সমুদ্রের গুপ্তকথা

সংযুক্তা চ্যাটার্জী

অলংকরণ:রনিন

   কি বলছ জেঠু সমুদ্রের নীচে নদী?” শাওন অবাক!

     সবাই বসেছে বিখ্যাত ওসানোলজিস্ট শঙ্কর সেনগুপ্তকে ঘিরে। তিতিরের জ্যেঠু উনি। বিয়েসাদি করেননি। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে আসেন ভাইয়ের বাড়িতে। তখনই তিতির আর ওর বন্ধুদের জমায়েত হয় গল্পের আশায়। তিতিরের বাড়ির সবাই খুব ফ্রি। জমিয়ে আড্ডায় তাই কোনও কিছু বাধা নিষেধ নেই। সবাই “বুড়ো সাধু” নিয়ে বসেছে গলায় ঢালবে বলে।

     আজ কথা উঠেছিল কাশ্মীরের বন্যা নিয়ে। সেখান থেকেই নদী, তারপর সমুদ্রের নিচের নদী।

     —তুই জানিস না? গত আশির দশকে যখন সমুদ্রের তলদেশের সোনার ম্যাপিং শুরু হয়, তখনই এ ব্যাপারে প্রথম জানা যায়। এদের মধ্যে কিছু নদী সামুদ্রিক জলের হয়। কয়েকটা আবার মিষ্টি জলেরও হয়। তবে জমির ওপরের নদীর মতোই গভীর খাদ তৈরি করে, দু-দিকে পলি জমা করে, প্রচুর ডেব্রিজ় বয়ে নিয়ে যায়। শেষে সমুদ্রের জলেই কোথাও হারিয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, এ সব নদী সাগরের তলায় কিছুদিন বয়ে চলার পর দিন, মাস এমনকি বছরও ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে চুপ করে লুকিয়ে থাকে। বোঝাই যায় না ওখানে জলের তলায় একটা নদী আছে। সেই জন্যই এদের অনেক কিছুই এখনও অজানা। তার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় তাদের উৎস আর মোহনা। কি করে জন্মায় আর কোথায় লীন হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জানা যায় না!

     শাওনের পাশে কফি নিয়ে বসে রোহন। ওর শক্ত পানীয়তে এলার্জি আছে। অবাক হয়ে কৌতূহলী হয়

     —কি অদ্ভুত! তা এ ব্যাপারে তোমার কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে নাকি, জেঠু?

   রোহনের কথায় চুপ করে যান প্রৌঢ় সমুদ্রপুরুষ। চোখ সীমানা পেরিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। চোখটা একটু যেন আর্দ্র হয়ে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেগে ওঠেন।

     —সময়টা গত শতাব্দীর অন্তিম কাল। তোমাদের কি মনে আছে? ওই সময় আমাদের বঙ্গোপসাগরে পরপর বেশ কয়েকটা ভূমিকম্প হয়েছিল। অবশ্য তোমরা ছোট ছিলে সে সময়ে। ঘটনাটা সে সময়ের।

     —আমার তো জন্মই হয়নি।

     ফুট কাটে তিন্নি। তিতিরের কলেজ পড়ুয়া বোন।

     —সেই তো। তোদের মনে থাকার কথা নয়।

     —ওর কথা ছাড়ো জ্যেঠু। কি হয়েছিল তখন? তুমি এভাবে হঠাৎ চুপ করে গেলে!

     —বলছি। বিশ্বাস অবিশ্বাস তোদের ব্যাপার।

     শুরু করেন তিনি।

(২)

     —তখন বছর পাঁচেক চাকরি পেয়েছি ভারত সরকারের অধীনে। মিনিস্ট্রি অব আর্থ সায়েন্স। পোস্টিং দিল্লিতেই। কাজের ক্ষেত্রে কিছু সুনাম হয়েছে ডাকাবুকো হওয়ার কারণে। কানাঘুষো খবর শুনছি, বে-অফ-বেঙ্গলের ভারত মায়ানমার সীমানায় কিছু ইস্যু চলছে। সীমানা মানে জলসীমানা। কোনও নির্দিষ্ট লাইন তো হয় না, খানিকটা অঞ্চলকে সীমানা ধরে নেওয়া হয়। সেখানে দু-দেশের কেউই ঠিক মতো দায়িত্ব নিতে চায় না। উড়িষ্যার কয়েকটা জেলে নৌকো পরপর হারিয়ে গেছে। গরীব জেলে, কারুর কিছু আসে যায়নি।

     আমাদের ডিপার্টমেন্ট নড়েচড়ে বসল যখন স্যাটেলাইট থেকে আন্ডারওয়াটার রিভারের অস্পষ্ট ছবি পাওয়া গেল ওই অঞ্চলে। হঠাৎই যেন তৈরি হয়েছে নদীটা। আমার তখনকার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আমাকেই মনে পড়ল।

     —সেনগুপ্ত, জানোই তো এই নদীগুলোর কোনও স্থিরতা নেই। কবে আবার ভ্যানিশ হয়ে যাবে, তার ঠিক নেই। একবার সরজমিনে তদন্ত করে এস। চাই কি তোমার পরের রিসার্চের মেটেরিয়ালও পেয়ে যেতে পার।

     এই খুড়োর কল না ঝোলালেও চলত! আমার নিজের মাথার পোকাগুলোই নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে।

     দু-দিনের মধ্যে কিছু গোছগাছ করে পৌঁছলাম বিশাখাপত্তনাম। ওখানে আমাদের জন্য রেডি ছিল “রে-অফ-সি”। একটা ছোট প্রাইভেট জাহাজ। ছোট ডেক, গোটা তিনেক কেবিন, কিচেন, টয়লেট মিলিয়ে সাজানো ব্যবস্থা। তবে জাহাজটা ছোট হলে কি হবে, তখনকার দিন অনুযায়ী বেশ ওয়েল ইক্যুইপট ছিল, যদিও সাবমেরিন জাতীয় কিছু ছিল না।

     কিন্তু প্রাইভেট। বললাম না সীমান্ত অঞ্চল? বেশ বুঝতে পারলাম কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটলে, আমি জাস্ট নেই হয়ে যাব। সরকার কোনও দায়িত্ব নেবে না। অফিসিয়াল কোনও অ্যাপ্রুভালও দেয়নি। দুধ পাওয়া গেলে তখন ক্ষীরটা খাবে আর কি! এইসব নদী থেকে সাগরের অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যায়। উপরিওয়ালার তাই এদিকে দৃষ্টি পড়েছে, কিন্তু কাজটা যেন সবার অলক্ষে হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন না করে।

     দু-দিন বাদে খুব ভোরে রওনা দিল সমুদ্র-রশ্মি। ক্যাপ্টেন সি. ধীরুভাল্লা আর ক্রু মেম্বার ছিল জনাছয়েক। এ ছাড়া একজন কেয়ারটেকার কাম রাঁধুনি। আর যাত্রী বলতে আমরা তিন জন। তিনজনই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। আমি সমুদ্রবিজ্ঞানী। মিস্টার পি. আইয়ার ছিলেন একজন হাইড্রোলজিস্ট, কেরেলিয়ান। আর শিরীন প্রুস্তি উড়িষ্যার মেয়ে, পেশায় মেরিন বায়োলজিস্ট। ওকে আগে থেকেই চিনতাম। পুনে সমুদ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দু-বছরের জুনিয়র ছিল। নানা সেমিনারে দেখা হত আমাদের। চুটিয়ে আড্ডা দিতাম। সমুদ্র ওর পেশা নয়, নেশা ছিল। ছুটির সময় স্কুবা ডাইভিং ছিল ওর হবি। ওর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া আমার সেমিনারগুলো অ্যাটেন্ড করার আরেকটা আকর্ষণ ছিল। এখানে আমার সহযাত্রী হিসেবে পাব ভাবিনি। মনটা বেশ খুশিয়াল হয়ে উঠল।

    কিন্তু তার আগে অতি প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিলাম। যাওয়ার আগের দু-দিন সমুদ্র ধারের জেলে বস্তিগুলোতে খুব ঘুরলাম। ছোট ছোট দরমার নোংরা ঘর। ওপরে ফুটিফাটা পলিথিনের চাল। এদিক ওদিক স্কুলে না যাওয়া অনেকগুলো বাচ্চা ঘিরে ধরল আমাদের। শিরীন কাঁধের ঝোলা থেকে ম্যাজিশিয়ানের মতো লজেন্স বের করে ওদের দিতে লাগল। খুশিতে চকচকে মুখগুলো এখনও মনে পড়ে। চারিদিকে দারিদ্র্য আর অপুষ্টির নগ্ন চেহারা। প্রতিটা ঘরের সামনে জাল গুটিয়ে রাখা। নৌকাগুলো সাগর তীরে প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের মতো উলটে পড়ে আছে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ মানুষগুলোর তখন রুজি রোজগার বন্ধ। কারণ এক নাম-না-জানা সুমদ্র আতঙ্ক। সাগরে নৌকা ভাসানো বন্ধ। অচেনা ভয়ে কাঁপছে তীরের জেলে বস্তিগুলো। কী এমন ভয়, যা পেটের খিদেকেও অতিক্রম করে! আমরা ঘুরছিলাম, যারা হারিয়ে গেছে, তাদের সম্পর্কে কিছু যদি খবর পাওয়া যায়। প্রায় জনাষোল লোক নিখোঁজ বিভিন্ন বস্তিগুলো থেকে। সবার বক্তব্য একই। সাগরে নতুন দানব এসেছে। কিন্তু কি ধরনের দানব! কী তার রূপ কেউ কিছুই বলতে পারে না! যারা দেখেছে তারা নাকি কেউই বেঁচে থাকে না। প্রথমে মনে হল মুখে মুখে গুজব ছড়িয়েছে। হয়তো আন্ডারওয়াটার নদীর কোনও চোরা স্রোতে ভেসে গেছে ডিঙিগুলো। কারণ ওই অঞ্চল হাঙ্গর জাতীয় প্রাণীর টেরিটোরি নয়। পরে একজন আই উইটনেস পাওয়া গেল। নামটা যতদূর মনে পড়ছে জগন্নাথ দাস। ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর উড়িয়া ভাষা মিশিয়ে সে হলফ করে বলল, ‘দানবটাকে আমি নিজের চোখে দেখেছি,বাবু। আর কখনও শান্তি করে দু-চোখের পাতা এক করতে পারব কি না জানি না। কী ভয়ঙ্কর! একেবারে নরক থেকে উঠে এসেছে। বেশি কিছু দেখতে পাইনি। শুধু অসংখ্য দাঁত। তীক্ষ্ন সারি সারি দাঁত। আবার দপদপ করে জ্বলছে। যেন নরকের আগুন জ্বলছে দাঁতগুলোতে। কিন্তু দাঁতের মালিক কই! গোটা শরীরটা দেখতেই পাইনি। এক ঝটকা মনে হয়েছিল, অনেক দাঁত সমেত একটা চোয়াল সমুদ্রে ঘুরছে। ভেঙে দিচ্ছে আমাদের ডিঙিগুলো। ছিঁড়ে কুটে দিচ্ছে মেছুড়েদের। কিন্তু তার কোনও দেহ নেই বাবু, কোনও শরীর আমি দেখতে পাইনি। ওটা দানো। পাতাল থেকে উঠে আসা দানো। এখন সাগরে যাবেন না। গরিবের কথা শুনুন।’

     জগন্নাথদের নৌকোটা বোধহয় একটু দূরে ছিল, তাই বেঁচে গেছে। ওদের বদ্ধমূল ধারণা, ওটা সামুদ্রিক কোনও দানব। জ্যান্ত নয়, মরা। ওর সঙ্গে তাই টক্কর দেওয়া অসম্ভব। আমরা যেন সাগরে না যাই। আমরা তিন অনুসন্ধিৎসু তা মানবো কেন? সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিল শিরীন। ওর পড়াশুনায় এই রকম প্রাণীর কথা ও শোনেনি। শেষে অনেক আলোচনা করে আমরা একটা ধারণায় এলাম। নতুন যে নদীটা সৃষ্টি হয়েছে তার স্রোতেই ভারত মহাসাগর থেকে কোনও “গ্রেট হোয়াইট সার্ক” হয়তো ভেসে এসেছে। এরা কম করে পঁচিশ ত্রিশ ফুট লম্বা হয়। সাদা আর ধূসর মিশ্রিত গায়ের রং জলের মধ্যে মিশে যায়। ক্যামোফ্লাজ আর কি! সেটা নিয়েই কোনও জনশ্রুতি তৈরি হয়েছে বোধহয়। কিন্তু দাঁতে আগুন জ্বলছে বলল কেন জগন্নাথ?

(৩)

     একটানা কথা বলে থামলেন প্রৌঢ়।

     তিন্নির কি আর সহ্য হয়!

      —তারপর কী হল জ্যেঠু? থামলে কেন?

     তিন্নিকে বকে ওঠে শাওন।

      —দাঁড়া না! হড়বড় করছিস কেন?

      —আজও পুরো ঘটনাটা মনে পড়লে গলা শুকিয়ে যায়। আমার জীবনটাই বদলে গেল রে। কাউকে কখনও বলিনি, বলার ইচ্ছে হয়নি। তোরাই প্রথম। হয়তো শেষ।

     একটা অসহায় ব্যথার সুর প্রৌঢ়ের গলায়। ওল্ড মঙ্কে বড় করে চুমুক দিয়ে আবার শুরু করলেন তিনি।

   —জাহাজ ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তটরেখা মুছে গেল। আদিগন্ত নীল সমুদ্র। বেশ শান্ত। আবহাওয়া এককথায় দুর্দান্ত। ব্রেকফাস্ট করে যন্ত্রপাতিগুলো সব নড়াচড়া করে দেখতে লাগলাম আমরা। ম্যাপ দেখে অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ স্থির করে নেওয়া গেল। কাল সকালের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গাতে পৌঁছে যাব মনে হল। যাইহোক সেদিনটা নিরুপদ্রবেই কেটে গেল।

     রাত নামল ধীরে ধীরে। সে এক অপার্থিব রাত। আমার জীবনের সেরা। অসংখ্য তারা নেমে এসেছে সমুদ্রের বুকে। যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব। সামনে কালো সীমাহীন সমুদ্রের ঢেউয়ের ছপছপ। আর সঙ্গে শিরীনের গলায়…

     It’s just another night

     And I’m staring at the moon

     I saw a shooting star

     And thought of you

     I sang a lullaby

     By the waterside and knew

     If you were here,

     I’d sing to you

     You’re on the other side

     As the skyline splits in two

     I’m miles away from seeing you

     I can see the stars…

     হিসেবমতো পরদিন ভোরবেলাতেই পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ। জাহাজ থামল। সে জায়গার আলাদা করে বর্ণনা দেওয়ার কিছু নেই। যেমন হয় আর কি সমুদ্রের মাঝখানে। তিনজনে মিলে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে রাখলাম ডেকের ওপর।

     প্রথমেই আমরা আর.ভি.ও নামিয়ে দিলাম জলের নীচে। উন্নত প্রযুক্তির আর.ভি.ও. ক্যামেরা জাহাজে বসেই সমুদ্রের নিচের আবছা নীল জগৎ খুলে দিল আমাদের সামনে। অসংখ্য রংবেরঙের সামুদ্রিক মাছ আর প্রাণীকে ওটার আশপাশ দিয়ে সাঁতরাতে দেখেছিলাম। এদিকে ওদিকে সমুদ্র শশা, জেলিফিশও দু-একটা চোখে পড়ল। কয়েকটা ছোট সাইজের স্কুইড কিলবিলে শুঁড়গুলো নেড়েচেড়ে বেড়াতে দেখলাম। শিরীন তো খুব এক্সাইটেড। যাই দেখে তার সাইন্টিফিক নাম আওড়াতে থাকে। একেবারে বাচ্চা মেয়ের মতো লাফিয়ে ওঠে। হাততালি দেয়। ওর জীবন প্রাচুর্য আর খুশি হওয়ার ক্ষমতা বিস্ময়কর। কালো মিষ্টি মুখটা ঘিরে কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। তার মাঝে সাদা সুন্দর দাঁতের সারি। কে বলবে ভারতের প্রথম সারির একজন গবেষক? এমনকি বয়স্ক আইয়ার স্যারের মুখও প্রসন্ন। মেয়েটার সামনে গাম্ভীর্য যেন টিকতেই পারে না। ধীরে ধীরে জলের আবছা আলো কমতে লাগল। সামুদ্রিক প্রাণীও। শেষ পর্যন্ত আমাদের আর.ভি.ও. পৌঁছে গেল অতি প্রত্যাশার আন্ডারওয়াটার রিভারের কাছে।

     —সেটা তোমরা কী করে বুঝলে? নদীটা তো জলের মধ্যেই। জলের নীচে শুধু ছবি দেখে বুঝে গেলে?

     আবার তিন্নি। যদিও এই প্রশ্নটা সবার মনেই ঘুরছিল। কিন্তু ঠোঁটকাটা তো একজনই আছে দলে।

     —আহ তিন্নি। থাম তো। জ্যেঠুকে বলতে দে না। তোর আর কবে বুদ্ধি হবে।

     আবার বকুনিটা ধেয়ে আসে অর্কর থেকে।

     —তুমি থামো অর্কদাদা। জ্যেঠু কখনও আমার ওপর রাগ করে না। তাই না জেঠু? আরে বাবা ভালো করে ব্যাপারটা বুঝতে হবে তো না কি?

     অর্ককে উড়িয়ে দেয় তিন্নি। ওর হাতে ফ্রুট জুস। নিজে রোজগার না করলে অন্য কিছু জুটবে না, কড়া নির্দেশ এ বাড়ির। আবার শুরু করলেন সামুদ্রিক

     —শিরীনও তখন অনেকটা তোর মতো ছিল। নিজের আনন্দে বয়ে চলা ঝড়। নিজে যা ঠিক করবে তাই করবে। নিজের ভালো খারাপ কিছুই দেখবে না। ওর আগে পিছেও নাকি কেউ ছিল না। তা, তিন্নি যা জিজ্ঞাসা করল তার উত্তর দিই আগে। প্রায় সাড়ে আটশো ফিট নীচে পৌঁছনোর পর, আর.ভি.ও.তে হঠাৎ খুব জোরে টান পড়ল। আমাদের জাহাজের ডেকের ওপরের কপিকল হুড়মুড়িয়ে ঘুরতে লাগল। দড়ি খুলতে লাগল দ্রুত। বুঝলাম একটা অন্যরকম স্রোতের মধ্যে পড়েছে ওটা। আর.ভি.ও. তো শুধু ক্যামেরা নিয়ে জলে ডোবেনি, আরও অনেক হালকা ওজনের যন্ত্রপাতি ছিল ওটার মধ্যে। জানা গেল, জলটা বেশ অ্যাসিডিক। সাধারণ জলজ প্রাণীর তুলনায় খানিকটা ক্ষতিকারক। তাপমাত্রাও বেশ খানিকটা বেশি। অথচ এত নিচের জল তুহিন শীতল হয়। নরমাল সাগরের তলদেশের জল নয় ওপর থেকেই আমরা বেশ বুঝিয়ে পারছিলাম। ক্যামেরাতে দেখা গেল জলটা খুব ঘোলা। ভিসিবিলিটি হঠাৎ খুব কমে গেল। আর মাছটাচ কিছু দেখা যাচ্ছিল না। প্রথমবার বেশিক্ষণ রাখা হল না। কর্ড টেনে তুলে, সব প্রয়োজনীয় ডেটা সংগ্রহ করা হল। ঘণ্টাখানেক পর আবার নামানো হল। আর সেবারই ঘটল একটা অদ্ভুত ঘটনা। নদীতে পৌঁছনোর পর, একদম অপ্রত্যাশিতভাবে ক্যামেরার সামনে চকচকে কী যেন ভেসে উঠল। প্রচণ্ড গতিতে এসে সেটা ধাক্কা দিল আর.ভি.ও.টাকে। প্রথমবার আমরাও দেখলাম সেই অপার্থিব দাঁতের সারি। চামড়াহীন বিশাল চোয়াল। আর তাতে সারি সারি দাঁত। ক্যামেরাটা দু-বার দপদপ করে বন্ধ হয়ে গেল। গোটা প্রাণীটা চলে গেল চোখের আড়ালে।

     শিরীনের উত্তেজনা তুঙ্গে; পারলে তখনই জলে ডাইভ দেয়। তাকে কোনওক্রমে থামিয়ে আর.ভি.ও.টাকে তোলার দিকে মন দিলাম সকলে। শেষ পর্যন্ত কর্ডটা ছিঁড়ে যায়নি তাই রক্ষে। তুলে যা দেখা গেল, তা বেশ ভয়ঙ্কর। সার্চ লাইটের জায়গাটা কোনও বিশাল প্রাণী চিবিয়ে দিয়েছে। তীক্ষ্ম দাঁতের চাপে গুঁড়িয়ে গিয়েছে সেটা। অথচ জলের নিচের চাপ সহ্য করার জন্য বেশ শক্তপোক্ত করে তৈরি, সহজে নষ্ট হওয়ার নয়। আইয়ার স্যার বললেন, ওঁর কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। নদী খুঁজতে এসে এ কী প্রাণীর সঙ্গে মোলাকাত হল। তা আবার কাজের শুরুর দিনই! কথায় বলে, মর্নিং শোজ দ্য ডে! বুঝলাম বৈজ্ঞানিকই মাত্রেই কুসংস্কারহীন হন না। তবে একথাও আজ আমি মানি বুদ্ধি দিয়ে সব কিছুর ব্যাখ্যা হয় না।

     বাকি দিনটা পরের দিনের প্ল্যান প্রোগ্রাম করেই কাটল। ঠিক হল আমি আর শিরীন পরদিন সকালে জলে নামব। আর বিপত্তি মোকাবিলা করবার জন্য মিস্টার আইয়ার ওপরে থাকবেন।

     জলের নীচে চাপ সহ্য করা বিশেষ ডাইভিং স্যুট, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ক্যামেরা, ফ্লেয়ার গান ছাড়াও দুজনের সঙ্গে থাকবে দুটো বিশেষ ধরনের ইলেকট্রিকাল হারপুন। সেটা কোনও প্রাণীর শরীরে তীরের মতো বিঁধে গেলে, ভিতর দিয়ে একটা মডারেট ইলেকট্রিক ফ্লো হবে। বড় বড় তিমি, হাঙ্গরকেও ঘণ্টাখানেকের জন্য নিশ্চল করে দিতে এ অস্ত্রের জুড়ি মেলা ভার।

(৪)

     সকালের সূর্য যখন নিজের আশীর্বাদে আমাদের ধুইয়ে দিচ্ছিল, জলের তলায় নামবার সাজসজ্জা সেরে আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম নীল আদিগন্ত সমুদ্রের দিকে। এই আলো ছেড়ে এই উষ্ণতা বাদ দিয়ে, রহস্যময়ী অতিপ্রাকৃতিক অতল সাগরে ডুব দেব। সে এক নিস্তব্ধ দুনিয়া। তোমার সব কথা, সমস্ত কান্না, সব চিৎকার সে গিলে নেবে। কেউ শুনতে পাবে না। নিস্তব্ধ যে কি ভয়ঙ্কর, ভাবনারও বাইরে!

     জলের নিচের বেশি বর্ণনা দিয়ে তোদের আর ‘বোর’ করব না।

     —আমরা কেউ বোর হচ্ছি না। তোমার কাছে শুনতেই তো এসেছি।

     রোহন মৃদু অভিযোগ করল। একটু ম্লান হেসে আবার শুরু করলেন প্রৌঢ়।

     —যত দুজনে নামছি আলো কমে গিয়ে অস্বচ্ছ পরিবেশ। শিরীনের সঙ্গে প্রথমবার ডাইভিং। বুঝতে পারছি, ও আমার থেকে অনেক দক্ষ ডাইভার। প্রায় আটশো ফিট নীচে সেই অদ্ভুত নদীর দেখা পেলাম। দেখেই চেনা গেল। চারপাশের জলের থেকে সে একদম আলাদা। কালো ঘোলা জল নিয়ে বেশ দ্রুতগতিতে বয়ে যাচ্ছে। শুরুতেই নদী অবগাহন থেকে আমরা বিরত থাকলাম। বিস্তারিত পরীক্ষা না করে ওই জলের ভিতরে ঢোকা উচিত হবে না। আমরা তাই পাশ দিয়ে উলটোদিকে সাঁতরে এগোতে লাগলাম। উৎসের সন্ধানে। একটু দূরত্ব রেখে কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হল। আর ছবিও। অদ্ভুতভাবে অন্য কোনও প্রাণীর দেখা পেলাম না আশপাশের জলে। কিছুক্ষণ এগোনোর পর দেখি নদীটা বেরিয়ে এসেছে একটা বিশাল সমুদ্র খাদের ভেতর থেকে। কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্ট। আর তখনই তাকে দেখলাম। খাদের ভিতর থেকে উঠে আসছে সে।

     কীভাবে বর্ণনা দেব সেই ভয়ঙ্করের। একটা বিশাল কঙ্কাল। সাধারণ পার্থিব প্রাণীর মতো মাংস বা চামড়ার কোনও অস্তিত্ব নেই। প্রায় ত্রিশ ফুট লম্বা। হাঙর জাতীয় স্পিসিসের কঙ্কাল যেমন হয়। মাথার সামনের দিকে ঝকঝক করছে অসংখ্য তীক্ষ্ম দাঁত। দুটো চোয়ালেই সামনে পিছনে দুসারি করে দাঁত। কাঁটার মতো সূচাল! ঠোঁটবিহীন দাঁতের সেই বীভৎস সারি যেন অট্টহাস্য করে হাড় হিম করে দিতে চাইছে। হাঁ মুখের ভিতর জুতোর শুকতলার মতো দেখতে কিছু একটা রয়েছে, সেটা কি জিভ? মাংস চামড়া ছাড়ানো বিশাল মাথা। নাকের গর্তদুটো অন্ধকার, তবে তার সামনের দিকে সূচাল প্রদীপের মতো বড় একটা ‘প্রজেক্শন’। চোখের কোটর দুটো খুব বড় বড়; সে জায়গায় নরকের অন্ধকার ধকধক করে জ্বলছে! পিছনে বিশাল দেহ। সে দেহের কোথাও কোনও মাংস নেই। নেই চামড়াও। দানবিক পাঁজরগুলো অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাদের ঘিরে সাদা সাদা শিকড়ের মতো কিছু ছড়িয়ে রয়েছে। জলের মাঝে লেজ অবধি পুরো শিরদাঁড়ার হিংস্র মোচড় দেখে আমাদের শিরদাঁড়া দিয়েই ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

     ওই ঘোলা জলের ভিতর কিছুই দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তাও সেই করালকে দেখতে পেলাম আমরা। কারণ তার সারা শরীরের প্রত্যেকটা হাড়, দাঁত, লেজ থেকে যে একটা নীলচে তীব্র আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে! ওহ! জগন্নাথ ঠিকই বলেছিল, ওটা জ্বলছে। তাতেই চারপাশের অস্বচ্ছতা একটু যেন কাটছে।

     আজও সেটার কথা ভাবলে বুকের ভিতরটা শুকিয়ে আসে। আর যেন কোনও মানুষ তার দেখা না পায়। কি ভয়ানক!

     সে কিন্তু আমাদের দেখতে পেল না, পেরিয়ে এগিয়ে গেল। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। শিরীনের হাতের ছোঁয়ায় সম্বিৎ ফিরল। ইশারায় বোঝাল, ওটা ফিরে আসার আগে নদীর উৎসটা দেখে আসা যাক। আমরা এগিয়ে গেলাম সেই গভীর খাদের দিকে।

     খাদের ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার। আমাদের হেলমেটের আলো সে অসহ্য অন্ধকারের তুলনায় বড়ই ম্লান। একশো ফিট মতো নেমেই খাদ শেষ হয়ে গেছে। দু-দিকের পাথুরে দেওয়াল নিচের দিকে মিলে গেছে বাটির মতো। সেখানেই দেখলাম, মাঝখানে একটা বিশাল গহ্বর। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে কালো ঘোলা জল সমেত নদীটা। যেন পাতালের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে স্টিক্স, নরকের নদী। সেই পাতাল গহ্বরটার ওপর ঝুলে আছে কয়েকটা বড় বড় পাথর।

     এটাই তবে নদীর উৎস! আশপাশের সমুদ্রতল, আলগা পাথর দেখে মনে হল, কয়েক মাস আগের ভূমিকম্পই এই গহ্বরের জন্ম। বেশ কিছু ছবি তুললাম। হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাগরের নীচে, অন্য কোনও ভূমধ্যসাগরীয় তলে আবদ্ধ ছিল একটা অজানা হ্রদ। ভূমিকম্প সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে আমাদের দুনিয়ার সঙ্গে। সেখান থেকেই উৎপত্তি হয়েছে এই নদীটার। এতদিন পৃথিবীর সাধারণ পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কহীন, এই হ্রদের ইকো সিস্টেম একদম আলাদা। সেখানকার জীবন আলাদা। হয়তো মৃত্যুও আলাদা।

     হ্রদটাই ছিল সেই ভয়ঙ্করের ডেরা। ওর নেস্ট। এতকিছু তখন বুঝলে হয়তো আরও তৈরি হয়ে যেতাম। তাহলে অত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

(৫)

     চুপ করে গেলেন তিনি। বড় দুর্ঘটনা! কী? কার? যদিও সে ঘটনা আজ ইতিহাস। জ্যেঠু ওর জীবন্ত নায়ক। তিতিরের ভিতরটা কেমন অজানা চিন্তায় কুঁকড়ে যায়। বাকিরাও ঘটনার গুরুত্ব বুঝে নীরব। সবার হাতের পানীয় শেষ। কারুর সে খেয়াল নেই। কিন্তু তিন্নি? ফড়ফড়ে মেয়েই নীরবতা ভাঙে। একসঙ্গে একঝাঁক জিজ্ঞাসা

     —তারপর সেদিনের জন্য কী উপরে উঠে এলে? সবাই খুব ভয় পেয়েছিলে নিশ্চয়ই? শিরীন কী করল? ওই কিম্ভূত জীবটাকে স্টাডি করতে চাইল না!

     কথক যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। যেন মনে পড়ে যাওয়া কিছু দুঃখের স্মৃতি তাঁর কুঁচকে যাওয়া মুখটাকে কালো করে দিয়েছে। মেয়েটার কথায় বাস্তবে ফিরে এলেন। বিষন্ন হেসে শুরু করলেন কাহিনির শেষটুকু-

     —ওই অবধি দেখে, সেদিনের মতো ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। অক্সিজেনও ফুরিয়ে আসছিল। সাময়িক ভয় পেয়েছিলাম ঠিকই, তবে আতঙ্কিত আমরা হইনি।

     উপরে এসে যতটুকু পারা যায়, নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হল। কিছু কিছু অচেনা যৌগের পরিচয় পাওয়া গেল। এবার সবচেয়ে এক্সাইটেড হলেন আইয়ার স্যার।

     —কাল আমি নামতে চাই তোমাদের সঙ্গে। আরও ওয়াটার স্যাম্পল চাই। বেশ কিছু অস্বাভাবিক সূচক পেয়েছি। আরও কনফার্ম হতে চাই। গবেষণার নতুন দিক খুলে যাবে হে। চাই কি বিখ্যাত হয়ে যেতে পারি আমরা।

     —কিন্তু তাহলে ওপর থেকে কে সামলাবে? আমি কিন্তু নামব। ওই অর্গ্যানিসমটাকে সামনে থেকে আবার দেখতে হবে।

     নিশ্চিত গলায় বলে ওঠে শিরীন। ও কাউকে পাত্তা দেয় কবে? আমিও কোনওমতেই রাজি হলাম না। একদিকে বিজ্ঞানী মন। অন্যদিকে শিরীনকে প্রৌঢ় আইয়ার স্যারের সঙ্গে ছেড়ে দিতে সাহস হচ্ছিল না।

     আমরা দুজন কেউই ওপরে থাকতে রাজি হলাম না। শেষে প্রৌঢ় মেনে নিলেন। শেষে বললেন, “মনে রেখো, ওই জলে যা যা সূচক আমি পেয়েছি তাতে কোনও প্রাণীর ওর ভিতরে জীবন্ত থাকা সম্ভব নয়। অত্যন্ত বিষাক্ত।”

     সাধারণ বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি দিয়ে কিছুই ব্যাখ্যা করা গেল না। শিরীনও চুপ করে আছে। বিড়বিড় করছে “ওর ব্রেইন কই? অভ্যন্তরীণ ভিসেরা-ও তো কিছু দেখা গেল না? সার্কুলেটরি সিস্টেম নেই। হৃৎপিণ্ডের চিহ্ন নেই। শুধু কাঠামো। শুধু এক্সোস্কেলেটন! ও কি জীবন্ত? নাকি সেখানে জীবন মৃত্যুর সংজ্ঞা অন্য?” এ প্রশ্নের উত্তর আমরা শেষ পর্যন্ত পাইনি।

     পরের দিন যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছেছিলাম আমরা দুজন। কিন্তু একদম ভুল সময়ে! ঠিক সেই সময়ে গহ্বরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল ওটা। আমাদের দুর্ভাগ্য। ওর বিশাল লেজের ঝাপটায় ওপরের ঝুলন্ত পাথরগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। আমরা উপর থেকে নীচের দিকে নামছিলাম সাঁতরে। মাথায় উজ্জ্বল আলোর হেলমেট। সেজন্যই হয়তো ওটা আমাদের দেখতে পেয়ে গেল। কালো চোখের কোটরের বিভীষিকাময় স্থির দৃষ্টি। আমার অন্তরাত্মা অবধি কাঁপিয়ে দিল। আচমকা তার প্রকাণ্ড লেজ নাড়িয়ে সে এগিয়ে এল আমার দিকে। আতঙ্কে আমি নড়তে ভুলে গেলাম। পাতাল নদী থেকে বেরিয়ে এল ওটা। সাধারণ সমুদ্রের জলে তার কোনও অসুবিধা হল বলে মনে হল না। বিশাল চোয়ালটা ফাঁক হতে লাগল আমার চোখের সামনে। ঝাপসা চোখের সামনে খুলে যেতে লাগল নরকের দ্বার। ঠোঁটবিহীন চোয়ালের দুপাশের সেই দু-সারি ফ্লুরোসেন্ট দাঁত। এবার চোখের গহ্বর দুটো জ্বলে উঠল। আমার সময় শেষ।

     ঠিক সেই সময়ে আমাকে বাঁচাল শিরীন। সেটা ছিল প্রথমবার। তার হাতের ইলেকট্রিক হার্পুন নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানল দানবটার দেহে। একটু যেন নড়ে উঠল সেটা। একটু পিছিয়ে গেল। তার শরীরের নীলাভ আলো কয়েক মুহূর্তের জন্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর দ্বিগুণ বেগে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। শিরীন হার্পুনটা কিন্তু ওর মাংস চামড়াহীন দেহে বিদ্ধ করতে পারেনি। বিঁধিয়ে দেওয়ার মতো শরীর ওর ছিল কোথায়! হারপুনটা নীচে সমুদ্রতটে পড়ে গেছে। শিরীন এখন নিরস্ত্র। আমি একটু সামলে উঠে চালালাম আমার হার্পুন। তার চোখের গহ্বর লক্ষ্য করে। আমার নিশানাও ভুল হল না! হার্পুনটা ঢুকে গেল সেই কৃষ্ণ গহ্বরে। আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল প্রাণীটা। মাথা ঝাঁকাতে লাগল, কিন্তু কোনও একটা হাড়ে আটকে গেছে হার্পুনটা। ঝেড়ে ফেলতে পারল না। যে ইলেকট্রিকের ঝটকা অন্য প্রাণীদের অজ্ঞান করে দিতে পারে, এর ক্ষেত্রে তা হল না। দপদপ করে জ্বলতে লাগল নারকীয় শরীরটা। আবার বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে এল আমারই দিকে। আমাদের দুজনেরই হাত তখন ফাঁকা। আমরা তাড়াতাড়ি উপরে উঠতে চাইলাম। শিরীন এগিয়ে গেল। বলেছি তো, আমার থেকে অনেক ভালো ডাইভার ছিল ও। প্রাণের দায়ে যত জোরে সম্ভব হাত পা চালালাম ঠিকই, ওটার সাঙ্ঘাতিক গতির সঙ্গে পারব কেন? আমার পায়ের কাছে প্রবল আলোড়নে বুঝলাম এবার আর রক্ষা নেই।

     আবার… দ্বিতীয়বার মাঝখানে এসে পড়ল শিরীন। পালিয়ে না গিয়ে ঘুরে এল আমার দিকে। আমি প্রবল হাত নেড়ে ওকে চলে যেতে বললাম। শুনলে তো!

     দ্রুত এগিয়ে এসে নিজের অক্সিজেন সিলিন্ডারটাকে এগিয়ে দিল ওর দিকে। আমাদের কাছে সিলিন্ডার দুটো ছাড়া বাঁচার মতো শক্তপোক্ত আর কিছুই ছিল না। হার্পুন দুটো তো কোনওই কাজে লাগেনি। ঘুরে দেখলাম আবার ক্ষণিকের জন্য খুলে গেল ওর ভয়ঙ্কর চোয়াল জোড়া। দাঁতের ফাঁকে কামড়ে ধরল সিলিন্ডারটা। আর পলক ফেলার আগে শরীরের এক প্রচণ্ড মোচড়ে উলটে গেল ওর প্রকাণ্ড শরীর। ফিরতে লাগল ওর নিজের বাসায়, গহ্বরটার দিকে।হয়তো সিলিন্ডারটাকে খাবার ভেবে ভুল করেছে। আর সঙ্গে সিলিন্ডারটার অপরদিকে থাকা শিরীনকেও টেনে নিতে লাগল। পাইপটা কাটার সময় পেলাম না। এত দ্রুত তার বেগ, সেকেন্ডের মধ্যে আমার নাগালের বাইরে চলে গেল শিরীনকে সমেত। শিরীনের একটা পা জড়িয়ে গেল ওর পাঁজরের সাদা শিকড়ের মতো উপাঙ্গে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওটা ঢুকে গেল নরকভোগী সেই কালো নদীর জলে। তার পিছনেই চলে গেল শিরীন। টানের জেরে।

     ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই শিরীনের গায়ের ডাইভিং স্যুটটা গলে গেল এক নিমেষে। সম্পূর্ণ নিরাবরণ শরীরটা এক পলকের জন্য চোখে পড়ল আমার। আর আমার চোখের সামনে; আমার এই দু-চোখের সামনেই ওর শরীরের সমস্ত চামড়া, মাংস গলে গিয়ে কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়ল। অপদার্থ শঙ্কর সেনগুপ্ত কিচ্ছু করতে পারল না।

     ফের নিস্তব্ধতা। সবাই চুপ। তিন্নিও। তিতিরের চোখ বাষ্পাচ্ছন্ন। তবে আবার মুখ খুললেন জেঠু

    —পৌঁছাতেই পারলাম না মেয়েটার কাছে। বাঁচাতে পারলাম না ওকে। যেমন করে দু-দু-বার ও বাঁচাল আমায়। এত অপদার্থ্য আমি! আমার হৃৎপিণ্ড উপড়ানো চিৎকার কেউ শুনতে পেল না। অন্ধকার কালো জল গিলে নিল সে শব্দ। শিরীনের কঙ্কালটা নিয়ে গহ্বরের মধ্যে শয়তানটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই ঘটল পরের ঘটনা।

     ভিতরে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। সম্ভবত সিলিন্ডার ব্লাস্ট করেই। চারপাশের জল প্রচণ্ড আন্দোলিত হতে শুরু করল। দুলতে লাগল নিচের মাটি। ভূমিকম্প শুরু হল আবার। তার ধাক্কায় বিরাট গর্তটার ওপরের আলগা পাথরগুলো ঝরে পড়ল। চারপাশে উথাল পাথাল জল। প্রচণ্ড ঝাপটা। চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল ওই গুহামুখটা।

     তখন ওপরের জাহাজের চারপাশেও প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। আইয়ার স্যার আর জাহাজের বাকিরা আমার অজ্ঞান শরীরটা টেনে তুলেছিল কর্ড দিয়ে। সেদিনের প্রলয়ঙ্করী ঢেউ থেকে জাহাজটা বাঁচেনি। আমাদের সমস্ত নমুনা, ছবিরও সলিল সমাধি ঘটে। অনেক কষ্টে লাইফ বোটে করে আমাকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছাতে পেরেছিল আইয়ার স্যার এবং অন্যান্য ক্রু-রা। এই ক-দিনে শিরীনের জন্য টানটা যে অন্য কিছু বুঝেছিলাম আমি। ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে। তারপরও ওকে বাঁচাতে না পারার কষ্ট ভোগ করতেই হয়তো আমি বেঁচে ফিরলাম।

     স্যাটেলাইট থেকে আর কোনওদিন ওই নদীটার কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ওপর মহল থেকে কেসটা চাপা পড়ে গেল অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে। শিরীনের খবর নেওয়ার জন্য ওর কোনও পরিবারও ছিল না। তাই ওর চিহ্ন মুছে গেল। কোনও প্রমাণ না থাকায় আমরাও সেই ভয়ঙ্করের কথা কাউকে বলিনি। আইয়ার স্যার বারণ করলেন। বিজ্ঞানী মহল যদি হাসি ঠাট্টা করে, সেই ভয়ে।

    পরে স্যার বলেছিলেন, ওই জলের নমুনায় প্রায় ৪৫-৪৮% অক্সিজেন ছিল। আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, সিলিকন ছাড়াও ছিল প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস। এলিমেন্টগুলোর উপস্থিতি এবং পরিমাণ আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরের ম্যাগমার দিকে নির্দেশ করে। কিন্তু ম্যাগমার তুলনায় তাপমাত্রা অনেক কম। হয়তো কোন নিভে যাওয়া আগ্নেয়গিরির ভিতরে, গ্যালাপাগোসের মতো এক অন্যরকম বিবর্তনের সাক্ষী হয়েছিলাম আমরা।

     ওই মাত্রায় অক্সিজেন যে কোনও সাধারণ প্রাণীর জন্য বিষাক্ত। সম্ভবত বিশেষ পরিবেশে ফসফরাসের আধিক্যের জন্য ওই জীবের দেহটা ওইভাবে নীলাভ সবুজ আলোয় জ্বলজ্বল করতো। আর ছিল একটা বিশেষ তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তার সঠিক সনাক্তকরণ স্যার পুরোপুরি করতে পারেননি জাহাজে বসে। তবে টাইটানিয়ামের সঙ্গে তার কিছু মিল খুঁজে পান। হয়তো নতুন কোনও মৌল। সেই মৌলই এই অদ্ভুত বিবর্তনের জন্য দায়ী কি না, কে বলতে পারে। একটা কথা পরে আমার মনে হয়েছে। হয়তো ওই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বাঁচতে ওখানে অন্যরকম বিবর্তন হয়েছে। হয়তো ওর এক্সোস্কেলেটনের মধ্যে সমস্ত ইন্টারনাল অর্গ্যান ছিল। পাইন গাছের ফলের মতো যদি ইন্টারনাল অর্গ্যান ওর এক্সোস্কেলেটনের ভিতরে থাকে তাহলে হয়তো এরকমই দেখাবে। সবই হয়তো। সবই যদি। বলে না যদির কথা নদীর জলে। আমাদেরও তাই হয়েছিল। যেটুকু প্রমাণ আমরা সংগ্ৰহ করেছিলাম,জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে তার সলিল সমাধি হয়।

     শুধু আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল শিরীন। আমার শিরীন। শেষ মুহূর্তে ওর চোখ দুটো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দু-চোখের দিকে। আমিও বুঝেছিলাম নিঃসন্দেহে তার চোখের নিঃশব্দ ভাষা। সে দু-চোখে মিশে ছিল আমার জন্য অপরিসীম ভালোবাসা। সেটুকুই আমার বেঁচে থাকার পাথেয়। আজও…

     By the waterside and knew

     If you were here,

     I’d sing to you

     You’re on the other side

     As the skyline splits in two

     I’m miles away from seeing you

     I can see the stars…

 

 

 

4 thoughts on “সমুদ্রের গুপ্তকথা

  • October 23, 2020 at 8:25 pm
    Permalink

    অসাধারণ একটা লেখা। মুগ্ধ হয়ে পড়লাম।

    Reply
    • November 5, 2020 at 3:19 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ

      Reply
  • October 24, 2020 at 3:21 pm
    Permalink

    Khub Valo Laglo

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!