কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য পরিচয় ৩: ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাস ও অবয়ব

সুমিত বর্ধন

অলংকরণ:মূল প্রচ্ছদ

সাম্প্রতিককালে ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের বিষয়ে আগ্রহ বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং বেশ কিছু গবেষণাপত্র, রিভিউ, আর্টিকেল ইত্যাদি প্রায় নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতীয় ফিকশন নিয়ে গবেষণার নবোদ্যমের এই জোয়ারে সুপর্ণ ব্যানার্জী রচিত ‘ইন্ডিয়ান সায়েন্স ফিকশন – প্যাটার্ন্স, হিস্ট্রি এন্ড হাইব্রিডিটি’ বইটি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবার দাবি রাখে।

     ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানের গঠন ও তার বিবর্তনের ইতিহাস লেখার কাজটা আদৌ সহজসাধ্য নয়। কারণ মূল বিষয়ের অবতারণা করার আগেই কতকগুলো বাধার প্রাচীর অতিক্রম করাটা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

     প্রথম বাধাটি হল সায়েন্স ফিকশন ঠিক কাকে বলে তার একটা রূপরেখা খাড়া করা। বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অগুন্তি পাঠক, লেখক, গবেষক মিলে অজস্র সংজ্ঞা নির্মানে পিপে পিপে কালি খরচা করেও সায়েন্স ফিকশনের সঠিক অর্থ নিয়ে বিবাদের আজও কোন নিষ্পত্তি করে উঠতে পারেননি। সায়েন্স ফিকশন নিয়ে নানা গবেষণাপত্র আর আর্টিকেল বাদ দিলেও এক উইকিপিডিয়াতেই ‘ডেফিনিশন্স অব সায়েন্স ফিকশন’ পেজটিতে সায়েন্স ফিকশনের প্রায় চল্লিশটির কাছাকাছি সংজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে হিউগো গার্ন্সব্যাকের সরল ব্যাখা – ‘আকর্ষণীয় রোমান্স মেশানো বৈজ্ঞানিক তথ্য আর ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার দূরদৃষ্টি’, তেমন আছে টম শিপ্পের অকপট স্বীকারোক্তি, ‘সায়েন্স ফিকশন কি, তা ব্যাখা করা কঠিন।’ তারপর আছে আছে সাহিত্যের আরও ঘরাণা, যাদের আর কল্পবিজ্ঞানের মাঝের সীমানাগুলো অনেক সময়ে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে চেনা যায় না। সব মিলিয়ে সায়েন্স ফিকশনের সীমা নির্ধারণ খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়।

     এর পর আসে ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের ‘ভারতীয়ত্ব’ নির্ধারণ। প্রথমত, অতীতের কিছু কাহিনি হয়তো পাওয়া গেল, যা এককালে ভারতীয় মহাদ্বীপের কোথাও লিখিত হলেও, তাদের রচনাস্থান আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে। এ ছাড়াও আছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখকেরা, যাঁরা ভারত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে বসবাস করলেও যাঁদের রচনায় ভারতীয় সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট।

     শেষ পর্যায়ে ভাষাভিত্তিক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ভারতের যে ক-টি প্রধান ভাষা আছে, সেই সব প্রত্যেকটি ভাষায় রচিত সায়েন্স ফিকশনের বিশ্লেষণ না করে একটি সায়েন্স ফিকশনের একটি ভারতীয় অবয়ব রচনা করলে কাজটি পূর্ণতা পায় না। কিন্তু এর জন্যে যে বহুভাষিক পারদর্শিতা প্রয়োজন, সে দক্ষতা আয়ত্ত করাও সহজসাধ্য নয়। অনুবাদ থাকলেও তা দিয়েও হয়তো কিছুটা কাজ চলতে পারত, কিন্তু ভারতীয় যে কোনও ভাষাতেই রচিত সায়েন্স ফিকশনের খুব সামান্যই ইংরিজি বা অন্য ভাষাতে অনূদিত হয়েছে।

 

সীমা নির্ধারণ

উপরোক্ত সমস্যাগুলির জন্যে লেখক মূল বিষয়ে অবতীর্ণ হওয়ার আগে প্রথমেই তাঁর বিশ্লেষণের সীমারেখাটি নির্ধারণ করার প্রচেষ্টা করেছেন। একদিকে যেমন অতি কঠোর সংজ্ঞা সৃজনশীলতা ব্যহত করে, অন্যদিকে আবার তেমনি অস্পষ্ট সংজ্ঞা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় জটিল বিশ্লেষণের পথে। এই দুই মেরুর দ্বান্দিক টানাপোড়েনের মধ্যবিন্দুতে তাই লেখক এমন একটি তার্কিক ক্ষেত্র নির্মাণ করার প্রয়াস করেছেন, যা সংহত আলোচনার জন্যে স্পষ্ট, অথচ সে আলোচনা যে সমস্ত শর্তাবলীর ওপর নির্ভরশীল, তাদের প্রয়োগের স্বপক্ষে নমনীয়। এর জন্যে তিনি তাঁর আলোচনার মূল ভিত্তি করেছেন ডার্কো সুভিনের সংজ্ঞাকে। ডার্কো সুভিনের মতে সায়েন্স ফিকশন এমন একটি সাহিত্যপ্রণালী যা লেখকের সচেতনতা এবং বাস্তববিরোধিতার মধ্যেকার যে অনৈক্য, তাকে ব্যবহার করে করে এমন একটি কাল্পনিক কাঠামো জন্ম দিতে, যাকে সুভিন বলেছেন ‘নোভাম’। লেখক তাঁর পরিচিত বাস্তবের থেকে আমূল পরিবর্তিত এক আলাদা জগৎ গল্পের জন্যে এই ‘নোভামের’ সাহায্যেই নির্মাণ করেন। একইসঙ্গে, সুভিনের এই দ্বান্দ্বিক ব্যাখার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সমতা রাখতে লেখক তাঁর পরবর্তী আলোচনায় পাশাপাশি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মিয়েভিল, রিডার ও এটারবির চিন্তাধারার সঙ্গেও।

     ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের ভারতীয় শব্দটির সীমানা নিরুপণ করতে গিয়ে লেখক স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর আলোচনা সীমিত থাকবে সেই সমস্ত লেখার মধ্যে যা রচিত হয়েছে আধুনিক ভারত রাষ্ট্রে, অথবা স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি অধিকৃত ভারত রাজ্যে, অথবা ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের দ্বারা। আধুনিক বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে রচিত লেখাকে তিনি তাঁর আলোচনার বাইরে রেখেছেন।

     বহু ভারতীয় ভাষা আয়ত্ত করে সেই সমস্ত ভাষায় রচিত সায়েন্স ফিকশন বিশ্লেষণ করা একপ্রকার অসম্ভবের কাজ। তাই লেখকেই বাধ্য হয়েই তাঁর আলোচনা বাংলা, হিন্দী, ইংরাজি ও মারাঠি, এই চারটি ভাষায় রচিত সায়েন্স ফিকশনের ওপরেই সীমিত রাখতে হয়েছে। যদিও বইয়ের নানান জায়গায় তিনি তামিল, তেলগু, অসমীয়া ও কন্নড় ভাষায় রচিত কল্পবিজ্ঞানের উল্লেখ করেছেন, তাঁর আলোচনার মূল ধারাটি চারটি ভাষার সায়েন্স ফিকশনকে আশ্রয় করেই প্রবাহিত হয়েছে। এতে অবশ্য বইতে শেষ পর্যন্ত কিছুটা একদেশদর্শিতার ত্রুটি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

ইতিহাস ও বিবর্তন

লেখক ১৮৩৫ সালকে ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের ইতিহাসের যাত্রাবর্ষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কারণ এই বছরেই প্রকাশিত হয় কে.সি.ডাট রচিত ‘এ জার্নাল অফ ফর্টি এইট হাওয়ার্স ইন দ্য ইয়ার ১৯৪৫।’ সন ১৮৩৫ থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল অবধি কালখণ্ডটিকে তিনি চার ভাগে ভাগ করেছেন— ১৮৩৫-১৯০৫, ১৯০৫-৪৭, ১৯৪৭-৯৫ এবং ১৯৯৫-২০১৯।

     প্রথম বিভাগে রচিত সায়েন্স ফিকশনকে লেখক ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন। এই সময়খণ্ডে কে.সি.ডাট রচিত ‘এ জার্নাল অব ফর্টি এইট হাওয়ার্স ইন দ্য ইয়ার ১৯৪৫’ ছাড়াও প্রকাশিত হয় জগদীশচন্দ্র বসু রচিত বাংলা সায়েন্স ফিকশন ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ (১৮৯৬ ) এবং প্রথম হিন্দী সায়েন্স ফিকশন কাহিনি, পণ্ডিত অম্বিকা দত্ত ব্যাসের ‘এক আশ্চর্য বৃত্তান্ত’।

     দ্বিতীয় সময়বিভাগে প্রকাশিত হয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ইংরাজিতে বেগম রোকেয়া রচিত নারীবাদী কাহিনি ‘সুলতানা’স ড্রিম’, এবং রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন রচিত সমাজতত্ত্বমূলক কাহিনি, ‘বাইশবি সদি’। এই কালখণ্ডে সাহিত্য ঘরাণা বা জন্র হিসেবে সায়েন্স ফিকশন আরও পরিণত হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় তার গ্রহণযোগ্যতা দেখা যায়। এই সময়কার কাহিনিতেও দুষ্ট বৈজ্ঞানিক, বিস্ময়কর যন্ত্র, হারানো জগৎ, অ্যাডভেঞ্চার, ইত্যাদি বিষয়বৈচিত্রও লক্ষ করা যায়।

     তৃতীয় সময়বিভাগটিকে লেখক সায়েন্স ফিকশনের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করেছেন। এই কালখণ্ডে পত্রপত্রিকার জনপ্রিয়তার চালিকাশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে বিভিন্ন ভাষায় সায়েন্স ফিকশন রচনার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। দেশজ লোককথা এবং এপিস্টেমোলজির সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় কাহিনির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে পরিবর্তন গ্রহণের অনুকুল। এই সময়েই অদ্রীশ বর্ধন প্রকাশিত করেন প্রথম সায়েন্স ফিকশন পত্রিকা ‘আশ্চর্য’। বাল ফোন্ডকে, জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকর এবং অন্যান্য স্বনামধন্য লেখকদের হাত ধরে মারাঠিতে সায়েন্স ফিকশন এই সময়খণ্ডেই একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ঘরাণা হিসেবে পরিণতি লাভ করে। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকর তাঁর ‘কৃষ্ণ বিবর’ কাহিনির মাধ্যমে ১৯৭৪ সালে মারাঠি সায়েন্স ফিকশনে তাঁর প্রথম স্বাক্ষরটি রাখেন।

     শেষ সময়বিভাগটিতে বৃদ্ধি পায় ইংরাজি সায়েন্স ফিকশন রচনা। ১১৯৫ সালে আর্থার সি. ক্লার্ক পুরস্কারে ভূষিত অমিতাভ ঘোষের ‘ক্যালকাটা ক্রোমোসোম’ ছাড়াও এই কালখণ্ডে রচিত হয় রুচির যোশীর ‘দ্য লাস্ট জেট ইঞ্জিন লাফ’, বন্দনা সিং-এর ‘দিল্লী’ এবং রিমি চ্যাটার্জ্জীর ‘সিগন্যাল রেড’। এ সময়েই প্রকাশিত হয় নানা সায়েন্স ফিকশন ওয়েব ম্যাগাজিন, যার মধ্যে দিল্লী থেকে প্রকাশিত মিথিলা রিভিউ ও কলকাতার কল্পবিশ্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও কাহিনির বিষয়বস্তুতে আত্মসমালোচনার ছাপ, এবং মহিলা কাহিনিকারদের সংখ্যায় লক্ষণীয় বৃদ্ধি এই সময়ের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক।

 

আখ্যান আঙ্গিক

ঐতিহাসিক বিবর্তনের পর লেখক ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনকে আখ্যানের চারটি মূল আঙ্গিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষন করেছেন— আখ্যানের কাল্পনিক জগৎ নির্মানে ব্যবহৃত জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজি, আখ্যানে ব্যবহৃত কালের প্রয়োগ পদ্ধতি, আখ্যান নির্মাণের স্থান এবং আখ্যানক্রিয়ায় নিয়োজিত অ-মানব চরিত্রের ব্যবহার।

     ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনে আখ্যানের কাল্পনিক জগৎ নির্মাণের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে লেখক জগদীশচন্দ্র বসুর ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ (১৮৯৬), সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কুর গল্প (১৯৬১-৯২), নারলিকরের ‘দ্য রিটার্ন অব বামন’ (মারাঠি, ১৯৮৯), দীনেশ চন্দ্র গোস্বামীর কাহিনি সংকলন ‘দ্য হেয়ার টাইমার’ (অসমীয়া, ২০১১), অমিতাভ ঘোষের ‘ক্যালকাটা ক্রোমোসোম’, ইত্যাদি উদাহরণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যে এই নির্মাণে প্রধানত তিনটি এপিস্টেমোলজিকাল সিস্টেম বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি পরষ্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে থাকে— পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন এবং লোকায়ত জ্ঞান।

     আখ্যানে কালের ব্যবহার নিয়ে আলোচনায় লেখক লক্ষ্মী নন্দন বোরা’র ‘কায়াকল্প – দ্য এলিক্সির অব লাইফ’ (অসমীয়া ২০১০), অম্বিকা দত্ত ব্যাসের ‘আশ্চর্য বৃত্তান্ত’ (হিন্দী, ১৮৮৪), বোমান দেশাইয়ের ‘দ্য মেমরি অব এলিফ্যান্টস’ (১৯৮৪), বন্দনা সিং-এর ‘দিল্লী’ (২০০৪) এবং ‘উইথ ফেট কন্সপায়ার’ (২০১৮) এবং অদ্রীশ বর্ধনের নাটবল্টু চক্রের গল্পের পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানে অতীতকে মূলত চিত্রিত করা হয় কখনও স্বর্ণযুগ হিসেবে, কখনও, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আমল হিসেবে, আবার কখনও সংস্কারের জগদ্দল অচলয়ায়তনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সময়কাল হিসেবে। অন্যদিকে কাহিনিতে ব্যবহৃত কল্পিত ভবিষ্যৎ যেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে মানুষের যুগপৎ নানা অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ভৌগোলিক প্রতিষ্ঠালাভের আকাঙ্খার টানাপোড়েনের আশা নিরাশার প্রতিচ্ছবি।

     কাহিনিকারের বাস্তব থেকে সম্পূর্ণরূপে এক আলাদা জগৎ কল্পিত সায়েন্স ফিকশন সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কাহিনিতে কল্পিত স্থান নির্মাণের প্রয়োগবিধির ব্যাখা করতে গিয়ে লেখক ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট তুলে ধরেছেন। ইউরো-মার্কিন কল্পবিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে সায়েন্স ফিকশনে সাম্রাজ্যবাদের যে অস্বস্তিকর ছায়া দেখতে পাওয়া যায়, ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানে তা অনুপস্থিত। রাজ্য বিস্তার বা উপনিবেশ স্থাপনের অভিযানের মতো কাহিনি ভারতীয় কল্পবিজ্ঞানে বিরল, হয়তা বা কোনও এক অতীতে ভারত নিজেই এই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য ছিল বলে। অন্যদিকে ফ্রেডরিক জনসন ও টমাস ময়লানের ইউটোপিয়া এবং ডিস্টোপিয়ার থিয়োরি এবং সুবোধ জাওড়েকরের ‘এ জার্নি ইনটু ডার্কনেস’ (মারাঠি, ১৯৯৩), এবং সুনীতা নামযোশির ‘মাদার্স অফ মায়াদ্বীপ’ কাহিনির মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনে ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়ার বলিষ্ঠ উপস্থিতি তিনি আমাদের সমক্ষে তুলে ধরেছেন, যেখানে লেখকের কলমে এমন এক কল্পিত ভারত ফুটে ওঠে যেখানে বহু অন্যায় এবং অত্যাচার চির জাগ্রত করে রাখে অরাজকতাকে।

     আখ্যানে যে সমস্ত অ-মানব চরিত্র তাদের ক্রিয়ার মাধ্যমে কল্পিত দুনিয়া ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে, বইয়ের শেষাংশে লেখক আলোচনা করেছেন তাদের নিয়ে। স্টুয়ার্ট হল, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এবং ডোনা হারাওয়ের কাজের এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ (১৯৬২), বন্দনা সিং-এর ‘অব লাভ এন্ড আদার মনস্টার্স’ (২০০৭) এবং সমিত বসুর ‘টার্বুলেন্স’ কাহিনির ওপর ভিত্তি করে তিনি দেখিয়েছেন যে ক্লোন, সাইবর্গ, মিউট্যান্ট, এ. আই., ভিনগ্রহী ইত্যাদি বিভিন্ন রূপে কাহিনিতে ব্যবহৃত এই সমস্ত চরিত্ররা আসলে নানান সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রতিরূপ। সে বিচ্ছিন্নতা কখনও সমাজের পিরামিডের নিম্নতম নাগারিক আর রাষ্ট্রের মধ্যের বিচ্ছিন্নতা আবার কখনও অচেনা সমাজে পরিযায়ী মানুষের বিচ্ছিন্নতা। লক্ষ্মণ লোণ্ঢে ও চিন্তামণি দেশমুখের ‘দেবমশি জীবে মরিলে’ (মারাঠি, ১৯৯০) এবং সামি আহমেদ খানের ‘এলিয়েন্স ইন দিল্লী’ কাহিনির উদাহরণ টেনে তিনি এও দেখিয়েছেন যে কখনোও কখনও এই সমস্ত চরিত্র স্বপ্ন ছদ্মবেশের আড়ালে কোন হামলাকারীর প্রতিরূপ হিসেবেও ব্যবহার হয়।

 

শেষের কথা

এই বইটি লেখা খুব সম্ভব সহজসাধ্য ছিল না। ভারতীয় ভাষায় রচিত সাহিত্যের পাহাড় প্রমাণ সম্ভার, বিভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করা দুঃসাধ্যতা, অনুবাদের অভাব, ঐতিহাসিক রেকর্ডের অপ্রতুলতা, সাহিত্য ঘরাণার সীমা রেখার অস্পষ্টতা, এ সবই হয়তো ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের একটি পূর্ণাঙ্গ এবং সম্পূর্ণ বিবরণ লেখার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে থাকবে। এবং লেখকও কোথাও দাবি করেননি যে তিনি ভারতীয় সায়েন্স ফিকশনের সম্পূর্ণ অবয়বটি দুমলাটের মধ্যে বন্দী করে ফেলেছেন। তবুও তাঁর এই প্রচেষ্টা ভারতীয় সায়েন্স ফিকশন সমন্ধে মানুষের মনে কৌতূহল জাগরূক করে তুলবে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আশা করা যায় তাঁর এই পরিশ্রম ভবিষ্যতে এই ধরনের বৌদ্ধিক অনুসন্ধানে প্রয়াসী হতে অন্যান্য লেখক ও গবেষকদের উৎসাহী করবে।

Leave a Reply




Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!