সায়েন্স ফিকশন – সির্দ্ধাথ ঘোষের কলমে

সিদ্ধার্থ ঘোষ

অলংকরণ:সুদীপ দেব

শেষ পর্ব

বাংলা সায়েন্স ফিকশনের ঐতিহ্য

বিক্ষুব্ধ সমুদ্রকে শাসনের জন্য ভাগ্নে এইচ. বোসের (হেমেন্দ্রমোহন বসুর) তৈরি এক শিশি ‘কুন্তলীন’ তেল ঢেলে অদ্ভুত ফল পেয়েছিলেন জগদীশ্চন্দ্র বসু। একটি অনবদ্য এস.এফ কাহিনী। বাংলা ছোটগল্পের জন্য প্রতি বছর ‘কুন্তলীন’ পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বর্ষেই, ১৩০৩ সালে ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ গ্রন্থে ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ মুদ্রিত হয়। অবশ্য সে সময়ের লেখকের নামোল্লেখ করা হয় নি। ১৩২৮ – এ প্রকাশিত ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে সংকলিত করার পূর্বে জগদীশ্চন্দ্র লেখাটি মার্জনা করেন এবং নতুন নাম দেনঃ ‘পলাতক তুফান’।

     ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ শিরোনামের সঙ্গে সাব-টাইটেল যুক্ত করেছিলেন জগদীশ্চন্দ্রঃ ‘বৈজ্ঞানিক রহস্য’। সায়েন্স-এর সঙ্গে ফিকশন অথবা ফ্যান্টাসিকে যুক্ত করে জোড়কলম শব্দ দুটি ইংরেজিতে আবির্ভূব হওয়ার বহু পূর্বেই জগদীশ্চন্দ্র স্বাধীন ও সচেতনভাবে এই বাংলা পরিভাষা নির্মাণ করেছেন। সায়েন্স ফিকশনের বাংলা পরিভাষা কি হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প না কল্পবিজ্ঞানের গল্প অথবা এই দুই প্রতিশব্দের এক্তিয়ার সংক্রান্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি ঘটাতে পারে ‘বৈজ্ঞানিক রহস্য’। বাংলায় ‘রহস্য’ শব্দটি ইংরেজি ‘mystery’ -র নিছক প্রতিশব্দ নয়। mystery প্রধানত ‘গোপনীয়’ ও ‘দুর্জ্ঞেয়’ অর্থবাচক। কিন্তু ‘রহস্য’-র মধ্যে প্রয়োগসিদ্ধ  অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা রয়েছে পরিহাস, বিস্ময়জনক বিষয় ও রঙ্গরস ইত্যাদির। এমন কি ‘গূঢ় ভবিষ্যৎ বিষয়’ অর্থে রহস্যজাত ‘রইস’ শব্দকে ব্যাখ্যা করেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অভিধানে।

     প্রচলিত ধারণা অনুসারে জগদীশ্চন্দ্রের এই লেখাটি অবশ্য বাংলা ভাষার প্রথম এস.এফ নয়। ১২৮৯ বঙ্গাব্দে (১৮৮২-তে) ‘শ্রী যোগেন্দ্রনাথ সাধু কর্ত্তৃক জোড়াসাঁকো ৫নং দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলি হইতে প্রকাশিত’ ও ‘সচিত্র বিজ্ঞান দর্পণ’ পত্রিকায় দুই কিস্তিতে মুদ্রিত হেমলাল দত্ত রচিত ‘রহস্য’ গল্পটি শুধু প্রাচীনত্বেই নয়, বিষয়গৌরবে ও লিপিকুশলতায় একাধারে বাংলা এস.এফ-এর প্রথম ও প্রতিনিধিত্বমূলক নিদর্শন।২৪

     ‘একদা বিজ্ঞান আমাকে অজ্ঞান বাঙালি পাইয়া কিরূপ দুর্গতি করিয়াছিল তাহা বলিতেছি, শুনিয়া আপনাকে কাঁদিতে হইবে।’ – প্রথম পরিচ্ছেদে লন্ডন প্রবাসী নগেন্দ্রের এই উক্তি সত্ত্বেও এটি হাস্যরসাত্মক কাহিনী। শিল্পবিপ্লবের প্রাথমিক উন্মাদনা কমে আসার পর জীবনযাত্রার অতিযান্ত্রিকীকরণের উৎপাত নিয়ে হিথ রোবিনসনের উদ্ভট কলকব্জার বিচিত্র দৃশ্য জগতেরই যেন সাহিত্যিক প্রতিচ্ছবি এই গল্পটি। গ্যালভানিক ব্যাটারি ও বহু যন্ত্রকৌশল সমৃদ্ধ সাহেব বন্ধু হার্বি-র স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ভরপুর বাড়িতে এক দিনের অতিথি এই বঙ্গ-সন্তানের ভুল করে পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধাকে তার শয্যাসঙ্গী হিসাবে আমন্ত্রণ এবং বহু বিঘ্ন পার হয়ে অব্যাহতি লাভের এই সরস ও উপভোগ্য কাহিনীর মধ্যে নিহিত কটাক্ষ অসতর্ক পাঠকের পক্ষেও লক্ষ না ক’রে উপায় নেই।

     জগদীশচন্দ্রের পূর্বে জগদানন্দ রায়-ও এস.এফ. কাহিনী লিখেছিলেন। বাঙালি পাঠকের গ্রহান্তরে ভ্রমনের এবং বুদ্ধিমান ভিন্‌গ্রহীদের সাক্ষাৎ লাভের প্রথম সুযোগ। বাংলায় ‘পপুলার সায়েন্স’ গ্রন্থমালার প্রবর্তক, বিজ্ঞান-লেখক ও শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায় সম্ভবত এই একটিই এস.এফ. কাহিনী লিখেছেন। ‘শুক্র ভ্রমণ’ গল্পটি সংকলিত হয় ১৩২১-এ প্রকাশিত ‘প্রাকৃতিকী’ গ্রন্থে। কিন্তু লেখকের নিবেদন থেকে জানা যায়, এটি গ্রন্থ-প্রকাশের প্রায় বাইশ বছর পূর্বের রচনা, যখন তিনি সদ্য সাহিত্যচর্চা আরম্ভ করেছেন।

     প্রাথমিক সাফল্যের এই তিনটি উদাহরণের পর কিন্তু বাঙলা এস.এফ. রচনায় বেশ কয়েক বছরের ভাঁটা পড়ে। তার মধ্যে অবশ্য জুল ভার্ণকে বাঙালির দরবারে হাজির করেছেন রাজেন্দ্রলাল আচার্য। ১৯১৪-য় তিনি অনুবাদ করেন ‘আশি দিনে ভূ-প্রদক্ষিণ’। তারপর একাদিক্রমে ‘বেলুনে পাঁচ সপ্তাহ’ (প্রকাশকাল অজ্ঞাত), ১৯১৬-য় ‘পাতালে’ (জার্নি টু দা সেন্টার অফ দা আর্থ) এবং ১৯২৪-এ প্রকাশিত হয় ‘চন্দ্রলোকে যাত্রা’। শেষোক্ত গ্রন্থটির ভুমিকায় অনুবাদক লিখেছেনঃ ‘প্রায় দশ বৎসর পূর্ব্বে ফরাসী জুল ভার্নেকে আমি প্রথমে বাঙ্গালা পোষাকে বাঙ্গালীর ঘরে বরণ করিয়া আনিয়াছিলাম। তখন ভাবিয়াছিলাম যে, আরও সহকর্মী পাইব। ক্রমে ক্রমে জুল ভার্ণের তিনখানি পুস্তক বাঙলায় প্রকাশ করিলাম। ‘চন্দ্রলোকে যাত্রা’ চতুর্থ। আজিও সহকর্মী মিলে নাই……।’

     এইচ.জি.ওয়েলেস-কে কিন্তু প্রথম বাঙালী অনুবাদক সংগ্রহ করার জন্য ভার্নের চেয়ে আরো পঁয়ত্রিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৩৫৬-য় নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ওয়েলসের প্রথম গ্রন্থ – গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়। অনুবাদকের মধ্যে ছিলেন বিনয় ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ। গ্রন্থটির প্রকাশক অভ্যুদয় প্রকাশ-মন্দির থেকে অবশ্য পরবর্তী সাত আট বছরের মধ্যে নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুবাদে ওয়েলসের ‘ওয়ার অফ দা ওয়ার্ল্ডস’, ‘দা ফার্স্ট মেন ইন দা মুন’ ও ‘ফুড অফ দা গড্‌স’ ইত্যাদি আরও পাঁচটি গ্রন্থের ঈষৎ সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

     বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায়ের কোনো জুড়ি নেই। এস.এফ.-এর ক্ষেত্রেও তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলায় এস.এফ. জাতীয় রচনা সবাতন্ত্র স্বাতন্ত্র্য অর্জন করার পূর্বেই আর্থার কোনান ডয়েলের ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে এস.এফ. নিয়ে প্যারডি রচনায় – ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়ারী’। কোনান ডয়েলের বিজ্ঞানী প্রফেসার চ্যালেঞ্জার আর তাঁর দলবল পৃথিবীর এক উপান্তে ‘সত্যিকার’ সব প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের সাক্ষাৎ পেয়েছিল, আর প্রফেসার হেশোরাম আবিষ্কার করেছিলেন ‘কাল্পনিক’ প্রানীদের। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, শার্লক হোম্‌সের ক্রিয়াকাণ্ড অনুকরণে একটি ডিটেকটিভ গল্পের প্যারডিও রচনা করেছিলেন তিনি – যার নাম ‘ডিটেকটিভ’।

     বাংলায় প্রথম নিয়মিত এস.এফ. চর্চা শুরু করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। হেমেন্দ্রকুমার রায় তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও, তাঁর এস.এফ. রচনায় হাত দেওয়ার পূর্বেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পিঁপড়ে পুরাণ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩১-এ। তারও কয়েক বছর পূর্বে সেটি ‘রামধনু’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল।

     ‘সে অনেক কাল আগের কথা। তখন সবই ছিল আশ্চর্য রকমের। তখন ঠিক ভোরের বেলা সূর্য উঠতো; আর এমন মজা যে, ঠিক রাত হবার আগেই সূর্য অস্ত যেত।’ – ‘পিঁপড়ে পুরাণ’ শুরু হয় এইভাবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কোনো লেখক যেন কাহিনীটি পরিবেশন করছেন। পিঁপড়েদের আকার ও বুদ্ধি অতিরঞ্জিত হওয়ার পর এই সমাজবদ্ধ জীবদের মানবসমাজের প্রতি যুদ্ধ ঘোষণার বৃত্তান্ত ‘পিঁপড়ে পুরাণ’।

     রকেটে শুক্রগ্রহে পাড়ি দেবার কাহিনী ‘পৃথিবী ছাড়িয়ে’ (১৯৩৯), রোবট সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলার দুরভিসন্ধির ক্ষেত্র ‘ময়দানবের দ্বীপ’, সমুদ্রের অতলের বাসিন্দা বিচিত্র বুদ্ধিমান জীবদের দুই গোষ্ঠীর তথা সভ্যতার সংকট নিয়ে ‘পাতালে পাঁচ বছর’ বা মন্‌স্টার-কাহিনী ‘আকাশের আতঙ্ক’, ‘দুঃস্বপ্নের দ্বীপ’ বা ‘অবিশ্বাস্য’ ইত্যাদি বহু এস.এফ. রচনা করেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

     নিদ্রাটাকে যিনি চারুকলা হিসাবে চর্চা করেছেন, ভোজনরসিক, গোল-গাল টাকমাথা সেই মামাবাবু নির্ভেজাল বাঙালী। এ-হেন মামাবাবু প্রেমেন্দ্র মিত্রের এক হিরো। ‘কুহকের দেশে’, ‘ড্রাগনের নিশ্বাস’, ‘পাহাড়ের নাম করালী’ বা ‘অতলের গুপ্তধন’-এ আমরা সিরিজ-ক্যারেক্টার হিসাবে মামাবাবুর অভিযান কাহিনী পড়ি। পরবর্তী কালে মামাবাবুকে অবশ্য টেক্কা মারেন ঘনাদা। ত্রৈলোক্যনাথের ডম্বরুধরের মন্ত্রশিষ্য বীরদর্পী ঘনাদা। কিন্তু ঘনাদার গুলগল্পের বৈজ্ঞানিক তথ্য বা তত্ত্বগুলি তিনি নির্ভেজাল পেশ করেছেন।

     প্রথম থেকেই বাঙলা এস.এফ. কিশোরোপযোগী অ্যাডভেঞ্চার-কাহিনী পরিবেশনের মধ্যেই তার মোক্ষ সন্ধান করেছে। জুল ভার্নের অনুরাগী প্রেমেন্দ্র মিত্রও এই ধারা অনুসরণ করেছেন। তাঁর উক্তিকেই সাক্ষী মানছিঃ ‘বিজ্ঞান-নির্ভর বা বিজ্ঞান-ভিত্তিক কাহিনী বলতে আমরা যা বুঝি গত শতাব্দীতে তার জন্ম। ফরাসী লেখক জুল ভার্নই এ জাতীয় কাহিনীর প্রবর্তক। …… বিজ্ঞানের অক্লান্ত সন্ধান নিত্য যে নতুন জগৎ আমাদের কাছে উদ্ঘাটিত করে তুলেছে তার বিস্ময়-বিহ্বলতা পাঠক মনে সঞ্চারিত করে দেওয়াই এ কাহিনীর আসল লক্ষ্য।

     প্রথম ইংরেজি পড়তে শিখে স্কুলের লাইব্রেরীতে জুল ভার্নের একটি উপন্যাস পেয়ে তার মধ্যে মগ্ন হয়ে গেছিলাম। পরবর্তীকালে সেই ছেলেবেলার স্বল্পতাই এই ধরণের কাহিনী লেখার চেষ্টায় আমায় উৎসাহিত করেছে।’ (ভূমিকা, বিজ্ঞান-নির্ভর গল্প, ১৯৬৪)।

     বাঙলা এস.এফ. এর বিবর্তন ও পুষ্টি ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণের ইঙ্গিত রয়েছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে। শুধু কিশোরোপযোগী অ্যাডভেঞ্চার রচনাই যদি উদ্দেশ্য হয় তবে এস.এফ. যে অতিরিক্ত কিছু অবলম্বন সরবরাহ করে না তার সেরা প্রমান বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’। মৌলিক বাংলা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী হিসাবে আজো কেউ তাকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের যাবতীয় এস.এফ. অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে সেরা ‘পাতালে পাঁচ বছর’-এ জুল ভার্ন-এর কিছুটা স্বাদ পাওয়া যায়।

     ‘জাত গল্প যাকে বলি, মানুষের হৃদয়ের মনের ভাবাবেগ নিয়েই তার প্রধান কারবার। বিজ্ঞান-নির্ভর কাহিনী মনের সেসব সূক্ষ ম্যারপ্যাঁচ নিয়ে মাথা ঘামায় না।’ লিখেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ‘মনু-দ্বাদশ’ উপন্যাসটি রচনা না করলে এই উক্তিই সাক্ষ্য হয়ে থাকত যে তিনি এস.এফ.-এর মর্ম উপলব্ধি করেন নি। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রথম এবং সম্ভবত আজ অবধি একমাত্র সিরিয়াস নিছক বয়স্কপাঠ্য এস.এফ. ‘মনু-দ্বাদশ’ পূর্বোক্ত উক্তিকেই স্ববিরোধী অসতর্ক মন্তব্য হিসাবে উপেক্ষা করার অনুমতি দেয়।

     এক পারমাণবিক প্রলয়ের পরের কথা। দূর ভবিষ্যতের মনু-দ্বাদশ কালে এই পৃথিবীর যৎসামান্য বস্ত্রাবৃত দ্বিপদ কিছু জীবকে প্রথমে সনাক্ত করতে হয় মানুষ রূপে। দশটি উল্লাসে বিভক্ত প্রাচীনগন্ধী ভাষায় পরিবেশিত ভবিষ্যতের এক আদিম সমাজের এই কাহিনীর মধ্যে একটি মাত্র বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করেছেন লেখক – গামা-ঘা। ভল্ল, নিক্ষেপ-রজ্জু, হৃস্ব-কৃপাণ ইত্যাদি হাতিয়ার সম্বল হলেও, তিন শিবিরে বিভক্ত প্রজনন শক্তিহীন মানবসমাজের শেষ বিংশ বিংশতি প্রতিনিধিদের মধ্যে ঈর্ষা দ্বেষ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটে নি। তারই মধ্যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গুটিকয়েক মানুষ মুক্তির সন্ধানে লুপ্ত ইতিহাস ও সভ্যতার বিবরণ সংগ্রহসুত্রে জানতে পারে গামা-ঘা ও প্রজন্ম ক্ষমতা বিলুপ্তির কারণ। সুদুর অতীতে শক্তি ও সমৃদ্ধির শীর্ষাসীন তাদের ঋষিতাপস-প্রতিম পুর্বপুরুষরা ভ্রষ্ট হয়েছিলেন স্বধর্ম থেকে। ‘ধূলিকণাকেও সূর্য-প্রমাণ করার বিদ্যা তাদের আয়ত্ত। কিন্তু সেই বিদ্যাই সমস্ত ধরণীর চরম সর্বনাশ ডেকে আনে। সূর্যস্ফুরণ বিদ্যা কাফ্রামদের মতো আরো বহু মানবসম্প্রদায় তখন অর্জন করেছে। ব্যোম বিজয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও তারা অগ্রসর।’

     পৌরানিক কাহিনীর স্বাদ বিশিষ্ট অথচ ভবিষ্যতের ভিন্ন মানুষ ও ভিন্ন সমাজের এই ‘ডিস্‌টোপিয়া’ খাঁটি বাংলা এস.এফ. –এর প্রতিশ্রুতি পুর্ণ করে।

     কিশোর মহলে চার ও পাঁচের দশকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের এস.এফ.-এর চেয়ে অধিক জনপ্রিয় হয়েছিল হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘অমানুষিক মানুষ’, ‘অসম্ভবের দেশে’, ‘মেঘদূতের মর্ত্যে আগমণ’ ও ‘ময়নাবতীর মায়াকানন’। বিশেষ করে শেষ বই দুটি। মঙ্গলগ্রহীদের আগমন ও তাদের কীর্তিকলাপের চেয়ে আকর্ষণীয় হেমেন্দ্রকুমারের বর্ণনার ভাষা। মঙ্গলগ্রহের উড়োজাহাজ নামার সময় সেই বিচিত্র শব্দ ভোলার নয় – যেন হাজার হাজার স্লেটের উপরে কারা হাজার হাজার পেন্সিল টানছে আর টানছে।

     চারের দশক থেকে এস.এফ. লিখে চলেছেন ক্ষীতিন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য। তাঁর রচনার বৈশিষ্ট এক একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে গল্পের মোড়কে পরিবেশন করা- বিজ্ঞান শিক্ষাদানই যার মূল উদ্দেশ্য। বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতার সীমা অতিক্রম করতে তাই আগ্রহী নন তিনি। কিন্তু ১৩৫০-এ তাঁর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ‘ধূমকেতু’, যেখানে নির্দিষ্ট কালের জন্য মানুষকে শক্তিকণায় রূপান্তরিত করে বাঁচিয়ে রাখার উপোযোগী মৃত্যু-কিরণ উদ্ভাবন করেছেন তিনি, কিংবা ‘আমার বন্ধু সুধাবিন্দু’-র দর্শনলাভে টাইম-টাইট দরিয়া-মঞ্জিলে প্রবেশ করেছেন, তাঁর এস.এফ.-কাহিনী নতুন মাত্রা পেয়েছে। 

 

সত্যজিৎ রায়

১৯৬১ বাঙালীর কাছে স্মরনীয় রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ রূপে। রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে এই বছরের মে মাসে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘তিন কন্যা’ ও ডকুমেন্টারি ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রথম প্রদর্শিত হয়। সত্যজিৎ রায়ের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাও এই বছরের মে মাসেই ঘটে যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় সত্যজিৎ রায় তাঁর পারিবারিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’কে নবরূপে আবার প্রকাশ করলেন। ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদনা সূত্রে সাহিত্যকর্মেও প্রবৃত্ত হলেন তিনি। মে থেকে সেপ্টেম্বর, নতুন ‘সন্দেশ’ এর প্রথম পাঁচটি সংখ্যায় তিনি লিয়র ও ক্যারলের নন্‌সেন্স রাইমের কয়েকটি অনবদ্য রূপান্তর উপহার দেন। (পরবর্তীকালে ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত)। তাঁর প্রথম মৌলিক গল্প প্রকাশিত হয়ে এই পত্রিকারই ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম সংখ্যা জুড়ে – ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরী’। নবম সংখ্যায় মৌলিক কবিতা ‘মেছো গান’। দশম ও একাদশ সংখ্যায় যথাক্রমে দুটি গল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ ও ‘টেরোড্যাক্‌টিলের ডিম’।

     ‘সন্দেশ’ এর দাবি মেটাতে লেখনী তুলে নিয়েছিলেন তিনি। প্রথম বছরে ছড়া, কবিতা ও গল্প – হয়ত পরীক্ষামূলক ভাবেই বিভিধ ফর্ম নিয়ে নাড়াচাড়াও করেছেন। কিন্তু প্রথম মৌলিক গল্প ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়েরী’র পর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয় নি। আত্মপ্রকাশের নতুন জগতের দরজা খুলে নিয়েছেন তিনি অনায়াসে। বাংলার স্বীকৃত লেখকদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়ই জীবনের প্রথম গল্প হিসাবে সায়েন্স ফিকশন রচনা করেছেন। শুধু প্রথমই নয়, প্রথম তিনটি গল্পই।

     প্রথম গল্পের ‘শঙ্কু’ – প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু – সিরিজ-চরিত্র হিসাবে পরবর্তীকালে উপহার দিয়েছে শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক অ্যাডভেঞ্চারের গল্পমালা। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের যাবতীয় গোয়েন্দা কাহিনী যেমন ফেলুদা-সিরিজের অন্তর্ভূক্ত, সায়েন্স-ফিক্‌শন তা নয়। শঙ্কুর শরণাপন্ন না হয়েও তিনি বহু সার্থক সায়েন্স ফিক্‌শন রচনা করেছেন এবং তার পূর্বোক্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্পটিও এই গোত্রভুক্ত।

     শঙ্কু সিরিজের ছ’টি গ্রন্থের ২৯টি গল্প ছাড়াও ‘এক ডজন গপ্‌পো’, ‘আরো এক ডজন’, ‘আরো বারো’, ‘এবারো বারো’ ও ‘একের পিঠে দুই’ নামক পাঁচটি সংকলনের দশটি গল্প এবং ‘পিকুর ডায়েরী ও অন্যান্য’-র অন্তর্ভূক্ত বড়দের জন্য লেখা দু’টি গল্প ‘সবুজ মানুষ’ ও ‘ময়ুরকন্ঠী জেলি’ সত্যজিৎ রায়ের সায়েন্স ফিক্‌শন চর্চার নিদর্শন। আর আছে অপ্রকাশিত ‘এলিয়েন’-এর ইংরেজি চিত্রনাট্য।

     সায়েন্স ফিক্‌শনের উপকরন বিচারে গল্পগুলির একটি শ্রেণীবিভাগ করা যায়। (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কোনো কোনো গল্প একাধিক শ্রেনীভূক্ত হয়েছে)

     [ক] মহাকাশ অভিযান ও গ্রহান্তরের আগন্তুকঃ

          ১. ব্যোমযাত্রীর ডায়রী  ২. বঙ্কুবাবুর বন্ধু  ৩. প্রোফেসর শঙ্কু ও গোলক রহস্য  ৪. প্রোফেসর শঙ্কু ও রক্তমৎস্য রহস্য  ৫. অঙ্ক স্যার গোলাপী বাবু ও টিপু  ৬. সবুজ মানুষ  ৭. এলিয়েন (চিত্রনাট্য)।

     [খ] রোবট ও চেতনাসম্পন্ন যন্ত্রঃ

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও রোবু  ২. শঙ্কুর শনির দশা  ৩. কম্পু  ৪. অনুকূল।

     [গ] আশ্চর্য প্রাণী ও উদ্ভিদ (কৃত্রিম অথবা প্রাকৃতিক)

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড়  ২. প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল  ৩. প্রোফেসর শঙ্কু ও চী-চিং  ৪. প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত  ৫. সেপ্টোপাসের ক্ষিদে  ৬. আশ্চর্য প্রাণী  ৭. স্বপ্নদীপ ৮. মরুরহস্য  ৯. কর্ভাস  ১০. প্রোফেসর হিজিবিজবিজ ১১. শঙ্কুর কঙ্গো অভিযান।

     [ঘ] পরশপাথর ও অমৃতঃ

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও কোচাবাম্বার গুহা  ২. শঙ্কুর সুবর্ণ সুযোগ ৩. হিপনোজেন  ৪. মানরো দ্বীপের রহস্য  ৫. ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট    ৬. ময়ুরকন্ঠী জেলি।

     [ঙ] টাইম মেশিনঃ

          ১. টেরোড্যাক্‌টিলের ডিম।

     [চ] অদৃশ্য প্রাণীঃ

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও ম্যাকাও।

     [ছ] অমীমাংসিত বিস্ময়কর রহস্য (ঐতিহাসিক, ভৌগলিক বা প্রাণীবিষয়ক)

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও ইজিপ্সীয় আতঙ্ক  ২. প্রোফেসর শঙ্কু ও চী-চিং  ৩. প্রোফেসর শঙ্কু ও খোকা  ৪. প্রোফেসর শঙ্কু ও কোচাবাম্বার গুহা  ৫. প্রোফেসর শঙ্কু ও বাগদাদের বাক্স ৬.  মানরো দ্বীপের রহস্য ৭. কম্পু ৮. একশৃঙ্গ অভিযান।

     [জ] অসৎ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তির অপব্যবহারঃ

          ১. প্রোফেসর শঙ্কু ও ম্যাকাও  ২. প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল  ৩. প্রোফেসর শঙ্কু ও রোবু  ৪. প্রোফেসর শঙ্কু ও গোরিলা ৫. মরু রহস্য ৬. কর্ভাস  ৭. ডাঃ শেরিং-এর স্মরনশক্তি  ৮. শঙ্কুর শনির দশা ৯. শঙ্কুর সুবর্ণ সুযোগ ১০. হিপনোজেন  ১১. মহাকাশের দূত  ১২. নকুড়বাবু ও এল. ডোরাডো  ১৩. প্রোফেসর শঙ্কু ও ইউ. এফ. ও.  ১৪. শঙ্কুর কঙ্গো অভিযান  ১৫. সেপ্টোপাসের ক্ষিধে  ১৬. ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট  ১৭. ময়ূরকন্ঠী জেলি।

     [ঝ] বিবিধঃ

          ১. টেরোড্যাক্‌টিলের ডিম  ২. ভূতো (অপরাধবোধ সঞ্জাত বিভ্রম?)  ৩. অসমঞ্জবাবুর কুকুর (ব্যঙ্গ)  ৪. প্রোফেসর শঙ্কু ও খোকা (শিশু প্রতিভাধর)।

     (এই শ্রেণীবিভাগে কাহিনীর মুখ্য প্রবণতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই, উদাহরণ স্বরূপ, ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’ গল্পটিতে একটি রোবট চরিত্র থাকলেও সেটি রোবট শ্রেণীভুক্ত হয়নি।)

     ভিন্ন দৃষ্টিকোণেও সত্যজিৎ রায়ের সায়েন্স ফিক্‌শনের শ্রেণীবিভাগ করা যায়, বিশেষত শঙ্কু-কাহিনীর। ভৌগোলিক অভিযান ও ঐতিহাসিক অভিযান। লেখক স্বয়ং শঙ্কুর গল্পকে সায়েন্স ফিক্‌শন অভিহিত করেন নি, ‘শঙ্কু কাহিনী’ বা ‘প্রোফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও একটি শঙ্কু-কাহিনী (প্রোফেসর ও ভূত) প্রকাশিত হয়েছিল সায়েন্স ফিক্‌শন পত্রিকা ‘আশ্চর্য’-য়। অন্যান্য লেখার ক্ষেত্রেও, বয়স্কপাঠ্য রচনা বাদ দিলে লেখন স্বয়ং কখনো ‘সায়েন্স ফিক্‌শন’ তকমাটি লাগান নি। ‘অনুকূল’ অবশ্য প্রকাশিত হয়েছিল ‘আনন্দমেলা’র বিশেষ সায়েন্স ফিক্‌শন সংখ্যায়।

     ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক অভিযানের ও ভ্রমণের উপাদান শঙ্কু-কাহিনীর একটি বিশেষ আকর্ষণ হলেও সত্যজিৎ রায়ের সায়েন্স ফিক্‌শনের মুখ্য আবেদন নয়। কিশোরপাঠ্য হিসাবে রচিত হয়েও তার স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভের ও নিহিতার্থের হদিশ এই ‘অ্যাডভেঞ্চার’-এর উপাদান থেকে সংগ্রহ করা যাবে না। সত্যজিৎ রায় ছোটবেলা থেকেই জুল ভার্ণের প্রতি আকৃষ্ট। তিনি একটি প্রবন্ধে লিখেছেনঃ ‘আমি একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, এখনও হই, ভার্নের গল্পের মধ্যে প্রাণ মাতানো নিখুঁত বর্ণনার অঢেল প্রাচুর্যের মধ্য দিয়ে পাঠককে আকর্ষণ করে স্তম্ভিত করে রাখার ক্ষমতা দেখে।’ একই প্রবন্ধের অন্যত্র তিনি বলছেন ‘ভার্ন যেসব কায়দায় গল্প ফাঁদতেন, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো, তিনি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে সুকৌশলে নতুন ধাঁচে সাজিয়ে গল্পের চরিত্রগুলিকে তারই মধ্যে বসাতেন এবং সেই সাজানো কাহিনীটিকে চমৎকারভাবে কল্পনা রঙিন ফ্যান্টাসি গল্পের প্যাটার্নে বুনে যেতেন।’ (‘এস.এফ.’-‘নাউ’ পত্রিকা থেকে অনূদিত)২৩। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শঙ্কু-কাহিনীর ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক অভিযান-সংক্রান্ত পর্বগুলির পিছনে ভার্ন-এর অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সত্যজিৎ যদি ভার্নকেই মডেল করতেন, তা হলে তাঁর সায়েন্স ফিক্‌শন তাঁর পূর্বসুরিদের বালখিল্যতা অতিক্রম ক’রে যেটুকু অগ্রসর হতো সে শুধু পরিবেশনের গুনে – আর্দ্র আবেগ-বর্জিত ঋজু ভাষা, মরচে পড়া বিশেষণের প্রতি বিরাগ, চলচ্চিত্রধর্মী এপিসোডের ধারা নির্মাণ ও শঙ্কু-কাহিনীতে ডায়েরী ফর্মের সুচিন্তিত প্রয়োগ তাঁর রচনার নির্মিত ও লিপিকুশলতার নিঃসংশয় প্রমাণ।

     ভূগোল অথবা ইতিহাস, ভাষা অথবা অ্যাডভেঞ্চারের অতিরিক্ত যে-সুর যোজনা করেছেন সত্যজিৎ, এখানে সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে চাই। তাই কয়েকটি প্রতিনিধিস্থানীয় রচনার সংক্ষিপ্তসার বর্জন করার উপায় নেই।

     ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’ গল্পে প্রথম প্রোফেসর শঙ্কুর আবির্ভাব তাঁর ডায়রিটি আবিষ্কারের সুত্রে। একটি উল্কার গর্তের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল নিরুদ্দিষ্ট বিজ্ঞানীর এই ডায়রি যার কালির রং ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, যার কাগজ ছেঁড়ে না বা পোড়ে না। রকেট নির্মাণ পর্বের বিবরণ থেকে ডায়রি শুরু হয়। পরীক্ষামূলক প্রথম রকেটটি প্রতিবেশী অবিনাশবাবুর মূলোর ক্ষেত ধ্বংস করলেও অচিরে শঙ্কু দ্বিতীয় রকেট যোগে মঙ্গলপুরে পাড়ি দেন। তাঁর সঙ্গী পুরাতন ভৃত্য প্রহ্লাদ, বেড়াল নিউটন আর যন্ত্রমানুষ বিধুশেখর। অভিযান কালে প্রহ্লাদ রামায়ণ পরে সময় কাটায়, বিধুশেখর বাংলা শিক্ষা করে তার নির্মাতা শঙ্কুর কাছে এবং অবিলম্বে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দ্বিজু রায়ের গান জোড়ে ‘ঘঙো ঘাংঙ কুঁক্ক ঘঙা আগাঁকেকেই কুকুং খঙা’। মঙ্গল অবতরণের পর, বিধুশেখরের উচ্চারণে ‘ভীবং বিভং’। অর্থাৎ ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয় তারা। মঙ্গলীয় সৈন্যদের আক্রমণ এড়িয়ে কোনোক্রমে রকেটে চড়ে পিঠটান দেয় তারা এবং অজানা এক গ্রহ টাফায় এসে পৌছায়। পৃথিবীর চেয়েও প্রাচীন এক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে সেখানে। তাদের প্রত্যেকটি লোকই বিজ্ঞানী এবং এত বুদ্ধিমান একত্র হওয়ায় সেখানে নাকি নানা অসুবিধা দেখা দিয়েছে। তারা এখন অন্যান্য গ্রহ থেকে কমবুদ্ধি লোক আনিয়ে টাফায় বসবাস করাচ্ছে। বিজ্ঞান-বিষয়ক আলোচনা করতে নারাজ হওয়ায় ক্রুদ্ধ শঙ্কু তাদের ওপর নিজস্ব উদ্ভাবন নস্যাস্ত্র প্রয়োগ করে। কিন্তু কিছু লাভ হয় না। তারা তখনো হাঁচতেই শেখে নি। ডায়রি এখানেই শেষ। আর গল্পের শেষে জানা যায় অমন অমূল্য ডায়রিটি শ’খানেক বুভুক্ষ পিঁপড়ে হজম করে ফেলেছে।

     সায়েন্স ফিক্‌শনের প্রচলিত মালমশলা ব্যবহার ক’রে রচিত এই প্যারডির মধ্যে সুকুমার রায়ের স্পষ্ট ছায়াপাত। প্রোফেসর শঙ্কু ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারে’র আদলেই গঠিত। ডায়রির পাতা থেকে উদ্ধার ক’রে গল্প পরিবেশনের ঢঙটিও এক। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষনীয় ১৯৬১-তে ইউরি গাগারিনের মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার সুবাদে স্ফীতগর্ব ‘বিজ্ঞান’ কিন্তু সেই বছরেই রচিত এই গল্পে কোনো আবেগময় আশাবাদ সঞ্চারিত করতে পারেনি। বরং বিধুশেখরের কন্ঠে দেশপ্রেমের গান মহাকাশে অভিযানের পিছনে জাতীয়তাবাদী অহমিকার ইঙ্গিত বহন করে। মনে পড়ে যায় প্রায় দশ বছর পরে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র চাকুরিপ্রার্থী সিদ্ধার্থ এ-যুগের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কি, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল ভিয়েতনামের যুদ্ধ। প্রশ্নকর্তাদের প্রত্যাশিত মহাকাশ বিজয় বা মানুষের চন্দ্রাবতরণের উল্লেখ করে নি সে।

     এস.এফ. নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের আরেকটি অনবদ্য প্যারডি ‘টেরোড্যাক্‌টিলের ডিম’। বদনবাবু অফিস ছুটির পর আউটরাম ঘাটের কাছে একা বেঞ্চিতে বসে ছিলেন। পাশে এসে বসল এক নতুন টিম মেশিনের উদ্ভাবক। এই যন্ত্রের নল দুটো কানে ঢুকিয়ে বাঁ দিকে টিপলে অতীতে আর ডান দিকে টিপলে ভবিষ্যতে যাত্রা করা যায়। উদ্ভাবকের মুখে আশ্চর্য সব কাল-পর্যটনের কাহিনী শুনলেন বদনবাবু, কিন্তু নিজে যন্ত্রটিকে ব্যবহার করতে পারলেন না। কারণ উদ্ভাবক ও বদনবাবু উভয়েরই মাথায় চুলের সংখ্যা এক হলে তবেই সম্ভব হতো! বাড়ি ফেরার পথে বদনবাবু দেখলেন তাঁর মানিব্যাগটি খোয়া গেছে। কিন্তু পঞ্চান্ন টাকা বত্রিশ নয়া পয়সার চেয়ে অনেক বড় প্রাপ্তি ঘটেছে তাঁর। বদনবাবুর সাত বছরের ছেলে বিলটু পঙ্গু। তাকে তিনি রোজ গল্প শোনান। আজ বিলটুর সত্যিকার খুশির খোরাক সংগ্রহ করেছেন তিনি।

     শুধু সায়েন্স ফিক্‌শন নয়, সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সেরা কাহিনী ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। কাঁকুড়্গাছি প্রাইমারি স্কুলে বাইশ বছর ধরে ভূগোল আর বাংলা পড়াচ্ছেন বঙ্কুবাবু। তাঁকে কেউ কখনো রাগতে দেখে নি। ছাত্ররা তো পিছনে লাগেই, এমনকি শনি-রবিবারে গ্রামের মান্যগণ্য উকিলের বাড়িতে যে আড্ডা বসে সেখানে বুড়োরাও তাঁকে অপদস্থ ক’রে আসর জমায়। ক্রেনিয়াস গ্রহ থেকে একটি মহাকাশযান যখন পথ ভুলে পঞ্চা ঘোষের বাঁশবাগানে অবতরণ করল, ভিন্‌গ্রহী অ্যাং-এর দেখা পেলেন বঙ্কুবাবু। ‘আই অ্যাম বঙ্কুবিহারী দত্ত স্যার, বেঙ্গলি কায়স্থ স্যার’ বলে নিজের পরিচয় দেন তিনি। এই নির্ভেজাল ছাপোষা সরল মানুষটি ভুগোল পড়ান, কিন্তু হিমালয়ের বরফ দেখেন নি, দীঘার সমুদ্র, সুন্দরবনের জঙ্গল, কি শিবপুরের বাগানের বটগাছটি পর্যন্ত নয়। বিচিত্র শক্তিধর অ্যাং তাঁর পৃথিবী ভ্রমণের অপূর্ণ সাধ পূরণ করে এক বিচিত্র যন্ত্রের সাহায্যে এবং ফিরে যাওয়ার আগে একটি উপদেশ দিয়ে যায়, ‘তোমার দোষ হচ্ছে যে তুমি অতিরিক্ত নিরীহ; তাই তুমি জীবনে উন্নতি কর নি।’ পরের দিন উকিল বাড়ির বৈঠকে বৈশাখী ঝড়ের মতো উদয় হন বঙ্কুবাবু। আমরা একটি নতুন মানুষকে আবিষ্কার করি যে আর নীরবে অপমান বরদাস্ত করতে রাজি নয়।

     বঙ্কুবাবুকে হীনমন্যতা থেকে মুক্তি দিতেই পঁচিশটা গ্রহের ভ্রমণকারীর যে পৃথিবীতে আগমন তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কারণ নেই। মানবিক ও হিতকর উদ্দেশ্য বিনা সত্যজিৎ রায়ের কোনো গল্পেই গ্রহান্তরের আগন্তুকদের উদয় হয়নি। যেমন ‘মহাকাশের দূত’ গল্পের আগন্তুকরা মানবসমাজের খাদ্য, পরিবেশ দূষণ, শক্তি সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের জন্য উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু সেখানে লক্ষ করার মতো, কোনো তৈরি সমাধান তারা উপহার দিয়ে যায়নি। তাদের প্রদত্ত একটি আশ্চর্য প্রস্তরখণ্ড থেকে বিচ্ছুরিত নীলাভ আলো শুধু উদ্বুদ্ধ করে অক্লান্ত গবেষণাকে, মানুষের মনের অন্ধকার দূর করার প্রেরণা যোগায়। কিংবা ‘অঙ্ক স্যার গোলাপী বাবু ও টিপু’ গল্পে মাষ্টারমশাই যখন সমস্ত রূপকথার কাহিনীকে কুসংস্কারের জনক বিবেচনা করেন, টিপুর দুঃখ দূর করতেই হামলাটুনির মাঠে ট্রিডিঙ্গিপিডি রেখে নেমে আসেন গোলাপীবাবু।

     সত্যজিতের গল্পে গ্রহান্তরের আগন্তুকের এই নিহিতার্থ যে কষ্ট-কল্পনা নয় তার সাক্ষী ‘দা এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য। চলচ্চিত্রটি গৃহীত না হওয়ার বৃত্তান্ত পরে আলোচিত হয়েছে, এখানে শুধু তার কাহিনীটি আমাদের বিবেচ্য।

     ১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারিতে জীবনীকার মারি সিটন-কে একটি চিঠিতে সত্যজিৎ লিখেছেনঃ২১

I am already at work on 2 more stories – both original. One, a science-fiction story involving a space ship with only one supremely intelligent Martian occupant – landing on the outskirts of a remote village with as little contact with ‘civilization’ as possible. Martian first taken for a monster, then for a God – and so on.

     এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ধৃতি চিহ্নের বন্ধনীর মধ্যে ‘সভ্যতা’। এই ‘সভ্যতা’র সঙ্গে ন্যূনতম সংস্পর্শে এসেছে যে উপান্তবর্তী গ্রামটি তারই সবচেয়ে লাঞ্ছিত অসহায় একটি বালকের [‘হাবা’] সঙ্গেই শুধু গড়ে ওঠে পরম বুদ্ধিমান ও অলৌকিক ক্ষমতাধর ‘এলিয়েন’-এর বন্ধুত্ব। হাবা-র সঙ্গে এলিয়েন লুকোচুরি খেলে, ব্যাং সাপ জোনাকি পোকা পদ্মফুল কাঠবিড়ালি আর বুলবুলি উপহার পেয়ে খুশি হয় এলিয়েন। ফেরার সময়ে হাবার কাছে শেখা ফুল-নদী-ধানক্ষেত নিয়ে সহজ একটি লোকগীতির সুর ভাঁজে। এলিয়েন আর হাবা, সদর্থক সভ্যতার দুই প্রতিনিধি, তাদের মধ্যে প্রযুক্তিগত সুবিধাভোগের স্তরভেদ ব্যাতীত কোনো ব্যবধান নেই। এক দিকে এদের দুজনের সম্পর্ক যত বিকশিত হয় তার প্রেক্ষাপটে স্পষ্টতর হয়ে ফুটে ওঠে আমাদের তথাকথিত ‘সভ্যতা’র স্বরূপ। এই সভ্যতার প্রতিনিধি বাজোরিয়া ফোটোগ্রাফারদের সাক্ষী রেখে গ্রামোন্নয়নের ব্রত নেয় (গরীব দেশে ধনীর ইমেজ রক্ষা করা বড় কঠিন)। ডেভ্লিন নামক এক ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগের সুবাদে মার্কিন প্রযুক্তি এই ব্যবসায়ীর তুরুপের তাস। আর সাংবাদিক মোহন সেখানে সত্যদ্রষ্টা কিন্তু নিষ্ক্রিয়।

     গ্রহান্তরের আগন্তুকদের আলৌকিক ক্ষমতা যেমন বঙ্কুবাবু বা হাবার মতো সরল অথচ পর্যুদস্ত মানুষেরই হিতার্থে নিয়োজিত হয় তেমনই সত্যজিতের বিভিন্ন গল্পে অত্যন্ত সাদামাটা মানুষই শুধু অর্জন করে কিছু কিছু অলৌকিক ক্ষমতা। প্রোফেসর শঙ্কু গিরিডিতে বসে অদ্ভুত যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেন খাঁটি দিশি উপকরন কাজে লাগিয়ে। তেত্রিশ টাকা সাড়ে সাত আনার মধ্যে কাজ সারতে হয় বলে তাঁর রোবটের চোখ ট্যারা হয়। শুধু তাই নয় তাঁর উদ্ভাবনগুলির মধ্যে কোনোটারই কারখানায় অধিক সংখ্যায় উৎপাদন সম্ভব নয়। এগুলি মানুষের হাতের কাজ – এক ধরণের শিল্পকর্ম। কিন্তু প্রোফেসর শঙ্কু অলৌকিক ক্ষমতাধর নন। তিনি বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। তাঁর বিচিত্র কার্যকলাপের বা অভিযানে সাফল্যের পিছনের কারন সর্বদাই যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু শঙ্কু এমন অনেক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী যার শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয় না। শুধু তাই নয়, এমন পরিস্থিতিরও প্রায়ই উদ্ভব হতে দেখা যায় যেখানে শঙ্কু নীরব দর্শক, মূল ভুমিকায় অবতীর্ন হয়েছেন সমাজের চোখে অতি নগন্য কোনো ব্যক্তি। যেমন নকুড়বাবু।

     মাকড়দার অধিবাসী নকুড়বাবুকে ‘কেয়ার অফ হরগোপাল বিশ্বাস’ চিঠি গ্রহন করতে হয়। অতি গোবেচারা ও নিরীহ এই ব্যক্তিটি শঙ্কু সামনে চেয়ারের ডগা ছুঁইয়ে বসে যখন, মুঠোয় ধুতির কোঁচা, ঘাড়ের হেলানো ভঙ্গিটিতেও কৃতার্থতা আর অফুরন্ত বিনয়। ‘নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’ গল্পে তাঁরই হস্তক্ষেপে শঙ্কু তাঁর অপহৃত গবেষণাপত্র ফিরে পান। নকুড়বাবু সব অর্থেই সাধারণ হলেও তাঁর অদ্ভুত একটি ক্ষমতা, তিনি অন্যের মন পড়তে পারেন, ভূত-ভবিষ্যত দেখতে পান, এমনকি নিজে যা কল্পনা করেন অন্যকে সেটা দেখাতেও পারেন। শঙ্কু ও নকুড়বাবু কুচক্রী বিজ্ঞানীর খপ্পরে পড়লে নকুড়বাবু সোনার শহর এল ডোরাডোর লোভ দেখিয়ে ব্রেজিলের গহন জঙ্গলের মধ্যে টেনে আনেন দুর্বৃত্তকে। এবার তাঁর কাজে লাগে বহুদিন পড়া শ্রীগুরু লাইব্রেরীর বরদা বাঁড়ুজ্জের ব্রেজিল বিষয়ক একটি বই। যাতে ছবি এঁকেছিলেন মদন পাল। সোনার শহর এল ডোরাডোর বাড়িগুলো অবশ্য ছবিতে দেখতে হয়েছিল টোল-খাওয়া টোপরের মতো – তাও সিধে নয় ট্যারচা। কিন্তু সাহেব ব্রেজিলের জঙ্গলের মধ্যে তাই দেখেই বলল, এল ডোরাডো ইজ ব্রেথ-টেকিং! সাহেবদের ঠকিয়ে তিনি শেষপর্যন্ত ঠাকুমার জন্য তিরিশ টাকা দামের একটি বিলিতি ওষুধ সংগ্রহ করতে পেরেই সবচেয়ে খুশি।

     নকুড়বাবুর তাও অলৌকিক ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পাপাডোপুলসের তো তাও নয়। এথেন্সের রাস্তায় পকেট মারতে সিদ্ধহস্ত সে – এইমাত্র। কিন্তু ‘হিপনোজেন’ গল্পে তারই দৌলতে রক্ষা পেয়েছিল শঙ্কু ও বিজ্ঞানী সামারভিল্‌। অস্‌লোর উপকন্ঠে এক মধ্যযুগীয় কেল্লার ঢং-এর বাড়িতে ধনকুবের ক্রাগের আমন্ত্রণে এসে ফাঁদে পড়েছিল তারা। ক্রাগ বিজ্ঞানী, স্বয়ং আয়ুবৃদ্ধির উপায় বার করে ইতিমধ্যে তিনবার অবধারিত মৃত্যুকে ঠেকিয়েছে। কিন্তু এবার তার মৃত্যু আসন্ন জেনে বিজ্ঞানীদের ডেকে এনেছে। ক্রাগের মৃত্যুর পর তারা যাতে ক্রাগের নির্দেশ অনুসারে আবার তাকে বাঁচিয়ে তোলে। ক্রাগের দুই রোবটের প্রহরা এড়িয়ে স্বাধীনভাবে কিছু করারও উপায় নেই। সবচেয়ে আশংকার কথা ক্রাগ পৃথিবীর একছত্র অধিকারী রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তার বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরী করেছে হিপ্‌নোজেন নামক মারাত্মক এক রাসায়নিক দ্রব্য। পাপাডোপুলা শেষে রোবটের পকেট মেরে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ছিঁচকে চোরের কীর্তির পাশে বৈজ্ঞানিক প্রতিভাও ম্লান প্রতিপন্ন হয় নৈতকতার কারণে।

     আয়ুবৃদ্ধির তৃষ্ণা (আর পরশপাথরের সন্ধান ) – এই থিম্‌ নিয়ে বেশ কিছু গল্প লিখেছেন সত্যজিৎ – যাতে বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে অনেক ধরণের ক্রাগকে আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু তার মধ্যে ‘ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট’ গল্পটির মেজাজ একেবারেই আলাদা। রিটায়ার্ড স্কুল মাষ্টার নিশিকান্তবাবু বাতের চিকিৎসা করাতে করিমগঞ্জে মাধব ডাক্তারের কাছে এসে ঘটনাচক্রেই ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগানে আবিষ্কার করেন প্রাই অমৃত-সম একটি অচেনা ফল। বহু ভিটামিন ও অচেনা রাসায়নিক সমৃদ্ধ, স্বাদগন্ধে ও উপকারিতায় যার জুড়ি নেই। নিশিকান্তবাবু প্রথমে নিজেই বিশ্বাস করতে পারেন নি এত বড় একটা আবিষ্কারের গৌরব তাঁর প্রাপ্য। তারপর অবশ্য তাঁর মনে হয়, এই যে মানুষ এত রকম শাক-সব্জি ফলমূল শস্যকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছে, তার শুরু কিভাবে হল তাও কি জানি আমরা? আম জাম কলা কমলা ইত্যাদি কে বা কারা প্রথম খেয়ে সেটাকে খাদ্য হিসাবে প্রমান করল, ইতিহাসে তার কি কোনো উল্লেখ আছে? গল্পের শেষে পৌঁছে আমরা দেখি সাধারণ ইতিহাসের এই রেওয়াজের সঙ্গেই সংগতি রেখে ম্যাকেঞ্জি ফ্রুটের আবিষ্কারক নিশিকান্ত বাবুর নামটিও আর কোনোদিন নথিবদ্ধ হবে না। এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিশিকান্তবাবুর আবিষ্কারটিকে কুক্ষিগত করেছে। ফলের চাষ শুরু করেছে ও কারখানা খুলেছে সংরক্ষক রসে ভরা টিনে পুরে ফলটি বেচবার জন্য। একদিকে নিম্নবিত্ত আবিষ্কারক যেমন স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হলেন, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া দাম ফলটিকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেল।

     আটপৌড়ে মানুষরাই শুধু সত্যজিতের জগতে আশ্চর্য বা অলৌকিক মানবিক ক্ষমতাবলে উজ্জ্বল নয়, অমানুষ রোবটও কখনো কখনো মানুষের অমানবিক আচরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘অনুকূল’ একই নামধারী একটি রোবটের কাহিনী। রোবট সাপ্লাই এজেন্সির দোকান থেকে নিকুঞ্জবাবু তাকে ভাড়া করে আনেন। সাধারণ গৃহভৃত্যের সব কাজই করে সে, শুধু রান্না ছাড়া। প্রথমের নিকুঞ্জবাবুকে সতর্ক করে দেওয়া হয়, বাড়ির বাইরে কোনো কাজে যেন তাকে পাঠানো না হয়, যেমন পান-সিগারেট ইত্যাদি আনাতে। ‘তুই’ বলে সম্বোধনটাও তার পছন্দ নয়, আর গায়ে হাত তোলা তো মোটেই বরদাস্ত করবে না – প্রতিশোধ নেবেই এবং তার ফলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। নিকুঞ্জবাবুর এক কাকা কিছুদিনের জন্য বাড়িতে আসেন অতিথি হিসাবে। তাঁকে সতর্ক করা সত্ত্বেও হঠাৎ একদিন ক্ষেপে গিয়ে তিনি অনুকূলকে চড় মারেন। কারণ, জানালার ধারে দাঁড়িয়ে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান গাইছিলেন, অনুকূল তার কথার ভুল ধরেছিল। যথা প্রত্যাশিত, অনুকূলের শক্‌-এ তার মৃত্যু ঘটে। পরে জানা যায়, আরো একটি কারণ প্ররোচিত করেছিল অনুকূলকে। আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন নিকুঞ্জবাবু, এবার কাকার মৃত্যুতে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তিনিই লাভ করবেন। অনুকূল আমাদের ঘরে চিরাচরিত প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কটিকে বেজায় অস্বস্তিকর করে তোলে। অনুকুলের কীর্তি আমাদের সত্যজিতের সেই অনবদ্য লিমেরিক-টিকেও স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ

        রামফাঁকিবাজ চাকর জোটে সাধনবাবুর ভাগ্যে,

        বাবু বলেন, রোবট রাখি। চাকরগুলো যাক্‌গে।

          রোবট হল কাজে বহাল,

          তার ফলে আজ বাবুর কি হাল?

       রোবট বলে, ‘কই রে ব্যাটা!’ বাবু বলেন, ‘আজ্ঞে?’

—-কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান, শারদীয়া সংখ্যা, ১৩৯০।।

     সত্যজিতের সায়েন্স ফিক্‌শন নির্ভেজাল বাঙালি ঘরের সন্তান। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা ৭২ নং-এর মেসবাড়ি ছেড়ে বেরোবার পরে বাঙালির খোলস পুরো ত্যাগ করেন। অভিযান কালে অলস নিদ্রাপ্রিয় মামাবাবুর বাঙ্গালিয়ানাও আর গল্পের সবার্থরক্ষায় জরুরী নয়। সত্যজিতের কাহিনীতে শুধু বাঙালি পোশাকে ও কিছু বিশেষ ভোজ্যের প্রতি আসক্তিসম্পন্ন চরিত্র আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবতীর্ণ হয় না। বাঙালি মন ও মানুষ সেখানে কাহিনী-কাঠামো বা মূল্যবোধের সংঘাত কেন্দ্রিক সমস্যা ইত্যাদির অরগ্যানিক দাবী পুর্ণ করে।

     আমাদের অত্যন্ত পরিচিত চেনাজানা মানুষ; মাঝারি মানুষ অতি ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে আবর্তিত হয় যাদের দৈনন্দিন ছকে বাঁধা জীবন, সত্যজিতের দুনিয়ায় কল্পনার দুঃসাহস বা অলৌকিক কিছু ক্ষমতা অর্জনের সুত্রে তাদের রূপান্তর ঘটে যায়। এক অর্থে ইচ্ছাপূরণের কাহিনী নিশ্চয়ই, কিন্তু বিশেষ মূল্যবোধেরও পরিচায়ক। রোবট, কম্পিউটার, উড়ন্ত চাকি, এলিয়েন, টেলিপ্যাথি – সায়েন্স ফিক্‌শনের সব উপকরণই ব্যভার করেছেন তিনি। কিন্তু যন্ত্রমানুষ ভিন্‌গ্রহী বা প্রাগৈতিহাসিক্‌ প্রাণীর জৈবিক বা যন্ত্রকৌশলের ব্যাখ্যা নয়, এই পৃথিবীরই চেনা মানুষের উপর অচেনা আলো ফেলে তিনি সাহিত্য নামক গবেষণাগারে মূল্যবোধ নিয়ে পরিক্ষণ চালান।

     সত্যজিতের সায়েন্স ফিক্‌শনে অলৌকিক ও ব্যাখ্যাতীত নানা প্রসঙ্গের উত্থাপন বহু সমালোচককে বিভ্রান্ত করেছে এবং তাঁর এই জাতীয় কাহিনীকে ‘সায়েন্স ফিক্‌শন’-এর পরিবর্তে ‘সায়েন্স ফ্যান্টাসি’ অভিহিত করে তাঁরা স্বস্তি লাভ করেছেন। এর পিছনে বলাই বাহুল্য ভার্ণকে সায়েন্স ফিক্‌শনের ও ওয়েলেস্‌-কে সায়েন্স ফ্যান্টাসির আদর্শ প্রতিনিধি রূপে কল্পনা করে নেওয়ার একটি ভ্রান্ত যুক্তির সমর্থন আছে। সাহিত্যে ফ্যান্টাসির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো বিরোধ নেই। ফ্যান্টাসি (যেমন সত্যজিতের গল্পের অলৌকিক পরিমণ্ডল বা ব্যক্তি বিশেষের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা) আসলে সত্য অন্বেষণের হাতিয়ার। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বা অদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিয়ে মানুষ, মানুষের সম্পর্ক ও সমাজকেই যা পরখ করে। বঙ্কু, নকুড় বা নিশিকান্তবাবুর মতো ছাপোষা মাঝারি মানুষদের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড আসলে আরো বিস্ময়কর ও অলৌকিক একটা ঘটনাকেই পরিস্ফুট করে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। শুধু বিষয়-বৈভবের দাপটেই দুনিয়াদারী চালাবার ছাড়পত্র সংগ্রহ করা যায় আমাদের সমাজে। এবং প্রোফেসর শঙ্কু সাধারণ মানুষ না হয়েও সে বিষয়ে সচেতন বলেই সম্ভবত তাঁর বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন কখনোই বৈষয়িক কাজে লাগে না। ব্যবসায়ীদের কারখানায় যার ভুরি ভুরি উৎপাদনও সম্ভব নয়।

    

‘আশ্চর্য’ ও এস.এফ. সিনে ক্লাব

বাংলা ভাষায় এবং ভারতের প্রথম সায়েন্স ফিক্‌শন পত্রিকা ‘আশ্চর্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩-র জানুয়ারি মাসে। আকাশ সেন ছদ্মনামে অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এস.এফ.-কে জনপ্রিয় করার আন্দোলন। ‘আশ্চর্য’র প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

     ‘আশ্চর্য’র প্রথম সংখ্যাতেই ওয়েলেস্‌-এর ‘টাইম মেশিন’ উপন্যাস ও ব্র্যান্ডবেরির গল্প ‘সার্সাপেরিলার গন্ধ’-র অনুবাদ প্রকাশিত হয়, যা সম্পাদকের সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে। তা ছাড়া এই সংখ্যাতে ফ্রেডারিক ব্রাউনের গল্প ‘ব্রহ্মাস্ত্র’, সমরজিৎ কর ও ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের দুটি মৌলিক কাহিনী এবং আর্থার সি ক্লার্ক-এর পরিচিতি সহ কৌতুক-চিত্র ও কমিক স্ট্রিপও প্রকাশিত হয়েছিল।

     নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বরেন গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত কিছু সাহিত্যিককে এস.এফ.-চর্চায় উৎসাহিত করেছিল ‘আশ্চর্য’, সত্যজিৎ দায় কে লাভ করেছিল উৎসাহী পরামর্শদাতা ও লেখক হিসাবে। তা ছাড়া ‘আশ্চর্য’র লেখককুলের মধ্যে সম্পাদক সহ এণাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, সমরজিৎ কর, রণেন ঘোষ ও মনোরঞ্জন দে প্রমুখ যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। কিন্তু ‘আশ্চর্য’র বড় আবিষ্কার গুরনেক সিং ও দিলীপ রায়চৌধুরী।

     ব্র্যাডবেরির ভক্ত গুরনেক সিং এর ‘হারানো ছেলে’, ‘মৃত্যুদূত’, ‘খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে’ ইত্যাদি গল্প পড়লে বিশ্বাস করা শক্ত লেখক বঙ্গসন্তান নন। অসাধারণ মুন্সিয়ানায় তিনি ব্র্যাডবেরির কাহিনী অবলম্বনে রচনা করেছিলেন ‘মঙ্গল স্বর্গ’।

     রাবার-টেক্‌নোলজিস্ট রসায়নবিদ দিলীপ রায়চৌধুরীর ভারতে পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তিতে রচিত ‘অগ্নির দেবতা হেফেস্‌টাস’ বা সেযুগে সাধারণ মানুষের প্রায় অশ্রুত প্লাজ্‌মা বা লেসার-কেন্দ্রিক কাহিনী ‘ক্যুগেল ব্লিৎস’, ‘প্লুটোর অভিশাপ’ কি ‘টিথোনাস’-এর আবেদন আজও অমলিন। ১৯৬৩-তে এই তরুণ প্রতিভাধরের অকাল প্রয়াণে সত্যজিৎ রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অদ্রীশ বর্ধনের শোক-বার্তা প্রকাশিত হয়েছিল ‘আশ্চর্য’র পাতায়।১৮ আমেরিকায় প্রবাসী হওয়ার পর জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রাক্তন কর্মী গুরনেক সিং-কেও হারিয়েছি আমরা।

     এস.এফ. এর পালে হাওয়া লাগাতে বদ্ধপরিকর ‘আশ্চর্য’র কর্তাদের আরেক কীর্তি – আকাশবাণী থেকে বারোয়ারী সায়েন্স ফিক্‌শন গল্প সম্প্রচার। ১৯৬৬-র ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘সবুজ মানুষ’ নামে গল্পপাঠের আসরে হাজির হয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, অদ্রীশ বর্ধন, দিলীপ রায়চৌধুরী ও সত্যজিৎ রায়।

     ‘আশ্চর্য’য় সত্যজিৎ রায়ের কাহিনী ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত’ ও ‘ময়ূরকন্ঠী জেলি’ ছাড়া প্রকাশিত হয়েছিল ‘নাউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘SF’ প্রবন্ধের অনুবাদ। সায়েন্স ফিক্‌শন ফিল্ম সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছিল, যা এস.এফ. সিনে ক্লাব সূত্রে স্বতন্ত্রভাবে উল্লিখিত হবে।

     পাঁচ বছর চলার পর ‘আশ্চর্য’ বন্ধ হয়ে যায়। অদ্রীশ বর্ধনের সম্পাদনায় আবার নতুন এস.এফ. পত্রিকা ‘ফ্যানটাসটিক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫-এ। সত্যজিৎ রায় এই পত্রিকার নামাঙ্কন (Logo) করে দেন।

     ‘আশ্চর্য’ প্রকাশের দু’বছরের মধ্যে এই পত্রিকাকে ঘিরে স্থাপিত হয় ‘এস.এফ. সিনে ক্লাব’ যার প্রাণপুরুষ ছিলেন সক্রিয় সভাপতি সত্যজিৎ রায়। প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অদ্রীশ বর্ধন যথাক্রমে সহ-সভাপতি ও সেক্রেটারি।

     ১৯৬৫-র ২৬ জানুয়ারি ক্লাবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ ‘ভিলেজ অফ দা ড্যামড্‌’ চলচ্চিত্র প্রকাশিত হয়। স্মরণী-পুস্তিকায় সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেনঃ ‘প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমি সায়েন্স ফিক্‌শনের ভক্ত; তাই এস.এফ. সিনে ক্লাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আমায় এতখানি নাড়া দিয়েছে। এ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পেরে আমি আনন্দিত; এ ধরণের ক্লাব বোধ করি শুধু এদেশেই সর্বপ্রথম নয়, বিদেশেও আর নেই। ক্লাবের উদ্বোধন উপলক্ষে এই কামনাই করছি সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করা সেরা এস.এফ. ফিল্মের বহু মনোগ্রাহী এবং চিন্তা-উন্মেষক প্রদর্শনী যেন সভ্যরা দেখতে পান।’ (-আশ্চর্য, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫, ইংরেজি থেকে অনুদিত)।

     এস.এফ. সিনে ক্লাব প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়কে প্রেরিত ওয়াল্ট ডিজনি, বে ব্র্যাডবেরি, আর্থার সি ক্লার্ক ও কিংসলি অ্যামিসের অভিনন্দন পত্রগুলি স্মরনী-পুস্তিকায় এবং পরে তার অনুবাদ ‘আশ্চর্য’য় (১৯৬৬-র ফেব্রয়ারি থেকে জুলাই সংখ্যায়) প্রকাশিত হয়েছিল।

     স্মরনী-পুস্তিকার প্রচ্ছদ থেকে ক্লাবের লোগো-সহ মেম্বারশিপ কার্ড, পোস্টকার্ড ইত্যাদি সবই ডিজাইন করেন সত্যজিৎ রায়। প্রদর্শিত প্রতিটি চিত্রও নির্বাচন বা অনুমোদন করতেন তিনি। মান সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে কোনো ছবি প্রদর্শিত হতো না। অজানা ছবির ক্ষেত্রে synopsis  দেখে প্রাথমিক নির্বাচনের পর সত্যজিৎ রায় ঘন্টার পর ঘন্টা লিন্ডসে স্ট্রিটের প্যাটেল ইন্ডিয়ার প্রোজেক্‌শন রুমে কাটিয়েছেন। দিল্লি, বম্বে, এমনকি বিদেশ সফরকালেও ক্লাবের জন্য ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন। জাপানে চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রিত সত্যজিৎ রায় জাপানি এস.এফ. ফিল্ম সম্বন্ধে কৌতুহল প্রকাশ করলে উৎসবের উদ্যোক্তারা দ্বিধাগ্রস্তভাবে জানিয়েছিল, জাপানে এখনো মনস্টার জাতীয় ফিল্মেরই প্রাধান্য। সত্যজিৎ রায়ের ক্লাবে দেখানোর উপযুক্ত কিছু নেই। এই ধরণের নানা সংবাদ সহ ক্লাবের নানা ক্রিয়াকলাপের কথা নিয়মিত প্রকাশিত হত ‘আশ্চর্য’র ‘এস.এফ. সিনে ক্লাবের টুকরো খবর’ বিভাগে। প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের কাহিনীর সারাংশ বা পূর্নাঙ্গ অনুবাদও প্রতি সংখ্যাতেই থাকতো। ‘আশ্চর্য’ ও ‘এস.এফ.সিনে ক্লাব’ ছিল পরস্পরের সম্পূরক।

     ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম – ‘দা ইনক্রেডিবল শ্রিংকিং ম্যান’, ‘দা ফেবুলাস ওয়ার্ল্ড অফ জুল ভার্ণ’, ‘দা ম্যান অফ দা ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ ও ‘এ জেস্টার্স টেল’ (চেক্‌), ‘দা গোলেম’ (নির্বাক, ১৯১৫), ডিজনি-র ‘দা সন অফ ফ্লাবার’, ব্র্যাডবেরির কাহিনী অবলম্বনে ‘দা ইলাস্ট্রেটেড ম্যান’ ও ‘ফারেনহাইট ৪৫১’, কুবরিকের ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’ ও ‘২০০১ – এ স্পেস ওডিসি’ ইত্যাদি।

     ১৯৬৭-এর মার্চ সংখ্যা ‘আশ্চর্য’র পাঠক ও ‘এস.এফ.সিনে ক্লাব’-এর সদস্যদের কাছে বহন করে আনে প্রায় অবিশ্বাস্য এক সুখবর। সত্যজিৎ রায় এস.এফ. চলচ্চিত্র তুলতে যাচ্ছেন। ব্যবস্থা প্রায় সম্পুর্ণ। ছবিটির প্রযোজনায় আগ্রহী বিদেশী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা আনেকদুর এগিয়েছে।

     সত্যজিতের এই অভিশপ্ত ‘এলিয়েন’-এর কাহিনীতে প্রবেশ করার আগে চলচ্চিত্রে এস.এফ. সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা দরকার।

     চলচ্চিত্র তার শৈশবেই আকৃষ্ট হয়েছিল এস.এফ. থিমের প্রতি। বাক্‌স্ফুর্তির পূর্বেই এস.এফ.-এর বিচিত্র কল্পনার দৃশ্য আবেদনের মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন চলচ্চিত্র-নির্মাতারা। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯০২-এ গৃহীত জর্জ মেলিয়ে-র ১৬ মিনিটের ব্যঙ্গরসাত্মক ফ্যান্টাসি ‘এ ট্রিপ টু দা মুন’ একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছে। নির্বাক যুগের সেরা চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে রাশিয়ার লিও কুলেশভ প্রথম এস.এফ.-এর প্রতি আকৃষ্ট হন। আলেক্সি তলস্তয়ের ‘দা হাইপার্‌বলয়েড অফ ইঞ্জিনিয়ার গ্যারিন’ অবলম্বনে তিনি ১৯২৫-এ সৃষ্টি করেন ‘লুচ্‌ স্মিয়েরচি’ (মৃত্যু রশ্মি)। সমালোচক জন ব্যাক্সটার ফিল্মটি সম্বন্ধে লিখেছেনঃ

Leo Kuleshov, one of the Soviet’s greatest directors of the period, used this melodrama set in an unnamed Western country as a means of dramatizing to the Russian people the sophistication of Soviet film-making, the equal to the world’s best ….. ‘The Death Ray’s degree of commitment was to remain unchallenged until the polemical onslaughts of ‘On the Beach’ near to our time.

     (নেভিল শ্যুট-এর কাহিনী অবলম্বনে গৃহীত ‘অন দা বিচ্‌’ পারমাণবিক বিস্ফোরণঘটিত বিভীষিকার এক আধুনিক এস.এফ. চলচ্চিত্র)

     কুলেশভের পরেই নির্বাক যুগের আরেক পরিচালককে আকৃষ্ট করেছিল এস.এফ.। ফ্রিৎজ ল্যাং। ডিক্টেটর-শাসিত ভবিষ্যতের হাই-টেক্‌ শহরের সেই বৃত্তান্ত, ‘মেট্রোপলিস’(১৯২৭) চলচ্চিত্রের ভাষার নিপুণ প্রয়োগে যেমন ‘ক্ল্যাসিক’ রূপে বিবেচিত, তেমনই আজও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি। কিন্তু এস.এফ. চলচ্চিত্রের ইতিহাসের আদ্যোপান্ত বিবরণ এই প্রবন্ধের উদ্দিষ্ট নয়। সত্যজিৎ রায়ের ‘এলিয়েন’ প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তনের আগে এখানে ‘আশ্চর্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘কুবরক, ক্রফো ও SF’-এর প্রাসঙ্গিক অংশটির প্রতি শুধু দৃষ্টি আকর্ষ্ণ করছি। সত্যজিৎ লিখেছেনঃ২১

     কিন্তু এতকাল পৃথিবীর মধ্যে যারা সেরা পরিচালকের পর্যায়ভুক্ত তাদের কেউই এদিকে [এস.এফ.-এর] এগোন নি। সম্প্রতি এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। গত বছরের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে Godard-এর Alphaville  ছবি পেয়েছিল প্রথম পুরস্কার। এ সম্মান এস.এফ. ছবির ভাগ্যে এর আগে কখনো জোটে নি। Alphaville ছবির পরিচালকের প্রধান কৃতিত্ব ছিল, একটিও কৃত্রিম সেট তৈরি না করে, আজকের দিনের প্যারিস শহরের রাস্তাঘাটে হোটেল আপিস ইত্যাদিতে ছবি তুলে, কেবলমাত্র আলো ও ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ নির্বাচনের চাতুরির জোরে ভবিষ্যতের বিজ্ঞান-শাসিত এক প্যারিসের চেহারা ছবিতে এনে ফেলেছিলেন। কলাকৌশলের দিক থেকে এ ছবি অবিস্মরণীয় সে কথা বলতে দ্বিধা নেই।

     ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া ক্রফো ও আমেরিকান স্ট্যানলি কুব্রিকের আশ্চর্য প্রতিভার পরিচয় আমরা একাধিক মার্কিন ও ফরাসি ছবিতে পেয়েছি। সম্প্রতি এঁরা দুজনেই এল্‌স্ট্রি স্টুডিওতে পাশাপাশি ফ্লোরে কাজ করে দুজন নামকরা এস.এফ. লেখকের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে দুটি ছবি তুলেছেন। ক্রফো তুলেছেন রে ব্র্যাডবেরির Fahrenheit 451, ও কুবরিক তুলেছেন তারই অনুরোধে এবং সহযোগিতায় আর্থার ক্লার্ক রচিত 2001: A Space Odyssey, আমি এবার লন্ডনে গিয়ে আর্থার ক্লার্ক এর সাথে যোগাযোগ করে এলস্ট্রি-তে উকি দেই, ক্রফোর ছবি শুনলাম তোলা শেষ, কিন্তু কুবরিক তখনও তুলে চলেছেন A Space Odyssey. ফ্লোরে গিয়ে মহাকাশযানের অভ্যন্তরের সেট দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কুবরিকের সাথে দু মিনিট কথা বলে যিনি এই রকেটের নকশা করেছেন তাঁর সাথে আলাপ করলাম। শুনে অবাক হলাম তিনি নাকি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রকেট ডিজাইনার। এবং তাঁর পরিকল্পিত রকেট নাকি এর আগেই মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে। সিনেমার কাজ কেন করছেন জিগ্যেস করাতে হেসে বললেন, এতে পয়সা অনেক বেশি।

     কুবরিক ও তাঁর সহকর্মীদের কাজের বহর ও উৎসাহ দেখে Space Odyssey নির্মাতাদের দাবী মানতে অসুবিধা হয়না। এঁদের মতে এত বড় এস.এফ. ছবি নাকি আগে কখনও হয়নি, এবং এ ছবি আত্মপ্রকাশ করার পর অন্তত দশ বছর নাকি অন্য কোন প্রযোজক মহাকাশ নিয়ে ছবি করার সাহস পাবেন না।

     সত্যজিৎ কিন্তু এই নিবন্ধ লেখার কয়েক মাস পূর্বেই ‘এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য রচনায় হাত দিয়েছেন সে-কথা আমরা মারি সিটন-কে লেখা তাঁর চিঠি থেকে আগেই জানতে পেরেছি। বিশাল ব্যয়বহুল ‘স্পেশাল এফেক্ট’-এর চোখ-ধাঁধানো আড়ম্বরের কথা ধরলে সত্যিই স্পেস ওডিসি-র পর এ-ধরণের চলচ্চিত্র নির্মাণে সত্যজিতের মতো ভারতীয় পরিচালকের পক্ষেও ব্রতী হওয়া দুঃসাহসের কাজ ছিল। কিন্তু মহাকাশ বিষয়ক এস.এফ. চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সত্যজিতের কল্পনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের। ‘এলিয়েন’-এর কাহিনী সূত্রে তার পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। তবু, স্পেস ওডিসি-র বাজেটের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও ‘এলিয়েন’ প্রযোজনা করার জন্যও বিদেশী সহযোগিতা অপরিহার্য ছিল। কাজেই সাহস নয়, সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন সত্যজিৎ।

     ১৯৬৭-র মার্চ সংখ্যা ‘আশ্চর্য’-য় লেখা হল, সত্যজিতের এই সায়েন্স ফিক্‌শন গৃহীত হবে বাংলাতেই, অভিনেতাদের মধ্যে থাকবেন একজন খ্যাতনামা আমেরিকান এবং চলচ্চিত্র গ্রহনের কাজ শেষ হওয়ার পরে সত্যজিতের কাহিনী অবলম্বনে আর্থার সি ক্লার্ক রচনা করবেন একটি উপন্যাস। প্রসঙ্গক্রমে, আর. ডি. বনসলের ‘গুপী গায়েন’-সহ এই এস.এফ. ফিল্মের প্রযোজনার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আসার কথাও জানানো হয়।

     ‘আশ্চর্য’-র পরবর্তী সংখ্যার ঘোষণা, ইংরেজিতে চিত্রনাট্যের প্রথম রচনার কাজ সম্পূর্ণ। সত্যজিৎ রায়ের মুখে কাহিনীটিও শুনেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অদ্রীশ বর্ধন। বাংলাদেশের বীরভূম বা বাঁকুড়ার কোনো গ্রামে ছবিটির বহির্দৃশ্য গৃহীত হবে। টড-অ্যাও স্ক্রিনে প্রদর্শনের উপযোগী চিত্রটি বিদেশী ক্যামেরায় তোলা হবে। আর্ট ডিরেক্টর ভারতীয় হলেও মেক্‌-আপ ম্যান আসবেন বাইরে থেকে। আসবেন স্পেসশিপ তৈরির এক্সপার্ট-ও। ছবির আমেরিকান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মার্লোন ব্র্যান্ডো ও স্টিভ ম্যাকুইন উভয়েই আগ্রহী।

     ১৯৬৭-র মে সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘সত্যজিৎ রায়ের সায়েন্স ফিক্‌শন ফিল্ম “অবতার” প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাতকার’। সত্যজিৎ রায় জানান, মাড়োয়ারির ভূমিকায় অভিনয়ে পিটার সেলার্স রাজি হয়েছেন। আগাগোড়াই আমেরিকান ইংরেজিতে কথা বলবেন, কিন্তু সেলার্সের বাংলাতেও বলার খুব ইচ্ছা, তাই হয়তো তাঁকে কিছু সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আমেরিকানের চরিত্রাভিনয়ে মার্লোন ব্র্যান্ডো আগ্রহী, কিন্তু সত্যজিৎ বাবুর ইচ্ছা স্টিভ ম্যাকুইনকে নেওয়ার। ম্যাকুইন-কে না পেলে পল নিউম্যান। কাহিনীর নামকরন প্রসঙ্গে সত্যজিৎ বলেন, ইংরেজিতে The Alien –বাংলায় সম্ভবত ‘অবতার’। গল্পের একটি ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল এই সাক্ষাতকারে। সত্যজিৎ রায়ের মুল কাহিনী অবলম্বনে আর্থার সি ক্লার্ক একটি উপন্যাস রচনা করবেন – এই বক্তব্য আবার সমর্থিত হয়। ১৯৬৮-র ফেব্রুয়ারিতে ছবির কাজ শুরু হয়ার কথা প্রসঙ্গে বিদেশী এজেন্ট মাইক উইলসনের নামও উল্লিখিত হয়।

     মাইক উইলসনের সঙ্গে সত্যজিতের হলিউড ও ইংল্যান্ড সফরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, ‘এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্যে সত্যজিতের নামের সঙ্গে মাইকের নিজের নাম যুক্ত করা, বিদেশী প্রযোজক প্রদত্ত অগ্রিম টাকা উধাও হওয়া ইত্যাদি ঘটনার কথা অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে কৌতুক কাহিনীর মতো সত্যজিৎ রায় ১৯৮০ তে লিপিবদ্ধ করেছেন স্টেটস্‌ম্যান পত্রিকায়। ‘Ordeals of the Alien’ নামে দুই কিস্তিতে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল।মাইক উইলসন সত্যজিতের ভাষায় ‘সীতা হরণ’ করেছিলেন। কিন্তু অভিশপ্ত ‘এলিয়েন’-এর অধ্যায়ে তাও যবনিকাপাত হয়নি। সেটি ঘটল ‘এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য মিমিওগ্রাফ-করা কপি থেকে অনেকে আইডিয়া আত্মসাৎ করে স্পিল্‌বার্গের ই.টি. আবির্ভূত হওয়ার পর। ‘আজকাল’ দৈনিকপত্রে দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন ‘সত্যজিৎ এলিয়েন ও স্পিলবার্গ’-এ তার পূর্ণ বিবরণ আছে।১৭ মারি সিটনের ‘সত্যজিৎ রায়’ গ্রন্থে ‘আলিয়েন’ বিষয়ক দীর্ঘ আলোচনা, চিত্রনাট্যের অংশ ও সত্যজিতের আঁকা গ্রহান্তরের অপার্থিব আগন্তুকের দুটি স্কেচ সাক্ষী যে স্পিল্‌বার্গের ই.টি. ‘এলিয়েন’-এর অপভ্রংশ।

 

উপসংহার

তিনের দশকে ‘সায়েন্স ফিকশন্‌’ পরিভাষার জন্মের পর একটি ঘরানা গড়ে উঠেছিল মূলত মার্কিন একটি উপচার রুপেই। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত ‘ভৌতিক কাহিনী’, ‘গোয়েন্দা কাহিনী’ ইত্যাদির সঙ্গে পাল্লা দেবে মনে হয়েছিল মনোরঞ্জক লঘু সাহিত্যের এই নতুন শাখা। প্রযুক্তি বিলাসে মত্ত অ্যাফলুয়েন্ট সোসাইটির পলাতক মনোবৃত্তির দৌলতে জনপ্রিয়তাও অর্জন করবে বলে আশা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে সায়েন্স ফিকশন ‘পত্রিকা’ বা ‘গোষ্ঠিকেন্দ্রিক’ উন্মাদনার সঙ্গে সঙ্গে মনোরঞ্জক সাহিত্য হিসাবেও তার আবেদন হারিয়েছে। ‘সায়েন্স ফিকশন’ পরিভাষাটি জন্মের পূর্বেই যারা এই শাখাকে সমৃদ্ধ করেছেন যেমন শেলি, ভার্ণ, ওয়েলস্‌ কি চাপেক – তাঁদের সাথে যুক্ত হয়েছেন ব্র্যাডবেরি, স্ত্রুগাৎস্কি, লেম বা সত্যিজিতের মতো মননশীল মানবতাবাদী সাহিত্যকরা। নীতি ও মূল্যবোধ নিরপেক্ষ প্রবল পরাক্রান্ত বিজ্ঞানের জগতের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জগতের একটি বিবেক-বন্ধন রচনাসুত্রেই এস.এফ. চর্চায় ব্রতী তারা। এমনকি এস.এফ. যেখানে এই সেতুবন্ধনে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে সেখানে এস.এফ. এর আশ্রয়েই এস.এফ.–কে সমালোচনা করতে দ্বিধাগ্রস্ত নন সাহিত্যিকরা।

     বিদেশে সায়েন্স ফিকশন আজ সিরিয়াস অধ্যয়নের বিষয়। ওহিও-র উস্টার কলেজের ‘Extrapolation’ পত্রিকা ১৯৫৯ থেকে এস.এফ. বিষয়ক অ্যাকাডেমিক আলোচনায় ব্রর্তী। মননশীল পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরো দুটি নাম ‘Foundation’ (নর্থ-ইস্ট লন্ডন পলিটেক্‌নিক) ও ‘Science Fiction Studies’ (ইন্ডিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি)। কয়েক শো পাঠক্রম আছে সায়েন্স ফিকশন বিষ্যে ইয়োরোপ ও আমেরিকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘সাইকোলজি’র ছাত্রদের অতিরিক্ত পাঠ্যপুস্তক হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে এস.এফ. কাহিনীর অভিনব সংকলন ‘Introductory Psychology Through Science Fiction’। নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্স। যার উদ্যোক্তাদের মধ্যে ক্ল্যারিওনরাইটার্স ওয়ার্কশপ, সায়েন্স ফিকশন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন ও মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সায়েন্স ফিকশন সিম্পোশিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে রায়ো ডি জেনিরোয় (১৯৬৯), টোকিও-য় (১৯৭০) এবং সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের সায়েন্স ফিকশন মহলের জন্য বুদাপেস্টে (১৯৭১)।

     বাংলায় সায়েন্স ফিকশন নিয়ে সিরিয়াস কোনো গবেষণা হয় নি। বাংলা সাহিত্য পত্রিকায় সায়েন্স ফিকশন আজও অচ্ছুৎ। ‘অন্বেষা’ নামে বিজ্ঞান পত্রিকার একটি কল্পবিজ্ঞান সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৭-তে।১৬ আর এ-বছর ‘শব্দ-শাব্দিক’ প্রকাশ করেছে কল্পসমাজ ও কল্পবিজ্ঞানের একটি বিশেষ সংখ্যা।২০ ১৯৮৭-র ‘দেশ’ পত্রিকার একটি সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী।১৯ কিন্তু এ ফর্দ ব্যতিক্রমেরই।

     এই অবস্থার জন্য বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শিশু ও কিশোরদের জন্যই শুধু সায়েন্স ফিকশন লেখা হবে, এটাই এখনো অবধি রেওয়াজ। আর সেই সঙ্গে সায়েন্স ফিক্‌শনের দুটি বাংলা পরিভাষা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পে’র সঙ্গে ‘কল্পবিজ্ঞানের গল্পে’র ঠান্ডা লড়াই জারি করেছেন কিছু স্পর্শকাতর পন্ডিতমন্য ব্যক্তি। বুঝতে অসুবিধা হয়না যে কিছু সমালোচক মনে করেন কল্পবিজ্ঞানের গল্প কিঞ্চিৎ নিকৃষ্ট জাতের, সেখানে ফ্যান্টাসির দাপট বেশি এবং বিজ্ঞানের অপলাপের সুযোগ আছে। এর থেকে আরো একটি ভ্রান্ত অনুমানের হদিশ পাই আমরা, যা সায়েন্স ফিক্‌শনের প্রকৃত তাৎপর্য ও সুপ্ত ক্ষমতা উপলব্ধি করতে না পেরে তাকে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলার কাজে নিযুক্ত করার পথনির্দেশ মনে করে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘মনু দ্বাদশ’, অথবা এই প্রবন্ধে আলোচিত সত্যজিৎ রায়ের রচনাগুলিকে আমরা ‘কল্পবিজ্ঞানের গল্প’ আখ্যা দিই বা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প’, সায়েন্স ফিক্‌শনের চর্চা এই আদর্শ অনুসরণ করেই সার্থক হতে পারে।

                

  সহায়ক গ্রন্থ ও উল্লেখপঞ্জি

১. John Baxter, Science Fiction in the Cinema, 1970

২. Evgeni Brandis, ‘The Horizon of Science Fiction’, Soviet Literature, January, 1983

৩. Vladimir Gaskov, ‘A Test of Humanity’, Soviet Literature, January, 1983

৪. Harry A. Katz, et al, Introductory Psychology Through Science Fiction, 2nd Ed., 1977

৫. P.S. Krishnamoorthy, A Scholar’s Guide to Modern American Science Fiction, 1983

৬. V.S. Muraviov, ‘Invitation to the Strange Land’ (in Russian),Science Fiction: English & American Science Fiction, Moscow, 1979.

৭. Patrick Parrinder, Science Fiction: Its Criticism &Teaching, 1980

৮. Rabikia, E.S. & Scholes R., SF: History, Science, Vision, 1977

৯. Satyajit Ray, ‘Ordeals of the Elien’ I & II, The Statesman, Oct 4&5, 1980

১০. Franz Rotteastiener, The Science Fiction Book, 1975

১১. Marie Seton, Satyajit Ray, 1972(Vikas).

১২. Phillip Strick, Science Fiction Movies, 1976

১৩. Richard E. Ziegfield, Stanishaw Lem, 1985

১৪. The Statesman, ৩০ জানুয়ারি, ১৯৮৬।

১৫. অদ্রীশ বর্ধন, ‘বাংলায় কল্পবিজ্ঞান’, যুগান্তর, ১১ ও ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩

১৬. অন্বেষা, বিশেষ কল্পবিজ্ঞান সংখ্যা, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৮৭

১৭. আজকাল, ২৫ মে, ১৯৮৭

১৮. আশ্চর্য (সম্পাদকঃ আকাশ সেন) ১৯৬৩-১৯৬৮

১৯. দেশ, ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৭

২০. শব্দ-শাব্দিক, জানুয়ারি-মার্চ, ১৯৮৮

২১. সত্যজিৎ রায়, ‘কুবরিক ক্রফো ও SF’, আশ্চর্য, অক্টোবর-নভেম্বর, ১৯৬৬

২২. সত্যজিৎ রায়, ‘শোকবার্তা’ (দিলীপ রায়চৌধুরী), তদেব।

২৩. সত্যজিৎ রায়, ‘এস.এফ.’ (‘নাউ’ পত্রিকা থেকে অনুবাদঃ অসীম বর্ধন), আশ্চর্য, জানুয়ারি, ১৯৮৭।

২৪. সিদ্ধার্থ ঘোষ, ‘বাংলা সায়েন্স ফিক্‌শনের ঐতিহ্য’, তৃতীয় নয়ন (১৮৮২ থেকে আধুনিক কাল অবধি বাংলা সায়েন্স ফিকশন গল্পের সংকলন), ১৯৮৬

২৫. স্তানিসোয়াভ লেম, পৃথিবী কি করে বাঁচলো (অনুবাদঃ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়), ১৯৭৯।

২৬. স্তানিসোয়াভ লেম, মুখোশ ও মৃগয়া (অনুবাদঃ ঐ), ১৯৮৫।

 

কঃসঃ – এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশ পায় এক্ষণ বার্ষিক সংখ্যা ১৩৯৫-তে। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি কল্পবিশ্বের দুটি সংখ্যায় পুনঃপ্রকাশ করা হল।পুনঃপ্রকাশের সময় বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই সংখ্যায় থাকছে অন্তিম পর্ব বাংলা কল্পবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা। লেখকের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি এবং রচনাসমূহের তালিকা প্রকাশ পেয়েছিল কল্পবিশ্বের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায়। উৎসাহী পাঠক সেটি পড়তে পারেন নিচের লিঙ্ক এ ক্লিক করেই।

সায়েন্স ফিকশন – প্রথম পর্ব 

স্বর্ণযুগের সিদ্ধার্থ

৩১শে অক্টোবর ২০০২ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। আমরা তাঁর মেয়ে বা অন্য কোন নিকট আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। তাই তাদের অনুমতি ব্যাতিরেখেই প্রবন্ধটি এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হল। প্রবন্ধটি টাইপ করে ডিজিটালাইজড করতে সাহায্য করেছেন দোয়েল বর্মণ।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!