আমি আজ বুকুন

“কে? বুকুন এলি?”

     ঘরের এক পাশে বিছানার সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা মানুষটির অস্ফুট কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ওই একটিই নাম থেকে থেকে বৃদ্ধার মনে পড়ে। তাঁর একমাত্র ছেলে।

     হ্যাঁ, আজ আমি বুকুন। আমার উচ্চতা আরও সাড়ে তিন ইঞ্চি বাড়িয়ে নিলাম। চোখের মণির রং বদলে আর-৫৩ জি-১৫ বি-৬-তে নিয়ে এলাম। ঘরের ভিতরে সাধারণত বুকুনের এটাই থাকে। গায়ের রংও তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে পরিবর্তন করতে হল। তবে বুকুনের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িটা আমি তৈরি করি না। কারণ, সুমিত্রাদেবীর স্মৃতিতে তাঁর ছেলের দু-বছর আগেকার পরিষ্কার করে কামানো মুখটাই ভেসে আছে।

     এত বড় বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ। বাড়ির আর সবাই তাঁদের দৈনন্দিন কাজে বেরিয়ে গেছে। ঘরদোর পরিষ্কার করে জানলার পর্দা সরিয়ে দিয়ে গেছে মালতী। পুবের কাচঢাকা জানলা দিয়ে সকালের মিঠে রোদ এসে বিছানায় তীর্যকভাবে পড়েছে। তা সত্ত্বেও ঘরের ভিতরে একটা বিষন্নতার আলো। আলো অথবা অন্ধকার। সুমিত্রাদেবী বাইরের বাগানে সময় কাটাতে খুব ভালোবাসতেন।

     এখন তিনি শুয়ে আছেন আরোগ্যশয্যায়। এটি একটি বিশেষভাবে তৈরি বিছানা। সুমিত্রাদেবীর দৈহিক অবস্থা চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ আর রেকর্ড করে যাচ্ছে। বিছানাটির সঙ্গেই যুক্ত আছে মনিটর, যেখানে প্রতিনিয়ত তাঁর হৃদস্পন্দন ও স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপের গ্রাফ ভেসে উঠছে। ঘরের মধ্যে এমনভাবে বিছানাটা রাখা আছে যাতে সুমিত্রাদেবী চোখের সামনেই জানলা দিয়ে বাইরের বাগানের দৃশ্য দেখতে পান। আর পাশের ঘরে যাওয়ার দরজাটাও ঘাড় ফেরালেই তাঁর চোখে পড়ে। কিন্তু তিনি সে-সব কিছুই দেখছেন না। আজ তাঁর স্মৃতি বুকুনময়।

     তাই আমি আজ বুকুন।

     বুকুনের কণ্ঠস্বর সৃষ্টি করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয় আমার কাছে। আমার গলায় বসানো আছে মাল্টিমোডাল ডায়নামিক স্পিকার।

     “গুড মর্নিং মা, কেমন আছ? বাগানের গাছে অনেক শিউলি ফুটেছে। সাজি ভরে নিয়ে এলাম তোমার জন্য।”

     সুমিত্রাদেবী ফুল খুব ভালোবাসেন। যে কোনও ভূমিকাতেই থাকি না কেন, আমি যখনই সকালবেলায় প্রথম তাঁর কাছে আসি, হাতে ফুল নিয়ে আসি। আমার তথ্যভাণ্ডার বলছে বুকুন ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে শরতের সকালে সাজি ভরে শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনত। সুমিত্রাদেবী শিশুর মতো হেসে ফুলের সাজিটা হাত বাড়িয়ে আমার কাছ থেকে নিলেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর কাঁপা কাঁপা হাত থেকে সাজিটা মাটিতে পড়ে ফুলগুলি ছড়িয়ে গেল। তিনি শিশুর মতোই ফুঁপিয়ে উঠলেন।

     “ফুলগুলো পড়ে গেল রে। কুড়িয়ে নিই দাঁড়া।”

     আমার অনুভূতি জালক কান্না দেখলেই চঞ্চল হয়ে ওঠে। আমি বললাম, “আমি কুড়িয়ে দিচ্ছি। তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো।”

     ফুলগুলি কুড়িয়ে আবার সাজিতে ভরে সাজিটা টেবিলের ওপর এমনভাবে রাখলাম যাতে মেডিকেল মনিটরের পেছনে ঢাকা পড়ে না যায়। সুমিত্রাদেবী স্থিরদৃষ্টিতে ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে আছেন। বদ্ধ ঘরে ইতিমধ্যেই শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।

     সুমিত্রাদেবীর হাতে যুক্ত ইন্ট্রাভেনাস টিউব দেখে মনে পড়ল কাল রাতের আই.ভি.-টা দেওয়া হয়নি। আমি বিচলিত হলাম না, কারণ এসব ক্ষেত্রে বুকুন বিচলিত হয় না। ‘মনে পড়ল’ কথাটা লিখলাম বটে, কিন্তু আমার তো স্মৃতি বলে কিছু নেই, আমার ভিতরের জমা হওয়ার তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে জানতে পারি। উনি কাল তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই আমার অনুকৃতি জালকও সচল ছিল না। আমি স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রামিং দ্বারা চালিত ছিলাম তখন।

     সুমিত্রাদেবীর চিকিৎসা সহায়ক কাজকর্ম ছাড়া রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার— ইত্যাদি ঠিকে কাজের জন্য অন্য ব্যবস্থা আছে। এমনিতে আমার নিজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ খুবই সামান্য। কিন্তু অনুকৃতি জালক আমার নবতম সূক্ষ সংযোজন। একে প্রতিদিন ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম দিয়ে স্থিতিশীল করতে হয়। না হলে যে কোনও সময় বিগড়ে যেতে পারে।

     আমি আবার আমার তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে সুমিত্রাদেবীর পুষ্টিতথ্য তুলে আনলাম। তারপর একদম বুকুনের মতো করেই বললাম, “সকালের জলখাবার খেয়েছ মা? মালতী বলল কিছুই নাকি প্রায় মুখে তুলতে চাওনি।”

     “মালতী? সে আবার কে?”

     আমার অনুকৃতি জালক আমি বাধা দেওয়ার আগেই উত্তর দিল। আসলে তাঁর স্মৃতিভ্রংশের ব্যাপারটা সামনে এলেই আরও অসুবিধা হয়, তাই পারতপক্ষে এমন উত্তর দেওয়া উচিত নয়। ‘বুকুন’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মালতী আমাদের বাড়িতে কাজ করে মা। তোমাকে খাইয়ে দেয়।”

     “না না। মালতী তো আসেনি। আমার খাবার এনেছিল ঝিলিক।”

     ঝিলিক বুকুনের বড় মেয়ে। কলেজে পড়ে। সবসময় খুব ব্যস্ত থাকে। গত পাঁচ দিন সে এই ঘরে প্রবেশ করেনি।

     আমার ভেতরের দুই প্রতিযোগী নির্দেশকের মধ্যে পড়ে আমার অবস্থা কাহিল। আমার অনুভূতি জালক সুমিত্রাদেবীর সঙ্গে সহমত হতে আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে। অথচ অনুকৃতি জালক বুকুনের চরিত্র অনুযায়ী তর্কে যেতে চাইছে। উভয় নির্দেশক নিজের প্রতিক্রিয়া আবর্ত শক্তিশালী করে প্রতিষ্ঠা পেতে চাইছে। এ যে কী অসহ্য যন্ত্রণা! সুমিত্রাদেবীর স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক, এ আমি চাই না।

     অবশেষে একজনের জয় হল, “হ্যাঁ মা, আমি ভুলে গিয়েছিলাম মালতী আজ আসেনি।”

     কিন্তু অপরজনও নিজের অস্তিত্ব জানান দিল, “কিন্তু তুমি মালতীকে চেনো না?”

     সুমিত্রাদেবী হেসে উঠলেন, পরক্ষণেই তাঁর হাসিটা রূপান্তরিত হল কাশিতে। কাশতে কাশতে ধনুকের মতো বেঁকে উঠছেন। আমি মুখের কাছে জলের বোতল বাড়িয়ে ধরলাম। কিছুটা জল খেয়ে ধাতস্থ হলেন।

     “ও মা! মালতীকে চিনব না? সেই তোর জন্মের সময় থেকে আছে। সে কোথায়? একটু ডেকে দে না, কথা বলি।”

     আমার কেন্দ্রীয় প্রণালী আঁতিপাঁতি করে তথ্যভাণ্ডার খুঁজে দেখতে লাগল। কারণ মালতী হল ঠিকে কাজের রোবট। বছরখানেক হল তাকে এ বাড়িতে নিয়োগ করা হয়েছে। সুমিত্রাদেবী যখনই কোনও নতুন লোকের প্রসঙ্গে কথা বলেন তখনই আমায় সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য খুঁজে বের করতে হয়। প্রায় সাড়ে ছ-সেকেন্ডের মাথায় খুঁজে পেলাম সাতচল্লিশ বছর আগে বুকুনের জন্মের সময় এ বাড়িতে কাজ করত বাসন্তী। একত্রিশ বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর চরিত্র ও বাহ্যিক গঠন সম্পর্কে খুব কম তথ্যই রয়েছে আমার কাছে। আমাকে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে সুমিত্রাদেবীর স্মৃতিচারণা থেকে আর এই পরিবারের অন্য লোকেদের কাছ থেকে। এই কারণে এখনই আমার অনুকৃতি জালকের পক্ষে সম্ভব নয় বাসন্তীর রূপ ধারণ করা। আমি বরং আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে বুকুন হওয়ার চেষ্টা করি।

     কিন্তু আবার আমার মধ্যে বুকুনের চরিত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, “না মা। আমার জন্মের সময় যে কাজ করত সে তো একত্রিশ বছর আগে মারা গেছে। সে আসবে কী করে?”

     আমার অনুভূতি সংকেতের মধ্যে সতর্কবার্তা জ্বলে উঠল। বুকুনের পক্ষে এমন কথা বলা হয়তো মানায়, কিন্তু সুমিত্রাদেবীর কাছে এই সংবাদ অত্যন্ত ভয়ানক। অভিব্যক্তি-সূচকের দ্বারা বুঝতে পারলাম সুমিত্রাদেবীর মুখের চামড়ার কোঁচকানো দাগগুলি স্পষ্টতর হচ্ছে। চোখ ছলছল করছে, যে কোনও মুহূর্তে কান্না বাঁধ ভাঙবে।

     “কী বললে? একত্রিশ বছর? না না, এই তো আজ সকালেই বাসন্তী এল।” সুমিত্রাদেবী এরপর অধৈর্যভাবে মাথা নাড়তে থাকলেন, “কী গো, শুনছ? হরিশ? বাসন্তীকে বলো বুকুনকে নিয়ে আসবে। কুয়োর জলে চান করলে বুকুনের ঠান্ডা লেগে যাবে যে।”

     আমি খুব দ্রুত নিজের চেহারা পরিবর্তন করতে লাগলাম। মাথার চুল কাঁচাপাকা, ঠিক যেমন দু-বছর আগে মারা যাওয়ার সময় হরিশবাবুর ছিল। আমার খুব পরিষ্কারভাবে হরিশবাবুর অনুকৃতি নকশা বানানো আছে। তাই খুব বেশি সময় লাগল না নিজেকে পালটে ফেলতে। আমি হরিশবাবুর গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠস্বরে বললাম, “সব ঠিক আছে, সুমি। সব ঠিক আছে। বুকুন এখন স্কুলে গেছে।”

     “বুকুনকে আমার কাছে এনে দাও।” সুমিত্রাদেবী অঝোরধারায় কেঁদে চলেছেন।

     আমি বিছানার ওপর বসলাম। পিঠের পেছনদিকে হাত দিয়ে সুমিত্রাদেবীকে আমার কাছে টেনে আনলাম। ঠিক যেমনভাবে হরিশবাবু বলতেন তেমনিভাবে চুলে হাত বুলিয়ে বললাম, “কেঁদো না সুমি, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো আছি। তোমার চিন্তা কীসের?”

আমি কেউ না। আমার কোনও সচেতন সত্ত্বা নেই। শুধু একটি যন্ত্র। চিকিৎসা সহায়ক অ্যান্ড্রয়েড BRKCX-01932-217JH-98662। অত্যাধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের তথ্যে পরিপূর্ণ এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিং চালিত এক উন্নতমানের যন্ত্রমানব। আমার কোনও রাগ নেই, দুঃখ নেই, অভিমান নেই, ভালোবাসা নেই। আছে শুধু জটিল হিসেবনিকেশ।

     সুমিত্রাদেবীর পরিবার অনেক টাকার বিনিময়ে এই যন্ত্রে অনুকৃতি জালক যুক্ত করেছেন। স্নায়বিক নেটওয়ার্ক এবং সংবেদী প্রতিক্রিয়া পদ্ধতির অত্যাধুনিক সমন্বয়— সুমিত্রাদেবীর কাছের মানুষদের চারিত্রিক এবং বাহ্যিক রূপ বিশ্লেষণ করে নিখুঁতভাবে অনুকরণ করাই যার কাজ। মনিব যখন অনুপস্থিত, সেই অবস্থাতেও তাঁর প্রিয়জন যাতে তাঁর উষ্ণ সান্নিধ্যলাভ করে সেদিকেই আমার সদাসতর্ক দৃষ্টি জাগ্রত রাখে।

     আর আছে অনুভূতি জালক। সুমিত্রাদেবীর ইচ্ছে, অনিচ্ছে, চাহিদা, রাগ, অভিমান, ভালোবাসা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে আমার মধ্যে তাঁর একটা সাইকোলজিক্যাল মডেল তৈরি করে। সেই হিসেবে আমি তাঁর সেবায় নিযুক্ত হই।

     কিন্তু যখন এই দুই নির্দেশকের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য সক্রিয় হয় তৃতীয় নির্দেশক। এই তৃতীয় নির্দেশকের নামই হল ‘আমি।’ সুমিত্রাদেবী যখন গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকেন, কেউ যখন তাঁর কাছাকাছি থাকে না, সেই নির্দেশক তখন নীরবে সজাগ হয়। এই যন্ত্র আমার উপস্থিতির কথা জানে না। কিন্তু সুমিত্রাদেবীর যখনই প্রয়োজন হয়, আমি হাজির হই।

আজ আমি ঝিলিক। ঝিলিকের ওই একমাথা কোঁকড়ানো চুল আমি কিছুতেই ঠিকঠাক আনতে পারি না, কিন্তু সুমিত্রাদেবী তা সত্ত্বেও আমার ফাঁকি ধরতে পারেন না। কারণ, তিনি যেদিন একান্তভাবেই ঝিলিকের সঙ্গ কামনা করেন তখনই আমাকে ঝিলিক হতে হয়।

     আগেই বলেছি, ঝিলিক তার কলেজ, পড়াশুনা, বন্ধুবান্ধব নিয়ে খুবই ব্যস্ত। তাই ইচ্ছে থাকলেও সে তার ঠাম্মির সঙ্গ দিতে পারে না। সেই সকালবেলা ঠাম্মি ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, আর রাত্রিবেলা যখন ফেরে, সুমিত্রাদেবী তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাই অনেক সময় সে আমার সঙ্গেই কথা বলে ফিরে যায় নিজের ঘরে। আমার অনুকৃতি জালকযুক্ত মডেলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার বেশ অসুবিধে হয়েছিল প্রথম দিকে। কিন্তু এখন সে জানে বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করলেও আমি আসলে আর পাঁচটা অ্যান্ড্রয়েডের মতো যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নই। তাই সে আমার সঙ্গেই তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন অনেক কিছু গল্প করে যা বাড়ির মধ্যে একমাত্র তার ঠাম্মিকেই আগে বলতে পারত। সে জানে যন্ত্র কখনও পেট-পাতলা হয় না।

     আজ ‘ঝিলিক’ ঘরে ঢুকেই ছুট্টে গিয়ে ঠাম্মির গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেল।

     “ঠাম্মি! কী সুন্দর দেখতে লাগছে তোমাকে। দাদান দেখলে আর-একবার তোমার প্রেমে পড়ে যাবে।”

     “দূর পাগলি! তুই সেজেগুজে নে, রোহিত আসবে বলেছিলি না আজ?”

     “সে আসবে বিকেলে। এখন চলো, একটু বাগানে ঘুরে আসবে। সারাদিন এই ঘরে বসে আছ।”

     সুমিত্রাদেবীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বাগানে নিয়ে এলাম। তিনি এখন আর খুব একটা বিছানা ছেড়ে উঠতে চান না। কিন্তু আমি জানতাম তাঁকে বাইরে নিয়ে আসার কাজটা ঝিলিকই সব থেকে ভালো পারবে। বাগানের ফুলগাছগুলি দেখতে দেখতে সুমিত্রাদেবী খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন। এই ফুলের বাগান, ঘাসে ঢাকা সবুজ লন তাঁর নিজের হাতের ছোঁয়ায় রূপ পেয়েছিল।

     “হ্যাঁ রে, জুঁইফুলে কুঁড়ি আসেনি? কতদিন জুঁইফুলের গন্ধ পাই না।”

     এখন জুঁইফুলের সময় নয়। কিন্তু সে কথা সুমিত্রাদেবীকে বলা যাবে না। আমার কোনও গন্ধের অনুভূতি নেই। আমি জানি না রজনীগন্ধার সঙ্গে জুঁইয়ের গন্ধের কী পার্থক্য। গন্ধ ছড়ানোর কোনও প্রযুক্তি এখনও আমার সঙ্গে যুক্ত হয়নি। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আমরা বাগানে কাটালাম। আমি ঝিলিকের ক্লাস আর নতুন বয়ফ্রেন্ডের গল্প বললাম, ঝিলিকের ঠাম্মি তাঁর জীবনের নানা পরিচিতজনের কথা বললেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বহুদিন হল আর ইহজগতে নেই, কিন্তু কত পরিষ্কারভাবে সুমিত্রাদেবীর স্মৃতিতে তাঁরা রয়ে গেছেন এখনও।

     আজ সন্ধেবেলা আমি কোনও ভূমিকায় নেই। সুমিত্রাদেবী ঘুম থেকে উঠে আমায় কারও সঙ্গেই মেলাতে পারলেন না। একেক দিন এমন হয়। তখন আমি নির্বাক পরিচর্যাকারীর কাজ করে যাই।

     তবে আজ সত্যিই ঝিলিক তার ঠাম্মির ঘরে এল। সুমিত্রাদেবী বললেন, “কী ব্যাপার রে? আজ তোর কোনও কাজ নেই? এই বুড়িটার সঙ্গে এত সময় নষ্ট করছিস যে?”

     “কী যে বলো তুমি ঠাম্মি? তুমি বুড়ি কে বলল? এখনও তোমাকে সাজিয়েগুজিয়ে র‍্যাম্পে হাঁটানো যায়, জানো? অন্য সবাই পাত্তাই পাবে না।”

     “আর কি হাঁটতে পারব রে? বাগানেই আজ কতক্ষণ তোর সঙ্গে ঘুরলাম, তাও ওই চেয়ারটাতে বসে বসে। পা দুটোতে কোনও জোর পাই না।”

     ঝিলিক একটু অবাক হলেও পরক্ষণেই বুঝে নিল সকালে সুমিত্রাদেবী আসলে কার সঙ্গে বাগানে ঘুরেছেন। এরপর দুই অসমবয়সি মহিলা খুনসুটি গল্পে মেতে উঠল আর আমি দূর থেকে ঝিলিককে লক্ষ করতে লাগলাম, যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে তার ভূমিকা পালন করতে পারি।

আজ আমি হয়েছিলাম অদিতি। বুকুনের স্ত্রী। কিন্তু আমাকে অবাক করে সত্যি সত্যিই অদিতি এ ঘরে এসে ঢুকল। প্রায় একমাস পরে। শেষ যখন সুমিত্রাদেবীর সঙ্গে অদিতির সাক্ষাৎ হয়েছিল, অদিতি সেদিন খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। অদিতিকে দেখলে মনে হয় সে তাঁর শাশুড়ির এই অবস্থা সহ্য করতে পারে না। বুকুন বা ঝিলিকের সঙ্গে অনেকবার তাঁর এই নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। আমার অনুভূতি জালক আমাকে মানুষের ব্যবহারের বিচার করতে অনুমতি দেয় না। কিন্তু আমি যখন অদিতির ভূমিকায় অবতীর্ণ হই, তখন বুঝতে পারি অদিতির আসল মনস্তত্ত্ব। সে আসলে সুমিত্রাদেবীর আচরণকে ভয় পায়। সুমিত্রাদেবীর সামান্য বিস্মৃতি দেখলেই তাঁর মনে ত্রাস সঞ্চার হয়— এই বুঝি অ্যালঝাইমার চরম রূপ ধারণ করল। কিন্তু আমার প্রাইভেসি প্রোটোকল অনুযায়ী কারও অনুকৃতি নকশা প্রকাশ করার অনুমতি নেই।

     অদিতি যখন আজ এ ঘরে এল তারপর যথারীতি আমি হয়ে গেলাম কেউ না। ঘরের এককোণে ফুলদানির ফুলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। অদিতির সঙ্গে এসেছে ঝিনুক। বুকুন আর অদিতির ছোট মেয়ে ঝিনুক। এখনও পাঁচ বছর বয়েস হয়নি, কিন্তু এর মধ্যেই তার সঙ্গে ঝিলিকের মিল প্রকট। সেই একই রকম কোঁকড়ানো লম্বা চুল। হাসিটাও একই রকম সুন্দর।

     ঝিনুক এসেই এক লাফে বিছানায় উঠে পড়ল। সুমিত্রাদেবী সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কিন্তু আমি অনুভূতি জালকের মাধ্যমে বুঝতে পারলাম তিনি ঝিনুককে চিনতে পারেননি। ঝিনুকের জন্ম হয়েছিল তাঁর অসুস্থতা প্রকট হওয়ার পরে। তাই ঝিনুকের স্মৃতি সুমিত্রাদেবীর মনে কোনও স্থায়ী ছাপ রাখে না। ঝিনুক প্রত্যেকবারই তাঁর কাছে নতুন মানুষ।

     বেশ কিছুক্ষণ সুমিত্রাদেবী আর ঝিনুকের মধ্যে কথোপকথন চলতে লাগল। বেশির ভাগ কথাই ঝিনুক বলে যাচ্ছিল। প্রথমদিকে সুমিত্রাদেবীও টুকটাক উত্তর দিচ্ছিলেন। তারপর একসময় হাসিমুখে হুঁ-হাঁ করতে লাগলেন। অদিতি বুঝতে পেরে বলল, “ঝিনুক, তুমি ঠাম্মিকে আর জ্বালাতন কোরো না। যাও, বাগানে গিয়ে খেলা করো।”

     বাগানে দাপাদাপি করা ঝিনুকের খুব পছন্দের জিনিস। সে এক ছুট্টে বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি ঝিনুকের অনুকৃতি নকশা তৈরি করিনি। কিন্তু সুমিত্রাদেবীর সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুব সহজেই বোঝা যায়। দুজনের মনই সাদা কাগজের পাতা। প্রতিদিন তার ওপর নতুন অভিজ্ঞতার ছবি আঁকা হচ্ছে। ঝিনুকের খাতা ভরে উঠছে নতুন নতুন পাতায়। আর সুমিত্রাদেবীর একটা একটা করে খাতার পাতা হারিয়ে যাচ্ছে।

     আমি এক-এক সময় অবাক হয়ে ভাবি, এমন সব ভাবনা আমার আসে কী করে! হয়তো এ সবই বিভিন্ন সময়ে আমার সৃষ্টি করা বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক নকশার অনুরণন।

     অদিতি আর সুমিত্রাদেবীর মধ্যে কথাবার্তা যা চলছিল তার বেশির ভাগটাই অদিতির নিজের সম্মন্ধে, তাঁর কর্মজগৎ সম্মন্ধে। কারণ অদিতি মনে করে এটাই সুমিত্রাদেবীর সঙ্গে আলাপচারিতার পক্ষে নিরাপদ বিষয়।

     কিন্তু খুব বেশিক্ষণ ব্যাপারটা নিরাপদ রইল না। শুরু হয়েছিল খুব তুচ্ছভাবে।

     “আমাকে একটু জল দেবে বউমা?”

     “হ্যাঁ মা। আনছি।”

     “না, তুমি না।” সুমিত্রাদেবী অদিতিকে কঠোরভাবে নিষেধ করে আমার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন, “বউমা, এক গ্লাস জল এনে দাও আমায়।”

     অদিতি অস্থির হয়ে উঠল। তাঁর চোখে ভীতির ছাপ স্পষ্ট। আর এই সময়েই সে ভুলটা করে বসল।

     “ও তোমার বউমা নয়, মা। এই তো আমি। ও তো মেডিকেল অ্যাটেন্ডেন্ট।”

     “তুমি কে তা আমি জানি না। তবে আমি আমার ছেলের বউকে ভালোভাবে চিনি। বউমা, এই ভদ্রমহিলাকে চলে যেতে বলো।”

     “মা…”

     অদিতি তাঁর বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সুমিত্রাদেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

     “আসুন…” আমি অদিতির কাঁধে হাত রেখে বললাম, “আমরা বরং পাশের ঘরে যাই।”

     অদিতির চোখ জলে ভিজে গেছে। সে ঘাড় নেড়ে আমার সঙ্গে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সে আমাকে মেরেই বসবে। কারণ তাঁর চরিত্রের পক্ষে এটাই ভালো যায়। কিন্তু আমায় অবাক করে অদিতি আমার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠল। খুব বেশি ভয় আর উৎকণ্ঠা একসঙ্গে উপস্থিত হলে তার আচরণগত প্রকাশ কীরকম হবে, তা আমি তাঁর অনুভূতি নকশার মধ্যে সংশোধন করে নিলাম। তাঁর পিঠে হাত রেখে আমি বললাম, “শান্ত হোন ম্যাডাম। আজ উনি হয়তো খুব একটা সুস্থ নেই। তাই…”

     “আমি জানি… বুঝেছি… শুধু…” মাথা তুলে চোখের জল মুছে নিল অদিতি।

     “আপনি কিছুক্ষণ পরে আবার ঘরে ঢুকে ওঁকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিন। উনি একটু আগের সব ঘটনাই তখন ভুলে যাবেন। আর আপনাকে ঠিকই চিনতে পারবেন।”

     “বলছ?”

     আমি ঘাড় নাড়লাম।

     “কিন্তু তুমি কী করবে?”

     “আমি ঘরে ঢুকব না এখন। আপনারা দুজন কিছুক্ষণ একা কথা বলুন।”

     “তুমি তাহলে একটু ঝিনুককে দেখো, একা বাগানে ঘুরছে।”

     ঝিনুক আমাকে ডাকে রোবটকাকু বলে। আর আমি ওকে বলি ঝিনুক দিদিমণি। তাতে ও খুব খুশি হয়। ওর প্রশ্নের শেষ নেই। আর আমার কাছেও আছে তথ্যভাণ্ডার। প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর আমি খুব সহজভাবে ওকে বুঝিয়ে দিই। আজ অনেকক্ষণ সময় বাগানে ঝিনুকের সঙ্গে রোবটকাকু হয়ে কাটালাম।

আজ আমি কেউ নই। প্রায় সারাদিন সুমিত্রাদেবী ঘুমিয়েই ছিলেন। স্বভাবতই আমারও কোনও কাজ ছিল না। একবার তন্দ্রা ভেঙে বললেন, “খিদে পেয়েছে।” আমার অনুভূতি জালককে সক্রিয় করতে এটুকুই যথেষ্ট ছিল।

আজ আমি বুকুন, অদিতি, বাসন্তী আর মালতী। সুমিত্রাদেবী আজ স্মৃতির সরণি বেয়ে অনেক পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মনের চাহিদামতো একবার ওঁর বাবার ভূমিকায় আমাকে নামতে হল। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কোনও তথ্যই আমার কাছে ছিল না। আমি হরিশবাবু আর বুকুনের চরিত্র মিলিয়ে-মিশিয়ে চেষ্টা করেছিলাম সুমিত্রাদেবীর বাবা সাজতে, কিন্তু তাঁর চাউনি দেখে বুঝলাম আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি।

আজ দিনের অনেকটা সময় আমার কোনও নাম ছিল না। কিন্তু এখন আমি আবার বুকুন। সুমিত্রাদেবীর রাতের খাবার এনে তাঁর সঙ্গে বসে গল্প করছি। পুরোনো দিনের কথা। বুকুনের ছোটবেলায় একটা ছোট সাদা বেড়াল ছিল, তার গল্প। বুকুনের স্কুলজীবনের গল্প। সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠে আসছিল সুমিত্রাদেবীর স্মৃতিতে।

     এমন সময় বিপদসংকেত বেজে উঠল। বাড়িতে এবং আমার অভ্যন্তরস্থ সমাযোজন ব্যবস্থাতেও। আমি সংকেত বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারলাম বাড়ির বেসমেন্টে আগুন লেগেছে। আগুন নেভানোর যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তাতেই কাজ হবে বলে মনে হয়, আমার সে নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। আমার কাজ হল সর্বাগ্রে সুমিত্রাদেবীকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

     সুমিত্রাদেবী চঞ্চলভাবে চারদিকে চেয়ে দেখছেন, তাঁর দৃষ্টিতে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। প্রথমে ওঁকে শান্ত করতে হবে।

     “কোথাও হয়তো সামান্য আগুন লেগেছে। চলো মা, তুমি হুইল চেয়ারে বসো, আমরা বাইরে বাগানে যাই।”

     “না, আমি এখন বাইরে যাব না।”

     আমি সংকেতবার্তা আর-একবার বিশ্লেষণ করলাম। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় কোথাও ত্রুটি হয়েছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যেই এ ঘরে ধোঁয়া ঢুকতে শুরু করেছে। আমি হুইলচেয়ারটাকে টেনে বিছানার কাছে নিয়ে এলাম।

     “মা, একটু কথা শোনো। তাড়াতাড়ি বাইরে বেরোতে হবে। ঠিক আছে?”

     আমি সুমিত্রাদেবীকে ধরে বিছানা থেকে নামাতে গেলাম। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, “কে তুমি? বেরিয়ে যাও এখান থেকে।”

     “আমি…” মুহূর্তকালের জন্য আমি যেন আমার ভূমিকা বিস্মৃত হলাম। তিনি আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি নিজেকে প্রমাণিত করার, “আমি বুকুন। চলো, তাড়াতাড়ি বাইরে চলো মা।” তাঁর প্রতিরোধকে প্রতিহত করার জন্য আমি জোর করতেই পারি, কিন্তু একই সঙ্গে আমাকে লক্ষ রাখতে হচ্ছে তিনি যাতে শারীরিকভাবেও আঘাত না পান।

     ধোঁয়ার কুণ্ডলী ইতিমধ্যেই বেশ ঘন হয়ে এসেছে। সুমিত্রাদেবী হাত-পা ছুড়ে বাধা দিচ্ছেন। আমি তাঁকে জোর করে চেয়ারে বসানোর চেষ্টা করছি। তিনি টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ সর্বশক্তি দিয়ে চেয়ারটার ওপর এক লাথি মারলেন। চেয়ারটা উলটে গিয়ে মনিটরের ওপর পড়ল। ভাঙা কাচ ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। তার মধ্যেই আমি ভাবছিলাম কী করে চেয়ারটা আবার নিয়ে আসা যায়।

     ওদিকে সুমিত্রাদেবী ভেতরের দরজার দিকে একা-একাই এগিয়ে চলেছেন। ভাঙা কাচে তাঁর পা কেটে রক্তাক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ওঁর যেন কিছুতেই হুঁশ নেই। এক অপার্থিব শক্তি যেন ফিরে পেয়েছেন। এমন সময়ে রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ফাটার বিকট আওয়াজ শোনা গেল। একই সঙ্গে আগুনের এক লেলিহান শিখা দমকা হাওয়ার সঙ্গে ভেতরঘরের দরজা ঠেলে সুমিত্রাদেবীকে গ্রাস করে নিল।

     আমার আর বিশ্লেষণ করার অবকাশ ছিল না। এক ঝটকায় বিছানা থেকে কম্বলটা তুলে নিয়ে ছুড়ে দিলাম সুমিত্রাদেবীর ওপরে। তাঁকে কম্বলে গোল করে পাকিয়ে নিয়ে কাচের জানলা ভেঙে বাইরে বাগানে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

     বাগানের সযত্ন পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা সবুজ ঘাসের গালিচার মধ্যে কিছুটা গড়িয়ে গেলাম। চোখের সামনে আরও একটা বিস্ফোরণে সুমিত্রাদেবীর ঘরটা সম্পূর্ণ আগুনের গ্রাসে চলে গেল। আগুনের হলকা তীব্রভাবে এসে আমার যান্ত্রিক শরীরে আঘাত করছে। আমার কেন্দ্রীয় প্রণালী ক্ষতির সংকেতবার্তা পাঠাচ্ছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি তা উপেক্ষা করতে। সুমিত্রাদেবীকে ঢেকে রাখা কম্বলের মধ্যেও জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলছে। আমার কোনও জ্বালার অনুভূতি নেই। কিন্তু ওঁর তো আছে। আমি থাবড়ে থাবড়ে সমস্ত আগুন নেভালাম। তারপর তাঁকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে আগুন থেকে আরও দূরে বাগানের এক কোণে চলে এলাম।

     কম্বল উন্মুক্ত করে আমি তাঁর নাড়ি দেখার চেষ্টা করলাম। সুমিত্রাদেবী অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “আমাকে নিয়ে চলো এখান থেকে। বড় কষ্ট হচ্ছে। তুমি কী?”

     ‘তুমি কী?’ এই প্রশ্নটা খুব বড় আমার কাছে। এই প্রশ্ন আমার অনুকৃতি জালককে বন্ধ করে দেয়, এবং আমার সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে। “আমি চিকিৎসা সহায়ক অ্যান্ড্রয়েড BRKCX-01932-217JH-98662, মিসেস সুমিত্রা চক্রবর্তী, আমি আপনার তত্ত্বাবধায়ক। আমি কি আপনাকে পরীক্ষা করে দেখতে পারি?”

     আমার অনুভূতি জালক এখনও সচল আছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম সুমিত্রাদেবীর চোখে ভীতির ছায়া। তিনি কিছু বলার চেষ্টা করছেন, তাঁর ঠোঁট কাঁপছে। শব্দের পরিবর্তে তাঁর গলা থেকে ঘড়ঘড় শব্দ বের হচ্ছে। একসময় তা পরিণত হল প্রবল কাশির দমকে।

     তাঁর শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য এই দুইয়ের মধ্যে কাকে প্রাধান্য দেব তা নিয়ে আমি দোলাচলে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত শারীরিক স্বাস্থ্যেরই জয় হল। আমি তাঁকে সযত্নে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। আমার শরীরের মধ্যে থাকা আপদকালীন চিকিৎসার সরঞ্জাম থেকে একটা যন্ত্রণা কমানোর ইঞ্জেকশান দিলাম। আমার অনুভূতি জালক বন্ধ হওয়ার সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু আমি তা অগ্রাহ্য করছি। জরুরি অবস্থার চিকিৎসার জন্য আমাকে প্রস্তুত করা হয়নি। আমার সঙ্গে নেই কোনও অক্সিজেন, সুমিত্রাদেবীর কাশির দমক কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। আমার সমস্ত আপদকালীন ব্যবস্থা সংকেত পাঠাচ্ছে যে এই মুহূর্তে তাঁর ভীষণভাবে প্রয়োজন অক্সিজেনের। কিন্তু আমার করার কিছুই নেই। আমি জোর করে শুধু নিজেকে সচল রেখেছি। অবশেষে যখন উদ্ধারকারী লোকজন এসে উপস্থিত হল আমি স্তব্ধ হলাম।

আজ আমি হরিশ। আমি হরিশ হতে চাইনি। কিন্তু বুকুন বলল হাসপাতালে শেষ সময় সুমিত্রাদেবীর পাশে হরিশবাবুর থাকা প্রয়োজন।

     এমনিতেই তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তার ওপর অগ্নিদগ্ধ হওয়া আর ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এখন অবস্থা খুবই সংকটজনক। শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ দ্রুত কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে। ওষুধে আর তেমন কাজ দিচ্ছে না। ডাক্তার বলেছেন, এইরকমভাবে বেঁচে থাকার থেকে তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো। এতেই তাঁর সমস্ত কষ্টের অবসান হবে।

     এইরকম সময়ে হরিশবাবু খুব বেশি কথা বলতেন না নিশ্চয়ই। আমিও সুমিত্রাদেবীর হাত আমার হাতের মধ্যে নিয়ে তাঁর পাশে চুপ করে বসেছিলাম। একে একে পরিবারের লোকেরা এসে দেখে যাচ্ছে। তিনি হয়তো জানেন না যে এই শেষ দেখা। কিংবা হয়তো জানেন।

     ঘরে ঢুকল ঝিলিক। সুমিত্রাদেবী তাঁর নাতনিকে ঠিক চিনতে পেরেছেন। অনেক কষ্টে হাসার চেষ্টা করলেন।

     “ঝিলিক… সোনা… রোহিত কেমন আছে?”

     রোহিত ঝিলিকের প্রথম প্রেমিক। ছয় বছর আগে তাদের প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। হয়তো ঝিলিকেরও এখন আর রোহিতকে মনে নেই ভালোভাবে।

     “রোহিত… ভালো আছে, ঠাম্মি।” পরিবারের মধ্যে ঝিলিকই সবথেকে সহনশীল। কিন্তু আমার অনুভূতি জালকের মাধ্যমে বুঝতে পারলাম, অনেক কষ্টে গলার কাছে পাকিয়ে আসা কান্নার দলাটাকে গিলে নিয়ে ঝিলিক এটুকু বলে আমার দিকে তাকাল। এখন আমি তার ঠাকুরদার ভূমিকায় আছি। হয়তো আরও কিছু স্মৃতি ভিড় করে এল তার মনে। ঝিলিক আর এক মুহূর্তও ঘরে থাকতে পারল না। মুখে রুমাল চেপে পেছন ফিরে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

     অদিতি এল, সঙ্গে ঝিনুক। ঝিনুক ঘরে ঢুকেই রোবটকাকুর দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু আমার পক্ষে হাসিটুকু ফেরত দেওয়া ছাড়া সেই ভূমিকায় ফিরে যাওয়া এই মুহূর্তে সম্ভব হল না। অদিতি সুমিত্রাদেবীর সঙ্গে নিজের কাজ আর ঝিনুকের স্কুল নিয়ে অনেক কথা বলে গেল। জানি না তার এক বর্ণও সুমিত্রাদেবী বুঝতে পারলেন কি না। কিন্তু সর্বক্ষণ তাঁর মুখে হাসিটুকু লেগে রইল।

     একসময় ঝিনুক তার মায়ের হাত ছাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অদিতি এগিয়ে এসে সুমিত্রাদেবীর একটা হাত তুলে নিজের হাতে নিল। আমি হরিশবাবু হিসেবে বড়ই অবাক হলাম। অদিতি কোনওদিন তার শাশুড়ির সঙ্গে শারীরিকভাবে এতটা ঘনিষ্ট হয়নি। যদিও তাঁদের দুজনের মধ্যে সদ্ভাবের অভাব কোনওদিনই ছিল না।

     অদিতি তার গল্প এখনও থামায়নি। সুমিত্রাদেবীর হাত নিজের হাতে নিয়ে নিজের মনে কথা বলেই চলেছে। একসময় বুকুন এসে আমার কাঁধে স্পর্শ করে দাঁড়াল। হয়তো তার নিজেরও এই সময় বাবাকে খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বুকুন আমার পাশ দিয়ে ঘুরে এসে বিছানায় বসল। অদিতির সঙ্গে বুকুনও তার গল্প শুরু করল। ঝিলিকের জন্মের ঘটনা। বুকুন আর অদিতির বিয়ে, প্রেম, কলেজের দিনগুলি। সুমিত্রাদেবীর চোখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘটনাগুলি এখনও প্রত্যক্ষ করছেন।

     কিন্তু একসময় তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর নিশ্বাসের লয় কমে এল। কিন্তু বুকুন আর অদিতির যেন কিছুই চোখে পড়ছে না। বুকুন গল্প বলছে, তার স্কুলের দিনগুলির কথা, সময় সরণি বেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে তার স্মৃতি। তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ মৃদু হয়ে আসছে।

     একসময় আমার আঙুলের সেন্সর কোনও নাড়ির স্পন্দন টের পেল না। আমি বুকে কান পাতলাম। যদি সেখানে কোনও শব্দ শুনতে পাই। কিন্তু না। কোনও শব্দ নেই। নিশ্বাস নেই। হৃদস্পন্দন নেই।

     আমি আরও কিছুক্ষণ হরিশ হয়ে রইলাম। তারপর আমি শুধুই আমি। সহসা আমার অনুভূতি জালক বুকুন আর অদিতির বিষাদে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

     আমি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সেখানে ঝিনুককে সঙ্গে নিয়ে ঝিলিক বসে আছে। সে রক্তাভ চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি মাথা নাড়লাম। ঝিলিকের গাল বেয়ে নতুন কয়েক বিন্দু জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। তারা দুজনে সুমিত্রাদেবীর ঘরে ঢুকে গেল আবার।

     আমি একা বসে রইলাম। আর তারপর আমার কেন্দ্রীয় প্রণালী ধ্বসে পড়ল।

এখন আমি প্রায়দিনই কেউ নই।

     আগুনের কারণ হিসেবে জানা গেছে বিদ্যুতের তারের গোলযোগ। বিমার টাকা পাওয়া গেছে। অগ্নিবিধ্বস্ত পুরোনো বাড়িটা ভেঙে ফেলে বাগান জুড়ে আরও বড় নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে।

     আমিও সেই বিমার একটা অংশ ছিলাম। আমাকে প্রস্তুতকারক সংস্থার কাছে ফেরত দিয়ে চুক্তির টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিমা কোম্পানি। কিন্তু বুকুন আর অদিতি রাজি হয়নি। আমাকে সারিয়ে এনে নিজেদের কাছেই তারা রেখেছে। অদিতি কখনও স্বীকার করবে না, কিন্তু আমি অনুভূতি জালকের মাধ্যমে জানি, সে ভয় পায় কোনও একদিন হয়তো তার নিজের বা বুকুনের আমাকে প্রয়োজন হবে। আবার আমার অনুকৃতি জালকের সাহায্যের দরকার হবে।

     আমার দিনের বেশির ভাগ সময়টা ঘুমিয়েই কাটে এখন। এমন অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসে যা আমার সামনে ঘটেনি, কিন্তু আমার তথ্যভাণ্ডারে সঞ্চিত আছে। সেই স্মৃতির ভার আমার শক্তি ফুরিয়ে ফেলে। আমাকে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে হয়।

     কিন্তু মাঝে মাঝেই ঝিনুক রোবটকাকুর সঙ্গে খেলা করতে চায়। তার বাবা-মাও তার সেই ইচ্ছায় বাধা দেয় না। তারা আমায় জাগিয়ে তোলে। আর ঝিনুক দিদিমণি আর আমি দুজনে মিলে অনেক অজানা জিনিস আবিষ্কার করে ফেলি। আজ সে আমার কাছে তার ঠাম্মির গল্প শুনতে চেয়েছে।

     আমি আজ সুমিত্রা।

মার্টিন শুমেকারের “টুডে আই অ্যাম পল”-এর রূপান্তর।

5 thoughts on “আমি আজ বুকুন

  • May 4, 2021 at 9:07 pm
    Permalink

    আসল গল্পটি পড়িনি। তবে পড়তে গিয়ে একবার ও মনে হয়নি এ গল্প অনুবাদ। সেখানেই হয়ত আপনার কৃতিত্ব।

    আর অনবদ্য কাহিনী।

    Reply
  • May 5, 2021 at 1:20 pm
    Permalink

    দারুন গল্প। দুর্দান্ত ভাষান্তর। গল্প পড়তে পড়তে মন দৃশ্যগুলো তৈরি করছিল।

    Reply
  • May 7, 2021 at 4:57 pm
    Permalink

    দুর্দান্ত লাগলো দাদা.. কিন্তু একটা প্রশ্ন ছিল… অনুকৃতি জালক ব্যাপারটা ঠিক ক্লিয়ার হোল না…. মানে রোবট যখন হরিশ বাবু হচ্ছে বা ঝিলিক হচ্ছে শুধুমাত্র facial reconstruction হচ্ছে নাকি সুমিত্রা দেবী একটা হ্যালুসিনেসন এর মত দেখতে পাচ্ছেন? একটু বলবে?

    Reply
    • May 7, 2021 at 5:31 pm
      Permalink

      Reconstruction হচ্ছে। ওটাই রোবটের ওই মডেলের নবতম প্রযুক্তি। সেটা গল্পের শুরুর দিকে লেখা আছে।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!