আকাশ-গঙ্গার মুলুকের তিনটি গল্প – তারার থেকে তারায় ঘুরে বেড়ানোর যুগের উপকথা

বন্দনা সিংহ, বাংলা অনুবাদ - স্বাতী রায়

অলংকরণ:অঙ্কিতা

টিপি-পাখি হেঁকে উঠল, ‘শোনো!’

কুম্বজা তারামন্ডলের, জেহানা গ্রহের সারস মানুষের একটি লোককথা।

সে অনেক দিন আগের কথা। মানুষ তখন সারস সমতলের উর্বর নদী উপত্যকায় সবে বসবাস করতে শুরু করেছে। সেখানে একটি টিপি পাখি ছিল। সে সময়ে টিপি পাখিরা শুধুমাত্র আজকের মতো কৌতুহলীই ছিল না, তারা কথা বলতেও পারত। তারা মানুষের বাড়ি-ঘর-দোরের কাছাকাছি নদীর তীরে বসে বসে সারাদিন ধরে গল্পগুজব করত আর নদীর থেকে তুলে চিংড়ি, শ্যাওলা এইসব খেত। সন্ধ্যাবেলায় তাদের ছোট্ট বেলুনের মতো ডানাগুলি গ্যাসে ভর্তি হয়ে যেত আর তারা গল্প করতে করতে, দিক বদলের জন্য তিন প্রান্ত দিয়ে গ্যাস বার করতে করতে, ভেসে ভেসে দূরে চলে যেত। আমাদের এই বিশেষ টিপি-পাখিটি এতই কৌতূহলী ছিল যে সে পাছে কিছু জব্বর ব্যাপার থেকে বাদ পড়ে যায় সেই ভয়ে প্রায় ঘুমোতেও পারত না।

     এক রাতে সে দেখল যে আকাশ থেকে একটি বিশাল অন্ধকার নিচে নেমে এল। প্রথমে সে খুব ভয় পাচ্ছিল, তবে তারপর সে বুঝল যে ইনি সেই মহান রূপদাতা, তার কৌতূহলের আর সীমা রইল না। সে তার দিকে এগিয়ে গেল, দেখল যে, অনেক ঠ্যাং-ওলা, ফুলো-ফুলো বিশাল বিশাল প্রাণীতে তার হাত ভরা। ‘এই দানবেরা কারা, হে মহান রূপদাতা? আপনি ওদের নিয়ে কি করবেন?’ উত্তেজিতভাবে টিপি পাখি জানতে চাইল। মহান রূপদাতা তাকে দেখলেন এবং খুবই বিরক্ত হলেন, উত্তরও দিলেন না। উর্বর নদীর উপত্যকায় যেখানে মানুষেরা থাকত, তার কাছে জলাজমির ধারে তিনি উবু হয়ে বসলেন আর ওই দানবগুলোকে কাদাজমির মধ্যে ছেড়ে দিতে শুরু করলেন। প্রাণীগুলো হড়বড়িয়ে ভেজা মাটি ফুঁড়ে ঢুকে গেল – শুধু একটা ঢেউ বা একটা বুদবুদ পড়ে রইল তাদের চলার পথের দিশা দিতে। এদিকে টিপি-পাখিটি মহান রূপদাতাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, তিনি বিরক্ত হতে হতে শেষে রীতিমতো রেগে গেলেন। কিন্তু তিনি নিজেই টিপি-পাখিদের এই লেগে থাকার গুণটি দিয়েছেন, তাই তিনি কিছু বলতেও পারছেন না। শেষকালে তিনি বললেন:

     ‘তুমি যদি প্রতিজ্ঞা কর যে কোন মানুষের কাছে এ নিয়ে একটা কথাও তুমি বলবে না, তাহলে আমি কি করছি তা তোমাকে বলব। মানুষেরা নদীতে বাঁধ দিয়ে, পাহাড়ের কোল ভেঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে আমার নদী উপত্যকাকে খালি বদলে দেয়, তাকে নতুন নতুন চেহারা দেয়। আমি এসব দেখে দেখে ভারী ক্লান্ত হয়ে পড়ছি – আমি চাই না যে তারা আরো উদ্ধত হোক। তাই আমি ঠিক করেছি যে প্রতি তিনশ বছরে একবার করে তাদের সভ্যতা ধ্বংস করতে হবে।’

     মহান রূপদাতা তারা-ভরা রাতের দিকে দেখালেন।

     ‘ওই ঝকঝকে স্থির আলোর বিন্দুটা দেখছ? ওটা পর্যটক-তারা এনাহ। প্রতি তিনশ বছর পরে এনাহ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠবে। তখন ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিকম্প দেখা দেবে। নদী-উপত্যকাগুলো জলে ভরা কবরে পরিণত হবে। একমাত্র পাহাড় পেরিয়ে যে মালভূমি সেই জায়গাটা একটু বেশি নিরাপদ থাকবে। কিন্তু পাহাড়ে পৌঁছানোর জন্য মানুষকে এই জলাজায়গাগুলো অতিক্রম করতে হবে, যেখানে আমি দানব ছেড়ে দিলাম। যখন প্রথম বন্যা আসবে, তখন জলের ছোঁয়ায় এই দানবগুলো জেগে উঠবে আর যারাই জলাভুমি পেরোতে চাইবে, তাদের খেয়ে নেবে। এনাহ যখন ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় ফিরে যাবে, তখন যে সামান্য ক’জন মানুষ বেঁচে থাকবে তাদের আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। মানুষ তাই আর কোনদিন পৃথিবী শাসন করতে পারবে না।

     টিপি পাখি শোনে, ভয় পায় আবার কেমন মুগ্ধ হয়। তারপর মহান রূপদাতা তার দিকে ঝুঁকে বলেন:

     ‘কিন্তু কারো কাছে এই কথা যদি বলেছ, টিপি-পাখি, তাহলে কিন্তু তোমার গুষ্টির সব পাখিকে ভয়ানক কঠিন সাজা দেব।’

     টিপি পাখি ভয়ে কাঁপতে লাগল এবং চুপ করে থাকবে বলে জানালো। তারপর মহান রূপদাতা নিজের কাজ শেষ করে আবার আকাশে উড়ে গেলেন আর চোখের সীমানার বাইরে হারিয়ে গেলেন।

     পরের দিন সকালে টিপি-পাখি মানুষদের বসতিতে গেল – রোজকারের মতোই অন্য সব টিপি-পাখিরা সেখানে জড়ো হয়েছে, চারপাশে যা কিছু হচ্ছে সব দেখছে আর ক্যাচরম্যাচর করছে। আগের রাতে যা কিছু দেখেছে-শুনেছে সেগুলো সবাইকে বলার জন্য আমাদের টিপি-পাখির প্রাণটা ফেটে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সে সারাদিন কথাগুলো না বলে ছিল। কিন্তু দিনের শেষে, যখন আঁধার নেমে এল, মানুষেরা ঘুমোতে চলে গেল, টিপি-পাখির মনে হল যে কথাগুলো কাউকেই না বলতে পারলে সে একেবারে পাগল হয়ে যাবে। সে তখন বাড়িগুলোর উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে একটা জানলায় এসে নামল। ঘরটার ভিতরে রেমা নামের এক বুড়ি গাঢ় ঘুমে ডুবে ছিল। টিপি পাখি বিছানার ধারে গিয়ে বসল আর ফিসফিসিয়ে বলল, শোনো গো! তারপর সে ঘুমন্ত বুড়ির কাছে মহান রূপদাতার বলা কথাগুলো সব উগড়ে দিল।

     কিন্তু সে রাতে টিপিপাখি যখন ছোট্ট বেলুনের মতো ভেসে আকাশে উঠল, একটা বিশাল হাত তাকে পাকড়াল – সে দেখল সে মহান রূপদাতার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

     গমগমে রাগী গলায় তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গেছ!’

     ‘না, মহান রূপদাতা, আমি নিজের দেওয়া কথা ভাঙিনি। আমি শুধু একজন ঘুমন্ত বৃদ্ধ মহিলার কাছে কথাগুলো বলেছি – আপনার গোপন কথা এখনও কেউ জানে না!’

     মহান রূপদাতা একটু শান্ত হলেন। তারপরেই তিনি আবার মাথা নাড়লেন।

     ‘তাহলেও তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গেছ’ তিনি বললেন। ‘এবার আমি তোমাকে আর তোমার গুষ্টির সব পাখিকে অভিশাপ দিচ্ছি। তোমরা শুধু একটা শব্দ বাদে আর কোন কথা বলতে পারবে না – শুধু ‘শোনো’ শব্দটা তোমরা বলতে পারবে।’

     ‘শোনো!’ ভয়ানক কষ্টে টিপি পাখি বলে ওঠে।

     টিপি পাখি এক টুকরো ছাই এর মতো নদী উপত্যকায় পড়ে গেল। অন্যান্য টিপি-পাখিরা তখন সবে নদীর তীর থেকে উঠছে, একে অপরকে ডাকছে। তারা শুধু একটা কথাই বলতে পারছে- ‘শোনো!’ তারপর থেকে তারা শুধু এটুকুই বলতে পারে।

     তবে তার কিছুদিন পরেই আকাশের ঝকঝকে বিন্দুটা যাকে মানুষেরা এনাহ বলেই জানে, সে আগের থেকে আর একটু বেশী জ্বলজ্বল করতে লাগল। টিপি-পাখি মানুষদের বসতিতে গিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবাইকে ডেকে বলতে লাগলো ‘শোনো’। মানুষেরা তার কথায় হেসেই বাঁচে না, বলে ‘কি শুনব?’

     শেষকালে সে সেই বুড়ি রেমার বাড়ি গেল। যখন সে বলল শোনো, রেমা কিন্তু হাসল না। তার বরং কিছুদিন আগে দেখা একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়ল আর সে টিপি-পাখির তিন চোখে একটা প্রচন্ড তাড়া দেখতে পেল। রেমা তখন মানুষদের ডেকে বলল সেই মুহূর্তেই পাহাড়ের দিকে রওনা না দিলে বন্যা ও ভূমিকম্প তাদের আটকে দেবে। রেমা তাদের জলাভূমির দানবদের কথাও বলল, প্রথম বন্যার জল লাগলেই তাদের জেগে ওঠার কথা। কিছু মানুষ তার কথা শুনে টিটকিরি দিল আর বাড়িঘর ছেড়ে যেতে নারাজ হল। তবে রেমাকে অনেকেই বেশ শ্রদ্ধা করত বলে, বাকিরা তার সঙ্গে জলাভূমি আর পাহাড় পেরিয়ে সেই উঁচু মালভূমিতে গিয়ে হাজির হল – সেখানে জীবন বড্ড কঠোর-কঠিন। তবে তারা প্রাণে বেঁচে গেল। বুড়ি রেমা সব শিশুদের এই গল্প বলে সতর্ক করে দিল আর তারা তাদের সন্তানের কাছে কথাগুলো বলে যেতে লাগল। তাই আজ অবধি টিপি-পাখিকে মানুষের বন্ধু হিসেবে পূজা করা হয় এবং প্রতি তিনশত বছরে মানুষ তাদের বসতি ছেড়ে সেই উঁচু জায়গাটাতে যায়, যেখানে তাদের শুধুমাত্র ভূমিকম্পের ভয় থাকে – বন্যা বা দানবদের ভয় নেই। এইখানে তারা অপেক্ষা করে যতক্ষণ না এনাহের রাগ পড়ে, বিশাল নদী আবার শান্ত হয়। তারপর বুড়ো আর মৃতদের পিছনে ফেলে তারা আবার ফিরে আসে, আবার নতুন করে ঘর বাঁধে!

***

হাইহোর ছুরি

আলামির তারামন্ডলীর কছ গ্রহের বিশাল দ্বীপপুঞ্জের সোনাহলী মানুষদের একটি উপকথা

একসময় এখানে কোন মানুষ থাকত না। দ্বীপগুলো জনশূণ্য ছিল, কোন মানুষ উষ্ণ সমুদ্রে সাঁতার কাটত না। তখন সব মানুষ আকাশ-মানুষ ছিল। তারা আকাশে রূপোর নৌকা চড়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের সঙ্গে অল্প কয়েকটাই জীবিত প্রাণী ছিল আর তাদের মধ্যে সবথেকে অন্তরঙ্গ যে প্রাণীটা ছিল, সে তাদের গায়ে থাকত, তখনো পর্যন্ত শান্ত আর ঘুমন্ত। এদের গায়ের সঙ্গে হাজার হাজার সরু সুতোর মতো লেজুড় ছিল আর সেই লেজুড়গুলো দিয়ে তারা মাথার বা যৌন-অঙ্গের চামড়ার সঙ্গে লেগে থাকত।

     অগণিত বছর আকাশে কাটানোর পর, আকাশবাসীরা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল- তারা নীচের পৃথিবীর দিকে, তার উষ্ণ সমুদ্র এবং দারুণ দেখতে দ্বীপগুলির দিকে তৃষিত চোখে তাকাতে লাগল। তাদের কয়েকজন রূপোর নৌকায় করে নেমে এল আর নতুন জায়গার অবাক-করা সাগরে নগ্ন হয়ে স্নান করতে নামল। জল যেই তাদের চারপাশ দিয়ে ঘিরে ধরল, তাদের গায়ে বাস করা প্রাণীরা জেগে উঠল। যেসব হাজার হাজার শুঁড় দিয়ে সেই প্রাণীরা মানুষদের গায়ে লেগে ছিল, সেগুলো তারা গায়ের থেকে খুলে নিল আর সমুদ্রে ভাসতে লাগল। তারপর লোকেরা যখন জল ছেড়ে উঠল আর জল ভেঙ্গে উজ্জ্বল সমুদ্র সৈকতে পৌঁছাল, তারা দেখল তাদের দেহগুলি মসৃণ আর অনাবৃত আর তাদের টাকমাথাগুলো সূর্যের আলোতে চকচক করছে। তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবল, আহা! আমরা কত সুন্দর!

     তারা সেই দ্বীপে দুই পুরুষ ধরে শান্তিতে ছিল। তারপর এক রাতে, যখন আগুন জ্বালান হয়েছে আর সবাই খানাপিনা-নাচে মত্ত, তখন আমাইলা নামের এক সাঁতার-প্রিয় যুবতী সমুদ্র থেকে উঠে এল। তার মাথার তালু আর আগের মতো আঢাকা নয়, অজস্র শুঁড়ে ঢাকা – সে শুঁড়গুলো একেকটা তার কড়ে আঙ্গুলের মতো মোটা। শুঁড়গুলো খলবল করছে আর আমাইলার মুখের চারপাশে পাক খাচ্ছে – তার সুন্দর মুখটাকে কি ভয়ানক দেখতে লাগছে! সবাই ভয় পেয়ে তার থেকে দূরে পালাতে লাগল, তবে সে তাদের আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘ভয় পেও না। এ হল মেডুসা, একসময় আকাশ-মানুষের গায়ে থাকত। সমুদ্র এদের পালটে দিয়েছে, কিন্তু এরা আমাদের ভোলেনি! এ আমাদের কোন ক্ষতি করবে না’

     তখন মানুষ শান্ত হল, সন্ধ্যায় উত্সব আবার চলতে থাকল। শুধু একজন, হাইহো নামের এক বুড়ো শিকারী, যুবতীকে সতর্কভাবে লক্ষ্য করছিল। তার মনে হলো যে মেয়েটি আর আগের মতো নেই; তার গলার স্বর নিচু এবং ক্লিষ্ট, আর সে মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ মেয়েটিকে নজর করে, হাইহো নিজের কূটিরে গেল এবং তার দোফলা শিকারের ছুরিটি বার করল। সাবধানে ছুরির ফলার একপাশ বরাবর সে খাঁজ তৈরি করল। এটা করতে তার অনেকটা সময় লাগল, তাই সে যখন আবার কুটিরের বাইরে এল, তখন সে দেখল যে সবাই ততক্ষণে সে রাতের জন্য ঘরে ফিরে যাচ্ছে।

     ‘আমার ছেলে কোথায়?’ হাইহো তাদের জিজ্ঞাসা করল। সে ভেবেছিল রাতের বেলা মেয়েটির উপর নজর রাখার কাজে তার ছেলে তাকে সাহায্য করবে। ‘কেন, সে আমাইলার সঙ্গে তার ঘরে চলে গেছে,’ সবাই বলল।

     এ কথা শুনে হাইহো তার ছেলের জন্য খুব ভয় পেল। সে আমাইলার ঘরের দিকে দৌড়ে গেল, যেখানে একটি হালকা আলো জ্বলছিল। তার হাতে শক্ত করে ছুরিটা ধরা।

     ঘরের ভিতরে সে এক ভয়ানক দৃশ্য। আমাইলা নির্জীব ও নগ্ন হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে, তার শরীর থেকে সব রঙ ধুয়েমুছে গেছে। তার মাথা আবার ন্যাড়া আর ছোট ছোট লাল গুটিতে ভরা। হাইহোর ছেলে তার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছে, আর তার মাথার তালুর উপর মেডুসা চলে বেড়াচ্ছে, তার মাথার চামড়ায় প্রথম শুঁড়টি ঢোকাল, তারপর আরেকটা…

     হাইহোর চিৎকারে গোটা গ্রাম জেগে উঠল। সবাই যখন এসে ভিড় জমাচ্ছে, হাইহো তাদের মেডুসার গায়ে জ্বলন্ত গাছের ডাল ছোঁয়াতে বলল! সেটা তখন ভয়ানক ভাবে মোচড়াতে আর পাক খেতে লাগল। তারপর হাইহো তার ছুরির খাঁজ কাটা দিকটা দিয়ে তার ছেলের মাথার তালু আঁচড়াতে শুরু করল। তাঁর ছেলে খুব ভয় পেয়ে ও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জেগে উঠল আর বাবার উপর চড়াও হতে গেল। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাড়াতাড়ি তার হাত চেপে ধরে রাখল। হাইহো তার ছুরির খাঁজগুলো ওই শুঁড়ের মাপে করেছিল – তাই শুঁড়গুলো খাঁজের মধ্যে আটকে গেল আর চামড়া ছেড়ে বেরিয়ে এল। ছেলের মাথায় রয়ে গেল অসংখ্য লাল লাল ফুসকুড়ি, সেগুলির যন্ত্রণায় ছেলে কেঁদে ফেলল। অবশেষে মেডুসার থেকে হাইহোর ছেলে মুক্তি পেল ও মেডুসাকে সমুদ্র সৈকতে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হল। আর তখন হাইহোর ছেলের জ্ঞানবুদ্ধি ফিরল – সে কাঁদতে লাগল, বাবাকে ও সব গ্রামবাসীকে ধন্যবাদও জানালো। সে তাদের বলল যে, আমাইলা, নিঃসন্দেহে জন্তুটার প্রভাবে, আমোদ করার লোভ দেখিয়ে তাকে ঘরে নিয়ে যায়- তার শুধু একটা দুর্দান্ত স্মরণীয় মিলনের কথা মনে আছে, তারপরে আর কিছুই মনে নেই।

     গ্রামবাসীরা যখন প্রথামত সমুদ্র-সমাধির জন্য নৌকায় করে আমাইলার লাশ নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা দেখল তার গায়ের চামড়া জুড়ে ছোট ছোট ফোঁড়া বেরোচ্ছে আর সেই ফোঁড়ার থেকে সরু সরু সুতোর মতো বেরোচ্ছে। তারা তো ভারী ভয় পেল, হাইহো যদি তাদের তখন না থামাত তাহলে তারা সমুদ্রের মধ্যেই শরীরটা ছুঁড়ে ফেলে দিত। হাইহো বলল, ‘জানোয়ারটার সংখ্যা কোনমতেই বাড়ানো চলবে না’, বলে তাড়াতাড়ি নৌকো বাইয়ে তীরে নিয়ে এল আর সেখানে মেয়েটির শরীর ও নৌকা দুটোই পুড়িয়ে দেওয়া হল।

     এরপর থেকে দ্বীপের সব লোকেরা সবসময় একধারে খাঁজকাটা দোফলা ছুরি নিয়ে ঘুরত। জলে প্রচুর মেডুসা থিকথিক করত আর অনেকেই কোন সাহায্য পাওয়ার আগেই মরে গেল। লোকেরা এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাওয়ার জন্য নৌকা ব্যবহার করতে শুরু করল আর সৈকত থেকে সামান্য দূরের বেশী সাঁতার কাটাও নিষেধ হয়ে গেল।

     একদিন একটা নতুন ঘটনা ঘটল। একটা জ্বলন্ত রূপোর নৌকা-শুদ্ধ এক আকাশ-মানবী আকাশ থেকে নীচে পড়ে গেল। নৌকাটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল তবু মহিলা তখনও বেঁচে ছিল, যদিও সে তখন প্রায় মৃত্যুর মুখে। তার মাথা ও কুঁচকি নিশ্চল মেডুসার সূক্ষ্ম শুঁড়ে ঢাকা। সে যখন হাইহোর ঘরে শুয়ে শুয়ে কাঁদছিল, তখন হাইহো নিজেই মেডুসাকে সরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিল। মহিলার মাথার তালু আর শ্রোণী অঞ্চল ঘষে ঘষে পরিস্কার করতে মেডুসা চামড়া ছেড়ে বেরিয়ে এল- হাইহো খুব খুশী হল। মহিলা আস্তে আস্তে সেরে উঠতে লাগল। কিন্তু ক’দিন পরে দেখা গেল মহিলার চামড়ার থেকে আবারও সরু সুতোর মতো শুঁড় বেরোচ্ছে। ‘এটা ওর শরীরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে,’ হাইহো দুঃখ করে বলল।

     এরপর আর একটাই করণীয় কর্ম ছিল।

     গ্রামের লোকেরা মহিলাকে সমুদ্র-সৈকতে টেনে নিয়ে যেতে সাহায্য করল। হাইহো ছুরিটা হাতে নিল, উপরে তুলল, ছুরিটা সূর্যের আলোয় ঝকঝকিয়ে উঠল। সে ছুরিটা ঘুরিয়ে ধরল যাতে খাঁজকাটা দিকটা বাইরের দিকে থাকে। তারপর আলতো করে সেটি মহিলার গলার উপর নামিয়ে আনল। তারপর তারা আগুন জ্বালাল আর শরীরটাকে পুড়িয়ে দিল।

     এইভাবে জ্ঞানী হাইহো আবার মেডুসার হাত থেকে তার লোকদের রক্ষা করল।

     সেই থেকেই, দ্বীপপুঞ্জের প্রতিটি দ্বীপের প্রত্যেক শিকারী সবসময় খেয়াল রাখে যে তার ছুরির একদিকটা যেন খাঁজকাটা আর অন্য দিকটা যেন মসৃণ, ধারালো ও মারাত্মক হয়।

***

গাছ ও পাথরের বিয়ে

প্রক্সিমা নক্ষত্রমন্ডলীর ওমাসা গ্রহের জাক্রাগ মহাদেশের আঙ্গুদকা উপজাতির একটি লোককথা

একদম গোড়ার দিকে, গাছেরা নড়তে চড়তে আর কথা বলতে পারত। তারা মাটির থেকে তাদের বেঁটে, মোটা শিকড়গুলোকে টেনে তুলত আর রোজ সকালে হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে যেত। নদীর জলে শিকড় ডুবিয়ে দিত আর প্রাণভরে জল খেত। তখন পাথরেরাও চলতে পারত, কথাও বলত। তারা গড়িয়ে গড়িয়ে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যেত আর গাছেদের সঙ্গে, অন্য পাথরদের সঙ্গে গল্গগুজব করত।

     গাছেদের ভাঙ্গা-ভাঙ্গা, ফিসফিসানি আর পাথরদের নীচু, কর্কশ স্বরে পৃথিবী ভরে থাকত – সব কিছু ভালই চলছিল।

     মাঝেমাঝেই একটা গাছ একটা পাথরের প্রেমে পড়ত আর পাথরটাও গাছের -তারা তখন বিয়ে করত। তাদের ছানাপোনারা হত সবুজ রঙের, মোলায়েম চামড়ার, চার হাত-পাওলা আর শিকড়ছাড়া। তাদের দেহে কচি, সবুজ অঙ্কুরের নমনীয়তা, ভিতরে পাথরের মতো কঠিন কাঠামো।

     এই সব শিকড়-ছাড়া, হাল্কা হাত-পার বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি চলতে পারত। তারা খুব তাড়াতাড়িই চারপাশের পৃথিবীকে চিনতে বেরোল। পাথরেরা তাদের জন্য যে জলের নালা তৈরি করে দিয়েছিল, সেখানে তারা স্নান করত আর গাছের থেকে ফল পেড়ে খেত।

     প্রথম দিককার ছেলেপুলেদের মধ্যে আঙ্গুদ ছিল একজন, সে সবসময় অন্যদের থেকে আলাদা থাকত। সে যখন খুব ছোট ছিল, তখন তার এক দাদা তাকে উপর থেকে ফেলে দিয়েছিল- তাই সে খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল। সে কেবল পাথর ও গাছের ধীর গতির সঙ্গেই তাল মেলাতে পারে। সে সারাদিন পাথর ও গাছেদের সঙ্গে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘুরে বেড়াত, তাদের গল্প শোনাত, বাঁশী বাজিয়ে তাদের গানও শোনাত। এর বদলে তারা তাকে লুকিয়ে রাখত, অন্যান্য বাচ্চাদের পিছনে লাগার হাত থেকে তাকে রক্ষা করত। বড় হয়ে ওঠার পরে, সে পাথর ও গাছ দুইয়ের সঙ্গেই মিলিত হয়েছিল, আর অধীর আগ্রহে নিজের সন্তানের জন্মের জন্য অপেক্ষা করছিল।

     আঙ্গুদের সমসাময়িক অন্যান্য বাচ্চারাও প্রায় এই একই সময়ে বড় হয়ে উঠল – এরা দেখল যে এরা গাছ, পাথরদের থেকে অনেক তাড়াতাড়ি চলাফেরা করতে পারে আর নতুন কিছু তৈরি করার জন্য বা কোনকিছুকে আলাদা করার জন্য এরা নিজেদের হাতপাগুলোকে ব্যবহার করতে পারে। এসব কারণে শীঘ্রই এরা খুব গর্বিত হয়ে উঠলো – সব্বাই, শুধুমাত্র আঙ্গুদ ছাড়া।

     একজন বাবা গাছ যখন তাঁর শিকড়ের সাহায্যে টলমলিয়ে হাঁটছেন, তখন এরা ব্যঙ্গ করতে লাগল। একজন পাথর-মা গড়াতে গড়াতে খুব কাছে চলে এলে, এরা ভুরু কুঁচকে তাকাতে লাগল। আঙ্গুদ যখন বাবা-মাদের হয়ে কথা বলতে এল, এরা আঙ্গুদকে মারধর করল, তার কাছ থেকে তার বাঁশী কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর এরা গাছপালা, পাথরদের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হুকুম দিল।

     প্রথমে গাছ ও পাথরেরা খুব রেগে গেল আর নিজেদের সন্তানদের খুব বকাবকি করল। কিন্তু সেই সন্তানেরা মুখ ঘুরিয়ে নিল আর গাছ, পাথরদের থেকে দূরে চলে গেল। রয়ে গেল শুধু আঙ্গুদ। সে গাছ ও পাথরদের যতটা পারে শান্ত করতে চেষ্টা করল। কিন্তু দুঃখের ভারে তারা চলৎশক্তিহীন হয়ে দাঁড়িয়েই থাকল।

     প্রথম প্রথম আঙ্গুদ তাদের মধ্যে লেংচে লেংচে ঘুরত, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তার জানা দুই ভাষাতে কাঁদত আর তাঁদের চাগিয়ে তোলার বৃথা চেষ্টা করত। তারপর যখন সে দেখল যে কিছুতেই কিছু হওয়ার নয়, সে তখন নিজের জন্য একটা থাকার জায়গা খুঁজে নিল আর সেখানে আগের মতোই থাকতে লাগল – শুধু সে বড্ড একা হয়ে গেল।

     খুব তাড়াতাড়ি ধুলো আর জঞ্জালের তলায় পাথর ঢাকা পড়ে গেল! দিশেহারা হয়ে মাটির নীচের পাথরের খোঁজে, গাছের শিকড় রোগা, লম্বা হয়ে মাটির গভীরে ঢুকে গেল।

     তারপর একদিন আঙ্গুদ একটা জোর হট্টগোল শুনতে পেল আর তার থাকার জায়গার বাইরে এসে দেখল তার কচি কচি বাচ্চারা পাথরের গুহা এবং গাছের ফোকরের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে। তার ভারী আনন্দ হল। সে তাদের গাছ আর পাথরকে ভালবাসতে শেখাল আর সব, সব পুরোন গল্প শেখাল।

     একদিন, সে যখন অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, তার এক নাতি তার কাছে একটা ফুটো-ওলা লম্বা কাঠের টুকরো নিয়ে এল! ‘আমার বাঁশী!’ আঙ্গুদ খুশী হয়ে বলে উঠল আর বাঁশীতে একটা কাঁপা কাঁপা সুর বাজাল। তার মনে হল সে বনের গভীর থেকে একটা আবছা গর্জন শুনল। তবে সে তখন এতই দুর্বল যে সে আর বাঁশী বাজাতে পারল না- অল্পদিনের মধ্যেই সে মারা গেল। তারপর তার সন্তানেরা কাঁদতে কাঁদতে তাকে আর তার বাঁশী, দুইকেই মাটিতে কবর দিয়ে দিল। তারপর থেকে আঙ্গুদকারা তাদের বাবা যেমনটি শিখিয়েছিল, সেইমতো বসবাস করতে থাকল আর জঙ্গল তাদের সব রকম ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করত।

     আঙ্গুদের ভাই ও বোনেরা, সেইসব অকৃতজ্ঞ বাচ্চারা, যারা দূরে চলে গিয়েছিল, তারা খুব তাড়াতাড়িই নিজেদের বাবা-মাদের ভুলে গেল। তারা বেঁচে থাকল, নিজেদের মধ্যে মিলিত হল এবং তারা নিজেদের নতুন এক ভাষা তৈরি করে নিল। তারা গাছ, পাথর কেটে ঘর বানাল, তাদের গায়ের সবুজ আভা মিলিয়ে গেল- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের উৎসও ভুলে গেল।

     কিন্তু গাছ ও পাথরের সেসব কথা এখনও মনে আছে, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তাদের সে কথা মনে পড়ে। তাদের স্মৃতি আগের মতো ততটা স্পষ্ট নয়, পুরোনো দুঃখের ধারও কমে গেছে। শুধু, যখন সেই অকৃতজ্ঞ সন্তানদের বংশধরেরা দড়ি, কুড়োল দিয়ে জঙ্গলে আসে, তখন তারা কখনও কখনও গাছেদের মধ্যে একটা মিষ্টি ও আবছা বাঁশীর সুর শোনে। কাউকেই দেখতে পায় না তারা, এমনকি তাদের গল্পগাথার আংগুদকা ভাইবোনদেরও না, তারা বিস্ময়ে, ভয়ে কাঁপতে থাকে। বাঁশীতে একটা করুণ সুর বাজে, গাছ আর পাথরেরা বহুবছরের ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠে, দ্রুত তাদের স্মৃতি ফিরে আসে, ঠিক গতকালের মতোই টাটকা। তখন মাটির নীচের পাথরেরা কেঁপে ওঠে, নড়তে থাকে, মাটি ফেটে যায়, এবং গাছেরা মাটির থেকে শিকড় উপড়ে ফেলে। কিন্তু কেউই আর আগের মতো নিজের ইচ্ছায় চলতে পারে না, তাই পাথর ফেটে যায় এবং গাছ হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। গাছ, পাথরের পুরোন ভাষায় মাটি গর্জে ওঠে আর তারা তাদের অকৃতজ্ঞ সন্তানদের বলে, তোমরা আমাদের বংশধর। আমরাই তোমাদের জন্ম দিয়েছি, তারা বলে, কিন্তু অকৃতজ্ঞেরা তা বোঝে না। তারা ভয়ে পালায়। তারা নিজেদের মাতৃভাষা আর মনে করতে পারে না।

লেখিকা পরিচিতিঃ

বন্দনা সিংহ একজন ভারতীয় বিজ্ঞান-ভিত্তিক কাহিনীকার। বোস্টন এলাকার একটা ছোট অথচ খুব সক্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। তিনি সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর আন্তঃবিভাগীয় জ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর দ্বিতীয় সংকলন, অ্যাম্বিগুইটি মেসিন এন্ড আদার স্টোরিস স্মল বিয়ার প্রেস থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে প্রকাশিত। ওয়েবসাইট – http://vandana-writes.com/.

One thought on “আকাশ-গঙ্গার মুলুকের তিনটি গল্প – তারার থেকে তারায় ঘুরে বেড়ানোর যুগের উপকথা

  • April 10, 2019 at 10:57 pm
    Permalink

    অসাধারণ লাগলো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!