স্পন্দন সিরিজ – প্রথম প্রাণের স্পন্দন ও আমরা (পর্ব-৩)

ড. শুভময় ব্যানার্জি

অলংকরণ:ড. শুভময় ব্যানার্জি

নেক ভোরে আজ প্রফেসর সূর্যশেখরের ঘুমটা ভেঙে গেল। বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়িতে দেখলেন পাঁচটা কুড়ি বাজে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে প্রফেসর তাঁর ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর বালিগঞ্জ প্লেসের এই ফ্ল্যাটটা বড় রাস্তা থেকে কিছুটা ভেতরে। তাঁর ফ্ল্যাটের সামনে একটা সবুজ পার্ক আছে, রাস্তা জুড়ে প্রচুর গাছ। তাঁর ফ্ল্যাটের নিজস্ব কম্পাউন্ডেও কিছু ঝাউগাছ আছে। গাছগাছালি প্রফেসরের খুব প্রিয়। তাঁর বিদেশ থেকে আনা বেশ কিছু অর্কিডের চারা ব্যালকনিতে বড় হচ্ছে।

     প্রফেসর অর্কিডে জল দিতে দিতে সামনের পার্কটার দিকে তাকালেন। তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিছুপরেই তাঁর পার্কে প্রাতঃভ্রমণে বেরোবার কথা, পাখিদের কলতানে মুখরিত চারদিক, কিন্তু রাস্তা সুনসান… আর পার্কে তালা ঝুলছে। রাস্তাতেও কেউ নেই। কেবল একটা পুলিশের ভ্যান দ্রুত বেগে চলে গেল। লকডাউন! লকডাউন চলছে বিশ্বজুড়ে। এক মারণ ভাইরাসের ভয়ে পৃথিবীর সবাই ঘরবন্দি, ওলোটপালোট হয়ে গেছে সবার জীবন, পৃথিবীতে শুধুই যন্ত্রণা আর মৃত্যুর আতঙ্ক! প্রফেসরের জীবন থমকে গেছে তাঁর চার দেয়ালের ঘরের মধ্যে। তাঁর ইউনিভার্সিটি বন্ধ, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুধু মোবাইলে আর স্কাইপে। কিছুদিন আগেও তো এমনটা ছিল না, হঠাৎ করে বদলে যাওয়া এই পৃথিবীটাকে প্রফেসরের খুব অচেনা মনে হয়।

     ব্রেকফাস্ট শেষ করে কফিতে চুমুক দিতেই মোবাইল বেজে উঠল। দিল্লীর নম্বর দেখাচ্ছে, কে আবার ফোন করছে দিল্লী থেকে?

     —হ্যালো?

     ওপাশ থেকে প্রফেসরের পরিচিত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কাকা, আমি উজান বলছি, কেমন আছ তুমি?’

     —উজান! তুই দিল্লীতে কি করছিস?

     —আর বলো না, সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস নিয়ে একটা কোর্স করতে কিছুদিন আগেই এসেছিলাম, তারপরেই হঠাৎ লকডাউন, ব্যাস আটকে গেলাম। ওদিকে বাবা-মা চিন্তায় আছে, কী সমস্যা বলো তো…

     —কোথায় আছিস ওখানে? প্রফেসর উদ্বিগ্ন হলেন।

     —বন্ধুরা একসঙ্গে একজনের বাড়ি আছি, চিন্তা করো না, অসুবিধা নেই। তবে তোমার সঙ্গে গল্প হচ্ছে না, মন ভালো নেই।

     প্রফেসর হাসলেন। উজান এখনও ছেলেমানুষ রয়ে গেছে। গল্পের টানে ছেলেটা এতদূর থেকে ফোন করছে।

     উজান বলল, ‘কাকা, সকালে ব্যস্ত? নাকি গল্প হতে পারে?’

     —হতে পারে, কী জানতে চাস বল।

     —কাকা, সবাই করোনা সংক্রমণ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি, আমি আর বন্ধুরা এই রকম প্যান্ডেমিক কোনওদিন দেখিনি তো তাই কেমন অদ্ভুত লাগছে!

     —শুধু তুই কেন, আমি আর তোর বাবাও কোনওদিন দেখিনি, চোখে দেখা যায় না এমন অণুজীব পৃথিবীতে যেন ত্রাস সৃষ্টি করছে। প্রফেসর থামলেন।

     —আচ্ছা, এই ভাইরাস পৃথিবীতে কীভাবে এল কাকা, আমরা এই ব্যাপারটা বিশেষ জানি না…

     —উজান, ভাইরাসের উৎপত্তি এখনও এক রহস্য। শুধু আমি কেন, পৃথিবীতে তাবড় বিজ্ঞানীরা এখনও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু উত্তর মিলছে না।

     —তাই নাকি কাকা? কোথায় যেন পড়েছিলাম ভাইরাসের উৎপত্তি জীবিত কোষ সৃষ্টির অনেক আগেই হয়েছিল। উজানের বক্তব্য।

     —তা নিয়ে বেশ তর্ক আছে। আচ্ছা, তুই আমার যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ইন্টারভিউটা দেখেছিলি? যেটা মাসখানেক আগে ব্রডকাস্ট হয়েছিল?

     —হ্যাঁ, দেখেছি, যেখানে তুমি কোষের আদিপুরুষ ‘লুকা’ এর কনসেপ্ট দিয়েছ।

     —ঠিক তাই, তোর মনে আছে দেখছি। সেখানে ভাইরাসের বিবর্তন সম্পর্কে একটা ছোট্ট হিন্ট দিয়েছিলাম। সেখানে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে লুকা থেকে সমস্ত আদিকোষের উৎপত্তি মানে, আর্কিয়া, ব্যাকটেরিয়া আর এককোষীয় আদ্যপ্রাণীর সৃষ্টি। কিন্তু ভাইরাসের তো কোষীয় কোনও অস্তিত্ব নেই। কোষের ভিতরে সে সজীব আর বাইরে জড় বস্তু। মানে ভাইরাস নিশ্চিতরূপে একটি পরজীবী।

     —আচ্ছা কাকা, ভাইরাস সজীব কোষকেই কেন খালি আক্রমণ করে?

     —ভালো প্রশ্ন, আসলে ভাইরাস নিজে কোনও এনার্জি তৈরি করতে পারে না, আর এনার্জি ছাড়া শারীরবৃত্তীয় কাজগুলো হবে কী করে? তাই ভাইরাসের বেঁচে থাকার জন্যে আর সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্যে একটা সজীব কোষ লাগে, বুঝলি?

     —কিন্তু কাকা, ভাইরাসের উৎপত্তি কোষ সৃষ্টির আগে না পরে, তা কীভাবে প্রমাণ হবে? কোটি কোটি বছর আগে ভাইরাস কেমন ছিল বা কোষের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সেটা জানার জন্যে তো ফসিল রেকর্ড চাই। উজানের গলায় আগ্রহের শুরু খেলে গেল।

     —ওরে উজান, খুব প্রাচীন কোষের ফসিল পেলেও ভাইরাসের ফসিল তৈরি হয় না। কেবল প্রোটিন খোলক আর সূক্ষ্ম নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে ফসিল তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।

     —তাহলে উপায়?

     —উপায় আছে রে। প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের ডিএনএ আর আরএনএ সিকোয়েন্স বার করে প্রাচীন কোষের জিনোম সিকোয়েন্স এর সঙ্গে মেলাতে চাইলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ভাইরাসের মিউটেশনের হার এত দ্রুত যে বিবর্তনের নিরীখে এদের সিকোয়েন্স অজস্রবার পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এই সূত্র ধরে ভাইরাসের আদিপুরুষকে চেনা অসম্ভব। তাই বিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় পন্থার আশ্রয় নিলেন। তুই তো জানিস, জিনের মিউটেশন তাড়াতাড়ি হলেও প্রোটিনের বাহ্যিক আকৃতির পরিবর্তন সহজে হয় না। বংশানুক্রমে, প্রোটিনের আকার আকৃতি একই রকম থাকে। ভাইরাসের খোলক বা ক্যাপসিড প্রোটিনের আকৃতির তথ্য বিশেষ প্রোগ্রামে কম্পিউটারে ফিড করে বিজ্ঞানীরা বার করার চেষ্টা করলেন প্রাচীন ভাইরাসের আকৃতি ও উৎস।

     —আরিব্বাস! দারুণ তো, এরপর কী হল?

     —এরপরে অনেক গবেষণা চলল, তারপর ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে তিনটি থিয়োরি দিলেন। প্রথমটি হল ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট এন্টিটি’ বা ‘স্বাধীন সত্ত্বা’ হাইপোথেসিস। তোর মনে আছে আমি আণবিক বিবর্তন আলোচনায় ‘আরএনএ ওয়ার্ল্ড’ এর কথা বলেছিলাম? অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন ভাইরাস সেই রহস্যময় আরএনএ ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছে। এদের আগে নিজেদের প্রতিলিপিকরণের ক্ষমতা ছিল, কালের বিবর্তনের ভাইরাস সে ক্ষমতা হারিয়েছে। কিন্তু এই থিয়োরিতে গলদ আছে। প্রফেসর থামলেন।

     —কীরকম গলদ?

     —ব্যাপার হল, যদি ধরেই নিই ভাইরাসের স্বাধীন সত্ত্বা ছিল, তাহলে তারা লুকার শরীরে বা পরবর্তীকালে আর্কিয়া, ব্যাকটেরিয়া আর প্রোটিস্টার দেহে পরজীবী হয়ে থাকতে গেল কেন? ভাইরাস আর আদিকোষের উৎপত্তি একসঙ্গে এবং স্বাধীনভাবে হলে কেনই বা আদিকোষ উন্নত থেকে আরও উন্নততর ও জটিল গঠনের অধিকারী হয়ে উঠল আর ভাইরাস গঠনগতভাবে আরও সরল হতে আরম্ভ করল? এর কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। এরপরে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এল ‘রিগ্রেসিভ ইভোল্যুশন থিয়োরি’।

     —ইভোল্যুশন উলটো দিকে হাঁটে নাকি? উজানের আগ্রহী প্রশ্ন।

     —ভাইরাসের ক্ষেত্রে তাই মনে হয় অনেকের। থিয়োরিটা বেশ মজার বুঝলি? বিজ্ঞানীরা বলেছেন ভাইরাস একটি সম্পূর্ণ পরজীবী কোষ হিসাবে লুকা বা আরও উন্নত কোনও কোষের ভিতরে থাকতে শুরু করল, এর ফলে তার নিজের কোষপর্দা, কোষীয় অঙ্গাণু কিছুরই আর প্রয়োজন হল না। খাদ্য ও এনার্জি সে পোষক কোষ থেকেই পেতে শুরু করল, দীর্ঘদিন পরে সে পোষক কোষ থেকে ভাইরাস পার্টিকল হিসাবে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু জানিস, এতেও গোলমাল আছে…

     —ওরে বাবা এতেও?

     —হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরা রিগ্রেসিভ ইভোল্যুশন থিয়োরির বেশ গুছিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন হল, ভাইরাস যদি একসময় পরজীবী কোষ হিসাবে থেকে থাকে, তার নির্দিষ্ট জীবনচক্র থাকা উচিত। সেটা কোথায় গেল? আর ভাইরাস যদি কোনও লুকাকে প্রথম আক্রমণ করে তার দেহে পরজীবী হয়ে থাকতে শুরু করে তবে সেই প্রাচীন লুকার কোনও সন্ধান নেই কেন? সেই লুকা কোষের একটা বংশধারা থাকা উচিত।

     —তাই তো, এটা ভেবে দেখার মতো। উজানের মন্তব্য।

     —তবে, সম্প্রতি বলা হচ্ছে আসলে কোষ বিবর্তনের শুরুতে দুই ধরনের লুকা তৈরি হয়েছিল, একটি ক্রমাগত উন্নত ও জটিল কোষের বংশধারা স্থাপন করে, যা থেকে আর্কিয়া, ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটিস্টা তৈরি হয়। আর একটি লুকা ক্রমশ সরল হতে হতে পরজীবী হিসাবে প্রথম লুকায় আশ্রয় নেয়। পরবর্তীকালে এরাই ভাইরাস বলে পরিচিত হয়।

     —আচ্ছা, আর কোনও থিয়োরি আছে নাকি?

     —আছে বৈকি। রিগ্রেসিভ ইভোল্যুশন থিয়োরির পর বিজ্ঞানীরা অনেক ভেবে বার করলেন তৃতীয় এবং এখনও পর্যন্ত জানা সর্বশেষ হাইপোথেসিস যার নাম ‘এসকেপ থিয়োরি’।

     —বাঃ, নামটা শুনে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।

     —তা তো বটেই, আর সবদিক বিচার করলে এটাই আপাতত ঠিক মনে হয়। তবে সেটা বলার আগে একটা প্রশ্ন করি, তুই জাম্পিং জিনের নাম শুনেছিস?

     —হ্যাঁ শুনেছি, বারবারা ম্যাক্লিনটক আবিষ্কার করেন জাম্পিং জিন, একে মোবাইল জেনেটিক এলিমেন্ট বলে না?

     —ঠিক বলেছিস। বিজ্ঞানী বারবারা ম্যাক্লিনটক এই আবিষ্কারের জন্যে ১৯৮৩ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। জীবের ক্রোমোজোমের কিছু জায়গায় এই রহস্যময় জিন থাকে, যারা লাফিয়ে এক ক্রোমোজোম থেকে অন্য ক্রোমোজোমে চলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের অনুমান জীবের জিনোমের অন্তর্গত কোনও কোনও জাম্পিং জিন স্বতন্ত্রভাবে একটি কোষ থেকে ভাইরাস হিসাবে বার হয়ে যায় এবং অন্য একটি কোষে ঢুকে পরজীবী হিসাবে থাকতে শুরু করে।

     —আচ্ছা কাকা, এই সব ভাইরাসকে শনাক্ত করে ধ্বংস করে দেওয়া যায় না? তাহলে তো আমরা নিশ্চিন্ত হই।

     —যে সব ভাইরাস ক্ষতিকারক তাদেরকে শনাক্ত করে অ্যান্টিভাইরাল তৈরির গবেষণা চলেছে, দেখা যাক।

     —উপকারী ভাইরাস আছে নাকি? সেরকম শুনিনি তো?

     হ্যাঁ রে, অনেক আছে, তবে সেই ইন্টারেস্টিং গল্পটা আর একদিন বলব।

(ক্রমশ)

    

 

তথ্যসূত্র:

1) Weiss MC, Sousa FL, Mrnjavac N, et al. The physiology and habitat of the last universal common ancestor. Nat Microbiol. 2016;1(9):16116. Published 2016 Jul 25. doi:10.1038/nmicrobiol.2016.116

2) Cantine MD, Fournier GP. Environmental Adaptation from the Origin of Life to the Last Universal Common Ancestor. Orig Life Evol Biosph. 2018;48(1):35-54. doi:10.1007/s11084-017-9542-5

3) Glansdorff N, Xu Y, Labedan B. Biol Direct. 2008 Jul 9; 3:29. Epub 2008 Jul 9.

4) Forterre P. Virus Res. 2006 Apr; 117(1):5-16. Epub 2006 Feb 14.

5) Koonin EV, Dolja VV Microbiol Mol Biol Rev. 2014 Jun; 78(2):278-303

6) Durzyńska J, Goździcka-Józefiak A. Virol J. 2015 Oct 16; 12:169. Epub 2015 Oct 16.

7) Nasir A, Sun FJ, Kim KM, Caetano-Anollés G. Ann N Y Acad Sci. 2015 Apr; 1341:61-74. Epub 2015 Mar 10.

8) Weiss MC, Preiner M, Xavier JC, Zimorski V, Martin WF. PLoS Genet. 2018 Aug; 14(8): e1007518. Epub 2018 Aug 16.

 

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!