স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ

চরিত্রলিপি

অনিকেত বর্মণ

দিব্যেন্দু মুখার্জী

মীরা মুখার্জী

বিশ্বরূপ

পারমিতা

সৌম্যশেখর গাঙ্গুলি

চিত্রা

 

গল্প ১

গিন্নি, কর্তা, প্রতাপচন্দ্র

গল্প ২

দিব্যেন্দু, রনি, শিখা, ছোটমামা, মামি

গল্প ৩

বিশ্বরূপ, পারমিতা, ভুটানি বৃদ্ধা

গল্প ৪

অমূল্য, পরমা, শশাঙ্ক, কৃষ্ণেন্দু, সিস্টার

(মঞ্চ অন্ধকার। ফোন বেজে ওঠে।)

—হ্যালো… নমস্কার। মিস্টার অনিকেত বর্মণ? আমি দিব্যেন্দু মুখার্জী বলছি… হ্যাঁ, হ্যাঁ, ইনটেরিয়ার ডেকরেশন… সন্ধে ছ-টার দিকে… ওকে, ভেরি গুড। থ্যাংক ইউ… এই জায়গাটা হচ্ছে নিউ বিষ্ণুনগর। চেনেন?… আপনি বাইপাস ধরে এসে, অজয়গড়ের মোড়টা তো চেনেন। সেখান থেকে লেফট নিয়ে দু-কিলোমিটার মতো।…

(আলো জ্বলে উঠে। স্টেজের বাঁদিকে ধনী গৃহস্থের বসবার ঘর। সোফা, চেয়ার, সেন্টার টেবিল। আসবাবে রুচি ও বিত্তের সহাবস্থান সুস্পষ্ট। কিছু জিনিস-ভরতি প্যাকিং বাক্স পিছনে দেখা যায়। কলিং বেল বাজে। বছর চল্লিশের গৃহকর্তা (দিব্যেন্দু) ভেতর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতে যান। গিন্নির (মীরা) প্রবেশ।)

মীরা: অনিকেতবাবু এলেন বোধহয়।

দিব্যেন্দু: হ্যাঁ, ছটা তো বাজল। দেখি।

(আগন্তুক (অনিকেত) ঘরে প্রবেশ করেন। মাঝবয়সি ভদ্রলোক, বেশভূষা ফ্যাশনদুরস্ত না হলেও পরিপাটি। অনিকেত ঘরের চারিদিক দেখতে থাকেন। বেজায় বিস্মিত। হাতের ছাতাটা গুটিয়ে নেন।)

দিব্যেন্দু: নমস্কার অনিকেতবাবু। আমিই দিব্যেন্দু মুখার্জী। আমার মিসেস, মীরা। আসুন আসুন। বাড়ি খুঁজে নিতে অসুবিধে হয়নি তো।

মীরা: আপনি ভিজে গেছেন বোধহয়। এমন অসময়ে বৃষ্টিটা শুরু হল।

অনিকেত: না, না, একদমই ভিজিনি।

দিব্যেন্দু: দিন, ছাতাটা আমায় দিন, বারান্দায় রেখে আসি।

অনিকেত: বাঁদিকের গেস্ট রুমের লাগোয়া বারান্দায়?

দিব্যেন্দু: আরিব্বাস, আপনি জানলেন কী করে? আপনি কি ইনটেরিয়ার ডেকরেশনের সঙ্গে সঙ্গে থট রিডিংও করেন নাকি?

(দিব্যেন্দুর ছাতা নিয়ে প্রস্থান। একটু পরেই প্রবেশ। অনিকেত ঘরের চারিদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।)

মীরা: আপনি বললেন না তো বারান্দাটা কী করে বুঝলেন?

দিব্যেন্দু: আরে বাবা এটা বুঝলে না, উনি এই প্যাটার্নের কত থ্রি-বি.এইচ.কে দেখেছেন। প্ল্যান তো হরেদরে সেই এক। কী মশাই, ঠিক বলিনি?

অনিকেত: আসলে, ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আমার আপনাদের বাড়িতে ঢুকে থেকেই, কিছু মনে করবেন না, একটু অস্বস্তি হচ্ছে।

মীরা: শরীরটা ভালো লাগছে না, ওষুধ খাবেন?

অনিকেত: না সেরকম কিছু না, আমার খালি মনে হচ্ছে যে আমি এই বাড়িতে আগে এসেছি।

মীরা: হ্যাঁ, এ কী বলছেন? আমরাই এখানে শিফট করলাম দিন তিনেক হল। আপনি এর মাঝে এলেন কবে?

দিব্যেন্দু: উনি হয়তো এইরকম দেখতে অন্য ফ্ল্যাটে গেছেন আগে। একই বিল্ডারের ডিজাইন হবে।

অনিকেত: না, আমার মনে হচ্ছে, আমি এই বাড়িতেই আগে এসেছি। শুধু তা-ই নয়, আমি আপনাদেরও আগে দেখেছি, কথাও বলেছি।

মীরা: আপনি তো বেজায় রসিক। আমরা গতকাল আপনার নামটা জানলাম, আর আপনি আজকে বলছেন আপনি আমাদের আগে থেকে চেনেন।

অনিকেত: সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

(ডোরবেল বাজে।)

দিব্যেন্দু: বিশ্বরা এল বোধহয়।

মীরা: ওর বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর আসার কথা, এই বাড়ি দেখতেই। কেউই তো এখানে আগে আসেনি।

(বিশ্বরূপ এবং তার স্ত্রী পারমিতা প্রবেশ করে। বিশ্বরূপ দিব্যেন্দুর সমবয়সি, তবে চোখেমুখে স্ট্রাগলের ছাপ পরিষ্কার বোঝা যায়। পারমিতা বয়সে বেশ কিছুটা ছোট, সবে তিরিশে পা দিয়েছে। তার পরনে দামি শাড়ি, গায়ে গয়না। দুজনেই বেশ সেজেগুজে এসেছে।)

দিব্যেন্দু: আলাপ করিয়ে দিই। আমার বাল্যবন্ধু ‘দিনলিপি’র সাংবাদিক বিশ্বরূপ এবং তার স্ত্রী পারমিতা। আর ইনি হচ্ছেন ইনটেরিয়ার ডেকরেটর অনিকেত বর্মণ।

(নমস্কার, প্রতি নমস্কার।)

মীরা: তুমি তো আসল ব্যাপারটাই বললে না। অনিকেতবাবুর মনে হচ্ছে উনি আমাদের বাড়িতে আগে এসেছেন, আমাদের চেনেন পর্যন্ত।

পারমিতা: অদ্ভুত, আপনার নিশ্চয়ই কোনও ভুল হচ্ছে।

বিশ্ব: আচ্ছা, আপনি আমাদেরও চেনেন?

অনিকেত: আপনারা ভাবছেন আমি রসিকতা করছি। কিন্তু সত্যি বলছি, আমার মনে হচ্ছে আমি আপনাদের সকলকেই চিনি, এবং এইখানে এই বাড়িতেই আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলেছি।

বিশ্ব: দাঁড়ান, ব্যাপারটা একটু হজম করার চেষ্টা করি। আপনি আমাকে, এই দু-মিনিট আগে যাকে জীবনে প্রথমবার দেখলেন, তাকে আগে থেকে চেনেন, কথা বলেছেন?

অনিকেত: ঠিক তা-ই।

পারমিতা: সেটা কী করে হয়, আমরা তো আপনাকে চিনিই না।

অনিকেত: সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না।

পারমিতা: কী মুশকিল, আপনি আমাদের চেনেন অথচ কীভাবে চেনেন সেটা জানেন না।

বিশ্ব: আচ্ছা, আপনি কি বলতে চাইছেন, এই যে বসে গল্প করছি, মানে এখন যে ঘটনাটা ঘটছে, সেরকম একটা ঘটনা আগেও ঘটেছে, কিন্তু সেটা আমাদের কারুর মনে নেই, শুধু আপনার আছে?

অনিকেত: পুরোপুরি মনে নেই, মাঝে মাঝে এক একটা দৃশ্য, এক একটা কথা শুনে মনে হচ্ছে, সেই কথা সেই দৃশ্য আমি আগে দেখেছি, আগে শুনেছি, ঠিক স্বপ্নের মতো।

মীরা: আচ্ছা যদি এরকম হয় যে, ঘটনাটা আজকে এখন প্রথমবারই ঘটছে, কিন্তু উনি সেটাই কোনও অলৌকিকভাবে জেনে ফেলেছেন?

দিব্যেন্দু: মানে উনি ভবিষ্যদ্‌দ্রষ্টা?

মীরা: কিম্বা টাইম ট্র্যাভেলার।

পারমিতা: গ্রহান্তরের মানুষ, ই.টি.?

বিশ্ব: অথবা স্রেফ একজন মিথ্যেবাদী জোচ্চোর।

দিব্যেন্দু: বিশ্ব, বাড়াবাড়ি করিস না। আমরা ওঁকে খুঁজেপেতে ফোন করে ইনভাইট করে এনেছি।

বিশ্ব: ইন্টারনেট থেকে তো, আজকাল ওয়েব-এ কতরকমের জালিয়াতি চলে তুই জানিস? এসব কেস আমি অনেক দেখেছি। অনিকেতবাবু, শুধু মুখে বললেই হবে না, আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে।

পারমিতা: প্রমাণ?

বিশ্ব: যাতে বোঝা যায়, উনি সত্যি কথা বলছেন। ভাবো, যদি উনি সত্যি বলেন তাহলে সেটা কত বড় একটা ব্যাপার।

দিব্যেন্দু: তুই না প্রচণ্ড সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস। এরকম তো হতেই পারে।

বিশ্ব: এরকম হতেই পারে, তোর এরকম হয়েছে কখনও?

(অনিকেত এতক্ষণ নির্বিকল্পভাবে বিশ্বরূপের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ বলে উঠে।)

অনিকেত: আপনার কি কিছু হারিয়ে গেছে?

বিশ্ব: আমার কী হারিয়ে গেছে?

অনিকেত: আপনার কিছু একটা হারিয়ে গেছে।

বিশ্ব: কী মশকরা করছেন আপনি? (রেগে উঠে দাঁড়ায়।)

মীরা: বিশ্ব, দ্যাখো তো পার্স, ঘরের চাবিটাবি ঠিকঠাক আছে কি না?

(বিশ্ব প্যান্টের পকেটে হাতড়ায়, জামার পকেটে, তারপর আবার প্যান্টের পকেটে।)

পারমিতা: চাবিটা তো তুমিই রাখলে।

বিশ্ব: দ্যাখো, তোমার ব্যাগটা।

(পারমিতা নিজের ব্যাগ খোঁজে, বিশ্ব যেখানে বসে ছিল তার আশপাশে খোঁজে, বাকিরা অদ্ভুত বিস্ময়ে দেখতে থাকে।)

দিব্যেন্দু: ট্যাক্সিতে ফেলে আসিসনি তো?

বিশ্ব: তাহলে কি ড্রাইভারকে টাকাটা দেবার সময় পড়ে গেল? ফোন করো তো ড্রাইভারকে।

(বিশ্ব ফোন নিয়ে উঠে যায়।)

বিশ্ব: হ্যালো, আমাদের এক্ষুনি ড্রপ করলেন আপনি, হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখুন তো একটা চাবির গোছা পড়ে আছে কি না, সিঙ্গাপুর লেখা কি-রিং আছে, ইয়ে তামাটে রঙের, সিঙ্গাপুর… পেয়েছেন? প্লিজ পৌঁছে দেবেন? আপনার যা এক্সট্রা তেল লাগবে… আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, আসছি, থ্যাংকস।

বিশ্ব: এই কাছেই ছিল, ভাগ্যিস, ফিরে আসছে, আমি নীচে নামছি। (প্রস্থান)

পারমিতা: এইটা কিন্তু আপনি দারুণ মিলিয়ে দিয়েছেন।

অনিকেত: আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছে, আমার বোধহয় চলে যাওয়াই উচিত।

দিব্যেন্দু: এই হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মিলে যাওয়া নিয়ে এত চিন্তিত হবেন না, বিশ্ব যা ছটফটে ছেলে, প্রায়ই এটা-ওটা হারায়।

মীরা: আর আপনার সঙ্গে তো কাজের কোনও কথাই হল না।

অনিকেত: আপনি বরং এই বাড়ির ডেকরেশন এর কাজটা অন্য কাউকে দিয়ে করান।

মীরা: এত খুঁজে আপনাকে পেলাম। আপনি প্লিজ যাবেন না, আমাদের খুব খারাপ লাগবে তাহলে।

পারমিতা: ও মাঝে মাঝে এমন উটকো কথা বলে না, আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আর আপনি আমাদের এত বড় উপকার করলেন।

(বিশ্ব ফিরে আসে। অনিকেতের সঙ্গে হাত মেলায়।)

বিশ্ব: থ্যাংক ইউ দাদা, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আপনি জাদুকর না অন্তর্যামী জানি না, কিন্তু চাবিটা হারিয়ে গেলে খুবই অসুবিধে হত। (পারমিতার প্রতি) বুঝতে পারছ, কী অভূতপূর্ব সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছি? অনিকেতবাবু, আপনার যদি আরও কিছু মনে হয়, বলুন।

দিব্যেন্দু: তোদের সম্পাদকীয় ভাষা ঝেড়ে ভদ্রলোককে আরও ঘাবড়ে দিস না।

অনিকেত: আমার মনের অবস্থাটা যদি আপনাদের বোঝাতে পারতাম, আমি তো নিজেই কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।

বিশ্ব: গভীর মনস্ত্বাত্বিক সমস্যা, বুঝলি।

পারমিতা: আচ্ছা মীরাদি, তোমাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের আসার কথা ছিল, বলেছিলে না? উনি তো এইসব সাইকোলজিটজি পড়ান বলেছিলে।

দিব্যেন্দু: তুমি সৌম্যকাকুর কথা এদের বলেছ? উনি আমার বাবার বাল্যবন্ধু। জে.এন.ইউ-এর প্রফেসর। আজ সকালেই কলকাতায় এসেছেন একটা টক দিতে।

মীরা: সাইকোলজিই তো ওঁর গবেষণার বিষয়।

অনিকেত: প্রোফেসর সৌম্যশেখর গাঙ্গুলি?

দিব্যেন্দু: আপনি তাঁকেও চেনেন?

বিশ্ব: এটাও কিন্তু একটা মারাত্মক কাকতালীয় ব্যাপার। কী বলিস?

(সৌম্যশেখরের (কাকু) প্রবেশ। ষাটোর্ধ, বনেদি। পরনে সিল্কের পায়জামা-পাঞ্জাবি, চোখে চশমা। হাতে একটা ভারী বই নিয়ে প্রবেশ করেন। সেটাকে সেন্টার টেবিলের উপর রেখে কথা শুরু করেন)

কাকু: আমায় নিয়ে কথা হচ্ছে শুনলাম।

দিব্যেন্দু: কাকু, এরা আমার বন্ধু বিশ্বরূপ এবং পারমিতা। আর ইনি হলেন আমাদের ইনটেরিয়ার ডেকরেটর অনিকেত বর্মণ।

মীরা: অনিকেতবাবুর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে, কাকু, আর সেটা কিন্তু পুরোপুরি আপনার এক্তিয়ারে।

(অনিকেত কাকুকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছিল, এখন একটু সরে যায়, তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ।)

কাকু: আমায় দেখে এমন ভয় পেয়ে উঠলেন কেন? কোনও সময়ে আপনাকে পড়িয়েছি বলে তো মনে পড়ছে না?

বিশ্ব: আপনি কি এনাকেও আগে দেখেছেন?

অনিকেত: দেখেছি। (ইতস্ততভাবে)

কাকু: ভেতর থেকে দু-চারটে ভাসাভাসা কথা শুনতে পাচ্ছিলাম, ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলো দেখি।

দিব্যেন্দু: কাকু, ওঁর এ বাড়িতে এসে থেকে মনে হচ্ছে উনি এখানে আগে এসেছেন, আমাদের সকলের সঙ্গে কথাও বলেছেন।

কাকু: যেটা অতি অবশ্যই আগে ঘটেনি।

বিশ্ব: কিন্তু উনি প্রমাণ দিয়েছেন, আমার চাবি হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা ভবিষ্যদ্‌বাণী করে।

কাকু: হুম, Deja vu.

মীরা: কাকু, তুমি তো অনেকরকম কেস ঘেঁটেছ, এরকম আগে দেখেছ কখনও?

(কাকু উঠে অনিকেতের কাছে যায়, চোখের দিকে লক্ষ করে, মুখের কাছে গিয়ে গন্ধ শুঁকে ফিরে আসে।)

কাকু: না, আপনি অন্তত মদ বা গাঁজার প্রভাবে এরকম ভাবছেন সেটা নয়। প্রথমেই ওই সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াটা জরুরি। গঞ্জিকাসেবনের ফলে কত লোকের যে কত দুর্লভ অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

অনিকেত: যাক, আমি অন্তত সুস্থ মস্তিষ্কে কথাগুলো বলছি, এটা আপনাদের বিশ্বাস হল।

কাকু: কিছু মনে করবেন না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেমিক্যালি ইনডিউস্‌ড হ্যালুসিনেশন-টাই প্রধান ফ্যাক্টর। আচ্ছা আপনার কী মনে হচ্ছে খোলাখুলি বলুন, তাহলে বরং আমরা আপনাকে একটু সাহায্য করার চেষ্টা করতে পারি।

অনিকেত: আমার মনে হচ্ছে আপনাদের সঙ্গে, বিশেষত আপনার সঙ্গে আমার জীবন, আমার ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আপনাকে আমি দেখেছি, একবার নয় বহুবার, সম্ভবত আমার স্বপ্নে।

দিব্যেন্দু: আচ্ছা এরকম তো হতে পারে কাকু, যে উনি তোমার ছবি দেখেছেন কাগজে বা ইন্টারনেটে, ওঁর মনে হয়েছে উনি তোমাকে কনসাল্ট করবেন এইসব স্বপ্নের ব্যাপারে, কোনওভাবে ওঁর মনে ব্যাপারটা গেঁথে গেছে যে উনি তোমার সঙ্গে কথা বলেছেন?

কাকু: গেমস অব দ্য সাবকনশাস মাইন্ড, অসম্ভব কিছু নয়।

বিশ্ব: এক মিনিট, আমাদের সকলকে কীভাবে চিনলেন?

পারমিতা: কেন, প্রায়ই তো তোমার মুখ দেখা যায় টিভিতে।

মীরা: ওর ছবিও বেরিয়েছিল কয়েকমাস আগে, আমারও একবার বেরিয়েছিল কলেজে পড়তে।

অনিকেত: আমি কিন্তু সেইসব পুরোনো ছবির কথা বলছি না। আমি আপনাদের সকলকে দেখেছি, এই বাড়িতে, এইভাবে, এই চেহারায়। (বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়, উত্তেজিত) এবং সেখানে আমিও উপস্থিত। আমার মনে হয়, এই সন্ধেটা আমি আগেও কাটিয়েছি।

বিশ্ব: তাহলে তো আপনি বলতে পারবেন, এর পর কী কী ঘটবে?

অনিকেত: সেটাই তো স্পষ্ট দেখতে পারছি না। কোনটা যে বাস্তব আর কোনটা যে আমার স্বপ্ন। মাঝেমধ্যে এই বাস্তব আর আমার কল্পনার মধ্যে একটা অনুরণন হচ্ছে, যেমন হল প্রোফেসর যখন ঢুকলেন। মনে হচ্ছে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তার ওপারে আমার পুরো জীবন, পুরো ভবিষ্যৎ। একটা-আধটা শব্দ ওপার থেকে ভেসে আসছে, খুচরো কয়েকটা দৃশ্য। আর আমি শিউরে উঠছি। মনে হচ্ছে ওপারে কিছু একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে চলেছে আমার জীবনে। কিন্তু কী, সেটা আমি বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে, একটা অন্ধকার বিশ্রী সময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আর আমি অন্ধের মতো তার দিকে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে চলেছি। আমি থামতে চাই, জানতে চাই পরে কী হবে, পারছি না। আমার সামনের বন্ধ দরজাটা খুলতে চাই, ভেঙে ফেলতে চাই, পারছি না। (প্রোফেসরের দিকে ফিরে তাকায়, তার সামনে এসে বসে) আপনি আমায় বাঁচান, আপনিই পারবেন আমার মনের অন্ধকার দূর করে দিতে।

কাকু: আমি আপনাকে সাহায্য করার যথাসম্ভব প্রচেষ্টা করব। আপনি শান্ত হয়ে বসুন, মনকে সংযত করুন। আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব, আপনি খুব একটা অসুবিধে না হলে উত্তর দিন।

(অনিকেত মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে।)

কাকু: আপনার আগে এরকম কোনও অভিজ্ঞতা হয়েছে?

(অনিকেত মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝায়।)

কাকু: কিন্তু এই স্বপ্নটা আপনি বহুবার দেখেছেন?

অনিকেত: হ্যাঁ, হয়তো। ঠিক মনে পড়ছে না।

কাকু: আপনার শৈশব-কৈশোরের কোনও ঘটনা যা আপনার মনে চিরকালের মতো দাগ কেটে গেছে?

অনিকেত: না, সেরকম কিছু নেই, একেবারেই স্বাভাবিক ছোটবেলা, আলাদা করে বলার মতো কিছু নেই। বিশ্বাস করুন, আমার জীবনে বিস্ময়কর উল্লেখযোগ্য কোনওদিন কিছু ঘটেনি। আর আজকে হঠাৎ করে কী যে হচ্ছে আমি একদম কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

কাকু: আপনি একজন ইনটেরিয়ার ডেকরেটর, ধরে নিচ্ছি আপনার কল্পনাশক্তি প্রখর। আচ্ছা, আপনি যখন প্রথমবার কোনও মক্কেলের বাড়িতে যান, এই যেমন আজকে এখানে, নিশ্চয়ই হোমওয়ার্ক করে যান।

অনিকেত: কিছুটা তো বটেই। বাড়ির ডিজাইনটা দেখে মোটামুটি কয়েকটা অপশন ভেবে রাখি। এই দেখুন যেমন, আমাদের কোম্পানির একটা প্যামফ্লেট, কিছু ছক তৈরি করা আছে। (পকেট থেকে বার করে একটা কাগজ দেখায়। কাকু একটু দেখে সেটাকে নামিয়ে রেখে দেয়।)

মীরা: দেখি একটু। (প্যামফ্ল্যেটটা নিয়ে দেখতে থাকে, দিব্যেন্দুও পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কাকু ও অনিকেতের কথা চলতে থাকে।)

কাকু: আর বাকিটা?

অনিকেত: বাকিটা নির্ভর করছে ক্লায়েন্টের রুচি আর ট্যাঁকের জোরের উপর।

কাকু: মানে, খাঁচাটা আপনি বানিয়ে রাখলেন, আর খুঁটিনাটিগুলো যেখানে যেমন পেলেন তেমনি খাপে খাপে বসিয়ে দিলেন।

অনিকেত: অনেকটা সেরকমই বলতে পারেন।

কাকু: আপনি কি ছবি আঁকেন? কাজের সূত্রে নিশ্চয়ই আঁকতে হয়? (অনিকেত মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে) এরকম ছবি আপনি আগে কখনও এঁকেছেন বা দেখেছেন, এই ধরুন, ভদ্রসাইজের একটা লিভিংরুম, সোফা, সেন্টার টেবিল, চেয়ার?

অনিকেত: হ্যাঁ, এটা তো কমন সেটআপ।

কাকু: আর সেই রুমে ছ-জন বসে আছে, কথা বলছে। আর সেটাই আপনি স্বপ্নে দেখছেন। আর ঠিক আপনার ডিজাইনে এর মতো ডিটেইল হিসেবে শুধু আমাদের মুখগুলো বসিয়ে নিয়েছেন সেই ছ-জনের জায়গায়?

(বাকিরা মাথা নাড়ে, নিজেদের মধ্যে ইশারা করে যে কাকু ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে মীরা সেন্টার টেবিল থেকে বইটা তুলে তার মধ্যে প্যামফ্লেটটা ঢুকিয়ে বইয়ের তাকে রেখে দেয়।)

অনিকেত: ছ-জন, না ছ-জন তো নেই, মোট সাতজন। সাতজন বসে কথা বলছেন।

কাকু: সাতজন? সাতনম্বর জন কে?

অনিকেত: আরেকজনের আসার কথা। মহিলা, না কমবয়সি মেয়ে… বিদেশিনী।

দিব্যেন্দু: এইটা বোধহয় আপনার ভুল হল, এখানে তো কোনও বিদেশিনীর আসার কথা নেই। (মীরার প্রতি) তুমি কাউকে চেনো নাকি? ইনভাইট করেছ আজকে আসতে?

মীরা: না, আমি আবার কোন বিদেশিনীকে চিনব? আজ তো আর কারুর আসার কথা নেই।

অনিকেত: তাহলে বোধহয় ভুলই বলছি। ভুল বললেই ভালো। পুরো ব্যাপারটাই যেন মনের ভুল হয়।

পারমিতা: ব্যাস, তাহলে তো সমস্যা মিটেই গেল। আর চিন্তা করবেন না।

মীরা: আপনাদের কথায় পুরোনো একটা গল্প মনে পড়ে গেল। কাকু, তুমি কিন্তু মন দিয়ে শোনো। কারণ গল্পের শেষে তোমার জন্য একটা প্রশ্ন থাকবে।

কাকু: বেশ তো।

মীরা: আমি তখন হোস্টেলে থাকি, আমাদের হোস্টেলের চেহারাটা ছিল ইংরেজি এল-এর মতো। তার একটা হাতে আমার রুম, আর তার থেকে সবচেয়ে কাছের টয়লেটটা ছিল এল-এর অন্য হাতে। আমার রুম থেকে বেরিয়ে কিছুটা গিয়ে ডানদিকে বেঁকে। একদিন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে গেছি। তখনও ঘুমের ঘোর খুব একটা কাটেনি। বেরিয়ে এসে সোজা হেঁটে রুমে ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। এ কী, আমার রুম ভেতর থেকে বন্ধ কেন? আমি বেরোনোর পরে আমার রুমমেটরা দরজা লাগিয়ে দিয়েছে? ওরা তো জানে আমি বাইরে। আমি দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম, অনেকক্ষণ ধরে ধাক্কা মারছি, তাও খুলছে না কেন? আরও কিছুক্ষণ নক করার পর দরজা খুলে গেল, একটা মুখ গভীর ঘুম থেকে উঠে প্রচণ্ড বিরক্তমুখে জিজ্ঞেস করলো ‘কে?’ আর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুমটা গেল কেটে। বুঝলাম আমি অন্য একটা রুমকে নিজের ঘর ভেবে নক করছি। সেটা আবার ফাইনাল ইয়ারদের রুম। আমার ঘরে যাওয়ার যে লেফট টার্নটা— সেটা ঘুমের চোটে নিতে ভুলে গেছি। অনেকবার সরিটরি বলে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। (একটু থামে, বাকিরা বুঝতে পারছে না শেষ হল কি না।)

বিশ্ব: তারপর?

মীরা: পরের বছর যখন নতুন করে রুম অ্যালটমেন্ট হল, দেখলাম এই রুমটাই পড়েছে আমার।

বিশ্ব: বাহ, দারুণ। পুরো সত্যি, না কিছুটা বানিয়ে বললে?

মীরা: নির্জলা সত্যি। এবার আমার কাকুর কাছে প্রশ্ন হচ্ছে এর অর্থ কী?

কাকু: তোমাদের বাড়িতে এলে যদি এমন ইন্টারেস্টিং সব গল্প শোনা যায়, তাহলে ভাবছি এখানেই থেকে রিসার্চটা চালিয়ে যাই। (হেসে নিয়ে) যা-ই হোক, গল্পের অর্থের প্রসঙ্গে আসি। আমার অনুমান, গল্পটা মিথ্যে না হলেও তুমি কিছুটা সত্য গোপন করে গেছ। কী, ঠিক বলছি?

মীরা: তুমিই বলো।

কাকু: তুমি তো খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলে শুনেছি। তাই ধরে নেওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, তুমি তোমার হোস্টেল এর ওয়ার্ডেন-এর নেকনজরে ছিলে। ঠিক?

মীরা: ঠিক।

কাকু: আর তাই পরের বছর রুম অ্যালোটমেন্টের সময় যদি কোনও রুম তুমি চেয়ে থাকো, সেটা না পাওয়ার কোন কারণ নেই। যেহেতু যে ঘরটায় তুমি ভুল করে নক করেছিলে সেটা ছিল ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রীদের, তুমি নিজেই বলেছ, সেটা পরের বছর খালি হয়ে যায়। আর সেই সিনিয়রদের রুমটা কাছাকাছি হওয়ায় শিফট করা খুবই সুবিধেজনক ছিল। সেই কারণটা আর এই ভুল করে টোকা মারার ঘটনাটা মিলে তোমার মনে ধারণা হয়েছিল ওই রুমটাই তোমার ভবিষ্যতের ঠিকানা, আর তাই তুমি নিজেই সেটা পছন্দ করো। কী, কিছু ভুল বললাম?

মীরা: কিন্তু রুমটা তো আমি পছন্দ করিনি, ওটা তো লটারি করে ঠিক হয়েছিল।

দিব্যেন্দু: কিন্তু তাহলেও তো তার একটা প্রবাবিলিটি ছিল। সেটা কম হতে পারে, কিন্তু শূন্য তো নয়।

কাকু: আর তুমি যদি ওই রুমটা না পেতে তাহলে এই ঘুমঘোরে অন্যের রুমে নক করার গল্পটাও তৈরি হত না। এরকম হয়তো অনেকেই করে থাকে, তাদেরটা চায়ের আড্ডার মুখরোচক গল্প হয় না।

পারমিতা: এই তো বেশ জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।

বিশ্ব: দাঁড়াও দাঁড়াও, কিন্তু এটা তো বোঝা গেল না যে প্রথমত সেদিন রাত্রে কেন বউদি ওই রুমটায় গিয়ে নক করেছিল।

পারমিতা: সেটা তো হতেই পারে, ঘুমের ঘোরে, আর নতুন হোস্টেল, প্রথমবার বাড়ির বাইরে থাকছ, এরকম হতেই পারে।

(কলিংবেল বেজে উঠে। সবাই চমকিত। দিবু উঠে দরজা খোলে। মীরাও দেখতে যায়। ঘরে প্রবেশ করে এক কমবয়সি মেয়ে। তার হাতে বাক্স।)

চিত্রা: আন্টি, মা এটা পাঠিয়ে দিলেন। নিজেই আসতেন, কিন্তু মায়ের হাঁটুতে খুব ব্যথা।

দিব্যেন্দু: এসো, বসো।

চিত্রা: না, আঙ্কল আমি যাই।

মীরা: যাবি কী, একটু বোস।

(মেয়েটি ঘরের ভেতরে ঢোকে।)

মীরা: আমাদের নীচের ফ্ল্যাটের মেয়ে, চিত্রা।

বিশ্ব: উরেব্বাস, আবার আপনি মিলিয়ে দিয়েছেন, গুরু পায়ের ধুলো দিন। (অনিকেতের প্রতি।)

পারমিতা: না, পুরো মেলেনি, আদ্ধেক।

চিত্রা: কী হল? কী ব্যাপার আন্টি?

মীরা: সত্যি তো! বোস, বলছি। ইনি হলেন আমাদের ফ্ল্যাটের ইনটেরিয়ার ডেকরেটর অনিকেতবাবু, তিনি আগাম জানিয়েছিলেন যে এক বিদেশিনী কমবয়সি মেয়ে আমাদের বাড়িতে এরপরে আসতে চলেছে।

বিশ্ব: আমি সেটাই বলছিলাম আর কী, যে উনি ভবিষ্যদ্‌বাণীটা মিলিয়ে দিয়েছেন, তবে আদ্ধেক।

পারমিতা: ওই বিদেশিনী পার্টটা মেলেনি, তোমায় দেখে বা কথা শুনে তো বাঙালিই মনে হচ্ছে।

চিত্রা: অ্যামেজিং! ব্রিলিয়ান্ট! আমার জন্ম হয় ইউ.এস.-এ, মা-বাপি তখন স্টেটস-এ ছিলেন। আমি ইউ.এস পাসপোর্ট হোলডার।

পারমিতা: বাপরে!

মীরা: এটা কিন্তু আমরাও জানতাম না।

চিত্রা: আমি তো ভাবতেই পারছি না আপনি এটা জানলেন কী করে? আপনি কি মা বা বাপিকে চেনেন?

দিব্যেন্দু: ওরে বাবা, চেনার কথা বলিস না, উনি বলেছেন উনি আমাদের সক্কলকে আগে থেকে চিনতেন।

চিত্রা: আমি তো কিছুই বুঝছি না, আপনি আমার ব্যাপারে আর কী জানেন?

অনিকেত: আমি কিছুই জানি না, আমার হঠাৎ মনে হল এই বাড়িতে আজ সন্ধেয় তোমার আসার কথা।

চিত্রা: কিন্তু আমার তো আসার কথা ছিল না, মা নিজেই আসতেন, আন্টি, কী ব্যাপার হচ্ছে বলো তো?

মীরা: আরে আমরাও কি বুঝছি নাকি? তোর আসার আগে কী হল সেটা তোকে বলি।

(চিত্রা আর মীরা কথা বলে)

বিশ্ব: কাকু, এই ঘটনাটার আপনি কী ব্যাখ্যা দেবেন?

কাকু: আই মাস্ট অ্যাডমিট আই অ্যাম ইকুয়ালি স্টান্‌ড। তবে একটা ব্যাখ্যা আমার মাথায় আসছে, দেখি আরেকটু ভাবি। পরে না-হয় বলব।

অনিকেত: ব্যাপারটা যে মিলে গেল, সেটা আপনাদের কাছে যেমন অলৌকিক, আমার কাছেও কিন্তু কম আশ্চর্যজনক নয়।

চিত্রা: হাও এক্সাইটিং, আমি আর কোথাও যাচ্ছি না, বসে আপনাদের গল্প শুনব। মা-কে একটা মেসেজ করে জানিয়ে দিই। (ফোন বার করে টাইপ করতে থাকে।)

অনিকেত: কিন্তু তুমি তো শেষপর্যন্ত থাকতে পারবে না, তোমায় তো চলে যেতে হবে।

চিত্রা: না, আমার তো কোথাও যাওয়ার কথা নেই।

মীরা: ঠিক আছে, সে পরে দেখা যাবে, এখন তো বোস।

বিশ্ব: এইটা কিন্তু আরেকটা ভবিষ্যদ্‌বাণী হল, দেখা যাক মেলে কি না।

কাকু: ব্যাপারস্যাপার যা ঘটছে, তা অদ্ভুত সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে এর একটা লজিক্যাল এক্সপ্ল্যানেশন পাওয়া যাবে। আচ্ছা চিত্রা, তোমার কী মনে হয়? এই যা ঘটছে সেটাকে বিজ্ঞান কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?

চিত্রা: সেটাই ভাবার চেষ্টা করছি। হতে পারে, ইনি কোনও একটা প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে এখানে চলে এসেছেন কোনওভাবে, ওয়ার্মহোল অর সামথিং? ওঁর ইউনিভার্স হয়তো আমাদের থেকে একদিন এগিয়ে।

কাকু: ফার-ফেচ্‌ড, বাট হোয়াই নট? আমরা হয়তো ইনফাইনাইট নাম্বার অব প্যারালাল ইউনিভার্স থিয়োরির প্রথম প্রমাণের সামনে বসে আছি।

বিশ্ব: দাঁড়ান, দাঁড়ান, ব্যাপারগুলো নোট করে নিই, যদি এটা সত্যি হয় তাহলে তো এটা সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় খবর।

চিত্রা: বা এটা হতে পারে উনি একটা টাইম লুপে আটকা পড়ে গেছেন, ওই সিনেমাটার মতো, কী যেন নাম?

মীরা: গ্রাউন্ডহগ ডে?

চিত্রা: ইয়েস আন্টি।

দিব্যেন্দু: বাবা!

অনিকেত: আমার মনে হয় আপনারা বোধহয় আমার ব্যাপারে একটু বেশিই ভাবছেন। আমি আপনাদের মতোই এই পৃথিবীর রক্তমাংসের মানুষ।

দিব্যেন্দু: আচ্ছা এরকম তো হতে পারে যে এই সমস্যার একটা সহজ-সরল সমাধান আমাদের চোখের সামনে রয়েছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

বিশ্ব: এরকমও তো হতে পারে যে এর কোনও সমাধান নেই, এটা একটা সত্যিই অলৌকিক ঘটনা।

দিব্যেন্দু: মানে এর কোনও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নেই, এটা তুই মেনে নিয়েছিস।

বিশ্ব: কী দরকার সব ব্যাপারে জটিল বিশ্লেষণ করে একটা মাথা ঘামানো তত্ত্ব খাড়া করার।

দিব্যেন্দু: তুই অদ্ভুত বোকাবোকা কথা বলছিস, মান্ধাতার আমলে মানুষ এইভাবে ভাবত।

বিশ্ব: ঠিক আছে, তুই বল, কী বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা এর হতে পারে।

দিব্যেন্দু: আমি জানি না, কাকু সহজ করে বলতে পারবেন হয়তো। কত কিছুই তো হতে পারে। হয়তো উনি এখানে আসার আগে আমাদের বাড়ির প্ল্যানটা ইন্টারনেটে সার্চ করেছিলেন, হয়তো উনি এই তথ্যটা কোথাও দেখেছেন যে অনেক এন.আর.আই এখানে ফ্ল্যাট কিনেছেন, হয়তো তোকে দেখেই ওঁর মনে হয়েছে তুই ভুলোমনের, হয়তো…

বিশ্ব: হয়তো এটা পুরোটাই ঘটছে ওঁর মাথার ভেতরে, হয়তো আমাদের অস্তিত্বই নেই ওঁর কল্পনার জগতের বাইরে। আরে বাবা, সে তো অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু সেটা তো কথা নয়।

পারমিতা: আচ্ছা এটা কী করে হয় যে উনি কাকুর সঙ্গে আগে বহুবার কথা বলেছেন?

দিব্যেন্দু: উনি কল্পনা করেছেন যে কাকুর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করার বা কথা বলার একটাই উপায় যদি কোনও সামাজিক আড্ডায় তার সঙ্গে হঠাৎ আলাপ হয়। উইশফুল থিংকিং। কিন্তু বাই চান্স ওঁর সেই স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে।

বিশ্ব: আপনিই বলুন স্যার, পুরো ব্যাপারটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে?

কাকু: এর একটা ব্যাখ্যা অবশ্য আমার কাছে আছে। আগে দিবু যেটা বলছিল, উনি হয়তো আমাকে অনেকবার যোগাযোগ করার কথা ভেবেছেন ওঁর স্বপ্নের ব্যাপারে, কোনও কারণে করা হয়ে উঠেনি। কিন্তু কোনও কারণে ওঁর ধারণা হয়েছে সব কিছু আমায় আগেই বলে রেখেছেন। আসলে আমাদের স্মৃতিতে অনেক কিছু তথ্য, মুখ, শব্দ অসংলগ্নভাবে জমা থাকে। মানুষের চিন্তার একটা বৈশিষ্ট্য হল সব কিছুতে একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া, একটা কমন কানেকশন। তোদের কানেক্ট কুইজের মতো। যেমন আকাশের তারা দেখে কন্সটেলেশন বানিয়ে সেগুলোকে নিয়ে গল্প ফাঁদা, মেঘের মধ্যে জন্তু-জানোয়ার-মানুষের মুখ দেখতে পাওয়া— এইরকম। এই যে একগুচ্ছ ছবি মনে জমা থাকছে, আমাদের অজান্তেই সেগুলো নিয়ে ঝালে-ঝোলে-অম্বলে একটা কাহিনি তৈরি হয়ে যায়, একটা সমান্তরাল বাস্তব। সেরকম সেরকম জটিল কেসে দেখা গেছে পেশেন্ট আসলে পৃথিবী আর মনের মধ্যে বানানো বিকল্প দুনিয়ার ফারাক করতে পারছে না।

(ঘরের পরিস্থিতি একটু থমথমে। কেউই মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছে। অনিকেত বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।)

মীরা: অনিকেতবাবুকে নিয়ে তোমরা গিনিপিগের মতো কাঁটাছেড়া করছ। এটা ঠিক না। উনি আমাদের বাড়িতে এসে অস্বস্তিতে ভুগছেন, আর তোমরা নিজেদের মধ্যে আঁতেল-আঁতেল আলোচনা করে ওঁকে আরও বিব্রত করছ।

বিশ্ব: না, বউদি তুমি ঠিকই বলছ, আমরা বোধহয় বাড়াবাড়ি করে ফেলছি।

দিব্যেন্দু: হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। আপনি কিছু মনে করবেন না।

পারমিতা: আচ্ছা অনিকেতবাবু, আপনি বলুন আপনি নিজে কী বুঝছেন? আমরা বরং আপনার উপলব্ধিটাই শুনি।

অনিকেত: আমার আসলে ভালোই লাগছে যে আপনারা আমার মতো একজন অচেনা মানুষকে নিয়ে এতটা মাথা ঘামাচ্ছেন। দেখুন, আমিও কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না। আমার একটা সত্তা চাইছে যে এইসব অলৌকিক ঘটনা সত্যি হোক। সত্যিই যেন আমি স্বপ্নে আমার ভবিষ্যৎ নিখুঁতভাবে জেনে ফেলতে পারি। আবার আরেকটা সত্তা বলছে যে, ‘না, এটা হতে পারে না, এর একটা ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে আমার অবচেতন মস্তিষ্কে কোথাও।’ এই দুটো সত্তা নিজেদের মধ্যে অনবরত তর্ক করে চলেছে, শুধু আজকে এখন নয়। হয়তো বহুদিন ধরেই।

কাকু: কী ভাবছে আপনার তার্কিক সত্তা?

অনিকেত: কী ভাবছে জানেন, ভাবছে ঠিক আপনি যেভাবে ভাবছেন সেভাবে। আমি আপনার লেখা অনেক পড়েছি, মানুষের মনের জটিলতার কথা, উদ্ভট সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আর তাই দিয়েই তো তর্কটা চালিয়ে যাচ্ছি।

চিত্রা: বেশ চ্যালেঞ্জিং ডুয়েল, একদিকে দাঁড়িয়ে ইমোশনাল, সেন্টিমেন্টাল আপনি; সম্বল আপনার সুপারন্যাচারাল অভিজ্ঞতা, আর অন্যদিকে প্রোফেসরের মুখোশ পরে দ্য ইনটেলেকচুয়াল সেলফ। কে জিতছে এই তর্কে?

অনিকেত: সেটাও তো আরেক মুশকিল। তর্কটা তো শেষই হচ্ছে না। শুধু থেকে থেকে ইমোশনাল আমি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠছে। ভয় হয় কখনও না নিজের উপর লাগাম হারিয়ে সে যুক্তিবাদীর গলা টিপে ধরে।

কাকু: বুঝতে পারছি আপনি চূড়ান্ত স্থিতিহীন অবস্থায় আছেন। আমরা বরং এই বিষয়ে আলোচনা বন্ধ করি। তোমরা সব গল্প বলছিলে আগে, সেরকমই কিছু হোক না।

মীরা: অনিকেতবাবু, আজ না হয় কাজের ব্যাপারটা থাক। পরে আরেকদিন হবে।

অনিকেত: আমি তাহলে বরং উঠি।

দিব্যেন্দু: এখন কোথায় যাবেন, বাইরে যা ওয়েদার।

মীরা: একটু চা-টা অন্তত খেয়ে যান।

বিশ্ব: আড্ডাটা কিন্তু আপনার জন্যেই ভালো জমেছে।

মীরা: না করবেন না প্লিজ, একটু থাকুন। বৃষ্টি কমলে না-হয় বেরোবেন।

(অনিকেত মাথা নাড়ে।)

বিশ্ব: তাহলে গল্পই হোক, তবে সবাইকে বলতে হবে কিন্তু।

পারমিতা: বউদি একটা বললেন, এবার দাদার পালা।

দিব্যেন্দু: আমি আবার কী গল্প বলব, বরং অন্য কেউ বলুক। চিত্রা?

চিত্রা: আমি মীরা আন্টির গল্পটা নিয়ে ভাবছি।

মীরা: তুই আবার কী থিয়োরি দিবি?

চিত্রা: গল্পটা কিন্তু আজকের সন্ধের সঙ্গে তাল রেখে বানানো। মানে এখানেও তো বলছে যে দ্য ফিউচার ইস ফিক্সড। নো ম্যাটার হোয়াট ইউ ডু ইউ ক্যান’ট অ্যাভয়েড ইট। ঠিক যেমনভাবে অনিকেতবাবু প্রেডিক্ট করছেন, আর সেটা একটার পর একটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে।

মীরা: বাহ, ভালো ধরেছিস তো। দাঁড়া আমি চা-টা নিয়ে আসি। (দিব্যেন্দুর প্রতি) একবার আসবে ভেতরে। (প্রস্থান, দিব্যেন্দুর প্রস্থান।)

কাকু: তার মানে তুমি বিশ্বাস করছ, এটা সম্ভব যে ভবিষ্যতে যা ঘটবে সেটা লেখা আছে এবং কেবল একজন সেটা পড়ে ফেলতে পারছেন? আর আমরা চাইলেও সেটাকে খণ্ডাতে পারব না?

চিত্রা: আমি তো বলিনি যে এটা আমার বিশ্বাস। এটা একটা রিজনেবল থিয়োরি, যেটা দিয়ে আজকের সন্ধের অদ্ভুত ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করা যায়।

কাকু: তাহলে ফ্রি উইল ইজ জাস্ট আ মিথ.

চিত্রা: হয়তো। হয়তো কোনও হায়ার ডাইমেনসনাল ক্রিয়েচার আমাদের এই পৃথিবীর এক্সপেরিমেন্টাল সেট-আপ ডিজাইন করেছে। হয়তো কোনও মাস্টারকোড রান করছে। আর আমাদের অনিকেতবাবু সেই কোডটা হ্যাক করে ফেলেছেন? কে বলতে পারে?

কাকু: হতেই পারে। কিন্তু আমাদের হাতের পুতুল বানিয়ে তাদের লাভটা কী? এই সন্ধের খেলাটার মানে কী?

চিত্রা: হয়তো মানে নেই, হতে পারে ওই কোডে একটা কোনও গ্লিচ আছে, আমরা সেটায় ফেঁসেছি। যেমন আপনি একটু আগে যে মেমারির কথাটা বললেন, আমার প্রোগ্রামিং ক্লাসের কথা মনে পড়ে গেল। একটা ভ্যারিয়েবল-এর মেমারি ঠিক করে ডিফাইন বা ক্লিন না করলে পরে সেই কোড ম্যালফাংশন করতেই পারে, আজকে সন্ধের মতো।

(মীরা ও দিব্যেন্দু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের দুজনের হাতে থালা ভরতি খাবারদাবার।)

দিব্যেন্দু: তুই বলছিস আমরা ইনফাইনাইট হোয়াইল লুপ-এ চরকিপাক খাচ্ছি।

বিশ্ব (একটা সিঙ্গারা তুলে নিয়ে): বাঃ, বেশ জমেছে কিন্তু।

পারমিতা: তোমরা আবার কীসব গভীর আলোচনায় চলে গেলে।

বিশ্ব: আবার গল্পই হোক নাকি? এবার চিত্রার পালা।

চিত্রা: আমায় বলতে হবে? আচ্ছা দাঁড়াও। এমনি একটা সিনেমার গল্প মনে পড়ছে। তার সঙ্গে আজকের আলোচনার কোনও সম্পর্ক নেই। চলবে?

অনিকেত: সম্পর্ক না থাকলেই বোধহয় ভালো।

(চিত্রা উঠে আসে। সবাই পিছিয়ে জায়গা করে দেয়।)

চিত্রা: প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরের মধ্যে দরজাজানালা বন্ধ করে বসেও সে আওয়াজে কান পাতা দায়। একা এক ভদ্রমহিলা শাকসবজি কাটছেন। কান দরজার দিকে। তার স্বামী বাইরে গেছেন, তারই প্রতীক্ষায়। দরজায় বাইরে থেকে টোকার আওয়াজ। মহিলা গিয়ে দরজা খুলতেই গৃহকর্তা ঘরে প্রবেশ করলেন। হাতে ছাতা, সর্বাঙ্গ ভিজে। মহিলা দরজা বন্ধ করে ভেতরে আসেন।

(বলতে বলতে এক মধ্যবয়সি পুরুষ ও মহিলা কর্তা গিন্নির ভূমিকায় অভিনয় করতে শুরু করে। গল্পের অভিনয় হয় মঞ্চের ডানদিকে। ঘরের আসবাব হিসেবে উপস্থিত একটি সাদামাটা চাদরপাতা খাট, রংচটা মোড়া, প্লাস্টিকের চেয়ার। চেয়ারে শুকোচ্ছে গামছা।)

কর্তা: ওরে বাবারে বাবা, কী বৃষ্টি!

গিন্নি: তোমার এত দেরি হল কেন?

কর্তা: আরে বাবা, যা বৃষ্টি, রাস্তাঘাটের যা অবস্থা। বেঁচেবর্তে ঘরে এসে যে ঢুকতে পেরেছি সেটাই অনেক। ভাগ্য খুব ভালো ছিল বাবা। নইলে আজ কপালে কী ছিল ভগবানই জানেন।

গিন্নি: হয়েছেটা কী সেটা বলবে তো?

কর্তা: সেটাই তো বলছি। ওই যে আমাদের অজয়গড়ের চৌমাথাটা, সেখান থেকে বেঁকে খালপাড়ের রাস্তাটা নিয়েছি, রাস্তার আলোগুলো গেল নিভে। খুঁড়ে খুঁড়ে এমন করে রেখেছে ব্যাটারা, অন্ধকারে চালানো যায়? ব্যস, সাইকেল গিয়ে পড়ল একটা গর্তে। জলকাদায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না তো। পড়লাম কাদায়। কোনওরকমে উঠে দেখি সাইকেলের চেনটা গেছে।

গিন্নি: সবজিগুলোর কী হল?

কর্তা: আরে সেগুলো তো কখন বিক্রি হয়ে গেছে।

গিন্নি: কত হল আজকে?

কর্তা: পাঁচশো সাতষট্টি টাকা। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। তারপর কী হল শোনো। আমি তো সাইকেলটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ কোথাও নেই। বাড়ি ফিরব কী করে বুঝতে পারছি না। মনে বড় ভয় হল। ভগবানের নাম নিতে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি পিছনের দিক থেকে একটা গাড়ি আসছে। আমায় দেখে দাঁড়ালেন। একা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। অত্যন্ত সদয় মানুষ, বুঝলে। নিজে থেকেই বললেন আমায় বাড়ি পৌঁছে দেবেন। সাইকেলটা পেছনে বেঁধে চেপে চলে এলাম।

গিন্নি: হ্যাঁ, তো?

কর্তা: আরে আসল মজার ব্যাপারটাই তো তোমায় বলিনি। গাড়িতে বসে একথা-সেকথা বলতে বলতে জানলাম, তোমাদের গ্রামেরই লোক। তোমাদের পাশের বাড়ির বাপনের নিজের মামা— প্রতাপচন্দ্র চক্রবর্তী।

গিন্নি: কী বললে, বাপনের মামা? প্রতাপমামা?

কর্তা: তবে, কী ভাগ্যের ব্যাপার বলো। দারুণ লোক বুঝলে, যেমনি বড়লোক, তেমনি বিদ্বান। কথায় কথায় ইংরেজি, সংস্কৃত। বৃষ্টি সম্বন্ধে কালিদাস কোথায় কীসব লিখেটিখেছেন আউড়ে গেলেন আসতে আসতে। কী দয়ালু লোক ভাবো? এই ঘোর বর্ষায়…

গিন্নি: মরে গিয়ে দয়ালু হয়েছে তা হলে, বেঁচে থাকতে এমন হাড়কিপটে ছিল যে, আত্মীয়স্বজন কারও সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল না। যখন মারা গেল বাপনরা কেউ জানতেই পারেনি প্রথমে। মুখাগ্নি, শ্রাদ্ধশান্তি কিছু হয়েছে কি না কে জানে?

কর্তা: তুমি এসব কী আজেবাজে কথা বলছ, আমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা হল, আমায় বাড়ি পৌঁছে দিলেন।

গিন্নি: ব্রহ্মদত্যি, বুঝতে পারছ না? এই ঝড়জলে এত রাতে কোনও মানুষ রাস্তায় বেরোয়? তোমায় ব্রহ্মদত্যি ধরেছিল, বুঝতে পারছ? যাক বাবা, ভগবানের দয়ায় বেঁচে বাড়ি ফিরেছ।

(দরজায় শব্দ। ভীতসন্ত্রস্ত চোখে দুজনেই দরজার দিকে তাকায়।)

গিন্নি: কে?

কর্তা: আমি তো ওঁকে বাড়িতে আসতে বললাম, এই বৃষ্টিবাদলে এক কাপ চা খেয়ে যাওয়ার জন্য। এতটুকু তো বলতেই হয়। ভদ্রলোক যেচে পড়ে সাহায্য করলেন। (দরজা খুলতে যায়।)

গিন্নি: ভগবান, রক্ষা করো, দুর্গা দুর্গা।

(বৃদ্ধের (প্রতাপচন্দ্র) প্রবেশ।)

বৃদ্ধ: বাঃ বাঃ বিধুশেখর, বাড়িখানা তো দিব্যি বানিয়েছ। কী সুন্দর সাজানো-গোছানো। এই তো অনুপমা, আমাদের ছোট্টো অনু। কত বড় হয়ে গিয়েছে। আর কত গুণী হয়েছে দ্যাখো। (আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়, অনু পিছিয়ে আসে। বৃদ্ধ একটা চেয়ার দেখে বসে।)

গিন্নি: আপনি আমার স্বামীকে এই ঝড়জলে সাহায্য করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। (শীতল কণ্ঠে)

বৃদ্ধ: সে আর এমন কী ব্যাপার। একজন মানুষ তো আরেকজনের জন্য এটুকু করবেই। হ্যাঁ শোন, আর পাকামি মেরে চা-টা বানাস না। এই রাতবিরেতে আর কিছু খাব না।

গিন্নি: জানতাম খাবে না। জানতাম ইনি চা খাবেন না। ভূতপেত্নি কখনও চা খায় শুনেছ?

বৃদ্ধ: ‘ভূতপেত্নি’? এসবের মানে কী বিধুশেখর?

কর্তা: আসলে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। অনু একটা খবর শুনেছিল, যে বছর তিনেক আগে প্রতাপমামা মানে আপনি গত হয়েছেন। ওই বাপনই খবরটা দিয়েছিল। তাই ওর ধারণা আপনি ভূত মানে আর কী ব্রহ্মদত্যি। না, আমার তা একেবারেই মনে হয় না।

বৃদ্ধ: (অট্টহাস্য সহকারে) আমি গত হয়েছি, আমি ব্রহ্মদত্যি!

গিন্নি: বললাম না, মড়া পোড়াতে কেউ যায়নি। সৎকারের কী হয়েছিল ভগবান জানে।

বৃদ্ধ: কয়েকবছর আগে মরোমরো অবস্থাই হয়েছিল আমার। কিছু লোক তো রটিয়েই দিল আমি পটল তুলেছি। গুচ্ছের ওষুধবিসুধ খেয়ে একদিন সুস্থ হয়ে উঠলাম। বাপনরা কেউ দেখা করতে এল না দেখে, লোকজনের উপর বিরক্ত হয়ে বাড়িঘর বেচে দেশ-বিদেশ ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। এতদিন পরে দেশে ফিরে যে ব্রহ্মদত্যি হওয়ার অভিযোগ শুনতে হবে তা তো জানতাম না।

গিন্নি: বাঃ, গল্প বানানোই আছে। চুল-দাড়ির অবস্থা দ্যাখো, জামাকাপড়ের, নিশ্চয়ই শেয়াল-কুকুরে টানাটানি করেছিল মড়াটাকে নিয়ে।

বৃদ্ধ: এই জলহাওয়ায় চুল-দাড়ি তো এলোমেলো হবেই। তা বলে আমি ব্রহ্মদত্যি! (হেসে, উঠে দাঁড়াতে যায়)। এই দ্যাখ না, দিব্যি জলজ্যান্ত আমি।

গিন্নি: একদম সামনে আসবে না। সাবধান!

বৃদ্ধ: এই দ্যাখ, আসার আগে বাপনের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হয়েছিল, এই চিঠি…

(বৃদ্ধ হাত বাড়িয়ে চিঠি দিতে যায়, গিন্নি ‘খবর্দার’ বলে হাতের ছুরি বার করে আত্মরক্ষার্থে, ছুরি বৃদ্ধের হাতে লাগে, সে চিৎকার করে বসে পড়ে।)

গিন্নি: এ বাবা, এ যে রক্ত। মড়া মানুষের তো রক্ত পড়ে না। তবে কি, তুমি বেঁচে আছ?

বৃদ্ধ: বাঃ, কত গুণী হয়েছে অনু। তুমিই বলো বিধুশেখর, কার মাথায় ভূত চেপেছে, আমার না তোমার স্ত্রী-র?

গিন্নি: এই তো বাপনের চিঠি, ছি ছি আমি কী করলাম, আমার খুব ভুল হয়ে গেছে মামা।

কর্তা: আমি ভেতর থেকে লাল-ওষুধটা নিয়ে আসি।

গিন্নি: তাড়াতাড়ি আর একটা পরিষ্কার রুমাল নিয়ে এসো।

(বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ায়।)

বৃদ্ধ: থাক অনু, থাক। এখন আর যত্ন করতে হবে না। কী দিনকাল পড়ল, মানুষের সাহায্য করলে এরকম প্রতিদান পাওয়া যায়? বোধহয় আমার বিদেশ থেকে না ফিরলেই ভালো হত। ওখানেই ভালো ছিলাম। বোধহয় আমি চা খেলেই ভালো হত। না থাক বরং, আমার আর এখানে থাকা উচিত নয়, যেখানে মানুষের মতো ব্যবহার পাওয়া যায় না।

(বলতে বলতে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।)

গিন্নি: মামা, শোনো, মাফ করে দাও। এ আমি কী করলাম? ছি ছি।

(কর্তার প্রবেশ। তার হাতে লাল ওষুধ। বিস্মিত।)

কর্তা: মামা কোথায়? কী, চলে গেছে? তোমার না মাথায় একটুও বুদ্ধি নেই। বুড়ো লোকটাকে বৃষ্টির মধ্যে যেতে দিলে। তার উপর কেটে গেছে। (বলতে বলতে বেরিয়ে যায়।)

(গিন্নি একটু পরে টিভি চালায়।)

সংবাদদাতা: ‘জেলার খবর অজয়গড় চৌমাথার কাছে খালপাড়ের রাস্তায় পথ দুর্ঘটনায় জনৈক সবজিবিক্রেতা বিধুশেখর মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছে। ঘণ্টা তিনেক আগে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালাতে গিয়ে গর্তে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এবার আসি কৃষির খবরে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার চাষিভাইদের জন্য সুসংবাদ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষিমন্ত্রক থেকে ঘোষণা করা হয়েছে…’

(গিন্নি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যায়।)

(ডানদিকের আলো নিভে বাঁদিকের আলো জ্বললে মঞ্চের পুরোনো দৃশ্য, সোফা ঘিরে সাতজনকে দেখা যায়।)

পারমিতা (হাততালি দিয়ে): দারুণ দারুণ। একের পর এক অসাধারণ গল্প শুনতে পাচ্ছি কিন্তু।

বিশ্ব: ভূত ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইয়ে মানে থ্রিলিং। ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

পারমিতা: বুকে হাত দিয়ে শুলে লোকে ভূতের স্বপ্ন দেখে জানেন? আপনি কি ভূতের স্বপ্নও দেখেন?

অনিকেত: এই যা হচ্ছে সে কি কম ভুতুড়ে?

চিত্রা: আমি মাঝে মাঝে কী দেখি জানেন, আমি হাঁটছি, হঠাৎ সামনে একটা বিশাল দেওয়াল, আমি দেয়ালের গায়ে হাত দিতেই সেটা কাচের মতো শব্দ করে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল।

অনিকেত: কী বললেন, কাচ ভেঙে যায়? কাচ ভাঙার শব্দ? মনে পড়ছে, একটা কাচ ভাঙবে কোথাও আর সেটাই ট্রিগার, কারণ তার পরেই সবটা অন্ধকার হয়ে যায়।

চিত্রা: তার মানে তার পরে কী হবে আপনি আর জানেন না।

কাকু: কাচ ভাঙার পরে কী হবে মনে করার চেষ্টা করুন, অনিকেতবাবু।

অনিকেত: সেটাই তো সমস্যা, মনে হচ্ছে পুরোটা অন্ধকারে ঢাকা, কে কী কোথায়— কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

কাকু: ঠিক আছে আপনি ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, বেশি জোর দেওয়ার দরকার নেই। কিছু মনে হলে আমাদের বলবেন। যতই সামান্য কিছু হোক না কেন। মনে হচ্ছে ওই অন্ধকারেই এই রহস্যের সমাধান লুকিয়ে আছে।

মীরা: আহ, চিত্রা কী সুন্দর একটা গল্প বলল, আর তোমরা সবাই কীসব আলোচনা শুরু করে দিলে। এই বাড়িতে অনেক কাচের জিনিস আছে, সেগুলো যেন কেউ খবরদার না ভাঙে বলে দিলাম। (হেসে পরিবেশ লঘু করার চেষ্টা করে।)

বিশ্ব: আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গে না হোক, আজকের পরিবেশের জন্য কিন্তু চিত্রার গল্পটা একেবারে আদর্শ। এই বৃষ্টিবাদলার দিনেই তো ভূতের গল্প জমে ভালো। নিঝুম রাত, পায়েলের শব্দ, আলো দপদপ করা, পিঠে ঠান্ডা ছোঁওয়া…

পারমিতা: হ্যাঁ ভূতের গল্পই ভালো, এই পাগলের আলোচনা, সরি মানে আপনাকে মিন করিনি…

অনিকেত: না না, আমি বুঝেছি।

মীরা: এবার কার পালা? তুমিই বলো, তোমার তো স্টক অনেক। দেশি ভূত, বিলেতি ভূত, ভ্যাম্পায়ার ভূত…

দিব্যেন্দু: হুম, ভূতের গল্প লেখা চাট্টিখানি কথা নয়। লোককে ভয়ও পাওয়াতে হবে, আবার বিশ্বাসযোগ্যও করতে হবে। এমনিতেই ভূত বিষয়টা বিস্তর গোলমেলে।

বিশ্ব: গোলমেলে কেন? মানে, আছে কি না সেটা জানা যায় না, তাই বলছিস?

দিব্যেন্দু: না, গোলমেলে বলছি কারণ কিছু লোক আছে যারা বিশ্বাস করে, ভয়ও পায়।

চিত্রা: আমি বিশ্বাস করি না, ভয়ও পাই না, শুধু ভূতের গল্প পড়তে ভালোবাসি।

অনিকেত: আমি এর কোনও দলেই পড়ি না, আমার বিশ্বাস নেই বটে, তবে তেমন তেমন পরিস্থিতিতে বুক যে কেঁপে উঠে না, তা কিন্তু নয়।

কাকু: সেটা হচ্ছে আপনাকে ছোট্টবেলা থেকে যেভাবে বড় করা হয়েছে তার জন্য। আমাদের আজকের শিক্ষিত সমাজেও শিশুদের ভূতের গল্প শুনিয়ে, জুজুর ভয় দেখিয়ে মানুষ করা হয়। হ্যাঁ, একসময় সেটার একটা প্রয়োজন হয়তো ছিল। কিন্তু এখন এই ইন্টারনেটের যুগে এসেও…

দিব্যেন্দু: না কাকু, সবাই যে সংস্কারবশে বিশ্বাস করে, বা ভয় পায় সেটা তো নাও হতে পারে।

কাকু: নইলে একটা শিক্ষিত লোক ভূতে বিশ্বাস করবে কোন যুক্তিতে?

দিব্যেন্দু: ধরো, যদি লোকের ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে জীবনে?

বিশ্ব: সত্যি-মিথ্যে জানি না, কিন্তু বন্ধুবান্ধব অনেকের মুখেই টুকটাক গল্প শুনেছি।

কাকু: ওই অন্ধকার রাস্তায় মনে হচ্ছে কেউ পেছন থেকে টানছে, একা ঘরে বসে মনে হচ্ছে আরেকজন কেউ হাঁটছে— সেরকম তো? এইধরনের এক্সপেরিয়েন্স ইজ আ রেজাল্ট অব আ পারটিকুলার ডিসফাংশন, যেখানে আপনার মাথায় অজানতেই আগে পড়া বা শোনা কোনও গল্পের কথা মনে পড়ে যায়, আর আপনার অত্যন্ত শক্তিশালী মস্তিষ্কে সেটা কল্পনা করতে শুরু করে।

দিব্যেন্দু: আর যদি কেউ নিজের চোখে দেখে থাকে?

মীরা: তুমি আবার ভূতটুত দেখেছ নাকি?

দিব্যেন্দু: তুমি আমার ছোটমামা-মামিকে দেখেছ? না, দেখবে কী করে? আমাদের বিয়েতে তো উনি আসতে পারেননি। আর তার পরের বছরেই তো…

পারমিতা: আপনার ছোটমামা কি ভূত দেখেছিলেন? নিজের চোখে?

দিব্যেন্দু: তাহলে আগাগোড়াই বলি। (দিব্যেন্দু গল্প শুরু করে।)

দিব্যেন্দু: ছোটমামা, প্রয়াত সুকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। ওই যে আগে নানারকমের লোকের কথা বলছিলাম, মামা ছিলেন এক অদ্ভুত শ্রেণির। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস ছিল খাঁটি, কিন্তু ভয়ডরের কোনও বালাই নেই। আর ছিল অফুরন্ত গল্পের স্টক, বেশিরভাগই ভূতের। তখন চারিদিকে এত লোকজন, বাড়িঘর, এত আলো কিছুই ছিল না। সন্ধের পর বাইরের দালানে বসে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হত যে ছোটমামার গল্পগুলোকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণই থাকত না। তা অবশ্য শুধু আমার জন্যেই। কারণ আমাদের আসরের আরও দুই নিত্যসঙ্গী, আমার মাসতুতো ভাই রনি আর মামাতো বোন শিখার কোনও গল্পই সত্যি মনে হত না। বেশিরভাগ দিনই ছোটমামার সঙ্গে তাদের তুমুল কথা কাটাকাটি লেগে যেত। আর তাতেই আমাদের সন্ধেগুলো যেত দারুণ জমে। কিছুটা বড় হবার পর পড়াশুনার চাপে আর সব ছুটিতে যেতে পারতাম না। সেরকমই একবার কলকাতায় আছি, ছোটমামার জরুরি ফোন এল আমাদের তিনজনের কাছেই, আর সেটা পেয়েই আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।

(বাঁ-দিকের আলো নিভে, ডানদিকের আলো জ্বলে। দেখা যায় ট্রেনের কামরা। মুখোমুখি দুটো বেঞ্চে বসে আছে রনি, শিখা আর বাবুল। আলো জ্বলে উঠলে দেখা যায় রনি হাই তুলে আড়মোড়া কাটছে।)

রনি: আর কটা স্টেশন রে?

বাবুল: এর পরে শক্তিগড়, তার পরে গাংপুর, তার পরেরটাই বর্ধমান।

শিখা: অনেক দিন আসিসনি মনে হচ্ছে।

রনি: ধুর, আর এখানে আসতে ভালো লাগে না। এবারে ভূত দেখানোর চ্যালেঞ্জ দিল, তাই চলে এলাম।

শিখা: তোকে কী বলল রে ছোটকাকা, ও নিজে দেখেছে? কোথায়? আমাদের বাড়িতেই?

বাবুল: আমি এতশত জিজ্ঞেস করিনি, বলল ভূত দেখবি তো চলে আয়, আর ওই অবিশ্বাসীগুলোকেও নিয়ে আয়।

রনি: অবিশ্বাসী নাকি? এই যুগে কটা লোক এইসবে বিশ্বাস করে বল তো।

শিখা: এই ভূতকে কেমন দেখতে?

রনি: কেন, সকালে উঠে আয়না দেখিস না?

শিখা: মেরে মাথা ফাটিয়ে দেব। (মারতে যায়)

বাবুল: এবারে কিন্তু ছোটমামা বলেছে, নিজের চোখে দেখিয়ে দেবে।

রনি: যদি হাতেনাতে জালিয়াতি ধরে ফেলি, সারাজীবনের মতো ঢপ মারা বন্ধ।

(মঞ্চ অন্ধকার হয়। “সীতাভোগ, মিহিদানা, চায়ে, গরম চায়ে, লেবু চা” ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মের শব্দ। আলো জ্বললে দেখা যায় তিনজনে পিঠে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।)

শিখা: নিতে আসবে বলেছিল তো।

বাবুল: তা-ই তো বলল। ফোনের পিছনে যা ঝগড়া শুনলাম, মামি বাড়ি থেকে বেরোতে দিলে হয়। (সবাই হাসে)

রনি: ওই তো আসছে।

মামা: অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছিস? খুব ক্লান্ত নাকি?

রনি: না না, আমরা ঠিক আছি। তোমার এত দেরি হল কেন?

মামা: ও অনেক ব্যাপার, ছাড়। এখন বল, সোজা গন্তব্যস্থলে যাবি কি না? একেবারে ভূত দেখে তারপর বাড়ি গিয়ে ডিনার। বাড়ি ঢুকলে তোদের মামি আর বেরোতে দেবে না।

শিখা: তুমি ভূত দেখেছ, কাকু?

বাবুল: কেমন দেখতে ছোটমামা? আমরা না ট্রেনে আসতে আসতে এটা নিয়েই কথা বলছিলাম।

শিখা: একটা বেটও ধরেছি, যদি ভূত আসে তাহলে তাকে কেমন দেখতে হবে? আমি বলছি ছায়ামূর্তি।

রনি: না, কঙ্কাল।

বাবুল: আমার মনে হয় ভূত অদৃশ্য, তুমিই বলো মামা কোনটা ঠিক।

মামা: অশরীরী প্রেতাত্মা কখন কী রূপ ধরে আসবে তার কোনও ঠিক নেই। পুরোটাই তার মর্জির উপর।

বাবুল: আচ্ছা ছোটমামা, আমরা কি টের পাব আগে থেকে? যেমন গল্পে দেখায়?

মামা: তা বলা ভারী শক্ত। তবে শুনেছি কুকুর-বিড়ালরা টের পায় মানুষের থেকে বেশি। শুনিস না মাঝরাতে মাঝেমধ্যে একপাল কুকুর একসঙ্গে চিৎকার করে উঠে?

রনি: সেই তোমার পুরোনো থিয়োরি। ওসব রাখো। যদি নিজের চোখে দেখতে পারি তবে মানব, নইলে নয়।

মামা: বললাম না, যদি ভাগ্য ভালো থাকে তাহলে দেখতেও পাবি, শুনতেও পাবি। যদি ভয় না পাস, তাহলে। ভয় পেলে কী হবে জানি না। ওঁর ইচ্ছে।

শিখা: আচ্ছা কাকু, এটা তো বললে না তুমি নিজে ওঁকে দেখেছ কি না? নাকি পুরোটাই শোনা গল্প?

মামা: আহ্‌, এখুনি এত প্রশ্ন নয়। ওখানে গিয়ে সব বুঝতে পারবি। চল এখন। (সকলের প্রস্থান। পুনরায় প্রবেশ। তাদের হাতে টর্চ, মাদুর, জলের বোতল, টিফিন বাক্স। দরজা খোলার শব্দ, ইঁদুর-বাদু্ড়ের ডাক)

মামা: কী রে, তোদের ভয় করছে না তো? ভয় করলেই কিন্তু সব মাটি।

শিখা: না না, ভয় কীসের?

মামা: পরিবেশটা বেশ ইয়ে বোধ হচ্ছে না?

রনি: সে তো বটেই, পরিবেশটা সত্যিই ভৌতিক।

শিখা: টর্চটা সামনে ফেলে চল। ভূতপ্রেত না থাক, সাপখোপ তো থাকতেই পারে।

মামা: এখানে ঢোক। এই ঘরটা আমি আজ সকালে পরিষ্কার করিয়ে রেখেছি। মাদুরটা পেতে ফেল।

(চারজনে বসে, বাবুল বাক্স খুলতে শুরু করে। মামা পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরাতে যায়।)

শিখা: ঘরের মধ্যে খেয়ো না প্লিজ। আমার খুব অসুবিধে হয়।

মামা: ঠিক আছে, আমি আসছি পাঁচ মিনিটে। এই বাইরেই আছি। (প্রস্থান)

শিখা: কী বুঝছিস বল তো? কিছু ফন্দি করে রেখেছে?

রনি: সে ব্যাটা যাই করুক, ধরতে পারলে এমন মজা দেখাব না, (ব্যাগ থেকে লাঠি বার করে দেখায়) ভুতের বাচ্চা বাপ বাপ করে পালাবে!

শিখা: কাউকে ভূত সাজিয়ে ভয় দেখাবে ভাবছিস?

রনি: আবার কী?

বাবুল: আগে থেকেই কেন ধরে নিচ্ছিস যে এখানে ভৌতিক কিছু নেই।

রনি: তুই এইসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করিস? মান্ধাতার আমলে মানুষ এইভাবে ভাবত। ব্যাপারটা একটু তলিয়ে ভাব, এরকম কিছু হতেই পারে না।

শিখা: ভয় পেয়ে গেছে রে বেচারা?

(মামার প্রবেশ, পিছন থেকে)

মামা: লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়। এখন থেকেই তো ভয় পেলে চলবে না।

রনি: এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল?

মামা: বললামই তো, যাব আর আসব। আমার একটা দায়িত্বজ্ঞান নেই, তোদের একটা হানাবাড়িতে রেখে চলে যাব।

শিখা: তোমার ভূত দেখার ঘটনাটা তো বললে না? তখন বললে পরে বলব।

মামা: শুনবি, আচ্ছা তাহলে বলি শোন। একটা কথা, ভয় যদি পাস, বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব। বুঝেছিস?

রনি: না না, আমরা ভয় পাব না। তুমি বলে যাও।

মামা: আর একটা কথা, এখানকার কোনও কিছু বাড়িতে বলবার দরকার নেই, মামিকে তো খবরদার না। বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক আছে?

সকলে: ঠিক আছে।

মামা: এখানে আমাদের একটা নতুন ক্লাব হয়েছে কিছুদিন আগে। এমনি আড্ডা, খেলাধুলো হয়। হঠাৎ একদিন ভূতের প্রসঙ্গ উঠল। এই বাড়িটার কথা শুনে আগ্রহ বেড়ে গেল প্রচণ্ড। দু-চারজন যারা সাহস করে রাতের বেলায় ঢুকেছে, সবাই কিছু না কিছু ভৌতিক উপস্থিতি টের পেয়েছে। শুনে মনে হল ব্যাপারটা খাঁটি। সরেজমিনে যাচাই করব ঠিক করলাম। পরের দিন রাত্রে ওই ক্লাবেরই বিনয়কে নিয়ে এলাম। অনেকক্ষণ থেকেও কিছু দেখতেও পেলাম না, শুনতেও পেলাম না। কিন্তু যেটা পেলাম সেটা একটা গন্ধ।

পুরোনো বইয়ের পাতা, বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর বুনো জন্তুর গায়ের বোঁটকা গন্ধ মেশানো একটা জগাখিচুড়ি আবেদন। তোরা হয়তো বিশ্বাস করবি না, কিন্তু অনেক প্রত্যক্ষদর্শীই এর কথা বলেছেন। (একটু থেমে) এমনকী এখন এই ঘরেও সেই গন্ধটা আছে।

(সবাই ঈষৎ ঘাবড়ে যায়। গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে। সাহস দেখানোর জন্য রনি বলে উঠে।)

রনি: আমরা গন্ধটন্ধ কিছুই পাচ্ছি না, যা-ই হোক, চালিয়ে যাও।

(মামা উঠে দাঁড়ায়, বাকি ঘটনা অভিনয় করে দেখানো হবে, বাকিরা একটু সরে গিয়ে মামাকে জায়গা দিয়ে তার কাণ্ডকারখানা দেখতে থাকে। মামা বলে চলে।)

মামা: গন্ধের ব্যাপারটা ক্লাবের কাউকে বলিনি। পরের দিন সকালে তোদের ফোন করে একাই রাত্রিবেলা এখানে চলে আসি। টর্চ নিভিয়ে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করছি, এমন সময়… (বলতে বলতে মামা বসে পড়েছে, তার হাতে নেভানো টর্চ।)

(পেছন থেকে একটা পা ঘষার শব্দ হয়, মামা চমকে পিছনে ফিরে টর্চ জ্বালায়, কিছু দেখা যায় না। টর্চটা নিভলেই আবার শব্দ। মামা আবার ঘুরে টর্চ জ্বালায়, কিছু দেখা যায় না। তৃতীয়বার শব্দ হয়, এবার অনেক সামনে থেকে। মামা মুখোমুখি দাঁড়ায়, টর্চটা বন্ধই থাকে।)

মামা: কে আপনি? (সামান্য নিস্তব্ধতা) কে আপনি? পরিচয় দিন।

(শূন্য থেকে উত্তর ভেসে আসে। এক একটি বাক্য ঘরের এক এক দিক থেকে আসছে মনে হয়।)

—আপনি যদি ভয় না পান তবে দু-চারটে কথা বলে প্রাণ জুড়োই। কাল থেকেই আপনার সঙ্গে আমার আলাপ করার অভিলাষ।

মামা: অবশ্যই, বলুন না।

—আসলে কী জানেন, আমি খুবই আড্ডাবাজ মানুষ ছিলাম, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্পগুজব করে দিন কাটত। এখন সব গেছে, শুধু মনের ইচ্ছেগুলো একইরকম রয়ে গেছে। কথায় বলে না, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। স্বর্গে? হাঃ হাঃ! আর আপনার মতো আর কটা মানুষের বুকের পাটা আছে বলুন যে বসে বসে প্রেতাত্মার গল্প শুনবে।

মামা: সত্যিই, প্রেতাত্মার সঙ্গে আলাপ করার অভিজ্ঞতা আর কটা মানুষের হয়?

—আমাদের নামেই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যায় লোকের, এই বুঝি ঘাড় মটকে দেব। ভাবুন তো বেঁচে থাকতে কাউকে চড় পর্যন্ত মারিনি, আর মরার পর একটা অচেনা ভালোমানুষকে এমনি এমনি মেরে ফেলব! এ আবার হয় নাকি?

মামা: পরলোকের বাসিন্দাদের সম্বন্ধে আমরা কত ভুল ধারণাই না পোষণ করি। আমার একেবারেই কোনও ভয় লাগছে না। আপনি বরং আপনার জীবনের গল্প বলুন।

—শুনবেন, আমার নাম ছিল প্রাণহরি। প্রাণহরি মল্লিক। কলেজ পাশ করে এই অঞ্চলের জমিদার পোদ্দারমশাইয়ের ম্যানেজারি আর ছেলেদের গৃহশিক্ষকের চাকরি নিয়ে এখানে চলে আসি। তখন আমার শখের প্রাণ, গড়ের মাঠ। দোষের মধ্যে একটাই ছিল প্রচণ্ড তাসের নেশা। সন্ধে হতেই প্রতিদিন আমার ঘরে তাসের আসর বসত। এলাকার সব বড়লোকের ছেলেরাই উপস্থিত থাকতেন। নিয়মিতদের মধ্যে ছিলেন জমিদারবাবুর ছোটভাই রূপচাঁদ।

“কী পরানহরি? আর তো নিরামিষ খেলা চলছে না। এবার থেকে টাকা বাজি রেখে খেলা হবে।”

“বাবু যা বলেছেন, জুয়া না হলে সন্ধেগুলো ঠিক জমছে না।”

আর সেই জুয়াই হল আমার কাল। বলে না, তাস দাবা পাশা, তিন সর্বনাশা (অট্টহাসি)। পরপর কয়েকদিন টানা হারলাম, একটু সন্দেহ হল।

“আজকেও কি খেলবে নাকি, এবার তো ঘটিবাটি বেচতে হবে।”

“এই ক-দিন বাবুর কাছে হেরে, ছি ছি প্রাণহরি, তুমি এত কাঁচা খেলোয়াড় সে তো জানা ছিল না।”

পরের দিন ভেবেচিন্তে ফাঁদ পাতলাম, যা ভেবেছিলেম তা-ই, কুলাঙ্গার রূপচাঁদই চুরিটা করছে। সবার সামনে ধরা পড়ে যাওয়াতে তার আসল রূপ বেরিয়ে এল।

“শুয়োরের বাচ্চা, বেইমান, নমকহারাম, তুই আমার পিছনে লাগতে এসেছিস? জানিস আমি কে? মেরে শালার…”

“আঃ বাবু, করছেন কী? ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবেন কেন? চলুন চলুন এই ছোটলোকের ডেরায় আসাই ভুল হয়েছে।”

সেদিন আর খেলা হলো না, বাকিরা বিদায় নিলে আমিও পরেরদিন সাতসকালে জমিদার বাড়ি গিয়ে সব মিটমাট করে নেব ভেবে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। সেই ঘুম আর ভাঙেনি। সেই রাত্রেই রূপচাঁদ তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে আমায় ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি মেরে আমার ভবলীলা সাঙ্গ করে।

মামা: তারপর?

—আর কী, মড়াটা কয়েকদিন এখানেই পড়ে ছিল। গন্ধ পেয়ে পাড়ার লোক এসে দেখতে পায়। শ্রাদ্ধশান্তি করার কেউ ছিল না। তখন থেকে এখানেই আছি। ভূতের বাড়ি বলে কেউ এসে থাকে না। ছেলেছোকরা মাঝেমধ্যে যা আসে আমি একটু সাড়াশব্দ করলেই পালিয়ে যায়। এই প্রথম আপনাকে পেলাম যার সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলে মনে শান্তি পাওয়া যায়।

মামা: আর রূপচাঁদ?

—আমার মৃত্যুর মাস ছয়েক পরে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে তার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। না, আমার কোনও হাত ছিল না তাতে।

মামা: আপনার সঙ্গে আলাপ করে আমার বহুদিনের সাধ পূর্ণ হল। ইচ্ছে হচ্ছে আপনাকে স্বচক্ষে দেখি।

—দেখবেন, কী রূপে দেখবেন? কী রূপে দেখতে চান? কার কথা মনে পড়ছে?

মামা: না না, আপনার নিজের চেহারাতেই।

— (বহু কণ্ঠে হাসি) নিজের রূপে আসতে হলে তো দেখবেন সারা গায়ে ছুরির আঘাত আর রক্ত। সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। আসুন বরং করমর্দন করা যাক।

মামা: হ্যান্ডশেক!

—আসুন।

(তিন কণ্ঠে হাসি চলতে থাকে।)

(মামা শূন্যে হাত বাড়ায়। তার হাত করমর্দনের ভঙ্গিতে কেঁপে উঠে। মামা হাতের দিকে, সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে স্তম্ভিতভাবে।)

(আলো পরিবর্তন হয়। শিখা রনি বাবুল মামার দিকে এগিয়ে আসে।)

বাবুল: আমার কিন্তু প্রচণ্ড ভয় করছে, মামা।

শিখা: বাড়ি যাই কাকু, আমার আর ভূত দেখার ইচ্ছে নেই।

রনি: দাঁড়া দাঁড়া, তার মানে তুমিও নিজের চোখে দেখোনি। উঁহু এই গল্পে আমি মানব না। এসেছি যখন, যদি কিছু থাকে নিজের চোখে দেখেই যাব।

মামা: এই তো চাই। সময় হয়ে এসেছে। নে ব্যাগ থেকে তাসটা বার কর তো। তাস খেলার টান উনি এড়াতে পারবেন না।

(বাইরে কুকুরের ডাক শোনা যায়। সবাই ভয় পেয়ে মামার কাছাকাছি চলে আসে।)

মামা: শুনতে পাচ্ছিস? উনি আসছেন?

(পায়ের শব্দ। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ।)

মামা: ভয় পাস না। আমি তো আছি।

(উঠে দরজা খুলতে যায়।)

শিখা: ওরে বাবারে!

বাবুল: রাম রাম! জয় হনুমান!

রনি: থাম তো সব ভিতুর ডিম। (লাঠি বার করে হাতে নেয়।)

(মামা বাইরে কাউকে দেখে চমকে দৌড়ে নীচে নেমে আসে। প্রচণ্ড ভীত। দরজায় এক ছায়ামূর্তি দেখা যায়। সবাই চেঁচিয়ে উঠে। রনি একটু সাহস করে টর্চ জ্বালায়।)

রনি বাবুল: মামি?

শিখা: কাকিমা? তুমি এখানে?

মামি: তোমার কোনও আক্কেল নেই। তোমায় না-হয় সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় তাই ভূতের বাড়িতে পড়ে থাকো, তা বলে এই বাচ্চাগুলোকে এখানে টেনে এনেছ। এদের যদি কিছু হয়, তোমার বাড়ির লোক আমায় ছেড়ে কথা বলত না। এমনিতেই আমায় সহ্য করতে পারে না, তার উপরে এই।

দিন নেই, রাত নেই, উনি ভূত দেখতে বেরিয়েছেন। আর এদিকে বাড়িতে যে একটা জ্যান্ত লোক রয়েছে, সে মরল কি বাঁচল সেদিকে কোনও হুঁশ নেই। থাকো এখানেই। আমি বাপের বাড়ি চললাম। (প্রস্থান।)

(সকলে হতবাক হয়ে যায়।)

রনি: যা কলা, আজকেও আর ভূত দেখা হল না।

(মামা হাসতে শুরু করে।)

বাবুল: কী হল? পাগল হয়ে গেলে নাকি? বাড়ি চলো?

শিখা: কাকু হাসছ কেন? বলো কিছু? আমরা দৌড়ে গিয়ে কাকিমাকে আটকাই।

মামা: ওরে তোরা এখনও বুঝিসনি? বলিনি তোদের?

রনি: কী বুঝিনি? কী বলোনি?

শিখা: কাকিমা যদি সত্যি বাপের বাড়ি চলে যায়?

মামা: বাপের বাড়ি যাবে কী রে, ও তো এখন নিজে নিজে বিছানা ছেড়ে বাথরুমেও যেতে পারছে না। দু-দিন আগে বাথরুমে পিছলে পড়ে বাঁ পা ভেঙেছে। আরও সপ্তাহ দুই শয্যাশায়ী।

বাবুল: মামি যে এখানে এল?

রনি: তার মানে?

শিখা: মামি?

মামা: তোমার জবাব নেই বহুরূপী, শেষপর্যন্ত আমায় এই রূপে দর্শন দিলে।

(এদের প্রস্থান, মঞ্চের ডানদিক অন্ধকার হয়, বাঁদিকে আলো জ্বলে।)

কাকু: ব্রাভো ব্রাভো, কী অসাধারণ একটা গল্প। দিব্যেন্দুরা নিজের চোখে ভূত দেখেওছে, কথাও বলেছে, এমনকী হাতও মিলিয়েছে। তাহলে তো বিশ্বাস না করার আর কোনও কারণই থাকল না।

পারমিতা: বিশ্বাস অবিশ্বাস নিজের কাছে।

কাকু: তোর এই গল্পের অর্থ উদ্ধার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব আমি হেরে গেলাম, ওয়েল প্লেড।

মীরা: তুমি এসব কী বলছ কাকু।

কাকু: আমার আগেই মনে হচ্ছিল যে আজ সন্ধের সমস্ত ঘটনার এটাই একমাত্র যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা। কিন্তু ভাবলাম দেখি আর কী কী হয়।

বিশ্ব: আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

কাকু: আর অভিনয় করার দরকার নেই। তোমরা খুব ভালো চালিয়েছ, ভবিষ্যদ্‌দ্রষ্টার আগমন, একের পর এক প্রেডিকশন মিলে যাওয়া, ঘুঁটি তোরা বেশ ভালোই সাজিয়েছিলি। কিন্তু শেষ গল্পটায় বাবা দিবু একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললি।

দিব্যেন্দু: তুমি কি বলছ যে আমরা পুরো ব্যাপারটাই বানিয়ে বলছি, মানে সব ঘটনাই সাজানো। কিন্তু কেন?

কাকু: পুরোটাই সাজানো, কারণ ভূত নেই, প্রেত নেই, ব্রহ্মদত্যি নেই, আর সবজান্তা ভবিষ্যদ্‌দ্রষ্টাও নেই। এটা একটা প্ল্যান আমায় একটু জব্দ করার জন্য। তাই তো? গোটা প্ল্যানটা কার মাথা থেকে বেরিয়েছে, তোর বাবার?

মীরা: কাকু, আপনি একদমই ভুল বুঝছেন। এরকম কিছুই নয়।

কাকু: এই যে অনিকেতবাবু, নামটা আসল নাকি সেটাও কল্পনা? আপনি কিন্তু ভালোই অভিনয় করেন। শখের যাত্রা-থিয়েটার করেন নাকি? অনেকটাই বুঝিয়ে ফেলেছিলেন আমাকে। তোমরা সবাই কিন্তু দারুণ খেললে, ওয়েল ডান।

অনিকেত: আমি কিন্তু কিছুই বানিয়ে বলছি না।

কাকু: আপনি এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন, আর দরকার নেই, বললাম তো ধরা পড়ে গেছেন।

(কাকু হাসিহাসি মুখ করে বসে পড়ে, যুদ্ধ জয়ের হাসি। চোখের চশমা খুলে টেবিলে রাখে। অনিকেত সোজা কাকুর দিকে তাকিয়ে।)

অনিকেত: চশমাটার বোধহয় আর আপনার প্রয়োজন নেই তাই না, ওটা ছাড়াই আপনি সব দেখতে পারছেন।

কাকু: মানে? কী বলছেন আপনি? আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই নিয়মিত চশমা পরি।

দিব্যেন্দু: চশমা ছাড়া কাকুকে কখনও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।

অনিকেত: জানি না মনে হল, ওঁর আর চশমার প্রয়োজন নেই। এটা বোধহয় জিরো পাওয়ারের।

কাকু: সেটা আপনি জানলেন কী করে?

অনিকেত: সেটাই যদি জানতে পারতাম প্রোফেসর, তাহলে আর আপনার সাহায্য চাইতাম কেন?

কাকু: মাই গড! এটা তাহলে অভিনয় নয়, সত্যি হচ্ছে?

মীরা: কিন্তু তোমার চশমা?

কাকু: বহুদিন ‘নেবো না, নেবো না’ করে শেষপর্যন্ত তোমার কাকিমা আমায় লেন্স নিতে রাজি করালেন। দেখতে সবই ভালো পারছি, শুধু মনে হতে লাগল মুখের মধ্যে থেকে গাম্ভীর্যটা চলে গেছে। অগত্যা এই জিরো পাওয়ারের চশমা। আমি ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলিনি এটার কথা। আমি ভাবতেই পারছি না এই ভদ্রলোক সেটা জানলেন কী করে?

বিশ্ব: তাহলে আপনিও মানছেন যে এমন অনেক কিছু ঘটে যেটার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

কাকু: (অনিকেতের প্রতি) আপনি কিছু মনে করবেন না, আমি উত্তেজনার বশে হয়তো কটু কথা বলে ফেলেছি। আমরা সবাই আপনাকে যথাসাধ্য সাহায্যই করব। ব্যাপারটা নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবতে হবে।

অনিকেত: আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না আমি এটা কীভাবে জানলাম। ভয় হচ্ছে, আমার পুরো স্বপ্নটাই না সত্যি হয়ে যায়।

চিত্রা: কিন্তু আপনার স্বপ্নের শেষে কী হবে, সেটা কি আপনার মনে পড়ছে?

বিশ্ব: আপনি একটা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে…

চিত্রা: কাচ ভাঙার শব্দ, তারপর?

অনিকেত: আমার সামনের দেয়ালটা কাচের মতো শব্দ করে ভেঙে গেল। আমার সামনে শুধুই অন্ধকার। আমি পা ফেললাম আমার ভবিষ্যতের দিকে, কিন্তু এ কী! সামনে কোনও মাটি নেই, অতল খাদ। আর সেই খাদের গভীরে আমি পড়তে পড়তে তলিয়ে যাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি, কোথায় গিয়ে ধাক্কা খাব জানি না। (অনিকেত বলতে বলতে উঠে এসেছে। তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। কিছুক্ষণ সবাই চুপ।)

চিত্রা: ঠিক ধাক্কা খাওয়ার আগের মুহূর্তে আপনি বুঝতে পারবেন আপনি স্বপ্ন দেখছেন, আর সঙ্গে সঙ্গে আপনার ঘুমটা ভেঙে যাবে।

পারমিতা: এরকম তো আমার স্বপ্নেও হয়। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি অন্য সাবজেক্টের কোয়েশ্চন পেপার। ফেল করে যাব বলে কান্নাকাটি শুরু করেছি। পরীক্ষা শেষ হবার ঠিক আগে ঘুমটা ভেঙে যায়।

দিব্যেন্দু: আমি তো স্বপ্ন দেখি অজানা জায়গায় অচেনা লোকের ভিড়ে হারিয়ে গেছি। আমি তাদের কথা বুঝতে পারছি না। তারা আমায় বন্দি করে ফেলেছে, কিছুতেই পালাতে পারছি না।

মীরা: তাহলে বুঝতে পারছেন, শুধু আপনি না, অনেকেই— বোধহয় সবাই কিছু না কিছু দুঃস্বপ্ন দেখে।

অনিকেত: কিন্তু শুধু আমার বেলাতেই দুঃস্বপ্নটা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। আমার মন বলছে কিছু একটা বীভৎস ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে এখানে, আমাকে ঘিরে। কোনও বিশাল অশুভ শক্তি আমার মতো হতভাগাকে মোমের পুতুল বানিয়ে খেলছে। আমাকে টেনেহিঁচড়ে নামাচ্ছে একটা ঘুর্ণাবর্তে, যেখান থেকে আমার কোনও নিস্তার নেই। আমার সেই দুর্ভাগ্যের অংশীদার আমি আপনাদের করতে চাই না। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।

দিব্যেন্দু: অনিকেতবাবু, আপনি ভয় পাবেন না, আমরা কেউই আপনার কোনও ক্ষতি করব না।

মীরা: বরঞ্চ যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটারই থাকে, তাহলে আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকুন। আমরা আপনার কোনও ক্ষতি হতে দেব না।

অনিকেত: যা হবে তা হয়তো আপনাদের নিয়ন্ত্রণে কিছুই থাকবে না।

মীরা: কাকু, আপনি কিছু বলুন, উনি আপনার কথা শুনবেন।

কাকু: সোফায় বসে চায়ের কাপ হাতে অ্যাকাডেমিক থিয়োরি কপচানো খুব সহজ, কিন্তু যখন চোখের সামনে এইরকম ব্যাখ্যাহীন ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন আর কোনও থিয়োরিই খাটে না। তবে একটা কথা বলতে পারি আপনাকে, এতক্ষণ অবধি প্রত্যেকটা ভবিষ্যদ্‌বাণী মিলে গেছে বলেই বাকিগুলোও মিলবে এরকম তো নাও হতে পারে। আর যদি কিছু অঘটন ঘটেই, সবাই একসঙ্গে থাকলেই বোধহয় ভালো, নয় কি?

বিশ্ব: যা ভাগ্যে লেখা আছে, হবে অনিকেতবাবু। আপনি শতচেষ্টা করেও ঠেকাতে পারবেন না। আমি এইসব সংস্কারটংস্কারে একদম বিশ্বাস করতাম না, জানেন। কিন্তু আমাদের জীবনেও এমন একটা ঘটনা ঘটেছে সেটারও কোনও ব্যাখ্যা আমরা করতে পারিনি। এই ব্যাপারটা আগে তোদের কখনও বলিনি, না জানি তোরা কী ভাববি।

পারমিতা: আমার মনে হয় বিষয়টা বলে ফেলাই ভালো। কাকু বা তোমরা যদি কিছু সুরাহা করতে পারো।

মীরা: কী ব্যাপার বলবে তো।

পারমিতা: আমরা গত বছর ভূটানে বেড়াতে গিয়েছিলাম, ঘটনার সূত্রপাত সেখানেই। থিম্পু থেকে একশো কিলোমিটার মতো দূরে, পাহাড়ের উপর ছবির মতো সুন্দর জায়গা লামচি, খুব একটা বেশি লোক যায় না। সেখানে নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষের বাস।

(মঞ্চের বাঁদিকের আলো নেভে। ডানদিক দিয়ে বিশ্ব প্রবেশ করে, তার গায়ে জ্যাকেট, গলায় মাফলার, মাথায় টুপি।)

বিশ্ব: আমাদের গত বছরটা যা গেছে, চাকরির সমস্যা, মায়ের অসুখ, বাড়ি নিয়ে শরিকি মামলা। লামচি জায়গাটার নাম শুনে মনে হচ্ছিল ওখানে গিয়ে কটা দিন থাকতে পারলে মন্দ হয় না। ওখানে পৌঁছে হোটেলে উঠলাম, চমৎকার ব্যবস্থা। নির্ঝঞ্ঝাট ঘুরে বেড়ালাম দিন দুয়েক। দ্বিতীয়দিন রাত্রে হোটেলে একটা ফোটোগ্রাফ দেখলাম, একটা বৌদ্ধমঠ। দেখে মনে হচ্ছে জায়গাটা যতটা দুর্গম, ততটাই সুন্দর।

পারমিতা: ওর তো দেখেই রোখ চেপে গেল, এখানে যেতেই হবে। পরের দিন খোঁজখবর নিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। নির্জন মঠ, ঘুরে ফিরে নামছি, দেখলাম এক বৃদ্ধা সামনে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন, কতগুলো মূর্তি। (এক বৃদ্ধা এসে পসরা সাজিয়ে বসেন।)

বৃদ্ধা: Kuzuzangbo, chilip, kuzuzangbo.

পারমিতা: বাঃ, কী অদ্ভুত মূর্তিগুলো দ্যাখো। (বৃদ্ধা খরিদ্দারদের দেখে হাসতে থাকেন। বিচিত্র অর্থপূর্ণ সেই হাসি।)

বিশ্ব: ওঠার সময় তো একে দেখিনি। এই পথেই তো উঠলাম।

পারমিতা: খেয়াল করিনি, কারণ তখন তাড়াহুড়ো করে উঠছিলাম, এই মূর্তি আমি একটা কিনব।

বৃদ্ধা: ing, lazhim, tashi delek, tashi delek.

বিশ্ব: দাঁড়াও, দাম জিজ্ঞেস করি আগে। (বৃদ্ধার প্রতি) দাম কিতনা হ্যায়? (অঙ্গুলিনির্দেশ করে।)

পারমিতা: ইয়ে কিসকা মূর্তি হ্যায়, মাজি?

বৃদ্ধা: nga mi she, tsip maza, nga mi she.

(বৃদ্ধা ভাষা না বুঝতে পেরে তাকিয়ে থাকে, মুখে হাসি। স্ত্রী নীচু হয়ে একটা মূর্তি তুলে নেয়।)

পারমিতা: কীসের বুঝতে পারছ? অনেকটা চাইনিজ বুদ্ধের মতো না?

বিশ্ব: কোনও তিব্বতী দেবতাটেবতা হবে। দেখতে মন্দ না।

পারমিতা: আমি এরকম মূর্তি আগে কখনও দেখিনি, আমাদের বসার ঘরে কর্নার র‍্যাকের উপর রাখব বুঝলে। কেউ এলে প্রথমেই নজরে পড়বে এটা।

বিশ্ব: সে তো বুঝলাম, কিন্তু দাম না বললে কিনবে কী করে, আর বাড়িই বা নিয়ে যাবে কীভাবে?

পারমিতা: কিতনা দাম হ্যায় মাজি?

বিশ্ব: ইয়ে ক্যায়া বুদ্ধমূর্তি হ্যায়?

বৃদ্ধা: nga mi she, tsip maza, nga mi she.

(বৃদ্ধা মাথা নাড়ে, অর্থ বোধগম্য হয় না।)

বিশ্ব: এ তো কিছুই বোঝে না, রেখে দাও।

(পারমিতা মূর্তিটা রাখতে গেলে বৃদ্ধা সজোরে মাথা নাড়তে থাকে, যার অর্থ ‘না।’ হাত দিয়ে ইশারা করে মূর্তিটা নিয়ে যাওয়ার জন্য।)

বিশ্ব: এ তো অদ্ভুত মুশকিল। নিতেও বলছে আবার দামও বলছে না। দাঁড়াও দেখি, এবারে নিশ্চয়ই বুঝবে।

(বিশ্ব পার্স থেকে নোট বার করে দেখায়। বৃদ্ধা মাথা নাড়তে নাড়তে একটু উঠে তলা থেকে একটা পুরোনো সাইনবোর্ড বার করে।)

বৃদ্ধা: Me ngultrum, me ngultrum. ci nyi sum, lha dorji. tashi delek. ci nyi sum, lha dorji.

বিশ্ব: GOD’S GIFT. NO MONEY. THREE WISHES GRANTED. ASK WISELY.

পারমিতা: যা বাবা, এবার কী করব?

বিশ্ব: কী আবার করবে, নিয়ে নাও। ওসব উইশটুইশ ফালতু কথা, টুরিস্টদের গছানোর জন্য ওসব লিখে রাখে।

পারমিতা: আর দাম দেব না, এমনিই নিয়ে যাব?

বিশ্ব: সে কিছু একটা দিচ্ছি, কত দেওয়া উচিত বলো তো, পাঁচশো?

পারমিতা: পাঁচশো তো হবেই, নিউ মার্কেটে এটাই দু-তিন হাজার দাম নেবে।

(বিশ্ব পার্স থেকে টাকা বার করে। পাঁচশোর সঙ্গে সঙ্গে একশোর নোটও বেরোয়।)

বিশ্ব: ছশোই দিয়ে দিই।

(টাকাটা বৃদ্ধাকে দেখায়, সে ‘না না’ বোঝাতে থাকে, টাকাটা গুঁজে দেয়)

বৃদ্ধা: me ngultrum. lazhim mindu, lha dorji. lazhim mindu.

বিশ্ব: চলো বেড়িয়ে পড়ি। সন্ধে হয়ে গেল।

(স্বামী-স্ত্রী নেমে চলে যায়। পেছনে বৃদ্ধা বিদেশি ভাষায় দুর্বোধ্য কথা ও হাতমুখের ভঙ্গিমা করতে থাকে।)

বৃদ্ধা: cho gati jou mo? Numkor kag nang. Numkor kag nang. cho gati jou mo. lha dorji. lazhim mindu.

বিশ্ব: এর পরের দিনই আমরা চলে আসি সকালে। হোটেলের বিল মেটানোর সময় একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে। আমাদের থাকা-খাওয়া মিলিয়ে গোটা অ্যামাউন্টে ছশো টাকা ছাড় দেওয়া হয়।

পারমিতা: ছশো টাকা, এরকম কোনও অফার ছিল নাকি?

বিশ্ব: সেরকম তো কিছু মনে পড়ছে না।

পারমিতা: আমার কী মনে হচ্ছে জানো?

বিশ্ব: জানি তোমার কী মনে হচ্ছে, কালকের বুড়িটার ছশো টাকা তো? আরে আমরা তো তাকে হোটেলের নাম ঠিকানা দিয়ে আসিনি যে সে এখানে এসে টাকাটা দিয়ে যাবে।

পারমিতা: একবার রিসেপশনে জিজ্ঞেস করবে?

বিশ্ব: ছাড়ো তো। কমই তো দিয়েছে, বেশি নিলে না হয় ভাবা যেত। চলো এখন, ট্যাক্সি এসে গেছে।

পারমিতা: অপ্রত্যাশিতভাবে টাকা বাঁচলে কার না ভালো লাগে। তাই এটা নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি বহুদিন। মাস দুয়েক পরের কথা।

বিশ্ব: ভুটান থেকে ফিরে জানিনে কেন, হয়তো প্রাণের সুখেই ওজন আর তার সঙ্গে সঙ্গে ভুঁড়িটা বেড়ে যাচ্ছিল। পারমিতার মনে হতে লাগল আমি আনফিট হয়ে যাচ্ছি। এমনি এক আধ দিন বলত, তারপর একদিন ওর কলেজের বান্ধবী মালবিকা বলল আমি মোটা হয়ে গেছি। ব্যাস, হয়ে গেল। রাস্তায় একটা ওষুধের দোকানে ওজন করালাম। বাড়ি ফিরেই শুরু হল—

পারমিতা: তোমার মতো হাইটে এত ওজন কখনও হয়? আমি যতদিন বলছিলাম এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বার করে দিচ্ছিলে, এখন বাইরের লোকের কাছেও শুনতে হল।

বিশ্ব: দেখি, এবার কিছু একটা শুরু করতে হবে, এক্সারসাইজ-টেক্সারসাইজ।

পারমিতা: তোমার কোনও মোটিভেশনই নেই। অফিসে তো একটা জিম আছে, সেটাতেও তো যেতে পারো?

বিশ্ব: পারি তবে, অফিসে ড্রেস চেঞ্জ করা সমস্যা।

পারমিতা: তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। মালবিকার হাজব্যান্ডের চেহারাটা দেখলে।

বিশ্ব: ঠিক আছে ঠিক আছে, কাল থেকে অফিসের জিমেই যাব।

পারমিতা: একটা টার্গেট সেট করো, যে একমাসে চার কেজি কমাবে।

বিশ্ব: একমাসে চার কেজি কেন? আমি দু-সপ্তাহেই চার কেজি কমিয়ে ফেলব।

(উত্তেজিত হয়ে উঠে ঘরের কোণের মূর্তিটা চোখে পড়ে। সেটা হাতে নিয়ে।)

বিশ্ব: হে ভুটানি দেবতা, তুমি আমার ওজন চার কেজি কমিয়ে দাও।

পারমিতা: তোমার সব কিছুতেই ইয়ার্কি। এইজন্য তোমার কোনও উন্নতি হবে না।

(পারমিতা ঘরে ঢুকে যায়। তার পিছনে পিছনে ঢোকে বিশ্ব। পারমিতা আবার বেরিয়ে আসে।)

পারমিতা: পরেরদিন যখন বিশ্ব অফিস থেকে ফিরল, ওর গায়ে জ্বর। সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যাথা। রাতে জ্বর এতই বাড়ল যে হাসপাতালে অ্যাডমিট করতে হল। একসপ্তাহ জ্বর আর মাথাব্যাথা নিয়ে চলতে থাকে। গুচ্ছের টেস্ট করেও কী ধরনের ভাইরাল ফিভার ডাক্তাররা বুঝে উঠতে পারেন না। ওষুধপত্রে কোনও কাজ দেয় না। বিশ্ব রোগের ঠেলায় আর কড়া ওষুধের ধাক্কায় দুর্বল হয়ে পড়ে। খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ। শুধু জুস ছাড়া আর কিছুই খেতে পারছে না। অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাব কি না পরামর্শ করছি, এমনসময় ওর জ্বরটা নিজে থেকেই কমতে লাগল, আর মাথাব্যাথাটাও।

(বিশ্ব ঘরে এসে শুয়ে ছিল এতক্ষণ, এখন ওঠে)

বিশ্ব: ঠিক দু-সপ্তাহ পরে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম, ফেরার আগে হাসপাতালে ওজন মাপলাম, শেষ যা দেখেছিলাম তার থেকে কাঁটায় কাঁটায় চার কেজি কম। পারমিতাকে অনেকদিন পর উৎফুল্ল দেখলাম, ওকে আর এই চার কেজির সমাপতনটা বললাম না। আমার মাথা থেকেও ব্যাপারটা বেরিয়ে গেল। স্বাভাবিক জীবন চলতে লাগল। মাসখানেক পরের একদিন।

(ক্লান্ত বিরক্ত পারমিতা ঢোকে, তার হাতে অফিসের ব্যাগ।)

পারমিতা: মা গো মা, কি বিচ্ছিরি ট্রাফিক, একটু বৃষ্টি পড়ল কি পড়ল না সারা রাস্তা জ্যাম। টিবোর্ডের সিগনালে পাক্কা একঘণ্টা দাঁড়িয়েছিলাম।

বিশ্ব: কী আর করবে, সইতেই হবে।

পারমিতা: রোজ রোজ সওয়া যায় না বুঝলে, আমার রুটে যদি ট্র্যাভেল করতে হত, তাহলে বুঝতে। এই একটা গাধার মোট বওয়া চাকরি, তার মধ্যে দু-বছর কোনও হাইক দেয়নি, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতন ট্রাফিক। জীবনটা পুরো নরক করে দিল। ভগবান কিছু একটা করো, আন্ডারপাস ওভারব্রিজ মেট্রো কিছু একটা, রোজ রোজ এই যন্ত্রণা সহ্য করা যাচ্ছে না।

বিশ্ব: ভগবানকে না বলে কর্পোরেশনকে বলো, অথবা (হাঁটতে হাঁটতে এসে মূর্তিটার কাছে দাঁড়িয়েছে) এনাকেও বলে দেখতে পারো। মনে আছে, ‘THREE WISHES GRANTED’!

পারমিতা: আমি মরছি একটা সিরিয়াস সমস্যা নিয়ে আর উনি মশকরা পেয়েছেন।

বিশ্ব: হে নাম না জানা ভুটানি দেবতা, আমার স্ত্রী-এর রোজকার টিবোর্ডের ট্রাফিক জ্যামের সমস্যা মিটিয়ে দাও।

পারমিতা: তুমি একটা আস্ত পাগল।

বিশ্ব: পরের দিন দুপুরে অফিসে বসে কাজ করছি। পারমিতার ফোন এল।

পারমিতা: (কান্না) সর্বনাশ হয়ে গেছে, আমাদের US office থেকে আজকেই জানিয়েছে আমাদের ইউনিটটা বন্ধ করে দিচ্ছে।

বিশ্ব: এ কী, কিন্তু, তোমাদের অনেকগুলো প্রোজেক্ট, অন্য কিছুতে ট্রান্সফার করে দিক।

পারমিতা: কাল সন্ধেবেলাতেই এরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কাদের কাদের ট্রান্সফার করা হবে। আমার পোস্টে নাকি অন্য প্রোজেক্টে কোনও ওপেনিং নেই।

বিশ্ব: ঠিক আছে, তুমি বাড়ি এসো। আমিও আসছি।

(দুজনেই ঘরে প্রবেশ করে। পারমিতা সোফার উপর আছড়ে পড়ে মুখ গুঁজে। বিশ্ব ইতস্তত হাঁটতে থাকে। চোখ পড়ে মূর্তিটার দিকে। সেটা হাতে নিয়ে বলে।)

বিশ্ব: একটা অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছে, কালকেই মূর্তিটাকে বললাম তোমার টিবোর্ডের জ্যামের সমস্যা মিটিয়ে দাও, আর আজকেই। এরকম কিন্তু আগেও একবার মিলেছিল, আমার শরীর খারাপের সময়।

(পারমিতা ছুটে আসে, মূর্তিটাকে কেড়ে নিয়ে চেয়ারে বসায়। তার নিচে হাঁটু গেড়ে বসে।)

পারমিতা: তুমি সত্যি জাগ্রত ঠাকুর, আমি এতদিন কেন বুঝিনি। ঠাকুর আমার একটা চাকরি করে দাও। প্লিজ প্লিজ ঠাকুর। আমি তোমার কাছে আর কিচ্ছু চাইব না। প্লিজ ঠাকুর প্লিজ, একটা ভালো চাকরি, একটা এর থেকেও ভালো চাকরি।

(টেলিফোন বেজে উঠে। বিশ্ব ধরে, শুনে বলে।)

বিশ্ব: পারমিতা, তোমার ফোন।

পারমিতা: হ্যালো।

(অন্যপ্রান্তের কথা শোনা যায়।)

—আমি কি জগবন্ধু চক্রবর্তীর মেয়ে পারমিতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলছি?

পারমিতা: হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন?

—আমি ওঁর অফিস থেকে ফোন করছি। আজ দুপুরে আমাদের ফ্যাক্টরিতে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। একটা কেমিক্যাল এক্সপ্লোশন। মিস্টার চক্রবর্তী একদম সামনেই ছিলেন। আমরা ওকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভরতি করি। অনেক চেষ্টা করেও ওঁকে বাঁচাতে পারিনি।

পারমিতা: কী… কী বলছেন আপনি, বাবা! বাবা…

—আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনাকে এভাবে জানানোটা হয়তো অমানবিক হচ্ছে। কিন্তু এটা কোম্পানি পলিসি, মানে আপনাকে শুধু জানিয়ে রাখা। যেহেতু দুর্ঘটনাটা কোম্পানির ভেতরেই হয়েছে, আর আপনিই ওঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী, তাই আপনাকে আমরা একটা সুইটেবল পজিশন অফার করছি, উইথ কম্পিটিটিভ প্যাকেজ অ্যান্ড স্টক অপশনস।

(পারমিতার কান্না বাগ মানে না।)

(ডানদিকের আলো নেভে। বিশ্ব ও পারমিতার প্রস্থান। বাঁদিকের আলো জ্বলে। পারমিতা মাথা নীচু করে বসে। মীরা তাকে সান্ত্বনা দেয়।)

বিশ্ব: ঘটনাগুলো যা ঘটেছিল বললাম, কেন ঘটেছিল আমাদের কোনও ধারণা নেই।

পারমিতা: লোকে বিশ্বাস করবে না এই ভয়ে কাউকে বলতেও পারিনি এতদিন।

অনিকেত: এমনি ভাবলে মনে হবে অবিশ্বাস্য, অবাস্তব, গল্পের মতো, কিন্তু আমাদের জীবনেই কত কিছু ঘটে যার কোনও ব্যাখ্যাই মেলে না।

চিত্রা: কিন্তু এরকম তো হতে পারে যে এগুলো আ সেট অব ইনডিপেনডেন্ট র‍্যান্ডম ইভেন্টস, আমরা এই ডটগুলোকে কানেক্ট করে একটা ইকুয়েশন দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি যেখানে শুরুতে কোনও কানেকটিং ফ্যাকটরই ছিল না।

কাকু: বুঝছি, তুমি কী বলছ। কিন্তু এতগুলো ঘটনাকে কোয়েন্সিডেন্স বলে ব্যাখ্যা করাটা মুশকিল। আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েও তোমাদের বোঝানোর মতো আমার কিছুই বলার নেই। আরেকটু ভাবি।

অনিকেত: হয়তো আপনাদেরও এই আমারই মতন একটা ব্যাখ্যাহীন অদ্ভুত উপলব্ধি নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।

মীরা: দেখুন অনিকেতবাবু, আমাদের মনে আমরা অনেকগুলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কল্পনা করে রাখি, তা-ই তো? অনেকসময় আংশিকভাবে মেলে, কখনও একেবারেই মেলে না। এই যেমন আপনি আমাদের বাড়িতে এলেন, আপনার ওয়েবসাইটে আপনার আগের বিভিন্ন ডিজাইন, ফোটোটটো ইত্যাদি দেখে আমি মনে মনে ভেবেছিলাম আপনি হয়তো এইটা পছন্দ করবেন না, ওইটা চেঞ্জ করতে বলবেন। সেগুলো কিছুই মেলেনি, কিন্তু আমার সেটা অদ্ভুত মনে হচ্ছে না, কারণ একজন অচেনা ব্যক্তি কী বলবেন বা ভাববেন সেটা আমার কল্পনার সঙ্গে না মেলাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি মিলে যায় পুরোপুরি তাহলে কি সেটাকেই মারাত্মক-অদ্ভুত-অলৌকিক মনে হবে না?

চিত্রা: এটা দারুণ বলেছ আন্টি, একশোটা কয়েন বারবার টস করতে থাকলে কি কখনও না কখনও সবগুলোতেই হেড পড়বে না? আর এটা ঘটনা ঘটার চান্স যতটা কম, সেটা ততটাই সেনসেশনাল। মিডিয়ার ভাষায় ব্রেকিং নিউজ। লোকে সেগুলোই আলাদা করে লক্ষ করে আর মনেও রাখে। কিন্তু তার চারিদিকে শত শত বোরিং হাই প্রোবাবিলিটি ইভেন্টকে পাত্তাই দেয় না।

পারমিতা: তাহলেও তো মানতে হবে অনিকেতবাবুর অবচেতন মস্তিষ্ক মারাত্মক রকমের প্রখর। এতগুলো জিনিস মিলিয়ে দেওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়।

বিশ্ব: তোমরা-না শুধু থিয়োরি খাড়া করতেই ভালোবাসো। উনি কাকুর চশমার ব্যাপারটা কী করে জানলেন? ওঁর স্বপ্নের শেষে যে ঘটনাটা বলছেন সেটার কী মানে বার করবি? আচ্ছা কাকু, আপনিই বলুন এর কি কোনও ব্যাখ্যা সম্ভব?

কাকু: ওঁর স্বপ্নের শেষে কী হবে জানি না, তবে অনুমান করতে পারি। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, তোমরা নিজেরাও যেমন বলছিলে, স্বপ্নের মধ্যে একটা পর্যায় অবধি সব কিছু ঠিকঠাক চলে, যেমন বাস্তবে হয়। যে স্বপ্নটা দেখছে তার পক্ষে তখন কোনওভাবেই বোঝার উপায় নেই এটা স্বপ্ন না বাস্তব। দি ইলিউশন অব রিয়েলিটি অনেকটা গ্র্যাভিটির মতো। সব কিছুকে বাস্তবের মাটিতে ধরে রাখে। কিন্তু তার পরের স্টেজে গিয়ে আর সেই মায়াটা থাকে না। একের পর এক মারাত্মক ঘটনা, মানুষ যা যা প্রচণ্ড ভয় পায়— সব পরপর ঘটতে থাকে, যেগুলো বাস্তবে কখনওই সেভাবে ঘটবে না। স্বপ্নটা দুঃস্বপ্নের খাদে তলিয়ে যায়। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে ঘুমের মধ্যেই কোনওভাবে আমরা বুঝতে পারি যে এটা সত্যি নয়, বাস্তব নয়। আর তখনই স্বপ্ন আর ঘুমটা ভেঙে যায়।

পারমিতা: স্বপ্নে যা হচ্ছে হোক, বাস্তবে যেন কোনও ভয়ংকর কিছু না ঘটে।

চিত্রা: আমার মাথায় আরেকটা আইডিয়া আসছে, ধরো (চিত্রার ফোন বেজে উঠে, বিরক্তির সঙ্গে ধরে) এক্সকিউজ মি… (ফোনে) হ্যাঁ বলো, কী হয়েছে?… কী হয়েছে বাপির?… কোথায়? আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি এখুনি। (ফোন রাখে)

সরি আন্টি, আমাকে একটু বেরোতে হবে। বাপি বৃষ্টিতে বাইকের চাকা স্লিপ করে পড়েছেন, দেখি আমি গিয়ে কী অবস্থা। (প্রস্থান)

পারমিতা: আপনার এই প্রেডিকশনটাও কিন্তু মিলে গেল! চিত্রা আলোচনার শেষ অবধি থাকতে পারল না!

অনিকেত: আমার মনে হয় আমারও এখুনি বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আপনারা প্লিজ আমায় আটকাবেন না, নইলে আরও বিপদ হবে।

দিব্যেন্দু: আমরা আপনাকে কিছুই সাহায্য করতে পারলাম না, বরং আরও অস্বস্তির কারণ হলাম, এটাই খারাপ লাগছে। আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি, আপনাকে আর বাধা দেব না।

মীরা: সত্যিই আমরা শত চেষ্টা করেও নিজেদের বোধবুদ্ধি দিয়ে এই অভিজ্ঞতার কোনও ব্যাখ্যা করতে পারব না।

বিশ্ব: আপনি এখন বেরোবেন কীসে? ওলা-উবার নাকি?

অনিকেত: দেখি কী পাই? (ফোন বার করে দেখে।)

কাকু: তোমরা সবাই তাহলে মেনে নিলে যে এর কোনও মানে বার করা সম্ভব নয়। একা আমিই এখনও নট-আউট। ঠিক আছে, তা-ই হোক। অনিকেতবাবুর স্বপ্নের শেষে ভয়াবহ কী হয় সেটা না জেনে আমি হাল ছাড়ছি না।

মীরা: পেলেন কিছু?

অনিকেত: না, ধারেকাছে কিছুই তো নেই বলছে।

বিশ্ব: আমরাও একটু পরেই বেরোব। একসঙ্গে বুক করা যেতে পারে তখন।

অনিকেত: আরেকটু দেখি।

পারমিতা: আমাদের চাবি, কাকুর চশমা, চিত্রার আসা— চলে যাওয়া, এতগুলো ব্যাপার আপনি মিলিয়ে দিলেন, এবার কিন্তু আমারও ভয় লাগছে।

অনিকেত: ভাবতে পারেন আমার মনের ভেতরে কী হচ্ছে, আমিও তো আপনাদের মতোই সাধারণ মানুষ, বিড়ালের কান্না শুনে ঘাবড়ে যাই। আর আজকে এত কিছু অদ্ভুত ঘটনা হচ্ছে, আর সেটা ঘটাচ্ছি আমিই। যাক, আশা করি এখান থেকে বেরোতে পারলেই এই দুঃস্বপ্নের শেষ হবে। আপনারাও বাঁচবেন, আমিও রক্ষা পাব।

দিব্যেন্দু: আজকে আর বেরোব না বলে ড্রাইভারকেও ছেড়ে দিলাম, নইলে আমাদের গাড়িতেই আপনাকে পৌঁছে দেওয়া যেত।

অনিকেত: আপনারা এত বিব্রত হবেন না, কিছুক্ষণেই পেয়ে যাব মনে হয়।

পারমিতা: আচ্ছা কাকু, আপনি এতবছর ধরে এতরকমের কেস ঘাঁটছেন, আপনিও নিশ্চয়ই এরকম ঘটনা দেখেছেন যেটার ব্যাখ্যা করা মুশকিল।

কাকু: এই প্রশ্নটা আশা করছিলাম। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। তার ব্যাখ্যা নেই বলব না, তবে বিষয়টা অদ্ভুত এবং জটিল।

পারমিতা: বলুন না, সবার গল্পই তো হল, আপনারটাই বা বাকি থাকে কেন?

কাকু: অনিকেতবাবু, যতক্ষণ না আপনার গাড়ি আসছে ততক্ষণ এটা শুনেই যান।

অনিকেত: কী আর করব বলুন, আপাতত আমি অসহায়। আর ভাবতে পারছি না, কপালে যা আছে হবে।

কাকু: পুরো ঘটনাটা আমি শুনি আমার এক ঘনিষ্ঠ ডাক্তার বন্ধুর কাছে। তোরা চিনবি না, তবুও নামটা পরিবর্তন করেই বলি। ধরে নে, ড. ঘোষ, অমূল্য ঘোষ। বছর তিরিশ আগে কলকাতার এক বড় মেডিকাল কলেজে অমূল্য আর তার স্ত্রী পরমার গল্প।

(বাঁদিকের আলো নিভে, ডানদিকের আলো জ্বলে। অমূল্য ও পরমা প্রবেশ করে। তাদের হাতে ব্যাগ, ঝোলা, স্যুটকেস। দুজনে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।)

পরমা: বাঃ, বেশ তো!

অমূল্য: বেশ? এটা একটা থাকার জায়গা হল?

পরমা: কেন, মন্দ কী? আমার তো দারুণ লাগছে।

অমূল্য: কতগুলো হাউজিং ফাঁকা পড়ে আছে, জানো? সরি পরমা, আমি তোমাকে একটা বাজে জায়গায় এনে তুললাম।

পরমা: বাহ রে, হাউজিংগুলো পার্মানেন্ট এমপ্লয়িদের জন্য, তুমি তো এখানে ইনটার্ন, তোমার তো ওগুলো পাওয়ার কথা নয়। আর আমার জন্য ভেবো না, এই দ্যাখো-না কী সুন্দর খোলা ছাদ।

অমূল্য: এই ছাদটাই তো সবচেয়ে ভয়ংকর, এতো বড় একটা বিল্ডিংয়ের ছাদ, আর তার কোণে একটামাত্র ঘর। এইভাবে মানুষ থাকতে পারে?

পরমা: তুমি-না সব কিছুতেই খুঁত ধরো। এই দ্যাখো, চেয়ারটেবিলগুলো কী পোক্ত, নিশ্চয়ই সেগুন কাঠের হবে।

অমূল্য: যত্তসব আদ্দিকালের ফার্নিচার, এই আয়নাটা তো স্বাধীনতার আগে থেকে আছে।

পরমা: তুমি এসবের কিছুই বোঝো না। এত ভালো কাঠের জিনিস এখন দাম দিলেও পাওয়া যায় না। দ্যাখো দ্যাখো, এই বইয়ের আলমারিটা। কত বই!

অমূল্য: বই, কীসের বই দেখি, হুম এ তো দেখছি সবই মেডিসিনের, বাহ নট আ ব্যাড কালেকশন!

পরমা: একটা জিনিস তো ভালো পেলে, আর কমপ্লেন কোরো না। ঠিক আছে, নাও এবার মালপত্রগুলো বার করো তো দেখি।

অমূল্য: এই কালেকশনটা পেয়ে তো খুব সুবিধে হল। ভাবছিলাম লাইব্রেরি থেকে নিয়ে আসতে হবে পড়ার জন্য। (বইয়ের পাতা উলটে, নিজের মনে) কৃষ্ণেন্দু স্যান্যাল, এম.বি.বি.এস, উনিও তাহলে আমারই মতো ইন্টার্ন ছিলেন মনে হচ্ছে। চাকরি পাওয়ার পরে আর বইগুলোর দরকার পড়েনি, তাই রেখে গেছেন। ভালোই উপকার করলেন দাদা।

পরমা: এই হল? বইটা রাখো এবার। বাসনকোসন বার করি, সব গুছিয়ে রাখতে হবে তো।

অমূল্য: খুব বেশি গোছগাছ কোরো না পরমা, এখানে আমাদের বেশিদিন থাকতে হবে না। ভেক্যানসিটা পরের মাসেই ঘোষণা হবে, ড. সেনগুপ্তের সঙ্গে কথা বলে এসেছি। আর সেই চাকরিটা আমায় পেতেই হবে।

পরমা: তুমি বেশি চিন্তা কোরো না, কিছু না কিছু একটা ভালো পাবেই।

অমূল্য: না পরমা, এই পজিশনটাই আমায় পেতে হবে, যে-কোনওভাবেই হোক।

(পরমা জিনিসপত্র গোছাতে থাকে। অমূল্য ঘরের ভেতরে ঢোকে। পরমুহূর্তেই হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরোয়, পরমাকে গুডবাই বলে বেরিয়ে যায়। নার্সের আগমন।)

সিস্টার: নমস্কার ড. ঘোষ। জিনিসপত্র সব এসে গেছে? এর মধ্যেই তো অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন দেখছি। কিছু দরকার হলে বলবেন। আমরা নীচের ফ্লোরেই আছি, ৩০৮-এ। কোনও অসুবিধে হলে বলবেন কিন্তু। আচ্ছা আসি এখন। একদিন সময় করে আসব। (প্রস্থান।)

পরমা: আসবেন কিন্তু। আমি সারাদিন ঘরেই আছি।

(পরমা হাতে একটা বই নিয়ে চেয়ারে বসে।)

(কৃষ্ণেন্দু এবং শশাঙ্ক ঘরে প্রবেশ করে। দুজনেই শিক্ষিত ভদ্রযুবক, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। কৃষ্ণেন্দুর হাতে একটা চিঠি।)

শশাঙ্ক: কী রে আবার বাড়ির চিঠি নাকি?

কৃষ্ণেন্দু: (চিঠি পড়তে পড়তে) হ্যাঁ, আবার সেই একই প্রশ্ন। চাকরিটা কবে পাকা হবে? কবে আরেকটু বেশি টাকা পাঠাতে পারব? আরে বাবা, চাকরি কি গাছে ফলে? না আমার হাতের মুঠোয় আছে, শখ করে নিচ্ছি না?

শশাঙ্ক: ওঁরা এত দূর থেকে কীভাবে বুঝবেন বল? এত চটিস না।

কৃষ্ণেন্দু: সে আর তুই বুঝবি কী করে? এই পার্মানেন্ট পজিশনটা আমায় পেতেই হবে। ইন্টার্নশিপের টাকায় এখানে থেকে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে আর চলছে না। বোনের বিয়ে, বাড়ি সারানো, মায়ের অসুখ, এই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে যদি এই চাকরিটা পেয়ে যাই।

শশাঙ্ক: তুই যা আদাজল খেয়ে লেগেছিস, না পেয়ে যায় কোথায়?

কৃষ্ণেন্দু: কেন, আমি তো একা নই, আরও যোগ্য প্রার্থী আছে।

শশাঙ্ক: যেমন আমি, তা-ই তো? চাকরিটা নেহাত আমারও দরকার, নইলে তোর কম্পিটিশন একটু কমিয়ে দিতাম।

কৃষ্ণেন্দু: তোর আবার দরকার? এই কলকাতা গভর্নমেন্ট হসপিটালের রেসিডেন্ট সার্জনের পার্মানেন্ট পোস্টটা শশাঙ্ক দত্তের শখ, আর সেটা কৃষ্ণেন্দু স্যান্যালের জীবন-মরণের প্রশ্ন।

শশাঙ্ক: তুই না বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস। একটা চাকরি পাওয়া বা না-পাওয়ায় জীবন শেষ হয়ে যায় না। হয়তো আরও ভালো কোনও চাকরি অপেক্ষা করে আছে।

কৃষ্ণেন্দু: বললাম না, তুই আমার পরিস্থিতিটা বুঝবি না। মা বোন আমার মুখ চেয়ে বসে আছে। যদি চাকরিটা না পাই, বাই চান্স না পাই, বাড়ি ফিরে কী বলব, বল?

শশাঙ্ক: বুঝলাম, কিন্তু তুই আমার উপর এত চটছিস কেন? আমি কী করলাম?

কৃষ্ণেন্দু: তুই আবার নতুন করে কী করবি? যা করার তো জন্মমুহূর্তেই করে ফেলেছিস প্রকাণ্ড ধনী স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বাড়িতে জন্ম নিয়ে। তুই ধরে নে যদি এই চাকরিটা না পাস, এমনকী ডাক্তারি পেশায় কোনও চাকরিই না পাস, কোনও পরোয়া নেই। স্রেফ বাপের গয়নার দোকানে গিয়ে বসে পড়বি। এখানে সারা দিনরাত মড়া ঘেঁটে যা মাইনে পাবি, দিনভর গদিতে বসে তার দশগুণ কামাবি হেসেখেলে। কী, ঠিক বলিনি?

শশাঙ্ক: এতদিন ধরে তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু তুইও আমায় বুঝলি না। ওই সারাজীবন সোনারুপো টাকাপয়সা সুদ আসল এই ঘুর্ণাবর্ত থেকে বেরোতে চেয়েছি বলেই তো এত পরিশ্রম করে মেডিক্যাল পড়া। নইলে তো কবেই ঢুকে পড়া যেত।

কৃষ্ণেন্দু: ভগবানের এ কী লীলা, যার আছে সে কিছুই চায় না। আর যার নেই, সে মাথা খুঁড়েও কিছু পায় না। যাক, তোর সঙ্গে বকবক করে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, একটু ফিজিওলজিটা ঝালিয়ে নিই। ইন্টারভিউতে কী থেকে কী প্রশ্ন করবে তার ঠিক আছে?

শশাঙ্ক: ইন্টারভিউ? তার তো এখনও দিনক্ষণই ঠিক হল না।

(কৃষ্ণেন্দু মুখে আঙুল রেখে চুপ করতে বলে।)

শশাঙ্ক: এই দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজেই তোর মাথাটা গেছে। চ, একটু ঘুরে আসি।

কৃষ্ণেন্দু: কোথায়?

শশাঙ্ক: জানিস না, আজ সন্ধেয় এই ডক্টরস’ অ্যাসোসিয়েশনের একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে।

কৃষ্ণেন্দু: ওরে বাবা, সংস্কৃতি। তা এই ক-দিনে এখানে এসেও জুটিয়ে ফেললি।

শশাঙ্ক: ওই আর কী, ড. সেনগুপ্ত দুপুরে বললেন, আমিও একটু উৎসাহ দেখালাম। তাই আসতে বললেন।

কৃষ্ণেন্দু: তুইও কিছু করছিস নাকি, কবিতাটবিতা?

শশাঙ্ক: ভাবছি কী আবৃত্তি করা যায়? দেবতার গ্রাসটা বড্ড বড় হয়ে যাবে। দেখি অগত্যা দুঃসময়।

কৃষ্ণেন্দু: দুঃসময় তো তোমার নয়, আমার। তোমার তো সুসময় আগচ্ছতি। এইসব সংস্কৃতি কচলিয়ে পপুলার হয়ে যাও, তারপর তোমার চাকরি পাওয়া ঠেকায় কে?

শশাঙ্ক: পাগলামি বন্ধ কর, যাবি তো চল, নইলে আমি বেরোচ্ছি।

কৃষ্ণেন্দু: না থাক, তুইই যা, তোদের সব সখী-সখী রবীন্দ্রনাথ এখন মুখে রুচবে না। বন্ধু, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।

শশাঙ্ক: (হেসে ফেলে) চলি তাহলে, রাতে দেখা হবে। (প্রস্থান)

(কৃষ্ণেন্দু বই নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।)

(দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ পাওয়া যায়। চেয়ারের উপর তন্দ্রাচ্ছন্ন পরমা জেগে উঠে।)

অমূল্য: (বাইরে থেকে) “পরমা পরমা”

(পরমা উঠে দরজা খোলে। অমূল্য হন্তদন্ত হয়ে ঘরে প্রবেশ করে।)

অমূল্য: ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি, এতক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছি।

পরমা: একটু চোখ লেগে গিয়েছিল, একটা অদ্ভুত স্বপ্নমতো দেখলাম জানো?

(অমূল্য এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। চিন্তিত মুখচোখ।)

পরমা: কী হয়েছে তোমার? কী হয়েছে, বলো?

অমূল্য: ড. সেনগুপ্ত যে এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন, সেটা যদি জানতাম।

পরমা: কী করলেন ড. সেনগুপ্ত?

অমূল্য: ইন্টার্নশিপে যখন ঢুকলাম তখন এমন বললেন যেন ক-দিন পরেই পাকা হয়ে যাবে। ইন্টারভিউ প্রসেসটা নাকি শুধু ফরম্যালিটি। আর এখন শুনছি পজিশনটা সবার জন্য ওপেন, বাইরে থেকেও অনেকে দরখাস্ত করছে।

পরমা: উনি কিন্তু তোমায় একবারও বলেননি। তুমি নিজের মনেই ধরে নিয়েছিলে।

অমূল্য: সে ভেবে আর কী হবে, এখন তো আদাজল খেয়ে লাগতে হবে। দেখি ফিজিওলজির বইটা নিয়েই বসি, ইন্টারভিউতে কোত্থেকে কী প্রশ্ন করবে বলা যায় না।

(পরমা শুনে একটু অবাক হয়, উঠে ভেতরে যায়।)

অমূল্য: আর হ্যাঁ, তোমার বাবা আজ সকালে ফোন করেছিলেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খবর নিলেন, কবে ইন্টারভিউ, কী প্রসেস, কবের মধ্যে জানতে পারবে, শুধু স্যালারিটা জিজ্ঞেস করতে বাকি রেখেছিলেন। তখনও তো ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারটা জানিনি, বলে দিলাম চাকরিটা পেয়েই গেছি।

পরমা: তুমি ওভাবে বলছ কেন? বাবা নিশ্চয়ই এমনিই খোঁজখবর নিতে ফোন করেছিলেন।

অমূল্য: সে আর তুমি কী বুঝবে রাজনন্দিনী। এবার তো শ্বশুরবাড়িতে মানসম্মানের প্রশ্ন হয়ে গেল। চাকরিটা আমায় পেতেই হবে। যেভাবেই হোক, বাই হুক অর বাই ক্রুক।

পরমা: এরকম বলছ কেন? তুমি ভালো স্টুডেন্ট, প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেবে। তারপর যার সবচেয়ে ভালো হবে সেই চাকরিটা পাবে। মে দ্য বেস্ট ম্যান উইন।

অমূল্য: তোমার পক্ষে কথাটা বলা সহজ। কিন্তু আমার কাছে এই চাকরিটা জীবন-মরণের ব্যাপার।

পরমা: এই রকম বোলো না প্লিজ। এত টেনশন কোরো না। ঠান্ডা মাথায় পড়াশুনো করো, দেখবে তুমি নিশ্চয়ই পাবে।

অমূল্য: তোমার কথাই যেন সত্যি হয়। একটু কফি খাওয়াবে, আজ রাত জেগে পড়তে হবে। (অমূল্য বই বার করে।) আচ্ছা তুমি একটা স্বপ্নের কথা বলছিলে না?

পরমা: ও তেমন কিছু নয়, আসলে তুমি সারাদিন এই ইন্টার্নশিপ, পার্মানেন্ট পজিশন— এইসব বলতে থাকো, আমিও স্বপ্নের মধ্যে সেটাই দেখেছি।

অমূল্য: তা কী দেখলে, আমি চাকরিটা পাচ্ছি?

পরমা: না না, সেরকম না। অন্য দুজন ডাক্তার বুঝলে, এই তোমারই মতন। এই রেসিডেন্ট সার্জনের পোস্টটার জন্য দরখাস্ত করছে। একজন তো পুরো তোমারই মতন উঠেপড়ে লেগেছে।

অমূল্য: আশ্চর্য, তারপর কী হল?

পরমা: কী আবার হবে, তোমার দরজা ধাক্কানোতে আমার ঘুম ভেঙে গেল।

অমূল্য: দ্যাখো, স্বপ্নে যদি কিছু প্রশ্নটশ্ন জানতে পারো, মনে করে নোট করে রেখো। কী জানি, যদি লেগে যায়।

পরমা: ইয়ারকি মেরো না। আমি সত্যি স্বপ্নটা দেখছিলাম। কী যেন নাম ছিল ওদের। শশাঙ্ক আর কৃষ্ণেন্দু।

(অমূল্য চমকে উঠে, বইয়ের সামনের পাতাটা খুলে দ্যাখে।)

পরমা: কৃষ্ণেন্দু স্যান্যাল বোধহয়।

অমূল্য: স্ট্রেঞ্জ!

পরমা: হ্যাঁ, কী অদ্ভুত স্বপ্ন বলো তো?

অমূল্য: সত্যিই অদ্ভুত!

(অমূল্য উঠে যায়, পরমাকে গুডবাই জানিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পরমা ঘরের কাজ করতে থাকে। অমূল্য সিস্টারের সঙ্গে কথা বলে।)

অমূল্য: সিস্টার, আপনি কি ওই ডক্টর কৃষ্ণেন্দু স্যান্যালের ঘটনাটা…

সিস্টার: আপনি জানেন?

অমূল্য: শুনলাম, অন্যান্য ডাক্তারদের কাছে।

সিস্টার: আপনাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?

অমূল্য: না, আমার কোনও সমস্যা নেই, তবে পরমার…

সিস্টার: কী হয়েছে মিসেস ঘোষের?

অমূল্য: না, তেমন কিছু না। তবে মনে হয় উনিও জানতে পেরেছেন। আপনি কি কিছু বলেছেন পরমাকে?

সিস্টার: না তো, আমি এই ব্যাপারে কিছুই বলিনি।

অমূল্য: তাহলে অন্য কোনও সিস্টার বলেছেন বোধহয়। যা-ই হোক, আশা করি আর বেশিদিন এখানে থাকতে হবে না, চলি তাহলে, বাই।

সিস্টার: গুডবাই, ড. ঘোষ।

(সিস্টার এবং অমূল্যের প্রস্থান। ঘরের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে পরমা আয়নার সামনে এসে বসেছে। মুখে গানের কলি। ঘরের ভেতরের দিক থেকে কৃষ্ণেন্দু আর শশাঙ্ক বেরিয়ে আসে। শশাঙ্ক আয়নার উলটো দিকে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ায়। তার মুখে একই গান। কৃষ্ণেন্দু বই নিয়ে বসে। খাতায় নোট করতে থাকে।)

শশাঙ্ক: কী রে, আজ বেরোবি না?

কৃষ্ণেন্দু: কাল ইন্টারভিউ, আজ ছুটি নিয়েছি। লাস্ট মিনিট প্রিপারেশন।

শশাঙ্ক: কী পড়ছিস, দেখি।

(কৃষ্ণেন্দু খাতা বই বন্ধ করে দেয়। শশাঙ্ককে দেখতে দেয় না।)

শশাঙ্ক: বাবা, এত কী রহস্য?

কৃষ্ণেন্দু: বলতাম যদি না তুই আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতিস।

শশাঙ্ক: তাও ভালো, শত্রু বলিসনি। কিন্তু একা কি আমিই? কালকে কি আর কেউ পরীক্ষা দিচ্ছে না?

কৃষ্ণেন্দু: দিচ্ছে, তবে আমার কাছে খবর আছে ড. সেনগুপ্ত আন্ড কোং একটা শর্টলিস্ট করে ফেলেছেন, তাতে দুটি মাত্র নাম, তুমি এবং আমি।

শশাঙ্ক: এসব খবর পাস কোথা থেকে?

কৃষ্ণেন্দু: বলব কেন, ফ্রি-তে তো কিছুই হয় না বাবা, গাঁটের কড়ি খরচা করতে হয়।

শশাঙ্ক: আন্দাজ করতে পারি অবশ্য, হেড ক্লার্ক বড়ালবাবুর সঙ্গে শেষের ক-দিন দহরম-মহরমটা একটু বেশিই দেখছিলাম। তা এই খবরে তোর তো বিশেষ সুবিধে হল না।

কৃষ্ণেন্দু: শুধু যে এটুকুই জানি সেটা তো বলিনি। এক্সটারনাল ইন্টারভিউয়ারের নামটা আর তার সঙ্গে সঙ্গে তার স্পেশালাইজেশন, পছন্দের প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি ইত্যাদি।

শশাঙ্ক: তুই যে এতটা অসৎ হতে পারিস, সেটা আমার জানা ছিল না। আমরা দুই বন্ধু, একজন চাকরিটা পাবে, অন্যজনকে সেটা মেনে নিতে হবে। কারণ যে পরীক্ষাটা ভালো দেবে, তারই তো পাওয়া উচিত। মে দ্য বেস্ট ম্যান উইন।

কৃষ্ণেন্দু: তোকে তো বলেইছিলাম, এই চাকরিটা আমার চাই-ই। যে ভাবেই হোক। বাই হুক অর বাই ক্রুক।

শশাঙ্ক: একটা চাকরির জন্য তুই এতটা নীচে নামতে পারলি! ঠিক আছে, আমি আজই ইস্তফা দিয়ে চলে যাই। তোর আর কোনও মাথাব্যথা থাকবে না।

কৃষ্ণেন্দু: না না, তা কেন। তুই অবশ্যই ইন্টারভিউ দিবি। নইলে তো এই চাকরিটা পাওয়ার গৌরবটাই কমে যাবে। দুজনেই পরীক্ষা দিই, তারপর মে দ্য বেস্ট ম্যান উইন। কেমন?

(শশাঙ্ক বেরিয়ে যায়। কৃষ্ণেন্দু আবার নোটবই নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। পরমার চমক ভাঙে। সে তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো ঘুরতে থাকে। বইয়ের আলমারি থেকে বই বার করে তার প্রথম পাতার লেখা নাম দেখে। অমূল্য এসে দরজা নক করে।)

পরমা: এসো, আজ এত দেরি হল?

অমূল্য: কালকেই তো ইন্টারভিউ। তার সব ব্যবস্থা করে এলাম।

পরমা: কীসের ব্যবস্থা?

অমূল্য: চাকরিটা পাকা করতে হবে কিনা, তাই কোনও কিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না।

পরমা: তুমি এত রাত জেগে জেগে পড়ছ, এত খাটছ। তুমি নিশ্চয়ই ভালো পরীক্ষা দেবে।

অমূল্য: শুধু যদি তাতেই হত পরমা, তাহলে এত ভাবতে হত না। যা যুগ পড়েছে, প্রতিযোগিতাটাও তো মাথায় রাখতে হবে।

পরমা: কে তোমার প্রতিযোগী?

 অমূল্য: থাক, অত তোমার জেনে কাজ নেই।

পরমা: কেন, আমায় বলবে না কেন? আমি কি আর কাউকে বলতে যাব নাকি?

অমূল্য: একদম গোপন ব্যাপার কিন্তু, পরমা। ডাক্তার, নার্স কাউকে কখনও ঘুণাক্ষরেও বলা চলবে না। জানতে পারলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

পরমা: প্রমিস, আমি কাউকে বলব না।

অমূল্য: হেডক্লার্ক বড়ালবাবুকে তো তুমি চেনো। ওঁকেই একটু পটিয়ে আদায় করলাম, কারা কারা দরখাস্ত করেছে তাদের লিস্ট। একটু টাকা খসল, যাকগে। যা বুঝলাম, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আর একজনই, ড. অজয় ভট্টাচার্য। এর আবার বিলিতি ডিগ্রি। অভিজ্ঞতা যা দেখলাম, নেহাত বাজে ইন্টারভিউ না দিলে এর দিকেই পাল্লা ভারী।

পরমা: এবার কী করবে?

অমূল্য: সেটাই ভাবছি, খবর নিয়েছি ড. ভট্টাচার্য শুধু এখানেই না, আরও কয়েকটা হাসপাতালেও পরীক্ষা দিয়েছেন। আমার যা মনে হয় উনি একটার বেশি চাকরির অফার পাবেন।

পরমা: কিন্তু তা হলেও তো উনি এই পোস্টটাই নেবেন। তুমিই তো বলো, এই চাকরিটাই মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস। সেটা নিশ্চয়ই উনিও জানেন।

অমূল্য: সে তো বটেই। কিন্তু এটা না পেলে ওর খুব একটা বড় ক্ষতি হবে না। কিন্তু যদি আমি না পাই, আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে।

পরমা: তাহলে এখন কী উপায়?

অমূল্য: ধরো যদি কাল সকালে ওঁর একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনা হয়, যাতে উনি ইন্টারভিউতে পৌঁছতেই না পারেন, তাহলে?

পরমা: তার মানে, তুমি এমন একটা প্ল্যান করছ, যাতে উনি এখানে আসতেই না পারেন। ছিঃ ছিঃ, একটা চাকরির জন্য তুমি এতটা নীচে নামতে পারলে?

অমূল্য: তোমায় তো বলেইছিলাম, এই চাকরিটা আমার চাই-ই, যেভাবেই হোক। বাই হুক অর বাই ক্রুক।

(শেষ বাক্যটা বলার সময় কৃষ্ণেন্দু বেরিয়ে এসে অমূল্যের পিছনে দাঁড়ায়। তারা একসঙ্গে সংলাপ উচ্চারণ করে।)

(অমূল্য এবং কৃষ্ণেন্দুর প্রস্থান, পরমা উত্তেজিতভাবে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসে। সিস্টারকে ডাকে।)

পরমা: সিস্টার, আমাদের কোয়ার্টারটায় আগে কারা থাকতেন?

সিস্টার: কেন বলুন তো, কোনও অসুবিধে হচ্ছে?

পরমা: না না, এমনিই কৌতূহল হচ্ছে, আসলে অনেক পুরোনো ডাক্তারি বইপত্র আছে তো।

সিস্টার: থেকেছেন অনেকে আগে, ছাত্রটাত্র হবে, ঠিক মনে নেই আমার।

পরমা: আপনি সত্যি বলছেন না, আপনার সবই মনে আছে। আমিই বলি, এই যে রেসিডেন্ট সার্জনের পোস্টটা, যার জন্য আমার স্বামী পরীক্ষা দিচ্ছেন, সেটার জন্য বেশ কিছু বছর আগে জানপ্রাণ লড়িয়েছিলেন করেছিলেন আরও দুজন ইনটার্ন, ড. কৃষ্ণেন্দু সান্যাল আর ড. শশাঙ্ক দত্ত।

সিস্টার: আপনি নামগুলো জানলেন কীভাবে? ড. ঘোষ আপনাকে বলেছেন?

পরমা: কৃষ্ণেন্দু সান্যালের একটু আর্থিক সমস্যা ছিল, তাই এই চাকরিটার জন্য তিনি জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিলেন, এমনকী অসৎ উপায় অবলম্বন করতেও পিছপা হননি।

সিস্টার: আপনি তো সবই জানেন দেখছি। কিন্তু কীভাবে?

পরমা: না, সবটা জানি না। শেষপর্যন্ত কী হবে? চাকরিটা কে পায়?

সিস্টার: অদ্ভুত, আপনি এত কিছু জানেন, কিন্তু আসল ঘটনাটাই জানেন না!

পরমা: সেটাই তো জানতে চাইছি, দয়া করে বলুন, সব কিছু খুলে বলুন।

সিস্টার: আপনারা যখন ওই কোয়ার্টারটাতেই আছেন, তখন বোধহয় পুরো ঘটনাটাই জানা ভালো। ইন্টারভিউয়ের দিন শশাঙ্কবাবুরটা হয়ে যায় দুপুরের দিকে, আর ড. স্যান্যালেরটা ছিল সবার শেষে। শশাঙ্কবাবু ঘরে ফিরে জামাকাপড় বইপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, এইসময়…

(বলতে বলতে শশাঙ্ক প্রবেশ করে ব্যাগ গোছাতে থাকে। ঘরে প্রবেশ করে কৃষ্ণেন্দু। রাগে ঘৃণায় উদ্‌ভ্রান্ত।)

কৃষ্ণেন্দু: তুই যে এতবড় একটা মিচকে শয়তান, সেটা যদি আগে জানতাম!

শশাঙ্ক: কী আজেবাজে বলছিস!

কৃষ্ণেন্দু: ড. সেনগুপ্তকে পটিয়ে যে চাকরিটা আগে থেকেই পাকা করে রেখেছিস সেটা তো বুঝতে পারিনি। আর মুখে কত বড় বড় কথা, মে দ্য বেস্ট ম্যান উইন! শালা হারামির বাচ্চা!

শশাঙ্ক: মুখ সামলে কথা বল। তোর জন্য এই চাকরির উপর বিরক্তি ধরে গেছে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না, আমি চললাম।

কৃষ্ণেন্দু: আমার কেরিয়ারের সর্বনাশ করে উনি এখন চললেন!

শশাঙ্ক: শোন, আমি তোর কোনও ক্ষতি করিনি। আর ওসব লোককে ধরেটরে চাকরি পাওয়ার ইচ্ছে আমার কোনওদিনই ছিল না, হবেও না। এইসব নোংরামি তোরই সাজে।

কৃষ্ণেন্দু: ন্যাকামি হচ্ছে? আমি ইন্টারভিউ দিতে ঢুকেই বুঝেছি ব্যাটারা আগে থেকেই তোকে চয়ন করে বসে আছে। মুখের হাসি দেখেই বুঝলাম, আমার সঙ্গে কথা বলাটা শুধুমাত্র ভণ্ডামি। শালা, মাথাটা গরম হয়ে গেল, সহজ জানা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারলাম না।

শশাঙ্ক: সেটা তো আমার দোষ নয়।

কৃষ্ণেন্দু: দোষ কেন হবে? সবই তো তোমার গুণ। আর সেই গুণেই সবাই মুগ্ধ।

শশাঙ্ক: তোর যা ভাবার তুই ভাব, আমার কিছু বলার নেই। (গোছানো শেষ, ব্যাগের চেন লাগায়।) এই চাকরি আমার চাই না, আমি চললাম।

কৃষ্ণেন্দু: যাবে আর কেন? চাকরি তো নাচতে নাচতে তোমার হাতে এসে পড়ল বলে। আর আমি এত খেটেখুটে পাগল হয়ে গেলাম, আমার ভাগ্যে শুধুই ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা! সব কিছু তোর জন্য, এই সব কিছুর জন্য দায়ী তুই।

শশাঙ্ক: গুড বাই, ভালো থাকিস। (ব্যাগ নিয়ে বেরোতে যায়, কিছুটা এগোতে কৃষ্ণেন্দু পেছন থেকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে, শশাঙ্ক মাটিতে পড়ে যায় আর্তনাদ করে। কৃষ্ণেন্দু পাগলের মতো লাঠি চালাতে থাকে। আর্তনাদ থেমে যায়।)

সিস্টার: কী হল, কী হল, কী হয়েছে? শশাঙ্কবাবু, শশাঙ্কবাবু?

(সিস্টার একবার শশাঙ্ক, একবার কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকায়। কৃষ্ণেন্দুর হাত থেকে লাঠি পড়ে যায়। সে পালাতে যায়।)

সিস্টার: ধরুন ধরুন। (চেঁচিয়ে)

(কৃষ্ণেন্দু দৌড়ে ফিরে আসে, উলটোদিকে যায়। ঘরের ভেতরের দিকে। একটা উঁচু জায়গায় ওঠে। সিস্টার ছুটে ধরতে আসে। কৃষ্ণেন্দু নীচে লাফিয়ে পড়ে। আর্তনাদ। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়। আলো জ্বললে দেখা যায় আয়নার সামনে পরমা বসে আছে।)

(অমূল্য প্রবেশ করে। চিন্তিত বিধ্বস্ত মুখ।)

অমূল্য: ইন্টারভিউটা ভালো হলো না পরমা, বুঝতে পারছি না এরপর কী করব?

পরমা: আমি জানি, তুমি কী করবে। তুমি ড. ভট্টাচার্যকে খুন করে চাকরিটা আদায় করবে।

অমূল্য: খুন! কী আজেবাজে কথা বলছ তুমি?

পরমা: কিন্তু ড. ভট্টাচার্যকে খুন করলে তুমি রেহাই পাবে না অমূল্য। তোমাকেও মরতে হবে।

অমূল্য: তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?

পরমা: পাগল আমি হইনি, পাগল হয়েছ তুমি, এই চাকরিটার লোভে আর ড. ভট্টাচার্যের উপর ঘৃণায় আর রাগে। এই অভিশপ্ত চাকরির মোহ তোমায় পাগল করে তুলেছে। আরেকটা খুন না করে তুমি থামবে না। কিন্তু সেটা আমি হতে দেব না।

অমূল্য: আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি কী বলছ?

পরমা: সে আর কী করে বুঝবে তুমি, কৃষ্ণেন্দু সান্যাল? শশাঙ্ক দত্তকে তুমি কোনওদিনই বুঝতে পারোনি। তাই তোমার এতদিনের বন্ধুকে নৃশংসভাবে খুন করতেও তোমার হাত কাঁপেনি।

অমূল্য: শশাঙ্ক, কৃষ্ণেন্দু! তোমার মাথায় কি ভূত চাপল নাকি? সিস্টার সিস্টার (বাইরের দিকে গিয়ে ডাকতে যায়।)

পরমা: পালাচ্ছ কোথায়? আমি তোমায় পালাতে দেবো না। শশাঙ্ক দত্তের খুনের প্রতিশোধ আমি নেবই। (পরমা অমূল্যের কলার ধরে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে।)

অমূল্য: কি করছ কী? পরমা সামলাও নিজেকে, পরমা।

(অমূল্যের পিছনে এসে দাঁড়ায় কৃষ্ণেন্দু, পরমার পিছনে শশাঙ্ক। তার হাতে চেয়ার তুলে নেয়)

পরমা: কৃষ্ণেন্দু স্যান্যাল, এই নাও তোমার পাপের শাস্তি। (চেয়ার ছুড়ে মারে, অমূল্য মাথা নামায়, চেয়ার গিয়ে লাগে আয়নায়। শব্দ করে আয়না ভেঙে যায়। শশাঙ্ক ও কৃষ্ণেন্দু পিছোতে পিছোতে ভেতরে ঢুকে যায়। পরমা সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অমূল্য এসে তাকে ধরে। মঞ্চ অন্ধকার হয়। সকলের প্রস্থান।)

(একটু পড়ে বাঁদিকের আলো জ্বলে।)

পারমিতা: পরমার অবস্থাটা ভাব, কী ভয়ংকর। ভাগ্যিস আয়নাটা ভাঙল, নইলে তো ওর ঘোরই কাটত না।

অনিকেত: কাচ ভাঙল, কাচ!

(মঞ্চ আবার অন্ধকার হয়।)

দিব্যেন্দু: যা, এখনই কারেন্টটা যেতে হল! এই দ্যাখো তো, ঘরে মোমবাতিটাতি আছে কি না।

(সবাই মোবাইলের আলো জ্বালায়।)

অনিকেত: কাচ ভাঙার পরে সব অন্ধকার হয়ে যায়।

কাকু: আপনার সব কথাই তাহলে ফলে যাচ্ছে।

অনিকেত: আপনি বিশ্বাস করছেন তাহলে শেষপর্যন্ত?

কাকু: জীবনের শেষপ্রান্তে এসে স্বীকার করতেই হচ্ছে, সব কিছুকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

দিব্যেন্দু: তুমিও হার স্বীকার করে নিলে কাকু?

কাকু: আবার নতুন করে গবেষণা শুরু করতে হবে।

পারমিতা: এই বৃষ্টিটা একটু থেমেছে, চলো বেরিয়ে পড়ি। মোড় থেকে ট্যাক্সিফ্যাক্সি কিছু পাওয়া যাবে।

বিশ্ব: যাবেন নাকি আমাদের সঙ্গে? কিছু দূর এগিয়ে দিতে পারি।

অনিকেত: হ্যাঁ, তা-ই ভালো। আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল বলতে পারছি না।

দিব্যেন্দু: কিছু মনে করবেন না, আমরা প্ল্যানিংটা অন্য কাউকে দিয়ে করাব।

মীরা: বোধহয় আপনার সঙ্গে আর দেখা না হওয়াই ভালো।

অনিকেত: মনে হচ্ছে ওঁর সঙ্গে আরেকবার দেখা হতেই হবে।

বিশ্ব: থাক দাদা, একটু চুপচাপ থাকুন। আপনি এখন মুখ খুললেই ভয় করছে।

(বিশ্ব, পারমিতা, অনিকেত বেরিয়ে যায়। ওদের ছাড়তে মীরা ও দিব্যেন্দুও নামে। মঞ্চে একা কাকু।)

কাকু: ভালো থাকবেন অনিকেতবাবু, আজ আপনার কাছে আমি হেরে গেলাম। এই ভবিষ্যদ্‌বাণী একের পর এক মিলে যাওয়া কীভাবে সম্ভব? কীভাবে? এ হতে পারে না, পারে না। নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনও কারণ আছে? আমাকে খুঁজে পেতেই হবে। ‘ভয় কেন কবি? আছে আশা, সততায় স্থির করো মন।’ স্থির স্থির, স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ সব গুলিয়ে যাচ্ছে যে।

(অনিকেত আবার ফিরে আসে)

অনিকেত: বললাম না আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে।

কাকু: আপনি ফিরলেন কেন? চলে যান।

অনিকেত: আপনাকে আর বিরক্ত করব না, ছাতাটা ফেলে গেছিলাম, সেটা নিতে এলাম।

(অনিকেত ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকেন কাকু। অনিকেত ছাতা নিয়ে ফিরে আসে। বেরোবার মুখে ফিরে আসে।)

অনিকেত: সকলের সামনে কথাটা মনে হলেও বললাম না, জানি না ক-জন জানেন?

কাকু: আবার কী কথা?

অনিকেত: আপনার গল্পটা আপনার বাবা-মায়ের, তা-ই না।

কাকু: আপনি কী করে জানলেন?

অনিকেত: সেটাই যদি জানতাম! সম্ভবত আপনার মা কোনওদিন ওই দুঃস্বপ্ন থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাননি। আর সেই কারণেই আপনার এই পেশা— এই গবেষণা। ঠিক বলছি তো?

কাকু: আপনি চলে যান, চলে যান, আমি আর কিছু শুনতে চাই না।

অনিকেত: নমস্কার। নাম ঠিকানা জানেন, এর পরে দেখা হবে কি না আপনার হাতে। চলি।

(অনিকেতের প্রস্থান। কাকু আবার মঞ্চে একা।)

কাকু: আছে, আছে, সব আছে। ভূত আছে, ভগবান আছে, আত্মা আছে, পরলোক আছে। ওয়ার্ম হোল, ইটি, টাইম লুপ— সব আছে। আছে, আছে, সব আছে, সব সত্যি।

(বড় ঘড়ির ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আলো আবার জ্বলে ওঠে। দিব্যেন্দু আর মীরা হাসতে হাসতে প্রবেশ করে, সঙ্গে চিত্রা, যেন কিছুই হয়নি।)

মীরা: তোদের বাড়িটা কী সুন্দর সাজিয়েছিস রে।

চিত্রা: মা নিজে দাঁড়িয়ে সব খুঁটিনাটি করিয়েছে, যা পারফেকশনিস্ট না!

মীরা: তোর মা খুব গুণী।

চিত্রা: আজ আসি, আন্টি।

মীরা: কাল সন্ধেয় আসতে ভুলিস না।

চিত্রা: ওকে। বাই আন্টি। বাই আঙ্কল।

দিব্যেন্দু: বাই। (চিত্রা বেরিয়ে যায়, মীরা, দিব্যেন্দু ঘরে প্রবেশ করে।)

দিব্যেন্দু: কী, কিছু আইডিয়া মাথায় এল? ডিজাইন?

মীরা: ধুর, আমি তো আরও ঘাবড়ে গেলাম, কালার-প্যালেট হেনতেন। এতশত আমি জানি না। তুমি যা ভালো বোঝো করো, পরে খিটখিট কোরো না।

কাকু: আরে তোমরা চিন্তা করছ কেন? একজন ইনটেরিয়ার ডেকরেটর বললেই তো পারো।

দিব্যেন্দু: এটা তো ভাবিইনি, এত খরচ হল, আরও একটু না-হয় হবে। ভালো করেই হোক, কী বলো?

মীরা: কিন্তু আমি তো কাউকে চিনি না।

কাকু: সেটা আবার সমস্যা নাকি? এই তো এক্ষুনি দেখলাম যেন কোথায়? (বইয়ের তাক থেকে সেই বইটা বার করে খোলে।) এই প্যামফ্লেটটা— এর মধ্যে ছিল। দ্যাখো তো ভালো লাগে কি না।

মীরা: দেখে তো ভালোই লাগছে।

দিব্যেন্দু: একটা ফোন করে দেখি, নাকি? যদি কাল-পরশু এসে একবার ফ্ল্যাটটা দেখে যায়।

(দিব্যেন্দু ফোন করে।) …নমস্কার। মিস্টার অনিকেত বর্মণ? আমি দিব্যেন্দু মুখার্জী বলছি। আপনার অ্যাডটা দেখলাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ইনটেরিয়ার ডেকরেশনের ব্যাপারে। কালকে সন্ধে ছ-টার দিকে একবার আসতে পারবেন?… ওকে, ভেরি গুড। থ্যাংক ইউ… এই জায়গাটা হচ্ছে নিউ বিষ্ণুনগর। চেনেন?… আপনি বাইপাস ধরে এসে, অজয়গড়ের মোড়টা তো চেনেন। সেখান থেকে লেফট নিয়ে দু-কিলোমিটার মতো। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের নাম স্বপ্ননীড়… আপনি আসছেন তো?

(নাটকটির কিয়দংশ Dead of night (1945) থেকে অনুপ্রাণিত)

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!