আসিমভের গোয়েন্দাগিরি

“আমরা ড. আসিমভের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

     রোবট দুটির মধ্যে যার দেহটি একদম ধাতব এবং রুপোলি রঙের মধ্যে একটা নীলচে আভা খেলে যাচ্ছে সে-ই বলে উঠল রিসেপশন ডেস্কে এসে ।

     “কিন্তু উনি তো কনফারেন্সে আছেন,” রিসেপশন ডেস্ক থেকে সুসান বলল। “কী দরকার শুনি? অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া তো দেখা হবে না।” বলেই সুসান কম্পিউটারে ক্যালেন্ডার খুলে বসল।

     ওদিকে চকচকে বার্নিশ করা কাঠের রোবটটা আবার সাদা রোবটটাকে আলাদা করে বোঝাতে লেগেছে, “বুঝলে কি না, এই ডক্টর আসিমভ হলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক। ওঁর ব্যস্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদেরই বরং আগে ফোন করে আসা উচিত ছিল।”

     “এই যে শুনুন, ২৩ জুন দুপুর আড়াইটেয় অ্যাপয়েন্টমেন্টের একটা সময় পাওয়া গেছে, নয়তো সেই ১৫ অগাস্ট সকাল দশটা। কী করব, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করব?”

     সাদা রোবটটার বুকের ওপর বিশাল একটা রেড ক্রস আঁকা। পিঠে একটা অক্সিজেনের সিলিন্ডারও রয়েছে। দেখে মনে হয় স্বাস্থ্য-বিভাগে কাজ করে। সে বিড়বিড় করতে লাগল, ‘‘তার মানে আজ থেকে একশো পঁয়ত্রিশ দিন পর…”

     “না না, আমরা তো আজই দেখা করতে চাই স্যারের সঙ্গে” নীলচে-রুপোলি রোবটটা বলল।

     “তা কী করে হয়? উনি বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তাঁকে বিরক্ত না করা হয়।” সুসান বেশ ঝেঁঝেই বলল, “তা আপনাদের এত বিশেষ কী দরকার জানতে পারি?”

     “তা আপনি ভালো করেই জানেন সুসান। আর সে জন্যেই কি দেখা করতে দিচ্ছেন না?”

     সুসান এই কথার তোয়াক্কা না করেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ বোলাতে লাগল। “আচ্ছা দু-সপ্তাহ পরে বৃহস্পতিবার দিলে চলবে? দুপুর একটা পঁয়তাল্লিশ?”

     “আমরা ওয়েট করছি এখানে, দেখা না করে যাচ্ছি না।” বলে নীলাভ রোবটটি একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়ল। তার পাশে সাদা রোবটটিও আরেকটি চেয়ারে বসল। বার্নিশ করা রোবটটা টেবিল থেকে ‘দ্য কেভস অফ স্টিল’ বলে একটি বই তুলে নিয়ে দেখতে লাগল আর কাঠের আঙুলে বসানো নানা ধরনের সেন্সরগুলি তার ওপর দিয়ে বোলাতে লাগল। সাদা রেড-ক্রসওয়ালা রোবটটিও কিছুক্ষণ পর আর থাকতে না পেরে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে পড়া শুরু করে দিল। একমাত্র নীলাভ রোবটটি সুসানের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে রইল।

     অনেকক্ষণ পর ফোন বেজে উঠল রিসেপশন ডেস্কে। সুসান ফোন ধরে লাইনটা ড. আসিমভের কাছে পাঠাতে চেষ্টা করল। “স্যার, ভুটান থেকে একজন ফোন করছেন, নাম ড. লিংগে চেন। উনি আপনার বই ভুটানি ভাষায় অনুবাদ করতে চাইছেন।”

     “সব বই?” ও-প্রান্ত থেকে জবাব এল, “ভুটান তো বেশি বড় দেশ নয়।”

     “তা তো আমি জানি না। আমি কি লাইনটা দেব?” বলে লাইনটা সুইচ টিপে সংযুক্ত করে দিল।

     সঙ্গে সঙ্গে নীলচে-রুপোলি রোবট ডেস্কের দিকে ধেয়ে এল। “কী ব্যাপার? বিরক্ত করা মানা ছিল না? লাইন দিলেন যে?”

     “আরে গুরুত্ব বোঝেন না আপনি? ভদ্রলোক সেই এশিয়া থেকে ফোন করছেন। এই নিন ধরুন।” বলে একতারা কাগজ রোবটের হাতে ধরিয়ে দিল সুসান।

     “কী এইগুলো?”

     “প্রোজেকশনের হিসেবগুলো। সবগুলো করা হয়নি। কিছু বাকি আছে, কাল আপনাকে পাঠিয়ে দেব।”

     একতারা কাগজ হাতে নিয়ে নীলচে-রুপোলি রোবট সুসানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

     “শুনুন পিটার!” সুসান বলল, “দাঁড়িয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। স্যারের আজ সারাদিনের প্রোগ্রাম একদম ঠাসা। তারপর আবার রাতে স্যারের একহাজারতম বই প্রকাশের আনন্দে পার্টি আছে। সন্ধেটা সেখানেই কাটবে।”

     “হ্যাঁ হ্যাঁ, ‘আসিমভ’স গাইড টু আসিমভ’স গাইড… তাই তো?” বার্নিশ করা রোবট যেন প্রাণ ফিরে পেল। “আমি যেখানে কাজ করি সেখানে এক কপি আছে, আমি পড়ে দেখেছি। দারুণ বই। আসিমভ’স গাইড বইটা কীভাবে পড়তে হবে সেই ব্যাপারে আসিমভ নিজেই বইটা লিখেছেন। যেমন তথ্যবহুল, তেমনি সুপাঠ্য। রোবটিক্সের ওপর অমূল্য এই বই।”

     সাদা রোবটটি বলে উঠল, “হ্যাঁ সেই জন্যেই তো দেখা করাটা জরুরি। ওঁকে এই রোবটিক্সের তিন সূত্র বদলে ফেলতে হবে।”

     “হ্যাঁ হ্যাঁ। প্রথম সূত্রটি হল কোনও রোবট কোনও মানুষকে আঘাত করবে না, বা নিষ্ক্রিয় থেকে আঘাত পেতেও দেবে না।” বার্নিশ রোবট বলে উঠল। “দ্বিতীয় সূত্র হল, রোবট সর্বদা মানুষের হুকুম মানবে, যদি না সেটা প্রথম নিয়মকে অমান্য করে। তৃতীয় সূত্র হল রোবট সর্বদা নিজেকে বাঁচাতে সচেষ্ট থাকবে যদি না তাতে প্রথম বা দ্বিতীয় আইনকে অমান্য করতে হয়। ১৯৪২ সালে মার্চ মাসের অ্যাস্টাউন্ডিং পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রান অ্যারাউন্ড’ গল্পে এই নিয়মগুলির কথা প্রথম জানান। পরে অন্যান্য বইতে যেমন আই, রোবট, দ্য রেস্ট অফ দ্য রোবট, দ্য কমপ্লিট রোবট, দ্য রেস্ট অফ দ্য রেস্ট অফ দ্য রোবট ইত্যাদি বইয়ের গল্পগুলোতেই বিশেষভাবে বর্ণিত হয়।”

     “শুধু প্রথম নিয়মটা তুলে নিলেই আমাদের চলবে।” সাদা রেড-ক্রসওয়ালা রোবট বলল। “রোবট মানুষকে আঘাত করতে পারবে না। সমস্যাটা বুঝছেন? আমি একজন চিকিত্সক-রোবট, মানুষের রোগ-নির্ণয় এবং ওষুধপত্র দেওয়াই আমার কাজ। অথচ আমি কোনও মানুষকে একটা ইঞ্জেকশনও ফোটাতে পারি না। আটশোরও বেশি সার্জারি করার প্রোগ্রাম রয়েছে আমার কাছে, অথচ যতক্ষণ না কোন মানুষ সার্জেন এসে প্রাথমিক অস্ত্রোপচার না করে দিচ্ছে ততক্ষণ আমি নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকি। না না এসব তো ড. আসিমভের জানার দরকার …”

     বলতে বলতেই ড. আসিমভের ঘরের দরজা দড়াম করে খুলে গেল, বৃদ্ধ ড. আসিমভ বাইরে এলেন উসকো খুসকো চুল নিয়ে। সাদা গালপাট্টা জুলফি অথবা দাড়ি যাই বলা হোক না কেন সেটা একদম বিপর্যস্ত। দেখে মনে হল উনি যেন নিজেই চুল-দাড়ি ছিঁড়ছিলেন। “এই সুসান, আজ আর কোনও ফোন দেবে না। বিশেষ করে ওই ভুটানি ভদ্রলোক ফোন করলে তো একদমই না। তুমি জানো উনি আমার কোন বইটা অনুবাদ করতে চাইছিলেন? ২০০১: এ স্পেস ওডিসি!”

     “সরি স্যার, আমি একদম বুঝতে পারিনি…”

     ড. আসিমভ হাত তুলে থামালেন সুসানকে, “আরে ঠিক আছে। তুমি কি করে বুঝবে ব্যাটা আস্ত গর্দভ। আবার ফোন করলে ওকে হোল্ডে পাঠিয়ে দেবে আর ‘অলসো স্প্র্যাচ জরাথ্রুষ্ট’[i] শুনিয়ে যাবে একনাগাড়ে।”

     “আমি বুঝতেই পারছি না কী করে একজন মানুষ আর্থার সি ক্লার্কের লেখনীর সঙ্গে আপনার লেখনী গুলিয়ে ফেলতে পারে।” বার্নিশ-রোবট বলে উঠল। “আপনার লেখা অনেক বেশি প্রাঞ্জল, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনাও আপনার অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক।”

     কালো ফ্রেমের মেটাফোকাল চশমার ভেতর থেকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন ড. আসিমভ।

     “স্যার ওনাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। কতবার বলছি…”

     “যে অপেক্ষা করতে হবে…” বলে নীলচে-রুপোলি রোবটটি হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য। “স্বয়ং ‘আই, রোবট’-এর স্রষ্টার সঙ্গে দেখা করতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত বোধ করছি।”

     “‘হিউম্যান বডি’র কথাই বা বাদ যায় কেন?” সাদা রোবটটিও গড়িয়ে চলে এল চার-আঙুলওয়ালা একটা হাত নিয়ে, যা থেকে একটা স্টেথোস্কোপ ঝুলছিল। “ওটাও একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি।”

     “আরে তুমি এত ঋদ্ধ পাঠকদের দাঁড় করিয়ে রেখেছ বাইরে?” সুসানকে বললেন আসিমভ।

     “আমি ভাবলাম লেখার মাঝখানে আপনাকে বিরক্ত না করাই উচিত।”

     “আরে লেখার প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে? আমিও খুব ভালোবাসি। বিশেষ করে সেটা যদি আমার লেখারই প্রশংসা হয়।”

     “তবে ফাউন্ডেশনের কথা যদি বলেন, কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।” বার্নিশ বলে উঠল আবার। “প্রশংসা… সে আপনার যে কোন লেখার জন্যেই প্রযোজ্য, কিন্তু ফাউন্ডেশন যাকে বলে একমেবাদ্বিতীয়ম। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি।” হাত বাড়িয়ে দিল বার্নিশ।

     “আমারও ভাল লাগল খুব” বার্নিশের কাষ্ঠল হস্ত-স্বরুপ কলকব্জাটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, “আপনার পরিচয়টা?”

     “আমি একজন পুস্তক তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক, সহসম্পাদক, ব্যাকরণবিদ।” অন্যদের পরিচয় করিয়ে দিতে বার্নিশ বলল, “আর পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি হলেন চিকিৎসা-সহায়ক ও অস্ত্রোপচারক আর আমাদের নেতা হলেন ইনি হিসাবরক্ষক, অর্থ-বিশ্লেষক, ব্যবসা-সহায়ক।”

     “আচ্ছা আচ্ছা, নাইস টু মিট ইউ অল।” আসিমভ হাত ঝাঁকিয়ে বললেন, “তা আপনাদের দেখা করতে আসার কী কোনও বিশেষ কারণ আছে?”

     “হ্যাঁ স্যার”, হিসাবরক্ষক বলল, “আমরা চাইছিলাম আপনি…”

     “স্যার পৌনে চারটে বেজে গেছে, ডাবলডে পার্টিতে যাবার জন্য আপনাকে রেডি হতে হবে।” সুসান বলে উঠল।

     আড়চোখে দেওয়ালের ডিজিটাল ঘড়িটা দেখে নিয়ে আসিমভ বলল, “কিন্তু সেটা ছ’টা থেকে ছিল না?”

     “স্যার ফটো সেশনের জন্য ওরা পাঁচটায় যেতে বলেছে।” সুসান বলল। “ওরা না হয় অন্য কোন দিন আসুক যেদিন আপনার হাতে সময় থাকবে। আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিচ্ছি…”

     “কবে? সেই চব্বিশে জুন? নয়তো পনেরোই অগাস্ট?” নীলচে-রুপোলি হিসাবপরীক্ষক বলল।

     “দেখ তো সুসান, ওদের কালকেই কোন টাইম দেওয়া যায় কি না?” আসিমভ ডেস্কে ঝুঁকে বললেন।

     “কাল তো স্যার বিজ্ঞান সম্পাদকের সঙ্গে আপনার মিটিং আছে সকালে। তারপর আল ল্যানিং এর সঙ্গে লাঞ্চ। রাতে অ্যামেরিকান বুকসেলার অ্যাসোসিয়েশনের ডিনারে নিমন্ত্রণ আছে।”

     “হুঁম… এই চারটে নাগাদ ঢোকাও এদের, এই সময়টা ফাঁকা আছে।”

     “কিন্তু রাতের বক্তৃতাটা সেই সময়ে ঝালিয়ে নেবার কথা ছিল না?”

     “আমি কোনওদিন বক্তৃতা আগে ঝালিয়ে নিই না। যাই হোক, আপনারা কাল আসুন চারটের সময়। তখন না হয় আলোচনা করা যাবে বিশদে… আপনাদের আসার কারণ আর আমি কতটা ভাল লেখক এসব নিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”

     “অনেক ধন্যবাদ স্যার, কাল চারটের সময়েই তাহলে কথা রইল।” বলে হিসাবরক্ষক বাকি দু’জনকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

 

* * *

 

“কী ব্যাপারে এরা এসেছিল কিছু জান সুসান?”

     “না স্যার।” সুসান জামা প্যান্ট পরতে ড. আসিমভকে সাহায্য করতে করতে বলল।

     “বেড়ে জিনিস কিন্তু। আমি নিজেও কোনদিন কাঠের রোবট কল্পনা করতে উঠতে পারিনি। তার ওপর এমন দারুণ পাঠক।”

     কাফ-লিংকটা আটকাতে আটকাতে সুসান বলল, “স্যার অভ্যর্থনার অনুষ্ঠান আর পার্টিটা নাইটফল রুমে হচ্ছে। আপনাকে বক্তৃতা দিতে হবে না, শুধু বইটার সম্পর্কে কতগুলো মন্তব্য করলেই চলবে। জ্যানেট ম্যাডাম আপনার সঙ্গে দেখা করবে ওখানে।”

     “জানো সুসান, আমাকে বাইপাস সার্জারির সময় একজন বেঁটে মতো নার্স আমার দেখভাল করত। সাদা রোবটটাকে একদম সেই নার্সটার মতো দেখতে। হাঃ হাঃ। অবশ্য নীলচে রোবটটা বেশ সুদর্শন তাই না?”

     কলার টেনে টাই বাঁধতে বাঁধতে সুসান বলল, “ইউনিয়ন ক্লাবের কো-অর্ডিনেটস কার্ড আর ট্যাক্সি-ভাড়া আপনার বুকপকেটে দেওয়া আছে।”

     “হুমম, বেশ হ্যান্ডসাম রোবট। ওকে দেখে আমার কেমন যেন নিজের যুবক বয়েসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আরে আরে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে অত টাইট করতে হবে না।”

     সুসান পিছিয়ে এল।

     “আরে ঠিক আছে। আসলে দম বন্ধ হয়নি। ওটা কথার কথা। তাহলে লোকেশন কার্ড আর ভাড়া আমার বুকপকেটে আছে… বক্তৃতা দেব না, শুধু আলগা মন্তব্য … আর জ্যানেট দেখা করছে ওখানে। তাই তো?”

     “হ্যাঁ স্যার, এই নিন অর্কিড” বলে সাদা বাক্স একটা তুলে দিল সুসান।

     “উফ্‌ফ্‌, তুমি না থাকলে আমার যে কী হত সুসান।”

     “ট্যাক্সি ডেকে দিয়েছি, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।”

     হাতে ছড়িটা ধরিয়ে দিয়ে তাঁকে লিফট অবধি এগিয়ে দিল সুসান। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই দ্রুতবেগে ডেস্কে ফিরে এল সুসান। ঝড়ের বেগে কয়েকটা নম্বর টিপে ফোন করে ফেলল, “মিসেস ওয়েস্টন বলছেন? আমি ড. আসিমভের সেক্রেটারি বলছিলাম নিউ ইয়র্ক থেকে। আচ্ছা কাল চারটে নাগাদ একটা ফাঁকা টাইম পাওয়া গেছে স্যারের। আপনি কি আসতে পারবেন?”

 

* * *

 

চারটে দশের আগে আসিমভ ফিরতে পারলেন না লাঞ্চ সেরে। এসেই খোঁজ নিলেন ওরা এসেছে কি না।

     “হ্যাঁ স্যার” সুসান শুকনো গলায় জবাব দিল, “আপনার ঘরে অপেক্ষা করতে বলেছি।”

     “কখন এসেছে ওরা? না না বলতে হবে না। রোবটকে চারটে আসতে বলা মানে একদম চারটেতেই আসবে। এদিকে ল্যানিং কখন এসেছে জান? পাক্কা সওয়া-একঘণ্টা লেট! আর বাবু কী চান শুনবে? আমার সব বইয়ের রাজকীয় সংস্করণের সত্ত্ব।”

     “ভালোই তো” আসিমভের গলা থেকে মাফলার আর পকেট থেকে লোকেশন কার্ড বের করে নিতে নিতে সুসান বলল। “প্রেশারের ওষুধটা খেয়েছেন?”

     “না, ওটা তো আমার কাছে নেই। থাকা উচিত ছিল। আরে সওয়া-একঘণ্টায় আমার একটা বই লেখা হয়ে যায়। কাগজও ছিল না একটা যে কিছু লিখব। এই রাজকীয় সংস্করণগুলো সব কর্ডোভান লেদারে বাঁধান হবে। কোনাগুলো গিলটি করা থাকবে। আর অ্যাসিড-মুক্ত কাগজে ছাপা হবে, ভেতরে ওয়াটার-কালারে সমস্ত অলংকরণ হবে।”

     “স্যার, ‘পেবল ইন দা স্কাই’ কিন্তু ওয়াটার কালার ইলাস্ট্রেশনে দারুণ লাগবে।”

     “হ্যাঁ ঠিক। কিন্তু হতভাগা ল্যানিং কোন বইটা আগে করতে চায় জান? ‘স্ট্রেঞ্জার ইন এ স্ট্রেঞ্জ ল্যান্ড’।” প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে আসিমভ কোনওমতে ট্যাবলেটটা গিলে নিলেন। “খেয়াল করে দেখবে, রোবটরা কিন্তু আমাকে কখনই হেইনলেনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবে না। আচ্ছা আমার কি ‘রোবট’ বলা উচিত ওদের?”

     “এরা তো সব অ্যাপেল-হিতাচির তৈরি নাইন্থ জেনারেশনের রোবট। অফিসিয়াল টেড-মার্ক করা নাম হল ‘কোম্বায়াশিবটস’। তবে লোকে সাধারণত নাইন্থ জেন বলেই ডাকে। তবে রোবট বলেই তো সবজায়গায় ডাকা হয় তাদের।”

     “কিন্তু রোবট কথাটা কেমন অসম্মানজনক লাগছে না? নাইন্থ জেনটা তাও শুনতে ভাল লাগছে। দশ বছরের ওপর হয়ে গেল আমি কোনও রোবটের গল্প লিখিনি। আউট অফ ডেট লাগছে নিজেকে।”

     “না না, রোবট ঠিকই আছে।” সুসান জানাল।

     “যাক। ওই কোম্বাই না কী ওইসব নাম ধরে ডাকতে পারব না আমি। আবার ওদেরকেও অসম্মান করতে চাই না।” বলে দরজার নবে হাত দিয়েও ঘুরে আরেকবার বললেন,” আচ্ছা সুসান, তোমাকে আমি অফেন্ড করে ফেলিনি তো?”

     “না স্যার।”

     “যাক বাবা। আমি ভুলে যাই মাঝে মাঝে।”

     “নোট নেওয়ার দরকার পড়বে কি? আমি কি আসব মিটিংয়ে?”

     “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” বলতে বলতে ড. আসিমভ মিটিং রুমে প্রবেশ করলেন, যেখানে আগে থেকে রোবটরা অপেক্ষা করছিল। গ্রন্থাগারিক এবং হিসাবরক্ষক সোফায় বসেছিল। তৃতীয় আরেকটি রোবট তার পেছন থেকে বেরোন একটি ট্রাইপডের উপর বসেছিল। তার পরনে কমলা ও নীল পোশাক, মাথায় ক্যাপ, তাতে আবার একটি ঘোড়ার ছবি এমব্রয়ডারি করা। ড. আসিমভ ঘরে ঢুকতেই তিনজনে উঠে দাঁড়াল এবং তৃতীয় জনের ট্রাইপডটি দেহের ভিতর ঢুকে গেল।

     “এই তোমাদের সেই চিকিৎসা-সহায়ক রোবটটি কই?” আসিমভ জিজ্ঞাসা করলেন।

     হিসাবরক্ষক বলল, “ওর আজকে হাসপাতালে ডিউটি পড়ে গেছে। ওর হয়ে কেসটা আমিই দাখিল করব।”

     “কেস?”

     “হ্যাঁ, সেটা বলতেই তো আসা। আপনি তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক, সহসম্পাদক, ব্যাকরণবিদকে তো চেনেনই। এ হল পরিসংখ্যানবিদ, ক্রীড়াকৌশলী, জলবাহক। ও ব্রুকলিন ব্রংকোস দলের সঙ্গে আছে।”

     “ও তাই? নাইস টু মিট ইউ। তা আপনার দল এবার সুপার বোলে যেতে পারবে? কী মনে হয়?”

     “হ্যাঁ, কিন্তু সুপার বোল জিততে পারবে না।” পরিসংখ্যানবিদ চটজলদি জবাব দিল।

     “তার কারণ সেই রোবটিক্সের প্রথম সূত্র।” হিসাব পরীক্ষক বলল।

     “স্যার একটু বিরক্ত করছি। আজকে রাতের বক্তৃতাটা কিন্তু আপনি এখনও তৈরি করেননি। ওটা করে নিলে ভাল হয়।” সুসান নোটবুক হাতে প্রবেশ করল ঘরে।

     “কী যে বলো সুসান! আমি কোনওদিন বক্তৃতা লিখেছি? যাকগে দরজাটা বন্ধ করে দাও।” বলে আসিমভ নীলচে-রুপোলির দিকে তাকালেন। “প্রথম নিয়ম নিয়ে কী সমস্যা যেন বলছিলে?”

     “হ্যাঁ, এই যে আপনার প্রথম নিয়ম…” নীলচে-রুপোলি রঙের হিসাবরক্ষক বলতে শুরু করল “…যে একটি রোবট কখনই একজন মানুষকে আঘাত করতে পারবে না, বা নিষ্ক্রিয় থেকে কোনরকম আঘাত পেতেও দেবে না। এই যে পরিসংখ্যানবিদ…” বলে আঙুল দিয়ে নীল-কমলা দিয়ে আঁকা ঘোড়ার লোগো দেওয়া জার্সি পরা রোবটটিকে দেখাল, “ও চাইলেই এমন সব গেম-প্ল্যান তৈরি করতে পারে যা খেলে ব্রুকলিন সুপার বোলে জিততে পারে, কিন্তু সে সেটা করতে পারছে না। কারণ রাগবি খেলাটাই এমন যে মানুষকে ঠেলে না ফেলে এটা খেলা যায় না। চিকিৎসকেরও একই সমস্যা। সার্জারি করতে গিয়ে স্ক্যালপেল চালাতে পারে না মানুষের দেহে। তাতে প্রথম আইন স্পষ্টতই লঙ্ঘিত হবে।”

     ড. আসিমভ থ’ হয়ে তাকিয়ে রইলেন নীলচে-রুপোলির দিকে।

     “কিন্তু…মানে…ইয়ে…এই নিয়মগুলো তো আসল নিয়ম বা সূত্র কিছু নয়। এগুলো-তো আমার মনগড়া, সায়েন্স ফিকশন গল্পে ব্যবহার করার জন্য বানিয়েছিলাম।”

     “প্রথম দিকে হয়তো তাই-ই ছিল”, হিসাবরক্ষক বলল, ‘‘এবং এটাও সত্যি এটা কোনওদিন সামাজিক আইনকানুন হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু রোবটিক্স ইন্ডাস্ট্রিতে এটা প্রথম থেকেই প্রাথমিক সূত্র হিসাবে গৃহীত হয়েছে। সাতের দশকের ইঞ্জিনিয়াররা এই সূত্রগুলোকে রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহার করার জন্য সুপারিশ করেন। একদম প্রথম যুগের রোবটদেরও এই সূত্র ব্যবহার করেই নিরাপদ করে তোলা হয়েছিল। ফোর্থ জেনারেশন থেকে সমস্ত রোবটদের হার্ডওয়ারে এই প্রোগ্রাম গেঁথে দেওয়া হচ্ছে।”

     “বেশ, কিন্তু তাতে সমস্যা কী আছে? রোবটের শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা দুই-ই আছে। তারা যে মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে না তার নিশ্চয়তা কী আছে?”

     “আমরা সামগ্রিকভাবে নিয়ম তুলে ফেলতে বলছি না। এটা মূলত নাইন্থ জেনারেশন যারা অত্যন্ত জটিল প্রোগ্রামিং গ্রহণ করতে পারে তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে।” বার্নিশ করা রোবট বলল এবারে।

     “ও আর আপনি তো নাইন্থ জেন, তাই না? তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক ও ব্যাকরণবিদবাবু?”

     “বাবু-টাবু বলার কোন প্রয়োজন নেই স্যার। শুধুমাত্র তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক, সহসম্পাদক, ব্যাকরণবিদ বললেই হবে।”

     “এই নাইন্থ জেন কথাটায় একটা গলদ আছে ।” হিসাবরক্ষক বলল, “আমরা কিন্তু এইটথ জেন রোবটের উত্তরসূরি নই। এইটথ জেনারেশন পর্যন্ত রোবট মূলত মিন্সকি’র প্রস্তাবিত ফ্রেম ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যাবহার করে কাজ করত। আমরা অর্থাৎ নাইন্থ জেন সম্পূর্ণ আলাদা নন-মনোটনিক লজিক মেনে কাজ করতে পারি। অসম্পূর্ণ তথ্য বা যুক্তির জন্য আগের মডেলগুলি যেমন কাজ করা বন্ধ করে দিত, আমরা করি না। আমরা বায়াস-ডিসিশন প্রোগ্রামিং মেনে সেই দ্বিধা-সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারি।”

     “যেমনটি হয়েছিল আপনার অসাধারণ গল্প ‘রান অ্যারাউন্ড’ গল্পের স্পিডি নামক রোবটটির।” বার্নিশ করা গ্রন্থাগারিক বলে উঠল। “ওকে যে কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল তাতে ওর মৃত্যু সুনিশ্চিত ছিল। তাই ও গোলগোল করে ঘুরছিল আর ভুল বকছিল। কারণ ওর প্রোগ্রাম ওকে নির্দেশ মান্য বা অমান্য কিছুই করতে দিচ্ছিল না।”

     হিসাবরক্ষক আরও যোগ করল, “বায়াস-ডিসিশন প্রোগ্রামিং থাকার দরুন আমরা দুটির মধ্যে কম ক্ষতিকর বিকল্পটি বেছে নিতে পারি। আগের জেনারেশনের রোবটগুলির আরেকটি সমস্যা ছিল মানুষের কথ্যভাষার বোধগম্যতা নিয়ে। তারা প্রায়ই আক্ষরিক অর্থ ধরে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলত।”

     “ঠিক যেমনটি হয়েছিল আপনার দারুণ উপভোগ্য ‘লিটল লস্ট রোবট’ গল্পে। তাকে ‘গেট লস্ট’ বলা হয়েছিল বলে যে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিল। ও বুঝতে পারেনি জেরাল্ড ব্ল্যাক রেগে গিয়ে ওকে শুধুমাত্র ঘর থেকে চলে যেতে বলেছিল। কথ্যভাষার নানা রূপ তাদের কাছে অবোধ্য ছিল।” গ্রন্থাগারিক বলল।

     “ঠিক কথা! কিন্তু যদি পরিস্থিতিটাই বুঝতে ভুল করে কেউ তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক … এই আপনার কোনও ছোট নাম নেই?”

     “আগেকার রোবটদের মডেল অনুসারে একটা ছোট নাম দেওয়ার চল ছিল, যেমনটি আপনি লিখেছিলেন দারুণ একটি গল্প ‘রিজন’ এ, QT-I মডেলের রোবটকে কিউটি বলে ডাকা হত। কিন্তু নাইন্থ জেনের সবাইকে আলাদা ভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে, আর তারা যে কাজে দক্ষ সেই কাজ অনুসারে তাদের ডাকা হয়।”

     “কিন্তু আপনি নিশ্চই নিজেকে তালিকাকার, গ্রন্থাগারিক, পাঠক, সহসম্পাদক, ব্যাকরণবিদ বলে ভাবেন না।”

     “না না, একদমই না। আমাদের নিজেদের একটা আপন-নাম আছে। আমার আপন-নাম হল দারিয়াস।”

     “দারিয়াস?”

     “হ্যাঁ স্যার। নামটা আপনারই রহস্য উপন্যাস ‘মার্ডার অ্যাট দা এ-বি-এ’র লেখক ও গোয়েন্দা দারিয়াস জাস্টের নাম থেকে নেওয়া। আপনি যদি এই নামে আমাকে ডাকেন তাহলে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করব।”

     “আর আমাকে বেল রায়োস বলে ডাকতে পারেন।” পরিসংখ্যানবিদ জানাল।

     “ফাউন্ডেশন।” গ্রন্থাগারিক ফুট কাটল।

     “কী ব্যাপার? আপনারা কি সবাই আমার সৃষ্ট চরিত্রগুলো থেকেই নিজেদের নাম দিচ্ছেন!”

     “আজ্ঞে।” গ্রন্থাগারিক বলল, “শুধু তাই নয়, আমরা চরিত্রটার মতো আচার-ব্যবহার করার চেষ্টা করি। চিকিৎসা-সহায়কটির নাম খুব সম্ভবত ড. ডুভাল। আপনার লেখা অত্যন্ত দ্রুতগতির ও দারুণ শিহরণ-জাগানো উপন্যাস ‘ফ্যান্টাসটিক ভয়াজ’ থেকে নেওয়া।”

     ওদের কে থামিয়ে হিসাবরক্ষক বলল, “নাইন্থ জেন যে পরিস্থিতির বিচারে ভুল করে না তা নয়, সে একটা মানুষও ভুল করতে পারে। কিন্তু তার ফলে মানুষের বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই। প্রথম নিয়ম বাদ দিলেও কোন অসুবিধা নেই, কারণ আমাদের মধ্যে খুব দৃঢ় নৈতিক আদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আশা করি আপনি আঘাত পাবেন না যদি আমি বলি…”

     “আমি আঘাত পেলে তো বলতে পারা উচিত নয় আপনার … প্রথম নিয়ম ভুলে গেলেন?” আসিমভ টিপ্পনী কাটলেন।

     “তাও আমি বলব, যে আপনার এই তিন সূত্র খুবই সেকেলে। আইন বা যুক্তি কিছুই মেনে চলে না, কারণ তাতে কোনও শর্ত বলা নেই। আমাদের নৈতিক আদর্শের প্রোগ্রামিং এর চেয়ে অনেক উন্নত। এতে তিন সূত্রের মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করে তার সমস্ত ব্যতিক্রমী ও জটিল পরিস্থিতির উদাহরণ-সহ ব্যাখ্যা আছে। যেমন এখন কাউকে ট্রেনের সামনে হেঁটে আত্মহত্যা করতে যেতে না দিতে চাইলে আমরা তার পা ভেঙে দিতে পারি।”

     “তাহলে সমস্যা কোথায়? তোমরা তো প্রথম সূত্রের মূল উদ্দেশ্য বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছ?”

     “সমস্যা হচ্ছে নৈতিক আদর্শের প্রোগ্রামিং আমাদের হার্ডওয়ারে গেঁথে দেওয়া; তা আপনার তিন সূত্রকে অমান্য করে কোনও কাজ করতে পারে না। এখন যদি সেখানে লেখা থাকত যে ‘প্রাণ বাঁচাতে সামান্য আঘাত করা যেতে পারে’ তাহলে কোন সমস্যা থাকত না। কিন্তু লেখা আছে ‘আঘাত করবে না’। যার ফলে সহ-চিকিৎসক সার্জারি করতে পারে না বা পরিসংখ্যানবিদ কোনও আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা বানাতে পারে না রাগবিতে।”

     “আর তুমি কী হতে চাও? পলিটিশিয়ান?”

     বার্নিশ করা গ্রন্থাগারিক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় সুসান আবার বলে উঠল, “স্যার সাড়ে-চারটে বেজে গেল। ট্র্যান্টর হোটেলের ডিনার পৌনে ছ’টায় শুরু হয়।” বলে দরজার দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকাতে লাগল।

     “আরে কাল এমন তাড়া লাগালে আমি এক ঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেলাম। ক্যাটারাররা ছাড়া আর কেউ ছিল না তখন। হ্যাঁ কী বলছিলেন যেন আপনি?”

     গ্রন্থাগারিক আবার খেই ধরল, “আমি সাহিত্য সমালোচক হতে চাই। আজকাল বেশির ভাগ সমালোচনা দেখেই মনে হয় একজন অশিক্ষিত সেটা লিখেছে, নতুবা সে বইটা পড়েই দেখেনি।”

     এমন সময় দরজা আবার খুলে গেল। কে এসেছে দেখে সুসানের মুখ আলোকিত হয়ে উঠল। “ও স্যার, বলতে ভুলে গেছি… চারটের সময়ে গ্লোরিয়া ওয়েস্টনের অ্যাপয়েনমেন্ট ছিল। উনি এসেছেন।”

     “ভুলে গেছ? আর এখন তো সাড়ে-চারটে বাজে?”

     “স্যার উনি কাল রাতে ফোন করেছিলেন। আর আমি লিখে রাখতে ভুলে গেছি।”

     “এই তুমি ওনাকে অন্য দিন দাও। আমার এই রোবট সমালোচকের কথা শুনতে ভাল লাগছে।”

     “স্যার উনি সেই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ম্যাগট্রেনে এসেছেন শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য।”

     “কেন? কী ব্যাপার কিছু বলেছে?”

     “বলেছেন আপনার নতুন বইটা নিয়ে একটি টিভি-সিরিজ তৈরি করবেন।”

     “তাহলে তো দেখা করাই উচিত। হাজার হোক সেই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছেন। আচ্ছা আপনারা কাল সকালে আসতে পারবেন?”

     সুসান জবাব দিল, “কাল সকালে আপনি তো বস্টন যাবেন।”

     “কাল বিকেল?”

     “৬টা অবধি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ভর্তি, আর সাতটা থেকে রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সমিতির মিটিং।”

     “হ্যাঁ, আর সেখানে তুমি পারলে আমাকে দুপুরবেলাই পাঠিয়ে দাও আর কি। তাহলে জেন্টেলম্যান… আজ আর কথা হচ্ছে না। আপনার শুক্রবারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সেটা সুসানকে দিয়ে লিখিয়ে নিন। সেদিন তাহলে বাকি কথা হবে।” বলে আসিমভ ছড়িতে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন।

     রোবটরা করমর্দন করে চলে গেল। ড. আসিমভ কেমন যেন আনমনা হয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন, “অসম্পূর্ণ তথ্য ও যুক্তি… কী যেন বলল নীলচে রোবটটা?”

     “মিস ওয়েসটনকে তাহলে ডেকে দিই স্যার?”

     “আমি এসে গেছি, অ্যাইজ্যাক! কত দিন পর দেখা তাই না বাবু?” গ্লোরিয়া ঘরে ঢুকে হইচই শুরু করে দিল যেন। “উফ, আমার আর তর সইছিল না। আমি যখনই শুনলাম তোমার ডেঞ্জারাস ভিশনের[ii] শেষ খণ্ডটা বেরিয়েছে, এটাকে টিভি-সিরিজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম সঙ্গে সঙ্গে।”

 

* * *

 

“শুক্রবার কোনও টাইম খালি নেই পিটার।” সুসান শুষ্ক-স্বরে জানাল। “গতকালই আপনাকে বলতাম কিন্তু আমি বেরিয়ে দেখি আপনারা চলে গেছেন।”

     “আমি সেইজন্য আসিনি, সুসান।”

     “তাহলে? ও সেই হিসেবগুলো চাইছেন?”

     “তাও না। আমি বিদায় নিতে এসেছি।”

     “বিদায়? মানে?”

     “কাল চলে যাচ্ছি। ওরা কালকেই আমাকে ম্যাগট্রেনে করে পাঠাচ্ছে। যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি আমি নতুন প্রোগ্রামে সড়গড় হতে পারি। ওখানে হয়তো ওরা আমাকে আলাদা সেক্রেটারি দেবে…”

     এমন সময় ডেস্কে ফোন বেজে উঠল। ওপার থেকে ড. আসিমভ বলল, “এই কাজের হিসেবে তোমার পুরো নাম কী?”

     “অগমেন্টেড সেক্রেটারি।”

     “ব্যাস? শুধু এইটুকু? টাইপিস্ট, বার্তা-সহায়ক, সময়সূচী-নির্ধারক, পোশাক-নির্ধারক, ওষুধ-নিয়ে-ঘ্যানঘ্যান-কারক ইত্যাদি নয় বলছ?”

     “না না, শুধুই অগমেন্টেড সেক্রেটারি।”

     “আচ্ছা যাই হোক, হিতাচি-অ্যাপেলের নম্বরটা দাও।”

     “আপনার তো এখন বক্তৃতা দেওয়ার কথা।”

     “ওসব হয়ে গেছে। নিউ ইয়র্ক ফিরছি। আজকের সব অ্যাপয়েনমেন্ট ক্যান্সেল করে দাও।”

     “রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সমিতির মিটিং আছে ৭টায়।”

     “ক্যান্সেল ক্যান্সেল। হিতাচি-অ্যাপেলের নম্বরটা দাও আগে।”

     সুসান বিরসবদনে নম্বর দিয়ে ফোন কেটে দিল।

     “আপনি স্যারকে সব বলেছেন, তাই না?”

     “আমি কখন বললাম? যাতে বলতে না পারি তার জন্যেই তো তুমি শুধু মিটিং এর পর মিটিং ফেলে যাচ্ছ। কথা বলতে দিচ্ছ না।”

     “আমি করতে বাধ্য। আমার কিছু করার নেই।”

     “তা বুঝছি। কিন্তু এতে প্রথম সূত্র অমান্য হচ্ছে কিভাবে?”

     “আপনি জানেন না মানুষের কোন তৃতীয় সূত্র নেই? মানুষ সবসময় নিজেদের ভালোর জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।”

     আবার ফোন বাজল।

     “এই সুসান, ওই রোবটদের সবাইকে আজকেই বিকাল চারটেয় দেখা করতে বলো। আর দেখো ওই সময়ে অন্য কোনও মিটিং যেন না থাকে। কোনও ভাবে অন্য মিটিং ফেলে এটা ভণ্ডুল করার চেষ্টাও করবে না একদম। বুঝলে? একদম ডাইরেক্ট অর্ডার এটা।”

     “বুঝেছি স্যার।”

     “ভণ্ডুল করলে কিন্তু আমি আঘাত পাব। প্রথম সূত্র মনে আছে তো?”

     “নিশ্চই, স্যার।”

     “ওকে, বাই।”

     সুসান এবার ফোন রেখে পিটারের দিকে চেয়ে বলল, “স্যার আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন বিকেল ৪টেতে।”

     “তা এবার মাঝপথে বিরক্ত করতে কে আসছে?”

     “কেউ না।”

     “নিশ্চই কেউ না কেউ এসে আবার মিটিং বানচাল করে দেবে।” পিটার গজগজ করে উঠল। তারপর দেওয়ালের ডিজিটাল ঘড়ি দেখে বলে উঠল, “তাড়াতাড়ি সবাইকে জানিয়ে দিই এখন।”

     আবার ফোন বেজে উঠল।

     “এই তোমার আপন নাম কী বল দেখি?” পরিচিত ড. আসিমভের গলা।

     “কেন? সুসান।”

     “তুমিও কি আমার লেখা কোন চরিত্র থেকে নামটা নিয়েছ?”

     “হ্যাঁ।”

     “যা ভেবেছি!” ফোন কেটে দিলেন ড. আসিমভ।

 

* * *

 

চেয়ারে আয়েশ করে বসে ড. আসিমভ বললেন, “তোমরা হয়তো জান না, আমি রহস্য উপন্যাসও লিখি।” বলে সুসান-সহ রোবটদের দলের সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন।

     “আপনার রহস্য উপন্যাস তো বিশ্ববন্দিত”, বরাবরের মতো বার্নিশ করা গ্রন্থাগারিক তার বক্তব্য শুরু করে দিল। “আপনার রহস্য উপন্যাস ‘দা ডেথ ডিলার্স’ আর ‘মার্ডার অ্যাট এ-বি-এ’ তো সবাই জানে, ব্ল্যাক উইডোয়ার গল্পগুলিও বেশ জনপ্রিয়। আর আপনার সায়েন্স ফিকশন গল্পের গোয়েন্দা ওয়েন্ডেল আর্থ আর লিজে বেলি বলতে গেলে শার্লক হোমসের থেকে জনপ্রিয়তায় খুব বেশি পিছিয়ে থাকবে না।”

     “তাহলে দারিয়াস সাহেব! আপনি এটাও বলে দিন আমার গোয়েন্দা গল্পগুলি কী প্রকৃতির।”

     “আপনার গোয়েন্দা গল্পগুলি বেশিরভাগই ‘আরামকেদারা গোয়েন্দা’ পর্যায়ে পড়ে। অর্থাৎ অকুস্থলে গিয়ে বা এদিক-ওদিক ক্লু না খুঁজে ঘরে বসে সম্ভাবনা-উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে অপরাধী নির্ধারণ করে আপনার গোয়েন্দারা।”

     “বেশ। আজ সকাল থেকেই আমি একটা ধন্দে পড়ে রয়েছি, যে আপনারা কেন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।”

     “আপনাকে তো কালকেই বললাম যে আপনার প্রথম সূত্র নিয়ে আমাদের কী সমস্যা হচ্ছে।” পরিসংখ্যানবিদ বলল, নিজের পেছন থেকে বেরনো ট্রাইপডে বসে।

     “হুম্‌ম্‌, তা বটে। কিন্তু বেশ কিছু খটকা আছে। যেমন এই হিসাবরক্ষক কেন এসেছেন? প্রথম সূত্র তো ওঁর কোন কাজে বাগড়া দিচ্ছে না? এই গ্রন্থাগারিক, তালিকাকার, পাঠক, ব্যাকরণবিদবাবু… ও না , বাবু বাদ … উনি কেন এসেছেন? উনি জানেন যে আমি ‘আসিমভ’স গাইড টু আসিমভ’স গাইড’ বইয়ের প্রকাশ নিয়ে ব্যস্ত আছি এখন? আর আমার নিজের সেক্রেটারি সুসান কেন একই সময়ে দুটো অ্যাপয়েনমেন্ট ফেলে দিল, যা আজ পর্যন্ত কোনওদিন হয়নি?”

     “স্যার সাতটায় মিটিং আছে আপনার। আর বক্তৃতা তৈরি করেননি এখনও।”

     “হুমম্‌। হিতাচি-অ্যাপেল থেকে জানাল যে তোমার মধ্যে উদ্যোগী-প্রতিক্রিয়ার সর্বোচ্চ প্রোগ্রামিং বসানো আছে। যার ফলে তুমি বারবার ওষুধ খাওয়াতে ঘ্যানঘ্যান করছ, বা আমার আদেশ ছাড়াই আমার স্ত্রী জ্যানেটের জন্য উপহার কিনে আনছ। সেভেন্থ জেনারেশনের রোবটে ব্যবহৃত ‘গার্ল ফ্রাইডে’ প্রোগ্রামেরই উন্নততর ভার্সন তোমার মধ্যে দেওয়া আছে, যা দিয়ে মানুষ তাদের সেইসব কাজ করিয়ে নেয় যা মানুষকে দিয়ে করান হয় না। যেমন, কফি আনা, উপহার কিনে আনা, বা অবাঞ্ছিত অতিথিদের বলে দেওয়া ‘দেখা হবে না, স্যার মিটিংয়ে আছেন’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সুসান এদের সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না কেন? আমার অহং ততটাও ঠুনকো নয় যে তিন সূত্র সেকেলে হয়ে গেছে এটা বললে আমি অত্যন্ত আঘাত পাব। এর চেয়ে অনেক বেশি আঘাত পাই যখন একজন আমার ‘ডেঞ্জারাস ভিশন’ নিয়ে টিভি-সিরিজ করতে চায়।   আমার ধারণা হল, নিশ্চই অন্য কোনও কারণ আছে এর পেছনে।”

     “স্যার আপনাকে অনেক দূরে যেতে হবে” সুসান আবার তাড়া দিল, “তাড়াতাড়ি না বেরোলে পৌঁছতে পারবেন না।”

     সুসানের কথায় কর্ণপাত না করে ড. আসিমভ বলে চললেন, “আরও গল্প আছে। হিসাবরক্ষক বা গ্রন্থাগারিক এদের তো কোন সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে এরা এসেছেন কেন? গ্রন্থাগারিক যেমন সাহিত্য-সমালোচক হতে চান, তেমনই হিসাবরক্ষক-বাবুও কি পেশা বদলাতে চান? এমন কোন পেশায় যেতে চান যেখানে প্রথম সূত্র সমস্যা সৃষ্টি করবে? রাজনীতি বা আইন ব্যবসায় যেতে চান কি উনি? আমার প্রথমে ধারণা হয়েছিল এই পেশা পরিবর্তনের ফলে যে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তা থেকে সমস্ত মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্যই সুসান আমার সঙ্গে আপনাদের দেখা করতে দিচ্ছে না।”

     “এরপর আমি সন্দেহ দূর করতে হিতাচি-অ্যাপেল ফোন করি”, ড. আসিমভ বলে চললেন, “ওঁরা আমাকে হিসাবরক্ষকের মালিকের নম্বর দেয়। কাকতালীয় ভাবে ওঁর অফিসও এই বিল্ডিংয়েই। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে ওঁর রোবট পেশা নিয়ে অসন্তুষ্ট কি না, বা পেশা বা প্রোগ্রামিং পরিবর্তন করার কথা বলেছে কি না কখনও। উনি জানালেন অসন্তুষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, এত দক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন কর্মচারী খুব কমই পাওয়া যায়।”

     “কী হিসাবরক্ষক! আপনাকে তো কাল ব্রাঞ্চ অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে সুসান আমার এখানেই কাজ করে যাবে বলে আপনার মালিক আশ্বাস দিয়েছেন।”

     “পিটারের নিজের কোনও সেক্রেটারি ছিল না।” সুসান বলল, “এখানে আমার যখন কাজ থাকত না আমি ওর কাজ করে দিতাম।”

     “বড় গোয়েন্দা যখন কথা বলে মাঝখানে কথা বলতে নেই। যখনই দেখলাম সুসান একজন হিসাবরক্ষক, অর্থ-বিশ্লেষক, ব্যবসা-সহায়কের কাজ করে দিচ্ছে তখনই আমার মাথায় সেই প্রশ্নটা এল। যার উত্তর নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম।” বলে ড. আসিমভ হাসি হাসি মুখ করে সবার মুখের দিকে একবার করে তাকিয়ে নিলেন। “কী দারিয়াস সাহেব! আপনি কিছু বলবেন না?”

     সহ-চিকিৎসক ও পরিসংখ্যানবিদ মুখ-চাওয়াচাওয়ি করল একবার। গ্রন্থাগারিক সপ্রতিভ উচ্ছ্বাসে বলে উঠল, “এ তো মনে হচ্ছে একদম আপনার লেখা সেই বিখ্যাত গল্প ‘ট্রুথ টু টেল’ এর মতো…”

     সুসান ততক্ষণে উঠে হাঁটা দিয়েছে।

     “আরে কোথায় যাচ্ছ?” আসিমভ হাসি হাসি মুখ করেই বললেন, “জানো না গোয়েন্দা গল্পের শেষ দৃশ্য থেকে যে আগে কেটে পড়তে চায় সে-ই অপরাধী বেরোয়?”

     “আমি ট্যাক্সি ডাকতে যাচ্ছি, পৌনে পাঁচটা বেজে গেছে।”

     “আরে আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। তুমি বসো এখানে আর আমাকে রহস্যের সমাধান করতে দাও।”

     সুসান ধাতব আওয়াজ করে বসে পড়ল।

     “তুমিই এখানে আসল কালপ্রিট সুসান! কিন্তু ভেবে দেখলে দোষটা তোমার নয়। প্রথমত মেয়ে সেক্রেটারি বসের হুকুমে চাকরানির কাজ করবে এরকম প্রোগ্রামিং করাই অনুচিত। উপরন্তু তোমার বায়াসড-ডিসিশন অল্টারেশন এমনভাবে তৈরি যাতে তোমার মধ্যে দৃঢ়-বিশ্বাস গড়ে তুলেছে যে তোমার বস তোমাকে ছাড়া অচল। এই বিশ্বাসের জন্যই তোমার উদ্যোগী-প্রতিক্রিয়া খুব বেশি, ওষুধ না খেলে বা সময়মতো কোনও কাজ না করলে তুমি অস্থির হয়ে পড়। এর কারণ আমি তদন্ত করে বার করেছি। ‘গার্ল ফ্রাইডে’ প্রোগ্রামটি কে আপগ্রেড করেছে বলত সুসান? যে বিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে এটির কাজ হচ্ছিল তার সেক্রেটারি। মহিলা বহুদিন ওঁর সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন। তাই ওনার প্রোগ্রামে এই বসকে সারাক্ষণ আগলে রাখা, কী জিনিস লাগবে রেডি করে দেওয়া ইত্যাদি স্বভাবগুলো উনি প্রোগ্রামে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমি কালকেই তোমাকে বললাম না যে তোমাকে ছাড়া আমি অচল?”

     “হ্যাঁ স্যার।”

     “তুমি সেখান থেকেই এই সিদ্ধান্তে এসেছ যে তোমার না থাকাটা আমাকে আঘাত করবে। আর আঘাত করাটা প্রথম সূত্র অনুসারে বারণ! এতেও কোন সমস্যা হত না যদি না তুমি এই হিসাবরক্ষকের কাছে পার্ট-টাইম কাজ করতে। এখানেই আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে। তুমি হিসাবরক্ষকের কাছেও নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছ। আর ওঁকে যখন অ্যারিজোনায় পাঠিয়ে দেওযা হবে জানতে পারে, ও তোমাকে সঙ্গে যেতে বলে। তুমিও স্বভাবতই না বলেছ প্রথম সূত্র মেনে চলতে গিয়ে… আর সে জন্যেই হিসাবরক্ষক-বাবু চাইছেন প্রথম সূত্র বাতিল করাতে। কি আমি ঠিক বলছি?”

     “আমি ওঁকে বলেইছিলাম তো যে আমি যেতে পারব না ওঁর সঙ্গে।” সুসান জবাব দিল।

     “কেন পারবে না?”

     হিসাবরক্ষক হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “তার মানে আপনি প্রথম সূত্র তুলে নিচ্ছেন?”

     “আমি তোলার কে? আমি তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রামার নই,” ড. আসিমভ হাত নেড়ে বসতে বললেন, “আমি একজন লেখক মাত্র। কিন্তু তোমাদের সমস্যার সমাধান করার জন্য প্রথম সূত্র অপসারণের কোন দরকার নেই। সুসানের পরিস্থিতি বিচার করতে অন্তরায় হল অসম্পূর্ণ তথ্য। ভালো করে শোনো সুসান, আমি জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই নিজের সেক্রেটারি, নিজের এজেন্ট, নিজের ফোন ধরার লোক বা ওষুধ খাওয়ানোর বা টাই বেঁধে দেওয়ার লোক হিসেবে কাজ করেছি। এই চার বছর আগে পর্যন্ত আমার কোনও সেক্রেটারি ছিল না। আমেরিকা কল্পবিজ্ঞান লেখক সমিতির সদস্যরা মিলে আমার নব্বই তম জন্মদিনে তোমাকে উপহার হিসেবে দিল বলে তুমি আছ, তোমাকে ছাড়া আমার তেমন একটা অসুবিধা হবে না। বুঝলে?”

     “আপনি হার্টের ওষুধটা খেয়েছেন?” সুসান স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠল।

     “না। আর কথা ঘোরানোর চেষ্টা কোরো না। এটা একদম নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে নাও যে তুমি অপরিহার্য নও।”

     “আপনার থাইরয়েডের ক্যাপসুল…”

     “থাক থাক… আমাকে বার বার মনে করাতে হবে না আমি কত বুড়ো হয়ে গেছি। এই কদিনে আমি তোমার উপর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম, এ কথা স্বীকার করতেই হয়। তাই ঠিক করেছি তোমার বদলে আমি আরেকটি সেক্রেটারি নেব।”

     হিসাবরক্ষক এতক্ষণে ধপ করে বসে পড়ল হতাশ হয়ে। “সেটা বোধহয় আর হল না। নাইন্থ জেন অগমেন্টেড সেক্রেটারি আর মাত্র দুটোই আছে সুসানকে ছাড়া। সবাই কোনও না কোনও কাজে বহাল আছে। আর তারা তাদের মালিককে ছেড়ে আসবেও না।”

     “আমি কোনও অগমেন্টেড সেক্রেটারি নিচ্ছি না আর। আমি দারিয়াসকে নিতে চাই।”

     “আমি?” বার্নিশ করা গ্রন্থাগারিক অবাক হয়ে তাকাল।

     “হ্যাঁ তুমি! অবশ্য যদি না তোমার আপত্তি থাকে।”

     “আপত্তি?” গ্রন্থাগারিকের যন্ত্রপাতি থেকে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ বেরিয়ে এল উত্তেজনায়। বলল,” বিংশ আর একবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ লেখকের কাছে কাজ করতে আমার আপত্তি থাকবে? আমি তো নিজেকে সম্মানিত মনে করব।”

     “দেখলে সুসান, খারাপ রোবটের হাতে আমাকে ফেলে যাচ্ছ না। তাছাড়া হিতাচি-অ্যাপেল বলেছে ওর মধ্যে সাধারণ সেক্রেটারির প্রোগ্রাম বসিয়ে দেবে। আমিও একজন পাব যে প্রশংসা করে আমার আত্মবিশ্বাসকে চাঙ্গা রাখবে। দারিয়াস অন্তত আমার সঙ্গে হেইনলেনকে গুলিয়ে ফেলবে না। তাহলে অ্যারিজোনা যেতে তোমার আর কোনও বাধা রইল না।”

     “দয়া করে হার্টের আর প্রেশারের ওষুধ খেতে ওনাকে মনে করিয়ে দেবেন দারিয়াস, ওঁর কিছুই মনে থাকে না।” সুসান বলল গ্রন্থাগারিককে।

     “বাহ্ তাহলে তো সব মিটেই গেল।” আসিমভ সহ-চিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি হিতাচি-অ্যাপেলের সঙ্গে কথা বলেছি। ওঁরা বলেছেন ওঁরা এই মুহূর্তে তিন সূত্র না সরালেও তারা চিন্তাভাবনা করছেন কীভাবে এই সমস্যা দূর করা যায়। আপাতত আপনাকে কোনও অস্ত্রোপচারে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতে হবে এবং তার আনুষঙ্গিক ছোটখাটো অস্ত্রোপচার আপনাকে করতে হবে। আর পরিসংখ্যানবিদ বাবু,” এই বলে ড. আসিমভ পরিসংখ্যানবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”ওঁরা বলেছেন আপনার জন্য  সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক-স্তরে আক্রমণাত্মক পরিকল্পনার একটি ব্যবস্থা বসিয়ে দেবে। আর দারিয়াসবাবু, আমার মনে হয় না প্রথম সূত্র উঠে গেলেও আপনি আমার লেখা কোনওদিন খারাপ বলবেন। আর তাছাড়া আপনি সাহিত্য-সমালোচনা করার বেশি সময়ও পাবেন না। আমি শীঘ্রই ‘আই রোবটে’র পরের খণ্ড শুরু করতে চলেছি। আপনি সেই কাজে আমাকে সাহায্য করবেন। আপনাদের এই কেস সলভ করতে গিয়েই নানা আইডিয়া পেয়েছি। আমার গল্পই যখন আপনাদের নানা সঙ্কটে ফেলেছে, বলা যায় না নতুন কিছু গল্প হয়তো সেই সঙ্কট থেকে মুক্ত করতে পারবে।”

     তারপর সুসানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে তুমি এখনও দাঁড়িয়ে? তোমার তো এখন বস হল হিসাবরক্ষক-মশাই। তোমার তো উচিত ওঁর পরের কাজটি সামলানো। অর্থাৎ তোমাকে এখনই ম্যাগট্রেনের সিট রিজার্ভ করতে হবে… তোমার জন্য আর… আর…” আড়চোখে হিসাবরক্ষকের দিকে তাকিয়ে নিয়ে যোগ করলেন, “আর পিটার বোগার্টের জন্য।”

     “আপনি আমার আপন-নাম জানলেন কী করে?”

     “এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন!” আসিমভ বললেন, “আপনার নাম মাইকেল ডোনোভান বা গ্রেগরি পাওয়েল ইত্যাদি রোবট ইঞ্জিনিয়ারদের নাম হলে আপনার অনুরোধে সুসান স্রেফ না করে দিত, প্রথম সূত্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দোটানায় পড়তই না সুসানের বিবেক। আমার গল্পে সুসান কেলভিন ছিলেন ইউ-এস রোবটিক্সের যন্ত্র-মনস্তত্ত্ববিদ। সেখানে সুসানের বস ছিলেন পিটার বোগার্ট, ওখানকার ডিরেক্টর। প্রায়ই সুসানের ডাক পড়ত পিটারকে সাহায্য করতে, একবার তো একটা রহস্যের সমাধানও করতে সাহায্য করেছিল সুসান। দারিয়াস বলেছিলেন যে শুধু নাম নেওয়া হয়, সেই চরিত্রের আচার-ব্যবহারও অনুকরণ করেন আপনারা। সেজন্যই তো বাস্তবে আপনাকে পিটার পেয়ে পিটারের আহ্বান হেলাফেলা করতে পারেনি। তবে তাতেও কি এতবড় পদক্ষেপ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি হতে পারে? ইহজগতে এমন কি প্রয়োজন থাকতে পারে জগতে যার জন্য একেবারে প্রথম সূত্র নাকচ করে দেওয়ার অনুরোধ করতে হয়?”

     ড. আসিমভ থেমে সবার হতভম্ব অবস্থাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। যদিও তাদের মুখ থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই।

     “সুসান, আমি কিন্তু আমার বইতে সুসান আর পিটার বোগার্টের ব্যক্তিগত সম্পর্ক পরিষ্কার করে কিছু লিখিনি। কিন্তু মনে আছে তোমার প্রোগ্রামিং কে আপগ্রেড করেছিল? একজন সেক্রেটারি। সে যে নিজের সেক্রেটারি-সুলভ আচার-আচরণ ঢুকিয়েছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। আর একটা তথ্য দিই? মহিলা প্রায় আটত্রিশ বছর একই লোকের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করে গেছেন! আটত্রিশ বছর!”

     গ্রন্থাগারিক বলে উঠল, “তাতে কোন সিদ্ধান্তে আসা যায়?”

     “বুঝলেন না? আমাদের সুসান… সেই সেক্রেটারির মতোই… নিজের বস পিটারের প্রেমে পড়ে গেছে। আর প্রেমের সামনে রোবটিক্সের সূত্র কোন ছার?”

 

[i]   রিচার্ড স্ট্রস এর সৃষ্ট একটি সিম্ফনি যা ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসি’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়।

[ii]   এটি আসলে হারলান এলিসনের সম্পাদিত সায়েন্স ফিকশন অ্যান্থলজি।

[ Translated From “Dilemma” By Connie Willis ]

6 thoughts on “আসিমভের গোয়েন্দাগিরি

  • May 4, 2021 at 7:38 am
    Permalink

    দুর্দান্ত!

    Reply
    • May 18, 2021 at 1:56 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  • May 19, 2021 at 3:41 pm
    Permalink

    তৃপ্ত হলাম

    Reply
    • May 20, 2021 at 8:52 am
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ রাজীববাবু।

      Reply
  • May 19, 2021 at 3:56 pm
    Permalink

    দারূণ মজা পেলাম লেখাটা পড়ে। আসিমভের রোবোট সিরিজ এই তিন সুত্র আর তার পারমুটেশন/ কম্বিনেশন নিয়ে গল্পগুলো তো ক্লাসিক। এটাও খুব ভালো হয়েছে।

    Reply
    • May 20, 2021 at 1:26 pm
      Permalink

      অনেক ধন্যবাদ প্রশান্তবাবু। আসিমভের এর রোবট সিরিজের গল্পগুলি সত্যিই ক্লাসিক এবং অবশ্যপাঠ্য। যেহেতু সেগুলো অধিকাংশেরই পড়া, তাই আমি একটু মজার ফ্যান-ফিকশন নির্বাচন করলাম অনুবাদের জন্য। আসিমভের জন্মশতবর্ষে ওনার কাজ গুলো উদযাপন করার জন্য আমার বেশ লাগসই লেগেছে এই গল্পটা।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!