স্টীমপাঙ্ক কথা

সুমিত বর্ধন

অলংকরণ:দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য (চিত্রচোর)

স্টীম ইঞ্জিন? ইয়েস! স্টীম রোলার? ইয়েস! স্টীম সন্দেশ? সেও ইয়েস, ইয়েস, একবারে চাকুম চুকুম ইয়েস!

কিন্তু স্টীমপাঙ্ক? নো স্যার, কভি নেই শুনা। সেটা কি বস্তু জাঁহাপনা? খায় না মাথায় মাখে?

জানেন না? আচ্ছা গুছিয়ে বলি তাহলে। স্টীমপাঙ্ক হল সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের একটা বিশেষ ঘরাণা। ইংরিজীতে যাকে বলে সাব-জনার।

তা এই বিশেষ ঘরাণার বিশেষত্ব কি?

এই ধারার বিশেষত্ব এই যে, কল্পবিজ্ঞান হয়েও এ ধারা তাকায় ভবিষ্যতের দিকে নয়, অতীতের দিকে। এ ধারার অনুপ্রেরণা সুদূর ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা মানুষের সমাজ নয়, এ ধারার অনুপ্রেরণা ভিক্টোরিয়ান বা এডোয়ার্ডিয়ান জমানার বাষ্পচালিত প্রযুক্তি আর সেই প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজ। তার সঙ্গে মেশে কল্পনার নানা মশলা, কখনও ম্যাজিক তো কখনও কল্প-ইতিহাস।
কল্পবিজ্ঞানের এই ধারাটির অঙ্কের হিসাব দিয়ে বোঝাতে গিয়ে স্টীমপাঙ্ক বাইবেল বইটিতে জেফ ভ্যাণ্ডারমিয়ার দিয়েছেন একটা অদ্ভূত ফর্মূলা।

স্টীমপাঙ্ক = উন্মাদ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কর্তা [আবিষ্কার (বাষ্প x হাওয়া-জাহাজ অথবা লোহালক্কড়ের মানুষ/ অতি-অলঙ্করণের স্টাইল) x (তথাকথিত) ভিক্টোরিয়ান পরিবেশ ] + প্রগতিশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি x অ্যাডভেঞ্চার প্লট

বলাই বাহুল্য, এ ফর্মূলায় অনেক কিছু বলা হলেও, এটা স্টীমপাঙ্ক শব্দটির অতি সরলীকরণ। স্রেফ মজা করা ছাড়া এ ফর্মূলার কোনও মূল্য নেই।

তবে দু-এক লাইনে স্টীমপাঙ্ক ঘরাণার সংজ্ঞা ঠিকমতো দেওয়া না গেলেও, কল্পবিজ্ঞানের এই সাবজন্রের কয়েকটা বৈশিষ্ট্য অবশ্যই আছে। প্রথমত, এই জন্র একইসঙ্গে রেট্রো আর ফিউচারিস্টিক, অর্থাৎ এ ঘরাণা অতীতপ্রেমী হয়েও ভবিষ্যৎমুখী। দ্বিতীয়ত, এ ঘরাণার কাহিনিতে একটা ভাব বা ছাপ থাকে আবিষ্কার আর অ্যাডভেঞ্চারের। তৃতীয়ত, এ ঘরাণা অতীতের হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তিকে আশ্রয় করে বুঝতে চায় ভবিষ্যৎকে।

অবশ্য এই কয়েকটা বৈশিষ্ট্য দিয়েও ঠিক স্টীমপাঙ্ককে বুঝে ওঠা দায়। তার কারণ স্টীমপাঙ্ক ঠিক আর কল্পবিজ্ঞানের কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে গত কয়েক দশকে সিনেমা, কমিকস, ফ্যাশন আর আর্টের দুনিয়া ঢুকে পড়ে স্টীমপাঙ্ক ইদানীং মোটামুটি একধরণের পপ কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং স্টীমপাঙ্কের কথা বিশদে বুঝতে গেলে এসব দিকগুলোও একবার ছুঁয়ে আসতে হবে।

তবে সেটা করার আগে একবার স্টীমপাঙ্কের ইতিহাসটুকু একবার নজর বোলাই।

স্টীমপাঙ্কের যাত্রা শুরু যে দুই দিকপালের কলমের ডগা থেকে, তাঁদের নাম সর্বজনবিদিত। জুল ভের্ণ আর এইচ জি ওয়েলস। ১৮৮০ সালে জুল ভের্ণের “দ্য স্টীম হাউস” কাহিনিতে দেখা গেল একটা যান্ত্রিক হাতীতে চড়ে ভারত ভ্রমণ করছেন এক ইংরেজ। তাঁর বাকি সব গল্পে ভের্ণ নানান প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠকদের অ্যাডভেঞ্চারে পাঠালেন বিভিন্ন অচেনা জায়গায়। চাঁদে (ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন), পৃথিবীর গর্ভে (আ জার্নি টু দি সেন্টার অব দ্য আর্থ) আর সমুদ্রের তলায় (টোয়েন্টি থাউজ্যাণ্ড লীগস আণ্ডার দ্য সী)। এই প্রথমবার পাঠক অবাক হয়ে দেখল কেমন প্রায় সমসাময়িক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মানুষের সামনে খুলে দিতে পারে অজানা দুনিয়ার দরজা। জুল ভের্ণ তাদের সামনে তুলে ধরলেন নানান প্রযুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

এইচ জি ওয়েলস হাঁটলেন খানিকটা অন্য পথে। তিনিও ভের্ণের মতন গল্পের সঙ্গে বিজ্ঞানের কচকচির মিশেল দিলেন বটে, কিন্তু গল্পের প্রযুক্তিকে রাখলেন বাস্তব থেকে দূরে। তাঁর ‘ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস’ আর ‘টাইম মেশিন’ কাহিনিতে মঙ্গলগ্রহীদের ত্রিপদ যান আর সময় ভ্রমণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেল, কিন্তু সে সব প্রযুক্তির বিবরণ কিছু পাওয়া গেল না। তার কারণ এইচ জি ওয়েলসের গল্পে প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান মূল বিষয় নয়, প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানকে সামনে রেখে তিনি গড়েছেন এক কল্পনার জগৎ।
সেকালের সমসাময়িক প্রযুক্তি দিয়ে যদিও বা ভের্ণের নটিলাস গড়া সম্ভব হয়, এইচ জি ওয়েলসের টাইম মেশিন আজকের বিজ্ঞানেরও আওতার বাইরে। ভের্ণ প্রযুক্তির সীমানাটা খানিকটা বাড়িয়ে পাঠককে নিয়ে যেতে চেয়েছেন অ্যাডভেঞ্চারে, এইচ জি ওয়েলস প্রযুক্তির পটভূমিতে রেখেছেন রাজনৈতিক আর সামাজিক কিছু প্রশ্ন। ভের্ণের কাহিনিতে প্রযুক্তি বাস্তব, এইচ জি ওয়েলসের গল্পে প্রযুক্তি আর্ট। কিন্তু আলাদা হলেও এই দুই ভাবধারাই পরের যুগে প্রভাব ফেলবে স্টীমপাঙ্ক জন্র ফিকশনে।
ভের্ন আর এইচ জি ওয়েলস যখন ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডে কাঁপাচ্ছেন তাঁদের নিজের স্টাইলে, তখন আমেরিকায় মাথা চাড়া দিল আর এক শৈলি, যার নাম এডিসনেড।

এডিসনেড নামটা অবশ্য অনেক পরে রাখা। সায়েন্স ফিকশন এনসাইক্লোপিডিয়ার রচয়িতা জন ক্লুট আর পিটার নিকলস ১৯৯৩ নাগাদ আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের নামে এই শৈলির নামকরণ করেছিলেন। এ ধরণের কাহিনি যে সময়ে প্রকাশিত হত, সে সময়ের মানুষ অবশ্য একে ডাইম নভেল বা সস্তার চটি বই হিসেবেই দেখত।

এডিসনেড কাহিনির প্লট মোটামুটি সব একই ছকে ফেলা। একজন আবিষ্কারক, যিনি অবশ্যই পুরুষ এবং অতি অবশ্যই আমেরিকান, বিপদের হাত থেকে বাঁচতে একটা যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেললেন, এবং সেই যন্ত্রের সাহায্যে নিজে তো বাঁচলেনই, বিদেশী শত্রুর হাত থেকে দেশকেও বাঁচালেন।

প্রথম এডিসনেডটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ সালের অগস্ট মাসে। কাহিনির নাম ‘দ্য হিউজ হান্টার অর দি স্টীম ম্যান অব দি প্রেইরিস’, লেখক এডওয়ার্ড এস এলিস। কাহিনিতে মূল চরিত্র জনি ব্রেনার্ডের হাতে গড়া বাষ্পচালিত মানুষ তাকে আর তার শাগরেদ বল্ডি বিকনেলকে একটা হাতটানা গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে গেল এক্কেবারে সেই আমেরিকার পশ্চিম সীমান্তে। সেখানে তারা মাটি খুঁড়ে সোনা হাতাল, রেড ইন্ডিয়ান মারল, তারপর নটে গাছটি মুড়োলে, দেশে ফিরে এক্কেবারে হিরো বনে গেল।

এই প্রথম এডিসনেডটির আদলে এর পর বেরল একই ধরণের আরও কাহিনি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ্যারি এন্টনের ‘ফ্র্যাঙ্ক রীড এন্ড হিজ স্টীম ম্যান অব দ্য প্লেন্স’, আর তার পরবর্তীকালে লুই সেনারেন্সের ‘ফ্রাঙ্ক রীড জুনিয়র এন্ড হিজ স্টীম ওয়ান্ডার’।
এডিসনেড ধারাটি প্রায় বছর বিশেক টিকে থাকলেও এই শৈলির সমস্ত গল্পের প্লট আর একদম গোড়ার ‘স্টীম ম্যান অব দি প্রেইরিস’ কাহিনির প্লটের মধ্যে পার্থক্য বিশেষ থাকত না। পার্থক্য যেটুকু থাকত সেটুকু কেবল ওই মূল চরিত্রের আবিষ্কার করা যন্ত্রটিতে। ওই একটি বিষয়েই প্রতিটা গল্প টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করত তার পূর্বসূরীদের। ফ্র্যাঙ্ক রীড সিরিজে একশো আশিটার কাছাকাছি গল্প বেরিয়েছিল। এসবে একে একে দেখা পাওয়া গেল নানান যন্ত্রের – জল, স্থল অন্তরীক্ষে ভাসা নানা যান, বাষ্পচালিত রোবট আর বৈদ্যুতিক গাড়ি। তবে এদেরকেও ছাড়িয়ে গেল রবার্ট টুম্বসের ‘ইলেকট্রিক বব’স বিগ ব্ল্যাক অস্ট্রিচ’। এ কাহিনিতে দেখা পাওয়া গেল মেশিন গান সমেত একটি যান্ত্রিক অস্ট্রিচের!

তবে এসব কাহিনির নাম আর তাদের মলাটের ছবি যতই চিত্তাকর্ষক হোক না কেন, এগুলো আর আজকের যুগের পাঠকের পাতে দেওয়ার মতন নয়। এদের ছত্রে ছত্রে বর্ণবিদ্বেষ আর জিঙ্গোইজম ঠাসা।

ভের্ন, ওয়েলস আর এডিসনেডের উনবিংশ শতাব্দীর পর এই ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় খুঁজতে আমাদের এরপর আসতে হবে বিংশ শতাব্দীতে, আশির দশকের মাঝামাঝি। এই কালখণ্ডে, কালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টিতে “ওহারা’স” নামে একটি পানশালায় আমরা দেখা পাব তিন কাহিনিকারের – টিম পাওয়ার্স, কে ডব্লু জেটার আর জেমস ব্লেলক। এই ত্রিমূর্তি এই বারটিতে আসতেন কেবল বিয়ারে গলা ভেজাতে নয়, মাথার আইডিয়াগুলোকেও নিজেদের মধ্যে চালাচালি করতে। তিনজনেই থাকতেন কাছাকাছি, এবং তিনজনেরই গভীর পরিচয় ছিল ভিক্টোরিয়ান আর এডওয়ার্ডিয়ান যুগের সাহিত্যের সঙ্গে। এক নতুন ঘরাণার উপন্যাস এবার একে একে বেরিয়ে এলে এঁদের কলম থেকে। পাওয়ার্সের ‘দ্য আনুবিস গেটস’, জেটারের ‘মর্লক নাইট’ আর ‘ইনফার্নাল ডিভাইসেস’ আর ব্লেলকের ‘লর্ড কেলভিন্‌’স মেশিন’। প্রতিটি উপন্যাসই ভিক্টোরিয়ান যুগকে কেন্দ্র করে লেখা কল্পনার ইতিহাস, বা অল্টারনেট হিস্ট্রি। রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি এই সব কাহিনিতে দেখা গেল ঐতিহাসিক চরিত্র আর ঘড়িকল আর বাষ্পচালিত নানা যন্ত্র।

তাঁদের এই নতুন শৈলির নামকরণ করতে গিয়ে জেটার এই প্রথম সৃষ্টি করলেন এক নতুন শব্দ।

স্টীমপাঙ্ক।

আধুনিক যুগে স্টীমপাঙ্কের এই যাত্রারম্ভে একটা জিনিষ স্পষ্ট হয়ে গেল। এই ঘরাণায় কাহিনি রচনা করতে হলে, তার প্লট যাই হোক না কেন, কাহিনির পটভূমিকা বা সমাজের চেহারা কিন্তু হতে হবে ভিক্টোরিয়ান যুগ বা তার আশপাশে। পাওয়ার্স, জেটার আর ব্লেলকের রচনার পর আরও একটা স্টীমপাঙ্ক উপন্যাসের কথা না উল্লেখ করলেই নয়। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত উইলিয়াম গিবসন আর ব্রুস স্টার্লিঙের ‘দ্য ডিফারেন্স ইঞ্জিন’। এই কাহিনিতে কোনওরকম নস্টালজিয়া বা অতীতের প্রতি ভালোবাসা নেই। উপন্যাসের পটভূমি ১৮৫০ সালের এক ডিস্টোপিয়ান দুনিয়া। এ কল্প-ইতিহাসে চার্লস ব্যাবেজ সফলভাবে বানিয়ে ফেলেছেন তাঁর যান্ত্রিক কম্পিউটার। ফলে ব্রিটেনে একই সঙ্গে উদয় হয়েছে শিল্পবিপ্লব আর তথ্য-প্রযুক্তি যুগের। এ কাহিনির দুনিয়ায় জেট বসানো এয়ারশিপ আকাশ চিরে উড়ে যায় কয়লার গুঁড়োকে জ্বালানী করে, পিরামিডের আকারের বাড়িতে বসানো যান্ত্রিক আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কাজ করে শব্দ-মুখর ছন্দে, তেলের ক্যান হাতে তার সেবাযত্ন করে শ্বেতবস্ত্র সাধুরা।

১৯৯৫ সালে আসে আরও কয়েকটি স্টীমপাঙ্ক রচনা। পল ডি ফিলিপো’র ‘স্টীমপাঙ্ক ট্রিলজি’, নীল স্টিফেনসনের ‘ডায়মণ্ড এজ’ আর ফিলিপ পুলম্যানের ‘দ্য গোল্ডেন কম্পাস’।

এর পরের দশকে আরও কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, চায়না মেভিলের ‘পেরডিডো স্ট্রীট স্টেশন’, এস এম স্টার্লিং রচিত ‘দ্য পেশোয়ার ল্যান্সার্স’, আর কেনেথ ওপেলের ‘এয়ারবর্ন’।

এর পরের সময়ের সফল এবং চর্চিত স্টীমপাঙ্ক রচয়িতাদের কথা আলোচনা করতে গেলেই উঠে আসে তিন মহিলা ঔপন্যাসিকের নাম। চেরি প্রিস্ট, গেল ক্যারিগার আর একাটেরিনা সেডিয়া। এঁরা স্টীমপাঙ্ক ঘরাণায় নিজেদের মতন করে নিয়ে এসেছেন নতুন বৈচিত্র। চেরি প্রিস্টের ‘বোনশেকার’ উপন্যাসের পটভূমি ব্রিটেন থেকে সরে এসেছে আমেরিকায়, কাহিনিতে জায়গা পেয়েছে জম্বি আর এয়ারশিপ। একাটেরিনা সেডিয়া’র ‘দ্য আলকেমি অব স্টোন’ উপন্যাসে ম্যাটি নামে এক ঘড়িকল নারী জড়িয়ে পড়ে আলকেমিস্ট আর মেকানিস্টদের পরস্পরবিরোধী রাজনীতিতে। গেল ক্যারিগারের ‘সোললেস’ উপন্যাসে স্টীমপাঙ্কের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্যারানর্মাল। কাহিনির পটভূমি এমন এক ব্রিটেন, যেখানে ওয়েরউলফ আর ভ্যাম্পায়াররাও সমাজের অংশ বলে বিবেচিত হয়, আর কাহিনির মুখ্য চরিত্র এক আত্মাহীন মানবী।

আধুনিক কালে স্টীমপাঙ্ক জন্র অবশ্য মাত্র এই কয়েকজন কাহিনিকার আর এই কয়েকটা বইতে শেষ নয়। লেখকদের তালিকাটা আরও অনেক দীর্ঘ। বইয়েরও। তাদের প্রতিটিকে নিয়ে বলতে গেলে লেখাটা তথ্য ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বে। তা ছাড়া ইন্টারনেট আর উইকিপিডিয়ার যুগে এসব তথ্য সহজলভ্য। সুতরাং উপন্যাস ছাড়া আর কোথায় স্টীমপাঙ্কের প্রভাব পড়ছে, সেগুলোতে একবার চোখ বোলানো যাক।

আগে আসি কমিকসের কথায়। এখানেও তালিকাটা ছোট নয়, সুতরাং দু-একটি উল্লেখযোগ্য কমিকসের নাম করেই থামতে হবে।
প্রথমে আসি ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটা ওয়েব কমিকসের কথায়। সিডনি পাডুয়া’র ‘লাভলেস এণ্ড ব্যাবেজ’। নামেতেই মালুম, গল্পের মূল চরিত্র চার্লস ব্যাবেজ আর অ্যাডা লাভলেস। এই দুজনের কীর্তিকলাপ নিয়েই এই মজাদার কমিক স্ট্রিপ। ২০১৫ সালে এই দুই চরিত্র নিয়ে প্রকাশিত হয় একটি গ্রাফিক নভেল, ‘দ্য থ্রিলিং অ্যাডভেঞ্চার্স অব লাভলেস এণ্ড ব্যাবেজ’। কাহিনিতে লাভলেস আর ব্যাবেজ মিলে তাঁদের বানানো অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন দিয়ে অপরাধের কিনারা করেন।

তবে স্টীমপাঙ্ক কমিকসের যাত্রা কিন্তু এরও দশ বছর আগে, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত অ্যালান মুর আর কেভিন ওনীলের ‘লীগ অব এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলমেন’-এর হাত ধরে। ১৮৯৮ সালের পটভূমিকায় লেখা এই গল্পে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স কাজে লাগিয়েছে কয়েকটি বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রকে – ক্যাপ্টেন নিমো, অ্যালান কোয়ার্টারমেন, ডক্টর জেকিল আর ইনভিজিবিল ম্যান হলি গ্রিফিনকে।

বই আর কমিকসের দুনিয়ার বাইরে স্টীমপাঙ্ক তার ছাপ ফেলেছে ছবিতে আর ভাস্কর্যেও। আর পৃথিবীর বৃহত্তম স্টীমপাঙ্ক ভাস্কর্যটি দেখতে আপনাকে হাজিরা দিতে আমেরিকার উইসকন্সিনের ফরেভারট্রন পার্কে। এখানে এই পঞ্চাশ ফুট উঁচু আর একশো কুড়ি ফুট উঁচু স্থাপত্যের দিকে আপনি হাঁ করে তাকিয়ে দেখবেন, কেমন তাকে গড়তে কাজে লাগানো হয়েছে ১৮৯০ সালের ডায়নামো, ১৯২০ সালের পাওয়ার প্ল্যান্টের যন্ত্রাংশ আর অ্যাপোলো এগারো মহাকাশযানের অংশ। এই বিশাল স্থাপত্যের ছায়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি আরও নানান ভাস্কর্য। যেন লোহালক্কড়ে বানানো দানবিক কীটপতঙ্গ আর অদ্ভূত দর্শন পাখি। এ সবেরই স্রষ্টা টম এভেরি, যিনি নিজের পরিচয় দেন ডক্টর এভারমোর বলে।

স্টীমপার্ক আর্ট প্রসঙ্গে এসে পড়ে আরও নানান শিল্পীর নাম। জেক ভন স্লাট টম এভেরির মতো স্থাপত্য বানান না, তিনি কাজের বা অকাজের জিনিষকে একটা পুরানো স্টীমপাঙ্ক মার্কা রূপ দেন। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ভিক্টোরিয়ান আদলের কম্পিউটার আর স্টীমপাঙ্ক গীটার। তাঁর মতো আর এক কারিগর ডাটাম্যান্সার বানিয়েছেন স্টীমপাঙ্ক ল্যাপটপ আর গথিক কম্পিউটার। রাশিয়ান শিল্পী ভ্লাদিমির গজদেভ ছবি আঁকেন ঘড়িকল বা বাষ্পে চলা জন্তু-জানোয়ারের। মাইক লিবি গড়েন ঘড়িকলে চলা কীট-পতঙ্গ।

স্থাপত্য আর আর্টের পর আসি একটা প্রদর্শনীর কথায়। জুল ভের্ন থাকতেন ফ্রান্সের নান্টেসে। কখনও যদি এখানে পদার্পণ করেন তাহলে এখানে ‘মেশিনস অব দ্য আইল অব নান্টেস’ স্টীমপাঙ্ক পার্কে দেখা পাবেন একটি চল্লিশ ফুট উঁচু যান্ত্রিক হাতির। গোটা পঞ্চাশেক সওয়ারী নিয়ে এ হাতি স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে পারে। এ ছাড়া একটা বিশাল নাগরদোলার মধ্যে দেখতে পাবেন স্টীমপাঙ্ক ঘরাণায় গড়া সামুদ্রিক প্রাণীদের। এরপর ইচ্ছে হলে চড়ে দেখতে পারেন যান্ত্রিক মাকড়সা কিংবা যান্ত্রিক সারসের পিঠেও।

হলিউডের স্টীমপাঙ্ক সিনেমার কথায় আসি। খাঁটি স্টীমপাঙ্ক সিনেমা বলতে গেলে ‘দ্য লীগ অব এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টলমেন’-এর কথা প্রথমেই উঠে আসে। এ ছাড়া ‘গোল্ডেন কম্পাস’ আর ‘শার্লক হোমস’ সিনেমাদুটিতেও রয়েছে স্টীমপাঙ্কের প্রভাব।

স্টীমপাঙ্ক ঘরাণার এই ব্যাপ্তি সত্ত্বেও একটা প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক। কয়েকশো বছর আগেকার একটা কালখণ্ডের সমাজ, ইতিহাস, বেশভূষা, যন্ত্রপাতি নিয়ে এই মাতামাতির কারণ কী?

এর উত্তর হয়তো অনেকরকম হতে পারে। কিন্তু আমি আমার মতন করে দিই।

স্টীমপাঙ্ক এমন একটা সময়ের দিকে ফিরে তাকানো, যে সময়ে যন্ত্র থাকলেও যান্ত্রিকতা ছিল না, যে সময়ে যন্ত্র মানুষের কাছে সম্পূর্ণ দূর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি, যে সময় মানুষের কাছে যন্ত্র ছিল প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের সহায়ক। বর্তমানের যন্ত্রনির্ভর যান্ত্রিক জীবনের প্রতি কিছুটা বিদ্রোহের মানসিকতাই সম্ভবত স্টীমপাঙ্কের প্রতি আকর্ষণের অন্যতম কারণ।

স্টীমপাঙ্কের আরও কিছু কথা রইল রেফারেন্স লিঙ্কে –
https://www.lesmachines-nantes.fr/en/
https://www.travelobscura.com/2018/02/08/dr-evermors-forevertron-sculpture-park-wi-steampunk-power-on/
https://insectlabstudio.com/
https://bonexpose.com/featured/vladimir-gvozdev/
https://www.brainpickings.org/2015/06/15/the-thrilling-adventures-of-lovelace-and-babbage-sydney-padua/
====================================================================
তথ্যঋণ – Jeff Vandermeer / The Steampunk Bible

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!