স্পন্দন সিরিজ – প্রথম প্রাণের স্পন্দন ও আমরা (পর্ব-১)

শুভময় ব্যানার্জী

অলংকরণ:শুভময় ব্যানার্জী

শীতের সকাল। প্রোফেসর সূর্যশেখর সেনগুপ্ত গরম কফিতে সবে চুমুক দিয়েছেন, এমন সময় কলিংবেল বাজল। ‘হরি, কে এল দ্যাখ’ বলে কফিতে তিনি আবার মনোনিবেশ করলেন। প্রোফেসরের বহুদিনের গৃহভৃত্য হরি দরজা খুলেই‘আরে দেখুন, কতদিন পর উজানবাবু এল’ বলে একগাল হেসে উঠল। প্রোফেসর সেনগুপ্ত ভারি খুশি হলেন। বলে উঠলেন, ‘উজান আয়, তোর’তো আর দেখাই পাওয়া যায় না। কলেজের ছুটি নিশ্চয়ই?’ বছর একুশের এক সপ্রতিভ যুবক ঘরে এসে বলল, ‘হ্যাঁ, কলেজে ছুটি পড়েছে। পরীক্ষা ছিল বলে আসা হয়নি। কিন্তু, তোমারই তো গেছোদাদার মতো অবস্থা, আজ রানাঘাট তো কাল তিব্বত! শুনলাম, আবার পৃথিবী ভ্রমণ করতে বেরিয়েছ। এবার কোথায় কোথায় গেলে কাকা?’ ‘হবে, হবে, সে সব হবে—আগে একটু গরম কফি খা’ বলে হরির দিকে ফিরে প্রোফেসর বললেন, ‘ও হরি, ছেলেটাকে একটু গরম কফি আর স্যান্ডুইচ দে।’

    প্রোফেসর সূর্যশেখর সেনগুপ্ত প্রাণীবিদ্যার নামকরা অধ্যাপক। সারা বছরই তাঁর নানা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেকচার দেবার জন্যে ডাক পড়ে। এছাড়া, জুওলজিক্যাল সার্ভের নানা গবেষণার কাজে প্রায়ই ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় পৃথিবীর নানা অজানা জায়গায়। উজান তাঁর একমাত্র ভাইপো। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাণীবিদ্যায় প্রথম বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনায় খুব আগ্রহ। ফোটোগ্রাফিতে বেশ ভালো হাত। কাকা-ভাইপো প্রায়ই মেতে ওঠেন নানা অদ্ভুত আলোচনায়। প্রোফেসর সেনগুপ্ত বিজ্ঞানের গম্ভীর বিষয়কে এত সহজে গল্পের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন, তাঁর আলোচনা আর গল্পের টানে উজান এবং তাঁর বন্ধুরা তাঁর কাছে হাজির হয়। প্রোফেসর বিয়ে করেননি। উজান তাঁর কাছে পুত্রসম, আবার বন্ধুস্থানীয়ও বটে। আসলে, প্রোফেসর প্রবীণ, রাশভারী অধ্যাপক নন, প্রাণখোলা মানুষ আর নবীন, অনুসন্ধিৎসু মনের মানুষ তাঁর ভারী প্রিয়।

    উজান সোফায় বসে কিছুটা অন্য আলোচনার পরে বলল, ‘আমাদের আজকের গল্পটা আজ জমবে মনে হচ্ছে। জানো কাকা, কালকে বন্ধুদের সঙ্গে এডগার রাইজ বারোজের লেখা “এ প্রিন্সেস অব মার্স” নিয়ে খুব তর্ক হচ্ছিল। জন কার্টারের মঙ্গল গ্রহে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা… আমার তো অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে লেখার বিষয়টা বেশ একদিকে ইণ্টারেসটিং আবার কনট্রোভারসিয়াল বলে মনে হয়’। প্রোফেসর সেনগুপ্ত শুনে একটু চুপ থেকে বললেন, “এ প্রিন্সেস অফ মার্স”… বারসোম সিরিজের প্রথম বই। বেশ জনপ্রিয় হয় লেখাটি। নে, কফি খা’। স্যান্ডুইচে কামড় দিয়ে উজান বলল, ‘বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, অন্য গ্রহে প্রাণ আছে কি নেই, সেটা সবার জানার উৎসাহ খুব। কিন্তু, আমাদের এই সবুজ গ্রহে কীভাবে প্রাণ এল, সে বিষয়ে তাদের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়। কাকা, এই ব্যাপারে তোমার মত কী?’ প্রোফেসর সেনগুপ্ত হেসে বললেন, ‘সে গল্প তো বেশ গভীর। কারণ, পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উৎস কোথায় এবং কীভাবেই বা তার উৎপত্তি, সে নিয়ে সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জিজ্ঞাসার আর কৌতূহলের শেষ নেই। জানিস তো, ২০১৬ সালে এক বৈজ্ঞানিক সন্মেলনে এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে যে, আমাদের সমস্ত জীবজগতের আদি পূর্বপুরুষ হলেন এক ব্যাকটেরিয়া! তাও যে সে ব্যাকটেরিয়া নয়, বিশেষ এক আর্কিব্যাকটেরিয়া’। ‘সবচেয়ে প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া-তাই না কাকা?’ উজানের প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ, চোখে দেখা যায় না এমন সব প্রাচীন অণুজীব যারা পরিবেশের চরমতম প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকে! যার থেকে কিনা তৈরি হল বিচিত্র সব গাছগাছালি, অদ্ভুত সব প্রাণী—যাদের অস্তিত্ব আজ সারা পৃথিবী জুড়ে। আসলে বুঝলি, জীবের প্রাণ-রহস্যের সন্ধান জানতে বিজ্ঞানীরা বহুযুগ আগে থেকেই অসাধারণ সব গবেষণা শুরু করেছিলেন। বিজ্ঞানীদের কালজয়ী সেইসব গবেষণার গল্প, কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতোই অবাক-করা ও ভীষণ চমকপ্রদ। তবে, সে গল্পে যাবার আগে, পেছিয়ে যাওয়া যাক ১৮৫৯ সালের মাঝামাঝি। সালটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, বুঝলি, কারণ সেই সালেই স্বয়ং চার্লস ডারউইন সাহেব বিজ্ঞানজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তাঁর বিখ্যাত “বিবর্তনবাদ” এর ধারণা দিয়ে। তুই তো জানিস, বহুযুগ ধরেই এই পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির কারণ হিসাবে কিছু ভ্রান্ত, অবৈজ্ঞানিক ধারণা চলে আসছিল। মূলত ধর্মান্ধ, গোঁড়া ক্যাথলিক ধর্মযাজক সম্প্রদায় সেই সব ভুল ধারণা মানুষদের বোঝাতেন। সেই সময়ে ডারউইনের মতবাদ প্রাণসৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ভাবনা-চিন্তার পথকে সুগম করে’। প্রোফেসর থামলেন। কফিতে চুমুক দিয়ে উজান বলল, ‘কিন্তু কাকা, আমি যতদূর জানি, ডারউইন ক্যাথলিকদের সঙ্গে তাঁর মতবাদ নিয়ে সরাসরি বিবাদে যেতে চাননি, তাই বোধহয় প্রাণ সৃষ্টি সম্পর্কে আবছা কিছু ধারণা দিয়েছিলেন’। ‘ঠিক বলেছিস’–প্রোফেসর সেনগুপ্ত বললেন। ‘আসলে, ১৮৭১ সালে, ডারউইন তাঁর পরিচিত জোসেফ ডাল্টন হুকারকে লেখা এক চিঠিতে প্রাণ সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে কিছু চিন্তার আভাস দিয়ে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রাক-জৈবিক পৃথিবীর (Pre-biotic earth) সমুদ্রে, অ্যামোনিয়া, ফসফরিক লবনের সংমিশ্রণে, আলো, তাপ, বিদ্যুৎপ্রবাহের প্রভাবে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত ঘন, উষ্ণ তরল! ডারউইন সেই পরিবেশকে “উষ্ণ, ছোট্ট জলাশয়” বলে উল্লেখ করেন। চিঠির সেইটুকু বক্তব্যের ভিত্তিতে ধারণা করা যায়, ‘আদিম প্রাণ’ হয়তো সেই বিশেষ তরল থেকে সৃষ্টি হয়েছিল’। ‘বেশ ইন্টারেস্টিং তো! এরপর?’ উজানের আগ্রহী গলার প্রশ্ন। প্রোফেসর বললেন, ‘ডারউইনের এই ধারণার প্রায় ৫০ বছর কেটে গেল। এর পর, ১৯২৪ সালে, রাশিয়ার বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আলেকজান্ডার ওপারিন ডারউইনের ধারণাকে মতবাদের রূপ দিলেন। ওপারিন ও আর এক বৈজ্ঞানিক জে বি হ্যালডেন দুজনে প্রায় একই বিষয়ে কাজ করছিলেন, দুজনে ১৯২৯ সালে “ওপারিন-হ্যালডেন মতবাদ” প্রকাশ করলেন। তাঁদের দুজনেরই একই সিদ্ধান্ত ছিল যে—সমুদ্রের জলে, রাসায়নিক বিক্রিয়াজাত পদার্থ থেকে পৃথিবীতে জীবনের প্রথম অধ্যায় বা ‘আদিমতম প্রাণবিন্দু’ এর সৃষ্টি হয়েছে। তবুও এখনো বোঝা গেল না, কিভাবে কিছুমাত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া সজীব প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে! ফলে, বিজ্ঞানীরা অন্ধকারে রইলেন আরও প্রায় ২৫ বছর।

    এর পরেই ঘটল এক কালজয়ী ঘটনা!’ ‘কী ঘটনা কাকা?’ উৎসাহী উজান। ‘শোন, সে গল্পটা বলার আগে, একজন মানুষের সঙ্গে তোর পরিচয় করানো যাক। ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে, বিশিষ্ট দম্পতি ছিলেন নাথন ও এডিথ মিলার। তাঁদের পুত্র স্টানলি ছিলেন ভীষণ মেধাবী। বিশেষ করে কেমিস্ট্রিতে ছিল অসাধারণ দখল। বন্ধুরা মজা করে তাকে ‘রসায়নের জাদুকর’ বলে ডাকতেন। সেই, স্টানলি যখন ইউনিভার্সিটি অব চিকাগোতে গবেষণা করছেন, সেখানকার রসায়নের অধ্যাপক এডওয়ার্ড টেলর কথোপকথন সূত্রে তাঁকে এক বিশেষ বিষয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন— যেমন, কীভাবে নক্ষত্রে মৌল-পদার্থ বা এলিমেন্ট তৈরি হয়? এই বিষয়ে পড়াশোনা করতে করতে স্টানলি অদ্ভুতভাবে পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে গবেষণা করতে গভীরভাবে আকৃষ্ট হন’। প্রোফেসর কিছুক্ষণ তাঁর হাতের বইটার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘এর পরের ঘটনা বিবর্তনবাদের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। মনে রাখিস, সালটা ছিল ১৯৫১। পড়াশোনা আর গবেষণায় স্টানলির দিনগুলো বেশ কাটছিল। সেই সময়ে ইউনিভার্সিটি অব চিকাগোতে রসায়নের গবেষক ছাত্রদের নিয়মিত ডিপার্টমেন্টাল সেমিনারে যোগ দিতে হত। সেই রকম এক সেমিনারে স্টানলি দেখা পেলেন সমকালীন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এবং রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হেরল্ড উরের। সেমিনারে অধ্যাপক উরে এক নতুন কথা বলেছিলেন, প্রাক-জৈবিক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ‘বিজারক গ্যাস’, অর্থাৎ- মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড ও হাইড্রোজেনের  মিশ্রণ। তাঁর মতে সেই আবহাওয়ায়, সম্ভবত গ্যাসমিশ্রনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায়, তৈরি হয় জৈবযৌগ (Organic compound), যা পরবর্তীকালে প্রাণসৃষ্টির মৌলিক রসদ হিসাবে কাজ করে। সেমিনারে, অধ্যাপক উরের কথা স্টানলিকে গভীরভাবে অণুপ্রানিত করে। এরপর তিনি নিজে অধ্যাপক উরের সঙ্গে দেখা করে, তাঁর সঙ্গে যৌথভাবে “প্রাক-জৈবিক পরিবেশ” এর উপর গবেষণার অনুমতি চাইলেন। তবে, অধ্যাপক উরে প্রথমে সম্মত হননি, অনেক অনুরোধের পর স্টানলিকে ওই বিষয়ে কাজ করার অনুমতি দেন। তবে এক শর্তে—মাত্র এক বছর সময়! তার মধ্যে গবেষণার কাজ শেষ করতে হবে, না হলে এই গবেষণার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই শর্তেই রাজি হলেন স্টানলি মিলার’। উজান নড়েচড়ে বসল। ‘বুঝলাম, কিন্তু, কীভাবে ওই এক্সপেরিমেন্ট হল কাকা? কাজটা তো বেশ কঠিন ছিল’ উজানের মন্তব্য। প্রোফেসর বললেন, ‘ঠিকই বলেছিস, এই গবেষণায় প্রধান সমস্যা ছিল পরীক্ষার উপযুক্ত যন্ত্র ও পরিবেশ তৈরি করা। যদি জৈব পদার্থের “প্রাক-জৈবিক সংশ্লেষ” (Pre-biotic synthesis) করতে হয় তবে তার জন্যে চাই বিশেষ যন্ত্র। অবশ্য, স্টানলি জানতেন, গ্যাসমিশ্রনে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ ব্যাবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটান যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঠিক যেমন বিজ্ঞানী লর্ড ক্যাভেন্ডিস বাতাসে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের সাহায্যে নাইট্রাস অ্যাসিড তৈরি করেছিলেন। সত্যি, সাধে কি আইনস্টাইন বলেছিলেন, “Imagination is more important than knowledge”!

    প্রোফেসর কিছুক্ষণ বুকশেলফে রাখা তাঁর প্রিয় বইগুলির দিকে চেয়ে রইলেন। বললেন, ‘শুধু স্বচ্ছ চিন্তা আর কল্পনা মানুষকে বহুদূর নিয়ে যায়… আর সঙ্গে চাই কাজটা করার প্রবল ইচ্ছে। সত্যি, সেই সময়ে ওই এক্সপেরিমেন্টটা করা মোটেও সহজ ছিল না। প্রয়োজন ছিল একটা দুরন্ত বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার।

    আসলে, স্টানলির ধারণা ও কল্পনায় ছিল আদিম পৃথিবীর ছবি। যেখানে মুহুর্মুহু ঘটে চলেছে বজ্রপাত এবং তার সঙ্গে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত—যা বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় উপাদানের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল। স্টানলি মিলার ও অধ্যাপক উরে দুজনে মিলে এক অদ্ভুত যন্ত্রের পরিকল্পনা করলেন। যন্ত্রটিকে ‘মিলার অ্যাপারেটাস’ বলে, জানিস তো। ওই যন্ত্রটি ছিল প্রাক-জৈবিক পরিবেশের এক সিম্যুলেসান মডেল’ অর্থাৎ, প্রাক-জৈবিক পরিবেশকে ল্যাবোরেটরিতে আনার প্রচেষ্টা’।  ‘সেটা কীরকম ব্যাপার?’ উজান বলে উঠল। প্রোফেসর বললেন-‘শোন, আগে পরীক্ষার সেট আপ সম্বন্ধে বলি। দুটি কাচের বড় ফ্লাস্ক নেওয়া হয়েছিল, যারা কিছু কাচের টিউব দিয়ে যুক্ত ছিল। নিচের ফ্লাস্কে রাখা হল জল এবং উপরের ফ্লাস্কে ছিল— মিথেন, অ্যামোনিয়া, ও হাইড্রোজেন গ্যাসের মিশ্রণ। এই ফ্লাস্কে বিদ্যুৎ স্ফুরণের জন্যে ইলেকট্রোড যুক্ত করা ছিল। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, এই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ তাঁদের যন্ত্রে প্রতিফলিত করেছিলেন! সূর্যের তাপে যেভাবে সমুদ্রের জল বাষ্পীভূত হয়, ঠিক সেভাবে নিচের ফ্লাস্ক থেকে উত্তপ্ত জলকে বাষ্পীভূত করে পাঠিয়ে দেওয়া হল উপরের ফ্লাস্কে। জলীয় বাষ্প মিশ্রিত হল গ্যাস মিশ্রনের সঙ্গে। বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ চালনা করে ঘটানো হল রাসায়নিক বিক্রিয়া। নতুন কোনও বিক্রিয়াজাত পদার্থ তৈরি হলে তা ঘনীভূত হয়ে নেমে আসবে নিচের ফ্লাস্কে। ঠিক যেমন মেঘ থেকে ঝরে পড়ে বৃষ্টি, আর মিশে যায় সমুদ্রের জলের সঙ্গে। বুঝেছিস?’ উজান চোখ গোল গোল করে বল্ল-‘উরিব্বাস! এতো দারু এক্সপেরিমেন্ট। কি হল এর পর?’

    চশমার কাচ মুছতে মুছতে প্রোফেসর বললেন, ‘এর পর যা হল, সেটা বেশ মজার। পর পর দু’দিন ধরে ক্রমাগত বিদ্যুৎপ্রবাহ চালিয়ে স্টানলি পেলেন একটি সরল অ্যামিনো অ্যাসিড-গ্লাইসিন। আর কিছু না। দমে না গিয়ে, পরীক্ষা চালালেন টানা আরও এক সপ্তাহ। দেখা গেল, দুটি ফ্লাস্কে কোথাও প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই! কিন্ত, ফ্লাস্ক দুটি ঘন লাল আঠালো তরলে পরিপূর্ণ। এই তরলের রাসায়নিক বিশ্লেষণে পাওয়া গেল প্রায় কুড়িটি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড! প্রাণের স্পন্দন এক্ষেত্রে পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু পরীক্ষায় জানা গেল— আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঠিক একইভাবে তৈরি হয়েছিল জীবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানগুলি। এই পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ বিবর্তনবিদ্যার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবি, বিখ্যাত “সায়েন্স” পত্রিকায় সে সময়ে স্টানলি মিলারের গবেষণার কাজ প্রকাশিত হয়’। প্রোফেসর একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, ‘স্টানলি মিলার তার সারাজীবনের গবেষণায় কেবল একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন—কীভাবে অজৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া, জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয় এবং তার থেকে বিপাকজাত বিক্রিয়ার (Metabolic reaction) সৃষ্টি হয়? তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, অ্যামিনো অ্যাসিড ছাড়াও কিছু অন্যান্য পদার্থ ওই তরলে ছিল, যেমন নিউক্লিওবেস। সেটা কি জানিস তো?’ ‘হ্যাঁ, জানি, নিউক্লিওবেস হল নিউক্লিক অ্যাসিডের মানে RNA বা DNA এর গঠনগত উপাদান। তাহলে কি কাকা ওই সময়ে RNA আর DNA তৈরি হচ্ছিল?’ উজান প্রশ্ন করল। প্রোফেসর মাথার পিছনে হাত দিয়ে চোখ বুজে বললেন, ‘আসলে ওই সময়ে যে নিউক্লিওবেস পাওয়া যায় তার প্রকৃতি বর্তমান রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের (RNA) নিউক্লিওবেসের চেয়ে বেশ কিছুটা আলাদা। অবশ্য, পরে জানা যায় সেই প্রাচীন নিউক্লিওবেসগুলি পরিবেশে স্থায়িত্ব লাভ করে ও প্রতিলিপি গঠনের (Replication) ক্ষমতা পায়। তখন শুরু হল জীব বিবর্তনবাদের নতুন এক আশ্চর্য অধ্যায়— “আরএনএ বিশ্ব” (RNA World)’। ‘আচ্ছা, এই আরএনএ ওয়ার্ল্ড এর ব্যাপারটা কি’ উজানের নতুন প্রশ্ন। ‘বলছি, বলছি, তার আগে RNA কি সেটা তোকে ক্লিয়ার করতে হবে’ প্রোফেসর বলে চললেন,

    ‘পৃথিবীতে RNA বা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের উৎপত্তি প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে। RNA এক আশ্চর্য অণু। এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে বুঝলি, RNA বংশগতির তথ্য এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে অনায়াসে স্থানান্তরিত করতে পারে। এছাড়াও নিজে উৎসেচক হিসাবে কাজ করতে পারে। ফলে RNA প্রতিলিপিকরনের মাধ্যমে সজীব কোষের উৎপত্তি— এই ধারণা ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীমহলে তৈরি হয়েছিল। ১৯৬০ সাল নাগাদ, এই ধারণা শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তিন বিজ্ঞানীর সাহায্যে, তারা হলেন— কার্ল উজ, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং লেসলি অরগ্যাল। তাদের তৈরি এই “আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথেসিস” বিজ্ঞানী মহলে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিল। তবে, বিজ্ঞানীমহলের বড় এক অংশ এই মতবাদের বিরোধিতা করলেন। সেই বিরোধিতা ও বিতর্ক আজও চলছে। তাহলে, তোর পরের প্রশ্ন হবে, “আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথেসিস” এর সমস্যা কোথায়? সমস্যা অনেক, যেমন—

    প্রথমত, RNA এর মতো জটিল অণু কীভাবে “প্রাক-জৈবিক পরিবেশ”-এ সৃষ্টি হল, সে ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের কাছে খুব পরিষ্কার নয়।

    দ্বিতীয়ত, RNA খুব একটা স্থায়ী অণু নয়, তাপ এবং উৎসেচকের প্রভাবে সহজেই ভেঙে যায়।

    তৃতীয়ত, RNA চেন বা শৃঙ্খল তো অনেক আকারের হয়, বৃহৎ RNA অণুগুলি উৎসেচক হিসাবে কাজ করে থাকে, তাহলে ক্ষুদ্র RNA অণুর কাজ কী?

    চতুর্থত, বিপাকজাত বিক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় RNA অণুর অবদান খুব বেশি নেই’। প্রোফেসর থামলেন। উজান একটু চিন্তা করে বলল-‘তাহলে ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য হলো না?’ প্রোফেসর হেসে বল্লেন-‘আসলে বিষয়টা উড়িয়েও দেওয়া গেল না। কিন্তু এটা ঠিক, এই সব প্রশ্নের সঠিক সমাধান আজও পাওয়া যায়নি। তাই, সাম্প্রতিককালে, বিজ্ঞানীরা “আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথেসিস” এর বদলে “আরএনএ পেপটাইড থিওরি”-তে বিশ্বাস করা শুরু করেছেন। এই থিওরিতে বলা হচ্ছে, “প্রাক-জৈবিক পরিবেশ”-এ, RNA এর সঙ্গে প্রোটিন গঠনকারী পলিপেপটাইড চেনও বিবর্তনের পথে উদ্ভব হয়েছে। নাহলে, শুধুমাত্র RNA-এর পক্ষে একা টিঁকে থেকে কোষের সমস্ত জৈবিক কাজগুলি পরিচালনা করা সম্ভব নয়’। প্রোফেসর থামলেন। অনেকটা বেলা হয়ে গেছে। ঘরের ব্যালকনির সামনে অনেক ফুলের গাছ। প্রোফেসরের হাতে লাগানো কিছু অর্কিডও আছে। তাদের উপর রোদ এসে পড়েছে। প্রোফেসর হরিকে ডেকে আর একবার কফি দিতে বললেন। উজান আধশোয়া হয়ে তাঁর কথা শুনছে। প্রোফেসর শুরু করলেন-‘রাসায়নিক বিবর্তনের (Chemical Evolution) ইতিহাসে, RNA এর থেকে তৈরি হয়েছে ডি-অক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা DNA। এখন প্রশ্ন হল কীভাবে? আমরা জেনেছি, একতন্ত্রী RNA স্থায়িত্বলাভ করে না। উৎসেচকের প্রভাবে তা সহজেই ভেঙে যায়। তবে, দ্বিতন্ত্রী RNA কিছুটা হলেও স্থায়ী। দ্বিতন্ত্রী RNA এর গঠনে, বিশেষ একটি উপাদান হল রাইবোজ সুগার, সেটা নিশ্চয়ই জানিস। এই রাইবোজ সুগারের পরিবর্তে ডি-অক্সি রাইবোজ সুগার দ্বিতন্ত্রী RNA এর গঠনে যুক্ত হলে তৈরি হয়ে যায় DNA। এই DNA স্থায়ী, দ্বিতন্ত্রী, জীবের বংশগতির সমস্ত তথ্যের ধারক ও বাহক। সবচেয়ে বড় কথা হল, DNA স্বাধীনভাবে প্রতিলিপি গঠনে সক্ষম’। উজান আগ্রহের সঙ্গে শুনছে। যেন সে এই অণু-পরমাণুর খেলা, তাদের পৃথিবীটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে! প্রোফেসর উজ্জ্বল চোখে উজানের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমরা গল্পের এক বিস্ময়কর জায়গায় চলে এসেছি। এর পরে বিজ্ঞানীদের এক যথার্থ প্রশ্ন ছিল— জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি-যেমন DNA, RNA, প্রোটিন, লিপিড, অ্যামিনো অ্যাসিড, ইত্যাদির উপস্থিতি তারা মেনে নিলেও, সেই উপাদান থেকে কীভাবে প্রাণ সৃষ্টি হয়, সেই ধারণাটা স্পষ্ট হল না। আসলে, খুব সুক্ষ্য তাত্ত্বিক বিচারে দেখা গেল, উন্মুক্ত পরিবেশে, বিক্ষিপ্তভাবে কোনও জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটা সম্ভব নয়। কেন? ভালো করে বোঝ, প্রথমত, জৈব-অণুগুলিকে (Biomolecules) পরস্পরের কাছাকাছি আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ার নির্দিষ্ট উৎসেচককে বিক্রিয়াস্থানে উপস্থিত হতে হবে। অর্থাৎ, বিক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হতে গেলে, বিক্রিয়া স্থানে বাহ্যিক পরিবেশের কোনও প্রভাব থাকা চলবে না। সুতরাং, বাহ্যিক পরিবেশ ও বিক্রিয়াস্থানের মধ্যে একটি আড়াল থাকার প্রয়োজন। এই চিন্তাভাবনা থেকে আবিষ্কার হয় কোষপর্দার অস্তিত্ব’। উজান বলে উঠল, ‘তাহলে কীভাবে এই কোষপর্দা সেই সময়ে তৈরি হল?’ ‘ভালো প্রশ্ন উজান’-প্রোফেসর সোফায় হেলান দিয়ে বললেন—‘এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে, আমাদের একটু কেমিস্ট্রি পড়তে হবে। এখন জেনেছিস, প্রাক-জৈবিক পরিবেশে, সমুদ্রের জলেই এই সব জৈব-অণুর উৎপত্তি। সেই পরিবেশে, লিপিড অণু তৈরি হবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিল। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি, কোষপর্দা ফসফোলিপিড দিয়ে তৈরি। এই ফসফোলিপিডের অদ্ভুত ধর্ম আছে, এরা “আম্ফিফিলিক” পদার্থ। মানে ফসফোলিপিডের গঠন দেখলে বোঝা যায়, এর দুটো ফ্যাটি অ্যাসিড চেন আছে আর একটা গোল মাথা আছে যা ফসফেট দিয়ে তৈরি। মজার কথা, ফসফেট জলআকর্ষী বা “হাইড্রোফিলিক” আর ফ্যাটি অ্যাসিড হাইড্রোকার্বন চেন হল জলবিমুখী বা “হাইড্রোফোবিক” যৌগ। DNA, RNA ও অন্যান্য জৈব-অণুকে ঘিরে ফেলেছিল লিপিড বা স্নেহপদার্থের আস্তরণ। কোষ অভ্যন্তরের অণুপরিবেশ (Micro-environment) ও বাহ্যিক পরিবেশের মধ্যে রইল কোষপর্দার আড়াল। কোষের পরিবেশ হয়ে উঠল স্বতন্ত্র। সেই পরিবেশের মধ্যে ঘটে চলল বিভিন্ন বিপাকজাত বিক্রিয়া। জন্ম নিল সজীব কোষ—দেখা দিল প্রথম প্রাণের স্পন্দন। তবে, এখানে শেষ নয়। এই সদ্যজাত কোষেরও বিবর্তন শুরু হবে। সে আর এক আশ্চর্য গল্প’।

(ক্রমশ)

বৈজ্ঞানিক তথ্যসূত্র

১) Steel, Mike & Penny, David 2010. “Origins of life: common ancestry put to the test”.Nature465 (7295): 168–9

২) Calvin, Melvin. 1969.Chemical evolution: molecular evolution towards the origin of living systems on the earth and elsewhere. Oxford University Press

৩) Oparin, Alexander Ivanovich 2003.The Origin of Life. Courier Dover

৪) Lei L, Burton ZF. Evolution of Life on Earth: tRNA, Aminoacyl-tRNA Synthetases and the Genetic Code. Life (Basel). 2020 Mar 2;10(3). pii: E21. doi: 3390/life10030021. Review. PubMed PMID: 32131473.

৫) Sasselov DD, Grotzinger JP, Sutherland JD. The origin of life as a planetary phenomenon. Sci Adv. 2020 Feb 5;6(6):eaax3419.

৬) The Search forLife’s Origins: Progress and Future Directions in Planetary Biology and Chemical Evolution. National Research Council (US) Committee on Planetary Biology and Chemical Evolution. Washington (DC): National Academies Press (US); 1990.

৭) Molecular Biology of the Cell. 4th edition.

Alberts B, Johnson A, Lewis J, et al.

New York: Garland Science; 2002

৮) Biochemistry. 5th edition.

Berg JM, Tymoczko JL, Stryer L.

New York: W H Freeman; 2002

৯) An Introduction to Genetic Analysis. 7th edition. Griffiths AJF, Miller JH, Suzuki DT, et al. New York: W. H. Freeman; 2000

১০) Science and Creationism: A View from the National Academy of Sciences: Second Edition. National Academy of Sciences (US). Washington (DC): National Academies Press (US); 1999

2 thoughts on “স্পন্দন সিরিজ – প্রথম প্রাণের স্পন্দন ও আমরা (পর্ব-১)

  • May 7, 2020 at 10:45 am
    Permalink

    গল্প জমে গেছে । আগামী সংখ্যার অপেখ্যায় রইলাম ।

    Reply
  • May 13, 2020 at 3:27 pm
    Permalink

    দারুন একটা সিরিজ শুরু হল।

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!