অদৃশ্য মানুষ

ক্টর গ্রাহাম স্মিথ প্রাইভেট লিফটের ভিতর থেকে দিগন্তের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। ওয়াশিংটন ডিসির এই আশি তলা বাড়ির উপরের দিকের কুড়ি তলাই জিটা কর্পোরেশনের অফিস আর ল্যাবরেটরি। এই লিফটে আশি তলায় উঠতে লাগে ঠিক নয় মিনিট পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড। ওঠার আর নামার এই সময় টুকুই ডঃ স্মিথের জীবনের একমাত্র সময় যখন তিনি কাজ আর কোম্পানি ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবেন। লিফটটা যখন উপরে উঠতে থাকে, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় মানুষ, রাস্তা, বহুতল বাড়িগুলো। শেষে হিউস টাওয়ারটাও যখন দিগন্ত থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন স্মিথ। সামনে শুধু নীল আকাশ আর তুলোর মত মেঘ, মানুষের হিংসা আর হানাহানির জগতের অনেক দূরে তিনি। চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকেন পুরনো দিনগুলোর কথা। ইউনিভার্সিটি থেকে বৃত্তি নিয়ে গবেষণা শেষ করে তিনি আর কার্লা যোগ দিয়েছিলেন অতি নামকরা এক বেসরকারী গবেষণাকেন্দ্রে। স্মিথ ছিলেন উদীয়মান জিনতত্ত্ববিদ আর কার্লা পদার্থবিজ্ঞানি। সেই সময়েই জিটা রশ্মি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন কার্লা। প্রায় পাঁচ বছর প্রাণান্তকর পরিশ্রমের প্রতিটা মুহূর্ত স্মিথ থেকেছেন বান্ধবীর পাশে, সাহায্য করেছেন সাধ্যমত। তারপর কার্লা আবিষ্কার করলেন জিটা রশ্মির সাহায্যে তথ্য আদানপ্রদানের পদ্ধতি। বিপ্লব ঘটে গেল পৃথিবীর যোগাযোগ পদ্ধতিতে। কার্লা আর স্মিথ খুললেন নিজেদের কোম্পানি, এই জিটা কর্পোরেশন। সে ছিল বড় সুখের সময়…।

     হঠাৎ সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে লিফটটা স্মিথকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ঢুকে প্রতিদিনের মতই কাজে ডুবে গেলেন স্মিথ। একপাশে চেয়ারে কার্লা বসে আছেন পাথরের মত। স্মিথের স্ত্রী, সুন্দরী প্রতিভাবতী কার্লা, একসময়ের প্রাণচঞ্চলা কার্লা আজ সাত বছর পাথরের মত বসে থাকেন সারা দিন এই ল্যাবে। স্মিথ রোজ কার্লাকে শোনান তার গবেষণার অগ্রগতির কথা। কার্লা শুধু শুনেই যান, কিছুই বলেন না। স্মিথের সমস্ত সহকারীদের বলা আছে এই গবেষণাগারে না ঢুকতে। কার্লা কাউকে সহ্য করতে পারেন না স্মিথকে ছাড়া।

     দীর্ঘ সময় কাজে ডুবে থাকার পরে স্মিথ ফোটন মাইক্রোস্কোপটা থেকে চোখ তুলে তাকালেন তার স্ত্রী কার্লার দিকে। যদিও তাঁর মুখের গভীর প্রশান্তি কার্লার নজরে পড়লনা। ‘অভিনন্দন প্রিয়তমা, আমি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি’, স্মিথের মনে হল কার্লার মুখে যেন সামান্য অভিব্যক্তি দেখতে পেলেন।

     – ‘অসিপিটাল লোবের মিউটেশনটা স্টেবল হয়েছে – অন্তত পরের দশ প্রজন্ম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত। ‘কার্লা কি হাসলেন? কে জানে, সাত বছর আগের সেই রাতটার পরে কেউ আর তাকে হাসতে দেখে নি। সুন্দরী কৃষ্ণাঙ্গী কার্লা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদদের মধ্যে একজন, জিটা রশ্মির যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর প্রভাব নিয়ে ওনার কাজ যুগান্তকারী। কিন্তু সেই সৌন্দর্য্য আর খ্যাতি তাঁকে কিছু হিংস্র জনতার আক্রমনের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। শুধুমাত্র কৃষ্ণবর্ণা হবার জন্য নির্জনপার্কে সম্মান লুঠের পরে আসিড ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিল কার্লার মুখ, সেই মানুষ নামক নরপশুরদল, আজ থেকে সাতবছর আগে। সমস্ত চিকিৎসার শেষে শরীরতো একদিন সেরে উঠেছিল, কিন্তু মন? কার্লা মানুষের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, এমনকি স্মিথও তাঁকে দিয়ে কিছু বলাতে পারেননি। চুপ করে বসে থেকেছেন দিনের পর দিন। আর জীবন্ত দগ্ধে মরেছেন স্মিথ, নিজে শ্বেতাঙ্গ হবার জন্যে স্বজাতির এই চরম ব্যভিচার মন ভেঙে দিয়েছিল তাঁর। কার্লার দিকে লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারেননি, নিজের যুবতী স্ত্রীকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা কুরেকুরে খেয়েছে তাঁকে। স্ত্রী একটু সেরে উঠলে সারাদিন পালিয়ে বেড়াতেন তিনি। কিন্তু যেখানেই যেতেন খবরের কাগজ, টিভি বা ইন্টারনেটে সেই একই খবর। এশিয়ার একদিকে হলুদ রঙের মানুষ লড়ছে বাদামীদের সাথে। আফ্রীকায় কালোরা খুন করছে সাদাদের, মিডলইস্টে বাদামী আর সাদারা লড়ে যাচ্ছে। আমেরিকায় সাদারা অন্য সমস্তরঙের মানুষকে দমিয়ে রাখতে চাইছে। এতদিন নিজের গবেষণায় ডুবে থেকে তিনি যেন চোখ বন্ধ করে ছিলেন সারা পৃথিবী থেকে। হঠাৎ, মনুষ্যজাতির হিংস্র চেহারাটা সামনে এসে গেল স্মিথের। এরা যেন নিজেরাই উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলেছে আত্মহননের পথে। আসলে মানুষ নিজের থেকে অন্যরকম কাউকে আপন করে নিতে পারেনা। তাই জাতিগত বৈশিষ্ট্য বা চামড়ার রঙকেই সে বেছে নেয় ঘৃণার মাধ্যম হিসেবে।

     এই ডিপ্রেশনের মধ্যেই একদিন তাঁর মনে পড়ে গেল এইচ জি ওয়েলস এর “ইনভিসিবল ম্যান” এর কথা। সবাই যদি সেই গল্পের মত অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত! কেউ কারো চেহারা বা গায়ের রঙ দেখতে পেত না। সবাই সমান হত সেই পৃথিবীতে। কিন্তু ওয়েলসের ব্যখ্যা তো আর বিজ্ঞানসম্মত নয়! অদৃশ্য মানুষের চোখের রেটিনাও অদৃশ্যই হবে, আর সেই রেটিনায় আলো পড়ার কোন উপায় না থাকায় তাকে অন্ধ হয়ে যেতে হবে। আর সেই সময়েই স্মিথের মনে পড়ল তাঁর নিজের গবেষণার কথা। নিম্ন তরঙ্গের জিটা রশ্মির মানবদেহের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করার ক্ষমতার কথা। রশ্মির শক্তির তারতম্য অনুযায়ী মস্তিষ্কের কিছু অংশে খুব সূক্ষ্ম তারতম্য ঘটানো সম্ভব। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় জেনেটিক অ্যালগরিদম প্রতিস্থাপন। যদিও ভীষণ কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ, কিন্তু এর মাধ্যমে স্মিথ মস্তিষ্কের সেই অংশটিতে মিউটেশন ঘটিয়েছেন যেখানে রেটিনা থেকে নার্ভ কোষ এসে মস্তিষ্কে প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। খুব সূক্ষ্ম তরঙ্গের মাধ্যমে তিনি সেই নার্ভ কোষে এমন পরিবর্তন এনেছেন যাতে তারা বিশেষ কিছু আকৃতি আর আকার চিনে তার ছবি নির্মানে অস্বীকার করে। এর ফলে পরিবর্তিত চোখের সামনের মানুষটি হয়ে পড়ে এক অবয়বহীন সিল্যুয়েট প্রতিচ্ছবি মাত্র – তার রঙের তারতম্যের জন্য তাকে হেয় বা নির্যাতিত হতে হয় না অন্য এক স্বঘোষিত “উন্নত” মানুষের হাতে।

     অনেক এক্সপেরিমেন্টের পরে স্মিথ সফলও হয়েছেন মানবাকৃতি যেকোন আকারকে অন্যরূপ দিতে। আজ শেষ এক্সপেরিমেন্ট করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে এই মিউটেশন অন্তত বেশ কয়েক প্রজন্ম স্থায়ী হবে। দুই সপ্তাহ আগেই জিটা কর্পরেশনের নিজস্ব উপগ্রহের সাথে পাড়ি দিয়েছে একটি যন্ত্র, তার কাজ জিটারশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে পৃথিবীর সমস্তপ্রান্তে অন্যান্য উপগ্রহে ছড়িয়ে দেওয়া। তারপর প্রতিটা উপগ্রহ সেই বিশেষ তরঙ্গের রশ্মিকে ছড়িয়ে দেবে পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তে।

     দু ঘন্টা আগেই যন্ত্রটা চালিয়ে দিয়েছেন স্মিথ। কাজ যে শুরু হয়ে গেছে তা টিভির খবরেই জানা গেছে। সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক ও অরাজকতা। কিন্তু গ্রাহাম স্মিথ জানেন, মানুষ আবার শান্ত হবে, যখন সে বুঝবে এই পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়, তখন সে নিজে থেকেই মেনে নেবে সবকিছু। কার্লার হাতধরে দুজনে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালেন। দুটি স্বচ্ছ মানবাকৃতি জীব চুম্বনে আবদ্ধ হল সাতবছর পরে। অনেক নিচে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে ইনভিসিবল মানুষের শহর।

[এই অনুগল্পটি লেখা হয়েছে এইচ জি ওয়েলসের (21 September 1866 – 13 August 1946) ১৫০ বছর জন্মতিথিতে, এই মহান সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে। ওয়েলসের ইনভিসিবল ম্যান, মানুষের লোভ, হিংসা আর ক্ষমতার কামনায় ধ্বংসের কাহিনি। তার পরিবর্তে এই গল্পে খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে, অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতাকে কিভাবে শুভ কাজে লাগান সম্ভব সেই থিওরিকে। ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!