জিন মহাপুরাণ

রচনা  : অঙ্কিতা

অলঙ্করণ : দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য (চিত্রচোর)

সারাদিন ধরে একরাশ পেপার আর বই চর্চা করার পরে সূর্য ডোবার আগে আগেই মাথাটা বিগড়ে গেল। তা মাথার খুব একটা দোষ ছিলনা। একে তো জুলাই মাসের ভ্যাপসা গরম, তার উপরে প্রতিবেশীদের মধ্যে কে যেন ভর দুপুরে শখ করে মহালয়া চালিয়েছে কম্পিউটারে। তাও আবার লুপ ফর্মে। একবার শেষ হলেই আবার বেজে উঠছে “জাগো চণ্ডী”। ছাইবর্ণ আকাশের সাথে সাথে আমার মস্তিষ্ককেও ক্রমাগত ত্রিশূলে বিদ্ধ করছে সেই শব্দব্রহ্ম। বাঙালির শখ দেখে গা জ্বালা করে আজকাল। এই তো সবে রথের দড়ি ছেড়ে ঘরে ঢুকলি এরমধ্যেই পুজোর জন্যে প্রাণ আনচান করছে একেবারে।

     বাঁশটা আমিই যেচে ঘাড়ে নিয়েছিলাম। জিন নিয়ে ফিচার লেখার আবদার জানিয়েছিলাম সম্পাদককে। জিন একটা পুঁচকে জিনিস। কোষের মধ্যে নিউক্লিয়াস তারমধ্যে অদৃশ্য সুতোর মত আছে কি নেই তা সাধারণ মাইক্রোস্কোপেও ঠাওর করা যায়না। ভেবেছিলাম অত ছোট জিনিসে আর কি এমন ব্যাপার থাকবে। ওরে বাবা গুগল ঘাঁটতে গিয়ে দেখি সুতো কোথায়! এ যে সুতোর কারখানা। এক মাস ধরে মাথা চিবিয়ে সে সুতোর আগা-মুড়ো কিছুই যখন বুঝলাম না তখন শেষমেশ গিয়ে এক প্রফেসর বন্ধুর দ্বারস্থ, থুড়ি লাইব্রেরিস্থ হলাম। বন্ধু আমার আবদার শুনে দুটো জাবদা মোটা বই দিয়ে বলল এক সপ্তাহ বাদে পড়া করে আসতে। সকাল থেকে সেইগুলো পড়ে পড়ে সন্ধ্যাবেলা এই হাল। বায়োলজি ছেড়েছি স্কুল ছাড়ার সাথে সাথে, তদুপরি সম্পাদকের খোঁচা। আজ বাদে কাল পত্রিকা বেরোবে যে।

     আমি ব্যাজার মুখে ডিকশনারির মত মোটা একটা ক্লোনিং-এর বই হাতে করে টেবিলে বসে আছি সামনের জানলাটা তাক করে। আর একবার মহালয়ার রিপিট টেলিকাস্ট শুরু হলেই বইটা ছুঁড়ে মারব ঠিক করেছি। কিন্তু আমাকে কিছুই করতে হল না, মা ভগবতীরও বোধহয় আমার মতই কান মাথা যখন ঝাঁ ঝাঁ করছিল আরেকবার পুঁউউ… করে শাঁখ বেজে উঠতেই দুম করে কারেন্টটা চলে গেল। সামনের ফ্ল্যাটের স্পিকারও থেমে গেল। আমিও হাসিমুখে মাকে এক কাপ চায়ের ফরমাশ করে আবার জেনেটিক্সের বইটায় চোখ রাখলাম। কিন্তু ঘরের মধ্যে আলো বেশ কমে এসেছে। বাইরে এখনো আলো আছে ভালোই। মা কে চা করতে বারণ করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লাম।

     পাড়ার পার্কে গিয়ে বসলাম। বইটা সবে খুলেছি কি খুলিনি ওমনি একটা সুরেলা আওয়াজ শুনলাম।

     “কি পড়ছেন? ক্লোনিং নাকি?”

     মুখ তুলে দেখি এক আমার বয়সী মেয়ে, জিনস শার্ট সিগারেটে শোভিত। মেয়েটা ধপ করে আমার পাশে বসল। “দেখি বইটা” বলে প্রায় খামচে কেড়ে নিল আমার হাত থেকে। ভারী অভদ্র তো! খানিক নেড়ে চেড়ে আমায় ফেরত দিয়ে বলল, “হুহ! ফালতু বই।”

     এবার আমি একটু ক্ষেপে গেলাম, এই বইটা নিয়ে আমি হপ্তা ধরে ধস্তাধস্তি করছি আর উনি একটু নেড়েই বলে দিলেন বাজে বই। “আপনি ক্লোনিং-এর কি জানেন? জানেন এই বইটা স্যামব্রুক আর রাসেলের লেখা। ক্লোনিং-এর বইগুলোর মধ্যে ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ইন ওয়ার্ল্ড।”

     মেয়েটা জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, “স্থানের হিসাবটা ঠিকই আছে। কালের হিসাবটা একটু গুলিয়ে গেছে।”

     “কাল?” আমি হাঁ করে তাকালাম মেয়েটার দিকে।

     “কাল মানে টাইম। ইংরাজিতে না বললে আজকালকার বাঙালীরা কিছুই বোঝে না।”

     আমার গায়ে লাগল, “হুম। কালের সাথে বই-এর কি সম্পর্ক? ভবিষ্যতে এর থেকে ভালো বই বেরোতেই পারে। জেনেটিক্সের নতুন নতুন আবিষ্কার প্রতিদিন হচ্ছে। কত কিছু অজানা জিনিস জানা যাচ্ছে।”

     “আমি ভবিষ্যতের কথা বলছি না।” মেয়েটা গম্ভীর মুখে ঘাড় নাড়ল। “আমি বলছি অতীতের কথা।”

     “তারমানে? আপনি বলতে চাইছেন এর আগে এর থেকে ভালো জেনেটিক্সের বই লেখা হয়েছে?”

     “হ্যাঁ অবশ্যই।”

     আমি একটু হাল ছেড়ে বললাম, “তা হতে পারে। এখন তো বিজ্ঞানের এক প্রধান শাখাই হল জেনেটিক্স। কত বই লেখা হচ্ছে। আমি সবে পড়াশুনা শুরু করেছি এই নিয়ে।”

     মেয়েটা আবার বব কাট চুল ঝাঁপরে ঘাড় নাড়ল, “আমি এখনকার কথা বলছিই না। আমি বলছি হাজার হাজার বছর আগেকার কথা।”

     আমি কত বড় হাঁ করে কতক্ষণ মেয়েটাকে দেখছিলাম ঠিক জানিনা।

     “হাঁ টা বন্ধ করুন, মশা ঢুকে যাবে যে।” মেয়েটা গম্ভীর মুখে বলল, “বলি পুরাণ টুরান কিছু পড়া আছে?”

     আমি সম্মোহিতের মত ঘাড় নাড়লুম, “ওই খানিক।”

     “এই জন্যই তো কিছু হবে না। সব কিছু থেকে খামচা মেরে জানার অভ্যেস। একটা জিনিস নিয়ে গভীর ভাবে পড়াশুনা করলে দেখবেন সেখানেই সব কিছু লেখা আছে।”

     “কিরকম?”

     “প্রথম সফল ক্লোনড জন্তু কি?”

     “ডলি। একটা ভেড়া। ১৯৯৬ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটির ল্যাবে এটাকে তৈরি করা হয়েছিল। সাড়ে ছয় বছরের মত বেঁচেছিল।” আমার সদ্য-লব্ধ জ্ঞান আমি গড়গড় করে উগরে দিলাম।

     “মুণ্ডু।” দাঁত খিঁচালো মেয়েটা। আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। “প্রথম সফল ক্লোনড জীব হল একটি গরু। তারপরে একটি ঘোড়া।”

     আমি এত সহজে হেরে যাবার পাত্রীই নই । স্মার্টফোনটা বের করে গুগল সার্চ করে ডলির উইকিটা খুলে মেয়েটার চোখের সামনে ধরলাম। “কক্ষনো না। এই যে লেখা আছে। ডলিই প্রথম।”

     মেয়েটা হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গী করল, “ঋক বেদ পড়া আছে?”

     আমি ব্যোমকে গিয়ে ঘাড় নাড়লাম। মেয়েটা এবার তার ফোনটা বার করে কি সব খুটখাট করে আমার চোখের সামনে ধরল। দেখলাম ইন্টারনেটের একটা সাইটে ঋক বেদ আর তার অনুবাদ খুলেছে মেয়েটা।

     “প্রথম মণ্ডলীর বিশতম সুক্তের তৃতীয় শ্লোকটা দেখুন।”

     আমি দেখলাম সংস্কৃতে কীসব লেখা আছে। তার নিচে ব্যাখ্যা করা আছে ঋভুগন একটি ক্ষীরদোগ্ধ্রী গাভী উৎপন্ন করেছিলেন। আমি পড়ে টরে কিছুই বুঝলাম না।

     “ওগুলো শর্টে লেখা আছে। ঋভু ঋষিরা ছিল প্রাচীন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার। ওরা পারত না হেন জিনিস নেই। সেই সময়ে এক অদ্ভুত মড়কে সমস্ত গরু মারা গেছিল। ভালো দুগ্ধবতী গাভী পাওয়াই যাচ্ছিল না। তখন ঋভুরা দূরদেশ থেকে কিছু ভালো দুগ্ধবতী গাভী নিয়ে আসে। কিন্তু সে গাভীরা কোনমতেই আমাদের দেশের গরুদের সাথে মিলনে সন্তান উৎপাদন করতে পারছিল না। কিন্তু বাছুর না হলে কি করে ভালো জাতের গরু পাওয়া যাবে? তাই ঋভুরা ক্লোনিং-এর কথা ভাবল। তারা করল কি ওই বিদেশী গাভীর চামড়া থেকে কিছু কোষ নিল। আর আমাদের দেশের গরুর থেকে কিছু কোষ নিয়ে তার থেকে নিউক্লিয়াসটা বার করে দিল আর বিদেশী কোষ থেকে নিউক্লিয়াস নিয়ে এতে ঢুকিয়ে দিল। ব্যাস। তারপরে সেই নতুন কোষ থেকে ডিম্বাণু বানানো হল আর তাকে নিষিক্ত করে স্থাপন করা হল আরেক গাভীর শরীরে। তারপরে ঠিক ঠাক সময়মত পাওয়া গেল প্রথম সফল ক্লোনড জন্তু। তার নাম রাখা হয়েছিল বিশ্বরূপ। এইভাবেই তো পরবর্তীকালে কামধেনুকেও তৈরি করা হয়েছিল। তারপর জেনেটিক্স বিজ্ঞান কত উন্নতি করল।”

     “এ সবই লেখা আছে নাকি ঋক বেদে?”

     “না তো কি? আমি মিথ্যা বলছি নাকি? পড়লেই জানতে পারবে। তবে হাজার হাজার বছরের ব্যাপার তো। কত শ্লোক হারিয়ে গেছে। তবে মূল মূল কথাগুলো ঠিক আছে।”

     “কিরকম?”

     “আচ্ছা ডলি ছাড়া আর কি ধরনের ক্লোনিং করেছে এযুগের বিজ্ঞানীরা?”

     “ডলির পরে? সেতো অনেক প্রাণীই হয়েছে। ইঁদুর , ছাগল, হরিণ, গরু, ঘোড়া…” আমি উইকি ঘাঁটা জ্ঞান ঢালছিলাম মেয়েটার কানে।

     “মানুষ?”

     আমি একটু থতমত খেলাম, “মানুষ? না সেরকম তো জানিনা। তবে শুনেছিলাম একটা ইঁদুরের পিঠের উপরে জেনেটিক ডিফর্মেশনে একটা মানুষের কান নাকি গজিয়েছে।”

     “ছোঃ, তাহলে এখনো আপনারা জেনেটিক্সে শিশু।” বলে মেয়েটা একটু উদাস হয়ে গেল, “ডিফর্মেশনের উদাহরণ তো ভুরি ভুরি। জিন নিয়ে কাজ করতে গেলেই ডিফর্মেশন আসবে।”

     আমি একটু উৎসুক হয়ে উঠলাম, “কিরকম?”

     “ঐরাবতের কটা শুঁড়? কটা দাঁত? ”

     আমতা আমতা করে জানালাম, “ঠিক মনে পড়ছে না।”

     “ দশটা দাঁত, পাঁচটা শুঁড়। আর প্রাণীটা জন্মেওছিল যাকে এখনকার দিনে বলে অ্যালবিনো তাই হয়ে। তবে এর আগেও দাঁত আর শুঁড় নিয়ে গবেষণা করছিল বিজ্ঞানীদের যে দলটা তারা সাতটা আরও হাতি তৈরি করেছিল। কিন্তু ঐরাবতের মত অপূর্ব দেখতে হয়নি। পুরাণ ঘাঁটলেই পাবে এইসব কথা।” 

     আমার ফট করে মনে পরে গেল আরেক পৌরাণিক পশুর কথা, “উচ্চঃশ্রৈবা? এর সাতটা মাথা ছিল? তাই না?”

     “না। তবে নামটা ঠিকই। ঐরাবতের পরে এই ঘোড়াটাকে বহুকষ্টে তৈরি করা হয়েছিল। এর সাতটা মাথা ছিলনা, এ অতি দ্রুত ছুটতে পারত। সাধারণ ঘোড়ার থেকে সাতগুণ বেশী জোরে। তাই একে সাতটা ঘোড়ার সমান তুলনা করা হত। এও বলা হত যে ঘোড়াটা উড়তে পারে।”

     “আচ্ছা। উড়তে পারে এমন জন্তু তৈরি হয়নি?”

     “হয়েছিল বইকি। শরভ। এটা ছিল হাফ সিংহ হাফ পাখি। ঠিকঠাক উড়তে পারত না। তবে দুটো ডানা ছিল। এরপর থেকেই তো বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটো ভিন্ন প্রাণীর জিন মিশিয়ে নতুন নতুন প্রাণী গঠনের ধুম পরে গেল। কত রকমের প্রাণী তৈরি হল। প্রথম বানানো হয়েছিল হাঙ্গর আর এক ধরনের মাছের সংমিশ্রণে মকর মাছ। তারপরে তিমি মাছকে বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলল বিজ্ঞানীরা। তৈরি হল তিমিঙ্গিল। উফফ জন্তুটা কিছু ভয়ানক হিংস্র ছিল। ওর জ্বালায় সমুদ্রে আর মাছ থাকতে পারত না।”

     “ আচ্ছা ক্লোনিং ছাড়া জিনের অন্যকোন গবেষণা হয়নি?”

     “ হয়নি আবার? এই যে এখন যৌবন বাড়ানোর জন্য মাথা খুঁড়ে ফেলছে বিজ্ঞানীরা। কিভাবে যুবক হয়ে বেঁচে থাকা যায় দীর্ঘদিন। বিশ্বরূপ নামের প্রথম ক্লোন গরুটাকে তৈরি করার কিছু বছরের মধ্যেই ঋভু ভাইয়েরা এটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তাদের মাবাবাই প্রথম গিনিপিগ হতে রাজী হন। ঋভু ভাইয়েরা সফলও হয়েছিলেন। মাবাবাকে পুনর্যৌবন দিয়েছিলেন। তবে তা সত্ত্বেও তারা বেশীদিন বাঁচেননি। কি অজ্ঞাত অসুখে মারা গিয়েছিলেন। তারপরে আরও বহু গবেষণার পরে আবিষ্কার করা গেল ঠিকঠাক হরমোনগুলো খুঁজে পাওয়া গেল। আর সেগুলোকে শরীরের অন্য ক্ষতি না করে বন্ধ করতে আরও অনেক দশক কেটে গেছিল। তারপরেই তো সেই ভয়ংকর ব্যাপারগুলো শুরু হল।”

     “ভয়ংকর ব্যাপার?”

     “হ্যাঁ বিজ্ঞানীরা মানুষের উপরে গবেষণা শুরু করল।”

     “হিউম্যান ক্লোনিং?” আমি উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলাম।

     “হ্যাঁ। প্রথম তৈরি হয় বেণা নামক মানুষের হাত থেকে কিছু কোষ নিয়ে এক পূর্নাঙ্গ মানুষ তৈরি করা হল। ততদিনে বিজ্ঞানীরা অ্যাডাল্ট কোষ থেকে পূর্নাঙ্গ শরীর তৈরি করতে শিখে গেছে। আর ডিম্বাণু থেকে সন্তান হওয়া বা ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার জন্য অপেক্ষা করতে হয়না। কিন্তু প্রথম মানুষের ক্লোন বানিয়ে দেখা গেল সেই মানুষের পূর্বের কথা কিছুই আর মনে নেই।”

     “তারমানে সে সম্পূর্ণ নতুন মানুষ তৈরি হল।”

     “হ্যাঁ। আরও একটা সমস্যা হল এই মানুষগুলোর কোন শৈশব নেই। বিজ্ঞানীরা মনে করে সেইজন্যেই তারা একটু হিংস্র প্রকৃতির হয়ে উঠল। এইসব বিভিন্ন কারণে কিছু মানুষের ক্লোনিং হওয়ার পরে মানুষ ক্লোনিং বন্ধ করে দেওয়া হল। প্রথম জেনেটিক্যালি গবেষণা করতে করতে শিবের একটি ক্লোন লালরঙের চামড়া নিয়ে জন্মাল। তার নাম দেওয়া হয়েছিল রুদ্র। অত্যন্ত ভয়ংকর ছিল সে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ছিল তার। এর পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত গবেষণায় সাধারণ মানুষের দেহে ক্লোন দেহ থেকে শরীরাংশ স্থাপন করতে পারলেন। তখন আরেক সমস্যা উৎপন্ন হল। সমাজের উচ্চস্তরের মানুষেরা বিভিন্ন জিনিসের আবদার করতে লাগল। ব্রহ্মা গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নিজে কোষ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সাহায্যে নিজের দেহে আরও চারটে মাথা গজালেন।”

     “অ্যাঁ।”

     “হ্যাঁ। তিনি ভাবলেন এতে করে বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ হওয়া যাবে। ব্রহ্মা গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা ক্রমশ তিনটে চোখ, ছটা হাত, দুটো মাথা প্রভৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ল। তারা এই বিজ্ঞানে অত্যন্ত উন্নতি করলেন। যেকোনো শরীরের সাথে যেকোনো শরীরকে জুড়ে নতুন প্রাণী গঠন করা তাদের কাছে কোন ব্যাপারই নয়। উপরন্তু হাজার হাত, ন-শো মাথার কিছু ভয়ংকর প্রাণীও তারা তৈরি করে ফেলেছিলেন।”

     “ওরে বাবারে!”

     “কিন্তু বিষ্ণু গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা অন্যরকম ছিল। তারা চেষ্টা করছিল কিভাবে পূর্নাঙ্গ শান্তিকামী ক্লোন তৈরি করা যায়। যাদের মধ্যে পূর্বেকার গ্রহীতার বুদ্ধি অভিজ্ঞতা থাকবে। নতুন করে সবকিছু শেখাতে হবে না।”

     “তারপরে কি হল?”

     “প্রথম দিকে তিন বিজ্ঞান গোষ্ঠীর মধ্যে ভাব ছিল। তিন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সমস্ত জ্ঞানের আদানপ্রদান করত। সেইসময় ব্রহ্মা গোষ্ঠী তৈরি করে এক প্রাণী যার অর্ধেক শরীর মানুষ আর অর্ধেক পাখী। পাখীর ডিম থেকেই বাচ্চা হয়ে বেরিয়েছিল সে। দেখা গেল সে দেহগত দিক থেকে পাখীর মত হলেও তারমধ্যে মানুষের বুদ্ধি আছে।”

     “গরুড়!” আমি উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম।

     মেয়েটা আমার দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকাল, “হ্যাঁ গরুড়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। ক্রমশ তারা একে একে এরকম অর্ধ-মানুষ অর্ধ-পশু কিছু ক্লোন তৈরি করলেন। বরাহ, নৃসিংহ। এদের হিংস্রতা দেখে এই গবেষণা বন্ধ করার জন্য বিষ্ণু গোষ্ঠী আবেদন করল। কিন্তু ব্রহ্মা গোষ্ঠী তাদের কথা শুনল না। তখন বিষ্ণু গোষ্ঠী নিজেদের পৃথক গবেষণাগার তৈরি করে সেখানে গবেষণা শুরু করল। সেখানে ক্রমাগত পরীক্ষা করে করে খানিকটা সাফল্য তারা পেল। তৈরি হল বামন। এর দেহ পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এর মস্তিষ্ক ছিল ক্ষুরধার বুদ্ধি সম্পন্ন, আবার খানিক শান্তও। কিন্তু তার পরবর্তী ক্লোনটি ছিল যেমন বুদ্ধিমান তেমনি যুদ্ধবাজ। একে সামলাতে শেষমেশ শিব গোষ্ঠীকে আসরে নামতে হয়েছিল। কিন্তু নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা পেল বিষ্ণু গোষ্ঠী। তারা দীর্ঘকালের জন্য গবেষণা বন্ধ রাখল।”

     “যাক শান্তি।” আমি হাঁপ ছাড়লাম।

     “কোথায় শান্তি? ব্রহ্মা গোষ্ঠী তো আর গবেষণা বন্ধ করেনি। তারা বিষ্ণু আর শিব গোষ্ঠীর সংস্পর্শ থেকে দূরে গিয়ে তাদের কারখানায় ভয়ংকর ভয়ংকর সব প্রাণী বানাতে লাগল। সবার টনক নড়ল তখন, যখন তাদের হাতেই উৎপন্ন এক অতি বুদ্ধিমান দানব তাদের কারখানার দখল করে নিল। ব্রহ্মা গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা চোখে অন্ধকার দেখলেন। তারা বিষ্ণু আর শিব গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ হলেন। সেই দানবের ছিল দশটা মাথা। বুদ্ধিতে শক্তিতে তার সমতুল্য কেউ ছিলনা। সে নিজেই অতি শীঘ্র কারখানায় বুদ্ধিমান সব প্রাণী তৈরি করতে লাগল।”

     “রাবণ!” রুদ্ধ নিঃশ্বাসে আমি বলে উঠলাম।

     সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল মেয়েটা। “তখন আবার বিষ্ণু গোষ্ঠী আসরে নামল। সে এবার নতুন রাস্তাতে পুরাতন পদ্ধতিতে হাঁটল। তারা নব-প্রক্রিয়ায় একটা কোষ গঠন করল। কিন্তু সেই কোষ থেকে তারা পূর্নাঙ্গ মানুষ না তৈরি করে বানাল চারটি ভ্রূণ শিশু। যথাসময়ে তাদেরকে সারোগেট মায়ের গর্ভে স্থাপন করা হল। ক্রমে চারটে বুদ্ধিমান অতিমানব শিশু জন্ম গ্রহণ করল। তাদের মস্তিষ্কে ছিল পূর্ব-অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি। কিন্তু তাদের শিশুকাল সমৃদ্ধ করার জন্য তা ভুলিয়ে রাখা হল। একই ভাবে আরও কিছু শক্তিশালী অতিমানব বানানো হল। পরিকল্পিত পথে হেঁটে যথাসময়ে যুদ্ধ হল। বিষ্ণু গোষ্ঠী জিতল।”

     “তারমানে রামায়ণে প্রকৃত ঘটনা এই?”

     “তা নাতো আবার কি? ছেলেভুলানো গল্প তো সবাই পড়ে কিন্তু উৎপত্তি কোথা থেকে হল সে খবর কি কেউ রাখে?”

     “তারপরে নিশ্চয়ই ব্রহ্মার কারখানা বন্ধ হয়ে গেল?” আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

     “তখনকার মত কারখানা জ্বালিয়ে দেওয়া হল। নষ্ট করা হল সেই ভয়ংকর ভয়ংকর প্রাণীগুলোকে। কিন্তু তাতেও শেষ হল না।”

     “সে কি আবার কি হল?”

     “আপনি যদি “অ” লিখতে পারেন তাহলে হাতের স্লেট ভেঙে ফেললেও অন্য যেকোনো জায়গায় আপনি তা লিখতে পারবেন, তাই তো?”

     “তারমানে সেই জ্ঞানের চর্চা চলতে লাগল?”

     “হ্যাঁ। সেই জ্ঞান নিয়ে ব্রহ্মা গোষ্ঠী থেকে একদল ক্ষুব্ধ বিজ্ঞানী দলত্যাগ করল ‘শুক্রাচার্য’-এর প্রতিনিধিত্বে। এরা এক গোপন জায়গায় নিজেদের ল্যাবরেটরি বসিয়ে আবার গবেষণা শুরু করল। শুক্রাচার্যের দল এক অদ্ভুত সাফল্য পেল গবেষণায়। এরা তৈরি করল এক ক্ষণজন্মা শেপসিফটার।”

     “শেপসিফটার? মানে বহুরূপী?”

     “হ্যাঁ। এর আগেও এই নিয়ে গবেষণা হয়েছিল। মারীচ নামক একটা ক্লোন দানব তৈরি করেছিল ব্রহ্মারা। কিন্তু সে শুধু হরিণের রূপ নিতে পারত। এক হরিণের জিনের সাথে সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছিল তার। কিন্তু এবার শুক্রাচার্য বানালেন এক প্রকৃত বহুরূপী। যে ইচ্ছামত নিজের কোষের গঠন পরিবর্তন করে যেকোনো প্রাণী বা মানুষ হয়ে যেতে পারে। আবার অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটল। সেই দানব দখল করে নিল শুক্রাচার্যের ল্যাব। হামলা চালাল অন্যান্য গোষ্ঠীর উপরে। এবার মানুষেরা এসে ব্রহ্মা গোষ্ঠীর উপরে হম্বিতম্বি শুরু করল। ব্রহ্মা নিরুপায় হয়ে বিষ্ণু গোষ্ঠীর শরণাপন্ন হল। বিষ্ণুরা বুঝতে পারল এবারে বড় কঠিন ঠাঁই। সহজে এদেরকে হারানো যাবেনা। তখন দু দল বিজ্ঞানী  মিলে গেল শিব গোষ্ঠীর কাছে। শিবরা তো শুনে টুনে রেগে ফায়ার হয়ে গেল বিষ্ণু আর ব্রহ্মাদের উপরে। এতবার করে বারণ করা সত্ত্বেও এরা গবেষণা চালিয়ে গেছে আর সমস্ত মানবজাতি তার ফল ভোগ করছে। শিবরা প্রথমে রাজি হলেন না মিটিং করতে। তখন এক অদ্ভুত মারণ রোগের খবর নিয়ে কিছু অধিবাসী হাজির হল শিবের কাছে। সে এক বীভৎস অসুখ। কোন মানুষ অসুস্থ হলে তার শরীর থেকে মল মূত্র বা বমির মাধ্যমে দ্রুত রক্ত বেড়িয়ে যাচ্ছে। খুব বেশী হলে মানুষটি আক্রান্ত হওয়ার পরে দুই কি তিনদিন বাঁচছে। সেই রক্তের সংস্পর্শে যারা আসছে তারাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দলে দলে লোক এই রোগে মারা যাচ্ছে।”

     “রক্ত থেকে ছোঁয়াচে অসুখ? এটা কি রক্তবীজ?”

     “বাঃ। আপনি তো বেশ কিছু জিনিস পড়েছেন। যে দানবটা নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে সে কে বলুন তো?”

     আমি একটু ভেবে বললাম, “মনে হচ্ছে মহিষাসুর। কিন্তু ওটা যদি বহুরূপী হয় তাহলে মহিষাসুর নাম হল কেন?”

     মেয়েটা আরেকটা সিগারেট ধরাল। একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “ও জন্মানোর পরে প্রথম যে রূপ ধারণ করে সেটা ছিল মহিষ।”

     “আচ্ছা। তাহলে এবার দুর্গা জন্ম নেবে?”

     “দুর্গা সম্বন্ধে আপনি কি জানেন?”

     “দশটা হাতে দশটা অস্ত্র। সিংহবাহিনী। মহিষাসুর-মর্দিনী।” এতো সবাই জানে ভাব করে আমি বলে গেলাম।

মেয়েটা ধীরে সুস্থে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “ভুল।”

     “ভুল!?”

     “হ্যাঁ ভুল। দশটা হাত নয়। দশ ধরনের স্পেসিফিক জিন কোয়ালিটি। সিংহ নয় নবগুনজারবাহিনী।”

     “কোয়ালিটি জিন? নবগুনজার? কি সেগুলো?”

     “আপনাদের সবটাতেই তাড়াহুড়ো।” বলে এমন অবজ্ঞা ভরে আমার দিকে তাকাল যে আমি মিন মিন করে বললুম, “ না না আপনি প্রথম থেকেই বলুন না। সেই যে রক্তবীজ আক্রমণ করল।”

     “হ্যাঁ রক্তবীজের কথা শুনে শিব নড়ে চড়ে বসল। এ যে বায়োলজিক্যাল ওয়েপন। এর থেকে সর্বনাশা আর কিছুই হয়না। এর আগেও এরকম অস্ত্র ব্যবহার করেছিল দানব গোষ্ঠী লঙ্কা যুদ্ধে। তাদের তৈরি করেছিল রাবণ নিজে। নাম দিয়েছিল অহীরাবণ আর মহীরাবণ। প্রচণ্ড রকমের সংক্রামক ভাইরাস রামের সেনাবাহিনী উজাড় করে দিয়েছিল প্রায়। কিন্তু দক্ষিণের প্রচণ্ড গরম আর নোনা জলের সংস্পর্শেই এই ভাইরাসের বাড়-বৃদ্ধি ছিল। যত মূল ভূখণ্ডের ভিতর দিকে সরে এসেছিল বাহিনী, তত এই সংক্রামক রোগের হাত থেকে রেহাই মিলেছিল। কিন্তু এবারের অসুখ দক্ষিণ থেকে উত্তর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শিবরা তখন মিটিং ডাকলেন। ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব তিন গোষ্ঠীর বিজ্ঞানী আবার মিলিত হল। শিব গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা মূলত চর্চা করত রোবটিক্সের।”

     “রবোটিক্স! তখনকার দিনে?”

     মেয়েটা আমাকে পাত্তা না দিয়ে বলে যেতে থাকল, “ রোবটিক্সে অত্যন্ত উন্নতি করেছিল শিব-গোষ্ঠী। এখনও যা মানুষের কাছে শুধুমাত্র থিওরি শেই বায়োসাইবারনেটিক্সের গণক যন্ত্র বানিয়েছিল শিব বিজ্ঞানীরা। সেই যন্ত্র ছাড়া কখনোই ডিএনএ-র বুনন সম্ভব নয়।”

     “ডি এন এ বুনন টা কি?”

     “তিল তিল করে তিলোত্তমা বানিয়ে তোলার পর্যায়। জেনেটিক্সের সর্বোচ্চ পর্যায় বলতে পারেন একে। মানুষ এখনো শুধুমাত্র এর থিওরিটাই আবিষ্কার করতে পেরেছে। ব্রহ্মা বিজ্ঞানীরা কি করতো? দুই ধরনের প্রাণীর জিনের মিশ্রণ ঘটিয়ে প্রাণী বানাত। কখনো কখনো তারা স্পেশাল শক্তির অধিকারী হয়ে যেত কিন্তু সেটা আকস্মিক ঘটনা। বিষ্ণু বিজ্ঞানীরা বানাতে চাইত ঠিক ঠাক মানুষ। উন্নততর। সে গতিশীল হবে, উচ্চ চিন্তাশীল হবে, শক্তিশালী হবে, সহজে অসুস্থ হবেনা। কিন্তু সেও ছিল প্রায় আকস্মিক। এদের সাথে বায়োসাইবারনেটিক্স-এর ব্রেন যখন যুক্ত হল তখনই সেই অসাধ্য সাধন সম্ভব হল। একমাত্র এই যন্ত্রের সাহায্যেই বলা সম্ভব কোন ডিএনএ-র সাথে কোন ডিএনএ যুক্ত হলে কি ধরনের ফল হতে পারে। তিন গোষ্ঠীর বিজ্ঞানী বহুদিন লড়াই করে ডিএনএ বুনে বুনে প্রথমে একটি পশু বানালেন। তাতে ছিল নয়টি প্রাণীর ডিএনএ। তৈরি হল নবগুনজার। পশুদের দিক থেকে এই প্রাণীটি ছিল শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধি, গতি, ক্ষিপ্রতা, শক্তি, হিংস্রতা আর আনুগত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল পশুটির মধ্যে। এই প্রাণীটা যখন ঠিকঠাক তৈরি হল তখন বিজ্ঞানীরা মানব গঠনে হাত দিলেন। সারা পৃথিবী খুঁজে সংগ্রহ করে আনা হল সব থেকে উৎকৃষ্ট মানের কয়েকশো মানব জিন। তার মধ্যে থেকে বিজ্ঞানীরা বেছে নিলেন সব থেকে অসাধারণ গুণাবলীসম্পন্ন দশটা জিনের গঠন। ডিজাইন করা হল পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট মানবীকে। ল্যাবরেটরিতে বিন্দু বিন্দু করে নির্মাণ হল তিলোত্তমার। অন্যান্য ক্লোনদের মত সে সরাসরি যৌবন পায়নি বা নিষিক্ত ডিম্বাণুকে স্থাপন করা হয়নি কোন স্বাভাবিক মাতৃ-জঠরে। তাকে রাখা হয়েছিল কৃত্রিম মাতৃ-জঠরে। সেই অতি উচ্চমানের ডিএনএ-র বুনট মাত্র নয় মাসে সম্পূর্ণ হওয়ার ছিলনা। কৃত্রিম জঠরে সেই নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন থেকে তার জন্মানোর জন্য লেগেছিল সুদীর্ঘ পনেরো মাস। শারীরিকভাবে নিখুঁত এক দেবীর জন্ম হল। ”

     “নিখুঁত মানে? দেখতে সুন্দর?” আমি চেপে থাকতে পারলাম না।

     “না। দর্শন কোন বড় কথা নয়। আদর্শ মস্তিষ্ক, আদর্শ শরীর তার। তার মস্তিষ্কের গঠন ছিল অত্যন্ত জটিল। সে বুঝে যেত অন্য মানুষের মনের কথা, জেনে যেত অদূর ভবিষ্যতকে, নিজের মস্তিষ্কের প্রায় সবটুকুই তার নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া কোন জিন-বাহিত অসুখ বিসুখ তার কোনদিনও হবে না তার। তাকে আক্রমণ করতে পারবে না কোন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া। শরীরে ও মস্তিষ্কে সে হল অবচেতন; আবেগ, রোগ, জরার অতীত এক দূর্ভেদ্য ইম্যুনিটি সিস্টেমের অধিকারিণী। এর সাথে সাথে সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে সেই শরীর প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। তীব্রতম সাইক্লোন তাকে নড়াতে পারেনা। জলের মধ্যে শ্বাস-বিহীন অবস্থায় সে বাঁচতে পারে দীর্ঘকাল। গলন্ত লাভা স্রোতে তার চুলও পোড়ে না। তীব্রতম ঠাণ্ডাতেও তার ত্বক একইরকম থাকে। সে অতিমানবদের থেকেও কয়েক গুন বেশী ক্ষিপ্র, গতিশীল, শক্তিশালী, যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা অসীম, সবরকম পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, এছাড়াও মহা মহাশক্তির অধিকারিণী সে। পৃথিবীর গ্র্যাভিটিকে ছিন্ন করা কোন ব্যাপার ছিলনা তার কাছে। অদ্ভুত দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন সে। দেখতে পেত অন্ধকারে, জলের তলায়, গাঢ় ধোঁয়ার মধ্যে, সূক্ষ্মতর বস্তু আর বহু বহু দূরের জিনিস। অদ্ভুত তার কোষ গঠন, যা একেবারে ধ্বংস হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হলেও পুনরায় সেই শক্তি থেকে দেহ গঠনের ক্ষমতা রাখে। অদ্ভুত তার ফুসফুস। বিষাক্ত বাতাস, অ্যাসিডের ধোঁয়াকেও সে প্রতিহত করতে পারত। মিশতে দিত না রক্তে। অদ্ভুত সেই রক্ত যাতে কোন আজকালকার যুগে যাকে বলে অ্যান্টিজেন তা ছিলনা। ”

     “মানে আরএইচ নাল (Rh Null) গ্রুপ?”

     “হ্যাঁ। ও নেগেটিভের থেকেও বেশী সর্বজনগৃহীত সেই রক্ত। যে কাউকে দেওয়া যায় সেই রক্ত। তাই তো যখন রক্তবীজের আক্রমণে সবাই মরে যাচ্ছিল তখন দেবী নিজে ছিন্নমস্তা হয়ে শরীর থেকে রক্ত বার করে দেয়। যাতে সেই রক্তের প্রভাবে মানুষ আবার সুস্থ হতে পারে। দেবীর রক্তের এক অদ্ভুত গঠন ছিল। তা যে কোন মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তাকে তো বটেই তার পরবর্তী বংশধরদেরও রক্ত-বাহিত রোগ অসুখ থেকে রক্ষা করত।”

     “তারপর দেবীর সাথে মহিষাসুরের যুদ্ধ হল না?”

     “হল তো। মহিষাসুর তো একটা দানব নয় তার লক্ষ লক্ষ চেলা চামুণ্ডা। দেবীকে বছরের পর বছর যুদ্ধ করে যেতে হল তাদের বিরুদ্ধে। শেষমেশ বধ করতে পারলেন মহিষাসুরকে। ধ্বংস করা হল সমস্ত ক্লোন দানবদের। সমস্ত জেনেটিক্সের জ্ঞানকে শিব গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা নিয়ে নিলেন। বিষ্ণু গোষ্ঠীকে ক্ষমতা দেওয়া হল শুধুমাত্র মানুষ এবং প্রকৃতির কল্যাণকর বিজ্ঞানের সাধনার। আর ব্রহ্মা গোষ্ঠী উচ্চপদচ্যুত করা হল। তারা চিরজীবন বিষ্ণু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।”

     “আচ্ছা দেবীর কি হল?”

     “দেবীর সব থেকে বড় ব্যাপার কি ছিল জানেন?”

     “কি?”

     “দেবী হল সীমা অতিক্রম করে শারীরিক ও মানসিকভাবে জীবিত থাকার জন্য পরিকল্পিত এক নারী। এই নিয়ে তিন গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা বহু তর্ক বিতর্ক করেছিল। ব্রহ্মা গোষ্ঠী চেয়েছিল এরকম সর্বগুনসম্পন্ন মহামানবিক শক্তি এক পুরুষের অধিকারে থাকুক। কিন্তু শিব-গোষ্ঠী চেয়েছিল জন্ম নিক এক নারী। আসলে বাকিরা কেউ বুঝতে পারেনি শিব-গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীরা কেন তা চেয়েছিল। শিব-গোষ্ঠীর চিন্তা শুধু এই সভ্যতা বা পৃথিবী নিয়ে ছিল না। তারা এক স্বর্গীয় স্বপ্ন দেখেছিল। একমাত্র নারীই পারে জন্ম দিতে। অসম্ভব প্রতিকূল পরিবেশেও দেবী তার মাতৃ-জঠরে লালন করতে পারবে ভবিষ্যতে বীজকে। যে বীজ পেরিয়ে যাবে এই গ্যালাক্টিক জগতকে, আর খুঁজে নেবে নতুন জগত। সেখানে দেবী বুনবে এক নতুন সভ্যতা। ”

     আমি হতবাক হয়ে বসে ছিলাম। আমার পাশে মেয়েটা সিগারেটের ধোঁয়ার ডুবে গেছে। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। অনেকক্ষণ চুপ চাপ বসে থাকার পরে ভাবলাম মেয়েটাকে একবার জিজ্ঞেস করি সে কে? আর এতসব কথা জানলই বা কি করে? পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখি কোথায় কে? কেউ নেই! শুধু খানিক জ্যোৎস্না বেঞ্চে লুটোচ্ছে। পায়ের কাছে একগাদা সিগারেটের ফিল্টার পড়ে। তখনও খানিকটা ধোঁয়া পাক খেয়ে খেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। হাজার হাজার বছর আগে এইসব হয়েছিল? আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছিল। বই বগলে গুটি গুটি ফিরে এলাম বাড়ীতে। ওই কাহিনী শোনার পরে আমারও মনে হচ্ছিল ‘ছ্যাঃ আমাদের বিজ্ঞান এখনো শিশু’। কিন্তু কিছু একটা লিখে জমা দিয়ে হবে তো। তাই শোনা কাহিনীটাই লিখে ফেললাম। এবার সম্পাদকের পছন্দ হলে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *