নক্ষত্রের আলো

ওদের কথাগুলো আর্থার ট্রেন্ট এক্কেবারে পরিষ্কার শুনতে পেল। উত্তেজনা ও রাগে ভরপুর কথাগুলো বুলেটের মত ছিটকে বেরিয়ে আসছিল রিসিভার থেকে। ‘‘ট্রেন্ট! তুমি পালাতে পারবে না। তোমার কক্ষপথ আমরা ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই খুঁজে পেয়ে যাব। আর তুমি যদি বাধা দিতে যাও, মহাশূন্যেই ধ্বংস করে দেব তোমায়।’’

     ট্রেন্ট হাসল। কিন্তু কিছুই বলল না। তার কাছে কোনও অস্ত্র-টস্ত্র নেই। কেনই বা থাকবে। লড়াইয়ের কোনও প্রয়োজনই তো নেই তার। দু’ঘণ্টার চেয়ে ঢের কম সময়ে তার মহাকাশযান অধিশূণ্যে লাফ দেবে। তারপর আর ওরা ওকে খুঁজে পাবে না। ট্রেন্টের কাছে থাকা ব্রিফকেসটায় প্রায় এক কিলোগ্রাম ক্রিলিয়াম রয়েছে। যা দিয়ে অনায়াসে হাজার হাজার রোবটের মগজ তৈরি করা যায়। গ্যালাক্সির যে কোনও গ্রহ বিনা বাক্যব্যয়ে কোটি টাকায় কিনে নেবে এটা।

     পুরো ব্যাপারটার পরিকল্পনা বুড়ো ব্রেনমেয়ারের। তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সে এই পরিকল্পনা করেছে। বলতে গেলে এটা তার সারা জীবনের কাজ।

     ‘‘এটাই তোমার পথ, হে ছোকরা।’’ সে বলেছিল। ‘‘এই কারণেই তোমাকে আমার দরকার। তুমি দিব্যি একটা যানকে উড়িয়ে নিয়ে মহাকাশে চলে যেতে পারো। আমি পারি না।’’

     ‘‘না, মিস্টার ব্রেনমেয়ার, এসব নিয়ে মহাশূন্যে পালিয়ে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না।’’ ট্রেন্ট বলেছিল, ‘‘অর্ধেক দিনের মধ্যেই আমরা ধরা পড়ে যাব।’’

     ‘‘উঁহু’’, মাথা নেড়ে চালাকির সুরে ব্রেনমেয়ার বলেছিল, ‘‘যদি লাফটা ঠিকমতো দিতে পারি… অধিশূণ্যের মধ্যে দিয়ে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরে চলে যাব আমরা।’’

     ‘‘কিন্তু লাফটা ঘটাতে অর্ধেক দিন তো লাগবেই। যদি আমরা ততটা সময় পেয়েও যাই, পুলিশ সমস্ত নক্ষত্রজগৎকে সতর্ক করে দেবে।’’

     ‘‘না, ট্রেন্ট, না।’’ বুড়ো মানুষটার উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা হাত তাকে আঁকড়ে ধরেছিল। ‘‘সমস্ত নক্ষত্রজগৎকে নয়। কেবল আমাদের প্রতিবেশী ডজনখানেককে। এই গ্যালাক্সি বিপুল। উপনিবেশ স্থাপনকারীরা গত পঞ্চাশ হাজার বছরে পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে হে।’’

     এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলছিল ব্রেনমেয়ার। সেই প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ যেটাকে পৃথিবী বলে চিনত, এই ছায়াপথটা এখন তার কাছে সেরকমই ছোট্ট আর চেনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছায়াপথের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষ। তবে সবাই নিজেদের চৌহদ্দির জগৎটাকেই ভালো করে চেনে।

     ‘‘যদি আমরা এলোমেলো লাফ দিই, যে কোনও জায়গায় পৌঁছে যাব। এমনকী পঞ্চাশ হাজার আলোকবর্ষ দূরত্বও কোনও ব্যাপার নয়। একঝাঁক উল্কার ভিতর থেকে একটা নুড়ি খুঁজে পাওয়ার মতোই অসম্ভব হয়ে উঠবে আমাদের খুঁজে পাওয়া।’’

     ট্রেন্ট মাথা নাড়ল, ‘‘এবং সেক্ষেত্রে আমরাও নিজেদের খুঁজে পাব না। এমন ভুলভাল কোনও উপায়ে আমরা আদৌ কোনও বসবাসযোগ্য গ্রহে গিয়ে উঠতে পারব নাকি?’’

     দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে আশপাশ ভালো করে জরিপ করে নিল ব্রেনমেয়ার। কাছাকাছি কেউ নেই, তবুও প্রায় ফিসফিস করে সে বলল, ‘‘গত তিরিশ বছর ধরে আমি ছায়াপথের সমস্ত বসবাসের যোগ্য গ্রহের তথ্য জড়ো করেছি। সমস্ত পুরনো নথি খতিয়ে দেখে নিয়েছি। মহাকাশের যে কোনও যান চালকের থেকে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ বেশি ভ্রমণ করেছি আমি। এবং প্রত্যেকটি বসবাসযোগ্য গ্রহ আমার কম্পিউটারের মেমোরিতে স্থাপন করেছি।’’

     ব্রেনমেয়ারের কথা শুনে আলতো করে ভুরু কোঁচকাল ট্রেন্ট।

     ব্রেনমেয়ার বলল, ‘‘আমি কম্পিউটারের নকশা তৈরি করি। সবচেয়ে সেরাটা আমার কাছেই রয়েছে। ছায়াপথের প্রতিটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের অবস্থান এঁকে রেখেছি আমি। এফ, বি, এ এবং ও বর্ণালি শ্রেণির প্রতিটি নক্ষত্রের বিস্তারিত বিবরণ তুলে রাখা আছে কম্পিউটারের মগজে। আমরা লাফ দেওয়ার পরে কম্পিউটার তার কাছে থাকা ছায়াপথের মানচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেবে সমস্ত নক্ষত্রকে। দ্রুত হোক বা একটু সময় লাগুক, সে ঠিকই খুঁজে পাবে অভীষ্ট গ্রহটি। তারপর মহাকাশে থমকে থাকা মহাকাশযানটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে দ্বিতীয় লাফটি ঘটিয়ে পৌঁছে যাবে নিকটবর্তী বসবাসের যোগ্য গ্রহতে।’’

     ‘‘যাই বলুন, শুনে তো খুব সুবিধের লাগছে না। বেশ জটিল ব্যাপার।’’

     ‘‘এটা ব্যর্থ হতেই পারে না। বছরের পর বছর ধরে আমি এই নিয়ে কাজ করেছি। এটা কখনওই ব্যর্থ হবে না। আমি কোটিপতি হয়ে আর দশটা বছর বড়জোর কাটাতে পারব। কিন্তু তুমি তো তরুণ। কত দীর্ঘ জীবন তুমি কাটাতে পারবে কোটিপতি হয়ে, ভাবতে পারছ?’’

     ‘‘কিন্তু ওরকম এলেমেলো লাফ দিলে তো আমরা সোজা কোনও নক্ষত্রের ভিতরেও পড়ে যেতে পারি।’’

     ‘‘একশো ট্রিলিয়নে একবারও তেমন হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই, ট্রেন্ট। তবে এমন হতে পারে কোনও উজ্জ্বল নক্ষত্র থেকে আমরা এতদূরে গিয়ে পড়লাম যে কম্পিউটার তার প্রোগ্রামের সঙ্গে কোনও তারাকেই হয়তো মেলাতে পারল না। আবার এমনও হতে পারে আমরা কেবল এক বা দুই আলোকবর্ষ দূরত্বে পৌঁছলাম। পুলিশও আমাদের সন্ধান পেল। তবে এসব ঘটার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। যদি এসব নিয়ে চিন্তা করতেই হয়, তাহলে এটাও ভাবো যে তুমি তো টেক অফ করার সময়ই হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যেতে পারো। সেটা ঘটার সম্ভাবনা এগুলোর থেকে অনেক বেশি।’’

     ‘‘হয়তো আপনিই ঠিক মিস্টার ব্রেনমেয়ার। আপনি অনেক অভিজ্ঞ।’’

     বুড়ো মানুষটা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘‘আমি কোনও গণনা করব না। যা করার স্বয়ংক্রিয় ভাবে কম্পিউটারই করবে।’’

     মাথা নেড়েছিল ট্রেন্ট। কথাটা সে মনে রেখেছিল।

     এরপর একদিন মাঝরাতে যখন যানটা মহাকাশে ভেসে পড়তে তৈরি, ব্রেনমেয়ার সেখানে এসে পৌঁছল একটা ব্রিফকেস হাতে। সেই ব্রিফকেসে রাখা ছিল ক্রিলিয়াম। ট্রেন্ট এরপরই তার কাজ সেরে ফেলে। কাজটা সারতে কোনও সমস্যাই হয়নি ট্রেন্টের। কেননা বুড়ো তাকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করত। কাজেই এক হাতে ব্রিফকেসটা নিতে নিতে অন্য হাতটা চকিতে ঘুরিয়ে অব্যর্থ ভাবে কাজটা সে অনায়াসে করে ফেলেছিল।

     আজও এসব কাজে ছুরির কোনও বিকল্প নেই। আণবিক অস্ত্রের মতো একই রকম মারাত্মক। অথচ আরও নিঃশব্দে কাজ সারা যায় এটা দিয়ে। মৃতদেহের শরীরে ছুরিটা গাঁথা অবস্থাতেই পালিয়ে এসেছে ট্রেন্ট। ছুরিতে তার হাতের ছাপ পরিষ্কার ভাবে ফুটে আছে। থাকুক। কী এসে যায় আর? ওরা আর ওর টিকিটিও পাবে না এজন্মে।

     এই মুহূর্তে সে মহাকাশের গভীরে, পিছনে পুলিশের যান— ট্রেন্টের টেনশন শুরু হল সম্পূর্ণ অন্য কারণে। প্রতিটি মহাকাশযান চালকই জানে একটি লাফ দেওয়ার আগে মনের ভিতরে কেমন উত্তেজনা কাজ করে। কোনও মনোবিদের পক্ষে কম্মো নয় এটাকে ব্যাখ্যা করা।

     মনের ভিতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি কাজ করে। মনে হতে থাকে সে এবং তার যান যেন সময়বিহীন, আকারবিহীন একটা পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছে। পরিণত হয়েছে পদার্থহীন, শক্তিহীন একটা অবস্থায়। তারপর সেখান থেকেই আবার দুম করে সম্পূর্ণ অন্য ছায়াপথে ভেসে উঠে নিজেকে ফিরে পাওয়া।

     ট্রেন্ট হাসল। সে বেঁচে আছে। কোনও নক্ষত্রের খুব কাছে চলে যায়নি তার যান। তবে তার যথেষ্ট কাছেই রয়েছে হাজার হাজার নক্ষত্র। সেই সব নক্ষত্র ভরিয়ে রেখেছে আকাশ। আর তাদের বিন্যাস এতটাই আলাদা যে বুঝতে অসুবিধে হয় না, লাফ দিয়ে মহাকাশযানটি বহু দূরে চলে এসেছে।

     কিছু নক্ষত্রকে দেখে মনে হচ্ছে ‘এফ’ বর্ণালি শ্রেণির। কম্পিউটার তার মগজের তথ্যের সঙ্গে এই বিন্যাসকে মিলিয়ে ফেলবে মনে হচ্ছে। এবং দ্রুত। খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়।

     আরাম করে পিছনে হেলান দিল ট্রেন্ট। তার যান আস্তে আস্তে ঘুরছে। আর সেই সঙ্গে ঘুরছে তারাগুলিও। দৃশ্যপটে বিভিন্ন ঔজ্জ্বল্যের নক্ষত্রের আলো। দেখতে দেখতে একটি উজ্জ্বল তারা একেবারে সামনে চলে এল। বড়জোর দু’ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে ওটা। তার পাইলটের অনুভূতি বলছে উষ্ণ ও চমৎকার নক্ষত্র ওটা। কম্পিউটারের উচিত এটাকেই বেস বানিয়ে এর কেন্দ্রের বিন্যাসের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া। বেশি সময় লাগবে বলে তো মনে হয় না।

     কিন্তু লাগল। মিনিটের পর মিনিট পেরিয়ে ক্রমে এক ঘণ্টা। কিন্তু এখনও কম্পিউটার ব্যস্ত হয়ে ক্লিক করে চলেছে। তার আলো ঝিলিক দিচ্ছে।

     ট্রেন্টের ভুরু কুঁচকে গেল। কেন এখনও বিন্যাসটার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? ব্রেনমেয়ার তাকে তার দীর্ঘ সময়ের কাজের ফিরিস্তি দিয়েছিল। বলেছিল সে কোনও নক্ষত্রকেই বাদ দেয়নি বা কাউকে ভুল জায়গায় বসিয়েও ফেল‌েনি।

     হ্যাঁ, তারারা জন্মায়। এবং মারাও যায়। মহাশূন্যে তারা ঘুরেও বেড়ায়। কিন্তু সেই সব পরিবর্তন ঘটে অত্যন্ত ধীরে। ব্রেনমেয়ারের হিসেব দশ লক্ষ বছরেও এই বিন্যাসগুলির কোনও পরিবর্তন—  

     হঠাৎই একটা আতঙ্কে লীন হয়ে গেল ট্রেন্ট। না! এমনটা হতেই পারে না। সোজা কোনও নক্ষত্রের ভিতরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার চেয়েও ঢের কম তেমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা। তবু মনের মধ্যে সেই আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে।

     সে অপেক্ষা করতে শুরু করল, কখন আবার উজ্জ্বল তারাটি ফিরে আসে চোখের সামনে। তার হাত কাঁপতে শুরু করেছে। আসার পর সেই অবস্থাতেই সে টেলিস্কোপিক ফোকাসের মধ্যে নিয়ে এল তারাটাকে। তারপর সেটাকে যতটা বাড়ানো সম্ভব, বাড়িয়ে তুলল। ক্রমে সে বুঝতে পারল নক্ষত্রটির চারপাশে যে আলোকবৃত্ত, তাতে ধরা পড়ছে অবাধ্য গ্যাসের ঘন কুয়াশা।

     ট্রেন্ট শিউরে উঠল। সেকী! এটা একটা নোভা! সেক্ষেত্রে অস্পষ্টতার ভিতর থেকে আচমকাই সেটা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। হয়তো এক মাসেই এটার ঔজ্জ্বল্য বেড়ে গেছে।

     মহাশূন্যে অবস্থানকারী এই নোভাটা কম্পিউটারের মেমোরিতে নেই। কেননা ব্রেনমেয়ার সেটাকে ওখানে রাখেইনি। আসলে যখন ব্রেনমেয়ার ওটা তৈরি করেছিল, তখন এই নোভা কোনও উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে ধরা পড়েনি। কারণ সে তখন ছিল অনুজ্জ্বল অবস্থায়। তাই ব্রেনমেয়ার ওটাকে বেছে নেয়নি। নেওয়ার প্রশ্নও ছিল না।

     ‘‘ওটাকে ধর্তব্যের মধ্যে এনো না। ছেড়ে দাও ওটাকে!’’ চিৎকার করে উঠল ট্রেন্ট।

     কিন্তু হায়! সে চেঁচাচ্ছে একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের উপরে। যন্ত্রটি এখনও তার মেমোরিতে থাকা ছায়াপথের বিন্যাসের সঙ্গে মেলাতে চাইছে নোভার বিন্যাসটিকে। খুঁজে পাবে না। কিন্তু চেষ্টাটা চালিয়ে যাবে। চালিয়েই যাবে… চালিয়েই যাবে। এইভাবে সে মেলানোর চেষ্টা করেই চলবে অনন্তকাল ধরে— না, অনন্তকাল নয়। সে ততক্ষণই মিলিয়ে চলবে যতক্ষণ না তার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

     একসময় ফুরিয়ে যাবে বাতাস। সুতরাং ট্রেন্টের জীবনও ফুরিয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না।

     অসহায় ট্রেন্ট চেয়ারের উপরে ধপ করে পড়ে গেল। এলানো শরীরে সে তাকিয়ে রইল নক্ষত্রের আলোর বিদ্রুপের দিকে।

     মৃত্যুর জন্য এক দীর্ঘ পীড়াময় প্রতীক্ষা শুরু হয়েছে ট্রেন্টের। নুইয়ে পড়া ট্রেন্টের এখন একটাই আক্ষেপ— যদি ছুরিটা সে নিজের কাছে রেখে দিত…               

 

মূল গল্প: স্টার লাইট             

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!