সত্যজিতের এলিয়েন

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

অলংকরণ: সত্যজিৎ রায়, জটায়ু

যাবার কথা ছিল প্লুটোয়, যান্ত্রিক গোলযোগে পৃথিবীতে এসে পড়েছিল ক্রেনিয়াস গ্রহের মহাকাশযানটি। সেই গ্রহেরই চার ফুট উচ্চতার প্রাণী অ্যাং এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল বঙ্কুবাবুর। তাই নিয়েই সত্যজিত রায়ের দ্বিতীয় বাংলা গল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘সন্দেশ’ পত্রিকার ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়। ওই গল্পের সঙ্গেই পাঠক চাক্ষুষ করেছিল সত্যজিতের ইলাসট্রেশন মারফত ‘অ্যাং’-এর শারীরিক গঠনের। বঙ্কুবাবুর বন্ধু অঙ্কুরটিই ক্রমে প্রস্ফুটিত হয়ে আকার নেয় সত্যজিতের প্রথম কল্পবিজ্ঞান কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্র ‘এলিয়েন’ এর চিত্রনাট্যের। যদিও ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’-র সঙ্গে এলিয়েনের কাহিনির মিল ছিল সামান্যই।

     ১৯৬৭ সাল নাগাদ এলিয়েনের চিত্রনাট্য লেখার কাজ শেষ করে ফেলেছিলেন। খেরোর খাতার এক কোণে লেখা ছিল চিত্রনাট্য শেষ করার তারিখ ২৪/২/৬৭। গল্প নয়, পুরো কাহিনিটাই লেখা ছিল চিত্রনাট্যের মাধ্যমে। এলিয়েনের মূল শাঁসটুকু অনেকটা এইরকম: স্বার্থপর ধনী মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী গগনলাল বাজোরিয়া অর্থ ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। গ্রাম বাংলায় এসেছেন জলাধার খোঁড়ার কাজে। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন জো ডেভালিন নামে এক মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারকে। সেই গ্রামেই উপস্থিত হয়েছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক সাংবাদিক মোহন। উদ্দেশ্য গ্রাম্যজীবন পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন লেখা। এই পরিস্থিতিতেই গ্রামের পদ্মপুকুরে অবতীর্ণ হয় ভিন্ন গ্রহের মহাকাশযান। পৃথিবী থেকে পরীক্ষার জন্যে নানা ধরনের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। পৃথিবীতে অবতরণের পর ভিন্ন গ্রহবাসীর মানসিক সংযোগ বা বন্ধুত্ব হয় একমাত্র গ্রামেরই এক অনাথ শিশু, হাবা-র সঙ্গে। গরীব অভুক্ত হাবা ছিল সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার শিকার। হাবার সঙ্গে মানসিক সংযোগ ঘটিয়ে জীবটি তার সঙ্গে খেলাও করে। মহাকাশযানটি দর্শনের পর বাজোরিয়া, ডেভ্লিন, মোহন ও গ্রামবাসীদের বিচিত্র ভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিক্রিয়াও দেখা যেত ছবিটিতে। এলিয়েন-এর আকৃতির ব্যাপারে সত্যজিতের ভাবনা পৌঁছে গিয়েছিল অন্তিম পর্বে। চিত্রনাট্যের সঙ্গে মহাকাশযান ও এলিয়েন অর্থাৎ অজানা গ্রহবাসী বিষয়ক অসংখ্য স্কেচ করে রেখেছিলেন সত্যজিত।

     এলিয়েন দেখতে ছিল খর্বকায়, খেতে না পাওয়া উদ্বাস্তু বালকের মতো। শরীরের তুলনায় কিঞ্চিৎ বড় মাপের মাথা, কোটরগত গাল, ছোট্ট মুখ, ছোট্ট নাক আর কান, শীর্ণকায় শরীরের সঙ্গে হাড় জিরজিরে হাত পা। ছেলে না মেয়ে বোঝা না গেলেও তার শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ে এক অপার্থিব স্বর্গীয় দ্যুতি, যা দেখে বোঝা যায় না, জীবটি শয়তানের প্রতীক না উচ্চ ক্ষমতাবিশিষ্ট প্রাণী। এলিয়েনের দৃষ্টি বলতে ছিল বিভিন্ন রঙের খেলা। চোখের রং দেখেই বোঝা যেত তার মনের স্বরূপ। দূরবীক্ষণের কাজে চোখ হত সবুজ, অনুবীক্ষণের প্রয়োজনে হত নীল, বিভিন্ন বস্তু স্পর্শ করে তার সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের সময় রং হত হলুদ, একই সঙ্গে এনার্জি তৈরি এবং প্রাণীর মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণের কাজে চোখের রং হত বেগুনী। নীরব বা নিস্তব্ধ অথবা প্রাণহীন বস্তুকে সজীব ও সচল করার কারণে লাল হত এলিয়েনের চোখের রং। এর প্রত্যেকটির কার্যকারণ বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ এলিয়েনের চিত্রনাট্যে। সত্যজিতের বিশ্বখ্যাত জীবনীকার মারি সেটন এলিয়েনের আকৃতি ও কার্যক্ষমতার ব্যাপারে লিখেছিলেন, চরিত্রটি সত্যজিতের চিত্রনাট্যের খাতায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সচিত্র উল্লেখ ছিল। আমি আগে সত্যজিৎকৃত অন্য ছবির চরিত্রে এই জিনিস লক্ষ করিনি। এলিয়েন দেখতে দুর্বল ও নিরস্ত্র হলেও সে ছিল মানসিক দৃষ্টিসম্পন্ন অস্ত্রের অধিকারী। নিজেকে রক্ষার জন্যে স্বনিয়ন্ত্রিত এই অস্ত্র সে ব্যবহার করত চোখ দিয়ে। কোনও প্রাণী তার দিকে তাকালেই বা স্পর্শ করলে এলিয়েনের চোখের রং যেত বদলে। আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন এলিয়েন মৃত মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেয়। অল্প সময়েই সবুজ ধানক্ষেত পাকা ধানের সোনালি ক্ষেতে পালটে ফেলে। মুকুলিত আম গাছ ভরে ওঠে পাকা আমে। এলিয়েনের চিত্রনাট্যে সত্যজিৎ বাস্তবতা অ-মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন বৈঞ্জানিক ভিত্তিতে কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্য। এমনি কল্পকাণ্ডের প্রাথমিক রূপ দেখা গিয়েছিল তাঁর ‘পরশপাথর’ ছবিতে। ছবির শেষ পর্বে সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন এলিয়েন পার্থিব নমুনা হিসেবে প্রজাপতি, ব্যাং, সাপ, পদ্মফুল, পাখি প্রভৃতি সংগ্রহ করে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। সেই সঙ্গে নিয়ে চলেছে ফুল নদী আর শষ্যক্ষেতকে বিষয় করে হাবার কাছ থেকে শেখা একটি পল্লীগীতির অংশ বিশেষ। এই সংগীতই ছিল হাবা ও এলিয়েনের মধ্যে ভাব প্রকাশের মাধ্যম। এলিয়েন ছবির চিত্রনাট্যে সবিশেষ লক্ষ করার বিষয় ছিল, সেই সময়কার হলিউডি কল্পবিজ্ঞান ছবিতে যা ছিল অবশ্যম্ভাবী, সেই ‘ডেঞ্জার অ্যান্ড ভায়োলেন্স’ –এর একান্তই অভাব। সত্যজিতের নিজের কথায় কল্পবিজ্ঞান কাহিনি অবলম্বনে ছবিটি হলেও মূলত এলিয়েন মানবিক মূল্যবোধের ছবি।

সত্যজিৎ রায়ের কল্পনায় ভিনগ্রহবাসির চিত্র  

     সত্যজিৎ রায়ের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কৈশোরকাল থেকেই। কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পাঠ, সন্দেশ সম্পাদনার সময় প্রিয় বিদেশি কল্পবিজ্ঞান গল্পের অনুবাদ, নিজে ওই ধরনের গল্প উপন্যাস লেখা ছাড়াও ১৯৬৩-তে অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত ‘আশ্চর্য’ পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যোগ দেন। এমনকি ১৯৬৬ সাল নাগাদ অদ্রীশ বর্ধনের সঙ্গে বিশ্বের প্রথম ‘সায়েন্স ফিকশন সিনে ক্লাব’ প্রতিষ্ঠাও করে ফেলেন। নিজের আগ্রহ ও পরিচয় খাটিয়ে গোটা বিশ্বের বিখ্যাত সব সাই-ফাই ফিল্ম নিয়ে এসে দেখাবার ব্যবস্থা করেন। ওয়াল্ট ডিসনি, রে ব্রাডবরি এমনকি আর্থার সি. ক্লার্কের সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ করে তাঁদের গল্পের অনুবাদ ও সাই-ফাই ফিল্ম আনানোর ব্যবস্থা করেন। এই সময় থেকেই সত্যজিতের কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক ছবি করবার ভাবনা মাথায় আসে এবং লিখে ফেলেন এলিয়েন-এর চিত্রনাট্য। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান কাহিনি লেখক আর্থার সি ক্লার্ক মারফত তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় শ্রীলঙ্কার চলচ্চিত্র প্রযোজক মাইক উইলসনের। কথাবার্তার পর ঠিক হয় ১৯৬৭ সালে উইলসন ‘এলিয়েন’ ছবিটি প্রযোজনা করাবেন। ঠিক হয় বাজোরিয়া নামে মাড়োয়ারির ভূমিকায় অভিনয় করবেন পিটার সেলার্স, মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকার জন্যে প্রথমে ঠিক হয় মার্লোন ব্রান্ডো। ব্রান্ডোর সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে গেলেও ডেট-এর অভাবে তাঁর পরিবর্তে কথা বলেন স্টিভ ম্যাকুইনের সঙ্গে। যদিও পরে এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিত জানান ম্যাকুইনকে না পাওয়া গেলে পল নিউম্যানের সঙ্গে কথা বলবেন। স্পেশাল এফেক্টস-এর জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিলও তৎকালীন দুঁদে কারিগর ও ক্যামেরাম্যান সল বাস-এর সঙ্গে। কথা ছিল ইংরেজি নাম ‘এলিয়ান’ হলেও ভারতীয় সংস্করণের নাম হবে ‘অবতার’। পরবর্তী এক দেড় বছরেই প্রচুর জল ঘোলা হয়। ঠিক হয় উইলসন ছবিটি প্রযোজনা করবেন কলম্বিয়া পিকচার্স এর ব্যানারে এবং সেই সূত্রে উইলসন এলিয়েন এর একাধিক চিত্রনাট্য কলম্বিয়ায় জমা দিয়ে আদায় করে নেয় ১০ হাজার ডলার। যার এক কানাকড়িও পাননি সত্যজিৎ। এইসব কারণেই কলম্বিয়া সত্যজিৎকে জানিয়েছিলেন, উইলসনের সঙ্গে নয়, আমরা নিজেরাই ছবিটি প্রযোজনা করতে ইচ্ছুক। ইতিমধ্যে ঠিক ও হয়ে গেছিল ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের গোড়ায় বোলপুরের কাছে এক গ্রামে শুটিং-এর কাজ শুরু হয়ে যাবে। তার আগে সত্যজিৎ, সুব্রত মিত্র ও বংশীচন্দ্র গুপ্তকে নিয়ে শুটিং স্পটে গিয়ে কিছু ফুটেজও তুলে নিয়ে আসেন। কিন্তু কলম্বিয়া রাজি হলেও মাইক উইলসনের একগুঁয়েমির কারণে শুরু হতে পারেনি এলিয়েনের শুটিং। অফিসিয়াল কারণেই এলিয়েনের চিত্রনাট্যের বেশ কয়েকটা কপি জমা পড়েছিল কলম্বিয়ার অফিসে। ছবির কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও সেইসব চিত্রনিট্যের কপি আর ফেরত আসেনি সত্যজিতের কাছে।

সত্যজিতের আঁকা ‘অ্যাং’-এর মুখ

     ‘আমি যখন স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টার অফ দ্য থার্ড কাইন্ড’ দেখি, আমার দেখা মাত্রই সন্দেহ হয় পরিচালক নিশ্চয়ই সত্যজিতের ‘এলিয়েন’ ছবির চিত্রনাট্যটি, যেটি কলম্বিয়া অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল, সেটি দেখেছেন, নয়ত শুনেছেন। স্পিলবার্গ সত্যজিতের চিত্রনাট্যটি থেকে দুটি বিষয় চমৎকারভাবে তুলে নিয়ে ব্যবহার করেছেন। একটি হচ্ছে অজানা গ্রহবাসীর আকৃতি এবং তাকে দেখে সরল শিশুটির ভয় না পাওয়া। কথাটি মারি সেটন লিখেছিলেন ১৯৮১ সালে। স্পিলবার্গ ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’ তৈরি করেছিলেন ১৯৭৭/৭৮ সালে। এবং ছবিটির জনপ্রিয়তা দেখে এর তিন/চার বছর পর স্পিলবার্গ আর একটি নতুন সংস্করণ বাজারে ছাড়েন। নতুন সংস্করণের কাজ আগেই করে রেখেছিলেন, কিন্তু প্রথমবার ছবিটি মুক্তি পাবার সময় কোন অজ্ঞাত কারণে সেই অংশটি বাদ দিয়ে দেন। প্রথম ছবিটি কলকাতায় মুক্তি পেয়েছিল জ্যোতি প্রেক্ষাগৃহে। ১৯৮২ সালে মিনার্ভা হলে মুক্তি পায় ক্লোজ এঙ্কাউন্টার দ্য থার্ড কাইন্ড-এর স্পেশাল এডিসন। ছবিটি দেখেই ছুটে গেছিলাম সত্যজিৎ রায়ের কাছে। উনি এই বিশেষ সংস্করণটির কথা জানতেনই না। ওঁকে জানাই মারি সেটন ক্লোজ এনকাউন্টারের সঙ্গে আপনার এলিয়েনের দুটি বিষয় মিল খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু নতুন এই ছবিটিতে আরও অনেক কিছুর মিল আছে। যেমন, পৃথিবী থেকে অন্য গ্রহের আগন্তুকেরা নমুনা হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে প্রজাপতি, পাখি, ফুল প্রভৃতি। এসব তো আপনার এলিয়েন এও ছিল। আবার অজানা গ্রহবাসীর সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমটি আপনার ভাবনার মতো স্পিলবার্গও বেছে নিয়েছিলেন সঙ্গীতের রূপ। তা ছাড়া প্রথম ছবিতে অন্য গ্রহবাসীকে খুব একটা স্পষ্ট করে দেখাননি স্পিলবার্গ। কিন্তু নতুন ছবিতে অন্য গ্রহবাসীর সঙ্গে আপনার আঁকা অ্যাং-এর হুবহু মিল আছে।’

‘ক্লোজ এনকাউন্টার অব দ্য থার্ড কাইন্ডঃ স্পেশাল এডিশন’-এর বিজ্ঞাপন  

     সত্যজিৎ চুপ করে শুনে শুধু ‘তাই নাকি’! বলে নিজের কাজে ডুবে গেছিলেন। তবে এর পরের বছর স্পিলবার্গের “ইটি” দেখে আর চুপ থাকতে পারেননি। ১৯৮১ সালে স্পিলবার্গ ‘এ বয়েজ লাইফ’ নামে একটি ছবি করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ছবিটির নাম বদলে রাখেন এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল, সংক্ষেপে ইটি। ১৯৮২ সালে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ইটি প্রথম দেখানো হয়। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক সত্যজিৎ রায়। ছবিটি দেখেই চমকে উঠেছিলেন সত্যজিৎ। দুঃখ পেয়েছিলেন বিজয়া রায়। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে স্বামীর হাত চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘তোমার আর এলিয়েন করা হবে না।‘ ঘটনাটি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ। কথোপকথনে সত্যজিৎ বলেছিলেন, আমার এলিয়েন চিত্রনাট্য থেকে অনেক দৃশ্য, ছবির মূল সুর বা ভাবনা এবং আরও অনেক আইডিয়া তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ চুরি এটাকে বলা যাবে না, কারণ প্রমাণ করা মুশকিল। এলিয়েন ছবিতে হাবার মতো ইটি-তেও ভিন্ন গ্রহবাসীর সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে বালক এলিয়টের। ইটি দর্শনে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াও ইটি-র অঙ্গ। এলিয়েন ও ইটি-র আশ্চর্য ক্ষমতার মিলও খুঁজে পাওয় যায়। আম গাছ বা ধানক্ষেত নয়, ইটি সজীব করে তোলে মৃতপ্রায় জিরেনিয়াম ফুলের গাছটিকে। এলিয়েনের মতো চোখের আলো দিয়ে নয়, মানব শিশুর কেটে যাওয়া আঙুল ইটি সারিয়ে তোলে তার আঙুলের আলো দিয়ে।

     এ বিষয় সত্যজিৎ/স্পিলবার্গের সাক্ষাৎকার হয়নি কখনও। তবে স্পিলবার্গ ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ ছবির কাজে শ্রীলঙ্কায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আর্থার সি ক্লার্ক-এর। ‘এলিয়েন’ চিত্রনাট্য লেখার সময় সত্যজিতের সঙ্গে আর্থার সি ক্লার্কের নানান বিষয় আলোচনা হত। এলিয়েনের চিত্রনাট্যটি তিনি পড়েওছিলেন। কথা ছিল ছবি মুক্তি পাবার পর এই চিত্রনাট্য অবলম্বনে আর্থার ক্লার্ক একটি উপন্যাস লিখবেন। বইটি প্রকাশ করবে একটি বিদেশি প্রকাশক। এবং কাহিনিকার হিসেবে দুজনেরই নাম থাকবে। তিনি সত্যজিতের সঙ্গে ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’ এবং ‘ইটি’- এর আশ্চর্যজনক মিলের কথা বললে স্পিলবার্গ উত্তর দিয়েছিলেন, আমি কি করে সত্যজিতের চিত্রনাট্যের কথা জানব বা হাতে পাব? ১৯৬৭/৬৮ সালে আমি তো স্কুলের ছাত্র। সত্যজিৎ সব দেখে শুনেও চুপ থাকতে চেয়েছেন। তা ছাড়া উনি জানতেন বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের ব্যাপার। এতো সহজে মীমাংসা হবে না। তবুও আইনের আশ্রয় নেবার ব্যাপারে অনেকেই পরামর্শ দিতে চেয়েছেন। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র অসীম ছাবরার এক বন্ধুর মারফত হাতে পান সত্যজিতের কলম্বিয়াকে দেওয়া ‘এলিয়েনের’ চিত্রনাট্যের একটি “ভিডিওগ্রাফ কপি”। সময়টা ১৯৮৩ সাল, উনিও বুঝতে পারেন স্পিলবার্গ শুধু ইটি নয়, ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’ ছবিটিও করতে পারতেন না। অসীম আর্থার সি ক্লার্ক ও সত্যজিতের সঙ্গে যোগাযোগ করে মার্কিন সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধ লেখেন। গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। সত্যজিৎ অনেক ফোন ও চিঠি পান। কিন্তু সত্যজিতের বক্তব্য ছিল: এইসব ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নিতে আমার একদমই ভালো লাগে না।’

     এলিয়েনর মূল চিত্রনাট্য, ছবি তৈরি বিষয়ক চিঠিপত্র, ১৯৮২ সালে সংকর্ষণ রায় ও অমিত চক্রবর্তীর নেওয়া সত্যজিতের সায়েন্স ফিকশন বিষয়ক রেডিয়ো সাক্ষাৎকার, ‘সায়েন্স ফিকশন সিনে ক্লাব’ বিষয়ক কিছু তথ্যাদি নিয়ে গত বছর সন্দীপ রায় সম্পাদিত একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ‘ট্রাভেলস উইথ দি এলিয়েন’। সেই বইতে যেমন কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তেমনি বাদ পড়ে গেছে অন্য অনেক তথ্য।

One thought on “সত্যজিতের এলিয়েন

  • October 4, 2019 at 11:38 pm
    Permalink

    বেশ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। কিন্তু বানানের ভুল বড় চোখকে পীড়া দিল !!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!