা দিয়েছে পৃথিবীরই একজন। সে এখানে ইলিশ মাছের ব্যবসা করতে চায়। ব্যাপারটা খুব সন্দেহজনক মনে হয়েছিল পদ্মাসনার। কারণ ইলিশ মাছ তো পৃথিবী থেকে কবেই হারিয়ে গেছে, যা নেই তার ব্যবসা হবে কেমন করে? তাহলে মানুষ থেকে যেমন হিউম্যানয়েড, তেমনি ইলিশ থেকে কি হিলশয়েড বানিয়ে ফেলল পৃথিবীর মানুষেরা? আর সেই হিলশয়েড আর্থেনিয়ানদের খাওয়াতে চাইছে লোকটা? মাথা গরম হয়ে গেছিল শুনে। রেগে কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই লোকটা ঝোলা থেকে বের করল এক বাক্স ইডলি, উত্তপম আর কয়েক প্যাকেট কাঁঠালের চিপস। ব্যস। সব পাস হয়ে গেল।

     কিন্তু কাঁঠালের চিপসও শান্ত করতে পারল না পদ্মাসনাকে। নিমপাতা মুখ করে তিনি টিভি দেখতে লাগলেন। ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওলালার পুলিশ। দড়ির ওপারে কৌতূহলী মুখের ভিড়। যেমন হয়। রেপ কেস আর উদ্বাস্তু অপরাধী বলে ভিড় একটু বেশি। হঠাৎ সেই ভিড় থেকে দড়ি টপকে ছেলেটির কাছে চলে এল একটি মেয়ে, পুলিশ বাধা দেবার আগেই জড়িয়ে ধরল ছেলেটাকে। যদিও এক মুহূর্তের জন্যে, কিন্তু সেটাকেই অনন্তকাল মনে হল পদ্মাসনার। ওই এক মুহূর্তেই যেন ওদের মধ্যে এমন সংকেত চালাচালি হয়ে গেল যা আর্থেনিয়াকে ধসিয়ে দিতে পারে। তারপরে যা ঘটল, তাতে হাড় হিম হয়ে গেল তাঁর। ক্যামেরার দিকে মুখ ফিরিয়ে মেয়েটি বলল, ‘চোখে যা দেখছেন তা একদম বিশ্বাস করবেন না। আসল অপরাধীকে আড়াল করতে নোয়াকে ফাঁসানো হয়েছে। সত্যিটা আমি খুঁজে বার করবই। নোয়া, আর্থেনিয়ার জেল তোমাকে আটকে রাখতে পারবে না, আই প্রমিস।’

জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসো রাজা

‘তুই কেন এসবের মধ্যে যাচ্ছিস জারা? তোকে ওরা শেষ করে দেবে। আমার কথা শোন। তুই এটা থেকে বেরিয়ে আয়।’

     জারা ব্যালকনিতে বসে ছিল, হাতে কফির কাপ। মা-ই দিয়ে গেছে একটু আগে। আর চুমুক দিতে দিতেই এসে হাজির হয়েছে জ্ঞান দিতে। জম্পেশ করে কাপটা দুহাতে ধরে সকালটাকে উপভোগ করছিল সে। মার কথায় কফিটা তেতো লাগল তার। বাকিটা এক চুমুকে শেষ করে মার দিকে চাইল জারা। কেটে কেটে বলল ‘আমাকে একরকম করে বাঁচতে শিখিয়ে এখন আবার অন্য কথা বলছ কেন মা? আমার পক্ষে অন্য রকম হওয়া সম্ভব কি আর? তুমিই বল।’

     মা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে ব্যালকনির অন্য মোড়াটা টেনে বসল। মার বসার ভঙ্গি দেখে মনে হল অনেক কিছু বলবে, মানে অনেক সময় লাগবে বলতে। জারা কয়েকদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে বটে, তা বলে তো ওর হাতে প্রচুর সময় আছে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। একটু পরেই ব্রেকফাস্ট সেরে ও বেরোবে। আর্থেনিয়ায় পৃথিবীর মতো আইন আদালত কিছু নেই। ওতে নাকি সময় নষ্ট ছাড়া কিছু হয় না। সেন্ট্রাল হাব যদি কাউকে অপরাধী মনে করে, সোজা তাকে ধরে জেলে পুরে দেবে, আর তার শাস্তি হিসেবে রয়েছে ফার্স্ট ডিগ্রি মেমরিপ, সেকেন্ড ডিগ্রি মেমরিপ, থার্ড ডিগ্রি মেমরিপ। মেমরিপ আর কিছুই নয়, মেমরি বা স্মৃতিকে চেঁছে তুলে দেওয়া। কতটা তোলা হচ্ছে, তার ওপর ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড ডিগ্রি। আইন আদালত নেই, তবে একটা নাম কা ওয়াস্তে জাস্টিস সেল আছে, আসামীর আত্মীয় বন্ধুরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি সিটিং হবে। পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি আর সমাজের কয়েকজন বিশিষ্টজনকে নিয়ে। যদিও সবাই বলে পাপেট মিটিং, তবু প্রাথমিকভাবে সেখানেই কমপ্লেন লজ করবে জারা। তাতে একটা সুবিধে হচ্ছে, যতদিন না জাস্টিস সেলের ফাইনাল মিটিং-এ ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি হচ্ছে, ততদিন নোয়াকে কোনও শাস্তি দেওয়া যাবে না। আর এই সময়ে জারা তার প্ল্যান অব অ্যাকশন সাজিয়ে নিতে পারবে।

     জারার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল মার একটা কথায়। মা হঠাৎ বলল ‘জারা, আমরা সামনে যা দেখি, সবসময় তা সত্যি নয়। আড়ালে হয়তো অন্যকিছু।’ শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল জারার। সে বলল, ‘শোন মা, আমি লোক চিনি। নোয়া খুব ভালো ছেলে। ও এ কাজ করতেই পারে না। ওকে ফাঁসানো হয়েছে।’

     ‘আমি তা বলিনি জারা। আমি বলছি যে রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেস নিয়ে এত তোলপাড়, সেটা কি আদৌ সত্যি? মারিওভা কফি জয়েন্টের ওয়েট্রেসের সাক্ষ্য ছাড়া কি প্রমাণ আছে বলতো? আর মারিওভায় মিকি টকিহাউসের শেয়ার রয়েছে এ কথা ভুললে চলবে না’

     উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল জারা।

     ‘তার মানে বলতে চাইছ পুরো ব্যাপারটাই সাজানো? কিন্তু আমি যে নিজের চোখে দেখলাম বডিটা পড়ে আছে।’

     ‘দেখেছিস, কিন্তু আর্থেনিয়ার সি.এইচ. লোগো দেওয়া কাপড়ে পুরো ঢাকা, ওর মধ্যে সাপ ব্যাং কী আছে কে বলতে পারে?’

     ‘কিন্তু মা, যে রেপ নিয়ে আর্থেনিয়ায় এত ঢাকঢোল, সেই রেপকে এভাবে ইউজ করতে চাইছে রাষ্ট্র? এ তো ঘৃণ্য ব্যাপার।’

     ‘শোন জারা, পৃথিবীতে একজন কবি ছিলেন সেকালে, রবি ঠাকুর নাম, তিনি এক জায়গায় লিখছেন—‘সিংহ সনে নখ দন্তে নহে কো সমান / তাই বলে ধনুঃশরে বধি তার প্রাণ কোন নর লজ্জা পায়?’

     জারা এক বিন্দুও বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

     ‘মানে!’

     ‘মানে কিছু পাওয়ার জন্যে যে কোনও উপায় অবলম্বন করা। রাষ্ট্র একটা কিছু পেতে চাইছে, তার জন্যে ওরা যে কোনও পথ ব্যবহার করবে, সেখানে ন্যায়নীতির কোনও জায়গাই নেই।’

     ‘বুঝলাম। কিন্তু লক্ষ্যটা কী?’

     ‘আপাতত মনে হচ্ছে বাইরের লোককে খেদানো। আরও কিছু থাকতে পারে, এখনি বুঝতে পারছি না।’

     হঠাৎ একটা কী মনে পড়ে গেল জারার। জানো মা, নোয়া কোথা থেকে এসেছে?’

     ‘পৃথিবী, আবার কোথায়? ‘

     ‘পৃথিবী তো অনেক বড় মা। নোয়া এসেছে আজবনগর থেকে।’

     এটা বলে ফেলেই জিভ কাটল জারা। মা বুঝে যাবে ইচ্ছাময়ীর ডায়েরিটা ও পড়েছে। মা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল, জারাও হেসে ফেলল, ধরা পড়ে যাওয়ার হাসি।

     বকুনি দেবার বদলে মা বলল, ‘আচ্ছা, আজবনগর, ফুল ফোটানো, ইচ্ছাময়ীর ডায়েরির সঙ্গে কী অদ্ভুত মিল তাই না?’

     ‘আমিও কদিন ধরে তাই ভাবছিলাম মা। তুমি আমাকে ছোটবেলায় বলতে যে মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে।’

     ‘এখানে যোগসূত্রটা কী বলতো? ফুল’

     ‘ফুল!’ অবাক গলায় বলে জারা।

     ‘হ্যাঁ। কেউ বা কারা চায় না আর্থেনিয়ায় ফুল ফুটুক। হোক শূন্যে, তবু ফুল তো। ফুল তাদের কাছে একটা থ্রেট, বিপদ।’

     ‘কী বলছ মা, ফুল কেন থ্রেট হতে যাবে? একটা সুন্দর জিনিস।’

     ‘একটু তলিয়ে ভাব। আর্থেনিয়ায় এর আগে কেউ কখনও ফুল ফোটায়নি। ফুল নিয়ে মানুষের চিন্তা অবদমিত ছিল। কিন্তু এখন আর থাকবে না। অনেকেই তো ইতিমধ্যে নোয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কেউ কেউ ফুল কিনে এনে ঘর সাজাবে, কিন্তু বেশিরভাগ লোকই চাইবে নিজের বাগান তৈরি করতে। নিজের বাগানে ফুল ফুটতে দেখার আনন্দই আলাদা।’

     ‘তাতে কী হল?’

     ‘তাতে এই হল যে, আর্থেনিয়ার লোকগুলোকে যেভাবে সেন্ট্রাল হাব বেঁধে রেখেছে, তা আর থাকবে না। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ইচ্ছে নিয়ে চলবে, সেন্ট্রাল হাবের শাসন আর খাটবে না।’

     ‘বাব্বা! ফুল থেকে এত! সামান্য ফুলের এত শক্তি!’

     ‘ফুল সামান্য নয় জারা। যারা ফুল ফোটায় তারা যেমন সামান্য নয়, আবার যারা ফুল ফোটাতে বাধা দেয়, তারাও।’

     জারার দেরি হয়ে যাচ্ছিল, সে উঠে চট করে একটা বাইরের ওভারঅল পরে নেয়, আজ আর মা তাকে নিউট্রাল মোড অন করার কথা বলে না। তবে অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি বেল্টটা পরার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটা পরতে পরতে চোখে জল এল জারার। মনে পড়ে গেল কীভাবে নোয়া তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এই বেল্টটা পরা না থাকায় সে পা ফসকে মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছিল। নোয়ার সেই স্পর্শ, তার ফোটানো ফুলের মতোই সে ভুলবে না কোনওদিন। কে সে লোক, যে চায় না আর্থেনিয়ায় ফুল ফুটুক?

     এরো স্কুটিতে স্টার্ট দিতে দিতে সে পেছন ফিরে মাকে জিগ্যেস করল, ‘মা, এমন কাউকে দেখেছ যে ফুল ভালোবাসে না?’

     ‘শুধু ভালোবাসে না নয়, রীতিমতো ভয় পায়।’

     ‘কে?’

     ‘সেন্ট্রাল হাবের চিফ।’

     ‘চিফ একজন রিয়েল! সত্যি মা? সবাই যে বলে চিফ বলে কেউ নেই। ওটা একটা প্রোগ্রাম।’

     জারার মা বিড়বিড় করে, ‘চিফ আছে। আমার থেকে বেশি কেউ জানে না সে কথা। আর আমি চাই না জারা তুমি চিফের ত্রিসীমানায় যাও।’

     মা কী বলছে জারা শুনতে পায় না। তার মাথায় শুধু ঘুরতে থাকে চিফ বলে একজন সত্যি সত্যি আছে!

গোপন বৈঠক

আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সি. এইচ.-এর কোর কমিটির। এমন বৈঠক তো কতই হয়, কিন্তু আজ এটা একটু অন্যরকমের বৈঠক। আজ এখানে জাস্টিস সেলে আসা কতিপয় অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হবে। তবে মিটিং এ আসা সবাই জানে সেটা আই ওয়াশ ছাড়া কিছু নয়। আসলে তো হবে সাম্প্রতিক হইচই ফেলে দেওয়া মারিওভা কফি জয়েন্টের রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেস নিয়ে। এখানে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কে অপরাধী। তার অপরাধ আরও মারাত্মক কারণ সে বাইরের লোক। পৃথিবী থেকে এখানে ফুল বেচতে এসে যে এরকম একটা ঘৃণ্য কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে, তার দুঃসাহস সত্যি অবাক করার মতো। তার চেয়েও বিস্ময়কর হল এই আর্থেনিয়ায় এমন ঘৃণ্য কাজেরও সমর্থক রয়েছে। আর, আরও পরিতাপের কথা, সে একজন মেয়ে! একজন মেয়ে হয়ে মেয়ের ওপর নৃশংস অত্যাচারীর প্রতি সমবেদনা! জাস্ট ভাবা যায় না। বৈঠক শুরুর আগেই সেই নিয়ে কফির কাপে তুফান তুলছিলেন কোর কমিটির সদস্যরা।

     রিও রাবাইতো কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘এ তো রাষ্ট্রদ্রোহিতা! চিফকে বলতে হবে এখুনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মেয়েটাকে…’

     কথার খেই হারিয়ে ফেললেন রিও। কোন শাস্তি দিলে যে ঠিক হয়, তিনি ভেবে উঠতে পারলেন না।

     মধু বললেন, ‘আমি তো ভাবছি জেন্ডার ইস্যুতে ওকে ফাঁসাব।’

     রিও তালে তাল দিয়ে বললেন, ‘প্রতিরক্ষাতেও যদি কিছু করা যায়?’

     মধু ওমনি বলেন, ‘দূর! আমাদের আইনে বড়সড় বদল দরকার। আজ এখানে একজন আইনের লোক থাকলে ভালো হত। তাই না পদ্মাসনা?’

     পদ্মাসনা এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিলেন। এবার তিনি খেপে গিয়ে বললেন, ‘অল বকওয়াশ। যা ইচ্ছে বললেই হল? রাষ্ট্রদ্রোহ, জেন্ডার, প্রতিরক্ষা! আমাদের মনে রাখতে হবে, মেয়েটা আর্থেনিয়ার নাগরিক। এবং খুবই উজ্জ্বল কেরিয়ার তার। তরুণ মহলে সে খুবই জনপ্রিয়। আসল অপরাধীকে ছেড়ে আপনারা এখন মেয়েটাকে নিয়ে পড়লেন! মাথায় একটা কথা খুব পরিষ্কারভাবে ঢুকিয়ে নিন। মেয়েটাকে এখনি কিছু করা যাবে না। অন্তত জনসমক্ষে। তাতে পাবলিক আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। মেয়েটার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু…’

     এই অব্দি বলে নিজেই খেই হারিয়ে ফেললেন পদ্মাসনা। তাঁর কি যেন একটা মনে পড়ে গেছে। আসলে আজ সকালটা বড় এলোমেলোভাবে শুরু হয়েছে। সকালে উঠেই কোর কমিটির সবাইকে গুড মরনিং উইশ পাঠান চিফ। ঘুম চোখে সেটা দেখতে গিয়ে চমকে উঠেছেন আজ পদ্মাসনা। সুপ্রভাতের পরে চিফ আলাদা করে লিখেছেন– মারিওভা কেসে সব ফোকাস যেন ফুলওয়ালার ওপর থাকে, তার পাশে কে দাঁড়াল না-দাঁড়াল সেই নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই। মেসেজটা পেয়ে অবাকই হয়েছিলেন পদ্মাসনা। যে কোনও প্রতিবাদ অংকুরে বিনষ্ট করার মধ্যে দিয়েই আর্থেনিয়া এগিয়ে চলেছে এতদিন ধরে। এক চিফ থেকে আরেক চিফ, মুখ বদলেছে, বদলায়নি অবদমনের ধরন। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এতবড় প্রতিবাদকে দেখেও না-দেখার ভান করতে বলছেন চিফ? নাকি এটা তাঁর কোনও চাল? মেয়েটির কপালে নাচছে আরও ভয়ংকর কোনও শাস্তি?

     সক্কালবেলা এই মেসেজটা পেয়ে ইস্তক মেজাজটা এত খিঁচড়ে আছে যে কফির সঙ্গে রোজ যে কাঁঠালের চিপস না খেলে দিনটা ভালো করে শুরুই হয় না, সেই চিপসও মুখে রোচেনি আজ। কোনওরকমে দুটো ইডলি গিলে অফিসে চলে এসেছেন। আগেকার দিনে মিটিং মানে ছিল সঙ্গে ভালো-মন্দ খাওয়া, সেন্ট্রাল হাবে সে সব সিন নেই। শুকনো মুখে মিটিং কর। তাও যদি মিটিংটাও ঠিকঠাক হত। নিজের মতপ্রকাশ, যুক্তিতর্ক কিছুর বালাই নেই। শুধু ঘাড় গুঁজে চিফের নির্দেশ মেনে নাও। এমনিতেই পদ্মাসনার মেজাজ খাট্টা, তার ওপর রিও আর মধুর আগডুম বাগডুম বকবকানির চোটে মাথা খারাপ হবার জোগাড়। পদ্মাসনা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘যে যার নোডে গিয়ে বসে পড়ুন। এখুনি মিটিং শুরু হবে।’

     মিটিং শুরুর আগে আর্থেনিয়ার জাতীয় সঙ্গীত বাজে –

     ‘আমার বুকের রক্ত দিয়া,

     বাঁচাব এই আর্থেনিয়া

     চুলোয় যাক বাকি দুনিয়া।’

     আর কোনও পদ নেই, এই তিন লাইনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে হয়। গান চলাকালীন উঠে দাঁড়াতে হয়, হাতটা বুকের বাঁদিকে রেখে, কলোনিয়াল হ্যাং ওভার এর মতো এ হচ্ছে পৃথিবীর হ্যাং ওভার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত লাগে পদ্মাসনার। প্রতিবার জাতীয় সঙ্গীত বাজলেই বেজায় মাথা গরম হয়ে যায়। কোন হতচ্ছাড়া যে লিখেছিল এর লিরিক। শালা, জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি রোবট, তারা বুকের রক্ত দিয়ে আর্থেনিয়াকে বাঁচাবে? রক্ত আর আই. সি. (ইন্টিগ্রেটেড চিপস) দিয়ে লেখা যেত না? পদ্মাসনা এর থেকে ভালো লিখতেন নিঃসন্দেহে। হাজার হোক, তাঁর সুদূর পূর্বজরা রীতিমতো গানের চর্চা করতেন। ত্যাগরাজের ভজন ভেসে বেড়াত বাতাসে বাতাসে। তাই সুর-ছন্দ-তাল-জ্ঞান তাঁর খারাপ নয়।

     জাতীয় সঙ্গীত শুনতে শুনতে পদ্মাসনা মনে মনে নিজস্ব একটা জাতীয় সঙ্গীত তৈরির মধ্যে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে তিনি খেয়ালই করেন না, জাতীয় সঙ্গীত কখন শেষ হয়ে গেছে আর তাঁর নোডে চিফের আইকনের বদলে ভেসে উঠেছে মিকি টকিহাউসের ছবি। আর তাই দেখে চোখ কপালে উঠেছে মধু ম্যানহাটান আর রিও রাবাইতোর। রিও আর থাকতে না পেরে বলেন, ‘দেখুন দেখুন পদ্মাসনা, মিটিং শুরুর আগে মিকি এসে হাজির। এমন তো কখনও হয়নি।’

     পদ্মাসনার ঘোর কেটে যায়। তিনি চমকে উঠে দেখেন সত্যি তো, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এর আগে মিকি কেন? এমন তো সত্যি আগে কখন হয়নি। সকালবেলায় চিফের ওইরকম একটা মেসেজ, তারপর আবার এখন মিকি, কী সব হচ্ছে? দেশটা উচ্ছন্নে গেল দেখছি। মিকির ছবি বড় হতে হতে স্ক্রিন ঢেকে ফেলে। ঠোঁট নড়ে সে ছবির। পদ্মাসনা শোনেন মিকি বলছে, ‘অনিবার্য কারণে আজকের মতো মিটিং স্থগিত রাখা হল। রাতে টেক্সট করে চিফ পরবর্তী নির্দেশ জানিয়ে দেবেন।’ চুঁ চুঁ চুঁই। লহমায় মিলিয়ে গেল মিকির মুখ। স্ক্রিন একদম ল্যাপা পোঁছা। হতভম্ব মুখে ওঁরা বেরিয়ে আসেন কমিটি রুম থেকে। মধু আর রিও পাবে ছোটেন। ওদের ভয়ানক তেষ্টা পেয়ে গেছে। পদ্মাসনা ভাবেন কী করবেন এখন। বাড়ি যাবেন একবার? নাকি অফিসে গিয়ে জমা কাজ সারবেন? ঠিক সেই মুহুর্তে একটা দৃশ্য দেখে তাঁর পা দুটো মাটিতে গেঁথে যায়। উলটোদিকের কনফিডেনশিয়াল রুম থেকে পার্পল ওভার অল পরা এক দীর্ঘাঙ্গী বেরিয়ে আসছেন শান্ত পায়ে। খুব চেনা চেনা লাগে মহিলাকে। তাঁর সামনে দিয়ে চলে যাবার পর প্রায় চেঁচিয়ে ওঠেন পদ্মাসনা। আরে! জাস্টিস সেলে নালিশ করতে আসা মেয়েটির ভিডিও তাঁর কাছে এসেছে। এই মহিলা ছিলেন মেয়েটির সঙ্গে। ইনি কি তাহলে জারার মা? কিন্তু ইনি এখানে কেন? চিফের সঙ্গে কী কথা তাঁর গোপনে?

ফুল ফোটে, তাই বলো!

‘যদি আমরা কয়েক বছর ধরে আর্থেনিয়ার সমস্ত মিডিয়ার ফোকাস লক্ষ্য করি তবে দেখব বারবার দুটো ইস্যু উঠে আসছে– এক তো রেপ, অন্যটা উদ্বাস্তু। এই দুটো সমস্যাই সি. এইচ.-এর গলার কাঁটা হয়ে আছে।’

     জারাদের ব্যালকনিটা খুবই ছোট, আর আজ সেখানে চার-চারজন লোক বসায় আরও ছোট দেখাচ্ছে। তবু বিকেলটা ভালো লাগছে বড্ড। পাশের মোড়াতে নোয়া বসে আছে যে।

     কফিতে চুমুক দিয়ে মা আবার বলতে শুরু করে, ‘প্রথমটা দিয়ে শুরু করি। রেপ দিনদিন বাড়ছে, এমনকি রোবটরাও রেপ করছে, মেয়েদের নিরাপত্তা প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই সমস্যার সমাধান করতে পারেননি আর্থেনিয়ার সি. এইচ.। উলটে তারা সোনার পাথরবাটির মতো একটা পলিসি আনলেন, যার নাম নিউটালাব্রিয়াম। প্রত্যেকটা মেয়েকে বলা হল বাড়ি থেকে বেরনোর সময় নিউট্রাল মোড অন করে বেরতে হবে। একটা প্যানিক ছড়িয়ে দেওয়া হল, আমরা মায়েরা মেয়েদের বাড়ি থেকে বেরনোর আগে সমানে বলতে থাকলাম নিউট্রাল মোড অন করে নে। বলতে খারাপ লাগে আমিও করেছি।’ শেষ বাক্যটা বলার সময় গলাটা কেঁপে গেল মায়ের।

     ‘ইটস অল রাইট মা। কিন্তু আমি কোনওদিন বুঝতে পারিনি জিনিসটা কী। একটা ঘড়ির মতো পরতে হয় আমাদের।’

     ‘এর থেকে বড় বুজরুকি কিছু হয় না। আগেকার দিনে পৃথিবীতে মানুষ ভাগ্য ফেরানোর জন্যে হাতে আংটি পরত, এটাও সেইরকম। হরমোন নিয়ন্ত্রণের জন্যে শরীরের মধ্যে যে চিপ বসানো হয়, জন্মের পরেই, হাতের ঘড়িটা তার রেগুলেটর।’

     ছিটকে ওঠে জারা ‘এটা তো ভীষণ অপমানজনক। এর মানে তো বোঝানো হচ্ছে রেপ হয় মেয়েদের তরফ থেকে মেয়েলি ইশারার জন্যে।’

     ‘একজ্যাক্টলি। এ যেন চুরির জন্যে চোর না ধরে গৃহস্থকে বলা সব জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলো। অনেক আগে মেয়েদের চেস্টিটি ব্যান্ড পরতে হত এ হচ্ছে অনেকটা এইরকম।’

     জারা মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘এই তাহলে নিউটালাব্রিয়াম!’

     ব্যালকনির কোণের দিকে মোড়ায় বসা চতুর্থ ব্যক্তিটি এইসময় কিছু বলার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাকে বলার সুযোগ না দিয়ে মা বলতে শুরু করেন,

     ‘স্বাভাবিকভাবেই নিউট্রালাব্রিয়াম নিয়ে বিক্ষোভ বেড়েই চলেছে। মেয়েরা মানতে রাজি নয় এই অদ্ভুত জিনিস। এদিকে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্বাস্তু সমস্যা।’

     ‘লোক কি শুধু পৃথিবী থেকেই আসে মা? আর কেনই বা আসে?’

     ‘হ্যাঁ, আর্থেনিয়ায় যত উদ্বাস্তু প্রায় সবই পৃথিবীর। আসলে আর্থেনিয়ার জন্ম তো বলতে গেলে পৃথিবীর হাতেই, এখানকার প্রথম যুগের নেতা নেত্রীরা সবাই পৃথিবীর। তাই ওখানে কোনও অসুবিধে হলে কিংবা নতুনভাবে বাঁচতে চাইলে সবাই আর্থেনিয়ায় পাড়ি জমায়।

     প্রথম প্রথম এদের খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি সি. এইচ.। কিন্তু পরে এমন এমন লোক আসতে শুরু করল, যে  সি. এইচ.-এর ধারণা হল এরা আর্থেনিয়ার অচলায়তন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে নোয়া আসার পর সি এইচের ভেতরে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, তাকে প্রায় হিস্টিরিয়াই বলা যায়।’

     এইসময় চতুর্থ ব্যক্তি গলা খাঁকারি দিলেন। মা তাঁর দিকে না চেয়েই বললেন, ‘ভেবো না, তুমিও বলার সুযোগ পাবে। আমার আর সামান্যই বাকি আছে।’

     জারা ভেবে পেল না এই ভদ্রলোককে মা এখানে কেন ডেকেছে। আসার পর থেকে কোনও হাই হ্যালো শিষ্টতাও বিনিময় হয়নি, আর এই ব্যাপারে ইনি কীভাবেই বা জড়িয়ে কে জানে। যাক গে, মার কথায় মন দিল জারা।

     ‘জারা, তুই জিজ্ঞেস করেছিলি না যে ফুলকে কেন কেউ ভয় পাবে? আমি তোকে বলেছিলাম ফুল একটা থ্রেট। বিপ্লব, প্রেম সব কিছুর প্রতীক ফুল। আর আর্থেনিয়ায় সবসময় চেষ্টা হয়েছে যে কোনও অনুভূতিকে দমিয়ে রাখতে, তাই ফুল বেচতে আসা নোয়া হয়ে দাঁড়াল বিষম মাথাব্যথার কারণ। আর তাই ওকে ফাঁসাতে ব্যবহার করা হল রেপ ইস্যুকেই। এতে দুটো লাভ– এক: নোয়ার মতো কেউ যেমন ভবিষ্যতে ফুল ফোটাতে আসবে না এখানে, তেমনি দুই: পাবলিক ভাববে রেপকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সি. এইচ.। তাই মিকির মাধ্যমে সাজানো হল মারিওভা কফি জয়েন্টের নাটক। ওই কাপড় তুলে যদি দেখতিস ওখানে কিছু পেতিস না!’

     জারা খুব অবাক হল না শুনে, কারণ এমন একটা আভাস মা আগেই দিয়ে রেখেছিল। মা বলতে লাগলেন, ‘সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু বাদ সাধল আমার জারা। সে নোয়াকে ভালোবাসল আর ভালোবাসা পাথরেও ফুল ফোটাতে পারে।’

     নোয়া জারার হাতে চাপ দিল। মা সেদিকে চেয়ে একটু হেসে বললেন, ‘জারা তুই বলেছিলি না কে ফুল ভয় পায়? এই সেই লোক।’

     জারা চমকে উঠে বলল, ‘ইনি! ইনি তাহলে চিফ! রিয়েল।’

     ‘হ্যাঁ ইনিই জালের আড়ালে থাকা রাজা, শুধু যে ফুলে অ্যালার্জি তাই নয়, শিশুতেও এর… তাই ছোট্ট জারা আর তার মাকে ফেলে চলে গেছিলেন।’

     জারা লাফিয়ে উঠে বলল, ‘কী বলছ মা? ইনি আমার বাবা! আর্থেনিয়ার চিফ আমার বাবা! আর আমরা এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে এত কষ্ট করে কাটিয়েছি এতগুলো বছর!’

     জারাকে বুকে টেনে নেন মা। নোয়া দেখে তার ফোটানো ফুলের চেয়েও সুন্দর এই জোড়া ফুল। বোধহয় এই দৃশ্য চিফকেও কিঞ্চিৎ বিচলিত করে, নইলে তিনি উঠে এসে জারার পিঠে হাত রাখবেন কেন। যদিও সেই স্পর্শে স্পষ্টতই কুঁচকে যায় জারা।

     মা বলেন, ‘প্লিজ তুমি বোসো। ভালোবাসার স্পর্শ ছাড়া কোনও স্পর্শ আমার মেয়ে সহ্য করতে পারে না। জারা শান্ত হও, এবার আমরা চিফের কথা শুনব।’

     একটু নড়েচড়ে বসেন চিফ। গলা ঝেড়ে বলেন, ‘আমার বিশেষ কিছু বলার নেই। আর্থেনিয়ার পলিসি নিয়ে এখানে আমি কিছু বলব না। আশা করি কেন বলব না– সেটা সবাই বুঝবে। রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মতো চলবে। আমিও সেখানে একটা ছোট্ট আলপিন।’ এই কথাটায় জারা আর নোয়ার মুখে যে মুচকি হাসি ফুটল সেটা না দেখার ভান করে চিফ বলে চললেন–

     ‘তাই রাষ্ট্রের কাছে ফুল বিপদসংকেত কি না এসব কেউ আমার মুখ থেকে বার করতে পারবে না, আর এই কেসটার ব্যাপারে একটা কথাই বলব, এটা ঠিকমতো হ্যান্ডল করা হয়নি, এই মিকিটাকে নিয়ে…’ চিফের মুখে স্পষ্টই বিরক্তি ফুটে ওঠে।

     মা ঠান্ডা গলায় বলেন ‘সেসব নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই, আমি জানতে চাই এবার থেকে নোয়া তার কাজটা বিনা বাধায় করতে পারবে কিনা?’

     চিফ সে কথার জবাব না দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ একটা কথা আমি বলতে পারি, ব্যক্তিগতভাবে আমি ফুলটুল একদম পছন্দ করি না, আর বাচ্চাকাচ্চা দেখলেই আমার মাথা ধরে যায়। তাই তোমাকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল সারা। তুমি যদি তখন মেয়েটাকে কেয়ার সেলে দিয়ে দিতে, তবে তো যেতে হত না।’

     মার মুখ কঠিন হয়ে ওঠে, তিনি কিছু বলার আগেই চিফ আবার বলেন, ‘বেশ, ধরে নেওয়া যাক ওটা আমার ঐতিহাসিক ভুল, তবে সেটা জনসমক্ষে স্বীকার করব, এমন আশা করো না। তবে হ্যাঁ এবার থেকে তোমরা মাসে মাসে একটা ভাতা পাবে, পরিত্যক্ত নারী ও শিশু ভাতা। সেটা যথেষ্ট বেশি। আর এই ছেলেটা যদি বেশি কেরদানি না দেখিয়ে চুপচাপ ফুল ফোটায় আর বেচে, তো ঠিক আছে, তবে মনে রেখো, ওর ওপর সেন্ট্রাল হাবের নজর থাকবে।’

     উঠে দাঁড়ান সারা, জারা দেখে মার ঋজু চেহারার সামনে চিফকে একটা বদখত জোকারের মতো দেখাচ্ছে।

     ‘আপনি এখন আসতে পারেন চিফ। আপনার ভাতা আমাদের প্রয়োজন হবে না, সরি। আপনি তো আবার নিজের কবিতা ছাড়া অন্যের টবিতা পড়েন না, পড়লে ভালো হত, আর্থেনিয়া বেঁচে যেত। প্রাচীন কালে পৃথিবীতে সুকুমার রায় বলে একজন কবি ছিলেন, তাঁর একটা কবিতা শুনুন–

     ঠাস ঠাস দ্রুমদ্রাম শুনে লাগে খটকা / ফুল ফোটে? তাই বলো, আমি ভাবি পটকা! তো নোয়া ফুল ফোটাবে না আপনাদের ল্যাজে জ্বলন্ত পটকা বেঁধে দেবে সেটা ওই ঠিক করবে। আর তখন আপনারা কী করবেন, সেটা আপনারা ভাবুন। তাড়াতাড়ি যান, গিয়ে আবার মিকি টকিহাউসকে শো কজ করতে হবে, কত ঝঞ্জাট বলুন তো!’

     চিফ চলে যাবার পরে জারা ঝলমলে মুখে বলে, ‘মা, আজকের বিকেলটা খুব সুন্দর, আমরা একটু বাঁশি নদীর ধার থেকে ঘুরে আসি।’

     ‘আচ্ছা যাও, কিন্তু সাবধানে। লেজে পটকাবাঁধা কুকুর গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আর নোয়া, তুমি কিন্তু একটা মিথ্যে কথা বলেছ।’

     সারার এই কথায় জারা চমকে উঠে দেখে, যাকে বলা, সে কিন্তু মুচকি মুচকি হাসছে।

     জারা নোয়ার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে ‘বলো বলো কী মিথ্যে কথা বলেছ আমাকে?’

     ‘ঠিক মিথ্যে নয়, কথা গোপন করা। ও আজবনগর থেকে এসেছে ঠিকই, কিন্তু ওর নাম নোয়া নয়, ও হচ্ছে জিয়ান।’

     ধপ করে বসে পড়ে জারা ‘জিয়ান! ইচ্ছাময়ীর জিয়ান! সে তো প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা! আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।’

     সারা জারার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘নোয়া শুধু পৃথিবীর সীমান্ত পেরিয়ে এখানে আসেনি, ও সময় সীমান্ত পেরিয়েও এসেছে, আর এসেছে শুধু তোর জন্যে। ও খবর পেয়েছিল, ইচ্ছাময়ীর উত্তরনারী এই আর্থেনিয়ায় থাকে। যে ভালোবাসা সে সেই সময় গ্রহণ করতে অপারগ ছিল, সেটা দুহাত পেতে নিতেই ও এসেছে, ওকে ফেরাস না জারা।’

     জারা অস্ফুটে বলে, ‘তার মানে ও আমার চেয়ে ৫০০ বছরের বড়?’

     ‘দূর বোকা মেয়ে! ভালোবাসার জন্যে সময়ের পারাপার করতে পারে যারা, তাদের বয়স এক জায়গায় থেমে থাকে, জানিস না বুঝি?’

     নোয়া থুড়ি জিয়ানকে নিয়ে এরো স্কুটিতে উঠে মাকে হাত নাড়ে জারা। সারা দেখেন তাঁর শূন্যকানন ভরে উঠেছে ইচ্ছাময়ীর ফুলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!