শান্ত গ্রহ – য়ুরি গ্লাজকভ

কটা খুব সুন্দর এবং সমৃদ্ধ গ্রহ। সম্ভবত মহাবিশ্বের সবচেয়ে সেরা গ্রহ। সবুজ রঙের পাহাড় সারির তলায় জমে আছে ধাতুর এক মহা ভান্ডার। এ গ্রহের শিরায় উপশিরায় বয়ে যাওয়া কালো তরল একে যোগাচ্ছে অপরিমেয় শক্তি। এখানকার গাছপালাকে দেখলে বোঝা যায় আক্ষরিক অর্থে মহীরুহ কাকে বলে। এদিকে ওদিকে ছুটে বেড়ায় নানান জীবজন্তু। আকাশে উড়ে বেড়ায় কত রকমের পাখি। নদীর জলে খেলা করে বেড়ায় মাছ। আর এসবের মাঝেই বাস করে বুদ্ধিমান জীবের দল। যারা এই গ্রহের শাসক। তারা জ্ঞানের সহায়তায় নিপুণতার দক্ষতার শীর্ষ বিন্দু ছুঁয়েছে। এর ফলে প্রাপ্ত ক্ষমতা তারা ব্যবহার করে নিজেদের এবং আশেপাশের সব কিছুর ভালোর স্বার্থে।

     কিন্তু আলো থাকলেই অন্ধকার থাকে। এরকম একটা ভালো গ্রহকে দখল করতে চায় অন্যেরা। এই গ্যালাক্সির একপ্রান্তে অবস্থানকারী এক সভ্যতার নজরে পড়েছে গ্রহটার দিকে। একে দখল করতে উদগ্রীব তারা। একই সঙ্গে তাদের লোভ গ্রহটার অফুরন্ত সম্পদ এবং উন্নত প্রযুক্তি দখল করার। এদিকে গ্রহটাতে না আছে অস্ত্রশস্ত্র না আছে সেনাবাহিনী। এখানকার অধিবাসীরা সব সময় মেতে থাকে চাষাবাদে কিংবা শহর নির্মাণে কিংবা এই মহাজগত বিষয়ে আরো আরো জ্ঞান আহরন করার ভাবনায় এবং ভ্রমণে।

     সময়ে অসময়ে এই মহাবিশ্ব সমুদ্রের নানান প্রান্তে জমায়েত হয় বিশাল বিশাল সেনাবাহিনী তাদের মিলিটারী সমরাস্ত্র সম্ভার নিয়ে। দৈত্যাকার স্পেস ক্রুজার, লেজার কামান, নিয়ন্ত্রণযোগ্য মিসাইল এবং রকেট ছাড়াও সেই জমায়েতে ঝটিকাবাহিনী, ট্যাঙ্ক, এয়ারক্র্যাফট, উভচরযান কি না দেখতে পাওয়া যায়। মিলিটারী বিজ্ঞানের সব কিছু এক জায়গায় জড়ো হয়। মাঝেমধ্যেই এরকম বাহিনী প্রায় নিঃশব্দে হাজির হয় গ্রহটার চারপাশে। শুরু করে আক্রমণ। অত্যুজ্জ্বল আলোর ঝলকে ভরে যায় মহাকাশের বুক। অন্ধকার বহিঃজগতের বুক চিরে সে আলো পৌঁছে যায় অন্যান্য গ্রহবাসীদের নজরে। তারপর একসময় সব থেমে যায়। মিলিয়ে যায় আলোর রোশনাই। মহাকাশের বুকে ভেসে থাকে… ভাসতে ভাসতে সরে যায় দূরে দুরান্তে… কত শত যন্ত্রাংশের টুকরো টাকরা এবং আক্রমণকারী দের দেহাবশেষ।

     ভেগা নক্ষত্র থেকে ভেসে আসে মহাকাশযানের বাহিনী… তারপর একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দিকে ভেসে যায় তাদের অন্তিম মুহূর্তের আর্ত চিৎকারের রেডিও তরঙ্গ…

     আল্টেয়ার তারা জগত থেকে ভেসে আসা রকেটগুলো থেকে ধেয়ে যায় ক্ষেপণাস্ত্র… সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় নিজেরাও…

     গামা ব্ল্যাক স্টারের জগত থেকে আসা দশটা অতিকায় মহাকাশ যুদ্ধযান প্রথম আঘাত হানতেই নিমেষের মধ্যে পরিণত হয় ধ্বংস স্তুপে… ওই তারাদের গ্রহজগতে বসবাসকারীদের কাছে এক চরম সত্যির বার্তা পৌঁছে যায় নিমেষের মধ্যে… ওই গ্রহে– যা তাদের নিজেদের সম্পত্তি নয়- আক্রমণ করা আর মৃত্যুর অভিশাপ নিজের মাথায় টেনে নেওয়া একই ব্যাপার।

     একটাও যুদ্ধবাজ মহাকাশযান পৌঁছাতেই পারে না ওই গ্রহের মাটিতে… ফলে জানাও যায় না কি রহস্য লুকিয়ে আছে ওই গ্রহের বুকে…

     বিধস্ত হওয়ার পর আক্রমণকারী কাউন্সিলের আলোচনা সভায় আজ তর্ক বিতর্কের ঝড় বইছে। একের পর এক জন নিজ নিজ ভাবনায় বোঝানোর চেষ্টা করছে কেন আক্রমণ সফল হচ্ছে না। গ্রহের অধিপতি উত্তর চান, অন্তত কেউ একজন বুঝিয়ে বলুক কি কারন এই অদ্ভুত অসাফল্যের। বার বার জেনারেল বদল করেও ফলাফলের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আপাতত নিজের ভাবনা বলার সুযোগ পেয়েছেন কর্নেল ক্রুক। অল্প বয়েসী চনমনে প্রকৃতির অফিসার। সেই সামান্য কিছু মানুষের তালিকায় কর্নেল ক্রুকের নাম আছে যারা একই সঙ্গে স্ট্রাটেজী বানাতে পারেন এবং তার সফল রূপায়ণ করতেও পারেন। পর পর পাঁচটা গ্রহ দখলের ক্ষেত্রে তার নৈপুণ্যতাকে সাধারণ এক সেনা থেকে আজ এই জায়গায় উঠে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। নির্মম আগ্রাসী শিকারী মানসিকতা তাকে সহায়তা করেছে এই যুদ্ধের জগতে একই সঙ্গে বেঁচে থাকতে এবং একের পর একজনকে পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে।

     দীর্ঘকায় সোনালী চুলের অধিকারী বিশালকায় কর্নেল আজেবাজে ভনিতা করে সময় ব্যয় করতে ভালোবাসেন না। সরাসরি বলতে শুরু করলেন-

     “একের পর ব্যর্থতা এবং ধ্বংস দেখার পর আমি সোজাসুজি এর থেকে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সে ব্যাপারে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।” ভালো করেই জানেন যাদের সামনে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চলেছেন তাদের কাছে ব্যাপারটা কি পরিমাণ তিক্ত। “যতদূর আমি বুঝতে পেরেছি তাতে আমার প্রথম সিদ্ধান্ত, আমাদেরকে আক্রমণের পদ্ধতি বদলাতে হবে। সব কিছু বিশ্লেষণ করে যা বুঝেছি ওই গ্রহটার আচরণ আগ্রাসী নয়। আজ অবধি ওদের তরফ থেকে একটাও যুদ্ধযান আমাদের উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসেনি। অথচ ওরা খুব ভালোভাবেই আমাদের অবস্থান বুঝতে সক্ষম। বিপদকালীন সময়েও ওরা আগে থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা করে না। দ্বিতীয় কথা, এটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে আমরা যে আক্রমণ করছি ঠিক তার সমমানের আক্রমণ ফেরত আসছে ওই গ্রহের তরফ থেকে। একটুও কম বা বেশি নয় তার মাত্রা। আর তার ধাক্কাতেই আমাদের সমস্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক এই কারনেই আমার সাজেশন হল, আমরা ওই গ্রহে কাছে উড়ে যাবো। নামবো কিন্তু আক্রমণ করবো না। না তারমানে কিন্তু এই নয় যে একেবারেই আক্রমণ করবো না। আমরা মহাকাশ থেকে আক্রমণ করবো না। যতবার আকাশপথে আক্রমণ করেছি ততবার আমাদের হেরে যেতে হয়েছে।

     “একটা মহাকাশযান… হ্যাঁ মাত্র একটা মাত্র মহাকাশযান নিয়ে ওখানে অবতরণ করতে হবে। আমরা যাবো পথহারা মহাকাশযানের ছদ্মবেশ নিয়ে। আমি নিশ্চিত ওরা কিছুই করবে না।

     “একবার ওই গ্রহে নামতে পারলে আমাদের সেনাবাহিনীকেও ওই গ্রহে নামানো যাবে বলেই আমার মনে হয়। আর তারপর ওই গ্রহ দখল করতে খুব বেশী সময় লাগবে না। বাইরে থেকে আক্রমণ করলে তবেই পালটা আক্রমণ করবো এরকম একটা সিম্পল ভাবনা নিয়ে ওই গ্রহের অধিবাসীরা বসবাস করে বলেই আমার ধারণা। ওরা আমাদের বাইরে থেকে করা কোনো আক্রমণকে ভয় পায় না। যে কারনেই ওদের তরফ থেকে কোনো আক্রমণ আমাদের দিকে ধেয়ে আসেনি । অতএব আক্রমণ নয় আগে গ্রহে অবতরণ, এটাই হবে আমাদের লক্ষ্য।”

     ক্রুক কথা থামিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন কি মন্তব্য ধেয়ে আসে সেটা শোনার।

     ‘অতি সরল অথচ কার্যকরী একটা ভাবনা, জেনারেল। দারুন!’ শোনা গেল গ্রহ শাসকের কণ্ঠস্বর। উত্তেজনায় ভরপুর। সঙ্গে এক সুখ স্বপ্নের আবেশ মিশে আছে তাতে। ‘অসাধারণ ভাবনা জেনারেল ক্রুক!’

     ক্রুক আলতো করে বললেন, ‘কর্নেল ক্রুক স্যার।’

     শাসক বললেন, ‘আমি যখন জেনারেল বলেছি তখন জেনারেল।’

     ক্রুক মাথা নিচু করে অভিবাদন জানাতেই শাসকের ইশারায় একজন এগিয়ে এলেন। হাতে বিশেষ ধাতব তারকাখচিত জেনারেল ওভার কোট। পরিয়ে দেওয়া হল ক্রুককে…

     এক বিশেষ মহাকাশযান সাজানো হল এই অতি বিশেষ অভিযানের জন্য। জেনারেল ক্রুক নিজের হাতে বেছে নিলেন সেনা সদস্যদের। এমন সব সেনা যাদের বকলমে জল্লাদ বললেও কম বলা হবে। বুঝিয়ে দিলেন ভালো করে নিজের প্ল্যান।

     আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপরেই অন্য রকমের এক আক্রমণ আছড়ে পড়বে শান্ত গ্রহটার ওপরে। সব কিছু রেডি। স্বয়ং শাসক শুভেচ্ছাবার্তা পাঠালেন জেনারেল ক্রুকের উদ্দেশ্যে এবং বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করলেন আপন ধর্মমত অনুসারে সব রকম খারাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য। শুরু হল এক অদ্ভুত শান্ত গ্রহে অবতরণের উদ্দেশ্যে যাত্রা। কিছু বাদেই গ্রহটির উদ্দেশ্যে পাঠানো হল পথ হারানোর সংকেত।

     মহাকাশযানের পোর্ট হোল দিয়ে তাকিয়ে থাকা ওর ভেতরে থাকা যোদ্ধাদের চোখের সামনে ক্রমশ বড় হচ্ছিল গ্রহটার অবয়ব। মনিটরে চোখ রেখে বসে থাকা ক্রুকের হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়ছিল তাল মিলিয়ে। গ্রহটার অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ অভিযাত্রীদের মনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল। ওদিক থেকেও কোনও সাড়া নেই… এদিকেও থেমে গেছে সবরকম গুঞ্জন। দমবন্ধ করা একটা আবহাওয়া। গ্রহটার তরফ থেকে এখনো কোনও সাড়া নেই… দেখাও যাচ্ছে না কোনোরকম কিছুই… আর এটাই সবচেয়ে আতঙ্কের।

     অস্ত্র বিভাগের দায়িত্বে থাকা অফিসার বললো, ‘আমাদের লেজার চালানো উচিত মনে হচ্ছে। এত নিস্তব্ধ চুপচাপ কেন শত্রুপক্ষ?’

     ‘না!’ ধমকে উঠলেন ক্রুক। ‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সঠিক সময়ের। পুরোনো ভুল আমি আর করতে রাজি নই।’

     ‘তাহলে আমাদের সেনাবাহিনীকে বলি তৈরি থাকতে আক্রমণ করার জন্য। বলা যায় না…’

     ‘না, তার দরকার নেই। আপাতত আমরা শুধুই অপেক্ষা করবো।’

     গ্রহটাকে ঘিরে কয়েক চক্কর মারলো ক্রুকের মহাকাশযান। অনেকটাই এগিয়ে গেল কাছে। না কোনো রকম আক্রমণের লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না অন্য তরফ থেকে। ওদের স্বাগত জানানোর জন্যেও কেউ এলো না। একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ছেয়ে আছে সারা গ্রহটা জুড়ে ।

     ক্রুক আদেশ দিলেন, ‘চলো, গ্রহে নামা যাক।’

     ছদ্মবেশী যুদ্ধযান ধীরে ধীরে নামলো গ্রহের জমিতে। বিপদের কিছুই ঘটলো না।

     অযাচিত কিছু একটা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কায় সকলের স্নায়ু টনটন করছে। মাথায় পড়ছে হাতুড়ির ঘা।

     কিছুটা সময় অপেক্ষা করে ক্রিক বললেন, ‘আর অপেক্ষা করে লাভ নেই … ঝাঁপিয়ে পড়া যাক …!’

     বলার সঙ্গে সঙ্গেই মহাকাশযানের পেটের তলায় বড় বড় দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো নির্বাচিত সেনাদল। বিশাল র‍্যাম্প বয়ে নেমে এলো ট্যাঙ্ক, ফাইটার এয়ার ক্র্যাফট। এগিয়ে গেল বেশ খানিকদূর।

     ‘অ্যাটাক!!’ চেঁচিয়ে উঠলেন ক্রুক তার মাইক্রোফোনে।

     সঙ্গে সঙ্গেই দেখলেন একটা একটা করে তার ট্যাঙ্কগুলো বিস্ফোরিত হল। শূন্যে ভেসে ওঠা এয়ারক্র্যাফট গুলো হোঁচট খাওয়ার মতো পড়ে গেল একের পর এক। আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠলো আকাশের দিকে। একদল সেনা এই সব দেখে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে ট্রিগার টিপলো। এক পল্টন সেনা প্রায় এক নিমেষে ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে অজ্ঞাত শত্রুপক্ষের পাল্টা আঘাতে। বাকি সেনাদেরও একই হাল হল। যে অফিসারের দায়িত্বে সেনারা শান্ত গ্রহটির জমিতে নেমেছিল সে লেজার গান বার করে সামনের দিকে তাক করলো… ক্রুক অবাক হয়ে দেখলেন মনিটরে ম্যাজিকের মতো নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল মানুষটা ।

     সবশেষ শুধু বিশ্বস্ত কয়েকজন সঙ্গী আর ক্রুক জীবিত আছেন এই মুহূর্তে। মহাকাশযানের ভেতরে থাকা শেষ চারটে ট্যাঙ্ক নিয়ে এই যুদ্ধ জেতার একটা শেষ চেষ্টায় সামিল হলেন ক্রুক।

     চারটে ট্যাঙ্ক এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। তারই একটায় বসে এই মুহূর্তে ক্রুক দেখতে পাচ্ছেন তার শত্রু পক্ষকে। একটা ট্যাঙ্ক এগিয়ে আসছে তার দিকে। একেবারে সামনাসামনি। বাকি তিনটে ট্যাঙ্কের উদ্দেশ্য ছুঁড়ে দিলেন আদেশ, ‘অ্যাটাক!!’ এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেলেন তিনটে ট্যাঙ্কেই বিস্ফোরণ হল।

     ট্যাঙ্কের ছাদের ঢাকনা খুলে ওপরে উঠে গেলেন। হ্যাঁ ওই তো দেখা যাচ্ছে শত্রুপক্ষের ট্যাঙ্কটাকে। কিন্তু আর কোথাও কিচ্ছু নেই। পুনরায় আদেশ দিলেন, ‘অ্যাটাক!’।

     দেখলেন সামনের ট্যাঙ্কটার নলটা উঠলো ওপরের দিকে। লক্ষ্য তার নিজের ট্যাঙ্ক। অর্থাৎ বিপদ। সামনের দিকে তাকিয়েই ঝাঁপ মারলেন পাশের একটা ঝোপে। শূন্যে ভেসে থাকতে থাকতেই দেখতে পেলেন যে গোলাটা ছুটে আসছে তার গায়ে খুব চেনা একটা চিহ্ন। চিহ্নটা তাদের বাহিনীর… শেষ বিস্ফোরণটা ঘটলো… ধ্বংস হয়ে গেল ক্রুকের শেষ ট্যাঙ্কটাও।

     কিছু সময় বাদে সামনের দিকে তাকাতেই আর কিছুই নজরে এলো না জেনারেল ক্রুকের। মনে মনে বললেন -বাহবা দিতেই হবে শত্রুপক্ষকে। আক্রমণ করেই সামনে থেকে দ্রুত সরে যাওয়া ভালোই আয়ত্ব করেছে।

     গড়িয়ে গড়িয়েই ডান দিকের একটা গাছের আড়ালে চলে গেলেন ক্রুক। এর মাঝেই তার সতর্ক দৃষ্টি এড়াতে পারলো না শত্রুপক্ষ। একজন একইভাবে ঠিক তার মতো করেই অন্য দিকের একটা গাছের আড়ালে চলে গেল। যে গেল তার মাথার চুলও সোনালী। পরনে ক্রুকের মতোই ওভারকোট।

     ‘এবার আমার পালা, হয় আমি মরবো নয় ওকে মারবো!’

     আগ্নেয়াস্ত্রটা হাতে নিয়ে গাছের আড়াল থেকে এক ঝটকায় লাফিয়ে সামনে এলেন ক্রুক। এভাবেই হঠাৎ আক্রমণ করে শত্রুপক্ষকে কত বার মাত করেছেন তিনি। কিন্তু শত্রুপক্ষের অবয়বটাও ওর মতোই ভাবছিল নিশ্চিত। প্রায় ছায়ার মতোই ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। সময় নষ্ট না করে ট্রিগারে চাপ দিলেন জেনারেল ক্রুক। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলিটা চালানোর সময় দেখতে পেলেন শত্রুপক্ষের মুখ। তার নিজেরই মুখ… কাদা রক্তে ঘামে মাখামাখি একটা সোনালী চুলওয়ালা মাথা… বিস্ফারিত চোখে যুগপৎ ঘৃণা আর ভয়ের ছাপ… বুকের বোতাম খোলা ওভার কোট… সে কোটের বুকের কাছে লাগানো আছে এক বিশেষ চকচকে তারা। হাতের কালো ছোটো নলের আগ্নেয়াস্ত্রটা তাক করা আছে সোজা বুকের দিকে…

     ..একটা আগুনের ঝলক… একটা জ্বলন্ত ধাতব টুকরো ঢুকে গেল শরীরে…

     শেষ একটা ভাবনার তরঙ্গ খেলে গেল মনে…

     ‘এক অপরাজেয় শান্ত গ্রহ!’

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ 

য়ুরি গ্লাজকভ এর লেখা ‘The Mirror Planet’ এর ভাবানুবাদ। য়ুরি গ্লাজকভ (Юрий Николаевич Глазков)(Yuri Nikolayevich Glazkov) এর জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৩৯ সালে। মৃত্যু ৯ই ডিসেম্বর ২০০৮। রাশিয়ান এয়ার ফোরসের মেজর জেনারেল। অসংখ্য সম্মানে ভূষিত মানুষটি ছিলেন একজন পাইলট, কসমোনট, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তি বিজ্ঞানে ডক্টরেট। ১৯৭৭ সালের সয়ুজ-২৪ স্পেশক্র্যাফটের দলে ইঞ্জিনিয়ার রূপে ছিলেন উনি। ১৯৮২তে কল্পবিজ্ঞান রচনায় হাতেখড়ি। বেশ কিছু সাইফাই নভেল লিখেছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘দ্য ব্ল্যাক সাইলেন্স’ (১৯৮৭)। তাঁর রচনার মূল বিষয় মহাকাশ এবং তার সামরীকিকরণের প্রতি সতর্কবাণী। প্রাচীন পৃথিবীবাসীদের সাথে উন্নত ভিনগ্রহীদের যোগাযোগ সংক্রান্ত গল্প এমনকি গোয়েন্দা কাহিনিও তিনই লিখেছেন।  

বর্তমান গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ইয়ুথ’ পত্রিকার ২/১৯৮৬ সংখ্যায়, গ্লাজকভের ‘অ্যাডাপটিভ ওয়াইফ’ গল্পের সাথে। ১৯৮৮ সালে রাদুগা পাবলিশার্স এর ‘Star Peace’ সংকলনে গল্পটির Graham Whittaker কৃত ইংরেজি অনুবাদ স্থান পায়। বর্তমান অনুবাদটি সেখান থেকেই করা। ১৯৯১ তে Bantam Spectra প্রকাশিত Lewis Shiner সম্পাদিত ‘When the Music’s Over’ সংকলনেও এটি স্থান পায়।

কৃতজ্ঞতা: য়ুরি গ্লাজকভ, রাদুগা প্রকাশনী, Graham Whittaker

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!