প্রেতাবিষ্ট প্রাসাদ

এডগার অ্যালান পো, বাংলা অনুবাদ: অদ্রীশ বর্ধন

অলংকরণ:জটায়ু

রৎকালের এক শব্দহীন, আভাহীন, ছায়ামায়ার দিনে ঘোড়ায় চেপে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছেছিলাম ‘আশার প্রাসাদে’। সারাদিন দেখেছি আকাশ থেকে ঝুলে পড়া রাশি রাশি কালো মেঘ। যেন বুকের ওপর চেপে বসেছিল। দেখেছি প্রান্তরের ওপর দীর্ঘ পথ— অসাধারণ নির্জন— খাঁ-খাঁ করছে দিগ্‌দিগন্ত। এত কষ্টে তেপান্তর পেরিয়ে এসে দেখলাম, ‘আশার প্রাসাদ’ও বিরস বদনে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। এরকম বিষণ্ণ ভবন কখনও দেখিনি।

     দেখেই বুক দমে গেছিল আমার। জানি না কেন এমন হল। অসহ্য নৈরাশ্য নিমেষে পাষাণের মতোই চেপে বসল আমার সমস্ত আশা-উৎসাহের ওপর। আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম অন্তহীন বিষাদে।

     অসহ্য বলার কারণ আছে। ভয়ংকরতম পাণ্ডববর্জিত পরিবেশেও হাঁপিয়ে না ওঠার মতো সরসতার সন্ধান করে নিতে পারে মানুষের মন। বিশুষ্ক প্রকৃতির বুকে। খুঁজে নেয় সৌন্দর্যের খনি। মন তখন নিজেই হালকা হয়ে যায়। একথা বলেন কবিরা। কিন্তু ‘আশার প্রাসাদ’-এর দিকে তাকিয়ে আমার মনের অকস্মাৎ গুরুভার অসহ্য হয়ে উঠেছিল— কারণ নিরানন্দ সেই নিকেতনের কোথাও কোনও আনন্দের আভাস আমি পাইনি। ‘আশার প্রাসাদে’ বুঝি আছে শুধু নিরাশা— আশার বিপরীত বস্তু।

     নিমেষহীন নয়নে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়েছিলাম নিঝুম প্রেতচ্ছায়ার মতো জীর্ণ ভবন আর তার জমি-জায়গার অবসন্ন প্রকৃতির দিকে। বিবর্ণ প্রাচীর। শূন্য চক্ষুগহ্বরের মতন খানকয়েক বাতায়ন। পচা নলখাগড়ার কয়েকটা ঝোপ। অন্তিম দশায় উপস্থিত কয়েকটা সাদাটে বৃক্ষ। অহিফেনসেবী যেমন প্রথমদিকে হই-হুলোড় করার পর একেবারেই নেতিয়ে পড়ে হতাশার হুতাশনে— এ-বাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে যেন সেই অবসাদ আর নৈরাশ্য— এ ছাড়া আর কোনও পার্থিব উপমা আমার মাথায় আসছে না। আফিমখোরের দুঃস্বপ্ন যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে আমার বিস্ফারিত দুই চক্ষুর সামনে— দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ স্মৃতি-বৈকল্যের মতন এই প্রাসাদও যেন এক বিস্মৃতি-বিভ্রাট। মনের ভেতর পর্যন্ত দমিয়ে দেয় ঝলক দর্শনেই।

     অদ্ভুত এক শৈত্যবোধ সহসা আঁকড়ে ধরল আমার হৃৎপিণ্ডকে—যেন তুহিন-শীতল নিষ্পেষণে বিবশ আর বিকল হয়ে এলিয়ে পড়তে চাইছে আমার বুকের খাঁচার পাখি; বিচিত্র সেই উপলব্ধিকে বোঝাই কী করে ভেবে পাচ্ছি না। এই নয় যে লাগাম ছাড়া চিন্তার ধু-ধু শূন্যতা আমারই বেসামাল কল্পনা দিয়ে হঠিয়ে দিয়েছিল মনের আনাচকানাচের সমস্ত সুস্থ স্বাভাবিক বোধশক্তিকে। ক্ষণেকের জন্যে তাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে ভাবতে চেষ্টা করেছিলাম— কেন এমন হল? কেন এত ঘাবড়ে গেলাম? ‘আশার প্রাসাদ’ কেন এমন হতোদ্যম করে তুলছে আমাকে? নিতল সেই রহস্য শেষ পর্যন্ত তিমিরাবৃতই রয়ে গেছিল আমার কাছে। ঠায় দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণ; অজস্র ছায়াসম কুহেলী-কল্পনা ভিড় করে আসছিল মনের মধ্যে— বুঝে উঠিনি আচম্বিতে কেন শিউরে উঠছি অকারণ কু-কল্পনায়। নিরুপায় হয়ে শেষে ভেবেছিলাম, প্রকৃতির অনেক বস্তুই সময়বিশেষে একযোগে মনের মধ্যে এ-হেন কায়াহীন আতঙ্কবোধ সৃষ্টি করে বটে— বিশ্লেষণ দিয়ে কিন্তু তাদের বুঝে ওঠা যায় না। বিভীষিকা-সঞ্চারী অদৃশ্য সেই শক্তি অব্যাখ্যাতই থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। প্রকৃতির যে দৃশ্য সমাহারের দরুন নামহীন এই শিহরণবোধ জাগ্রত হচ্ছে, সেই দৃশ্য-সমাহারকে একটু অদলবদল করে নিলেই নিশ্চয় শিহরণবোধও চম্পট দেবে— এই আশায় ঘোড়ার লাগাম ধরে এগিয়ে গেছিলাম জল-ভরতি সরোবরের পারে— দৃশ্যান্তরে মনোনিবেশ করে মনের বিভীষিকাকে খেদিয়ে দেওয়ার আশায় চেয়েছিলাম নিথর জলের দিকে। ফল হয়েছিল উলটো। মসীকৃষ্ণ জলে জীর্ণ প্রাসাদের উলটোনো শায়িত প্রতিবিম্ব আরও রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল— ধূসর নলখাগড়া আর মড়ার মতো বিকটাকার গাছের গুঁড়ি, শূন্যগর্ভ চোখের মতো ফাঁকা জানলা, শিহরণের তরঙ্গ বইয়ে দিয়েছিল পা থেকে মাথা পর্যন্ত।

     এ সব সত্ত্বেও বুক-দমানো এই প্রাসাদপুরীতেই তো থাকতে হবে কয়েকটা সপ্তাহ। এ বাড়ির মালিক, রোডরিক আশার, আমার ছেলেবেলার বন্ধু। বহু বছর ছাড়াছাড়ি গেছে। দেশের অন্য প্রান্তে বসে হঠাৎ একটা চিঠি পেলাম। রোডরিকের চিঠি। স্নায়বিক উত্তেজনায় ঠাসা প্রতিটি পংক্তি। ওর নাকি কী এক কঠিন ব্যাধি হয়েছে। ব্যাধিটা শরীরের। মনটাও গোলমাল করছে। বড় যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে। আমি গিয়ে ওকে যদি হপ্তাকয়েক সঙ্গ দিয়ে যাই— তা হলে আমার সমাজের কিছুটা প্রসন্নতা ওর অপ্রসন্ন পরিবেশকে তাড়িয়ে দিতে পারবে— মনের ভার লাঘব হবে— রোগও পালাবে। প্রাণের বন্ধু হিসেবে আমাকে করতেই হবে। হৃদয়-ঢালা এই চিঠির উত্তাপ আমাকে স্পর্শ করেছিল। ওর ব্যাকুল আহ্বান আমি না-রেখে পারিনি। ছুটে এসেছিলাম অনেক দূর থেকে ছেলেবেলার বন্ধুর অদ্ভুত আমন্ত্রণ রাখবার অভিলাষ নিয়ে।

     যখন ছোট ছিলাম, তখন রোডরিকের সঙ্গে বন্ধুত্বটা লতায়পাতায় নিবিড় হয়ে উঠলেও ওর সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানতাম না। নিজেকে একটু অতিরিক্ত মাত্রায় রেখে ঢেকে দেওয়ার স্বভাব ওর জন্মগত। ওর সুপ্রাচীন বংশগরিমা সম্বন্ধে যা জেনেছিলাম, তা এই— এ বংশের সবাই বড় বিচিত্র ধাতু দিয়ে তৈরি হয়, আশ্চর্য অনুভূতি এদের অস্থিমজ্জায় অষ্টপ্রহর সঞ্চরণ করে; যুগে যুগে অদ্ভুত এই অনুভূতির অভিব্যক্তি ঘটেছে বহু প্রশংসিত শিল্পকর্মে, সম্প্রতি ঘটছে দানধ্যানে, আর সঙ্গীতবিজ্ঞানের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের সন্ধানে। জেনেছিলাম আরও একটা অসাধারণ ব্যাপারে। ‘আশার’ বংশবৃক্ষ যুগে যুগে ডালপালা মেলে ছড়িয়ে মহীরুহে পরিণত হয়নি— বংশগতি অব্যাহত রেখেছে সরাসরি নীচের দিকে— সাময়িকভাবে সামান্য এদিক-ওদিক করা ছাড়া বংশধারা এগিয়ে চলেছে একই লাইন ধরে। পুরুষানুক্রমে এই বংশ একটা রেখা ধরে একই বাড়ির মধ্যে পদবি টিকিয়ে রাখার ফলেই বোধহয় জায়গাজমির নামের সঙ্গে বংশের নামও মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে ‘আশার প্রাসাদ’-কে ভীতিকর সম্ভ্রমবোধে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

     সরোবরের পাড়ে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকিয়ে মনের ভয় কাটাতে গিয়ে আরও ভয় পেয়েছিলাম— আগেই তা বলেছি। কুসংস্কার দ্রুত বেড়ে গেছিল নিশ্চয় জলের মধ্যে বাড়ির উলটো ছায়া দেখে। আতঙ্ক থেকে যে-সব অনুভূতির জন্ম, তারা প্রত্যেকেই এই ধরনের আপাতবিরোধী নিয়মশৃঙ্খলে আবদ্ধ বলেই আমি মনে করি। নইলে এক ভয় থেকে আর এক ভয়— এক দুর্বার কল্পনা থেকে আর এক দুর্বারতর কল্পনা মনের মধ্যে শেকড় চালিয়ে দেবে কেন? নিথর কালো জলের দিকে তাকিয়ে সেই মুহূর্তে নতুন যে ছমছমে অনুভূতিটা এমনই অতীন্দ্রিয়ভিত্তিক যে, লিখতে গিয়েও হাসির উদ্রেক ঘটছে। তা হলেও লিখব— নইলে বোঝাতে পারব না কী ধরনের জীবন্ত বিভীষিকাবোধ স্থাণু করে তুলছিল আমার চেতনার গোড়া পর্যন্ত। কল্পনাকে নিশ্চয় বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। তাই হঠাৎ মনে হয়েছিল জীর্ণ কিন্তু প্রায়-জীবন্ত এই প্রাসাদপুরী আর এই তল্লাটে পরিব্যাপ্ত পুরো পরিবেশটাকে স্বর্গীয় বলা যায় না মোটেই— কেননা, পচা গাছপালা, ধূসর প্রাচীর আর নিথর সরোবর থেকে নিরন্তর কুণ্ডলী দিয়ে শূন্যে ধেয়ে যাচ্ছে একটা অপ-বায়ু— দুর্বোধ্য গূঢ় রহস্যবহ একটা বাষ্প-মন্থরগতি, ক্লেদাক্ত, ক্ষীণভাবে দৃশ্যমান এবং বিষাদবর্ণে রঞ্জিত— ধূসর সিসের মতোই চেপে বসতে চায় বুকের মাঝে।

     যা দেখেছি, তা নিশ্চয় স্বপ্ন। খারাপ স্বপ্ন মনকে তো দমিয়ে দেবেই। এই ভেবে প্রাসাদপুরীর প্রকৃত তাৎপর্য তলিয়ে দেখবার প্রয়াসে আরও সন্ধানী চোখে প্রতিটি দুর্নিরীক্ষ দৃশ্যকে চুলচেরাভাবে দেখে গেছিলাম। অতিবার্ধক্য এ বাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য। শুধু প্রাচীন বললে অসঙ্গত হবে— অতিরিক্ত মাত্রায় প্রাচীন। বয়সের ভার যখন অতিশয় হয়— তখন তা প্রথমেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে বিবর্ণতার মধ্যে দিয়ে। এ বাড়ির সঙ্গেও লেপে রয়েছে সেই কালিমা। কার্নিশের কিনারা থেকে শৈবাল ঝুলছে ঘন বুনটের ঝালরের মতন, অথচ অসাধারণ জীর্ণাবস্থার পদচিহ্ন তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। কোত্থাও তো খসে পড়েনি প্রকাণ্ড ইমারতের কণামাত্র অংশ। পলেস্তারা অক্ষত, গাঁথনি অটুট। বিপুল অসামঞ্জস্য বিধৃত হয়ে রয়েছে পরস্পরবিরোধী এই দুই অবস্থার মধ্যে; প্রতিটি প্রস্তর গুঁড়িয়ে যাওয়ার মতন অবস্থায় পৌঁছেও গুঁড়িয়ে যায়নি— খসেও পড়েনি— গোটা বাড়িটা রয়েছে আশ্চর্যভাবে অটুট। কোনও অংশই স্খলিত হয়নি— অথচ স্বাভাবিকভাবেই তা হওয়া উচিত ছিল। ঠিক যেন পাতলা সমাধির কারুকাজ করা দারুময় খিলেন— বাইরের বাতাসের নিঃশ্বাসের ছোঁয়া না পেয়ে কাঠের সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম অক্ষত রয়ে গেছে; ভাঙনের মুখে এসেও কিন্তু ভাঙন যে রোধ করে দিয়েছে প্রহেলিকাসম এই প্রাসাদপুরী— সেটা অবশ্য সুস্পষ্ট ভবনের সর্বত্র। পারলে যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে ধুলোয় পরিণত হয় এখুনি— অবস্থা সেই রকমই— অথচ কী এক নিগূঢ় শক্তি তাকে ধরে বেধে অটুট অক্ষত রেখে দিয়েছে জোর করে। চোখের তারা সঙ্কুচিত করে দীর্ঘক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করেছিলাম বলেই অবশ্য একটা ক্ষীণকায় ফাটল চোখে পড়েছিল— শুধু একটা ফাটল— এত সরু যে চোখে পড়ার কথা নয়। বাড়ির ছাদ থেকে শুরু হয়ে দেওয়ালের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে বিদ্যুতের মতন গতিপথে নেমে এসে মিলিয়ে গেছে তড়াগের স্থির জলে। এতসব খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখার পর ঘোড়ার মুখ ফিরিয়েছিলাম। কদমচালে এগিয়ে গেছিলাম পাথরবাঁধাই উঁচু জঙ্গল বেয়ে প্রাসাদপুরীর দিকে। আমার পথ চেয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ভৃত্য। অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে ঘোড়া ছেড়ে দিলাম তার জিম্মায়। গথিক খিলেনের তলা দিয়ে ঢুকলাম হলঘরে। চোরের মতো পা টিপে টিপে এগিয়ে এল খাস ভৃত্য। সতর্ক পদবিক্ষেপে আমাকে নিয়ে আঁধারঘেরা অনেক জটিল গলিপথের মধ্যে দিয়ে পৌঁছোল মনিবের স্টুডিওতে। সেই সব গলিঘুঁজি করিডর পেরিয়ে আসবার সময়ে শতগুণে বৃদ্ধি পেল গা ছমছমে অনুভূতি— এ বাড়িকে বাইরে থেকে দেখে অব্যক্ত যে অনুভূতি নাগ-পাকে ঘিরে ধরেছিল আমাকে— অন্দরমহলেও বিরাজমান অস্বস্তিকর সেই পরিবেশ, কী যেন দেখা যাচ্ছে না— অথচ তা রয়েছে। ইন্দ্রিয় দিয়ে যাকে গোচরে আনা যাচ্ছে না— অতীন্দ্রিয় তাকে টের পাচ্ছে। আশপাশের প্রতিটি বস্তু, কড়িকাঠের অপূর্ব শিল্পকর্ম, দেওয়াল-ঢাকা উৎকৃষ্ট পর্দা, আবলুস কালো মেঝে, চোখে-বিভ্ৰম-জাগানো জয়ের স্মারকচিহ্ন হিসেবে অগুন্তি ট্রফি— এ সবই তো ছেলেবেলায় আমি দেখেছি। অথচ যখন হাঁটছিলাম নিঃশব্দ চরণে, পা ফেলেছিলাম ভয়ে ভয়ে— খটখট করে নড়ে উঠেছিল বিদঘুটে ট্রফিগুলো, অমনি অস্বস্তির সেই আবর্ত আমার সমস্ত পুরোনো ধ্যানধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চাইছিল। জিনিসগুলোকে দেখেছি আশৈশব, কিন্তু অবাঞ্ছিত যে কল্পনা সমগ্র এদের দেখার সঙ্গে সঙ্গে কাঁকড়ার কর্কশ কঠিন দাঁড়ার মতো আঁকড়ে ধরেছে আমার চিন্তাজগৎকে— তার কবল থেকে তো মুক্তি পাচ্ছি না। এই বিদঘুটে বিকট কল্পনা বাল্যে অপরিচিত ছিল আমার কাছে। হঠাৎ এদের আবির্ভাব ঘটছে কেন?

     একটা সোপানশ্রেণির পাদদেশে দেখা গেল গৃহচিকিৎসকের সঙ্গে। মুখ দেখে কেন জানি মনে হল, ভদ্রলোক খুব ঘাবড়ে রয়েছেন— তাঁর কপালজোড়া ধূর্ততাও যেন হালে পানি পাচ্ছে না— যদিও সেই ধূর্ততা খুব একটা উঁচুদরের বলে মনে হয়নি আমার। আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন ঈষৎ সন্ত্রস্তভাবে, উধাও হলেন পরক্ষণেই। তারপরেই মস্ত পাল্লা খুলে ধরে মনিবের ঘরে আমাকে ঢুকিয়ে দিল খাসভৃত্য।

     ঘরটা খুবই বড়। কড়িকাঠ অনেক উঁচুতে। জানলাগুলো লম্বাটে, সরু প্যাটার্নের, ওপরদিকে ছুঁচোলো— কালো ওক কাঠের পাটাতন মোড়া মেঝে থেকে এতই উঁচুতে যে হাত বাড়িয়ে নাগাল ধরা মুস্কিল, কাচের জাফরি দিয়ে যে আলো ঢুকছে ঘরে, তার রং গাঢ় রক্তের মতন লাল— কিন্তু সে আলোয় শুধু বৃহদাকার বস্তুগুলোকেই দেখা যায়। ঘরের কোণের বস্তু অথবা কড়িকাঠের কারুকাজ অথবা খিলেনের ফাঁকফোকর দেখতে মেহনত করতে হয় চোখকে, দেখা যায় না কিছুই। দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলছে গাঢ় বর্ণের বিশাল বিশাল পর্দা। আসবাবপত্র বিস্তর। মান্ধাতার আমলের। আরামদায়ক নয় কোনওটাই। ঘরময় যত্রতত্র ছড়ানো। প্রচুর বই আর বাজনার সরঞ্জাম ফেলে রাখা হয়েছে যেখানে-সেখানে, কিন্তু তাদের কেউই নির্জীব ঘরটাকে প্রাণরসে ভরপুর করে তুলতে পারছে না। এ ঘরে ঢুকেই মনে হল যেন বাতাস থেকে একরাশ দুঃখ টেনে নিলাম আমার ফুসফুসের মধ্যে। বিষাদবায়ুতে ভারাক্রান্ত এ ঘরের সব কিছুই। নিরেট, নিশ্ছিদ্র, নিশ্চল সেই বায়ু এখানে জাঁকিয়ে বসেছে— তাকে হঠিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই কারওই।

     ঘরে ঢুকতেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আশার। এতক্ষণ লম্বা হয়ে শুয়েছিল অতিশয় দীর্ঘ এই সোফায়, আমাকে দেখেই বিষম উল্লাসে অভ্যর্থনা জানাল বটে, উল্লাসের আধিক্য দেখে আমার কিন্তু মনে হল, এ ঘরের নাছোড় একঘেয়েমিকে জোর করে কাটিয়ে ওঠবার চেষ্টা করছে প্রাণপণে। মুখের পানে ঝলক দর্শন ফেলেই অবশ্য উপলব্ধি করলাম— অভিনয় করছে না, আন্তরিকতা রয়েছে যথেষ্ট। বসলাম পাশাপাশি। কিছুক্ষণ কেউই কোনও কথা বললাম না।

     আমি যে চোখে ওকে দেখছিলাম, তার মধ্যে ছিল বিমিশ্র অনুভূতি, অর্ধেক অনুকম্পা, অধের্ক ভীতি।

     রোডরিক আশার এত অল্প সময়ের মধ্যে এরকম ভয়ানকভাবে পালটে গেছে! এ যে ভাবাও যায় না! ছেলেবেলায় যাকে দেখেছিলাম, তাকে তো সামনের এই মানুষটার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি না! মুখের চেহারাচরিত্র কিন্তু আগে যা ছিল, এখনও তা-ই আছে— কোনওকালে পালটাবে বলেও মনে হয় না। বড়ই অসাধারণ সেই মুখাকৃতি। মৃত ব্যক্তির গায়ের রঙের সঙ্গে কিম্ভূত মিল আছে ওর চামড়ার রঙের। মুখ দেখলে মনে হয় যেন মড়ার মুখ। একটা চোখ কিন্তু অন্য চোধের চেয়ে বড়, ছলছলে আর বেশি মাত্রায় প্রদীপ্ত। ঠোঁট পাতলা আর পাঙাসপানা— কিন্তু অধরোষ্ঠের বঙ্কিমতা বিস্ময়করভাবে সুন্দর। হিব্রু ছাঁচে গড়া সূক্ষ্ম নাক। নাসিকারন্ধ্র গড়ন যদিও অসাধারণ প্যাটার্নের। চিবুক পাতলা আর নয়ন সুন্দর— কিন্তু নৈতিক দুর্বলতার অভিব্যক্তি ঘটায় তা অতীব ক্ষীণকায়। মাথার চুল মাকড়শার জালের তন্তুর মতন পাতলা, মিহি আর অতিসূক্ষ্ম। রগের দু-পাশ মাত্রাতিরিক্তভাবে বিস্তৃত। সব মিলিয়ে এ মুখ দেখলে আর সহজে ভোলা যায় না। কিন্তু যে মুখ ছেলেবেলায় দেখেছি, যে রকম ভাবের প্রকাশ সেই মুখের রেখায় রেখায় ফুটে বেরোতে দেখেছি, এখনকার এই মুখে আর ভাবের অভিব্যক্তিতে পুরোনো সেই স্মৃতির সঙ্গে তো কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারছি না। কথা বলতে যাচ্ছি কার সঙ্গে? রোডরিক আশার-এর সঙ্গে তো? ওর চামড়া এখন মৃতবৎ পাণ্ডুর বর্ণের, চোখে দেখা যাচ্ছে অলৌকিক প্রকৃতির চেকনাই— এ সব তো আগে ছিল না। হেঁয়ালির জবাব না পেয়ে ধাঁধায় পড়লাম, ভয় পেলাম। রেশম-মিহি চুলের বোঝা অযত্নবর্ধিত এবং অবিন্যস্ত; উদ্দাম ঊর্ণনাভদের সূক্ষ্ম জালের মতোই তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লেপটে রয়েছে মুখাবয়বে। মুখজোড়া চুলের বন্য নকশা দেখে খেয়ালী প্রকৃতির হাতে গড়া উদ্ভট কোনও গাছের পাতার কথা মনে ভেসে আছে— সেইরকম বিচিত্র কারিকুরি আর জটিল জটাজাল দিয়ে আবৃত মুখের গোটা চেহারাটা! এ মুখভাবের সঙ্গে সহজ সরল মানবিক মুখভাবের কোনও আদল তো খুঁজে পাচ্ছি না।

     প্রথম থেকেই লক্ষ করলাম বন্ধুবরের হাবভাবে রয়েছে অসঙ্গতি আর অসংলগ্নতা। সন্ত্রাসবোধ এমনই অভ্যাসগত হয়ে গেছে যে তা পাকাপাকি বাসা বেঁধেছে অস্থিমজ্জায়— স্নায়বিক উত্তেজনার আধিক্য এক্ষেত্রে ঘটবেই, ওরও তাই হয়েছে— আর এই ভয়বোধ আর নার্ভাসনেসকে কাটিয়ে ওঠার ব্যর্থ আর দুর্বল প্রয়াস থেকে জন্ম নিচ্ছে যত কিছু অসঙ্গতি আর অসংলগ্নতা। এর কিছুটার জন্যে তো আমি তৈরি হয়েই এসেছি; আভাস পেয়েছিলাম চিঠির ভাষায়; মনে পড়েছিল ওর ছেলেবেলার স্বভাবচরিত্র; শরীর আর মনের, অদ্ভুত অবস্থাটা কীরকম দাঁড়াতে পারে, তা আঁচ করে নিয়েছিলাম আগে থেকেই। কখনও প্রাণরসে টগবগিয়ে ফুটে উঠছে, পরক্ষণেই ঝিমিয়ে নেতিয়ে পড়ছে আবার একটু পরে উথলে উঠছে প্রাণ প্রাচুর্য। পর-পর আসছে আর যাচ্ছে উচ্ছ্বাস আর বিষাদ। যে মাতালরা মদের দাসানুদাস হয়ে পড়ে, অথবা যে আফিমখোররা আফিমসেবন ছাড়া জীবনটাকে নিষ্প্রাণ বলে মনে করে— তারা যেমন কখনও গলা কাঁপিয়ে অহেতুক আওয়াজ করে যায় জান্তব প্রেরণায়, অতর্কিতে মেপে মেপে, তাড়াহুড়ো না করে, বেশ ওজন করে, ফাঁকা বুলি আওড়ে যায়— আশার-এর কথাবার্তার মধ্যে লক্ষ করলাম হুবহু সেই লক্ষণ। কখনও উত্তাল, কখনও নিশ্চল। কখনও প্রাণময়, কখনও নিষ্প্রাণ। কখনও বেসামাল, কখনও হুঁশিয়ার। এই রকম অবস্থার মধ্যে দিয়ে ও বলে গেল আমার আগমনের উদ্দেশ্য। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে ব্যাকুল হয়েছে শুধু আমার মুখে সান্ত্বনার কথা শোনার জন্যে। আগডুমবাগডুম অনেকক্ষণ এইভাবে বকে যাওয়ার পর শুরু করল ওর অদ্ভুত অসুখবিসুখের কথা। ওর মতে, এ ব্যাধি ওর বংশগত। রক্তের পাপ। নার্ভের বারোটা বেজে গেলে যা হয়। তবে হ্যাঁ, আশার মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, খুব শিগগিরই রাহুর দশা কেটে যাবে, স্নায়ুর ওপর যাচ্ছেতাই এই ধকলের অবসান ঘটবে। স্নায়ু আর সইতে পারছে না বলেই তো নানাভাবে তা প্রকাশ করে চলেছে। অনুভূতি এরকম অতীক্ষ্ণ তো কখনও হয়নি। লক্ষণগুলো শুনে আমি কৌতূহলী যেমন হয়েছিলাম, ঠিক তেমনি হতবুদ্ধিও হয়েছিলাম। আশার কিন্তু বেশ গুরুত্ব নিয়েই বর্ণনা করে গেছিল প্রতিটি কষ্ট আর অনুভূতির কথা— হালকাভাবে বলেনি— আমিও হালকাভাবে নিতে পারিনি। মানুষ যখন মুমূর্ষু হয়, তখন তার অনুভূতিটনুভুতিগুলো যেরকম ধারালো আর টানটান হয়ে থাকে— আশার-এর অনুভূতি নাকি এখন সেই অবস্থায় চলে এসেছে। কোনও সুখাদ্যই মুখে রোচে না— যত ভাবেই রাঁধা হোক-না, তা বিষবৎ মনে হয়। সহ্য হয় শুধু অত্যন্ত বিস্বাদ আহার্য। বিশেষভাবে বোনা কয়েকটা বস্ত্র ছাড়া অন্য কোনও পরিধেয় ওর সহ্য হয় না। সব ফুলের সুবাসই ওর কাছে অসহ্য, মনে হয় যেন পূতিগন্ধ নাকে ঢুকে শরীর অস্থির করে দিচ্ছে। আলো একদম সইতে পারে না, খুব নরম আলোই গ্রহণ করতে পারে ওর চক্ষু প্রত্যঙ্গ। তারের বাজনার অদ্ভুত আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ বরদাস্ত করতে পারে না একেবারেই। কারণটা আরও অদ্ভুত। খুটখাট শব্দও আতঙ্ক সঞ্চার করে মগজের মধ্যে। নামহীন আতঙ্কের কাছে যেন মাথা বিকিয়ে বসে আছে আশার। বিভীষিকার ক্রীতদাস হয়ে গেছে। জড়িত অস্পষ্ট স্বরে বারবার বলতে লাগল, “বাঁচব না— আমি বাঁচব না— এ অবস্থায় বেঁচে থাকা যায় না। ঠিক এই ভাবেই সব শেষ হয়ে যাবে আমার। ভবিষ্যৎকে ভয় পাই যমের মতো— ভবিষ্যতের ঘটনার জন্যে নয়— ঘটনাগুলোর পরিণামের জন্যে। আত্মার ওপর শেষকালে যে কী ধরনের নিপীড়ন চলবে— তা ভাবতে গেলেই শিউরে উঠি— সে ঘটনা তুচ্ছাতিতুচ্ছ হলেও শিহরণ রোধ করতে পারি না। বিপদকে আমি পরোয়া করি না— বিপদ সম্বন্ধে কোনও বিতৃষ্ণা আমার নেই— আসন্ন আতঙ্কের কল্পনাই আমাকে কুরে কুরে মেরে ফেলছে। এই অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে, তা হলে এমন একটা সময় আসবে, তখন ভয় নামক করাল দানবের সঙ্গে লড়তেই আমি পাগল হয়ে যাব— প্রাণও হারাব।”

     কিছুক্ষণ অন্তর, ভাঙাভাঙাভাবে দ্যর্থক ইঙ্গিতের মধ্যে থেকে, আবিষ্কার করলাম ওর বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থার আর একটা অত্যাশ্চর্য দিক। অদ্ভুত একটা কুসংস্কারের নিগড় ওকে বেঁধে ফেলেছে। এই প্রাসাদপুরীতে ওর জন্ম, এইখানেই আছে সারা জীবন, এর বাইরে কখনও বেরোয়নি। ছায়াচ্ছন্ন একটা প্রভাব বিরাজ করছে পূর্বপুরুষদের এই ভিটের রন্ধ্রে রন্ধ্রে— ছায়াময় অব্যাখ্যাত সেই শক্তির তাড়নাকে মুখে বলে বোঝানো যায় না। এই ভিটেতে জীবন কাটিয়ে গেছেন ওর পূর্বপুরুষরা— তাঁদের দুঃখকষ্ট ভোগান্তি নানা আকার আর বস্তুর মধ্যে দিয়ে সজীব হয়ে রয়েছে এ বাড়ির সর্বত্র। এ বাড়ির প্রতিটি ধুলোর মধ্যে রয়েছে অস্পষ্ট কিন্তু আমোঘই সারা। ধূসর প্রাচীর আর বুরুজ সবাই যুগ যুগ ধরে অনিমেষে চেয়ে রয়েছে সরোবরের কালো জলের দিকে। এ বাড়ির গোটা ইতিহাসটা জ্যান্ত হয়ে রয়েছে ওই হ্রদের জলে। রোডরিক আশার-এর গোটা অস্তিত্বর প্রাণভোমরা ধরে রেখেছে এরাই।

     অনেক দ্বিধার পর অবশ্য এটাও স্বীকার করেছিল আশার যে, ওর এহেন অদ্ভুত বিষাদরোগের মূলে রয়েছে একমাত্র সহোদরার অনেক বছরের একটা কঠিন রোগ। স্বাভাবিক কারণ হয়তো এইটাই। বোনটি তার বড় আদরের। রক্তের সম্পর্ক বলতে তো ওই একজনই। বছরের পর বছর ধরে আশারকে সঙ্গ দিয়ে গেছে শুধু এই সহোদরা। বোনের ব্যাধির কথা বলতে গিয়ে বন্ধুর গলায় যে ধরনের তিক্ততার ব্যঞ্জনা শুনেছিলাম সেদিন, আজও তা ভুলিনি। বলেছিল, “আমার দিন তো ফুরিয়ে এল। বোনকেও কালব্যাধি একদিন নিয়ে যাবে— সেদিনই খতম হয়ে যাবে সুপ্রাচীন আশার বংশ।”

     এ-কথা যখন ও বলছে, ঠিক সেই সময়েই ঘরের অনেক দূরের কোণ ঘুরে চলে গেছিল লেডি ম্যাডেলিন— রোডরিক আশার-এর সহোদরা। আমাকে দেখতে পায়নি। আমি কিন্তু অতিশয় অবাক হয়েছিলাম তার আসা আর যাওয়া দেখে— আমার তখনকার বিস্ময়বোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশেছিল বেশ খানিকটা বিভীষিকাবোধ। অথচ বুঝিনি কেন অত অবাক হলাম, কেন আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেলাম। স্তম্ভিত চোখে দেখেছিলাম দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল রোগশীর্ণা একটি নারীমূর্তি। দরজা বন্ধ হতেই চোখ ফিরিয়েছিলাম রোডরিকের দিকে। দেখেছিলাম দুই করতলে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কাঁদছে সে। শীর্ণ আঙুলের ফাঁক দিয়ে টপ টপ করে অশ্রু পড়ছে কোলের ওপর। নিছক রোগজনিত অবসাদ যে এই ভেঙে পড়ার পেছনে নেই— তা কিন্তু উপলব্ধি করেছিলাম তৎক্ষণাৎ।

     লেডি ম্যাডেলিনের ব্যাধি দীর্ঘদিন ধরেই হার মানিয়েছে ডাক্তারদের হাজারো দক্ষতাকে। অনীহা আর ঔদাস্য মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসেছে ভদ্রমহিলার স্নায়ুতন্ত্রে। সেই সঙ্গে ভাঙছে শরীর— তিলতিল করে, বিরামবিহীনভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধ্বংসের পথে চলেছে প্রতিটি কোষ। এইসঙ্গে মাঝেমধ্যেই চড়াও হচ্ছে মৃগী রোগের খিঁচুনি— তারপরেই মূর্ছা। অদ্ভুত এই রোগেদের নিদান করতেই পারছেন না জ্ঞান-গুণী বিচক্ষণ ডাক্তাররা। তা সত্ত্বেও এতদিন সিধে থেকেছে ভদ্রমহিলা— বিছানায় শুয়ে থাকতে চায়নি— চলেফিরে বেড়িয়ে লড়ে গেছে রোগের প্রকোপের সঙ্গে, কিন্তু আর পারছে না। এইবার নিল শেষ শয্যা। আমিই তাকে শেষ দেখা দেখলাম। জীবদ্দশায় নিশ্চয় আর দেখতে পাব না। আমি যেদিন যে সন্ধ্যায় প্রাসাদে পা দিয়েছি, ঠিক তখন থেকেই একেবারে ভেঙে পড়েছে লেডি ম্যাডেলিন— ভয়ানক উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে এত কথা নিবেদন করে গেল রোডরিক, একটু ধাতস্থ হওয়ার পর।

     এরপরের কয়েকদিন লেডি ম্যাডেলিনের নাম মুখে আনিনি আমি অথবা রোডরিক। বিষাদ-মেঘ কাটিয়ে ওকে উৎফুল্ল রাখার সহস্র প্রয়াস চালিয়ে গেছি এই ক-দিনে। দুজনেই ছবির পর ছবি এঁকে গেছি পাশাপাশি বসে, অথবা বহুবিধ বইয়ের পাতায় নাক ডুবিয়ে রেখেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনও যেন দুঃস্বপ্নের ঘোরে শুনে গেছি ওর গিটার বাজনার কথা বলা। হ্যাঁ, কথা বলা। গিটার শুধু সুর রচনা করেনি, বুঝি বাক্য রচনাও করেছে— দুঃস্বপ্ন তো সেই কারণেই। তারের যন্ত্র আমার মনের তার ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলে গেছে অনেক… অনেক কথা। এইভাবেই এক-একটা দিনের শেষে দুই বন্ধু আরও কাছাকাছি চলে এসেছি… একটু একটু করে খসে পড়েছে ওর মনের আগল… কখনও ওর মুখের কথা না শুনেও অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছি ওর মনের অতলান্ত বিষাদ-স্বর। সপ্তকের সপ্তম সুর নিষাদের মতোই তা এতই চড়ায় বাঁধা যে ওর সত্তার অণু-পরমাণু পর্যন্ত নিয়ত অনুরাণিত হয়ে চলেছে এই বিষাদ সুরে। হিমালয় প্রতিম তিমির-পাহাড় বুঝি চেপে বসেছে ওর মনের আনাচেকানাচে। বস্তুময় বিশ্ব তার নিজস্ব যাবতীয় বস্তু থেকেও যেন ক্রমাগত বিষাদ বর্ষণ করে চলেছে রোডরিক আশার-এর পঞ্চভূতের শরীরটার ওপর— এ সবের কবল থেকে ওকে বাঁচাই কী করে? অসম্ভব?

     আমার স্মৃতির খাতায় চিরকাল অমলিন থেকে যাবে কিন্তু ভাবগম্ভীর মিনিট-ঘণ্টা-দিবস-রজনীগুলো কীভাবে কাটিয়েছিলাম ‘আশার প্রাসাদ’-এর শেষ অধিপতির সান্নিধ্যে। অথচ অত পর্যবেক্ষণ করেও সারকথায় উপনীত হতে অক্ষম হয়েছি, ওরই কথামতো রকমারি কাজে মেতে থেকেও কোনও কাজ থেকেই আসল ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারিনি। উত্তেজনা আর আদর্শবোধে আচ্ছন্ন ছিলাম বলেই বোধহয় গন্ধকময় কটু আবরণের মতো ওর মূল হেঁয়ালির অবগুণ্ঠন খসাতে পারিনি। ওর কাঁচা হাতের মৃতের স্মরণগীতি চিরকাল জড়িয়ে থাকবে আমার কানের পর্দায়। ফন ওয়েবারের ওয়ল্‌স নাচের বন্য উদ্দামতা আর বিকৃত বিবর্ধিত রূপ একবারই দেখেছিলাম— যন্ত্রণার সঙ্গে বাকি জীবনটা তা মনে রেখে দিতে হয়েছে। রোডরিকের আঁকা তৈলচিত্রগুলো আমার মনের মধ্যে প্রায় একই রকম যন্ত্রণার সঞ্চার করে গেছে। দুর্বার কল্পনা দিয়ে তুলির পর তুলি বুলিয়ে, রঙের পর রং চাপিয়ে, ও যে আবিলতা রচনা করে গেছে— তা প্রকৃতই রোমাঞ্চকর। যতবার দেখেছি, ততবারই শিউরে উঠেছি। অথচ বুঝিনি শিহরিত হচ্ছি কেন। চোখের সামনে এখনও ভাসছে প্রতিটি তৈলচিত্র। কোনও ছবিরই সামান্যতম অংশকেও কথার ছবি দিয়ে বুঝিয়ে তুলতে আজও আমি অপারগ। অথচ ছবি আঁকার কায়দায় নেই কোনও চালিয়াতি অথবা মস্ত মুন্সিয়ানা; সাদাসিধে সোজা তুলির পোঁচে ও ফুটিয়ে তুলেছে যেসব নকশার নগ্নতা— তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে পেঁচিয়ে ধরে, ভয়ের বাঁধনে বেঁধে ফেলে। মরজগতের মানুষ হয়ে রোডরিক আশার এঁকে গেছে মরলোকেরই ছবি, কিন্তু ওর চিত্রে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে উন্মাদ মস্তিষ্কের বিকৃত বিষন্নতা আর অসীম অন্যমনস্কতা। ক্যানভ্যাস জোড়া পাগলামির ভয়াবহতা এমনই তীব্র যে সহ্য করা যায় না; হেনরি ফুসেলি বিভীষিকা-জাগানো ফ্যানট্যাসটিক চিত্রকল্পের জন্যে বিখ্যাত হতে পারেন। মিলটন আর সেক্সপিয়ারের অনেক রচনার ছবি তো ইনিই এঁকেছেন। উইলিয়াম ব্লেক-এর ওপরেও প্রভাব ফেলেছেন। আমি কিন্তু বলব, খোদ হেনরি ফুসেলিও রোডরিকের মতো আতঙ্কসঞ্চারী ছায়া-জগৎ ক্যানভ্যাসের বুকে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।

     বন্ধুবরের উদ্দাম বীভৎস ধ্যানধারণার একটিকে দ্বিধাগ্রস্ত শব্দ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যায়। ছবিটা ছোট্ট। দূরবিস্তৃত একটা আয়তাকার সুড়ঙ্গ আঁকা হয়েছে ছবিতে। ছাদ খুব নীচু। দেওয়াল মসৃণ আর সাদা। কারুকাজের বালাই নেই— চোখ আটকে যাওয়ার মতো খাঁজখোঁজও নেই। দু-চারটে বৈশিষ্ট্য দেখে বোঝা যায়, এ সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে অনেক গভীর পাতাল-প্রদেশে। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও পথ কোনওদিকে নেই। মশাল বা কৃত্রিম আলোর চিহ্নমাত্র নেই। অথচ তীব্র রশ্মির বন্যা বয়ে যাচ্ছে গোটা সুড়ঙ্গপথে। অপার্থিব আভার এত ধুমধাম সত্ত্বেও কিন্তু মনে হচ্ছে এ আলো মড়ার দেশের আলো। আলোর ঐশ্বর্য বলতে যা বোঝায়, তা নয়— নেহাৎই খাপছাড়া।

     আগেই বলেছি, রোডরিকের কানের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। স্নায়ু মুমূর্ষু হলেই বুঝি এমন হয়। তারের বাজনার কয়েকটা সুর ছাড়া কান আর কোনও গানবাজনা বা আওয়াজ সইতে পারে না। গিটারের বাজনার দৌড় বেশি নয়। কিন্তু সংকীর্ণ ওই সুর অঞ্চলেই অনেক ফ্যানট্যাসটিক কথা আর সুরের জন্ম দিতে ওকে দেখেছি। উচ্ছ্বাসপূর্ণ অসংলগ্ন একটা রচনা আমার মনে গেঁথে আছে। মনে আছে বোধহয় একটাই কারণে। কাব্যের অতীন্দ্রিয় অর্থের জন্যে যতটা না-হোক— এই প্রথম এবং এই একবারই প্রাসাদ-রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়ে গেছে কথার মালা সাজিয়ে। কবিতাটার নাম ‘প্রেতাবিষ্ট প্রাসাদ’। হুবহু মনে নেই, যতটা মনে পড়ছে, লিখে যাচ্ছি শুধু মর্মার্থ:

     সবুজ এই অধিত্যকার সবচেয়ে মরকত-সবুজ অঞ্চলে নিবাস ছিল উচ্চমার্গের দেবদূতগণের। সবুজ-সুন্দর সেই অঞ্চলেই একদিন মাথা তুলেছিল পরীর মতো সুন্দরী এক রাজপ্রাসাদ— আলো ঝলমলে অপরূপ সেই প্রাসাদের ভিত গাঁথা হয়েছিল কিন্তু চিন্তা নৃপতির খাস-মুলুকে! ঊর্ধ্বতম স্বর্গের দেবদূতরাও বিস্মিত হয়েছে মনোহর প্রাসাদের মহিমা দেখে। সৌন্দর্যের আকর সঞ্চিত যেখানে— সেইসব জায়গায় ইতিপূর্বে তাদের সূক্ষ্ম স্বচ্ছ ডানার আন্দোলন ঘটেছে চিরকাল, অথচ সৌন্দর্যের বিচারে কোনওটাই এই প্রাসাদের সৌন্দর্যের অর্ধেকও নয়।

     অনেক অনেক বছর আগে ঝকমকে হলুদ আর সোনা রঙের পতাকা উড়ত এই প্রাসাদের শীর্ষে। প্রতিটি মধুর দিবসে সুমিষ্ট সমীরণ ডানা মেলে উড়ে যেত গড়ের প্রাচীরের ওপর দিয়ে, কেল্লাপ্রাসাদের সুবাসও পাখির পালকের মতো বাতাসে ভর দিয়ে চলে যেত দূর হতে দূরে।

     নিখাদ সুখের নিকেতন ছিল সেই অধিত্যকা। পথভোলা পথিক সেখানে এসে একজোড়া আলোকময় উন্মুক্ত বাতায়নের মধ্যে দিয়ে দেখতে পেত শরীরী স্বর সপ্তক বীণাবাদনের নির্দেশে নেচে নেচে ঘুরছে নিয়মের ছন্দে; দেখতে পেত অঞ্চল-অধিপতি আসীন রয়েছেন সবচেয়ে কঠিন পাথর দিয়ে তৈরি সিংহাসনে। আনন্দময় প্রাসাদের আনন্দ-মুকুট তো তিনিই— স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত থাকতেন আনন্দ-সিংহাসনে।

     মুক্তো আর চুনি ঝিকিমিকি রোশনাই বিতরণ করে যেত অপরূপ প্রাসাদের সদর দরজায়, দু-পাল্লার ফাঁক দিয়ে নিরন্তর উড়ে আসত অবিরাম প্রতিধ্বনি লহরী। তাদের মধুর কর্তব্য ছিল শুধু গানে গানে ভুবন ভরিয়ে তোলা। মাণিক্যদ্যুতিতে সমুজ্জ্বল সেই প্রতিধ্বনি-সঙ্গীতের প্রতিটিতে কীর্তিত হত আনন্দ-রাজার গৌরব গাথা, তাঁর প্রজ্ঞা আর পাণ্ডিত্য, ধীশক্তি আর উপস্থিত বুদ্ধির চিক্কণ বিবরণ।

     আর তারপর একদিন মহাদুঃখের অধিপুরুষ হানা দিল সিংহাসনে অধিরূঢ় নৃপতির খাসমুলুকে— অজস্র অশুভ ক্রিয়াকলাপের পরিণামে যার আবির্ভাব ঘটে সর্বত্র। মহিমময় অধিরাজার জন্য বিলাপ করা ছাড়া আর কী-ই বা করা যায়— আগামী দিনের সূর্যরশ্মি আর তো তাঁকে দেখতে হয়নি। তারপর থেকেই গৌরবময় এই ভবন ঘিরে অস্পষ্ট স্মৃতি বাষ্পের মতো শুধু আবর্তিত হয়ে চলেছে অতীতের সুখের দিনের অগুনতি ছবি— একদিন যা ছিল সত্যি— ছিল আনন্দ-কিরণে উদ্ভাসিত মণিময় আলেখ্য।

     আর আজ? রক্তাভ গবাক্ষ পথে দৃষ্টি সঞ্চালন করে অধিত্যকার পর্যটকরা দেখতে পায় বেতাল সুরের বিশাল ছায়া।, কদর্য আকৃতির নিয়ত সঞ্চরমান অপচ্ছায়া; মলিন বিবর্ণ পাণ্ডুর সদর দরজা দিয়ে বেগে বয়ে চলে এক কদাকার জনস্রোত— কণ্ঠে তাদের অট্ট হাস্যরোল— নেই সেই মৃদু মধুর স্মিত হাস্য।

     রোডরিক যেভাবে এই গাথা রচনা করে আমাকে শুনিয়েছিল, সেভাবে গুছিয়ে লিখতে আমি অক্ষম। তবে তার ভাবার্থ থেকে অনুমান করে নেওয়া যায় রোডরিকের আর একটা বদ্ধ বিকৃত উন্মাদ ধারণাকে। অজস্র চিন্তার হুড়োহুড়ি দেখেছি ওর মগজের মধ্যে। তাদের মধ্যে থেকে মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা উৎকট বিশ্বাস। উদ্ভট এই বিশ্বাসটার অভিনবত্ব নিয়ে অনেকেই পঞ্চমুখ হলেও আমি নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করি।

     রোডরিকের বিশ্বাস, অতীন্দ্রিয় অনুভূতির দৌলতে উদ্ভিদ জগৎ সব বুঝতে পারে। তাদের বোধশক্তি আছে, চেতনা আছে। অদ্ভুত এই ধারণা আরও এক পাক মোচড় মেরে আরও বিকট রূপ পরিগ্রহ করেছে ওর আবিল মস্তিষ্কে। শুধু উদ্ভিদ জগৎ নয়— সব জড় পদার্থই চৈতন্যময়, বোধশক্তির অদৃশ্য ফুলিঙ্গ কল্পনা থেকে প্রস্রবণের মতো উৎসারিত হচ্ছে বন্য বিশ্বাসের প্রচণ্ড তাড়না— আমার অভিমত ধোপে টেঁকে না তার মতামতের কাছে। শত চেষ্টা করলেও ওর সেই ব্যাকুল বিশ্বাসকে আমি কথা দিয়ে বুঝিয়ে উঠতে পারব না। যদিও আমাকে ওর মতে টেনে আনবার জন্যে ও কম চেষ্টা করেনি। ওর সেই প্রপাতসম প্রচণ্ড বিশ্বাস যত প্রমাদেই ভরা হোক না কেন, তবুও তা জেনে রাখা দরকার ওর ধোঁয়াটে মনের নাগাল ধরার জন্যে।

     এই প্রাসাদপুরীর প্রতিটি পাথরের বিন্যাস লক্ষ করার মতো। শ্যাওলা গজিয়েছে পাথর ঘিরে— তাদের বিন্যাসের মধ্যেও রয়েছে একই নিয়ম নিষ্ঠা। বাড়ির চারদিকের পচা গাছগুলিও সুবিন্যস্ত। যে বিন্যাস নিয়ে এদের জন্ম, সেই বিন্যাস রক্ষা করে চলেছে যুগ যুগ ধরে— তাল কেটে যায়নি কোথাও। সবচেয়ে লক্ষণীয়, সরোবরের জলের প্রাণময়তা। পাথর আর শৈবাল যেমন তাদের প্রাণময়তা অক্ষুন্ন রেখেছে পতন ধ্বংস আর জরাকে ঠেকিয়ে রেখে— এতটুকু ধসে না গিয়ে— একইভাবে জীবন্ত হয়ে রয়েছে হ্রদের জল এদের আস্ত প্রতিবিম্বকে বুকে ধরে রেখে। জল আর দেওয়াল নিজস্ব বায়ুমণ্ডলনিজেরাই বানিয়ে নিয়েছে যুগ যুগ ধরে। বিশেষ এই বায়ুমণ্ডলই এদের প্রাণবায়ু, এই জড়দের প্রাণভোমরা। এই বংশের প্রতিটি মানুষের ওপর করাল ছায়াপাত করে গেছে মহাকুটিল এই প্রাণবাষ্প— প্রাণবাষ্প যে অলীক কল্পনাপ্রসূত নয়, বংশধরদের শোচনীয় পরিণতিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অদৃশ্য প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি কেউই— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জড় জগতের অদৃশ্য এই প্রাণবায়ু নিয়ন্ত্রিত করে চলেছে বংশের প্রতিটি মানুষের নিয়তিকে। এদেরই প্রভাবে রোডরিকের কী হাল হয়েছে— তা নাকি আমি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

     উদ্ভট এই বিশ্বাস নিয়ে আর কোনও কথা আমি বলতে চাই না। গাছপালা-শ্যাওলা-বাড়ি-সরোবর যদি পুরুষানুক্রমে বংশের মানুষদের অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হয়— তাদের তৈরি বায়ু যদি বিষবায়ু হয়ে বংশধরদের তিল তিল করে ধ্বংস করছে বলে কেউ মনে করে থাকে— তা হলে থাকুক সে তার অলীক বিশ্বাস নিয়ে।

     তবে হ্যাঁ, এহেন বাতুল বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওয়্যাটসন, ডক্টর পার্সিভালো, স্পালাজানি, ল্যান্ডফে-র পাদরী— ‘Chemical Essays’ গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডে এই অদ্ভুত বিশ্বাসকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। আমি নেই এ দলে। স্নায়ুর রাসায়নিক প্রভাব বলে চালিয়ে দিলেও আমি মানতে রাজি নই।

     বই পড়ার বাতিক রোডরিকেরও আছে। গ্রন্থাগারে দেখেছি এই জাতীয় অনেক বই। তাদের নাম লিখে এই রচনাকে আর বাড়াতে চাই না। কিম্ভূতকিমাকার ধারণাগুলো ওর মাথায় ঢুকেছে এই সব বইয়ের পাতা থেকেই। বইয়ের পোকা নড়িয়ে দিয়েছে ওর মাথার পোকাকে। তাই বলে পাথর-শ্যাওলা-জল-গাছ অতীন্দ্রিয় নয়নে নিরীক্ষণ করে চলেছে প্রাসাদের প্রত্যেককে, ইন্দ্রিয়াতীত শক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের ভাগ্য— এবম্বিধ কল্পনা মাথায় আসে কী করে!

     অসুস্থ চিন্তাধারাকে কীভাবে দিনে দিনে উদ্দীপ্ত করেছে অসংখ্য উদ্ভট গ্রন্থের কিম্ভূত আলোচনা, আমি যখন সেই সব নিয়ে নিজস্ব ভাবনায় তন্ময় হয়ে রয়েছি, ঠিক তখনই খবর এল, ধরাধাম ত্যাগ করেছে লেডি ম্যাডেলিন।

     তারপরেই শুনলাম, রোডরিকের বিকৃত বাসনার আর একটা নমুনা। সহোদরার মৃতদেহকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোর দেবে পনেরো দিন পরে। এই পনেরোটা দিন মৃতদেহ রেখে দেওয়া হবে ভূগর্ভের কবরখানায়। কারণটা বড় বিচিত্র। বোনের রোগ নিয়ে যেহেতু ধাঁধায় পড়েছিলেন মহা মহা ডাক্তাররা— তাই তাঁরা মৃতদেহ পরীক্ষা করতে চান পনেরো দিন ধরে। ফ্যামিলি কবরখানাও তো বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে এবং খোলামেলা। তাই দেহ থাকুক বাড়িতেই।

     পুরো দু-সপ্তাহ একটা ডেডবডিকে কবর না দিয়ে ফেলে রাখা হবে এই বাড়িরই নীচে পাতাল ঘরে— ভাবতেই কীরকম লেগেছিল আমার। অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত থেকে এক তিলও নড়েনি গোঁয়ার রোডরিক। রোগটাই যখন অত্যাশ্চর্য, তখন ডাক্তাররা ছিনে জোঁকের মতো যদি বায়না ধরেন— কী আর করা যায়।

     ডাক্তার! ডাক্তার তো দেখেছি একজনকেই এ বাড়িতে ঢুকেই সিঁড়ির গোড়ায়। পৈশাচিক ধূর্ততা দেখেছি তার চোখে মুখে। কুটিল বুদ্ধির সেই ডাক্তার কি এক্সপেরিমেন্ট করতে চান মড়া নিয়ে?

     চুলোয় যাক! ক্ষতি যখন কোনও নেই, বাধা দিতেই বা যাব কেন। যা খুশি করুক রোডরিক।

     বন্ধুর অনুরোধেই সাময়িক সমাধির আয়োজনে সাহায্য করেছিলাম। কফিনে শোয়ানো ছিল মৃতদেহ। দুজনে মিলে কফিন বয়ে নিয়ে গেলাম পাতালঘরে। অনেকদিন সেখানে কেউ যায়নি। দরজা খোলাও হয়নি। বদ্ধ বাতাসে মশাল নিভু নিভু। খুঁটিয়ে দেখতেও পাচ্ছি না। তবে আলো ঢোকে না কোনও দিক দিয়েই। প্রকৃতই অন্ধকূপ। ছোট্ট ঘর। ভয়ানকভাবে স্যাঁতসেঁতে। ওপরতলায় যেখানে আমার শোবার ঘর— ঠিক তার নীচে, মাটির অনেক তলায়— এ ঘর মধ্যযুগে ব্যবহার করা হত নিশ্চয় পাতাল কারাগার হিসেবে। তারপর অন্যভাবেও কাজে লাগানো হয়েছে। নিশ্চয় বারুদ বা ওই জাতীয় দাহ্য পদার্থ রাখা হত। তাই গোটা মেঝে আর বাঁকানো খিলেন আগাগোড়া তামার পাত দিয়ে মোড়া। প্রকাণ্ড দরজার পাল্লা মজবুত লোহা দিয়ে তৈরি হলেও একইভাবে পুরু তামার পাত দিয়ে মোড়া। পেল্লায় পাল্লা ওজনে এত ভারী যে কবজার ওপর যখন ঘোরে, তখন অস্বাভাবিক কর্কশ ঘষটানির আর্তনাদে লোমকূপে শিহরণ জাগে।

     এ-হেন বিভীষিকা বিবরে কাঠের ঢালু পাটাতনের ওপর রেখে হড়কে নামিয়ে দিলাম শোকাধার। কফিনে তখনও স্ক্রু আঁটা হয়নি। খুলে ফেললাম ডালা। শবাধারেই এখন থেকে যার নিবাস, দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম তার মুখের ওপর। সেই প্রথম লক্ষ করলাম, চমক সৃষ্টি করার মতো সাদৃশ্য রয়েছে ভাই আর বোনের মুখাবয়বে। আমার মনের কথা অবশ্যই টের পেয়েছিল রোডরিক। তাই বিড়বিড় করে যা বললে, তা থেকে বুঝলাম, ওরা যমজ। অদ্ভুত মিল আছে দুজনের প্রকৃতিতে— সহানুভূতির নিবিড় নিগড় বেঁধে রেখেছে দুটি সত্তাকে— বিচিত্র বন্ধনকে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বুঝে ওঠা যায় না। দুই বন্ধুই কিন্তু নিষ্পলকে দীর্ঘক্ষণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম মৃত মহিলার মুখের ওপর। না রেখেও পারছিলাম না। কারণ লোমহর্ষক অনুভূতি শিরশির করছিল প্রতিটি লোমকূপ রন্ধ্রে। ভরাট যৌবনেই সমাধিস্থ হয়েছে লেডি ম্যাডেলিন। বিচিত্র ব্যাধি স্বাভাবিকভাবেই তার পদক্ষেপের স্বাক্ষর রেখে গেছে মুখের রেখায় রেখায়। মৃগী আর মূর্চ্ছা রোগে যা দেখা যায়। বুকে আর মুখে ভাসছে ক্ষীণ রক্তাভা। ঠোঁটের কোণে কোণে জেগে রয়েছে হালকা হাসির বিদ্রুপ— মরণের পর যে ব্যঙ্গ মড়াদের মুখে দেখে থ হয়ে যায় না এমন মানুষ নেই ধরাধামে। ভয়ানক সেই চাপা হাসি দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে ডালা নামিয়ে দিলাম শবাধারে, এঁটে দিলাম স্ক্রু, শক্ত করে বন্ধ করলাম লৌহকপাট, পরিশ্রান্ত শরীরে উঠে এলাম ওপর তলার প্রকোষ্ঠে, যেখানে বিষাদ-বায়ু অতটা নিরেট নয়।

     প্রিয়জন বিয়োগের পর শোকাচ্ছন্নতা স্তিমিত হতে বেশ ক-টা দিন যায়। স্থবির আর স্থাণু হয়ে থাকে মনের অন্তরতম প্রদেশ। রোডরিকের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আর তারপর থেকেই একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন আবির্ভূত হল বন্ধুবরের অসুস্থ মনের প্রতিটি বাহ্যলক্ষণে। তিরোহিত হল ওর স্বাভাবিক আচরণ। স্বাভাবিকভাবে যা নিয়ে মেতে থাকত, সে-সবে আর আকর্ষণ রইল না— অথবা তাদের বিস্মৃত হল। এক প্রকোষ্ঠ থেকে আর এক প্রকোষ্ঠে বিচরণ করত দ্রুত পদক্ষেপে; কখনও জোরে পা ফেলত, কখনও আস্তে। উদ্দেশ্যহীন পদচারণায় বিরাম দিত না নিমেষের জন্যেও। আরও মৃতবৎ বিবর্ণতা জাগ্রত হল পাণ্ডুর মুখে— একেবারেই নিভে গেল কিন্তু চোখের সেই অস্বাভাবিক দ্যুতি। ঘষা গলায় আগে যেভাবে মাঝে মধ্যে মুখ খুলত— বন্ধ হল তাও। এখন কণ্ঠস্বরে জাগ্রত হত থর-থর স্বরকম্পন— যেন নিঃসীম আতঙ্কে গলার স্বরকে আয়ত্তে রাখতে পারছে না কিছুতেই। মাঝে মাঝে আমার স্পষ্ট মনে হত, মনের সঙ্গে ও নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একটা গুপ্ত কথা বলে ফেলে মনের বোঝা কমানোর জন্যে— কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না কিছুতেই। আবার কখনওসখনও মনে হত, বিদঘুটে এই হাবভাব বদ্ধ উন্মাদের ক্ষেত্রেই তো ঘটে। বিশেষ করে ও যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা শূন্যের পানে চেয়ে থেকে উৎকর্ণ হয়ে থাকত— তখন ওকে বিকট পাগল ছাড়া আর কিছুই মনে হত না। শূন্যগর্ভ চাহনি মেলে কী যে ছাই শুনতে চায়, তা বুঝতাম না। উন্মাদের মনের গতি বোঝার ক্ষমতা আমার তো নেই। কল্পনায় অনেক শব্দ এরা গড়ে নেয়, কানের পর্দায় সেই শব্দ বাজছে কিনা পরখ করতে চায়। মনগড়া সেই অশ্রুত শব্দের প্রত্যাশায় ব্যাকুল রোডরিককে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এই অবস্থায় দেখতে দেখতে ভয়ের নাগপাশে বাঁধা পড়লাম আমিও। অনুভব করলাম, গুঁড়ি গুঁড়ি আতঙ্ক প্রবেশ করছে আমার মনের মধ্যেও। বন্ধুবরের ফ্যানট্যাসটিক অথচ মনে দাগ রেখে যাওয়া কুসংস্কারগুলোও জাল মেলে দিচ্ছে আমার মনের ওপরেও। তিল তিল করে একই ব্যাধিতে সংক্রমিত হচ্ছি আমিও।

     লেডি ম্যাডেলিনকে পাতাল-কারাগারের কফিনে রেখে আমার দিন সাত-আট পরের এক রাতে শুরু হল সেই বিশেষ ঘটনা। বিচিত্র উপলব্ধির পূর্ণ শক্তি টের পেলাম সমস্ত সত্তা দিয়ে। কোচে শুয়ে ছিলাম ঘুমোব বলে। কিন্তু নিদ্রাদেবী কোচের ধারেকাছেও এলেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দু-চোখ খুলে শুয়ে রইলাম কাঠ হয়ে। যুক্তি দিয়ে বুঝতে চাইলাম, এত ভয়কাতুরে হচ্ছি কেন? কেন এই নার্ভাসনেস? ভয়ের খপ্পর থেকে বেরোনার কোনও পথ কিন্তু আবিষ্কার করতে পারলাম না। মনকে বোঝালাম, এ ঘরের বিষাদ-নিমজ্জিত আসবাবপত্রের হতবুদ্ধিকর প্রভাবের জন্যেই মন আমার শিউরে শিউরে উঠছে। মনকে বোঝানোর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য উপলব্ধিও করছিলাম সেই একই ব্যাপার। বাইরে ঝড় উঠছে। তার প্রবল নিশ্বাস ঢুকছে ঘরের মধ্যেও। অস্থির হচ্ছে স্থির বাতাস। ঝাপটা লাগছে দেওয়ালে। দুলছে দেওয়াল জোড়া ছেঁড়া ময়লা পর্দা। দুলে দুলে উঠছে শয্যার বাহারি কারুকাজ, কানে ভেসে আসছে কাপড়ে কাপড়ে ঘষটানির খসখস শব্দ। চেষ্টা করেও তাই মনকে কিছুতেই বাগে রাখতে পারিনি। একটু একটু করে অদম্য কাঁপুনি ছেয়ে ফেলল আমার গোটা শরীরটাকে। অবশেষে হৃৎপিণ্ডের ওপর গ্যাঁট হয়ে চেপে বসল নিতান্ত অহেতুক হুঁশিয়ারির এক দুঃস্বপ্নবোধ। এতক্ষণ দম বন্ধ করে এই দুঃস্বপ্নবোধকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। এবার গা ঝাড়া দিলাম। যেন খাবি খেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম বালিশের ওপর। বেশ বুঝছি, গোটা শরীরটা কাঁপছে ঠকঠক করে। সূচ্যগ্র চোখে চেয়ে রইলাম ঘরের নিরেট অন্ধকারের দিকে। কান খাড়া করে শিহরিত কলেবরে এমন কয়েকটা শব্দ স্পষ্টভাবে শোনার চেষ্টা করলাম, যারা অতি-অস্পষ্টভাবে মাঝে মাঝে জেগে উঠছে ঝড়ের দমকা হাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে। কেন যে শুনতে চাইছি, কী শুনতে চাইছি— তা জানি না; কিন্তু আমার সত্তা আর স্থির থাকতে পারছে না— অস্ফুট শব্দনিচয়ের উৎসরহস্য জানবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠছে। জানি না সে সব শব্দ আসছে কোত্থেকে। কিন্তু তবুও ঝড়ের গজরানি যখন স্তিমিত হচ্ছে, অমনি গা-হিম করা শব্দগুলো ক্ষীণভাবে প্রবেশ করছে আমার কর্ণকুহরে।

     আতীব্র সেই আতঙ্কবোধ অবর্ণনীয়, অথচ অসহ্য। আমি ভেঙে পড়েছিলাম। তাড়াতাড়ি গায়ে পোশাক চড়িয়েছিলাম। বেশ বুঝলাম, এ-রাতে আর ঘুমোনো সমীচীন হবে না। ভয়ের নাগপাশ খসিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ঘরের এদিক থেকে সেদিকে পায়চারি শুরু করেছিলাম।

     বারকয়েক ঘরের এ-মুড়ো থেকে সে-মুড়ো পর্যন্ত ঘুরে আসার পরেই হালকা পায়ের আওয়াজ শুনে চমকে উঠেছিলাম। আওয়াজটা আসছে এ ঘরের লাগোয়া সিঁড়ি থেকে। কান খাড়া করতেই ঝড়ের হুহুংকারের মধ্যেই চিনে ফেললাম কার পায়ের আওয়াজ।

     রোডরিকের। দাঁড়ালাম দরজার সামনে। আলতো টোকা পড়ল কপাটে, খুলে দিলাম তক্ষুনি। জ্বলন্ত লম্ফ নিয়ে ঘরে ঢুকল বন্ধুবর। মুখাবয়ব আগের মতোই। মড়ার মুখের মতন বিবর্ণ— কিন্তু এখন সেখানে দেখা দিয়েছে নতুন একটা উপসর্গ।

     দুই চোখে নৃত্য করছে উন্মত্ত উল্লাস। সমস্ত শরীর দিয়ে বুঝি আটকাতে চাইছে হিসটিরিয়ার আক্রমণকে— অদম্য ভাবাবেগ ফুটে বেরোচ্ছে চোখ দিয়ে।

     দেখে তো আমার আত্মারাম শুকিয়ে গেল। কিন্তু এই নিরন্ধ্র তমিস্রায় একা একা উদ্ভট বিকট কল্পনায় অধীর হয়ে থাকার চেয়ে তো ভালো। সঙ্গী পেয়ে তাই বর্তে গেলাম। সাদরে ঘরে ডেকে নিলাম।

     ও কিন্তু ঘরে ঢুকেই আচমকা জুলজুল করে দেখতে লাগল ঘরের আনাচেকানাচে পর্যন্ত। বললে তারপরেই, “দেখেছ?”

     আমার হতভম্ব মুখভাব দেখেই বললে পরক্ষণে, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, দেখতে পাবে, এখুনি!”

     বলেই, লম্ফের আড়াল দিয়ে, এক ঝটকায় খুলে দিল একটা জানলার পাল্লা। মত্ত প্রভঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে লম্ফ দিয়ে প্রবেশ করল ঘরের মধ্যে। ভয়ানক এক ধাক্কায় মনে হল যেন মেঝে থেকে ছিটকে গেলাম শূন্যে।

     জানলা দিয়ে দেখলাম ঝড়ের রাতের দৃশ্য। রক্ত-জমানো সন্দেহ নেই— আশ্চর্য সুন্দরও বটে। আতঙ্ক আর সৌন্দর্যকে পাশাপাশি সাজিয়ে অপরূপা হয়ে উঠেছে অমানিশা। নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও ঘূর্ণিঝড়ের অভ্যুত্থান ঘটেছে। মাঝে মাঝেই তাই দিক পরিবর্তন ঘটছে পাগলা হাওয়ার— ঘটছে আচমকা, বিনা নোটিশে। ঘন মেঘ ঝুলে পড়েছে প্রাসাদের ওপর। ঝড় তাদের নিয়ে লোফালুফি খেললেও তারা যেন জীবন্ত শরীরে রুখে দাঁড়াচ্ছে ঝড়ের বিরুদ্ধে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েও বারে বারে ফিরে এসে জড়ো হচ্ছে বাড়ির ঠিক মাথায় আর বাড়ির চারধারে— হুড়োহুড়ি দাপাদাপি করে ঘিরে রাখছে আশার প্রাসাদকে ছিনে জোঁকের মতো— ঝড় তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়েও হেরে যাচ্ছে বারবার। পণ করেছে মেঘের দল, এ বাড়ি ছেড়ে বেশি দূরে যাবে না কিছুতেই— মাতাল হাওয়ার মাতলামিতেও ছাড়ছে না একগুঁয়েমি। হুল্লোড়বাজ মেঘের দলের গায়ে গা লাগিয়ে জমাট হয়ে এমন নিরেট চন্দ্রাতপ রচনা করেছে মাথার ওপর যে, চাঁদ অথবা তারাদের দেখতে পাচ্ছি না কিছুতেই— বিদ্যুৎবাজিও থেমে গেছে অলক্ষ্যে। কিন্তু বিষম উল্লাসে ফেটে পড়ছে বুঝি বাড়ি ঘিরে থাকা বাষ্পবলয়ের তলদেশ, ধিকিধিকি আভা জাগ্রত হয়েছে অদৃশ্য বাষ্পে; শুধু কি বাষ্প, প্রাসাদ ঘিরে রয়েছে যা কিছু পার্থিব বস্তু— তাদের প্রত্যেকে প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে অপ্রাকৃত প্রভায়; ফিকে দ্যুতি স্পষ্ট ঠিকরে আসছে গ্যাস থেকে, বাড়ি ঘিরে জমে থাকা সমস্ত গ্যাস বিপুল আনন্দে জ্বলে উঠে আবর্ত রচনা করে চলেছে মেঘ আর ঝড়ের নৃত্যের তালে তালে।

     শিউরে উঠেছিলাম। রোডরিককে জোর করে টেনে এনেছিলাম জানলার সামনে থেকে। চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে পাল্লা এঁটে দিয়ে বলেছিলাম, “দেখবার কী আছে? এ তো বিদ্যুতের খেলা— প্রাকৃতিক তড়িৎপ্রবাহ— অপ্রাকৃত নয়— অবাক হওয়ার মতো ঘটনা নয়। সুতরাং জানলা খুলে আর দেখতে যেও না। সরোবরের পচা গাছপালার দুষিত গ্যাসের জন্যেও এরকম হতে পারে। জঘন্য!— এই ঠান্ডায় খোলা জানলার সামনে দাঁড়ালে রোগে পড়বে যখন? চুপ করে বসে থাকো। বই পড়ে শোনাচ্ছি— শুনে যাও। তোমারই প্রিয় রোমান্স-উপন্যাস। দেখবে ভয়ানক এই রাত ভোর হয়ে যাবে।”

     স্যার লন্সলট কানিং-এর লেখা ‘ম্যাড ট্রিস্ট’ বইটা পেলাম হাতের কাছে। মান্ধাতার আমলের বই। কিন্তু অন্য বই এখন পাচ্ছি কোথায়? ঝড় তো মাথা কুটে যাচ্ছে বন্ধ কপাটে— খটখট খটাখট করে নড়ছে সব কিছুই। এ বইকে রোডরিকের অতিপ্রিয় রোমান্সের বই বলেছিলাম খানিকটা ঠাট্টার ছলে— সত্যি সত্যি তো নয়। কুচ্ছিত আর কষ্টকল্পিত এই কাহিনি কখনওই ওর উঁচু মন আর দার্শনিক চিন্তাধারার যোগ্য নয়— তা জেনেও বই খুলে বসেছিলাম তৎক্ষণাৎ আর একটা ক্ষীণ অভিপ্রায় নিয়ে। বিষের ওষুধ বিষ। পাগলামির ওষুধ পাগলামি। ক্ষিপ্ত মস্তিষ্কে যে ব্যক্তি অলীক দর্শন করছে, উদ্ভট কল্পনার বাতিকে ভুগছে— তাকে অনুরূপ বস্তু উপহার দিলেই টোটকার কাজ দেবে। বিকৃত মস্তিষ্কদের ক্ষেত্রে এরকম চিকিৎসার রেওয়াজ আছে বলেই আমি জানি। ও কিন্তু কান খাড়া করে অসীম মনোযোগ দিয়ে শুনে গেছিল কাহিনিটা— তখন অবশ্য বুঝিনি কতটা নিবিষ্ট হয়েছে গল্পের মধ্যে, বুঝতে পারলে বাহবা জানাতাম নিজেকেই সঠিক দাওয়াই দিতে পেরেছি বলে।

     কাহিনির যেখানে ট্রিস্ট-এর নায়ক এথেলরেড জোর করে ঋষির ঘরে ঢুকবে বলে মন ঠিক করেছে, একটু পড়েই আমি এসে গেলাম সেখানে। উপন্যাসের কথাগুলোই লিখে যাচ্ছি হুবহু—

     “কাকুতি মিনতিতে যখন কান দিল না ঋষি, তখন এথেলরেড ঠিক করল গায়ের জোরে ঘরে ঢুকবে। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে অনিবার, ভিজে চুপসে যাচ্ছে বেচারি— অথচ একগুঁয়ে ঋষি তাকে ঢুকতে দেবে না। কড়া মদের নেশায় কাঁহাতক আর সহ্য করে এথেলরেড। ঝড়ের মাতনও বেড়েছে। তাই গদা তুলে পাল্লায় দু-চার ঘা মারতেই কাঠ উড়ে গেল। দস্তানাপরা হাত কাঠের ফাঁকে ঢুকিয়ে গোটা পাল্লাই উপড়ে আনল এথেলরেড। মড়মড় মচাৎ শব্দের প্রতিধ্বনি কাঁপতে কাঁপতে ধেয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে।”

     এই পর্যন্ত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল লেখক বর্ণিত হুবহু সেই আওয়াজ যেন ভেসে এল প্রাসাদের নিচ থেকে। ঝড়ের দামালির জন্যে সে আওয়াজ খানিকটা চাপা পড়ে গেলেও, কাঠ ভাঙা মড়মড় মচাৎ শব্দ চিনতে পারা যায় বইকী। হতে পারে, আমি নিজেও তখন উত্তেজিত অবস্থায় ছিলাম বলে ভুল শুনেছি। ঝড়ের দাপটে জানলার কপাটও তো সমানে খট খট খটাং খটাং আওয়াজ করে যাচ্ছে। পাতালপুরী থেকে ভেসে আসা আওয়াজটা কানের ভুল নিশ্চয়। গলা টিপে ধরা প্রতিধ্বনির রেশকে তাই আর আমোল দিইনি। কাহিনির খেই তুলে নিয়েছিলাম—

     “ভাঙা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে মহাবীর এথেলরেড কিন্তু ঋষিকে দেখতে পায়নি। দেখেছিল এক ড্রাগনকে। তার গায়ে চকচকে আঁশ, জিভটা লকলকে অগ্নিশিখার। ভয়ানক চেহারায় সে আগলাচ্ছে একটা সোনার প্রাসাদ— যে প্রাসাদের মেঝে তৈরি হয়েছে রুপো দিয়ে। দেওয়ালে ঝুলছে চকচকে পেতলের একটা ঢাল। ঢালের গায়ে লেখা রয়েছে: ড্রাগনকে বধিবে যে, আমারে লভিবে সে।

     “এথেলরেড তৎক্ষণাৎ গদা তুলে পিটিয়ে মেরেছিল ড্রাগনকে। প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ার সময়ে ড্রাগনের গলা চিরে বেরিয়ে এসেছিল রক্ত-জমানো এমন এক ভয়াল চিৎকার— যা পৃথিবীর কেউ কখনও শোনেনি। এথেলরেডের মতো মহাবীরও সইতে না পেরে হাত চাপা দিয়েছিল কানে।”

     আবার আমাকে থমকে যেতে হয়েছিল এই পর্যন্ত পড়েই। আবার আমি শুনেছিলাম বীভৎস শব্দের পর শব্দ— ঈশ্বর জানেন সে শব্দ পরম্পরা আসছিল কোন দিক থেকে। ঝড়ের গজরানিকে ম্লান করে দিয়ে লেখক-বর্ণিত প্রায়— সেই হুহুংকার নিদারুণ কর্কশ নিনাদে ধ্বনি আর প্রতিধ্বনির রেশ তুলে গমগমে আওয়াজে প্রবেশ করেছিল আমার কর্ণ রন্ধ্রে। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। ড্রাগনের অপ্রাকৃত হাহাকার তো নিছক কল্পনাপ্রসূত— কিন্তু এখুনি আমি যা শুনলাম, তা কীসের আক্রোশ-ধ্বনি? কোত্থেকে আসছে নরক-গুলজার-করা এই অপার্থিব গজরানি? খুবই দমে গেছিলাম অসাধারণ এই দ্বিতীয় ঘটনায়। হাজার হাজার পরস্পরবিরোধী অনুভূতি লড়াই লাগিয়ে দিয়েছিল মনের মধ্যে। কখনও অবাক হয়েছি, কখনও ভয় পেয়েছি। কিন্তু মনের হাল ছাড়িনি। চোখে চোখে রেখেছিলাম রোডরিককে। আমার চাইতে অনেক বেশি অনুভূতি সচেতন আর ভিতু আমার বন্ধুটি কি এই আওয়াজ শুনতে পেয়েছে? সঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে লক্ষ করলাম, গত কয়েক মিনিটের মধ্যেই অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে ওর আচরণে। আগে বসেছিল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে— একটু একটু করে চেয়ারের ওপর দিয়ে ঘুরে গিয়ে এখন মুখ ফিরিয়ে রয়েছে দরজার দিকে। তাই সোজাসুজি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না, দেখছি পাশ থেকে; পাশ থেকে দেখেই বুঝতে পারছি, ঠোঁট নড়ছে অল্প অল্প, যেন অশ্রুত শব্দে কথা বলে যাচ্ছে নিজের সঙ্গে, দেখতে পাচ্ছি দু-চোখ পুরো খুলে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে দরজার বন্ধ কপাটের দিকে— সেই সঙ্গে অল্প অল্প সারা শরীর দোলাচ্ছে ডাইনে আর বাঁয়ে, শরীর দুলছে কিন্তু নিয়মিত ছন্দে, ঠোঁটও নড়ছে তালে তাল রেখে, চোখদুটোই কেবল আড়ষ্টভাবে চেয়ে রয়েছে দরজার দিকে। এইটুকু দেখেই আমি স্যার লন্সলট রচিত কাহিনি পাঠ শুরু করেছিলাম জোর গলায়—

     “ড্রাগন নিধনের পর মহাবীর এথেলরেড দানবদেহকে পথ থেকে সরিয়ে রুপোর মেঝে মাড়িয়ে ঢুকে গেছিল সোনার প্রাসাদে। পেতলের ঢালকে দেওয়াল থেকে খসিয়ে নামানোর সময়ে হাত ফসকে ঢাল আছড়ে পড়েছিল রুপোর মেঝেতে। প্রচণ্ড ঝনঝন ঝনাৎ শব্দে মুখরিত হয়েছিল দিগ্‌বিদিক।”

     শেষ শব্দটা মুখ দিয়ে বের করতে না করতেই সত্যিই যেন একটা পেতলের ঢাল ঝনঝন ঝনাৎ শব্দে আছড়ে পড়ল রূপোর মেঝেতে— স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা ধাতব ঝনঝনানি— চাপা আওয়াজ— কিন্তু পায়ের তলার মেঝে কেঁপে উঠল আওয়াজের রেশে। ভয়ে দিশেহারা হয়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছিলাম চেয়ার ছেড়ে। রোডরিকের নিয়মিত ছন্দের দেহ-দুলুনি কিন্তু স্থগিত হয়নি। ক্ষণেকের জন্যেও। দৌড়ে গেছিলাম ওর পাশে। দেখেছিলাম, দুই নয়নে নিবিড় তন্ময়তা জাগিয়ে নিথর চাহনি মেলে রেখেছে বন্ধ কপাটের ওপর— গোটা মুখটায় কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছে আশ্চর্য আড়ষ্টতা— রক্ত মাংসের মুখ এত শক্ত হয় কী করে! কাঁধের ওপর আমি হাত রাখতেই শিহরণের পর শিহরণ বয়ে গেল সারা শরীরের ওপর দিয়ে; ঠোঁটের কোণায় ভেসে উঠল রুগ্ন পাণ্ডুর ক্ষীয়মান হাসির আভা— যা দেখলে গা হিম হয়ে যেতে বাধ্য, তখনও ঠোঁট নড়ে চলেছে দেখে কান নামিয়ে এনেছিলাম ওর ঠোঁটের কাছে শুনেছিলাম, খুব নীচু গলায়, খুব দ্রুত টানে, খুব জড়ানো গলায় বিড়বিড় করে চলেছে রোডরিক— আমি যে রয়েছি ঘরের মধ্যে, তা যেন ভুলেই গেছে। কদাকার শব্দস্রোতটা এইরকম—

     “পাচ্ছ শুনতে? আমি কিন্তু শুনেছি— অনেক আগেই শুনেছি। অনেক… অনেক… অনেক মিনিট, অনেক ঘণ্টা অনেক দিন ধরে শুনেছি— বলার সাহস হয়নি— জ্বলে পুড়ে মরেছি, তবুও মুখ ফুটে বলতে পারিনি! জ্যান্ত কবর দিয়েছি মেয়েটাকে! বলিনি, আমার অনুভূতির ধার অনেক বেশি? বলিনি, আমি যা টের পাই তা তুমি টের পাও না? এখন তা হলে বলি, ফাঁপা কফিনের মধ্যে ওর নড়াচড়ার প্রথম আওয়াজ আমি ঠিকই শুনেছিলাম— অনেক, অনেক দিন আগে— বলতে কিন্তু পারিনি— বলবার মতো বুকের পাটা আমার ছিল না। আর আজ— এই রাতে এথেলরেড— হা! হা! ঋষির ঘরের দরজা ভেঙে পড়ল না, ম্যাডেলিনের কফিনের ডালা উড়ে গেল? ড্রাগনের মরণ-চিৎকার নয়— ম্যাডেলিন লোহার কপাট খুলে ফেলল হ্যাঁচকা টানে! পেতলের ঢাল আছড়ে পড়ল রুপোর মেঝেতে? মূর্খ! ও আওয়াজ পেতলমোড়া খিলেনের তলায় ওর দাপাদাপির আওয়াজ! যাই কোথা? পালাই কোথায়? জেলখানা ভেঙে উঠে আসছে… সিঁড়িতে পেয়েছি পায়ের আওয়াজ। এসে পড়ল বলে। সাজা দিতে আসছে! জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে যাচ্ছিলাম— সহ্য করবে কেন? এই তো শোনা যাচ্ছে হৃৎপিণ্ডের রক্ত জমানো ধুকপুকুনির আওয়াজ— ম্যাডেলিনের বুকের খাঁচায় লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে হৃৎপিণ্ড— আমরা ভেবেছিলাম নিথর হৎপিণ্ড— আর নড়বে না! উন্মাদ।” বলতে বলতে তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সমস্ত শক্তি দিয়ে, “উন্মাদ! ওই তো এসে দাঁড়িয়েছে দরজার ওদিকে!”

     অতিমানবিক এনার্জি ফেটে পড়েছিল শেষ এই শব্দ ক-টার মধ্যে। আর এই অতিমানবিক শক্তির বিচ্ছুরণেই যেন দমাস করে খুলে গেল আবলুস কাঠের বিরাট কপাট। আসলে খুলল হাওয়ার ধাক্কায়। কিন্তু মনে হল যেন, রোডরিক তর্জনী তুলে দরজা দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য শক্তি আঙুলের ডগা থেকে ধেয়ে গিয়ে দু-হাট করে দিল পাল্লাজোড়া।

     বাইরে দাঁড়িয়ে সাদা শব-বস্ত্র পরা একটি নারীমূর্তি। লেডি ম্যাডেলিন। আস্তে আস্তে দুলছে সামনে আর পেছনে। লাল রক্ত লেগেছে সাদা বস্ত্রে, ক্ষীণ আর শীর্ণ তনুর ওপর দিয়ে ধস্তাধস্তির ঝড় যে বয়ে গেছে— তার চিহ্ন সুস্পষ্ট সারা দেহে। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্যে সামনে পেছনে শরীর দুলিয়ে ছিটকে এল ঘরের মধ্যে— গলা চিরে বেরিয়ে এল চাপা গোঙানি— চেয়ারে আসীন ভাইয়ের ওপর আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই ঠিকরে গেল মেঝের ওপর। চরম মৃত্যুকালীন সেই কাৎড়ানি আর খিঁচুনিই মরণের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে গেল রোডরিকের প্রাণের খাঁচায়। দু-দুটো নিপ্রাণ দেহ স্থির হয়ে পড়ে রইল মেঝের ওপর।

     পালিয়ে এলাম আমি সেই ঘর আর সেই প্রাসাদ থেকে। পাথরে বাঁধানো উঁচু জঙ্গলের ওপর দিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে দৌড়োতে দেখলাম পাগলা ঝড়ের পাগলামি এতটুকু কমেনি। আচমকা পথের ওপর ঝলকে উঠল উদ্দাম এক আলোকরশ্মি। সচমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম আলো আসছে কোত্থেকে— তা দেখবার জন্যে। আমার পেছনে প্রকাণ্ড ওই প্রাসাদ আর তার মহাকায় ছায়া ছাড়া তো কিছুই থাকার কথা নয়। দেখেছিলাম প্রাসাদের বুক চিরে রক্তলাল, অস্তগামী পূর্ণ চন্দ্রকে যে ক্ষীণ ফাটলের কথা আগে উল্লেখ করেছিলাম— প্রায়-অদৃশ্য যে ফাটলটা ছাদের কার্নিশ থেকে শুরু করে এঁকে বেঁকে বিদ্যুল্লতার ভঙ্গিমায় মেঝে পর্যন্ত পৌঁছেছিল— অকস্মাৎ তা উদার হয়ে চন্দ্ররশ্মির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। আমার স্তম্ভিত চাহনির সামনেই দেখতে দেখতে আরও চওড়া হয়ে গেল ফাটল-পথ— হু-হু করে দামাল ঝড় পথ করে নিল সেই ফাঁক দিয়ে, ফাটলকে আরও ব্যাদিত করে দিয়ে তুলে ধরল উপগ্রহের পূর্ণ অবয়বকে। মাথা ঘুরে গেল আমার! কর্ণকুহরে ভেসে এল বিশাল প্রাসাদের প্রকাণ্ড দেওয়াল একে একে ধসে আর আছড়ে পড়ছে দু-পাশে— লক্ষ করতালি বাজিয়ে বুঝি উল্লোল অট্টহেসে নৃত্য জুড়েছে জলোচ্ছ্বাস— নিমেষ মধ্যে পায়ের তলার নিতল সরোবর প্লাবন ঘটিয়ে আশার প্রাসাদ-এর ভগ্নাবশেষের ওপর— এখন তার অথই জলের চাদরে নিস্তব্ধ বিষাদ ছাড়া আর কিছুই নেই।

 

    

মূল গল্প: দ্য ফল অব দ্য হাউস অব আশার (১৮৩৯)

মূল লেখক: এডগার অ্যালান পো

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!