সম্পাদকীয়

কল্পবিশ্ব সম্পাদকমণ্ডলী

পৃথিবী বদলাচ্ছে। এবং দ্রুত। তারই মধ্যে কিছু জিনিস বদলে যেতে যেতেও বদলায় না। যেমন উৎসব। কেজো পৃথিবীর লোহালক্কড়-ব্যস্ততার ফাঁকে কখন যেন চুপিসারে উঁকি দিয়ে যায় অন্যমনস্ক কাশফুল। আপনাদের জন্য উৎসবের উপহার নিয়ে হাজির কল্পবিশ্বও। যদিও আপাত ভাবে মনে হবে, উৎসবের সময় এ নয়। জলে বাতাসে মিশে যাচ্ছে বিষ। আমাজনের জঙ্গলের দাউদাউ জতুগৃহের আঁচ আমাদের অস্তিত্বেও কি এসে লাগছে না? তবে হ্যাঁ, তারই মধ্যে এসে দাঁড়াচ্ছে নতুন পৃথিবী। গ্রেটা থানবার্গের মতো এক কিশোরী যখন বিশ্বের বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনেতাদের মুখের উপরে বলে বসে, ‘‘আপনাদের এত সাহস হয় কী করে?’’ তখন বুঝি এই পৃথিবীকে, এই বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের আগামী প্রজন্ম রণব্যস্ততায় নেমে পড়েছে নীল রংয়ের গ্রহটাকে বাঁচাতে। আমরা না পারলেও, ওরা পারবেই।

     ব্যর্থতা আর সাফল্যের টানাপোড়েনের মাঝেই নিজেদের মতো করে এগিয়ে চলেছে কল্পবিশ্ব। বছর কয়েক আগে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’য় উৎসাহী কিছু মানুষ একসঙ্গে যে কাজ শুরু করেছিল তা আজ বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে নতুন পথের সম্মুখীন। ক্রমশ বাড়ছে কল্পবিশ্বের পরিবার। বাড়ছে কর্মকাণ্ডের পরিসর। সেই ছয়ের দশকে রেডিয়োতে বারোয়ারি কাহিনি ‘সবুজ মানুষ’ শুনে মুগ্ধ হয়েছিল বাঙালি। এযুগে কল্পবিশ্ব আবারও ফিরিয়ে আনল সেই হারিয়ে যাওয়া কাহিনিকে। কেবল পুরানো বইটির পুনর্মুদ্রণই নয়, তার সঙ্গে জুড়ে গেল আরও অনেক অনেক কিছু। সবচেয়ে আশ্চর্যের, অতীতের সেই হারিয়ে যাওয়া রেডিয়ো-কাহিনি আবারও খুঁজে বের করেছি আমরা। প্রায় পাঁচ দশক পর আবারও সত্যজিৎ রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অদ্রীশ বর্ধন, দিলীপ রায়চৌধুরীদের কণ্ঠস্বর গমগম করে বেজে উঠল ‘রিডবেঙ্গলিবুকস’-এ গ্রন্থপ্রকাশের দিন! সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘স্ক্রোল’ ও ‘দ্য হিন্দু’-তে ‘সবুজ মানুষ’-এর প্রশংসায় আমরা অভিভূত।

     ইসরোর চন্দ্রযান চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই ব্যর্থতা সামগ্রিক নয়। ল্যান্ডার বিক্রম সফল না হলেও অর্বিটার কিন্তু কাজ করছে। আগামী দিনে সাফল্য আসবেই, এই বিশ্বাস আমাদের আছে। এরই মধ্যে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে ‘বাঙালির চন্দ্রাভিযান’ নিয়ে আড্ডা দিতে হাজির ছিল কল্পবিশ্ব। আমেরিকার আটলান্টার বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সমাবেশে অংশ নিয়েছেন কল্পবিশ্বের সম্পাদক সুপ্রিয় দাস। সুপ্রিয় সেখানে বাংলা কল্পবিজ্ঞান শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ও বাংলা কল্পবিজ্ঞানে কল্পবিশ্বের অবদান নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।  এদিকে ৭২ নং বনমালী নস্কর লেনের সেই বিখ্যাত বাসিন্দা ঘনাদাকে নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে ‘ঘনাদা ক্লাব’। আর সেই প্রয়াসের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছে কল্পবিশ্ব। আসলে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের চর্চা ও প্রসার ঘটানোর জন্য যত রকম সুযোগ আসে তার একটাও হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করে না আমাদের। ক্ষমতা যতই সীমিত হোক, তারই মধ্যে এগিয়ে চলার অদম্য অনুপ্রেরণাতেই নতুন নতুন পথে হাঁটা। সেই নতুন পথে হাঁটতে গেলে অতীতকে সঙ্গে করেই এগোতে হবে। আর তাই সিদ্ধার্থ ঘোষের মতো এক ক্ষণজন্মা জিনিয়াসের কাজকে নতুন দিনের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর কল্পবিজ্ঞান রচনা সংগ্রহের প্রথম খণ্ড পাঠকপ্রিয় হওয়ার পর এবার আসছে দ্বিতীয় খণ্ড। অতীত খুঁড়ে আরও এক উজ্জ্বল উদ্ধারের কথা বলি। রেবন্ত গোস্বামী। বহু প্রজন্মের কৈশোরকে মুগ্ধ করা এই লেখকের সমস্ত কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আমরা প্রকাশ করব কল্পবিজ্ঞান সমগ্র। আশা, সেদিনের পাঠকদের পাশাপাশি নতুন দিনের পাঠকদেরও তৃপ্ত করবেই লেখাগুলি। সত্যিকারের ভালো লেখার সেটাই গুণ। আমাদের পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে রেবন্ত গোস্বামীর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। তাঁর অনুরাগীরা তো বটেই, যিনি এখনও পর্যন্ত সেভাবে পরিচিত নন ওঁর লেখনীর সঙ্গে, তাঁরাও পরিচিত হবেন এক শক্তিশালী লেখকের লেখার সঙ্গে।

     এবারের পুজোসংখ্যায় থাকছে এমনই কত আকর্ষণ! উপন্যাস, বড় গল্প, গল্প, অণুগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদের রকমারি সম্ভার। একদিকে যেমন কলম ধরেছেন দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী আর যশোধরা রায়চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ সিনিয়ার কল্পবিজ্ঞান রচয়িতারা, সঙ্গে থাকছেন ঋজু গাঙ্গুলী, সোহম গুহ, পার্থ দে, রনিন বা ত্রিদিবেন্দ্র নারায়ণ চ্যাটার্জির মতো কল্পবিজ্ঞানের তরুণ তুর্কীরা। এ ছাড়াও নন-ফিকশনে পেয়েছি দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, কৌশিক মজুমদার ও সনৎ কুমার ব্যানার্জির মতো বিদগ্ধ মানুষদের প্রবন্ধ। এ ছাড়া অনেক নতুন বন্ধু প্রথমবারের জন্যে কলম ধরেছেন কল্পবিশ্বের পাতায়। নতুন প্লট ও আইডিয়ার জন্যে নতুন রক্তের জোগান আজ সবথেকে জরুরী কল্পবিজ্ঞানের শীর্ণ শিরায়। নানা বিষয় ও নানা রকমের ক‌লমের বৈচিত্র উৎসবের দিনগুলিতে আপনার সঙ্গী হয়ে উঠুক এটাই কাম্য। কেমন লাগল সেই প্রতিক্রিয়া আপনারা বরাবরই জানিয়ে এসেছেন। এবারও জানাবেন, সে আশা করি। শেষ করার আগে একটা কথা। আগামী বছরের একদম শুরুতে, জানুয়ারি মাসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ এবং কল্পবিশ্বের যৌথ উদ্যোগে একদিনের সমাবেশ আয়োজিত হবে। দিনভর কল্পবিজ্ঞান নিয়ে থাকবে নানা আয়োজন। আপনাদের জন্য রইল সাদর আমন্ত্রণ। উৎসবের দিনে ভালো থাকুন সবাই। সঙ্গে থাকুন। অলমিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!