সবুজ পৃথিবীর জন্য

রচনা  : অধরা বসুমল্লিক

অলঙ্করণ : ধ্রুবজ্যোতি দাস

এখন সদ্য ভোর হয়েছে, ঘড়ির দিকে চেয়ে তিয়া মিলিয়ে নিল। ওর ঘুম ভেঙেছে আর একটু আগেই। ও আস্তে আস্তে ব্যালকনির দরজাটা খুলে প্রায় নিঃশব্দ পদক্ষেপে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।

     ও রোজই সকালে একবার করে এসে দাঁড়ায় এই অদ্ভুত ব্যালকনিটায়। খুব ছোটোবেলা থেকে, একেবারে তিন-চার বছর বয়স থেকেই এরকম করে। কেন কে জানে। বাইরেটা একবার না দেখলে ওর কেন যেন খুব খালি-খালি লাগে, সারাটা দিন কেমন যেন অস্থির-অস্থির লাগে।

     স্বচ্ছ পলিমার-আবরণে পুরোটা ঢাকা এই ব্যালকনিটা। তার মধ্য দিয়ে বাইরেটা দেখা যায়। বাইরেটায় দেখবার কী-ই বা আছে? শুধু একটা ঝুলকালো আকাশ আর কালচে একটা দিগন্ত। না সূর্য, না চাঁদ, না দুটো-একটা পাখির ওড়া-উড়ি, না একটা মধুর নীল আকাশ, সবুজ গাছের মাথা-কিচ্ছু না।

     সেসব নাকি ছিল। অনেক আগে। কয়েকশো বছর আগে। তিয়া শুনেছে। সেই সময়কার পৃথিবীর দৃশ্য ছবিতে, মুভিতে, সিডিতে দেখেছে। কী আশ্চর্য সুন্দরই না ছিল তখন পৃথিবীটা!

     এই সক্কালবেলাটায়, যখন তাদের ফ্ল্যাটের আর কেউ ওঠে নি ঘুম থেকে তখন এইরকম ভাবে তিয়া। নইলে সবাই তো ওকে অস্বাভাবিক ভাববে! হয়তো নিয়ে যাবে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। তিনি তাঁর বহু রকমের প্রোব দিয়ে হয়তো তিয়ার মগজ পরীক্ষা করবেন।

     ঝুলকালো আকাশটা দেখতে দেখতে তিয়ার মনটা কেমন করে, ছবিতে দেখা নীলকান্তমণির মতো নীল আকাশটা মনে পড়ে। সত্যি ঐরকম ছিল আকাশটা? কেন আবার ঐরকম হয় না? মানুষ অত হিতাহিত জ্ঞানশূন্য কেন ছিল? কেন তারা ভবিষ্যতের কথা ভাবল না? কেন পরিবেশ এরকম ভাবে দূষিত করে দিল?

     আকাশের ঐ মেঘ থেকে মাঝে মাঝে যে বৃষ্টি নামে, তাতে অ্যাসিড। সেই বিষে সব গাছ মরে গেছে। সামান্য যে ক’টা নাছোড়বান্দা চারা এখনো গজিয়ে ওঠে দুই বৃষ্টির মাঝে, সব কুঁকড়ে পুড়ে শেষ হয়ে যায় ঐ অভিশাপের মতো বৃষ্টিতে। আবার কবে শুদ্ধ জলের বৃষ্টি নামবে? কবে এই এখনকার ঐ অভিশাপের মতো নষ্ট-মেঘ শেষ হয়ে নীল টলটলে আকাশটা আবার মুখ দেখাবে?

     একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তিয়ার। ওর এইসব কবি-কবি ভাবনার কোন অর্থই অন্য কারুর কাছে নেই।

     তিয়ার দিদি তিষা ওর থেকে চার বছরের বড়ো। কিন্তু তিষা তিয়ার এইসব কথায় হাসে। আগে যখন তিয়া আরো ছোটো ছিল, তখন দিদিকে এসব কথাগুলো বলতো, কিন্তু শুনে দিদির সে কি হাসি! যেন দারুণ মজার কথা শুনেছে। মাকে ডেকে নিয়ে এলো শোনানোর জন্য। কী অদ্ভুত! যা কিনা দু:খের, তাই হয়ে গেল হাসির!

     মা ও কথাগুলোর গুরুত্ব দেয় নি সেদিন। বরং বলেছিল, “তিয়া, পৃথিবীর কথা ভাবতে হবে না। নিজের কথা ভাবো। কই, হোম-ওয়ার্কগুলো হয়েছে?”

     তিয়া তারপর থেকে আর কোনোদিন এইসব কথা কাউকে বলে নি। বরং, ওদের সামনে বেশ সিরিয়াস হয়ে নিজের পড়াশুনোর কথা বলেছে, দুই বোনের পরীক্ষা হয়ে গেলে কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে, চাঁদে না অ্যাস্টরয়েড বেল্টে-এই নিয়ে মতামত দিয়েছে। ওকে ইনডোর-স্কি শেখার স্কুলে কবে ভরতি করবেন মা, সে কথা সিরিয়াস হয়ে জানতে চেয়েছে।

     তিয়ার বাবা একজন বৈজ্ঞানিক। তিনি বছরের বেশীরভাগ সময়েই পৃথিবীর আর পৃথিবীর বাইরের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে। তিয়া শুনেছে যে ওঁরা পৃথিবীর পরিবেশ আবার কি করে সেই অনেককাল আগের মতো বিশুদ্ধ করা যায়, সেই নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন।

     তিয়া একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কতদিন লাগবে আবার আগের মতো হতে?

     তিয়ার তখন সাত বছর। বাবা ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, “অনেক অনেক বছর লাগবে। এই দূষিত মেঘ ভেঙে পুরোটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার মতো হতেই হয়তো পেরিয়ে যাবে বছর পঞ্চাশ। তারপরে নীল আকাশ, রোদ, সূর্য। তারও পরে গাছপালা, বনজঙ্গল।”

     “বাবা, আমাকে নেবে, তোমাদের কাজে?”

     বাবা হেসেছিলেন। বলেছিলেন “বড়ো হও। মন দিয়ে পড়াশোনা করে যদি বৈজ্ঞানিক হতে পারো, তখনো যদি এই কাজ করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে নিশ্চয় যাবে এই কাজে।”

     তিয়া ওর বাবার গালে গাল ঠেকিয়ে বলেছিল, “তুমি খুব ভালো, জানো বাবা? তুমি ভীষণ ভালো। আমি নিশ্চয় মন দিয়ে পড়বো। আর ইচ্ছে আমার থাকবেই।”

     আজও সেইদিনের কথাগুলো একদম গতকাল শোনার মতো করে মনে মনে আছে তিয়ার। আসলে বাবা ওর খুব মনের মতন। বাবাকে কাছে পায় খুব কম। কত বছর পর পর বাবা ছুটিতে আসেন! সারাক্ষণ কাজ কাজ আর কাজ।

     তবু এই কাজের কথা ভেবেই ওর ভালো লাগে। মনে হয়, দূরে কোথাও কোন গবেষণাগারে একজন মানুষ মন দিয়ে হিসেব নিকেশ করে বার করছে কেমন করে পৃথিবীকে আবার আগের মতো নিষ্কলুষ করা যায়।

     সূর্য-হীন পুব আকাশের ঝুল মেঘের দিকে চেয়ে অল্প মাথা ঝোঁকালো তিয়া। ঐ মেঘরাশির ঐপারে কোথাও আছে রূপময় সূর্য -উজ্জ্বল সোনালি তার রঙ, তীক্ষ্ণ অথচ কোমল তার তেজ। তার কথা ভেবেই উদ্দেশ্যে প্রণাম জানায় তিয়া, রোজ। নাহয়, নাই বা দেখা গেল।

     স্পেসে গিয়ে সূর্য দেখেছে তিয়া, কালো অন্ধকার স্পেসে জ্বলজ্বলে একটা সাদাটে আলো। স্পেসশিপগুলো এখন লম্বাটে হয় না, বেশ গোল ধরনের হয়। অনেকটা যেন বেড় পরানো বিরাট একটা কমলালেবু। ঐ বেড়ের জায়গা জুড়ে থাকে সারে সারে স্বচ্ছ আবরনী দেওয়া জানালা। ঐ জানালাগুলোর সামনে সীট পাতা, তাতে বসে বসে বা শুয়ে শুয়ে মহাকাশ দেখেছে তিয়া অনেকবার।

     প্রত্যেকবার স্কুলের পরীক্ষা হয়ে গেলেই মা ওদের দুই বোনকে নিয়ে যান বেড়াতে। দিদির স্পেসই খুব পছন্দের আর মায়েরও। তাই প্রায় প্রত্যেকবারই স্পেসেই যাওয়া হয়। কিন্তু ঐ সূর্য নয়, পৃথিবীর নীল আকাশে যে অপরূপ সূর্যোদয় হতো, সেটা দেখতে চায় তিয়া।

     একবার এক ছুটিতে ওরা গেছিল একটা সংরক্ষিত অরণ্য দেখতে। খোলা বন নয়। একটা পাহাড়ের ঢালে শক্ত পদার্থের বিরাট অর্ধগোলাকার আবরণে ঢাকা বন। ঐ আবরণের ছাদের তলায় দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো আলো জ্বালানো সেই বন দেখতে অদ্ভুত লেগেছিল তিয়ার। ঐসব আলোগুলো নাকি নিউক্লিয় শক্তিতে জ্বালানো। বারো ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখা হয়, বারো ঘণ্টা বন্ধ। এটা গাছেদের সালোকসংশ্লেষের জন্য।

     কৃত্রিম জলাশয় ছিল সেখানে, ছিল সরু সরু কৃত্রিম নদীও। ঐ বন দেখে একটুও ভালো লাগেনি তিয়ার। দমচাপা বিচ্ছিরি। তিয়ার কল্পনায় ছিল আশ্চর্য সুন্দর সপ্রাণ এক বন। সেখানে কত পাখি কিচির মিচির করে ডাকছে! দৌড়ে দৌড়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে লেজ ফোলানো কাঠবেড়ালীরা। কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে দেখছে খরগোশ। হরিণের দল ছুটে যাচ্ছে, তাদের আঁকা বাঁকা শিঙের কত বাহার!

     আর সেখানে এসব কী? কিচ্ছু নেই। শুধু নিস্তব্ধ একটা বন। সেখানে এতটুকু হাওয়া অবধি বয় না যা গাছের পাতাগুলোকে কাঁপাবে!

     তিয়াকে মা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে ওরকম সুন্দর বন আর এখন নেই। যেসব প্রাণীদের বাঁচানো গিয়েছে তারা থাকে বন্যপ্রাণী-আবাসনে।

     তাছাড়া তিয়াকে আরো বলেছিলেন মা, “এখন তো আমাদের সব খাবার দাবার-চাল ডাল তরি তরকারি সব চাষ হয় হার্ভেস্টিং কমপ্লেক্সের ভিতরে। আগে তো তা হতো না! কয়েকশো বছর আগে যখন খোলা বন ছিল, পশুপাখি বেঁচে ছিল তখন মানুষ খোলা মাঠে চাষবাস করতো। তখন কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে হতো না, সূর্যের আলোতে গাছেরা সালোকসংশ্লেষ করতো। তখন বিশুদ্ধ জলের বৃষ্টি হতো, তাতে গাছেরা সতেজ আর আরো বেশী সবুজ হয়ে উঠত।”

*****

ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে এলো তিয়া। স্কুলের জন্য তৈরি হতে হবে। যে উড়নযানে করে ওরা দু বোনে স্কুলে যায় তার ড্রাইভার একটি রোবট। নাম তার তুরাব। ফ্লাইং-গাড়ীটার কাছে ওরা এলেই তুরাব চালকের আসন থেকে নেমে দরজা খুলে ধরে দাঁড়ায় অল্প মাথা ঝুঁকিয়ে। 

     তিয়া আর তিষা “সুপ্রভাত, তুরাব” বললেই তুরাব বলে, “সুপ্রভাত,মাদমোয়াজেল।” ঐরকমই নাকি ওর প্রোগ্রামিং করা। ও নাকি তৈরি হয়েছে ফরাসী দেশে।

     মাঝে মাঝে তিয়া অবাক হয়ে ভাবে ওর একটা নাম থাকার কী দরকার ছিল? শুধু একটা যন্ত্র, কেবল এই ফ্লাইং গাড়ীটা চালায় আর এটা দেখভাল করে, নতুন এনার্জি-বক্সের দরকার থাকলে জানায়, নিজের এনার্জি-বক্সের শক্তি ফুরিয়ে গেলে রিচার্জ সেন্টারে যায়-আর বাকি সময়টা শুধু চুপ করে গাড়ীর মধ্যে বসে থাকে – ওর একটা নামের কি দরকার ছিল? কি জানি বোধহয় ওর কোম্পানি থেকেই নামটা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফরাসী কোম্পানি এরকম অদ্ভুত নাম কেন দেবে?

     তুরাব এমনিতে কোন কথা বলে না। হয়তো ওর প্রোগ্রামিংএ এর বেশী শব্দ দেওয়া নেই। অনেকদিন পর্যন্ত তাই ধারনা ছিল তিয়ার। কিন্তু একদিন সে জানতে পেরেছিল যে তুরাব আরো কথা বলতে পারে। এমনকি ওর মধ্যে সুখ-দু:খ আন্দোলিত একটি মন পর্যন্ত আছে!

     কিন্তু সে ঘটনা পরে। আগে তিয়ার সঙ্গে তিয়ার ক্লাসে গিয়ে আমরা দেখি সেখানে ওরা কেমন করে লেখাপড়া করে।

     ওদের স্কুল একটা বিরাট উঁচু বাড়ীর একেবারে সর্বোচ্চ তলায়। পুরো বাড়ীটাই একটা বিরাট আবরণের ভিতরে। আবরণটা আবার ফুলারিনের গঠনের। মানে অনেক ষড়ভুজ আর পঞ্চভুজ জুড়ে জুড়ে তৈরি হয়েছে সেই মজবুত আবরণ। কিন্তু সেগুলো স্বচ্ছ নয়। সেগুলোতে অনেককিছু display করে দেখানো হয়।

     তিয়ার ক্লাসের উপরে যে বিরাট পঞ্চভুজটা, তাতে আজ দেখানো হচ্ছিল আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র। এমনিতে তো আর তাদের দেখা যায় না কয়েকশো বছর। কিন্তু এতে কী সুন্দর দেখাচ্ছিল!

     তাদের দিদিমণি লাল লেসার পয়েন্টার ব্যবহার করে খুব সুন্দর করে সব বোঝাচ্ছিলেন। তিয়ার সবচেয়ে ভালো লাগে সপ্তর্ষিমণ্ডল। সাতটা ঝকঝকে তারা আকাশে কেমন জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে জেগে ওঠে, অদ্ভুত সুন্দর! আর ভালো লাগে কালপুরুষ। ঝলমলে তিনটে তারা দিয়ে তৈরি তার কোমরের বেল্ট আর তা থেকে ঝোলে তরবারি। সেখানে লেসারের ঝলমলে লাল তীরটা এসে পড়তেই দৃশ্যপট বদলে যায়।

     এবারে দেখানো হচ্ছে নীহারিকা। কালপুরুষের তরবারির কাছে আছে একটি নীহারিকা আর কোমরের বেল্টের কাছে আছে আরেকটি নীহারিকা। দিদিমণি সে দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে display করে লেসারের তীর-চিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তাদের অন্তর্নিহিত পার্থক্য। তিয়ার ভালো লাগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্লাস।

     দেখানো শেষ হয়ে গেলে সিলিঙের আলো মিলিয়ে গিয়ে ঘরের আলো জ্বলে উঠলো। এই আলো কোমল, সুন্দর। দিনের আলোর অনুভূতি দেয় নাকি এই আলো। তিয়া ভাবে, কি জানি, কেমন ছিল দিনের আলো।

     এবার দিদিমণি প্রশ্ন করছেন তিয়াদের। ওরাও প্রশ্ন করতে পারে, কিছু যদি না বুঝতে পারে। তাহলে দিদিমণি আবার ভালো করে বুঝিয়ে দেন।

     পরের ক্লাস সৌরমণ্ডলের ভূগোল। প্রথমে পৃথিবীর-ভূপ্রাকৃতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূগোল। পরে অন্য উপনিবেশগুলো যেমন চাঁদ, মঙ্গল, বৃহস্পতির বড়ো উপগ্রহগুলো–গ্যানিমিড, ইউরোপা, আইও আর ক্যালিস্টো, শনির উপগ্রহ টাইটান, ইউরেনাসের ওবেরন, এরিয়েল, টিটানিয়া, মিরান্দা – এইসব নিয়ে বলছেন দিদিমণি। এইসব উপনিবেশগুলোতে এখন মানুষ থাকে যদিও সংখ্যায় তারা মুষ্টিমেয়। আর পৃথিবীর জনসংখ্যাই তো মাত্র চার মিলিয়ন মানে চল্লিশ লক্ষ এখন।

     তিনশো বছর আগের সেই ভয়ানক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে তখনকার পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল সাতশো কোটি। বিপর্যয়ের পরে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র এক মিলিয়নে মানে দশ লক্ষে।

     এইসব মানুষেরা আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিল মাটির নীচের মজবুত কুঠুরিগুলোতে। এইগুলো তৈরি করা হয়েছিল বিধ্বংসী পরমাণু বোমা বা অ্যান্টিম্যাটার বোমার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

     কিন্তু সেসব বিপদ হয় নি, হল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বছরের পর বছর খরা চলল সারা পৃথিবীতে, গরম প্রচণ্ড বেড়ে গেল। তারপরে দেখা দিল ধূসর কালো মেঘ। সেই মেঘ থেকে নামলো কালান্তক অ্যাসিড-বর্ষণ।

     সমস্ত গাছপালা নষ্ট হয়ে গেল। বনের পর বন জ্বলে গেল। সমস্ত শস্যক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেল। নদীর জল অম্ল-তিক্ত হয়ে গেল। মাছেরা ও অন্যান্য জলচর জীবেরা মরে গেল।

     রক্ষা পাওয়া মানুষেরা নিজেদের জন্য ফার্ম তৈরি করলো আবরণের ভিতরে। এখানে গাছপালারা কৃত্রিম আলোয় সালোকসংশ্লেষ করে। সেই আলো জ্বলে নিউক্লিয় শক্তিতে। এখানে বৃষ্টি কৃত্রিম। জল ক্রমাগত রিসাইকল করা হয়।

     বাইরের নদীর জল সরাসরি আনা যায় না, তা অম্লে বিষাক্ত। সেই জলকে বেশ অনেকবার করে নানা শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে তবে সেই জল ব্যবহার করা চলে। মাংসের জন্য যেসব পশু ও পাখী পালন করা হতো তাদেরও রাখা হয়েছিল ইনডোর ফার্মে। কিন্তু বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করা যায় নি। লক্ষ লক্ষ প্রজাতির পশুপাখি লোপ পেয়েছে।

     বহু বছর ধরে জনসংখ্যা প্রায় একই জায়গায় থমকে ছিল। কমে যাবারই বরং আশংকা ছিল। তারপরে এই গত পঞ্চাশ বছর ধরে জনসংখ্যা বেড়েছে কিছুটা। এখন পৃথিবীতে এটা চল্লিশ লক্ষে দাঁড়িয়েছে।

     বিপর্যয়ের আগেই চাঁদে মঙ্গলে ও অন্যান্য বাসোপযোগী উপগ্রহে মানুষের উপনিবেশ ছিল। কিন্তু পৃথিবীতে অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের পর সেগুলিরও আর তেমন সম্প্রসারণ হয় নি, কারণ সেগুলো ছিল বহুলাংশেই পৃথিবীর প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ-নির্ভর।

     শুনতে শুনতে আর দেখতে দেখতে তিয়ার মনটা অতীতে হারিয়ে গেছিল। দিদিমণি চাঁদের উপনিবেশ কেপলারে লেসার তীর তাক করে বলছেন, ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার, তিয়া পাশে তাকিয়ে দেখল বন্ধুদের মধ্যে অনেকে ঘুমোচ্ছে।

     এই ক্লাসটা অনেকের কাছেই বেশ বোরিং। অনেকে এই ক্লাসটায় বেশ এক ঘুম দিয়ে নেয়। পরে বাড়ীতে পড়ে ম্যানেজ করে নেবে।

     আসলে এই কিশোর বয়সে মানুষ খুব বর্তমানে আর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে বাঁচতে চায়, তাই বোধহয় সেই দূর অতীতের ঘটনা আর দূর গ্রহ উপগ্রহের ডিটেলস এই কিশোর-কিশোরীদের তেমন আকর্ষণ করে না।

     পরের ক্লাসটা বেশ এনজয়েবল। প্রচুর মুভি দেখানো হয়। আসলে এই ক্লাসটা মুভি তৈরি কিভাবে হয় সেই কৌশল শেখার। স্পেশাল-এফেক্টগুলো দেখার সময় সব ছেলেমেয়েরা একেবারে উৎসাহে টগবগ করতে থাকে। কেমন সেগুলো করা হয় সেটাও সকলের কাছে দারুণ একটা আনন্দের শিক্ষা।

     তিয়ার বেশ মজা লাগে ভাবলেই যে কী দ্রুতই না এই পরিবর্তন, মাত্র কয়েক মিনিট আগেই প্রায় সবাই ঘুমে ঢুলে পড়ছিল। আর এখন এই অন্ধকারেও সবাই বড়ো বড়ো চোখ করে চেয়ে আছে। এবারের ইন্সট্রাক্টর একজন তরুণ, তার এক একটা জিনিস বোঝানো শেষ হতে না হতে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে এমন প্রশ্নের ঝড় যে ভদ্রলোক উত্তর দিতে দিতে জেরবার! কিন্তু খুবই ধৈর্যশীল এই তরুণ, একেবারে রেগে যান না। বরং খুব চমৎকার করে বুঝিয়ে বুঝিয়ে উত্তর দেন।

     ক্লাস শেষ হলে এবার সবাই দল বেঁধে চলেছে ল্যাবে। সেখানে হাতে কলমে কাজ। আজকের ল্যাব ক্লাসে তিয়ারা শিখবে কি করে লেজার দিয়ে ক্রিস্টালের গঠন পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারপরে শিখবে কেমন করে ইউ ভি লাইট পড়লে এক বিশেষ জাতের অণু ঘুরে যায়।

     করিডরে দেখা হল ভিকির সঙ্গে। ভিকি তিয়ার থেকে মাস ছয়েকের বড়ো। একই ক্লাসে পড়ে। যদিও সেকশন আলাদা। ভিকির মুখ কেন কে জানে প্রায় সবসময় খুব বিষণ্ণ। ওকে খুব কম হাসতে দেখেছে তিয়া।

     ভিকিরা তিয়াদের প্রতিবেশী বলা যায়, ওরা থাকে তিয়াদের থেকে বেশ কয়েক ব্লক দূরে। ভিকি, ভিকির ছোটো ভাই রোশন আর ওর মা-বাবা। ওদের সঙ্গে ভালোই পরিচয় আছে তিয়াদের। দুই-একমাস পর পর হয় তিয়ারা যায় ভিকিদের ফ্ল্যাটে বেড়াতে নয়তো ভিকিরা সবাই আসে তিয়াদের ফ্ল্যাটে। তিয়ার তো ভিকিদের বেশ সুখী পরিবার বলেই মনে হয়। কিন্তু ছেলেটার মুখ এমন গোমড়া কেন সর্বদা?

     তিয়া ভিকির দিকে এগিয়ে গিয়ে একটু হেসে বলল, “কিরে ভিকি, কেমন আছিস?”

     ভিকি অন্যমনস্ক ছিল, চমকে মুখ তুলে বলল, “আরে, তিয়া! তুই কেমন? আমি তো ভালোই আছি।”

     তিয়া হেসে ফেললো এবার, “ভালো তো মুখটা এমন তুম্বো কেন তোর?”

     ভিকি বিষণ্ণ একটা হাসি হেসে বলল, “আমার এরকমই। তোর ক্লাস কেমন হল?”

     “ভালো। আচ্ছা ভিকি, তোকে কি কেউ বকেছে নাকি রে?”

     “না, নাহ। এখন তো বকাঝকা বেআইনি রে।”

     “বেআইনি তা জানি। কিন্তু ঘরের ভিতরে কে কী করছে তা তো আর কেউ দেখতে যায় না সবসময়! আমার কী মনে হয় জানিস? তোর মা বাবা তোকে খুব মারেন আর ভীষণ বকেন।”

     “কী সব বলছিস? না না, মিথ্যে কেন বলবো বল? ওরা সাদাসিধে ভালোমানুষ, কিছু করেন না আমায়। এমনিই আমার ভালো লাগে না। আমি ওদের সঙ্গে বেশী কথাও বলি না।”

     “কিন্তু তোর কেন ভালো লাগে না রে? কী হয়েছে তোর?” তিয়ার গলায় সত্যি সত্যি সমবেদনার সুর।

     ভিকি অন্যদিকে তাকিয়ে উদাস সুরে বলে, “তেমন কিছু না। কেন জানি রাত্তিরে আমি উদ্ভট উদ্ভট স্বপ্ন দেখি। একদম অচেনা সব স্বপ্ন। অচেনা সব মানুষেরা, অচেনা সবকিছু। ওদের ভাষা এত আলাদা, তবু কেন যেন আমার মনে হয় ওরা যা বলছে, তা আমি যেন অল্প অল্প বুঝতে পারি। ঘুম ভেঙে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।”

     তিয়া কৌতূহলী হয়ে বলে, “কতদিন থেকে এরকম হচ্ছে তোর?”

     “খুব ছোটোবেলা থেকে। আমার মনেও নেই কবে প্রথম ওদের দেখা শুরু করেছিলাম। তুই কাউকে বলিস না কিন্তু তিয়া। তাহলে আমাকে মানসিক রোগের ডাক্তারদের কাছে নিয়ে যাবে মা- বাবা। বলবি না তো?”

     তিয়া হাসে, প্রতিশ্রুতি দেয়, “না, কারুক্কে বলবো না।”

     ওর নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়ানোর কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছিলো, মনে পড়ছিল সেই সময়ের ভাবনাগুলোর কথা। সেকথাও তো ও কাউকে বলতে পারে না।

     তিয়া ভিকিকে বলে, “ঠিক আছে, এটা আমাদের সিক্রেট। আমারও এরকম একটা সিক্রেট আছে। কিন্তু তার জন্য তো আমি মুখ গোমড়া করে থাকি না!”

     ভিকির চোখে এই প্রথম কৌতূহলের একটা ঝিলিক জ্বলে ওঠে। ও জিজ্ঞাসা করে, “কী সিক্রেট রে তিয়া? তুইও স্বপ্ন দেখিস? কিরকম স্বপ্ন? পাহাড়, বন, ঝর্ণা, নদীর স্বপ্ন? ময়ূরের স্বপ্ন? খুব সুন্দর দেখতে একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ের স্বপ্ন? লাল, নীল, বেগুনী ফুলের স্বপ্ন? আমার মতন?” স্বভাবত মুখচোরা ভিকি আজকে যেন প্রগলভ হয়ে গেছে।

     তিয়া দূরের দিকে তাকিয়ে বলে, “তা একরকম স্বপ্নই বলতে পারিস। তবে রাতে ঘুমিয়ে নয়, জেগে জেগে। সক্কালে উঠে পুবের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, ভিকি।” বলতে বলতে তিয়ার মুখে একটা বিষাদের ছায়া ভেসে আসে।

     ভিকি কী বুঝল কে জানে, তাকিয়ে রইলো তিয়ার মুখের দিকে। তারপরে খুব নরম গলায় বলল, “তিয়া, তোর বাবা কবে আসবেন রে?”

     তিয়া দূরের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে ভিকির মুখের উপরে রাখে, ম্লান গলায় বলে, “বাবা এবছর আসতে পারবেন না। খুব নাকি ব্যস্ত।”

     ভিকি তিয়ার দিকে এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে বলে, “তাই তোর মনখারাপ, তিয়া?”

     তিয়া হেসে আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “বা রে বেশ মজা তো! মনখারাপ বুঝি আমার আর তুম্বো মুখ করে ঘুরছিস তুই? না রে, বাবার জন্য মন কেমন করলেও আমি জানি বাবা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। আমার স্বপ্নটাকেই তো বাস্তব করবেন ওরা। এর জন্য দু’তিন বছর বাড়ীতে না আসতে পারা তো কিছুই নয়।”

     তারপরে কী মনে পড়েছে এইরকম ভাবে ভিকিকে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলো, “তুই তোর স্বপ্নের কথা কী বলছিলি যেন? ময়ূর, লালনীলবেগুনী ফুল আর খুব সুন্দর দেখতে একদল বাচ্চা ছেলেমেয়ে— এসব নাকি দেখিস স্বপ্নে?”

     ভিকি আস্তে করে বলে, “হ্যাঁ, তাই তো দেখি প্রায়ই। স্বপ্নে দেখি একটা সবুজ বাগান, কত রঙবাহারী ফুল গাছে গাছে! কত ময়ূর ঘুরে বেড়ায়! একদল সুন্দর বাচ্চা ছেলেমেয়ে ওই বাগানে খেলা করে। স্বপ্নের মধ্যে আমিও ওদের সঙ্গে খেলি।”

     তিয়া দুষ্টুমী ভরা মুখ করে বলে, “তুই স্বপ্নের মধ্যে ভবিষ্যৎ দেখতে পাস, তা জানিস? ঐ সব বাচ্চারা সব তোর ছেলেমেয়ে।”

     ভিকির মুখ আর কান লাল হয়ে গেল, কিন্তু তারপরেই অবিকল তিয়ার দুষ্টুমীভরা মুখের মতন মুখ করে বলল, “হ্যাঁ, তোর আর আমার।” বলেই দৌড় দিল নিজের ক্লাসের দিকে।

     তিয়া হাসতে হাসতে নিজের ল্যাবের দিকে চলল। সত্যিই ছেলেটা এইসব স্বপ্ন দ্যাখে নাকি?

     স্কুলের শেষে দিদির সঙ্গে উড়নযানে করে বাড়ী ফেরে তিয়া। উড়িয়ে নিয়ে আসে নীরব তুরাব। দিদি এরপর একটু বিশ্রাম নিয়েই যাবে ব্যালে ক্লাসে। তিয়া ব্যালে শেখে না, ওর ইয়োগা ক্লাস পরদিন। আজ বাড়ীতেই একটুখানি যোগ প্র্যাকটিস করবে। মায়ের অফিস থেকে ফিরতে এখনো ঢের দেরি।

     তিষাকে কিন্তু এবারে তুরাব গাড়ী চালিয়ে নিয়ে যায় না। তিষার বয়ফ্রেন্ড চিনুক বলে একটি ছেলে এসে ওকে নিজের গাড়ীতে চড়িয়ে নিয়ে যায়। বাড়ী এসেই চিনুককে ফোন করেছিল তিষা। চিনুক ওর সঙ্গেই ব্যালে শেখে।

     একা বাড়ীতে বেশ অনেকক্ষণ যোগাসন অভ্যাস করে তিয়া উঠলো। সমস্ত নীরব, এত নীরব বলেই বোধহয় হাল্কা কান্নার স্বর ওর কানে গেল। কে কাঁদছে, কোথায়?

     উড়নযানটার দিক থেকে আসছে শব্দটা। ও সেদিকে এগোল আস্তে আস্তে, তারপরে ভীষণ অবাক হয়ে গেল।

     তুরাব কাঁদছে! না, চোখে জল নেই, জল কোথা থেকে আসবে ধাতুর রোবটের চোখে? কিন্তু ওর মুখটা নীচের দিকে ঝোঁকানো, শরীরটা কাঁপছে। অল্প একটা গোঙানির মতন আওয়াজ হচ্ছে।

     তিয়া গিয়ে আলতো হাত রাখে তুরাবের কাঁধে। বলে, “কী হয়েছে, তুরাব?”

     তুরাব চমকে মুখ তোলে, নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে বলে, “কিছু না।”

     তিয়া খুব নরম গলায় বলে, “নিশ্চয় কিছু হয়েছে। আমাকে বলতে চাও না, তাই না?”

     তুরাব মুখ তুলে তিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকে একটুক্ষণ। তারপরে একবার নিজের কপালে হাতটা ঘষে, একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে, “আজকে আমার খুব ফারহানার কথা মনে পড়ছে। আজ তার জন্মদিন কিনা, তাই বোধহয় এত করে মনে পড়ছে।”

     তিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে “ফারহানা কে?”

     তুরাব বলে, “সে ছিল ভারী মিষ্টি একটা ছোট্ট মেয়ে। ওকে গাড়ী করে ওর ইস্কুলে নিয়ে যেতাম আমি।” 

     “তারপরে?”

     “তারপরে একদিন অসুখ করলো ওর। আর ইস্কুলে বেশী যেতে পারতো না। শেষে খুব অসুখ বাড়ল, খুব শ্বাসকষ্ট হল ওর। ওর মা-বাবা ওকে নিয়ে হসপিটালে গেলেন। তারপরে কী হল আর জানি না। আর আমাদের দেখা হয় নি। ওর বাবা আমাকে কোম্পানিতে ফিরিয়ে দিয়ে এলেন। পরে তোমার মা-বাবা গিয়ে আমায় কিনে আনলেন।”

     তিয়া তুরাবের কাঁধে আবার হাত রেখে বলে, “তুমি ফারহানাকে খুব ভালবাসতে, তাই না তুরাব?”

     তুরাব একটু অবাক গলায় বলে, “ভালোবাসা? সে কাকে বলে? কোন উন্নত প্রোগ্রামিং বুঝি?”

     তিয়া হাসে, বলে, “না, সে কোন প্রোগ্রামিং নয়। মানে মানুষের বানানো কোন প্রোগ্রামিং নয়। কিন্তু হয়তো ঈশ্বরের প্রোগ্রামিং।”

     তুরাব এতখানি চোখ করে বলে, “ঈশ্বর, সে কে?”

     তিয়া হাসে, “ঈশ্বর কে সে কি আমিও জানি নাকি? সবাই বলেন, বড়ো বড়ো সব লোকেরাও বলেন যে এই জগতের সব কিছু যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই হলেন ঈশ্বর। এই পৃথিবী, ওই আকাশ, ওই মেঘগুলো, মেঘের পিছনে লুকিয়ে থাকা সব তারা, গ্রহ, গ্যালাক্সি-সব কিছু। একদিন তিনিই আবার এই সব কিছু ধ্বংস করে দেবেন।”

     “ধ্বংস করে দেবেন? কেন?”

     “কেন তা কেউ জানে না। ধ্বংস করে দেবেন কিনা তাও ঠিকমতন জানে না কেউ। আসলে হয়তো মানুষেরই ভাবনা সব।”

     “তিনি কি ফারহানাকেও সৃষ্টি করেছিলেন? তারপরে আবার ছোটোতেই তাঁকে ধ্বংস করে দিলেন?”

     “তুরাব, তুরাব, তুমি তো জানো না যে শেষ অবধি ফারাহানার কী হয়েছিল। হয়তো সে আজও আছে, ভালোই আছে, হয়তো তোমাদের আবার কোনোদিন দেখা হবে।”

     তুরাব চেয়ে থাকে তিয়ার মুখের দিকে, তারপরে বলে, “তুমি খুব ভালো, তুমি বড়ো ভালো। তোমার ভালো হবে।”

     তিয়া হেসে বলে, “তুরাব, তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না ভালোবাসা কাকে বলে? এই যে তোমার কতকাল ধরে না দেখা ফারহানার জন্য মন কেমন করছে, একেই মানুষে বলে ভালোবাসা। এই যে যেমন আমার ও তো বাবার জন্য খুব মন কেমন করছে, বাবাকে তো ভালোবাসি, তাই। আচ্ছা, কতদিন আগের কথা বলছিলে তুমি তুরাব যখন ফারহানার কথা বলছিলে?”

     তুরাবের চোখের দৃষ্টি সুদূরে চলে যায়। মনে করার চেষ্টা করতে করতে বলে, “কি জানি সে কতদিন আগের কথা। ফারহানার বাবা আমাকে কোম্পানিতে ফিরিয়ে দেবার পরে বহুকাল আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। সময়ের হিসেব নেই আমার।”

     তিয়া বলে, “তুরাব, তোমার নামটা বুঝি ফারহানার দেওয়া?”

     তুরাব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তিয়ার দিকে। বলে, “হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কেমন করে জানলে?”

     তিয়া মুচকি হেসে বলে, “আমি ওরকম অনেক কিছু জানতে পারি। এই যে দেখো বললাম তোমাদের একদিন দেখা হবে। এখন বলছি আজকালের মধ্যেই বাবার ফোন আসবে। তুমি মনখারাপ কোরো না তুরাব, দ্যাখো তো আমিও তো কত বছর বাবাকে দেখি না, তাতে কি আমি এমন মনখারাপ করছি তোমার মতন?”

     তুরাবের চোখ দুটো আবার এতখানি হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বলে, “তুমি বলছ যে মন কেমন করা, মনখারাপ করা। মন কী গো?”

     “উরে বাবা, ভালোবাসা, ঈশ্বর, এখন আবার মন। এত প্রশ্ন করছ যে, আমি কি সবকিছুর উত্তর জানি? আর এসব খুব কঠিন প্রশ্ন, এগুলোর উত্তর প্রায় কেউই জানে না। আসলে এসবের সঠিক উত্তর বলে কিছু নেইও। একি অংক নাকি ইতিহাস নাকি ভূগোল, নাকি বিজ্ঞান যে উত্তর থাকবে একেবারে মাপা মাপা?”

     তুরাবের মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে যায় হঠাৎ। বলে, “রাগ করলে নাকি? আমি তো কিছু জানি না, তাই জিজ্ঞেস করছিলুম। আমাকে ক্ষমা করে দাও।”

     তুরাবের কাঁচুমাচু মুখের দিকে চেয়ে হেসে ফেলে তিয়া। বলে, “ওমা তোমার মুখ শুকিয়ে গেল এতেই?”

     তারপরে এসে তুরাবের কাঁধে মাথা রেখে বলে, “তুমি আর কখনো মন খারাপ করবে না, কেমন?”

     অভিভূত তুরাব কোনোক্রমে শুধু বলে, “না, আর মনখারাপ করবো না।”

     টেবিলে রাখা ছোট্ট আর ঝকঝকে ফোনটা ঝিকমিক করে জ্বলে ওঠে আর তারপরেই একটা মিঠে সুরের জলতরঙ্গ বাজনা ছড়িয়ে পড়ে ঘরের বাতাসে ।

     তিয়া তুরাবের ধাতব গালে একটা চুমো খেয়ে ছুটে চলে যায় টেবিলের দিকে। ফোন হাতে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে বাবার গলা।

     তিয়া আনন্দে একবার লাফিয়ে ওঠে, “হ্যালো বাবা, কেমন আছো তুমি?”

     “——— “

     “আমরা ভালো। দিদি এখন ব্যালে ক্লাসে। মা অফিসে। তুমি কি তোমার ল্যাব থেকে ফোন করছ?”

     “————–”

     “কী বললে? তোমাদের এক্সপেরিমেন্ট সফল? ১০০%? এবার তোমরা সত্যি সত্যি বাইরের ঐ মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে সব মেঘ ঝরিয়ে দিতে পারবে? আবার আকাশ দেখা যাবে? নীল রঙের আকাশ? ঐ অনেক আগের মতন? কতদিন লাগবে বাবা?”

     “ ——————”

     “না না উত্তেজিত হচ্ছি না। এই একটুখানি— কেমন একটু আনন্দে এরকম করে ফেলছি। তুমি তো জানোই আমি কিরকম।”

     “——————-”

     “তুমি কবে বাড়ী আসবে বাবা?”

     “——————–”

     “ও। ঠিক আছে। তাহলে তিন বছরের মধ্যেই তোমরা বৃষ্টি নামাতে পারবে? নোনতা জলের বৃষ্টি? তারপরে?”

     “——————–”

     “তারপরে সেই জল থিতিয়ে পরিষ্কার হবে? সবুজ গাছপালারা জন্মাবে? আবার দেখা যাবে সবুজ পৃথিবী?” তিয়ার গলা আনন্দে কাঁপছিল।

     আরো অনেকক্ষণ বাবার সঙ্গে কথা চলল তিয়ার। কথা শেষ হলে ফোন টেবিলে রেখে দিয়ে তিয়া নিজের ঘরে চলে গেল।

     এবার বিছানায় মুখ গুঁজে প্রাণভরে কাঁদবে তিয়া। অনেকক্ষণ। কতদিন সে বাবাকে দেখেনি, দেখবে না আরো কতদিন। তারপরে কোন সোনা রোদ্দুরের সকালে হয়তো একদিন সবুজ ঘাসের এক উপত্যকার মধ্যে বাবার সঙ্গে দেখা হবে।

     বড় হয়ে যাওয়া তিয়া কি তখনো এমন সজীব সবুজ থাকতে পারবে? এমন দুরন্ত বিস্ময়ে ভরা? এমন সুদূরের স্বপ্নে মগ্ন? বাবাও কি আর তখন এরকম যুবক থাকবেন? হয়তো প্রৌঢ় হয়ে যাবেন। হয়তো এই উৎসাহ আর থাকবে না তখন কথায়।

     তুরাব কিন্তু চলে যাওয়া তিয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। এইমাত্র মেয়েটা বলল ওর বাবার ফোন আসবে আজকালের মধ্যে আর এক্ষুণি এসে গেল?

     সত্যি কি মেয়েটা সেইরকম অদ্ভুত ক্ষমতা ধরে নাকি যা বলে তাই হয়ে যায়? তাহলে কি ফারহানার সঙ্গে সত্যি দেখা হবে একদিন?

     সেই মিষ্টি নরম একরত্তি মেয়েটা এসে আবার হাত বাড়িয়ে মিষ্টি দিতে দিতে বলবে, “আমার আজকে দম্মদিন তো তাই তোমায় মিত্তি দিলাম। ভায়ো, খাও,ভায়ো।” ও তখন এত ছোটো ছিল যে জানতো না তুরাবকে মিষ্টি দিতে নেই। পরে বড়ো হয়ে আর দিতো না, ওর বাবা মা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ওকে।

     যা:, আবার সেইরকম ছোটো দেখবে কী করে ফারহানাকে? সে তো এতদিনে কত বড়ো হয়ে গেছে!

******

সেই রাত্রে তুরাব আর তিয়া দুজনেই দুটো স্বপ্ন দেখল।

     তুরাব দেখছিল একটা পাহাড়ের ঢালে সে দাঁড়িয়ে আছে আর দূর থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে ছোট্ট একটা মেয়ে। প্রথমে তুরাব মনে করেছিলো বুঝি ফারহানা, কিন্তু তারপরে দেখল তাকে অনেকটা তিয়ার মতন দেখতে, কিন্তু আরো মিষ্টি, আরো সুন্দর মুখটা আর তিয়ার থেকে অনেক ছোটো। তুরাব দু’হাত বাড়িয়ে ওকে কোলে তুলে নিলো।

     তিয়া দেখছিল একটা বিরাট উড়নযানে চড়ে সে, দিদি, মা, চিনুক, ভিকি, ভিকির মা-বাবা-ভাই-সবাই কোথায় চলেছে উড়ে। যানটা চালাচ্ছে হাসিমুখ তুরাব, সে আর ধাতব রোবট নেই, মানুষের মতন দেখতে হয়ে গেছে। 

     আকাশ ঝকঝকে নীল, দূরে অল্প অল্প হাল্কা সাদা মেঘ শুধু। উড়নযানটা এরকম সব ঢাকা দেওয়া নয়, উপরটা খোলা। হাওয়া এসে তিয়ার লম্বা চুলগুলোকে ওড়াচ্ছে, সে মাথা তুলে হাওয়ার স্পর্শ নিচ্ছে।

     নীচে দেখা যাচ্ছে ছবির মতন সুন্দর সবুজ, প্রাণময়ী পৃথিবী। দূরে একটা পাহাড়ে একটা সাদা রঙের বাড়ী,তার চারপাশ ঘিরে অপরূপ বাগান। সেখানে ঠিক ভিকির স্বপ্নের মতন ময়ূরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

     বাগানে দোলনায় কারা যেন দুলছে আর অনেকে দৌড়ে দৌড়ে খেলা করছে।

     তিয়া জানে ঐ বাড়ী থেকে বাবা বেরিয়ে এসে হাত নাড়বেন আর তুরাব ঐ বাগানে উড়নযানটা নামাবে।

     স্বপ্নের মধ্যেই একটুকরো হাসি ফুটে ওঠে তিয়ার মুখে। ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরে সে, বলে “আমি আসছি বাবা। এই দেখো আমরা সবাই আসছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *