হুবহু – রে ব্র্যাডবেরি

বাংলা অনুবাদঃ সাগরিকা রায়

অলংকরণ:সূর্যোদয় দে

মুচকি হেসে স্মিথ বলল – “দেখে মনে হচ্ছে বাড়ি ফেরার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছো! এমন তাড়াহুড়ো করছো, যেন কতদিন বাড়িতে যাওনি! হে হে, একেবারে যেন সদ্য বিবাহিত বর! বয়স কিন্তু পঁয়ত্রিশ ছুঁয়েছে! ভুলো না! বিয়েও হয়েছে দশ বচ্ছর! হা হা!”

     রাত এখন প্রায় দশটাদুই বন্ধু অনেকদিন পরে হাঁটতে বেরিয়েছে একটু একটু ঠান্ডা বাতাস বেশ আরামদায়ক লাগছে। স্মিথের চিমটি মারা কথায় ব্রিলিং রাগ করল না একবার স্মিথের দিকে তাকাল, তারপর প্যান্টের দু পকেটে হাত ঢুকিয়ে শ্বাস ফেলল – “কেন যে ব্যস্ত হচ্ছি! জানোই তো সব!”

     তা নয়, তবে একটা কথা বলো, কতদিন পরে তুমি ‘আফটার ডিনার ওয়াক এ মাইল’ কথাটা মনে করলে? এখন তো নাইট ওয়াক করোই না! আর যাও বা বের হলে, ফেরার জন্য এমন তাড়াহুড়ো করছো! স্ট্রেঞ্জ! এখনও দশটাও তো বাজেনি ভায়া!”

     আসলে একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি বুঝলে!” ব্রিলিং মাথা নীচু করে হাঁটছিল

     আরে, সে তো আছেই তোমার! কিন্তু আজ এই বাইরে আসার ব্যাপারটা ম্যানেজ করলে কি করে? তোমার সঙ্গে বসে দু’পাত্তর গিলবো, একটু আড্ডা মারবো কতদিনের ইচ্ছে! যদিও বা এলে, কিন্তু তুমি শালা এমনভাবে বাড়ির দিকে ছুটছো, যেন পাগলা কুকুরে তাড়া করেছে! …বাড়ি থেকে বের হলে কি করে বলতো!”

     ওহ! আজ মহা সুযোগ পেয়েছি অভাবিত!” ব্রিলিং নিজের বুকে হাত রাখল

     অবাক লাগছে! বউ কাছছাড়া করল? নাকি……ব্রিল তুমি বউয়ের কফিতে ঘুমের ওষুধ ফসুদ মিশিয়ে দাওনি তো?”

     ধুরর! ওসব ছ্যাঁচড়ামো আমার দ্বারা হবে না! তবে যা করেছি, শিগগিরি দেখতে পাবে! হুঁ হুঁ বাওয়া! জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!”, বলতে বলতে একটু দাঁড়াল ব্রিলিং রাস্তার বাঁকে টুপিটা টেনে কপালের ওপর নামিয়ে দিল

     স্মিথ ইতস্তত করল –“কিছু মনে করো না ব্রিলিং একটা কথা না বলে পারছি না! তুমি তোমার বউকে সহ্য করো কি করে! আমার মনে হয়, তোমাদের দাম্পত্য সম্পর্কটা খুবই খারাপের দিকে হেলে পড়েছে! একদম যাচ্ছেতাই!”

     স্মিথ! আমি কি কখনও এ কথা বলেছি?”

     না বললেও এসব গোপন থাকে না! পচা জিনিসের গন্ধ ঢাকা চাপা থাকে না ব্রাদার! ১৯৭৯ সালে রিওতে যাওয়ার সময় তোমাদের বিয়েটা হয়েছিল, তাই না? হুঃ! বিয়ে না ফাঁসি!”

     ওহ! ফের রিও শব্দটা মনে করিয়ে দিলে! আজও রিও দেখা হল না যাওয়াও হল না!” ব্রিলিং দীর্ঘশ্বাস ফেলে। “ভেবেছিলাম রিও যাব নাচেঙ্গে গায়েঙ্গে অ্যায়েশ করেঙ্গে ….. কিস্যু হল না!”

     ব্রিলিং, শুনেছি তোমার বউ নাকি হুমকি দিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিল? জামাকাপড় ছিঁড়েখুঁড়ে, চুল ছিঁড়ে উন্মাদের মত আচরণ করেছিল? বিয়ে না করলে তোমাকে জেল খাটাবেসত্যি নাকি অ্যাঁ?” ফিসফিস করে স্মিথ

     আসলে কী হয়েছে জানো, বউটা হাইপ্রেশারের রুগী একটু রাগী আর কি!”

     তাই বলে এই রকম ব্যবহার করা উচিত? তুমি বউকে বলে দিলে না কেন যে তুমি ওকে ভালোবাস না! বলেছিলে নাকি?”

     বলেছি ভাই, হাজারবার বলেছি!”

     তারপরেও কী আক্কেলে তুমি ওই বদমেজাজি মহিলাকে বিয়ে করে বসলে?”

     স্মিথ! ব্যাপারটা তুমি ঠিক বুঝবে না! তখন আমি একটা বিজনেস করছি বুড়ো বাবামা! বউ ঝামেলার ভয় দেখাতে ভয় পেলাম বদনামের ভয়! বাবা, মা কেলেঙ্কারির ভয়ে হার্টফেল করতো! মান সম্মান রাখতে বিয়েটা করতে হল কী করতাম বল?”

     সেও তো দশবছর হয়ে গেল, তাই না?”

     হুম তাই বলে ভেবো না সব শেষ হয়ে গেছে!” ব্রিলিং ধূসর চোখ তুলে স্মিথের দিকে তাকাল –“একটা জিনিস দেখবে? যার জন্য এতগুলো বছর অপেক্ষা করে আছি, সেটা আমি ইন দা মিন টাইম পেয়ে গেছি! এইই দেখো, এটা কী বলো দেখি?” বলতে বলতে কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটা লম্বা নীল টিকিট বের করল

     স্মিথ তো টিকিটটা হাতে নিয়ে হতভম্ব – “এ কী? এ যে বেস্পতিবারের রকেটের টিকিট! রিও! তুমি রিওতে যাচ্ছ ওস্তাদ?”

     চওড়া হাসল ব্রিলিং –“ইয়েস ইয়েস! অবশেষে আমি রিওতে যাচ্ছিইই!”

     উফ! দারুণ! কিন্তু তোমার বউ? সে আবার কোনও হাঙ্গামা বাধাবে না তো?”

     হুম, এটা চিন্তার বিষয় ছিল, তবে এখন আমার বউটি আর জানতেই পারবেনা যে আমি রিওতে গেছি! আর একমাস পরে ফিরেই আসব তুমি ছাড়া কেউ জানতেই পারবেনা যে আমি রিওতে গেছি!”

     স্মিথ শীতার্ত আকাশের দিকে তাকাল –“কী ভাগ্য তোমার ব্রিলিং! আমিও যদি তোমার সঙ্গে যেতে পারতাম!”

     হা হা, স্মিথ, তাহলে বলতে হয়, তোমার মনেও আক্ষেপ আছে? অ্যাঁ? তোমার উনিও মনে হচ্ছে খুব একটা ভাল রাখেননি তোমাকে! কি বলো? হা হা হা!”

     সেটা আবার উলটো কেস! আমার বউ …কী বলবো, হেব্বি সেক্সি! প্রেমে শান্তিপুর ডুবুডুবু, নদে ভেসে যায়! মানে অসহ্য ভালবাসা! বিয়ের দশবছর পরেও কাছে পেলেই কোলে বসে পড়ে আদরে আদরে পাগল করে দেবে! নিজের জন্য একমিনিটও নেই আমার! ভাবতে পারো? ইদানিং প্রেমের বহর বেড়েছে মাইরি বলছি, আমি তো যাকে বলে নাজেহাল! এত পিরিত আসে কোত্থেকে বল দেখি?”

     ধ্যাত্তেরি! বুড়োটেপনা ছাড়ো তো! এনজয় করো …স্মিথ, আসলে একটা কথা তোমাকে বলব আজ বাড়ির কাছে চলে এসেছি এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াব না একটা গুপ্ত কথা বলব তোমাকে! তুমি আজ জানতে চেয়েছিলে যে কেমন করে বউকে পটিয়ে বাড়ির বাইরে এলাম! তাই তো?”

     আরে হ্যাঁ ! আমি খুব অবাক হয়েছি!”

     একটা জিনিস দেখ…ওই যে আমার বাড়ির জানালায়!”

     স্মিথ দেখল ব্রিলিংএর বাড়ির দোতলার জানালায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে! বছর পঁয়ত্রিশের যুবক! হুবহু ব্রিলিংএর মত! আকার প্রকার সবই একই রকম!

     এটা কে? একদম তোমার মত দেখতে!… আমি তো ভেবেছি তুমিই!” স্মিথ চেঁচিয়ে ওঠে

     এই চুপ চুপ! চেঁচিও না!” বলে ব্রিলিং দোতলার জানালার যুবকটির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল যুবকটিও হাত নেড়ে ইশারা করল

     কী কান্ড! আমি কি পাগল টাগল হয়ে যাচ্ছি?” স্মিথ নিজের মাথার চুল খামচে ধরল “ডুপ্লিকেট!

     এখনই কী? ওয়েট কর! পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত!” ব্রিলিং কথা শেষ করতে না করতেই বাড়ির গেট খুলে সেই লোকটি বেরিয়ে এল এক্কেবারে ব্রিলিংএর মত দেখতে! ধূসর উদাসী চোখ কপালের ওপরের নুন মরিচ চুল …! লোকটা এসেই ব্রিলিংএর দিকে হাত বাড়াল – “হাই ব্রিলিং!”

     ব্রিলিং হেসে হাত মেলাল –“হাই ব্রিলিং!”

     স্মিথ অবাক হয়ে গেছে হুবহু দুটো ব্রিলিং মুখোমুখি! কথা বলার ঢং অব্দি এক!

     তোমরা যমজ ভাই?”

     উঁহু! এগিয়ে এসে আমার জুড়িদার এই ব্রিলিংএর বুকে কান পাতো দেখি!” ব্রিলিং হাসছিল মজা করার সময় ব্রিলিং এভাবে হাসে

     মানে?” স্মিথ থতমত খায় একটা লোকের বুকে কান পাততে বলছে ব্রিলিং! পাগল নাকি? লোকটা কী ভাববে?

     আরে, এসে দেখই না!”

     ব্রিলিং প্রায় হাত ধরে টেনেই এগিয়ে দিল স্মিথকে স্মিথ বোকা বোকা মুখে ব্রিলিংএর মত দেখতে ভদ্রলোকের বুকে কান পাতল আর হতবাক হয়ে শুনল লোকটার বুকের ভেতর থেকে একটানা শব্দ উঠছে – টিক…টিক…টিক…টিক…

     এটা…মানে… ব্রিলিং…তুমি…?” স্মিথ তোতলায়

     ইয়েস! যা ভাবছ, ঠিক তাই!”

     না, না! আমি আরেকবার শুনবো!” স্মিথ এগিয়ে গিয়ে হুবহু ব্রিলিংএর বুকে ফের কান পাতল! একটানা শব্দ হচ্ছে টিক…টিক…টিক…টিক টিক টিক…

     ভয়ে বিস্ময়ে মাথা ঘুরছিল স্মিথের নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে এল স্মিথ দুই নম্বর ব্রিলিংএর মুখে হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল

     কোথা থেকে পেলে একে?” বিস্ময়ে কথা বেরোচ্ছিলনা স্মিথের

     দারুণ না?” ব্রিলিং ভ্রু নাচাল

     আমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারছি না! আগে বল, কোথায় পেলে একে?”

     ব্রিলিং, ডিয়ার ব্রিলিং, ভিজিটিং কার্ডটা স্মিথ, মানে এই ভদ্রলোককে দাও দেখ“ ব্রিলিং হুবহু ব্রিলিংএর দিকে তাকাল

     ব্রিলিং টু একটা সাদা রঙের কার্ড বের করে স্মিথকে দিল স্মিথ পড়ে দেখে তাতে লেখাঃ

     হুবহু কোম্পানি!”

আপনার বা আপনার নিকটজনের নকল হিউম্যানেড প্ল্যাস্টিক ১৯৯০ মডেল হুবহু

শারীরিক চেহারা প্রদানের নিশ্চয়তা দাবি করে মূল্য মাত্র সাত হাজার ছশো ডলার থেকে শুরু

পনেরো হাজারে আমরা বিশেষ ডিলাক্স মডেল বানিয়ে থাকি

     এটা কি সম্ভব?” স্মিথ ভ্যাবলা চোখে দেখছে ব্রিলিং টুকে!

     সম্ভব যে, তা তো দেখছই!” ব্রিলিং মজা পাচ্ছে স্মিথের অবস্থা দেখে

     ইয়েস, এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার” ব্রিলিং টু আলোচনায় অংশ নিল

     কবে আনলে একে?”

     এই তোমার মাসখানেক হবে! মাটির নীচের স্টোরে একটা বাক্সে এটাকে ভরে রেখেছি আমার বউ ওদিকে পা দেয় না আর বাক্সের চাবিও আমার কাছে থাকে অসুবিধে নেই !…আজ ব্রিলিং টু কে বাক্স থেকে বের করে বললাম দেখ, আমি সিগারেট কিনতে যাব তুমি ততক্ষণ আমার বউ এর সঙ্গে আড্ডা দাও আমি হয়ে ব্যাস! ইজি! এভাবেই বাইরে চলে এলাম! ম্যাজিক! হা হা হা!”

     ভাবা যায় না ব্রিলিং! ওর শরীর থেকে তোমার বিশেষ ব্রান্ডের পারফিউমের গন্ধই আসছ!”

     হুম, দেখ, পুরো ব্যাপারটাতে আমি কোন অন্যায় দেখছি না! এত কিছু হলেও বউ কিছু জানছে না! সে তো জানে সবসময় আমার কাছেই আছে! একটা অদ্ভুত কান্ড হল, এই ব্রিলিং টু এর মধ্যে আমার সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো আছে! আজ পুরো সন্ধ্যে আমার বউ ব্রিলিং টুএর সঙ্গেই কাটাল! এর পরের একমাসও কাটাবে! তাই না? ও আমার বউএর সঙ্গে কাটাচ্ছে যখন, আমি তখন? ইয়াপ্পি! রিওতে! দশবছর ধরে এই দিনটির জন্য বসে ছিলাম স্মিথ! হ্যাঁ, ফের ফিরে এসে ওনাকে বাক্সে ভরে রেখে দেবো! কেল্লা ফতে!”

     কিন্তু ব্রিলিং, একটা কথা ভেবেছো, এই একমাস ও কিছু খাবে না! তোমার বউ কিভাবে নেবে ব্যাপারটা …! বুঝতে পারছো?” স্মিথ বেশ ধন্ধে পড়ে গেছে

     শোন, শোন, স্মিথ! আমি একটা যা তা জিনিস এনেছি বলে ভাবছো নাকি? আরে না, না! এই মালটা অন্যরকম! এমনভাবে একে বানানো হয়েছে যে ইচ্ছে করলে ছয়মাস না খেয়েও থাকতে পারে! আবার দরকারে একদম মানুষের মতই খিদে তেষ্টা …ঘুম, হুবহু মানুষের মতই বৈশিষ্ট্য আছে এর মধ্যে তাছাড়া…” মিটমিটে হাসে ব্রিলিং – “ব্রিলিং, ও ব্রিলিং, আমার বউ এর দেখভাল ভাল করে করবে তো! একটু আদর টাদর…উঁ?”

     নিশ্চয়! ব্রিলিং টু মিটমিটে হাসে” –ওকে আমার খুব ভাল লেগেছে! সুইট হার্ট!

     স্মিথ উত্তেজিত –“অ্যাই ব্রিলিং, এই কোম্পানি কবে থেকে শুরু হয়েছে?”

     “দু’বছর হল! আসলে ব্যাপারটা খুব গোপন কিন্তু

     “গোপন? হোক, আমাকে যেভাবে হোক একটা জোগাড় করে দাও ব্রিলিং এই হুবহু রোবট আমার চাই!” স্মিথ ব্রিলিংএর হাত আঁকড়ে ধরে

     ব্রিলিং কার্ড এগিয়ে দিল –“এটা নাও

     স্মিথ কার্ডটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে উত্তেজনায় লাল হয়ে যাওয়া মুখ তুলে তোতলালো –“থ্যা থ্যাঙ্ক ইউ ব্রিলিং! তুমি কতটা উপকার করলে জানো না! আমার একটু রেস্ট দরকার ভাই! মাসে অন্তত একটা দিন! আমার বউ খুব ছেলেমানুষি করে! দশবছর হল বিয়ে হয়েছে, এখনও চোখের আড়াল হতে দেয় না! আমি একটু রিলিফ চাই ওর অসহ্য ভালবাসা থেকে!”

     “তবু তোমার বউ তোমাকে ভালবাসে আর আমাদের সম্পর্ক বিষের মত! হুঃ!”

     “না ভাই, নেটি সত্যি আমাকে ভালবাসে তবে একটু কম ভালবাসলে আমার হয়ত একটু আরাম হতো!” হেসে ফেলে স্মিথ

     “স্মিথ, আমি রিওতে গেলে তুমি কিন্তু আমার বাড়িতে যেও মাঝে সাঝে নাহলে আমার বউ আবার সন্দেহ করতে পারে যা দজ্জাল মহিলা!”

     “বেশ, যাব আচ্ছা, এখন তাহলে গুড নাইট?”

     “গুড নাইট

     কার্ডটা নাচাতে নাচাতে স্মিথ চলে গেল আর ব্রিলিং হুবহু ব্রিলিংকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল

     বাসে উঠে কার্ডের লেখাগুলো ভাল করে পড়ে দেখল স্মিথ কোম্পানী কিছু তথ্য দিয়েছে গ্রাহকদের জন্য

     গ্রাহকদের অনুরোধ করা হচ্ছে যে তাঁরা যেন বিষয়টি গোপন রাখেন কোম্পানীর এবং তাঁদের নিজেদের স্বার্থে কারণ আমাদের কোম্পানি আইনগতভাবে এখনও বৈধ নয় সুতরাং আমাদের রোবট ব্যবহার করা অন্যায় বলে গণ্য হতে পারে এই হুবহু রোবট যারা চান, তাঁদের নিজ শরীরের মাংস দিয়ে একটা ছাঁচ ও কালার ইনডেক্স দিতে হবে এর মধ্যে পড়ছে চোখ, ঠোঁট, চুল, চামড়া …! গ্রাহকদের এই রোবট পেতে হলে দু’মাস অপেক্ষা করতে হবে

     হুম! কোম্পানি কিচ্ছু লুকোচ্ছে না অবশ্য! দু’মাসে শরীরের ক্ষতগুলো সেরেই যাবে! আচ্ছা, আর কী বলছে এরা…

     “হুবহু কোম্পানি এর মধ্যেই গ্রাহকদের খুশি করতে পেরেছে আমাদের ঠিকানা ৪৩ সাউথ ওয়েসলি ড্রাইভ

     বাড়ি পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্ল্যান কষে নিল স্মিথ বউ নেটি আর ওর জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ হাজার ডলার আছে ওখান থেকে যাহোক কারণ দেখিয়ে আট হাজার ডলার তুলে নেবে বদলে যা পাবে, তা খরচের চারগুণ নেটি কিচ্ছুটি জানতেও পারবে না!

     বেডরুমে আস্তে উঁকি দিল স্মিথ মোটাসোটা গাবলাগাবুস নেটি ঘুমোচ্ছে ভোঁসভোঁস করে ইস, নেটি বেচারি কত ভালোবাসে বর কে! জেগে থাকলে কত্ত আদর করতো এখন! মনটা খারাপ হল স্মিথের কত পবিত্র মেয়ে! চ্যাপম্যান তো একসময় নেটির প্রেমিক ছিল অথচ নেটি কিন্তু স্মিথকে বেছে নিয়েছিল ইদানিং নেটির ভালবাসার বহর আরও বেড়েছে উন্মত্ত ভালবাসা!

     নেটির জন্য মন খারাপ হল স্মিথের খুব ইচ্ছে করল নেটির নরম ঠোঁটে একটা চুমু খেতে! মনে হল, নেটিকে নিয়ে সব অনীহা ছুঁড়ে ফেলে দেয়!

     নাঃ! আবেগে ভেসে যাওয়া ঠিক নয় তাড়াতাড়ি অন্ধকার প্যাসেজ পেরিয়ে লাইব্রেরিতে গেল স্মিথ ড্রয়ার টেনে ব্যাঙ্কের বই বের করল মনে মনে হাসল স্মিথ – বেশি নেব না নেটি রানি! মাত্র আট হাজার! পরক্ষণেই হাসি মিলিয়ে গেল স্মিথের মুখ থেকে চমকে উঠল স্মিথ এ কী? পঞ্চাশ হাজার ডলার কোথায়? মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দাঁত বের করে পড়ে আছে! সে কি? ডলারগুলো কোথায় গেল! নেটি ডলার দিয়ে করেছেটা কী? খরচ করেছে, অথচ একবার জানালো না? কী এমন সাজু গুজুর কৌটো কিনেছে? নাকি…হাডসনের বাড়িটা কেনার ইচ্ছে ছিল ওর, সেটাই কিনে ফেলল?

     রাগে মাথা খারাপ হবে না? স্মিথ প্রায় ছুটে বেডরুমে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল –“নেটি! অনেক ঘুমিয়েছ, এবারে জাগো দয়া করে! অতগুলো ডলার দিয়ে কী করেছ?”

     ঘুমিয়ে কাদা নেটিকে ঝাঁকাতে লাগল স্মিথ ইয়ার্কি নাকি? গুচ্ছের ডলার উড়িয়ে এসে ঘুমোবে!

     এই নেটি!”

     নেটি উঠল না কোন সাড়া দিচ্ছে না ও! ভয় পেয়ে গেল স্মিথ কী হল নেটির? নেটি সাড়া দিচ্ছে না কেন? ও বেঁচে আছে তো! “নেটি! আমার মিষ্টি বউ! ওঠো নেটি! দেখো, আমি এসে গেছি!”

     উঠল না নেটি আতঙ্কিত স্মিথ নেটির বুকে কান পাতল নেটির হার্ট চলছে তো!

     চলছে স্মিথ নেটির বুকে কান পেতে শুনতে পেল শব্দ হচ্ছে টিক…টিক…টিক…টিক…! স্তব্ধ হয়ে গেল স্মিথ!

     বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে ব্রিলিং বলল –“এবারে স্মিথ সুখী হবে

     হুম, আমারও তাই মত হুবহু ব্রিলিং সিঁড়ি ভাঙছিল

     আচ্ছা ব্রিলিং টু, বলছি, আজ তোমার ডিউটি শেষ এই নীচের স্টোরে চল, তোমাকে বাক্সে রাখি গিয়ে” ব্রিলিং আরামের শ্বাস ফেলে কথা বলতে বলতে ওরা মাটির নীচের ঠান্ডা স্টোরে ঢুকল

     শুনুন, এই বিষয়টা নিয়ে আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল এখানে থাকতে আমার আর ভাল লাগে না! এই বাক্সে থাকাটাও খুব বাজে!”

     চিন্তা করো না হুবহু ব্রিলিং! আমি তোমার জন্য বাক্সের মধ্যে ফাইন ব্যবস্থা করে দেবো

     আরে! আমাদের বানানোই হয় যাতে আমরা হুবহু মানুষের মতই হাঁটা চলা, খাওয়া দাওয়া, নাচন কোঁদন …করতে পারি, বুঝলেন কিনা? এখন আপনাকে যদি বাক্সে পুরে রাখা যায়, কেমন লাগবে আপনার? পারবেন থাকতে?”

     না, মানে…ব্রিলিং কী বলবে বুঝতে পারে না

     মানুষের মতই আমরা শুদুমুদু আমাদের আটকে রাখবেন কেন? ভাল লাগা, মন্দ লাগা সবই আছে আমার আমি আটকে থাকতে পারবই না

     আহা! ব্রিলিং টু! কথা শোন মাত্র ক’টা দিন! আমি রিওতে গেলে তুমি আমার বউ এর সঙ্গে আমি মানে মানুষ ব্রিলিং সেজেই থাকতে পারবে! কত মজা করবে! প্রেম করবে, ঘুরে বেড়াবে! একমাস জুড়ে! ভাবো!”

     তারপর? ফিরে আসবেন যখন? ফের আমাকে ওই বাক্সে?”

     উফ, তুমি খুব তক্কো করতে ভালবাস দেখি! কোম্পানি এমন তার্কিক রোবট গছাচ্ছে নাকি? সাঙ্ঘাতিক বদ দেখছি!”

     বটে? আমি বদ? রিওতে মস্তি করবেন, আর আমাকে ফিরে এসে বাক্সে পুরে…! মশাই, মানুষের মতই আমরা! হুবহু! সব বোধ আছে!”

     কিন্তু, ব্রিলিং টু, তুমি এটা বুঝছ না, রিওতে যাব বলেই কিন্তু তোমাকে ডলার খরচা করে কেনা! রিওতে গিয়ে একটু আনন্দ করে ফ্রেস হব বলেই কিনেছি তোমাকে

     আর আমি? কখনও রিও যাব না! আনন্দ উপভোগ করবো না! সেটা তো ভাবেননি! আর আপনার বউ…!”

     বউ? ও বাবা, সে আবার কী করল হে?” বলতে বলতে ব্রিলিং স্টোর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল তাড়াতাড়ি

     হে, হে, কিছু মনে করবেন না, আমি তাকে খুব ভালবেসে ফেলেছি আই লাভ হার ভেরি মাচ!”

     মানে?” ব্রিলিং থমকে গেল এসব বলছে কী এই দু’নম্বরিটা?

     হিসহিস করে ওঠে হুবহু ব্রিলিং – “আমি মনে করি, রিওর মত সুন্দর জায়গায় আমি কেন যাব না? সঙ্গে আপনার সুন্দরী ইসতিরি! নাও শি ইজ মাই হার্ট!”

     হা হা”, সহজভাবে হাসতে হাসতে স্টোর থেকে সরে পড়তে চাইছিল ব্রিলিং –“একটু দাঁড়াও একটা ফোন সেরে আসি

     হুবহুর ভ্রু কুঁচকে গেল –“কাকে ফোন করবেন? আমাদের কোম্পানিকে তো? আমাকে পালটে দিতে বলবেন? ফেরত দেবেন তো আমাকে?”

     আরে না, না! ধুর, কী যে বলো!” বলতে বলতে খোলা দরজার দিকে প্রায় ছুটে গেল ব্রিলিং কিন্তু ওকে আটকে দিল একটা ধাতব হাত বিষাক্ত গলায় বলে উঠল –“একদম পালাতে চেষ্টা করবেন না!”

     ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে! উঃ, কী করছো পাগলের মত…!” ব্রিলিং ছটফট করে

     না!”

     আমার বউ … কি তোমাকে এইরকম ব্যবহার করতে বলেছে আমার সঙ্গে?”

     নো, নেভার!”

     হুবহু, তুমি কি…উফ, আমার বউকে হুবহু কোম্পানির কথা বলে দিয়েছ? ও কি সব জানে?”

     হুবহু হেসে উঠল –“কিচ্ছু জানতে পারবেন না আপনি! আপনাকে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখব একদম নড়ার চেষ্টা করবেন না! আপনার স্ত্রী মানে আমার প্রেমিকার জন্য রিওর একটা টিকিট কিনবো এখন

     ব্রিলিং টু, শোন শোন, এখনই কোন ডিসিশন নিও না! প্লীজ আমরা একটা আলোচনা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে পারি…!”

     থ্যাঙ্ক ইউ! বাই ব্রিলিং!”

     বাই? মানে? তুমি…ওফ!” বাক্সের ডালা পড়ে গেল

     দশ মিনিট পরে মিসেস ব্রিলিং ঘুম ভেঙে উঠে নিজের নরম গালে হাত বুলিয়ে অবাক – “মাই গড! ব্রিলিং আমাকে চুমু খেয়েছে? কতবছর পরে এই কাজটা করল ও? অবশেষে পারল একটু আদর করতে!”

     আর কী কী করতে পারি, সেটাও জানতে পারবে সোনা!” ব্রিলিংএর দুটো হাত পরম আবেগে জড়িয়ে ধরল মিসেস ব্রিলিংকে ভালবাসায় ডুবে যাচ্ছিল ওরা!

     ওদিকে ঠান্ডা মাটির নীচের ঘরের তালা দেওয়া বাক্সটা পড়ে আছে একধারে! কী আছে ওতে, কেইবা খবর রাখে! চাবিটা কোথায় হারিয়ে গেছে, সেটাই বা কে জানে!

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর একঘেঁয়ে বুনোট থেকে বেরিয়ে অন্যধারার রচনায় বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়ে ছিলেন রে ব্র্যাডবেরি এখানে তাঁর বিখ্যাত গল্পসঙ্কলন ‘The illustrated Man’ থেকে “Marionettes, Inc” গল্পের অনুবাদ করা হয়েছে ‘হুবহু’ নামে

2 thoughts on “হুবহু – রে ব্র্যাডবেরি

  • September 29, 2017 at 7:06 pm
    Permalink

    Khub sundor onubad korechen didi. Golpo Tao darun 🙂

    Reply
  • October 2, 2017 at 4:05 pm
    Permalink

    চমৎকার অনুবাদ। এই গল্প অবলম্বনে বিবেক কুণ্ডু-ও একটি গভীর গল্প লিখেছেন এবারের শারদীয়া ঘোড়াড্ডিম ১৪২৪-এ, “মনকেমন” নামে। সেটাও আমার ভালো লেগেছে, তবে এই অনুবাদটা অন্য লেভেলের।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!