দ্রোহ

সুমিত বর্ধন

অলংকরণ:সৌরভ ঘোষ

     প্রারম্ভিকপর্ব

    

টার্টারাসের ধূলিময় প্রান্তর। আকাশ জুড়ে ঝুলে থাকা লোহিত নক্ষত্রের লালচে আলোয় লাল হয়ে থাকে ধুলোর গভীর স্তর। হাওয়ার সামান্য ঝাপটেই ধোঁয়ার মতন কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যায় চারপাশেট্যাঁকাঠের তক্তা ঠুকে বানানো এই হতশ্রী কুটিরের প্রতিটি আসবাবের ওপরেও ধুলোর প্রলেপ। ধুলো জমেছে বিছানায়, তাকের ওপরে রাখা বাসনে, পেরেকে টাঙানো পোষাকে। প্রথম যখন আসি তখন দিনকতক চেষ্টা করেছিলাম অন্তত নিজের বিছানাটাকে পরিষ্কার রাখতে। সে অধ্যবসায় দিন পনেরোর বেশি স্থায়ী হয়নি।

     কুটিরের মালিকের অধ্যবসায় শেষ হয়ে গেছে অবশ্য তারও আগে। তার বিছানাটাকে আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই। শুধু মনে হয় এক রাশ ধুলো জড়ো করে রাখা আছে।

     কুটিরের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাই। তিলমাত্র বৈশিষ্ট কোথাও নজরে পড়ে না। কেবল সীমাহীন, প্রাণহীন উন্মুক্ত প্রান্তর তার লালিমা নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে দিগন্ত অবধি।

     এ রাঙা ধুলোর শূন্যতার মাঝে ব্যতিক্রম কেবল কুটিরের পাশেই মাথা তুলে দাঁড়ানো বিশাল পাহাড়টা।

     না, প্রাকৃতিক পাহাড় নয়। নানা কলকব্জা আর যান্ত্রিক উপাদানের স্তূপ পাহাড়ের আকার নিয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চেয়েছে। স্তূপের সর্বাঙ্গে জড়ানো পাইপ, তার আর ধাতব দণ্ডের জটিল নক্সা। তার বিশাল চেহারায় ইতস্তত ঝলসে ওঠে বিচিত্র বলদ্যুতি, টুপটাপ জ্বলে নেভে রঙিন আলোর বিন্দু।

     এক ঝলক হাওয়া প্রান্তরের ধুলোর সঙ্গে বয়ে আনে নানারকম যান্ত্রিক আওয়াজ। কুটিরের মালিক শিখরগোলক মেরামত করছে। মেরামতি শেষ হলেই শুরু হবে তার ওই যন্ত্রগিরির চূড়ায় শিখরগোলক বসানোর প্রয়াস।

     দুঃসাধ্য প্রয়াস।

     নিষ্ফল প্রয়াস।

     আজ কয়েক বছর হল আমি ওই তার অনলস প্রয়াস আর বিরামহীম নিষ্ফলতার সাক্ষী।

     ওই নিষ্ফলতা প্রত্যক্ষ করার আগে টার্টারাসের অস্তিত্বই আমার অজানা ছিল।

    

     দেবপর্ব

    

     আমার এ কাহিনি প্রথমে ছুঁয়ে গেছে ৩-অমরাবতীর ফটক।

     একসময়ে ব্রহ্মাণ্ডে ধীমান প্রজাতি ছিল মাত্র একটিই। ছায়াপথের এক ভুলে যাওয়া কোণে, পৃথিবী নামে কোনও এক হারিয়ে যাওয়া গ্রহ থেকে নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে দিগন্তরে ছড়িয়ে পড়ে তারা।

     সেই ধূসর ইতিহাসের পর খেলা করে চলে গেছে অনেক হাজার বছর।

     এখন ছায়াপথে দুটি প্রজাতি। দেবতা আর মানব।

     মানবেরা বাঁচে গ্রহ-গ্রহাণুর বুকে। সুখ-দুঃখ, ঘৃণা-ভালোবাসা, জীবন-মৃত্যুর রণরঙ্গের উছাল-পড়াওয়ে জ্বলে নেভে তাদের জীবন দীপ।

     দেবতারা অমর, অজর। প্রাকৃতিক ভূমি নয়, অসীম শক্তিতে গড়া নিজেদের অধিষ্ঠানে বাস তাদের। ছায়াপথে ইতস্তত ছড়ানো সেইসব মহাকাশদ্বীপকে আমার মতো মানবেরা বিস্ময়ে স্বর্গ বলে ডাকে।

     ৩-অমরাবতী এইরকমই এক স্বর্গ।

     ফটকের এপারে মাথার ওপর মহাকাশের গভীর তমসা। ফটকের ওপারে আলো মাখা সুনীল আকাশ।

     ফটকের এপারে পাথরের প্রান্তর। বন্ধুর। ঊষর। প্রাণহীন। ফটকের ওপারে সবুজ ঘাসে ঢাকা ঊর্মিল জমি। ফুলে ঢাকা গাছ। স্বচ্ছতোয়া নদী। পাখির কূজন।

     দেবতাদের কাছে প্রকৃতির গোলামির প্রমাণ দিয়ে ফটকের ওপরে আকাশের নীল মিশেছে মহাকাশের কালোয়। তার অদ্ভুত বর্ণের দিকে চোখ রেখে নির্দেশের অপেক্ষা করি আমি। বহু আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই নেমেছি অমরাবতীর দ্বারপ্রান্তে।

     ইতিহাস আমার বিষয়। ঐতিহাসিক মহলে কিঞ্চিৎ সুনামও আছে। গবেষণা করতে করতে একবার আগ্রহ জেগে উঠল শিশুপালের কিংবদন্তীকে ভালো করে বোঝার।

     ভাতৃহন্তা, অজাচারী, দুর্দম নভদস্যু শিশুপালের গল্প রূপকথার টুকরোর মতন ছড়িয়ে আছে ছায়াপথের আনাচে-কানাচে। অপরাজেয় রণযানে সওয়ার ক্রুরকর্মা শিশুপাল হয়ে উঠেছিল ছায়াপথের একচ্ছত্র অধিপতি। কিন্তু স্থায়ী হয়নি তার একাধিপত্য। দেবসভায় আমন্ত্রিত হয়েও ক্ষমতার দর্পে দেবতাদের অপমান করেছিল সে। ক্রুদ্ধ দেবতারা নিভিয়ে দিয়েছিলেন তার রণযানের আণব-চুল্লী, নির্বাসন দিয়েছিলেন তাকে টার্টারাসের চির গোধূলিতে। সেই থেকে সেখানে সে বিরামহীনভাবে চেষ্টা করে চলেছে তার রণযানকে ফের জাগিয়ে তুলতে, কিন্তু সফল হয়নি আজও।

     অবশ্য এসব নিছক গল্প। ইতিহাস শিশুপালের কোনও প্রমাণ দেয় না। কিংবদন্তীর পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসটুকুকে বুঝতেই তাই শুরু করেছিলাম গবেষণা।

     কিন্তু গবেষণার মধ্যেই ডাক এল দেবতাদের। আমাকে হাজিরা দিতে হবে অমরাবতীতে।

     মানবের ব্যাপারে সাধারণত দেবতাদের কোনরকম আগ্রহ থাকে না। তাও হঠাৎ কেন স্বর্গের দরজায় আমার ডাক পড়ল তা আমার ছিল অজানা।

     শুধু এটুকু জানতাম যে দেব আহ্বান অগ্রাহ্য করা যায় না। আসতেই হয়।

     অতএব স্বর্গের ফটকের বাইরে প্রশ্নহীন ধৈর্য্য নিয়ে অপেক্ষা করি হুকুমের।

     ফটকের পেছনে কোথাও একটা সুরের মূর্চ্ছনা বেজে ওঠে।

     মহাকাশের বায়ুহীনতার প্রাচীর পেরিয়ে, মহাকাশ পোষাকের পেছনে আমার কর্ণরন্ধ্রে কেমন করে পৌঁছয় সে সুর, সে প্রশ্ন মনে জাগে না। দেবভূমিতে প্রকৃতি ক্রীড়নক।

     ফটকের ফাঁক দিয়ে উড়ে আসে এক ঝাঁক রঙিন প্রজাপতি। ডানায় তাদের ধাতুর তীক্ষ্ণ উজ্জ্বলতা।

     ফটকের সামনে জটিল আবর্তে পাক খায় প্রজাপতির ঝাঁক। প্রথমে ধীরে, তারপর দুরন্ত গতিতে। ক্রমে তাদের সেই বুনট ঘূর্ণিপাকের মাঝে চকিত ঝলকের মতন ফুটে ওঠে এক অসম্পূর্ণ অবয়ব। তার খানিকটা মানবী শরীর, বাকিটুকু কল্পনা করে নিতে হয়।

     মাথার মধ্যে সুরেলা ঝঙ্কারে কে যেন কথা বলে ওঠে।

     “তোমাকে শিশুপাল নিয়ে গবেষণা বন্ধ করতে হবে।”

     বিস্মিত হই। শিশুপালের কিংবদন্তী নিয়ে দেবতাদের হঠাৎ এই অসম্মতির কারণ বুঝতে পারি না।

     জানি দেবকর্মে বিস্মিত হতে নেই, তবু বিস্মিত হই।

     সুরেলা কণ্ঠ আবার কথা বলে।

     “শিশুপালকে ভুলে যাও। গবেষণা করতে হলে করো অন্য বিষয় নিয়ে।”

     প্রশ্ন করার সুযোগ পাই না। সম্মতি কিম্বা আপত্তি জানানোরও না। অসম্পূর্ণ মানবী শরীর হারিয়ে যায় প্রজাপতির ভিড়ে। সর্পিল রেখায় পাক খেয়ে ধাতব প্রজাপতির ঝাঁক হারিয়ে যায় ফটকের পেছনে।

     নীরবে ফিরে আসি স্বর্গ থেকে।

     ফিরে আসি, কিন্তু কৌতূহল নিরসন হয় না। বরং বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।

     দেব আদেশ লঙ্ঘন করি, অত্যন্ত গোপনে জারি রাখি অনুসন্ধান। বহু চেষ্টার পর, এক ধূলি ধূসর নথিশালা থেকে খুঁজে পাই টার্টারাসের অবস্থানের মানচিত্র।

     তারপর একদিন সংগোপনে গগনযানে পাড়ি জমাই সেই কিংবদন্তীর গ্রহের উদ্দেশে।

    

     প্রারম্ভিকপর্ব

    

     ওপরে আকাশের বুক জুড়ে ঝোলে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো নিভু নিভু সূর্য। নিচে যবনিকার মতো থমকে থাকে গগনযানের নিষ্কাশনীর আঘাতে ওড়া ধুলো। তারই মধ্যে টার্টারাসের মাটিতে পা রাখি সন্তর্পণে।

     ধুলোর আবরণের পেছনে গোধূলি আকাশের পটে আঁকা সিল্যুয়েটের মতন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এক অতিকায় ছায়ামূর্তি।

     “শিশুপাল?”

     প্রশ্ন করি কুণ্ঠিত স্বরে।

     একটা ক্রুদ্ধ গর্জন করে সামনে এগিয়ে আসে ছায়ামূর্তি।

     থিতিয়ে আসে হাওয়ায় ওড়া ধুলো। মৃতপ্রায় সূর্যের বিষণ্ণ লালচে আলোয় পরিস্ফূট হয়ে ওঠে তার চেহারাটা।

     উচ্চতা তার সাধারণ মানুষের দেড়গুণ। বুকে বাঁধা সেরামিকের রংচটা বর্ম, হাতে ইস্পাতের বুটি তোলা কালো দস্তানা, কোমরে ঝোলে বজ্রমুষল।

     শিশুপাল। রূপকথার বর্ণনার সঙ্গে বিন্দুমাত্র ফারাক নেই।

     লম্বা পায়ে এগিয়ে আসে শিশুপাল। একটা হুঙ্কার ছেড়ে আমার গলা ধরে তুলে ধরে শূন্যে।

     “মানব! কে তুই? কী চাস?”

     নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। তবু কোনওক্রমে পরিচয় দিই নিজের।

     “আমি ঐতিহাসিক। তোমার ইতিহাস লিখতে চাই।”

     “হুঁ:!”

     একটা তাচ্ছিল্যের আওয়াজ তুলে আমাকে মাটিতে ছুড়ে ফেলে শিশুপাল।

     “তুই! তোর মতো একটা কীটানুকীট লিখবে আমার ইতিহাস? আমার রণযানের আতঙ্কে একসময়ে ত্রস্ত্য হয়ে থাকত ছায়াপথ। বাহুবলে মানব থেকে হয়ে উঠেছিলাম দেবতাদের সমকক্ষ। আমার ইতিহাস লিখবি তুই?”

     তাচ্ছিল্যের আওয়াজ করার পালা এবার। আমার।

     “হুঁ! দেবতা! তোমার ব্যাপারে মানুষের মুখে মুখে কী কাহিনি ফেরে জানো? ভাতৃহন্তা। নিজের ভাইকে হত্যা করে চেদির অধিপতি হয়েছিলে। অজাচারী। নিজের ভাইঝিকে তুলেছিলে বিছানায়। নভদস্যু। নক্ষত্রপথের যাত্রীদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করা ছিল তোমার পেশা।”

     ফের ক্রুদ্ধ হুঙ্কারে আমার গলা চেপে ধরে শিশুপাল। কোমর থেকে বজ্রমুষল টেনে বের করে উঁচিয়ে ধরে আমার মাথার কাছে।

     “আমার বিশাল জীবনের ব্যপ্তি বোঝা তোর ওই ক্ষুদ্র মগজের কাজ নয়। ওটাকে ঝলসে দিলে তোর ইতিহাসচর্চা এখানেই শেষ হয়ে যাবে।”

     উদ্যত বজ্রমুষলের মাথায় চড়চড় আওয়াজে পাক খায় নীল বিদ্যুৎ। সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ রাখি শিশুপালের চোখে, “আমি কেবল কিংবদন্তীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যিটাকে বুঝতে চাই। তুমি চাও না তোমার ইতিহাস মানুষ জানুক?”

     কেমন ঘোলাটে ছায়া পড়ে শিশুপালের চোখে। আমার গলা থেকে আলগা হয়ে আসে তার আঙুল। নিভে আসে বজ্রমুষলের মাথার বিদ্যুৎ।

     আমাকে মাটি থেকে টেনে তোলে শিশুপাল।

     “চল। বলছি।”

    

     ইতিহাসপর্ব ১

    

     কুটিরের কোনে চুল্লি জ্বলে। চুল্লির ওপর ঝোলানো হাঁড়ি থেকে হাতায় করে একটা চটা-ওঠা মগে শুরুয়া ঢালে শিশুপাল।

     “নে।”

     শিশুপালের হাত থেকে নিয়ে চুমুক দিই শুরুয়ার মগে। স্বাদ বড় একটা পাই না, শুরুয়ায় মেশা টার্টারাসের ধুলো দাঁতে কিচকিচ করে।

     নিজের মগে শুরুয়া ঢালে শিশুপাল।

     “যা বললি তার কোনওটা অস্বীকার করতে পারি না। দস্যুবৃত্তিটা আমাদের বংশে। আমার বাবা ছিল দস্যুদলের সর্দার। অস্ত্রের জোরে অধীশ্বর হয়েছিল চেদির। একটা লড়াইয়ে মারা যেতে তার জায়গা নেবার জন্যে ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি শুরু হল। ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে লড়াকু ছিল অনঙ্গপাল, আমি তার দলে ভিড়লাম।”

     কুটিরের বাইরে তাকাই। টার্টারাসের নিঃশেষিত সূর্য নেমে এসেছে দিগন্তের কাছে। তার শেষ আলোয় টার্টারাসের মাটিকে দেখাচ্ছে জমাট বাঁধা রক্তের মতন।

     “অনঙ্গপাল পেয়েছিল ক্ষমতার দখল?”

     অনেক ক্লান্তি নিয়ে মাথা নাড়ে শিশুপাল।

     “হ্যাঁ, বাকিদের হত্যা করে অনঙ্গপাল সর্দার হল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে ডুবে গেল নেশা আর রতিক্রীড়ায়। দল সামলাতে লাগলাম আমি।”

     সূর্য ডুবে গেছে। বাইরে এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। একটা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটে চুল্লীতে লাফিয়ে ওঠে শিখা, বাতাসে উড়ে যায় দু-একটা ফুলকি। হাঁড়ির শুরুয়াটা হাতা দিয়ে নাড়ে শিশুপাল।

     “আমার হাতে দল হয়ে উঠল আরও শক্তিশালী। বেশ কয়েকটা বড় লড়াইয়ে জয়ী হলাম আমরা। চেদির সৌরমণ্ডল ছাড়িয়ে আমাদের ক্ষমতার বৃত্ত ছড়িয়ে গেল ছায়াপথে। শ্রেষ্ঠী সংঘের নজরানায় ফুলে-ফেঁপে উঠল আমদের তহবিল।”

     “অনঙ্গপাল?”

     “নেশার ঘোরের মধ্যেও অনঙ্গপাল বুঝতে পারছিল যে ক্ষমতার লাগাম তার হাত থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়ছে। আমিও অনঙ্গপালের অপদার্থতায় বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম। হেবেইয়ের তুষার প্রান্তরে দুটো কিলিন যেমন আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে দূর থেকে একে অপরকে চক্কর মারে, আমরাও তেমন একে অপরকে নিকেশ করার সুযোগ খুঁজতে থাকলাম।”

     কোমরের বজ্রমুষল খুলে দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখে শিশুপাল। বুক থেকে খোলে বর্ম।

     “দলে আমাদের দু-পক্ষেরই মদতদাতাদের অভাব ছিল না, সুতরাং আমিই যে জিতব তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু সুযোগ এনে দিল আস্তার্তে।”

     “আস্তার্তে কে?”

     আমার প্রশ্নের উত্তর দেয় না শিশুপাল। নীরবে তাকিয়ে থাকে বাইরের অন্ধকারের দিকে। চুল্লীর রক্তিম আলো পড়ে তার অনাবৃত শরীরের বিচিত্র উল্কিতে।

     “শিশুপাল!”

     ক্লান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় শিশুপাল।

     “একবার নজরানা দেবার অজুহাতে ডেকে এনে কিরভোহ্রাদের যোধ-বণিকেরা আমাকে ফাঁদে ফেলল। হয়তো অনঙ্গপালই তাদের উস্কেছিল। তাদের অতর্কিত আক্রমণে নিমেষের মধ্যে আমার নভতরী ধ্বংস হয়ে গেল, মারা পড়ল আমার সঙ্গীরা। প্রাণ বাঁচাতে আমি আশ্রয় নিলাম একটা গ্রহাণুর বুকে। গ্রহাণু ঘিরে চক্কর দিচ্ছে সমর-সাম্পান, শক্তিশিখার আঘাতে নীরব বিষ্ফোরণে গ্রহাণু থেকে ছিটকে যাচ্ছে পাথরের চাঁই, ফুরিয়ে আসছে আমার অক্সিজেন, এমন সময়ে অজস্র শক্তিশিখার কাটাকুটির ফাঁক গলে আকাঁবাঁকা পথে উড়ে এল একটা ছিপছিপে লড়াকু যান। আমাকে গ্রহাণু থেকে ছিনিয়ে নিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেল শত্রুদের নাগালের বাইরে। সে যান চালাচ্ছিল আস্তার্তে। বাদামি চোখ, একমাথা বাদামি চুল।

     “চিনতে আগে তাকে?”

     একটা ভারী নিশ্বাস উঠে আসে শিশুপালের বুকের ভেতর থেকে। বিন্যাস পালটে নিজেদের নতুন নক্সায় সাজায় তার শরীরের উল্কিগুলো।

     “আগে দেখেছিলাম দু-একবার। আমারই দলের উড়ান-নায়েক। যখন পরে জানলাম যে সে অনঙ্গপালের মেয়ে। তখন তার শরীরের নেশায় এতটাই ডুবে গেছি আমি এতটাই যে সে সম্পর্ক আমার কাছে তখন অর্থহীন।”

     “আর আস্তার্তে? সে জানতো না?”

     ঘাড় নাড়ে শিশুপাল।

     “জানতো। অনঙ্গপালই আমার ওপর নজর রাখার জন্যে তাকে আমার দলে ঢুকিয়েছিল। কিন্তু বংশের উচ্চাকাঙ্খা তার রক্তে। ক্ষমতার চূড়োয় ওঠার জন্যে সে যে কোনও মূল্য দিতে প্রস্তুত। অনঙ্গপালের চাইতে তখন আমাকে তার বেশি প্রয়োজন। আস্তার্তের সাহায্য নিয়ে অনঙ্গপালকে রাস্তা থেকে সরাতে এরপর বেশি আর বেশি সময় লাগেনি।”

     একটা ঝোড়ো হাওয়া ধাক্কা মারে কুটিরের গায়ে। শব্দ করে কাঁপে কুটির, কাঠের দেওয়ালের ফাঁক ফোকর দিয়ে ঝরনার মতো ঝরে পড়ে শুকনো ধুলো।

     “অনঙ্গপালের মৃত্যুর পর?”

     “আমার হাতে তখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। প্রথমে অনঙ্গপালের পক্ষের লোকেদের নিজের হাতে হত্যা করলাম। তারপর রণযান নিয়ে ছুটে বেড়ালাম ছায়পথের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। গ্রহ, গ্রহাণু, ব্যোম-বসতি, ছায়াপথে মানুষের যত নিবাস আছে, আমার গগনসেনার কাছে পরাভূত হয়ে নতি স্বীকার করতে লাগল এক এক করে। অবাধ হত্যা আর লুণ্ঠনের পর অগণিত মানুষের জীবন মরণের অধিকার বাঁধা পড়ল আমার ক্ষমতার মুঠিতে।

     “আর আস্তার্তে?”

     ফের একটা ঝোড়ো হাওয়ায় নড়ে ওঠে কুটির, নিভে যায় চুল্লীর আগুন। দেওয়ালে মাখানো রোশনি-রঙের নিষ্প্রভ আলোয় কেমন প্রেতমূর্তির মতন লাগে শিশুপালের চেহারাটা।

     “আস্তার্তে? আমি আস্তার্তেকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসলেও, তার উচ্চাকাঙ্খার পিপাসা তখনো মেটেনি। অনঙ্গপালের পর আমি তখন তার পথের কাঁটা। একদিন সঙ্গম লিপ্ত অবস্থায় প্রায় পৌঁছে গেছি চরম মুহূর্তে। দুই ঊরুর মাঝে আমার কোমরকে রেখে আমার চিৎ হওয়া শরীরের ওপরে রতিছন্দে দুলছে আস্তার্তে, তার দুই স্তনের দোলনের লয়ে গেছে আটকে আমার সমস্ত চেতনাটুকু, ঠিক সেই সময়ে আমার গলা লক্ষ্য করে নেমে এল তার ছোরা। আঘাত লাগলে গলা হয়তো দু-ফাঁক হয়ে যেত। কিন্তু আমার সুষুম্না কাণ্ডে বসানো রণচক্র তার আগেই আমার শরীরের দখল নিল। পাশে পড়ে থাকা বজ্রমুষল আজান্তেই উঠে এল হাতে, আছড়ে পড়ল আস্তার্তের মাথায়। তার রক্ত মাখা শরীরটা ঢলে পড়ল আমার শরীরের ওপর।”

     চুপ করে যায় শিশুপাল। টার্টারাসের ধুলিগর্ভ হাওয়া কুটিরের ফাঁকের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় কর্কশ শব্দে।

     “শিশুপাল?”

     আধা অন্ধকারে মনে হল অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে শিশুপালের কণ্ঠস্বর।

     “শরীরের প্রতিটি রোমকূপে রতিসুখের মদির আচ্ছন্নতা, আর তারই সঙ্গে মনের ভেতর প্রিয়জন হারানোর চরম বিষাদের হাহাকার। দুটো পরস্পর বিরোধী অনুভূতি একই মুহূর্তে প্রলয় তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ল আমার ওপরে, টেনে নিয়ে গেল মানসিক দ্বন্দের এক উত্তাল সমুদ্রে। উন্মত্ত ভারসাম্যহীনতার এক স্বরচিত নরকে বন্দি হয়ে পড়লাম যেন অনন্তকাল ধরে। বহুদিন পরে, বহু চেষ্টায়, নৈরাশ্যের পঙ্কিল আবিলতা সরিয়ে খানিকটা সমতা ফিরে পেলাম বটে, কিন্তু ততদিনে স্বভাবসুলভ জীবনটাকে প্রশ্নহীনভাবে স্বীকার করে নেওয়ার অভ্যাসের বাঁধনটা আলগা হয়ে এসেছে অনেকটাই।

     কুটিরের খোলা দরজা দিয়ে টার্টারাসের মখমল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে শিশুপাল। নির্বাক হয়ে বসে থাকি আমিও।

     কেটে যায় টার্টারাসে আমার প্রথম রজনী।

    

     ইতিহাসপর্ব ২

    

     দিগন্তে ভর দিয়ে মন্থর গতিতে আকাশে ওঠে টার্টারেসের মৃতপ্রায় সূর্য। তার আলো পড়ে কুটির থেকে সামান্য দূরে টুকরোটাকরা জিনিস দিয়ে বানানো একটা হতশ্রী ছাউনিতে।

     ছাউনির দিকে পা বাড়ায় শিশুপাল। তার পেছনে হাঁটি আমি। রাঙা ধুলোয় ফেলে যাওয়া আমাদের পায়ের চিহ্ন শুকনো হাওয়া ফের ঢেকে দেয় ধুলো দিয়ে।

     ছাউনির ভেতর একপাশে প্রোটিন ভাটী আর শাকসব্জীর জল-মাচান। অন্যদিকে মাটির ওপরে বসানো একটা বিশাল ধাতব গোলক, গায়ে তার বিদ্যুৎবীথির জ্যামিতিক আঁকিবুঁকি।

     মাটি থেকে একটা হাতুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে গোলকটা মেরামত করে শিশুপাল। একটা ভাঙা বাক্স টেনে নিয়ে বসি আমি।

     “আস্তার্তের পর কি অব্যাহত তোমার রইল যুদ্ধ-বিগ্রহ?”

     গোলকে ধাতব আওয়াজ তোলে শিশুপালের হাতুড়ি।

     “আস্তার্তের মৃত্যুর পর স্বাভাবিক হতে অনেকটা সময় লাগল। তারপর ফের রণযান নিয়ে হানা দিতে লাগলাম ছায়াপথের এক একটি প্রান্তে। কিন্তু খেয়াল করলাম শীতল হয়ে গেছে আমার রণ-প্রবৃতি, লড়াইগুলো করে চলেছি নিষ্পৃহভাবে, ফলাফলের ওপর যেন আর আমার কোন আসক্তি নেই।“

     “তখনই কি দেবতাদের কাছ থেকে ডাক পেলে তুমি?”

     থেমে গেল শিশুপালের হাতুড়ির আওয়াজ।

     “তোদের কিংবদন্তী কি এই কথাই বলে নাকি?”

     “হ্যাঁ। তাই তো বলে। ছায়াপথের একটা সম্পূর্ণ বাহু যখন তোমার দখলে, দেবতাদের তলব পেলে তুমি। নতজানু হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলে সমস্ত অপরাধের। পরিবর্তে দেবতাদের বরে তুমিও হয় উঠলে দেবতা। অজর। অমর।”

     মাথা নাড়ে শিশুপাল।

     “না। দেবতারা ডাকেনি। আমি নিজে গিয়েছিলাম।”

     ছাউনির ফোকর দিয়ে তির্যক রেখায় এসে পড়ছে টার্টারাসের লাল সূর্যালোক। সেই রক্তিম কিরণে ভাসতে থাকা ধূলিকণার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শিশুপাল।

     “ছায়াপথের অধীশ্বর হয়েও একটা সময় মনে হতে লাগল আমি যেন আমার জীবন থেকে আলাদা হয়ে গেছি। আমার অতীতে কোনও সুখের স্মৃতি নেই, ভবিষ্যতের জন্যে নেই কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য। সময়ের প্রবাহ যেন এক রঙ্গমঞ্চ, আর আমি যেন দর্শকের আসনে বসে দেখে চলেছি আমার নিজেরই অভিনয়। জীবনের যান্ত্রিক অসারতায় মুষড়ে পড়া মনটাকে যখন বাগে আনতে বারে বারে ব্যর্থ হলাম, তখন রণযান নিয়ে হাজির হলাম শাংগ্রিলার ফটকে।”

     “দেবতাদের কাছে ক্ষমা চাইতে?”

     ঘণ্টার মতন বেজে ওঠে শিশুপালের হাতুড়ির আওয়াজ।

     “না! দেবতাদের যুদ্ধে আহ্বান করতে?”

     “যুদ্ধ! দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ!”

     চেপে রাখতে পারি না কণ্ঠের বিস্ময়।

     “হ্যাঁ। যুদ্ধ। জেতার জন্যে যুদ্ধ নয়। দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে জেতা আমার পক্ষেও সম্ভব ছিল না। আত্মবিলুপ্তির পথ প্রশস্ত করার জন্যে যুদ্ধ। নীরাগ জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য যুদ্ধ।”

     “যুদ্ধ হল?”

     “নাঃ! আমার ডাক পড়ল শাংগ্রিলার ভেতরে। আমাকে সাদরে অভ্যর্থনা করে বানিয়ে দেওয়া হল দেবতা। অজর। অমর।”

     প্রতিটি শব্দের সঙ্গে গোলকের গায়ে সশব্দে আছড়ে পড়ে শিশুপালের হাতুড়ি।

     “কিংবদন্তী বলে দেবতা হওয়ার উপযুক্ত ছিলে না তুমি। অপমান করেছিলে দেবতাদের। তাই তোমাকে চিরনির্বাসন দেওয়া হয় টার্টারাসে।”

     হাতুড়ি ছুড়ে ফেলে শিশুপাল।

     “জীবন থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেললে অনেক কিছু পরিষ্কার বোঝা যায়। দেবতাদের মধ্যে থেকে বুঝতে পারলাম তাদের অসীম ক্ষমতাটুকু বাদ দিলে মানবের সঙ্গে তাদের বিশেষ ফারাক নেই। মানুষের মতোই তারা জীবনের পথ চলে রাগ-দ্বেষ-ঘৃণা-অহঙ্কারের পসরা নিয়ে। বাসনার পিপাসা মেটানোর তাগিদায় ছুটে বেড়ায় মানুষের মতোই। এইটা বোঝার পর মাথায় জেগে উঠল একটা প্রশ্ন।”

     “কী প্রশ্ন?”

     “হারিয়ে যাওয়া অতীতে তো ছিল কেবল মানুষ। দেবতাদের উৎপত্তি হল কীভাবে?”

     “এর উত্তর তো জানা। মানুষের মধ্যে যারা অসাধারণ, বিবর্তনের ফলে তারাই দেবতা হয়েছে।”

     একটা কাপড় দিয়ে গোলকটাকে ঝাড়ে শিশুপালের। ধুলো ওড়ে বাতাসে।

     “দেবতাদের মধ্যে থাকতে থাকতে আমার একটা পুরোনো ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার বুঙ্গোমা বলে একটা গ্রহ আক্রমণ করেছিলাম। গ্রহের মূল জীবিকা কৃষি আর পশুপালন। বরাবর দেখে এসেছি গ্রহের অধিবাসীরা একজোট হয়ে আমাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করে থাকে। কিন্তু বুঙ্গোমা ব্যতিক্রম। এখানের বেশির ভাগ মানুষ আমাদের অভ্যর্থনা করল দুহাত বাড়িয়ে। যেন আমরা লুণ্ঠনকারী দস্যু নয়, মুক্তিদাতা। অল্পসংখ্যক যে কয়েকজন আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা বাধ্য হল আত্মসমর্পণ করতে।”

     “এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ?”

     “কারণ? কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম বুঙ্গোমার বেশির ভাগ জমির মালিক অল্প কিছু মানুষ। গ্রহের অধীশ্বর তারাই। জীবন তাদের মোড়া বৈভবে। যাদের জমি নেই তারা দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে কোনওভাবে। এরাই ছিল আমাদের পক্ষে।”

     “কিন্তু এর সঙ্গে দেবতাদের কী সম্পর্ক?”

     মাটি থেকে একমুঠো ধুলো তুলে নেয় শিশুপাল। ছাউনিরে ফোকর দিয়ে আসা লাল আলো পড়ে তার মুখের ওপর।

     “বুঙ্গোমায় যেমন হাতে গোনা কয়েকজন জমি হাতিয়ে নিয়ে মালিক হয়ে পড়েছিল সমস্ত গ্রহের, তেমনি বহুযুগ আগে একদল মানুষ মুঠোয় ভরে ফেলেছিল সভ্যতার একটা মূল উপাদান। আর তার জোরে হয়ে উঠেছিল ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি।”

     “সভ্যতার উপাদান! কোন উপাদান?”

     মুঠো খুলে হাতের তালুতে ফুঁ দেয় শিশুপাল। শুকনো ধুলো ওড়ে ছাউনির আলোছায়ায়।

     ধুলোর লাল ঝাপসা পর্দার পেছন থেকে ভেসে আসে শিশুপালের কণ্ঠস্বর।

     “জ্ঞান! প্রকৃতিকে প্রয়োজনের নিগড়ে আটকে ফেলার জ্ঞান। অজর, অমর, অক্ষয় হওয়ার জ্ঞান। ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হয়ে ওঠার জ্ঞান।

    

     ইতিহাসপর্ব ৩

    

     প্রোটিন ভাঁটিতে তৈরি নকল মাংসের টুকরো আর জল-মাচানের শাকসব্জী ফেলি শুরুয়ার হাঁড়িতে। চুল্লীতে কাঠের ফালি গুঁজে দেয় শিশুপাল, আগুনের লালচে আভা পড়ে তার ক্ষতচিহ্ন আঁকা মুখে। বাইরে জমে আসে শীতল অন্ধকার।

     “তুমি ছাড়া আর কেউ মানব থেকে দেবতা হয়েছে?”

     “দেবতাদের আর মানুষের মধ্যে ফারাক কেবল সবলস আর দুর্বলের। মানুষ নিজের বাহুবলে দেবতাদের সমকক্ষ হয়ে উঠলে দেবতারা তাকে নিজেদের দলে টেনে নেয়। মানুষ থেকে দেবতা আমার আগেও হয়েছে, আমার পরেও হবে।”

     “কিন্তু স্বর্গ থেকে নির্বাসিত তুমি বোধহয় একাই!”

     নিজের অজান্তেই কিছুটা ব্যঙ্গের ছোঁয়া লাগে আমার কণ্ঠে।

     চুল্লীর কাঠ ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায় শিশুপাল। আগুনের শিখার ছায়া পড়ে জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল হয়ে ওঠে তার দু-চোখ। বর্মের ফাঁক থেকে ঘাড় বেয়ে সর্পিল গতিতে মুখের ওপর উঠে আসে উল্কি। হাতটা নেমে আসে কোমরের বজ্রমুষলের কাছাকাছি।

     ভয়ে পিছিয়ে যাই কয়েক পা।

     টার্টারাসের হাওয়ায় একটা শব্দ করে বন্ধ হয়েই ফের খুলে যায় দরজা।

     একটা ভারী নিশ্বাস ফেলে সেদিকে তাকিয়ে দেখে শিশুপাল। চোখ থেকে মুছে যায় আগুনের ছায়া, ঘাড় বেয়ে নেমে ফের বর্মের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে উল্কির নক্সা।

     “যেখান থেকে আমি এসেছিলাম সেই শিকড়ের কথাটা ভুলতে পারিনি।”

     দু-কাঁধ ঝুঁকে পড়ে শিশুপালের

     “দেবতাদের কাছে মানুষের মূল্য কীটপতঙ্গের মতন। পোকামাকড়ের মতোই ঘৃণার চোখে দেখে তারা আমাদের। একবার কিছু দেবতাদের আমোদপ্রমোদের প্রয়োজন হয়েছিল। এরা কামিকাওয়া থেকে উড়িয়ে নিয়ে এল একটা পুরো পরিবারকে। কয়েকজনকে অচল করে বসিয়ে রাখল দর্শকের আসনে, বাকিদের মগজ নিয়ন্ত্রণ করে একে অপরকে দিয়ে হত্যা করাল গ্ল্যাডিয়েটারের মতন।”

     “মানুষে মানুষে লড়াইতে দেবতারা আমোদ পায়?”

     “লড়াইতে নয়। লড়াইটা গৌণ। চোখের সামনে নিকটজনের মৃত্যুতে তাদের পরিজনের আর্তনাদ আর হাহাকার উপভোগ করাটাই তাদের মূল বিনোদন।”

     কুটিরের বাইরে পা রাখে শিশুপাল। মুঠোমুঠো তারা ছড়ানো টার্টারাসের আকাশের দিকে তাকায় মাথা তুলে।

     “একবার একটা মজলিশে এই গল্পটা করে এরা নিজেদের মধ্যে হাসি-তামাশা করছিল। প্রয়োজনে হত্যা আমিও করেছি, কিন্তু মানুষকে দুঃখ দিয়ে আনন্দ পাওয়ার মতন রুচি আমার ছিল না। আমি সে কথাটা বলতেই দেবতাদের মধ্য তুমুল হাসির রোল উঠল। একজন ভুরু নাচিয়ে আমাকে বলল দেবতাদের ভোগে লাগাটাই নাকি মানব জীবনের উদ্দেশ্য।”

     তারায় ছাওয়া আকাশে একটা উল্কা ক্ষণিকের জন্যে ছুট দিয়েই ফের বিলীন হয়ে যায়।

     “মস্তিষ্কের মধ্যে একটা রক্তলাল ক্রোধ যেন ফণা তুলল। শরীরের দখল নিল সুষুম্না কাণ্ডে রণচক্র। হাতে উঠে আসা বজ্রমুষল এক এক করে আছড়ে পড়ল দেবতাদের মাথায়। রক্তের ফোয়ারা ছড়িয়ে তাদের শরীরগুলো গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। মস্তিষ্কের লাল রাগটা তখনো ফুঁসে চলেছে হিংস্র জানোয়ারের মতন। মাথার মধ্যে বেজে চলেছে কিছুক্ষণ আগে শোনা কথাটা— মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য দেবতাদের ভোগে লাগা। পড়ে থাকা শরীরগুলো খণ্ড খণ্ড করে ফেলে দিলাম প্রোটিন ভাঁটিতে। দেবতাদের ভোগে কেবল মানুষ লাগবে কেন, দেবতারাও লাগুক।”

     অনিচ্ছাসত্ত্বেও গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে একটা বিস্ময়ের অস্ফূট আর্তনাদ।

     আমল দেয় না শিশুপাল। টার্টারাসের ধুলোর মতন তার অট্টহাস্য ছড়িয়ে যায় অন্ধকারে।

     “হত্যা, লুণ্ঠন, যুদ্ধ, জীবনে অন্যায় কম করিনি। কিন্তু এই একটা কাজের জন্যেই আজও গর্ব হয়।”

     বিস্ময় রুদ্ধ গলায় প্রশ্ন করি, “তারপরই কি তোমাকে নির্বাসন দিল দেবতারা?”

     “প্রায় তার পরে পরেই। রণযান নিয়ে শাংগ্রিলা থেকে পালালাম বটে, কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম না। দেবতাদের অস্ত্রে নিভে গেল আমার যানের আণব-চুল্লী। আমাকে দেবতারা নামিয়ে দিল টার্টারাসে।”

     “কিন্তু প্রাণে মারল না!”

     “মানব হলে হয়তো প্রাণ নিয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করত। কিন্তু দেবতারা চিন্তা করে অন্যভাবে। কয়েক হাজার বছর ধরে কেউ তাদের কেউ আঘাত করেনি। আমাকেও তারা শাস্তি দিতে চাইল হাজার বছর ধরে। আমার ব্যর্থতা, নৈরাশ্য উপভোগ করতে চাইল বছরের পর বছর ধরে।”

     আকাশের দিকে আঙুল তোলে শিশুপাল।

     “ওইখানে কক্ষপথে ঘুরছে আমার রণযান। তাকে জাগিয়ে তোলার একটাই উপায়। টার্টারসের বুকের ভেতর জমে থাকা লাভার শক্তিতে পুঞ্জীভূত করে যানের আণব চুল্লীতে আঘাত করা।”

     “কী করে?”

     এবার সামনের দিকে আঙুল তোলে শিশুপাল। সেখানে অন্ধকারের ক্যানভাসে আরও গাড় অন্ধকার দিয়ে আঁকা একটা পাহাড়। সে পাহাড়ে জ্বলে রঙিন আলো, তার গা বেয়ে আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের মতন ছুটে যায় বলদ্যুতি।

     “নিয়ম করে দেবতারা টার্টারাসে ছুড়ে ফেলে নানা যন্ত্রের টুকরো। তাই দিয়ে অল্প অল্প করে গড়ে তুলেছি আমি ওই যন্ত্রগিরি। ওর চূড়োয় শিখরগোলকটা ঠিকভাবে বসাতে পারলেই আকাশের বুক চিরে ছুটে যাবে তেজরশ্মি, তার আঘাতে জেগে উঠবে আমার রণযান। টার্টারসের মাটি ছেড়ে উড়ে যাব আমি।”

     “কবে থেকে চেষ্টা করে চলেছ রণযানকে জাগানোর?”

     বিষণ্ণ শোনায় শিশুপালের কণ্ঠস্বর।

     “হাজার বছর হবে। যখন থেকে টার্টারাসে নির্বাসন হয়েছে আমার।”

    

     দ্রোহপর্ব

    

     গুরুভার গোলকটাকে পিঠে চড়িয়ে যন্ত্রের পাহাড় বেয়ে শরীরটাকে ওপর দিকে টেনে নিয়ে যায় শিশুপাল একটু একটু করে।

     আজ কয়েক বছর হল আমি তার এই অনলস প্রয়াসের সাক্ষী। তাকে এর আগেও বহুবার দেখেছি এইভাবে পাহাড়ের মাথায় গোলকটাকে হিঁচড়ে টেনে তুলতে।

     পাহাড়ের চূড়োয় পৌঁছে খানিকক্ষণ থামে শিশুপাল। দেখতে না পেলেও তার ঠোঁটের বিজয়ীর হাসিটা পাহাড়ের নিচ থেকেই আমি অনুমান করতে পারি।

     রণহুঙ্কার ছেড়ে মুঠো করা হাত আকাশের দিকে তোলে শিশুপাল।

     তারপর গোলকটা বসিয়ে দেয় পাহাড়ের মাথায়।

     একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ ওঠে। টার্টারাসের লাল আকাশে নীল বিদ্যুৎ ছড়িয়ে যায় শিরা-উপশিরার মতন।

     চূড়ো থেকে গোলকটা লাফিয়ে ছিটকে পড়ে একদিকে। পাহাড়ের গা বেয়ে ওলটপালট খেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে শিশুপালের শরীরটা।

     আজ কয়েক বছর হল আমি শিশুপালের এই বিরামহীম নিষ্ফলতার সাক্ষী। বারবার তাকে দেখেছি এই একইভাবে পাহাড়ে চড়তে আর গোলক বসাতে বিফল হয়ে ছিটকে পড়তে।

     বারবার বিফল হয়েও তবু কেন বিরামহীনভাবে চেষ্টা করে যায় শিশুপাল?

     ধুলোয় বসে হাঁপায় শিশুপাল। তার নাক কান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে রক্তের ধারা।

     পাশে গিয়ে বসি আমি।

     “তুমি জান তোমার শিখরগোলক কাজ করবে না। দেবতাদের কারসাজিকে পরাস্ত করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

     “জানি।”

     দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ছোট মক্ষত্রযানের দিকে আঙুল তুলি।

     “রণযান যখন চালু করতে পারবে না জানো, তাহলে আমার সঙ্গে চলো।”

     বিষণ্ণ হাসি হাসে শিশুপাল।

     “তুই কি মনে করিস এর আগে সে চেষ্টা কেউ করেনি? না, তুই যে টার্টারাসে এসেছিস সে খবর দেবতাদের অজানা। আমাকে নিয়ে টার্টারাস ছাড়লেই ধ্বংস হয়ে যাবি তুই, আমাকে দেবতারা ফের ফিরিয়ে দেবে টার্টারাসে। যদি কোনওভাবে তাদের চোখে ধুলো দিয়ে আমাকে নিয়ে পালাতেও পারিস, তাহলেও আমার পক্ষে মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। আমার ইতিহাসই আমাকে ফের ধরিয়ে দেবে।”

     “তাহলে তোমার ভবিতব্য কি অনন্তকাল এই টার্টারসে বন্দি হয়ে থাকা?”

     “হ্যাঁ। এই বন্দিদশা থেকে আমার মুক্তি নেই।”

     নিজের অজান্তেই চোখ পড়ে যায় শিশুপালের কোমরের বজ্রমুষলের দিকে।

     দৃষ্টি এড়ায় না শিশুপালের।

     “কী দেখছিস?”

     অস্বস্তিতে সরিয়ে নিই চোখ।

     “না, কিছু না!”

     “জানি কী ভাবছিস। ভাবছিস এই নিরবচ্ছিন্ন ব্যর্থতার হাত থেকে বাঁচতে আমি আত্মহত্যা করি না কেন? মাথায় বজ্রমুষলটুকু ছোয়াঁলেই তো নিষ্কৃতি পাওয়া যায় এই অনন্ত নরক থেকে।”

     উত্তর না দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকি।

     টার্টারাসের লাল আকাশের দিকে তাকায় শিশুপাল।

     “করি না কেন জানিস? কারণ আত্মহত্যা হল স্বীকারোক্তি। হেরে যাওয়ার স্বীকারোক্তি। জীবনের ভার যে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে আত্মহত্যা হল তা স্বীকার করে নেওয়া। দেবতাদের কাছে আমি পরাজয়ের স্বীকারোক্তি দেব না। কোনও মূল্যে না।”

     চোখ তুলে যন্ত্রগিরির চূড়োর দিকে নির্দেশ করে শিশুপাল।

     “চূড়োর গোলক বারবার ব্যর্থ হওয়ার প্রতিকার আমার হাতে নেই। যাদের বিরোধী শক্তিতে আমি প্রতিবার ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ি তারা আমার চাইতে অনেক ক্ষমতাবান। কিন্তু ওপরে ওঠার প্রয়াসটা আমার সম্পূর্ণ নিজের। যতবার পড়ে যাব, ততবারই আমি উঠব।”

     উঠে দাঁড়ায় শিশুপাল। বর্মের ফাঁক দিয়ে তার মুখের ওপর উঠে আসে শরীরের উল্কি। টার্টারাসের নিঃশেষিত সূর্যের লাল আলোয় সে উল্কি দেখায় কোনও দুর্বোধ্য লিপিতে লেখা রক্তের অক্ষরের মতন।

     “ওই বারবার উঠতে চাওয়াটাই দেবতাদের বিরুদ্ধে আমার দ্রোহ।”

    

     সমাপ্তিপর্ব

    

     আমার যানে কিছু কারিকুরি করে দিয়েছিল শিশুপাল। দেবতাদের নজরে এড়িয়ে পালাতে পেরেছিলাম টার্টারাস ছেড়ে। কিন্তু জানি দেবতাদের চোখে ধুলো দিয়ে বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে পারব না।

     তাই চারদিকে ছড়িয়ে দিলাম এই কাহিনি। আমি না থাকলেও রয়ে যাবে শিশুপালের সঠিক ইতিহাস।

     শিশুপাল ভাতৃহন্তা, শিশুপাল অজাচারী, শিশুপাল দুর্দম নভদস্যু। শিশুপাল ভালো মানুষ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিশুপাল প্রতীক।

     অবিচারের অচলাবস্থার বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রতীক।

    

         ঋণস্বীকার: আলবার্ত কাম্যু, দ্য মিথ অব সিসিফাস

 

  

4 thoughts on “দ্রোহ

  • October 23, 2020 at 5:26 pm
    Permalink

    আহা! আমাদের পুরাণকে এমন শাশ্বত, মহাজাগতিক, হয়তো বা অতি-জাগতিক মাত্রা আর কেই বা দিতে পারতেন সুমিতদা ছাড়া? কুর্নিশ।

    Reply
  • October 23, 2020 at 9:04 pm
    Permalink

    দারুন। গ্রীক ও ভারতীয় মিথের মিথোস্ক্রীয়ায় এইভাবে যে এক্সটা সাইফাই গড়ে উঠতে পারে ভাবা যায় না। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং খুব আকর্ষণীয় লাগল।

    Reply
    • October 23, 2020 at 9:28 pm
      Permalink

      *এক্সটা নয় , একটা

      Reply
  • October 28, 2020 at 8:16 am
    Permalink

    সুমিত বাবু – খুবই ভাল লাগল। আপনাকে আর নতুন করে কী বলব, তবে ভাষার ব্যবহার অনবদ্য লাগল। শেখার মতন।

    Reply

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!