মানবিক

ঐষিক মজুমদার

অলংকরণ:সুমন দাস

শ্চর্য জ্যাক! এই হোক্কিট-দের নিয়ে তোমরা পাক্কা তিন বছর কাজ করছ, অথচ ওদের উন্নতির জন্য কিছুই করোনি?”

     নতুন সুপারভাইজার মাইকেল ওটিনো-র কথা কানে যেতে কারখানার ইনজিনিয়ার তথা হিসাবরক্ষক জ্যাক নর্টন হাতের নকশাটা থেকে মুখ তুলে আড়চোখে তার দিকে তাকাল। নতুন এই আফ্রিকাজাত সুপারভাইজারকে সে একেবারেই পছন্দ করে না।

     “কী ধরনের উন্নতি?” সে সতর্কভাবে প্রশ্ন করল।

     “আরে, এদের এই আদিম, অসভ্য আচার-আচরণের উন্নতি!” উন্নাসিক ভঙ্গীতে মাইকেল বলল, “কপালগুণে মানুষের সংস্পর্শে যখন এসেইছে, আমাদের কি কর্তব্য নয়, এদের মধ্যে মানবিক গুণাবলীর বিকাশের চেষ্টা করা?”

     জ্যাক নর্টন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মুহূর্তে তার আগের সুপারভাইজার ভারতীয় ভিকি ভরডোয়াজ-এর কথা মনে পড়ছে।

     “ওদের ব্যাপারে নাক গলাতে যেও না!” বিয়ারের বোতলে চুমুক দিয়ে বুড়ো বলত, “তোমার কাজ করানো নিয়ে কথা, আর কোম্পানির কাজ হওয়া নিয়ে কথা! হোক্কিট-রা কী করল না-করল, তা দেখে তোমার কী লাভ?”

     ভালোই ছিল বুড়ো, ঘরভরতি মদের বোতল আর ইয়ার-বাড ভরতি ভারতীয় রাগসঙ্গীত নিয়ে। এক মাস হল অবসর নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে গেছে। তারপরেই তার জায়গায় এই আপদ…

     তার চেয়ে বয়েসে সামান্যই বড়। মানুষ যে খুব খারাপ, তা নয়। তবে সদ্য পৃথিবী থেকে আসার ফলে মহৎ সব পরিকল্পনায় মগজ ঠাসা। গত তিরিশ দিনে কারখানার কর্মপদ্ধতিতে অন্তত তিরিশটা ভুল খুঁজে বার করেছে হতভাগা!

     অবশ্য মাইকেলের খুব দোষ দেওয়া চলে না। জ্যাক নিজে যখন প্রথম এই ওরোস গ্রহে আসে, তখন সে-ও ছিল কল্পনাবিলাসী। তারপর তিনটি বছর ধরে এই কারখানার ঘানি ঠেলা। সমাজ-সংসার নেই, নারীসঙ্গ নেই। সম্বল শুধু রদ্দি কিছু রহস্য-রোমাঞ্চের বই। মদ সে একটু-আধটু খায় বটে, তবে ভিকি-বুড়োর মতো নেশাটাও রপ্ত করতে পারেনি। সব মিলিয়ে, তার সমস্ত কল্পনা কবেই বাষ্প হয়ে উবে গেছে।

     কল্পনার মূলে কুঠারাঘাতের আরেকটা বড় কারণ হোক্কাইট, অর্থাৎ হোক্কিট-দের ভাষা। এ ভাষার বর্ণমালায় ছাপ্পান্নটি অক্ষর, এবং তার মধ্যে কোনও স্বরবর্ণ নেই। ফলে হোক্কাইট ভাষার শব্দের যে বিটকেল ধ্বনি হয়, তিনটে জিভ থাকার ফলে একমাত্র হোক্কিট-দের পক্ষেই তার যথাযথ উচ্চারণ সম্ভব। তার ওপরে প্রয়োগের বিভিন্নতায় একই শব্দের নানারকম অর্থ হতে পারে। এ ভাষা চলনসই গোছের রপ্ত করতে গিয়ে প্রথম বছরেই জ্যাকের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার দাখিল হয়েছিল। এই মুহূর্তে তার ইংরেজি পুরোপুরি বিশুদ্ধ কি না, সে নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে তার।

     তবুও এ কাজটা পাওয়ার জন্য সে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয়। পৃথিবী বা তার কাছাকাছি গ্রহের উপনিবেশগুলোতে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতায় চাকরি পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের এই ওরোস গ্রহের দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ। এত দূরে অভিযান সম্ভব হয়েছে মাত্র বছর পাঁচেক আগে। পরিবেশ অনেকটা পৃথিবীর মতো হলেও এখানে তেমন কোনও উপনিবেশ এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। তবুও পৃথিবী ও তার কাছাকাছি উপনিবেশের বণিকমহলে এই ওরোস গ্রহের গুরুত্ব আজ অপরিসীম। সেজন্যই এখানে বেড়েছে কর্মসংস্থান।

     তার একমাত্র কারণ, এই গ্রহের সবচেয়ে উন্নত প্রজাতি হোক্কিট-দের আশ্চর্য কারিগরী দক্ষতা। মানুষের প্রায় অর্ধেক উচ্চতার হলেও এরা মোটামুটি মনুষ্যাকৃতি। তফাতের মধ্যে গায়ের রং লালচে এবং মুখমণ্ডলে চোখ ও জিভের সংখ্যা তিনটি করে। অনেকটা মানুষের মতোই আজানুলম্বিত দুই হাত, তাতে আঙুলও আছে কয়েকটা।

     আসল তফাত অন্য জায়গায়। প্রত্যেক হোক্কিট-এর পেটের কাছে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট-ছোট প্রত্যঙ্গ। এই প্রত্যঙ্গগুলির সাহায্যে তারা যে কোনও সূক্ষ্ম কাজে অসাধারণ পারদর্শী।

     তাদের এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছে পৃথিবীর বেশ কয়েকটি সংস্থা, জ্যাকের কোম্পানি “ইন্টারস্টেলার জুয়েলার্স” যাদের অন্যতম। প্রতি দু-মাস অন্তর পৃথিবী থেকে মহাকাশফেরিতে তারা পাঠায় সোনা, জহরত ও অন্যান্য কাঁচামাল। এখানে হোক্কিট-রা সেই কাঁচামাল থেকে অবিশ্বাস্য কম সময়ে তৈরি করে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নকশার অসামান্য সব অলংকার। সুপারভাইজারের কাজ এর তত্ত্বাবধান, জ্যাকের কাজ হোক্কিট-দেরই সাহায্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতি। তাদের নিজেদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও টিনের খাবার ওই মহাকাশফেরিতেই আসে। তৈরি গয়নাও ওতে করেই পৃথিবীতে ফেরত যায়।

     এই শ্রমের মূল্য হিসাবে হোক্কিটরা নেয়… বালি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, বালি! সামান্য পরিমাণ বালির বিনিময়ে অকথ্য পরিশ্রম করে তারা। বালি বা সিলিকন ডাই-অক্সাইড এ গ্রহে পাওয়া যায় না। পৃথিবী থেকে তা-ও আসে মহাকাশযানেই। বালি মজুত ও বণ্টনও জ্যাকের দায়িত্ব।

     অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য হিসাবে হোক্কিট-রা বালি খেয়ে থাকে। যদিও সিলিকন ডাই-অক্সাইড তারা কীভাবে পরিপাক করে, অথবা তাদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় তা ঠিক কী ভূমিকা পালন করে, তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

     শৈল্পিক নৈপুণ্য থাকলেও হোক্কিট-দের জীবনযাত্রা সরল শুধু নয়, আদিম বলা চলে। তারা যূথবদ্ধ জীব, অনেকটা পৃথিবীর মনুষ্যেতর প্রাণীদের মতোই। এই কারখানার প্রায় একশো জন হোক্কিট সকলে একসঙ্গে একটা চাঁদোয়ার নীচে বসবাস করে। স্ত্রী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সকলের পরনে একখণ্ড কৌপিনের মতো জিনিস। তারা একসঙ্গে এই গ্রহের ছোটখাটো জলচর ও স্থলচর প্রাণী শিকার করে। জঙ্গল থেকে নিয়ে আসে বিচিত্রদর্শন ফল। যে যা-ই পাক, সবাই সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। মানুষের মতোই তারা রাতে বিশ্রাম নেয়। উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন এবং তৎপরবর্তী কার্যকলাপও চলে অবাধে। সবই সর্বসমক্ষে, ওই বারোয়ারী চাঁদোয়ার তলায়।

     আর এটাই সম্ভবত না-পসন্দ্ মাইকেলের। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের বহুগামিতাও হয়তো তার বিবমিষার উদ্রেক করে থাকবে।

     ভাগ্যক্রমে জ্যাকের সঙ্গে তার এই কথোপকথন আর বেশি দূর এগোল না। নৈশভোজের পরেই নিজের ঘরে গিয়ে সেঁধোল জ্যাক। ঘুম অবশ্য সহজে এল না। তার প্রধান কারণ একটা পাতলা দেওয়ালের ব্যবধানে পাশের ঘরে মাইকেলের নাসিকাগর্জন।

     পরদিন সকালে রোজকার মতো ঘর থেকে বেরিয়ে জ্যাক এক অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হল। হোক্কিট-দের ছাউনির সামনে দাঁড়িয়ে মাইকেল প্রাণপণে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। তার সামনে শ্রোতা মূলত তিনজন— এক মাতব্বর গোছের পু্রুষ হোক্কিট, তার সাম্প্রতিক সঙ্গিনী, এবং আরেকজন পুরুষ। জ্যাক এদের চেনে। নামগুলো কাছাকাছি এবং দুরুশ্চার্য; তাই সে নিজের সুবিধামতো সামান্য পরিবর্তন করে নিয়েছে। ওই যুগল হল জোকামো এবং জোকিমি। অন্য পুরুষটির নাম জোকিমাও। তিনজনেই মাইকেলের কথা বুঝবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কৌতূহলভরে তাকাচ্ছে অন্যরাও।

     ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মাইকেল বারংবার অঙ্গভঙ্গীর আশ্রয় নিচ্ছে। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে, কারণ মানুষের অঙ্গভঙ্গীর সঙ্গে হোক্কিট অঙ্গভঙ্গী মেলে না।

     জ্যাককে দেখতে পেয়েই মাইকেল ডাকল, “ওহে জ্যাক, একবার এদিকে এসো ভায়া!”

     অনিচ্ছাসত্ত্বেও জ্যাক এগিয়ে গেল। মাইকেল বলল, “আমার কথাগুলো এদের একটু বুঝিয়ে দাও তো।”

     জোকামো ও জোকিমিকে উদ্দেশ করে সে যোগ করল, “তোমরা দুজনে দুজনকে পছন্দ করেছ। তাই আজ থেকে তোমরা স্বামী-স্ত্রী।”

     অনুবাদ করতে গিয়ে জ্যাক হোঁচট খেল। হোক্কাইট ভাষায় সঙ্গত কারণেই “স্বামী” বা “স্ত্রী”-র কোনও প্রতিশব্দ নেই। দ্বিধাগ্রস্ত সুরে সে মাইকেলকে বলল, “স্যার, আপনি কি নিশ্চিত?”

     “আলবাত!”

     মনে-মনে সুপারভাইজারের মুণ্ডপাত করতে-করতে জ্যাক আদেশ পালন করল। সে অবশ্য ব্যবহার করল “সঙ্গী ও সঙ্গিনী” কথাটাই।

     জোকামো এবং জোকিমি একটু অবাক হল। এ আর বলার কী আছে!

     মাইকেল, এবং জ্যাক, বলে চলল, “এ জন্য তোমাদের উচিত সবার সামনে… ইয়ে, মানে সবার সামনে না থেকে একটা আলাদা বাড়িতে থাকা।”

     প্রতিশব্দের অভাবে এবার জ্যাক সরাসরি “বাড়ি” কথাটাই বলতে বাধ্য হল। বিস্ময়ে হোক্কিট-দের তিনটে চোখেই ঘন-ঘন পলক পড়তে লাগল। জ্যাক মাইকেলকে বুঝিয়ে বলল, “স্যার, ওরা বাড়ি কাকে বলে জানে না।”

     “বাড়ি জানে না!” – বলে সোৎসাহে মাইকেল কাজে লেগে পড়ল।

     প্রথমে সে একটা কাঠির সাহায্যে ওরোস গ্রহের ধুলোর ওপর ছবি এঁকে দেখাল। তাতে সুবিধা না হওয়ায় নিজের ঘর থেকে একটা খালি প্যাকিং বাক্স টেনে এনে বাড়ির সম্ভাব্য মডেল বোঝাতে লাগল।

     এবারে কাজ হল। নতুন কিছু তৈরির সম্ভাবনায় জোকামো-জোকিমির পেটের প্রত্যঙ্গগুলি দ্রুত নড়াচড়া করতে লাগল। শেষ নির্দেশটুকু নিয়েই তারা কাজে লেগে পড়ল। গ্রহের মাটির সঙ্গে জল মিশিয়ে মেখে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় দুজনে একটা মাটির দেওয়াল তুলতে শুরু করল। দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল আরও অনেকে।

     বিরসবদনে জ্যাক গিয়ে কারখানার তালা খুলল। প্রায় একশোজন কর্মীর মধ্যে কাজে এসেছে ষাটজন, অন্যরা তামাশা দেখতে ব্যস্ত। তাদের নিয়েই সে কাজ করতে লাগল।

     বিকেলের মধ্যেই জোকামো-জোকিমির মাটির বাড়ি তৈরি হয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলায় তারা বিজয়গর্বে সেখানে প্রবেশ করল।

     পরদিন সকালে অন্য হোক্কিট-রা সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসেছিল। সম্ভবত এই নতুন ব্যবস্থায় তারা কৌতুকই অনুভব করছিল। এইসময় জ্যাককে বগলদাবা করে মাইকেল আবার গিয়ে তাদের মধ্যে উপস্থিত হল।

     জ্যাককে আরেকবার দোভাষীর ভূমিকা নিতে হল।

     “এটা ঠিক নয়!”

     সকলে অবাক হয়ে তাকাল। জোকিমাও জিজ্ঞেস করল, “কোনটা ঠিক নয়?”

     “এই যে ওদের একটা বাড়ি আছে। তোমাদের নেই। তোমাদেরও তো চেষ্টা করা উচিত!”

     ওরা আবার বাড়িটার দিকে তাকাল।

     “ওদের আছে, তোমাদের নেই!” মাইকেল আর জ্যাক আরেকবার বলল, “এটা ঠিক নয়।”

     বেলার দিকে দেখা গেল, হোক্কিট-দের অনেকেই বাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারখানায় ঢুকে জ্যাক দেখল, আজকে তিরিশজন উপস্থিত। সে মাইকেলকে বলতে গেলে মাইকেল উদার হেসে জানাল, “আহা, থাক-না! ওরা যদি মানুষ হয়ে উঠতে চায়, তার জন্য এক-দু-দিন ছুটি দেওয়াই যেতে পারে।”

     এক-দু-দিনে কিন্তু বিষয়টার নিষ্পত্তি হল না। পরবর্তী তিনদিনে দেখা গেল, কারখানার লাগোয়া অঞ্চলে সব মিলিয়ে পঁয়ত্রিশটা ছোট মাটির বাড়ি উঠেছে। বারোয়ারী চাঁদোয়া উধাও।

     জ্যাক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক, এবার হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আবার পুরোদমে শুরু হবে কারখানার কাজ।

     ঠিক সেইসময় জোকামো তার বাড়ির উচ্চতা কিছুটা বাড়াল। জোকিমি বাইরের দেওয়ালে এঁকে দিল কিছু সুন্দর নকশা।

     পরের দিন মাত্র পনেরো জন শ্রমিক কাজে যোগ দেওয়ায় মাইকেল জ্যাককে নিয়ে সরেজমিনে তদন্তে বেরোল।

     দেখা গেল, অধিকাংশ হোক্কিট যার-যার বাড়ির উন্নতিসাধনে রত। অবাক হয়ে দুই পৃথিবীবাসী জোকিমাও-কে গিয়ে ধরল।

     “তোমাদের সকলের বাড়ি তৈরি তো হয়ে গেছে। এখন আর তার পেছনে খাটছ কেন?”

     কাজ না থামিয়েই জোকিমাও জবাব দিল, “এটা ঠিক নয়।”

     “কোনটা?”

     “জোকামো-র বাড়ি। ওটা আমার বাড়ির চেয়ে বড় আর ভালো। এটা ঠিক নয়।”

     জ্যাকের মাধ্যমে মাইকেল তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, বাড়ি শুধু থাকার জন্য। সেটাকে আরও সুন্দর করে কোনও লাভ নেই। তবে সেই বোঝানোয় কোনও কাজ হল না। জোকিমাও ওদের কথা শুনল না, বা শুনলেও পাত্তা দিল না। ওদের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে সে এক মনে কাজ করে যেতে লাগল।

     জ্যাক আর মাইকেল অন্য হোক্কিট-দেরও জনে-জনে বোঝাল। কিন্তু ফলপ্রসূ হল না সেই চেষ্টা।

     কেবিনে ফেরার পথে মাইকেল রাগে ফুঁসছিল।

     “অসভ্য বর্বর জাতি!” বিড়বিড় করে সে গালি দিল, “আর একটা দিন দেখে নিই, তারপর আমি এদের নামে পৃথিবীতে রিপোর্ট করব।”

     ফুঁসছিল জ্যাকও। সে-ও গালাগালি দিল, তবে মনে-মনে।

     “কেলে-কুষ্মাণ্ড!”

     পরের দিন কারখানায় হাজিরা দিল দশজন। গম্ভীর মুখে মাইকেল পৃথিবীর হেড অফিসে হোক্কিট-দের অযৌক্তিক অবাধ্যতার নিন্দা করে এবং পরবর্তী করণীয় জানতে চেয়ে এক গ্রাম্ভারী চিঠি লিখল। জ্যাক মারফত সেই চিঠি রেডিয়ো সংকেতের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হল। এই বার্তা পৌঁছতে এবং হেড অফিস থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ আসতে সব মিলিয়ে সময় লাগবে সাত দিন। তদবধি এভাবেই চালানো ছাড়া উপায় নেই।

     লাঞ্চের সময় কলোনি পরিদর্শনে বেরিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল। বাড়ি নিয়ে ব্যস্ততা তো আছেই, তার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজিত তর্কে লিপ্ত দুই বা ততোধিক হোক্কিট।

     মাইকেল জিজ্ঞেস করল, “ব্যাপার কী হে?”

     জ্যাকের কাছেও এই অভিজ্ঞতা নতুন। কয়েকজনকে প্রশ্ন করে সে জানতে পারল, এই বিবাদ সঙ্গিনী-সংক্রান্ত।

     “সে কী!” মাইকেলের সকৌতুক উক্তি, “এদের মধ্যে এসবও আছে নাকি?”

     জ্যাক ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল। নেই। অন্তত, এতদিন ছিল না। তার কারণ, হোক্কিট-রা স্বচ্ছন্দ বহুগামিতায় অভ্যস্ত। যে-কেউ যে-কোনওদিন যে-কারুর সঙ্গে থাকে; কলহের কোনও অবকাশ নেই। এই মুহূর্তে কী হচ্ছে, কিছুই সে বুঝতে পারছে না।

     সেই রাতে একটা ভয়ানক গোলমালে ওদের ঘুম ভেঙে গেল। ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ। তার সঙ্গে ক্রুদ্ধ গর্জন আর কাতর আর্তনাদ।

     আওয়াজটা আসছে হোক্কিট-আবাসনের দিক থেকে। দুজনে রাত-পোশাকেই সেদিকে ছুটল।

     একটা জায়গায় অনেক হোক্কিট গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে জ্যাক দেখতে পেল— বৃত্তের মাঝখানে দ্বন্দ্ব চলেছে জোকামো আর জোকিমাও-এর মধ্যে। প্রথমজনের সঙ্গিনী জোকিমি-সহ অন্য হোক্কিট-রা নীরব দর্শক।

     মরণপণ সংগ্রাম! দীর্ঘ বাহুযুগলের সাহায্যে একে অপরের ওপর মুহুর্মুহু মুষ্ট্যাঘাত বর্ষণ করছে দুই যুযুধান শত্রু। লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে তাদের ক্ষুদ্র প্রত্যঙ্গগুলিও।

     জোকামো বয়েসে প্রবীণ। অপেক্ষাকৃত নবীন প্রতিপক্ষের আক্রমণে তার অবস্থা রীতিমতো কাহিল। জ্যাক বাধা দেওয়ার আগেই এক মোক্ষম আঘাতে সে ধরাশায়ী হল।

     “কী হচ্ছে এসব?” জ্যাক ধমকের সুরে জানতে চাইল।

     জোকিমাও হাঁপাচ্ছে। সেই অবস্থাতেই তিন চোখ পিটপিট করে সে বলল, “এটা ঠিক নয়!”

     “কোনটা?” জ্যাক অবাক।

     “জোকামোর সঙ্গিনী আমার সঙ্গিনীর চেয়ে সুন্দরী। এটা ঠিক নয়। আমার জোকিমি-কেই চাই!”

     জোকামো মাটিতে শুয়ে ধুঁকছে। কয়েকজন দর্শকের সাহায্য নিয়ে জ্যাক তাকে তার ঘরের ভেতর নিয়ে গেল। নিজের কেবিন থেকে ফাস্ট-এইড বক্স নিয়ে এসে তার ক্ষতের যথাসাধ্য পরিচর্যা করল। হোক্কিট-দের মধ্যে যারা চিকিৎসা বিশারদ, তারা নিজস্ব উপায়ে গাছের ডাল ও লতা দিয়ে বেঁধে দিল জখম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

     তবুও জোকামো নির্জীবের মতো পড়ে রইল। দেহের ভেতরে কী হচ্ছে তা জানার কোনও উপায় নেই। কোম্পানি এই গ্রহে উন্নত চিকিৎসার কোনও বন্দোবস্ত করেনি। অসহায়ভাবে আরও কিছুক্ষণ বসে থেকে শেষে জ্যাক নিজের কেবিনে ফিরে এল।

     পরদিন ভোরের দিকে জোকামো মারা গেল। কয়েকজন হোক্কিট তার দেহটা নিয়ে গিয়ে দূরের মাঠে কবর দিয়ে এল।

     জোকিমাও হয়ে বসল হোক্কিটদের অঘোষিত মাতব্বর। নিজের ঘর ছাড়াও জোকিমি-র ঘরেও সে যাতায়াত করতে লাগল। জোকিমি-রও তাতে বিশেষ আপত্তি আছে বলে মনে হল না।

     এই ঘটনার পর তিনদিন কেটে গেছে। পৃথিবী থেকে এখনও কোনও নির্দেশ এসে পৌঁছয়নি। জ্যাক বিমর্ষ মুখে বসে আছে। হোক্কিট-দের আভ্যন্তরীণ বিবাদ ক্রমবর্ধমান। কারখানার কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আজ কাজে এসেছে সাকুল্যে পাঁচ জন কর্মী।

     বেলায় সে সবে লাঞ্চের জন্য খাবারের একটা টিন নিয়ে বসেছে, জনা তিনেক সঙ্গী-সহ জোকিমাও এসে উপস্থিত। অনেকটা মানুষের ভঙ্গীতেই সে হেলেদুলে কারখানার ভেতর খানিক ঘুরল। তারপর জ্যাকের সামনে এসে দাঁড়াল।

     “এটা ঠিক নয়!”

     “আবার কী হল?” আঁতকে উঠে বলল জ্যাক।

     “তোমার কাছে এত বালি।” জোকিমাও বালির গুদামের দিকে ইঙ্গিত করল, “আমাদের কাছে বালি নেই। ঠিক নয়।”

     “ঠিক নয়… ঠিক নয়…” মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল তার অনুচরদের মুখেও।

     “ওই বালি তোমাদের জন্যই রাখা আছে।” স্থির দৃষ্টিতে জোকিমাও-এর মুখের দিকে তাকিয়ে জ্যাক বলল, “কাজ করলেই পাবে।”

     জোকিমাও কিন্তু এই উত্তরে সন্তুষ্ট হল না। তিন চোখ পিটপিট করতে-করতে সে বিদায় নিল।

     সেই রাতেই বালির গুদাম লুঠ হয়ে গেল।

     হোক্কিট-রা কোনও ফাঁকে গুদামের তালার চাবি দেখে তার নকল বানিয়ে রেখেছিল। আওয়াজ শুনে জ্যাক আর মাইকেল গিয়ে দেখতে পেল— দরজা খুলে বস্তা-বস্তা বালি নিজেদের আস্তানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে একদল হোক্কিট!

     ভিনগ্রহে আত্মরক্ষার জন্য লেসার গান যে কোনও মানুষের কাছেই থাকে। লুটেরাদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে জ্যাক আর মাইকেল একসঙ্গেই বন্দুক তুলল।

     জবাবে বেশ কিছু হোক্কিট তাদের দিকে সেই বন্দুকের নিখুঁত প্রতিলিপি তুলে ধরল!

     এই বন্দুক-ও বানানো হয়েছে এই ক-দিনে, সম্ভবত তাদের অলক্ষে আসলকে অনুকরণ করেই! শিউরে উঠে জ্যাক তার বন্দুক নামাল।

     মাইকেল তখনও ইতস্তত করছে। সংশয়ের সুরে সে বলল, “ওদের ওই নকল লেসার গানে আদৌ কি লেসার রশ্মি বেরোবে?”

     জ্যাক নর্টন তিন বছর হোক্কিটদের সঙ্গে কাজ করেছে। সে সংক্ষেপে বলল, “বেরোবে।”

     নির্বিঘ্নে কাজ সম্পন্ন করে লুণ্ঠনকারীরা সদর্পে চলে গেল। আতঙ্কিত গলায় মাইকেল বলল, “কাল সকালেই কিছু একটা করতে হবে! কুড়ি মাইল দূরের গ্যালাক্টিক টেক্সটাইলসের সঙ্গে যোগাযোগ…”

     জ্যাক মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। সে কোনও কথা বলল না।

     কিছু করার সুযোগ অবশ্য পাওয়া গেল না। ভোররাতের দিকেই কেবিনের দরজা ভেঙে দুজনকে পাকড়াও করল জোকিমাও-এর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র হোক্কিট-বাহিনী।

     দিনের আলো সবে ফুটে উঠেছে। কর্মী আবাসনের সামনে বন্দি দুজনকে বেঁধে রাখা হয়েছে দুটো পাথরের সঙ্গে। গম্ভীর মুখে তাদের সামনে পায়চারী করছে জোকিমাও। চারদিকে হোক্কিট-দের ভিড়।

     “ওরোস গ্রহের সমস্ত হোক্কিট-দের খবর দিয়েছি আমরা।” পায়চারী থামিয়ে অবশেষে বলল জোকিমাও, “এই মুহূর্তে তোমাদের মতোই, অন্যান্য ভিনগ্রহী মানুষরাও আমাদের হাতে বন্দি। কেউ পৃথিবীতে খবর পাঠাতে পারবে না। তোমাদের বাঁচিয়ে রাখা হবে কি না, সেটা আমরা আজকেই ঠিক করব।”

     একটু থেমে দম নিয়ে সে আবার শুরু করল, “এরপর মহাকাশযান এসে পৌঁছলেই তার মহাকাশচারীদেরও গ্রেপ্তার করব আমরা। সেই মহাকাশযানের আদলে বানাব আরও অনেক ওরকম যান। তারপর সেই সব মহাকাশযানে সওয়ার হয়ে সব হোক্কিট একসঙ্গে পৌঁছব পৃথিবীতে। মানুষেরই অস্ত্রে মানুষকে ঘায়েল করে দখল করে নেব সেই গ্রহ।”

     ভয়ার্ত মাইকেলের মুখে কথা সরল না। প্রমাদ গুণল জ্যাক। হোক্কিট-দের কারিগরী দক্ষতা নিয়ে তার সামান্যতম সংশয় নেই। দেখে-দেখে মহাকাশযান তৈরি করা তাদের পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়। আর প্রত্যেক মহাকাশযানেই থাকে বেশ কিছু পারমাণবিক অস্ত্র, যাত্রাপথে অ্যাস্টেরয়েড বা গ্রহাণুর মুখোমুখি হলে তা চূর্ণ করার জন্য। কাজেই হোক্কিট-রা অতর্কিতে আক্রমণ করলে তাদের পৃথিবী জয়ের পরিকল্পনা হয়তো আকাশকুসুম না-ও হতে পারে। কিন্তু…

     “কিন্তু,” শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে সে প্রশ্ন করল, “পৃথিবীর মানুষ তো তোমাদের কোনও ক্ষতি করেনি! তোমরা এমনটা করবে কেন?”

     “কারণ এটা ঠিক নয়!” জলদগম্ভীর স্বরে বলল জোকিমাও, “পৃথিবীতে আছে বালির অশেষ ভাণ্ডার। এই ওরোস গ্রহে কোনও বালি নেই। তোমাদের আছে, আমাদের নেই! এটা ঠিক নয়!”

     “ঠিক নয়! ঠিক নয়!” সমস্বরে গর্জে উঠল সমবেত হোক্কিট-বৃন্দ।

     আর সেই ভয়ংকর মুহূর্তে হিস্টিরিয়া-গ্রস্ত রোগীর মতো উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল জ্যাক। চমকে উঠল সবাই।

     পাগলের মতো হাসছে জ্যাক। হাসতে-হাসতে রীতিমতো বেসামাল সে। পাথরের সঙ্গে বাঁধা না থাকলে হয়তো লুটিয়েই পড়ত মাটিতে।

     বিস্ময়ে ঘন-ঘন পলক পড়তে লাগল হোক্কিট-দের ত্রিনয়নে।

     অবাক হল মাইকেলও। অবিমিশ্র আতঙ্কের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে সে বলল, “এর মধ্যে হাসির কী পেলে জ্যাক? পাগল হয়ে গেলে নাকি?”

     “আপনি এদের ভেতর মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন না?” হাসি থামিয়ে কোনওমতে উচ্চারণ করল জ্যাক, “অভিনন্দন, স্যার! আপনি সম্পূর্ণ সফল! মানবিক গুণ এরা ভালোভাবেই রপ্ত করেছে!”

     বলেই আবার সে ফেটে পড়ল অট্টহাসিতে।

     “মানবিক গুণ?” প্রশ্ন করল বিভ্রান্ত মাইকেল, “কী যা-তা বলছ? কোন মানবিক গুণ?”

     হাসতে-হাসতে মুখে ফেনা উঠছে জ্যাকের, রুদ্ধ হয়ে আসছে তার শ্বাস। মরিয়া চেষ্টায় তার গলা থেকে ছিটকে বেরোল একটাই শব্দ।

     “ঈর্ষা!”

 

 

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!