শ্যাতোয়ান্ত

দীপেন ভট্টাচার্য

অলংকরণ:তৃষা আঢ্য, জটায়ু

১. শ্যাতোয়ান্ত

সকালটা প্রায় শেষ যাচ্ছিল যখন মিস্টার শ্যাতোয়ান্ত বলল, “জানালার পর্দা খুলে দাও।”

     এতক্ষণ যা মনে হয়েছিল দেয়াল­— যাতে সাঁটা ছিল বহু বিমূর্ত ছবি— তা মিলিয়ে গিয়ে দেখা দিল জানালার বাইরে পেঁজা তুলোর মতো বাতাসে তুষার কণার বিচলন। ঘরের ভেতর বাজছিল জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের ‘বাতাস’। রাস্তার ওপাড়ে এক বহুতল বাড়ির ২৬তম তলা। ফ্রিজ খুলে কমলার রসের বোতল বার করে টেবিলের ওপরে রাখা গ্লাসে ঢালে শ্যাতোয়ান্ত। গ্লাসটা নিয়ে খোলা জানালার সামনে দাঁড়ায়। তুষারের তুলোর নৃত্যের পেছনে, সামনের বহুতল বাড়িটির বাদামি দেয়ালে দেখা যাচ্ছে সাজানো সারি সারি চৌকো বদ্ধ জানালা। সেদিকে তাকিয়ে শ্যাতোয়ান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বদ্ধ জানালাগুলির পেছনের অধিবাসীদের সম্পর্কে তার কৌতূহল অপরিসীম। শহরটাকে বুঝে উঠতে চাইছে সে।

     রাতে ওই জানালাগুলির পেছনে আলো জ্বলে। ছায়া দেখে শ্যাতোয়ান্ত। খেলা করে বাচ্চারা। রান্না করে কোনও তরুণ, চুল বাঁধে কোনও তরুণী, এক প্রৌঢ় ভায়োলিন বাজায়। রাতের অন্ধকারে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসে নিচে রাস্তার যাতায়াত ব্যবস্থার শব্দের ওপর দিয়ে। এখনও কেউ অযান্ত্রিক ভায়োলিন বাজায়, আশ্চর্য হয়েছিল শ্যাতোয়ান্ত। আর চুল বেঁধেছিল যে তরুণী তাকে আর একবার একটা কাপ মুখে তুলতে দেখেছিল। এসবই ছিল ছায়ানৃত্য। কিন্তু একবার, হেমন্তের এক সকালে, জানালা খুলে নিচু হয়ে বড় রাস্তাটা দেখছিল সেই তরুণী, কালো চুল ছড়িয়ে পড়েছিল তার সারা মাথা আর মুখমণ্ডল ঢেকে। তারপরে, সে যখন জানালাটা বন্ধ করে দিচ্ছিল, তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল শ্যাতোয়ান্তের। এতদূর থেকেও তার চোখের দীপ্তি যেন সে দেখেছিল।

গতকাল একটা মিটিং ছিল, ঘরে বসে ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণেই কথা হল সহকর্মীদের সঙ্গে, শহরের একপ্রান্তে তাদের কোম্পানির একটা আবাসিক দালান ছিল। সেটা ভেঙে পার্ক করা হবে। ঘরে বসেই তার ঘনকের সাহায্যে নক্সা করে প্রকৌশলী শ্যাতোয়ান্ত। ঘনককে আগে বলা হত কম্পিউটার। শ্যাতোয়ান্তের ঘনকটি জানালার পাশেই টেবিলের ওপর বসানো, ঘন আয়তনের ধূসর রঙের বাক্সটির প্রতিটি দিক ১০ সেন্টিমিটারের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এই ঘনক, তার সঙ্গে আন্তর্জালে আরও অনেক ঘনকের সঙ্গে যোগাযোগ।

     ওই শতাব্দীর শেষে বর্ণমালা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছিল। মনোযোগ না দিলে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো স্মৃতিতে নোঙর ফেলে না, তেমনই স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ, এমনকি অক্ষরমালার বাইরে গাণিতিক সংখ্যাগুলো এক অবরোহী কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছিল, কিন্তু নাগরিকরা খেয়াল করছিল না। তারা তাদের সর্বক্ষণের সাথী— ছোট থেকে বড়, আবার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম গণনাযন্ত্রগুলোকে— মৌখিক আদেশ দিয়ে চালাত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্বসমূহের সঙ্গে তারা মতামত বিনিময় করত শব্দের মাধ্যমে। এই সভ্যতার স্লোগান হল ‘ধ্বনিই একমাত্র বার্তাবাহক, জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করার জন্য কণ্ঠনালী নিসৃত দীঘল তরঙ্গের কোনও বিকল্প নেই’। তাই যেদিন শ্যাতোয়ান্ত দেখল নতুন ঘনকে কিবোর্ড নেই সে’দিন সে আশ্চর্য হল না। নাগরিকেরা কি-বোর্ড থেকে মুক্তি পেয়ে বলল, “আপদ বিদায় হয়েছে, হাতের আঙুল দিয়ে অক্ষর টিপে কব্জিতে ‘কার্পেল টানেলের’ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে।” এর বহু বছর আগেই অবশ্য তারা কাগজের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিল। কলমের কারখানাগুলোও উঠে গিয়েছিল বহুদিন। আধুনিক হস্তলিপিও ঐতিহাসিক হল, সুমেরীয় কিউনিফর্ম, মিশরীয় হিরোগ্লিফ, সিন্ধুনদের প্রতীকগুলোর সঙ্গে প্রত্নতত্ত্বের সংগ্রহশালায় ঠাঁই পেল।

     ক্ষুদ্র যন্ত্রে মানুষ প্রথমে চিরকুট লিখত, তাকে এসএমএস, টেক্সটিং এসব বলত। ধীরে ধীরে ছোট চিরকুট সঙ্কেতে পরিণত হল। মানুষ যেন ফিরে গেল সুমেরীয় কিউনিফর্মে, তারপর সেটাও পরিত্যাগ করল। ততদিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সভ্যতার জটিল অংশগুলি দেখত। কি-বোর্ডবিহীন ঘনককে এখন শুধুমাত্র কথা দিয়ে চালাতে হয়। শ্যাতোয়ান্তের প্রজন্ম হাতে লিখতে শেখেনি, তারা কথা বলতে পারে, জটিল অঙ্কও ঘনকের সাহায্যে সমাধান করতে পারে, পড়তে পারে কিন্তু লিখতে পারে না। শহর পরিচালনা পর্ষদও যে কোনও লেখাকে নিরুৎসাহিত করত।

     শ্যাতোয়ান্ত সামনের বাড়িটির দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে শুধু প্রকৌশলী নয়, সে নতুন গল্প লিখতে চায়। জানলা থেকে ফিরে এসে সে টেবিলের ওপর রাখা ঘনকের সামনে বসে। ঘনককে বলে, “ঘনক, আমি একটা নতুন গল্প লিখব।” ঘনক উত্তর দিল, “নতুন গল্প সৃষ্টির পথ কন্টকময়।” ঘনকের কণ্ঠ ছিল অনুশীলনপ্রাপ্ত নাট্যশিল্পীর মতো। শ্যাতোয়ান্ত ঘনকের কথা অগ্রাহ্য করল, বলল, “শুরুর বাক্যটা হবে— পৃথিবী তখন এতই নতুন ছিল যে কোনও বস্তুর নাম ছিল না, আঙুল দিয়ে সেগুলো দেখিয়ে দিতে হত।”

     ঘনকের গলায় শ্লেষ, বলে, “তুমি ঠাট্টা করছ, এই বাক্যটি তো লেখা যাবে না, কারণ এর মতোই একটি বাক্য গ্যাব্রিয়েল মার্কেজ তাঁর নিসঙ্গতার শতবর্ষ বইটিতে ব্যবহার করেছেন।’ শ্যাতোয়ান্ত দাঁতে দাঁত চেপে ঘনক সম্বন্ধে অশ্রাব্য কিছু বলল, ঘনক সেটা বুঝতে পারল। বলল, “এতে আমার কিছু করার নেই, নকল করে গল্প লেখা একেবারেই বারণ।”

     শ্যাতোয়ান্ত বলল, “ঠিক আছে। ওটা লিখতে হবে না। লেখ, ওই প্রাচীন পৃথিবীতে একটি বড় বটগাছ ছিল, একদিন একদল বক সেই গাছের মাথায় এসে বসল, দূর থেকে মনে হল গাছের মাথা থোকা থোকা সাদা ফুলে ভরে গেছে।”

     ঘনকের বাতি জ্বলে-নেভে, বলে, “তোমাকে এটার জন্য দোষ দেব না, তুমি এঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত নও। এরকম একটি বাক্য পাওয়া যাবে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের আরণ্যক বইটিতে।” বিভূতিভূষণের নাম শ্যাতোয়ান্ত শোনেনি, কিন্তু ঘনক পৃথিবীর যাবতীয় লিখিত সম্পদকে মুহূর্তের মধ্য দেখে নিতে পারে। নকল করার ব্যাপারে বিশেষ সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। গত দশ বছরে কোনও মৌলিক সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়নি, কারণ শহরের যাবতীয় ঘনকের প্রতি নির্দেশই আছে যদি কোনও বাক্য অতীতে সৃষ্ট সাহিত্যের একটি বাক্যর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বা অংশতভাবে এক হয়, এমনকি যদি ভাবগতভাবে মিল পাওয়া যায় তবে সেটি নকল বলে বিবেচ্য হবে, এবং ঘনক ওই লেখককে সাহায্য করবে না। বলাই বাহুল্য শর্তটি কঠিন। ঘনককে এড়িয়ে হাতের লেখায় নতুন রচনা শহর পরিচালনা পর্ষদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

     শ্যাতোয়ান্ত হাল ছেড়ে দেয়। তার প্রতিটি সকালই এভাবে শুরু হয়, প্রতিটি সকালেই সে ভাবে, যদি আজ ঘনককে ফাঁকি দেওয়া যায়। তুষারপাত কমলে লিফট দিয়ে নিচে নেমে আসে সে। ৩৫ নম্বরের বাসটা তার দালানের সামনেই থামে। সেটি দিয়ে অনেক সময় কাছেই একটা বাজারে শাকসব্জি কিনতে যায় সে। শুনেছে বাসটার শেষ স্টপেজ শহরের একটা পুরোনো অংশে, যে অংশটা এখনও ভেঙে ফেলা হয়নি। ৩৫ নম্বর বাসে ওঠে সে। যেতে যেতে সব যাত্রী নেমে যায়। শেষ গন্তব্যে বাস থামলে সে চালককে জিজ্ঞেস করে এখানে কোনও পুরোনো দিনের দোকান আছে কিনা। চালক বোঝে না শ্যাতোয়ান্ত কী বলতে চাইছে, একটু সন্দেহের চোখে তাকায় তার দিকে, তারপরে দূরের কিছু বাড়ির দিকে হাত তুলে দেখায়, বলে, “ওইদিকে কিছু মানুষ থাকে, ওদের জিজ্ঞেস করতে পারেন।”

     শহরটা এখানে হঠাৎ করেই যেন শেষ হয়ে গেছে, এরপর তুষার ঢাকা প্রান্তর। বাড়িগুলোর কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শ্যাতোয়ান্তের হাতের আঙুল জমে যায়। সারি সারি দোতলা পুরোনো বাড়ি। প্রথম বাড়ির দরজায় টোকা দিলে এক বয়স্ক পুরুষ দরজা খোলে। শ্যাতোয়ান্ত বলে, “আমি কাগজের খোঁজ করছি। আপনার কাছে কি সাদা লেখার কাগজ পাওয়া যাবে?” মানুষটি যেন প্রশ্নটিতে আশ্চর্য হয় না, কিন্তু মাথা নেড়ে না বলে দরজা বন্ধ করে দেয়। শীতটা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। পরপর আরও চারটা দরজায় টোকা দেয় শ্যাতোয়ান্ত, অবশেষে পঞ্চম বাড়িটির দরজা খোলে এক দৃঢ়-মেরুদণ্ডী প্রৌঢ়া। কাগজের কথা শুনে সে তাকে ভেতরে এসে বসতে বলে। অন্ধকার, কিন্তু উষ্ণ ঘরটি পুরোনো আসবাবপত্রে ভর্তি। প্রৌঢ়া ভেতর থেকে এক বান্ডিল সাদা কাগজ নিয়ে আসে। লোভীর মতো সেটা তার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নেয় শ্যাতোয়ান্ত। আঙুল দিয়ে অনুভব করতে চায় কাগজের রুক্ষ কোমলতা। “কত?” জিজ্ঞেস করে সে। “একশো ফ্র্যাঙ্ক,” বলে প্রৌঢ়া। “আমার কাছে দু’শো ফ্র্যাঙ্কের একটা বাজার করার কার্ড আছে, সেটা নিতে পারেন। ক্রেডিট কার্ড তো ব্যবহার করা যাবে না। আপনাকে বাকি একশো ফ্র্যাঙ্ক ফেরত দিতে হবে না।” “ঠিক আছে, সেটা দিতে পারেন। আপনার কলম লাগবে না?” “কলম?” কলমের কথাটা মনেই ছিল না শ্যাতোয়ান্তের। প্রৌঢ়া হাসে, বলে, “কলম ছাড়া কাগজ তো অচল।” শ্যাতোয়ান্ত কৃতজ্ঞতা বোধ করে। বের হবার সময় প্রৌঢ়া বলে, “আমার কাগজের ভান্ডার প্রায় শেষ। যা লিখবেন তা যেন অমূল্য হয়।” কলম আর কাগজের বান্ডিলটা ব্যাগে ঢোকায় শ্যাতোয়ান্ত।

     বাড়ি ফিরে শোবার ঘরে ঢোকে শ্যাতোয়ান্ত, ঘনক এখানে তাকে দেখতে পাবে না। ব্যাগটা খুলে কলমটা বের করে। খাটে বসে সে খুব যত্ন সহকারে লেখে শ, তারপর ত, তারপর ‘শ্যাতোয়ান্ত’। না, ভুলে যায়নি, চল্লিশ বছর আগে তার মা তাকে যা শিখিয়েছিলেন কিছুটা হলেও সে ধরে রেখেছে। শ’য়ের বক্রতায়, ন আর ত এর যুক্তাক্ষরে মোহিত হয়ে যায় শ্যাতোয়ান্ত। হাতের স্পর্শে সৃষ্ট অক্ষর, স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি তার যোগাযোগ। আহা!

     পরদিন খুব ভোরে তার উঁচু দালানের নিচে নেমে শ্যাতোয়ান্ত অপেক্ষা করে। আজ আকাশ নীল, গতকালের স্তূপীকৃত তুষারের ওপর সূর্য ঝলকাচ্ছে। অপেক্ষা করে যতক্ষণ না তার পা জমে যায়, তারপর সেই তরুণী বের হয় সামনের বাড়ি থেকে। তার মুখমণ্ডলের পরিলেখ খুব ভালো করে চেনে শ্যাতোয়ান্ত। রাস্তা পার হয়ে দৌড়ে তার কাছে যায় সে, বলে, “মিজ, আপনার জন্য আমার একটা উপহার আছে।” তরুণী এরকম অচেনা একটি মানুষের সম্বোধনে হতচকিত হয়। সে দেরি করে না, তরুণীর হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ গুঁজে দেয়। তরুণী অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে হাতের কাগজটার দিকে চেয়ে থাকে। শ্যাতোয়ান্ত বলে, “এটা আপনার জন্য।” এই বলে তরুণীকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রাস্তা পার হয়ে ঢুকে যায় তার বিল্ডিং-এ।

     ঘরে ফিরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে তরুণীর ফ্ল্যাটের দিকে, যদি সে তার জানালাটা খোলে। দুপুর গড়িয়ে যায়, শীতের ছোট দিন ফুরিয়ে আসে, সূর্য দক্ষিণ দিগন্ত ঘেঁষে পশ্চিমে এগোতে থাকে। কিন্তু তরুণীর জানালা বন্ধ থাকে। সন্ধ্যা হবার আগে শ্যাতোয়ান্তের দরজায় কে যেন টোকা দেয়। এ সময়ে কারুরই আসার কথা নয়, আর এলেও নিচের দরজা তার খুলতে পারার কথা নয়। কাজেই সে যে শহর নিয়ন্ত্রণ কমিটি থেকে এসেছে এ নিয়ে শ্যাতোয়ান্তের সন্দেহ থাকে না। দরজা খুললে ধূসর পোষাকের আগন্তুক ঘরে ঢুকে পড়ে, পরিচয় দেবার ধার ধারে না, বলে, “মিস্টার শ্যাতোয়ান্ত, আপনি আপনার প্রতিভাকে নষ্ট করছেন, অপাত্রে দান যাকে বলে।” দীর্ঘাঙ্গ মানুষটির মাথায় পুরোনো দিনের হ্যাট। জানালার কাছে যেয়ে নিচে তাকায়, বলে, “আপনার ফ্ল্যাটটি তো ভালোই। আর প্রকৌশলী হিসেবেও আপনার নাম আছে, তা যার যে কাজ তার মধ্যে থাকাই কি ভালো নয়?” শ্যাতোয়ান্ত বোঝে তার কাজটি গোপন থাকেনি। আগন্তুক বলে, “আমার নাম, শ্যালুর, বিশেষ গোয়েন্দা শ্যালুর। আমাদের কাছে খবর এল আপনি চোরাকারবারিদের কাছ থেকে কাগজ কিনেছেন।” গতকালের প্রৌঢ়াকে চোরাকারবারি হিসেবে চিত্রিত করা শ্যাতোয়ান্তের কাছে হাস্যকর মনে হয়।

     শ্যালুর বলে, “উলুবনে মুক্তা ছড়াতে নেই। আমার সঙ্গে যারা কাজ করে তারা কবিতা-টবিতা বোঝে না, তারা আপনার প্রকৌশলী ব্যাজ কেড়ে নেবার জন্য প্রস্তুত, তার সঙ্গে এই সুন্দর ফ্ল্যাটটিকেও।” এই বলে শ্যালুর তার কোটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে। শ্যাতোয়ান্ত কাগজের পাতাটাকে চিনতে পারে। “তো আমি যা বলছিলাম, যার যা কাজ তার মধ্যে থাকাই ভালো নয় কি?” বলে শ্যালুর কাগজটা খুলতে খুলতে, “আপনি হলেন প্রকৌশলী, তা আপনার মাথায় চাপল কবিতার ভূত। কীরকম কবিতা লিখলেন আপনি?” কাগজটা তার চোখের সামনে তুলে নাটকীয় ভঙ্গীতে শ্যালুর পড়ে, “শীতলতায় ডুবে যায় নরম শিশিরকণা/ জানালায় জমে কঠিন স্ফটিকখণ্ড/ তবু তোমার প্রতিলেখ ভেসে ওঠে/ তোমার উষ্ণতার ছোঁয়া ভাসে/ উদাসীন শহরের অতৃপ্ত বাতাসে। হা হা হা, এটা কবিতা হল? আপনার নামটির যা অর্থ তাতে আমি অনেক কিছু আশা করেছিলাম।”

     সত্যিই এটা কবিতা হয়নি। শ্যাতোয়ান্ত লজ্জায় মাথা নোয়ায়। শ্যালুর বলে, “কবিতাটি কোনও পদের হয়নি সেটা একটা ট্র্যাজেডি বটে, কিন্তু তার থেকেও বড় ট্র্যাজেডি কী জানেন? যাকে উদ্দেশ্য করে এই কবিতা লিখেছেন সে তার একটি কথাও বুঝতে পারেনি।”

     এই শহরের সব কিছুই অলীক, শ্যাতোয়ান্ত ভাবে।

     “তবে অন্য দিক দেখলে বলতে হবে ভালোই হয়েছে, এই কবিতার অত্যাচার থেকে সে বেঁচেছে।” এই বলে হা হা করে আবার হাসে শ্যালুর। বলতে থাকে, “আপনার হদিশ কে দিল জানেন? আপনি তাকে কাগজটা দিলে সে জিনিসটা কী না বুঝতে পেরে সোজা গোয়েন্দা দপ্তরে হাজির। ভেবেছিল আপনার বোধহয় কোনও সাহায্যের প্রয়োজন। হা হা। তো আমরা কাগজ আর তার কালি দেখে প্রথমেই বুঝে নিলাম সেটা কোথা থেকে আসছে। তবে এর আগেই ২০০ ফ্র্যাঙ্কের একটা বাজারের কার্ড বেনামে ব্যবহার করার সময় এক প্রৌঢ়ার নাম আন্তর্জালে নথিভুক্ত হয়। তো তাকে খুঁজে পেতে বেশি অসুবিধা হয়নি। সেই প্রৌঢ়ার সব কাগজ আর কলম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ঘাবড়াবেন না, আমরা অমানুষ নই। তাকে আপাতত কোনও সাজা দেওয়া হচ্ছে না। আর এটা আপনার প্রথম অপরাধ, আপনার প্রকৌশলী ব্যাজ আমরা কেড়ে নিচ্ছি না। আমাকে শুধু কাগজগুলো আর কলমটা দিয়ে দিন। এরপরে আর কবি সাজবার চেষ্টা করবেন না।”

     কাগজ আর কলম বাজেয়াপ্ত করে শ্যালুর চলে গেলে ঘনক শ্যাতোয়ান্তকে বলে, “আমাকে বলতেই পারতে যে তুমি ওই তরুণীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলে। আন্তর্জালে এই শহরের সব খুঁটিনাটি আমার নখদর্পণে। সে যে পড়তে পারে না সেটা তোমাকে আগেই বলে দিতে পারতাম। এ শহরে কে পড়তে পারে, বল? এত কষ্ট করে, আমার কাছ থেকে লুকিয়ে, তোমাকে কবিতা লিখতে হত না। আর যে ছাঁইপাশ লিখেছ তার থেকে অনেক ভালো কবিতা আমি লিখে দিতে পারতাম। তুমি বোধহয় জানো না ‘যুদ্ধ ও পরবর্তী শান্তি’ নামে আমার ৩ মিলিয়ন শব্দের একটা উপন্যাস পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। লেখক হিসাবে আমার নাম হচ্ছে।”

     এই শহরে এখন শুধুমাত্র ঘনকেরাই উপন্যাস লেখে।

     আরও রাত হলে শোবার ঘরে যায় শ্যাতোয়ান্ত, বিছানার ম্যাট্রেসের নিচ থেকে বের করে আনে একটা কলম আর একটা সাদা কাগজ। প্রৌঢ়া তাকে দুটো কলম দিয়েছিল, শ্যালুর একটা নিয়ে গেছে; এই কলমটা ও একটা কাগজ সে লুকিয়ে রেখেছিলে। খাটে বসে কলম দিয়ে পরম যত্নে ও ভালোবাসায় কাগজে খুব ছোট অক্ষর ফুটিয়ে তোলে সে, “আমার মা আমার নাম রেখেছিলেন শ্যাতোয়ান্ত। শ্যাতোয়ান্ত অর্থ হল মণি প্রতিফলিত উজ্জ্বলতা। এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমি লিখে যাচ্ছি এই শহরের কাহিনি ….”

    

. ভেল্টসমার্স

ঠক ঠক ঠক শব্দে আমার ঘুম ভাঙে, বাইরের দরজায় টোকা দিচ্ছে কেউ। টোকা দেবার কোনও কারণ নেই, বৈদ্যুতিক ঘণ্টা আছে। সেই ঘণ্টা না বাজানোর অবিমৃষ্যকারিতায় অদৃশ্য আগন্তুকের ওপর বিরক্ত হই। ক’টা বাজে এখন? জানালার পর্দার বাইরে আবছায়া আলো দেখা যায়। ভোর হচ্ছে, না সন্ধ্যা? আমি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? অল্প আলোর কুহেলিকায় বিপর্যস্ত থাকি। দরজায় ঠক ঠক হয়েই যায়।

     বিছানায় উঠে বসি, পায়ের নিচে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ শরীরের অবসাদগ্রস্থ সমস্ত স্নায়ুকে সচকিত করে, চিৎকার করি, “যথেষ্ট হয়েছে, থামুন, আসছি।” এরপর আর দুটো ঠক ঠক হয়, এমন যেন আগন্তুক নিতান্ত জাড্যর কারণে তার আঙুলগুলোকে, আমার কথাগুলো তার কানে প্রবেশ করার পরও, দরজায় টোকা দেওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। হাতের কাছে কথক যন্ত্রটিতে দুটো আদেশ দেওয়া মাত্র দরজার ওপারে দাঁড়ানো মানুষটির চেহারা ভেসে ওঠে। মাথায় হ্যাট, পরনে ওভারকোট। গোঁফ, জুলফি। বছর চল্লিশ বয়স হতে পারে। কথক যন্ত্রে বললাম, “কে?” উত্তর এল, “নিয়ন্ত্রণ কমিটি”। নিয়ন্ত্রণ কমিটির নিয়ন্ত্রণ এমনই যে মানুষটি “নিয়ন্ত্রণ কমিটি থেকে এসেছি” এটুকু বলার প্রয়োজন মনে করল না। দাঁড়াতে দাঁড়াতে কথককে বললাম, “দরজা খুলে দাও।”

     গায়ে একটা গাউন জড়াতে না জড়াতেই অনাহুত অতিথি ঘরের মধ্যে উপস্থিত। “আহ, ভুল সময়ে এসেছি, ঘুমে ব্যাঘাত করার জন্য দুঃখিত।” তার উচ্চারণ ও চতুষ্কোণ মুখাবয়বের ভঙ্গীতে দুঃখের কিছু খুঁজে পেলাম না, বরং মনে হল আমার বিড়ম্বনায় তার চোখের উজ্জ্বল কালো মণি চাপা উল্লাসে স্ফীত। “ডক্টর বি.?” সে আমার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়, কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘরটাকে নিরীক্ষণ করে। নিয়ন্ত্রণ কমিটি থেকে কেউ মঙ্গল সাধনে আসে না।

     তার হ্যাট ও ওভারকোট পরার ধরনটা আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হল। আগন্তুক বলল, “আমার নাম ভেল্টসমার্স, বিশেষ গোয়েন্দা ভেল্টসমার্স। আমাকে আপনার পরিচিত মনেই হতে পারে, বলতে পারেন এই ক্ষেত্রে জীবন আর্টকে অনুসরণ করছে, আমি ইন্সপেক্টর শ্যালুরের জীবন্ত প্রতিভূ।”

     গোয়েন্দা শ্যালুর? শ্যালুরের কথা এই মানুষটি জানল কেমন করে?

     আমার প্রতিটি মৌন প্রশ্নই সে ধরে ফেলে। “শ্যালুরের কথা কেমন করে জানলাম? সেটা তো শ্যাতোয়ান্তের কাহিনি  পড়েই। গল্পটা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। বিশেষত শ্যালুরের চরিত্রটি, তো সেরকম একটা হ্যাট ও ওভারকোট পরে চলে আসলাম। বেশ নাটকীয় পদক্ষেপ, তাই না?”

     নাটকীয় পদক্ষেপ? ভেল্টসমার্সের রঙ্গ আমাকে হালকা করতে পারে না। ‘শ্যাতোয়ান্ত’ লেখাটা তার হাতে পৌঁছাল কেমন করে? আর ভেল্টসমার্সই বা কী ধরনের নাম?

     “কেমন করে আমার হাতে পৌঁছাল? ডকটর এলের মাধ্যমে।”

     এল.? না, এল. আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না। ভেল্টসমার্স জানালার কাছে যেয়ে ভারি পর্দাটা সরিয়ে দেয়। শেষ বিকেলের রাঙা রোদ ঘরটা ভরিয়ে, বুঝলাম দুপুরের পরই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিকেল আর সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণে মনটা সবসময় উতলা থাকে, ঘরে এক গোয়েন্দার উপস্থিতি মনটাকে আরও বিপর্যস্ত করে দিতে থাকে।

     “তবে ডকটর এল. আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা করেনি। সে কোনও দোষ করেনি, তবে ভুল করেছে। সে আপনার লেখাটা তার কাজের টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছিল। কাজটা কাঁচাই হয়েছিল। ড্রয়ার যদিও চাবি দিয়ে আটকানো ছিল, তো সেটা খুলতে আমাদের অসুবিধে হয়নি। আপনার ডিপার্টমেন্টে আমাদের লোক আছে যারা এসব বিষয় চোখে চোখে রাখে।”

     ডিপার্টমেন্টে তাহলে নিয়ন্ত্রণ কমিটির চর আছে।

     “আছে।” আমার মনের কথাগুলো ভেল্টসমার্স কেমন করে ধরে ফেলছে?

     “কেমন করে ধরছি?”

     আমি স্তব্ধ হয়ে যাই, শরীরে কাঁটা দেয়।

     “আপনি কী ভাবছেন সেটা ধরা এমন কিছু নয়, আপনার জায়গায় আমি থাকলে যা ভাবতাম আপনি তাই ভাবছেন। এটা টেলিপ্যাথি নয়। এই ধরুন আপনি ভাবছেন ভেল্টসমার্স নামের মানে কী? খুব খটমট নাম, তাই না? এভাবে উচ্চারণ করতে পারেন… ভেল্টস্, তারপর মার্স। কথাটার মানে বলতে পারেন এক ধরনের বিষণ্ণতাবোধ। কেন বিষণ্ণবোধ জানেন? পৃথিবীর অপূর্ণতায়, জীবনের অক্ষমতায়…”

     ‘অক্ষমতায়’ কথাটা অনুচ্চারিত থাকে, ভেল্টসমার্সের ঠোঁটের নড়া দেখে বুঝে নেই শব্দটা। ভেল্টসমার্স কেমন জানি আনমনা হয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “যাইহোক, আমরা সময় নষ্ট করছি। ‘শ্যাতোয়ান্তের’ মতো লেখা যে নিষিদ্ধ সে তো আপনার থেকে ভালো কেউ জানে না। সরকারি বিধানের পরিপন্থী, এরকম রচনা সমস্ত বিশৃঙ্খলার উৎস। এ বিষয়ে আইন একেবারে পরিষ্কার, কোর্টে কোনও আর্জিই টিঁকবে না। আপনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন, সেই কাজ তো আর করতেই পারবেন না, শহর থেকে নির্বাসিত হতে হবে। সেটা হলে অন্তত ভালো, কিন্তু উদাহরণ সৃষ্টির জন্য আপনার শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে, আজীবন কারাবাস, এমনকি মৃত্যু।”

     জানালার কাছে যেয়ে ভেল্টসমার্স নিচে শহর দেখতে চায়। শহর তখন অন্ধকারে ডুবতে শুরু করেছে, রাস্তার বাতি জ্বলে উঠতে শুরু করেছে, বহুদূরে শহরের কেন্দ্রের উঁচু অট্টালিকাগুলো আলোয় উজ্জ্বল থাকে। বহুদিন আমার শহর কেন্দ্রে যাওয়া হয়নি।

     “আপনার লেখাটা যে আমার অপছন্দ হয়েছে এমন নয়। ঘনক নামে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণকযন্ত্রের কথা বলেছেন সেটা বেশ। লেখাটা কি আপনার নিজস্ব?”

     “কী বলতে চান আপনি?” রেগে বলি, “অবশ্যই নিজস্ব।”

     “রাগবেন না,” দূরে সন্ধ্যার শহর দেখতে দেখতে বলে ভেল্টসমার্স, “আপনি যে এটা লিখেছেন তাতে আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি না, কিন্তু আপনার লেখাটা আমার কাছে মনে হয়েছে অনেক লেখক দ্বারা প্রভাবিত। যেমন ধরুন আইজাক আসিমভের একটা গল্প, গল্পটার নাম হল….,” ভেল্টসমার্স গল্পটার নাম মনে করতে চায়, “…Someday। গল্পটায় আপনার শ্যাতোয়ান্তের মতোই এক কাল্পনিক সময়ের যেখানে মানুষজন লিখিত লিপি ভুলে গিয়েছিল, কিশোররা পুনরায় সেটা আবিষ্কার করে, অন্তত এরকমই একটা কিছু। পড়েছেন?”

     “পড়িনি,” বললাম।

     “অথবা ধরুন ‘ফারেনহাইট ৪৫১’, রে ব্র্যাডবেরির লেখা, যেখানে বই পড়া নিষিদ্ধ ছিল। দমকল বাহিনীর কাজ ছিল আগুন নেভানো নয়, বরং আগুন দেওয়া, যে বাড়িতে বই পাওয়া যাবে সব বইসহ সেই বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া।”

     “পড়েছি,” বললাম, “কিন্তু ‘শ্যাতোয়ান্ত’ ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ নয়।”

     “আহ, আমিও তাই বলছিলাম, এটাই বলছিলাম আমার বসকে, প্রফেসর নাতসুকাশিকে।”

     “কী নাম বললেন, নাতসুকাশি?” আমি বিস্মিত হই।

     “হা হা,” হাসে ভেল্টসমার্স। “আমি জানি নাতসুকাশি তার আসল নাম নয়।”

     নাতসুকাশি ছিলেন দর্শনের তাত্ত্বিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এককালের কড়া দার্শনিক এখন গোয়েন্দা দফতরের অধিকর্তা, কেমন করে সেটা সম্ভব?

     “সবই সম্ভব,” আমার মনের কথাটা ধরতে ভেল্টসমার্সের সময় লাগে না, “বাঁচার জন্য মানুষ সব কিছুই করতে পারে, আর দার্শনিকেরা তো শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে বাঁচতে চায়, প্রলেতারিয়েতের মতো সাদামাটা হয়ে তার থাকতে চায় না।”

     কথাটা সত্যি।

     “তো নাতসুকাশি আমার কথায় সায় দিয়েছিল, অর্থাৎ ‘শ্যাতোয়ান্ত’ গল্পটি ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ নয়। কিন্তু এরকম ডিসটোপিয়া— ভবিষ্যৎ দুঃস্বপ্নের কাহিনি র— অনেক লেখা হয়েছে, তাই না?”

     “লেখা হয়েছে বটে, তার মানে এই না যে এই নিয়ে আর লেখা যাবে না,” আমি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েই বলি, “তাহলে মানুষ আর প্রেমের কবিতা লিখত না।”

     “আহা, রাগ করবেন না, আমি আপনার লেখার উদ্দেশ্যটা বুঝতে চাইছি, কী ধরনের ভাবনাটা আপনাকে এই লেখাটা লিখতে তাড়িত করেছিল। আগেই বলেছি, আপনিও এটা জানেন, এই লেখাটির জন্য আপনার কাজটি খোয়াতে পারেন, এই ফ্ল্যাটটি আপনার হাতছাড়া হতে পারে, শহর থেকে নির্বাসিত হতে পারেন, আর অন্তরীণ হবার কথাটা আবার নাই বললাম। যে লেখার জন্য আপনার এরকম বিপর্যয় হতে পারে সেই লেখা লিখে লাভ কী?”

     আমি চুপ করে রইলাম, এই ক্ষেত্রে বেশি কথা বলা বিপজ্জনক।

     ভেল্টসমার্স তার ওভারকোটের ভেতরের পকেট থেকে একটা ছোট চ্যাপটা হুইস্কির বোতল বার করে। বোতলটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়, আমি মাথা নেড়ে না করি। ভেল্টসমার্স বোতল থেকে এক ঢোক খায়, বোতল কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। আশ্চর্য হই, গোয়েন্দা দফতরের মানুষ কাজের সময় হুইস্কি খাচ্ছে, ব্যাপারটা ব্যতিক্রমী বলতে হবে।

     ভেল্টসমার্স হাসে, বলে, “হ্যাঁ, লিখে লাভ আছে যদি সেটা কালোত্তীর্ণ হয়। যখন শহর পরিচালনা পর্ষদ থাকবে না, নিয়ন্ত্রণ কমিটি থাকবে না, গোয়েন্দা দফতর থাকবে না, আমাদের প্রজন্মের সবাই যখন মরে যাবে, তখন যদি কেউ আপনার লেখা পড়ে, তবে এখন আপনার ওপর যতই নিপীড়ন হোক না কেন সেই লেখার মূল্য থাকবে।”

     নৈতিকতা নিয়ে, সাহিত্যের মূল্য নিয়ে এই গোয়েন্দা কেন আলোচনা করতে চাইছে তা বোঝার চেষ্টা করি। এটা আমাকে নিতান্তই একটা ফাঁদে ফেলার চেষ্টা। তবু বলি, “মানুষ লেখে অমরত্বের তাগিদে নয়, মানুষ লেখে কারণ সে না লিখে থাকতে পারে না, সেটা তার ধর্ম।”

     আর এক ঢোক হুইস্কি খেয়ে হা হা করে হাসে ভেল্টসমার্স। বলে, “ডক্টর বি.! আপনি বড় বুদ্ধিজীবী, কিন্তু মানুষ সম্বন্ধে আপনার ধারণা নিতান্তই শিশুসুলভ। মানুষের প্রবৃত্তিকে আপনি ধর্ম বলছেন, এই ধরনের সংজ্ঞা এই শহরের নাগরিকেরা বোঝে না। কিন্তু প্রবৃত্তি যত না বড় তার থেকে বড় হল মানুষের ইগো। ইগো হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় চালিকা, ইগো ছাড়া কি সৃজন সম্ভব? ইগোর মানে শুধু আত্মম্ভরিতা বা অহং নয়, সেটা আপনি জানেন। আপনি একটা জিনিস সূক্ষ্মভাবে গড়ে তুলবেন, নিজের কাছে উৎকর্ষতা দাবি করবেন সেটা ইগো ছাড়া সম্ভব নয়।”

     নিয়ন্ত্রণ গোয়েন্দা সৃজনের উৎস নিয়ে দ্বিরালাপ করতে চাইছে, এটাও এক ধরণের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি নিশ্চয়।

     ছোট ঘরের অন্য কোনায় একটা ছোট টেবিল, তাতে কিছু পারিবারিক ছবি বাঁধাই করা। জানালা থেকে সেখানে যেয়ে ভেল্টসমার্স ছবিগুলি মনোযোগ দিয়ে দেখে, হুইস্কির বোতলটা টেবিলের ওপর রেখে বলে, “এবার বলুন,” ভেল্টসমার্স বলে, “আপনার সাহিত্যের অনুপ্রেরণার উৎস কী?”

     বুঝলাম ভেল্টসমার্স আমার কাছ থেকে নাম বার করতে চাইছে, বললাম, “কাফকা, অরওয়েল, কোয়েস্টলার।” এরকম উত্তরে সে সন্তুষ্ট হবে না জানতাম। ভাবলাম, সে বলবে, এই শহরে আপনার সমমনা লোকদের নাম জানতে চাইছি। কিন্তু আমাকে কিছুটা আশ্চর্য করেই ভেল্টসমার্স বলল, “আহ, আমরা আবার পুরোনো কথায় ফিরে যাচ্ছি, পুরোনো লেখকেরা অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে না। আপনার লেখায় নতুনত্ব তাহলে কী?”

     এবার আমার রাগই হল, সাবধানতাকে পরিত্যাগ করলাম। বললাম, “নতুনত্ব? নতুনত্ব আবার কী? ইতিহাসের প্রতিটি সময় দাবি করে সেই সময়ের লেখা। না হলে আমরা নতুন গান গাইতাম না। প্রতিটি যুগ মানুষকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় তারা কোন সময়ে বাস করছে। তা যদি না হত মানুষ বুঝতে পারতো না সে এক কুয়োর মধ্যে বাস করে, আপনাদের শত বিধি নিষেধকে সে প্রকৃতি-প্রদত্ত ভাবতো। যেমন এখন পরিচালনা পর্ষদের আইনকে সে ভাবছে যথাযথ, আর যথাযথ যদি না ভাবে সে এটা নিয়ে চিন্তা করতে চায় না।

     “আর নকলের কথাই যদি বলবেন আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপই কি নকল নয়? আপনার সঙ্গে এখন যে বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে সেরকম আলোচনা হাজার বছর ধরে হাজার হাজার লোক করে গেছে। আমরা যে খাই, ঘুমাই তাও তো অনুকরণ করেই, শিশু তো সেভাবেই শেখে। আমরা যে প্রেম করি, কি সঙ্গমে লিপ্ত হই, এসবই কি নিতান্তই নকল নয়? শুনুন সের্গেই ইয়েসেনিন নামে এক কবি ছিল, খুব অল্প বয়সে ভয়ানকভাবে আত্মহত্যা করেছিলেন। তো আত্মহত্যা করার আগে তাঁর জীবিতা মা’র উদ্দেশ্য একটা কবিতা লিখে গেলেন, সেটার শেষ দু’লাইন হল— ‘পৃথিবীতে মৃত্যু কোনও নতুন জিনিস নয়, কিন্তু জীবনও আহামরি কোনও ব্যাপার নয়।’ আসলে ইয়েসেনিন কী বলতে চেয়েছিলেন জানেন? উনি বলতে চেয়েছিলেন, আমি এতক্ষণ যা বলছি, জীবনের কোনও কিছুই নতুন নয়, সবই আগে হয়ে গেছে।”

     “আপনি এসব বলতে পারেন, ডক্টর বি., কিন্তু আমি জানি আপনি এসবে আসলে বিশ্বাস করেন না।”

     টেবিল থেকে আবার আবার জানালার কাছে নিচের দিকে তাকায় ভেল্টসমার্স। বলে, “আর এই শহরের লোকেরা কী বিশ্বাস করে আমি জানি না।” দীর্ঘ প্রশ্বাস ফেলে ভেল্টসমার্স। “পরিচালনা পর্ষদ আপনাকে ক্ষমা করলেও শহরের নাগরিকেরা আপনাকে ক্ষমা করবে না।” আমি আশ্চর্য হই, ভেল্টসমার্সের কথায় সহানুভূতি খুঁজে পাই।

     ভেল্টসমার্স টেবিলের ওপর রাখা আমার কথক যন্ত্রটি তুলে নেয়, বোতাম টিপে যন্ত্রটা বন্ধ করে দেয়। আমাকে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কাছে আর কোনও কথক নেই তো?” আমি বিস্মিত হয়ে হয়ে মাথা নাড়ি, না নেই। ভেল্টসমার্স ঘরের কোনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে, বুঝলাম সে খুঁজছে লুকানো ভিডিয়ো তোলার যন্ত্র, মাইক্রোফোন। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদের মানুষ কেন টেপ করার লুকানো যন্ত্র খুঁজবে বুঝলাম না। সেগুলো দিয়ে তো আমার ওপর চোখ রাখার কথা। বুঝলাম গোয়েন্দারা একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখে না।

     কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে ভেল্টসমার্স বলল, “আপনাকে আমি শহরের বাইরে বের করার ব্যবস্থা করেছি। আপনাকে এখন কারাগারে নিলে আপনি বাঁচবেন না, আর পালাতে চাইলে শহরে মানুষই আপনাকে ধরিয়ে দেবে।”

     “আপনি আমাকে পালাতে সাহায্য করবেন?” আমার বিস্ময়ের বাঁধ মানে না।

     “নিশ্চয়, আমাকে অনেকটা ‘ফারেনহাইট ৪৫১’এর দমকল কর্মী গাই মনট্যাগের মতো ভাবতে পারেন যে কিনা বই পোড়াতে পোড়াতেই বইকে ভালোবাসতে শিখেছিল, শেষে বিদ্রোহ করে শহর থেকে পালিয়েছিল।”

     “তাহলে বলছেন আপনার এই মত পরিবর্তন কিছুটা নকল করে শেখা।”

     “তা আপনি বলতে পারেন, মহৎ আর্টকে অনুকরণ করলে জীবনে হয়তো মহত্ত্ব সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু কোনটা অনুকরণ আর কোনটা নয় সেটা নিয়ে ভাবার আমাদের সময় নেই। দু’জন অতিরিক্ত গোয়েন্দা এখনই এসে পড়বে, তারা এলে আপনাকে এই বাড়ি থেকে আমি বের করতে পারব না।”

     “আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন?”

     “সেটা আপনাকে বলতে পারব না। এই গোপনীয়তাটুকু আমাকে রাখতেই হবে।”

     “কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করব কীভাবে, আমাকে নিয়মের বাইরে নিয়ে মেরে ফেলবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়?”

     “সেটার কোনও নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু আমার কথায় সায় দেওয়া ছাড়া আপনার উপায় কী? আপনি কি নিরাপত্তা ভবনে যেতে চান?”

     “না, তা চাই না, তবে আপনার কাছ থেকে এমন নিশ্চয়তা চাই যে আমাকে গুম করে ফেলবেন না, আমাকে অন্তত একটা নাম বলুন যাতে আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি।”

     ভেল্টসমার্স দ্বিধা করে। তারপর বলে, “প্রফেসর অসিতোপল। তার একটা বড় বাড়ি আছে শহরের প্রান্তে। সেটা আমরা ব্যবহার করছি মতান্তরবাদীদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাবার আগে।”

     এটুকু তথ্যই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমি বাইরের দরজার কাছে গেলাম, ভেল্টসমার্স ভাবল দরজার বাইরে কেউ আমাদের কথা ওঁত পেতে শুনছে কিনা সেটা যাচাই করতে গেছি। আমি দরজাটা খুললাম, বাইরে দুজন দাঁড়িয়ে ছিল, তারাও পরে ছিল ওভারকোট। ভেল্টসমার্সের মতোই তাদের মাথায় ছিল হ্যাট। তারাও নিরাপত্তা কমিটির গোয়েন্দা। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “আপনার ভেতরে আসুন, আমাদের যা জানার সেটুকু জনতে পেরেছি। অধ্যাপক অসিতোপল মতান্তরবাদীদের সাহায্য করছেন। আর গোয়েন্দা ভেল্টসমার্সকে রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য আপনারা গ্রেপ্তার করতে পারেন।”

     সদ্য আগত দুই গোয়েন্দা ভেল্টসমার্সের দিকে অগ্রসর হয়। ভেল্টসমার্স কি পরিস্থিতি এরকম বদলাতে পারে সেই আশঙ্কা করেছিল? সে হেসে ওঠে, “হা, হা, ডক্টর বি.! আমি নকল গাই মনট্যাগ হতে পারি, কিন্তু আপনি একজন সাধারণ বিশ্বাসঘাতক কুইসলিং বা মীরজাফর। আমি মহৎ আর্টকে অনুকরণ করি, আর আপনি নকল করেন ইতিহাসের কুখ্যাত চরিত্রদের। আর আপনি কি ভেবেছেন আমি আপনার বিশ্বাসঘাতকতার ভাবীকথন করতে পারিনি? জানবেন নকল ধরাই আমার ব্যবসা।”

     এরপর, কেউ কিছু বোঝার আগেই, বিদ্যুৎগতিতে, ভেল্টসমার্স তার কোটের পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে আনে। ততোধিক ক্ষিপ্রতায় পরপর তিনটি গুলি করে তিনজনের উদ্দেশ্য, একটা গুলি মনে হয় আমার পেট ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আমি মাটিতে পড়ে যাই, অন্য দুই গোয়েন্দাও মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

     আমার যে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল এমন নয়, শুধু দৃষ্টিটা যেন কেমন আবছায়া হয়ে গেল। দেখলাম ভেল্টসমার্স প্রায় আমার ওপর দাঁড়িয়ে। বলছে, “আপনি যে পরিচালনা পর্ষদের হয়ে ‘শ্যাতোয়ান্ত’ গল্পটি লিখেছেন সেটা আমার মাথায় আসেনি যে তা নয়। আমি যাতে সেটা ডক্টর এলের টেবিলের ড্রয়ারে খুঁজে পাই সেটা বোধহয় আপনার আর নাতসুকাশির যৌথ আইডিয়া। এটা খুবই দুঃখের কথা আপনার মতো এমন একটি গুণী লোক ছ্যাঁচরা গোয়েন্দার কাজ করবে, ডগমাজাতীয় মতবাদ খুব বিপজ্জনক ব্যাপার, ডক্টর বি.!”

     ভেল্টসমার্স নিশ্চিত হয়ে নেয় যে মেঝেতে শায়িত দুই গোয়েন্দা মৃত, তারপর জানালার কাছে যেয়ে নিচের রাস্তাটা পর্যবেক্ষণ করে, বলে, “নাতসুকাশি কথাটার অর্থ তো জানেন? এক ধরনের নস্টালজিয়া, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির কথা মনে করে হাহাকার। খুব গভীর একটা অনুভূতি, তাই না? কিন্তু তার নিজের জীবনে সেই গভীরতা সে হারিয়ে ফেলেছে। জীবনের এই গভীরতা যে হারিয়ে ফেলে সেই সন্দেহের চোখে সবকিছু দেখে। আপনার ক্ষেত্রেও তাই বলা যায়, ডক্টর বি. যদিও আপনি ‘শ্যাতোয়ান্ত’ লিখেছিলেন। আর শাতোয়ান্তের অর্থ যেন কী বললেন? মণি প্রতিফলিত উজ্জ্বলতা। উজ্জ্বলতার কথা লিখলেন, অথচ নিজে চরম অন্ধকারে হাঁটলেন!”

     দেখলাম জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভেল্টসমার্স তার পিস্তলটা আমার দিকে তাক করছে। যন্ত্রণার মধ্যেও বিড়বিড় করে বললাম, “এক ডগমা বদলে আর এক ডগমা আসবে। এতে নতুনত্বের কী আছে?” একটা শব্দের সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের পাশে গরম সীসার অনুভূতি হল।

     ভেল্টসমার্সের আব্ছায়া মুখাবয়ব আমার চোখের সামনে দোলে, শুনতে পাই তার কণ্ঠস্বর, “ডক্টর বি., ভবিষ্যৎ যখন আমার এই কাজটিকে দেখবে, আমাদের দুজনের মধ্যে এই দ্বন্দ্বকে ইতিহাসের অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতের পুনরাবৃত্তি হিসেবেই দেখবে, সেখানে নতুনত্ব কিছু থাকবে না। কিন্তু আপনিই না একটু আগে বললেন ইতিহাসের প্রতিটি সময় দাবি করে সেই সময়ের লেখা, না হলে আমরা নতুন গান গাইতাম না। ভেবে নিন এই ক্ষণের জন্য আমার এই ক্রিয়াটিই নতুন একটি গান— আপনার হৃৎপিণ্ডে আমার বুলেট— সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার একটি কাজ করা, অসিতোপলকে নিয়ন্ত্রণ কমিটির হাত থেকে বাঁচানো… অসিতোপল কথাটির অর্থ জানেন তো? নীলকান্তমণি! নীলকান্তমণিকে রক্ষা করা কি মহৎ কাজ নয়?”

     আমার চোখ বুঁজে আসতে শুরু করে, ভেল্টসমার্সের শেষ কথাগুলি শুনতে পাই না, কিন্তু চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাবার আগে তার ঠোঁটের নড়া দেখে বুঝতে পারি সেগুলো কী ছিল।

4 thoughts on “শ্যাতোয়ান্ত

  • August 16, 2020 at 7:33 pm
    Permalink

    খুব ভালো গল্প।

    Reply
  • August 17, 2020 at 5:11 am
    Permalink

    বাপরে বাপ! এমন গল্প মাথায় আসে কেমন করে, তাই ভাবছি? লেখক দীপেন ভট্টাচার্য আসলে কোন সময়ের মানুষ?? ভীষণ ভাল গল্প। শুভকামনা রইল।

    Reply
  • August 19, 2020 at 10:14 pm
    Permalink

    দুর্দান্ত! চমকের পর চমক। ইউনিক আইডিয়া, আর লেখার স্টাইলের কথা কী বলবো! অনন্য।

    Reply
  • September 15, 2020 at 2:25 pm
    Permalink

    অসাধারণ। এইরকম এক-আধটা গল্প ডিস্টোপিয়াকে নতুন করে তোলে একক দক্ষতায়!

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!