সিমুলেশন হাইপোথিসিস

সায়ন নাথ

অলংকরণ:সৌরভ ঘোষ

দৌ কি এই জগৎ সত্য? নাকি সবই আমাদের ভ্রম, আমাদের এক অলীক ইউটোপীয় ধারণা? প্রশ্নটা পড়ে হয়তো অনেকেই অবাস্তব বা পাগলের প্রলাপ বলে মনে করবেন। আবার কেউ কেউ ভাববেন, এমন আবার হয় নাকি! আমরা তো প্রতিদিন আমাদের চারিপার্শ্বের প্রকৃতিকে, বাস্তবিকই প্রত্যক্ষ করি এবং তার সঙ্গে পরিবেশের অন্তর্গত বস্তুজগতের পারিপার্শ্বিক মিথষ্ক্রিয়াকে অনুভব করি, তাহলে এমন উদ্ভ্রান্তের মতো প্রশ্নের অর্থ কী? আসলে এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বজনের গ্রহণযোগ্য কোনও সুস্পষ্ট গাণিতিক উত্তর নেই, তবে প্রশ্নটা আমাদের সবাইকেই ভাবিয়ে তোলে। তাই নয় কি?

     উপরিকৃত কথাগুলো বলার কারণ হল এই প্রবন্ধে আমরা তাত্ত্বিক আলোকের নিরিখে কয়েক দশকেরও প্রাচীন এক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব: সিমুলেশন হাইপোথিসিস নিয়ে আলোচনা করব।

    

কী এই সিমুলেশন হাইপোথিসিস?

     সব কিছু শুরু থেকে আলোচনা করা যাক। সেটি ১৯৭০ সালের ঘটনা, যখন বৈজ্ঞানিক ও ব্রিটিশ গণিতবিদ জন কনওয়ে জীবনচক্রের খেলা (the game of life) নামে একটি ভিডিয়ো গেমস তৈরি করে পৃথিবীর বিশ্ববরেণ্য ও প্রবাদপ্রতিম বৈজ্ঞানিকদের তালিকায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। গেমটির বিশেষত্ব ছিল যে এটি কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রামিং আর কোডিং এর সমন্বয়ে তৈরি করা। সেটি সমকালীন ibm কম্পিউটারেরমনিটরে চলার সময় কিছু নির্দিষ্ট প্যাটার্ন, ডট আর লাইনের মাধ্যমে কৃত্রিম কোষের জীবনচক্রদর্শকদের সামনে তুলে ধরত, কিছু প্রয়োজনীয় কমান্ডের নির্দেশে। তারপর কোষগুলি কখনও ছড়িয়ে পড়ত আবার কখনও সময়ের সাপেক্ষে মিলিয়ে যেত। তবে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর জগতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর জনক অ্যালান টুরিং ও তার সহকর্মী ডেভিড চাম্পার্নউনের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা ১৯৪৮ সালে পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামিং চেস গেম turochamp chess simulation তৈরি করেন। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীদের কাছে সিমুলেশন হাইপোথিসিস এর ধারণা একটা আলাদা মাত্রা হিসেবে কাজ করেছে। এখন কল্পবিজ্ঞানের মঞ্চে এই আর্টিফিসিয়াল সিমুলেশন হাইপোথিসিস এর ধারণার ব্যবহার সাইফি গল্পের প্লট তৈরিতে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে।সফটওয়্যারেতৈরি গেমিং ওয়াল্ড কে বলা হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা একটি ইলিউশন বা আমাদের ভ্রমের জগৎ। তবে ২০০৩ সালে তাত্ত্বিক ভাবে এই ধারণাকে প্রথম প্রকাশ করেন সুইডেনের এক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক নিক বস্ট্রম। তার কথায়, “We are living in a reality in which posthumans have not developed yet and we are thinking actually living in reality।” এখানে তিনি বলেছেন যে হতে পারে আমাদের এই দৃষ্টিগোচর মহাবিশ্ব কোনও এক বিশাল সৃষ্টির এক ক্ষুদ্রতম অংশ হিসাবে গড়ে ওঠা সিমুলেটেড প্রোগ্রাম মাত্র। তাই এই প্রোগ্রাম পূর্বে উল্লিখিত জন কনওয়ের সৃষ্টি করা গেম, the game of life এর এক্সিকিউশনের মতো কম্পিউটার মনিটরে ১ অথবা ০-এর বাইনারি সিকোয়েন্সকে অবলম্বন করে স্ক্রিনে কোনও ডট বা লাইনের মাধ্যমে কোনও নির্দিষ্ট প্যাটার্নকে দেখায় না। যা দর্শায় তা হল এই দৃষ্টিগোচর ব্রহ্মাণ্ডে উপস্থিত প্রতিটি গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সিপুঞ্জ, কসমিক ভয়েড, ডেড স্টার, সুপারনোভা, নিউট্রন স্টার, গ্রহ, নীহারিকা, উপগ্রহ সবকিছুকে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে মানুষ এখনও জানে না এই কসমিক কম্পিউটারের মনিটরটি কোথায় অবস্থিত। কোথা থেকে স্বয়ং স্রষ্টা বা অ্যাডভান্সড প্রোগ্রামাররা আমাদের উপর মনিটরিং করে নজরদারি চালাচ্ছে।

     এই বিষয়ের উপর প্রাচীন ইউনানি দার্শনিক প্লেটো বহু পূর্বে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছিলেন, এমন কি ইউরোপের এক মধ্যযুগীয় দার্শনিক রেনে দেকার্ট এই ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় ভগবান কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন “এই জগৎ হল এক মায়া।” তাই এখানে প্রশ্ন ওঠে আমাদের পূজনীয় ভগবানরা কি সত্যিই মানেন যে তাঁদের দ্বারা তৈরি করা মানব জাতির এই বিশ্ব- ব্রহ্মাণ্ড একটি সিমুলেশন মাত্র? তাঁরাই কি আমাদের বাস্তবিক,ও শ্বাশত সৃষ্টিকর্তা? হয়তো সময় তার উত্তর দেবে তাই এখন আর আমাদের এ বিষয় সম্পর্কে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

    

হাইপোথিসিসে বিশ্বাসী এলন মাস্ক:

     এলন মাস্কের নাম এখন পৃথিবীর প্রায় সবাই জানে। মাস্কের নাম শুনে সকলে বলে আরে ওই তো ওই লোকটা যে কিনা মঙ্গলগ্রহে মানব জাতির বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হ্যাঁ, এলন মাস্ক, যিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে কোডিং করে একটি গেম বানিয়ে তা বিক্রী করে ৫০০০ ডলার রোজগার করেছিলেন। একধারে যিনি স্পেস এক্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, সঙ্গে টেসলা রোডস্টার, জিপ২, পেপাল এই সকল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যুক্ত। যিনি মাত্র সাতাশ বছর বয়সে কোটিপতির তকমা পেয়েছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য মার্কিন দেশে সানফ্রান্সিসকো থেকে নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস শহরকে এক বায়ুনিরুদ্ধ টিউবের মারফত তৈরি হাইপারলুপ নামে এক পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার। সেই কোটিপতি আফ্রো-কানাডিয়ান মার্কিন যুবক এলন মাস্ক এই হাইপোথিসিস-এ দারুণভাবে বিশ্বাসী।

    

সিমুলেশন হাইপোথিসিস সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন:

     এই হাইপোথিসিস সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্ন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা বহুবার উপস্থাপন করেছেন। সেরকমই অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলোচিত হল।

    

     ১. সাবজেক্টিভ রিয়ালিটি:

     সাবজেক্টিভ রিয়ালিটি মানে হল একটি বস্তুর বা অনুভূতির ভিত্তিতে একজন মানুষের উপর সৃষ্টি হওয়া প্রতিক্রিয়া। ধরা যাক সাবজেক্ট A ও সাবজেক্ট B আছে। এরা দুজনেই need for speed বা NFS নামে একটি কম্পিউটার গেম খেলছে। এখন একজনের কাছে গেমটা প্রচণ্ড সোজা মনে হতে পারে কিন্তু অন্যজনের কাছে এটা মনে হতে পারে বেশ কঠিন। তাই এখানে need for speed এর পরিপ্রেক্ষিতে দুজনের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। আসলে বস্তু বা অনুভূতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির বিষয়টা আমাদের নিজেদের মস্তিস্ক প্রসূত ধারণা। আমরা যা অনুভব করি বা আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় যা প্রত্যক্ষ করে তা সোজা আমাদের মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠায়। আমাদের এই মস্তিস্ক আবার কোটি কোটি নিউরোন দিয়ে তৈরি। এই নিউরোনগুলো সক্রিয়ভাবে ব্রেইন থেকে একটি কাউন্টার অ্যাকশন আমাদের ইন্দ্রিয়তে পাঠালে তবে আমরা উক্ত বস্তু বা অনুভূতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকি। তাই এখন প্রশ্ন হল, আমাদের ব্রেইন তো আমাদের শারীরিক কম্পিউটারের সিপিইউ। সবার শরীরতো একইরকম উপাদান দিয়ে তৈরি, কিন্তু বস্তু বা অনুভূতির সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে কেন সবাই একই রকম ধারণা ব্যক্ত করতে সমর্থ নন? উক্ত তত্ত্ব অনুযায়ী এইভাবেই হয়তো একই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আপেক্ষিকতা তৈরি হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ এটা ভাবা যায় যে যখন কোনও ব্যক্তি কোনও একটি গেম খেলে তখন সে শুধু ওই গেমটির একটি নির্দিষ্ট অংশই কম্পিউটারের পর্দায় প্রত্যক্ষ করে কিন্তু তাই বলে কি গেমটির বাকি অংশটি থাকেনা? অবশ্যই থাকে, কিন্তু আমরা একটি একক সময়ে ওই বস্তু বা অনুভূতির সম্পর্কে একাধিক ধারণা লাভ করতে সচেষ্ট নই। তাই এই প্রশ্নটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ডুয়াল পসিবিলিটি বা পদার্থের dual state এর ধারণাকে নতুন ভাবে ইন্ধন যোগায়।

    

     ২. অ্যান্থ্রপিক প্যারাডক্স:

     এই ধারণার মূল তত্ত্ব হল, কীভাবে এই ব্রহ্মাণ্ডে সবকিছু এক নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে সুন্দর নিয়মে সাজানো গোছানো রয়েছে। যাকে বলে একেবারে পারফেক্ট। উদাহণস্বরূপ আমাদের পৃথিবীর কথা বলা যেতে পারে। আমাদের পৃথিবীর অবস্থান সৌরমণ্ডলের এমন এক সুবিধাজনক স্থানে যেখানে সূর্যের তাপ খুব বেশি নয় আবার খুব বেশি ঠান্ডার প্রকোপও নেই। যা জীবন ধারণের জন্যে উপযুক্ত। এটা কি শুধুই কোনও এত্তেফাক বা কোনও মিরাকল? কেন সৃষ্টি এমন হল? নাও হতে পারত। তাই এ প্রসঙ্গে বলা যায় সিমুলেশন একদম পারফেক্ট। তবে আজ ২১ শতকের মানবীয় সভ্যতাও প্রোগ্রামিং করে ভার্চুয়ালিটি বা আর্টিফিশিয়াল গেমিং ওয়ার্ল্ড তৈরি করতে সক্ষম। তবে আমরা সেই কৃত্রিম জগতের চরিত্রগুলোর মধ্যে এখনও আমাদের মতো আবেগপূর্ণ বৈশিষ্টগুলো প্রবেশ করাতে পারিনি। হয়তো এই ব্যাপারে আমাদের সৃষ্টিকর্তা সত্যিই অনেক এগিয়ে আছেন!

    

     ৩. ভিসিবল ফ্লস:

     কখনওই কোনও সিমুলেশন পুরোপুরি ১০০% পারফেক্ট হয় না। কিছু না কিছু খামতি থাকা তাতে অবশ্যম্ভাবী। ভিসিবল ফ্লস এই ধারণাকেই প্রশয় দেয়। আমরা যেমন আমাদের তৈরি কম্পিউটার সিমুলেশন কখনওই পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে গঠন করতে পারি না, তেমনই মহানুভব সৃষ্টিকর্তার তৈরি এই চারিপার্শ্বের দৃশ্যমান মহাবিশ্বেও কিছু খামতি থাকা উচিৎ। এই খামতির কিছু নিদর্শনের সম্মুখীন মাঝে মধ্যে আমরা হই, যেগুলোকে আমরা অতিলৌকিক বা অলৌকিক হিসাবে পর্যালোচনা করি। এক্ষেত্রে deja vu -এর কথা দারুণ ভাবে খাটে। Deja vu হল একটি ফরাসি শব্দ যার অর্থ আমরা আমাদের ভবিষ্যতে কি ঘটবে তার পূর্ব অনুমান নিজেদের অতীতে কোনও না কোনও সময় নিজেদের স্বপ্নের ভিতর দেখতে পাই। পরে সেগুলো আমাদের সামনে ঘটলে মনে হয়, এগুলো তো আমার স্বপ্নে দেখা, কীভাবে সত্যি হল এগুলো? Deja vu পৃথিবীতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ করে থাকেন, তবে এর রহস্য এখনও উন্মোচিত করা সম্ভব হয়নি। যেমন এ প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই, যে আমরা কেন স্বপ্ন দেখি? সত্যিই এই সৃষ্টিকে বোঝার উপায় এখনও আমরা কুক্ষিগত করতে পারি নি। হয়তো

     ভবিষ্যতে কোনওদিন পারবো।

    

     ৪. ডিলিশন অব প্রোগ্রাম:

     এই ধারণার মূল কথা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতাবাদ। আসলে আমরা কখনই এই সৃষ্টিকে বুঝতে সচেষ্ট নই। আমরা এই বস্তুজগতের পারিপার্শ্বিক মায়াজাল থেকে নিজেদের কখনওই পৃথক করতে পারি না। নাম, যশ খ্যাতি, সম্পত্তি এসবের উর্ধ্বে গিয়ে আমরা নিজেদের কখনই জানতে চাই না, এমনকি নিজেদের সেভাবে কল্পনাই করি না। তাই এই জগৎ আমাদের সত্য বলে মনে হয় যেটা আসলে হল একটি ইলিউশন বা আমাদের ভ্রম। যে সকল মহাপুরুষগণ এই জগৎ সত্যের আড়ালে থাকা নিগূঢ় বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারেন, তাঁরা ভগবান গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীর জৈনের মতো জীবনের এক বিশাল অঙ্কের সময় আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। ফলে তারা হয়ে উঠেন বোধি। এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে দিয়ে তারা এই মিথ্যে জগৎ থেকে নিজেদের সরিয়ে দেন। তাই বলা যায় তাদের প্রোগ্রাম এই ভার্চুয়াল জগৎ থেকে ডিলিট হয়ে যায়।

    

     ৫. ঈশ্বর কি কোনও প্রোগ্রামার?

     এই প্রশ্নের কোনও সুদুত্তর নেই। মানুষ যুগ যুগ ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে কিন্তু তা মেলেনি আজও। আমরা জানি আমরা তাঁর মহান সৃষ্টি, কিন্তু জানি না কে আমাদের সেই সৃষ্টিকর্তা। তাই পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সেই আদি শক্তিকে আলাদা আলাদা নামে অভিহিত করেছেন। যেহেতু এই জগৎ সংসার বড়ই বিচিত্র ও একাধিক বৈশিষ্টসম্পন্ন, তাই বিভিন্ন নাম আপেক্ষিকতার এক নিগূঢ় বৈশিষ্ট।

     হিন্দু ধর্মে ভগবান, কোরআন শরীফে আল্লাহ, বাইবেলে গড, গ্রীক পুরাণে জিউস, রোমান মিথে জুপিটার, আর নোর্স মিথে অলফাদার ওডিন— এরা সকলেই হতে পারেন কোনও অ্যাডভান্সড প্রোগ্রামার!

    

     ৬. সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ড:

     বর্তমানের ক্লাসিক্যাল পদার্থ বিজ্ঞান সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ড সংক্রান্ত ধারণাকে মানতে নারাজ, কিন্তু অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও আধুনিক স্ট্রিং থিয়োরি একাধিক মহাবিশ্বের অবস্থানের সপক্ষেযুক্তি উপস্থাপন করে। সাধারণত স্ট্রিং থিয়োরি অনুযায়ী বলা যায়আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি হাইপার ডাইমেনশনাল প্রোগ্রাম। এই মহাবিশ্বে প্রায় ৩৬টি মাত্রা বা ডাইমেনশন বিরাজমান। কিন্তু আমরা এখনও আমাদের সেই ত্রিমাত্রিক দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ও উচ্চতার জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাই আমরা সেই সব ডাইমেনশন ও সেই ডাইমেনশন-এ উপস্থিত প্রাণের অস্তিত্বের কাহিনি জানতে পারব না। আমরা যদি কোনওভাবে ভবিষ্যতে নিজেদের প্রযুক্তিকে উন্নত করে অতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম জগতে পদার্পণ করতে পারি তাহলে দেখব এই সৃষ্টির আর এক সুন্দর রূপ। প্রতিটা পদার্থের মধ্যস্থ অনু-পরমাণুর গঠন, মানবদেহের প্রতিটি কোষের অন্তভাগে উপস্থিত গলগি বস্তু, লাইসোজম, মাইটোকনড্রিয়া, ইত্যাদির অভ্যন্তরীণ গঠন, এমনকি রক্তের মধ্যে অবস্থিত প্রতিটি খনিজের অতিক্ষুদ্র পার্টিকেল বা কণা দেখা সম্ভব হবে। তাই বলা যায় প্রতিটি মানুষই নিজেই এক একটি ব্রহ্মাণ্ড। যাই হোক এ তো গেল শুধুমাত্র একটি আলাদা রিলেম বা এই মহাবিশ্বে অবস্থিত ছোট একটা দুনিয়ার কথা। এ ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক মহাবিশ্ব। আমরা তো শুধুমাত্র এই বিশাল সৃষ্টির এক ক্ষুদ্রতম অংশ মাত্র। আবার হতে পারে আমাদেরই মতো সমবৈশিষ্ট্যের অধিকারী ২য় অথবা সহস্র পৃথিবী রয়েছে অন্য কোনও মহাবিশ্বে। এই তত্ত্ব মাল্টিভার্স-এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে আমরা সেই পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি না, কারণ হয়তো সেই পৃথিবীগুলো আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ধরা ছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করে, কিংবা সেগুলি অন্য কোনও হাইপারডাইমেনশনে অবস্থান করে পূর্বে উল্লিখিত কোয়ান্টাম জগতের মতো। তাই এক্ষেত্রে বলা যায় আমরা, আমাদের এই মহাবিশ্ব, সবকিছুই যেন এক অসীম সমুদ্রে ভেসে থাকা একটি ক্ষুদ্রতম জলকণার বিন্দুমাত্র।

     তাই কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে এই মহাবিশ্বের শেষ সীমা কোথায়? তাহলে বলা যায় এর কোনও শেষ সীমা নেই।

    

     এই হাইপোথিসিস সংক্রান্ত সমান্তরাল মহাবিশ্বের প্রশ্ন নিয়ে যে কথাটা সবার আগে জানা প্রয়োজন, তা হল একাধিক মহাবিশ্বের মাঝে এই সৃষ্টি বা সিমুলেশন কাজ করে একটি চেইন রিয়্যাকশানের মতো। অর্থাৎ আমরা যেমন আমাদের প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে কোনও ভার্চুয়াল জগৎ তৈরি করতে পারি তেমনই কোনও অ্যাডভান্সড বুদ্ধিমত্তারা আমাদের তৈরি করেছে। যাদের আমরা সৃষ্টিকর্তা বা মতান্তরে এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল নামে জানি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল তাদের কে সৃষ্টি করেছে? প্রশ্নটা বহু প্রাচীন কিন্তু উত্তর মেলেনি আজও।

    

সিনেমা জগতে হাইপোথিসিস:

     সিমুলেশন হাইপোথিসিস নিয়ে হলিউড কয়েকটি দুর্ধর্ষ সিনেমা রিলিজ করেছিলো। তবে এই তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সিনেমার লিস্ট খুব বেশি বড় নয়। সিনেমাগুলি হল—

     ১) ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি inception

     ২) ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ready player one

     ৩) ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া the matrix

     ৪) ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া the 13th floor

     ৫) ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া source code ইত্যাদি।

   

 

 

 

    

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!